যৌনতার কোন ধর্ম নেই, সৌন্দর্য্য আছে

লেখকঃ আরন্যক বন্দোপাধ্যায়

কিছু কথা শোনাবো বলে লিখতে বসেছি।কি নিয়ে বলবো?বলবো হলো এই কমিউনিটির টপ বটম আর ভার্সেটাইল রোলের মারপ্যাচ আর ফেমিনিন মেসকুলিন বিহেভিয়ার এর রাজনীতি নিয়ে।
তার আগে নিজের সম্পর্কে হালকা পাতলা ধারনা দেওয়া উচিত।
আমি নিজেকে একজন সমকামী পুরুষ মনে করি,এটি আমার সেক্সুয়াল আইডেন্টিটি,আর নিজের জেন্ডার পরিচয়ের বেলায় জেন্ডার ফ্লুইড বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি, কখনো সখনো নিজেকে আবার ট্রান্স উইমেনও বলে ফেলি অতি আবেগে,কিন্ত গভীরভাবে উপলব্ধী করে আমি এও দেখেছি যে আমি নিজেকে পুরোপুরি নারীরুপে আসলে কখনোই দেখতে চাইনি,চাইওনা।
আমার ফেমিনিন এক্সপ্রেসানগুলো কিছুটা ন্যাচারাল, কিছুটা আমার চর্চাগত এবং আমার ফেমিনিন সজ্জা বলেন আর সাজ বলেন পুরোটাই আমার একধরনের কৌশল এবং সেটিও আমার চর্চাগত।
আমি মেয়ে হইনি বলে,কিংবা মেয়ের কোন পোশাক, সাজ সজ্জা গ্রহন করতে পারিনি বলে কোন প্রকার কোনরকম আফসোস কিংবা হাহাকার আমার হয়নি কোনকালেই।

কলেজ পেরুবার পর থেকে  আমার পুরুষালী বেশ, পুরুষালী পোশাকের ভেদ ছেদ করেও যখন কিছু কিছু ফেমিনিন এক্সপ্রেশান মানুষের চোঁখে পড়ে এবং তারপর সেই পুরষের শরীরে ফেমিনিন এক্সপ্রেশানগুলো খুব বাজে বলে ধিকৃত হয় তখন আমার মস্তিষ্কটা একটু নাঁড়া দিয়ে উঠে।
আমার ভেতর হাজারটা প্রশ্ন আসতে থাকে,কৌতুহল জন্মাতে থাকে।

জানতে ইচ্ছে হয় কেনইবা একজন পুরুষের কোন মেয়েলী আচরন থাকা চলেনা,কেনইবা একজন পুরষকে রুক্ষ কাঠখোট্টাই হতে হয়,কেনইবা একজন পুরুষের তথাকথিত  পুরুষের পোশাকটাই পরতে হয়!
একজন নারী যদি শরীরে পুরুষালী বেশভূষা ধারন করে তবে তাকেও কটু কথা শুনতে হয়,কিন্তু ততোটা শুনতে হয়না যতটা পুরুষ নারীর কোন কিছু ধারন করলে  শুনতে হয়।

তার কারন কি?
কারন পুরুষতান্ত্রিক সমাজ সবসময়ই আমাদের ভাবিয়ে আসছে নারী মানে অশুচ, নারী মানে ডাইনি,নারী মানে নিচ।
এইসব ভাবনাগুলোর কারনে নারীর পোশাক নারীর আচরন একেবারে নিচতলার কিছু,জঘন্য কিছু বলেই বিবেচিত পুরুষতান্ত্রিক নারী পুরুষ ইন্টারসেক্স উভয়ের কাছেই।
পুরুষের শরীরে নারীসুলভ কোন আচরনও তাই গর্হিত অপরাধ,পুরুষের শরীরে নারীর কোন পোশাক মানেই পুরুষের জাত্যাভিমান নষ্ট হবার ভয়।

যখন এই পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতি গুলো বুঝে উঠতে পারি,তখন থেকেই ফেমিনিন এক্সপ্রেসানগুলো, ফেমিনিন সজ্জাগুলো আমি আরও বেশি বেশি রপ্ত করার চেষ্টা করি এবং এগুলোকে একেকটা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করি।

চোঁখে কাজল পরলে যদি নষ্ট নোংরা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের আতে ঘাঁ লাগে তবে সেই ঘাঁ টা দেবার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি,পুরুষ হয়ে শরীরে শাড়ি পরে বের হয়ে গেলে যদি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পুরুষাঙ্গের জোর নড়বড়ে হয়ে যায় তবে সেই নড়বড়ে করে দেবার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি।

পুরুষকে একটি সীমানার ভেতর সংগ্যায়িত করবার এইযে প্রয়াস এটি ভাঙবার জন্য শুধুমাত্র সমকামী পুরুষদের নয়,বিষমকামী পুরুষদেরও সীমানা ভেঙে সাজ সজ্জা আর এক্সপ্রেশানের বৈচিত্রতা আনার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি।

তো আসি এখন মূল কথায়,আমি আগেই বলেছি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী পুরুষ ইন্টারসেক্স,ট্রান্সজেন্ডার সিসজেন্ডার সবাই পুরুষতান্ত্রিক চিন্তায় বড় হয়ে উঠে এটিই স্বাভাবিক।
তাই কারনেই সমকামী পুরুষেরাও তথাকথিত পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হতে চায়,সমকামী পুরুষরাও পুরুষকে সেরকমভাবেই যায় যেরকমভাবে এই সমাজ একটি পুরুষকে দেখতে চায়,পুরুষ মানে যার বুক পিঠ টান টান,পুরুষ মানেই যার কাঁদতে নেই,পুরুষ মানেই যার আরাম করে বসতে নেই,যাকে কেবল শক্ত আর রুক্ষই হতে হবে,এই তথাকথিত পুরুষকেই সমকামী পুরুষরা চায়,এরকম পুরুষের প্রতি বেশিরভাগ সমকামী পুরুষ আকৃষ্ট হয়,ব্যাতিক্রম কিছু থাকতে পারে,কিন্তু মেজরিটিটা এরকমই।

এই টপ বটমের রাজনীতিতেও তাই পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতি বহমান।স্বাভাবিকভাবেই টপ মানেই যিনি উপরে,যিনি কিছুটা শ্রেষ্ঠ, যিনি কিছুটা উন্নত, টপ হওয়া কিছুটা গৌরবের,যেমনটা তথাকথিত পুরুষ হওয়া গৌরবের,বটম হওয়া কিছুটা অসম্মানের যেমনটা একজন নারীর নারী হওয়ার বেলায় অসম্মানের এই সমাজের চোঁখে।
বটম মানেই টপদের কাছে একটু দমন করার মত কোন বস্তু,একটু তাচ্ছিল্য করার মত কিছু,যেমনটা একজন পুরুষ নারীকে অবদমন করে ঠিক সেরকম।

গোলযোগটা বাঁধে এখানে নয়,গোলযোগটা বাঁধে অন্য জায়গায়।

বায়োলজিকেলি কেউ পুরুষ হয়ে জন্মেও যখন নারীসুলভ আচরন করে আর ঠিক তখন সমাজ যেমন তাকে চোঁখ রাঙানি দেয় তদ্রুপ একজন ফেমিনিন সমকামী পুরুষ যদি বটম না হবার বদলে টপ হতে চায় তাকেও অনুরুপ এইযে এক সমাজের ভেতর আরেক সমাজ,মানে সমকামী সমাজ,সেখানে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য পেতে হয়,একটু নাঁক কুচকানো দেখতে হয়।

এমনকি ফেমিনিন পুরুষদেরতো এই সমকামী সমাজে নিচুতলারই মনে করা হয়।

আবার পুরুষালী কোন সমকামী পুরুষ যদি আবার বটম হয়ে যায় তখন ঐযে নির্যাতিত অপমানিত বলে যাদের হয়ে আমি এতক্ষন সাফাই গাইলাম, সেই ফেমিনিন পুরুষদের ভেতর বেশিরভাগই তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে বলাবলি শুরু করে দেয়।আহারে কি একটা মেনলি ছেলে অথচ বটম হলো।

তো টপ বটম ভার্সেটাইল এগুলো কোন বিষয় নয় আসলে,আমার আপনার আমাদের সবার মাথা থেকে যখন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পুরুষতান্ত্রিক লিঙ্গটা না কেটে ফেলতে পারবো,ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা নিজেদের ঠিকঠাক চিনতেই পারবোনা,বুঝতেই পারবোনা কিসে আমার সত্যিকারের ভাল লাগা,কিসে আমার সত্যিকারের আনন্দ।

একজন ফেমিনিন সমকামী পুরুষ কেবল বটম নয়, একজন মেসকুলিন সমকামী পুরুষ কেবল টপ নয়,একজন ফেমিনিন সমকামী পুরুষ কেবল মেসকুলিন সমকামী পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হয়না,ফেমিনিন মেসকুলিন উভয়ের প্রতিই আকৃষ্ট হতে পারে।

তেমনি এই বিষয়টিই আবার মেসকুলিন সমকামী পুরুষের বেলাতেও একই।

আমরা নিজেরাই বলি আমরা বৈচিত্রময়, কিন্তু আমরাই সেই তথাকথিত ধ্যান ধারনা থেকে বের হতে পারিনা।

আমার ফেমিনিন পুরুষদের প্রতি ভাল লাগা কাজ করে বিধায় ফেমিনিন মেসকুলিন সবাই আমাকে কম হেয় প্রতিপন্ন করেনা,আমার ফেমিনিন সমকামী পুরুষ বন্ধুদের ভেতর কেউ কেউ তো সরাসরি বলেই দেয় যে আমার রুচি ভালনা।
আমার কথা হচ্ছে কে কার রুচি ঠিক করে দেবে?কে কার রুচিবোধ সম্পর্কে জানবে?জানার প্রয়োজন আছে কি কোন?

তাই ফেমিনিন মেসকুলিন বিহেভিয়ার দিয়ে রোল জাজ করা বন্ধ করুন,ফেমিনিন মেসকুলিন বিহেভিয়ার দিয়ে কারোর জেন্ডার নিরুপন করা বন্ধ করুন।আমি নিজেকে পুরুষ বলছি মানে আমি পুরুষ,আমি শাড়ি পরলাম না চুরি পরলাম সেটি আমার পরিচয় নয়।
আমি নিজেকে টপ বলছি মানে আমি টপ,আমি নারীসুলভ নাকি পুরুষসুলভ সেটি বিবেচ্য নয়।

সবথেকে বড় কথা এই টপ বটম ভার্সেটাইল ফেমিনিন মেসকুলিন শব্দগুলোই বিলুপ্ত হয়ে যাক,আমরা বরং সীমানাহীন ভালবাসতে শিখি একে অপরকে,আমরা বরং রঙধনুর মতন হই,আমরা বরং হাজার রঙের মতন হই, আমরা বরং নিজেদের এই সীমানায় না রেখে আরও বহুদুর বিস্তৃত করি নিজেদের ভাল লাগাকে,নিজেদের চিন্তাকে।
একজন পুরুষ সে টপ বটম ভার্সেটাইল হলেও পুরুষ,একজন পুরুষ ফেমিনিন মেসকুলিন হলেও পুরুষ।

কে কার প্রতি আকৃষ্ট হবে এটি একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার,সেটি নিয়ে আমার কোন গাত্রদাহ কিংবা অনুযোগ নেই।

আমার একটি অনুরোধ কেবল,একটু ভাববেন গভীরভাবে,একটু চিন্তা করবেন গভীরভাবে যে আমার আপনার ভাল লাগা গুলো সমাজ সীমাবদ্ধ করে রাখছেনাতো?

চারপাশ দ্বারা প্রভাবিত হতে হতে আমি নিজের আনন্দকে মাটি দিচ্ছিনাতো?

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.