হৃদয়ের নাম আরশিনগর

লিখেছেনঃ মেঘ রাজ সাইমুন।

(প্রথম পর্ব)

<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<< 

বিঃদ্রঃ তোমার একটিমাত্র জীবন যদি প্রেমহীন থেকে যায়,শর্তহীন দলিলে যদি কোন বিবাদীর নাম লেখা না থাকে,অনাবিষ্কৃত ভালোলাগা যদি তোমার ঠোঁটের আঙ্গিনায় বিরহ না জাগায়,একটিমাত্র জীবনে তুমি যদি কলঙ্ক এর সুখই না পেলে-তবে তুমি…!তবে তুমি আমার গল্প পড়ো না।

<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<< 

এক।

গ্রীষ্মের ঝলসা রোদে পুড়ে ভর্তি কোচিং থেকে ফিরতেই ধমক খেয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে গেল বর্ণ।

অভিমানে চোখ ছলছল করছে তার।অভিমানটা জমা পড়ছে আন্নার উপরে।তার কেবল মনে হতে লাগল,শহরে এতো আত্মীয়স্বজন থাকতে আন্না কেন তাকে তার বদরাগী মামাতো ভাইয়ের কাছে রেখে গেল?মা-বাবা বেঁচে থাকলে এমনটা কখনো হতো না।ছোটবেলা থেকে এই একটা মানুষকে সে যমের মতো ভয় পায়।নানাবাড়ি গেলে যতটা সময় এই মানুষটা ঘরে থাকত সে বাড়ির এক কোণে চুপসে রইত।তারপর বিকেলে ক্রিকেট খেলতে বেরিয়ে গেলে বর্ণ নানা বাড়ির সারা পাড়া চরে বেড়াত।মামাতো ভাই তীর্থের সাথে তার বেশ সখ্যতা।অবশ্য বিচারে ভুল হয়ে গেলে ভোগান্তির শেষ থাকতো না।সে প্রসঙ্গে আমরা পরে আসি।তার শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরেফিরে বারবার মনের দরজায় কড়া নাড়ে,নানাবাড়িতে পার্থ ভাইয়া,ভাবী,নানু,নানাভাই,তীর্থ ভাইয়া,মামা,মামী সবাই এতো ভালো।কিন্তু মামার এই মেজো ছেলেটা এতো বদমেজাজি হলো কিভাবে?

বর্ণকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে স্বার্থ বলল,কি ব্যাপার বললে না তো তোমার কোচিং ক্লাস কখন শেষ হলো?

বর্ণ ভয়ে ভয়ে বলল,দু’টোয়।

-এখন চারটা বাজে?তুমি কই ছিলে এতক্ষণ?

বর্ণের কলিজা শুকিয়ে গেল।এখন এক গ্লাস পানি তার খুব দরকার।কিন্তু প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ না হলে সে এক পা ও নড়তে পারবে না।

ঢোঁক গিলে বলল,এক বন্ধুর সাথে নীলক্ষেত গিয়েছিলাম কিছু বইয়ের জন্য।

স্বার্থ ততক্ষণে ফোঁসফোঁস করতে লাগল।বলল,আমাকে বলতে,আমি এনে দিতাম।তুমি এই কড়া রোদে কেন ঘুরতে গেলে?

বর্ণ মাথা নিচু করে বলল,স্বার্থ ভাইয়া!আপনার ভার্সিটিতে ক্লাস আছে কি’না তাই বলি নি।

-সেটা আমি বুঝতাম,আমার ব্যাপার।বেশি বোঝো?

বর্ণ মুখ ফ্যাকাশে করে বলল,আর হবে না।

-হয়েছে।যাও ড্রেস ছেড়ে শাওয়ার নাও।কিচেনে খালা সব গুছিয়ে রেখে গেছে।খেয়ে নাও।

খাবার না খেলে স্বার্থ বুঝতে পারবে।পরে আবার চেঁচামেচি করবে ভেবে বর্ণ বলল,আমি খেয়ে এসেছি ভাইয়া!

স্বার্থ টিউশনিতে যাচ্ছিল।দরজায় গিয়ে ফিরে দাড়িয়ে বলল,মানে?তোমাকে কতবার বলেছি বাইরে জাঙ্ক ফুড না খেতে?

বর্ণ আমতাআমতা করে বলল,বন্ধুরা খাওয়ালো বলেই তো।

-ও বন্ধুরা খাওয়ালো বলে খেতে হবে?আর দু’দিন এসে পারলে না,এতো খাওয়ানো বন্ধু কোথা থেকে জুটলো?

বর্ণ চুপ করে রইল।রাগে ঘনঘন ঠোঁট কামড়াতে লাগল।এক সপ্তাহও হয়নি ঢাকাতে এসেছে।এর মধ্যেই অসহ্য লাগছে তার।মনে মনে ভাবল,কে যে আন্নাকে বুদ্ধি দিয়েছি ঢাকা শহরে কোচিং করাতে।তাকে পেলে কাঁচা চিবিয়ে খেতাম।

স্বার্থ একটু চুপ থেকে বলল,শোনো,শরীফ ভাইয়া এখানে তোমাকে রেখে গেছে পড়াশুনার জন্য,এ্যাট লিস্ট ভালো একটা ভার্সিটিতে চান্স পাও যাতে।বাইরে বন্ধুদের সাথে আড্ডা,মাস্তি করার জন্য না।প্রথমবার বলে কিছু বললাম না।একই ভুল দু’বার যেন না হয়।

বর্ণ নিচু হয়ে মাথা নাড়াল।

রুমে এসে বর্ণ ব্যাগ বিছানায় ছুড়ে ফেলল।তার নিজের উপর প্রচন্ড রাগ হচ্ছে।গায়ের মাংস কামড়ে ছিড়ে ফেলতে ইচ্ছা করছে।একটা মানসিক রোগীর কাছে রেখে গেছে তাকে।একটা মোবাইল পর্যন্ত নাই যে কল করে ভাবীর সাথে সব শেয়ার করবে।আর কল করলেই বা কি?তাদের সংসারে তার আন্নাই সব!ভাবী আন্নার মুখের উপর কথা বলবে না।সারাদিন সংসার সংসার খেলবে।ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের বউ বলে কথা।দায়িত্ব কি তার কম।অনু আপুকেও কল করা যেত।কিন্তু সে তো এখন কলেজে।অনু গ্রামের কলেজে পড়তে পারলে,সে কেন পড়তে পারত না।এতদিন তো দিব্বি পড়ছিল।ইন্টার পাশ করে কি সে সংসারে বোজা হয়ে গেছিলো?বর্ণের সারা শরীরে হিম শীতল স্রোত বয়ে গেল এটা ভেবে যে,স্বার্থ ভাইয়া না জানি আবার আন্নাকে কল করে সব বলে দেয়।তাহলে ঝামেলার শেষ থাকবে না।মনে মনে সে দোয়া ইউনুছ পড়তে পড়তে বিছানায় গা এলিয়ে দিল।

বিকেলের পড়ন্ত রোদে বেরিয়েও দরদর করে ঘামছিল স্বার্থ।উজ্জ্বল শ্যামলা বর্ণের একুশের বলিষ্ঠ যুবকটির সারাদেহের যৌবন নিয়ে সুনীল আকাশের পড়ন্ত অথচ প্রখরতাপী সূর্য যেন খেলা করছিল।উন্নত নাসিকার নিচে মৃদু গোলাপি ঠোঁট বারবার কম্পিত হচ্ছিল,আয়ত চোখের ভ্রুযুগল কুচকে যাচ্ছিল তার।

টিউশনি বাসায় ঢুকতেই তার মেজাজ আরো বিগড়ে গেল।স্যারের দেরি হওয়াতে ছাত্র ব্যাট হাতে নিয়ে খেলতে বের হয়ে গেছে।ছাত্রের মা লজ্জিত হয়ে তাড়াহুড়ো করে ছেলেকে ডাকতে গেলেন।স্বার্থ মনে মনে বর্ণের উপর ফুঁসছে।বর্ণের দেরির জন্য আজ তার এমন অস্বস্তিতে পড়তে হলো।ঢাকায় গত সাড়ে তিন চার বছরে টিউশনি জীবনে এমনটা একদিনও হয় নি।হাজার যানজট থাকলেও সে সময় মতো উপস্থিত হয়েছে,নয় তো আগে থেকে জানিয়ে দিয়েছে।সোফায় বসে সে বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল।

দরজার আড়াল থেকে মণিষা বলল,স্বার্থ দাদা আপনাকে এক গ্লাস সরবত দেয়?

স্বার্থের অস্বস্তি ভাব বেড়ে গেল।গত নব্বই দিনে সে পড়াতে এসেছে সত্তর দিন।শুরুর দিন থেকে আজ একাত্তরতম দিনেও এই মেয়ে তার পিছে পড়ে আছে।একটা ক্লাস টেন পড়ুয়া মেয়ে তার সাথে সখ্যতার চেষ্টা করছে ভেবে তার কেমন যেন লাগে।

সে শান্ত গলায় বলে,আমি কি তোমার কাছে সরবত চেয়েছি?

মণিষা দুরুদুরু বুকে,আর্দ্র কন্ঠে বলে,না মানে দাদা আপনি খুব ঘেমে গেছেন তো?

-হ্যাঁ,তো?পাখা চলছে।

-তাহলে ফ্রিজের থেকে এক গ্লাস ঠান্ডা জল এনে দেয়?

-শোনো,মণিষা।আমি ঠিক আছি।তুমি বরং ওখানে দাঁড়িয়ে না থেকে পড়তে বসো।সামনে তোমার এসএসসি পরীক্ষা।সময় নষ্ট করো না।তাছাড়া আজ আমার একটু তাড়া আছে।মানব এলে ওকে পড়াগুলো দেখিয়ে চলে যাবো।

মণিষা দরজার আড়াল থেকে সরে গেল।মনে মনে বলল,কি রসকষহীন মানুষ করে গড়েছ ভগবান।

পড়ানো শেষ করে উঠার সময় মানব একটা চিরকুট বের করে বলল,স্যার!

স্বার্থ মানবের দিকে তাকিয়ে বলল,মানব!কিছু বলবে?

চিরকুটটি এগিয়ে দিয়ে সে বলল,দিদি দিয়েছে।

স্বার্থ পুনরায় ঘামতে শুরু করল।

সে চোখ স্থির করে বলল,মানব তুমি কাকিমাকে বলবে কাল থেকে আমি আর তোমাকে পড়াতে আসবো না।

কথাটা বলেই তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে এলো সে।

মিনিট পাঁচকের মতো হবে স্বার্থ কলিংবেল বাজিয়েই চলেছে।দরজা খোলার কোন নামগন্ধ নেই।বিরক্তি,রাগে তার অবস্থা খারাপ।

বিছানায় শরীর এলিয়ে দিতেই বর্ণের চোখে ঘুম ধরে গেছিল।কলিংবেলের আওয়াজ তার কান অবধি পৌঁছাতে মিনিট দশেক লেগে গেল।ভয়ে ভয়ে দরজা খুলতে যথারীতি প্রশ্নের পর প্রশ্ন।

-দরজা খুলতে এতো সময় লাগে?এতক্ষণ কি করছিলে তুমি?

-সরি,ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

-হোয়াট?তোমাকে আমি বলেছিলাম শাওয়ার নিয়ে পড়তে বসতে।আর তুমি এই সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুমালে?এসব কি বর্ণ?

-বললাম তো স্বার্থ ভাইয়া সরি।

-এসব অনিয়ম এখানে চলবে না বর্ণ।তুমি ঠিকঠাক ভাবে চলতে চেষ্টা করো।মাইন্ড ইট।

‘মাইন্ড ইট’ বলে ভেংচি কেটে স্বার্থের চলে যাওয়ার দিক তাকিয়ে রইল বর্ণ।তারপর দরজার কাছে বসে পড়লো।দু’হাত তুলে উপরে তাকিয়ে সে বলল,হে আল্লাহ!তুমি আমাকে এ কোন যমের হাতে পাঠালে!

রাতে টেবিলে পড়তে বসে বর্ণ বইয়ের উপর ঢলে ঢলে পড়ছিল।সেটা দেখে স্বার্থ বলল,কি ব্যাপার রাত দশটা বাজতে না বাজতে ঘুমে ঢলে পড়ছো যে?

-আসলে ভাইয়া আজ একটু বেশি ঘোরাঘুরি হয়ে গেছে।

-তার মানে তুমি কোচিংয়ে ক্লাস করো নাই।আড্ডাবাজি করছো?

বর্ণ চুপ করে রইল।ধরা পড়ে গেছে ভেবে চোখ মুখ লাল হয়ে গেল তার।স্বার্থ বইখাতা রেখে বিছানা থেকে নেমে বলল,টেবিলে বইখাতা গুছিয়ে রেখে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসো।আমি আসছি।

বর্ণ সবকিছু সেভাবে রেখেই ঢুলতে ঢুলতে ওয়াশরুমে ঢুকল।স্বার্থ ফিরে এসে বইখাতা অগোছালো দেখে দুধের গ্লাস সাইডটেবিলে রেখে সব গুছিয়ে সোফায় নিজের বইখাতা নিয়ে বসল।বর্ণ বের হতে বলল,দুধটুকু খেয়ে শুয়ে পড়ো।

বর্ণ হাই হাই তুলতে বলল,না,দুধ খাবো না।গন্ধ লাগে।

-শোনো,সন্ধ্যায় ভাত খেয়েছ বলে এখন ভারী কিছু দিলাম না।দুধটাই খেতে হবে।সুতরাং অজুহাত দেখিও না।

বর্ণ বিছানায় শুতে শুতে বলল,প্লিজ স্বার্থ ভাইয়া।

-বেশি বুঝো না তো বর্ণ।যা বলেছি করো।সকালে আমার অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে হবে।তোমার সাথে বকবক করতে মন চাচ্ছে না।

অগত্যা উপায় না দেখে বর্ণ ঢকঢক করে দুধের গ্লাস শেষ করল।

বিছানায় উঠে বলল,স্বার্থ ভাইয়া!এতো বড় বিছানা দু’জন তো শোয়াই যায়।আপনার কষ্ট করে সোফায় শোয়ার কি দরকার?

স্বার্থ ঘামতে শুরু করল।সে লেখায় মন দিয়েছিল,বর্ণের দিকে না তাকিয়ে বলল,দেখো বর্ণ!আমি কারোর সাথে বেড শেয়ার করতে পারি না।এই ফ্ল্যাটে আরেকটা বেডরুম আছে।শরীফ ভাইয়া বলেছে তুমি একা রুমে শুতে পারো না,আমিও জানি সেটা।তাই শুধু তুমি ভয় পাবে বলে এ রুমে থাকি।আর স্টাডির সময় সাহায্য লাগতে পারে তাই সন্ধ্যায় এসে বসে থাকি।

-না মানে আমি সোফায় থাকলেও তো হয়।

-শোনো,বেশি বুঝো না।যা বলছি করো।আমাকে আমার মতো থাকতে দাও।ঘুমাও।শুভ রাত্রি।

‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও-গোমড়ামুখো কোথাকার’ মনে মনে আওড়ালো বর্ণ।তারপর বলল,আচ্ছা গুড নাইট।

সকালে রাখালের মায়ের ডাকাডাকিতে ঘুম ভাঙ্গল বর্ণের।

বর্ণ আড়মোড়া দিয়ে বলল,উফস খালা!আপনি যান তো।আজ আমার কোচিং ছুটি।একটু ঘুমাবো।

-বর্ণ বাবু।স্বার্থ বাবু রেগেটো যাবে ক্যানে।উ কলেজটো যাবার টাইমটোতে কইনছে তুকে উঠে নাস্তাটো কুরতে।নাস্তাটো কুরে যত খুশি ঘুমা ক্যানে।

বর্ণ উঠতে উঠতে বলল,শোনেন,খালা!আপনি আমাকে বাবু বলবেন না।শুধু নাম ধরে ডাকবেন।

রাখালের মা পান চিবানো দাঁত বের করে বলল,কি টো কইনছিস তু।স্বার্থ বাবু শুনলে গোসসাটো কোরবোক।উ তুকেও বাবু কইতে কইনছে।মু উয়াকেও বাবুটো ডাকি।

-আপনি তাকে বাবু ডাকেন।আমার লাগবে না।

-পারবোক লাই।

বর্ণ মুখভার করে বলল,ওকে আপনার যা খুশি বলেন।আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।খাবার দেন।খেয়ে আপনার স্বার্থ বাবুকে উদ্ধারটো করি।

রাখালের মা স্মৃত হাসল।সে মেঝেতে ঝাড়ু দেয়া শেষ করে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বলল,ওহ,স্বার্থ বাবু,তুকে অহন গুসোলটো কুরে খাইনতে বুলছে ক্যানে।

বর্ণ রাগে দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরল,ধ্যাত ভাল্লাগেনা।

খেতে বসে বর্ণ জিজ্ঞাসা করল,খালা!পরোটার এমন অবস্থা কেন?এটা খাওয়া যায়?

রাখালের মা পূর্বের ন্যায় পান চিবানো দাঁত বের করে বলল,স্বার্থ বাবুটো ক্যানে।উ বুলে,মু বহুটো তেলে পরোটা ভাইনজি।উ কি কুরছে জানিস লাই?অল্প তেলেটো দুইটা পরোটা ভাজাইনছে।

কথাটা বলে রাখালের মা হি হি শব্দে হাসতে লাগল।বর্ণ ডিমের দিকে তাকিয়ে দেখল ডিমের অবস্থা আরো খারাপ।ডিম ভাজি হাতে উঠিয়ে বলল,আর এটা কিভাবে ভেজেছে?

রাখালের মায়ের হাসি বেড়ে গেল।হাসি মুখে রেখে বলল,উ আর কবেক লাই,এ্যাক কোড়ুই জ্বলন্ত পানিটোতে এতটু তেলটো দিয়া ডিম দিয়াছে ক্যানে।স্বার্থ বাবু কইন,উটো নাকি স্বাস্থ্যকর আছে।তেলটো বেশি খাইনলে নাকি ফিটটো হয়।

-ওটা ফিট নয় খালা।ফ্যাট।

-ঐ হলো ক্যানে।

বর্ণ বলল,আচ্ছা এই ক’দিন এসে সকালে যা খেয়েছি।মানে পাউরুটি,জেলি,কলা।ওগুলো দিন।আমি এসব খাবো না।

-ও গুলান লাই বাবু।স্বার্থ বাবু কইনছে উ কলেজটো ফেরার টাইমটোতে আইনবো ক্যানে।

-ওটা কলেজ নয়,খালা,ভার্সিটি।তাহলে আমি আজ খাবো না।আপনি আপনার স্বার্থ ফার্থ বাবু কে বলবেন না যে আমি খাই নি।

বর্ণ উঠে দাঁড়াল।রাখালের মা তার সামনে এসে বাঁধ দিল,বর্ণ বাবু,তু না খাইনলে উ টেরটো পাইবোক।মুকে বকবো।তু আজি খা ক্যানে ইটো।

‘উফ!বেশ ঝামেলায় পড়া গেল তো’ বলে বর্ণ ফের আবার বসে পড়লো ডাইনিংয়ে।

-রেগেটো যাইনছিা ক্যানে?উ তুকে বহুত খেয়ালটো কুরে।

-খেয়াল না ছাই!রীতিমতো অত্যাচার।

-স্বার্থ বাবুটো বহুত ভালোটো আনছে।

বর্ণ গজগজ করে বলল,ভালো না।ঘোড়ার আন্ডা।বদরাগী,মেন্টাল একটা।

দুই।

ক্লাস শেষ করে টিএসসিতে মৌনের সাথে বসেছিল স্বার্থ।ত্রিশা এসে দূর থেকে মৌনকে ডাক দিল।মৌন সেদিকে গেলে ত্রিশা বলল,একটু দূরে আয়।তোর সাথে কিছু কথা আছে।

মৌন স্বার্থের দিকে একবার তাকিয়ে বলল,তো এখানে বল!ও তো দূরেই বসা আমাদের থেকে।

ত্রিশা বিরক্তি নিয়ে বলল,উফ!তোর যেতে সমস্যা কি?

মৌন হাটতে হাটতে বলল,ওকে চল যাচ্ছি।কি বলবি বল?

ত্রিশা কিছুক্ষণ ভেবে বলল,তুই তো জানিস দোস্ত।স্বার্থ কে আমি পছন্দ করি।কিন্তু ও যা রাগি।আমার ভয় লাগে বলতে।তুই আবার একটু বলে দেখবি।

-দেখ ত্রিশা!যথেষ্ট হয়েছে।ভার্সিটিতে ছেলের অভাব নাই।তুই যে কেন ওর পিছনে পড়ে আছিস কে জানে!ত্রিশা একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,ওসব তুই বুঝবি না!তুই তো আর মেয়ে না।কোন ছেলেকেও ভালোবাসবি না।এসব বোঝা তোর কর্ম না।

মৌন পা দিয়ে মাটিতে একটা ঘা মেরে বলল,হুট!আমি ছেলেকে ভালোবাসতে যাবো কেন?কি যা তা বলিস!

-ধুর!এক্সামপল দিলাম।প্লিজ ওকে আরেকবার বল না!

-আচ্ছা এই লাস্টবার কিন্তু।আমি আর বলতে টলতে পারবো না।

ত্রিশা হেসে বলল,তুই বললেই হবে।মাতালদের মতো টলতে হবে না।

-মজা নিচ্ছিস ছাগল।

‘ওলে বাবা না লে’ বলে ত্রিশা মৌনের গাল টেনে দিলো।

গালে হাত দিয়ে মৌন ফিরে আসতেই স্বার্থ ফোড়ন কাটল,কি রে মেয়েদের হাতে চড় খেলি নাকি?

মৌন দ্রুত মুখ থেকে হাতটা সরিয়ে বলল,ধুর।আমাকে কোন মেয়ে মারবে?

-তাহলে ত্রিশা ডেকে নিয়ে আদর করলো?

-আরে না।আবার সেই কথা!

-কোন কথা?

-ঐ যে তোকে ভালোবাসে।

স্বার্থ দাঁত চেপে বলল,মৌন!তোকে কতবার বলেছি আমার সঙ্গে এসব বলবি না।তুই কি চাস আমি ডিপার্টমেন্টে ত্রিশার বিরুদ্ধে কমপ্লেন করি?

-কি আজব!তুই লোক হাসাবি নাকি?একটা মেয়ে তোকে ভয়ে প্রপোজ করতে পারে না বলে আমাকে দিয়ে বলাই।আর তুই বাচ্চাদের মতো বিহ্যাভ করিস।

স্বার্থ নিজেকে কন্ট্রোল করে বলল,প্লিজ!মৌন।তুই ত্রিশাকে বুঝিয়ে বল।না হলে কবে ঐ মেয়ে আমার হাতে মার খাবে।

-তুই কি সত্যি পাগল হয়ে গেলি।

-শোন,সামনে সেমিস্টার এক্সাম তোর যা অবস্থা।তুই এবারও অন্য সব সেমিস্টারের মতো যা তা রেজাল্ট করবি ত্রিশার দালালি করতে করতে।

মৌন একগাল হেসে বলল,তুই তো আছিস দোস্ত।আমার চিন্তা কি?

‘ধুর’ বলে সেখান থেকে উঠে গেল স্বার্থ।তার পিছু ছুটলো তার প্রিয় বন্ধু মৌন।

মাঝরাস্তায় মানবের মায়ের ফোন এলো।তার অর্থ মানবকে আবার পড়াতে যেতে হবে।কিন্তু মণিষার ঝামেলাটা সে আর নিতে পারবে না।সুতরাং সরাসরি না বলে দেয়া ভালো ভেবে স্বার্থ ফোনটা রিসিভ করল।

-হ্যালো কাকিমা বলুন।

-বাবা,তুমি নাকি আর মানবকে পড়াতে আসতে পারবে না বলেছো!

স্বার্থ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,দেখুন কাকিমা।কথাটা আমি কিভাবে বলব ভেবে পাচ্ছি না।কোন কারন ছাড়া হঠাৎ করে তো আমি এ কথাটা বলব না নিশ্চয়।

-আসলে কি বলব স্বার্থ।আমি চিরকুট টা দেখেছি।তোমার কোন সমস্যা হবে না আশা করি।মণিষাকে আজ সকালে ওর মাসির বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছি।এখন থেকে ও ওর মাসি বাড়ি থেকে পড়াশোনা করবে।

স্বার্থ আমতা আমতা করে বলল,কিন্তু কাকিমা এটা তো ভালো দেখায় না।আমার জন্য মণিষা কেন পরিবার ছেড়ে থাকবে?

-তুমি কিছু মনে করো না বাবা।এমনিতেই মণিষা এদেশে থাকবে না।ভারতে ওর সম্মন্ধ ঠিকঠাক।দু’বছর পরে ও আমার বড় মেয়ের কাছে চলে যাবে ভারতে।ওখানেই সব কিছু হবে।

স্বার্থের মনটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল।কোথাও একটা টান যেন রয়ে গেল।হয়তো ভালোবাসার নয়,তবুও একটা মায়া মায়া গন্ধ হৃদয়ে সুবাস ছড়াত।সে যখন মানবকে পড়াতে যেত,দরজার আড়ালে একটা মেয়ে তাকে সমস্ত নজর জুড়িয়ে দেখতো।মাঝে মধ্যে চোখে চোখ পড়লে মেয়েটি লজ্জায় লাল হয়ে দৌড়ে পালাত।একটা দেখা মানুষকে অচেনার নেশা খেলে যেত মেয়েটির কোমল মনে।আচ্ছা এরপর যখন মানবকে পড়াতে যাবে সে কি দরজার ওপাশের মেয়েটিকে মিস করবে না?কিংবা মাঝেমধ্যে নাস্তা হাতে ধীর পায়ে কাছে আসা কাজলপরা চোখের মেয়েটির নজরবন্দি হতে মন চাইবে না?

‘কি হলো বাবা?’মানবের মায়ের আওয়াজে হুশ ফিরল তার।

-কাকিমা আমি পরশু থেকে আসব তাহলে।

-আচ্ছা বাবা বাঁচালে।আসলে মানব তোমাকে খুব পছন্দ করে।ছোট ছেলে তো,যার তার কাছে একদম পড়তে চাই না।

-হুম।ওকে কাকিমা রাখছি।

স্বার্থ বাসায় ফিরে বর্ণকে না দেখে রাখালের মাকে জিজ্ঞাসা করল,খালা!বর্ণ কোথায়?

রাখালের মা বলল,স্বার্থ বাবু!বিহানটোতে উঠে নাস্তাটো কুরে ঘুমটো দিনছে।বহুটো বার বুলাইনছি।উ উঠবেক লাই।রান্না কুরেটো যাইনছি,শুধু বুইলছে খালা তু যা ক্যানে।

স্বার্থ ব্যাগ রেখে বলল,ওকে তুমি যাও।রান্না শেষ করো আমি দেখছি।

রুমে ঢুকে একটানে ঘুমন্ত বর্ণ কে বিছানায় বসিয়ে দিল স্বার্থ।বর্ণ চোখ কচলাতে কচলাতে বলল,কি হলো?একটু ঘুমাই প্লিজ।

স্বার্থ জোরেশোরেই বলল,ঘুমাই মানে?দিনের বেলা তোমাকে ঘুমাতে কে বলেছে?

বর্ণ কেঁপে উঠলো।এবার তার হুশ এলো।এটা বাড়ি নয়।বাড়িতে অনু তাকে প্রতিদিন ঘুম থেকে টেনে তুলতো।সেটা নিয়ে দুই ভাইবোনের যত ঝগড়া।শেষে ভাবী মিটমাট করতো সব।এখানে তো যত ঝামেলা মেন্টালটাকে নিয়ে।মনে মনে বিড়বিড় করছিলো সে।

স্বার্থ বলল,তুমি উঠবে নাকি এ বয়সে মার খাবে?

বর্ণ মুখ ভার করে বলল,স্যরি!উঠছি তো।বকছেন কেন?

-হুম তাই।উঠে ফ্রেশ হয়ে এসো।সকালে গোসল করতে বলে গেছিলাম,করছিলে?

বর্ণ মাথা নাড়াল।

-গুড বয়।এখন যাও ফ্রেশ হয়ে এসো।

‘আচ্ছা’ বলে বর্ণ বাথরুমে ঢুকে গেল।

দুপুরে ডাইনিং এ খেতে বসে বর্ণ উসখুস করতে লাগল।সেটা দেখে স্বার্থ বলল,কিছু বলবে?

বর্ণ মাথা নিচু করে বলল,আমার কিছু বই কেনার ছিল!আমার ফ্রেন্ড সৃজনকে আসতে বলেছিলাম বিকালে।ও ঢাকায় অনেকবার এসেছে সবখানে চেনে তো তাই।যাবো?

স্বার্থ খেতে খেতে বলল,নাহ।ঢাকার সবখানে আমিও চিনি।আমাকে বইয়ের লিস্ট দিও,এনে দিবো।

‘আচ্ছা’ বলে বর্ণ উঠতে যাচ্ছিল।

-কি ব্যাপার!অর্ধেক খেয়ে উঠে যাচ্ছ কেন?

-না মানে ক্ষুধা নেই।

-ওসব বলে আমার কাছে অন্তত কিছু হবে না।পুরোটা খেয়ে তারপর উঠো।

বর্ণ রাগে গোগ্রাসে খেতে লাগল।সব কিছুতে এতো বাধ্য বাধকতা তার ভালো লাগে না।আন্না পর্যন্ত তাকে কখনো ধমকিয়ে কথা বলে না।আর এখানে তাকে উঠতে বসতে নিয়ম করে চলতে হচ্ছে।শ্বাসনালীতে খাবার যেয়ে বর্ণ বিষম খেল।এমনিতে রাগ,তার উপর কাশতে কাশতে লাল হয়ে গেল।স্বার্থ দ্রুত পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে রাখালের মাকে ডাকতে লাগল।

-খালা!ওর পায়ের বুড়ো আঙ্গুলে একটু পানি দাও তো।

রাখালের মা বর্ণের পিঠে হাত দিয়ে অল্প অল্প করে চড় দিতে লাগল।মাথায় ফুঁ দিতে লাগল।

-বর্ণ বাবু!বুড়ো বুড়ো শ্বাঃসটো লে।

স্বার্থ বলল,কি খালা!তোমাকে যা বলেছি করো।

রাখালের মা গ্লাসের পানি নিয়ে বর্ণের পায়ের আঙ্গুলে ঢালল।ঠিক হয়ে গেলে বর্ণ আবার খাওয়া শুরু করল।

-ওয়েট,তুমি এতো জিদ দেখাচ্ছ কেন?আমি তোমাকে পানি খেতে বলেছি।তুমি সেটা না করে আবার গোগ্রাসে খাওয়া শুরু করছ?

বর্ণ কিছু বলল না।স্বার্থ নিজের খাবারে পানি ঢেলে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,প্লেট রাখো তোমার খেতে হবে না।এক চড়ে তোমার দাঁত ফেলে দেবো।বেয়াদব কোথাকার।

রাখালের মা স্বার্থের ভাবগতি ভালো না দেখে সামনে দাঁড়িয়ে বলল,বাবু,গাইনটো হাত তুলবিক লাই।উ ছোটটো আছে!

-খালা!তুমি সামনে থেকে সরো।

-বুইলছি তো মু দেখেইনছি,বাবু।মুর বাজানটো আছে।নতুন ভাত দিনছি তু খা ক্যানে।

বর্ণ ভয়ে জড়সড়ে হয়ে গেল।

‘তুমি ওকে নিয়ে রুমে দিয়ে এসো’ বলে বর্ণের সামনে থেকে প্লেট নিয়ে গেল স্বার্থ।রাখালের মা বর্ণকে উঠিয়ে নিয়ে গেল।

এই মুহূর্তে বর্ণের প্রচুর হাসি পাচ্ছে।কিন্তু চাইলেই সে হাসতে পাচ্ছে না।দু’টো ছেলে একই রিকশায় যাচ্ছে অথচ স্বার্থ এমন ভাব করছে যেন দু’টো সম্পূর্ণ অপরিচিত ছেলেমেয়ে দায়ে পড়ে এক রিকশায় বসতে বাধ্য হয়েছে।বলা বাহুল্য যে আজকাল অপরিচিত ছেলেমেয়েও এমন অস্বস্তিবোধে থাকে না।তারপর স্বার্থের মতো একটা সুন্দর সুশ্রী ছেলেকে তো এসব মানায় না।বর্ণ নিজে একটু সরে বসে বলল,স্বার্থ ভাইয়া!এদিকে এগিয়ে বসুন,আপনি তো পড়ে যাবেন!

স্বার্থের কপাল বেয়ে ঘাম পড়ছে।উজ্জ্বল বর্ণ গায়ের রং ফ্যাকাশে হয়ে গেছে তার।অথচ কিছুক্ষণ আগে বৈশাখের শেষ হালকা বৃষ্টি হয়ে গেল।আকাশ মেঘলা।ঠান্ডা হাওয়া বইছে।স্বার্থ আরো কিছুটা বাইরে ঝুকে বসে বলল,ইট’স ওকে।আমি ঠিক আছি।

বর্ণ কিছুটা মুচকি হাসল।তারপর পিঠের ব্যাগটা খুলে দু’জনের মাঝে রেখে দিল।

রিকশা বর্ণের কোচিংয়ের সামনে এলে স্বার্থ বলল,যাও!আচ্ছা তোমার কোচিং আজ ক’টা পর্যন্ত?

বর্ণ বিরক্তি নিয়ে বলল,ভাইয়া আমি একা যেতে পারব।

স্বার্থ বলল,জানি।কিন্তু আমার হয়তো আজ ক্লাস ক্যানসেল হতে পারে।আকাশে মেঘ,বৃষ্টি হলে তোমার সমস্যা হবে।

-ভাইয়া ব্যাগে ছাতা আছে।আর আমিও ছোট নেই।

-বেশি কথায় কাজ নেই।ক্লাস কয়’টায় শেষ সেটা বলো।

‘ক্লাস কয়’টায় শেষ সেটা বলো’ বর্ণ মনে মনে আওড়ালো।

তারপর বলল,আজ বারো’টা পর্যন্ত ক্লাস।

-আচ্ছা।আর শোনো ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়ে আড্ডা মেরো না।ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে।জ্বরসর্দি লেগে যাবে।

বর্ণ মনে মনে বলল,বেশি বকে।ব্যালকনিতে দাঁড়ায় সেটাও দেখে যায় নাকি?

প্রকাশ্যে বলল,ওকে।আসবো না।

কোচিং ক্লাসে ঢুকতেই সৃজন এসে একেবারে হুড়মুড়িয়ে গায়ের উপর পড়ল।বর্ণ ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে বলল,কি’রে দেখে চলতে পারিস না?

সৃজন বর্ণকে জড়িয়ে ধরে বলল,দোস্ত,ক্যাবলাকান্ত টা কে রে?

-এক্সকিউজ মি!ক্যাবলাকান্ত বলছিস কাকে?ও আমার মামাতো ভাই।স্বার্থ।

সৃজন হো হো শব্দ করে বলল,জমিদারের নাতি?

বর্ণ ব্যাগ রেখে বলল,নাতি নয়,পূর্বসূরি।

-তুইও তো তাই।

-হ্যা।তো?

-কিছু না।দোস্ত একটা ঝামেলা হয়েছে!

-কি?নিশ্চয় নীলার সাথে?

সৃজন মাথা নেড়ে বলল,হুম।প্লিজ দোস্ত একটু কথা বলবি?

বর্ণ সৃজনের পেটে ঘা মেরে বলল,শালা!সেই মাধ্যমিক থেকে তোদের বাল ছাল সামলে আসছি।ঢাকাতে আসলাম,তবুও পিছু ছাড়লি না!

-বাল ছাল বলছিস কেন দোস্ত?তোর বৌদি হয় তো।

বর্ণ ভেংচিয়ে বলল,বাল ছাল বলছিস কেন দোস্ত?তোর বৌদি হয় তো।শালা হিন্দু হয়ে মুসলমানের মেয়ের সাথে প্রেম করিস,লজ্জা করে না?

কিছুক্ষণ পরে বলল,বলতে পারি তবে একটা শর্ত আছে।

সৃজন মাথা চুলকিয়ে বলল,কি দোস্ত?

তোর মোবাইল থেকে আমি আগে বাড়ি কল করে কথা বলব,তারপর নীলাকে কল করব।চলবে?

‘দৌড়াবে’ বলে সৃজন মোবাইলটা এগিয়ে দিয়ে বলল,নে কর!শরীফ দাদার নাম্বার সেভ আছে দেখ।

বর্ণ মোবাইল টা হাতে নিয়ে বলল,উহু।আন্নাকে নয়।আন্না ব্যস্ত।ভাবীকে কল করব।

দু’বার রিং হতেই কল রিসিভ হলো।

-হ্যালো,কে?

-বলো তো কে?

রিসিভারের মহিলা ব্যস্তসমস্ত হয়ে পড়লেন,বর্ণ তুই?কেমন আছিস ভাই?

-হুম,কেমন আছিস ভাই?খুব তো বলা হচ্ছে।এই কয়দিন খোঁজ নিয়েছ?

তিনি একটু দুঃখিত হয়ে বললেন,জানিসই তো ভাই।তোর আন্না কল করতে দেয় না,নিজেও বোধয় করে না।বলে,কল করলে তুই নাকি পড়াশুনায় মন দিবি না।

-উহু,হয়েছে।এখন সব দোষ আন্নার উপর চাপাচ্ছ!খুব তো তুমি আমাদের মায়ের মতো।এই তার নমুনা?

মহিলাটি হয়তো দুঃখ পেলেন,বললেন,একথা বলতে পারলি ভাই?তুই জানিস না তোর আন্না কেমন?নিজেই তো ভয়ে জড়সড় হয়ে থাকিস।আবার আমাকে বলছিস।

বর্ণ বলল,আমি জানি ভাবি।বাদ দাও,তারপর বলো ডার্লিং কেমন আছ?

-আবার ফাজলামি!এই তো আমি ভালো আছি,তুই কেমন আছিস?

বর্ণ একগাল হেসে বলল,ফাজলামি হবে কেন?তুমি তো আমার সুইটহার্ট।ভালো নেই একদম!

-ওমা কেন?

-কেনটা তোমাকে বলা যাবে না।বললে আন্নার কানে চলে যাবে।

তিনি হেসে বললেন,ওকে বাবা।আমাকে বলতে হবে না।তোর সাথে পিরিতির আলাপ ছাড়া আমার বহুত কাজ আছে।এই নে আদরের বোনকে বল।

বর্ণ জানে এখন তার ভাবী মোটেও কাজ করবে না।দরজা বন্ধ করে খানিকক্ষণ কাঁদবে,তারপর উঠে আবার সংসারে নিপুণ বৌয়ের মতো কাজে লেগে যাবে।কাজের লোকেদের কাজ তার পছন্দ নয়,কোমর বেঁধে তাদের সাথে কাজ করবে।আন্না ফেরার সময় হলে কাজ থেকে কেটে পড়বে।

অনু বলল,বল ভাই।কেমন আছিস?কি করিস?ঠিক মতো খাওয়াদাওয়া করিস?

-আরে আপু!এতো প্রশ্ন একসাথে করলে আমি কোনটার উত্তর দিবো?

অনু মোবাইল নিয়ে পালঙ্কে শুয়ে পড়ল।বলল,নে এক এক করে বল।

বর্ণ গলা নিচু করে বলল,আর বলিস না আপু।আন্না আমাকে একটা মেন্টালের কাছে রেখে গেছে।

-কি বলিস যা তা!স্বার্থ ভাইয়া মেন্টাল হলো কবে থেকে?

-ধুর তুইও না।আরে বদমেজাজি।উঠতে বসতে আমার ধমক খেতে খেতে পেট অর্ধেক ভরে যায়।

অনু মিষ্টি শব্দ করে হেসে উঠল।বর্ণ বলল,তুই হাসছিস?

সৃজন এতক্ষণ বর্ণের কানের কাছে কান নিয়ে সব শুনছিল।আলাপের ধরন দেখে মোবাইলটা নিয়ে কল কেটে দিল।

-তুই দেখি ব্যালেন্সটাই শেষ করবি শালা।দিদির সাথে পরে কথা বলিস।নে নীলার সাথে কথা বল।

বর্ণ সৃজনের ঘাড় ধরে বলল,শালা ব্যালকনি থেকে ফেলে দিবো।কল ঢোকা হারামি।

পর মুহূর্তে তার মনে পড়ে গেল ব্যালকনিতে আসা নিষেধ।মেন্টাল টা না জানি আবার কোথা থেকে দেখছে বা স্পাই লাগিয়ে রাখছে।সে মোবাইল কানে ধরে বিল্ডিংয়ের উল্টো দিকের ব্যালকনিতে চলে গেল।

(দ্বিতীয় পর্ব)

<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<< 

বিঃদ্রঃ তোমার একটিমাত্র জীবন যদি প্রেমহীন থেকে যায়,শর্তহীন দলিলে যদি কোন বিবাদীর নাম লেখা না থাকে,অনাবিষ্কৃত ভালোলাগা যদি তোমার ঠোঁটের আঙ্গিনায় বিরহ না জাগায়,একটিমাত্র জীবনে তুমি যদি কলঙ্ক এর সুখই না পেলে-তবে তুমি…!তবে তুমি আমার গল্প পড়ো না।

<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<< 

তিন।

ভার্সিটি চত্বরে ত্রিশার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল স্বার্থের।এড়িয়েই যাচ্ছিল।ত্রিশা ডাকল।স্বার্থ দাঁড়িয়ে বলল,কেউ কিছু বলতে চাই?

ভাববাচ্যে কথা।সে সব সময় এমন করেই বলে।ত্রিশা অভ্যস্ত।বলল,বৃষ্টির দিনে পাঞ্জাবী পরে আসছ কেন?

স্বার্থ আসমানি রংয়ের সোনালি সুতোয় কাজ করা পাঞ্জাবী পরে এসেছে আজ।তার দাদীজানের হাতের কাজ।নিপুণ।সূক্ষ্ম।গতবছর ঈদে তাদের দুইভাইকে দিয়েছেন তিনি।ভাইয়া দেশে থাকলে তাকেও দিতো।সে চোখ সরু করে বলল,আমি কোন কারনে কি পরে আসব এটাও কি তোমাকে বলতে হবে?

ত্রিশা কিছুটা আহত হলো।বলল,নাহ!টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছে।নোংরা হবে!

-সেটা আমি দেখব।

-আচ্ছা একটা কথা বলো তো!

-কী?

-আমি দেখতে খুব খারাপ?

-আমার বলার কি আছে?বাসায় আয়না রাখ না?

-না গো।পোষাই না।তুমি বলো শুনি।

-সাড়ে তিন বছর পিছে পড়ে আছো,অথচ আমার ভালোবাসা পাচ্ছ না।এবার ভেবে দেখ তুমি কেমন!

-আমি এত বিশ্রী আগে জানতাম না।থ্যাংকস।

স্বার্থ চলতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল।বলল,আমি কেন আমার বন্ধু মৌনও তোমাকে পছন্দ করে না।যদি পারো প্রেম করে দেখাও।

ত্রিশা এবার বড়সড় আঘাত খেলো।সে যথেষ্ট সুন্দরী।সে নিজে বলে না।লোকে বলে।ভার্সিটির অনেক ছেলে তার পিছে পড়ে আছে।কিন্তু সে তাদের পাত্তা দেয় না।আজ তার নিজের কাছে খুব খারাপ লাগছে।সে জানে স্বার্থ যথেষ্ট স্মার্ট,হ্যান্ডসাম।কিন্তু সৌন্দর্যই কি একটা মানুষের এতো অহংকার হতে পারে?তদুপরি স্বার্থ শুধু তাকে নয়,কোন মেয়েকেই পাত্তা দেয় না।এমনই যে এতদিনে তার একটা মেয়ে বন্ধু জোটে নি,বলা ভালো সে জুটায় নি।মৌনই তার একমাত্র বন্ধু।সুখ-দুঃখের সাথী।ত্রিশা স্বার্থের মুখের উপর আঙ্গুল উঠিয়ে বলল,তোমাকে আমি চ্যালেঞ্জ দিলাম।সাতদিনের মধ্য মৌনকে আমার প্রেমিক করে ছাড়বো।

স্বার্থ স্মৃত হেসে বলল,ওকে ডান।

স্বার্থের আর ডিপার্টমেন্টে যাওয়া হলো না।ত্রিশার সাথে দেখা হয়ে তার মনটা খারাপ হয়ে গেল।শাহবাগের রাস্তায় হাটছে সে।রাস্তা বেশ শুনশান।এখনো হালকা বৃষ্টি।রাতের বৃষ্টিতে ঢাকা শহরের পথঘাট চকচক করছে।প্রতিদিনের তুলনায় আজ চোখে গাড়িঘোড়া কম পড়ছে।ভাবতে লাগলো একটা রিকশা নিয়ে বর্ণের কোচিংয়ের সামনে গেলে কেমন হয়?ওর ও হয়তো বৃষ্টির কারনে আজ ক্লাস হচ্ছে না।

বর্ষার জলে তার পাঞ্জাবী শরীরের সঙ্গে আটকে গেছে।মাথার চুলগুলো দল বেঁধে জায়গায় জায়গায় জনসভা করছে।ঠান্ডা লেগে ভয়ানক কিছু হলে সমস্যা।সামনে তার সেমিস্টার ফাইনাল।

রিকশায় বসে তীর্থকে কল করলো সে।অনেকদিন বাড়িতে কথা হয় না তার।শেষ কথা হয়েছে রসুলপুর বাজারে মতি ভাইয়ের দোকান থেকে আব্বার সাথে।মতি ভাইয়ের দোকান থেকে তার মাসের খরচ পাঠানোর জন্য যখন আব্বা তার দোকানে আসে তখন।শুনেছিল দাদাজান কিঞ্চিৎ অসুস্থ।তারপর আর খোঁজ নেওয়া হয় নি।

-কি’রে এতদিন পর?টাকা লাগবে?

-কেন টাকার প্রয়োজন ছাড়া আমি কল করতে পারি না?

তীর্থ হেসে বলল,না মানে তুই টাকার প্রয়োজনে সব সময় কল করিস কি’না!

-তাই তো।বাদ দে দাদাজান কেমন আছে?

-এখন বেশ ভালো।আব্বা গঞ্জের ধীরেন ডাক্তারকে বাড়িতে ডেকে এনে দেখিয়েছে।

-ধীরেন কাকা তো ভালো ডাক্তার।আচ্ছা ধীরেন কাকার মেয়ে শোভার কি বিয়ে হয়ে গেছে?

-নাহ।তবে পাত্রপক্ষ প্রায় আসে শুনি।

স্বার্থ গলা পরিষ্কার করে বলল,তুই কিভাবে শুনিস?

তীর্থ হো হো শব্দ করে হেসে উঠল।রহস্য বুঝতে পেরে স্বার্থ বলল,মাইর খাবি।এ্যাডভান্টেজ নিস না।আমি ঝামেলায় পড়বো।

-আরে না।তোর সমস্যা হবে এমন কিছু আমি করবো না ভাই।

-বাড়িতে আর সবাই কেমন আছে?

-ভালোই।আম্মা বলছিল তোকে অনেকদিন দেখে না।

-তোকে দেখলেই তো হয়।

-আমি আর তুই এক হলাম?

-সামনে আমার সেমিস্টার ফাইনাল।আম্মাকে বলিস শেষ হলে আসব।

তীর্থ নরম গলায় বলল,ভাই!

স্বার্থ মোলায়েম সুরে বলল,হুম!

-তুই ভালো আছিস তো?

স্বার্থ অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল,হ্যা।আমি ভালো আছি রে।

তীর্থ জানে স্বার্থ ভালো নেই।সে যতটা হাসিখুশি,প্রাণবন্ত।বিপরীতে স্বার্থ ততটা নিষ্প্রাণ,মলিন।তার ভাইটার হাসিমুখ শেষ কবে সে দেখেছে মনে নেই।তার কেবল মনে হয়,এত কিছু থেকেও ভাইটা তার জনম দুঃখী।

-শুনলাম,বর্ণ তোর ফ্ল্যাটে উঠছে?

স্বার্থ বিরক্ত নিয়ে বলল,আর বলিস না।জ্বালিয়ে মারে।সারাক্ষণ বন্ধু,আড্ডা,লাফালাফি নিয়ে আছে।

তীর্থ বলল,মেরে সোজা কর।ছোটবেলায় তো তোকে খুব ভয় পেতো।

-হুম।আর তোর ন্যাওটা ছিলো।সারাক্ষণ পিছন লেগে থাকত।

-এবার আসলে ওকে নিয়ে আসিস!আচ্ছা শরীফ ভাইয়া আব্বার কাছে ফোন করেছিল,কি ঝামেলা বলল।

-কি ঝামেলা?

-আম্মা তো বলল অনুকে সাবেক চেয়ারম্যানের ছেলে নাকি ডিস্টার্ব করছে।

-মেয়েদের এতো পড়িয়ে লাভ কি?শরীফ ভাইয়াকে বল বিয়ে দিয়ে দিতে।

-সেটাও বলল।কেবল অনার্স ফাস্ট ইয়ার।শেষ হতে তো সময় লাগবে।বিয়ের পর স্বামী চাইলে পড়বে।

-হুম।তোর ডিগ্রি ফাইনাল কবে?

-মে মাসের শেষের দিকে বোধয়।

স্বার্থ একটা হাঁচিয়ে দিয়ে বলল,একসাথে শুরু করে তোর গ্রামের কলেজে ডিগ্রি শেষ হতে চলল,আর আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সই শেষ হলো না।

-ধুর আমি তো গ্রামের ক্ষ্যাত।আমার ভাই ঢাবির স্টুডেন্ট।বড় ডিগ্রি অর্জন করবে।সময় তো লাগবে।

-চুপ পাগল।

স্বার্থ নিজে তো জানে তীর্থের ত্যাগ।তার বড় ভাইয়া পার্থ বিদেশ থাকার কারনে তাদের পরিবারে দৌড়াদৌড়ির মতো দু’টি মাত্র ভাই ছিলো।ইন্টারের পর তার আব্বার হার্টের অসুখের জন্য একজনকে তো বাড়ি থাকতেই হতো।তীর্থ বলল,তুই যা ঢাকায় কোচিং কর।আমি গ্রামের কলেজে একটা কিছু করে নিবো।স্বার্থ সেদিন বিনাবাক্যে নিজের ভবিষ্যৎ গোছাতে চলে এসেছিলো শহরে,একা তীর্থের উপর দাদীজান,দাদাজান,অসুস্থ আব্বা,আম্মা আর সন্তানপ্রসূত বড় ভাবীকে ফেলে।মাঝে মাঝে তার মনে হয়,তার স্বার্থ নামটা তার জন্য পরিপূর্ণ।

স্বার্থের কাশি শুনে তীর্থ বলল,কি’রে ঠান্ডা লাগিয়েছিস?

-আরে না।ভার্সিটি থেকে ফিরতে একটু ভিজে গেছি।এখন রিকশায় আছি।

-রিকশায় কেন?আরো ভিজে যাবি তো।ভাইয়া শুনলে বকবে।একটা ক্যাব নিতি!টাকার কোন সমস্যা হলে বলবি তো নাকি?

-আরে পাগল টাকার সমস্যা হবে কেন?মাসে ত্রিশ হাজার টাকা আমার লাগে?তাছাড়া ক্রিয়েটিভ সংস্থা থেকে মেধাভিত্তিক যে উপবৃত্তির টাকাটা পাই,তাও তো থেকে যায়।এমনি ইচ্ছা করলো উঠতে,তাই আর কি!

স্বার্থ যে ঢাকায় এসেই টিউশনি করানো শুরু করেছিলো।এটা আজও বাড়িতে বলেনি।তীর্থকে অবশ্য কোন কথা সে গোপন করে না।কিন্তু এই কথাটা ভয়ে বলে নি।যদিও তাদের জমিদারি নেই,তবুও তাদের প্রোপিতামহের জমিদারি সম্পত্তি তার দাদা খুব যত্নে সামলেছে।এখন তার বাবা সামলাচ্ছে।তবে সম্পত্তির রুপ বদলেছে।দুইশত জমির কিছু কিছু বদলে গঞ্জে কয়েকটা চালের আড়ত,দুইটা ভাটা,একটা এতিমখানা,একটা মাদ্রাসা,একটা বৃদ্ধাশ্রম উঠেছে।এতকিছু থাকার পরেও পার্থ যে কেন বিদেশ বিদেশ করে বাইরে চলে গেল স্বার্থ,তীর্থ আজও বুঝলো না।

-তুই এখনি নেমে যা।নেমে কোথাও দাঁড়িয়ে ক্যাব ঠিক করে বাসায় যা।আম্মা,দাদিজান শুনলে আমাকে আস্ত রাখবে না।

-আচ্ছা হয়েছে,নামছি।আম্মাকে বলিস না।উফ,একটা দু’টো কাশি দিয়ে ঝামেলায় পড়লাম।

-সেটাই।নাম আগে।

-তুই কোথাও যাচ্ছিস?নাকি বাড়িতে?

-গঞ্জে আমাদের চালের আড়তে যাচ্ছি।আব্বা ডেকে পাঠালো।আর ভাবী মিশুর জন্য কিছু খাবার আনতে দিলো।

-মিশু আমার কথা কিছু বলে?

তীর্থ হেসে বলল,আমাকেই বড় কাকু বলে ডাকে।

-ফাজিল।সবখানে আমার জায়গা দখল করছে।

-স্বার্থ!আমি আড়তে চলে আসছি।আব্বা যদি বোঝে তোর সাথে কথা বলছি,তো কথা বলতে চাইবে।তুই যা কাশছিস।আব্বা শুনলে তোকে সামনে না পেয়ে আমাকে বকবে।

-আচ্ছা!আমি রাখছি।

-যা বলছি।তাই কর প্লিজ,লক্ষ্মী ভাই আমার।

“আচ্ছা” বলে স্বার্থ ফোন কেটে দিলো।

ততক্ষণে রিকশা বর্ণের কোচিংয়ের সামনে চলে এসেছে।একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে স্বার্থ রিকশা থেকে নামলো।ভাড়া মিটিয়ে সে বর্ণদের কোচিংয়ের সামনে একটা চায়ের দোকানে দাঁড়াল।অনেকদিন পর সময় করে তার ছোট ভাইয়ের সাথে কথা হলো।বেশ ভালো লাগছিল তার।দোকানিকে বলল,কফি হবে?

দোকানি অবাক চোখে তাকাল।তারপর বলল,কফি নেই।চা হবে।চলবে?

স্বার্থ খানিকক্ষণ ভেবে বলল,চা ই দিন।চিনি ছাড়া।

তার ভাবতে অদ্ভুত লাগল,ঢাকার মতো একটা শহরে কফি চেয়ে পাওয়া যাবে না।

উপর থেকে বর্ণ দেখল চায়ের দোকানে স্বার্থ আধভেজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।সে প্রচুর বিরক্ত হলো।তাদের ক্লাস হচ্ছে না।তবুও সে সিদ্ধান্ত নিলো নিচে নামবে না।থাকুক শালা কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।তার কি?সে সৃজনের থেকে মোবাইল নিয়ে গেম খেলতে বসে গেল।

চায়ের পর্ব শেষ করে স্বার্থ আর দাঁড়ালো না।এবার সত্যি তার ঠান্ডা লেগে যাচ্ছে।বর্ণের কখন ছুটি হবে তার ঠিক নেই।বৃষ্টির গতি বেড়ে গেছে।আশেপাশে ক্যাব দেখল না।সে একটা রিকশা ডেকে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলো।

রিকশায় সে বসে ভাবল,মৌনকে ফোন করা দরকার।তার মামা পাঠাও সার্ভিসের গাড়ি চালান।মৌন বললে হয়তো তিনি আসবেন।বর্ণের ছুটি হলে বাসায় দিয়ে আসবেন।বৃষ্টির গতি সুবিধার ঠেকছে না।মনে হয় না থামবে।সারা দিন তো ঝরছে,রাতেও বোধয় বিরাম দেবে না।ঢাকায় এসে বর্ণ জ্বরসর্দিতে ভুগলে শরীফ ভাইয়া কি জানি কি মনে করবেন!ভাববে সে তার ভাইকে আগলে রাখতে পারে নি।

সন্ধ্যায় পড়তে বসে স্বার্থের হাঁচির শব্দে বর্ণ বিব্রত বোধ করলো।মনে মনে বলল,আমার জন্য বন্ধুর মামার গাড়ি পাঠায় ঘন্টাচুক্তি,আর নিজে রিকশায় ভিজে ভিজে এসে হাঁপানির রোগীর মতো করছে,মেন্টাল একটা।

শেষের ‘মেন্টাল একটা’ কথাটি স্বার্থ অস্পষ্ট শুনতে পেয়েছিল।মাথা তুলে বলল,কিছু বললে?

বর্ণ প্রকাশ্যে বলল,খালাকে বলেন আদা দিয়ে এক কাপ চা দিতে,খেলে ভালো লাগবে।

স্বার্থ একটা হাঁচি দিয়ে বলল,খালা সন্ধ্যার পর থাকে না।

-আমি করে আনবো?

-নাহ।গ্যাসে হাতটাত পুড়িয়ে ফেলবে।আমি দেখছি কি করা যায়!

বর্ণ বলল,গরম পানি করে ভাপ নিতে পারেন।

স্বার্থ উঠতে উঠতে বলল,দেখি!তুমি পড়ো।আমি আসছি।

বর্ণ টেবিল থেকে উঠে সোফায় স্বার্থের মোবাইল খুঁজলো।লাভ বিশেষ কিছু হলো না।বর্ণ সশব্দে বলল,ধ্যাত শালা!কিচেনে গেছে তবুও মোবাইল সাথে।ওয়াশরুমেও নিয়ে যায় না’কি?

পুনরায় টেবিলে গিয়ে বসে পড়ল সে।মোবাইলটা পেলে বাড়িতে কল করতে পারতো।ভাবীর জন্য তার মন খারাপ লাগছে।ছোটবেলা থেকে সে তাকে আর অনুকে মায়ের আদর দিয়ে মানুষ করেছে।সন্তান হলে শেষে তাদের আদর কমে যাবে ভেবে ভাবী নিজের নারীত্বকে বিসর্জন দিয়েছে।আন্না তাতে স্বাদ দিয়েছিল না,সে বলেছিল,তুমি সন্তান নাও।আমার ভাইবোনকে আমি মানুষ করবো।তোমার পরিবার যেন আমাকে দোষ দিতে না পারে।

ভাবী বলেছিল,ওরা তোমার ভাইবোন।কিন্তু আমার সন্তান।আমার পরিবার কিছু বলতে এলে আমি দরকার পড়লে পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখবো না।

অতটুকু বয়সেই বর্ণ কি বুঝে ভাবীকে জড়িয়ে ধরে শেষবার কেঁদেছিলো।সেই মানুষটিকে ফেলে সে আজ কত দূরে।

বেশ কিছুক্ষণ পর স্বার্থ দু’কাপ আদা চা নিয়ে রুমে এলো।বর্ণের টেবিলের উপর রেখে বলল,তুমিও খাও।ভালো লাগবে।

-আচ্ছা।

বর্ণ দ্বিতীয় কোন কথা বলল না।সেদিন দুপুরের কথা তার এখনো মনে আছে।স্বার্থ সোফায় গিয়ে বসল।বলল,কিচেনে চা করবার সময় শরীফ ভাইয়া কল করেছিল।

বর্ণ ফিরে তাকাল।কিছু বলল না।

-আমি কল করে দিচ্ছি।নাও কথা বলো।

বর্ণ উঠে গিয়ে মোবাইল কানে ধরলো।রুমের বাইরে যাওয়ার জন্য স্বার্থের দিকে তাকাল।

স্বার্থ বলল,যাও।

বর্ণ বাইরে চলে এলো।

-হ্যালো আন্না?

-কি’রে কেমন আছিস?

বর্ণ কেঁদে দিলো।বলল,একদম ভালো নেই।

-কেন?কি হয়েছে?স্বার্থ কিছু বলেছে?

বর্ণ কাঁদতে কাঁদতে বলল,নাহ।তোমাদের কথা খুব মনে পড়ছে।

-পাগল।তুই কি এখনো ছোট আছিস?

-হুহুহুহু..জানি না।আমাকে দেখতে আসবা কবে?

-খুব শীঘ্র আসবো।তোর জন্য আমাদেরও খারাপ লাগছে।

বর্ণ নাকমুখের পানি মুছে বলল,হুহুহু..তাড়াতাড়ি আসো।

শরীফের গলা কোমল হয়ে এলো।মোলায়েম কন্ঠে বলল,স্বার্থের সব কথা মেনে চলছিস তো।

-হুম।

শরীফের চোখে পানি এসে পড়ল।স্ত্রীকে বললেন,সুমি!চোখে কি যেন পড়েছে!নাও,তুমি কথা বলো।

-হ্যালো আন্না,হ্যালো।

-বর্ণ আমি।তোমার আন্নাকে কে যেন ডাকছে!

-ও ভাবী?এতো রাতে আন্নাকে কে ডাকছে?আমার সাথে কথা বলার থেকে বড় হয়ে গেল সেটা।

সুমি আর্দ্র কন্ঠে বলল,ধুর পাগল।শোন,তোর আন্নার ইউনিয়ন পরিষদের কি একটা কাজ পড়েছে ঢাকায়।বলেছে আমাকে অনুকেও নিয়ে যাবে সাথে করে।তোর সাথে দেখা হবে।

বর্ণ চিৎকার করে উঠল,ওয়াও রেয়্যালি?

-আস্তে বাবা।স্বার্থ কে বলিস।

-আচ্ছা বলব।অনু আপু কোথায়?

-ঘুমিয়ে গেছে।

-এতো তাড়াতাড়ি?

-তাড়াতাড়ি কই?রাত ১১টা বাজে।গ্রামে এটা অনেক রাত।আচ্ছা রাখছি,তোর আন্না ডাকছে।

-ওকে ভাবী।লাভ ইউ।

-লাভ ইউ টু।

চার।

রুমে অফুরন্ত খুশি নিয়ে ঢুকল বর্ণ।কতদিন সে কাছের মানুষগুলো দেখে না।একেকটা দিন যেন তার একেক বছর।স্বার্থের কাছে মোবাইল রাখতে গেলে বলল,ওটা টেবিলে রাখো।চিৎকার করলে কেন?

বর্ণ মনে মনে বলল,হাতের থেকে মোবাইলটা নিতেও আপত্তি।মেন্টাল একটা।মানুষ এতো গোমড়ামুখো হয়।

মোবাইল রেখে প্রকাশ্যে বলল,আন্নারা ঢাকায় আসছে খুব তাড়াতাড়ি।

স্বার্থ না তাকিয়ে বলল,আর কাঁদলে কেন?

বর্ণ লজ্জা পেল।বলল,কই কাঁদলাম।

-আমার কাছে খুব কষ্টে আছো?

-তাই বলেছি নাকি?

-সব কথা বলতে হয়?যেভাবে কাঁদলে,ভাইয়া-ভাবী সেটাই ভাববে।

বর্ণ আওড়ালো,হ্যা!সবাই যেন ওনার মতো মেন্টাল।

মুখে বলল,নাহ।আন্নাও কাঁদছিল।ভুল বুঝবে না।

-অনুকে কে যেন ডিস্টার্ব করছে,জানো?

-কই আন্না,ভাবী তো বলল না।

স্বার্থ কঠিন করে বলল,আমার ধারনা,কেউ কিছু না বললেও তুমি জানো অনুকে কে বিরক্ত করে।

বর্ণ বলল,হৃদয় ভাইয়া।

-সাবেক চেয়ারম্যানের ছেলে?

-হ্যা।

বর্ণ দম নিয়ে বলল,কিন্তু আপু ওনাকে একদম পছন্দ করে না।

-কিন্তু তুমি তো পছন্দ করো।

বর্ণ অবাক হয়ে বলল,মানে?

স্বার্থ বলল,তোমার চা তো ঠান্ডা হয়ে গেল।দাও গরম করে এনে দেই।

-চা খাওয়ার মুড নেই।

-ওকে তাহলে গরম করে আমি বরং আরেক কাপ খাই।

বর্ণ রাগে ফুলছে।বলল,অর্ধেক কথা বলেন কেন স্বার্থ ভাইয়া?বললে পুরোটা বলুন।

স্বার্থ ঠান্ডা চায়ের কাপ হাতে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,পছন্দ না করলে চায়ের দোকানে,কলেজ রোডে,তাকে দুলাভাই দুলাভাই বলে ডাকতে কেন,তার দেওয়া খাবার খেতে কেন?শালাকে তো পটিয়ে ফেলছিল,ভাগ্যিস বোনটা রাজি হয় নি।

বর্ণ চুপ করে রইল।আসলে বলার কিছু ছিল না তার।সে ভাবতে লাগল স্বার্থ ভাইয়া কিভাবে এটা জানল।

স্বার্থ ফিরে এসে বলল,এতো ভেবে ছোট্ট মস্তিষ্কে চাপ বাড়াতে হবে না।সময় হলে সব জানতে পারবে।মন দিয়ে পড়াশুনাটা করো।

বর্ণ মুখে আওড়ালো,মন দিয়ে পড়াশুনাটা করো।

-কিছু বললে।

-কই নাতো।

-ভাইয়ারা কবে আসছে?

-বলে নি।তবে খুব তাড়াতাড়ি।

-বর্ণ!

-হুম।

-আমার হাঁচিটা কমেছে।আমি বরং আজ শুয়ে পড়ি।ঠান্ডা লাগছে কেমন যেন।

-আচ্ছা।

-তুমি আর কিছুটা সময় পড়ো।কিচেনে গ্লাসে দুধ রাখা আছে,খেয়ে তারপর শুয়ে পড়ো।

বর্ণ দুধের কথা শুনে অস্পষ্ট শব্দ করল।তারপরও বলল,ওকে ভাইয়া।

বর্ণ পড়া ছেড়ে ভাবতে বসলো।হৃদয় ভাইয়ার এসব ঘটনা স্বার্থ ভাইয়া কিভাবে জানলো।অনু আপু তো কখনো স্বার্থ কে এসব বলবে না।সে বুঝতে শেখার পর কখনো দেখে নি অনু আপু আর স্বার্থ ভাইয়া এক জায়গায় দাঁড়িয়ে এক মিনিট কথা বলেছে।ফোনে তো অসম্ভব।অাত্মীয় পরিচয়ে বর্ণরা মামা বাড়ি বেড়াতে গেলে নিতান্ত দায়ে পড়ে স্বার্থ অনুকে একবার বলে,কেমন আছো।ব্যস।তারপর তার আর সারাদিনে খোঁজ থাকে না।ঘরে পড়ে থাকে।বিকাল হলে সরাসরি ক্রিকেট মাঠে।কিংবা বড় হয়ে সে কখনো দেখেনি স্বার্থ তাদের শরীয়তপুরে বেড়াতে গেছে।তীর্থ অসংখ্য বার গেছে।সারা বাড়ি মাতিয়ে রেখেছে।তাকে চেনার সব চেয়ে সহজ কৌশল তার মুখে সব সময় লেগে থাকা এক টুকরো হাসি।

মাঝরাতে প্রবল প্রসবের চাপে স্বার্থের ঘুম ভেঙ্গে গেল।রাত তখন দু’টো।সে সোফা থেকে উঠে দেখল,রুমে লাইট জ্বলছে।বর্ণ পড়ার টেবিলে বইয়ের উপর ঘুমিয়ে পড়েছে।ওয়াশরুম থেকে ফিরে সে কিচেনে গেল।দুধের গ্লাস সেভাবে পড়ে আছে,গ্যাস জ্বালিয়ে দুধটা হালকা গরম করে রুমে ফিরে এলো।

বৃষ্টিতে ভেজায় ঠান্ডা লাগার জন্য তারও প্রচুর ঘুম পাচ্ছে।সে বর্ণকে ডাকল।বর্ণ ঘুম জড়ানো চোখে সাড়া দিল,হুম।

-বিছানায় গিয়ে শোও।লাইট অফ করবো।

বর্ণ আড়মোড়া ভাঙ্গল।স্বার্থ বলল,দুধটুকু খেয়ে নাও।

বর্ণ গ্লাসটা হাতে নিয়ে দ্রুত সেটা শেষ করে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।বেডসিট টেনে গায়ে দিয়ে পাশ ফিরে শুতেই ঘুমিয়ে গেল।

স্বার্থের চোখ থেকে ঘুমটা কেমন কেটে গেল।সে রুমের লাইট অফ করে কিচেনে এলো।রাতে ঘুম ভাঙ্গলে তার কফি খেতে ইচ্ছা করে।সে গ্যাসে পানি বসিয়ে ফ্রিজ খুলল।সন্ধ্যা রাতে সর্দিহাঁচির কারনে তার খাওয়া হয়নি।বর্ণকে কোনমতে জোর করে কটা খাইয়েছে।খাবার মতো আপাতত কেক ছাড়া তার চোখে কিছু পড়ল না।এক পিস কেক নিয়ে সে খেতে লাগল।তারপর কফি মগ নিয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো।

স্বার্থের ফ্ল্যাটটা ‘অাবর্ত’ ম্যানশনের তৃতীয় তলায়।এখন আকাশ ঝলমলে পরিষ্কার।আকাশ জুড়ে অসংখ্য নক্ষত্ররাজি খেলছে।বৃষ্টির ছিটেফোঁটা নেই কোথাও।সে কফি মগে চুমুক দিয়ে গেটের দিকে তাকালো।দারোয়ান চেয়ারে বসে টেবিলে মাথা রেখে নাকডেকে ঘুমাচ্ছে।ঠিক বর্ণের মতো।তবে বর্ণ নাকডাকে না।হোসেন ভাই ডাকে।হোসেন ভাইয়ের মেজো ছেলেটা পঙ্গু।মাঝেমধ্যে হোসেন ভাইয়ের দিনে ডিউটি পড়লে সে আসে।বাবার থেকে পাঁচদশ টাকা পেলেই সে খুশি হয়ে ফিরে যায়।স্বার্থের বুকের ভিতর হুহু করে উঠে।ভার্সিটিতে যাওয়ার পথে কোন কোন দিন স্বার্থের দেখা হয়ে যায়।স্বার্থ খুব আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞাসা করে,তোমার নাম কি যেন?

পঙ্গু ছেলেটা পা টেনে টেনে পথ চলার মতো টেনে টেনে বলে,রো..রো…হিম।

-কোন ক্লাসে পড়ো বলেছিলে?

রহিম পুনরায় টেনে টেনে বলল,ক্লা…স টু…উ।

স্বার্থ মানিব্যাগ থেকে পঞ্চাশ টাকা বের করে দেয়।রহিম নিতে চায় না।বাবার দিকে তাকায়।হোসেন ভাই হেসে উঠে।রহিম নেয়।

হোসেন ভাই বলে,আঙ্কেলকে সালাম দাও।

রহিম টেনে টেনে সালাম দিয়ে,আসা পথে একইভাবে ফিরে যায়।হোসেন ভাইয়ের চোখ ঝাপসা হয়ে যায়।সে বলে,বুঝলে স্বার্থ ভাই।ছেলেটা আমার অনেক ভালো।আল্লাহ কেন ওকে এমন করলো?

হোসেন ভাই শুদ্ধ বাংলা ভাষায় কথা বলে।ইন্টার পাশ করার পর অভাবে পড়ে দারোয়ানি চাকরি নেওয়া।স্বার্থের বিষয়টা ভালো লাগে।সে আশ্বাস দিয়ে বলে,হোসেন ভাই,দেখবেন একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।

হোসেন ভাই দীর্ঘশ্বাস ফেলে।স্বার্থ ছোট ঘোট পায়ে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বাইরে এসে দাঁড়ায়।তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে।

কফি মগে শেষ চুমুক দিয়ে স্বার্থ রুমে ফিরল।তার একটু ঘুমানো দরকার।

সেমিস্টার ফাইনালের আগে আজকের তত্ত্বীয় ক্লাসগুলো শেষ ক্লাস ছিলো।মৌন ক্লাসগুলোতে এলো না।মৌন কখনো এমন করে না।স্বার্থের দুশ্চিন্তা হলো।অসুখবিসুখ করে নি তো আবার।ক্লাস থেকে বেরিয়ে সে রুবেল কে জিজ্ঞাসা করল,মৌনকে দেখেছ?

স্বার্থ সচরাচর তেমন কারোর সাথে কথা বলে না।বললেও তুমি সম্মোধন করে বলা আর কি!একমাত্র মৌনকে সে তুই করে বলে।রুবেল সরু চোখে তাকিয়ে বলল,আইবিএ ভবনের সামনে দেখে এলাম ত্রিশার সাথে।যাও গেলে পাবে।

-থ্যাংকস।

রুবেল কয়েকজনের সাথে দাঁড়িয়ে ছিলো।স্বার্থ চলে আসতে আসতে শুনল,দেখলি শালার অহংকার।দেমাগে মাটিতে পা পড়ে না।

স্বার্থ দাঁড়িয়ে গেল।সে কম কথা বলে,কম মেশে,ঠিক আছে।তবে অহংকারী এটা সে মানতে পারল না।

ত্রিশার এক বান্ধবী দাঁড়িয়ে ছিলো।সে বলল,কি বলিস!ও অনেক ভালো।

রুবেল হেসে বলল,তাই তো তোর বান্ধবী পাত্তা পেল না।

হাসির রোল পড়ে গেল।স্নিন্ধা হেসে বলল,শোন রাইমা,দেখতে হ্যান্ডসাম আর মেধাবী হলে হয় না।বিহ্যাভ জানতে হয়।ও কি বদরাগী জানিস?

রাইমা বলল,একটু রাগী ঠিক আছে।তবে মনটা ভালো।

শ্যামল রুবেলের কাঁধে হাত ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো।সে ফোড়ন কেটে বলল,শুনেছি জমিদার বংশের ছেলে।বদমেজাজি তো একটু হবেই।

আবার হাসির রোল পড়ে গেল।স্বার্থ এখন প্রতিবাদ করতে গেলে গন্ডগোল হবে।সে আর না দাঁড়িয়ে দ্রুত বেরিয়ে এলো।

আইবিএ ভবনের সামনে মৌনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে স্বার্থ দূর থেকে ডাকল।মৌন সাড়া দিলো না।ত্রিশা চেঁচিয়ে বলল,ও এখন যেতে পারবে না।

-সেটা কি তুমি বলবে?

-এখন থেকে আমিই বলব।

-প্রেমটা কি তাহলে হয়েই গেলো?

-হ্যা,কোন সমস্যা?

স্বার্থ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি চেঁচিয়ে বলল,আমার কেন কোন সমস্যা হবে?বেস্ট অফ লাক।

-থ্যাংক ইউ।কি পারলাম তো?

স্বার্থ বাঁ হাত উঠিয়ে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বুঝিয়ে দিল,তুমি পেরেছো।

মৌন উল্টো দিকে ফিরেছিল।একেবারের জন্যও স্বার্থের দিকে ফিরে তাকাল না।স্বার্থের চোখ নোনাজলে ভরে গেল।সে চোখ পরিষ্কার করে চলার পথ লক্ষ্য করলো।

কয়েকদিন পরের ঘটনা।দুপুরে খেয়ে স্বার্থ ঘুমিয়েছিল।সে সচরাচর ঘুমায় না।আজ একটু মাথা ধরার কারনে শুতেই ঘুমিয়ে পড়েছে।বর্ণ এখনো কোচিং থেকে ফেরে নি।একটু আগে সেটা নিয়ে ভাবছিল।শোরগোল,চেঁচামেচিতে তার ঘুমটা ভেঙ্গে গেল।ব্যালকনিতে যেয়ে দেখলো রাখালের মা আর রশিদ চাচা ফের ঝগড়া বাঁধিয়েছে।হোসেন ভাইয়ের সাথে রাখালের মায়ের খুব ভাব।সে দিনে গেটে থাকলে কোন ঝামেলা বাঁধে না।শিফট চেঞ্জ হলে রশিদ চাচা এলেই একটা না একটা ঝামেলা পাকাবেই।স্বার্থ উপর থেকে বলল,খালা!তুমি আবার গন্ডগোল করছো?

রাখালের মা হাঁপিয়ে বলল,উ বুইড়া ভামটো ফের ক্যানালে প্রসবটো কুরতে বইনছে।মু কি দেখেইনছি?উর গাটোতে ময়লা পড়োইনছে।

-খালা,আমি তোমাকে কতদিন বলেছি,উপর থেকে ময়লা নর্দমায় ছুড়ে মারবে না!

-ক্যানে ই কথাটো বুইলছিস?ঐ বুইড়াটো ক্যানালটোতে প্রসব কোরবেক লাই।

রশিদ চাচা চেঁচিয়ে বলল,মাতারি তাতে তোর কি?মুই তোর ঘারের উপর করছি?

-দেখ ক্যানে বাবু,উ কথাটো কি কোইনছে ?

স্বার্থ বিরক্তি নিয়ে বলল,খালা,তুমি উপরে আসো।আর কখনো উপর থেকে ময়লা ছুড়বে না।আর একটু কিছু হলেই নিচে চলে যাও কেন ঝগড়া করতে?

-আইনছি ক্যানে।

-আর রশিদ চাচা,আপনি বা যেখানেসেখানে প্রসব করতে বসেন কেন?এরপর থেকে ওয়াশরুমে যাবেন।

রশিদ চাচা মাথা নেড়ে বলল,জে আইচ্ছা আব্বা।

স্বার্থ রুমে ফিরবে বলে পা বাড়িয়ে আবার দাড়িয়ে বলল,খালা!বর্ণ এখনো ফেরে নি?

-লাই বাবু।বর্ণ বাবুটো রোজ তাড়াতাড়ি ফিরেনছে।আজি দেরিটো হইনছে ক্যানে?

-অনেক তো বেজে গেল।

একটা রিকশা এসে গেটের কাছে থামলো।রাখালের মা বলল,বর্ণ বাবুটো আইনছে।

স্বার্থ ব্যালকনি থেকে যেতে যেতে বলল,ওকে উপরে নিয়ে আসো।আর আমার রুমে যেতে বলো।

-দিবো ক্যানে।

বর্ণ ভয়ে ভয়ে স্বার্থের রুমের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালো।স্বার্থ বলল,ভিতরে এসো।

বর্ণ ভিতরে গিয়ে বলল,স্বার্থ ভাইয়া!আজ একটু সৃজনের সাথে শপিংয়ে গেছিলাম।তাই একটু দেরি হলো।রোজ তো তাড়াতাড়ি ফিরি।খালাকে জিজ্ঞাসা করুন।

স্বার্থ ঠান্ডা মাথায় বলল,আমি কি এবারও এটা জানতে চেয়েছি যে দেরি হলো কেন?

-না মানে…..।

-রিকশায় কে নামিয়ে দিয়ে গেল?

-ঐ তো আমার বন্ধু সৃজন।

-এক রিকশায় তিনজন এলে কেন?পাশের মেয়েটা কে?

-সৃজনের প্রেমিকা নীলা।

-তুমি সৃজনের কোলে বসে এসেছো কেন?

-ওরাও এদিকে আসছিলো,বলল,তাই আসলাম।

-এরপর থেকে এভাবে কখনো এক রিকশায় আসবে না।

-আচ্ছা,আসবো না।

স্বার্থ গলা নরম করে বলল,যাও,ব্যাগ রেখে শাওয়ার নিয়ে ফ্রেশ হও।

বর্ণ মাথা নিচু করে বলল,সকালে তো গোসল করে গেছি।খালাকে জিজ্ঞাসা করুন।

স্বার্থ হাতে ঘড়ি পরতে পরতে বলল,আমি যখন শাওয়ার নিতে বলেছি,তুমি নিবে।আমি টিউশনিতে গেলাম।এসে যেন কোন উল্টাপাল্টা না দেখি।

-আচ্ছা ভাইয়া।

স্বার্থ ওয়াশরুমে ঢুকল।

বর্ণ গলা মোটা করে বলল,আমি টিউশনিতে গেলাম।এসে যেন কোন উল্টাপাল্টা না দেখি।

স্বার্থ বেরিয়ে বলল,দাঁড়িয়ে আছো কেন?যাও।

‘ওকে’ বলে বর্ণ বেরিয়ে গেল।দরজার কাছে গিয়ে বিড়বিড় করে বলল,মেন্টাল একটা।

(তৃতীয় পর্ব)

<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<< 

বিঃদ্রঃ তোমার একটিমাত্র জীবন যদি প্রেমহীন থেকে যায়,শর্তহীন দলিলে যদি কোন বিবাদীর নাম লেখা না থাকে,অনাবিষ্কৃত ভালোলাগা যদি তোমার ঠোঁটের আঙ্গিনায় বিরহ না জাগায়,একটিমাত্র জীবনে তুমি যদি কলঙ্ক এর সুখই না পেলে-তবে তুমি…!তবে তুমি আমার গল্প পড়ো না।

<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<< 

পাঁচ।

কলিংবেলের শব্দে স্বার্থের ঘুম ভেঙ্গে গেল।সে সোফায় শোয়া থেকে উঠে বসল।আড়মোড়া ভেঙ্গে ডাকল,খালা দেখো তো কে এলো?

পরক্ষণে মনে পড়ল,এতো সকালে খালা কোথা থেকে আসবে?বর্ণ অঘোরে ঘুমাচ্ছে।গতকাল বিকালে গোসল করে সারারাত কেশেছে।ভোররাতে ঘুমিয়েছে।স্বার্থেরও শেষ রাতে ঘুম ধরেছে।এতো সকালে কে হতে পারে?দুধওয়ালা নয়তো?কিন্তু দুধওয়ালা তো সেই নয়টায় আসে।খালা আসার পর।খালা এসেই রোজ সকালে দুধ রাখে।সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে সে দরজা খুলল।

শরীফ হেসে বলল,কি’রে তোদের এখনো ঘুম ভাঙ্গেনি?আমরা শরীয়তপুর থেকে চলে এলাম।

স্বার্থ শরীফকে জড়িয়ে ধরল,শরীফ ভাইয়া!আপনারা?

সুমীকে পা ছুঁয়ে সালাম করে বলল,ভাবী ভিতরে আসুন।

অনুর দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে বলল,ভালো আছো অনু?

অনু মাথা নেড়ে মুচকি হাসল।বলল,বর্ণ উঠে নি?

-না।দাঁড়াও আমি ডেকে দিচ্ছি!

অনু বাধা দিয়ে বলল,থাক ভাইয়া,আমি যাই?

স্বার্থ সূক্ষ্ম হেসে বলল,যাবে?না মানে একটু পরে যাও।ভাইয়া,ভাবী আপনারা ড্রয়িংরুমে এসে বসুন না!

স্বার্থ দ্রুত রুমে ঢুকে সোফা থেকে বালিশ,বেডসিট বর্ণের ডানপাশে রেখে দিলো।দেখে যেন মনে হয় স্বার্থ কেবল উঠে গেছে বর্ণের পাশ থেকে।অনু রুমে ঢুকে চারপাশ দেখল।স্বার্থ বলল,তুমি ডেকে তোলো।আমি ভাইয়া,ভাবীর কাছে আছি।

স্বার্থ বেরিয়ে গেলে অনু বর্ণের পাশে গিয়ে বসল।ঘুমন্ত বর্ণের চুলে টান দিয়ে বলল,কি’রে এতো ঘুম কিসের?ঢাকায় এসে অলস হয়ে গেছিস।

বর্ণ ঘুমের ঘোরে পাশ ফিরে শুয়ে বলল,হু,স্বার্থ ভাইয়া!আরেকটু ঘুমাই।

অনু তার পিঠে সুড়সুড়ি দিলো।চট করে বর্ণের মনে এল,স্বার্থ ভাইয়া তো কখনো তাকে স্পর্শ করে ঘুম থেকে জাগাবে না।সে হুড়মুড়িয়ে বিছানায় উঠে বসল।

অনু ভ্রু নাড়িয়ে বলল,কি’রে ঢাকা এসে ভুলে গেছিস বোনকে?

বর্ণ মিষ্টি হেসে জড়িয়ে ধরল,আপু!আন্না আসেনি?

-হুম।আন্না এসেছে,ভাবী এসেছে।

বর্ণ অনুর হাত ধরে দৌড়ে ড্রয়িংরুমে চলে এলো।শরীফ বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো।বর্ণ দৌড়ে তাকে জড়িয়ে ধরলো।অনেকক্ষণ পর শরীফ বলল,নে হয়েছে।ছাড় এবার।তোর ভাবী কিন্তু দেখছে।

বর্ণ সুমীর পা ছুঁয়ে সালাম করে বলল,ভাবী কেমন আছো?

সুমী বর্ণের দু’গালে হাত দিয়ে বলল,এই মিষ্টি ভাইটা ছাড়া কি আমরা ভালো থাকি?

অনু এগিয়ে এসে শরীফের হাত ধরল,আন্না বসো তো।নিজে বসতে বসতে বলল,দেখছ আন্না?ভাবী কেমন করে বলল,এই মিষ্টি ভাইটা ছাড়া কি আমরা ভালো থাকি?মিষ্টি বোনটা দোষ করলো কি শুনি?

সুমী হেসে বলল,মিষ্টি?তুই তো আমার ঝগড়াটে ননদিনী।

-আন্না!ভাবীর কথা শুনলে?

শরীফ এক গাল বলল,তোরা তিনটা এক জায়গা হলে ঝগড়া করিস।তিনটাই ঝগড়াটে।

স্বার্থের দিকে তাকিয়ে বলল,দশটায় একটু প্রেসক্লাবে যেতে হবে।তুই আমার গোসলের ব্যবস্থা কর।

স্বার্থ এতক্ষণ দূরে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে এদের দেখছিল।পরিবারের প্রত্যেকটা মানুষের জন্য প্রত্যেকটা মানুষের কত মায়া।অথচ তার কেবল পরিবার,আপনজনদের থেকে পালাতে ইচ্ছা করে।গত সাড়ে তিন-চার বছরে সে বাড়িতে হাতে গোনা আটদশবার গেছে।তাও নিতান্ত দায়ে পড়ে।বাধ্য হয়ে।আম্মার ঘ্যানঘ্যানানিতে।উৎসব-পার্বণে।

স্বার্থ নড়েচড়ে দাঁড়িয়ে বলল,শরীফ ভাইয়া,আসুন।

বর্ণ কেশে উঠল।শরীফ উঠে দাঁড়িয়ে ছিল।বলল,কি’রে কাশছিস কেন?

বর্ণ একবার স্বার্থের দিকে তাকিয়ে বলল,আসলে গতকাল বিকালে গো…..।

স্বার্থ থামিয়ে দিয়ে বলল,কি বলি বলুন তো ভাইয়া।একটা কথাও শোনে না।গতকাল কত করে বললাম,কোচিং থেকে ফিরেছো বিকাল হয়ে গেছে।আজ আর গোসল করতে হবে না।তবুও করল।

বর্ণ বিড়বিড় করে বলল,বি স্মার্ট।

শরীফ বলল,কি যে করিস না তুই!আচ্ছা গোসল সেরে ওষুধ এনে দিচ্ছি।

স্বার্থ বাধা দিয়ে বলল,লাগবে না ভাইয়া।ওর রুমেই আছে।রাতে কতবার খেতে বললাম,খেলোই না।

বর্ণ মনে মনে বলল,ভাইয়াকে ইম্প্রেস করার চেষ্টা।ভীতু কোথাকার।

স্বার্থ শরীফকে বাথরুমে ঢুকিয়ে দিয়ে এসে বলল,ভাবী আমি একটু নিচে যাই।আসলে খালা কখন আসবে!দেরি হবে না,কাছেই বাসা।আপনারা বসুন।

সুমি বলল,বেশ,যাও ভাই।আমি,অনু বরং ফ্রেশ হই।

বর্ণ ভাবল,রাখালের মা এখনি চলে আসবে।সে আটটার আগে চলে আসে।তার মানে স্বার্থ ভাইয়া অন্য কোন কারনে নিচে যাচ্ছে।আন্নাকে তো দেখছি বেশ ভয় পায়।দারুন তো,সুযোগটা পরবর্তীতে কাজে লাগানো যাবে।

হোসেন ভাই সারারাত ডিউটি শেষে বাসায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে।রশিদ চাচা এখনো এসে পারেনি।স্বার্থ কে হন্তদন্ত হয়ে নামতে দেখে বলল,স্বার্থ ভাই!বাসায় মেহমান এলো বুঝি?

-হ্যা।আমার মামাতো ভাই,ভাবী,বোন।হোসেন ভাই ফার্মেসি খোলা পাওয়া যাবে?

-এতো সকালে তো মতিন চাচা দোকান খোলে না।দশটায় খুলবে।কেন কার কি হলো?

-মামাতো ভাইটা খুব কাশছে।দম নিতে পারছে না।

-এক কাজ করো।চাচার বাসা দোকানের সাথেই,সকালে নামাজ পড়তে উঠে আর ঘুমান না।কোরআন পড়েন।

-জানি বলেই বের হলাম।আচ্ছা হোসেন ভাই,দেখি পাওয়া যায় কি’না।

অগত্যা ম্যানশনের নিচ রোডে ‘রাহমান ফার্মেসি’।রাহমান,মতিন চাচার একমাত্র ছেলের নাম।অনেক স্বপ্ন নিয়ে ছেলেকে ডাক্তারি পড়াতে আমেরিকা পাঠিয়েছিল।ডাক্তারি পড়া তো শেষ হলো তবে সে ফেরে নি।বিদেশি ম্যাম বিয়ে করে সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেছে।মা-বাবার খোঁজ নেওয়ার সময় তার নেই।বৃদ্ধ বাবা মায়ের তা নিয়ে কোন অভিযোগ নেই।নেই কোন অভিমান।চাচী প্রতি শুক্রবার চাচা নামাজে যাওয়ার সময় ছেলের জন্য দোয়া চেয়ে ইমামকে সেলামি দেন।চাচা সারাক্ষণ চুপচাপ থাকেন।উনাদের ‘শেফালি’ নামের কাজের মেয়েটা তিনবেলা ছেলের মরণ কামনা করেন।বৃদ্ধা বাধা দিলে ঝগড়া বেধে যায়।শেফালির সে আওয়াজ পুরো অগত্যা ম্যানশনে প্রতিফলিত হয়।

ওষুধ নিয়ে ফিরে এসে স্বার্থ দেখল রাখালের মা চলে এসেছে।কিচেন থেকে খটখট শব্দ আসছে।বর্ণ একা ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে ছিলো।স্বার্থ কে দেখে ভ্রু নাড়িয়ে বলল,কী?খুব না?

স্বার্থ হাত উঠিয়ে মাইর দেখিয়ে বলল,ওষুধগুলো নাও।কিচেনে যেয়ে খেয়ে নাও।

-তা হচ্ছে না।আন্নাকে এতদিনের সব বলে দিবে।

-বলো!এরপর কিন্তু আমার কাছেই থাকতে হবে।তখন?

বর্ণ ওষুধের প্যাকেটটা একপ্রকার ছিনিয়ে নেওয়ার মতো করে কিচেনে চলে গেল।স্বার্থ পিছু পিছু গেল।

দরজায় দাঁড়িয়ে মুখ বাড়িয়ে বলল,খালা,আমি তোমাকে ডাকতে গেলাম।পেলাম না।তুমি দেখি চলে আসছো।

রাখালের মা আটা মাখছিলো।বলল,কিটো কইনছিস?তুকে তো মতিন ভাইয়ের দোকানটোতে দেখেইনছি।

স্বার্থ বলল,তাই তো।তুমি চলে আসছো বলে আর যাই নি।

বর্ণ শব্দ করে হেসে উঠল।বলল,খালা,বাঘ-সিংহ যে মানুষকে এতো ভয় পায়,আজকে জানলাম।

-কি?আমি বাঘ,সিংহ।

রাখালের মা বলল,হইনছে বাপু।মুর বহুত কামটো আছে।তুগো ঝগড়াটো শোনার টাইমটো লাই।ড্রয়িংরুমটোতে বহুত জায়গা পড়েটো আছে উটোতে গিয়া কর ক্যানে।

স্বার্থ বলল,বর্ণ,যাও ফ্রেশ হয়ে নাও।

বর্ণ আড়চোখে তাকিয়ে মুচকি হেসে বেরিয়ে গেল।

রাতে ডাইনিংয়ে খেতে বসে শরীফ বলল,স্বার্থ,ঢাকার কাজ তো শেষ হলো।কাল একবার নেত্রকোনা যেতে হবে।

স্বার্থের নার্ভগুচ্ছ কেঁপে উঠল।কে জানে কি হয়েছে।অন্যায় টন্যায় কিছু হয়ে গেল কি’না।বর্ণ কিছু বলেছে ভাইয়াকে।সে খাওয়া রেখে বলল,আমাদের বাড়ি?কেন ভাইয়া।

-হুম।অনু কে মামার কাছে রেখে আসি।

সুমি,অনু মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।সুমি বলল,কই আমাকে তো কিছু বললে না।বললে তো,ঢাকার কাজে যখন যাচ্ছি তো তোমাদের নিয়ে যায় বর্ণকে দেখে এসো।

শরীফ সে কথার জনাব না দিয়ে বলল,আমার লোক খবর আনছে বাচ্চু চেয়ারম্যানের ছেলে এসিড নিয়ে ঘুরছে।অনু কে তো কোথাও বের হতে দেই নি এ ক’দিন।

অনু আঁতকে উঠলো।বর্ণ অনুর গায়ে হাত দিয়ে বলল,আপু!

বর্ণের ধারনা ছিলো হৃদয় ভাই এতো টা খারাপ না।খারাপ হলে গত দু’বছর আপুর পিছু না ঘুরে কোন একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেলত।সে কিছু বলার আগে শরীফ বলল,আমি আর রিস্ক নিতে চাই না।ওকে মামার কাছে রেখে আমি চেয়ারম্যানের ছেলেকে দেখছি।

স্বার্থ এতক্ষণ চুপ করে ছিলো।বলল,তা হলে তাই করুন।

-তুই আর বর্ণও চল।একদিনেরই তো ব্যাপার।

-না ভাইয়া।আমার সামনে সেমিস্টার ফাইনাল।এক্সাম ডেট দিয়ে দিছে।আর বর্ণেরও প্রচুর চাপ।এখন ক্লাস গ্যাপ দেওয়া যাবে না।

বর্ণ স্বার্থের উল্টো দিকে বসা ছিলো।টেবিলের নিচ দিয়ে স্বার্থের পায়ে ঘা দিলো।স্বার্থের খাবার নাকমুখে উঠে বিষম খেলো।

সুমি পানির গ্লাস এগিয়ে দিয়ে তার পিঠে হাত টানতে টানতে বলল,কি যে করো।আস্তে খাও।এতো তাড়া কিসের?

বর্ণ মুচকি হেসে বলল,ভাবী ওনার পায়ের বুড়ো আঙ্গুলে পানি ঢালুন।

স্বার্থ আগুন দৃষ্টিতে বর্ণের দিকে তাকালো।বর্ণ উঠে এসে জগ ভরা পানি নিয়ে নিচু হলো।স্বার্থের পায়ে চিমটি কেটে সম্পূর্ণ জগের পানি তার পায়ে ঢেলে দিলো।

স্বার্থ ‘আউছ’ শব্দ করে উঠল।

-কি’রে কি হলো?

-কিছু না ভাইয়া।

বর্ণ ঘুরে এসে নিজের জায়গায় বসে বলল,আন্না।ওনার আর খাবার খেয়ে কাজ নেই।দেখো কেমন লাল হয়ে গেছে।ভাবী দুধটা এনে দাও খেলে শক্তি পাবে।

শরীফ বলল,হ্যা,সুমি।তাই করো।

স্বার্থ আপত্তি করে বলল,না না ভাবী।আমি দুধফুধ খাই না।

বর্ণ মুখ টিপে হেসে বলল,কেমন পুরুষ আপনি?দুধ খান না।

স্বার্থ প্রচন্ড লজ্জা পেল।অনু বর্ণের কান টেনে বলল,খুব ফাজিল হয়েছিস ঢাকায় এসে।

-আসলে ভাবী বর্ণ থাকছে বলে ওটা রাখা হয়।আমি খাই না সত্যি।

স্বার্থ দ্বিতীয়বার আর ‘দুধ’ উচ্চারণ করলো না।

শরীফ স্বার্থের পিঠ চাপড়ে বলল,আরে খা খা।জানিস,আমাদের নতুন বিয়ে হলে তোর ভাবী আমাকে প্রতিদিন এক কেজির উপরে দুধ খাওয়াতো।

এবার সুমি লজ্জা পেল।বলল,তুমি পাগল হয়ে গেছো।কোথায় কি বলছো।

-যা বাবা।দুধ আবার কি খারাপ জিনিস।

স্বার্থ,অনু মাথা নিচু করে ফেলল।বর্ণ খাচ্ছে আর মুচকি হাসছে।

মাঝরাতে বমির শব্দে সুমি জেগে গেল।শরীফকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলল,শুনছ?কে যেন বমি করছে।

শরীফ হঠাৎ উঠে বসে বলল,বর্ণ নয় তো?

-আরে ড্রয়িংরুম থেকে শব্দ আসছে।

-দেখি চলো তো।

তারা স্বার্থের বেডরুমে শুয়েছিল।অনু বর্ণের সাথে তার বেডরুমে।স্বার্থের আর কি করা,সে ড্রয়িংরুমে সোফায় শুয়ে পড়েছিল।সুমি দ্রুত ড্রয়িংরুমের লাইট অন করে দেখে স্বার্থ বমি করে ফ্লোর ভাসিয়ে ফেলেছে।সে গিয়ে স্বার্থ কে সোফায় ঠিক করে বসালো।স্বার্থ পেটে হাত দিয়ে বলল,ভাবী আমি ঠিক আছি।

-সে তো দেখতেই পাচ্ছি।

শরীফ বলল,কি’রে এমন কিভাবে হলো?

সুমি বলল,দুধ খেলে যে তোমার সমস্যা হয়,এবারও তো বলো নি!

ততক্ষণে বর্ণ আর অনু এসে দাঁড়িয়েছে।স্বার্থ ক্লান্ত চোখে তাকাল বর্ণের দিকে।বর্ণের মায়া হলো।সে রাখালের মায়ের কাছ থেকে শুয়েছে স্বার্থ দুধ খেয়ে সহ্য করতে পারে না।এবার তার এক বন্ধু মৌন না ফৌন কি যেন,দাওয়াত খেতে এসে জোর করে দুধ খাইয়ে দিয়েছিল।সে রাতে স্বার্থ আটবার বমি করেছিল।সকালে রাখালের মা এসে অনেকক্ষণ কলিংবেল বাজিয়ে সাড়াশব্দ না পেয়ে হোসেন ভাইকে ডেকে এনে দরজা ভেঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি করা লেগেছিল।এমনটা করা উচিত হয় নি তার।তখনো বর্ণের মস্তিষ্কে দুষ্টু বুদ্ধি খেলছিল।

সে এগিয়ে এসে বলল,ইশ!কি অবস্থা করেছে।ভাবী ওনাকে গোসল করিয়ে আনো।

-কি বলিস এসব।ঠান্ডা লেগে যাবে।

-দেখছো না।বমি করে সারা শরীরে কিভাবে মাখিয়েছেন।

-তাই তো।যা তো তুই ধরে নিয়ে বাথরুমে দিয়ে আয়।

বর্ণ ‘ওয়াক!ওয়াক’ করতে করতে বলল,ছিঃ,আমি পারবো না।আমার পেটের নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে আসছে।

স্বার্থ ক্লান্ত কন্ঠে বলল,ভাবী কাউকে লাগবে না।আমি একা যাচ্ছি।

-আরে না।তুমি আবার ঘুরেটুরে পড়ে যাবে।তোমার ভাইয়া যাচ্ছে।

শরীফ এগিয়ে এসে বলল,আয়!আয়!গোসল কর।তারপর দেখি ওষুধপাতি পাওয়া যায় কি’না।

স্বার্থ উঠতে উঠতে বলল,ওষুধ লাগবে না।সকালে ঠিক হয়ে যাবো।

শরীফের ঘাড় ধরে কিছুদূর যাওয়ার পর স্বার্থ বর্ণের দিকে ফিরে তাকালো।বর্ণ বিড়বিড় করে বলল,আমাকে দিনে দু’বার গোসল করানো।আমি আপনাকে রাতে করিয়ে ছাড়লাম।দেখুন মজা কেমন।

সুমি বলল,কি’রে বিড়বিড় করে কি বলিস।

‘কিছু না’ বলে বর্ণ অনুর হাত ধরে বলল,চল তো আপু আমরা শুয়ে পড়ি।

সুমি বলল,না,তোর রুমে স্বার্থকে নে।ওকে সোফায় শুতে হবে না।তোর ভাইয়া স্বার্থের রুমে ফ্লোরে শুবে।আমি আর অনু উপরে থাকবো।

বর্ণ জানে স্বার্থ ভাইয়া তার সাথে এক বিছানায় কিছুতে শুবে না।তাছাড়া সে নিজেই ভয় পাচ্ছে।মেন্টাল টা মারধর শুরু না করে মাঝরাতে।সে গোপন করে বলল,নো ওয়ে ভাবী।দেখা গেল ঘুমের ঘোরে আমার গায়ে বমি করে দিলো।ও রিস্ক আমি নিতে পারবো না।

-তাহলে তোর ভাইয়া শুবে ওর সাথে।তুই আমাদের রুমে আয়।আমি ফ্লোরে শুয়ে পড়বো।

-না।তুমি নিচে শুবে কেন?আমাকে ঐ রুমে ফ্লোরে বিছানা করে দাও।

-আচ্ছা দেখা যাবে।তোরা ঐ রুমে যা।স্বার্থের গোসল শেষ হলে আমি ওদের ঠিকঠাক করে দিয়ে আসি।

বর্ণ মনে মনে বলল,ধুর।প্রতিশোধ নিতে গিয়ে নিজের বিপদ মনে হয় নিজে ডেকে আনলাম।

ছয়।

শরীফেরা সকালে চলে গেছে।অনু কে তার মামাবাড়ি রেখে তারা শরীয়তপুর চলে যাবে।বর্ণ মন খারাপ নিয়ে কোচিংয়ে চলে গেছে।যাওয়ার সময় শরীফ বলল,বর্ণ,মন খারাপ করিস না।ভালো করে পড়াশুনা কর।কোথাও চান্স পেলে,ভর্তি কাজ সেরে মামাবাড়ি বেড়িয়ে আসিস।

ওষুধ খেয়েও স্বার্থের শরীরের দুর্বলতা কাটেনি।সে সোফায় এসে বসেছিল।বলল,শরীফ ভাইয়া,আমার সেমিস্টার ফাইনাল আর ওর একটা গতি হলে আমি ওকে সাথে করে বাড়ি নিয়ে যাবো।আম্মাও বলেছে।বাই দ্যা ওয়ে!স্যরি,আপনাদের খানিকটা এগিয়ে দিয়ে আসতে পারলাম না।

শরীফ স্বার্থের পিঠ চাপড়ে বলল,হয়েছে।তুই আগে খেয়েদেয়ে সুস্থ হ।

বর্ণ আড়চোখে তাকিয়ে মনে মনে বলল,বেশি বোঝে,মেন্টাল।ওনার সাথে আমি যেন যাওয়ার জন্য লাফালাফি করছি।মুখে বলল,আচ্ছা আন্না।

তার ইচ্ছা ছিলো দু’একদিনের জন্য হলেও সে যাবে।তীর্থ ভাইয়ার সাথে তার কতদিন দেখা হয় না।সেবার এসএসসি পরীক্ষার পর গিয়ে পনেরদিন ছিলো।স্বার্থ অবশ্য ঢাকাতে ছিলো বলে তার সুবিধা হয়েছিল।সারাদিন তীর্থের সাথে টো টো করে বেড়িয়েছে।কোন বাগানের আম গাছে আমের মুকুল এলো,কার বাগানের বইচি গাছে বইচি ফল পাকলো,পাশের বাড়ির সৌমেনদের কুকুর ‘ভুলু’র কয়টা বাচ্চা হবে তা নিয়ে তীর্থের সাথে তার সে’কি তর্ক।শেষে তার মামী তীর্থ কে দৌড়ানি দিয়ে বলল,বুড়োধাড়ী কোথাকার।এখনো বাচ্চাদের সাথে করে ঘুরে বেড়াস।সারাদিন রোদে টো টো করিস।এখন ওর সাথে হাতাহাতি করছিস।

তীর্থ দৌড়ে দূরে গিয়ে বলল,আম্মা,বুড়োধাড়ী বলছো কেন?ও কি ছোট?

-তোর থেকে চার বছরের ছোট।ও এটা করলে মানায়।তোকে মানায় না।বিএ পড়ছিস তুই!কবে বড় হবি?

-তুমি ওকে কিছু বলছো না কেন?

-ওকে কি বলবো?স্বার্থ কে দেখ,তোর ভাই।তোর থেকে হাজার গুন বুঝদার।

-আমার ওতো বুঝদার হয়ে লাভ নেই।

-তা হবে কেন?কাল থেকে বলব,কান ধরে সারাদিন চালের আড়তে বসিয়ে রাখতে।না হলে ভাটায় গিয়ে হিসাব দেখবি।আর বর্ণ সৌমেনের সাথে ঘুরবে।

তীর্থের মন খারাপ হয়ে গেল।তার আম্মা সব জানার পরও বারবার স্বার্থের সাথে তাকে তুলনা করে।ভরদুপুরে সে গামছা কাঁধে জোড়াদীঘির শানবাঁধানো ঘাটে গিয়ে বসল।বর্ণ পিছন পিছন এসে বলল,শোভাদিদের বাড়িতে যাবে না নাড়ু খেতে।

তীর্থ পিছন ঘুরে বসে বলল,তুই যা এখান থেকে।না হলে মাইর খাবি।

বর্ণের চোখ ছলছলিয়ে উঠল।সে মন খারাপ করে সৌমেনদের কুকুর ‘ভুুলু’র কাছে বসে রইল সারা বিকেল।সৌমেনের মা মুড়ি ভেজে আটপৌরে সংসার জোড়াতালি দিয়ে চালায়।বলল,নাতবাবু মুড়ি খাবানি?ও’রে সৌমেন খেজুর পাটালি দিয়ে নাতবাবু’রে কটা মুড়ি দে।

বর্ণ জবাব দিলো না।সৌমেন খেজুর গুড়ের পাটালি দিয়ে একপাত্র মুড়ি আনলো!দু’জনে বসে স্কুল জীবনের নানা গল্প করে বিকেল গড়িয়ে দিলো।

সন্ধ্যায় রসুলপুর বাজারের বাকখালিতে শোভাদের বাড়ি যাওয়ার সময় তীর্থ বর্ণের দিকে তাকিয়ে বলল,কষ্ট পাইছিস?

গোধুলি বেলা।বর্ণের রাগি মুখের উপর আকাশের রক্তিম আভা পড়ায় মুখটা লাল টুকটুকে লাগছে।সে তীর্থের দিকে না তাকিয়ে বলল,দেখো আমি আর নেত্রকোনা আসবো না।

-কেন?

-তুমি এমন করো কেন?আমার খারাপ লাগে না বুঝি!

-খুব বেশি কষ্ট পেয়েছিস?

-হুম।

‘আয় আদর করে দেয়’ বলে তীর্থ বর্ণের হাত ধরল।বর্ণ হাত ঝাড়ি মেরে ফেলে দিয়ে বলল,লাগবে না।

ধীরেন ডাক্তারের বাড়িটা আটচালা।তার দু’ছেলে রবি আর শশী দার্জিলিংয়ে দর্জিডাক্তারি করে।ফোড়া নিয়ে রোগী এলেও নাকি অপারেশন করে সেলাই করে,তাই এদেশের লোকে তাদের দর্জিডাক্তার বলে।তদুপরি তারা তো আর পাশ দেওয়া ডাক্তার নয়।বউ ছেলে নিয়ে দার্জিলিং থাকে।সেখানে শীতের প্রকোপ বেশি হলে,তাদের অতিথিপাখির মতো দেখা যায় এ বাড়ির উঠানে।শোভা উঠান ঝাড় দিচ্ছিল।তীর্থকে দেখে দৌড়ে ঘরে চলে গেল।গোধুলিবেলায় কেউ উঠান ঝাড়ু দেয়?তীর্থের জানা ছিলো না।সে এগিয়ে গিয়ে হাত উচু করে বলল,নমস্কার কাকা।

ধীরেন ডাক্তার মাটিতে পাটি ফেলে চশমা চোখে হোমিওপ্যাথিক বিদ্যার বই পড়ছিল।চোখ তুলে বললেন,কে এলি রে,গণেশা নাকি।

গণেশা এ বাড়ির কাজের ছেলে।বাবা মেয়ের হাত আরানি শোনে।তীর্থ পাটির পাশে জলচৌকিতে বসতে বসতে বলল,না কাকা।আমি রমজান চৌধুরীর ছেলে।তীর্থ।

-ওহ!জমিদার বাড়ির ছেলে।চশমা চোখেও আজকাল ভালো দেখি না।তারপর সন্ধ্যা হয়ে এলো।তা হ্যা রে তোর বাবা কেমন আছে?হার্টের সমস্যা সারছে।

ধীরেন ডাক্তার ছোট বড়,চেনা অচেনা সকলকে তুই করে সম্মোধন করে।তীর্থ ইশারায় বর্ণকে তার পাশে বসতে বলে বলল,জি কাকা।গতবছর ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসা করিয়ে আনলাম।

-ভালো করেছিস।তোর ভাই আরেকটা কি করে?

-ভাইয়া তো বিদেশে।আর মেজোটা ঢাকায় থাকে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।

-তা বেশ।ওলো শোভা কই গেলি।এদের একটু জলমিষ্টি দে।তোর সাথে কে?

তীর্থ বর্ণকে দেখিয়ে বলল,আমার পিসির ছেলে।

-ও নিম্বুর ছেলে?

-হ্যা রিনা ফুপুর ছেলে।

ধীরেন ডাক্তার বই বন্ধ করে চশমা পরিষ্কার করতে করতে বললেন,এ ছেলে জন্মের সময় আমাদের নিম্বুটা মারা গেল নাকি?

-জি কাকা।

-তোর পিসেমশায় বেঁচে আছে?

-জি না।কাকা।ফুপুর মৃত্যুর তিন মাস পর তিনিও মারা গেছেন।

ধীরেন ডাক্তার একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,মানুষের জীবন আর কি!কচু পাতার জল।আমার পোড়ামুখীটাও জন্মের সময় মাকে খেলো।এখন বাবা মেয়ে এতো বড় পৃথিবীর এককোণে পড়ে আছি।সংসারের কাজে মেয়েটি বেশি পড়তে পারলো না।

উঠতে উঠতে বললেন,তোরা বোস।আমি সন্ধ্যা-আহ্নিক সেরে আসি।ও লো কই গেলি মা শোভা।আমার ঠাকুরঘরে জল দে।

শোভা সন্ধ্যাপ্রদীপ নিয়ে তুলসিতলায় গেছিলো।সেখান থেকে বলল,সব করে রাখছি বাবা।তুমি যাও না!

একটু পর উলুর ধ্বনি শোনা গেল।

একটা প্লেটে একটু মোহনভোগ,কয়েকটা নাড়ু আর দু’কাপ চা নিয়ে শোভা উঠানে এলো।গোধুলি-সন্ধ্যা এতটুকু সময়ের মধ্যে সে স্নান করে ফেলেছে।স্নিগ্ধ চোখ।দেখলে মনে হয় চোখে গাঢ় করে কাজল পরে এসেছে।ঈশ্বর কিছু কিছু মেয়েকে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত করুণা করেন।জন্মের সময় জন্মকাজল পরিয়ে দেন।ভেজা চুল সে তোয়ালে দিয়ে মুড়িয়ে এসেছে।মোমবাতির আলোয় তাকে স্বর্গের মানবীর মতো লাগছে।তীর্থ হা করে তাকিয়ে আছে।

মোমদানিসহ মোমবাতি জলচৌকিতে নামিয়ে রেখে শোভা বলল,কারেন্ট নাই।থাকলে ঘরে বসাতাম।

খুব মিষ্টি শোনালো সেই স্বর।তীর্থ বলল,লাগবে না।বর্ণ তোমাকে দেখতে চাইলো বলে আসলাম।

শোভা বর্ণের দিকে তাকিয়ে বলল,খাও ভাই।গরীবের ঘরে এসেছো!

বর্ণ লজ্জা পেল।বলল,শোভাদি এভাবে বলছেন কেন?

শোভা তীর্থের দিকে তাকিয়ে বলল,তুমি নাও।

-হুম।

শোভা মুচকি হেসে বলল,মনে আছে,আমরা প্রাইমারিতে থাকতে তুমি একদিন একে স্কুলে নিয়ে গেছিলে,খুব দুষ্টুমি করছিল,পরে তোমার একটা ধমকে প্যান্ট ভরে প্রসব করে দিছিল।

তীর্থ হোহোহো করে হেসে উঠলো।শোভার হালকা হাসিতে তার গজ দাঁত বেরিয়ে গেলে হাসিটা রুপালি জোসনা ছড়ানো চন্দ্রের মতো মনে হলো।বর্ণ তখন ভেবেছিলো শোভাদি কে সে চন্দ্রাবতীদি বলে ডাকবে।তাদের হাসিতে বর্ণ লাল হয়ে গেল।তীর্থের হাত ধরে বলল,তীর্থ ভাইয়া,চলো যাই।রাত হয়ে গেল।

ফেরবার পথে বর্ণ জিজ্ঞাসা করল,শোভাদি কি তোমাকে পছন্দ করে?

তীর্থ হেসে উড়িয়ে দিল।বলল,আরে ধুর।আমাকে না,স্বার্থ কে পছন্দ করে।

বর্ণ ভ্রু কুঁচকে বলল,তাই বলো।কিন্তু তুমি তো সুযোগ নিচ্ছো।

-আরে না।বেশ ভালো লাগে।তাই যাই।

-রোজ যাও?

-রোজ না,তবে সপ্তাহে দু’তিনদিন যাই।

অন্ধকারে তীর্থের চোখ জলজল করে উঠল দূর থেকে আসা কোন আলোরেখায়।সে চোখের কোণ মুছে বলল,খুব হাওয়া দিচ্ছে,না?

বর্ণ মন্ত্রমুগ্ধের মতো বলল,হুম।

-ঠান্ডা লাগছে?

-একটু!

-এদিকে আয়।

বর্ণ তীর্থের গা ঘেষে হাটতে লাগলো।বলল,তীর্থ ভাইয়া,একটা কথা বলব?

-বল।

-আম্মা’কে সবাই নিম্বু ডাকতো?

-হুম।

-কেন?

-দাদীজান তো বলে,ফুপু নাকি লেবু খেতে খুব পছন্দ করতো।এবার কি হয়েছে শোন,অতিরিক্ত লেবু খেয়ে ফুপু পেট ব্যথার যন্ত্রণায় মরি মরি।ডাক্তারবদ্দী দিয়ে কিছু হলো না,শেষে দাদীজান গোবর গুলিয়ে ফুপুকে জোর করে খাইয়ে দিলেন।ফুপু হড়গড় করে বমি করে ভাসিয়ে দিলেন।তারপর তার পেট ব্যথা সারলো।

-লেবু খেয়ে কারোর পেট ব্যথা হয়?

-আরে হয়।অতিরিক্ত কিছু ভালো না।একটা মজার কথা শোন।তুই কি জানিস ফুপুর বিয়ে কিভাবে ফুপার সাথে হয়েছিলো?

বর্ণ অবাক হয়ে বলল,আমি কিভাবে জানবো?

তীর্থ জ্ঞানীর মতো বলল,আমাদের জোড়াদীঘির উত্তরপাশে অনেক লেবুগাছ দেখেছিস?

বর্ণের উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করে সে আবার বলতে শুরু করল,ওখানে আগে অারো অনেক লেবু গাছ ছিলো।তুই তো জানিস ফুপা ফলের ব্যবসা করতো।একবার ফুপা ব্যবসার কাজে এসে দাদাজানের থেকে লেবু কিনতে চাইলো।দাদাজান কিছু না ভেবে পুরো বাগানের লেবু বিক্রি করে দিলেন।তারপর ফুপুর সে কি কাঁন্না!দাদাজান রেগে দাদীজানকে ডেকে বললেন,তোমার মেয়েকে বরং ঐ লেবুওয়ালার সাথে বিয়ে দিয়ে দাও।এরপর ফুপা প্রতি বছর লেবু কিনতে আসতেন।এভাবে একদিন কেমন করে যেন দাদাজানের রাগের কথাটা সত্য হয়ে গেল।

তীর্থ বিকট শব্দ করে অনেকক্ষণ সময় নিয়ে হাসলো।সে হাসি ধীরে ধীরে সন্ধ্যারাত্রের সন্ধিক্ষণে রসুলপুরের সোনাদিয়া বিলে মিলিয়ে গেল।

বর্ণ কানে আঙ্গুল দিয়ে বলল,বিশ্রী করে হেসো না তো।ভয় লাগে।

-ধুর!কিসের ভয়?আমি তোকে ধরে আছি না!

অনেকক্ষণ চুপ থেকে বর্ণ বলল,আম্মা কি আমার জন্য মারা গেছে?

-পাগল!কে বলল একথা তোকে?

-শোভাদির বাবা।

তীর্থ বর্ণের কাঁধ শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,ধুর পাগল,বাজে কথা।

বর্ণ ব্যাগ গুছিয়ে উঠে দাঁড়ালো।সৃজন হাত ধরে টেনে বসিয়ে বলল,কি’রে শুধু এক্সাম দিলি।ক্লাস করবি না?

-না দোস্ত।স্বার্থ ভাইয়ার খুব শরীর খারাপ।রাতে বমিটমি করে শ্রী কান্ড করেছে।আজ আর ক্লাস করবো না,তুই নোট দিস।

-সে না হয় দিলাম।বেশি শরীর খারাপ হলে আমি আসি?তুই একা কি করবি?

-না।খালা আছে।তুই ক্লাস কর।

-ওকে।সাবধানে যাস।

বর্ণ কোচিং থেকে বেরিয়ে রিকশা খুঁজতে লাগলো।নারীকন্ঠে তার চোখ স্থির হয়ে গেল।

-তুমি স্বার্থের কে হও?

হঠাৎ একটা মেয়ের থেকে এমন প্রশ্নে সে ঘাবড়ে গেল।বলল,কাজিন,কেন?

মেয়েটি রিকশার একপাশে সরে বসে বলল,উঠে এসো!আমি ওদিকেই যাচ্ছি।

বর্ণের অবাক হয়ে তাকানো দেখে সে বলল,ভয় নেই।আমি স্বার্থের ক্লাসমেট।আমি ত্রিশা।

বর্ণ শুধু বলল,’ওহ’।

ত্রিশা হেসে বলল,আসলে কিছুদিন আগে এক বৃষ্টির দিনে তোমাকে স্বার্থের রিকশা থেকে এখানে নামতে দেখেছিলাম।ভাবলাম কোন রিলেটিভ হবে।আরে উঠে এসো।স্বার্থ কিছু বলবে না।

বর্ণ একপাশে উঠে বসলো।ত্রিশা বলল,মামা,সামনে একটা মোড় পড়বে,ওটার বামদিকে কিছুক্ষণ যেয়ে নার্গিস হোটেল থেকে ডানদিকের রোড ধরবেন।রাহমান ফার্মেসির সামনে অগত্যা মেনশনে রাখবেন।

রিকশাওয়ালা পিছন ফিরে চটচটে তেল পড়া গামছায় ঘাম মুছে বলল,জে আপা।

ত্রিশা বর্ণের দিকে তাকিয়ে বলল,আরে বি ইজি।ঠিকঠাক হয়ে বসো।সঙ্কোচ করছো কেন?তুমি আমার ভাইয়ের মতো।

বর্ণ নড়েচড়ে বসল।বলল,আপনিও যাবেন আমাদের বাসায়?

-হ্যা।স্বার্থের সাথে আমার একটু দরকার আছে।

-কিন্তু ভাইয়া তো অসুস্থ।

-কেন?কি হয়েছে?

-তেমন সিরিয়াস কিছু না।রাতে উল্টাপাল্টা খাওয়া পড়ছিল বোধয়।বমি হয়েছে।

-ও মাই গড।

ত্রিশা সাইডব্যাগ থেকে মোবাইল বের করে কাকে যেন কল করল।

-হ্যালো,মৌন?তুই স্বার্থের ফ্ল্যাটে চলে আয়।

ওপাশ থেকে কিছু বলার আগে ত্রিশা ফোন কেটে দিলো।

(চতুর্থ পর্ব)

<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<< 

বিঃদ্রঃ তোমার একটিমাত্র জীবন যদি প্রেমহীন থেকে যায়,শর্তহীন দলিলে যদি কোন বিবাদীর নাম লেখা না থাকে,অনাবিষ্কৃত ভালোলাগা যদি তোমার ঠোঁটের আঙ্গিনায় বিরহ না জাগায়,একটিমাত্র জীবনে তুমি যদি কলঙ্ক এর সুখই না পেলে-তবে তুমি…!তবে তুমি আমার গল্প পড়ো না।

<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<< 

সাত।

স্বার্থ বালিশে ঠেস দিয়ে চোখ বুজে বসে ছিল।কোলের উপর বই।বর্ণ রুমে ঢুকে মৃদু স্বরে ডাকল।

-স্বার্থ ভাইয়া।দেখুন,কে এসেছে!

ত্রিশাকে দেখে স্বার্থ বলল,ত্রিশা?তুমি ওকে কোথায় পেলে?

বর্ণ বলল,আপনার কাছেই আসছিলো।পথে দেখা হলো।

স্বার্থ উঠতে উঠতে বলল,বর্ণ তুমি যাও ড্রেস ছেড়ে ফ্রেশ হয়ে নাও।

বর্ণ বেরিয়ে গেলে ত্রিশা বলল,থাক তোমার উঠতে হবে না।আমি বসছি।শরীর কি বেশি খারাপ?

-আরে না।ঐ একটু বমি হয়েছিল।হালকা কাশি।

-মেডিসিন নিয়েছো?

-হ্যা,সকালে নিলাম।শরীফ ভাইয়া এনে দিলো।

ত্রিশা বলল,শরীফ ভাইয়া কে?

স্বার্থ বলল,ওহ।হ্যা তাই তো!শরীফ ভাইয়া হলো বর্ণের বড় ভাই।আমার কাজিন।

-খেয়েছো কিছু সকালে?

-হ্যা।খালা কাঁচকলা ভর্তা দিয়ে ভাত দিলো।

-মৌন আসছে!

স্বার্থ শান্ত চোখে ত্রিশার দিকে বলল,ও কেন আসছে?

ত্রিশা অবলীলায় বলল,আমি যে কারনে এসেছি।

-তুমি কেন এসেছো?আমাকে দেখতে?

-উহু।তুমি অসুস্থ আমি জানতাম না।বর্ণ বলল।

-তাহলে কেন এলে?

-বলছি।তাড়া কিসের?

-তাড়া না।কৌতূহল!

কলিংবেলের শব্দ শুনে স্বার্থ বলল,খালা!দেখো তো কে এলো?জেনিথ হলে বলো আজ শরীর ভালো নেই।পড়াবো না।

ত্রিশা স্বার্থের বেডে বসা ছিলো।সেখান থেকে উঠে সোফায় গিয়ে ওড়না ঠিক করে পায়ের উপর পা তুলে আরাম করে বসল।বলল,জেনিথ কে?

-ক্লাস ফোরের একটা মেয়ে।আমাদের নিচের ফ্ল্যাটে থাকে।ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে।

-ওহ।যাই হোক,যা বলছিলাম,তোমার তাহলে কৌতূহলও হয়?

-হবে না কেন?মানবজাতি বলতেই কৌতূহলী।

মৌন এসে স্বার্থকে জড়িয়ে ধরল,প্লিজ দোস্ত।মাফ করে দে।

ত্রিশা বলল,আমাকেও।

স্বার্থ মৌনকে ছাড়িয়ে সরে বসে বলল,বোস।তোরা কি পাগল হয়ে গেলি?

মৌন বলল,জানিস দোস্ত।এ কদিন তোর সাথে কথা বলতে না পেরে আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল।

-হয়েছে।পাম দিস না।এমনিতে শরীর খারাপ।পামে ফুললে আরেক ঝামেলা।

স্বার্থের কপালে হাত নিয়ে মৌন বলল,কেন?জ্বরটর বাঁধালি নাকি?

-আরে না।রাতে বমি হয়েছিল একটু।হালকা কাশি।

মৌন চোখ সঙ্কুচিত করে বলল,বমি?এ্যানি থিং রং?

স্বার্থ ভ্রু নাড়িয়ে বলল,ঐ কেস?

‘দুধ’ বলে মৌন হাসিতে ফেটে পড়ল।ত্রিশা মৌনের ঘটানো আগের ঘটনাটা জানতো।সে ওড়না নিয়ে মুখ চাপা দিলো।শুধু স্বার্থ বিস্মিত চোখে দু’জন সদ্য প্রেমিকযুগলের প্রাণভরা হাসি দেখছিলো।

বর্ণ ফ্রেশ হয়ে কিচেনে ঢুকল।গ্যাসের চুলার কাছে ফাঁকা জায়গায় পা ঝুলিয়ে বসে বলল,খালা!স্বার্থ ভাইয়ার একজন ফ্রেন্ড এসেছেন।কিছু নাস্তা দেন।

রাখালের মা গাঁজর টুকরা করছিলো।বলল,তু উয়া বসছিস ক্যানে বর্ণ বাবু।মাতিয়ে বোস ক্যানে,গায়ে ফুসকা পড়বোক লো।

বর্ণ পা দুলাইতে দুলাইতে বলল,কিছু হবে না।

-ফুসকা পড়বিটোক উয়া স্বার্থ বাবু মুকে বকবেক লো!

বর্ণ সে কথার কর্ণপাত না করে চিপসের প্যাকেট এগিয়ে দিয়ে বলল,খাবেন খালা?

রাখালের মা অবাক হয়ে বলল,বর্ণ বাবু,তু এগুলান কিয়া খাইছিস লো?স্বার্থ বাবু জাইলে তুকে আস্ত রাখবোক লাই।

বর্ণ থ্রি কোয়াটারের পকেট থেকে চকলেট বের করে বলল,দেখেন এগুলাও খাই।আপনার স্বার্থ বাবু জানলে তো!

-তু এয়া ছাইপাঁশ রাখ ক্যানে।মু তুকে নাস্তাটো দিবো,উয়া স্বার্থ বাবুর ঘরে দিয়া আই,যা ক্যানে।

-দেন।

নাস্তার পরিমাণ দেখে বর্ণ বলল,খালা,এতো খাবার কে খাবে?একটা মেয়ে এতো খাবার খাবে?

রাখালের মা বলল,উয়া একলা না আছে।আরো এক ছুলেটো আইনছে!

-কে?

-স্বার্থ বাবুর এক বন্ধুটো আছে।

-কখন এলো?

-একটু আগেটো আইনছে।

বর্ণ নাস্তা দিয়ে দাঁড়ালে স্বার্থ বলল,বর্ণ,একটু নিচে যেয়ে জেনিথের মমকে বলো এসে,আজ পড়াবো না।বলো স্বার্থ ভাইয়ার শরীর ভালো নেই।

‘আচ্ছা’ বলে বর্ণ বেরিয়ে গেল।মৌন বলল,ছেলেটা কে’রে?

স্বার্থ বলল,আরে তোকে বলেছিলাম তো গ্রাম থেকে আমার এক কাজিন এসেছে।এখানে অ্যাডমিশন কোচিং করতে।

মৌন দরজার দিকে তাকিয়ে বলল,কিউট আছে।

ত্রিশা আড়চোখে তাকাল।মৌন হেসে বলল,আরে ছেলে তো।সুন্দর হলে বলবো না।তুমি চাপ নিচ্ছ কেন?

স্বার্থ বলল,ও তোকে বলেছে যে ও চাপ নিচ্ছে?ফাজিল।ওসব ছাড় নে খা।

ত্রিশা বলল,আমি পায়েস খাবো না।

স্বার্থ দুষ্টুমি করে বলল,মোটা হওয়ার ভয়?আরে খাও তুমি মোটা হলেও মৌন তোমাকে ছেড়ে যাবে না।সুমি ভাবি মানে বর্ণের ভাবি এসেছিল,উনি গতরাত্রে করেছিলো।বেশ সুস্বাদু।

-আরে সেজন্য না।ফ্রিজে ছিলো বোধয়।আমার টনসিলের প্রব্লেম আছে।

মৌন বলল,আরে ছাড়।ওর হয়ে আমি খেয়ে দিচ্ছি।

পায়েসের বাটি নিয়ে খেতে শুরু করলো মৌন।স্বার্থ বলল,তুমি ফল খাও তাহলে,নুডুলস খেতে পারো।খালা দারুন তৈরি করে।

-হুম।আচ্ছা বর্ণ কি তোমাকে বেশ ভয় পাই?নাকি সম্মানে ওমন করে?

-কেমন করে?

-নাহ।রিকশায় উঠতে বললাম,কেমন জানি একটা করলো।

-আরে না।তুমি অপরিচিত তো তাই।

-হয়তো।বাট তোমার ফ্রেন্ড যখন বললাম তখনও কেমন একটা করলো।

-ধুর।বাদ দাও তো।খাও।

-হুম।তুমি একটা কিছু নাও।

-না ত্রিশা।এখন আর খাবো না।বাই দ্যা ওয়ে,তোমরা কিন্তু লাঞ্চ করে যেও।খালা বোধয় অলরেডি জোগাড় শুরু করে দিয়েছে।

মৌন গোগ্রাসে পায়েস খাচ্ছিল।আধো আধো করে বলল,নিশ্চয়!নিশ্চয়!এ্যাট অ্যানি সার্ভিস।

স্বার্থ ঘা মেরে বলল,তুই ভোজনরসিক আমি জানি।তাই তোকে বলি নি।ত্রিশাকে বলেছি।

-ওহ!ঐ একই কথা দোস্ত।দে আর কি আছে।

-সব পড়ে আছে,যেটা মন চাই,খা।

বর্ণ দরজায় দাঁড়িয়ে ঘা দিলো।এ বাসায় কলিংবেল নেই।সে কোচিংয়ে যাওয়ার সময় মাঝে মাঝে দেখে দুধওয়ালা দরজা ধাক্কাধাক্কি করছে।বাসার কর্ত্রী হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে রোজ বোধহয় একটা কথা বলে,স্যরি,কিচেনে ছিলাম তো,শুনতে পাই নি।

দ্বিতীয় টোকা দেওয়ার আগেই আজ দরজা খুলে গেল।বর্ণ বলল,আমি স্বার্থ ভাইয়ার কাজি।আসলে…!

ভদ্র মহিলা কথা শেষ করতে দিলেন না।বললেন,তোমাকে চিনি।ভিতরে এসো!

-না আসলে আমি বলতে আসছিলাম যে স্বার্থ ভাইয়া একটু অসুস্থ।আজ জেনিথ কে পড়াতে পারবে না।

‘ইট’স ওকে ব্রো!কিন্তু তুমি ভিতরে তো আসবে’ বলে ভদ্র মহিলা তাকে হাত ধরে টেনে ভিতরে নিয়ে গেলেন।বর্ণ কিছুটা অবাক হলো।তার অস্বস্তিও হচ্ছিলো।ঘেমে যাচ্ছিল সে।কিছুটা ভয় ভয়ও করছে।তার ধারনা এই মহিলা এখন প্রচুর কথা বলবে।কিংবা অন্য কিছু।ভদ্র মহিলা বর্ণ কে সোফায় বসিয়ে বলল,তুমি একটু বসো,আমি যাবো আর আসবো।

বর্ণের মনে হলো সে ছুটে পালাবে।কিন্তু কিছুটা সহবতের জন্য পারছিল না।সে ঘুরেফিরে ড্রয়িংরুমের প্রত্যেকটা জিনিস দেখছিল।

মোনালিসার সুন্দর হাসির সেই বিখ্যাত ছবি দেয়ালে ঝুলছে।বর্ণ কিছুতে বুঝে উঠতে পারে না যে মোনালিসার হাসি কি এমন যে সবাই অন্যের হাসি সঙ্গে তুলনা করে তার হাসি।তার তো একটুও ভালো লাগে না হাসিটা।মনে হয় জোর করে একটু মুচকি হেসেছে।দক্ষিণের দেওয়ালে ফ্রেমে বাঁধানো কিছু হাতের কারুকার্য।নিশ্চয় ভদ্রমহিলার করা।সারা ড্রয়িংরুম জুড়ে অসংখ্য শখের জিনিস।দেখলেই বোঝা যায় প্রতিটা জিনিস অতি যত্নের।একদম সামনে পাশিপাশি দুটো ছবি।একটা যিশুখ্রিস্টের সেই কষ্টের মুহূর্ত এবং দ্বিতীয়টা শিবের ধ্যানমগ্ন ছবি।সে কিছুটা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে দেখছিলো।

বর্ণ যা ভাবছিলো তার কিছু হলো না।কয়েক মিনিট পর ভদ্র মহিলা খাবার ট্রে হাতে ঢুকল।বর্ণকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলল,জেনিথের পাপ্পা হিন্দু।আমি খ্রিস্টান।ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম তো,কেউ কাউকে কোনকিছুতে জোর করি নি।

বর্ণ আনমনা হয়ে বলল,ওহ।

-নাও ব্রো।সামান্য কিছু।

বর্ণ বলল,এসবের কি দরকার ছিলো দিদি?

-তুমি আমাকে সিস বলো।ভালো লাগবে।

-আচ্ছা।

তিনি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,বর্ণ,তোমার মতো আমার একটা ভাই আছে।জন।অবশ্য তোমার থেকে একটু বড় হবে।প্রকাশ কে বিয়ে করার পর পাপ্পা আমাদের মেনে নেন নি।তাই রাঙামাটি ছেড়ে ঢাকায় আসা।প্রকাশ একটা মাল্টিমিডিয়া ন্যাশনাল কোম্পানি জব করে।টুকটাক সাজিয়েগুছিয়ে বেশ চলে যায়।

-জনের সাথে যোগাযোগ নেই?

-আছে।ব্রো লুকিয়ে লুকিয়ে ফোন করে প্রায়।জেনিথের জন্য এটাওটা পাঠায়।খুব ভালোবাসে জেনিথকে।অথচ এখনো জেনিথকে নিজে চোখে প্রাণ ভরে দেখতে পেলো না।

-প্রকাশ দাদার বাড়ির লোক মেনে নেন নি?

-নিয়েছে।তারা আমাকে খুব ভালোবাসে।তবে আমার শ্বশুর শাশুড়ি,দেবর,ননদ এদেশে থাকেন না।ভারতে থাকেন।প্রকাশের স্টাডির জন্য ও যেতে পেরেছিল না।তারপর আমাদের প্রেম,বিয়ে।প্রকাশ প্রায় বলে,চল জেসিকা আমরা মা বাবার কাছে চলে যায়।আমি শুধু জোর করে আছি।যদি পাপ্পা,মমের রাগটা ভাঙ্গিয়ে যেতে পারি।খুব খারাপ লাগে মাঝে মাঝে।

জেসিকা চোখ মুছলো।বলল,আরে তুমি তো কিছু খেলে না।

বর্ণ হেসে বলল,অনেকটা খেয়ে ফেলেছি।আর খাবো না দিদি।স্যরি সিস।

জেসিকা বলল,কেকের টুকরো তো খেলে না।একটু আগে রেডি করলাম।জেনিথের আজ বার্থডে।আমি আর জেনিথ যেতাম তোমাকে,স্বার্থ কে বলতে।

‘তাহলে তো খেতে হয়’ বলে বর্ণ কেকের টুকরো তুলে নিলো।

ড্রয়ার থেকে ফ্রেমে বাঁধানো একটা ছবি এনে জেসিকা বলল,এটা জন।চোখের সামনে থাকলে মন পোড়ে তাই যত্ন করে তুলে রাখি।

বর্ণ হাতে নিয়ে দেখল।খুব মিষ্টি হাসির একটা ছেলের ছবি।চোখে সানগ্লাস।গলায় ক্রুজ।নীল জিন্সের সাথে মিষ্টি কালারের টিশার্ট পরা।ঠোঁটে দুষ্টুমির আভা।

জেসিকা বলল,রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে গত বছর ভর্তি হলো।পাপ্পা,মমের কাছেই থাকে।পাপ্পা ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ।মজার বিষয় হলো প্রকাশও ওখানে পড়তো।মাঝে মাঝে পাপ্পার কাছে প্রয়োজনে আসতো।তারপর যা হয় আর কি!

-আপনি কোথা থেকে স্টাডি কমপ্লিট করেছেন?

-আমি রাঙামাটি সরকারি কলেজে পড়তাম।

‘ওহ’ বলে বর্ণ পুনরায় বলল,জেনিথ কোথায়?ওকে দেখছি না যে?

-তোমাদের উপরের ফ্ল্যাটে অর্পিতাকে ইনভাইট করতে গেল এই দুপুরবেলা।বলে,ফ্রেন্ডকে ইনভাইট করবো না!খুব ঘরোয়াভাবে করতে চাচ্ছি।তোমাদের কিন্তু আসতে হবে রাতে।তোমাকে পেলাম বলে আর যাচ্ছি না কিন্তু।

বর্ণ হেসে বলল,আর লাগবে না।আমি স্বার্থ ভাইয়াকে বলবো।এবার উঠি।

জেসিকা বর্ণের হাত ধরে বলল,মাঝে মাঝে মন চাইলে সিসের কাছে চলে এসো।খুব ভালো লাগবে আমার।ব্রো কে কতদিন হলো দেখি না।তোমাকে দেখলে হয়তো কিছুটা স্বস্তি পাবো।

জেসিকা চোখ মুছে হেসে বলল,তুমি কিন্তু একমাত্র সিস বললে।আর বললে না।

বর্ণ হেসে দিলো।আসলে সিস বলতে তার কেমন একটা লাগছিলো।দিদি বলতে হলেও এতটা অস্বস্তি লাগতো না।ঐ পনেরো দিনে তীর্থের সাথে যতবার শোভাদের বাড়ি গেছে।সে শোভাকে শোভাদি বলে ডেকেছে।চন্দ্রাবতীদি আর বলা হয়ে উঠে নি।শোভার সেই হাসি এখনো তার মনে পড়ে।

বর্ণ হেসেই বলল,আসলে অভ্যাস নেই তো।সময় লাগবে।

দরজায় দাঁড়িয়ে জেসিকা বলল,ওকে ব্রো।রাতে আসছো তো?

বর্ণ মাথা নাড়িয়ে বিদায় নিল।

দুপুরে খাওয়ার সময় মৌন বলল,তোর কাজিন কই?আমাদের সাথে খাবে না?

স্বার্থ জানে বর্ণ তার ভয়ে দুপুরে ঘুমাবে না।হয়তো পড়ছে।তবুও বলল,থাক তোরা খা।ও ঘুমাচ্ছে।

ত্রিশা বলল,আমি ঘুম থেকে জাগিয়ে আনি।ওকে ছাড়া আমরা খাবো ব্যাপারটা কেমন না?

-আরে না।ঘুমাচ্ছে তো।

রাখালের মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,খালা,তুমি বর্ণের খাবার টা রুমে দিয়ে আসো!

রাখালের মা বলল,তু না বলছিসটো উ ঘুমাইনছে।তো খাবারটো কে খাইনবে?

স্বার্থ বলল,আহ,খালা,তুমি এখন দিয়ে এসো।ও উঠলে খাবে।

মৌন টিপ্পনী কেটে বলল,ব্যাপারটা কি বলতো?বর্ণ কি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে খাবে না’কি?

-আরে না।খা তো।জ্বালাস না।

রাখালের মা খাবার নিয়ে বর্ণের রুমে দিতে বেরিয়ে গেলে ত্রিশা বলল,তোমার কাজের বুয়াটা এমন অদ্ভুত ভাবে কথা বলে কেন?

স্বার্থ বলল,কে খালা?উপজাতি কি’না তাই।তবে মনটা অনেক সহজ সরল।

‘হুম তা ঠিক’ বলে ত্রিশা খেতে লাগল।

বর্ণ রুম থেকে বেরচ্ছিল।রাখালের মা বলল,যেতে হবেক লাই।তুর খাবারটো স্বার্থ বাবু রুমে পাঠাইনছে।

-কেন?ওখানে খেলে কি সমস্যা?

-সে কথাটো তু মোকে জিগাইনছিস ক্যানে?মু কিছুটো জানিক লাই বর্ণ বাবু।

বর্ণ মনে মনে বলল,আমি গেলে তার বোধয় মানসম্মানে কমতি পড়বে বন্ধুদের সামনে।মেন্টাল একটা।

মুখে বলল,খালা,তুমি রেখে যাও।

-তু খাবিটো লাই?

-যখন ইচ্ছা খাবো।রেখে যাও।

বর্ণ গিয়ে শুয়ে পড়ল।রাখালের মা বলল,খাবি লাই তো উ স্বার্থ বাবু রাগটো করবেক।

বর্ণ সে কথার জবাব দিলো না।

আট।

মৌনদের চলে যাওয়ার পর স্বার্থ রাখালের মাকে জিজ্ঞাসা করল,খালা,বর্ণ খেয়েছে?

-তুদের কি হইনছে বলটো মুকে?উ তো খাবারটো না খেইনছে,রাগটো করে শুয়েনছে।

-আচ্ছা তুমি খেয়ে নাও।তারপর গুছিয়ে চলে যাও।রাতের জন্য আর রাঁধতে হবে না।

-ঠিক আনছে বটে।তু উ কে খাওয়াটো ক্যানে!

স্বার্থ রুমে ঢুকে দেখল বর্ণ বিছানায় বসে পড়ছে।সে সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বলল,খাবার খাও নি কেন?

বর্ণ একবার আড়চোখে তাকিয়ে বলল,ক্ষুধা নেই।

-শোনো বর্ণ,আমার শরীরটা ভালো না।আমাকে কোন কিছুর জন্য বাধ্য করো না।

বর্ণ বলল,স্বার্থ ভাইয়া,সব সময় এমন না করলেও পারেন।আমার সত্যি ক্ষুধা নাই।

-খেতে ডাকি নি বলে রাগ করেছো?

‘খেতে ডাকি নি বলে রাগ করেছো,মেন্টাল একটা’ বর্ণ মনে মনে আওড়ালো।বলল,নাহ।

-তাহলে ক্ষুধা নাই কেন?

‘জেনিথের মম অনেকটা নাস্তা দিয়েছিল’ বলেই মনে মনে বলল,আল্লাহ রক্ষা করো,যেন কিছু না বলে।

স্বার্থ শান্ত স্বরে বলল,ওহ।তাহলে তুলে রাখি ফ্রিজে।পরে খেও।

স্বার্থ উঠতে বর্ণ বলল,জেনিথের মম ইনভাইট করেছে আমাদের?

-কি উপলক্ষে?

-আজ জেনিথের জন্মদিন।

‘ওহ’ বলে স্বার্থ খাবার নিয়ে বেরিয়ে গেল।ফিরে এসে বলল,এরপর মৌন আমার এখানে এলে তুমি ওর সামনে যাবে না।

-কেন?

স্বার্থ ধমক দিয়ে বলল,আমি বলেছি যাবে না।ব্যস।যাবে না।

বর্ণ কেঁপে উঠল।শান্ত স্বরে বলল,আচ্ছা।

-ত্রিশার সাথে দেখা হলেও এড়িয়ে যাবে।

-সেটা কি ভালো দেখাবে?আপনারই তো ফ্রেন্ড।

স্বার্থ রাগি চোখে তাকাল।বর্ণ ঢোঁক গিলে বলল,আচ্ছা।এড়িয়ে যাবো।

মনে মনে বলল,পাবনার পাগলাগারদে বসবাস করছি মনে হয়।

অনেকক্ষণ পর নিরবতা ভেঙ্গে স্বার্থ বলল,সন্ধ্যায় রেডি থেকো।একটু বের হবো তোমাকে নিয়ে।

-কই যাবো আমরা।

-ভয় নেই।খুন করবো না।জেনিথদের জন্য ছোটখাটো একটা গিফট কিনতে যাবো।তুমি তো ফ্ল্যাটে একা থাকতে পারবে না সন্ধ্যার পর,কি আর করা।

-না মানে বলছিলাম আপনার তো শরীর খারাপ।

-এখন অনেকটা ভালো লাগছে।

-আচ্ছা।

স্বার্থ বলল,ওকে তুমি পড়ো।আমি একটু রেস্ট নেয় রুমে গিয়ে।ঘুমিয়ে পড়লে সন্ধ্যার আগে ডেকে তুলো।

বর্ণ মনে মনে বলল,ইশ!ঘুমিয়ে পড়লে সন্ধ্যার আগে ডেকে তুলো।নবাবজাদা।আমি যেন চাকর।

মুখে বলল,আচ্ছা ভাইয়া।

গিফটের দোকানে ঢুকে স্বার্থ চারদিক তাকিয়ে বলল,বর্ণ!টেডিবিয়ার,চকলেট নিলে তো হবে।কি বলো?

-আচ্ছা।তবে ফুল হলে ভালো হতো।

-ওকে।সামনের ফুল মার্কেট থেকে নিয়ে নিবো।

দোকানের এক যুবক কর্মচারী এগিয়ে এসে বলল,এক্সকিউজ মি,স্যার।ক্যান আই হেল্প ইউ?

স্বার্থ বলল,আমাদের কিছু টেডিবিয়ার দেখান।

-ওকে স্যার।

সে বর্ণের দিকে তাকিয়ে বলল,বর্ণ,তুমি সিলেক্ট করো!

কর্মচারী বর্ণকে বলল,তুমি এদিকে এসো।আমি দেখাচ্ছি।

স্বার্থ বলল,না!ও একা কোথায়ও যাবে না।বাই দ্যা ওয়ে,আপনি ওকে তুমি বললেন কেন?

কর্মচারী ঢোঁক গিলে বলল,ইয়ে না মানে ও তো আমার ছোটই হবে।

-সো হোয়াট?ছোট হবে বলে আপনি অপরিচিত কাস্টমারকে তুমি সম্মোধন করবেন?

বর্ণ পাশ থেকে বলল,স্বার্থ ভাইয়া।আমার কোন সমস্যা নেই।অযথা ঝামেলা করছেন কেন?

-কি বললে?আমি ঝামেলা করছি।

-করছেনই তো।

কর্মচারী বর্ণের কথায় সায় দিয়ে মাথা নাড়াল।স্বার্থ রেগে গিয়ে কর্মচারীর কলার চেপে ধরে বলল,বাস্টার্ড!

বর্ণ ছাড়াতে এগিয়ে গেলে স্বার্থ বলল,ডোন্ট টাচ মি,বর্ণ।

কর্মচারী বলল,আরে ভাই।করছেন কি?পাগল হয়ে গেলেন নাকি?

দোকানের ম্যানেজার এসে স্বার্থকে ছাড়িয়ে বললেন,হোয়াট হ্যাপেনড?

স্বার্থ রাগি চোখে কর্মচারীর দিকে তাকিয়ে আছে।

ম্যানেজার বললেন,কি হয়েছে,কি করেছো তুমি?

ছেলেটি হাঁপাতে হাঁপাতে বর্ণকে দেখিয়ে বলল,ঐ ছেলেটাকে আমি ‘তুমি’ সম্মোধন করাই এই ভাইয়া রেগে এই অবস্থা করেছে।

স্বার্থ আবার এগিয়ে আসতে গেলে ম্যানেজার থামিয়ে দিল।স্বার্থ দাঁত চেপে বলল,হাউ ডেয়ার ইউ!তুই ওকে তুমি বলবি কেন?

ম্যানেজার বললেন,আপনি থামুন।ছেলেটা দোকানে নতুন।

তিনি ছেলেটার দিকে তাকিয়ে ধমক দিয়ে বললেন,তুমি তাকে তুমি সম্মোধন করবে কেন?তুমি জানো না কাস্টমার ছোট বড় যাই হোক তার সাথে শালীনতা বজায় রেখে কথা বলতে হয়?

ছেলেটি মাথা নিচু করে বলল,আমি তো অশালীন কিছু বলি নি।

-আবার কথা বলো?তুমি এখনি ওনাকে স্যরি বলো।

ছেলেটি আড়চোখে স্বার্থের দিকে তাকিয়ে বলল,স্যরি।

ম্যানেজার বললেন,তুমি ওদিকে গিয়ে এখানে আরেকজনকে পাঠাও।তারপর স্বার্থের দিকে তাকিয়ে বললেন,আই অ্যাম এক্সট্রেমলি স্যরি স্যার।আপনারা আসুন।অন্য কর্মচারী আপনাদের হেল্প করছে।

পুরো ঘটনায় বর্ণের বিস্ময়ের সীমা রইলো না।সে ভাবল,স্বার্থ ভাইয়া কি সত্যি দিনকে দিন মেন্টাল হয়ে যাচ্ছে।কি অবস্থা।রাগী একটু বটে,তাই বলে এতো টা?

টেডিবিয়ার নিয়ে দোকানের বাইরে এসে বর্ণ বলল,স্বার্থ ভাইয়া!এতো টা সিনক্রিয়েট না করলেও হতো!সামান্য ব্যাপার।

-শোনো বর্ণ।যেটা বোঝো না সেটা নিয়ে কথা বলবে না।আমার পছন্দ না।

বর্ণ মনে মনে বলল,নিজে যেন কত বোঝে।

স্বার্থ বলল,তোমার কষ্ট হচ্ছে?রিকশা নিবো?

-কষ্ট হবে কেন?আমি কি ননীর পুতুল নাকি?তাছাড়া ফুল মার্কেট তো দেখাই যাচ্ছে।

-তাহলে আমার বামপাশ দিয়ে হাটো।কোথা থেকে আবার কি এসে গায়ের উপর তুলে দিবে!

-আপনার গায়ে তুলবে না?

-আমার তো এ শহরে চলার অভ্যাস আছে।তোমার তো নেই না?

বর্ণ মনে মনে বলল,এতোই যদি দরদ ছোট ভাইয়ের হাতটা ধরে হাটলেই তো হয়।

-কি ব্যাপার কিছু বললে না যে?

-কি বলবো?আপনিই তো বললেন আমার চলার অভ্যাস নাই।মেনে নিলাম।

এক ফুলের দোকানে দাঁড়িয়ে স্বার্থ বলল,আচ্ছা।কি ফুল নিবে দেখো?

বর্ণ অনেকক্ষণ দেখে বলল,গাঁদা ফুলের সব মালা দেখছি।জিজ্ঞাসা করেন তো গাঁদা ফুলের তোড়া পাওয়া যাবে কি’না?

ফুলের দোকানদার যুবক।বলল,তোড়া নেই ভাইয়া।তবে রেডি করে দেওয়া যাবে।

স্বার্থ বলল,আচ্ছা আপনি করুন।কত পড়বে?

দোকানদার বলল,ভাইয়া,ছোট তোড়া নিলে দু’শ টাকা পর্যন্ত রাখা যাবে,মাঝারিটা পাঁচ’শ টাকা আর যদি বড়টা নিতে চান তো হাজার টাকার কমে হবে না।এবার আপনাদের চয়েস।

স্বার্থ বর্ণের দিকে তাকালো।বর্ণ ভাইয়া বলতে গিয়েও থেমে দম নিয়ে বলল,আপনি মাঝারিটা দেন।

দোকানদার মুচকি হেসে বলল,ওকে।

স্বার্থ বলল,আপনি রেডি করুন আমরা ঘুরে আসছি।পেমেন্ট করে যেতে হবে?

দোকানদার বলল,না।আপনারা নেওয়ার সময় দিলেই হবে।

‘ওকে’ বলে স্বার্থ বর্ণের দিকে তাকিয়ে বলল,কিছু খাবে?চলো কোথাও গিয়ে বসি!

-আপনি তো সেদিন বাইরের খাবার খাওয়া নিয়ে বকলেন।

-তুমি ভাজাপোড়া খাও তাই বকেছি।মোটা হলে টের পাবে!

-আমি কি মোটা নাকি?মিডিয়ামই তো আছি।

-সে জন্য তো বললাম।সর্তক থাকলে মেদভূড়ি হবে না।অনেকদিন বাঁচবে?এমন সুন্দর থাকবে সব সময়।

বর্ণ মুচকি হেসে বলল,আমি সুন্দর নাকি?কেউ তো বলে না।অনু আপু তো সব সময় বলে আমি নাকি পেঁচার মতো।ভাবী অবশ্য বলে,আমার দেবরটা কিউট।

স্বার্থ কোন কথার জবাব দিলো না।বলল,চলো ফালুদা খাই!

-ফালুদা আপনার খুব পছন্দের?

-কেন বলো তো?

-না এমনি।জানতে পারি না?

-আমার খুব একটা ভালো লাগে না।তবে আজ না হয় খেলাম একটু।

বর্ণ বুঝতে পারল স্বার্থ মিথ্যা কথা বলছে।ফালুদা,লাচ্ছি তার একদম ভালো লাগার কথা নয়।

বর্ণ বলল,আপনার তো দুধে সমস্যা হয়।তারপর রাতে যা কান্ড হলো।

-তাও ঠিক।তাহলে তুমি খাও ফালুদা।আমি না হয় অন্য কিছু খাবো।

বর্ণের চোখ শহরের নিয়নবাতির আলোয় চকচক করে উঠল।ফুড প্লাজাতে ঢুকে চেয়ারে বসতে বসতে স্বার্থ বলল,গাঁদা ফুল তোমার খুব প্রিয়?

-খুব।গন্ধটা আমার দারুন লাগে।

-শরীফ ভাইয়া কল করেছিলো।উনারা আমাদের ওখানে পৌঁছে গেছেন।

খানিকক্ষণ চুপ থেকে সে আবার বলল,তোমাকে যেতে দেই নি বলে আমার উপর রাগ করেছো?

বর্ণ একবার তাকিয়ে বলল,মিথ্যা বলবো না।রাগ হয়েছিলো।কিন্তু এখন রাগটা নেই।

-কেন?

-এই যে আমাকে সাথে করে ঘুরতে আনলেন।শোধবোধ হয়ে গেল।

-বেশ।তাহলে অর্ডার দেই?

স্বার্থ ওয়েটারকে ডাক দিলো।একজন মেয়ে এসে হাজির।মেনু চ্যাট এগিয়ে দিয়ে সে দাঁড়িয়ে রইল।স্বার্থ বর্ণের দিকে তাকিয়ে বলল,আর কিছু খাবে?

-না থাক।জেনিথদের ওখানে তো যেতে হবে।তাহলে…।

-ওহ হ্যা।তাই তো।

স্বার্থ চোখ তুলে দেখে মেয়েটি হা করে তার দিকে তাকিয়ে আছে।সে বলল,কি ব্যাপার আপনার পলক পড়ছে না যে।

মেয়েটি বোধয় লজ্জা পেল।স্বার্থ বলল,একটা ফালুদা।আইসক্রিম কম দিবেন।

বর্ণ বলল,কেন?আইসক্রিম কম কেন?

-শোনো ঠান্ডা লেগে যাবে।

বর্ণ মনে মনে বলল,ধুর ব্যাটা।সবখানে ইতরামি।

মেয়েটি যাওয়ার সময় জিজ্ঞাসা করল,অর এনিথিং।

-বর্ণ,কি খাওয়া যায় বলো তো?

বর্ণ বলল,ম্যাংগো জুস?

-গুড আইডিয়া।

স্বার্থ মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল,এবং আমার জন্য ম্যাংগো জুস!

দু’মিনিট পর মেয়েটি ফিরে এসে স্বার্থের কাছে জানতে চাইল,এক্সকিউজ মি স্যার!ফালুদাতে ফল কোনটা হবে?

বর্ণ বলল,স্ট্রবেরী।

মেয়েটি বিনয়ে বলল,ওকে স্যার।

আবার এক মিনিট পর সে এসে বলল,এক্সকিউজ মি স্যার।আপনার জুসে সুগার হবে?

স্বার্থ বিরক্ত মুখে বলল,আপনাকে সুগার দিতে মানা করেছি?

-স্যরি স্যার।

মেয়েটি চলে যাওয়ার পর স্বার্থ বলল,বার বার আসছে কেন বলো তো?

বর্ণ মুচকি হেসে বলল,আপনাকে বার বার দেখতে আসছে বোধয়।

-মজা নিও না।

-মজা নয়,স্বার্থ ভাইয়া।যে কয়বার আসছে আপনার দিকেই তাকিয়ে আছে।

স্বার্থ অস্বস্তি নিয়ে বলল,এরা মেয়েদের রাখে কেন কে জানে!ছেলে রাখলে তো পারে।

-কেন মেয়েদের আপনার পছন্দ নয়?

স্বার্থ অবাক হয়ে বর্ণের দিকে তাকালো।বর্ণ চোখ বুজে ঢোঁক গিলল।

অনেকক্ষণ পর স্বার্থ বলল,আরে ব্যাপার সেটা নয়।সামাজিকতার কথা ভেবে বলছি।

বর্ণ স্পষ্ট করে বলল,অন্যদের আর দোষ কি?নিজে একটু কম সুন্দর হলে তো পারতেন!অতো হ্যান্ডসাম হলে চলে?

স্বার্থ সবটাই শুনেছে।তবুও বলল,আমাকে কিছু বললে বর্ণ?

-কিছু না ভাইয়া।

মনে মনে বলল,আপনার সাথে কোথাও এসে শান্তি নেই,তীর্থ ভাইয়ার সাথে গেলেও একই অবস্থা।

স্বার্থ বলল,তীর্থের সাথে দু’তিনদিন কথা হয় না।শরীফ ভাইয়ারা বোধয় কিছু বলেনি বাড়িতে আমার কথা।

(পঞ্চম পর্ব)

<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<< 

বিঃদ্রঃ তোমার একটিমাত্র জীবন যদি প্রেমহীন থেকে যায়,শর্তহীন দলিলে যদি কোন বিবাদীর নাম লেখা না থাকে,অনাবিষ্কৃত ভালোলাগা যদি তোমার ঠোঁটের আঙ্গিনায় বিরহ না জাগায়,একটিমাত্র জীবনে তুমি যদি কলঙ্ক এর সুখই না পেলে-তবে তুমি…!তবে তুমি আমার গল্প পড়ো না।

<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<< 

নয়।

বর্ষার এক ভর দুপুরে ভিজে একাকার হয়ে ফ্ল্যাটে ফিরল স্বার্থ।বর্ণ পড়ছিল।রাখালের মায়ের কথা তার কানে ভেসে এলো।

-তু এত্তো ভিজেটো গিইয়েনছিস কিটো করে?

স্বার্থের চোখ-মুখ লাল হয়ে গেছে।সে কোনরকম সোফায় বসে বলল,খালা!বর্ণ কই?

বর্ণের ডাক পড়ার আগে সে এসে সোফার কাছে দাঁড়িয়েছে।

রাখালের মা বলল,ঐ তো দাঁড়িয়ে আনছে ক্যানে!

স্বার্থ একবার বর্ণের দিকে তাকিয়ে বলল,মনে হয় জ্বর আসবে প্রচুর।তুমি খেয়ে নাও।আমি একটু রুমে গিয়ে বিশ্রাম করি।

বর্ণ মাথা নাড়াল।উঠতে গিয়ে টলছিলো স্বার্থ।বর্ণ ধরতে গেলে বলল,লাগবে না।আমি পারবো।

বর্ণ মনে মনে বলল,হায় রে আজব চিজ।

স্বার্থ রুমে গেলে সে রাখালের মা’কে বলল,খালা!কিচেনে সাবু আছে?

-উ তো না আনছে।

-আচ্ছা আমি নিচের দোকান থেকে আনছি।

-তু আবার নিচেটো গেলে উ স্বার্থ বাবু রাগটো করবে ক্যানে।

-করলে করুক।জ্বর নিয়ে উনি ভাত খাবে না।সাবু,বার্লি হলে শরীরের জন্য ভালো,পেটেও কিছু পড়বে।

-ঠিকটো আনছে।

বিকেল নাগাদ স্বার্থের জ্বর বেড়ে গেল তরতরিয়ে।বর্ণ চিন্তায় পড়ে গেল।রাখালের মা জলপট্টি দিচ্ছে দুপুর থেকে।বর্ণ বলল,খালা!আশেপাশে ডাক্তার পাওয়া যাবে?

-মু তো জানিকটো লাই।তু একটো কাজ কর,গেটটোতে হোসেন ভাইকে বুল ক্যানে।

-আচ্ছা।আপনি খেয়াল রাখেন।

বর্ণ নিচে নেমে সরাসরি হোসেন ভাইয়ের সামনে দাঁড়ালো।

-হোসেন ভাই,আশেপাশে কোন ডাক্তার পাওয়া যাবে?

হোসেন ভাই চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞাসা করল,ছোট ভাই!কার কি হয়েছে?

-স্বার্থ ভাইয়ার প্রচুর জ্বর।জ্বরের ঘোরে আবোল তাবোল বকছে।আমার খুব ভয় করছে।

-তুমি এসো আমার সাথে।রাহমান ফার্মেসিতে রোজ বিকালে একজন ডাক্তার আসে,দেখি মতিন চাচাকে বলে ম্যানেজ করা যায় কিনা।

বর্ণ নিঃশব্দে হোসেন ভাইয়ের পিছু চললো।

মতিন চাচা ব্যস্ত ছিলেন।তাকে বেশ হাসিখুশি মনে হলো।রোগীর লম্বা লাইন।হোসেন ভাই বর্ণকে বাইরে দাঁড়িয়ে রেখে ভিতরে ঢুকল।

-চাচাজি,স্বার্থ ভাইটার প্রচুর জ্বর।রোগীর তো লম্বা লাইন,কিছু একটা কি ব্যবস্থা করা যায়?

মতিন চাচা হাসি মুখে বললেন,দেখছো তো বাবা রোগী,ডাক্তার এখন স্পেশাল যেতে পারবে না।

-ছেলেটা খুব কষ্ট পাচ্ছে আর কি!

-আমার রাহমান ফিরে এসেছে।তুমি দাঁড়াও,ও নিশ্চয় যাবে।

এতক্ষণে হোসেন ভাই মতিন চাচার হাসি মুখের কারন বুঝলো।সে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,যাক ভালোই করেছে।ছেলেটার সুবুদ্ধি হলো।

সবকিছু দেখে রাহমান প্রেসক্রিপশন লিখে বর্ণের হাতে দিয়ে বলল,এগুলো খেলে ঠিক হয়ে যাবে ইনশাল্লাহ।তুমি আমার সাথে ফার্মেসিতে এসো।আমি সব ওষুধ দিয়ে দিচ্ছি।

আধঘোরে,আধচোখে স্বার্থ একবার বর্ণের দিকে তাকালো।তারপর চোখ বুজল।রাখালের মা আবার জলপট্টি দিতে গেলে রাহমান বলল,অনেকক্ষণ তো দিয়েছেন বোধহয়।আর দিতে হবে না।

হোসেন ভাই বলল,বর্ণ প্রেসক্রিপশনটা দাও।চলো ভাই আমি যাচ্ছি।বর্ণ এখানে থাকুক।কি না কি দরকার পড়ে।

রাহমান উঠতে উঠতে বলল,চলুন একজন।

বর্ণ বলল,হোসেন ভাই,দাঁড়ান।টাকাটা নিয়ে যান।

রাহমানের দিকে তাকিয়ে বলল,আপনিও বসুন প্লিজ।

রাহমান হেসে বলল,আমার ফি লাগবে না।

বর্ণ লজ্জা পেল কথাটা শুনে।বলল,তবুও।

-আচ্ছা,তোমার স্বার্থ ভাইয়া সুস্থ হোক।না হয় একদিন এসে চা খেয়ে যাবো।

বর্ণ বাধা দিয়ে বলল,তাহলে আজই খেয়ে যান প্লিজ।

সে রাখালের মায়ের দিকে তাকালো।রাখালের মা পা বাড়াতেই রাহমান বলল,আন্টি আজ থাক।

বর্ণের দিকে তাকিয়ে আবার বলল,আমি অবেলায় চা খাই না।

-ওকে।তাহলে একদিন কিন্তু আসতে হবে।

রাহমান মুচকি হেসে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো।

-হোসেন ভাই,আপনি দাঁড়ান।আমি টাকাটা নিয়ে আসি।

হোসেন ভাই চোখ ছলছল করে বলল,বর্ণ,স্বার্থ ভাইকে তোমার মতো আমরাও ভালোবাসি।ভাইয়ের জন্য এই খরচটুকু আমিই করতে পারবো।স্বার্থ ভাই আমাদের বড় ভালো ছেলে।

বর্ণ মনে মনে বলল,আমি স্বার্থ ভাইয়া কে ভালোবাসি নাকি?কি অদ্ভুত!

কাজকর্ম সেরে সন্ধ্যায় রাখালের মা এসে বলল,বর্ণ বাবু,আজি রাতটোতে মু ড্রইংরুমে আছি ক্যানে।

বর্ণ বই থেকে মুখ তুলে বলল,থাকলে তো ভালোই হয়।আপনার স্বার্থ বাবু যে ঘাড় ত্যাড়া।রাতে তাকে একা সামলানো দায়।

-উ সাবুটো রেইন্দেছি ক্যানে।তু একটু দিবিক টো আয়।

-আচ্ছা চলেন।

রুমে ঢুকে বর্ণ দেখলো স্বার্থ বালিশে ঠেস দিয়ে উঠে বসেছে।কয়েক ঘন্টার জ্বরে তাকে কাবু করে ফেলেছে।সাবুর বাটি সাইড টেবিলে রাখতে রাখতে বর্ণ বলল,খালা এটা দিলো।এটা খেয়ে ওষুধ খেতে হবে।

স্বার্থ একবার সে দিকে তাকিয়ে বলল,খেতে ইচ্ছা করছে না।

-না খেলে অসুস্থ সারবে না।

-ভালোই তো লাগছে জ্বর।কেমন ঘোরে ঘোরে থাকছি।

-কি যে সব বলেন।আপনার সেমিস্টার ফাইনাল চলছে।সে খেয়াল আছে?

-আর এক্সাম নেই।আজ লাস্ট ছিলো।

-সে তো ঠিক আছে।তাই বলে অসুখ পুষে রাখতে হবে?

-রাখলে দোষ কি?বেচারা অসুখেরা যার শরীরে যায়,সে ই এদের তাড়াতে ব্যস্ত।আমি না হয় কিছুদিনের জন্য আশ্রয় দিলাম।

‘পাগলের মতো উল্টোপাল্টা না বলে এটা খান তো’ বলে বর্ণ সাবুর বাটি এগিয়ে দিলো।

সাবু খেতে খেতে স্বার্থ বলল,তুমি কিছু খেয়েছো সন্ধ্যায়?

-না।খেয়ে নিবো।

একটু থেমে আবার বলল,আজ রাতে আমি এ রুমে থাকি?সমস্যা নেই,আমি সোফায় থাকব।

স্বার্থ আঁতকে উঠল,না।তুমি সোফায় থাকবে কেন?তুমি বেডে শোও,আমি সোফায় থাকছি।

বর্ণ শান্তভাবে তাকাল,শোনেন,খালা আজ রাতে ড্রয়িংরুমে থাকছে।আপনি তো আমাকে বেশি ধারে কাছে ঘেষতে দেন না।কিছু দরকার পড়লে ঝামেলা হবে।খালা থাকলে ভালো হবে।আর আমি আমার রুমে একা থাকতে পারবো আজ,ভয় করবে না।

স্বার্থ রহস্য করল,তুমি শিওর তো।

বর্ণ অগোচরে স্বার্থের কথা পুনরোক্তি করল বিকৃতভাবে,তুমি শিওর তো।

প্রকাশ্যে বলল,হ্যাঁ,শিওর।

স্বার্থ অস্পষ্ট স্বরে বলল,যাক বাবা,বাঁচা গেল।জ্বরের ঘোরে তো আমার হুশ থাকে না।কাছে থাকলে কি না কি করে বসি।

বর্ণ মুখ এগিয়ে বলল,কিছু বললেন।

স্বার্থ জবাব দিল,মানে বলছি খালা থাকুক।

‘সেই’ ড্রয়ার থেকে ওষুধগুলো বেরিয়ে বর্ণ সাইড টেবিলে রেখে বলল,প্রত্যেকটার একেকটা করে।বাটি টা দিন নিয়ে যাই।আমার পড়া আছে।পানি রইলো,ওষুধগুলো খেয়ে শুয়ে পড়ুন।

বাটি এগিয়ে দিয়ে স্বার্থ বলল,তুমি কিছু খেয়ে পড়তে বসো।

মাথা নিচু করে বর্ণ বলল,ঠিক আছে।

রাত দু’টোর সময় বর্ণ পড়া শেষ করে ভাবলো একবার স্বার্থ ভাইয়াকে দেখে আসা যাক।জ্বরটা কমছে কি না!তার নিজেরও প্রচুর ঘুম পাচ্ছে।রুম থেকে বেরিয়ে দেখলো ড্রইংরুমে রাখালের মা নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে।বাইরে এখনো মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে।শীত শীত লাগছে তার।ড্রইংরুম পেরিয়ে স্বার্থের রুমে উকি দিয়ে দেখলো লাইট জ্বলছে এখনো।অঘোরে ঘুমাচ্ছে স্বার্থ।ঠান্ডা আবহাওয়া।শীতে হাত পা এক জায়গা করে ফেলেছে বেচারা।বেডসিট পায়ের কাছে গড়াগড়ি খাচ্ছে।সে রুমে ঢুকে স্বার্থের পায়ের কাছ থেকে বেডসিট তুলে তার গায়ে দিতে গেলে স্বার্থ ঘুমের ঘোরে একটু নড়েচড়ে পাশ ফিরে আকস্মিক বর্ণের হাত ধরে টেনে পাশে শুইয়ে জড়িয়ে ধরলো।বর্ণের সারা শরীর শিহরিত হলো।সে মুচকি হেসে নিচে তাকিয়ে দেখলো স্বার্থের কোলবালিশ মেঝেতে পড়ে গেছে।সেটি তোলার জন্য বর্ণ স্বার্থের থেকে হাত ছাড়িয়ে যেই উঠতে গেলো তখনি স্বার্থ তাকে আবার চেপে ধরে সম্পূর্ণ তার গায়ের উপর দিয়ে তুলে বর্ণকে নিয়ে পাশ ফিরলো।বর্ণ চোখ বন্ধ করে ফেললো।তার হৃদয় স্পন্দন ক্রমশ বাড়ছে।তার কানের লতিতে স্বার্থের গোলাপি ঠোঁট স্পর্শ করেছে।বর্ণ ঘাড় ফিরিয়ে দেখলো ঘুমের ঘোরে স্বার্থ মিটিমিটি হাসছে।স্বার্থ আবার নড়েচড়ে বর্ণের গালের সাথে গাল মিলিয়ে বলল,”আই লাভ ইউ”।মুহূর্তের মধ্যে বর্ণের মনের শহর কেমন রঙিন হয়ে গেল!যার কারন তার জানা নেই।স্বার্থ আর তীর্থ দু’টো ভাই ছোটবেলা থেকে ঘুমের ঘোরে কথা বলে।এটা সবাই জানে।তাদের আত্মীয়।অনাত্মীয়।পরিজন।যে স্বার্থ তাকে কোনদিন স্পর্শ পর্যন্ত করে নি,আজ এই জ্বরের শরীরে ঘুমের ঘোরে তাকে জড়িয়ে ধরে আছে।ভাবতেই কেমন একটা লাগছে তার।স্বার্থ কিছুক্ষণ পর আলতো করে বর্ণের গালে চুমু দিয়ে আবার বলল,”আই লাভ ইউ এ লট।”বর্ণ এক ঝাটকায় স্বার্থের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ালো।মেঝে থেকে কোলবালিশ তুলে বিছানায় রেখে,স্বার্থের গায়ের উপর বেডসিট টেনে দিলো।তার বুকের ভিতর এখনো ধুকধুক করছে।রুমের লাইট অফ করে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল।

ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বর্ণ শহর দেখছে।সারা শহর জুড়ে আলো আঁধারের খেলা।সোডিয়াম বাতিগুলো নিষ্কলুষ আকাশের বুকে তারার ফুলকির মতো লাগছে।তার বুক এখনো মৃদু কাঁপছে।সে কম্পন কেন জানি তার ভীরু ঠোঁটে আঁচড়ে পড়ছে।তার কেবলই মনে হতে লাগলো কেমন বাজে একটা ব্যাপার হয়ে গেল।সকালে কি সে তার স্বার্থ ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারবে?হয়তো না।এসব কিছু বর্ণের কাম্য ছিলো না।

বর্ণ মুচকি হাসলো।রসুলপুরের সোনাদিয়া বিলের বুকে তীর্থ ভাইয়া আর সহস্র জোনাকির আলো মাখা একটা রাত তার কেবল মনে পড়ে।তীর্থ ছেলেটা বড্ড পাগল।সেই রাতে বর্ণকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তীর্থ প্রশ্ন করল,জোনাকির দেশে যাবি?

ঘুম ঘুম চোখে বর্ণ তাকিয়ে রইলো।তার উত্তরের অপেক্ষা না করে তীর্থ আবার বলল,’চল না’ বলে বর্ণের হাত ধরে টেনে বাড়ির মাঝ উঠানে দাঁড় করালো।সে কি মায়াময়ী জোসনা।চাঁদের তীব্র নরম আলোয় বর্ণের দু’চোখ থেকে ঘুম পালাল।আবার তার হাতে টান পড়ল।

সোনাদিয়া বিল শুরু সৌমেনদের বাড়ির দক্ষিণ হতে।বর্ষার ভরা যৌবনে এ বিল নব রুপ ধারন করে।তখন সৌমেনদের বাড়ির অর্ধেকটা সে তার নতুন পানি দিয়ে গিলে ফেলে।সৌমেনদের বিল ঘাটে তার বাবার নৌকা বাঁধা ছিলো।তার সামনে দাঁড় করিয়ে তীর্থ বলল,কি যাবি তো?

বর্ণ তীর্থের থেকে হাত ছাড়িয়ে বলল,সৌমেনকে ডেকে আনি?মজা হবে।

তীর্থ বলল,কেন?দু’জনে ভালো লাগছে না?

-সে’টা না।ও হলে আরো মজা হতো।

-এতো রাতে ওর মা ওকে ছাড়বে না।

বর্ণ গিয়ে নৌকায় বসল।তীর্থ বৈঠা খুঁজে এনে নৌকা ভাসিয়ে দিল।

বর্ণ মিহি সুরে বলল,তীর্থ ভাইয়া,তুমি নৌকা বাইতে পারো?

তীর্থ হেসে বলল,কেন পারবো না।গ্রামের ছেলে তো।দাদাজান শিখিয়েছে!

-স্বার্থ ভাইয়া বাইতে পারে?

-তোর কি মনে হয়?বলতো পারে কি’না?

বর্ণ অনেকক্ষণ ভাবল,হুম,না।পারে না।

-কারেক্ট ব্রাদার।ওকে কখনো এসব শিখতে দেওয়া হয় নি।আমরা সবাই ওকে খুব ভালোবাসি তো।ওর লেখাপড়ায় আগ্রহ বেশি বলে এসবের ধারেকাছে কখনো আনা হয় নি।

-তোমার পড়ালেখায় আগ্রহ নেই?

তীর্থ তার চিরচারিত হাসিটা দিল,না’রে।জানিস আমার পড়তে একদম ভালো লাগে না।

-শুধু ছেলেবেলার মতো আজও পাড়াসুদ্ধ ছেলেমানুষি করতে ভালো লাগে?

তীর্থ হো হো শব্দে হাসল,যেন পুরো সোনাদিয়া বিল কেঁপে উঠলো তার বিশাল হৃদয়বর্হিত হাসিতে।

-কি’রে শীত লাগে?

-একটু!

-পাগল।আমার কাছে এসে বোস।

-থাক না।

তীর্থ আবারও হেসে উঠল,বলল,লজ্জা লাগে?

বর্ণ সে কথার জবাব দিল না।

-কি আসবি না?

বর্ণ উসখুস করছিল।বলল,বড় হয়েছি তো,এখন কোলে বসার সময় আছে নাকি?

-ধুর।পাগল।ছোটই তো আছিস।আমার থেকে তো বড় হয়ে যাস নি।আমার ভাই আমার কোলে বসতে পারে না?আয় তো!

বর্ণ উঠে গিয়ে তীর্থের কোলের ভিতর বসল।

-থ্রি কোয়াটার আর টিশার্টে তোকে একদম বাচ্চা বাচ্চা লাগে!

-তোমাকে বলেছে।

-সত্যি!আচ্ছা একটা চাদর আনলে ভালো হতো না?আমারও শীত শীত লাগছে।

-হুম পালোয়ান।নিজে শীতে কাঁপছে,আমাকে আবার ডেকে কোলে বসালো।

-আরে মার্চের শুরুতে মাঝ রাতে মুদৃ শীত পড়ে বুঝি নি।তাছাড়া নৌকা বাইছি হাওয়া লাগছে তো।হিহিহিহি,দেখবি একটু পর ঘেমে গরম হয়ে যাবো।

অপূর্ব জোসনায় সোনাদিয়া বিল যেন ভেসে যাচ্ছিল।কিছুক্ষণের ভিতর বর্ণ শতসহস্র উড়ন্ত হলুদ আলো আবিষ্কার করলো।তার ছোট্ট বুকের ভিতর পুলকে রক্ত উথলে উঠলো।তীর্থের কোল থেকে উঠে গিয়ে দাঁড়িয়ে জোনাকিপোকা মুঠোবদ্ধ করতে ব্যস্ত হয়ে গেল।নৌকা দুলে উঠলো।

তীর্থ স্ববিনয়ে বলল,আরে পাগল কি করিস?নৌকা ডুবে যাবে তো।

বর্ণ চিৎকার করে উঠল,ওয়াও।থ্যাংক ইউ তীর্থ ভাইয়া।এতো জোনাকিপোকা আমি জীবনে কখনো একসঙ্গে দেখি নি।খুশিতে আমি পাগল হয়ে যাবো।

বর্ণের চিৎকারের প্রতিধ্বনি ফিরে এলো সোনাদিয়ার দক্ষিণপাড়া হতে।তীর্থ উঠে গিয়ে বর্ণের পাশে তার কাঁধ ছুঁয়ে দাঁড়ালো।একটা জোনাকিপোকা এসে বর্ণের ঠোঁটের উপর বসলো।তীর্থ ডান হাতের তর্জনী আঙ্গুল দিয়ে আলতো করে সেটা সরিয়ে দিলো।

বর্ণ ফিরে তাকিয়ে বলল,কি করলে?

-কিছু না।

-আজ সারারাত থাকবো এখানে।

-পাগল?আম্মা জানতে পারলে আমার হাড্ডি আস্ত রাখবে না।

-প্লিজ।প্লিজ।

-ওকে ভোর রাত অবধি।

সে’রাতে আকাশ ধবল হওয়ার কিছুটা সময় আগে তারা ফিরে যায়।কত ঘনিষ্ঠ সময় সে তীর্থ ভাইয়ার সাথে কাটিয়েছে,কই কখনো তো আজ রাতের মতো এমন হয় নি।কত রাত সে তীর্থ ভাইয়ার সাথে জড়াজড়ি করে ঘুমিয়েছে,কখনো তো বুকের ভিতর ধুকধুকানি উঠে নি।সেখানে দু’টি ভাইয়ের বন্ধন কাজ করলে আজ কেন সেই বন্ধন পেরিয়ে যাচ্ছে বলে তার মনে হলো।তাহলে কি!বিস্ময়ে বর্ণের চোখ বড় বড় হয়ে গেল।

আযানের আগমুহূর্তে সে বিছানায় গেল।

দশ।

কলেজে যাওয়ার পথে সাহাপাড়া মোড়ে ‘মধু টি স্টল’ পড়ে।এ পথে হেটে যাওয়ার সময় রোজ তার হৃদয় ভাইয়াকে দেখে বর্ণ।সে বাইক দাঁড় করিয়ে মধু দাদার দোকানে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকে।বর্ণ আর অনু যখন কলেজে যায়,সে রোজ তাদের পিছু যায়।বাইকের গতি মন্থর করে তাল রাখে।অনু কখনো পিছু ফিরে দেখে না।কিন্তু বর্ণ বারবার পিছু ফেরে আর মুচকি হাসে।হৃদয় তা দেখে বর্ণকে চোখের ইশারা করে যেন অনু একবার তার দিকে পিছন ফেরে।বর্ণ ছলনা করে বলে,আপু,হৃদয় ভাইয়া আজ পিছনে আসছে না!

অবাক হয়ে অনু পিছু ফেরে।হৃদয় তখন বাইকের লুকিং গ্লাসে নিজের মাথার চুল ঠিক করতে ব্যস্ত।অনু ধোকা খেয়ে বর্ণের পিঠে মৃদু আঘাত করে বলে,শয়তান।আর একদিন এমন করলে না আন্না কে বলে দিবো।

আজ বর্ণ একা ছিল।হৃদয় সরাসরি তার সামনে বাইক থামাল।বর্ণের দিকে তাকিয়ে বলল,শালাবাবু,আমার বউটি আসে নি?

বর্ণ মুচকি হেসে বলল,নাহ দুলাভাই।আপনার বউটি আজ রুশা আপুর বিয়েতে গেছে।

-রুশা কে?

-অনু আপুর বান্ধবী।

-ও মেরা শালী।তো আমার শালাবাবু যায় নি কেন?

-আপনার শালাবাবুর আজ একটা ক্লাস টেস্ট আছে।বিকালে যাবে।

-তো উঠে এসো?

-কই?

-বাইকে।

-আরে না।আমি যেতে পারবো।সামনেই তো কলেজ।

হৃদয় হাসল,যেতে যে পারবেন তা আমিও জানি শালাবাবু।তবুও উঠুন।ছেড়ে আসি।

বর্ণ বাইকে বসল।হৃদয় বলল,ধরে বসুন।আপনার দুলাভাই ইয়ং জেনারেশনের,ধীরে মোটেও চালাবে না।

বর্ণ হৃদয়ের কাঁধে হাত রাখল।

-বর্ণ,ব্যাগটা আমার কাছে দাও!আমি আমার সামনে রাখছি।

বর্ণ ব্যাগ এগিয়ে দিলে সে তার সামনে রাখে।বর্ণের হাত দু’টো নিয়ে তার পেটকে আবদ্ধ করিয়ে বলে,এভাবে ধরে বসে থাকো।

বর্ণ সেভাবেই পড়ে থাকে।হৃদয়ের পিঠে নাক পড়তেই মিষ্টি একটা গন্ধ তার মস্তিষ্কে প্রবেশ করে।মিহি মাদকতার নেশা।সে ভাবে,এতো সুন্দর একটা ছেলেকে কেন যে অনু আপু পছন্দ করে না।সে মেয়ে হলে কতই না ভালো হতো।কত আগে সে প্রেমে পড়ে যেত।কি মায়া হৃদয় ভাইয়ার চোখে-মুখে।

হৃদয়ের হাতের তুড়ি পড়াই বর্ণের ভাবনায় ছেদ পড়ল,শালাবাবু,এসে গেছি তোমার কলেজ।

বর্ণ নেমে ব্যাগটা নিয়ে হাটা দিল।হৃদয় পিছন থেকে বলল,মানুষ কি অকৃতজ্ঞ!দুলাভাইকে অন্তত একটা ধন্যবাদ তো দেওয়া যেত।

বর্ণ দাঁড়িয়ে পিছন ফিরল,নিজের লোকদের কখনো ধন্যবাদ দিতে নেই।

-তাই নাকি?শালাবাবু দেখি অনেক বড় হয়ে গেছে।

-সে তো হয়েছি।সব কিছু বড় বড় হয়ে গেছে।

হৃদয় চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে বলল,দেখি কি কি বড় হয়েছে।

-উহু,ওখানে দাঁড়ান।

-আচ্ছা দাঁড়ালাম।বর্ণ?

-কহেন দুলাভাই!

-ক্লাস টেস্টের পর একটু সময় দিতে পারবে?কিছু কথা ছিলো।আমি কলেজেই থাকছি।

বর্ণ হেসে দ্রুত ক্লাসের দিকে পা বাড়াল।

বিছানায় এসে এসব ভাবতে ভাবতে চোখটা লেগে গেছিলো।সকালে রাখালের মায়ের ডাকাডাকিতে বর্ণের ঘুমের বারোটা বাজল।শেষ রাতে ঘুমিয়ে চোখে এখনো ঘুম লেগে আছে।হাই তুলতে তুলতে বলল,খালা!আপনি যান।আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।

-জলদি উট ক্যানে।স্বার্থবাবু ডাকিনচে।

-হুম।ভাইয়াকে কিছু খেতে দিয়েছেন?

-বার্লিটো দিয়েইনচি।

-কেন ডেকেছে কিছু জানেন?

-উটো মু জানিক লাই।তু জলদিটো উট ক্যানে।

বর্ণ আর দেরি না করে ওয়াশরুমে ঢুকল।তার ভয় হতে লাগল।কি না কি কারনে ডেকেছে কে জানে।এমনিতেই মেন্টালটার মেজাজ খারাপ থাকে।এখন অসুখে পড়ে না জানি কতটা খিটেখিটে হয়েছে।গতরাতের ঘটনা কি টের পেয়েছে?পেলেই তো সর্বনাশ।হাজারটা প্রশ্ন করবে!কেন আমি অতো রাতে রুমে গিয়েছিলাম?কি দরকার ছিলো?

রুমে ঢুকে বর্ণ জিজ্ঞাসা করল,ভাইয়া ডেকেছেন?

স্বার্থ সোফায় বসে পত্রিকা দেখছিল।মুখ তুলে বলল,শরীরটা দুর্বল লাগছে।তোমার ক্লাস তো আজ বিকালে।জেনিথ কে একটু পড়িয়ে দিয়ে আসতে পারবে।

বর্ণ মাথা নাড়াল।

স্বার্থ বলল,না মানে….!জেনিথ তোমাকে বেশ পছন্দ করে।মনে হয় না পড়াতে সমস্যা হবে।

বর্ণ মাথা নিচু রাখা অবস্থায় বলল,আচ্ছা ঠিক আছে।

স্বার্থ বর্ণের দিকে তাকাল,আমার দিকে তাকাও,খালা স্যান্ডুইচ করে রেখেছে।খেয়ে তারপর যাও।

বর্ণ বেরনোর আগ মুহূর্তে প্রশ্ন করল,স্বার্থ ভাইয়া,সকালে ওষুধ খেয়েছেন?

স্বার্থ চোখের ইশারায় বুঝাল খেয়েছে।

হেমন্তের ফুরফুরে হাওয়া বইছিল।বড্ড ভালো লাগছিল বর্ণের।এর আগে এখানে কখনো আসে নি সে।রাইয়ের ভাটা নদীর পাশে একটা বিশাল বট বৃক্ষের ছায়ায় শান বাঁধানো ঘাটে বসে আছে সে আর হৃদয়।ভরদুপুরে নদীর ঘাটে লোকের আনাগোনা কম।হৃদয় শার্টের বোতাম খুলে দিল।শার্টের নিচের সাদা স্যান্ডো গেঞ্জিতে ঢাকা হৃদয়ের সুগঠন শরীর চোখে পড়ল বর্ণের।

হৃদয় হেসে বলল,ডোন্ট মাইন্ড শালাবাবু।গরম লাগছে খুব।তাই..।

-ইট’স ওকে।

কিছুক্ষণ নীরব থেকে বর্ণ নিঃশ্বাস ফেলল,হৃদয় ভাইয়া,কি কথা ছিলো বললেন যে!

-ওহ,হ্যা।তাই তো।আচ্ছা তোমার আন্না আমাকে পছন্দ করেন না কেন?

-আপনার বাবার সাথে রাজনৈতিক মনমালিন্য তো লেগেই থাকে।হয়তো তাই!

হৃদয় গলা পরিষ্কার করল,আচ্ছা বর্ণ,অনু আমাকে কেন পছন্দ করে না?

বর্ণ ঢোঁক গিলল।সে ভেবেছিলো তার কথা কিছু বলবে।বলল,আপু তো পছন্দ করে,আন্নার ভয়ে হয়তো অমন করে।

-নাহ,আমি বুঝতে পারি।কেউ ভালোবাসলে তার চোখ দেখে বোঝা যায়,না ভালোবাসলেও বোঝা যায়।ওর চোখে আমার জন্য ঘৃণা দেখেছি।

বর্ণ হো হো শব্দে হেসে উঠল।বলল,আপনি একটু গুন্ডা টাইপের তো।তাই হয়তো।

হৃদয় নীরব সুরে বলল,অনু কি অন্য কাউকে ভালোবাসে?

-নাহ তো।

-অনুর সবটা হয়তো তুমি জানো না।

-অসম্ভব!অনু আপু আমাকে সবটাই শেয়ার করে।

হৃদয় উদাস দৃষ্টিতে বটবৃক্ষের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,আমাকে কেউ ভালোবাসে না।

-এভাবে বলছেন কেন?

-ছোটবেলায় মা মরলো।বাবা আবার বিয়ে করল।অর্থ সম্পদের অভাব নাই,কিন্তু ভালোবাসা জুটলো না কপালে।সৎমা চোখে দেখতে পারে না,বাইরে থেকে থেকে আমি নষ্ট হয়ে গেছি।

বর্ণ হৃদয়ের হাটুতে হাত রেখে বলল,কেউ ভালো বাসুক আর নাই বাসুক,আমি আপনাকে অবশ্য ভালোবাসি।

হৃদয় বাম হাত দিয়ে বর্ণের গাল ছুঁয়ে বলল,থ্যাংক ইউ শালাবাবু।অন্তত পৃথিবীতে কেউ তো একজন আমাকে ভালোবাসে বললো।

অভিমানে তার চোখ ছলছল করছে।বলল,চলো উঠি বর্ণ।

বর্ণ উঠতে উঠতে সান্ত্বনা দিল,হৃদয় ভাইয়া,দেখবেন একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।

হৃদয় শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে বলল,কি জানি!আমার জীবনে কোনদিন কিছু ঠিক হবে না।

বর্ণ পা বাড়াল,জানি,অভিমানে এসব বলছেন।কিন্তু দেখবেন সত্যি একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।

জেনিথের কথায় বর্ণ বাস্তবে এলো।

মোবাইলের ভাইব্রেটে ঘুম ভেঙ্গে গেল স্বার্থের।তীর্থ কল করেছে।ধরতে ইচ্ছা করছে না তার।জ্বর বাধিয়েছে জানলে গ্রামে যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি শুরু করবে।তবুও ধরতে তো হবে।

-কি’রে এতো দিন পর?

তীর্থ হেসে বলল,তুই তো খবর নিবি না,তাই বাধ্য হয়ে আমাকে নিতে হয়।

-তো কেমন আছিস সবাই তোরা?

-সবাই ভালো আছে।ঐ আমার শুধু একটু জ্বর।তুই কেমন আছিস?

-জ্বর বাধালি কিভাবে?

তীর্থ আবার হাসল,কি জানি,বুঝতেছি না।তুই ঠিক আছিস তো।জানিসই তো তুই অসুস্থ হলে আমিও অসুস্থ হই।

স্বার্থ বলল,আরে না।আমি একদম পারফেক্ট আছি।শোন,ডাক্তারের কাছে যা।

-জো হুকুম মহারাজ স্বার্থ।

স্বার্থ বিরক্তি প্রকাশ করল,উফস,সবকিছুতে তোর ফাজলামি।ঐ আম্মার সাথে অনেকদিন কথা বলি না।আম্মা কোথায়?

-আম্মা তো বাকরখালী গেছে।আমি আর অনু জোড়াদিঘি পাড়ে বসে আছি।

-হঠাৎ আম্মা মামাবাড়ি গেলো যে?সব ঠিক আছে?

-আর বলিস না,বড় মামা আর ছোট মামা নাকি কি সব ঝামেলা বাধিয়েছে,তাই আম্মাকে ডেকে পাঠিয়েছে বড় মামী।নানা-নানী বেঁচে নেই,এখন যত ঝামেলা আম্মার।

-ফিরবে কখন?

-আজ বোধয় ফিরবে না।কাল ফিরলে কল করবো তখন কথা বলিস।

-হুম।অনু কেমন আছে?

-আছে ভালোই।ওহ,বর্ণ কোথায়?অনু একটু কথা বলবে ওর সাথে!

স্বার্থ মোবাইল কান থেকে নামিয়ে ডাকল,খালা!বর্ণ জেনিথ কে পড়িয়ে ফিরেছে?

রাখালের মা কিচেন থেকে উত্তর দিল,উ তো উর রুমটোতে আনচে!

-একটু আমার রুমে পাঠিয়ে দাও।

আবার ফোন কানে নিয়ে বলল,দাদাজানের শরীর ঠিক আছে?

তীর্থ সেই পরিচিত হাসি হেসে বলল,হ্যা।বুড়ো টা বেশ আছে।

-শোভা কেমন আছে?তুই যাস এখন ধীরেন কাকাদের বাড়ি?

-শোভাকে নিয়ে ধীরেন কাকা তো ভারত চলে গেছে।

-কি বলিস?কবে গেলো?

-এই তো মাসখানেক হবে?

-আমাকে বললি না যে?

-স্যরি ভাই!আসলে এমনিতেই বলে উঠা হয় নি।

স্বার্থের কেন জানি মন খারাপ হয়ে গেলো।বর্ণকে দেখে বলল,এই নে,বর্ণের সাথে কথা বল।

বর্ণকে মোবাইল দেওয়ার আগে বলল,আমার জ্বর হয়েছে তীর্থ কে বলো না যেন।

বর্ণ মোবাইল নিল,কেমন আছো তীর্থ ভাইয়া?

তীর্থ টিপ্পনী কেটে বলল,কি’রে অনু বলল তুই নাকি বেশ বড় হয়ে গেছিস?আর আমার স্বার্থটাকে জ্বালাচ্ছিস না’তো?

স্বার্থের কথা বলতেই বর্ণ মোবাইল নিয়ে রুম ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এলো।

রসুলপুর থেকে সোনাদিয়া বিলের ওপার বরাবর দক্ষিণপাড়ায় স্বার্থদের প্রাথমিক স্কুল ছিলো।সোনাদিয়া বিলের জল কখনো রসুলপুর কিংবা দক্ষিণপাড়ার মানুষ শুকাতে দেখেনি।নৌকা যোগে বিলের বুক চিরে দুই গ্রামের মানুষ যোগাযোগ রক্ষা করতো।তীর্থ সব সময় নৌকা যোগে স্কুলে যাওয়া আসা করলেও স্বার্থ রায়গঞ্জের কলেজ মোড়ের ভিতর দিয়ে হেটে আসা যাওয়া করতো।নওলকিশোর বয়সে শোভাকে তার সত্যি ভালো লাগতো।রোজ শোভার সাথে হেটে হেটে স্কুলে যাওয়ার জন্য বাকখালি থেকে শোভাকে নিয়ে রায়গঞ্জের ভিতর দিয়ে দক্ষিণপাড়ায় পৌঁচ্ছাতো।কত সুন্দর ছিলো সেই প্রথম কামহীন ভালোলাগা।

একদিন স্কুলে শোভা স্বার্থ দাদা বলে কেঁদে পড়লো।অনেক জিজ্ঞাসার পর যখন জানতে পারলো ক্লাসের শরৎ শোভার বিনুনি ধরে টান মেরেছে,তখন স্বার্থ রেগে শরতকে সে কি মার।শরতের পাল্টা আঘাতে স্বার্থের নাক কেটে গলগল করে রক্ত পড়া দেখে তীর্থ এগিয়ে শরতকে এলোপাথাড়ি ঘুষিতে বেহুশ করে দিলো।শোভার কি কাঁন্না তার স্বার্থ দাদার জন্য।

শেষে শরতের চিকিৎসার ভার নিতে হয়েছিলো স্বার্থের বাবা রমজান চৌধুরীর।সেদিন রাত দশটা অবধি তীর্থের কোন খোঁজখবর ছিলো না।বাবার ভয়ে সে গৃহমুখী হয় নি।শেষে স্বার্থ ও তার দাদীজান মিলে সারা পাড়া খুঁজে ঘোষ বাড়ি নবীন ঘোষের ছেলে অনন্তের কাছে গিয়ে পেয়েছিলো।অতোটুকু বয়সেও ভাইয়ের প্রতি তার অগাধ টান জন্মেছিল।

আরেকদিন স্কুলে শোভা হঠাৎ এসে স্বার্থকে বলল,আমাকে বিয়ে করবে স্বার্থ দাদা?

স্বার্থ অবাক হয়ে বলল,ধুর পাগলি।আমরা তো ছোট।এই বয়সে কেউ বিয়ে করে?

শোভা মন খারাপ করে বলল,তাহলে শরৎ যে বলল ও নাকি একদিন আমাকে বিয়ে করবে।

-যখন করবে,তখন দেখা যাবে।ওর আগে আমিই তোকে বিয়ে করবো।

শোভা একগাল হেসে স্বার্থের পাশে বসে বলল,ঠিক করবে তো?ভুলে যাবে না’তো আবার?

স্বার্থ শোভার মাথায় হাত রেখে বলল,তোর মাথা ছুয়ে বললাম,ঠিক করবো।

সেদিনের সেই কামহীন আবেগে কোন পাপ ছিলো না,ছলনার রঙ ছিলো না।ছিলো দু’টি শিশু মনের সরলতা।প্রাথমিকের গন্ডি পেরিয়ে যখন রায়গঞ্জের মাধ্যমিকে আসা হলো,তখন শোভা,স্বার্থ দু’জনের বয়ঃসন্ধি চক্রকাল।শোভার ভালোলাগা,প্রথম কৈশোরের কামাবেগ স্বার্থকে ঘিরে বেড়ে চললো।স্বার্থের চাওয়াপাওয়া বদলে গেল।শোভাকে তুই থেকে তুমিতে,আর শোভা স্বার্থ কে তুমি থেকে আপনিতে বদলে নিলো।তীর্থ হয়ে উঠল গ্রামের সেরা দূরন্ত।

সেই শোভা কেমন বড় হয়ে গেল।বাবা মেয়ের সংসারে কর্ত্রী হয়ে গেল।এখন সুদূর কোন গ্রামে বা কোন শহরে নিজের নিপুণতার রঙ ছাড়াচ্ছে।আর হয়তো কোনদিন দেখা হবে না।শোভাকে তার বলা হবে না,শোভা,আমি তোমাকে ভালোবাসতে পারবো না,তোমাকে বিয়ে করতে পারব না।আমাকে ক্ষমা করে দিও তুমি।ধর্মের থেকে আমার মনের বাধা যে অনেক বড়।তোমাকে আমি সুখী করতে পারবো না,শোভা।তুমি বরং শরতকে বিয়ে করো।

কিছুক্ষণের মাঝে দরজায় ঢোকা পড়ল।বর্ণ দরজায় দাঁড়িয়ে বলল,স্বার্থ ভাইয়া!জ্বর একটু কমেছে নাকি?

-হুম।

-তাহলে গোসলটা করে নিন।

-হুম।

বর্ণ ঠোঁট বাঁকিয়ে মনে মনে বলল,হুম হুম করছে কেন?মেন্টালটা সত্যি সত্যি পাগল হয়ে গেল না’তো!

(ষষ্ঠ পর্ব)

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>> 

বিঃদ্রঃ তোমার একটিমাত্র জীবন যদি প্রেমহীন থেকে যায়,শর্তহীন দলিলে যদি কোন বিবাদীর নাম লেখা না থাকে,অনাবিষ্কৃত ভালোলাগা যদি তোমার ঠোঁটের আঙ্গিনায় বিরহ না জাগায়,একটিমাত্র জীবনে তুমি যদি কলঙ্ক এর সুখই না পেলে-তবে তুমি…!তবে তুমি আমার গল্প পড়ো না।

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>> 

এগারো।

স্বার্থ সুস্থ হতে সপ্তাহখানেক চলে গেল।জ্বরে ভুগে শরীরটা রোগাটে হয়ে গেছে তার।জেনিথকে পড়ানো কাজটা এ ক’দিন বর্ণকেই করতে হয়েছে।আধবেলা নিজের পড়া পড়ে সে বাকি সময়ে স্বার্থের টিউশনি সামলেছে।বিকালে স্বার্থ গায়ে শার্ট চাপিয়ে বের হওয়ার আগে বলল,আজ একটু ভালো লাগছে,মানবকে পড়িয়ে আসি!

বর্ণ ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে পড়ছিল।না তাকিয়ে বলল,আজ না গেলে হতো না?আমিই না হয় করিয়ে আসি।

স্বার্থ বলল,না থাক।ভালো লাগছে তো।খালা কি চলে গেছে?

-হুম।

বর্ণ মুখ তুলে আবার বলল,আচ্ছা তবে যান।জেনিথকে আমি পড়িয়ে আসবো আমার পড়াটা কম্পিলিট হলে।

স্বার্থ সোফায় বর্ণের পাশে বসে জুতা চাপালো,তোমার কিছু লাগবে?

বর্ণ কিছুক্ষণ ভেবে বলল,নাহ।আমার কিছু লাগবে না।আপনি সাবধানে যেয়েন।

স্বার্থ বেরিয়ে গেলে বর্ণ মনে মনে বলল,কি ব্যাপার মেন্টালটা ভালো হয়ে গেলো নাকি?

তারপর ‘কি জানি’ বলে কাঁধ নাড়িয়ে পড়ায় মন দিল।

রশিদ চাচা পান খাওয়া লাল দাঁত বের করে বলল,স্বার্থ আব্বা,ভাল আছ?জ্বর কমচে নি?

স্বার্থ মুখে শুকনো হাসি টানল,কমেছে চাচা।আপনি ভালো আছেন?

রশিদ চাচা একটা দীর্ঘশাস ছাড়ল,এই বয়সে আর ভালা!আজ দু’দিন সকাল বিকাল ডিউটি করতে করতে আমি শ্যাষ।

স্বার্থ অবাক হয়ে বলল,দু’বেলা ডিউটি করছেন কেন?হোসেন ভাই কোথায়?

-ক্যান তুমি কিছু জানো না আব্বা?গতপরশু হোসেনের পঙ্গু ছেলেটা ম্যানহোলে পড়ে মারা গেছে।

স্বার্থ যেন নির্বাক হয়ে গেল।এই তো দশদিন আগেই হোসেন ভাইয়ের পঙ্গু ছেলেটাকে সে টাকা দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।কি নিষ্পাপ হাসি তার।সরল দু’টি চোখ।অভিমানহীন।অভিযোগহীন।

রশিদ চাচা কে সে জিজ্ঞাসা করল,হোসেন ভাই কোথায় থাকে জানেন?

রশিদ চাচা পানের পিক ফেলল,ফুলতলি বস্তিতে গিয়ে মোবারক হোসেন নাম বললেই দেখিয়ে দিবে।

তখন সন্ধ্যা।মানবকে পড়িয়ে ফেরবার পথে স্বার্থ ফুলতলি বস্তিতে গেল।জেনিথের মমকে ফোন দিয়ে বলে দিল,জেনিথকে পড়ানো শেষ হলে বর্ণকে সে যেন তার ফ্ল্যাটে রেখে দেয়।

কাচাঁপাকা নিচু একটা ঘর।মাটির মেঝেতে পাটি ফেলে সবে খেতে বসেছে হোসেন ভাই।স্বার্থকে দেখে হন্তদন্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল,স্বার্থ ভাই,কিভাবে এলে,তোমার জ্বর কমেছে?

হোসেন ভাইয়ের অল্পবয়সী বউটা তড়িঘড়ি ঘোমটা টেনে উঠে একপাশে সরে দাঁড়াল।পুরো ঘরটাই একবার চোখ বুলিয়ে নিল স্বার্থ।এতটুকু ঘরে মালপত্রে বোজায়।ছেলে দু’টো অঘোরে ঘুমাচ্ছে।হোসেন জলচৌকি টেনে দিয়ে বলল,বসো,স্বার্থ ভাই।

স্বার্থ বসল।বলল,হোসেন ভাই,রশিদ চাচার কাছে রহিমের খবরটা শুনে আমার এতো খারাপ লাগল।কিভাবে হলো এসব।

হোসেন স্বার্থের হাত ধরে কেঁদে বলল,তুমি কত ভালোবাসতে আমার ছেলেটাকে।কি করে যে কি হয়ে গেল।পঙ্গু ছেলেটা আমার কাছে দু’টো টাকা চাইতে গিয়ে ম্যানহোলে পড়ে আর উঠার সাধ্য হলো না।

স্বার্থ তার হাত মুঠো করে ধরে সান্ত্বনা দিল,হোসেন ভাই,মৃত্যুর উপর তো কারোর হাত থাকে না।যে যাবার গেছে,বাকি যে দু’জন আছে,ওদের কথাও তো চিন্তা করতে হবে।

হোসেন নিশ্চল চোখে চেয়ে রইল।তারপর বলল,গরীবের ঘরে এসেছো ভাই।রাতে দু’টো ডালে ভাতে খেয়ে যাও।তোমার ভাবি রোজ তোমাকে বাসায় আনার কথা বলতো,দুঃখের মাঝে তো আজ এসেই পড়েছো।

-আজ থাক হোসেন ভাই।বর্ণকে একা রেখে এসেছি।আপনি তো জানেন,ও প্রচুর ভীতু।

হোসেন বলল,তাহলে আর কি বলি বলো তো।বর্ণ কে সাথে নিয়ে আরেকটা দিন এসো কিন্তু।

স্বার্থ মাথা নাড়ল।এতক্ষণে কোণে চুপ করে বসে থাকা মহিলাটির দিকে তাকাল,ভাবী আজ তাহলে আসি।

মহিলাটি আস্তে করে মাথা নাড়াল।স্বার্থ বের হওয়ার সময় মহিলাটির মৃদুকন্ঠ কাঁন্নার সুর শুনতে পেল।এ ক’দিন ছেলের শোকে কেঁদেকেটে বোধহয় বেচারী বড় দুর্বল হয়ে পড়েছে।

জেনিথদের সদর দরজায় টোকা পড়ার আগেই বর্ণ দরজা খুলে দিলো।যেন অপেক্ষায় ছিল।জেসিকা এগিয়ে এলো,স্বার্থ ভিতরে এসো ভাই?

স্বার্থ বলল,না।এখন থাক।বর্ণের পড়া আছে।রুমে যেতে হবে।

-কাঁচা লঙ্কা,পেঁয়াজ দিয়ে মুড়ি মেখেছিলাম দু’ভাইবোনে।তুমিও ক’টা খেয়ে যাও।

স্বার্থ বর্ণের দিকে তাকিয়ে বলল,না আপু আমার এসিডিটি আছে।বর্ণ ফ্ল্যাটের চাবি দাও,আর খাওয়া শেষ করে রুমে এসো।

বর্ণ চাবি দিলে স্বার্থ সিঁড়ি বেয়ে চলে গেল।

‘শোনো,ওয়াশরুমে ঢুকে আগে ব্রাশ করবে!তারপর পড়তে বসবে।’ রুমে ঢুকে কথাটা শুনে বর্ণ থমকে দাঁড়াল।

-স্বার্থ ভাইয়া,রাতে খাওয়ার আগে তো ব্রাশ করি।আজও করে নিবো।

স্বার্থ বিশ্রী সুরে ধমকাল,তোরে যা বলেছি,তাই করবি।তোকে কাঁচা পেয়াজ দিয়ে মুড়ি মাখা কে খেতে বলেছে?

বর্ণ কেঁপে উঠল।এতো দিনে যতই ধমকাধমকি করুক।স্বার্থ কখনো বর্ণকে তুইতোকারি করে নি।আজ কি হলো এমন।বর্ণ কোন কথা না বলে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।

বর্ণের পড়া শেষ করতে করতে রাত এগারোটা বেজে গেল।স্বার্থ বলল,ডিনার দিবো?

বর্ণ একবার আড়চোখে তাকাল।কিছু বলল না।

-আমি ডিনার রেডি করছি,ডাইনিংয়ে এসো।

স্বার্থ বেরিয়ে গেলে বর্ণ উঠে দ্রুত সোফা থেকে স্বার্থের মোবাইলটা নিলো।এতদিনে লুকিয়ে চুরিয়ে সে লকটা শিখে ফেলেছে।

তীর্থ ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলল,কি’রে স্বার্থ?এতরাতে কল করতে গেলি কেন?

বর্ণ বিরক্তি নিয়ে বলল,আমি স্বার্থ না।বর্ণ।

-তুই?দিলি তো ঘুমের বারোটা বাজিয়ে।কি হয়েছে?

-শোনো,তীর্থ ভাইয়া!অনু আপুকে বলো,সে যেন আন্নাকে ম্যানেজ করে।আমি আর তোমার মেন্টাল ভাইয়ের কাছে থাকবো না।

তীর্থ ধমক দিয়ে বলল,ঐ তুই স্বার্থকে মেন্টাল বলছিস কেন?কি করেছে আমার ভাই?

-সারা দিন-রাত খিটখিট করতে থাকে।আমার ভালো লাগে না।ধ্যাত!

-অকারনে নিশ্চয় খিটখিট করে না।তুই কি করিস তাই বল?

-আজব!আমি আবার কি করি?

-তুই কিছু না করলে ও অমন করে?আমার ভাইকে আমি চিনি না?

-কচু চেনো।আস্ত একটা মেন্টাল।

তীর্থ আবার ধমকালো,ঐ ফোন রাখ।আমি কাল স্বার্থকে ফোন করে বলবো ও যেন আরো কড়া শাসনে রাখে।ফাজিল।

বর্ণ মন খারাপ করে বলল,তুমিও এমন করলে।

-একদম ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল নয়।মেরে তক্তা করবো।আচ্ছা যা,স্বার্থকে বলবো তোকে যেন আর ধমকাধমকি না করে।

‘তোমাকে কিছু করতে হবে না’ রেগে কল কেটে দিল বর্ণ।

ডাইনিং থেকে আওয়াজ এল,কই বর্ণ,খেতে এসো।

‘আসছি’ বলে বর্ণ তাড়াতাড়ি ডায়েল নাম্বার মুছে ফেলে পা বাড়াল।

স্বার্থ জিজ্ঞাসা করল,রুমে কার সাথে বকবক করছিলে?

বর্ণ ঢোঁক গিলল,কই না তো।কারোর সাথে না।এমনি ভাইভার প্র্যাকটিস করছিলাম।

স্বার্থ প্লেটে ভাত তুলতে তুলতে বলল,ভাইভার কথা বলতে মনে পড়ল!কাল একবার আমার সাথে যাবে?

-কোথায়?

-আমাদের ভার্সিটিতে।বলো তো কি?শরীরটা এখনো ভালো মতো ঠিক হয় নি।কাল আমার একটা প্র্যাকটিক্যাল এক্সাম আছে।তুমি সাথে গেলে ভালো হতো।

বর্ণ মনে মনে বলল,হুহু,বীরপুরুষ।মুখে বলল,আচ্ছা ভাইয়া।

-কাল তোমার কোন গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস নেই তো।

-এখন তো সব ক্লাসই ইম্পরট্যান্ট।সমস্যা নাই।আমি ম্যানেজ করে নিবো।সৃজনের থেকে নোট নিয়ে নিবো।

সৃজনের কথা বলে বর্ণ জিভ কামড়ে ধরলো।এখন প্রশ্ন আসবে,সৃজন কে?তোমার সাথে তার কি?অসহ্য!

প্রশ্ন এলো না।স্বার্থ বলল,সৃজন!ঐ যে মুসলমান একটা মেয়ের সাথে প্রেম করে?একদিন তোমাকে নামিয়ে দিয়ে গেল?

বর্ণ খাচ্ছিল।পরবর্তী ধমকের জন্য প্রস্তুতি নিয়ে চোখ বন্ধ করে বলল,হ্যা।

স্বার্থ বলল,আচ্ছা।ওকে তুমি খাও,এই যে ক্লাসে দুধ রেখে গেলাম।

বর্ণ বলল,আপনি খাবেন না?

-আসলে শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে।খেতে ভালো লাগছে না।তুমি খাও,আমি শোবার আগে কিছু খেয়ে নিবো।

রুমে ফিরে এসে বর্ণ দেখল,স্বার্থ কোলের উপর ল্যাপটপ রেখে বালিশে ঠেস দিয়ে বসে কি যেন করছে।বর্ণকে দেখে উঠতে গেল।

বর্ণ বলল,অভয় দিলে একটা কথা বলি?

-বলো।

বর্ণ ঢোঁক গিলে বলল,এই সাত-আট দিন তো আপনি অসুস্থ ছিলেন বলে খালা ড্রয়িংরুমে ছিলো।আপনি আপনার রুমে শুয়েছেন।আমার অসুবিধা হয় নি।আজ তো খালা নেই।আপনি এখানেই শুবেন।

স্বার্থ বলল,হুম,তো?

-না মানে আপনি তো আমাকে সোফায় শুতে দিবেন না।তাছাড়া আপনি তো সম্পূর্ণ সুস্থ হন নি।বেডেই শোন না আমার সাথে!

কথাটা বলেই বর্ণ বুঝতে পারলো তার হৃদকম্পন বেড়ে গেছে।শুধু ধমকের অপেক্ষা।

স্বার্থ জবাব দিলো না কোন।বর্ণ পরবর্তী কথার ভরসা পেয়ে বলল,সমস্যা নেই তো।মাঝে কোলবালিশ দিয়ে রাখবো!শুবেন,প্লিজ?

স্বার্থ পুনরায় বিছানায় বসতে বসতে বলল,আচ্ছা ঠিক আছে।তাহলে তুমি ঘুমাও আমি কালকের এক্সামের কাজটা সেরে শুয়ে পড়বো।

বর্ণ কোলবালিশটা মাঝে দিয়ে স্বার্থের উল্টো দিকে মুখ করে শুয়ে পড়ল।

বারো।

ভার্সিটিতে ঢুকেই বর্ণকে ত্রিশার কাছে বসিয়ে রেখে কই হাওয়া হয়ে গেল স্বার্থ।এই পর্যন্ত চার কাপ কফি খাইয়ে ফেলেছে ত্রিশা।বর্ণের প্রচন্ড বিরক্তবোধ হচ্ছে।বারবার এদিকে ওদিকে তাকাচ্ছে ক্যাফেটেরিয়াতে বসে।ত্রিশা বলল,তুমি কিন্তু খুব স্মার্ট বর্ণ।

বর্ণ একটু ফিকে হাসল,থ্যাংক ইউ ত্রিশা আপু।

-আরে অস্থির হচ্ছো কেন?চলে আসবে স্বার্থ।

-আসলে আপু,স্বার্থ ভাইয়া একটু অসুস্থ তো।তাই টেনশন হচ্ছে।

-তুমি টেনশন নিও না।মৌন আছে ওর সাথে।আসলে কি বলো তো,এক্সামটা দুপুর দু’টোয় হওয়ার কথা ছিলো।কি এক কারনে এগারোটায় ফেলেছে,তাই স্বার্থ এসেই তাড়াহুড়ো করে চলে গেছে।

বর্ণ ত্রিশার দিকে তাকাল,আপনি এক্সাম দেন নি?

ত্রিশা হেসে বলল,হুম দিয়েছি তো।আমার সিরিয়ালটা আগে ছিলো,তাই শেষ হয়ে গেছে।

-একটা বাজতে চললো,এখনো ভাইয়ারা এলো না।

ত্রিশা ক্যাফের সদরে চোখ দিয়ে বলল,ঐ তো ওরা চলে এসেছে।

বর্ণ যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।

ত্রিশা বলল,আসলে তবে?স্বার্থ,তোমার কাজিন তো স্বার্থ ভাইয়া!স্বার্থ ভাইয়া! করে আমার মাথা খারাপ করে দিচ্ছে।নাও ভাইকে সামলাও।

মৌন চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল,আমাদের ছোটভাই তো স্মার্ট,হ্যান্ডসাম আছে।তোমার কয়েকটা বান্ধবীর সাথে লাইন লাগিয়ে দিতে।

ত্রিশা মৌনকে সমর্থন দিল,সে তো আছেই।কার ভাই দেখতে হবে না?আমাদের স্বার্থের!তবে আমার বান্ধবী মানে তো ওর বড়,তাই আর রিস্ক নিলাম না।

বর্ণ নিচু হয়ে মুচকি হাসছিল।স্বার্থ সেদিকে একবার তাকিয়ে বলল,মৌন,তোরা ফাজলামি রাখ।কি খাবি বল?তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে হবে?

মৌন বলল,ক্যাফে থেকে কিছু খাওয়ার মধ্যে নেই মামু।তোমার পিছু বহুত পরিশ্রম গেছে।আজ বাইরে লাঞ্চ করাতে হবে।

স্বার্থ একটা হাত উঠিয়ে মৌনকে আঘাত করতে গিয়েও ফিরিয়ে আনল,নে মারলাম না।ছেড়ে দিলাম।ছোট ভাইব্রাদারের সামনে লজ্জা দিবো না।

সে বর্ণের দিকে চেয়ে পুনরায় বলল,ওকে যা আজ চাইনিজ খাওয়াবো।তবে আরো একটু পরিশ্রম করতে হবে তোকে?

মৌন ভাব নিয়ে বলল,ডু ইউ ওয়ান্ট অ্যানি হেল্প ফ্রম মি?ঐ কোন মেয়েকে পছন্দ হয়েছে?পটিয়ে প্রেম করিয়ে দিতে হবে?

এবার ত্রিশা আর বর্ণের মুচকি হাসির দিকে চেয়ে স্বার্থ বলল,ঐ ফাজিল,মেয়ে পটাতে তোকে লাগবে কেন?আমি কি আনস্মার্ট নাকি অসুন্দর?

মৌন ডান হাতের দু’আঙ্গুলে প্রশংসাবৃত্ত ধরে বলল,ইউ আর জোশ দোস্ত!আমি ছেলে হয়েও তোর প্রতি ক্রাশ।আর মেয়ে হলে তো কথায় ছিলো না,জোর করে তোর সাথে প্রেম করতাম।

ত্রিশা কটাক্ষ রাগে তাকাল।মৌন নিজেকে আড়াল করে বলল,আই অ্যাম জাস্ট কিডিং ইয়ার।

তারপর বলল,বল দোস্ত,কি করতে হবে?আজ্ঞা হোক জমিদারনাতি শাহজাদা চৌধুরী সাইমুন ইসলাম স্বার্থ!

স্বার্থ অবাক হলো,এই প্রথম তুই আমার পুরো নাম বললি।বাই দ্যা ওয়ে,ফাজলামি রাখ।পরিশ্রমটা আমার জন্য করতে হবে না,বর্ণের জন্য!

মৌন তড়িঘড়ি হয়ে উঠল,ছোটভাইয়ের জন্য?নো চিন্তা জনাব!জান দিয়ে দিবো।একবার বলে দেখ তো,কি করতে হবে।

স্বার্থ বিরক্ত হলো,বেশি কথা বলিস।জান দিতে হবে না।আমাদের ঢাবির অ্যাডমিশন ফর্ম ছাড়ছে?

মৌন কিছুক্ষণ ভেবে বলল,না!তবে সামনের মাসের পহেলা সপ্তাহের ভিতর ছাড়বে।কেন?

-আমার শরীরটা তো বেশি ভালো যাচ্ছে না।ঢাকার বাইরে কোন ভার্সিটিতে বর্ণকে পরীক্ষা দেওয়াবো না।

ত্রিশা ভ্রু কুচকাল,কেন?বর্ণের এতো ভালো রেজাল্ট।তারপর ওর নিজেরও তো কোন চয়েসেবল ভার্সিটি থাকতে পারে।

-আরে তুমি বুঝচ্ছ না।বর্ণ একা যেতে পারবে না তো।ওকে আনা নেওয়া করবে কে বলো তো?

ত্রিশা বলল,মৌন করবে না হয়।

স্বার্থ মাথা নাড়াল,না,না,মৌন তুই ঢাকার ভিতরের ভার্সিটির ফর্মগুলো একটু তুলে দে ভাই।এটুকু করলেই হবে।

মৌন বাধা দিল,কিন্তু স্বার্থ,আমি বলছি না চান্স পাবে না।কিন্তু ভাগ্য বলে তো একটা কথা আছে।

-বেশি বুঝিস না।চান্স না পেলে না পাবে।দরকার পড়লে প্রাইভেটে পড়াবো।

ত্রিশা বাধ সাধল,তুমি আরেকবার ভেবে দেখো স্বার্থ?

-সিদ্ধান্ত এটাই।

মৌন ইশারা করল,ত্রিশা তুমি চুপ করো।ও যখন চাইছে না।ওকে স্বার্থ,আমি বর্ণকে আমাদের ভার্সিটির,জবি আর জাবির যোগ্য ইউনিটগুলোর ফর্ম তুলে দিবো।আমাকে বর্ণের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিস।

স্বার্থ উঠতে উঠতে বলল,জাবিরটা লাগবে না।ওখানে প্রচুর হ্যারাজমেন্ট হয়।ঢাবি আর জবি হলেই চলবে।

তারপর বলল,ওকে চল তাহলে তোদের চাইনিজ আবদার মেটায়।

ফুড প্লাজার একটা দোকানে ঢুকতে মেইন রোড ক্রসিংয়ে মৌন বলল,ছোটভাই হাত দাও।বলা তো যায় না।

বর্ণ একবার স্বার্থের দিকে তাকাল।মৌন বলল,ও কি বলবে?

স্বার্থ বলল,তোকে ওর হাত ধরতে হবে না।তুই ত্রিশাকে সামলা।

ত্রিশা ফোড়ন কাটল,শোনো স্বার্থ,আমি এখানকার মেয়ে।এসব রোড ক্রসিংয়ে আমার ছোটবেলা থেকে অভ্যাস।

মৌন বলল,তাহলে ত্রিশা হাত ধরো বর্ণের।

স্বার্থ এগিয়ে এসে বলল,কারোর হাত ধরার দরকার নেই।ও নিজে পার হতে পারবে।এখানে থাকবে যখন শিখতে হবে ওকে।

মৌন খেঁকিয়ে উঠল,তো তুই হাতে ধরে শেখা না।ধর,তুই ওর হাতটা ধর।

বর্ণ দ্রুত পায়ে রোড পার হয়ে গেল।মৌন বিব্রত হল,স্বার্থ,তুই দিন দিন সাইকো হয়ে যাচ্ছিস।

স্বার্থ পা বাড়িয়ে বলল,হলে হচ্ছি।বেশি কথা না বলে আয় তো।

মিনিট পাঁচেক পরে স্বার্থ ফিরে এসে বলল,অর্ডার দিয়ে এলাম।এখুনি খাবার চলে আসবে।

মৌন জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটে বলল,ইয়াম্মি,মামু,ইউ আর গ্রেট।

ত্রিশা বলল,মৌন,তুমি কিন্তু দিন দিন পেটুক হয়ে যাচ্ছো।আমার বাবার অতো টাকা নেই,ভাই।জামাই আদরে ভু্ঁড়িভোজ চলবে না।

মৌন অট্টহাসি দিয়ে বলল,আমি জানি আমার শ্বশুর অতো কিপ্টা না তার মেয়ের মতো।

ত্রিশা রেগে গেল,কি?আমি কিপ্টা!ঐ হারামি দাঁড়া তোর হচ্ছে।

মৌন টেবিল থেকে উঠে দৌড় দিল।ত্রিশা ছুটল তার পিছু।স্বার্থ মৃদু হেসে বর্ণের দিকে তাকিয়ে বলল,দেখলে পাগল দু’টোর কাজ?একটুও বনিবনা হয় না।সারাজীবন সংসার করবে কিভাবে,আল্লাহ জানে!

বর্ণ মুখ নাড়াল,মনে মনে বলল,হাসলে মেন্টালটাকে কত সুন্দর দেখায়,অথচ সারাক্ষণ কেমন মুখ গম্ভীর করে রাখে।ভাল্লাগেনা!

হঠাৎ কোথা থেকে স্নিগ্ধা এসে বলল,স্বার্থ,রুবেল কে দেখেছ?

স্বার্থ কপাল কুচকাল,মানে কি?আমি কি তার গার্লফ্রেন্ড নাকি বয়ফ্রেন্ড?গার্লফ্রেন্ড তো তুমি।ওর খোঁজ আমার চেয়ে বেটার তুমি জানো।

স্নিগ্ধা একটা চেয়ার টেনে বসতে বসতে বলল,জানি না বলেই তো তোমার কাছে আসলাম।

স্বার্থের চোখ গেল ফুড প্লাজার দ্বিতীয় তলায়।সেদিকে চেয়ে বলল,নাটক করছো কেন?রুবেল তো ঐ যে।

স্নিগ্ধা বলল,ও তাই তো।

স্নিগ্ধার কথায় কর্ণপাত না করে স্বার্থ জোরেশোরে মৌনকে ডাকল,মৌন,তোরা দু’টোতে কি শুরু করলি,বল তো?

স্নিগ্ধা হঠাৎ স্বার্থের একটা হাতে ধরল,স্বার্থ তোমার ফোন নাম্বারটা দিবে?আমার ভীষণ দরকার।

স্বার্থ একবার বাঁ হাতের দিকে তাকিয়ে,আবার সামনে বসা বর্ণের দিকে তাকাল।বর্ণ দ্রুত উঠে ফুড প্লাজার সদর দরজায় গিয়ে দাঁড়াল।

স্বার্থ ঝাড়া দিয়ে স্নিগ্ধার হাত সরিয়ে উঠে দাঁড়াল,আর ইউ মেন্টাল?দরকার হলে অবশ্যই বলবে,তবে সিনক্রিয়েট করার তো কিছু নেই।তুমি এসো আমি তোমার সাথে পরে কথা বলছি।

মৌন এগিয়ে এসে বলল,কি হয়েছে রে স্বার্থ?

ত্রিশা স্নিগ্ধার দিকে তাকাল,এ্যানিথিং রং?কি হয়েছে স্নিগ্ধা?

স্নিগ্ধা কোন কথার জবাব না দিয়ে পাশ কেটে বেরিয়ে গেল।

মৌন স্বার্থের কাধে হাত রাখল,কি’রে বর্ণ কই?

স্বার্থ মৌনের দিকে তাকাল,তোরা বোস আমি আসছি।এই যে খাবার চলে এসেছে।খেতে শুরু কর।

স্বার্থ চলে গেলে ত্রিশা বলল,কি হলো কিছুই তো বুঝলাম না।

‘কি ব্যাপার তুমি চলে এলে কেন?’ স্বার্থ বর্ণের পিছনে গিয়ে দাঁড়াল।

বর্ণ সেভাবে দাঁড়িয়ে থেকে বলল,এমনি!

-এমনি মানে?

-বললাম তো এমনি।আমি বাসায় যাবো,ভালো লাগছে না।

স্বার্থ বর্ণের সামনে গিয়ে অবাক হয়ে গেল,তুমি কাঁদছো কেন?

বর্ণ চোখ মুছে বলল,কই কাঁদছি?

-তোমার কি আমাকে অন্ধ,বোবা মনে হয়?চোখ দিয়ে পানি পড়ছে,কেঁপে কেঁপে উঠছো।আর বলছো কই কাঁদছি।কি হয়েছে?

বর্ণ রাগী চোখে তাকিয়ে বলল,ঐ মেয়েটা তোমার হাত ধরলো কেন?

স্বার্থ চাপা হাসল,সো হোয়াট?ও আমার ক্লাসমেট।হাতটা ধরতেই তো পারে!

‘ধরবে কেন?’ বর্ণ রাগে ফুঁসছিল।

‘ছোট থেকে দেখে এলাম তীর্থের ভাগ তুমি কাউকে দিতে চাইতে না।এখন দেখি আবার আমি?তুমি এমন একটা কাজিন আছো জানলে তো আমার ঘরে বউ থাকবে না,’স্বার্থ সামান্য মজা করল।

তারপর রুমাল এগিয়ে দিয়ে বলল,চোখ মুছো।মৌন আর ত্রিশা দেখলে ক্ষেপাবে।চলো,খাবার এসে গেছে।

স্বার্থের থেকে রুমাল নিয়ে বর্ণ তাকে অনুসরন করলো।

এভাবে চেনা মানুষের প্রতি বুকের মাঝে অজানা এক অনামিক অধিকারবোধ।অনুভূতির অপ্রকাশ।মানে।অভিমানে কেটে গেল বেশ কয়েকটা দিন।

স্বার্থ ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে বলল,বর্ণ,আর পড়তে হবে না।অনেক রাত হয়ে গেল।এতো রাত জাগলে সকালে এক্সাম দিতে পারবে না।

বর্ণ বইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,আচ্ছা।

স্বার্থ বিছানা ঠিক করে কোলবালিশ মাঝে রাখল।নিজের পাশে পালঙ্কে ঠেস দিয়ে বসে বলল,একটু শোনো!

বর্ণ ওয়াশরুমে যাচ্ছিল।ফিরে তাকাল,কি হয়েছে বলুন?

স্বার্থ বলল,সেদিন তোমাকে চোখের পানি মুছতে আমার প্রিয় নীল রুমালটা দিলাম।তুমি কি সেটা নিজের করে ফেললে?

বর্ণ জিভ কাটল,এই যা,সেটা তো সেদিনই হারিয়ে ফেলেছি।

-যাকগে।আমি এমনিতেই নিজের ইউজ করা কিছু কাউকে দেই না।তুমি কাঁদছিলে বলে দিয়েছিলাম।

বর্ণ দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়াল,ইহ,আসছে আমার বড়লোক।

স্বার্থ ভ্রু নাচাল,কিছু বললে?

বর্ণ যেতে যেতে বলল,না,কিছু বলি নি।

স্বার্থ জোরেশোরে বলল,চুরি করে আবার যেন নিজের কাছে রেখে দিও না।জানো তো,অন্যের রুমাল নিলে ঝগড়া বাধে কিন্তু।

বর্ণ গজগজ করল,বেশি বোঝে।তার সাথে যেন আমার মধুর সম্পর্ক।মেন্টাল একটা।

বর্ণ ফিরে এসে জিজ্ঞাসা করল,কালের ঢাবির ঘ ইউনিটের এক্সাম কি বুয়েটে পড়েছে।

স্বার্থ উপন্যাস পড়ছিল।মুখের উপর থেকে বই নামাল,হ্যাঁ,কেন?

-না।এমনি।মৌন ভাইয়া,ত্রিশা আপু থাকবে তো?

-ওদের থাকতে হবে কেন?আমাকে ভরসা পাও না?

বর্ণ মনে মনে বলল,ভরসা?ভয়ে বাঁচি না।

মুখে বলল,সেটা না।সবাই থাকলে আমার ভালো লাগবে!

স্বার্থ ভাবল কিছুটা।তারপর চোখ বন্ধ করে বলল,ওকে,আমি বলে রাখছি।অবশ্য তুমি ভালো করে জানো,ওরা আসবে।

-আপনাকে বলেছে!আমি কিভাবে জানবো?

-সত্যিই তুমি জানো না?তুমি তো মৌনের ন্যাওটা।আর ত্রিশা তো ছোটভাই ছোটভাই বলে মুখে তিতা তুলে ফেলে।

বর্ণ কপাল কুচকাল,হিংসুটে কোথাকার!

স্বার্থ সাইড টেবিলে বইটা রেখে শুতে শুতে বলল,মনে মনে কি যে সব বলো।কথাটা কি আমি ভুল বলেছি?তোমার তো দেখি পৃথিবীর সবার সাথে খাতির,শুধু আমি তোমার চোখের বালি।

বর্ণ বিদ্রুপ করল,ইশরে!আমি যেন আপনার চোখের মনি।সারাদিন তো রাখেন ধমকের উপর।খাবারের চেয়ে আমার আপনার ধমক খেয়ে পেট ভরে বেশি।

স্বার্থ টেবিলল্যাম্প অফ করে বলল,হয়েছে!কত যে ঝগড়া করতে পারো!এসে ঘুমাও,সকালে তাড়াতাড়ি উঠতে হবে।ঢাকা শহরের জ্যাম তো জানো।

বর্ণ ধড়ফড় করে পালঙ্কে উঠল।স্বার্থ বলল,আস্তে ছোটভাই,ভেঙ্গে গেলে আর কিনবো না।ফ্লোরে শুতে হবে তখন।

বর্ণ শুয়ে উল্টো দিকে মুখ করে অস্পষ্ট স্বরে বলল,হুম,যেন তার টাকায় কেনা।

স্বার্থ বেডসিট দিয়ে মুখ ঢেকে বলল,শুনেছি কিন্তু।বুঝলাম তোমার মামাজানের টাকায় কেনা।তোমার নানাজান-মামাজান তো সাবেকি জমিদার।কিন্তু ব্রাদার,কোন কিছুর অপচয় কি ভালো?

বর্ণ বলল,আমার কিন্তু মাথা ধরেছে।

‘কি’রে ভাই আপনি দেখেশুনে চালাতে পারছেন না?’স্বার্থ রিকশাচালকে সাবধান করলো।

রিকশাচালক পিছন ফিরে বলল,ভাইজান,এইহানের রাস্তা বহুত খারাপ আছে।হাবধানে বয়েন।

স্বার্থ সম্মতি দিল,আচ্ছা,তবুও আপনি একটু দেখেশুনে চালান।

বর্ণ পাশে বসে গজগজ করছিল,কি দাম রে বাবা।রিকশার ধাক্কায় গায়ে উপরে একটু পড়ছি বলে কত ভাব।এক্কেবারে মেন্টাল।

স্বার্থ আরো একটু নিজের দিকে সরে বসে দূরত্ব মেইনটেইন করল,তোমার বন্ধু সৃজনের সিট কোথায় পড়েছে?

বর্ণ অস্পষ্টে আওড়ালো,স্পর্শ লাগলে যেন তার সুন্দর চামড়া ক্ষয়ে যাবে।বাপ রে বাপ।

তারপর আড়চোখে স্বার্থের দিকে তাকিয়ে বলল,আশেপাশের কোন একটা সরকারি কলেজে পড়েছে বলল,কলেজটার নাম মনে নেই।

স্বার্থ বিড়বিড় করল,বাঁচা গেল।

স্বার্থের স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়া দেখে বর্ণ হাসল,ওর সিট আমার সেন্টারে পড়লে আপনার কি খুব অসুবিধা হয়ে যেতো।

স্বার্থ ছাড়া ছাড়া স্বরে বলল,নাহ,আমার অসুবিধা হবে কেন?কি যে সব বলো পাগলের মতো।

‘এহ,আসছে আমাকে পাগল বলতে,নিজে তো বদ্ধ পাগল’ বর্ণ মুখে হাত চাপা দিলো।

মৌন আর ত্রিশাকে সেন্টারের বাইরে বসিয়ে রেখে স্বার্থ এখানে এসেছে।নামাজ সে খুব কম পড়ে,তবুও স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস তার অগাধ।ভোররাতে খেয়ে রোজা রেখেছে।সকালে নামাজ পড়ে তড়িঘড়ি করে নাস্তা তৈরি করেছে।খালা অতো সকালে এসে পারবে না।তারপর বর্ণকে সব বলে রেডি করিয়েছে।

মসজিদের ওযুখানা থেকে ওযু করে এসে সে নফল নামাজের জন্য দাঁড়াল।

তার মা সব সময় বলতো,আল্লাহর কাছে মন থেকে কিছু চাইলে তিনি কখনো বান্দাকে নিরাশ করেন না।ছোটবেলায় যখন তার বা তীর্থের অসুখ করতো,তার মা সব সময় নামাজ শেষে সৃষ্টিকর্তার কাছে তাদের জন্য দোয়া করতো।উপরওয়ালা তার মায়ের কথা শুনতেন।তাহলে আজ তিনি কেন স্বার্থের কথা শুনবেন না।

নামাজ শেষে স্বার্থ মোনাজাত ধরল,হে আল্লাহ!আমি জীবনে তোমার কাছে কোনদিন কিছু চাইনি।চাইতে হয় নি।না চাইতেই তুমি অনেক কিছু দিয়েছো।প্রাক্তন জমিদারী বংশের ধনসম্পদ,আভিজাত্য,রুপ নিয়ে বড় হয়েছি।সব তোমার মহিমায়।আজ প্রথম এবং শেষবার একটা জিনিস চাইবো তোমার কাছে।প্লিজ!তুমি না করো না আল্লাহ।প্লিজ!প্লিজ।তুমি বর্ণের পরীক্ষাটা ভালো করে দাও।ও যেন ঢাবিতে চান্স পায়।ওর সকল মনের বাসনা পূরণ করো।ও যেন সব সময় ভালো থাকে।আমি আমার নিজের জন্য কিছু চাই না।প্লিজ আল্লাহ!

স্বার্থের দু’চোখ বেয়ে পানির ফোঁটাগুলো দু’হাতের উপর পড়ছিলো।সে মোনাজাত শেষ করে উঠে দাঁড়াল।মসজিদের খাদেম সাহেব তার কাছে এসে বলল,বাবা!অনেকক্ষণ থেকে লক্ষ্য করছি,নামাজ শেষে তুমি মোনাজাতে কাঁদছো!বিড়বিড় করছো।তাছাড়া এখন তো কোন নামাজের ওয়াক্ত না।তাহলে?

স্বার্থ দু’হাত দিয়ে চোখ মুছল।তার কেন জানি লজ্জা লাগছে।লোকটা কি মনে করলো কে জানে।এতো বড় একটা ছেলে কাঁদছে,সেটা আবার কেউ মনযোগ দিয়ে দেখছে,কেমন অস্বস্তিকর ব্যাপারটা।

স্বার্থ মৃদু হেসে বলল,আসলে চাচা,আমার ভাইটার আজকে ঢাবিতে ভর্তি পরীক্ষা তাই দু’রাকাত নফল নামাজ পড়লাম।

খাদেম সাহেব স্বার্থের গায়ে হাত বুলিয়ে দিল,আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখো,তিনি কখনো কাউকে নিরাশ করেন না।

স্বার্থ খাদেম সাহেবের পা ছু্ঁয়ে সালাম করে বলল,আপনি দোয়া করবেন চাচা।আমার ভাইটার ইচ্ছাটা যেন পূরণ হয়।

খাদেম সাহেব হাসল,বাবা,তুমি ভাইটাকে খুব ভালোবাসো বুঝতে পারছি।অবশ্যই দোয়া করি তিনি তোমাদের মনের সকল স্বপ্ন পূরণ করুন।

স্বার্থ পা বাড়াল বাইরের পথে,আসসালামু আলাইকুম,চাচা।আসি।

শরীফ ভাইয়া কত ভরসা করে বর্ণকে তার কাছে রেখে গেছে।বর্ণের কোন একটা ব্যবস্থা না হলে কেমন ভারমনা লাগছে স্বার্থের।পুরো ঢাকা শহরে বর্ণের একমাত্র গার্ডিয়ান সে।বর্ণের সকল আবদার,অধিকার তো তার কাছে।স্বার্থ জানে সে একটু রাগী,বদমেজাজি।তবুও বর্ণের ব্যাপায়গুলোই সে যেন একটু বেশি খেয়ালি,অধিকারভুক্ত,এবং মনচোরা প্রকৃতির।এসব ভাবতে ভাবতে স্বার্থ হাটছিল।মৌন ধাক্কা দিয়ে বলল,কি’রে কই গিয়েছিলি?কখন থেকে খু্ঁজছি!বর্ণের বেরোনোর সময় হয়ে এলো।

স্বার্থ এড়িয়ে গেল,একটু সামনে গিয়েছিলাম।জানিস তো,ভিড় একদম ভালো লাগে না।

মৌন রহস্য করল,সে তো বুঝলাম।কিন্তু তোর কাজিন বেরিয়ে তোকে না দেখতে পেলে আমাদের দিয়ে তার হবে?হাজার হোক আমরা তো তার রক্তের কেউ না।

স্বার্থ মৌনের গলা টিপে ধরল,শালা,ফাজলামি রাখ।আমি মরছি আমার জ্বালায়।টেনশনে আমার…।

সম্পূর্ণ কথা শেষ না করে স্বার্থ আবার বলল,ত্রিশা কই গেলো আবার?

মৌন ফোঁড়ন কাটল,সে তো আরেক চিজ।গেটের কাছে গেছে তার ছোটভাইকে কোলে করে আনতে।যেন তিনি দুধের বাচ্চা।ভাবলাম আমার শ্বশুরের কোন ছেলে নেই,জামাই হয়ে আমি সব পাবো।তা না এই বর্ণ ঠিক শালা হয়ে জুটে গেল।

স্বার্থ কটাক্ষ চোখে তাকাল,শালা,তুই সত্যিই এবার আমার হাতে মার খাবি।

মৌন নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,আরে থাম,ঐ যে এসে গেছে রাজপুত্র-রাজকন্যা।

স্বার্থ চোখ-মুখ গভীর করে বলল,এক্সাম কেমন হয়েছে বর্ণ।

উত্তরটা শোনার জন্য তৃষ্ণায় যেন তার গলাটা শুকিয়ে গেল।বর্ণ সেদিকে কর্ণপাত করলো না।

আকস্মিক মৌনকে জড়িয়ে ধরল,মৌন ভাইয়া,ফাটাফাটি এক্সাম হয়েছে।চান্স পেয়ে যাবো, ইনশাল্লাহ।

স্বার্থ ছলছল চোখে উল্টো দিকে মুখ ঘুরিয়ে মনে মনে বলল,আলহামদুলিল্লাহ।থ্যাংকস গড।

মৌন নিজেকে ছাড়িয়ে নিল,আরে শালাবাবু,ছাড়ো,সামনে কে দাঁড়ানো দেখেছো?আমার ধড়ে মাথা থাকবে না।

ত্রিশা মৌনকে চড় বসিয়ে দিল,ঐ শালাবাবু কি?মৌন দিন দিন তোমার বাঁদরামি বাড়ছে কিন্তু।

মৌন উল্টো হয়ে ফিরে থাকা স্বার্থকে জড়িয়ে ধরল,আজিব!বর্ণ কে তুমি ছোটভাই বলো।তাহলে ও আমার কি হলো?

স্বার্থ নিজেকে ছাড়িয়ে মিহির সুরে বলল,তোরা কিছু খেয়ে নিবি চল,দু’টোয় আবার ওর এক্সাম আছে।

মৌন আর ত্রিশা মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।

বর্ণ মনে মনে বলল,মেন্টালটার আবার কি হলো?

(সপ্তম পর্ব)

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>> 

বিঃদ্রঃ তোমার একটিমাত্র জীবন যদি প্রেমহীন থেকে যায়,শর্তহীন দলিলে যদি কোন বিবাদীর নাম লেখা না থাকে,অনাবিষ্কৃত ভালোলাগা যদি তোমার ঠোঁটের আঙ্গিনায় বিরহ না জাগায়,একটিমাত্র জীবনে তুমি যদি কলঙ্ক এর সুখই না পেলে-তবে তুমি…!তবে তুমি আমার গল্প পড়ো না।

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>> 

তেরো।

রসুলপুর বাজারে নেমে সোজা চালের আড়তে চলে গেল স্বার্থ।

বিশাল বড় আড়ত।কর্মচারী প্রচুর।রমজান চৌধুরী ছেলেকে জড়িয়ে ধরে রাখলেন অনেকক্ষণ।বললেন,আব্বু আপনি এতো শুকিয়ে গেছেন কেন?ঢাকা শহরে থেকে খাওয়াদাওয়া করেন না একদম।

সহজ।সরল।সদা হাসিখুশি।রসিক রমজান চৌধুরী।সন্তানস্নেহ কাতর এই পিতা সংসারে স্বার্থকে ভালোবাসেন সবচেয়ে বেশি।তিনি স্বার্থের ছোটবেলা থেকে স্বার্থকে সস্নেহে আপনি সম্বোধনে কথা পাড়েন।বুঝ বয়সে প্রথম প্রথম স্বার্থের লজ্জা লাগতো।এখন সহজাত স্বভাবে পেয়ে গেছে বিষয়টা।সে এখন বাবার এই ‘আপনি’ সম্বোধনটার বড় বেশি অভাব অনুভব করে ব্যস্তনগরীতে।

স্বার্থ বাবার বন্ধনমুক্ত হয়ে বলল,আব্বাজান!আপনি কি সব বললেন?বসে,শুয়ে খেতে খেতে পেট বেড়ে গেছে দেখেন।

তিনি বললেন,আচ্ছা হয়েছে।আমি তীর্থকে ফোন করছি,ও এসে আপনাদের নিয়ে যাবে।

তারপর হাসিমুখে বর্ণের দিকে এগিয়ে গেলেন।বর্ণ নিচু হয়ে সালাম করল,কেমন আছেন মামাজান?

তিনি বললেন,বেশ বড় হয়ে গেছিস বর্ণ!তোকে তো চেনায় যাচ্ছে না।

স্বার্থ টিপ্পনী কাটল,আব্বাজান!ও খালি শরীরে নয়,সবকিছুতেই বড় হয়ে গেছে।

বর্ণ একটা চাপা হাসি হাসল।তিনি বললেন,যা তোরা ভিতরে ফ্যানের নিচে গিয়ে বোস।

স্বার্থ কাঁধ থেকে ব্যাগ রাখল,আব্বাজান,আমি একটু শরতের দোকান থেকে আসছি।

-শরতকে আপনি কই পাবেন?তারা সকলে তো ভারত চলে গেছে মাসখানেক আগে।

‘ওহ’ বলে স্বার্থ আড়তের বাইরে এসে দাঁড়াল।বর্ণ কিছুক্ষণ স্বার্থের দিকে তাকিয়ে ভিতর ঘরে ঢুকে গেল।

‘আব্বু কোথাও গেলে ছাতাটা নিয়ে যান,তীর্থ এলে খবর দিবো।’

স্বার্থ বলল,আব্বাজান,তীর্থ কে বলবেন যেন গাড়ি না আনে।আমরা ভ্যানে করে যাবো।

রমজান চৌধুরী বললেন,গাড়ি থাকতে ভ্যানে যাবেন কেন?

স্বার্থ বাবাকে জড়িয়ে ধরল,আব্বাজান,আপনি তো জানেন ওসব আমার ভালো লাগে না।

তারপর বাবার থেকে ছাতা নিয়ে স্বার্থ বাজারের দক্ষিণে পা বাড়াল।

শেষবার আট মাস আগে এসেছিল।তখনও রসুলপুর বাজারে এতো দোকানপাট ছিলো না।কয়েক মাসে বেশ কয়েকটা দোকান হয়েছে নতুন।নবীন ঘোষের ‘অনন্ত ঘোষ ডেয়ারি’ তে অনন্তকে পাওয়া গেলো না।

সুমন্ত বলল,দাদা তো বাকরখালি গেছে একটা কাজে!তুমি বসো,স্বার্থ দাদা।

স্বার্থ দোকানের দরজায় দাঁড়িয়েছিলো।বলল,অনন্ত এলে আমার কথা বলিস।বিকেলে একবার আমাদের বাড়িতে যেতে বলিস।

সুমন্ত এগিয়ে এসে মাথা নাড়াল,বসো না,দাদা।মিষ্টি খাও!

স্বার্থ সুমন্তের চুলে হাত দিয়ে ঝাঁকাল,কি’রে বেশ বড় হয়ে গেছিস!ঠিকঠাক স্কুলে যাস?

সুমন্ত লজ্জা পেল,দাদা!আমি তো স্কুলে না,কলেজে পড়ি।

‘বলিস কি?এতো বড় হয়ে গেছিস?’স্বার্থ বেরিয়ে আসতে আসতে জিজ্ঞাসা করল,কাকিমা ভালো আছে?

রসুলপুর দু’পাড়ায় বিভক্ত।দক্ষিণপাড়া।উত্তরপাড়া।

স্বার্থদের উত্তরপাড়ায় হিন্দুদের বসতি বেশি।আগে এ’পাড়াকে হিন্দুপাড়া বলা হতো।দক্ষিণপাড়া।যেখানে স্বার্থের প্রাইমারি সময়গুলো কেটেছে।সেখানে মুসলমান বেশি।

উত্তরপাড়ার সবচেয়ে বড় কালিপূজা হতো নবীন ঘোষের বাড়িতে।নবীন কাকা এ গাঁয়ের সচ্ছল গৃহস্থের একজন ছিল।একমাত্র মেয়ের চিন্তায় অনিয়ম করে কি এক রোগ বাসা বাঁধলো তার শরীরে।চিকিৎসার টাকা যোগাতে জমিজমা সব গেল।নবীন কাকাও গেল।এখন সংসার বাইবার হাল অনন্তদের এই একটিমাত্র দোকান।

শেষবার কালীপূজার সময় ঘটে যাওয়া ভয়ংকর অতীত এখনো স্বার্থের মনে পড়ে।ক্লাস সেভেন কি এইট হবে!পূজায় মদ খেয়ে স্বার্থ একেবারে গুলিয়ে গেছে।অনন্তের বিধবা বোনটির ঘরের কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

ভিতর থেকে একটা পুরুষের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।নেশাগ্রস্ত হয়ে পুরুষটির স্বর স্বার্থের খেয়ালে এলো না।

-রমিজ দা,চলো,আজ রাতে পালিয়ে যায়।

-কিসব বলো তুমি অতসী?আমি বয়াতী মানুষ,তোমাকে নিয়ে কই যাবো?

অতসী কাতর হলো।কন্ঠে মিনতির সুর,তাহলে বিয়ে করো আমাকে?

রমিজ বয়াতী হুংকার দিয়ে উঠলো,বেজাতির মেয়ে বাপজানে মেনে নিবে না।তাছাড়া আমায় দিয়ে সংসার হবে না।

-শোয়ার সময় মনে ছিলো না আমি বেজাতির মেয়ে?

রমিজ বয়াতী অতসীকে একটা ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে এসে স্বার্থকে দেখে থমকে দাঁড়াল।স্বার্থের পা টলছে তখনও।ঝাপসা চোখে চেয়ে বলল,কে?

রমিজ সে কথার জবাব না দিয়ে দ্রুত পা চালাল।

ঘরে ঢুকে এক কান্ড বাধালো স্বার্থ।সরাসরি অতসীদির পায়ে পড়ল স্বার্থ,টেনে টেনে বলল,আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই অতসী দি।তুমি খুব সুন্দর!আমাদের শোভা রাণীর থেকেও সুন্দর।

অতসী প্রশ্ন করল,শোভা রাণী কে গো ছোটো খোকা?

স্বার্থ বন্ধচোখ খুলে বলল,আমি তো ছোট খোকা নই,নই তো।

অতসী কিছুক্ষণ স্বার্থের দিকে তাকিয়ে রইল,মেজো খোকা।তার যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না।স্বার্থ এতো শান্ত।নিরীহ।একটা ছেলে কি’না শেষে মদ খেলো।সে অতসীদির মুখের দিকে চেয়ে বলল,ঐ যে আমাদের সাথে পড়ে!চেনো না বুঝি?ধীরেন ডাক্তারের মেয়ে।

-তুই ও কে ভালোবাসিস মেজো খোকা?

-নাহ!না।আমি কাউকে ভালোবাসি না,আমাকেও কেউ একটু ভালোবাসে না।

অতসী মেঝে থেকে উঠিয়ে স্বার্থকে খাটে বসালো।অতসীর ছোটভাই সুমন্ত অপরপাশে ঘুমিয়ে।অতসী ধীরে বলল,আমাকে গহনা কিনে দিতে পারবি?আমার এতো গহনা চাই।

স্বার্থ দু’হাত উঠিয়ে থেমে থেমে বলল,এতো গহনা?হুম,দেবো।

-তোর অতো টাকা আছে?গহনা কিনবি কি দিয়ে মেজো খোকা?

-টাকা তো আব্বাজান দিবে!

-বিয়ে করবি তুই!টাকা কেন কাকাবাবু দিবে?

‘তাহলে আমি রোজকার করে কিনে দেবো’ বলে দড়াম করে বিছানায় পড়ে গেলো স্বার্থ।

অতসী অনন্তকে ডেকে বলল,কি’রে ওকে ছাইপাঁশ খাইয়েছে কেন,আর তীর্থ কোথায়?

অনন্ত বলল,তীর্থ তো আসে নি এবার।আর দিদি,ওকে কেউ এসব খাওয়ায় নি।ও নিজে জোর করে খেলে আমরা কি করবো!

অতসী বিরক্ত হয়ে বলল,যা তো আমার চোখের সামনে থেকে।শোন,এ বাড়িতে সবাই ব্যস্ত।একমাত্র তোর কোন কাজ নেই।তেঁতুলজল গুলিয়ে নিয়ে আয় ওকে বমি করাতে হবে।

অনন্ত তেঁতুলজল আনলে অতসী জোর করে স্বার্থকে খাইয়ে দিতেই অতসীর গা ভরে বমি করে দিল সে।

অতসী উঠে দাঁড়াল,শোন অনো,ওকে তোর ঘরে নিয়ে শুইয়ে দিয়ে আয়।মাঝরাতে আমার আবার স্নান করতে হবে।

ভোরবেলা অনন্তদের বাড়িতে কেউ জাগার আগে স্বার্থ ঘর ছেড়ে বের হল।অনন্তদের বাড়ির পূর্ব কোল ঘেঁষে রহিম বয়াতির বাড়ি।তার বিরাট পুকুর।পুকুরপাড় থেকে নিমের ডাল ভেঙ্গে স্বার্থ দক্ষিণপাড়ে শান বাঁধানো ঘাটে বসতেই বুকটা কেঁপে উঠল তার।ঘাটের সিঁড়িতে অতসীদির সাদা কাপড় পড়ে রয়েছে।

পুকুর থেকে অতসীদির লাশ তুলতে তুলতে দুপুর গড়িয়ে গেল।সোনালী পেড়ে লাল জামদানি শাড়ি।গা ভর্তি গহনা।হাতে শাঁকা।জলে ধোয়া সিঁদুর তার সারা কপাল জুড়ে।গলায় ভাঙ্গা মাটির কলসি ঝুলছে।

খবর পেয়ে দূরগাঁয়ে বায়না করতে যাওয়া রমিজ বয়াতী ফিরে এলো,শেষে কি’না আমাদের পুকুরে এসে মরতে হলো?

রহিম বয়াতী ছেলেকে ইশারা করলেন।

স্বার্থের মনে গতরাতের আবছায়া কিছু ঘটনা মনে আসছিল।সে জন্য তড়িঘড়ি করে এ’বাড়ি ছাড়তে চেয়েছিল সবার অগোচরে।এখন শুধু মনে হতে লাগল,গতরাতের নেশায় আজেবাজে কি বলায় হয়তো অতসীদি এমন করলো।রমিজ বয়াতীর কথাটা তার নেশাগ্রস্ত মস্তিষ্ক ধরে রাখতে পারে নি।বাড়ি ফিরে টানা তিন দিন বমি হলো তার।কিছু খেলে পেটে সইতো না স্বার্থের।কি ভয়ংকর অবস্থা!

পথে যেতে যেতে তীর্থ জানালো,শরৎ ভারতে গিয়ে শোভাকে বিয়ে করেছে।

স্বার্থের মনে শোভার ব্যাপারে জমা মেঘ যেন কেটে গেল।

স্বার্থ জিজ্ঞাসা করল,তুই জানলি কিভাবে?

তীর্থ বলল,বিয়ের পরদিন শরৎ ফোন করেছিল।

‘ওহ’ বলে স্বার্থ আবার বলল,আজ অতসীদির কথা খুব মনে পড়ছে।

তীর্থ স্বার্থের একটা হাত ধরল,ভাই,আবারও?তুই তো জানিস অতসীদি কেন অাত্মহত্যা করেছিল।রমিজ বয়াতী তো তার শাস্তিও পেয়েছে।

স্বার্থ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,তবুও সে’দিন কেন যে অমন করলাম।

ভ্যানে বসেই তীর্থ স্বার্থকে জড়িয়ে ধরে বলল,ভাই,এমন মন খারাপ করে থাকলে আম্মা ভাববে আমি তোকে কি না কি বলেছি,শেষে আমাকে দৌড়ানি দিবে।

রসুলপুর বাজার হতে গ্রামের সরু মাটির পথ দিয়ে ভ্যানগাড়ি করে ওরা যাচ্ছিল।হেমন্তের হালকা বাতাস বইছে।রাস্তার দু’ধারের জমিতে রবিশস্যে তুলতে লোক ব্যস্ত।বর্ণ ভ্যানের পিছনে বসে তাদের পিছু ছুটে চলা দেখছে।

তীর্থ সামনে থেকে বলল,বর্ণ,এগিয়ে এসে বোস।পড়ে গেলে তোর নানু,মামীজান,আমাকে আস্ত রাখবে না।

স্বার্থ আড়চোখে তাকাল বর্ণের দিকে,বলে কোন লাভ নাই,ওনার যা খুশি হবে,উনি তাই করবে।এখন তো ঢাবিতে চান্স পেয়ে আকাশে উড়ছে।

বর্ণ অস্বস্তি চোখে স্বার্থের দিকে তাকাল।

তীর্থ বলল,কি’রে স্বার্থ,তুই এখানে এসেও ওর পিছু লাগছিস?

স্বার্থ জবাব দিল,তুই পিছে লাগাটাই দেখলি?এই পাঁচ মাসে ওকে কি ভদ্র-সভ্য করে ফেলেছি দেখলি না?

তীর্থ পিছনে ফিরে তাকাল,কি’রে বর্ণ,তুই ভদ্র হয়ে গেছিস?

বর্ণ আড়চোখে স্বার্থের দিকে তাকিয়ে বলল,তীর্থ ভাইয়া,চুপ থাকো তো!তোমার কাছে আমার বহুত নালিশ আছে।

তীর্থ স্বার্থের দিকে ইশারা করল,কার বিরুদ্ধে বর্ণ?আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে?

বর্ণ দূরে উড়ন্ত একটা পাখির দিকে তাকিয়ে বলল,জানি না।

রসুলপুরের বড় বাড়ি।বিশাল সাবেকি দু’তলা জমিদার বাড়ি।জমিদারি প্রথা এখন না থাকলেও স্বার্থের প্রো-পিতামহের রেখে যাওয়া বিশাল অট্টলিকা এখনো বিরাজমান।এই বড় বাড়ির অনেক পুরানো অংশ নতুন করে ঠিক করা হয়েছে।আধুনিক আসবাবপত্রে ঘর ভরেছে।শয়নকক্ষে জোড়া বাথরুম উঠেছে।কিছু কিছু জমিদারি চিহ্ন অবশ্য আছে।একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায় নি।বলা চলে,স্বার্থের দাদাজান হতে দেন নি।রসুলপুরের অনেক পরিবার এখনো স্বার্থদের গৃহ-জমিতে কাজ করে সংসার চালাই স্বাচ্ছন্দ্যে।গ্রামের সকল মানুষ আজও স্বার্থদের ভালোবাসে,সম্মান করে এবং সমীহ করে চলে।এ যুগে এসেও এটা পাওয়া তাদের ভাগ্যের ব্যাপার বটে।

ভ্যানগাড়ি এসে জোড়াদিঘিতে থামল।স্বার্থ ওয়ালেট থেকে টাকা বের করতে গেল।তীর্থ বাধা দিল,তুই রাখ আমি দিচ্ছি।

ভ্যানচালক হেসে বলল,লাগবো না তীর্থ ভাই।আমাগো স্বার্থ ভাই এতদিন পর এলো,আমি টাকা নিমু।

তীর্থ জোর করে মতির পকেটে টাকা ঢুকিয়ে দিলো,মার খাবি!ধর নে।তোদের স্বার্থ ভাই কি সাহেব নাকি?গাঁয়েরই তো ছেলে।

মতি কৃতজ্ঞতায় তীর্থের দিকে তাকাল।

অনু দৌড়ে এসে বর্ণকে জড়িয়ে ধরল,ভাই,কেমন আছিস?

বর্ণ বলল,ভালো না’রে আপু।ভালো না।তোর ভাইটা বড্ড শুকনা হয়ে গেছে,দেখ।

অনু বর্ণের চোখমুখ দেখল,হ্যাঁ,তাই তো।

তীর্থ এগিয়ে এসে বর্ণের কান ধরে টান দিল,এসে পারিস নি,কূটনামি শুরু হয়ে গেছে,ফাজিল।শোনো অনু,তোমার ভাই কিন্তু আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলবে সব।

বর্ণ একগাল হেসে বলল,তীর্থ ভাইয়া,তুমি স্বার্থ ভাইয়ার মতো অনু আপুকে ‘তুমি’ করে বলা ধরলে কবে থেকে।

তীর্থ গলা পরিষ্কার করল,কি’রে স্বার্থ,ও দিকে কি দেখিস?চল ভিতরে চল।

বর্ণ মুচকি হাসল,তীর্থ ভাইয়া আমার জবাব পেলাম না।

স্বার্থ জোড়াদিঘির থেকে মুখ ফেরাল,এই তীর্থ,শোন না,আমাদের দিঘির পাড়ে বড় শিউলিগাছ টা ছিলো না?ফুল ফুটেছে,ভাই?

তীর্থ এগিয়ে গিয়ে স্বার্থের হাত ধরল,তুইও না!বাড়ি আসলে বাচ্চা হয়ে যাস।সব হবে,আগে ভিতর বাড়ি চল তো।

দাদীজান তড়িঘড়ি করে এসে তীর্থকে জড়িয়ে ধরল,কই আমার দাদুভাই কই?কত শুকিয়ে গেছো!

তীর্থ স্বার্থের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপল।স্বার্থ মুচকি হাসল।স্মিত ঠোঁট প্রশস্ত করে।

বর্ণ স্বার্থের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,হয়ে গেল।আমি শেষ।এই ছেলেটার আর কত সৌন্দর্য রহস্য বাকি কে জানে।

তীর্থ দাদীজানকে জোরে জাপটে ধরল,শালা বুড়ি,তোমার চোখের তো বেশ অবনতি হয়েছে।দিনের বেলাতেও চোখে ধাধা লেগেছে।না’কি আমাকেই বেশি পছন্দ হয়েছে স্বামী হিসাবে।

দাদীজান তীর্থকে ছেড়ে দিল,শালা তুই,আমি না হয় বুড়ি হয়ে গেছি চোখে কম দেখি,তুই কেন সামনে এসে দাঁড়িয়েছিস।ভাগ।

স্বার্থ দু’হাত মেলে ধরে বলল,দাদীজান,আর ঝগড়া করতে হবে না।এসো।

স্বার্থ দাদীজানকে জড়িয়ে ধরে বর্ণের দিকে চেয়ে ভ্রু নাড়াল।তার অর্থ,কি?লাগবে নাকি?

তীর্থ দাদীজানের ঘাড়ে হাত দিয়ে স্বার্থের থেকে ছাড়াল,হয়েছে,হয়েছে।একজনকে এতো আদর করলে চলবে?আরেকজন তো হিংসায় জ্বলছে।পোড়া পোড়া গন্ধ বের হচ্ছে।এই অনু তুমি গন্ধ পাচ্ছো?

বর্ণ এগিয়ে গিয়ে তার নানুকে সালাম করে উঠে দাঁড়াল।দাদীজান একসাথে দু’জনকে তার দু’কাঁধে শুয়ে জড়িয়ে ধরে মুখে আদর করল,তোমরা দু’টো হলো গিয়ে হিরার টুকরো।বেঁচে থাকো দাদু ভাই,নানাভাই।

কাঁধে শুয়েই স্বার্থ বর্ণের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ভ্রু নাড়াল আরো একবার।বর্ণের বুকের ভিতর এই প্রথম ঢিপঢিপ।ঢিপঢিপ।শব্দের ধ্বনি শুরু হলো।

জ্বরের ঘোরে তার স্বার্থ ভাইয়া যেদিন প্রথম জড়িয়ে ধরে কোমল ঠোঁটের শিহরণে ‘আই লাভ ইউ’ বলেছিলো,সেদিন ধুকধুক।ধুকধুক।শব্দ প্রথম।সেটা কি আজ ঢিপঢিপ।ঢিপঢিপ।শব্দে রুপান্তর হলো।চোখেমুখে তার সে আভা ছড়িয়ে পড়লো।ঠোঁট মৃদু কেঁপে উঠল।

তীর্থ আওয়াজ তুলল,শালা বুড়ি,ওরা হিরার টুকরো?আমি কি হুম?কাঁচের টুকরা?

দাদীজান বর্ণ আর স্বার্থকে ছেড়ে বলল,তুই তো কাঁচের টুকরোই।

-কিহ?শালা বুড়ি।সারাবছর এই আমিই তোমার সেবা করি।তোমার বুড়ো বর,স্বার্থ,বর্ণ কিন্তু আসে না।দাঁড়াও এবার এরা যাক।তোমার হচ্ছে।

দাদীজান বলল,সারাদিন ঝগড়া আমার সঙ্গে।ওদের আদর দেখে তোর হিংসে হচ্ছে!আয় তোকেও আদর করি।তুই তো আমার হিরা-চুন্নি-পান্না সব।

তীর্থ কটাক্ষ রাগ দেখাল,জি না।আমার লাগবে তোমার আদর।নতুন মানুষদের করো গিয়ে।

অনু তীর্থের এসব দেখে মুচকি হাসছিল।তীর্থ ধমকাল,কি?হাসছো কেন?মজা লাগে।

অনু ওড়না দিয়ে মুখ চাপা দিল,হুম লাগে।তোমার কোন সমস্যা?

বর্ণ আর স্বার্থের ব্যাগ ভ্যান থেকে হাতে নিতে নিতে তীর্থ বলল,মজা নিচ্ছো নাও।আমারও সময় আসবে,তখন সব ক’টাকে সোজা করবো।ঐ বুড়িকেও।

তারপর স্বার্থের দিকে তাকিয়ে বলল,তোরা ভিতরে আয়,আমি গেলাম।

সবাই তীর্থকে অনুসরন করার পর ভ্যানচালক মতি এক নজর স্বার্থদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলল।

চৌদ্দ।

বাবার শরীরটা ভালো না থাকায় তীর্থ চালের আড়তের কিছু হিসাব দেখছিল।তার মাঝে কিছুক্ষণ আগে ইটবাটার ম্যানেজার এসে আরেক গাদা হিসাব ধরিয়ে দিয়ে গেল।সোফায় বসে হিসাব দেখতে দেখতে তার পিঠ লেগে যাওয়ায় সোফায় ঠেস দিয়ে চোখ বুজল।স্বার্থ দরজায় দাঁড়িয়ে কাশি দিল,ঐ ঘুমাচ্ছিস নাকি?

তীর্থ সোজা হয়ে বসল,আরে না,ভিতরে আয়।

স্বার্থ অনন্তের দিকে তাকিয়ে বলল,আয়।

তীর্থ অনন্তের দিকে চেয়ে টিপ্পনী কাটল,কি অনন্তবাবু যে!বসেন।বন্ধু আসছে না?আমি তো আর কারোর বন্ধু না?স্বার্থই আপনার বন্ধু।

অনন্ত বসে তীর্থের কাঁধে চাপ দিল,শালা,তুই জানিস না দোকান থেকে নড়া যায় না।সুমন্ত বসতে চায় না।না হলে তোদের বাড়ি রোজ আসতাম।আগে আসি নি?

-হ্যাঁ,আগে তো খুব আসছেন।এখন বন্ধু নাই বলে আসেন না।

স্বার্থ সোফায় গা এলিয়ে দিল,তীর্থ,তোকে নিয়ে আর পারা যায় না।সবার পিছে তোর লাগা চায়।ফাজিল।

তীর্থ অট্টহাসিতে ভেঙ্গে পড়ল।

পুরানো জমিদার বাড়ি যেন কেঁপে উঠল।এ বাড়ি সারাক্ষণ মাতিয়ে রাখে তীর্থ।হাসি।মজায়।মাদকতায়।রাগ জিনিসটা তার স্টকে নেই।

অথচ স্বার্থ তার বিপরীত।গুরুগম্ভীর।রাগী।তবে হাসে সে খুব কম।যদি একটু হাসে তাতেই যেন পরিবেশটা স্নিগ্ধতায়।নেশায়।মিহি সুরের তরঙ্গ বয়ে যায়।

স্বার্থ তীর্থকে জড়িয়ে ধরল,খুব না!এতো হাসতে পারিস।এখনও ছোটদের মতো ফাজিল আর পাগলাটে রয়ে গেলি।

অনন্ত তীর্থকে চিমটি কেটে বলল,চাপ নিস না,স্বার্থ।বউ এসে ওর সব পাগলামি ছুটাবে।

তারপর স্বার্থের দিকে তাকাল,নে দু’ভাই আদর আহ্লাদ পরে করিস।আমি বাড়ি যাবো,অনেক রাত হলো।কাকিমা ঠেসেঠুসে যা খাওয়ালো,মনে হয় হাটতে পারবো না।স্বার্থ,চল কথা আছে।

তীর্থের কান টেনে বলল,ঐ বাঁদর,এমনি তো যাস না।স্বার্থ আসছে,এবার আমাদের বাড়ি যাস।মা ঘুরতে ফিরতে তোদের দু’টোর কথা বলে।তার সেই এক কথা,ছোটবেলা তোরা কত যাইতি।নাড়ু খাওয়া নিয়ে কাড়াকাড়ি করতি।

দরজার কাছে গিয়ে বর্ণকে দেখে অনন্ত হাসল,বর্ণ,তুমিও একদিন এসো আমাদের বাড়ি,কেমন!

বর্ণ মুচকি হাসল,আচ্ছা অনন্ত দা।

বর্ণ মিশুর হাত ধরে ছিল,দৌড়ে অনন্তের কোলে উঠল,অন্তু কাকু আমিও যাবো।

সে অনন্ত বলতে পারে না।বলে অন্তু।

অনন্ত আদর করল,অবশ্যই যাবে।তুমি না গেলে কি হয় কাকু?

স্বার্থের দিকে তাকিয়ে বলল,আমাদের পার্থ দাদার ছেলেটা কিন্তু বেশ পাকা হয়েছে।আমাদের তিন বছর বয়সে আমরা বোধহয় মা-বাবা ডাকটাও ভালো শিখি নি।

মিশুকে বর্ণের কাছে দিয়ে অনন্ত আর স্বার্থ বেরিয়ে গেল।

তীর্থ হিসাবের খাতা তুলে রাখল,এই যে বর্ণ সাহেব,এসে ধরে তো পাত্তা দিচ্ছেন না আমাকে।এতো রাতে মনে পড়ল।সারাক্ষণ বোন আর বড় ভাবির সাথে খাতির জমিয়ে যাচ্ছেন।বললেন কি সব নালিশ আছে।

বর্ণ মিশুকে কোলে করে সোফায় বসতে বসতে বলল,তীর্থ ভাইয়া,মজা নিও না তো।মন খারাপ।

তীর্থ বর্ণকে জড়িয়ে ধরল,কেন?মন খারাপ কেন?

মিশু বড় বড় চোখে তাকাল,উফ্,ব্যথা পাচ্ছি তো।

তীর্থ ধমক দিল,ঐ তুই নেমে বয় কোল থেকে।ইঁচড়েপাকা কোথাকার।

বর্ণ নিজেকে ছাড়াল,ছাড়ো তো।ঐ ওর সাথে তুমি অমন করো কেন?ভাবি আমাকে সব বলেছে।এইটুকু একটা ভাইপো,তার পিছুও সারাক্ষণ লাগা চায় তোমার।

তীর্থ জানালো,লাগবো না তো কি করবো,হুম?সারাদিন আমি ওকে দেখেশুনে রাখবো,আর ও সারাক্ষণ বড় কাকু,বড় কাকু করবে।

বর্ণ হেসে উঠল,তুমিও না পারো,ও কি অতো বোঝে?অতো ছোট মানুষ।

-তোকে বলেছে।বিয়ে দিয়ে দেখ,বাচ্চার বাপ হবে।সব পেকে গেছে।

-সেই,তুমি তো পাকো নি।কচি আছো।

তীর্থ হো হো করে উঠল,আমি তো একটা কিউট বেবি।

বর্ণ বলল,ছাই!শোনো না,ভাবলাম আজ রাতে অনু আপুর কাছে শুবো।কিন্তু আপু নাকি বড় ভাবীর কাছে শুবে।

-শুবে কি?অনু এ বাড়িতে আসছে অবধি বড় ভাবির কাছেই থাকে।পার্থ ভাইয়া না থাকাতে যে অনুর কি লাভ হয়েছে।সারাক্ষণ ভাবির সাথে ফিসফাস করে।

বর্ণ বলল,তাহলে আজ তোমার কাছে শুবো।

তীর্থ বর্ণের মাথায় টোকা দিল,আজ কি?এ বাড়িতে আসলে সারা জীবনই তো তুই আমার কাছে শুয়েছিস।এখন আমাকে বাতিল লিস্টে ফেলছিস যে।

-আরে ধুর,তা না তো,কতদিন আপুর কাছে শুই না।

-এত বড় হয়ে গেছিস।অনুর কাছে শুতে তোর লজ্জা করে না?

-হুস,লজ্জা করবে কেন?

অনু রুমে ঢুকে বলল,ভাবি মিশুকে ঘুম পাড়াবে,আমারও ঘুম পাচ্ছে।বর্ণ ওকে দে।তারপর তোরা সারারাত বকবক কর দু’টোতে।

মিশু বর্ণকে জড়িয়ে ধরল,না,না,আমি বর্ণ কাকুর কাছে শুবো।

বর্ণ নিজে মিশুকে জড়িয়ে ধরল,ওলে বাবা লে,আমি শুবো তো আমার বাবাটার কাছে।এখন আমার বাবাটা কি করবে বলো তো।অনু ফুপির সাথে চলে যাবে।তারপর আমি তোমার তীর্থ কাকুর সাথে গল্প করে চলে আসছি।আমরা এক সাথে শুবো।

মিশু বর্ণের গলা ছেড়ে দিল।ছোট্ট সুরে বলল,আচ্ছা।

অনু মিশুকে নিয়ে যাওয়ার সময় তীর্থের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।ব্যাপারটা বর্ণের চোখ এড়ালো না।

অনু যাওয়ার পর তীর্থ উঠে দাঁড়াল,তুই উপরে আমার রুমে গিয়ে বিছানা ঠিক কর।আমি একটু হেটে আসছি।

বর্ণ সোফায় গা এলিয়ে দিল,একা একা সিঁড়ি ভেঙ্গে এখন উঠতে ইচ্ছা করছে না।তুমি ফিরে এসো তারপর যাই।

তীর্থ হাসল,শুয়ে থাক তাহলে,আমি এসে আধকোলা করে তুলে নিয়ে যাবো।

বিছানায় শুয়ে দিতেই বর্ণ চোখ মেলে তাকালো।মিষ্টি একটা হাসি দিল,তীর্থ ভাইয়া,দেখলে তোমাকে কেমন বোকা বানালাম।

তার বুকের ভিতর হৃৎপিন্ডে রক্তেরচাপ বেড়ে গেছে।হেমন্তের আবহাওয়াও সে প্রচুর ঘেমে গেছে।সে ঢোঁক গিলল,দিস ইজ নট ফেয়ার বর্ণ।নিচ থেকে তোমাকে,স্যরি,তোকে আনতে গিয়ে আমি সবদিক দিয়ে শেষ।

বর্ণ ভ্রু নাড়ল,সবদিক দিয়ে মানে?

সে সাইড টেবিল থেকে ঢকঢক করে পানি খেল।বলল,কিছু না।তুমি,স্যরি তুই ঘুমের ভাণ ধরে আছিস জানলে এতগুলো সিঁড়ি ভেঙ্গে আধকোলা করে তোকে উপরে আনতো কে?

বর্ণ অবাক হলো,তীর্থ ভাইয়া,কি হয়েছে আজ তোমার?এমন করছো কেন?এদিকে তাকাও।

-আরে কিছু না।ঘুমিয়ে পড়।

-হুম,ঘুমাবো তো।তুমি শুবে এসো,কতদিন দু’ভাই জড়িয়ে ধরে শুয়ে গল্প করি না।

-তুই শো,আমি ফ্রেশ হয়ে আসি।

বর্ণ ভাবল,মেন্টালটার মতো এটার আবার কি হলো।মেন্টালটা কই ঘুমাচ্ছে,কি করছে কে জানে?

সে ওয়াশরুম থেকে ফিরলে বর্ণ বলল,আচ্ছা,তীর্থ ভাইয়া,স্বার্থ ভাইয়া কোন রুমে ঘুমাচ্ছে?

সে বিছানায় উঠতে উঠতে বলল,কেন তুই জানিস না?এ বাড়িতে কে কোন রুমে ঘুমায়।

বর্ণ মনে করার চেষ্টা করল।নিচতলার পাশাপাশি দু’টো রুমের একটিতে নানাজান-নানু,অন্যটায় মামাজান,মামীজান।ড্রয়িংরুম পেরিয়ে বাকি রুমগুলোতে স্টোররুম,লাইব্রেরি,কিচেন।নাচমহল তালা পড়ে আছে নানাজানের আমল থেকে।উপর তলার দক্ষিণ-পশ্চিমে স্বার্থ ভাইয়া।দক্ষিণ-পূর্বে তীর্থ ভাইয়ার রুম।তারপর দু’জনের দু’পাশে তিনটি করে মোট ছয়’টি রুম।গেস্টরুম।উত্তরের মাঝের দু’টো রুম পার্থ ভাইয়া-ভাবী।

বর্ণ চোখ খুলে বলল,মনে পড়েছে।

-বেশি বকবক না করে ঘুমা।অনেক রাত হয়েছে।

বর্ণ উল্টো দিকে মুখ ফেরালো,তুমি কেমন বদলে গেছো,তীর্থ ভাইয়া।আগে কত কি করতে!

সে মুচকি হাসল,কি কি করতাম রে?

বর্ণ কটাক্ষ রাগ দেখাল,জানি না,যাও।

-বল না,কি কি করতাম।

-কত গল্প করতে।শোভাদির,আমার মায়ের,সোনাদিয়া বিল,রসুলপুরের কত কি,তোমার কত দুষ্টুমির কথা।

-এসব বলতাম নাকি?কই আমার তো মনে পড়ছে না।

-এসএসসির পর এসে গেছি এ বাড়িতে।দু’বছরে ছোটবেলা থেকে এ পর্যন্ত সব ভুলে গেলে?

-আরে মজা করছি তো।সব মনে আছে।বর্ণ,লাইট অফ করি?

বর্ণ হঠাৎ ঘুরে তাকে জড়িয়ে ধরল,এভাবে জড়িয়েও রাখতে।

কানের কাছে ঢিপঢিপ।ঢিপঢিপ।শব্দে বর্ণ বলল,তীর্থ ভাইয়া,তোমার বুকের মধ্যে ঢিপঢিপ আওয়াজ হচ্ছে।

বর্ণ হেসে দিল,তুমি ভয় পেয়েছো?

সে নিজের বুকের থেকে বর্ণের মাথা সরিয়ে বলল,বর্ণ,গরম লাগছে তো।

বর্ণ পাশ ফিরে শুয়ে অভিমান করল,তুমি সত্যি বদলে গেছো।

বর্ণের হয়তো জানা নেই বুকের ভিতর এই যে ঢিপঢিপ ধ্বনি।প্রতিধ্বনি।এটার একটা সুখমর্মী অর্থ আছে।বয়স কম তার,তার থেকে অবুঝ তার অপক্ক মন।সে কি জানে উছলে পড়া নদীর ধর্ম?জোয়ারসম শরীরের বয়ে চলার গতির দিকধর্ম কি?

‘বর্ণ’ শব্দটা এতো মিহির আর মাদকতাপূর্ণ শোনালো বর্ণ ফিরে তাকালো।

‘তোর তীর্থ ভাইয়া আগের মতোই আছে।’চোখ ছল ছল করছিলো তার।ঘরময় আলো তার চোখে আর্দ্রতার খেলা খেলছিল।

‘সারারাত জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে পারবো না,আমার শরীর ভালো লাগছে না।একবার হাগ করলে চলবে?মন খারাপ করছিস তো,তাই।’ সে সম্মতি চাইলো।

বর্ণ জড়িয়ে ধরলো।তারপর ছেড়ে দিয়ে বলল,তীর্থ ভাইয়া,তুমি পারফিউম বদলেছো?

সে জবাব দিল না।

বর্ণ তার গলায় হাত দিল।বর্ণের হাতের স্পর্শে শরীর কেঁপে উঠল তার।

বর্ণর প্রশ্ন ছুড়ল,তোমার গলায় এই কালো তিলটা তো আগে ছিলো না।নতুন হয়েছে?

সে বলল,হবে হয়তো।তুই এতসব দিকে চোখ দিস কেন?যা ঘুমা।লাইট অফ করলাম।

বর্ণ আবারও উল্টো পাশ ফিরল।

আজ তার তীর্থ ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরতেই কেমন গায়ে কাটা দিলো।এমনটা তো আগে কখনো অনুভব হয় নি।তার তীর্থ ভাইয়াও কেমন একটা অস্বাভাবিক আচরণ করছে।কিন্তু সে তার তীর্থ ভাইয়াকে কখনো এমনভাবে অনুভব করেনি,আজ যা হলো।তার নিজের আন্নার মতো সে তীর্থকে শ্রদ্ধা করে।ভালোবাসে।পার্থক্য শুধু দু’জনের ছেলেমানুষিগুলো।যা তার আন্নার সাথে করা হয় না।

মেন্টালটাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে।বর্ণ হাসল,এসবের কোন মানে হয়!এতো রাতে অকারনে স্বার্থকে কেন তার দেখতে ইচ্ছা করবে?

কেন যেন চোখের কোণ বেয়ে কয়েক ফোঁটা পানি বালিশে পড়লো। বর্ণ কেঁপে উঠে চোখ বন্ধ করলো।

(অষ্টম পর্ব)

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>> 

বিঃদ্রঃ তোমার একটিমাত্র জীবন যদি প্রেমহীন থেকে যায়,শর্তহীন দলিলে যদি কোন বিবাদীর নাম লেখা না থাকে,অনাবিষ্কৃত ভালোলাগা যদি তোমার ঠোঁটের আঙ্গিনায় বিরহ না জাগায়,একটিমাত্র জীবনে তুমি যদি কলঙ্ক এর সুখই না পেলে-তবে তুমি…!তবে তুমি আমার গল্প পড়ো না।

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>> 

পনেরো।

স্বার্থদের বৃদ্ধাশ্রমের নাম ‘আনন্দাশ্রম’।বৃদ্ধাশ্রম হলেও এখানের একটা অংশে অনাথ ছেলে মেয়েদের রাখা হয়।মুসলিম ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা হয় স্বার্থদের মাদ্রাসায়।মাদ্রাসা স্বার্থের দাদাজান কাউসার চৌধুরীর নামে।

গাড়ি বৃদ্ধাশ্রমের কাছে এসে থামলো।গ্রামের ভিতর মনোরম পরিবেশে এতো সুন্দর বৃদ্ধাশ্রম।ভাবা অকল্পনীয়।

তীর্থ আর বর্ণ পিছনে বসে ছিলো।তীর্থ নেমে দাঁড়ালো,কি’রে বর্ণ বের হ।

স্বার্থ ড্রাইভারের সাথে সামনে বসেছিলো।বলল,বশির ভাই,ভিতর থেকে ম্যানেজার এলে ওনাকে মালামালগুলো বুঝিয়ে দিন।তারপর দাদাজান মাদ্রাসার জন্য যেসমস্ত জিনিস দিয়েছে ওগুলো মাদ্রাসায় দিয়ে আপনি গাড়ি নিয়ে বাড়ি চলে যাবেন।

তীর্থ বাধা দিল,ঐ গাড়ি নিয়ে চলে যাবে মানে?এরপর কি আমরা হেটে হেটে যাবো।

স্বার্থ নেমে আড়মোড়া ভাঙ্গল,হ্যাঁ,আমরা হেটেই যাবো।

বর্ণ নেমে তীর্থের পাশে দাঁড়ালো।ফিসফিস করে বলল,আমি কিন্তু হাটতে পারবো না,বলে দিলাম।

তীর্থ বর্ণের কানের কাছে মুখ নিল,আহা কি সংলাপ!আমি তোকে ঘাড়ে করে নিয়ে হাটবো?আমাকে না বলে,যে বলেছে তাকে গিয়ে বল।

তারপর স্বার্থের দিকে তাকাল,ভাই,এমন করছিস কেন?

স্বার্থ ভ্রু কুচকালো,সঙ্গে মালামাল আছে বলে গাড়িটা আনা হয়েছে।দাদাজানের এই সাবেকি আমলের গাড়িতে আমার উঠতে ভালো লাগে না।নিশ্বাসবন্ধ লাগে।মালামাল না থাকলে না তোদের দু’টোকে হেটে হেটেই আসতে হতো।

স্বার্থ আজ ব্লু কালারের শার্টের উপর হালকা রংয়ের কোটী পরেছে।বর্ণ লক্ষ করলো।তারপর বিড়বিড় করল,দু’টো ভাইকে সবটাতে মানায়।আজ সানগ্লাস পরে মেন্টালটাকে দারুন হ্যান্ডসাম লাগছে!লাগলে কি সবখানে বাগড়া দিবে।তাতে দেখার আর স্বাদ থাকে না।

তীর্থ কনুই দিয়ে বর্ণকে খোঁচা দিল,ঐ কি বললি?শুনতে পারলে তোকে নয় গাঁধা,আমাকে নিয়ে পড়বে।রক্ষা কর ভাই।

তীর্থ হেসে স্বার্থের দিকে তাকাল,আচ্ছা।আমরা হেটেই যাবো।কি বলিস বর্ণ?

বর্ণ রাগী চোখে তীর্থের দিকে তাকিয়ে চাপা সুরে বলল,তীর্থ ভাইয়া,এবার কিন্তু বেশি হয়ে যাচ্ছে।

তীর্থ মেকি হেসে স্বার্থকে একবার নজরে এনে বর্ণের কানের কাছে মুখ নিল,চেপে যা!চেপে যা।

স্বার্থ ধমক দিল,ঐ দু’টোতে ফিসফাস করছিস কেন?ভিতরে চল।

তীর্থ বর্ণের হাত ধরে বলল,চল।

স্বার্থ চোখে ইশারা করল।তীর্থকে বুঝাতে চাইলো বর্ণের হাত ছেড়ে দে।তীর্থ হাত ছেড়ে দিল।বর্ণ একবার স্বার্থের দিকে চেয়ে তীর্থের বাঁ হাতটা নিজে ধরল,তীর্থ ভাইয়া,তুমি ভিতরে যাবে,নাকি আমি এখান থেকে চলে যাবো।

তীর্থ স্বার্থের দিকে চেয়ে ইঙ্গিতে বুঝালো,এই যা,আমি কি করবো।

এ আশ্রমের অধিকাংশ লোক তীর্থকে চেনে।তীর্থ এখানে মাঝে মাঝে আসে।স্বার্থকে দেখে সবাই অবাক হয়ে তাকাচ্ছে।সে আগে এসেছে দু’চার বার,তবে তীর্থের মতো নয়।বৃদ্ধাশ্রমে বৃদ্ধদের থাকার অধিকাংশ ঘরগুলো নিচতলায়।

তীর্থ একজন বৃদ্ধের রুমে ঢুকল।বৃদ্ধকে জড়িয়ে ধরল,বন্ধু,কেমন আছো?

বৃদ্ধ হেসে বলল,আরে ছাড় ছাড়।তোর মতো জোয়ানমর্দ পোলার লগে মুই পারবো নি?ওযু করলাম।নামাজ পড়মু।

তীর্থ জিজ্ঞাসা করল,সকাল দশটায় এখন কিসের নামাজ?

বৃদ্ধ কুচকানো গালে আবার হাসল,নামাজের শেষ আছে নি।

তারপর অবাক হয়ে স্বার্থের দিকে তাকাল।তীর্থ বলল,এটা আমার ভাই,স্বার্থ।তোমাকে যার কথা সব সময় বলি,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে।মনে পড়েছে বন্ধু?

বৃদ্ধের চোখমুখে বিস্ময় খেলছে,তুই না কইলেও যে কেউ বুঝবো যে এটা তোরই ভাই।

তীর্থ সম্মতি দিল,হ্যাঁ,বুঝবেই তো।দেখতে হবে না ভাইটা কার।এই আমার!

তারপর বর্ণের দিকে দেখিয়ে সে বলল,ওটা আমার মামাতো ভাই,বর্ণ।

বৃদ্ধ বলল,খুবি মিষ্টি পোলা।

তীর্থ মজা করল,হাছা কতা কইচো বন্ধু।এক্কেয়ারে রসগোল্লার লাহান।

বৃদ্ধ তীর্থকে খোঁচা দিল,তুই মোরে ভ্যাঙাইতাচোচ,ফাজিল কোহানকার।

তীর্থ বৃদ্ধকে আবার জড়িয়ে ধরল,তুমি থাহো বন্ধু,ওগো আশ্রমটা দেহাইয়া আবার মুই আইাতাচি!

এ আশ্রমের মূলত দুটা অংশ।এক অংশে হিন্দু ধর্মাবলম্বী মহিলা-পুরুষ,ছেলেমেয়েদের আলাদা করে রাখা হয়েছে।তার ভিতর ‘মা আনন্দময়ী মন্দির’।হিন্দু ছেলেমেয়েরা ওখানে ধর্মপাঠ শেখে।বাকি পড়া আশ্রমের স্কুলে করে।আরেক অংশে তিনতলাবিশিষ্ট ভবনের নিচতলায় মুসলমান পুরুষ-ছেলে এবং দ্বিতীয়তলায় মুসলমান মহিলা-মেয়ে আলাদা করে ব্যবস্থা।তৃতীয়তলায় স্কুল।ভবনের সামনে মসজিদ।বারোজন নতুন খিস্টান আসছে।তাদের জন্য আলাদা ভবনের নির্মাণ কাজ চলছে।

তীর্থ একজন হিন্দু বৃদ্ধাকে ডাকল,ও ঠাম্মা!ঠাকুরদা কোথায়?দেখো,আবার অন্য ঠাম্মাকে নিয়ে পালিয়ে না যায়।

বৃদ্ধা হাত উঠিয়ে তীর্থকে মার দেখালো।তারপর হাসল,তোমার ঠাকুরদা অন্যের সঙ্গে ভাগলে আমি তোমাকে নিয়ে ভাগবো।

তীর্থ হাত ইশারা করে বলল,এই যে দেখো,আজ আমরা তিন ভাই এসেছি।তোমার দু’বান্ধবীকেও বলো তাহলে জোড়ায় জোড়ায় পালানো যাবে।

বর্ণ মুচকি হাসল।স্বার্থ ধমকালো,তুই সবখানে এমন।ফাজিল।

তীর্থ চলতে চলতে বলল,আরে শোন না,যে ঠাম্মার সাথে কথা বললাম ওনার একটা মাত্র ছেলে।কষ্ট করে ছেলে পড়িয়েছে ঠিকই কিন্তু ছেলে মানুষ হয় নি।ইঞ্জিনিয়ার।বিয়ে করার পর বউয়ের পরামর্শে মা-বাবাকে এখানে ফেলে গেছে।চার বছর হলো।কোনদিন দেখতে এলো না।

বর্ণ আগ্রহ দেখাল,তারপর?

তীর্থ বলল,ঠাকুরদা ঠাম্মাকে অনেক ভালোবাসে।এখানে এসে দু’জন আলাদা থাকতে হয়।একদিন রাত দু’টোর সময় দু’জনে চুরি করে দেখা করতে আশ্রমের পুকুরপাড়ে গেছে।দায়িত্বে থাকা গার্ড চোর বলে ধরেছে।ঠাকুরদাকে দু’টো আঘাতও করে ফেলেছে।তারপর দেখে ওনারা।

তীর্থ হো হো করে হেসে উঠল।স্বার্থ আড়চোখে বর্ণের দিকে তাকাল।বর্ণ খেয়াল করে মুখ মলিন করে ফেললো।

স্বার্থ বলল,তীর্থ,বৃদ্ধদের নিয়ে মজা নিবি না।আমার একদম অপছন্দ।

বর্ণ মনে মনে স্বার্থের কথার পুনরাবৃত্তি করল,আমার একদম অপছন্দ।আইছে,জগতে সবাই উনার নিয়মে চলবে!

তীর্থ জিভ কাটল,এই যা আমি আবার কখন বৃদ্ধদের নিয়ে মজা করলাম।

‘আব্বা!আপনি বাড়ি চলেন,আমি কোনদিন আর আপনাকে কষ্ট দিবো না।’ কথাটা শুনে তারা তিনজনই দাঁড়িয়ে গেল।

এক দম্পতি জেদি বৃদ্ধের পা জড়িয়ে বসে আছে।বৃদ্ধ কিছুতে বাড়ি যাবে না।তিনি বললেন,রোজ রোজ আমি কষ্ট পেতে রাজী নই।আমি এখানে খুব ভালো আছি।হাসিতে।খুশিতে।বাকি জীবনটা কাটাতে চাই।

বৃদ্ধের ছেলের বউ বলল,আব্বা আমি অন্যায় করছি।আমাকে আপনি মাফ করে দেন।

বৃদ্ধ বললেন,তুমি আমাকে বিষ খাইয়ে মারতে চেয়েছিলে।তুমি মাফ পাইবা ভাবছো?

স্বার্থ এগিয়ে এলো।

বৃদ্ধের কাঁধে হাত রাখল,চাচা,অন্যায় করে কেউ মাফ চাইলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন।আমরা তো তার বান্দা।আমাদের কি উচিত নয়,অন্তরে ক্ষমার মতো মহৎ গুন ধারন করা।আপনি ওনাদের মাফ করে দিন।

বৃদ্ধ ফিরে তাকালেন,ও তুমি।কিন্তু…..!

স্বার্থ এক পলক চোখ বন্ধ করে খুলল,হুম।আপনি বাড়ি যান।আমি নাম কাটার ব্যবস্থা করছি।

তীর্থ দূরে দাঁড়িয়ে স্বার্থের দিকে তাকিয়ে বুড়ো আঙ্গুল উঠিয়ে বুঝলো,গ্রেট জব ব্রো।

তীর্থের চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।তার পাশে দাঁড়িয়ে বর্ণ অবাক হয়ে স্বার্থকে দেখছিলো।তার বুকের ভিতর দু’বার ঢিপঢিপ।ঢিপঢিপ।শব্দ হলো।

স্বার্থ ফিরে এলো,তীর্থ,আমার এখানে ভালো লাগছে না,ভাই।কাজ সেরে যত দ্রুত পারিস চল।

তীর্থ বুঝল স্বার্থের কষ্ট হচ্ছে।সে স্বার্থের হাত ধরল,ওকে,ভাই।তুই দাঁড়া এখানে।বাচ্চাদের চকলেটগুলো দিয়ে আমি ম্যানেজারের সাথে কথা বলে আসছি।বর্ণ আয় তো।

স্বার্থ বলল,তুই একা যা।বর্ণ এখানে থাক।

বর্ণ স্বার্থের অগোচরে মাথা নাড়ালো।তীর্থ ইশারা করল,থাক।আমি যাবো আর আসবো।

বৃদ্ধাশ্রম থেকে বেরিয়ে স্বার্থের আশেপাশে তাকানো দেখে তীর্থ তার কোমরে চিমটি কাটল,কি?খুব তো বললি হেটে যাবি।চল এবার।

স্বার্থ দাঁত চেপে বলল,শোন,বেশি কথা বলবি না।আশেপাশে ভ্যানগাড়ি আছে কি’না দেখ।

তীর্থ একটু দূরে দাঁড়ানো বর্ণের দিকে তাকিয়ে হাসল,বুঝি,বুঝি।সবই বুঝি।

তারপর নিচু স্বরে বলল,আমি জানতাম।

স্বার্থ তীর্থের হাত চেপে ধরল,কি জানতি বল?

-হাত ছাড়।তারপর বলি।আমি কি পাগল নাকি?তুই ধরে রাখলে আমি কখনো কিছু বলবো না।

স্বার্থ ছেড়ে দিল,যা ছেড়ে দিলাম।বল।

তীর্থ স্বার্থের কানের কাছে মুখ নিল,বর্ণের যে হাটায় অভ্যাস নেই,তা তুই ভালো করে জানিস।তখন যে বললি হাটিয়ে নিয়ে যাবি,কি হলো?

স্বার্থ আবার দাঁত চেপে বলল,এখন কিন্তু সত্যি মার খাবি।

তীর্থ বর্ণকে শুনিয়ে জোরে গলা পরিষ্কার করল,তাহলে বড় রাস্তায় চল অটোরিকশায় যাই।

স্বার্থ তীর্থকে দৌড়ানি দিল,তুই ভ্যানই আনবি।ওসবে আমার দম বন্ধ লাগে।

তীর্থ দৌড়ে দূরে দাঁড়িয়ে বলল,তোর লাগে?নাকি অন্য কারো লাগে।সবই বুঝি।

সকালে খাওয়াদাওয়ার পর স্বার্থের চোখটা একটু লেগে এসেছিল।ঘুম ভাঙ্গল বারোটায়।ঘুম থেকে জেগে ড্রয়িংরুমে রিতুকে বসা দেখল।উপরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করল,বড় ভাবী,বর্ণ আর তীর্থ কোথায় গেছে জানো?

রিতু বলল,ওদের তুমি চেনো না?দেখো গিয়ে গ্রামে কার বাগান পরিষ্কার করতে গেছে!না হলে পাখির বাসা দেখে বেড়াচ্ছে।

-মিশু কই?

-ঘুমিয়েছে।

-আম্মাকে ডেকে দাওতো।

রিতু হেসে বলল,স্বার্থ,তুমি দেখছো আমি চাল বাছছি,তারপরও।আম্মা দাদীজানের রুমে।আচ্ছা দাঁড়াও ডেকে আনছি।

স্বার্থ নামতে নামতে বললো,লাগবে না।তুমি বসো।আম্মার সাথে আমি পরে কথা বলছি।আগে ঐ দু’টোকে আমি পিটিয়ে আসি।

স্বার্থ গ্রামের পথে নেমে প্রথমে সিরাজ শেখের বাগান।পুকুরপাড় দেখল।বর্ণ,তীর্থকে পাওয়া গেল না।

ছোট একটা কলাই ক্ষেতের আইল পাড়ি দিয়ে বসুরখাল উঠল সে।খালের কাঁচা রাস্তা দিয়ে সাইকেল চালিয়ে একটা ছেলে যাচ্ছিল।মুখ ফিরিয়ে বলল,ভাই,বিকেলে কলেজ মাঠে ক্রিকেট খেলা আছে।আসবেন তো।

স্বার্থ বলল,আচ্ছা।

একজন মুরুব্বিকে আসতে দেখে স্বার্থ সালাম দিল।তারপর দাঁড়িয়ে বলল,চাচা,ভালো আছেন?

লোকটা স্মিত হাসল,ভালো,বাবা।দোকানের জন্য তোমাদের আড়ত থেকে যে চাল নিছিলাম।তোমাদের ম্যানেজারের কাছে টাকা দিয়ে আসছি।

স্বার্থ বিনয়ভাবে তাকাল,আচ্ছা চাচা,আমি আব্বাজানকে বলে দিবো।

মুন্সিবাড়ির বাগানের কাছে গিয়ে স্বার্থ থেমে গেল।তীর্থ জাম্বুরাগাছে উঠেছে।বর্ণ নিচে দাঁড়িয়ে উপর দিকে মুখ করে আছে,তীর্থ ভাইয়া,তোমার ডানে দেখো,ওটা পাকা।

তীর্থ মাথা নাড়াল,আরে এটাই রোদ পড়ছে তাই নিচে থেকে এমন দেখছিস।ওটা পাকা না।

-তোমাকে বলছে।হুহুহু,মাত্র চারটে হলো।ওটাও পাড়ো তো।

স্বার্থ একটা লাঠি হাতে গাছ তলায় গিয়ে দাঁড়ালো,ঐ তীর্থ,ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যে নিচে নামবি।

বর্ণ তীর্থের দিকে তাকাল।

বর্ণের বুকের ভিতর ধুকধুক।ধুকধুক।শব্দ শুরু।

তীর্থ বলল,তুই নিচে থেকে সর,আমি নামছি।

স্বার্থ নিঃশ্বাস ছাড়ল,তুই কবে বড় হবি?আচ্ছা লাঠি ফেলে দিলাম।এবার নাম।

তীর্থ নামলে স্বার্থ বলল,এই রোদে তুই পরের গাছের জাম্বুরা চুরি করতে আসছিস!আমাদের বাগানে জাম্বুরা হয়নি?

তীর্থ নিচ থেকে জাম্বুরা হাতে নিল,আরে ধুর,তুই কিচ্ছু বুঝিস না।চুরি করে খাওয়ার মজাই আলাদা।

-ঐ,জাম্বুরা রাখ।এই ছাতা নে,বর্ণকে নিয়ে সোজা বাড়ি যাবি।আমি জাম্বুরা দিয়ে আসছি।

-ছাতা কি তুই আমার জন্য আনছিস,নাকি…..!

-জি না।আমার রোদে বেরোতে হয়েছে তো তাই আনছি।তোর কোন সমস্যা?

-তাহলে তুই রেখে দে।

স্বার্থ ফেলে দেয়া লাঠির দিকে তাকাল,ওটা কি তুলে আনতে হবে?

তীর্থ একটা জাম্বুরা হাতে নিল,অনু খেতে চেয়েছিলো।একটা নেয়?

-আচ্ছা,একটা কিন্তু।

তীর্থ বর্ণের হাত ধরে হাটা দিল।স্বার্থ বলল,এই শোন,ওর হাত ছেড়ে হাট।

তীর্থ হাত ছেড়ে দিল।বর্ণ আড়চোখে তাকাল স্বার্থের দিকে।অস্পষ্ট সুরে বলল,মেন্টাল কোথাকার!কোথাও যেয়ে শান্তি নাই।

তারপর তীর্থের হাত ধরে টান দিল,তীর্থ ভাইয়া,তুমি আসো তো।

উত্তরপাড়ার মুন্সিবাড়ি হলো গ্রামের সবচেয়ে পর্দাশীল বাড়ি।এ পাড়ার মসজিদের ইমাম হালিম মুন্সি।তার বাড়ি।স্বার্থ বাইরে দাঁড়িয়ে ডাকল,বাড়িতে কেউ আছেন?

ভিতর থেকে একটা লোক বেরলো,কে?

স্বার্থের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে বলল,স্বার্থ না?দোস্ত কবে আসলি?

স্বার্থ বলল,এই তো দু’তিনদিন হলো।রফিক,এগুলো তোদের…..!

রফিক কথা শেষ করতে দিল না,আরে রাখ এগুলো।তীর্থের কাজ তাই তো।আমি তো প্রথমে ভাবছিলাম….।

স্বার্থ থামিয়ে দিল,সবাই তাই ই ভাবে।

রফিক বলল,আয়,কাছারিঘরে।কত দিন দু’বন্ধু সুখদুঃখের কথা বলি না।

এ বাড়ির কাছারিঘরে মেয়েছেলেরা আসে না।

ষোল।

রাত বারোটায় বিছানায় উঠে বসল।লাইট অন করে বর্ণের দিকে তাকাল সে।হৃৎপিন্ডে ঢিপঢিপ।ঢিপঢিপ।শব্দ অনুভব হলো।প্রথম নয়।চাওয়াপাওয়ার অনুভুতি যেদিন বদলে ছিলো।নতুন কামনায় পড়ে,যেদিন সে বর্ণকে প্রথম অন্য চোখে দেখেছিলো।ঠিক সেই মুহূর্তের পর বিশেষ একটা সময়ে তার বুকের ভিতর ঢিপঢিপ।ঢিপঢিপ।শব্দ আরম্ভ।

বর্ণ এলোমেলোভাবে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে।জলপাই থ্রি কোয়াটারের সাথে পরা মিষ্টি কালারের টিশার্ট নাভির উপরে উঠে গেছে।একটা ছেলের নাভি এতটা মাদকতাপূর্ণ হতে পারে?এটা সম্ভব!কি গভীর!কি নেশাভরা!স্লিম পেট।হেমন্তের হালকা ঠান্ডার ভিতর সে ঘেমে যাচ্ছে।চোখ মৃদু কাঁপছে তার।সে বর্ণের পায়ের কাছে সরে বসলো।কাঁপাকাঁপা ঠোঁটে নিচু হয়ে বর্ণের নাভিতে হালকাভাবে ঠোঁট ছোঁয়ালো।ঘুমের ঘোরে বর্ণ শিহরে উঠল।পাশ ফিরে ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলল,তীর্থ ভাইয়া,ঘুমাওতো।জ্বালিও না।

সে উঠে ওয়াশরুমে যেয়ে পানির কল ছাড়লো।কয়েক ঝাপটা পানি চোখেমুখে দিলো।তারপর তোয়ালেতে হাতমুখ মুছে বাইরে এলো।

বর্ণ কে মৃদু ধাক্কা দিলো।বর্ণ চোখ বন্ধ অবস্থায় বলল,তীর্থ ভাইয়া।আবার!

সে ‘হুসস’ বলে বর্ণের ঠোঁটে হাত রাখলো।বর্ণের কানের কাছে মুখ নিল,আমার সঙ্গে এক জায়গা যাবে?

তার বুকে ঢিপঢিপ।ঢিপঢিপ।

তখনও বর্ণের ঘুমভাব।সে সর্তক হলো,কি বল,যাবি তো?

বর্ণের বুকেরও ঢিপঢিপ।ঢিপঢিপ শব্দ।বর্ণ আড়মোড়া ভাঙ্গল,কই যাবে এতো রাতে?

-যাবি তো চল,গেলে দেখবি।

বর্ণ উঠে বলল,দাঁড়াও মুখে পানি দিয়ে আসি।আর সাদা টিশার্টটা পরে আসি।রাতে অদ্ভুত কম্বিনেশন হবে।

জোড়াদিঘির উত্তরপাড়ে শিউলতলায় এসে থামল তারা।বর্ণের বুকে ধুকধুক।ধুকধুক শব্দ।

-কি ভয় লাগছে?দেখ না,কি স্বচ্ছ কাঁচজোসনা।তামাম জোড়াদিঘি চকচক করছে।দিঘিতে পদ্মফুল থাকলে সুন্দর লাগতো না?

-হুম,লাগতো হয়তো।তীর্থ ভাইয়া,এখানে কেন এলে?

সে নাকে লম্বা শ্বাস টেনে বলল,কি মিষ্টি শিউলিফুলের ঘ্রাণ।নেশায় ঘোর লেগে যায়।

বর্ণ ঘাড় চুলকালো,তুমি শিউলিফুল পছন্দ করো?

সে আরেকবার গন্ধে বিভোর হলো,হুম।আমার সব থেকে প্রিয় ফুল।

বর্ণ মুখে হাত রেখে দীর্ঘ নিঃশ্বাস টেনে ছেড়ে দিল,কি জানি।

-দক্ষিণপাড়া যাবি?আমাদের প্রাইমারি স্কুল মাঠে?

বর্ণ অবাক হয়ে বলল,এতো রাতে?

-তো কি?সাইকেলে করে যাবো।

-কি শুরু করলে বলো তো,তীর্থ ভাইয়া।

-যাবি কি’না বল!

বর্ণ বিরক্ত হলো,আচ্ছা চলো।

সে কয়েকটা ঝরেপড়া শিউলিফুল কুড়িয়ে বলল,চল,সাইকেল নিয়ে আসি।

বড় বাড়ি ফেলে রাস্তায় এসে সে বলল,নে ওঠ।

বর্ণ সাইকেলের পিছনের ক্যারিয়ারে বসতে গেল।

-শোন,সামনে বোস।পিছনে বসলে সামলাতে পারবো না।

-কি সামলাতে পারবে না।কি সব বলো।

-ধ্যাত,যা বলছি তাই কর।আমার কোমরে সুড়সুড়ি।তুই পিছনে বসে আমাকে ধরলে….!

বর্ণ সামনে উঠে বসতে বসতে বলল,নতুন কথা বলো কেন,কোমরে সুড়সুড়ি কবে ছিলো তোমার?

বর্ণের ঘাড়ে ভারি নিঃশ্বাস পড়ছে।গা ঝাড়া মারলো তার।বাঁপাশের পরিচিত শব্দ অনুভব হলো।

বর্ণ এক হাত ঘাড়ে নিঃশ্বাস পড়া জায়গায় চেপে রেখে বলল,সাইকেলে করে কলেজে যাও।

-কে কলেজে যায়?

-তুমি ছাড়া আর কে?

-ওহ,হ্যাঁ।আমরা দু’ভাই এসএসসি পাশ করার পর আব্বাজান কিনে দিয়েছিল।তারপর ইন্টার পাশের পর একখান আমার বড় মামার ছেলে রনি নিয়ে গেছে।এখন একটাই আছে।

-আচ্ছা,তোমার ডিগ্রি ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে গেছে?না,স্বার্থ ভাইয়া বলছিলো কবে যেন?

-হুম,সে তো কবে।

-রেজাল্ট?

-কি জানি কবে দেয়।

‘উফস’ বর্ণ অস্পষ্ট শব্দ করল,আস্তে।ব্যথা করছে।

সে মুচকি হাসলো।বর্ণের পিঠের পিছনে আরেক হৃৎপিন্ড।অদেখা হাসি।তবুও তার প্রভাবে বর্ণের অদেখা বুকের যন্ত্র ঢিপঢিপ।ঢিপঢিপ করলো।

সে মজা করল,কোথায় ব্যথা করছে?

-তুমি জানো না?

-নাহ।

-সামনে এভাবে বসা যায়,কি শক্ত রড।

-আর একটু।হয়ে গেছে।

‘ধুর’ বর্ণ লজ্জা পেল,কি সব শুরু করলে।কি হয়ে গেছে?

-আরে পাগলা,বললাম স্কুল মাঠে চলে আসছি।

সাইকেল স্ট্যান্ড করে তারা মাঠের মাঝখানে এসে বসল।বর্ণ বলল,আমার ঘুম পাচ্ছে।

সে সমাধান দিলো,আমার কোলে শুয়ে ঘুমা।আমি তোকে সারারাত পাহারা দেই।

‘লাগবে না’ বলে বর্ণ সবুজ ঘাসে ভরা মাঠে শুয়ে পড়লো।

সে শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,বর্ণ,আকাশের চাঁদটা কি সুন্দর না?

-হুম।

-কচু।আমার পাশে যে শুয়ে আছে তার কাছে ঐ চাঁদ কিছু না।

-ডোন্ট ফ্লার্ট,তীর্থ ভাইয়া।দিস ইজ নট ফেয়ার।তুমি তো আমার থেকে কত সুন্দর।সবকিছুতে কি দারুন তুমি।সব বেশে মানিয়ে যায় কেমন।বেশ লাগে।

সে ঘুরে একটা হাত নিজের মাথার নিচে দিয়ে উঁচু হয়ে পাশ ফিরে বর্ণের দিকে তাকাল,আমি কখনো মিথ্যা বলি না।

বর্ণ হাসল,শুধু অন্যের গাছের ফল চুরি করো?

সে বর্ণের বিদ্রুপের জবাব দিলো না।আবার চিৎ হয়ে বর্ণের পাশে শুয়ে বলল,কত তারা আজ আকাশে,যেন সোনালী চুমকি।আচ্ছা,তুই কখনো সমুদ্র দেখেছিস?

-হুম,এসএসসির পর আমি,আন্না,ভাবি,অনু আপু কুয়াকাটা গিয়েছিলাম।

-আমি কখনো সমুদ্র দেখিনি।

-কেন?যেতে ইচ্ছা করলে তো যেতে পারো?

-হুম,পারি।কিন্তু একটা স্বপ্ন আছে?

-কি?

-ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে সাগরতীরে একবার হলেও তার হাতটা ধরে হাটতে চাই।

-তাহলে অনু আপুকে নিয়ে যেতে পারো।

-মানে?

বর্ণ কথা এড়িয়ে গেল,কিছু না।

সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,রাতের আকাশকে নীল দেখায় না কেন?জানিস!

-আমি তোমার মতো পন্ডিত না।

-আমি পন্ডিত?

বর্ণ মাথা নাড়াল।সে বলল,পাহাড়ে গিয়েছিস কখনো?

-নাহ।পাহাড় দেখলে আমার বুক ধুকধুক করে।স্বার্থ ভাইয়া ধমক দিলেও অমন শব্দ হয় বুকের মাঝে।

-স্বার্থকে ভয় পাস?

‘সব সময় না তো।যখন পাগলামি করে’ কথাটা বলে বর্ণ প্রসঙ্গ বদলালো,তোমার কি আজ মন খারাপ,তীর্থ ভাইয়া।

-কই না’তো।তোর কেন মনে হচ্ছে আমার মন খারাপ?

-কেন জানি মনে হলো।

সে হঠাৎ উঠে বসলো।বর্ণের দিকে তাকাল।বর্ণকে মায়া জোসনায় মায়াবি লাগছে।ঠিক যেন এক টুকরো শুভ্র মেঘ।

সে অন্যদিকে ফিরল,গান শুনবি?

বর্ণ চাঁদের দিকে চোখ স্থির রেখে বলল,তীর্থ ভাইয়া,তুমি গান গাইতে পারো?

-এতো পাকামো করিস কেন?সারাক্ষণ প্রশ্ন আর প্রশ্ন।শুনবি কি’না বল।

বর্ণ চোখ বন্ধ করল,আচ্ছা শোনাও।

সে প্রশ্ন ছুড়ল,রবীন্দ্র সংগীত,চলবে।

‘হুম’ বলে বর্ণ একবার চোখ খুলে আবার বন্ধ করল।

সে আবার শুয়ে পড়ল বর্ণের পাশে।

তারপর সে তার কন্ঠে সুর তুলল,

আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি পাইনি,

তোমায় দেখতে আমি পাইনি ।

বাহির পানে চোখ মেলেছি, আমার হৃদয় পানে চাইনি ।

আমার সকল ভালোবাসায় সকল আঘাত সকল আশায়,

তুমি ছিলে আমার কাছে,তোমার কাছে যাইনি!!

তুমি আমার আনন্দ হয়ে ছিলে আমার খেলায়,

আনন্দে তাই ভুলে ছিলাম,কেটেছে দিন হেলায়।

গোপন রহি গভীর প্রানে,আমার দুঃখ সুখের গানে,

সুর দিয়েছো তুমি,আমি তোমার গান তো গাইনি।।

তার দু’চোখের কোণ বেয়ে কয়েক ফোঁটা পানি পড়ল শৈশবের স্মৃতিভরা সেই স্কুল মাঠের সবুজ ঘাসে।

এতো আবেগ দিয়ে গাইল।কি মোলায়েম!জলের ধারার মতো কন্ঠ।চেনা হৃদ কম্পন ঢিপঢিপ।ঢিপঢিপ।বর্ণ চোখের পাতা খুলতেই দু’চোখের দু’ফোঁটা অবাক অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।কোমল জোসনাঝরা চাঁদ অবাক হয়ে দু’জনের পাণে চেয়ে রইল।অবাক জোসনা।অজানা ব্যথায় আজ দু’টি হৃদয় কাতর।কি সে ব্যথা!কিসের ব্যথা।

নিশ্চুপ চারপাশ।মাঝে মাঝে ঝিঁঝিপোকা তার অস্তিত্ব জানা দিচ্ছে।অনেকক্ষণ কেউ কোন কথা বললো না।

বর্ণ চোখের পানি মুছল,জানো,ছোটবেলা থেকে জানি,স্বার্থ ভাইয়া খুব সুন্দর রবীন্দ্র সংগীত গায়।শোনার জন্য মন কেমন করতো।ভয়ে কোনদিন বলতে পারি।

সে আর্দ্র কন্ঠে অভিমানী সুর টানল,তোর সব কথাতেই স্বার্থ ভাইয়া!স্বার্থ ভাইয়া।কেন আমি কি খারাপটা গাইলাম?

বর্ণ হাসল,পোড়া গন্ধ পাচ্ছি।কোথাও কিছু পুড়ছে বোধহয়।

-ইশ।আমার বয়ে গেছে।

-তীর্থ ভাইয়া,খুব খুব সুন্দর গেয়েছো তুমি।স্বার্থ ভাইয়ার……!

সে বর্ণকে কথা শেষ করতে দিলো না,আবার?

বর্ণ হো হো করে হেসে উঠলো।

সে কাতর হলো,এভাবে হাসি না।বুকের ভিতর ভাঙ্গন ধরে।

-ধুর,তীর্থ ভাইয়া।তুমিও না।সব সময় হেয়ালি করো।

সে হাসল।বর্ণের ভিতরটা চুরমার হলো কেমন!

সে সত্যিই হেয়ালি করল,ভুল বললি,আমি বড্ড খেয়ালি।

-তুমি পারোও বটে।সব সময় সব কথার উত্তর থাকে না?

‘হুম’ বলে সে আবার উঠে বসল,উত্তরে হাওয়া দিচ্ছে।শীত শীত লাগে।চল।

বর্ণ এবার উঠে বসল।বলল,আরেকটু থাকি।ভালো লাগছে।

বর্ণ মোবাইলে সময় দেখল,দু’টো বেজে গেছে,চল।শিশির পড়ছে।দেখ না,ঘাস ভেজা ভেজা লাগছে।

সে উঠে দাঁড়াল।বর্ণ বসা থেকে হাত বাড়িয়ে দিল,নাও তোলো।

সে আপত্তি করল,নিজে উঠ না।

বর্ণ উঠে সাইকেলের কাছে হেটে এসে দাঁড়ালো।

বর্ণ এবার সামনে বসতে আপত্তি করল,তীর্থ ভাইয়া,সামনে বসলে আমার কেমন জানি লাগে!পিছনের ক্যারিয়ারে বসি?

সে মজা নিল,কেমন লাগে?ব্যথা লাগে।

-ধুর,ওটা না।তুমি বুঝবে না।আচ্ছা তোমার কোমরে সুড়সুড়ি তো।তোমাকে না ধরলে তো হলো।

সে বর্ণকে ক্ষেপালো,পিছন থেকে পড়ে গেলে?যদি ঘুমিয়ে যাস।

-তোমাকে বলেছে।

-আচ্ছা বোস।ইটের রাস্তা।খালের ভিতর পড়লে বুঝবি।

বর্ণ পিছনে বসল,পড়লে পড়বো।তাতে তোমার কি?

-আমার আবার কি?ক’দিন কেঁদেকেটে না খেয়ে থাকতে হবে এই যা।

-ইশ।তুমি কাঁদবে কেন?

-খালে পড়লে তো আমি তুলবো না।কি হবে তখন?

-তোমাকে তুলতে হবে না।মরলে মরবো।

সে এক হাতে চলতি সাইকেলের ব্রেক ঠিক রেখে আরেক হাত উঠিয়ে বলল,চড় দিয়ে সব ক’টা দাঁত ফেলে দেবো।

বর্ণ হাসল,আজিব!তুমি যে কথাটা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বললে আমি সেটা ডিরেক্টলি বললাম।তাতে আমার দোষ?

সে রেগে গেল,গ্রামের ছেলে হয়েও তুই সাঁতার শিখলি না কেন?

-হয়েছে।খালি ঝগড়া।তাড়াতাড়ি চলো তো হাওয়ায় শীত করছে।

-সাইকেলের সামনে তো আমি।সব হাওয়া আমারই লাগছে।তোর তো শেল্টার আছে।

-কি পুরুষ আমার।তো তোমার বুঝি ঠান্ডা লাগছে না।

-হুট,আমি তোর পুরুষ হতে যাবো কেন?

-ধ্যাত,আমি তাই বললাম নাকি?বললে বা কি?তোমার জন্য কি এমন রাজকন্যা বসে আছে!

-আছে,আছে।দেখবি আমার জীবনসঙ্গী হবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দর।

বড় বাড়ি ঢুকতে সাইকেলে বেল বাজালো সে।বর্ণ সর্তক করলো,কি আজব,বেল বাজাচ্ছো কেন?কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।

সে অভয় দিল,আরে তাতে কি?এ আওয়াজ কাউসার চৌধুরীর রাজমহলে ঢুকবে না।

বর্ণ বলল,কতো যে সাহসী আমার জানা শেষ।ঢুকলে তো এই জোড়াদিঘি পাশ দিয়ে,বাড়ির সামনে দিয়ে চলো দেখি।

-আরে না,পাগল!খান চাচা,সারারাত বাড়ির সামনে পাহারায় খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে থাকে।লোকটার ঘুম নেই।

-খান চাচা বুঝি বেলের আওয়াজ শুনবে না?

সে সাইকেল থামলো,তাও তো কথা।নে নাম তাড়াতাড়ি।

রুমে ঢুকে সে বলল,বর্ণ,তোর শীত লাগছে বললি না?

‘হুম’ বলে বর্ণ বিছানায় উঠলো।সে বলল,তাহলে গায়ে কাঁথা রাখিস না কেন?

বর্ণ উপুড় হয়ে শুলো,আরে,থাকে না তো।ঘুমিয়ে গেলে কিভাবে জানি পড়ে যায়।

-তোর শোয়ার যে অবস্থা।টিশার্ট অবধি উঠে যায়।ঠান্ডা লাগিয়ে একটা বড় কিছু হবে।এক কাজ কর,থ্রি কোয়াটারের ভিতর টিশার্ট গুঁজে দে।

বর্ণ শোয়া থেকে উঠে বিছানার একেবারে কাছ ঘেষে হাটু মুড়ে দাঁড়াল,তুমি করে দাও।

সে ঢোঁক গিলল,আমি?

সে বিছানার কাছে ছিলো।বর্ণ তাকে টেনে তার হাত বর্ণের পেটের উপর রাখল,হুম দাও।

হাত কাঁপছিলো তার।বলল,তুই নিজে করে নে।

বর্ণ তাকাল,তোমার হাত কাঁপছে কেন?

সে চোখ বুজলো।চোখে গম্ভীর।অথচ নেশাভরা নাভি ভেসে উঠলো।

সে দ্রুত হাত সরিয়ে নিল,লাগবে না।যা তো সর।ঘুম পাচ্ছে।

দু’জন বিছানার দু’দিকে উল্টো মুখে শুয়ে আছে।বুকে তাদের ঢিপঢিপ।ঢিপঢিপ।শব্দ।

দেয়াল ঘড়িতে রাত তিনটার সুর টিক।টিক।টিক। করলো।

(নবম পর্ব)

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>> 

বিঃদ্রঃ তোমার একটিমাত্র জীবন যদি প্রেমহীন থেকে যায়,শর্তহীন দলিলে যদি কোন বিবাদীর নাম লেখা না থাকে,অনাবিষ্কৃত ভালোলাগা যদি তোমার ঠোঁটের আঙ্গিনায় বিরহ না জাগায়,একটিমাত্র জীবনে তুমি যদি কলঙ্ক এর সুখই না পেলে-তবে তুমি…!তবে তুমি আমার গল্প পড়ো না।

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>> 

সতেরো।

অনন্তদের বাড়ি থেকে ফেরার পথে বর্ণ মনে মনে ভাবল,তীর্থ ভাইয়া রাতে কেমন একটা করে,যেন অন্য মানুষ।আবার এখন তো ঠিকই আছে।বর্ণের কাঁধচেপে দিব্বি তাকে জড়িয়ে ধরে হাটছে।

তীর্থ হাসল,কি’রে সকাল থেকে দেখছি আমার দিকে হা করে তাকিয়ে থাকছিস!ঘটনা কি?

বর্ণ বলল,কই কিছু না তো।

-তাহলে বারবার আমার দিকে না তাকিয়ে সামনে তাকিয়ে হাট।স্বার্থ আর অনন্ত দেখ তো কতদূর চলে গেছে।এখনি দেখবি স্বার্থের ধমক খাবি।

বর্ণ মজা নিল,তুমিও কি স্বার্থ ভাইয়াকে ভয় পাও?

তীর্থ ডান হাত দিয়ে বর্ণের চুল টানল,খুব পেকেছিস।আমি কেন ওকে ভয় পাবো?

-সত্যিই পাও না?

তীর্থ বর্ণকে ছেড়ে বাম হাতের মার্সেল দেখাল,এই দেখ।আমি কত পালোয়ান।

বর্ণ বিদ্রুপ করল,পালোয়ান না ছাই!রাতে তো দেখি আমার ভয়েও কাঁপছিলে।

তীর্থ হাত উঠালো,মার খাবি।বড়দের নিয়ে মজা হচ্ছে।

তারপর বর্ণকে পুনরায় জড়িয়ে ধরল,কেন তুই ভয় পাস না স্বার্থকে?

বর্ণ হেসে তীর্থের দিকে তাকাল।চোখে ইশারা করল,খুব।

দু’জনই হেসে দিল।স্বার্থ দূর থেকে বলল,দু’টোকে গাছ থেকে ডাল ভেঙ্গে পিটাবো।দ্রুত পা চালা।এক জায়গা হলে সারাক্ষণ কি সব গল্প করে,আর হাসে।

তীর্থ মুচকি হেসে মুখে তর্জনী আঙ্গুল ঠেকালো,চেপে যা,চেপে যা।

বর্ণ ফিসফিস করে বলল,কি,হুম?তুমি বলে ভয় পাও না।

তীর্থ বর্ণের হাতে টান মারল,আরে কথা না বলে দ্রুত পা চালা।

স্বার্থ আবার পিছু তাকাল।

অনন্ত বলল,আরে ওদের তাড়া দিচ্ছিস কেন?যা করে করুক।জানিস তো দু’টোতে এক জায়গা হলে কেমন করে।আমার দোকানে যেতে হবে।দেখলি তো,তোদের পেলে মা ছাড়তে চাই না।

স্বার্থ মজা করল,তোর বা এতো তাড়া কিসের?ডেটিং আছে নাকি বৌদির সঙ্গে?

-আরে ধুর।তোদের নিয়ে ফিরে আসতে আসতে সন্ধ্যা হয়ে গেল।সন্ধ্যায় শফিক স্যারের কাছে সুমন্ত পড়তে যায়।জানিসই তো,দিদি,বাবা চলে যাওয়ার পর আমাদের কি অবস্থা গেছে।নিজে তো পড়তে পারলাম না তিনটা মানুষের সংসার সামলাতে গিয়ে।এখন ছোটভাইটাকে যদি একটু পড়াতে না পারি।

স্বার্থ অনন্তের কাঁধে হাত রাখল,আরে বাদ দে।মন খারাপ করিস না।যা হওয়ার হয়েছে।শফিক স্যার মানে আমাদের কলেজের শফিক স্যার?

অনন্ত মাথা নাড়াল,হ্যাঁ,ঐ যে দক্ষিণপাড়া।

-এই উত্তরপাড়া থেকে দক্ষিণপাড়া পড়তে যায় সুমন্ত।

-কি আর করা।

-তোর মনে আছে?একবার একুশে ফেব্রুয়ারিতে শফিক স্যারের বাড়ি গাঁদা ফুল চুরি করতে গিয়ে প্রায় ধরা পড়ে গেছিলাম।

অনন্ত হাসি চাপল,মনে আবার থাকবে না!তীর্থই তো শফিক স্যারের মা’কে ভয় দেখিয়ে অজ্ঞান করে দিল।বেচারী ভয়ে প্রায় আধমরা হয়ে গেছিলো।

স্বার্থ বলল,আচ্ছা রত্নার কি খবর?

অনন্ত জিভ কাটল,উফস,তোকে তো বলাই হয়নি।আরে তীর্থকে তো বলেছিলাম তোকে বলতে।আমি ব্যস্ত থাকি বলে তোকে ফোন করা হয়ে উঠে নি।

-আরে কি বলিস নি?বলবি তো।

-বাইশ তারিখ আমাদের বিয়ে।আমি তো ভাবলাম এই কারনে তুই এসেছিস।

স্বার্থ অনন্তের পেটে খোঁচা দিল,শালা,আমাকে না বলেই এতোদূর।

-ঐ আমার কি দোষ?তীর্থ,তোকে বলেনি আমি জানি?

স্বার্থ নেতাজির মতো হাত উঠালো,তাহলে বন্ধু,তোর শ্বশুর,সত্যজিৎ নারায়ণ গদাধর তোকে মেনে নিল,কি বল?

‘আরে ধুর,তুইও না’ অনন্ত হাটার গতি বাড়াল,পিছনের বাঁদর দু’টোকে বল বাড়ি ফিরতে।তোকে দোকান বন্ধের পর এগিয়ে দিয়ে আসবো।

স্বার্থ জোরেশোরে বলল,ঐ তীর্থ,তুই বর্ণকে নিয়ে বসুরখাল দিয়ে বাড়ি যা।আমি পরে আসছি।বর্ণকে অন্ধকারে দেখেশুনে নিস।

তীর্থ চেঁচাল,তোর এতো দরদ থাকলে তুই নে না।

স্বার্থ হাত উঠিয়ে মার দেখালো,মার খাবি।সেদিন রাতের কথা কিন্তু সবাইকে বলে দেবো,আব্বাজান,দাদাজানকেও।

তীর্থ হাক পাড়ল,ওকে,ওকে।যাচ্ছি তো।শুধু ব্ল্যাকমেইল করা।

বর্ণ জিজ্ঞাসা করল,কোনদিন রাতে কি হলো তীর্থ ভাইয়া।

তীর্থ কথাটার পুনরাবৃত্তি করল,কোনদিন রাতে কি হলো,তীর্থ ভাইয়া।পা চালা,পাকনামি করতে হবে না।

ড্রয়িংরুমে সকলে চুপচাপ বসে আছে।বারবার বর্ণের চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে।সন্ধ্যায় এসে দেখে শরীয়তপুর থেকে তার আন্না,ভাবি এসে হাজির।আন্না যখন জানালো,হৃদয় পাগলের মতো অনুকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।তখন বর্ণের ভিতরটা মোচড় দিল।কেন তার আন্না এমন করছে।অনু আপুটার কোন মায়াদয়া নেই।একটা ছেলে একটা মেয়েকে ভালোবেসে পাগল প্রায়।আর এরা..!কি অদ্ভুত!

শরীফ কাউসার চৌধুরীর দিকে তাকাল,নানাজান,হৃদয়কে একদিন আমার ছেলেপেলে মেরেছে পর্যন্ত।সাদেক চেয়ারম্যান ক্ষেপে আছে।অনুকে তো আর গ্রামে নেওয়া সম্ভব না।

কাউসার সাহেব কিছুক্ষণ ভাবল।তারপর বললেন,আমার মেয়েটা এক্সিডেন্টে যখন হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায়,তখন আমার হাতটা ধরে বলে গেছে,আব্বাজান,আমার একটা মাত্র মেয়ে অনু।তাকে তুমি তোমার পরিবারের বউ করে এনো।ভাইজানের মেজ ছেলে স্বার্থের বউ করো।

দাদীজান শাড়ির আঁচলে চোখ মুছলেন।রমজান চৌধুরী সম্মতি দিলেন,আব্বাজান আমার তো কোন অমত নেই।

তারপর স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন,নাজমা,স্বার্থকে নিচে আসতে বলো।

তীর্থের দিকে তাকালেন,তুই তোর ভাবিকে নিচে আসতে বল।পার্থ দেশে নাই।সুতরাং তার এখানে থাকা দরকার।আর শোন,অনু যেন এখানে না আসে।

তীর্থ শুকনো মুখে বলল,আচ্ছা,আব্বাজান।

বর্ণ সেটা লক্ষ্য করল।সুমীর কাঁধের কাছে সোফায় ঠেস দিয়ে সে দাঁড়িয়ে ছিল।ফিসফিস করে বলল,ভাবী,এগুলো কিন্তু তোমরা ঠিক করছো না।

শরীফ বর্ণকে ধমক দিল,তুই উপরে যা।এখানের থাকার দরকার নাই।

বর্ণ দৌড়ে উপরে উঠতে গিয়ে সিঁড়িতে স্বার্থের মুখোমুখি হলো।তীর্থ মুখ অন্ধকার করে তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে।বর্ণ কোন কথা না বলে পাশ কাটিয়ে উঠে গেল।

রমজান চৌধুরী নড়েচড়ে বসলেন,পার্থ দেশের বাইরে।তুমি এ বাড়ির বড় বউ,তোমার মতামতও গুরুত্বপূর্ণ।স্বার্থের সাথে আমাদের অনুর বিয়ের কথা বলছি,তুমি কি বলো।

রিতু মাথার ঘোমটা ঠিক করল,আপনারা মুরুব্বিরা আছেন।আপনারা যা ভালো মনে করেন।তাই করবেন।আমার অমত নেই।

রমজান চৌধুরী স্বার্থকে বললেন,আপনি কি বলেন আব্বু?আপনার মত আছে এ বিয়েতে?

স্বার্থ তীর্থের দিকে তাকাল।তীর্থ চোখের ইশারা করে ঠোঁটে আঙ্গুল রাখলো।স্বার্থ বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,আব্বাজান,আপনারা যা চান তাই হবে।

‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে কাউসার চৌধুরী বললেন,তাহলে রমজান,শরীফ তোমরা বিয়ের আয়োজন শুরু করে দাও যত তাড়াতাড়ি পারো।

তিনি আবার বললেন,অনুর মতটা নেওয়া দরকার না?

শরীফ বলল,না নানাজান।ও আমাদের উপর কোন কথা বলবে না।

স্বার্থ তীর্থের কাছে যেয়ে কানে কানে বলল,উপরে আমার রুমে আয়,কথা আছে।

বর্ণ এতক্ষণ উপরে দাঁড়িয়ে ছিল।পার্থদের রুমে ঢুকে বলল,আপু,শুনলি স্বার্থ ভাইয়ার সাথে আন্না তোর বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে।

মিশু বিছানা থেকে উঠে এসে বলল,বর্ণ কাকু,কোলে নাও।

বর্ণ বিছানায় বসে মিশুকে কোলে নিল,আপু,হৃদয় ভাইয়াকে ঠকানো হচ্ছে কিন্তু।ছেলেটা তোমাকে অনেক ভালোবাসে রে আপু।

অনু উত্তেজিত হয়ে গেল,ঐ কুত্তার বাচ্চার দালালি তোকে কে করতে বলেছে,হুম?তুই এখনি আমার চোখের সামনে থেকে যাবি।বের হ।

বর্ণ সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে অন্ধকার ছাদে উঠে গেল।যে আন্না,আপু তাকে কখনো ফুলের টোকা পর্যন্ত দেয় নি।তারা আজ এমন ব্যবহার করছে।সে কি করেছে?তীর্থ ভাইয়াটা পর্যন্ত কেমন যেন একটা হয়ে গেল।তার কেবল একটা কথা মুখ ফুটে বের হলো,স্বার্থ ভাইয়ার সাথে অনু আপুর বিয়ে হয়ে যাবে?

তার বুকের ভিতর কেমন একটা করলো,অন্ধকারের ভয়ে নাকি অন্য কোন কারন।এই অকারণের কারনটা বর্ণের অজানা।

অন্ধকারে দু’টি হাত পিছন থেকে বর্ণকে জড়িয়ে ধরল।বর্ণ কেঁপে উঠল।জড়িয়ে ধরা মানুষটি বর্ণের মাথায় নিজের থুতনি ছুঁইয়ে বলল,এখানে এসে খুব সাহস বেড়ে গেছে না?অন্ধকারে কি করছিস একলা ছাদে?

বর্ণ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল,ও তীর্থ ভাইয়া।এমনি ভালো লাগছে না।

সে তার দু’হাত দিয়ে বর্ণের হাত দু’টোকে মুষ্টিবদ্ধ করলো।কিছুটা সময় নিয়ে বর্ণকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল,কি’রে কাঁদছিস?

বর্ণ নাক টানল।নরম সুরে বলল,তুমিও তো কাঁদছো?

-আমি তো কাঁদছি খুশিতে।

-খুশিতে মানুষ কাঁদে?

-কাঁদে।বুদ্ধুরাম।তুই কিচ্ছু জানিস না।

-তো কিসের খুশিতে কাঁদছো শুনি।

-বাহ রে,তুই জানিস না?

-স্বার্থ ভাইয়ার সাথে আপুর বিয়ে হচ্ছে।তুমি খুশি হয়েছো,তীর্থ ভাইয়া?

সে সার টানল,আমার ভাইয়ের বিয়ে হচ্ছে!আমি খুশি হবো না?কেন,তুই খুশি হোস নি?

‘জানি না’ বলে বর্ণ তাকে জড়িয়ে ধরল।

দু’জনের বুকের বাঁপাশে মাংসের নিজে থাকা দু’টি হৃৎপিন্ডের ঢিপঢিপ।ঢিপঢিপ।শব্দ অবিরাম বেড়ে চললো।

‘প্লিজ,বর্ণ,আর কিছুক্ষণ এভাবে থাকলে আমি হার্ট ফেল করবো!’নিজেকে ছাড়িয়ে নিল সে।

তারপর ভেজা কন্ঠে অনুমতি চাইল,একটা প্রশ্ন করবো তোমাকে?স্যরি,তোকে!

বর্ণ হাসল,হার্ট ফেল করবে বললে কেন?আচ্ছা কি জানতে চাও বলো।

সে অনেকক্ষণ সময় নিল,তুই কি স্বার্থকে ভালোবাসিস?

বর্ণ লজ্জা পেল,ধুর তীর্থ ভাইয়া।কি সব অযৌক্তিক কথা বলো।তুমি আমার মামাতো ভাই,সেও আমার মামাতো ভাই।তোমাকে তো ভালোবাসি!তাকে ভালোবাসবো না?ভাইদেরকে সবাই ভালোবাসে!

সে মুচকি হাসল।যে হাসি অন্ধকার ভেদ করে বর্ণের চোখে ধরা পড়লো না,তবুও বর্ণের হৃৎপিন্ডে শব্দ হলো ঢিপঢিপ।ঢিপঢিপ।বর্ণ বুকে হাত দিল।

সে বলল,তুই বেশ বড় হয়ে গেছিস রে,বর্ণ।কেমন কথা লুকাতে শিখেছিস,যুক্তি দিতে শিখেছিস।

বর্ণ ‘তীর্থ ভাইয়া’ বলে আবার জড়িয়ে ধরতে গেলে সে এক পা পিছিয়ে বলল,প্লিজ,আর না।নিচে চল।ঘুম পাচ্ছে।ছাদে হাওয়া দিচ্ছে,তোর ঠান্ডা লেগে যাবে তো।

আলোচনায় বিয়ের তারিখ পড়ল।

অধিকাংশ কেনাকাটা শেষ।বিয়ের দু’দিন আগে এক দুপুরে খাওয়া দাওয়া শেষে তীর্থ আর বর্ণ গল্প করছিলো।

নাজমা চৌধুরী একগাদা শাড়ি এনে তীর্থের সামনে ফেললো।

তীর্থ হেসে বলল,আম্মা,তুমি এগুলো আমার সামনে ফেলছো কেন?আমি কি এখন শাড়ি পরবো?

নাজমা চৌধুরী বিরক্তবোধ করলেন,সরে বোস।ঐ ফাজিল!আমি কি বলছি তুই শাড়ি পরবি?

বর্ণ খেয়াল করেছে,প্রথম দিন বিয়ের কথা আলোচনায় তীর্থকে যেমন শুকনা লেগেছিল।সেই রাতের পর থেকে সে আর তেমন নেই।আগের মতো হাসিখুশি।প্রাণবন্ত।সেই দুষ্টুমি।ফাজলামি।সব যেন ফিরে এসেছে।

তীর্থ তার আম্মাকে জড়িয়ে ধরল,নাজমা চৌধুরী,তুমি কিন্তু রেগে যাচ্ছো!

তিনি হাত উঠালেন,চড় খাবি।আম্মাজান শহরে লোক পাঠিয়ে একগাদা শাড়ি এনেছে।তোদের দু’টো পছন্দ করে দিতে বলেছে।

বর্ণের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন,বাবা!বর্ণ,দেখ তো পছন্দ হয় কি’না!

বর্ণ একটা শাড়ি হাতে নিল।তীর্থ কেড়ে নিয়ে বলল,এই রাখ তো।

তারপর আম্মার দিকে তাকাল,বুড়ি তো অমনই।আমরা কি শাড়ির কিছু বুঝি?তুমি সুমি ভাবি বা বড় ভাবীকে বলো।

নাজমা চৌধুরী ভ্রু কুচকালো,তুই একটু বেশি বেশি।সুমি,রিতু গহনা পছন্দ করছে নিচে।

তীর্থ তার আম্মাকে চটালো,বাহ!বাহ।নাজমা চৌধুরী,তুমি বউদের দামী জিনিস পছন্দ করতে দিয়ে এসে,আমাদের সস্তা জিনিস ধরাচ্ছো।

তিনি রেগে গেলেন,নাইমুন,তোর সব সময় ফাজলামি।ভাল্লাগেনা।

তীর্থ তাকে আবার জড়িয়ে ধরল,আম্মা,আম্মা।মজা করছিলাম তো।

তিনি তীর্থকে ছাড়িয়ে বললেন,ছাড় তো।সাইমুন আর অনু কখন ফিরবে?

এ বাড়িতে একমাত্র নাজমা চৌধুরী এই দু’ছেলেকে নিজের বাবার দেওয়া নামে ডাকেন।তীর্থের নানা স্বার্থের নাম রেখেছিলেন সাইমুন,তীর্থের নাম নাইমুন।রমজান চৌধুরী শ্বশুরের সম্মানার্থে, ছেলেদের নামের আগে নিজ বংশ পদবী দিয়ে নামকে যেন ফ্রেমে বাধাই করেছেন।তবে তিনি শ্বশুরের দেওয়া নামে ডাকেন না।স্ত্রী ডাকলে মনোযোগ দিয়ে শোনেন।অল্প বয়সে স্ত্রীর সঙ্গে মজা করে বলতেন,তোমার সাইমুন-নাইমুনকে একটু ডেকে আনো তো।

তীর্থ বলল,স্বার্থদের ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে।লক্ষ্মী আম্মা,তুমি শাড়িগুলো রেখে যাও।আমরা পছন্দ করে নিচে নিয়ে আসছি।

তিনি বেরিয়ে গেলে বর্ণ জিজ্ঞাসা করল,স্বার্থ ভাইয়া আর আপু কই গেছে?

তীর্থ একটা শাড়ি তুলল,আরে,নেত্রকোনা শহরে।দেখতো কোনটা পছন্দ হয়।

বর্ণ ভাবনায় ডুব দিল,এ বাড়িতে এসে স্বার্থ ভাইয়ার সাথে তার একটা কথা পর্যন্ত হলো না।এতো বড় বাড়িতে দেখা হয় কম।কিন্তু খাবার টেবিলে রোজ তিনবেলা তো দেখা হয় তাদের।তবুও কথা হয় না।শহরে এক ফ্ল্যাটে কয়েক মাস কাটিয়ে এলো।রেগে বলুক,শেধে বলুক,কথা তো বলতো।বর্ণের বুকের ভিতরটা ব্যথা করে উঠলো।চোখের কোণ আর্দ্র হয়ে এলো।সে বসা থেকে উঠলো,তীর্থ ভাইয়া,আমি একটু আসছি।তুমি দেখতে থাকো।

তীর্থ তাকাল,তোর আবার কি হলো?

আটারো।

গায়ে হলুদের রাতে প্রায় বারোটার সময় বর্ণ গুটিগুটি পায়ে স্বার্থের রুমের বাইরে গিয়ে দাঁড়াল,স্বার্থ ভাইয়া,ভিতরে আসবো?

হলুদ অনুষ্ঠানে বর্ণ সবুজ পাঞ্জাবীর সাথে সাদা চুড়িদার পরেছে।আধফোটা গন্ধরাজ ফুলের মতো লাগছে তাকে।সে সোফায় বসে টিভি দেখছিলো।বলল,আয়,স্যরি এসো।

বর্ণ ভিতরে গিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।সে চোখের ইশারায় বসতে বলল,কিছু বলবে?

বর্ণ বসে দু’হাত মুচড়াতে লাগল।হলুদের পর কোন ছেলেকে এতো সুন্দর লাগে?কি ভয়ংকর সুন্দর।

বর্ণ বলল,না কিছু বলবো না।এমনিতে আসছি।

-আচ্ছা!তাহলে টিভি দেখো।

বর্ণ ‘আচ্ছা’ বলে তার দিকে তাকাল,ঢাকা থেকে আসার পর আপনি তো একবারও আমার সাথে কথা বললেন না।

সে হাতে রিমোট নিয়ে টিভিতে চ্যানেল পরিবর্তন করলো।বর্ণের দিকে না তাকিয়ে বলল,বলি নি তো কি হয়েছে?তোমার কি এখানে মানুষের অভাব?

বর্ণের গলা ধরে এলো,’ওহ’ বলে উঠতে যাচ্ছিল।সে বলল,বসো।

তারপর অভিযোগ করল,তুমিও তো এখানে এসে একবারও আমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করো নি।সারাক্ষণ তীর্থ ভাইয়া।ভাবী।অনু আপু বলে গলা শুকিয়ে ফেলো।আবার সেদিন অনন্তদের বাড়ি যেয়ে অনন্ত দা।অনন্ত দা।বলে সে’কি অবস্থা।শুধু আমারই খোঁজ তোমার দরকার পড়ে না।

বর্ণ চোখ বুজল,এখানে এসে যে দু’জনের কথা হলো না,তার জন্য কি সে একা দায়ী?মেন্টালটাও তো একবার ডেকে বলতে পারতো,বর্ণ এখানে এসে তোমার বেশ সাহস বেড়ে গেছে।এবার ঢাকা নিয়ে পিটানির উপর রাখতে হবে তোমাকে।কই সেটা তো একবারও বললো না।সে কি জানে না?তার শাসনে বর্ণ অভ্যস্ত হয়ে গেছে।খুব মিস করে তার শাসনটা।

বর্ণ চোখ খুলল,অনু আপুকে যে বিয়ে করছেন,বাধ্য হয়ে করছেন না তো!

সে এবার তাকাল বর্ণের দিকে,তোমার এমন কেন মনে হচ্ছে যে আমি বাধ্য হয়ে বিয়েটা করছি।

বর্ণ বুঝাতে চেষ্টা করল,না,বোনটা তো আমার।তাকে যার সাথে বিয়ে দিচ্ছি সে কোন দ্বিধা ছাড়া বিয়েটা করছে কি’না জানা দরকার তো।

সে টিভি বন্ধ করল,তার জন্য তো এ বাড়িতে মুরুব্বিরা আছে।তোমার পাকামো না করলেও চলবে।আর কিছু বলার থাকলে বলো!না হলে যাও।অনেক রাত হয়েছে।এসব পোশাক ছাড়ো রুমে গিয়ে।

বর্ণ উঠে দাঁড়ালো।এই মুহূর্তে খুব ইচ্ছা করছে একটিবার তার স্বার্থ ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরতে।প্রথম এবং শেষবারের মতো।

সে বর্ণকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল,কি?কিছু বলবে?

বর্ণ ঢোঁক গিলল,একটা অনুরোধ রাখবেন?

-কি বলো।রাখার মতো হলে রাখবো।

বর্ণের চোখ ছলছল করে উঠল,আপনাকে আমি কোনদিন জড়িয়ে ধরি নি।আজ প্রথম আপনাকে খুব জড়িয়ে ধরতে মন চাচ্ছে।কথা দিচ্ছি এটাই প্রথম এবং শেষ।আর কোনদিন এমন দুঃসাহস দেখাবো না।প্লিজ।

সে দু’হাত বাড়িয়ে দিল।

বর্ণ মৃদু পায়ে হেটে কাছে যেতেই সে বর্ণের হাত ধরে টেনে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো।বর্ণের মনে হলো না যে সে প্রথম তার স্বার্থ ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরেছে।কত চেনা আলিঙ্গন।শরীরের কত পরিচিত অলিগলি।আজ বর্ণের বুকের বাঁপাশে ঢিপঢিপ।ঢিপঢিপ।শব্দ হলো না।

সে বর্ণকে নিজের গভীর আলিঙ্গন থেকে ছাড়ল,হয়েছে।এবার রুমে যাও।

নাজমা চৌধুরী হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকলেন।বর্ণের দিকে তাকিয়ে বললেন,ও বর্ণ তুই এখানে!এক কাজ কর বাবা,সাইমুনের গায়ে তো হলুদ পড়ে গেছে।ওকে রাতে একা ঘুমাতে দেওয়া ঠিক হবে না।তুই বরং ওর কাছে শুয়ে পড়।

সে আপত্তি করলো,আম্মা,বাড়ি ভর্তি মানুষ।ও কেন আমার কাছে শুবে।ও তীর্থের রুমে যাক।তুমি অনন্তকে উপরে পাঠিয়ে দাও।

তিনি বললেন,সাইমুন,অনন্ত অনেক ব্যস্ত।এখনো মানুষজন খেতে বাকি।আমরা কেউ ফ্রি না।

সে জানাল,বাড়ি ভর্তি কাজিন।তাদের একজনকে পাঠাও।

নাজমা চৌধুরী হাটা দিল,আচ্ছা,তোর বড় মামার ছেলে রনিকে পাঠাচ্ছি।

বর্ণ মুখটা শুকনো করে ফেলল,আমি কিন্তু থাকতে পারতাম।মাঝে না হয় বরাবরের মতো কোলবালিশ থাকতো।

সে ধমক দিল,তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেন?তোমাকে না যেতে বললাম।

এই প্রথম বর্ণ ধমকে কেঁপে উঠলো না।দরজার কাছে গিয়ে ফিরে তাকাল,আপনি কি পারফিউম চেঞ্জ করেছেন?

সে বলল,হ্যাঁ।বিয়ের জন্য নতুন ব্র্যান্ড কেনা হয়েছে।তোমার এতো সব না জানলেও চলবে।

বর্ণ বারান্দায় এসে স্বার্থের রুম থেকে হাসির শব্দ শুনল।সে মনে মনে আওড়ালো,মেন্টালটা এবার সত্যিই মেন্টাল হয়ে যাবে।তার চোখের পাতা ভারি হয়ে এলো।

তীর্থের রুমে এসে বর্ণ ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা লক করে দিলো।সে পানির কল ছেড়ে আয়নায় তাকাল।দরজায় টোকা পড়লো।বর্ণ পানির কল আরো জোরে ছাড়ল।ধরা গলায় বলল,তীর্থ ভাইয়া,কি হয়েছে?

বাইরে থেকে আওয়াজ এলো,তুই এভাবে ওয়াশরুমে ঢুকলি কেন?বেরিয়ে আয়।

বর্ণ জানালো,চোখেমুখে পানিরছিটা দিচ্ছি তো।আসছি।

-তোর চোখেমুখে পানি দিতে হবে না।আমি বের হতে বলেছি।

বর্ণ তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে ওয়াশরুমের দরজা খুলে রুমে এলো।

প্রতীক্ষিত চোখ দু’টি জিজ্ঞাসা করলো,তুই কাঁদছিস কেন?

বর্ণ বিছানায় কাছে এসে দাঁড়াল,কই কাঁদছি?তুমি কি সব বলো?তীর্থ ভাইয়া,অনেক রাত হয়েছে।আমার প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছে।আমি শুবো।

বর্ণ বিছানায় উঠতে গেলে সে হাত ধরে ফেলল,ঘুমাস ঠিক আছে?আগে বল না তোর কি হয়েছে।

বর্ণ ফিরে রাগী চোখে তাকাল,আমার কিছু হয়নি।তুমি হাত ছাড়ো,তীর্থ ভাইয়া।

সে ছলছল করা চোখ দু’টো স্থির করে বলল,বলবি না কি হয়েছে?

-তোমরা পেয়েছো টা কি?তোমাদের বাড়িতে আসছি বলে যা বলবে আমাকে তাই শুনতে হবে?

-তুমি চাইলে,স্যরি,তুই চাইলে এখানে সারাজীবন থাক,বর্ণ।আমরা কেউ মানা করেছি?

-ভাব করে আবার তুমি বলা হচ্ছে।শোনো,অনু আপুর বিয়ে হয়ে গেলে আমি এ বাড়ি এক মিনিটও থাকবো না।

-তুই পাগলের মতো এমন করছিস কেন?স্বার্থ তোকে কিছু বলেছে?

-মাই ফুট,স্বার্থ।তোমরা দু’টো ভাই আমাকে পাগল করে ছাড়বে!

সে বর্ণের দিকে সরে গিয়ে বলল,তোকে এই লুকে কতো মায়াবী লাগছে জানিস?

বর্ণ তাকে ধাক্কা দিয়ে হাত ঝাড়া মারল,তীর্থ ভাইয়া,সব সময় তোমার এসব হাসি তামাশা ভালো লাগে না।

সে নিজেকে সামলে নিল,অন্তত ড্রেসটা চেঞ্জ করে শুতে যা।

বর্ণ সে কথার জবাব না দিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল।

সে কিছুক্ষণ বর্ণের দিকে তাকিয়ে থেকে রুমের লাইট অফ করে সোফায় গিয়ে গা এলিয়ে দিল।

মহা ধুমধামে বিয়ে হয়ে গেল।

বড় বাড়িতে আজ সবাই কতো হাসিখুশি।শুধু বর্ণের কেমন যেন একটা খালি খালি লাগছে।তার বুকের বাঁপাশে ঢিপঢিপ।ঢিপঢিপ।শব্দ নয়।ধুকধুক।ধুকধুক।শব্দ হচ্ছে।ভয় পেলে তার বুকের ভিতর ধুকধুক।ধুকধুক।শব্দ হয়।কিন্তু তার আজ কিসের ভয়?একমাত্র বোন অনু।তার এতো বড় বাড়িতেই নয় কেবল,আপনজনদের মাঝে রয়ে গেল সে।তাহলে কিসের ভয়?অন্ধকারে?নাহ!পুরো বাড়িময় চোখ ঝলসানো আলো।চারদিকে লোকারণ্য।কোথাও বিন্দুপরিমাণ অাঁধারের গন্ধ।শব্দ।রং নেই।তাহলে কিসের ভয় তার!হারানোর ভয় তো তাকে কোনদিন স্পর্শ করে নি।তাহলে কি?

বর্ণ ভাবল,গতরাতে তীর্থ ভাইয়ার সাথে তার অমন করা উচিত হয় নি?বেচারা সারারাত সোফায় কেমন করে জানি শুয়ে ছিলো।দেখলে বড় মায়া লাগে।সকাল থেকে তার সাথে একটা কথা পর্যন্ত বলে নি।যতবার সে কাছে ঘেষতে গেছে,অমনি অজুহাত দেখিয়ে পালিয়েছে।ততবার বর্ণের বুকের ভিতর ধুকধুক।ধুকধুক।শব্দের মাত্রা বেড়েছে।নিজের বন্ধুবান্ধব সহ স্বার্থ ভাইয়ার বন্ধুদেরকেও সামলাতে হচ্ছে।আর স্বার্থ ভাইয়া স্টেজে,আচার অনুষ্ঠানে হাসিমুখে ছবি তুলতে ব্যস্ত।

সৃজন এসে বর্ণের কাঁধে হাত রাখল,কি’রে এখানে বসে আছিস যে।সেই সকালে এলাম।তখন থেকেই দেখছি পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিস।কি হয়েছে দোস্ত?

বর্ণ বলল,কই পালিয়ে পালিয়ে বেড়ালাম?

সৃজন একটা চেয়ার টেনে বসল,ওকে তুই পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিস না।মানলাম।তো এ্যাট লিস্ট কি হয়েছে সেটা তো বল।

বর্ণ এড়িয়ে গেল,তোকে একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো?যদি মনে কিছু না করিস?

সৃজন হাসল,শালা,তুই একটা কেন হাজারটা বল।মাইন্ড করবো কেন?

বর্ণ বলল,এখানে এসে আমার যে কি হয়েছে আমি নিজেই বুঝছি না’রে।অনু আপুর বিয়ে,তোকে যে বলবো আমার সেটা পর্যন্ত মাথায় ছিলো না।তাহলে তোকে বিয়ের খবরটা কে দিলো।

সৃজন অবাক হলো,কেন,স্বার্থ দাদা।

বিস্ময়ে বর্ণের চোখ বড় হয়ে গেল,তুই শিওর স্বার্থ ভাইয়া তোকে বলেছে?

সৃজন ব্যাখ্যা দিল,আরে হ্যাঁ।স্বার্থ দাদাই তো ফোন দিয়ে বলল,বর্ণ একটু ব্যস্ত আছে।ওর বোনের বিয়ে ঠিক হয়েছে।তোমাকে কিন্তু আসতে হবে।এমনকি এই যে মৌন দাদা,ত্রিশা দিদির সাথে আসলাম।এটাও উনি ব্যবস্থা করেছে।

বর্ণ হতবাক হয়ে গেল,তুই স্বার্থ ভাইয়াকে চিনিস?উনি কেমন তুই জানিস?

সৃজন মৃদু হাসল,জানতাম।বাট নাউ আই অ্যাম কনফিউজড।

মৌন একটা চেয়ারে বসতে বসতে বলল,শালাবাবু,সকাল থেকে তো তোমার পাত্তায় পাওয়া যাচ্ছে না।

বর্ণ শুকনা একটা হাসি দিল।

ত্রিশা একটা চেয়ার টেনে বসল,বর্ণ,তুমি দেখি এখানে এসে একেবারে চোখমুখ শুকিয়ে ফেলেছো!কি ব্যাপার অাপুর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে তাই?

মৌন মজা করতে ছাড়ল না,নো টেনশন,শালাবাবু,আপু একটা যাচ্ছে তো কি হয়েছে এই যে তোমার সামনে আরেকটা আছে।

ত্রিশা বলল,তুমি মন খারাপ করছো?স্বার্থের মতো দুলাভাই পেয়ে কেউ মন খারাপ করে?ঢাকায় তো দেখলাম সে তোমার কতো খেয়াল রাখে।দেখো,তোমার আপু সুখেই থাকবে।

বর্ণ নড়েচড়ে বসল,তীর্থ ভাইয়া আসছে।

সে এসে মৌন আর ত্রিশার দিকে তাকাল,আম্মা তোমাদের ভিতর বাড়ি ডাকছে।অনুদের ভিতর বাড়ি নেওয়া হয়ে গেছে।

তারপর সৃজনের দিকে তাকিয়ে বলল,তোমার বন্ধুকে নিয়ে এসো।এখানে শিশির পড়ছে।ঠান্ডা লাগবে।সে কিন্তু এসবে কেয়ার করে না।

মৌন আর ত্রিশা তাকে অনুসরণ করে ভিতর বাড়ি গেল।

সৃজন মুচকি হাসি দিল,তোর মামাতো ভাইগুলো তোর বেশ খেয়াল রাখে।আচ্ছা বললি না তো কি হয়েছে,দোস্ত।

বর্ণ সৃজনের হাত ধরে টেনে উঠালো,এখানে থাকলে তুই বকবক করে আমার কানের বারোটা বাজাবি।ভিতরে চল।অনেক রাত হলো।

বর্ণ ড্রয়িংরুমে ঢুকে দেখলো আত্মীয়স্বজন অনুকে ঘিরে আনন্দে মেতে আছে।সে সৃজন কে ইশারায় দেখালো,উপরে উঠে দক্ষিণ দিকের শেষের রুমটা গিয়ে বোস।আমি একটু পরে আসছি।

সৃজন চলে গেলে বর্ণ রিতুকে ডাকল,বড় ভাবী,আন্না আর ভাবী কোথায়?

রিতু বলল,শরীফ আর সুমি উপরের কোন একটা গেস্টরুমে থাকবে হয়তো।তুমি যাও।

বর্ণ উপরে উঠে গেল।তাদের উত্তর-পূর্বের শেষ রুমটাতে পেল।সে দরজায় গিয়ে দাঁড়াল,আন্না আসবো?

শরীফ তাকিয়ে বলল,আরে বর্ণ,এদিকে আয়,ভাই।

সুমি বর্ণের দিকে তাকাল,কি’রে চোখ ছলছল করছে কেন?

শরীফ হাত ধরে টেনে বর্ণকে পাশে বসালো,কি হয়েছে আমার ভাইটার?

বর্ণ হঠাৎ শরীফকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিল।শরীফ বর্ণের গায়ে হাত বুলালো,আরে,দেখো দেখি কান্ড।এতো বড় ছেলে কাঁদে নাকি?অনু কি পরের বাড়ি গেছে?নিজের লোকেদের কাছেই তো থাকবে।

সুমি বর্ণের গায়ের উপর একটা হাত রাখল,সকাল থেকে এ পর্যন্ত একেবারের জন্য তো দেখলাম না বোনটার কাছে গেছিস।এখন আবার কাঁদছিস।

শরীফ বর্ণকে জড়িয়ে ধরে বলল,তুই কি বোকা হয়ে যাচ্ছিস দিন দিন।সুমি যাও তো ওকে অনুর কাছে একটু নিয়ে যাও।

সুমি বর্ণের হাত ধরে টেনে তুলল,আয় তো।অনু নিচে আছে।তুই আর বড় হলি না।

বর্ণ মনে মনে বলল,ভাবি,আমি যে কি কারনে কাঁদছি আমি নিজেও জানি না।কারনে অকারনে চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে।বুকের ভিতর জ্বলে যাচ্ছে।তোমাদের কি করে সেটা বুঝাবো।

গতকাল হলুদ অনুষ্ঠানের জন্য ছাদে ডেকারেশন করা হয়েছিল।এখনো সাজসজ্জা তোলা হয় নি।বর্ণ ছাদে উঠে একটা চেয়ার টেনে বসল।একা অন্ধকারে তার ভয়।অথচ ছাদের আবছায়া আলোও বিরক্তিকর।অসহ্য লাগছে।হৃদয় ভাইয়া এখন কি করছে।সে কি জানে অনু আপু এখন আরেকজনের স্ত্রী।অনু আপু কেন হৃদয় ভাইয়াকে ভালোবাসতে পারলো না।খুব মায়া হয় তার হৃদয় ভাইয়ার জন্য।ছোটবেলা থেকে ভালোবাসা না পাওয়া একটা ছেলে।তার কি অধিকার নাই।ব্যস,একটু ভালোবাসাই তো।না জানি কোথায় কোথায় আজ সে অনু আপুকে খুঁজছে।কার দুয়ারে ঘুরছে।

শব্দ করে কেউ পিছে এসে দাঁড়াল।বর্ণ পিছন ফিরল,তীর্থ ভাইয়া।

সে আরেকটা চেয়ার টেনে বর্ণের মুখোমুখি বসলো।কোলের উপর প্লেট রাখলো।তারপর বলল,নে হা কর?

বর্ণ মাথা নাড়াল।সে রাগী চোখে তাকাল,আমি একবারের জন্য কিন্তু জানতে চাইনি তুই সারাদিন কেন না খেয়ে থাকলি।কোনদিন জানতে চাইবো না।এখন তুই যদি হা না করিস।আমি এই ছাদ থেকে খাবার ভর্তি প্লেট ফেলে দিবো।শুধু তাই না,তোকেও ফেলে দিবো।দেখতে চাস?

বর্ণ বলল,তুমিও তো খাও নি।

-তোকে কে বললো আমি খাইনি?

বর্ণ তার বাঁ হাতটা নিজের মাথায় রেখে বলল,আমাকে ছুঁয়ে বলো,তুমি কিছু খেয়েছো?

সে দ্রুত হাতটা সরিয়ে নিল,সারাদিন নজরবন্দি করে রাখছিলি?

-তুমি কেন রেখেছিলে?

-হয়েছে!এবার লক্ষ্মী ছেলের মতো হা কর।আমিও খাচ্ছি।এই দেখ অনেকগুলো আনছি চুরি করে।

বর্ণ হা করে খাবার মুখে নিল।তার বুকের ভিতর ঢিপঢিপ।ঢিপঢিপ।ধ্বনি শুরু হলো।

সে নিজে খাবার মুখে নিয়ে আরেকবার বর্ণকে দিয়ে বলল,একটা সত্যি কথা বলতো!তুই কাল রাতে অমন করলি কেন,বর্ণ?

বর্ণ একবার তাকিয়ে মাথা নিচু করলো,স্যরি,তীর্থ ভাইয়া।আসলে কি যে হচ্ছে।আমি বোধহয় পাগল হয়ে যাবো।

সে কড়া শাসন করলো,আচ্ছা খাওয়ার সময় কথা বলতে হবে না।বিষম উঠবে।ধর তো পানির বোতলের মুখ তুলে রাখ।

বর্ণ মুখে খাবার নিয়ে ভাবল,স্বার্থ ভাইয়াকে মেন্টাল বলতে বলতে আমি নিজে বোধহয় মেন্টাল হয়ে গেলাম।স্বার্থের কথা মনে হতে বর্ণের বুকের ভিতর ঢিপঢিপ।ঢিপঢিপ।ধ্বনি ধুকধুক।ধুকধুক।প্রতিধ্বনিতে রুপ নিল।

(দশম পর্ব)

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>> 

বিঃদ্রঃ তোমার একটিমাত্র জীবন যদি প্রেমহীন থেকে যায়,শর্তহীন দলিলে যদি কোন বিবাদীর নাম লেখা না থাকে,অনাবিষ্কৃত ভালোলাগা যদি তোমার ঠোঁটের আঙ্গিনায় বিরহ না জাগায়,একটিমাত্র জীবনে তুমি যদি কলঙ্ক এর সুখই না পেলে-তবে তুমি…!তবে তুমি আমার গল্প পড়ো না।

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>> 

উনিশ।

বড় বাড়ির নিয়মানুসারে বউভাতের রাতে বাসর হয়।

সকাল থেকে বর্ণের বাঁপাশে অবিরাম ধুকধুক।ধুকধুক।শব্দ হচ্ছে।

আজ বৌভাত হয়ে গেল।সারাদিন সে তার স্বার্থ ভাইয়ার সাথে এক মিনিট কথা বলার জন্য পাগল হয়ে আছে।কিন্তু এক মুহূর্তের জন্য সুযোগ মেলে নি।সন্ধ্যায় মৌন ভাইয়ারা চলে গেল।সৃজনটা থাকলেও তার একটু স্বস্তি মিলতো।বর্ণের এখন এমন কোথাও বসতে খুব ইচ্ছে করছে।শব্দহীন।আলোহীন।নির্মল আঁধারে।

সে গুঁটি পায়ে জোড়াদিঘির শাঁন বাঁধানো ঘাটে নিচে নেমে পানিতে পা ডুবিয়ে বসলো।জোড়াদিঘিতে লাইটিং করা হয় নি।অন্ধকারে নয়,আজ অন্য কিছুর ভয়ে তার বুকে শব্দ বিরামহীন।বর্ণ উঠে দাঁড়াল।সিঁড়ি থেকে এক পা পানিতে নামাল।আচমকা একটা পরিচিত হাত তাকে টান দিল।

সে বর্ণের গালে চড় বসিয়ে দিল,পাগল হয়ে গেছিস তুই?

বর্ণের ঘোর কাটল।সে কেঁপে উঠলো।তাই তো সে কি করতে যাচ্ছিল।কি কারনে?অকারনে?নাহ।বর্ণ কি এতটা আবেগী?

বর্ণের দু’চোখ বেয়ে পানি পড়ছে।আবছায়া অন্ধকারে বর্ণ তার দিকে তাকাল,তীর্থ ভাইয়া,আমি আর পারছি না?

সে দু’হাত বাড়িয়ে বর্ণকে নাড়া দিল,কি হয়েছে তোর?পাগলামি করছিস কেন?

বর্ণ তাকে জড়িয়ে ধরতে গেলে সে এক পা পিছিয়ে বলল,ডোন্ট টাচ মি,বর্ণ।আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দে।

বর্ণ কোন কথার জবাব না দিয়ে দৌড়ে ভিতর বাড়ি চলে গেল।

হয়তো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে অভিমানী দু’টি চোখ তার গমনের পথ চেয়ে আছে।

বর্ণকে সামনে পেয়ে রিতু ভাবি এসে টেনে নিয়ে গেল,তোমার একমাত্র বোনের বিয়ে হলো।কিন্তু সারাদিন না পাচ্ছি তোমার খোঁজ,না দিচ্ছ নিজে থেকে দেখা।

বর্ণ হাত ছাড়াতে চেষ্টা করল,বড় ভাবি,কই নিয়ে যাচ্ছেন বলেম তো?আমার খুব ঘুম পাচ্ছে।

রিতু স্বার্থের রুমের সামনে বর্ণকে দাঁড় করিয়ে বলল,চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকবে।একদম নড়বে না।স্বার্থ আর অনুকে বাসর ঘরে আনা হচ্ছে।শরীফ তো সম্মুন্দি।তুমি স্বার্থের একটা মাত্র শালা।পাঁচ হাজারের নিচে দরজা ছাড়বে না!

বর্ণ বিরক্ত হলো,বড় ভাবি,আপনারা তো আছেন।আমার সত্যি ভালো লাগছে না।

রিতু ধমক দিল,ওরা আসছে।চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকো।

বর্ণ অস্পষ্টে বলল,আমি মরছি আমার যন্ত্রণায়।

অনুরা কাছাকাছি আসতেই রিতু বলল,স্বার্থ ভাইটা আমার,শালা দাঁড়িয়েছে দরজায়।আবার এ বাড়ির একমাত্র ছোটভাইও ভাবতে পারো,সামলাও।

সে হাসল,বড় ভাবি,তার দরকার পড়লে সে বলুক।তুমি বাগড়া দিচ্ছ কেন?

রিতু হেসে তার থুতনিতে হাত ছোঁয়ালো,ওরে,দেওরাঝি আমার,তর সইছে না বুঝি।

অনুদের সাথে আসা মেয়েরা হেসে একে অপরের গায়ে পড়লো।অনু মুচকি হাসছে সবার অগোচরে।

সে এগিয়ে গিয়ে বর্ণের সামনে দাঁড়াল।বর্ণের কানের কাছে মুখ নিল,কি শালাবাবু,কত টাকা লাগবে?

তার আড়মোড়া ভেঙ্গে ফিসফিস করল,না ছাড়লে আমার কি?তোমার বোন,তুমি বোঝো।

বর্ণ সে প্রশ্নের উত্তর দিলো না।রিতু তার হয়ে বলল,সব শুনেছি স্বার্থ,আমি বলে দেবো?

সে বাধা দিলো,তুমি কেন বলবে?তুমি দরজায় দাঁড়িয়েছো?

রিতু হাসল,তবুও বলি।ছয় হাজারের নিচে হবে না।

সে প্রশ্ন করল,বড় ভাবি,তোমার কমিশন কত?

রিতু কটাক্ষ রাগ দেখলো,ভালো হবে না বলে দিলাম,স্বার্থ।ঐ আমি কি বাধা দিলাম?যাও না ভিতরে।

সে আরেকবার স্বার্থের কানের কাছে মুখ নিল,আমার কলিজার টুকরাকে তোমাকে দিয়েছি।পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পত্তি।

বর্ণ ফিসফিস করল,শোনেন,হেয়ালি করার মুডে নেই।টাকা দিলে দেন!না হলে বলেন দিবেন না,চলে যাই।

সে চাপা স্বরে বলল,খুব বাড়ছো!আমার উপর এতো রাগ কিসের তোমার?তোমাকে ঠকিয়ে বিয়ে করছি আমি?জ্বলছো কেন?

বর্ণের চোখ ছলছল করছে।বলল,স্বার্থ ভাইয়া,সত্যি আমার ভালো লাগছে না।

সে ওয়ালেট থেকে টাকা বের করল।বর্ণের হাতে টাকা দিল,নাও সাত হাজার দিলাম।তোমার এসিসটেন্টকে ভাগ দিও।আর শোনো,তোমার সম্পত্তি কিন্তু আমি রেখে আসছি।

বর্ণ টাকা নিল,আমার কি সম্পত্তি?

সে হাসল,কেন,তোমার তীর্থ ভাইয়া।সারাক্ষণ তো যবের মালার মতো তীর্থ ভাইয়া।তীর্থ ভাইয়া করো।বোন ঝুলল আমার ঘাড়ে,তুমি ঝুলবে তার ঘাড়ে।

বর্ণের এবার সত্যি রাগ হলো।চোখ জ্বলছে।বর্ণ তাকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে দরজা থেকে সরে এলো।রিতুর কাছে টাকাটা দিয়ে দ্রুত হেটে তীর্থের রুমে ঢুকল।

‘কি ব্যাপার?প্রিয় মানুষকে বাসর ঘরে ঢুকিয়ে পরানখানা পুড়ছে?’ সে কৌতুক করলো।

রুমে ঢুকে কথাটা শুনে বর্ণ তার উপরই রাগ ঝাড়ল,তীর্থ ভাইয়া,বাজে কথা বলতে আসবে না।আমি কিন্তু এখন উল্টাপাল্টা বলবো।

কথাটা বলতে গিয়ে বর্ণের বুকের ভিতর ধুকধুক।ধুকধুক।শব্দ হলো।

সে অবাক হলো,মানে কি,বর্ণ?একটু মজা করা যাবে না?

বর্ণ সে কথার প্রত্যুত্তর না করে ওয়াশরুমে ঢুকল।

ওয়াশরুম থেকে চোখমুখ লাল করে ফিরল বর্ণ।সে উঠে গিয়ে পাশে দাঁড়াল,কি’রে আবার কাঁন্না করছিস?কি হয়েছে তোর?চোখমুখ লাল করে ফেলছিস।

বর্ণ আস্তে জবাব দিল,এলার্জি বাড়ছে।

-ওষুধ আনবো?

‘লাগবে না’ বলে বর্ণ বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ল।সে বিস্ময়ে চেয়ে রইল।কিছুক্ষণ পর বর্ণ ঘুরে তাকাল।বুকে চিনচিন ব্যথা উঠল,তীর্থ ভাইয়া তোমার হাতে কি হয়েছে?

‘কিছু না বলে’ সে রুমের বাইরে চলে এলো।

বর্ণ বাইরে এসে তাকে রুমে টেনে নিয়ে সোফায় বসালো।পকেট থেকে নীল একটা রুমাল বের করে তার হাত বাধতে বাধতে বলল,কখন কেটেছে?কিভাবে রক্ত পড়েছে।কাউকে ডাকবে তো?

সে হাত টান দিল,পড়লে পড়ছে।তাতে কার কি?

বর্ণ আবার হাত টেনে নিল,ধুর।বাধতে দেন তো।আমি কিন্তু এবার মামীজানকে ডাকবো।

সে শান্ত চোখে বর্ণের দিকে তাকাল,এই নীল রুমালটা কার?

বর্ণ তার হাত মনোযোগ দিয়ে বাধছিল,সেফটিক হয়ে যাবে।ফাস্টএইড বক্স কোথায়?

সে বড় একটা শাল কাঠের আলমারির দিকে ইশারা করল,ওখানে।

বর্ণ সেদিকে তাকিয়ে বলল,অনেক উঁচু।আমি তো অতো লম্বা না।আপনি কষ্ট করে একটু পেড়ে দেন না।

সে কেমন নিষ্ঠুরভাবে জানাল,পারবো না।তোর লাগলে তুই পেড়ে নে।

বর্ণ রুমাল বাধা শেষ করল।তার দিকে ছলছল নয়নে তাকাল,প্লিজ।

‘প্লিজ’ টা বর্ণ এতো আবেগ নিয়ে বলল তার বুকের ভিতর ধুক করে উঠলো।

সে তার গোলাপি ঠোঁট চাটলো,মুচকি হাসল,আমি পাড়তে পারবো না।তবে তোকে হেল্প করতে পারি।

বর্ণ অসহায়ভাবে তার মুচকি হাসির দিকে চেয়ে রইল।বর্ণ ঢোঁক গিলল।মনে মনে বলল,হয়ে গেল।এই হাসিটায় বাকি ছিলো তীর্থ ভাইয়ার।

সে বর্ণের চোখের সামনে আঙ্গুলের তুড়ি বাজাল।বর্ণের গালে হাত দিতে গিয়েও দিল না,মুখটা লাল হয়ে গেছে।চড়ে খুব ব্যথা পেয়েছিস না?

বর্ণ মাথা নাড়াল,না তো।পেয়েছি অন্যখানে।

সে জিজ্ঞাসা করল,কোথায়?

বর্ণ হেয়ালি করল,ছাড়ো তো।

বর্ণের বুকে চিনচিন করছে।

কিছুক্ষণ স্থির নজরে তাকিয়ে থেকে বর্ণ আচমকা বলল,হ্যাঁ,বলো কি করবো যেন?

সে সোফা থেকে উঠলো,আমি তোকে উঁচু করে ধরছি।তুই পেড়ে আন।

‘আচ্ছা’ বলে বর্ণ আলমারির সামনে গিয়ে দাঁড়াল।সে আলমারির সাথে পিঠ ঠেকিয়ে বর্ণকে সামনে থেকে উঁচু করলো।বর্ণ বউভাত অনুষ্ঠান শেষে পাঞ্জাবী চেঞ্জ করে থ্রি কোয়াটার,টিশার্ট পরেছিল।ফাস্টএইড বক্স নেওয়ার জন্য বর্ণ হাত উঁচু করলে টিশার্ট উঠে গেল।বর্ণের সুগভীর,নেশাভরা নাভি তার একেবারে ঠোঁটের একটু নিচে।সে চোখ বন্ধ করে ফেলল।বর্ণ নিচে তাকিয়ে বলল,তীর্থ ভাইয়া,নাগাল পাচ্ছি না তো।আরেকটু উঁচু করো।

সে আরেকটু উঁচু করলো বর্ণকে।তারপর ধীরে ধীরে চোখ খুলল।বর্ণের নাভি আর তার ঠোঁট মাত্র এক ইঞ্চি ব্যবধানে।সে ঘামতে শুরু করলো।হৃৎপিন্ডে ঢিপঢিপ।বর্ণ ফাস্টএইড বক্সে হাত দিল।হাত কাঁপছে।কারনটা অজানা।একটা হাত বাঁপাশে রাখল।পরিচিত সেই শব্দ টের পেলো বর্ণ।

বর্ণ চোখ বন্ধ করল,তীর্থ ভাইয়া,কিছুক্ষণ নিঃশ্বাসটা বন্ধ রাখুন না।আমার পেটে সুড়সুড়ি লাগছে।বক্স পাড়তে পারছি না।

সে আবার চোখ বন্ধ করল।মনে মনে দোয়া পড়ল,আল্লাহ,হুশটা রেখ।

চোখ বন্ধ রেখেই বলল,বর্ণ,তাড়াতাড়ি কর।বেহুশ হয়ে যাবে কিন্তু তোর তীর্থ ভাইয়া।

বর্ণ বলল,চাও কি বলো?বেহুশ হবে কেন?নামাও,বক্স নিয়েছি।

সে বর্ণকে নামিয়ে পালঙ্কে বসল,বাপরে,তুই এতো ভারী?পাগল হয়ে যাবো।

বর্ণ দূরত্ব নিয়ে বিছানায় বসে তাকাল,তুমি পাগলই হয়েছো?ভারীর হওয়ার সাথে পাগলের কি সম্পর্ক?সারাক্ষণ মেন্টালটার মতো!

সে প্রশ্ন করল,মেন্টাল কে?

‘কেউ না’ বলে বর্ণ বলল,হাত দাও,রুমাল খুলে ড্রেসিং করতে হবে?

-তুই সব এড়িয়ে যাচ্ছিস আজকাল।তখন কিন্তু বললি না রুমালটা কার?

বর্ণ রুমাল খুলে ড্রেসিং করছিল।বলল,আমার!তোমার কোন সমস্যা?

সে বলল,মিথ্যা বলা শিখে গেছিস।এটা তো স্বার্থের রুমাল।আমি ওকে দিয়েছিলাম।

বর্ণ সে কথায় কর্ণপাত করল না।প্রশ্ন করল,তোমার হাত কাঁপছে কেন?

সে মনে মনে আওড়ালো,শুধু হাত?বুকের বাঁপাশটা কেঁপে ছিড়ে যাবে বোধহয়।

‘উফস’ শব্দ করে মুখে বলল,ব্যথা লাগে না বুঝি।তাই কাঁপছে।ছেড়ে দে করতে হবে না।

বর্ণ জিজ্ঞাসা করল,সত্য কথা বলো তো?হাত কাটলো কিভাবে?

সে সত্য কথায় বলল,ইচ্ছে করে কেটেছি।

-পাগল?কিভাবে কাটলো সেটা বলো ঠিকঠাক।

-বললাম তো।

আবার রুমাল বাধল,নাও হয়ে গেছে।তুমি যে ভীরু তুমি কাটবে হাত!তাহলে হয়েছে।

-আমি ভীরু?তুই কি?অন্ধকারে তো সেই রকম চিল্লাস।

-তোমাকে বলেছে।মামাজান,নানাজানের মুখেমুখে কথা বলতে পারবে না বলে নিজের মানুষটাকে ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে দিলে।সেও দিব্বি বিয়ে করল।এদিকে আমার কপাল….!

বর্ণ কথা শেষ করলো না।সে বলল,কি বললি তুই?

‘কিছু না’ বলে বর্ণ ফাস্টএইড বক্স টেবিলে রেখে বলল,ঘুমাও তো।আমার ঝগড়া করার মুড নাই।মন প্রচুর খারাপ।ক্ষেপিও না।ঝামেলায় পড়বে।

সে বলল,ঘুমাবো।সব করবো।কিন্তু তুই কি বললি আরেকবার বলতো?আর আমি তোকে ক্ষেপাই?

বর্ণ সে কথার জবাব দিলো না।বলল,হাত উঁচু করো পাঞ্জাবী খুলে দেয়।স্যান্ডো গেঞ্জি আছে নিচে?

‘আছে’ বলে সে আবার বলল,হাতে ব্যথা লাগবে তো।আমি খুলি একা?

বর্ণ ধমক দিলো,জ্বালিও না তো।যা বলছি করো।

-বাপরে,তুই ধমক দেওয়াও শিখে গেছিস।

পাঞ্জেবী খুলে দিয়ে বর্ণ বলল,এবার এই অর্ধনুড বডিতে খামচে ধরবো।বেশি বকবক না করে শুয়ে পড়ো।

সে সম্মতি দিল,তুই কামড়ে দিলেও অবাক হবো না।আমি জানি তুই মানুষের মাংস খাস।নরখাদক তো।

-উফস।তোমাকে বলেছে না।

সে শুয়ে কাঁথা গায়ে দিল।মজা করল,ছিঃ,এভাবে তাকিয়ে কি দেখিস?পুরুষ মানুষ কখনো দেখিস নি?

বর্ণ হেসে দিল,তীর্থ ভাইয়া,তুমি না।কি যে সব বলো পাগলের মতো।

তারপর আবার বলল,ওয়েট!ওয়েট!তীর্থ ভাইয়া,তুমি বুকটা আরেকবার আমাকে দেখাও।

সে এবার কাঁথা মুড়ি দিয়ে দুষ্টুমি করল,ভাগ।আমার বুঝি লজ্জা করে না।

বর্ণ মনে মনে কি ভাবল,থাক লাগবে না।ঘুমাও।ভুল দেখেছি বোধহয়।ভালো করে খেয়াল করা হয়নি।

সে কাঁথা থেকে মুখ বের করল,কি সব বলিস বুঝি না।

বর্ণ সে কথার জবাব দিলো না।লাইট অফ করে সোফায় গিয়ে বসলো।

‘কি’রে শুবি না’ বলে সে পাশ ফিরলো।

বর্ণ জানালো,তুমি শোও,আমি একটু পরে শুই।

দরজার বাইরে এসে দাঁড়াল বর্ণ।নিচে ড্রয়িংরুমে আলো জ্বলছে।মেহমান অধিকাংশ চলে গেছে।বাকিরা উপরতলায় তাদের পাশাপাশি কয়েকটা রুমে।গেস্টরুমে।বর্ণ সরাসরি দক্ষিণ-পশ্চিমে স্বার্থের রুমের দিকে তাকাল।দরজা ভেজানো।পাশের কয়েকটা রুমে আলো জ্বলছে।তার বুকে সেই চিনচিন।চিনচিন।টান ধরে আছে।অনুভুতিটা লাল পিঁপড়ার কামড়।সে মনে মনে বলল,আল্লাহ,আমার বোনটাকে ভালো রেখো।

সোফায় গা এগিয়ে দিয়ে বর্ণ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।তার কি আজ ঘুম আসবে?নাকি সারারাত জাগতে হবে?কিন্তু কেন?সে তো ঘুমাতে ভালোবাসে।প্রচন্ড ঘুমকাতুরে।বর্ণ চোখ বন্ধ করল।

মাঝরাতে বিছানা হাতিয়ে বর্ণকে পাশে না পেয়ে সে লাইট অন করলো।সোফায় ঘুমাচ্ছে বর্ণ।সে উঠে এসে বর্ণকে তুলে আধকোলা করলো।সোফা থেকে বিছানা।এটুকু দূরত্ব বর্ণকে কোলে তুলে সে ঘেমে গেলো।বর্ণের মুখের দিকে তাকাল।মুহূর্তে যেন পড়ে নিল বর্ণকে।কত অভিমান।অভিযোগ।সারা মুখে।গালে।ঠোঁটে।ঘরময় আলোতে সে বুঝল,বর্ণ কেঁদে ঘুমিয়ে গেছে।বর্ণের চোখের কোণে পানির শুকনো নিশানা।খুব কি কষ্ট পেয়েছে ছেলেটা?এসবের জন্য কি সে দায়ী?হয়তো বা না!বর্ণের কাছ থেকে সে যা আশা করেছিলো সেটা তো পাওয়া হলো না তার।বর্ণ কোনদিন তাকে বুঝবে?বুঝবে কোনদিন এই যে আধকোলা করা এই মিষ্টি ছেলেটা তার কত ভালো লাগে।

বর্ণের একধারের গাল রাঙা।চড়ের দাগ।বর্ণের মাদকতা ভরা নাভিতে সামান্য কাঁপা ঠোঁট ছোঁয়ানোর পর সে এই প্রথম নিচু হয়ে বর্ণের কোমল গালে আলতা করে ছোট্ট একটা চুমু খেলো।তার হৃৎপিন্ডে রক্তের ক্রিয়াচক্র যেন বন্ধ হয়ে গেল।সে ঘুরে বর্ণকে তার বাঁপাশের বালিশে শুইয়ে দিলো।টুক করে তার এক ফোঁটা চোখের জল বর্ণের চোখের উপর পড়লো।ঘুমন্ত বর্ণের চোখের পাপড়ি কেঁপে উঠলো।সে দ্রুত লাইট অফ করে বিছানায় বর্ণের উল্টো দিকে শুইয়ে পড়লো।

বর্ণ চোখ খুলে গালে হাত দিলো।চুমু।এতো মিষ্টি।ঘোরলাগা।আবেগী হয়।তার ছোট্ট মনে প্রশ্ন শত।তীর্থ ভাইয়া কেন তাকে চুমু খেল।মেরেছে বলে?নাহ।তাহলে?তীর্থ ভাইয়া কি তাকে ভালোবাসে?কিন্তু কেন?সে তো তার তীর্থ ভাইয়াকে ঠিক কামনায় ভালোবাসে না।কিন্তু এই টানটা।বুকের মাঝে শব্দের ধ্বনি।প্রতিধ্বনি।এটা কার জন্য?

তীর্থ ভাইয়া নাকি স্বার্থ ভাইয়ার জন্য?আজ স্বার্থ বিয়ে করেছে বলে তার কষ্ট হচ্ছে,কিন্তু কষ্টটা কেমন মলিন।আবেগহীন।গভীর নয়।কিন্তু ঢাকায় তার স্বার্থ ভাইয়ার সাথে কতগুলো সময় কেটে গেল এক ছাদময় ছোট সংসারে।

অথচ তার তীর্থ ভাইয়ার সাথে মাত্র কয়েকদিনে কি’সব ঘটে গেল।তার তীর্থ ভাইয়া সামনে এলে।বা দূরে গেলে বুকের এই যে ধ্বনি বদল।এটা তো এর আগে কখনো হয় নি।হৃদধ্বনি ক্রিয়া তো শুরু হয়েছি তার স্বার্থ ভাইয়ার মুখে প্রথম ‘আই লাভ ইউ’ শুনে।

বর্ণ আর ভাবতে পারলো না।

বিশ।

বড় বাড়িতে হয়তো এখনো কারোর ঘুম ভাঙ্গে নি।

ভোর পাঁচটায় বর্ণের ঘুম ভেঙ্গে গেল।সে একবার তার তীর্থ ভাইয়ার দিকে তাকাল।সে বর্ণের উল্টো দিকে মুখ করে শুয়ে আছে।বর্ণ বিছানা থেকে নামাল।সে ভেবেছিল আজ রাতে তার ঘুম হবে না।ঘুম হলো।নিশ্চিন্তে।গভীর।একটানা গাঢ় ঘুম।দরজা খুলে বাইরে এসে পার্থদের রুমের কোলঘেষে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে গেল।ছাদের উত্তর-পূর্ব কোণে দাঁড়ালে জোড়াদিঘি পাড়ের শিউলিগাছ চোখে পড়ে।শিউলিফুল সকালে থাকে না।ঝরে পড়ে।শিউলিতলা রক্তিমশুভ্রে চকচক করছে।এক ঝাপটা পূবালী হাওয়া বর্ণের গাল ছু্ঁয়ে গেল।সিঁড়িতে কারোর পায়ের আওয়াজ শুনে বর্ণ পানির ট্যাবের আড়ালে দিয়ে দাঁড়াল।

এতো ভোরে গোসল করে কেউ ছাদে কাপড় মেলতে আসছে।তীর্থ ভাইয়াকে সে ঘুমে দেখে এসেছে।তীর্থ ভাইয়া হলে তার সংকোচ ছিলো না।সে প্রচুর বেহায়া এ ব্যাপারে।এসএসসির পর যখন এসেছিল তখন একরাতে তার তীর্থ ভাইয়ার নাইটফল হলো।সে বর্ণকে ঘুম থেকে টেনে তুলে জোড়াদিঘিতে গোসল করতে গেল রাত আড়াইটায়।অথচ রুমে জোড়া বাথরুম।কিন্তু এখন যদি বাড়ির অন্য কেউ হয় তবে লজ্জার শেষ থাকবে না।সে আরেকটু আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল।কিন্তু কৌতূহল রয়ে গেল মনে।বর্ণ সামান্য উঁকি দিয়ে দেখতে গেলেই চোখাচোখি হলো।বর্ণের বুকের ভিতর ধুকধুক।ধুকধুক।শব্দ শুরু হয়ে গেল।মনে মনে আওড়ালো,স্বার্থ ভাইয়া।

সে জোরেশোরে বলল,বর্ণ,এদিকে এসো।

বর্ণ খুব মৃদু পায়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল।তার কোমরে তোয়ালে পেঁচানো।উদ্দাম গা।চুল ভেজা।বর্ণ এক পলক দেখে মাথা নিচু করল।

সে সামনে দাঁড়িয়ে বলল,তুই স্যরি তুমি এতো সকালে ছাদে কি করছো?ঠিকঠাক জবাব দিবে?

বর্ণ জানে তার স্বার্থ ভাইয়া প্রচন্ড রেগে গেলে তুইতোকারি করে।বর্ণ মাথা নিচু রেখেই বলল,স্যরি,ভুল হয়ে গেছে।আসলে ঘুম ভেঙ্গে গেলো,তাই ভাবলাম সকালের বাতাসটা গায়ে লাগিয়ে আসি।

সে বিদ্রুপ করল,অমনি ছাদে চলে এলে?বাগানে যেতে।তুমি জানো না এ বাড়িতে কত লোকজন দু’তিনদিন!মানুষের সিকিউরিটি দরকার পড়ে।

বর্ণ সেভাবে মাথা নিচু রেখে বললো,বললাম তো ভুল হয়ে গেছে।

সে কোমল সুরে বলল,বর্ণ,আমার দিকে তাকাও।

বর্ণ চোখ তুলে তাকাল।

সে জিজ্ঞাসা করল,সত্যি করে বলো তো রাতে ঘুমিয়েছো?

বর্ণ কথাটার জবাব না দিয়ে তার উদ্দাম বুক পাণে চেয়ে রইল।সে চোখে ইশারা করল,কি দেখো?যা জিজ্ঞাসা করলাম তার উত্তর দাও।

বর্ণ এবার অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।বর্ণের চোখে বিস্ময়।কৌতূহল।ঘোরলাগা।অবিশ্বাস।তার মানে এতদিন সে…..!ওহ নো,শিট!কিভাবে সম্ভব এতো সুনিপুণ।সূক্ষ্ম।নজর এড়ানো অভিনয়।

বর্ণ অনুরোধ করল,স্বার্থ ভাইয়া,প্লিজ।আপনি দু’মিনিট এখানে দাঁড়ান।কোথাও যাবেন না।আমি জাস্ট নিচে যাবো আর আসবো।

বর্ণ দ্রুত পায়ে নিচে নেমে গেল।পিছন থেকে সে ডাকল,বর্ণ,আমার কথার জবাব পেলাম না।

তারপর সে তোয়ালে পরা অবস্থায় ছাদের উঁচু ইটের রেলিংয়ে বসে হাসল,আরে,পাগল নাকি?সত্যি,বর্ণ,তোর অবস্থা দেখার মতো।

মিনিট পাঁচেক পরে বর্ণ তার তীর্থ ভাইয়াকে নিয়ে এসে তার স্বার্থ ভাইয়ার সামনে দাঁড় করালো।

তার তীর্থ ভাইয়া ঘুম জড়ানো কন্ঠে প্রশ্ন করল,কি’রে এখানে নিয়ে আসলি কেন?’সে সামনে না তাকিয়েই কথাটা বললো।

রেলিংয়ে বসা জন নেমে বর্ণের সামনে ডানপাশে দাঁড়ালো।

‘ছিঃ বর্ণ,তুই আমাকে এই দেখাতে নিয়ে এসেছিস?স্বার্থ নতুন বিয়ে করেছে।নবদম্পতি ওরা।তুই… ‘ কথাটা শেষ না করে সে বর্ণের বাঁপাশ থেকে হাটা দিতেই বর্ণ বাঁহাত দিয়ে তার হাতটা টেনে ধরলো,উনি আসলেই কি স্বার্থ ভাইয়া?তাহলে আপনি কে?

‘মানে?’ বর্ণের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জনই অবাক হলো।

বর্ণ তোয়ালে পরা জনের দিকে তাকাল,তুমি স্বার্থ ভাইয়া নও।তুমি তীর্থ ভাইয়া।

বর্ণ যার হাত ধরে ছিলো,সে হাত ঝাড়া দিল,কি’সব বাজে বকছিস,বর্ণ?তুই পাগল হয়ে গেছিস।

বর্ণ যেন ভেঙ্গে পড়লো,তোমরা এমন করছো কেন?আমাকে গুলিয়ে দিও না।আমি সত্যি পাগল হয়ে যাবো।

বাঁপাশের জন বলল,আমি গেলাম।ঘুমাবো।একদম আটকাবি না,বলে দিলাম।

বর্ণ ঢোঁক গিলল।তার দু’চোখের পাতা ভারি হয়ে এসেছে।বর্ণ নিজেকে সামলে নিল,আমি মানছি আমি ভুল।কিন্তু একটিবার আপনাদের দু’জনকে ত্রিশ সেকেন্ডের জন্য আমাকে জড়িয়ে ধরতে দিন।প্লিজ!আমার এই অনুরোধটা রাখেন।

বাঁপাশের জন এক পা পিছিয়ে গেল,নো ওয়ে,এসবের কোন মানে হয় না।

বর্ণের অগোচরে ডানপাশের জন তাকে চোখে ইশারা করল।যার অর্থ এমন করলে বর্ণের সন্দেহ গাঢ় হবে।আমরা ধরা পড়ে যাবো।

বর্ণের ডানপাশে তোয়ালে পরা জন বলল,ওকে আমরা রাজি।তবে একটা শর্ত আছে।তুমি এখানে পাঁচ মিনিট দাঁড়াও।আমরা নিচে গিয়ে ফিরে আসছি।

‘ওকে’ বর্ণ সম্মতি দিল,এ বাড়ির অন্য কেউ জাগার আগে আপনারা ব্যাপারটা শেষ করবেন আশা করি।

পাঁচ মিনিটের আগেই তারা দু’জন একই পোষাকে আবার ফিরে এলো,ওকে আমরা রেডি।

বর্ণ প্রথমে টিশার্ট পরা জনের দিকে এগিয়ে গেল।তাকে জড়িয়ে ধরল।তার বুকের ভিতর কোন ধ্বনিপ্রতিধ্বনি হলো না।নাকে পারফিউমের ঘ্রাণ নিল।বর্ণ তার গলার দিকে তাকাল।কোন তিল নেই।তাকে ছেড়ে দিয়ে অপরজনের শরীরের কাছে গেল।তোয়ালে পরা।উদ্দাম শরীর।কয়েক পা এগোলেই বর্ণের হৃৎপিন্ডে ধুকধুক।ধুকধুক শব্দ শুরু।জড়িয়ে ধরার আগ মূহুর্তে ঢিপঢিপ।ঢিপঢিপ।শব্দ বদল।পারফিউমের গন্ধ।মাতাল করা।নেশা লাগে।বুকে ভাঙ্গন ধরে।তারপর বর্ণ সরাসরি গলায় তাকালো।কাজল কালো তিল তার গলায়।

বর্ণ দু’জনের সামনে দাঁড়াল।তোয়ালে পরা জনের দিকে তাকিয়ে বলল,আপনি স্বার্থ ভাইয়া।আর তুমি তীর্থ ভাইয়া।

টিশার্ট পরা জন এবার ধমক দিল,তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে।কিছুক্ষণ আগে তুই ও কে তীর্থ বললি,এখন বলছিস ও স্বার্থ।যদি তাই হয়,তবে তো ঠিকই আছে।অনুর সাথে স্বার্থেরই বিয়ে হয়েছে।

বর্ণ তোয়ালে পরা জনের সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ তার একটা হাত নিজের মাথায় রাখল,আমাকে ছুঁয়ে বলেন,আপনি স্বার্থ ভাইয়া না?

স্বার্থ দ্রুত হাত সরিয়ে নিল,বহুত হয়েছে।হ্যাঁ,আমি স্বার্থ।

তীর্থ বাধা দিলো,কি’সব বলছিস?তোরও কি ওর মতো মাথা খারাপ হয়ে গেছে।ঐ বর্ণ,গতকাল রাতে তোর সাথে কে ছিলো?তোর তীর্থ ভাইয়া তো।এই আমিই ছিলাম।কেন অযথা পেঁচাচ্ছিস বলতো?

বর্ণ তীর্থের দিকে তাকিয়ে স্বার্থের হাত দেখালো,তীর্থ ভাইয়া,আমি এতটাও বোকা না।গতকাল রাতে স্বার্থ ভাইয়ার হাত কেটে গেছিলো,এই দেখো এখনো কাটা দাগ।এতক্ষণ মুষ্টি পাকিয়ে রেখেছিলো।

স্বার্থ বলল,তীর্থ,ছেড়ে দে।ও কে আমি বুঝিয়ে বলছি সবটা।

যেদিন স্বার্থ এবং বর্ণ এ বাড়িতে এসেছিল সেদিন রাতে খাওয়াদাওয়ার পর স্বার্থ অনন্তকে এগিয়ে দিতে বাহির বাড়ি অবধি যায়।ড্রয়িংরুমে অনু এসেছিলো মিশুকে নিতে।সে বর্ণের কোল থেকে মিশুকে নেওয়ার পর তীর্থকে ইশারা করেছিলো।তীর্থ অনুর দিকে তাকিয়ে হেসেছিলো।অনুর চলে যাওয়ার পর তীর্থ বর্ণকে বলেছিল,তুই একটু বোস,আমি আসছি।

জোড়াদিঘির শান বাঁধানো ঘাটের সিঁড়িতে আবছায়া কারোর প্রতিবিম্ব দেখে স্বার্থ প্রশ্ন ছুড়ল,এতো রাতে এখানে কে?

তীর্থ বলল,আরে আমি?অনন্ত চলে গেছে?

স্বার্থ এগিয়ে গেল,তুই এতো রাতে এখানে কেন?সাথে কে?

স্বার্থকে এ বাড়ির সকালে জানে।রাগলে তার হুশ জ্ঞান থাকে না।কিন্তু ঠিক এই কারনে তীর্থ তাকে ভয় পায় না,বরং,সমীহ।ভালোবাসা।ভরসার উপর ভিত্তি করে সে স্বার্থের ব্যাপারে অন্ধ।আকস্মিক তীর্থ তাকে জড়িয়ে ধরল,অনু।

‘অনু?’ স্বার্থ অবাক হলো,এতো রাতে অনু এখানে কেন?

তীর্থ আরো আষ্টেপৃষ্ঠে ভালোবেসে স্বার্থকে জড়িয়ে ধরল।

স্বার্থ তার হাত ছাড়িয়ে দিল,আগে আমাকে বল কি হচ্ছে এখানে?

স্বার্থ অনুর দিকে তাকিয়ে বলল,তুমি এখনি ভিতর বাড়ি যাবে!

অনু স্বার্থকে প্রচন্ড ভয় পায়।সে আর এক মুহূর্তে দাঁড়ালো না।

অনু অন্ধকারে হারিয়ে গেলে স্বার্থ তীর্থের কান ধরল,সারা দিনরাত দু’টোতে এসব করিস?ফাজিল,বোস এখানে।

‘আরে ব্যথা লাগছে তো,কান ছাড়,বসছি তো’ বলে তীর্থ স্বার্থকে জড়িয়ে ধরেই বসে পড়লো।

স্বার্থ মিহি সুরে ডাকল,ভাই!

তীর্থ বলল,হুম।

-ভালোবাসিস অনুকে?

তীর্থের চোখ টলমল করছে।সে উপর দিকে তাকাল,খুব।খুব ভালোবাসি।

-জানে বাড়িতে কেউ?

-নাহ।

-দাদীজানকে বলতে পারতি।

-ভয় লাগে।

স্বার্থ তীর্থের পেটে খোঁচা দিল,ভয় লাগে না?ভালোবাসছিস কেন তাহলে?

তীর্থ বলল,বাহ,আমি ভালোবাসলে দোষ?তুই যে ভালোবাসিস?

স্বার্থ হাত উঠালো,পাকনামি হচ্ছে এখন।ঐ আমি কাকে আবার ভালোবাসলাম?

তীর্থ হাসল,আমি জানি তোকে।একই মায়ের পেটে একসঙ্গে ছিলাম।আমাদের যে নাড়ির টান।সাধারন দশটা ভাইবোনের সম্পর্ক থেকে আমরা বহু উর্ধ্বে।

স্বার্থ জিজ্ঞাসা করল,আব্বাজান,দাদাজানকে বলতে পারবি?

তীর্থ হঠাৎ উঠে দাঁড়াল,মাথা খারাপ!

স্বার্থ দাঁড়িয়ে বলল,ওকে,তুই না বলতে পারিস,আমি বলবো।

তীর্থ আবার স্বার্থকে জড়িয়ে ধরল,একদম না।দাদাজান,আব্বাজান যেমন কোমল তেমন কঠিন।তুই বলতে গেলে তোমাকেই মেরে ফেলবে।আমার কপালে যা আছে হবে আমার জন্য তোকে হারাতে পারবো না।

স্বার্থ তীর্থকে তুলে দু’গালে ধরল,আমার উপর বিশ্বাস নাই,ভাই?

-হুম আছে।অন্ধের মতো।

-আমি সব ঠিক করে দিয়ে,তবে ঢাকা ফিরবো।

-স্বার্থ,আত্মীয়ে সম্পর্ক এ বাড়ি মেনে নিবে না কোনদিন।

অনুর সাথে স্বার্থের ছোট থেকে বিবাহ ঠিক,এ কথা না জেনেই স্বার্থ বলেছিল,সে দায়িত্ব আমার।কিন্তু আমারও কিছু চাই।

তীর্থ জিজ্ঞাসা করল,হুট,কি চাই তোর আবার?

-বাহ রে,আমার কিছু তো চাওয়ার থাকতে পারে।

তীর্থ বলল,ওকে ডান।বল কি চাস?

স্বার্থ মুচকি হাসল,আমরা যমজ।হুবহু চেহারা।এই সুযোগটা নিয়ে তুই আমার প্রক্সি দিয়েছিস এ গ্রামে।

তীর্থ আপত্তি করল,ঐ মিথ্যা বলবি না,স্বার্থ।একদম ভুল সংবাদ।কে বলেছে তোকে এসব?অনন্ত?ওর খবর আছে।

স্বার্থ আবার হাসল,লাভ নেই।সব খবর আমার কানে যায়।

-গেলে যায়।তাতে কি?আমার ভাইয়ের সবকিছুতে আমার শতভাগ অধিকার।

-হ বুঝছি।আপনার বকবক থামালে,কাজের কথা বলি।

-ওকে,বল কি চাস?

-তোর টিশার্ট খোল!

তীর্থ পিছিয়ে গেল,মানে?দৌড় দিবো কিন্তু এবার।

স্বার্থ হাসল,তুই এতোদিন আমার প্রক্সি দিয়ে মানুষকে কনফিউজড করেছিস।এবার তোর হয়ে আমি জাস্ট একজনকে কনফিউজড করবো।

তীর্থ এগিয়ে এলো।টিশার্ট খুলতে খুলতে বলল,বর্ণকে?লাভ নেই।ও তোর কাছে জীবনেও শুবে না।

দু’জনের চেঞ্জ করা হলে।স্বার্থ বলল,ঘড়ি,মোবাইল ও লাগবে।দাঁড়া,চুলটা তোর মতো করে নেয়।দেখতো তোর মতো দাড়ি ট্রিম করা কি’না?

তীর্থ সাহস দিল,দেখার কি আছে?ছোটবেলা থেকে তোর কথা ছাড়া আমি কারোর কথা শুনেছি?দু’ভাইয়ের একই হেয়ার কাটিং,ট্রিম,এমন কি প্রায় সেম পোশাকাদি।তবে তোর পারফিউমে আমার এলার্জি বলে ওটা জাস্ট ভিন্ন।

স্বার্থ সম্মতি দিল,আর শোন,লাভ আছে।আমি সুনিপুণ।সূক্ষ্ম।অভিনয় জানি।তুই পারবি কি’না বল?

তীর্থ জানাল,একেবারে জিরো।তোর মতো গান,অভিনয় আমার দ্বারা হয় না।আমি পারি হাসতে।টেনেটুনে পাস করতে।ইটবাটা।চালের আড়ত।এসব সামলাতে।

স্বার্থ ধমক দিল,দাঁত বের করে হো হো করলে ধরা খাবি।আমাকেও ডুবাবি।জাস্ট রাতে তো।দিনে যে যার ভূমিকায়।শোন,ঢাবিতে যেয়ে কয়েকদিন থিয়েটার করেছিলাম মৌনের পাল্লাই পড়ে।আর গান তো আগে থেকে পারি।তোর কিছু করতে হবে না।শুধু আমার মতো মুডে চলতে পারবি না?কথা কম।গম্ভীর।রাগী।

তীর্থ মাথা নাড়ল,ধুর,এতো টুকু কোন ব্যাপার।ওকে ডান।বেশ মজা হবে।

সব শুনে বর্ণের খুশি-অখুশির অনুভুতি যেন হারিয়ে গেল।তার কি করা উচিত?

স্বার্থ বর্ণের দিকে তাকাল,তুমি বলো,তুমি বুঝতে পারো নি যে অনু তীর্থ একে অপরকে ভালোবাসে।

বর্ণ কোন কথার জবাব দিলো না।

তীর্থ বর্ণের হাত ধরল,বর্ণ,আমি জানি তোর খারাপ লেগেছে।কিন্তু স্বার্থ তো জাস্ট মজার জন্য এটা করেছে।

বর্ণ তীর্থের থেকে হাত ছাড়িয়ে নিল।সে কথার পুনরাবৃত্তি করল,মজা!জাস্ট মজা?

তীর্থ বলল,কেন?তোকে কি স্বার্থ কোন প্রকার কষ্ট দিয়েছে?এখানে এসে তোর সাথে বরং আমার কথা কম হয়েছে।আগের মতো তোকে সময় দিতে পারি নি।কিন্তু স্বার্থ তোর পাশে রোজ রাতে শুয়েছে।মাঝরাতে সাইকেলে করে স্কুল মাঠে নিয়ে আকাশ দেখিয়েছে।অনুর বিয়ের জন্য যখন মন খারাপ করে গোটা তিনদিন কেমন কেমন করতে শুরু করলি।এই স্বার্থই তোর একলা অন্ধকার ছাদে গল্প করেছে।তোকে মুখে তুলে খাইয়েছে।দিনের পুরোটা সময় তুই ওর কাছে থাকলি অথচ চিনলি না।তার দায় আমাদের?আমার ভাইটা তোর চোখে কি এতই খারাপ?আমি জানি,আমার ভাইটা একটু বদরাগী।কিন্তু তোকে তো কোনদিন সামান্য কষ্ট দেয় নি।

বর্ণ যেন নির্বাক।নির্লিপ্ত।নির্বিকার।শুধু বলল,আমাকে বুঝতে দিবেন না বলে আপনারা নিচে গিয়ে পোষাক পর্যন্ত বদলে আসলেন।এতটা…!

তীর্থ জিজ্ঞাসা করল,বর্ণ,তোর এটা বলার ছিলো?আর কিছু বলার নাই?

বর্ণ দু’জনের দিকে তাকিয়ে বলল,আপনারা দু’ভাইয়ের একজনও আর কোনদিন আমার সাথে কথা বলবেন না।আমি আন্নাকে বলে আজি ঢাকা চলে যাবো।

বর্ণ সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল।

বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেলে তীর্থ বলল,স্বার্থ,সকাল হয়ে এসেছে।আমাদের যাওয়া উচিত।এই মুহূর্তে ছাদে কেউ এলে।লজ্জার ব্যাপার।চল,নিচে গিয়ে পোষাক চেঞ্জ করি।

স্বার্থ বিনা বাক্যে তীর্থকে অনুসরন করলো।তার চোখ ছলছল করছে।পুরুষের চোখে পানি বেমানান।তবে স্বার্থের মতো সুশ্রী পুরুষের চোখে পানি?বড্ড ভয়ংকর সুন্দর।

(একাদশ এবং অন্তিম পর্ব)

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>> 

বিঃদ্রঃ তোমার একটিমাত্র জীবন যদি প্রেমহীন থেকে যায়,শর্তহীন দলিলে যদি কোন বিবাদীর নাম লেখা না থাকে,অনাবিষ্কৃত ভালোলাগা যদি তোমার ঠোঁটের আঙ্গিনায় বিরহ না জাগায়,একটিমাত্র জীবনে তুমি যদি কলঙ্ক এর সুখই না পেলে-তবে তুমি…!তবে তুমি আমার গল্প পড়ো না।

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>> 

একুশ।

সকালে ব্রেকফাস্ট টেবিলে শরীফ তীর্থের নাম ধরে ডাক দিল,তীর্থ!

তীর্থ অনুর পাশে বসে ছিল।সে শরীফের দিকে তাকাল,জী ভাইয়া।

সকলে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো।দাদীজান হেসে বললেন,কি’রে স্বার্থ!বিয়ে করে নিজের নামটা ভুলে গেলি।

স্বার্থ তীর্থের বিপরীতে বসেছিল।টেবিলের তলা দিয়ে সে তীর্থের পায়ে আঘাত করলো।তীর্থ মনে মনে ‘ওফ শিট’ বলে অনুর হাত চেপে ধরলো।অনু ভয়ে কুঁকড়ে গেল।এবার স্বার্থ শরীফের দিকে তাকিয়ে বলল,জী ভাইয়া,কিছু বলবেন?

শরীফ সে’কথার জবাব না দিয়ে বলল,নানীজান আপনিও আমার সাথে ভন্ড শুরু করেছেন?বাহ।

দাদীজান বললেন,আমি তোমার সাথে কোন ভন্ডামি করছি না।

শরীফ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।জোর গলায় বলল,করছেন আপনি ভন্ডামি।গতকাল রাতে আমি হালিম মুন্সির থেকে কাবিনের ফটোকপি এনেছি,তাতে স্পষ্ট অনুর নামের পাশে লেখা ‘চৌধুরী নাইমুন ইসলাম তীর্থ’।মা স্বার্থের সাথে অনুর বিয়ে ঠিক করেছিলো তীর্থের সাথে নয়।

বর্ণ নিচু হয়ে খাচ্ছিল।শরীফ তার দিকে তাকিয়ে বলল,বর্ণ,তুই বল!এখানে কে তীর্থ কে স্বার্থ?

বর্ণ সামান্য মাথা উঁচু করল,আন্না,আমি বলতে পারবো না।যেখানে তোমরা চিনছো না সেখানে আমি কিভাবে…!

শরীফ রেগে গেল,এক চড়ে সব দাঁত ফেলে দেবো,বেয়াদব।মিথ্যা বলা শিখে গেছিস।ভোরে ছাদে দাঁড়িয়ে তিনটা কি নাটক করলি?

বর্ণ কেঁপে উঠল।যে কোনদিন তার আন্নার মুখের উপর কথা বলে নি,সে কি অবলীলায় আজ মিথ্যা বললো।

নাজমা চৌধুরী পাশে দাঁড়ানো ছিলো।বললেন,শরীফ তুই শান্ত হ,বাবা।

শরীফ নাজমা চৌধুরীর দিকে তাকাল,মামীজান,আপনি তো জন্মদাত্রী মা।আপনি আমাকে বলেন তো কে স্বার্থ আর কে তীর্থ।

নাজমা চৌধুরী কাতর কন্ঠে বললেন,বিয়ের এতো ঝামেলায় আমি তো বাবা খেয়াল করি নি।

তিনি হেটে স্বার্থের চেয়ারের কাছে গিয়ে বললেন,তুই গলা উঁচু কর তো।

স্বার্থ দাঁত চেপে ফিসফিস করল,আম্মা,তুমিও!তুমি তো জেনে গেছো।

নাজমা চৌধুরী জোর করে তার গলা উঁচু করলো।গলার তিলের দিকে নজর দিয়ে বলল,এটা সাইমুন।আর নাইমুনের বুকে একটা তিল আছে।

দাদীজান বললেন,রিনা তার আব্বাজানের হাত ধরে বলেছিল স্বার্থের সাথে অনুর বিয়ের কথা।ঠিক আছে মানলাম।কিন্তু আমার তীর্থ অনুকে ভালোবাসে।অনু তো জানে তার কার সাথে বিয়ে হয়েছে।

শরীফ অনুর দিকে তাকাল,কি’রে নানীজান কি বলছে এসব?

অনু মাথা নিচু করে রইল।দাদীজান বললেন,তোর নানাজান বেয়াড়া।আর আমার ছেলে রমজান সহজ-সরল হলেও বাপের মতো গোয়ার।তীর্থ,স্বার্থ তাদের মুখের উপর কথা বলে নি কোনদিন।আমি আর নাজমা গতকাল বৌভাতের রাতে জানতে পেরেছি ওরা দু’টো মিলে আমাদের বোকা বানিয়েছে।তবুও আমি খুশি।একজন মরা মানুষের কথা রাখতে গিয়ে তো ওরা ওদের জীবন নষ্ট করতে পারে না।এখানে আমার নাতিদের কোন দোষ নেই।

শরীফ শান্ত হলো,কিন্তু নানীজান,নানাজান-মামাজানকে কিভাবে ম্যানেজ করবো।

দাদীজান বললেন,সেটা আমি দেখছি।ওনারা দু’জন ঘরে আছে।

শরীফ হাত ধুয়ে উঠে গেলেন।দাদীজান বললেন,নাজমা,রিতু,সুমি তোমরাও আসো।আর তোরা খেয়ে উপরে যা।

বর্ণ খাবারের ভিতর পানি ঢেলে দ্রুত উপরে উঠে গেলো।স্বার্থ তীর্থের দিকে তাকালো।তীর্থ চোখ ইশারা করল,আরে যা না।

অনু তীর্থের দিকে তাকিয়ে বলল,কিছুই তো বুঝলাম না,বর্ণের কি হলো?স্বার্থ ভাইয়া দৌড়ে গেল কেন?

তীর্থ বলল,তোমার এতো না বুঝলেও চলবে।ওদেরটা ওরা বুঝুক।তুমি মন দিয়ে খাও।আচ্ছা,আমি একটু আসছি।

অনু বলল,তুমি আবার কই যাও।

স্বার্থ তীর্থের রুমের দিকে গেল।কারন এতোদিন সে বর্ণের সাথে এখানেই ছিলো।রুমে ঢুকে স্বার্থ দরজা আটকে দিল।বর্ণের থেকে ব্যাগ কেড়ে নিল,ব্যাগ গুছিয়ে কই যাচ্ছো তুমি?পাগল হয়ে গেলে?

আজ বর্ণের ভিতরটা ঢিপঢিপ।ঢিপঢিপ।নয়।ব্যথায় চিনচিন করছে।সে স্বার্থের থেকে ব্যাগ নিতে চাইল,স্বার্থ ভাইয়া,ব্যাগ দিন।আমি কিন্তু ঘরের সবকিছু ভেঙ্গে ফেলবো এবার।

স্বার্থ বলল,ওকে।তোমার মন চাইলে সব ভেঙ্গে ফেলো।বাট তুমি কোথাও যাচ্ছো না।

স্বার্থ ব্যাগ বিছানায় ফেললো।তারপর বর্ণের সামনে গিয়ে দাঁড়াল,এমন করো না,প্লিজ,বর্ণ।

বর্ণ রাগে গজগজ করল,ব্যাগ দিবেন কি না?

স্বার্থ বর্ণের একটা হাত ধরতে গেলেই বর্ণ সরে দাঁড়াল,ডোন্ট টাচ মি।আমি ব্যাগ রেখেই গেলাম।

বর্ণ দরজার কাছে যাওয়ার আগেই স্বার্থ সোফার সামনে ছোট্ট টেবিলে থাকা একটা ছুরি নিয়ে দরজায় বাধা হয়ে দাঁড়াল।

ছুরি দেখিয়ে বলল,কাল রাতে তোমাকে চড় মেরেছিলাম বলে নিজের সেই হাত কেটেছি।আজ তুমি চলে গেলে হাতের শিরা কেটে ফেলব।

বর্ণ বিদ্রুপ করল,ভয় দেখাচ্ছেন?আই ডোন্ট কেয়ার।

স্বার্থের চোখ সজল হয়ে এলো,ভয় নয়,সত্যি।

‘যা খুশি করেন’ বলে বর্ণ জোর করে স্বার্থকে সরিয়ে দরজার বাইরে আসতেই তীর্থ সামনে পড়লো।

তীর্থ বর্ণকে ধরতে গেলেই বর্ণ বলল,ছু্ঁবে না,তীর্থ ভাইয়া,আমি কিন্তু চিল্লাবো।

তীর্থ সরে দাঁড়াল,ধরলাম না তোকে।কিন্তু তুই কি ছোট শিশু হয়ে গেছিস?এভাবে কই যাচ্ছিস?

বর্ণ তীর্থের কথার জবাব না দিয়ে দ্রুত নিচে নামতে লাগল।

তীর্থ রুমে ঢুকে স্বার্থের হাতে ছুরি দেখে বলল,হয়েছে।ওর দেখাদেখি তোরও মাথা বিগড়েছে।হা করে দাঁড়িয়ে না থেকে ব্যাগ গুছিয়ে ওর ব্যাগসহ ওর পিছনে যা।ও এখন কারোর কথা শুনবে না।তুই এক কাজ কর,এ রুমে তো আমার শার্ট,প্যান্ট সব।এখন তোর রুমে যেতে গেলে,সময় হবে না।তুই আপাতত এগুলো নিয়ে যা,আমি পরে সব পাঠিয়ে দেবো।

স্বার্থের চোখ লাল হয়ে গেছে।সে দ্রুত অগোছালো কাপড়গুলো কোনমতে ব্যাগে ঢুকিয়ে বর্ণের ব্যাগটা নিল।তীর্থকে জড়িয়ে ধরল,এদিকের কি হবে?

তীর্থ তার পিঠে হাত রেখে বলল,আমি সব সামলে নিবো।নো টেনশন।ভালোবাসার থেকে বড় কিছু নেই।ভালোবাসার জন্য সব করা যায়।

স্বার্থ তীর্থকে আরো জোরে জড়িয়ে ধরল,আমি বর্ণকে ভালোবাসি,তুই জানতিস?

তীর্থ মাথা নাড়াল,হুম,আমি জানি তো,আমার ভাইটা একটু এরকম।তার চাওয়াপাওয়া অন্যরকম।

স্বার্থ তীর্থকে ছেড়ে তীর্থের গালে একটা চুমু দিল,থ্যাংকস,ভাই।লাভ ইউ লট।আসলাম।ফোন করে সব জানাস।

তীর্থের চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।মনে মনে বলল,আই আলসো লাভ ইউ সো মাচ,ভাই।

অনু এসে পাশে দাঁড়াল,তোমাদের কি হলো বুঝলাম না।ওরা দু’জন তড়িঘড়ি করে কোথায় গেলো।

তীর্থ বলল,কিছু না।ওরা যাক না ওদের মতো।চলো,আমরা দাদাজানের রুমে যাই।ওখানে সবাই আছে।আমাদের ও থাকা দরকার।

অনু চিরদিন বোকা।শান্ত।নির্ভর।হয়তো তাই সে দ্বিতীয় কোন কথা জিজ্ঞাসা করলো না।

বর্ণ বাসে মুখ শুকনো করে চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে বসে আছে।কিন্তু জার্নিতে তার ঘুম হয়।নেত্রকোনা যাওয়ার দিন সে পুরোটা পথ ঘুমিয়েছিলো।স্বার্থ দীর্ঘ সময় ধরে তার ঘুমন্ত মুখ দেখে কাটিয়ে দিয়েছিল।ঘুমন্ত বর্ণ কি নিষ্পাপ।স্নিগ্ধ।মুগ্ধতায় ভরা।অথচ বর্ণ অশান্ত।চঞ্চল।সর্বোপরি মজার ব্যাপার সে খুব ভীরু প্রকৃতির।বাস নেত্রকোনা পৌঁছালে স্বার্থ তাকে ডাকতেই সে বাচ্চাদের মতো করল,স্বার্থ ভাইয়া,আরেকটু ঘুমাই।

স্বার্থ তার কোল থেকে ব্যাগ উঠিয়ে বলল,আরে আমরা নেত্রকোনা শহরে এসে গেছি।রসুলপুর যেতে হবে।

‘ওহ’ বলে বর্ণ আবার চোখ বুজল।তখন স্বার্থ পানির বোতল এগিয়ে ধরল,চোখেমুখে পানি দাও ঘুম কেটে যাবে।বাস এখানে বেশিক্ষণ দাঁড়াবে না,বর্ণ।এটা তোমার বেডরুম নয়।

তারপর রসুলপুরের পুরোটা রাস্তায় বর্ণ ঝিমিয়েছে।স্বার্থ বার বার তাকিয়ে এটাওটা রসুলপুরের কত গল্প করেছে বর্ণের ঘোর কাটাতে।সে কথার বিন্দু হয়তো সেদিন বর্ণের কানে ঢোকে নি।

পুরানো কথায় মনে পড়ায় স্বার্থের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো।

আজ বাস জার্নিতে সেই অধীর।অস্থির।ছেলেটি ঘুমিয়ে কাটাচ্ছে না।স্বার্থ চোরা চোখে তাকে দেখছে।চুপচাপ।পলকহীন।অথচ চোখে যেন তার কি আনন্দ খেলা করছে।স্বার্থের চোখে কি সে খুশির ঝিলিক প্রতিফলন হচ্ছে?হয়তো না।তার বুক দুরু।দুরু।কাঁপছে।ফ্ল্যাটে গিয়ে পাগলকে সে সামলাবে কিভাবে?স্বার্থ অবাক হলো,কোন কিছুতে ভয় তো তার কোনদিন ছিলো না।তবে আজ কেন বুকে ধুকধুক।ধুকধুক রুপবদল।

চলতি বাসে মাঝে মাঝে রোদের ঝিলিক বর্ণের চোখেমুখে পড়ছে।বিরক্ত হচ্ছে।অথচ পর্দা টানছে না।স্বার্থ উঠে ঘুরে দাঁড়ালো পর্দা টানার জন্য।তার কোমর বর্ণের মুখের কাছে।বর্ণ একবার উঁচুচোখে স্বার্থকে দেখল।সে পর্দা সরাতে ব্যস্ত।বর্ণ তার কোলের উপরের ব্যাগ নিয়ে তার মুখ এবং স্বার্থের কোমরের মধ্যদূরত্বে রাখল।স্বার্থ পর্দা সরিয়ে নিচে বর্ণের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচাল।

বর্ণ মাথা নাড়াল,যার অর্থ কিছু না।

স্বার্থ মৌনকে কল করল,হ্যালো,মৌন।আমরা ঢাকা ফিরছি।বড় বিপদে আছি ভাই।সেফ মি।

মৌন ওপাশ থেকে বলল,কি বলিস?চলে আসছিস মানে?ভাবি সাথে নাকি?

-আজব!তোর ভাবিকে আনবো কেন?পুরো কথা না শুনে বকবক করিস।

-আরে শালা।বিয়ে করলি দু’দিন হলো না।বউ ফেলে পালাচ্ছিস।

স্বার্থ বিরক্ত হলো,আরে ধুর।আমি আর বর্ণ আসছি।তোর শালাবাবু তো রেগে আগুন।আমি একা পুড়তে পারবো না।একটু বাসস্টপে আসবি?

-আমার তো নকল শালা,তোর তো আসল।তুই সামলা।আচ্ছা,কাহিনী কি?

স্বার্থ বলল,তাহলে সন্ধ্যায় ফ্ল্যাটে আয়।সব কাহিনী শুনবি।ত্রিশাকে আনবি?

-ত্রিশা তোদের ওখান থেকে এসে সরাসরি ওর মামার বাসায়।

‘আচ্ছা,তাহলে একা আসিস।রাখলাম’ বলে স্বার্থ কল কেটে দিল।সে দেখল বর্ণ আড়চোখে তাকিয়ে আছে।মুখে মৃদু হাসি।

স্বার্থ মনে মনে বলল,আল্লাহ,বেঁচে যাবো বোধহয়।

বর্ণকে বাইরে দাঁড়িয়ে রেখে স্বার্থ বাড়িওয়ালার কাছে ফ্ল্যাটের চাবি আনতে গেছে।তড়িঘড়ি করে আসতে গিয়ে নিজের ব্যাগটা ফেলে আসায় চাবিটা থেকে গেছে।বর্ণ না দাঁড়িয়ে জেনিথদের বাসায় চলে গেলো।স্বার্থ ফিরে এসে না পেয়ে জেনিথদের বাসায় টোকা দিলো।তারা এখনো কলিংবেল সেট করে নি।

জেসিকা দরজা খুলে হাসল,ভিতরে আসো।তুমি নাকি বিয়ে করেছো?বর্ণ মাত্র বললো।

স্বার্থ বলল,ও ভিতরে?

-হ্যাঁ।একটু পাঠিয়ে দিন।

জেসিকা বলল,তুমি উপরে যাও।আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি।রাগ বোধহয়,না?

‘হুম একটু’ বলে স্বার্থ সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলো।

বর্ণ ফিরলো সন্ধ্যার পর।স্বার্থ আর মৌন সোফায় বসে গল্প করছিলো।মৌন বলল,শালাবাবু,কখন এসে বসে আসি।কইছিলে বলো তো?

বর্ণ মৃদু হাসল,জেনিথদের বাসায় ছিলাম।

মৌন হো হো করে হেসে উঠলো,তোমার তো দুলাভাই বদল হয়ে গেল।স্বার্থ তোমার কাজিন থেকে বেয়াই হয়ে গেলো।আমরা পর্যন্ত গিয়ে দু’টোকে আলাদা করতে পারি নি।

বর্ণ বলল,মৌন ভাইয়া,আপনারা কথা বলুন।আমি একটু ফ্রেশ হবো।

বর্ণ চলে গেলে মৌন ইশারা করল,কি হয়েছে?

স্বার্থ বলল,আরে ছাড়।তেমন কিছু না।ওখানে গিয়ে ওর তীর্থ ভাইয়ার জায়গা নিয়েছিলাম তো।

মৌন শব্দ করে হাসল,তোরা কি অভিনয় পারিস রে বাবা।ত্রিশা শুনলে হেসে খুন হয়ে যাবে।আজ আসি,দোস্ত।তুই বরং তোর কাজিন,আই মিন বেয়াইকে সামলা।

হঠাৎ করে চলে আসায় স্বার্থ খালাকে বলতে পারে নি।স্বার্থ রান্নাবান্না তেমন কিছু পারে না।কখনো দরকার হয় নি।যদিও বাইরের খাবারে তার অরুচি তবুও মৌনকে আসার সময় বাইরে থেকে খাবার আনতে বলেছিলো।স্বার্থ বর্ণের রুমে ঢুকল।টেবিলে খাবার রেখে বলল,বাড়িতে তো সকালে কিছু খেলেন না।সারা জার্নিতে খাওয়ানো গেল না।এখন দয়া করে এটা খেয়ে নিন।

বর্ণ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল,আমার জন্য কারোর না ভাবলেও চলবে।আমি না খেয়ে নেই।জেনিথদের বাসা থেকে খেয়ে আসছি।

বর্ণ বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।

‘ওহ’ বলে স্বার্থ সোফায় গিয়ে বসল,তাহলে তো ভালোই।আগে বলতেন খাবারের টাকাগুলো বেচে যেতো।

বর্ণ মুখ ফেরালো,আপনার টাকার খাবার আপনিই খান।

স্বার্থ খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল,আমার ক্ষুধা নেই।ওকে,খাবারগুলো রেখে কি করবো!ফেলে দিয়ে আসি।

বর্ণ বিছানা থেকে দ্রুত উঠে দরজায় দাঁড়াল,ভালো হবে না বলে দিলাম,স্বার্থ ভাইয়া।

স্বার্থ মুচকি হাসল,কেন খারাপের কি হবে?বলেন তো।

‘উফস’ বর্ণ মনে মনে উচ্চারণ করল,আবার সেই হাসি!কালিজায় গিয়ে লাগে তো।

বর্ণ সামনে থেকে একপা দু’পা করে এগোলো।

স্বার্থ এক’পা দু’পা করে পেছালো,বর্ণ,আর এগোবে না।ওকে,ওকে রাখছি।

স্বার্থ সোফা টেবিলে মৃদু ধাক্কা খেয়ে ঘুরে দাঁড়াল।খাবার রেখে বলল,ফেলছি না।রেখে দিলাম।হ্যাপি?

বর্ণ দাঁড়িয়ে পিছনে হাত বাধল।পায়ের পাতার উপর ভর দিয়ে একবার উঁচু আরেকবার নিচু হয়ে বলল,আপনিও বসেন।লক্ষ্মী ছেলের মতো।

স্বার্থ বসল।বর্ণ গিয়ে সোফায় তার পাশে বসে প্লেট হাতে নিল,হা করেন?

স্বার্থ জিজ্ঞাসা করল,আপনি এখন আমায় খাইয়ে দিবেন নাকি?

বর্ণ কটাক্ষ রাগ দেখাল,হা করতে বলেছি।

স্বার্থ মাথা নাড়াল,এই না না,প্লিজ।আমি মরে যাবো একদম।

বর্ণ ধমক দিল,বেয়াইসাব,আমি হা করতে বলছি না?বিয়ের অনুষ্ঠানের দিন,রাতে আমাকে ছাদে খাইয়ে দিলেন না?বাই দ্যা ওয়ে,আমি কারোর ঋণ রাখি না।

স্বার্থ মন খারাপ করল,তার মানে ঋণ শোধ করছো।আমি ভাবলাম বুঝি…!

বর্ণ কথা শেষ করতে দিলো না,হ্যাঁ,ঋণ শোধই তো।হা করেন।

স্বার্থ হা করার আগে বর্ণের হাতের দিকে তাকাল,কিন্তু হাত তো ধুলেন না আপনি।

বর্ণ স্বার্থের মুখে একগ্রাস জোরে দিয়ে বলল,অপরিষ্কার হাতেই খাওয়াবো।

স্বার্থ আবার মুচকি হাসল,তো একটু মায়া করে খাওয়ান না।যেমন করছেন আপনি।

বর্ণের বুকের ভিতর ঢিপঢিপ।ঢিপঢিপ।শব্দ হচ্ছে।

মনে মনে বিরক্তি নিয়ে বলল,উফস,জ্বালাচ্ছে খুব।

তারপর জোরে বলল,এই হাসবেন না তো।বিরক্তি লাগে।

স্বার্থের মুখ শুকনো হয়ে গেল।

বর্ণ আড়চোখে চেয়ে নিজেই মুচকি হাসল।

বাইশ।

বিছানায় শুয়ে বর্ণ রসুলপুরে বড় বাড়িতে স্বার্থের সাথে ঘটা প্রত্যেকটা কথা মনে করতে চেষ্টা করছে।দক্ষিণপাড়া স্কুল মাঠে এক আকাশ জোসনায় শুয়ে গল্প।স্বার্থের মিষ্টি কন্ঠে গান।ঘুমাতে যাওয়ার আগে কত খুনসুটি।ছাদময়।জোড়াদিঘি।শিউলতলা।কত আবেগ।অনুভুতি।কি নিখুঁত অভিনয় পারে স্বার্থ ভাইয়া।একেবারে ধরতে পারলো না।তবে তার হৃদয়ের ধ্বনি প্রতিধ্বনি বারবার তাকে জানিয়েছে।বুকের স্পন্দন অনুভবের অভাব হয় নি তার।কিন্তু বাহ্যিক অনুভুতির টানাপোড়ন চলেছে সারাক্ষণ।

এখন ভিতরটা ধুকধুক করছে তার।সে মৃদু হাসল।গোটা ব্যাপারটা জানার পর একই বিছানায় শুতে বর্ণের লজ্জা করছে।তাই রাগের সুযোগটা নিয়ে স্বার্থকে বের করে দিয়েছে।এখন ভয় ভয় লাগছে।লাইট অন।দরজা খোলা।বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে বর্ণ।

তীর্থ কি সব সামলাতে পেরেছে?ফোনটা তো করবে!অনন্তের বিয়েতে তার থাকা হলো না।স্বার্থ বিছানায় শুয়ে এপাশওপাশ করছে।ভিতরটা তার ঢিপঢিপ।ঢিপঢিপ।শব্দ করছে।বর্ণ ভয় পাবে না তো।যে বর্ণ তাকে ভয় পেতো।সমীহ।শ্রদ্ধা।এসবের কমতি ছিলো না।আজ কেমন সাহসী হয়ে গেছে।বর্ণ হয়তো বুঝে গেছে স্বার্থের দুর্বলতা।তার স্পষ্ট ধারনা হয়ে গেছে স্বার্থ তাকে ফুলের টোকাও দিবে না।স্বার্থ মুচকি হাসলো।

সে হাসির রেষে কি এ রুমে বর্ণের বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে উঠলো।

রাত একটা।স্বার্থ কোলবালিশ ছেড়ে পাশ ফিরল।মুখে নিশ্বাসপ্রশ্বাসের গরম হাওয়া টের পেল।চোখ মেলে দেখলো বর্ণ তার পাশে শুয়ে আছে।কুঁকড়িয়ে।ভয়ে কখন উঠে এসেছে কে জানে?স্বার্থ বেডসুইচ অন করলো।সম্মুখে দু’জনের ঠোঁট।নাক।চোখ।স্বার্থ অপলক তাকিয়ে দেখছে।বর্ণ।একটা নাম।যা নীবরে উচ্চারণেও তার বুকে ভাঙ্গন ধরে।তোলপাড় হয়।কি আকর্ষণ।মায়া।নেশা।বর্ণের কপালে চুল এসে পড়েছে।স্বার্থ ফুঁ দিল।বর্ণের চোখের পাতা কেঁপে উঠলো।স্বার্থ শোয়া থেকে সামান্য উঁচু হয়ে বর্ণের কপালে ছোট্ট একটা চুমু দিল।বর্ণ চোখ মেলে তাকাল।কিছুক্ষণ।তারপর হঠাৎ বর্ণ স্বার্থকে জড়িয়ে ধরলো।স্বার্থের যেন হুশ নেই।কাঁপাকাঁপা কন্ঠে বলল,ভয় পেয়েছিস?

বর্ণ জড়িয়ে ধরেই মাথা নাড়াল,হুম।

স্বার্থ বর্ণকে জোরে আকড়ে ধরল,স্যরি রে।তোকে কষ্ট দেওয়ার জন্য।

বর্ণ স্বার্থের পিঠে আছড় কাটাল,আবার তীর্থ ভাইয়া সাজার চেষ্টা।একেবারে মেরে ফেলবো।

‘আউছ,লাগলো তো’ বলে স্বার্থ বর্ণের গলায় চুমু দিল,কষ্ট পেয়েছো না খুব?

বর্ণ স্বার্থের বুকে মাথা লুকাল,অনেক।মন চাইতো মরে যায়।

স্বার্থ বর্ণের চুলে চুমু খেল,মাইর দিবো।আবার মরার কথা।আমাকে এতো ভালোবাসো?কই কোনদিন বলো নি তো?

বর্ণ স্বার্থের বুকে চিমটি দিল,ইশ,আমার বয়ে গেছে উনাকে ভালোবাসতে।বরং আপনি বাসেন।

‘উফ!আবার চিমটি কাটে’ স্বার্থ যেন অবাক হলো,মজা করলো,আমি আপনাকে ভালোবাসি নাকি?কই মনে পড়ছে না’তো।

বর্ণ স্বার্থকে ছেড়ে বিছানায় উঠে বসল,আচ্ছা,তাহলে আমি আমার রুমেই যাই।

স্বার্থ বর্ণের হাত ধরে টেনে বিছানায় শুয়ে দিয়ে একেবারে গায়ের উপর শুয়ে পড়ল,খুন করে ফেলবো।আমাকে আধমরা করে,এখন বলে চলে যায়।

বর্ণ নিচে পড়ে মোচড় দিল,উফ,কি ওজন!গায়ের উপর থেকে নামো তো।দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

‘হুসস’ স্বার্থ বর্ণের ঠোঁটে আঙ্গুল ছোঁয়ালো,বন্ধ হলে হবে।তোমাকে দেখলে যে আমার বুকে ঢিপঢিপ।ঢিপঢিপ।শব্দে আমি দম বন্ধ হয়ে রোজ মরি।তার বেলায় কিছু না?

বর্ণ চোখ বন্ধ করল,ওকে।সারারাত শুয়ে থাকেন।আমি ঘুমালাম।

স্বার্থ অভিযোগ করল,আপনি এগ্গে করো কেন?যখন তোমার তীর্থ ভাইয়া ছিলাম তখন তো মিষ্টি করে তুমি বলতে।এবার ‘তুমি’ বলো।

বর্ণ হাসল,পারবো না।যান তো।

স্বার্থ বর্ণের পিঠের নিচে হাত রেখে এক গোড় দিয়ে বর্ণকে নিজের বুকের উপর নিল,পারতে হবে।বলো,না হলে সুড়সুড়ি দিবো।

বর্ণ নামতে চাইল।স্বার্থ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল।বর্ণ স্বার্থের ঘাড়ের কাছে বালিশে মুখ লুকালো।স্বার্থ নিজের মাথার নিচের বালিশ সরিয়ে নিল।দু’হাত দিয়ে বর্ণের মুখ তুলে নিজের নাকের সাথে বর্ণের নাকে ঘষা দিলো,বলবে না?

বর্ণ মাথা নাড়াল।যার অর্থ,না।স্বার্থ কটাক্ষ রাগ দেখিয়ে বর্ণকে তার বুকের উপর থেকে নামিয়ে পাশ ফিরে শুইল।বর্ণ স্বার্থের পিঠে আবার আছড় কাটল।সে বর্ণের হাত সরিয়ে দিল।

বর্ণ আবার আছড় টানল স্বার্থের পিঠে,’তুমি’ তো।

এক মুহূর্ত।আকস্মিক স্বার্থ ঘুরে বর্ণের গায়ের উপর উঠে গেল।বর্ণ কিছু বুঝে উঠার আগে চোখ বন্ধ করে বর্ণের ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল।বর্ণের শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো।সে চোখ বন্ধ করে ফেলল।টানা দু’মিনিট।স্বার্থ বর্ণকে ছেড়ে দিয়ে বর্ণের পাশে চিৎ হয়ে শুয়ে হাঁপাতে লাগল।

বর্ণ দম ছাড়ল।তার চোখ বেয়ে পানি পড়ছে।অনেকক্ষণ পর স্বার্থ সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বলল,আই অ্যাম স্যরি,বর্ণ।

বর্ণ চোখের পানি মুছল,স্যরি কেন?

স্বার্থ চোখ স্থির থেকে বলল,তোমার কষ্ট হলো,তাই।

বর্ণ কাঁপা স্বরে বলল,আমার ভালে লেগেছে।

তারপর বর্ণ উল্টো পাশ ফিরল।

দু’জনের বুকে যেন আজ শ্রাবণ সুখের বৃষ্টি ঝরঝর শব্দ করে টিপটিপ।টিপটিপ।ঝরছে।

স্বার্থ বর্ণকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বর্ণের কানের লতিতে হালকা কামড় দিল,আই লাভ ইউ।লাভ ইউ লট।ডু ইউ লাভ মি?

বর্ণ মাথা নাড়াল।অর্থ না।স্বার্থ তার ঘাড়ে কিস করতে করতে একটা হাত দিয়ে বর্ণের পেটে সুড়সুড়ি দিলো।বর্ণ হাসতে হাসতে চিৎ হয়ে গেল।

স্বার্থ বলল,স্ট্যাচু!

বর্ণ স্থির হয়ে গেল।স্বার্থ ধীরে ধীরে বর্ণের কোমরে কাছে এসে তার টিশার্ট তুলল।বর্ণের শরীর মোচড় দিল।স্বার্থ বর্ণের দিকে তাকাল,স্ট্যাচু তো।

তারপর সে গোলাপি ঠোঁট বর্ণের সুগভীর।নেশাময়।মাদতকামিহি।নাভিতে ডুবিয়ে দিল।

বর্ণ ঠোঁট কামড়ে ধরে চোখ বন্ধ করল।এভাবে পাঁচমিনিট।

বর্ণ অনুরোধ করল,স্বার্থ ভাইয়া,প্লিজ ছাড়ো না।আমি আর পারছি না।শরীর খারাপ করছে আমার।

স্বার্থ মুখ তুলে মদ খাওয়া নেশাগ্রস্তদের মতো মাথা ঝাঁকলো।তার মাথা ঘুরছে।ঘোর লেগে গেছে।

বর্ণের বুকের উপর শুয়ে আবার তার নাক বর্ণের নাকে ঘষা দিল,কি নেশা নাভিতে।পাগল করে দেয়।পেটে কি ঘ্রাণ তোমার বর্ণ।

বর্ণ স্বার্থের গলার কালো তিলে চুমু দিল,আমার এটাতে নেশা লাগে।

স্বার্থ মুচকি হাসল,তো খেয়ে ফেলো।

‘খাবোই তো’ বর্ণ স্বার্থের কপাল থেকে আঙ্গুল ছুঁয়ে নাকে নেমে স্বার্থের কোমল নরম ঠোঁটে আঙ্গুল থামাল,আজ থেকে এই সুন্দর মানুষটি শুধু আমার।

স্বার্থ টুক করে বর্ণের ঠোঁটে একটা চুমু খেল,আর এই দুষ্টুটা কার?

বর্ণ দুষ্টুমির হাসল দিল,আমার রসের বেয়াইসাবের।

স্বার্থ বর্ণের গায়ের উপর থেকে হাত বাড়িয়ে বেডসুইচ অফ করে দিল।

ওয়াশরুমে থেকে গোলাপি তোয়ালে পেঁচিয়ে সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে বর্ণ বের হলো।ভেজা চুল।নিখুঁত শরীর।বিছানার পাশে বসে স্বার্থকে ডাকল,স্বার্থ ভাইয়া,উঠো তো।কাল রাতে না খালাকে ফোন দিলে।এখনি চলে আসবে কিন্তু।

স্বার্থ একচোখে তাকিয়ে বর্ণকে জড়িয়ে নিজের গায়ের উপর ফেলল,আসুক।তুমিও শুয়ে থাকো।

‘উফ’ বর্ণ ছাড়ানোর চেষ্টা করল,রাতটা ভরে জ্বালিয়েছো,এখন ছাড়ো।উঠে শাওয়ার নাও।

স্বার্থ ঘুম ঘুম চোখে বর্ণের ঘাড়ে গাল ঘোষল।বর্ণ পিঠ মুচড়িয়ে বলল,দাড়ি লাগে তো।

স্বার্থ চোখ খুলল,লাগুক।দাড়ির মর্ম কি বুঝবে তুমি?তোমার তো নওয়াল কিশোরদের মতো কচি দাড়ি।

বর্ণ হাসল,হুম,বুঝছি তো।তোমার ট্রিম করা দাড়ি,প্রিন্স প্রিন্স ভাব।এবার উঠো।খালা আসার আগে গোসল শেষ করো।

স্বার্থ মিষ্টি সুরে বলল,গোসল করলে আমার দুষ্টুটাকে এতো কিউট লাগে?

বর্ণ বলল,এবার কিন্তু কামড়ে ধরবো।

স্বার্থ মুচকি হাসল।

বর্ণ অভিযোগের সুর টানল,তুমি এই মুচকি হাসিটা দিলে আমার কেমন কেমন যেন লাগে।

স্বার্থ আবার সেই হাসি দিল,জানি তো।এজন্য তো হাসিটা দেই।যাতে আমার জন্য পাগল হও।

বর্ণ এবার স্পষ্ট বলল,মেন্টাল।

স্বার্থ বর্ণকে সোজা করে বসিয়ে নিজে বিছানায় উঠে বসল,ওয়েট,ওয়েট।তুমি বিড়বিড় করে এটা বলতে?

বর্ণ মাথা নাড়াল,নাহ,না তো।

-কাতুকুতু দেবো কিন্তু এবার,ঠিকঠাক বলো।

বর্ণ স্বীকার করল।দু’আঙ্গুল কোড়া করে স্বার্থের নাক টানল,হুম,বলতাম তো।তাতে কার কি?মানুষটা আমার,যা খুশি তাই বলবো।

স্বার্থ বর্ণের পেটে সুড়সুড়ি দিয়ে শুয়ে দিল।নিজে পাশে শুয়ে আবদার করল,আমার এই ভেজা ভেজা আর্দ্র মানুষটাকে একটু আদর করি?

বর্ণ মাথা নাড়াল,উঁহু।

স্বার্থ হাত জোড় করল,প্লিজ!প্লিজ।

বর্ণ হেসে চোখ বুজল।স্বার্থ বর্ণের ঠোঁটের কাছে ঠোঁট নিতেই কলিংবেল বেজে উঠল।

‘উফস’ স্বার্থ বিরক্ত হলো,মধুচন্দ্রিমায় ডিস্টার্ব।খালাকে না তিনদিনের ছুটি দিবো।

বর্ণ হো হো করে হেসে উঠল।দ্রুত উঠে নিজের পেঁচানো তোয়ালে খুলে স্বার্থের ঘাড়ে দিল।নিচে তার শর্টস পরা ছিলো বলে রক্ষা।

স্বার্থ হা করে তাকাল।ডান হাতের তর্জনী আঙ্গুল উঠিয়ে বলল,হুহুহু,ঐ শোনো না,একটু করি।

‘আরে খালা আসছে তো’ বর্ণ ধাক্কা দিয়ে স্বার্থকে ওয়াশরুমে ঢুকিয়ে লক করে দিল।

এভাবে খুনসুটি।হাসি।আনন্দ।মানে-অভিমানে কেটে গেল বেশ কয়েকটা দিন।

আজ বর্ণের ওরিয়েন্টেশন ক্লাস।সকাল থেকে স্বার্থ বর্ণকে তাড়া দিয়ে যাচ্ছে।নিজে ভোরে উঠে হালকা হয়ে শাওয়ার নিল।রাখালের মা আসলে তাকে সব বুঝিয়ে দিয়ে বিছানায় বর্ণকে জড়িয়ে ধরে আবার শুয়ে পড়ল।বর্ণের পিঠে ঠোঁটের সুড়সুড়ি দিল,বর্ণ,ওঠো।তাড়াতাড়ি যেতে হবে।না হলে জ্যামে পড়বো।

বর্ণ ঘুমচোখে ঘুরে স্বার্থের গলা জড়িয়ে ধরল,উঁহু।আরেকটু ঘুমাই,প্লিজ।

স্বার্থ তার বাসি ঠোঁটে টুক করে একটা চুমু দিল,আমি কিন্তু রেগে যাবো।

বর্ণ ঘুমচোখে দুষ্টু হাসি দিল,রাগো।নিষেধ করছে কে?

স্বার্থ বর্ণের কানের কাছে মুখ নিল,এবার কিন্তু আমার দুষ্টুটার নাভিতে ঠোঁট ডুবাবো।তখন কিন্তু দুষ্টুটা বলতে পারবে না,স্বার্থ ভাইয়া,ছাড়ো না,আমি আর পারছি না।আমার শরীর খারাপ করছে।

বর্ণ মুচকি হাসি দিয়ে জোরে জড়িয়ে ধরল,বলল,হুহুহু,যাচ্ছি তো।

স্বার্থ উঠে বিছানায় বসে বর্ণকে টেনে তুলে তার কোলে বসালো।পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,ভার্সিটিতে যেতে লেট হয়ে যাবে,বাবু।খালা কিন্তু নাস্তা তৈরি করছে।প্লিজ।

বর্ণ ঘুরে স্বার্থের গলার তিলটার উপর চুমু দিল,তুমি কিন্তু আজ ভার্সিটিতে সারাক্ষণ থাকবে আমার সাথে।একলা ভয় লাগে।

স্বার্থ বর্ণের মুখ তুলে তার দু’গাল ধরে বলল,আমার ক্লাসগুলো কে করবে,জানপাখি?ত্রিশা আর মৌন দেখলে কিন্তু তোমাকেই ক্ষেপাবে।

‘ওকে যাও লাগবে না’ বলে বর্ণ নিজে স্বার্থের বন্ধন মুক্ত হতে চাইলো।

‘আচ্ছা,বুঝেছি তো।কি রাগ রে বাবা’ স্বার্থ বর্ণকে আধকোলা করে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।বর্ণকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে বর্ণের ব্রাশে পেস্ট মাখালো।বর্ণ তখনও আয়নার সামনে ঝিমুনি দিচ্ছে।স্বার্থ বর্ণের পিছনে দাঁড়িয়ে বলল,হা করো।তোমাকে নিয়ে আর পারি না।

বর্ণকে ব্রাশ করিয়ে চোখমুখ ধুইয়ে তোয়ালে ধরিয়ে দিল,নাও এবার শাওয়ারটা নিজে করো।আমি দেখি খালা কি করল।

‘হুম’ বলে বর্ণ ওয়াশরুমের দরজা লক করলো।

স্বার্থ রুমে ফিরে দেখলো বর্ণ কোমরে তোয়ালে পেঁচিয়ে জামাকাপড় খুঁজচ্ছে।উদাম শরীর।খোলা সুগভীর নাভি।লোমহীন ফর্সা বুকে লাল চাকা চাকা।স্বার্থ আরেকটা তোয়ালে নিয়ে তার গায়ে দিল,তুমি আমাকে খুন করবে নাকি?

তারপর জড়িয়ে ধরে বলল,স্যরি।

বর্ণ দু’হাত দিয়ে স্বার্থের পিঠ আবদ্ধ করল,স্যরি কেন?

স্বার্থ বলল,বুকে ঐ অবস্থা করার জন্য।খুব কষ্ট দিয়েছি না?

‘যার অধিকার আছে সে করেছে,আমি কি বাধা দিতে পারি? মুচকি হেসে বর্ণ জিজ্ঞাসা করল,আচ্ছা ভার্সিটিতে কি পরে যাবো?

‘ওয়েট’ বর্ণকে ছেড়ে দিয়ে স্বার্থ দু’টো নতুন পাঞ্জেবী এনে সামনে ধরল,দু’জনের জন্য কিনে রাখছিলাম।

বর্ণ বলল,ওএমজি,কবে?

স্বার্থ হাসল,অনেক আগে।বিয়ের সময় অনুকে নিয়ে শপিংয়ে গেলাম যে।তোমাকে বলি নি।

বর্ণ অস্পষ্ট স্বরে বলল,চোর।

স্বার্থ বাধা দিল,এক্সকিউজ মি।তুমি নিজে কি হুম?

-ঐ আমি কি চুরি করছি?

স্বার্থের চোখে দুষ্টুমি,কেন আমার রুমাল আর হলো…..!

বর্ণ ধাক্কা দিল,আর কি?

স্বার্থ আবার বর্ণকে জড়িয়ে ধরল,কেন আমার মনটা কে চুরি করলো,হুম?

সাদা রংয়ের পাঞ্জেবীর উপর সাতরঙের ডাইসের কারুকার্য।দু’জনকে বেশ নির্মল।পরিপাটি।স্বচ্ছ লাগছে।

ডাইনিংয়ে ডিম ওমলেট।নানরুটি।কলা।মাখন।

স্বার্থ রুটিতে মাখন লাগিয়ে বর্ণের মুখের সামনে ধরল,নাও,হা করো।

বর্ণ হা করল।রাখালের মা বলল,দু’টো ঝগড়াটো করা থামাইনচিচ ক্যানে।মুর কি যে ভালোটো লাগিনচে।আচ্চা,তুরা খাটো ক্যানে।মু উপর ফ্ল্যাটটোর কাম কুরে আসিটো।

স্বার্থ নিজে একবার রুটি মুখে নিল,আমার বুকের ভিতর ধুকধুক।ধুকধুক।করছে সকাল থেকে।

বর্ণ মায়া চোখে তাকাল,কেন?

স্বার্থ তার মুখে আরেকবার খাবার দিয়ে বলল,হয়তো তোমাকে হারানোর ভয়ে।ভার্সিটিতে কত মানুষ।ছাড়তে ভয় লাগে।

বর্ণ স্বার্থের হাতের উপর হাত রাখল,বিশ্বাস নাই আমার উপর?

স্বার্থ বর্ণের চোখে তাকিয়ে বলল,সম্পূর্ণ!

স্বার্থ আর বর্ণ।দু’জনের হৃদয়ের আরশিতে দু’জনের প্রতিচ্ছবি চকচক করে উঠল।ঢিপঢিপ।ঢিপঢিপ।শব্দ নয়।চোখের ছলছল জলব্যথা রেটিনা-মস্তিষ্কের শিরা বেয়ে হৃদয়ে সুখের শিরশির।শিরশির।শিহরণ দিলো।

আজ একই রিকশায় স্বার্থ পিছন দিয়ে বর্ণকে জড়িয়ে রেখেছে।তার শরীর ঘামহীন।চোখে মুগ্ধতা।

স্বার্থ তার ডিপার্টমেন্টের সামনে বর্ণকে দাঁড়িয়ে রেখে সে উপরে গেলো।

বর্ণের কাঁধে কারোর হাতের আবেগী পরশে সে ফিরে তাকাল।চোখে বিস্ময়,হৃদয় ভাইয়া!আপনি এখানে?

বর্ণের হৃৎপিন্ড থেকে ধমনীতে হিমশীতল রক্ত বয়ে গেল।

———————————————————————-

বিঃদ্রঃ অন্তিমপর্বে আমরা সকল পাঠকের মন্তব্য আশা করছি।আপনাদের ভালোলাগা ও ভালোবাসা পেলে লেখক কিছুদিন বাদে এই গল্পের সিরিজ ”হৃদয়ের নাম আরশিনগর ২” লিখবেন।ইনশাল্লাহ!

———————————————————————-

।।সমাপ্ত।।সমপ্রেমের গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.