মুসলিম ও সমপ্রেমি

*ম। একজন মুসলিম। একজন সমপ্রেমি। আমাদের এই দুটি পরিচয় যেন পরস্পর সাঙ্ঘর্ষিক। সত্যিই কি তাই? এ ব্যপারে একজন মুসলিম এবং সমপ্রেমির কাছেই আমরা জানতে চেয়েছিলাম তার অনুভুতি সম্পর্কে।

প্রশ্নঃ ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির কারণে কি আপনি আপনার যৌন প্রবৃত্তি নিয়ে আত্মগ্লানিতে ভুগেন?

মঃ একেবারে ভুগি না বললে ঠিক হবে না। মাঝেমধ্যে একটা অনুভুতি কাজ করে আসলে কি হচ্ছে না হচ্ছে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, সৃষ্টিকর্তা আছে। তার ইশারা ছাড়া কিছুই হয় না। আমরা যা করি সেটা তার ইশারাতেই করি। ধর্মীয় গ্রন্থাবলীতে লেখা আছে ‘মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব’ কিন্তু তারপরও সব ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তার হাতেই।

প্রশ্নঃ আপনার বক্তব্যে মনে হচ্ছে আপনি একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম। যেহেতু ইসলাম ধর্মে ‘সমপ্রেম’ নিষিদ্ধ করা হয়েছে সেহেতু আপনি কি মনে করেন সমপ্রেমি মুসলিম হিসেবে ধর্মের সাথে যৌন প্রবৃত্তির দ্বন্দ্ব রয়েছে?

মঃ আমি সেক্সুয়ালিটিকে কখনও ধর্মের সাথে মিলাতে পছন্দ করি না। কারণ যতটুকু সম্ভব আমরা সবাই ধর্ম পালন করি। আর এটার সাথে মিলাতে গেলে সমীকরণগুলো খুব জটিল হয়ে যায়। আমি ধর্মের সাথে আমার সেক্সুয়ালিটি মেলাতে পছন্দ করি না।

প্রশ্নঃ নানাধরণের সমপ্রেম ভিত্তিক সংগঠন রমজান উপলক্ষে ‘ইফতার’ এর আয়োজন করে থাকে আপনি এই আয়োজনগুলোকে কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেন?

মঃ আসলে আয়োজনগুলোকে আমি ‘ইফতার’ হিসেবেই দেখি। একটি সংগঠন বা সমপ্রেমিরা আয়োজন করছে কি করছে না, এসব তকমায় আমি বিশ্বাসী না। আমরা সবাই মানুষ। আমি এগুলোকে অন্যান্য সব ইফতার আয়োজনের মতোই দেখি।

প্রশ্নঃ আপনি কি এ ধরণের কোন ইফতার আয়োজনে অংশগ্রহণ করেছিলেন?

মঃ জি, করেছিলাম। ‘রূপবান’ আয়োজিত ইফতারে অংশগ্রহণ করেছিলাম।

প্রশ্নঃ সেই আয়োজনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জানতে পারি?

মঃ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আয়োজনের সাথে ছিলাম। খুব উপভোগ করেছি পুরো আয়োজন। সকাল থেকেই আয়োজকরা একসাথে কাজ করছিল, তাদের সাথে কাজ করতে খুবই ভালো লেগেছে। উৎসবমুখর পরিবেশে একসাথে কাজ করার মাধ্যমে আমাদের মাঝে এক দৃঢ় বন্ধন স্পষ্টভাবে প্রকাশ পাচ্ছিল। এতো বড় একটা আয়োজনে সবাই যার যার সাধ্যমত সহায়তা করে আয়োজনটি সম্পূর্ণ করে তুলেছিল। আয়োজন নিয়ে অংশগ্রহণকারীদের উচ্ছ্বাস আমার কাছে সবচেয়ে উপভোগ্য ছিল।

প্রশ্নঃ সমপ্রেমীদের নিয়ে একটি ধারণা বিদ্যমান আমাদের নিজেদের মাঝেই, যেমনঃ তারা একসাথে হতে পারে না, তারা ধর্ম নিয়ে উদাসীন, যৌনতা ছাড়া তারা কিছু বুঝে না ইত্যাদি। এধরণের ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে ইফতারের মত আয়োজন কিভাবে সহয়তা করে?

মঃ এধরণের আয়োজন অবশ্যই গভীর প্রভাব ফেলে। কারণ যে ভ্রান্ত ধারণায় মানুষজন বাস করতো সেগুল এধরণের আয়োজনের মাধ্যমে অনেকটাই দূর হয়েছে। এ আয়োজনগুলোর মাধ্যমে বোঝা যায়, আমরাও আর ৮-১০টা সাধারণ মানুষের মতোই। হয়তো আমাদের চাহিদা ভিন্ন কিন্তু দিনশেষে সবাই মানুষ। সেক্সুয়ালিটি যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। এই আয়োজনের মাধ্যমে যারা সমপ্রেমীদের ঘৃণা করে তারাও যখন এসে দেখবে ও বুঝবে যে আমরাও ওদেরই মতো। এসব আয়োজন যত বেশি হবে তত বেশি ভ্রান্ত ধারনা দূর হবে।

প্রশ্নঃ আর কি কি ধরণের আয়োজন করা যেতে পারে?

মঃ ইফতারের আয়োজনে বিভিন্ন শ্রেণি, পেশার মানুষ এসেছে। এর পাশাপাশি আমাদের দেশী উৎসবগুলো উদযাপনের আয়োজন করা যেতে পারে। এসব অনুষ্ঠান করলে সব ধরণের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যাবে।

প্রশ্নঃ একটা কথা আছে ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’। অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবগুলোতে অংশগ্রহণ করা হয়?

মঃ আমার দৃষ্টিকোণ থেকে বলবো, ধর্ম আসলে নিজের কাছে। ধর্ম দেওয়াই হয়েছে যেন মানুষ একটা শৃঙ্খলার ভিতরে থাকে। নিয়মের ভিতরে থাকে। অন্যায় থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারে। এটাকে আমি আমার মতো করে দেখি। যতটুকু সম্ভব হয় আমি আমার ধর্ম পালন করে থাকি। আর অন্য ধর্মের অনেক বন্ধু আছে আমার, তাদের উৎসবে আমি যাই। আবার তারা আমার উৎসবে আসে। সবাই সমানভাবে সব উৎসবকেই উপভোগ করতে পারি।

প্রশ্নঃ সমপ্রেমি কমিউনিটিতে অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলিম আছে যারা নিজেদের নিয়ে আত্মগ্লানিতে ভুগে, তাদের এই অবস্থা থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে কিছু বলা আছে কি?

মঃ এধরণের মানুষদের বিষয়টা হল ‘ধরি মাছ নাই ছুঁই পানি’ মত। তারা সমপ্রেমি স্বত্বাকে আলিঙ্গন করে, আবার বলে আমি তো পাপ করছি! এখন কি হবে! মনে যদি ওই খুঁতখুঁতটাই থাকে যে পাপ করছ, তাহলে করছ কেন? কেউ তো কাউকে জোর করছে না। You are what you are! Just be yourself!    

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.