হৃদয়ের নাম আরশিনগর ২

লিখেছেনঃ মেঘ রাজ সাইমুন।

(প্রথম পর্ব)

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>> 

বিঃদ্রঃ তোমার একটিমাত্র জীবন যদি প্রেমহীন থেকে যায়,শর্তহীন দলিলে যদি কোন বিবাদীর নাম লেখা না থাকে,অনাবিষ্কৃত ভালোলাগা যদি তোমার ঠোঁটের আঙ্গিনায় বিরহ না জাগায়,একটিমাত্র জীবনে তুমি যদি কলঙ্ক এর সুখই না পেলে-তবে তুমি…!তবে তুমি আমার গল্প পড়ো না।

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>> 

এক।

নিশিরাতের মুখোশ পরিহিত মুখগুলো দেখছিলো সে।উবছে পড়া হাসির খিলখিল শব্দ।কোথায় এতটুকু ক্লান্তি নেই এদের।কেউ দরদাম কষছে।কেউ খরিদদার পেলে হাসিমুখে সঙ্গে যাচ্ছে।বাইরের আবরণ-সাজপোশাক দেখলে কে বলবে এদের প্রত্যেকের একটা নিজস্ব কষ্টের গল্প আছে।অথচ শোনাবার কেউ নেই।না আছে বলবার মতো কেউ।

তার হাতে আবার টান পড়লো।

ভদ্রমহিলা বলা ঠিক হবে কিনা জানি না।বললে হয়তো সমাজ আমার দিকে আঙ্গুল তুলে ভেংচি কাটবে।

অর্ধবয়স্কা মহিলাটি জোরে বলল,এসো তো বাছা!তোমাকে নিয়ে তো ঢের বিপদ।আমাকে আবার নিচে যেতে হবে যে।

আশেপাশে রাতের ঝলমল আলোয় দল পাকিয়ে গল্প করা রমণীগুলোর কেউ কেউ অবাক হয়ে তাকালো।কেউ মুখ টিপে হাসলো।

মহিলাটি দ্বিতীয়তলার শেষের ঘরটির বাইরে দাঁড়িয়ে হাক ছাড়ল,তিথি ঘরে আছিস নাকি?

ভিতর থেকে আওয়াজ এলো,হ্যাঁ মাসি।গোসল করছি।

মাসি তার হাত ধরে টেনে ঘরের ভিতরে বিছানায় বসাল,এখানে বসো,বাছা।

তারপর বাথরুমের দরজায় গিয়ে বলল,তিথি,একজনকে রেখে গেলাম।সামলাস।

তিথির গোসল প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।

সে পানির কল বন্ধ করে বলল,কি গো মাসি!মাত্র একজন গেলো।আবার আরেকজনকে ঢুকিয়ে দিলে।আমাদেরও তো শরীর নাকি?

মাসি হেসে বলল,রাগ করিস না।নতুন ছেলে।তার উপর বয়স কম।যার তার ঘরে পাঠানো যাবে না।তোকে ভালোবাসি তাই রেখে গেলাম।

তিথি বিরক্তি নিয়ে বলল,আচ্ছা,মাসি।শোনো,আর কাউকে পাঠাবে না আজ রাতে।শরীরটা ভালো না।মাসিক চলছে।

মাসি সম্মতি দিয়ে বেরিয়ে গেল।যাকে রেখে গেল,সে অবাক হয়ে ঘরটায় চোখ বুলিয়ে দেখছে।দেওয়াল জুড়ে মনীষীদের ছবি।মোনালিসা কিংবা জয়নুলের আঁকা দুর্ভিক্ষের ছবি।ছিমছাম।পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।নিরিবিলি ঘরটা।সে কাঁধের ব্যাগটা বিছানায় রেখে উঠে দাঁড়ালো।দক্ষিণ দেওয়ালে সর্বশেষ যে ছবিটা ঝুলছে সেইটাই চোখ আটকে গেলো তার।গৌতম বুদ্ধের সঙ্গে এক বেশ্যার ছবি।নিচে লেখা-চুরি করে যে বেশ্যার ভাত খায়,ধর্মের তাতে কি এসে যায়।

বাথরুমের দরজা খোলার শব্দ হলো।সে পিছন ফিরলো না।

তিথিই প্রশ্নটা করলো,নাম কি তোমার?বয়সে ছোট হবে বলে তুমি করে বললাম।মনে কিছু করো না।

সে এবার পিছন ফিরে তাকালো।পঁচিশ-ছাব্বিশের এক অর্ধনগ্ন মেয়ে দাঁড়িয়ে।রুপের কমতি নেই।বাড়াবাড়িও নেই।একটা নাতিদীর্ঘ গোলাপি তোয়ালে দিয়ে স্তন বেড়িয়ে হাটুর দু’কি তিন ইঞ্চি উপর অবধি পুরো শরীর বেস্টনের বৃথা রকমের সব চেষ্টা করেছে।

সে ফিরে এক পলক তাকাতেই তিথির লজ্জার সীমা রইলো না।একদম নওয়াল যুবক ছেলে।ভারী নয়,হালকা গোঁফের রেখা নাকের নিচে।অঘন অথচ মসৃণ হালকা দাড়ি।ফর্সা।মায়াবী।তার মুখটাও যেন লজ্জায় রাঙা হয়ে গেলো।মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো সে।

তিথির অস্বস্তি বেড়ে গেল।বলল,তুমি বসো।

সে দু’পা এগিয়ে খাটে বসল।তিথির দিকে তাকালো না।বলল,আপনি পোশাক পরুন।আমি বরং বাইরে গিয়ে দাঁড়াই।

তিথি যেন অবাক হয়ে গেলো।কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,না।তুমি বসো।আমি বাথরুমে গিয়ে চেঞ্জ করে আসছি।

আলনা থেকে সিল্কের হলুদ শাড়িটা নিলো সে।সচরাচর শাড়ি পরা হয়ে উঠে না তার।এ শাড়িটা তার প্রেমিকের দেওয়া।সে পরতেও পারে না শাড়ি।প্রায় নাইটি বা সালোয়ার কামিজে ঘর চালিয়ে দেয়।আউট কলে গরজিয়াছ কোন পোশাক পরে যায়।আজ কেন জানি শাড়িটা পরতে ভীষণ মন চাইছে তার।বাথরুমে ঢুকে শাড়িটা গুছিয়ে পরলো সে।বেরিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করল,তুমি কি কিছু খাবে?

সে মাথা নাড়াল।বলল,আমি কিছু খাবো না।

তিথি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আজ অনেকক্ষণ সময় নিয়ে,যত্ন করে সাজলো।সরু করে চোখে কাজল পরলো।হালকা মিষ্টি কালারের লিপস্টিক।সিল্কের হলুদ শাড়ি।সবুজ ব্লাউজ।কালো টিপ মানানসই না হলেও সে কালো টিপ পরলো।মন্দ লাগছে না।যেন এক অতি সাধারন মেয়ের রুপ পেয়েছে সে।

আয়নার সামনে থেকে উঠে এসে তিথি তার সম্মুখে দাঁড়ালো।সে তখনও খাটে বসে মাথা নিচু করে রেখেছে।একবার উপরে তাকিয়ে হঠাৎ তিথির পায়ের কাছে এক হাটু গেড়ে আরেক হাটু ভাজ করে বসে পড়লো।

তিথি সরে দাঁড়াল,কি করছো তুমি?

সে চোখের ইশারায় শাড়ির ভাঁজের অংশ দেখাল,শাড়ির ভাঁজগুলো ঠিক হয় নি।আমি ভাঁজগুলো ধরছি।আপনি ঠিক করুন।

‘হুম’ বলে তিথি নাভির কাছে হাত নিয়ে শাড়ির ভাঁজের অগ্রভাগ খুলে হাতে নিলো।

সে ভাঁজগুলো আঙ্গুলের ডগায় যত্নে ধরে ধরে মসৃণ করছিলো।সে ভাঁজগুলো ঠিক করে তিন আঙ্গুলে ধরল,আপনি শাড়ি কম পরেন মনে হয়?

তিথি মুগ্ধ হয়ে বলল,কোনদিন খুব একটা পরা হয় নি।মা ছিলো না তো।কে শেখাবে বলো?

সে উঁচু হয়ে তিথির মুখের দিকে তাকালো,আপনার মা নেই?

তিথি মাথা নাড়াল,না নেই।

তারপর শাড়ির ভাঁজগুলো পরিপাটিভাবে কোমরের অগ্রভাগে গুঁজে তিথি অভিযোগ করল,তখন যে জিজ্ঞাসা করলাম,নামটা বললে না যে!

সে পুনরায় বিছানায় বসে বলল,আমার নাম হৃদয়।হৃদয় তালুকদার।

তিথি পাশে বসতে বসতে বলল,সাথে ব্যাগ দেখছি।তুমি স্টুডেন্ট?কোন ক্লাসে পড়ো?

হৃদয় ব্যাগটা কোলের উপর টেনে নিয়ে বলল,হুম।দ্বাদশ শ্রেণিতে।

তিথি অপলক হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,কলেজ ছুটির পর বাড়ি যাও নি?

হৃদয় বেশ কতক্ষণ চুপ থেকে বলল,না।বাড়ি যাওয়ার তাড়া থাকে না তো।

তিথি যেন নির্বাক।এইটুকু বয়সের একটা ছেলের কথার কি গাম্ভীর্য!দুঃখের ছায়া চোখে স্পষ্ট।তবুও বলল,কেন?আন্টি খোঁজ রাখেন না?

হৃদয় একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়াল,আমার মা বেঁচে নেই।

তিথির বুকে যেন একটা ধাক্কা লাগলো।হৃদয় ব্যাগ হতে কয়েকটা দশ-বিশ টাকার নোট বের করে তিথির হাতে গুঁজে দিলো।

তারপর বলল,এখানে আসবো বলে অনেকদিন ধরে জমিয়েছি।আপনি রাখেন এগুলো।

তিথি প্রতিবাদ করল,অকারনে টাকা দিচ্ছ কেন?টাকা নেওয়ার মতো তো কিছু হয় নি।তুমি চাইলে…..!

হৃদয় তিথিকে থামিয়ে দিল,আমি কিছু চাই না।আমার একটা সমস্যা আছে।সমস্যাটা আপনাকে বলতে পারবো না।প্লিজ,মাফ করবেন আশা করি।

তিথি টাকাগুলো হৃদয়ের সামনে ধরে বলল,খারাপ হতে পারি!তবে এটা বোঝার মতো মন আমার নিশ্চয় আছে যে টাকাগুলো গোছাতে তোমার অনেক কষ্ট হয়েছে।তুমি এগুলো ফেরত নিয়ে যাও।তুমি আমাকে স্পর্শ করলে আমি অবশ্য এগুলো নিতাম।

হৃদয় বিছানা থেকে উঠতে উঠতে বলল,না বুবু।যে মাসিটা আমাকে এ ঘরে রেখে গেলো তিনি নিশ্চয় ভালো মানুষ নন।আপনাকে অত্যাচারিত হতে হবে।আপনি টাকাটা রাখেন।

তিথির চোখ যেন ব্যথায় ভেঙ্গে যাচ্ছে।আবছায়া হয়ে এলো হৃদয়ের মুখটা।কয়েক ফোঁটা অশ্রু টপটপ করে হঠাৎ যেন ঝরে গেলো।

ভারী কন্ঠে স্বভাবজাত প্রশ্ন ছুড়ল,তুমি আমাকে বুবু ডাকলে?

হৃদয় তিথির একটা হাত ধরে বলল,বুবু।আমার নিজের কোন ভাই-বোন নেই।গোটা পৃথিবীতে কেমন আমি একলা।আমি এখানে সবাই যা করতে আসে;তার জন্য আসি নি।এসেছিলাম নিজেকে চিনতে,জানতে।যদি আবার কোনদিন আসি বা দেখা হয় তবে আপনাকে নিশ্চয় কারনটা বলবো।

অশ্রুভরা চোখে তাকিয়ে তিথি বলল,ভাই।তুমি টাকাগুলো নিয়ে যাও।মাসিকে আমি আমার জমানো টাকা থেকে দিয়ে দেবো।

হৃদয় তিথির চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলল,ভাই বলে যখন ডাকলে।তখন তুই করে ডাকো না,বুবু।বড় আপন আপন লাগে।দেখো আমি কেমন তুমি বললাম তোমাকে।নিজের বুবুকে ছোটভাই যেমন বলে।

হৃদয় একটু হাসল।তারপর ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস নিল,মনে করেন না এটা আপনার ছোট ভাইয়ের প্রথম রোজকারের টাকা।আমি কিন্তু টাকাগুলো চুরি বা অসৎভাবে আনি নি,বুবু।

তিথি আকস্মিক বিছানায় বসে পড়লো।হৃদয় ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেলো।তিথি দরজা লাগিয়ে টাকাগুলোর দিকে চেয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো।

শরীয়তপুরের আরশিনগর বাজারে হৃদয়ের বাবার চেয়ারম্যান অফিস।সকাল-সন্ধ্যা তাকে ছুটতে হয় নানান কাজে।ঘুম থেকে উঠে সাদেক সাহেব দাওয়ায় বসে নিম দাঁতন করছিলেন।আসমা এসে দাঁড়াল,এই যে চেয়ারম্যান সাহেব!সারাদিন তো আছেন চেয়ারম্যানি নিয়ে।আপনার বড় লাটসাহেবকে ঘুম থেকে তুলে জিজ্ঞাসা করেন কাল রাতে কই ছিলো?

সাদেক সাহেব নিম দাঁতন ফেলে কুলি করতে করতে বললেন,দেখো আসমা বেগম!সকাল সকাল আমার মেজাজ বিগড়াবে না।তোমার যা খুশি করো।দু’টো খেতে দিলে দাও,আমার কাউন্সিল অফিসে যেতে হবে।

আসমা বেগম ভ্রু কুঁচকে বলল,হৃদয়কে বলো সে যেন সাইকেলে হাত না দেয়।ওটা আমার উদয় চালাবে।

সাদেক সাহেব বললেন,তোমার প্রতিদিন এক গান।উদয় এখনো অনেক ছোট।সবে আট বছর।তাছাড়া ওর তো ছোট সাইকেল আছে একটা।দেখো আমাদের মাত্র দু’টো ছেলে।সম্পত্তি ঢের আছে।আমরা যাওয়ার পর তো সব ওদের দু’ভাইয়ের।

আসমা বেগম হুংকার দিল,মানি না আমি।আমার একটায় ছেলে।সতীনের পুত মরুক গা।

‘তোমার যা খুশি করো,দু’টো খেতে দিলে দাও’ কথাটা বলে সাদেক সাহেব দাওয়া হতে উঠে গেলো।

আসমা বেগম চিৎকার দিয়ে ডাকল,এই মর্জিনা,অলক্ষ্মী কই গেলি?মরলি নাকি?তোর চাচাজানকে নাস্তা দে।

মর্জিনা ঢেঁকিঘর থেকে উত্তর দিল,আসি আম্মা।তারপর মনে মনে আওড়ালো,আল্লাহ গো এই বেটির জবান পইড়া যায় না ক্যান?দজ্জাল বেটির লাগি তালুকদার বাড়ি একটা কাক পর্যন্ত বহে না।

মর্জিনা এ বাড়িতে ফাইফরমাশ খাটে।স্বামীটা হঠাৎ কলেরায় মারা যাওয়ার পর সাত বছরের মর্জিনাকে সাথে নিয়ে সখিনা বিবি তালুকদার বাড়িতে উঠেছিলো।চেয়ারম্যান সাহেব সখিনার দুঃসম্পর্কের ভাই।এখন মর্জিনার বয়স তেরো বছর।বাড়ন্ত শরীর।সখিনা বিবি মেয়েকে বারবার সজাগ করে দেন।তবুও উঠতে বসতে মর্জিনার বাড়ন্ত শরীর যেন মুক্ত হতে চায়।সখিনা বিবি চোখ পাকান মেয়ের দিকে চেয়ে।সকলের অগোচরে।

বারান্দায় চেয়ার টেবিলে খাবার সাজিয়ে মর্জিনা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল,আম্মা,খাবার দিছি।

আসমা বেগম ভিতর থেকে বলল,তুই যা।আর শোন,দেখতো উদয় কই গেলো!আর লাটসাহেবকে ডাক।দু’টো খেয়ে ঘুমিয়ে মরুক।

মর্জিনা গজগজ করতে করতে উঠান পেরিয়ে উত্তরের ঘরে ঢুকলো।

উদয় একাধারে বায়না করেই চলেছে,ও মিয়াভাই।দাও না।দাও।এরপর দেখবে শালিকপাখি বাচ্চা নিয়ে উড়ে চলে যাবে।একটা বাচ্চা এনে দিলে কি হয়?

হৃদয় সযত্নে উদয়কে বুকের উপর শুইয়ে বলল,আচ্ছা,ভাই।দেবো।একটাই কিন্তু।না হলে মাপাখি কষ্ট পাবে।

উদয় এদিকওদিক ঘাড় নাড়াল।হৃদয় ভাইকে জড়িয়ে ধরে বলল,আমার লক্ষ্মী ভাই।যা খেয়ে নে।

মর্জিনা এসে বিছানার কাছে দাঁড়াল,উদয় চল,আম্মা খাইতে ডাহে।হৃদয় ভাইজান আপনাকেও খাইতে কইছে।উঠেন।না হলে পরে আবার বকাঝকা করবো আম্মায়।

হৃদয় আবার গায়ের কাঁথা টেনে নিল,আমি খাবো না,মর্জিনা।কেমন জ্বর জ্বর লাগছে রে।তোর আম্মাকে বল আমি খাবো না।

‘ও আল্লাহ,কই দেহি ভাইজান’ বলে মর্জিনা হৃদয়ের কপালে হাত রাখতে গেলো।

হৃদয় একটু সরে শুয়ে বলল,তোকে কেন দেখতে হবে?যা এখান থেকে।

মর্জিনা রাগে গজগজ করতে করতে উদয়ের হাত ধরে টেনে নিয়ে চলে গেলো।

চেয়ারম্যান বাড়ির বড় ছেলে হয়েও সবচেয়ে খারাপ ঘরটায় থাকে হৃদয়।টিনের দোচালা এক বারান্দার ঘরটায় একপাশে সে।অন্যপাশে বেড়া দিয়ে আলাদা করা ঘরে মর্জিনা আর তার মা।এ ঘরের পিছনে চেয়ারম্যান বাড়ির কাছারি ঘর।শীতে যাত্রা কিংবা ফুটবল-ক্রিকেট খেলার সময় লোকজনের ভিড়ে কাছারিঘর ভরে না।আসমা বেগমের কড়া নিষেধ।শুধু বিচার শালিস বসে।এই খোলা ঘরটায় থাকে রহিম।মা-বাবাহীন ছেলেটা এ’বাড়িতে কোথা থেকে এসেছিলো কেউ জানে না।নয় বছরে ভেসে এসে তালুকদার বাড়ির সংসারে পড়েছিল সে।গতবছর হৃদয়ের দাদা মারা যাওয়ার সময় সাদেক সাহেবকে ডেকে বলে গেলেন,’সাদু,তুই রহিমকে একটু দেখিস।বড় ভালো ছেলে।’আজ রহিমের বয়স আটারো ছুঁইছুঁই।হৃদয়ের সমবয়সী।প্রায় কাজের ফাঁকে এসে হৃদয়ের সাথে গল্প করে।আসমা বেগম দেখলে বড় খিটখিট করে।

পূর্বের সুন্দরী কাঠের সুন্দর দোতালা ঘরে থাকেন সাদেক সাহেব।তার দ্বিতীয় স্ত্রী আসমা বেগম এবং উদয়।দক্ষিণে আরেকটা টিনের চৌচালা ঘর অবশ্য আছে।আসমা বেগম তার বাপের বাড়ির মেহমানের জন্য বরাদ্দ রেখে প্রায় তালাবন্ধ রাখেন।হৃদয়ের মা যখন ছিলো,তখন এ বাড়িতে এটাই ছিলো সবচেয়ে সুন্দর এবং বড় ঘর।শেষবার বিছানায় পড়ে জামেলা বেগম এ ঘরে পনেরো দিন কাটিয়ে মারা গেলো।অবুঝ বয়সী হৃদয় তখন মাকে জড়িয়ে ধরে সে’কি কাঁন্না।তারপর তালুকদার বাড়ি চেয়ারম্যান বাড়ি হলো।নতুন ঘর উঠলো।হৃদয়ের জায়গা হলো না তাতে।বরং পুরানো ভালো ঘরটাও হাতছাড়া হলো।বাড়ির বিশাল উঠান পেরিয়ে পশ্চিমে পুকুর।সংসারে অভাব তো চোখে পড়ে না।তবুও হৃদয়ের জীবনে কতকিছুর যেন অভাব থেকে গেলো।

সকলের আড়ালে সখিনা বিবি বড় আপসোস করে।

‘সতীনের পুত মরে না কেন?’আসমা বেগম হুংকার দিল,খাবে না সেটা আগে বলা যায় না।আমার সংসারে কি সব বেয়ে পড়ছে?দুপুরে ভাত জুটবে না কপালে।বলে দিলাম।

আসমা বেগম জোরে হেকে বলল,মর্জিনা,সখিনা বু যেন সতীনের পুতকে ভাত না দেয়,দরদ করে।

মর্জিনা থালাবাসন নিতে নিতে বলল,আম্মা,ঠিক আছে।আপনি চিল্লাইয়েন না তো।

আসমা বেগম চোখ পাকিয়ে তাকাল,দুর হলি এখান থেকে হারামজাদী?আমি চিল্লাই?

মর্জিনা ভয়ে কেঁপে উঠে দ্রুত থালাবাসন গুঁছিয়ে ঢেঁকিঘরের দিকে ছুটলো।

সখিনা বিবি মর্জিনাকে দাঁত চেপে ধমক দিল,তোকে না কইচি বেশি কথা আমার পছন্দ না।চুপ থাকবি।

সাদেক সাহেব পান মুখে নিয়ে ঘর থেকে বের হলেন।দাওয়ায় পিক ফেলে বললেন,আসমা বেগম কম চিল্লাও একটু।হার্ট এ্যাটাক করবে।শোনো,রহিমকে গঞ্জে পাঠিয়ে দিও।সদাই করে দিবো।আর হৃদয়ের জন্য ওষুধ পাঠাবো।

আসমা বেগম বাধা দিল,খবরদার ওষুধ পাঠাবে না।তোমার ছেলে ভাব ধরেছে।

‘সবাই তোমার মতো না আসমা বেগম’ বলে সাদেক সাহেব রহিমকে জোরে ডাকতে ডাকতে কাছারিঘরের দিকে গেলেন।

দুই।

সাইকেল থামিয়ে মির্জাবাড়ির পথে দাঁড়িয়ে গেলো হৃদয়।জ্বরগায়ে ভিতর বাড়ি যাওয়া ঠিক হবে কি’না ভাবতে লাগলো।আসমা বেগমের শেষ কথাগুলো কানে যেতেই তড়িঘড়ি করে বিছানা ছেড়ে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে এলো সে।সাত-আট মাইল সাইকেল চালিয়ে সেই সখিপুর স্কুলে যেতে মন চাচ্ছে না জ্বরগায়ে।মির্জাবাড়ি তার মায়ের ছোটবেলার বান্ধবী রেবেকার বিয়ে হয়েছে।মায়ের কাছে দুই সইয়ের কত গল্প তার শোনা ছয়-সাত বছর বয়সে।অতটুকু বয়সে সব মনে না থাকলেও একেবারে ভোলে নি হৃদয়।রাতে মায়ের কোলে গল্প শোনার বায়নায় নিজের জীবনের গল্প শোনাতো জামেলা বেগম।জীবনগল্প অসমাপ্ত রেখে,যক্ষ্মারোগে সাত বছর বয়সী হৃদয়কে ফেলে পাড়ি জমাল পরপারে।অর্থৈ সমুদ্রের মাঝে সামান্য খড়কুটা পর্যন্ত রেখে গেলো না হৃদয়ের জন্য।ছোটবেলায় মায়ের আঙ্গুলের ডগায় ধরে এ’বাড়িতে তার যাতাযাত শুরু।মায়ের মৃত্যুর পর প্রায় গোটা এগারো বছর চলে গেলো।হৃদয়ের যাতাযাত এখনো থামেনি।

সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে হৃদয় বাড়ির উঠানে পা দিল।মির্জাবাড়ির অন্দরমহলে সবাই যেতে পারে না।তবে হৃদয় বিনা বাধাই যেতে পারে।মির্জাবাড়ির কাছারিঘর পেরিয়ে দেয়ালঘেরা বিস্তার উঠান পড়ে।হৃদয় সাইকেলটা উঠানের বিশাল বকুলগাছে ঠেস দিয়ে রেখে দীর্ঘ চৌদ্দসিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় উঠল।এটা একটা হিন্দু জমিদার বাড়ি।একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবীণ জমিদার নারায়ণ রায় চৌধুরী;মির্জাবংশের মৃত আরব মির্জার কাছে বিক্রি করে যান জলের দামে।সেই থেকে দারোগাকান্দিতে এটা মির্জাবাড়ি নামে সুপরিচিত।

সারাবাড়ি শোরগোলময়।সদর দরজা পরিয়ে সে ভিতরবাড়ি ঢুকল।হৃদয় এদিকওদিক তাকিয়ে রেবেকাকে খুঁজতে লাগল।

একজন ভদ্রমহিলা হৃদয়কে ডাকল দিল,কি’রে হৃদয়,কিছু খুঁজছিস?

হৃদয় পিছন ফিরে বলল,ও শর্মি ফুপি।না এমনি।আচ্ছা বাড়িতে এতো লোকজন কেন,ফুপি?

শর্মি ডালা হাতে এসেছিলো।সেটা ভালো করে আগলে বলল,তুই ক’দিন পর এ’বাড়িতে এলি বল তো?

হৃদয় স্মিত হেসে বলল,সাত-আটদিন হবে?কেন বলো তো?

শর্মি বলল,শোন বাপ,আমার অনেক কাজ।তুই বরং মেজো ভাবির কাছে যা।সব শুনতে পারবি।

হৃদয় শর্মিকে জড়িয়ে ধরতে গেল,ইশ ফুপি,তুমি বলো না।

শর্মি এক পা সরে গিয়ে বলল,এই ধরবি না।ডালা পড়ে যাবে।

হৃদয় নিজেকে সামলে মৃদু হেসে বলল,আচ্ছা ধরবো না।সইমা কই বলো তাহলে?

শর্মি এদিকওদিক তাকাল,মেজো ভাবিকে পাকঘরে দেখে এসেছি।

শর্মি এবার ডানদিকে তাকিয়ে বলল,ঐ তো মেজো ভাবি আসছে।আমি যাই।এসে বকাঝকা শুরু করবে।

শর্মির বিয়ে হয়েছিলো তেরো বছর বয়সে গাওদিয়া গ্রামে।আরশিনগর থেকে মাইলখানিক উত্তরে হেটে গেলে,বিশাল ফসলের বিল ডিঙিয়ে যে মোল্লা বাড়ি পড়ে সেখানে।বছর ঘুরতে না ঘুরতে স্বামীটা দেশান্তরি হলো।সেই থেকে বাপের বাড়ি পরে আছে গত দশ-এগারোটা বছর।ভরা যৌবনে যেন তার চর পড়ে গেছে,জোয়ার সেখানে প্রবেশ করে না এখন বোধহয়।

রেবেকা এগিয়ে এসে বলল,কি’রে হৃদয়।সইমাকে ভুলে গেলি?তোদের বাড়ির রহিম এসেছিলো বাইরে কাছারিঘরে টিভিতে না কি প্রোজেক্টরে খেলা দেখতে।ওকে তো ভিতর বাড়ি ডেকে বলে দিলাম তোকে গতকাল আসতে।রহিম বলে নি?

হৃদয় রেবেকাকে জড়িয়ে ধরে বলল,না সইমা।বললো না’তো।কি জানি ভুলে গেছে বোধহয়।

রেবেকা হৃদয়কে ছাড়িয়ে বলল,থাক হয়েছে।নিজেও তো আসলে পারতিস।

হৃদয় একটু দূরে সরে গিয়ে বলল,এই তো এলাম।

রেবেকা বলল,দুষ্টুমি রাখ।একটা কাজ করে দিবি বাপ?

হৃদয় তাকাল,সইমা!তুমি আমাকে কিছু বলবে,আমি করে দিবো না,তাই কখনো হয়েছে?

রেবেকা বলল,তুই সাইকেল সঙ্গে এনেছিস তো?তোর রাজপুত্র আসছে শহর থেকে।রফিক ভীষণ ব্যস্ত।আনতে যেতে পারবে না।তুই একটু যাবি?সাইকেলে করে নিয়ে আয় না,অহনকে!

হৃদয় চোখ সরু করে বলল,সইমা!রাজপুত্র আসছে বলে বুঝি বাড়িতে এতো লোকজন?সে কি সঙ্গে করে তোমার জন্য বউমা আনছে?

রেবেকা হেসে দিল,তোর মাথা।টুশির বিয়ে ঠিক হয়েছে।পরশু বিয়ে?

হৃদয় অবাক হয়ে গেল,কি?টুশি আপুর বিয়ে?ওয়াও।

রেবেকা আবার হাসল,এজন্য তো তোকে খবর পাঠালাম।হঠাৎই ঠিক হলো।এবার যা তো বাপ।

হৃদয় তড়িঘড়ি শুরু করে দিল,ছোটকা ব্যস্ত যেহেতু আমিই যাচ্ছি রাজপুত্রকে আনতে।তোমার এই ছেলে থাকতে,নো টেনশন।

হৃদয় হাটা দিলে রেবেকা বাধা দিল,শোন,তোর চোখ-মুখ শুকনা লাগছে কেন?খেয়েছিলি সকালে?

হৃদয় বলল,ও কিছু না।তুমি মা তো।সন্তানের চোখ-মুখ সব সময় তোমার কাছে শুকনাই লাগবে।

রেবেকা এগিয়ে এলো,পাকা পাকা কথা বলিস না।দেখি তো অসুখবিসুখ বাধাস নি তো?

কপালে হাত দিতে গেলে হৃদয় বাধা দিল,সইমা,কি করছো?আমার দেরি হচ্ছে তো!

‘হোক’ রেবেকা হৃদয়ের হাত ছাড়িয়ে কপালে হাত দিল,সে কি জ্বরে তো তোর গা পুড়ে যাচ্ছে।তোকে যেতে হবে না।চল তুই শুবি!আমি বরং টুটুলকে পাঠাচ্ছি অহনকে আনতে।

হৃদয় বলল,কিচ্ছু হবে না।আমি থাকতে টুটুল ভাইয়া কেন যাবে?ওনার কত কাজ।

রেবেকা বলল,কাজ না ছাই।ডাক্তারী পড়ে একেবারে সাহেব হয়ে গেছে।বাড়িতে এলে সারাক্ষণ বইয়ে মুখ গুঁজে পড়ে থাকে।বড় বুবুর পেটে ওটা কোথা থেকে এলো কে জানে!অথচ ওরই বোন টুশিকে দেখ,কত ছটফটে-মিশুক।

হৃদয় দুষ্টু হাসি দিল,সইমা,অহন কিন্তু তার চাচাতো ভাইয়ের ধারা পেয়েছে।কিন্তু আমাদের অহনা বুড়ি তোমার মতো হয়েছে।সুন্দরী,বুদ্ধিমতী।

রেবেকা হৃদয়ের কান ধরল,তোকে বলেছে।আমার অহন কি অসুন্দর?

হৃদয় ‘আইছ’ শব্দ করল,ছাড়ো।লাগছে তো।আমি কি তাই বললাম?সুন্দর বলেই তো রাজপুত্র বলি।শোনো,আমি বরং যাই।জ্বরে কিছু হবে না।এই যাবো আর আসবো।

রেবেকা বলল,জ্বর নিয়ে যাস না,বাপ।আমি না হয় রফিককেই পাঠায়।তুই ঘরে চল।

হৃদয় সদর দরজার কাছে গিয়ে ফিরে দাঁড়াল,বিয়ে বাড়ি কত কাজ।ছোটকা ব্যস্ত।তুমি ছাড়ো তো।আমি যাই।

রেবেকা বলল,সাবধানে যাস তাহলে।আর শোন,অহনের পিছনে লাগিস না।তোকে এমনিতেই চোখে দেখতে পারে না।

হৃদয় যেতে যেতে জোরেশোরে বলল,চিন্তা করো না সইমা।তোমার ননীর পুতুলকে আস্তই আনবো।

বকুলতলা থেকে সাইকেল নিয়ে হৃদয় বেরিয়ে গেল।

এ বাড়িতে হৃদয়কে সকলে ভালোবাসলেও তিনটি প্রাণীর চোখে সে দু’চোখের বিষ।স্বামীর মৃত্যুর পর অহনের দাদী একটু খিটখিটে স্বভাবের হয়েছে।তাই হৃদয় তার সব ব্যবহার মেনে নেয়।খুশি মনে।কিন্তু অহন আর টুটুল ভাইয়া যে কেন তাকে দু’চোখে দেখতে পারে না।সে সমীকরণ হৃদয় মেলাতে পারে না।পরিবারে ভালোবাসা পায় না বলে কেবল সে মির্জাবাড়ি আসে।হাসি-আনন্দে সকলের ফাইফরমাশ খাটে।যদিও তার সইমা এটা নিয়ে সবসময় আপত্তি করে।তবুও হৃদয় একপ্রকার সুখসুখ মনে সকলের মন জিততে চায়।এটা নিশ্চয় তার অন্যায় নয়।যৌবনের শুরু তার।এই বয়সে সব ছেলেমেয়ের মন বদলাতে থাকে।হৃদয়েরও বদলে।বড় অদ্ভুত বদল।গতরাতে সে যে বেশ্যা পাড়ায় গিয়েছিলো,তার খবর কেউ জানে না।আচ্ছা সইমা জানলে কি তাতে আর এমুখো হতে দিবে?সংকোচে হৃদয়ের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠে।

এতসব ভাবতে ভাবতে হৃদয় আরশিনগর বাজারে চলে এলো।ঢাকার বাস এখনো এসে পৌঁছায় নি।আচ্ছা অহন গ্রামে থেকে পড়লে তো পারতো।সইমাকে ছেড়ে চাকরিরত মামার সংসারে থেকে পড়ার কি আছে?গ্রামে কি ভালো পড়াশোনা হয় না?বেশ হয়।তাদের ক্লাসের ফার্স্টবয় রতন তো কত ভালো ছাত্র।টেস্ট পরীক্ষায় উচ্চতর গনিতে একশোতে পঁচানব্বই।কলেজের ইসলামের ইতিহাস স্যার রহস্য করে মাঝে মাঝে ক্লাসে আসেন।এসেই কৌতুক করেন,হিন্দুদের ব্রেইন কেন এতো ভালো জানিস?ছাত্রদের কৌতূহল বেড়ে যায়।তারপর স্যার বলেন,ওরা কাঁকড়ার ঘিলু খায় তো।তোরা আবার কাঁকড়া খাস না যেন।ক্লাসে হাসির রোল পড়ে যায়।কেউ কেউ হাত দিয়ে নিজের মুখ নিজে চেপে ধরে।হৃদয়ের কোন ভাবান্তর হয় না।সে ভাবে খেলে কি ক্ষতি।লোকে মারা তো আর যায় না।

অহন বাস থেকে নেমে এদিকওদিক তাকায়।তার জন্য আম্মু কাউকে পাঠাবে না।তা তো হতে পারে না।অন্তত টুটুল ভাইয়া তো বাড়িতে এসেছে।টুশি আপুর বিয়ে,সে ডাক্তারী প্র্যাকটিস রেখে কয়েকদিনের জন্য আসতে পারবে না রাজশাহী থেকে?তাই হয় নাকি?মামা চাকরিতে ছুটি না পাওয়ায় তার একা একা আসতে হলো।অন্তু আর মামী যে আসবে তারও উপায় নেই,মামার খাওয়াদাওয়ার সমস্যা হবে।মামা তো বলে দিলো,একদিন ছুটি নিয়ে একেবারে বিয়ের দিন হাজির হবে।কে জানে আসবে কি’না?সারাপথ বাসের ভিতর অপরিচিত লোকজন দেখে তার বড় ভয়ে কেটেছে।একলা এই প্রথম ঢাকা থেকে ফেরা।বরাবর আব্বু,না হলে মামা যাতাযাতে সঙ্গে থাকতো তার।কাঁধের ব্যাগটা নামিয়ে হাতে নিলো।পরিচিত কাউকে চোখে পড়ছে না।

হঠাৎ হৃদয় এসে অহনের গা ঘেষে সাইকেলে ব্রেক কষলো।মিষ্টি হেসে বলল,সইমা,আর কাউকে পাঠায় নি।আমার সঙ্গে যেতে বলেছে।পিছনে উঠো।

অহন রাগী চোখে তাকাল,আপনি কে?আমি তো আপনাকে চিনি না।যাকে চিনিই না তার সঙ্গে যাওয়ার তো কোন প্রশ্নই আসে না।

হৃদয় নিপুণ চোখে একবার অহনের দিকে তাকালো।হালকা অতসী ফুলের মতো গায়ের রং।গোলাপী ঠোঁটের উপরে হালকা কালচে গোঁফের রেখা।বাম চিবুকে একটা কালো তিল।রাগী অথচ আর্দ্র মিষ্টি কুয়াশার মতো ছলছল দু’টি চোখ।বেশ বড় হয়ে গেছে অহন।লম্বায় তার কান বরাবর।রাজপুত্রই বটে।

হৃদয় হালকা কাশি দিল,শোনো,রাজপুত্র।সইমা আমাকে পাঠিয়েছে।গেলে চলো,না হলে হেটেই যেতে হবে সারাপথ।ভরদুপুরে কোন ভ্যানগাড়ি পাবে না।

অহন বিরক্ত হয়ে বলল,রাজপুত্র বলেন কেন আপনি?বিরক্তিকর।যান তো আপনি?আমি হেটেই যাবো।

হৃদয় সাইকেল বেড় দিয়ে দাঁড়াল,আচ্ছা তুমি না চাইলে রাজপুত্র বলবো না।কিন্তু আমার সাথে না গেলে জোর করে তুলে নিয়ে যাবো।সইমার সব কথা আমার কাছে বেদবাক্য।

অহন অাড়চোখে তাকাল,এসেছেন আমার সইমার চ্যালা।বিরক্ত লাগে।

হৃদয় বলল,শোনো,সহজভাবে বলছি।পিছনে উঠে বসো।সইমা পথ চেয়ে আছে।

‘আপনি যান তো’ বলে অহন সাইকেলের বেড় কাটিয়ে সামনে এগোলো।হৃদয় আবার সামনে গিয়ে বেড় দিলো।নরম সুরে বলল,উঠবে না তো।দেখো আমি কি করি।

নিজের বা হাত দিয়ে অহনের ডান হাত চেপে ধরে অন্য হাতে অহনের থেকে ব্যাগ নিয়ে নিজের কাঁধে রাখল।তারপর অহনকে ঘুরিয়ে তার কোমরে হাত রেখে সাইকেলের সামনে বসালো।দু’হাত সাইকেলের ব্রেকে রেখে অহনকে সামনে বন্দি করে বলল,পিছনে তো বসতে বললাম।বসলে না।এখন সামনে বসে থাকো।সামনে রাস্তা ভাঙ্গা।বুঝবে কত ধানে কত চাল।

অহন মোচড়ামুচড়ি করতে লাগল,ভালো হচ্ছে না বলে দিলাম।ছাড়েন তো।বিরক্তিকর।

হৃদয় সেদিকে খেয়াল না দিয়ে আপন মনে সাইকেলের প্যাডেল ঘুরাতে লাগল।

‘কি’রে হৃদয় ওটা উঠান থেকেই ওভাবে একেবারে ভিতরবাড়ি চলে গেলো কেন?মুখটা লাল হয়ে আছে!আমাকে যেন চোখেই পড়লো না।’শর্মি অভিযোগ করলো।

হৃদয় অর্ধেক সিঁড়ি উঠে বলল,শর্মি ফুপি,আপনার ভাতিজা ক্ষেপে গেছে বোধহয়।আমার সাথে আসতে চাচ্ছিল না,জোর করে এনেছি।

শর্মি বড় বড় চোখে তাকাল,হৃদয়,তোকে কতবার বলেছি ওর পিছনে লাগিস না,বাপ।তুই দেখ,এখনই ঝড় উঠবে।

হৃদয় বলল,আচ্ছা তুমি বলো!আমি কি ওর শত্রু?কি জানি আমাকে কেন দু’চোখে দেখতে পারে না।আজ দু’বছর পর ওর সঙ্গে দেখা,যদিও এর মাঝে বাড়িতে এসেছে আমার সঙ্গে তো দেখাটা হয় নি,বলো।ছোটবেলা থেকে কি এমন রাগ পুষে রেখেছে কে জানে!

উপর ঘর থেকে ভাঙ্গাচোরার আওয়াজ শুনে দৌড়ে বাড়ির অর্ধেক লোক জড় হতে লাগল।শর্মি ঢোঁক গিলে বলল,আয় তো!শুরু হয়ে গেছে মনে হয়।

ভিতরবাড়ি গিয়ে সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত দোতলায় উঠে দেখল অহন নিজের ঘরের অর্ধেক জিনিস মেঝেতে ফেলেছে ইতিমধ্যে।রেবেকা অহনের ঘরে ছিলো।অহন আসবে বলে গোছগাছ করছিলো।অহন ঘরে ঢুকেই বিছানায় ব্যাগটা ফেলে হাতের কাছের ফুলদানি ছুড়ে ফেললো।তারপর একে একে সব।রেবেকা হৃদয়কে বলল,বাপ,তোকে কত করে বললাম ওর পিছনে লাগিস না।ওকে ক্ষেপাস না।তবুও কি করলি?এখন এই পাগলকে কে সামলাবে?আমার আর ভালো লাগে না।এবার ওর বাপ এলে বলবো যেন ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে গিয়ে পুলিশের ওসিগিরি করে।

জাহানারা বেগম তড়িঘড়ি করে ছুটে এলেন।শর্মি বলল,মা,আস্তে পড়ে যাবে।

তিনি শর্মিকে ঝাড়ি মারল,তুই চুপ থাক।

রেবেকার দিকে তাকিয়ে বলল,আমার শেরশাহ এলো,তুমি বললে না মেজো বউ?

রেবেকা কাঁদোকাঁদো হয়ে বলল,আম্মা,বলার সময় পেলাম কই?আপনার নাতি কি কান্ড করছে দেখেন।

জাহানারা বেগম রুমে ঢুকতে গেলেন।রেবেকা বাধা দিল,দেখেশুনে যান আম্মা।পায়ের নিচে কাঁচ ভাঙ্গা।

তিনি নিচে তাকিয়ে হেটে অহনের কাছে গেলেন।অহন পিছন ফিরে পালঙ্কে বসে বাইরে তাকিয়ে আছে।তিনি গিয়ে অহনের কাঁধে হাত রাখতেই অহন জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে দিলো।

ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলল,দাদি,বাড়িতে এতো মানুষ থাকতে আম্মু তার সইয়ের ছেলেকে পাঠিয়েছে আমাকে আনতে।ঠিক করেছে তুমি বলো?

জাহানারা বেগম মাথা নাড়ালেন,না,একদম ঠিক হয় নি।

সাইকেলে তোলার সময় হৃদয় জোরে চেপে ধরাতে অহনের ডান হাত লাল হয়ে গেছে।সেই হাত দেখিয়ে বলল,দেখো দাদি,ঐ ছেলে আমাকে মেরেছে।

সকলে হৃদয়ের দিকে তাকাল।হৃদয় যেন পাথর হয়ে গেল।জাহানারা বেগম চেঁচিয়ে রফিককে ডাকলেন,রফিক,ঐ রফিক!

রফিক কোথা থেকে দৌড়ে এসে বলল,কি হয়েছে মা?

তিনি রেগে বললেন,তুই একটু কাজ রেখে অহনকে আনতে যেতে পারিস নি?টুটুলই বা কোথায়?

রফিক বলল,মা,মেজো ভাবি তো আমাকে কিছু বলে নি!

তিনি আড়চোখে রেবেকার দিকে তাকালেন,তার তো পেটের সন্তানের চেয়ে অন্যের সন্তানের প্রতি দরদ বেশি।তিনি এতিম-মিসকিন মানুষ করার দায়িত্ব নিয়েছেন কি’না?

শর্মি হৃদয়ের দিকে তাকাল।

বেচারার চোখ টলমল করছে।রেবেকা দ্রুত পায়ে হেটে হৃদয়ের হাত টেনে বলল,চল,এখানে থাকতে হবে না তোর।বাড়িতে অনেক কাজ পড়ে আছে।হাতে-হাতে একটু করে দে,বাপ।

অহন আড়চোখে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিল।যেন বিজয়ের হাসি।

(দ্বিতীয় পর্ব)

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>> 

বিঃদ্রঃ তোমার একটিমাত্র জীবন যদি প্রেমহীন থেকে যায়,শর্তহীন দলিলে যদি কোন বিবাদীর নাম লেখা না থাকে,অনাবিষ্কৃত ভালোলাগা যদি তোমার ঠোঁটের আঙ্গিনায় বিরহ না জাগায়,একটিমাত্র জীবনে তুমি যদি কলঙ্ক এর সুখই না পেলে-তবে তুমি…!তবে তুমি আমার গল্প পড়ো না।

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>> 

তিন।

পুকুরপাড়ে গোসল করতে গিয়ে উদয়কে পেয়ে হৃদয় কাছে ডাকল,শোন ভাই!

উদয় ওযু করে উঠে এসে বলল,কও মিয়াভাই,কি কইবা?

হৃদয় হাটু গেড়ে বসে উদয়ের কাঁধে একটা হাত রেখে বলল,আমার সঙ্গে যাবি?

উদয় প্রশ্ন করল,কোথায় মিয়াভাই?

হৃদয় বলল,অহনাদের বাড়ি।যাবি?আজ টুশি আপুর গায়ে হলুদ।সইমা তোকেও নিয়ে যেতে বলেছে।

উদয় খুশি হয়ে বলল,অহনার খেলনা ধরতে দিবে আমাকে?

হৃদয় চোখ বুজল,হুম দিবে তো।তুই গেলে তো দেয়।অহনা খুব ভালো মেয়ে।

উদয় একটা কাটা নারিকেলগাছের গুড়িতে বসে বলল,কচু দেয়।সেদিন তোমার সাথে গেলে আমাকে মেরেছিল।ওর সাথে আড়ি।আড়ি।

হৃদয় বোঝালো,বন্ধু-বন্ধু অমন মারামারি হয়।আমি ভাব করিয়ে দেবো।যাবি?

উদয় কিছুক্ষণ মাথা চুলকিয়ে বলল,কিন্তু মিয়াভাই,আম্মু্ তো বকবে তোমাকে।

হৃদয় হেসে বলল,আব্বু ঘরে আছে।আব্বুকে বলবো যে তোকে নিয়ে যাচ্ছি।ঠিক যেতে দিবে।

‘আচ্ছা’ বলে উদয় মাথা নাড়াল।হৃদয় বলল,তাহলে তুই মকতবে যা।আমি পুকুরে একটা ডুব মেরে আসি।

উদয় যেন বায়না ধরল,আমিও গোসল করবো না?বেড়াতে যাবো তো।

হৃদয় বলল,না ভাই,এতভোরে গোসল করলে তোর ঠান্ডা লেগে যাবে।

উদয় জিজ্ঞাসা করল,তোমার ঠান্ডা লাগবে না মিয়াভাই?

হৃদয় বিজ্ঞের মতো মতামত দিল,আমি তো বড় মানুষ।

উদয় অবাক হলো,বড় মানুষ হলে ভোরে গোসলে করতে হয়?

হৃদয় হেসে দিল।বলল,তুই যখন বড় হবি তখন বুঝবি বড়দের মাঝে মাঝে ভোরে গোসল করতে হয়।

বসন্তের শেষ সময়।চৈত্রের মাঝামাঝি।ভাপসা গরম কেমন।গলা অবধি পানিতে নেমে ভালোই লাগছে হৃদয়ের।পুকুরের পূর্বদিকে গ্রামের মানুষদের জন্য আলাদা ঘাট বেধে দিয়েছেন সাদেক সাহেব।গ্রামের অধিকাংশ লোক চেয়ারম্যান বাড়ির এই পুকুরে গোসল করে।মেয়ে-বউদের জন্য আড়াল করে কাপড় পরিবর্তনের জায়গা করে দেওয়া হয়েছে।সারা পুকুর ভর্তি মাছ।গোসল করতে নামলে মাছের অত্যাচারে অতিষ্ঠ।হৃদয়ের ব্যাপারটা ভালোই লাগে।কেমন মাছের আদর খাওয়ার মতো।এতো ভোরে রহিমকে পুকুরপাড়ে দেখে হৃদয়ের অস্বস্তি বেড়ে গেল।একটা ডুব দিয়ে উঠে গা ঢলতে ঢলতে বলল,কি’রে রহিম সারারাত ঘুমাস নি?

রহিম নিমদাঁতন ফেলে মুখে পানি নিয়ে আঙ্গুল দিয়ে পরিষ্কার করলো।কুলি ফেলে বলল,বড় ভাইজান,ধলা গাইডা বাছুর দিছে।হারারাত সখিনা খালা আর আমি উজোগার আছিলাম।শ্যাইষরাতে বিয়ালো।

হৃদয় বলল,তাহলে এখন যা।একটু ঘুমিয়ে নে।

রহিম গামছা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলল,ঘুমালে চলবি ক্যামন কোরে,বড় ভাইজান।চাচা কইছে ধলারে নাওয়াইতে।সখিনা খালা ঘুমাইতে গেছে।আমি বরং ধলারে নাওয়াইতে নিয়ে যাই কদমবাড়ির খালে।

হৃদয় আরেকটা ডুব মেরে বলল,দূরে কেন যাবি?পুকুর থেকে পানি তুলে গোসল করা।

রহিম যেতে যেতে বলল,চাচা কইছে বিয়াতি গরু।দূরে গিয়া সাফ করতে।

‘আচ্ছা যা’ বলে হৃদয় উঠে এলো উপরে।

রহিম এ বাড়িতে সবচেয়ে সুখী মানুষ।সহজ।সরল।নিরিবিলি স্বভাবের।সারাদিন গাধারখাটুনি খেটে,রাতে দু’টো মুখে পুরেই আলগা কাছারিঘরে নাক টেনে ঘুম দেয়।হুশ থাকে না।জগতের কোন চিন্তা তার মাথায় নেই।তাকে দেখলে চিন্তা-ভাবনা বোধহয় লজ্জা পায়।তবুও কেন যেন এমন একটা সোজা মানুষকে মর্জিনা পছন্দ করে না।পক্ষান্তরে সখিনা খালা রহিমকে বড় স্নেহ করে।

পিছনের ক্যারিয়ারে বসে উদয় নানান কথা বলে চলেছে।উদয়কে সাথে আনতে গিয়ে অনেক কথা শুনতে হয়েছে হৃদয়ের।তবুও বড় মায়া তার ভাইয়ের প্রতি।হলুদ অনুষ্ঠানে কত খাওয়াদাওয়া হবে মির্জাবাড়ি।সে ছোটভাইটাকে রেখে কিভাবে সেসব মুখে তুলবে।আসমা বেগম মরে গেলেও সতীনের সইয়ের বাড়ি বিয়েতে আসবে না।তাই তো হৃদয় সইমাকে মানা করে দিয়েছে দাওয়াত করতে।আগ বাড়িয়ে অপমান হওয়ার কোন মানে হয় না।

উদয় পিছন থেকে হৃদয়কে জড়িয়ে ধরে বলল,মিয়াভাই,আম্মু্ তোমাকে পছন্দ করে না কেন?

হৃদয় একটা হাত নিজের পেটে অর্থাৎ উদয়ের জড়ানো হাতে রেখে বলল,ছিঃ ভাই।অমন বলতে নেই।মা তো মা ই হয়।আমি একটু দুষ্টু তো,তুমি তো আমার লক্ষ্মীভাই।তাই মা তোমাকে বেশি ভালোবাসে।আমাকে কম ভালোবাসে।

উদয় হৃদয়ের পিঠে মাথা রেখে বলল,তুমি মিথ্যা বলো কেন?আম্মু তোমাকে একটুও ভালোবাসে না।খালি বকে।

হৃদয় ছোটভাইয়ের একটা হাত টেনে চুমু দিয়ে বলল,তুই এতো পাকা হয়েছিস কেন বলতো?অহনা কিন্তু ক্ষেপাবে।চুপ করে আমাকে শক্তভাবে জড়িয়ে ধরে বোস তো।তাড়াতাড়ি সাইকেল চালাই।সইমা রাগ করবে দেরি হলে।

হৃদয়ের চোখে অশ্রুজল টলমল করছে।ছোটভাইটা তাকে কত ভালোবাসে।নিষ্পাপ মনের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।ভ্রাতৃত্বের বন্ধন বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে শক্ত বন্ধন।

মির্জাবাড়ির বকুলতলায় বিশাল প্যান্ডেল সাজানো হয়েছে।সন্ধ্যা সাতটা থেকে গায়েহলুদ অনুষ্ঠান।সারাবাড়ি লোকে লোকারণ্য।গ্রামের বাচ্চাদের দৌড়াদৌড়িতে উঠান যেন মাতোয়ারা।বাহির কাছারিঘরে শফিক সাহেব গ্রামের মুরুব্বীদের সঙ্গে আলোচনায় ব্যস্ত।হৃদয়কে দেখে বললেন,যা তো বাপ,বাড়ির ভিতরে গিয়ে রফিককে পাঠিয়ে দে।

হৃদয় সাইকেল কাছিরঘরের সাথে ঠেস দিয়ে রাখল,পাঠিয়ে দিচ্ছি বড়কা।

শফিক সাহেব আবার বললেন,আর শোন,তোর বড়মাকে বল টুটুলকেও পাঠাতে।বিয়ের কয়টা দিন বইয়ে মুখ না গুঁজলে চলছে না!

তিনি আফসোস করলেন,তার হলো বোনের বিয়ে,কাজ করবে কি!আছে বই নিয়ে।

হৃদয় বলল,আচ্ছা বড়কা,বড়মাকে বলছি টুটুল ভাইয়াকেও পাঠাতে।

উদয় বলল,মিয়াভাই,সাইকেলে তালা দিলে না?চুরি হয়ে যাবে।কত্ত লোক!

‘ভালো কথা বলেছিস তো।তুই দাঁড়া,আমি তালা দিয়ে আসছি’ বলে হৃদয় সাইকেলে তালা দিয়ে এসে বলল,শোন,একদম দুষ্টুমি করবি না,ভাই।সারাদিন আমি ব্যস্ত থাকবো।তুই অহনার সাথে খেলাধুলা করবি।কেমন?

উদয় মাথা নাড়াল।

শর্মিকে দেখে হৃদয় বলল,শর্মি ফুপি,ভাইটাকে একটু অহনার কাছে দিয়ে এসো না।

শর্মি হেসে বলল,আয় উদয়,অহনাকে মেজো ভাবি খাওয়াচ্ছে ঘরে।তোকে দিয়ে এসে আবার মায়ের ঘরে যেতে হবে।

উদয় শর্মির হাত ধরে দাঁড়াল।হৃদয় বলল,ফুপি,ছোটকা কই বলো তো?বড়কা কাছারিঘরে ডাকছে।

শর্মি যেতে যেতে বলল,বাড়ির পিছনে পাকশালা পড়েছে,ওখানে হবে হয়তো।দেখ গিয়ে একটু বাপ।

হৃদয় পিছনবাড়ি গিয়ে রফিককে ডাকল,ছোটকা,বড়কা তোমাকে ডাকছে কাছারিঘরে।তুমি যাও তো আমি এখানে দেখছি।

রফিক হৃদয়ের কাছে এসে বলল,আচ্ছা একটু দেখ তো বাপ।এদের কিছু লাগে কি’না!

রফিক যাওয়ার পর হৃদয় দূরে তাকিয়ে দেখলো বিশাল জামরুল তলায় দু’টো চেয়ার পাতিয়ে অহন আর টুটুল বসে আছে।

মির্জাবাড়ির পিছনে এক বিঘা জমির পর থেকে সুবেরী বিল শুরু হয়ে গেছে।পুরো বর্ষা মৌসুমে দারোগাকান্দির এই বিল ডুবে থাকে কয়েক হাত জলের নিচে।বছরের খুব অল্প সময়ের জন্য ফাল্গুন-চৈত্রের দিকে বিল মাথা তোলে।যেমন এখন আছে।একারণে গ্রামের অনেক লোকে একে ‘ভূতের বিল’ বলে থাকে।ফসল ফলে না তেমন,তবে মাছের আখড়া প্রসিদ্ধ ভূতের বিল।

অহন বিরক্ত হয়ে বলল,টুটুল ভাইয়া,আপনাকে ডেকে আনলাম একটু গল্প করতে।আপনি সঙ্গে একখানা বই এনে পড়েই যাচ্ছেন।পাশে যে একজন মানুষ আছে তার খেয়াল নেই।

টুটুল বইয়ের থেকে মুখ তুলে চোখের চশমা ঠিক করল,অহন কিছু বললে?

অহন ভ্রু কুঁচকে বলল,না কিছু বলি নি।আমি গেলাম।বিরক্তিকর!

টুটুল যেন অবাক হলো,কই যাচ্ছো?গল্প করবে বলে তো ডেকে আনলে!

অহনের কণ্ঠে বিদ্রুপের সুর,হ্যাঁ তাই তো।গল্পই তো করছি।খুব গল্পবাজ কি’না আপনি?

টুটুল ডান হাত তুলে আবার চশমা ঠিক করল,ওহ তাই।আচ্ছা একমিনিট।এই প্যারাটা শেষ করে নেয়।

অহন বিরক্তি নিয়ে উঠে যাবে তখনই হৃদয়ে এসে বলল,টুটুল ভাইয়া,বড়কা আপনাকে কাছারিঘরে ডাকছে।

টুটুল খানিকক্ষণ ভাবল।তারপর বলল,আমি যেয়ে কি করবো?আর তোমাকে দিয়ে ডাকার কি হলো?

অহন স্পষ্ট ভাষায় বিরক্তি প্রকাশ করল,এলেন আমার সইমার চ্যালা।অসহ্য।

টুটুল উঁচু হয়ে তাকিয়ে বলল,শোনো হৃদয়,তুমি আমার সামনে আসবে না কখনো!তোমাকে আমার পছন্দ না।

হৃদয় মাথা নাড়াল,আচ্ছা ভাইয়া।

টুটুল বই হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল,আর হ্যাঁ,এরপর থেকে সামনে না পড়ার চেষ্টা করবে।

হৃদয় পুনরায় সম্মতিতে মাথা দোলালো।

টুটুল চলে গেলে খালি চেয়ারটাই বসতে বসতে হৃদয় শুধু আওড়াল,রাজ….!

বাকি শব্দাংশ শেষ করার আগে মনে পড়ল গতকালের কথা।হৃদয় আজ এ বাড়িতে আসতো না।তবুও এসেছে সইমার কথাতে।অহন গতকাল যা করলো আদৌ করা উচিত নয়।সইমা তাকে অহনের চেয়ে কম ভালোবাসে না।মা মরা এতিম ছেলে বলে হৃদয় কি সকলের করুণার পাত্র।অত্যন্ত সইমার ব্যাপারে তার ভাবনাটা এমন হয় না।তার কেবলই মনে হয় পৃথিবীতে একমাত্র সইমাই তাকে ভালোবাসে।আদর করে।বাকি যারা যা করে কেউ করুণা।কেউ ঘৃণা।অহন যে কেন তাকে ঘৃণা করে তার তল সে আজও পেলো না।হৃদয় সামনে পড়লে অহনের চোখ ক্রোধে লাল হয়ে যায়।অথচ কত সুন্দর দু’টি মায়াবী চোখ তার।হৃদয় কোনদিন কারোর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারে না।অস্বস্তির সঙ্গে লজ্জা যোগ হয়।অহনের চোখে চোখ তার কমই পড়েছে।যতবার পড়েছে এক সেকেন্ডের আগে চোখ সরিয়ে নিয়েছে।বুকে কাঁপন বেড়েছে।ভয়ে নাকি অন্য কোন কারন আছে!হৃদয়ের সেটা অজানা।কিশোর বয়সের শেষ।যৌবনের দ্বার-প্লাবনে খোলার সন্ধিক্ষণ আগত।অচেনা।অজানা।মদির আবেগ-অনুভূতিতে তার বুক কেঁপে উঠে বারবার।বড় কোন অসুখ কি হলো তার?হলে বা কি?জগতে যার আপন কেউ আছে বলে পরিচয় মেলে না,তার থাকা,না থাকায় কার কি এসে যায়।

অহন জিজ্ঞাসা করল,আপনি কি এখন এখানে বসে থাকবেন?আপনি থাকলে আমি উঠবো।

হৃদয় তুমি বলতে গিয়েও থেমে গেল।দরকার কি!কিসে আবার রেগে যায়।হৃদয় বলল,না,আমিই যাচ্ছি।আপনি বসেন।আচ্ছা সকালে খেয়েছেন আপনি?

অহন ছোট করে ‘হুম’ বলে সবেরী বিলের দিকে তাকিয়ে রইলো।হৃদয় উঠে হাটা দিল।

শর্মি এসে পিছনবাড়ি দাঁড়াল।হৃদয়কে ইশারায় ডাকল।হৃদয় কাছে গিয়ে বলল,ফুপি,কি হয়েছে?

শর্মি বলল,মেজো ভাবি তোকে ডাকছে একটু।কি যেন বলবে!

হৃদয় বলল,ছোটকা তো এখানে রেখে গেলো।বাবুর্চিদের কিছু লাগবে কি’না দেখতে।

শর্মি একটু ভেবে বলল,তুই যা।আমি জয়নালকে ডেকে পাঠাচ্ছি এখানে।

হৃদয় হেসে দিল,জয়নাল ভাই এসব দেখবে?উনি তো আমাদের রহিম বরাবর।গরু,খাওয়া আর ঘুম ছাড়া কিছুই বোঝে না।

শর্মি হৃদয়ের কাঁধে হালকা চড় দিল,তোকে বলেছে।কয়েক মিনিটের ব্যাপারই তো।পারবে।তুই গিয়ে শুনে অায়।

‘আচ্ছা’ বলে হৃদয় ভিতর বাড়ির দিকে চলল।

এ বাড়ির পাকঘরে হৃদয়ের সচরাচর যাতাযাত।মির্জাবাড়ি এলে অধিকাংশ সময় সে তার সইমা আর বড়মাকে পাকঘরেই পায়।পুরুষেরা অন্য মহিলাদের হাতের রাঁধা খান না।তারা কেবল বাড়ির গিন্নীদের হাতে-হাতে সাহায্যটাই করেন।পাকঘর ছাড়া অসংখ্য কাজে এ বাড়ি কয়েকজন নিয়মিত থাকে।খায়।

হৃদয় পাকঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বলল,সইমা,ডেকেছিলে?কি করতে হবে বলো!

রেবেকা তরকারি কাটছিলো।উঠে এসে ফিসফিস করে বলল,অহন কইরে?

হৃদয় শান্ত কন্ঠে বলল,বাড়ির পিছনে বসা দেখে এসেছি।কেন?

রেবেকা আঁচলে হাত মুছে বলল,তোমার রাজপুত্র সকালে এখনো খায় নি!কাল থেকে আমার সাথে কথাও বলছে না।রাতে আম্মা জোর করে খাইয়েছিল দু’টো।

হৃদয় অবিশ্বাস চোখে তাকাল,আমি যে জিজ্ঞাসা করলাম।বলল খেয়েছে।

রেবেকা বলল,খায় নি রে বাপ।ছেলেটা আমার প্রচুর জেদি আর একরোখা হয়েছে।একটু দেখবি খাওয়াতে পারিস কি’না!

হৃদয় দ্রুত মাথা নাড়াল,ওরে বাপ,আমি পারবো না।তোমার যে ছেলে।সোনার টুকরো,তিতলা ঘুঘু।

রেবেকা চড় উঠাল,একদম বদমাইশি কথাবার্তা বলবি না।মাইর খাবি।আমার ছেলেটা খারাপ হবে কেন?

হৃদয় ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,ও আল্লাহ,আমি আবার কখন খারাপ বললাম!রাজপুত্র কি আমি এমনি এমনি বলি?তোমার মতো রাজরানির ছেলে তো,রাজ স্বভাব পেয়েছে।

রেবেকার কপালে ভাঁজ পড়ল,উফস,আবার?ঐ তুই নিজেকে দেখেছিস আয়নায় কখনো?একেবারে নবাবপুত্র।আমার দু’ছেলেই সুন্দর।

হৃদয় রেবেকাকে জড়িয়ে ধরল,হুম।একটা রাজপুত্র,আরেকটা নবাবপুত্র।

‘হয়েছে।এবার তোর দাদিকে গিয়ে বল যে অহন খায় নি এখনো’ রেবেকা কাজে হাত লাগালো আবার।

চার।

মিনিট পাঁচেক পরে ফিরে এলো হৃদয়।বলল,সইমা,শর্মি ফুপি বললো দাদি নাকি দরজা বন্ধ করে শুয়ে আছে।সাইন্ড বক্সে গানের শব্দে নাকি তার মাথা ধরেছে।ডাকা যাবে না।

রেবেকা একজন মহিলাকে বলল,আয়েশা,হাতের কাজ সেরে উঠানে গিয়ে পাড়ার ছেলেদের বলে আয় গান সন্ধ্যার পর বাজাতে।আম্মা কষ্ট পাচ্ছে।আনন্দ মাটি হবে বলে বোধহয় কিছু বলছে না।

আয়েশা মাথা নেড়ে বলল,জে,মেজমা।যাইতাছি।

মাসুমা পাকঘরে ঢুকে বলল,আর পারি না রে ছোটো।তোর ভাসুরটাও হয়েছে তেমন,টুটুলকে ডেকে নিয়ে কিসব বলেছে,ঘরে এসে ব্যাগ গোছাতে শুরু করেছে।চলে যাবে।

রেবেকা তরকারি কাটা থামিয়ে বলল,কি বলো বড় বু?দাদা আবার কি বলল?দাদা জানে না যে ও একটু অমন।কাজকাম করেনি কোনদিন,তাই যেতে চাই না।অহনটাও তো এমন।

মাসুমা চুলার কাছে বসে বলল,ছোটো,তোকে না বললাম ডালটা ফোঁড়ন দিতে,কই দিস নি তো।

রেবেকা জিভ কাটাল,একেবারে ভুলে গেছি বড়বু।

‘ভুলেই থাক।সংসারে আমার যত জ্বালা।যেদিকে না যাবো সেদিকে ঝামেলা’ মাসুমা ডালের কড়াই নামালো।

হৃদয় আর রেবেকা মুখ টিপে হাসল।

মাসুমা এবার হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,কি’রে তোর জ্বর কমেছে?খেয়েছিস কিছু?

হৃদয় নড়েচড়ে দাঁড়াল,কমেছে বড়মা।মর্জিনা ওষুধ এনে দিছিলো কোথা থেকে।

রেবেকা বলল,সেই তো।দেখেছিস আমার একদম মনেই নেই এতো ঝামেলার মাঝে যে তোর জ্বর।আমার কাছে এসে বোস তো,বাপ।দেখি জ্বর আছে কিনা!

হৃদয় পাশে বসে বলল,আরে সইমা,জ্বর নেই।

রেবেকা কপালে হাত দিয়ে বলল,জ্বর নেই।সকালে খেয়েছিলি?সত্যি বলবি।

‘তুমিও না!আরে বাবা খাবো না কেন?’ হৃদয় কথা এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করলো।

মাসুমা বলল,দেখলি ছোটো,ছেলে পাকা হয়ে গেছে এই বয়সে।ঐ টুলটা টেনে এখানে বোস তো।আম্মার জন্য মাছের ঝোল করেছি,সেখান থেকে দিচ্ছি।খেয়ে তারপর সব কাজ।

হৃদয় বাধা দিল,দাদি গরুর মাংস খান না বলে তুমি তার জন্য ঘরে আলাদা রান্না করছো।ওটা দাদির জন্য রাখো।তাছাড়া আমি মাছ খাই না,বড়মা।তুমি ভুলে গেছো।

রেবেকা বলল,হ্যাঁ বড়বু।ও তো কোন মাছ খাই না।তুমি বরং ডালটা ফোঁড়ন দিয়ে দাও।

মাসুমা ডালের কড়াইয়ে তেল দিয়ে বলল,ও হ্যাঁ,তুই তো আবার মাছ খাস না।চুপটি করে বোস,আমি ডাল দিয়েই দিচ্ছি।

হৃদয় টুল টেনে বসে বলল,তোমাদের দুই মায়ের ভালোবাসার অত্যাচারে আমি পাগল হয়ে যাবো ঠিক একদিন।দেখবে!

হৃদয়ের সইমা আর বড়মা হেসে উঠল।তবে হৃদয়ের দু’চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।বড়মার ডালের কড়াই তার চোখে আবছায়া ঠেকল।

রাজশাহী থেকে টুটুলের এক বান্ধবী এবং তিন বন্ধু এসেছে।একসঙ্গে মেডিকেলে পড়ছে তারা।শর্মি তাদের এনে টুটুলের ঘরে দিয়ে গেল।ফেরারপথে হৃদয়ের ডাকে কাছে এসে বলল,কি’রে হাতে ভাতের থালা কেন?কার জন্য নিচ্ছিস?

হৃদয় কপাল কুঁচকে হেসে বলল,আর কার!রাজপুত্রের জন্য।তুমি একটু দিয়ে এসো প্লিজ,ফুপি।

শর্মি বড় বড় চোখ করল,তোর মাথা খারাপ হয়েছে?আমার মায়ের শেরশাহের কাছে একমাত্র তিনি গেলে শেরশাহ গলে পানি হয়।আমি পারবো না বাপ।তুই যা।

হৃদয় ঢোঁক গিলে বলল,আমি?সইমা তোমাকে দিয়ে দিতে বললো তো।

শর্মি একদমে বলল,শোন,আমি পারবো না।

হৃদয় মুখটা গোমড়া করার ভাণ করল,আচ্ছা কি আর করা!আমিই যাচ্ছি তাহলে।দোয়া করো।যেন বেঁচে ফিরি।

শর্মি ফিক করে হেসে দিলো।হৃদয় অভিমানের সুর টানল,হাসো,আমারও সময় আসবে।শোনো,ফুপি।আমার উদয় কোথায়?তখন থেকে ওর কথা মাথাতেই নেই।

‘টেনশন নিস না।অহনার কাছে আছে।মেজো ভাবি উদয়কেও খাইয়ে দিয়েছে।দেখ আশেপাশে খেলছে কোথায়।তুই যা বাপ,আমার বহুত কাজ! বলে শর্মি হাটল দিলো।

হৃদয় হেসে বলল,হু,আমার কাছে এলে তোমার কাজ বেড়ে যায়।কাজ তো একটাও করতে দেখি না।শুধু দৌড়াদৌড়ি করো।

শর্মি থমকে দাঁড়াল।হেসে বলল,তোকে আবার হাতের কাছে পাই।দেখ কি করি।

হৃদয় বাড়ির পিছনে এসে বাবুর্চিদের একজনকে বলল,গফুর কা,গরুর গোশত কষানো হয়েছে?

গফুর এ গায়ের সেরা বাবুর্চি।দল গড়ে তুলেছে রাঁন্নার।চেয়ারে বসে তদারকি করে।ঘনঘন পান খায়।পানের পিক ফেলে বলল,হয়েছে।একটুপর ঝোলের পানি দিবো।কি করবা?

হৃদয় থালা দেখিয়ে বলল,সইমা কয়েক পিচ গরুর গোশত দিতে বলেছে।অহন খাবে।

গফুর বাবুর্চি চেঁচিয়ে বললেন,ঐ কুরবান!এই পোলাডা কয়েক পিচ কষা গোশত তুইলা দে তো।

পাকঘরে খাওয়া শেষ করে হৃদয় যখন তার সইমাকে বলল,তুমি একটা প্লেটে ভাত দাও,সইমা।দেখো আমি রাজপুত্রকে ঠিক খাইয়ে আসবো।

রেবেকা তখন বাধা দিল।বলল,না না।তোর যেতে হবে না।জেদি ছেলে না খেয়েই থাক।শেষে তোকে দেখে ক্ষেপে যাবে।

মাসুমা বলল,ছোটো,আজ বরকত ওসি এলে তাকে বলিস ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে যেতে।বাব্বা এতো জেদি ছেলে আমি বাপের জনমে দেখি নি।

রেবেকা বলল,তুমিই বলো বড়বু তোমার দেবরকে।আমার আর ভালো লাগে না।টুটুল তোমার কত ন্যাওটা,আমার ছেলেটা কথাই শোনে না।

হৃদয় মুচকি হেসে বলল,সইমা,অপবাদ দিলে কিন্তু।

রেবেকা হৃদয়ের দিকে তাকাল,ঐ তোর কথা বলেছি?

হৃদয় হাসল,থাক হয়েছে।বড়মা,তুমি দাও তো একটা প্লেটে কটা ভাত।

রেবেকা বলল,যা তোর যখন মন চাচ্ছে ঝাড়ি খেতে,খেয়ে আয়।ও ডাল খেতে চায় না।তুই বরং বাবুর্চিখানা থেকে গরুর গোশত কষানো হলে সেটার কয়েক পিচ নিয়ে যাস।অহন খুব পছন্দ করে।

অহনের পছন্দ অপছন্দ হৃদয় বড় একটা জানে না।ছোটবেলা থেকে এ বাড়িতে এলেও অহনের সান্নিধ্য সে কখনো পায় নি।অহন বরাবরই তাতে এড়িয়ে চলেছে ছোটবলা থেকে।যার কারন তার অজানা।

হৃদয়কে আসতে দেখে অহনের কপালে বিরক্তির ছাপ পড়লো।দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়াল,আবার আসছে।বিরক্তিকর।

এটুকু বয়সে তার এই একটা মানুষকে যতটা অপছন্দ ততটা অপছন্দ বোধহয় আর কেউ নেই।দেখলেই বিরক্তিতে মেজাজটা খারাপ হয়ে যায়।

হৃদয় আসতেই বলল,কি চায়?আবার কেন জ্বালাতে এসেছেন?

হৃদয় নরম সুরে বলল,সইমা বললো তুমি সকাল থেকে কিছু খাও নি।তাই খাবার পাঠালো।খেয়ে নাও।

অহন বলল,আচ্ছা সারাবাড়ির লোক কাজে ব্যস্ত।আপনার কি কোন কাজ নেই?সারাক্ষণ কি আমার পিছনে লেগে থাকতে হবে?

হৃদয় অহনের হাতে আচমকা প্লেট ধরিয়ে দিয়ে টুটুলের উঠে যাওয়া চেয়ারটায় পানির গ্লাস রেখে বলল,দিয়ে গেলাম।মন চাইলে খাও।না হলে ফেলে দাও।

রফিক বাবুর্চিখানা থেকে ডেকে বলল,হৃদয়,বাপ একটু গঞ্জে যেতে হবে।তাড়াতাড়ি আয়।

হৃদয় যাওয়ার আগে বলল,দেখো অহন।আমি তোমাদের কেউ না।এখানে আসলে অন্তত ভালোবাসাটা পাই।সেই লোভে আসি।এতিম হই,মিসকিন হই।সুখের ঠিকানা তো সবাই খোঁজে।এই মির্জাবাড়ি হলো আমার সুখের ঠিকানা।তুমি আমাকে পছন্দ করো না কেন!আমার জানা নেই।কিন্তু আমার উপর রাগ করে তুমি কেন নিজেকে কষ্ট দিবে,বলো?খেয়ে নাও।এই অনুরোধটুকু রাখো।

হৃদয় চলে যাওয়ার পর অহন প্লেট থেকে এক লুকমা ভাত মুখে দিল।গ্লাসের সম্পূর্ণ পানিটুকু ঢকঢক শব্দে নিঃশেষ করল।তারপর একটা বাচ্চাকে ডেকে প্লেট আর গ্লাসটা তাকে ধরিয়ে দিল।

টুটুল বন্ধুদের সাথে নিয়ে অহনের কাছে এসে বলল,তুমি এখনো এখানে বসে?আমি সারাবাড়ি খুঁজে বেড়াচ্ছি।

তারপর বন্ধুদের দেখিয়ে বলল,সবার সাথে পরিচয় হয়ে গেছে।একমাত্র তুমি আর দাদি বাকি!এই হচ্ছে বাপ্পি,এটা কৌশিক,সঞ্জু আর এ তমা।

এরপর টুটুল অহনের দিকে দেখাল,আর গাইজ,এটা হচ্ছে আমার কাজিন।অহন।ওর একটা ছোট বোনও আছে,অহনা।আমাদের অহনা বুড়ি।

বাপ্পি হাত বাড়িয়ে দিল,হাই অহন,হোয়াট’স আপ?

অহন উঠে দাঁড়িয়ে হ্যান্ডশেক করল।টুটুলের দিকে তাকাল,টুটুল ভাইয়া,জয়নাল ভাইকে বলেন না আর কয়েকটা চেয়ার দিয়ে যেতে।

টুটু্ল বলল,আচ্ছা বলছি,তুমি এদের নিয়ে কথা বলো।আমি তমাকে টুশির রুমে রেখে আসছি।ও যেতে চাইছে।

বাপ্পি খোঁচা মারল,তমা যেতে চাচ্ছে?নাকি তুই নিয়ে যাচ্ছিস?

টুটুল চোখের ইশারায় অহনের দিকে দেখাল।

বাপ্পি বলল,সো হোয়াট?অহন আজ জানলেও জানবে,কাল জানলেও জানবে।ইট’স নট ব্যাড ইয়ার।

অহন মিটিমিটি হাসছিল।

জয়নাল ভাইকে আর বলা লাগে নি।নিজে থেকে চেয়ার এনে দিয়ে গেল।

‘তোরা বোস তাহলে!আমরা যাই’ বলে টুটুল তমাকে সঙ্গে নিয়ে চলে গেল।

কৌশিক আর সঞ্জু পাশাপাশি চেয়ারে বসে গেল।ল্যাপটপ সঙ্গে এনেছে।তাতে কি একটা দেখছে আর হাসছে।নিজেদের ভিতর ইশারায় কিসব বলছে।অহন একবার তাকাল সেদিকে।দু’জনের এদিকে কোন খেয়াল নেই।

বাপ্পি একটা চেয়ার টেনে অহনের পাশে বসল।তার হাতে দামী ক্যামেরা।চোখে সানগ্লাস।শহুরে সাজপোশাক।দামী ব্র্যান্ডের পারফিউম।কড়া গন্ধ ছড়াচ্ছে।ধবল ফর্সা।ট্রিম করা স্টাইলিশ দাড়ি।নাসিকার নিচে রাঙা ঠোঁট।

অহন কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করল,আপনি ফটোশ্যুট করেন?

বাপ্পি সগর্বে জবাব দিল,ইয়া,ইট’স মাই প্যাশন।তোমার ভালো লাগে?

অহন প্রত্যুত্তরে একটা হাসি দিল।বাপ্পি বলল,নাইস স্মাইল।

ক্যামেরাটা অন করে অহনের দিকে তাকিয়ে বলল,প্লিজ,কিউট স্মাইলটা আবার!

অহন নিজের মুখের উপর হাত দিল,বাপ্পি ভাইয়া,না।

বাপ্পি অহনের হাত সরিয়ে বলল,কুল ইয়ার।ওয়ান শ্যুট প্লিজ।

কৌশিক আর সঞ্জু এবার তাকাল।কৌশিক সঞ্জুকে বলল,দেখ,শুরু হয়ে গেল।এর জন্য কোথায় আসতে ইচ্ছা করে না।

সঞ্জু বিরক্তি নিয়ে বলল,তাতে তোর সমস্যা কি বুঝি না।দু’টো দিনই তো মাত্র।আমরা এখানে সারাজীবন থাকতে আসে নি।

কৌশিক রেগে গেল,ধুর শালা,তুই যা বুঝিস না,সেটা তোকে বোঝানোই দায়।

বাপ্পি একসঙ্গে অনেকগুলো শ্যুট নিয়ে নিল।অহন এবার বাধা দিল,বাপ্পি ভাইয়া,আর না প্লিজ।আমার কিন্তু এবার অস্বস্তি লাগছে।

বাপ্পি একটা মিষ্টি হাসি দিল,তুমি কত সুন্দর জানো?একবার দেখো পিকগুলো কত নাইস হয়েছে।

নিজের চেয়ারটা অহনের দিকে আরেকটু সরিয়ে বসে অহনকে পিকগুলো দেখাতে লাগলো।

কৌশিক আড়চোখে একবার বাপ্পির দিকে তাকাল।সঞ্জু বলল,আবার?তোর হয়টা কি বল তো?ইট’স সিম্পিল ইয়ার।কাম অন কৌশিক।

কৌশিক নিজের কাঁধ থেকে সঞ্জুর হাত সরিয়ে দিল,তোরই বা কি?তোর কাছে তো সিম্পিলই লাগবে,তাই না?

সঞ্জু ল্যাপটপের ভিডিও অফ করে বলল,কৌশিক একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না?তুই জানিস কিন্তু বাপ্পি অমনই।সবার সাথে ফ্লার্ট করা চাই।ইন দ্যাট কেস,তুই এটাও জানিস যে ও কিন্তু বাই এ্যান্ড বহুগামী।তুই এটা জেনেই ওকে ভালোবেসেছিস।

কৌশিক মন খারাপ করল,হুম জানি তো।

সঞ্জু এবার অভয় দিল,বাপ্পি যাই করুক,অন্তত তোকে ঠকাবে না!আমি নিজে গ্যারান্টি দিচ্ছি ইয়ার।মন খারাপ করিস না দোস্ত।বি ইজি!

কৌশিক শান্তভাবে বলল,সবই বুঝি।কিন্তু ভয় লাগে সঞ্জু,পেয়ে হারানোর মানে তুই কি বুঝবি?

সঞ্জুর বুকে গিয়ে লাগল কথাটা।বলল,হুম সেই।আমি কি বুঝবো।কি বল তো,এই যে আমি তমা কে এতো ভালোবাসি।টুটুলকে কখনো জানতে দিয়েছি?মন হালকা করতে তোকে শেয়ার করি সব।এমন কি বাপ্পিও জানে না।তমা ব্যাপারটা বোঝে।তবুও সে আমাকে অসম্মান করে না।সে জানে,ভালোবাসার অধিকার প্রত্যেকের আছে।আমার বলায় নয়,টুটুল আর তমা দু’জনেই আমার অত্যন্ত প্রিয়।ওরা ভালোবেসে ভালো থাকুক,এটা আমি মন থেকে চাই।

কৌশিক সঞ্জুর কাঁধে হাত রাখল,তোকে হার্ট করে দিলাম না?স্যরি দোস্ত।

সঞ্জু যেন ব্যাপারটা হেসে উড়িয়ে দিল,আরে ছাড় ইয়ার!আচ্ছা একটা কথা বল তো,বাপ্পির পাশে যাকেই দেখবি তাকেই তোর গে মনে হয়।এটার কারন কি বল তো?

কৌশিক হেসে দিল।সঞ্জু থামল না,শোন,কৌশিক।তোর আর বাপ্পির ব্যাপারটা একমাত্র আমি জানি।এখানে এমন কোন অ্যাটিচিউড দেখাবি না যাতে লোকের চোখে পড়ে।আর অহন সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে।ওর ব্যাপারে অন্তত এই মনোভাবটা আনিস না।টুটুল সেটা ভালো চোখে নিবে না।হাজার হোক ওরা কাজিন।

কৌশিক অন্যমনস্ক হয়ে বলল,আসলে দোস্ত।বাপ্পি বড় ঘরের ছেলে।বাবার টাকা আছে।রুপবান।আমি তো ওর আধাঅধিও নয়।তাই আমার থেকে বেটার অপশন ওর পাশে দেখলে মনটা কেমন জানি করে উঠে।

সঞ্জু কৌশিকের কাঁধে চাপ দিল,অহনকে নিয়ে ভাবিস না।ছোট্ট একটা ছেলে।আয় না,আমরা যা করছিলাম!করি।

বাপ্পি এবার তাকাল,সঞ্জু,তোরা ফিসফাস করে কি বলাবলি করছিস?আমাকেও বল,শুনি।

সঞ্জু রহস্যের হাসি দিল,আমাদের ফিসফাস শুনে তোর কি লাভ হবে,ভাই?যা করলে লাভ হবে সেটা কর না।

কৌশিকের দিকে ইশারা করে সঞ্জু আবার বলল,তবে এক্সেস নয়।এদিকে খেয়াল রাখিস।না হলে রাতে মাইর একটাও মাটিতে পড়বে না।

কথাটা বলে সঞ্জু মুচকি হেসে কৌশিকের মাথাটা ধরে নিচু করে ল্যাপটপের ভিডিও প্লে করলো।

বাপ্পি একটা ফিকে হাসি দিল।

অহন প্রশ্ন করল,কি হয়েছে,বাপ্পি ভাইয়া?কি বললেন উনি?

বাপ্পি ফিকে হাসির শেষ রেখা ঠোঁটে টেনে এনে বলল,ও কিছু না।ওরা এমনই।তুমি পিকগুলো দেখো না।সুন্দর লাগছে না।

অহন প্রায় নিঃশব্দে বলল,হুম।সুন্দর হয়েছে।

———————————————————————-

(তৃতীয় পর্ব)

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>> 

বিঃদ্রঃ তোমার একটিমাত্র জীবন যদি প্রেমহীন থেকে যায়,শর্তহীন দলিলে যদি কোন বিবাদীর নাম লেখা না থাকে,অনাবিষ্কৃত ভালোলাগা যদি তোমার ঠোঁটের আঙ্গিনায় বিরহ না জাগায়,একটিমাত্র জীবনে তুমি যদি কলঙ্ক এর সুখই না পেলে-তবে তুমি…!তবে তুমি আমার গল্প পড়ো না।

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>> 

পাঁচ।

টুশিকে হলুদ মঞ্চে আনতে রাত আটটা বেজে গেলো।টুশিকে সাজানোর দায়িত্ব নিয়েছিলো তমা।শহুরে মডার্ন মেয়ে।সাদামাটা গ্রামের টুশিকে পরীর মতো সাজিয়েছে।টুটুল অবাক হয়ে গেছে।সঙ্গে যেন খুশির ঝিলিক খেলা করছে ঠোঁটে।মাসুমা মেয়েকে দেখে প্রায় কেঁদে ফেললেন।কি রুপ বেরিয়েছে তার মেয়ের।মাত্র তো ক’দিন হলো টুশি তার কোল ছেড়েছে।তার সেই বালিকা মেয়ের বিয়ে।বড্ড তাড়াতাড়ি বড় হয়ে গেল মেয়েটি।

টুটুল তমা কে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলল,খুব সুন্দর সাজানো হয়েছে বোনকে।

তমা লজ্জার লেশ মাত্র চোখে রাখল না,মির্জাবাড়িতে যখন আসতে হবে।সবার মন জয় করার কৌশলটাও তো জানতে হবে।রাই বাঘিনী নন্দিনীকে আগে কাবু করলাম।

টুটুল হেসে দিল,তোমার বরং আর ফিরে কাজ নেই।আম্মুকে রাজি করে এখানে থেকে যাও।

তমা টুটুলের থুতনিতে হাত রেখে বলল,আমার ক্যাবলাকান্ত,চশমাওয়ালা বই পড়ুয়া প্রেমিকটা দেখি বই ছাড়া যে আরো কিছু পারে।আমি তো জানতামই না।

সঞ্জু কাশি দিল,টুটুল দোস্ত,প্রেম পিরিত পরে করিস।পিছনে তাকিয়ে দেখ,বড় আঙ্কেল আসছে।

টুটুল আর তমা দু’জনে নড়েচড়ে দাঁড়াল।শফিক সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন,তমা মা,তোমাদের কোন অসুবিধা হচ্ছে না তো?

তমা ফিকে হাসি দিল,না আঙ্কেল।কোন অসুবিধা হচ্ছে না।

শফিক সাহেব বললেন,কিছু লাগলে কিন্তু তোমার বড় আন্টিকে বলো।কার্পণ্য করো না।

তমা মাথা নাড়াল।শফিক সাহেব চলে গেলে সঞ্জু বলল,আহা!কত আদর বউমার।আমরাও তো আছি নাকি?টুটুল,আঙ্কেল কি আমাদের দেখে নি?

টুটুল বলল,তুই একটু বেশি কথা বলিস।

সঞ্জু তমাকে ঠাট্টার ইঙ্গিত করল,আঙ্কেল আঙ্কেল না করে আব্বু বললে তো পারতিস,তমা মির্জা?

তমা বাধা দিল,মির্জা এখনো হয় নি।সো ডোন্ট বি জোকস টু কল তমা মির্জা।

তারপর তমা যেতে গিয়ে সঞ্জুকে ধাক্কা দিয়ে বলল,যা সর,গিট্টু।

সঞ্জু টুটুলের দিকে তাকিয়ে অভিযোগ করল,দেখলি কিভাবে গায়ে এসে পড়ে!

টুটুল ভ্রু কুঁচকে বলল,তুই কম যাস না!

সঞ্জু কথায় জোর দিল,বাহ,সব আমার দোষ এখন।তুই বড্ড সেলফিশ ইয়ার।

আসলে সঞ্জু একটু খাটো।বন্ধুরা তাই মজা করে গিট্টু বলে ডাকে।কারোর ডাকায় সঞ্জুর মন খারাপ হয় না।কেবলমাত্র তমা গিট্টু বললে তার বুকে গিয়ে যেন তীর বিঁধে।

আজ তমা সবুজ রংয়ের সিল্কের শাড়ি পরেছে।ম্যাচিং ব্লাউজ।কপালে লাল টিপ।খোঁপায় রজনীগন্ধার মালা।সঞ্জুর চোখে তাকে অপ্সরার মতো লাগছে।সঞ্জু ভাবে,টুটুলের চশমার নিচের সরল দু’টি চোখ কি এমন সৌন্দর্য দেখতে পায়?

সারাদিনে হৃদয়ের দেখা একবারও মেলে নি এদের মাঝে।সারাবাড়ি কাজে দৌড়াদৌড়ি করেছে।সন্ধ্যার আগে উদয়কে খাইয়ে জয়নাল ভাইকে দিয়ে তাকে বাড়িতে পাঠিয়েছে।বেশি রাত করে পাঠালে আসমা বেগম দ্বিগুণ চোটে যাবে।সারা গায়ে ঘাম তার।মিষ্টি রংয়ের একটা টিশার্ট এমন ভাবে ঘামে ভিজেছে যে স্ব-রংয়ের অস্তিত্ব হারিয়েছে।জিন্স প্যান্টে প্রচুর গরম লাগছিলো।সেটা খুলে রফিকের একটা লুঙ্গি পরেছে।কপালে পরিশ্রমের বিন্দু বিন্দু ঘাম।মির্জাবাড়ির সজ্জিত আলোর প্রতিবিম্ব তার কপাল জুড়ে যেন মুক্তার চুমকি বসিয়েছে।তার দু’টি চোখ অহনকে খু্ঁজছে।অহনার হাত ধরে সে হলুদ মঞ্চের দিকে এলো।

তমা অহনাকে দেখে নিচু হয়ে বলল,ও বাবা,আমাদের অহনা মনিকে তো পরীর মতো লাগছে।কে সাজিয়ে দিলো?

অহনা মিষ্টি করে বলল,আমার প্রিয়া আপু।

অহনার বয়স কেবল সাত।কিন্তু মুখে কথার খই ফোটে সারাক্ষণ।উদয় চলে যাওয়ার পর হৃদয়কে বিশবারের মতো প্রশ্ন করা হয়ে গেছে,উদয় কাল আসবে কি না?আজ কেন চলে গেলো,হৃদয় ভাইয়া।তুমি তো চলে যাওনি।

তমা তার থুতনিতে হাত রাখল,প্রিয়া আপু কে?

অহনা যেন হেসে কুটিকুটি,বলল,টুশি আপুর বান্ধবী তো।ওমা তুমি চেনো না?হেহেহে।

হৃদয় বলল,শোনো,ছোট আপু,উনি তো এ বাড়িতে নতুন।উনি সবাইকে কিভাবে চিনবে বলো?

অহনা বলল,তা ঠিক।আচ্ছা আমি তোমাকে সবার সাথে দেখা করিয়ে দিবো।কেমন?

তমা অভিভূত হাসি দিল,ওকে।তাই দিও।এখন এসো আমরা প্যান্ডেলে যাই।

অহনা হৃদয়ের কাছে অনুমতি চাইল,হৃদয় ভাইয়া।যাবো তো মিষ্টি আপুর সাথে?

হৃদয় বলল,ওকে যাও,ছোট আপু।দুষ্টুমি করো না।আপুকে বেশি জ্বালিও না।

অহনা হৃদয়ের হাত ছেড়ে তমার হাত ধরল।হৃদয় বলল,সম্পর্কে কি হন তা তো জানি না।আপনি কি অহনকে দেখেছেন?

তমা ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল,তুমি এ বাড়ির কে?আই মিন আমি তো সবাইকে চিনি না।

অহনা বলল,ওমা তুমি জানো না বুঝি?ঐ তো আমাদের হৃদয় ভাইয়া।

তমা হেসে বলল,ওমা তাই বুঝি।তোমাদেরর ভাইয়া।

তমা হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,তুমি অহনের বড় জন?আই ওয়ান্ট টু সে আমি যতদূর জানি,অহনরা তো দুই ভাইবোন।তাই প্রশ্নটা করলাম।ডোন্ট মাইন্ড প্লিজ।

হৃদয় যেন নিজেকে বিদ্রুপের হাসি উপহার দিল,বলল,আসলে আমি এ বাড়ির কেউ না।অহনার আম্মু আমার মায়ের বান্ধবী ছিলো!

তমা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,ছিলো মানে?

হৃদয় বলল,আসলে আম্মু বেঁচে নেই।

তমা হতাশ ভাব প্রকাশ করল,সো স্যাড।তাও তো সম্পর্ক একটা আছে।এ বাড়ির কেউ না বলছো কেন?

হৃদয় মনে মনে বলল,এ বাড়ির সঙ্গে আমার নাড়ির টান।যে টান পৃথিবীর অন্যকিছুর জন্য নেই।

মুখে বলল,হ্যাঁ,সম্পর্ক তো আছে।

তমা প্যান্ডেলের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে আঙ্গুলে ইশারা করে বলল,ঐখানে দেখো একটা ছেলে ক্যামেরা হাতে চেয়ারে বসে আছে।ফর্সা মতো।তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করো ভাই।ওর কাছে বসেছিলো।তবে অনেকক্ষণ দেখছি না।

হৃদয় এগিয়ে গেলো।

বড় প্যান্ডেল সাজানো হয়েছে বকুলতলার নিচ উঠানে।দেড়শত এর মতো চেয়ার পড়েছে।সামনে সামান্য উঁচু করে স্টেজ করা হয়েছে।সেখানে টুশিকে বসানো হয়েছে।টুশির পাশে তার একগাদা বান্ধবী।গার্লস কলেজে পড়ে।ছেলে বন্ধু কেউ নেই।মির্জাবাড়ি যেন আজ আলোকময়ী তারকাজ্যোতি।

হৃদয় হেটে গিয়ে বাপ্পিকে জিজ্ঞাসা করল,ভাইয়া,অহনকে দেখেছেন?বলতে পারবেন ও কোথায়?

কৌশিক আর সঞ্জু পরবর্তী দুটি চেয়ারে পাশাপাশি বসে আছে।সঞ্জু বলল,মোবাইলে কথা বলছে বোধহয় স্টেজের পিছনে দাঁড়িয়ে।তুমি যাও।

সঞ্জুর কথা শেষ হতে না হতে অহন জিন্স প্যান্টের পকেটে মোবাইল ঢুকাতে ঢুকাতে এসে দাঁড়াল।

বাপ্পি তাকে বলল,অহন,এই ভাইটা তোমাকে খুঁজছে!কে?তোমাদের আত্মীয়?

অহন একবার হাসল।তারপর হৃদয়কে ইশারা করল।হৃদয় দূরে গিয়ে অহনের কাছে দাঁড়াতেই বলল,আপনি অদ্ভুতভাবে সেজেছেন কেন?লুঙ্গি পরতে কে বলেছে আপনাকে?গাইয়া ক্ষ্যাতের মতো লাগছে।ওনাদের কাছে গিয়ে আবার আমার খোঁজ করছেন।ওনারা কে জানেন?টুটুল ভাইয়ার বন্ধুরা।টুটুল ভাইয়া জানলে আস্ত রাখবে আপনাকে?ফকির কোথাকার।

হৃদয় কথাগুলো শুনলো।কোন প্রতিবাদের প্রয়োজন মনে হলো না তার যুক্তিতে।আসলেই তো,এমন ক্ষ্যাত বেশে ওনাদের সামনে যাওয়া তার ঠিক হয়নি।ওনারা তো জিজ্ঞাসা করল,আমি কে?অহন কি পরিচয় দিবে আমার?শুধু অহনকে কেবল তার বলা হয়ে উঠে না যে তার এই একটা মাত্র টিশার্ট কেবল একটু ভালো আছে।বাকিগুলো বেশ পুরানো।একটা মাত্র জিন্স প্যান্টে তার দুইটা বছর কেটে যাচ্ছে।এসএসসি পরীক্ষায় তার আব্বু চুরি করে কিনে দিয়েছিল।যদিও পরবর্তীতে অনেক কথা শুনতে হয়েছিল হৃদয়কে আসমা বেগমের কাছে।সাদেক সাহেব তখন নির্বাক হয়ে ছিলো।কলেজ ড্রেসটাও বেশ পুরানো।কলেজ ড্রেস পরে তো আর বিয়ে বাড়ি ঘোরা চলে না।

হৃদয় সামান্য হেসে বলল,আসলে গরম লাগছিল তো,তাই প্যান্টটা খুলে রেখে ছোটকার একটা লুঙ্গি পরলাম।

অহন বলল,শোনেন,হয়েছে।অতো কৈফিয়ত কেউ চাচ্ছে না।বিরক্তিকর।

হৃদয় বলল,না।তা হবে কেন?কৈফিয়ত না চাইলেও আমি বললাম।

অহন অধৈর্য হলো,শোনেন,আগ বাড়িয়ে কিছু বলার দরকার নেই।অন্তত আমার সামনে।যত আগ বাড়ানো কথা।অসহ্য।অপ্রয়োজনীয় বকবক যতসব।এসব আপনার সইমার কাছে করবেন।সে বোধহয় অখুশি হবে না।

হৃদয় অস্পষ্ট সুরে বলল,বাপরে,কিছু বললেও জ্বালা,না বললেও জ্বালা।কোন পথে হাটি।

অহন দ্বিধাভরে বলল,কিছু বললেন?

হৃদয় বলল,কিছু না।আসলে সইমা পাঠালো।

অহন সম্মতি দিল,ওহ হ্যাঁ।কিসের জন্য খুঁজছিলেন এবার বলুন!

হৃদয় লুঙ্গি সামলে বলল,সইমা জিজ্ঞাসা করতে বলল টুটুল ভাইয়ার দু’টো হিন্দু বন্ধু এসেছেন না,ওনাদের জন্য ভিতর বাড়ির পাকঘরে যে রাঁন্না হয়েছে।সেটা কি এখন খাবেন ওনারা?দুপুরে তো তেমন খেলেন না।

অহন বিরক্তি নিয়ে বলল,অসহ্য!তো এ কথা আমাকে জিজ্ঞাসা করছেন কেন?টুটুল ভাইয়াকে বলুন গিয়ে।

হৃদয় লুঙ্গির খোলা গিট টাইট করতে করতে বলল,টুটু্ল ভাইয়া তো ওনার সামনে যেতে মানা করলো।তাই আর কি…!

অহন কপাল কুঁচকালো,সরুন তো।এমন বিশ্রীভাবে আমার সামনে লুঙ্গি ঠিক করবেন না।বিরক্তিকর।আচ্ছা আমি দেখছি।

অহন প্যান্ডেলের ভিতরে গিয়ে বলল,কৌশিক দাদা আর সঞ্জু দাদা,আম্মু আপনাদের ভিতর বাড়ি খাওয়ার জন্য ডেকে পাঠিয়েছে।আপনারা কি এখন খাবেন?নাকি পরে খাবেন!

কৌশিক বলল,অহন,অনুষ্ঠান তো শুরু হয়ে যাবে।আমরা বরং অনুষ্ঠানের পরে খাই।তুমি আন্টিকে বলে দাও।

‘আচ্ছা’ বলে অহন ফিরে এসে হৃদয়কে বলল,আম্মুকে বলুন ওনারা অনুষ্ঠানের পরে খাবেন।

হৃদয় মাথা নেড়ে চলে গেল।

নীল-সাদা সমন্বয় হালকা রংয়ের পাঞ্জেবীতে অহন কে সুন্দর লাগছে।যেন শরতের এক টুকরো শুভ্র মেঘময় আকাশ।অালোকসজ্জার আলোআঁধারি ধারা যখন অহনের মুখে খেলা করছিল,তখন হৃদয় দেখেছে সে রুপ।বড় সুন্দর অবময়।

হৃদয় পাকঘরে এসে বলল,সইমা,ওনারা বলছেন,ওনারা অনুষ্ঠানের পরে খাবেন।

রেবেকা বলল,ঠিক আছে।তুই যা।আচ্ছা দুপুরে তোর রাজপুত্র খেয়েছিলো?

হৃদয় বলল,হ্যাঁ,টুটুল ভাইয়ার বাকি দুই বন্ধুর সাথে খেয়েছিলো।

রেবেকা প্রশ্ন করল,তুই কি আর কিছু খাবি?

হৃদয় মুখে অদ্ভুদ শব্দ করল,না সইমা।পেট ফেটে যাচ্ছে,দেখো।রাতে আমি আর কিছু খাবো না।অনুষ্ঠানের পর সকল মেহমান-দাওয়াতিদের খাইয়ে আমি বাড়ি যাবো।

রেবেকা আপত্তি জানালো,পাগল হয়েছিস?রাতে বাড়ি গিয়ে কাজ নেই।এখানে থেকে যা।সেই তো কাল আবার আসতে হবে।তাছাড়া অনেক রাত হয়ে যাবে সব শেষ হতে।অতো রাতে আমি ছাড়তে পারবো না।

হৃদয় সজল নয়নে বলল,কিন্তু আমি না গেলে উদয়কে আর আসতে দিবে না।

রেবেকা বলল,সে চিন্তা আমার।আমি সাদেক ভাইজানকে ফোন করেছিলাম।উনি কাল আসবে উদয়কে নিয়ে যে করেই হোক।কথা দিয়েছেন।তোর সৎমা,আসমা বেগম ঝামেলা না করলে তাকেও বলতাম।আসলেও পরে দেখা যাবে তোকে নিয়ে অশান্তি করছে এ বাড়িতেও।তখন আমার কথা শুনতে হবে বাড়ির লোকের কাছে।

হৃদয় বলল,ভালো করেছো।উদয় কাল আসলে আমি যাবো না।রাতে থেকে যাবো।

রেবেকা বলল,হুম তাই কর।এই শোন যাস না।

হৃদয় ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল,কিছু বললে।ছোটকা খু্ঁজছিল তখন,শর্মি ফুপি বলল।আচ্ছা শর্মি ফুপি কই?অনেকক্ষণ দেখছি না।

রেবেকা জানালো,শর্মি আর তোর বড়মা আম্মার ঘরে।আম্মার বাতের ব্যথা বেড়েছে।ছ্যাঁক দিচ্ছে।

হৃদয় বলল,আমি যাবো দাদির কাছে?

রেবেকা বাঁধা দিল,না বাপ।তুই গেলে আবার ক্ষেপে যাবে।বুঝিস না কেন হৃদয়?যারা তোকে পছন্দ করে না।তাদের সামনে কম যাবি।

হৃদয় ঘাড় নাড়াল,আচ্ছা,বুঝছি তো।কি বলতে চেয়েছিলে বলো।

রেবেকা কোন ভূমিকা ছাড়া বলল,তোদের দু’ভাইয়ের জন্য দু’টো নক্সী কালারের পাঞ্জেবী কিনেছি।তোর রাজপুত্রকে বললাম।কোন কথা তো বলছে না আমার সঙ্গে।শুধু বলল বিয়ের দিন পরবে।তুই কি এখন অনুষ্ঠানে পরবি?না কাল পরবি?

হৃদয় বলল,সইমা,এখন আর পরবো না।দেখো,ঘেমে নেয়ে গেছি।কাল না হয় পরবো।

পরক্ষণে হৃদয় বলল,রাজপুত্রকে তো বোধহয় নতুন পাঞ্জেবী একটা পরা দেখলাম।

রেবেকা বসা থেকে উঠে দাঁড়াল।কাজের মহিলাটির দিকে তাকিয়ে বলল,আয়েশা,মাছের কালিয়াটা হলে নামিয়ে রাখ।

আয়েশা প্রত্যুত্তরে মাথা নাড়াল।রেবেকা হৃদয়ের কাছে এসে বলল,হ্যাঁ।তোর মেজকা এনেছে আজ।

হৃদয় অবিশ্বাসভাবে বলল,মেজকা এসেছে?কই দেখা তো হলো না।তুমি না বললে কাল আসবে!ছুটি পায় নি আজ।

রেবেকা বলল,চল বলছি।

তারপর বলল,ম্যানেজ করে এসেছে বলল।তোর খোঁজ করছিলো।তখন তুই গঞ্জে ছিলি।

হৃদয় আপত্তি করল,তারপর এলে বললে না কেন?

রেবেকা হাসল,হয়েছে বাপ,এতো ঝামেলায় মনে থাকে?লোকজনের ভিড় কমুক।দেখা করে নিস।

হৃদয় বলল,আচ্ছা,আমি তাহলে ছোটকার খোঁজে যাই।ডেকেছিলো একবার।

ছয়।

মাসুমা এসে টুশিকে হলুদ মেখে,খির খাওয়ানোর পর একে একে সবাই পর্বটা শেষ করলো।

শর্মি স্টেজ থেকে নেমে লোক সমেত চেয়ার সরিয়ে স্টেজের সামনের জায়গাটুকু খালি করলো।তারপর অহনের কাছে যেয়ে বলল,নে চল।

অহন যেন অবাক হলো,কই যাবো?

শর্মি হাত ধরে চেয়ার থেকে তুলল,ন্যাকামো করিস না।নাচবি চল।

অহন হাত ছাড়িয়ে বলল,ফুপি।ইয়ার্কি মেরো না।ভাড়া করে সিঙ্গার আনছে ছোট কাকা।গান শোনো।

টুটুল আর তমা পাশাপাশি বসেছিল।অহনা তমার পাশের চেয়ারে বসে তমার গায়ে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে গেছে।শর্মি টুটুলের দিকে তাকাল,তুই একটু বল না,টুটুল।

টুটুল চোখের চশমা ঠিক করল,তুই বলছিস তাতে না হলে আমি কি বলবো?

শর্মি সম্পর্কে টুটুলের ফুপি হলেও সমবয়সী হওয়ায় টুটুল তাকে তুই-তুকারি করে বলে।আরব মির্জার বড় ছেলে শফিকের বউ মাসুমা গর্ভবতী হলে অর্ধবয়সী জাহানারা শেষবার একমাত্র মেয়ের মা হলেন।রফিকের বয়স তখন সবে দশ কি বারো।

শর্মি বাপ্পির দিকে তাকিয়ে বলল,তুমি একটু বলো তো বাপ!তোমরা আসার পর থেকে তো দেখছি তোমার সঙ্গে বেশ মাখামাখি অহনের।

কথাটা শুনে কৌশিক আড়চোখে বাপ্পির দিকে তাকালো।বাপ্পি ঢোঁক গিলে কপালে-চোখে আসা হালকা বাদামী চুল বাম হাতের পাঁচ আঙ্গুল দিয়ে ঠিক করে বলল,আমি?

শর্মি মাথা নাড়ল,হুম বলো তো।

সঞ্জু বলল,ফুপি।বাপ্পিও দারুন ড্যান্স করে।গ্রুপ ড্যান্স হয়ে যাক।

বাপ্পির দিকে তাকাল শর্মি,তুমিও করো।তাহলে ও নাচবে।

কৌশিক হেসে বলল,যাও।ভয় নেই।তুমি সুন্দর ড্যান্স পারো তো।

বাপ্পি কৌশিকের কানের কাছে মুখ নিল,পরে আবার রাতে রস উঠাবে না তো?

কৌশিক দাঁত চেপে বলল,এসে থেকে কম কিছু করো নি।দেখছি তো।এখন ঢঙ করো না,যাও।

বাপ্পি উঠে দাঁড়াল।বলল,অহন কোন মিউজিকটা দিবে বলো তো।

অহন উঠে দাঁড়াল,হিন্দি।পারবেন তো?

বাপ্পি বলল,হুম।চলবে।

হৃদয় লুঙ্গি ছেড়ে আবার জিন্স প্যান্ট পরে এসে প্যান্ডেলের শেষপ্রান্তে দাঁড়াল।ড্যান্স শুরুর পর হৃদয় মুগ্ধ হয়ে গেল।অহনের ড্যান্সের প্রতিটি স্টেপ মনোরথ।দু’একটা স্টেপে বাপ্পি অহনকে ধরে স্টেপ ওভার করছে।কৌশিক সেই মুহূর্তে আনমনা হয়ে যাচ্ছে।সঞ্জু কৌশিকের কাঁধে হাত রেখে চোখের ইশারা করল,বি রিলাক্স।ইট’স জাস্ট ড্যান্স।সো ডোন্ট বি মুভ অন অ্যাটিচিউড।

কৌশিক সম্মতিতে চোখ বুজে ইশারায় বুঝাল,সে ঠিক আছে।

ড্যান্স শেষে করতালি পড়ল।

অহন বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলে এসে চেয়ারে বসল।বাপ্পি এসে বসেই প্রশংসায় পঞ্চমুখ,ওয়াও।তুমি তো অল ওভার পারফেক্ট।ড্যান্স শিখেছিলে কোথাও?

অহন বলল,ঐ আম্মু শিখিয়েছে একটুআধটু।

বাপ্পি তাজ্জব বনে গেল,সো নাইস ইয়ার।আন্টি ড্যান্স পারে?

অহন জানালো,বিয়ের আগে আম্মু শিখতো।এ বাড়িতে এসে আর দাদার ভয়ে করতে পারে নি।

অহন পুনরায় বলল,আপনি কোথা থেকে শিখলেন?

বাপ্পি জানাল,মেডিকেল কলেজের পাশে একটা ড্যান্স ক্লাব আছে।শখ ছিল ছোটবেলা থেকে,তাই আর কি ভর্তি হয়েছিলাম।বাট মাসখানেক করার পর স্টাডির চাপে ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলাম।দেখলে না কিছু কিছু স্টেপে তোমার হেল্প নিলাম।

অহন বলল,ইট’স ওকে।তবুও ভালো করেছেন।

বাপ্পি রুমাল বের করে ঘাম মুছে বলল,তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।বিশেষ করে তোমার চোখ দু’টো।

অহন চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে বলল,থ্যাংকস,বাপ্পি ভাইয়া।

টুশিকে তার বান্ধবীরা উঠিয়ে ভিতর বাড়ি নিয়ে গেলো।গায়ের ছেলেরা কি সব করে না করে।এতগুলো মেয়ে।অহনের বাবা,বরকত সাহেব আইনের লোক।কোন অন্যায় সহ্য করবেন না।তিনি অনেক ভেবে মেয়েছেলেদের বাড়ির ভিতর পাঠালেন।টুটুল অহনাকে কোলে করে তমাকে নিয়ে ভিতরে গেলেন।এখন পুরো প্যান্ডেলে গায়ের ছেলেসহ এ বাড়ির দাওয়াতি ছেলে-পুরুষেরা।স্টেজে নতুন কণ্ঠস্বর শোনা গেল।রফিকের বন্ধু।আদনান।স্ত্রী-পুত্র নিয়ে বিয়েতে এসেছেন।তিনি ঘোষণা করলেন,এবার গান শুরু হবে।মেয়েদের জন্য ভিতরবাড়ি সাইন্ড বক্স দেওয়া হয়েছে একটা।সুতরাং কোন সমস্যা আছে কি?

সকলে চেঁচিয়ে উঠল,না নেই।

রাধানগরের শম্বু বয়াতি উঠল প্রথমে মঞ্চে।তারপর উঠবেন সব মডার্ন শিল্পীরা।

অহন বলল,বাপ্পি ভাইয়া,আমিও যাই।প্রচুর হেড পেইন হচ্ছে।শোরগোলে আরো বাড়বে।আপনারা থাকেন।

বাপ্পি বলল,চলো আমিও যাচ্ছি।আমারও ভালো লাগছে না।

কৌশিক বাপ্পির হাত চেপে ধরল।বাপ্পি আমতাআমতা করে বলল,অহন,তুমি যাও তাহলে আমি পরে আসছি।

অহন বলল,ইট’স ওকে।গান শেষ করে আসেন।

হৃদয় প্যান্ডেলের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিলো তখনও।অহন তাকে ক্রস করার সময় অহনের হাতটা ধরে বসল।অহন ঘুরে দাঁড়াতেই ডান হাতে রাখা হলুদ,তর্জনী আঙ্গুল দিয়ে অহনের গালে লাগিয়ে দিল।

অহন চিৎকার করে উঠল,ঐ কুত্তার বাচ্চা।তোর সাহস হয় কেমনে আমাকে টাচ করার।

বলেই সজোরে চড় বসিয়ে দিল হৃদয়ের বাম গালে।

হৃদয় হতবাক হয়ে গেল।কি হলো ব্যাপারটা।প্যান্ডেলে শেষে থাকা লোকগুলো অহনের চিৎকারে ফিরে তাকাল।তখনও গান শুরু হয় নি।বাপ্পি,কৌশিক,সঞ্জু দ্রুত উঠে এলো।বরকত সাহেব এসেই হৃদয়ের টিশার্ট খামচে ধরলো।তারপর চুল মুষ্টি করে ধরে মুখে অবিরাম চড় ঘুষি বসিয়ে যাচ্ছে,কি করেছিস আমার ছেলেকে?বল।

বাপ্পি এগিয়ে এসে ছাড়াল,আঙ্কেল।বি কুল।হোয়াট হ্যাপেন?আগে তো শুনুন অহনের কাছে।কারনটা তো আমরা কেউ জানি না।আপনার ব্যাপারটা শোনা উচিত।তারপর না হয় ছেলেটাকে শাস্তি দিন।

বরকত সাহেব রেগে গেল,তুমি আমাকে শেখাবে?আমি কি করবো?ওই বদমাইশ কিছু না করলে আমার ছেলে চিৎকার করলো কেন?

সঞ্জু বলল,আঙ্কেল,আমরা মানছি।কিন্তু আগে তো শোনা উচিত।

কৌশিক যেন পাথর হয়ে গেল।কি হচ্ছে এসব।

শোরগোলের আওয়াজ শুনে শর্মি দৌড়ে এলো।এসেই হৃদয়কে জড়িয়ে ধরলো।হৃদয় পড়ে যাচ্ছিল।শর্মির কাঁধের উপর অজ্ঞান হয়ে গেলো সে।নাক মুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে।

শর্মি কাঁদোকাঁদো হয়ে বলল,হয়েছেটা কি কেউ কি আমাকে বলবে?

বরকত সাহেব চেঁচিয়ে উঠল,তোকে কে বাইরে আসতে বললো?এতো সাহস কেন তোর?ঐ বদমাইশের কাছে শোন ও আমার ছেলের সাথে কি করেছে।

শর্মি বলল,মেজো ভাই,তুমিই শোনো তোমার গুণধর ছেলের কাছে।

শর্মি অহনের দিকে তাকিয়ে বলল,ঐ কি এমন করেছে তোকে ও?

অহন তখনই ফুঁপিয়ে যাচ্ছে রাগে।দাঁত চেপে বলল,ওর কত বড় কলিজা।আমার গায়ে হাত দেয়।আমার গালে একগাদা হলুদ মাখিয়েছে।

শর্মি অবাক হয়ে যায়।বলল,একটু হলুদই তো।এসিড তো ঢেলে দেয় নি।তাই বলে তুই এমন কান্ড করবি?

বাপ্পির দিকে তাকিয়ে শর্মি বলল,তুমি একটু ধরো তো,বাপ,ওকে ঘরের ভিতর নিয়ে যায়।

বরকত সাহেব শাসালেন,খবরদার ওকে যদি ভিতর বাড়ি নিয়েছিস।এখন তোর মেজো ভাবির আধিক্যেতা দেখার মুড নেই আমার।সো বি এলার্ট।

শর্মি সঞ্জুর দিকে তাকিয়ে বলল,তুমি একটু জয়নালকে খু্ঁজে দেখো তো।কাছারিঘরে নিয়ে যাই তাহলে।

জয়নালকে খোঁজা লাগলো না।সে দ্রুত ছুটে এলো কোথা থেকে।শর্মির সঙ্গে হৃদয়কে ধরলো।

বরকত সাহেব শর্মির হাত ধরে বসল,তুই বাড়ির বাইরে বেরুবি না।ঘরে চল।

শর্মি বাপ্পির দিকে তাকিয়ে বলল,তুমি একটু যাও বাপ,জয়নালের সঙ্গে।

বাপ্পি তড়িঘড়ি করে শর্মিকে সরিয়ে হৃদয়কে ধরলো।বরকত সাহেব শর্মিকে বলল,তোর ভাবি যেন এতো রাতে উঠানভর্তি লোকের সামনে না আসে বলে দিলাম।

শর্মি দৌড়ে ভিতরবাড়ি চলে গেল।অহন তার পিছু পিছু গেল।বাপ্পি হৃদয়কে নিয়ে জয়নালের সঙ্গে কাছারিঘরে গেলো।

কৌশিক আর সঞ্জু তাদের অনুসরণ করলো।

বরকত সাহেব লোকেদের দিকে তাকিয়ে বলল,কি দেখছেন?নাটক হচ্ছে এখানে?গান শুরু হয়েছে।নিজেদের কাজ করুন আপনারা।প্লিজ।

সারারাত জ্বরে বেহুশ হয়ে থাকার পর ভোর রাতে ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে গেল।গায়ের উপর কাঁথা থাকায় ঘামটা বেশি হয়েছে।মির্জাবাড়ির কাছারিঘরে জয়নাল ভাই থাকে।তার সঙ্গে হৃদয় শুইয়েছিলো।জয়নাল ভাই রাত দু’টো অবধি মাথায় জলপট্টি দিয়েছে।তারপর সে নিজেও ঘুমিয়ে গিয়েছে।হৃদয় বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।দুর্বল লাগছে।স্বপ্নদোষ হয়েছে।পরপর দু’রাত হলো।জ্বরে পড়লে তার এটা রোজ হয়।প্রথম যেদিন স্বপ্নদোষ হলো।তের বছরে।হৃদয় ভীষণ অবাক হয়েছিলো।লজ্জাটা জেঁকে বসেছিলো।প্রতিদিন ভোরে মর্জিনা বিছানা ঠিক করতে আসে।সেদিন হৃদয় তাকে বিছানা গোছানোর সুযোগ দিলো না।নিজেই বিছানা পরিপাটি করে চাদরটা তুলে খাটের তলে ফেলে দিলো।নোংরা জায়গাটা সাবধানে লুঙ্গির ভাঁজে ফেলে ব্রাশ নিয়ে পুকুরপাড়ে গেলো।রহিম ভোরে উঠে গোসলে নেমে গেছে।হৃদয় পাড়ে বসে জিজ্ঞাসা করল,রহিম,তুই এতো ভোরে গোসল করছিস কেন?

রহিম ভণিতা না করে বলল,স্বপ্নদোষ হইছে বড় ভাইজান?

হৃদয় একটু ভেবে প্রশ্ন করল,সেটা কি?

রহিমের বরাবর লজ্জা কম।সোজা।সরল।বলল,রাইতে ঘুমির মধ্যি ধাতু ভেইঙ্গে লুঙ্গি নষ্ট হইছে!গা ঘিনঘিন কচ্ছে।তাই নেয়ে নিচ্ছি।

লজ্জায় হৃদয়ের মুখ রাঙা হয়ে গেল।বলল,তোর এসব রোজ রাতে হয়?

রহিম আরেকটা ডুব দিয়ে উঠে বলল,না,বড় ভাইজান।বছরখানেক আগে থেকে শুরু হইছে।মাঝে মধ্যি রাইতে হয়।

হৃদয় আর কথা বাড়াল না।কুলি করে মুখ ধুয়ে ঘরে চলে এলো।তারও গা ঘিনঘিন করছে।অপবিত্র লাগছে।রহিম কতকিছু বোঝে।সে বুঝল না।অথচ বয়স তাদের কাছাকাছি।রহিম পুকুর থেকে ফিরলে তাকেও গোসল করতে হবে।সবার অগোচরে।গোপনে।

আজ পাঁচ বছর পরেও লজ্জাটা একই রয়ে গেছে।ব্যাপারটাই স্বাভাবিকতা আসে নি।সে জয়নালের গামছাটা নিয়ে মির্জাবাড়ির পুকুরে গেলো।শান বাঁধানো পুকুর।বাড়ির সামনে।সারি সারি নাকিকেল গাছ।চারপাড়ে।পুকুর আর বাড়ির মাঝে পথচারীর চলাচলের জন্য কাঁচা রাস্তা।এ রাস্তা দিয়ে নাক বরাবর হেটে গেলে দারোগাকান্দির ছোট বাজার।তারপর ডানে পড়ে মাইলচারেক গেলে আরশিনগর বড় বাজার।হৃদয় গামছাটা সিঁড়িতে রেখে পুকুরে নেমে গেলো।

রেবেকা ঘোমটা টেনে এসে পুকুরের সমতল সিঁড়িতে দাঁড়াল।হৃদয়কে লক্ষ্য করে বলল,সারাবাড়ি খুঁজে এসে এখানে পেলাম।রাতে কোথায় শুয়েছিলি?

হৃদয় এবার সত্যি লজ্জা পেল।সইমা যদি জানতে চায়,এতো সকালে কেন গোসল করছি।কি বলবে সে।হৃদয় মুখে পানি মেরে বলল,জয়নাল ভাইয়ের কাছে।রাতে জ্বর এসেছিলো তো।ভোর রাতে ঘাম দিয়ে জ্বর চলে গেলো।গা ঘিনঘিন করছিলো তাই গোসলটা করে নিচ্ছি।

রেবেকা সে কথার জবাব দিলো না।হৃদয় ঠোঁটে জমা হওয়া রক্ত টান মেরে ‘আউছ’ শব্দ করে উঠল।রেবেকা মায়া কন্ঠে প্রশ্ন করল,বেশি লেগেছে?

হৃদয় হেসে দিল,না বেশি লাগে নি।অভ্যাস হয়ে গেছে।

হৃদয়ের গামছা রাখার পাশে রেবেকা এবার বসে পড়ল।তারপর বলল,আসমা তোকে এখনো মারে?

হৃদয় ঠোঁট-নাকের শুকনো রক্ত পরিষ্কার করতে করতে বলল,দু’বছর হলো হাতে মারা বাদ দিয়ে,ভাতে মারে।শেষবার মেরেছিল এসএসসি রেজাল্টের পর।

রেবেকা বলল,উঠে আয়।আমি গা ঢলে দিচ্ছি।

হৃদয় মাথা নাড়াল,না,সইমা।তুমি যাও।মেজকা রাগ করবে।আবার ঝামেলা বাধাবে।আমি চাই না আমাকে নিয়ে মির্জাবাড়িতে অশান্তি হোক।আমি কে বলো তো?বাইরের একটা ছেলে।এ বাড়ির জয়নাল ভাই আর আমার মাঝে কি কোন পার্থক্য আছে?

রেবেকা মুখে আঁচল চাপা দিল,এভাবে বলিস না বাপ?আমার কথা একবারও ভাবিস না?

হৃদয় বলল,মা তোমার কাছে আমাকে রেখে গেছিল বলে এ বাড়ি আজও আসি।না হলে…!

হৃদয় কথাটা শেষ না করে আবার বলল,যার নিজের বাড়িতে মূল্য নেই।তার অন্য বাড়িতে মূল্য আশা করা বেমানান।

রেবেকা বলল,তোর যা খুশি বল।আমি শুধু একটা কথা বলতে এসেছি,তুই আজকের দিনটা অন্তত থাক এ বাড়িতে।বিয়ের ঝামেলা মিটে গেলে আর আসিস না এ বাড়ি।

হৃদয় পানি থেকে উঠল,তুমি মানা করলে আমি আসবো না।এটা ভাবলে কিভাবে?তুমি যতদিন এ বাড়ি আছো,অন্তত বেঁচে আছো।ততদিন যত মার উষ্টা খাই।আমি আসবো।আর ভয় নেই,আমি আজ যাচ্ছি না।আব্বু উদয়কে নিয়ে আজ আসবে।দুপুরে ওদের খাওয়া হলে আমিও চলে যাবো।

রেবেকা গামছাটা তুলে বলল,মাথা নিচু কর।তুই তো দেখি আমার চেয়েও লম্বা হয়ে গেছিস।

হৃদয় মাথা নিচু করে দাঁড়াল।রেবেকা তার মাথা মুছতে মুছতে বলল,জয়নালের থেকে কিছু নিয়ে পরে নে।ঠান্ডা লেগে যাবে।শর্মিকে দিয়ে আমি পাঞ্জাবীটা পাঠিয়ে দেবো।সকালে পিছনবাড়িতে সবার জন্য খিচুড়ি হবে।খেয়ে নিস।

হৃদয় গামছাটা নিয়ে বলল,আচ্ছা,ঠিক আছে।তুমি এখন যাও।কেউ দেখে ফেলবে।

রেবেকা চলে যেতে গিয়ে ফিরে দাঁড়াল,আর শোন,তোর মেজকার সামনে পড়িস না।মানুষটা চাকরি করে।বেশিদিন তো থাকবে না।টুটুল,তোর রাজপুত্রও থাকবে না।তখন তুই এ বাড়ি আসিস।আমরা বাকিরা তো তোকে কম ভালোবাসি না।যদিও আম্মা…!

হৃদয় কথায় বাধা দিল,তুমি যাও,সইমা।তোমার হৃদয় বয়সে ছোট হলেও পরিবেশ পরিস্থিতিতে নিজেকে বড় করে নিয়েছে।অন্তত যারা আমাকে ভালোবাসে তাদের আবেগ-অনুভূতিটুকু বুঝি।

রেবেকা পা বাড়াল,যাই।সবার ঘুম ভেঙ্গে গেছে বোধহয়।চা করতে হবে।বড় বু উঠল কি না কে জানে!

রেবেকার গন্তব্যের পথে হৃদয় তাকিয়ে রইলো।তার সইমার প্রতিচ্ছবি কেমন ঝাপসা লাগছে।দু’চোখের দু’ফোঁটা জল টুক করে ঝরে পড়তেই তা পরিষ্কার হলো। ———————————————————————-

(চতুর্থ পর্ব)

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>> 

বিঃদ্রঃ তোমার একটিমাত্র জীবন যদি প্রেমহীন থেকে যায়,শর্তহীন দলিলে যদি কোন বিবাদীর নাম লেখা না থাকে,অনাবিষ্কৃত ভালোলাগা যদি তোমার ঠোঁটের আঙ্গিনায় বিরহ না জাগায়,একটিমাত্র জীবনে তুমি যদি কলঙ্ক এর সুখই না পেলে-তবে তুমি…!তবে তুমি আমার গল্প পড়ো না।

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>> 

সাত।

দাওয়াতিদের খাবার প্যান্ডেল হলুদ প্যান্ডেলের উল্টো দিকে করা হয়েছে।উত্তর পাশে।পুরুষ-মহিলা খাবার জায়গা আলাদা করা হয়েছে।প্যান্ডেলের মাঝে সেপারেশন দিয়ে।মহিলাদের তদারকি করছে গ্রামের পরিচিত ছেলেরা।এ বাড়ির আত্মীয়-স্বজনের ছেলেরা।পুরুষদের খাওয়াচ্ছে গফুর বাবুর্চির লোক।হৃদয় তাদের সঙ্গে।রফিকসহ দাওয়াতি কয়েকজন মুরুব্বি আত্মীয় মিলে মহিলা প্যান্ডেলের ছেলেদের দেখিয়ে দিচ্ছে।শফিক সাহেব বাবুর্চিখানার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।দক্ষিণ পাশের হলুদ প্যান্ডেলকে বরযাত্রীর আপ্যায়নে ব্যবস্থা করা হয়েছে।সেখানে রবকত সাহেব সুব্যবস্থা করেছেন।স্টেজে বরসহ তার বন্ধুদের বসতে দেওয়া হয়েছে।

টুশিকে আজ শহর থেকে বিউটিশিয়ান এনে সাজানো হয়েছে।সোনালি লেহেঙ্গার সঙ্গে স্বর্ণের অলংকারগুলো সুন্দর ম্যাচিং হয়েছে।বড় মোহনী লাগছে তাকে।অন্দরমহলে বিবাহ রেজিস্ট্রির সই নিতে আসলে টুশির কাঁন্না বেড়ে গেলো।শেষে রেবেকা মাসুমাকে ডেকে এনে মেয়ের পাশে বসালেন।তারপর অনেক বুঝিয়ে সই আদায় করা গেলো।মাসুমা টলমল চোখে তাকিয়ে রইল।তার বুকের ভিতর অতীতের চিত্র।তার এমন করে বিয়ে হয়নি।হিন্দু ঘরের মেয়ে মানসী থেকে সে মাসুমা হয়েছে।শফিক সাহেবের সাথে পালিয়ে এসেছিলেন।আরব মির্জা দ্বিমত থাকলেও শেষে মেনে নিয়েছিলেন।মানুষটি আজ নেই।এরপর পঁচিশটি বছর এই অন্দরেই কেটে গেল তার।আজও তার মেয়ের বিয়েতে পিতৃকুলের কেউ নেই।অথচ শৈশব-কৈশোর তার কেটেছে ব্রাহ্মণ যৌথপরিবারে।বহুল লোকের ছত্রছায়ায়।এখনো স্বপ্ন হয়ে ফিরে আসে দীঘলডাঙ্গার বড় চর।দূরে চলা রেললাইন কিংবা উড়ালপুলের বালু মাঠ।

তৃতীয় বৈঠকে অহনসহ টুটুল তার বন্ধুদের নিয়ে খেতে বসল।এর আগের দুই বৈঠকে সেপারেশন প্যান্ডেল মিলে হাজার দুয়েক খেয়েছে।তমা আধুনিক মডার্ন মেয়ে।সে এসে পুরুষ প্যান্ডেলে অহনদের সঙ্গে বসল।হৃদয় যে টেবিলের দায়িত্বে ছিল,প্যান্ডেলের একেবারে উত্তরপূর্ব কোণে।সেখানে গিয়ে তারা বসল।

হৃদয় রফিকের কাছে এসে বলল,ছোটকা।আমার টেবিলটা একটু চেঞ্জ করে দাও।

ভিড়ের মাঝে থেকেও রফিক জিজ্ঞাসা করল,কেন ও টেবিলে কারা বসেছে?

হৃদয় জানালো,অহন আর টুটুল ভাইয়া ওনার বন্ধুদের নিয়ে বসেছে।

রফিক বুঝে ফেলল ব্যাপার।বলল,দাঁড়া আমি দেখছি।

একজন কাউকে ডাকল,ঐ শান্ত।তুই হৃদয়ের টেবিলে যা।তোর টেবিলটা ওকে দে।

শান্ত মাথা নেড়ে উত্তরপূর্ব কোণের টেবিলে চলে গেল।

অহনের জন্য চেয়ার আগলে রেখেছিল বাপ্পি।অহন আনন্দ মনে বসল।কৌশিক গিয়ে বাপ্পিকে ডানে ফেলে সঞ্জুর পাশে দাঁড়াল।সঞ্জুকে ইশারা করল বাপ্পি,ওকে এখনটাই বসতে বল!

সঞ্জু বাপ্পির বামে একটা চেয়ার খালি রেখে বসেছে।কৌশিকের হাত ধরে বলল,ঘাড়ের উপর দাঁড়িয়ে না থেকে বোস।

কৌশিক সঞ্জুর ঘাড়ে চাপ দিল,তুই ওটাতে গিয়ে বোস।আমি তোরটাতে বসি।

সঞ্জু বলল,আজিব,আমারটাই বসবি কেন?যে জায়গা রেখেছে তার পাশে বোস।

তমা মোবাইলের স্ক্রিন থেকে চোখ তুলল।কৌশিকের দিকে লক্ষ্য করে বলল,মেয়েদের মতো নাটক করিস না,দোস্ত।ঠিকঠাক বোস।টেবিল না পুরলে খাবার সার্ভ করবে না।খুব ক্ষুধা লেগেছে,প্লিজ।তুই তো জানিস আমি ক্ষুধা সহ্য করতে পারি না।

কৌশিক বিদ্রুপ করল,ঢঙ করিস না।তুই যে না খেয়ে নেই,তা আমি জানি।টুটুল বাবুর্চিখানা থেকে চিকেন নিয়েছে,সেটা আমি দেখেছি।

টুটুল কেশে উঠল।চশমা ঠিক করতে করতে বলল,কৌশিক বাজে বকিস না।বোস তো।

বাপ্পি উঠে গিয়ে কৌশিকের পাশে দাঁড়াল।ফিসফিস করে বলল,কুশ,সিন ক্রিয়েট করো না,প্লিজ।তোমার যত অ্যাটিচিউড রাতে দেখিও।রাতে কাছে পাবে তো।

কৌশিক ঠোঁটের উপর হাত রেখে ধীরে ধীরে বলল,যাকে টেনে পাশে বসিয়েছো,তাকে নিয়ে খাও না।

বাপ্পি সেভাবেই বলল,কুশ,ডোন্ট বি সিরিয়াস।অহন ছোট মানুষ।তোমার আমার থেকে অনেক ছোট।তাছাড়া সবাই আমাদের মতো না।কাম অন কুশ।

বাপ্পি কৌশিকের হাত ধরে নিয়ে পাশে বসালো।শান্ত হেল্পার দিয়ে টেবিলে খাবার আনাতে লাগল।টুটুল বলল,শান্ত,এখানে আমার ঐ দু’টো ফ্রেন্ড হিন্দু।ছোট কাকাকে গিয়ে বলো যে এ টেবিলে চিকেনটা বেশি করে দিতে।

শান্ত সম্মতি জানাল,বলল,টুটুল ভাইয়া,রফিক কাকা বলেছে আমাকে,আমি সেই মতো আনছি।

টুটুল বলল,থ্যাংকস।আর শোনো,ওদের সাইডটায় গরুর মাংসটা রেখো না।কেমন?

শান্ত বলল,আচ্ছা।

সঞ্জু বলল,টুটুল এতো কিছুর দরকার নেই।আমরা খাই না ঠিক আছে।কিন্তু ওটা খাবার তো।ঘৃণা নিশ্চয় করি না।

টুটুল চশমা ঠিক করল,না কৌশিক তো একটু….!ঐ তাই আর কি!

সঞ্জু বলল,আর কৌশিক।গরু খায় না ঠিকই তবে গরু খাওয়া মানুষকে ঠিকই……!

কৌশিক দাঁত ঠোঁট চেপে তাকাল সঞ্জুর দিকে।বাপ্পি কাশি দিল হালকা স্বরে,চেপে যা।

টুটুল দ্বিধাভরে বলল,তুই কি বললি বুঝলাম না।

তমা বলল,ছাড়ো তো।আমাকে দেখো তো।কেমন লাগছে?

টুটুল তাকাল,সুন্দরই তো।আজ শাড়ি পরলে না যে?

তমার মন খারাপ হল,শুধুই সুন্দর!আর কিছু না।

টুটুলের কপালে ভাঁজ পড়ল,আর কি লাগবে?

কৌশিক ফোঁড়ন কাটলো,বুঝেছি মা।আমিই তোকে পিক তুলে দিবো।সেলফি তুলে তো ফোনের গ্যালারি ভরে ফেলেছিস বোধহয়।

তমা রেগে গেল,তোকে বলেছে।

খাবার পরিবেশন শুরু হলো।

প্যান্ডেল এবারও লোকে ভরে গেছে।সকলে তদারকিতে ব্যস্ত।অহন কিছুটা খেয়ে উঠে যেতে চাইল।বাপ্পি হাত ঘুরিয়ে বাম হাত দিয়ে অহনের বাম হাত চেপে ধরল,কি খেলে বলো তো।কিছুই খেলে না।আরেকটু খাও।

অহন আবার বসে পড়ল,আর খেতে পারবো না,বাপ্পি ভাইয়া।পেট ভরে গেছে।এরপর বমি করবো।

বাপ্পি মৃদু ধমক দিল,আরে ইয়ার।তুমি খেলে টা কি!এ জন্য এতো শুকনা।বাতাসের আগে উড়ো।

অহন প্রতিবাদ করল,আপনাকে বলেছে।আমার ওয়েট পঁয়তাল্লিশ কিলো।অনেক না?

বাপ্পি হেসে দিল,হুম।অনেক।আমারটা জানো?সাতষট্টি।ফিঙ্গার দেখেছো?

অহন বলল,আপনি তো নায়ক।আমি সাধারন পাবলিক।আপনার মতো অতো সুন্দর না।

কৌশিক খাওয়া রেখে ওদের দিকে তাকিয়ে রইল।সঞ্জু কনুইয়ে চাপ দিল,খা।হা করে থাকিস না।শোধ তোলার সময় পাবি।

বাপ্পি নিজের প্লেট থেকে এক টুকরো মাংস তুলল,আচ্ছা।হা করো।এক পিচ বীফ নাও অন্তত আমার থেকে।

অহন কোন দ্বিধা ছাড়াই হা করল।বাপ্পি পাশে তাকিয়ে বলল,কুশ,বীফ তো তুমি আর খাবে না।টেক ইট ইজি।ছোট ভাই তো।

কৌশিক ফিসফিস করল,আমি কি কিছু বলেছি?ওভার স্মার্ট হও না।

বাপ্পি বলল,এখন সবার সামনে বলছো না।একা পেলে তো…!জানোই তো তোমাকে ভয় পাই।

অহনের দিকে তাকিয়ে বলল,আরেক পিচ নাও।

টুটুল বলল,ওকে খাওয়াতে গেলে তুই খাবি কখন?ও একা খেতে পারবে।

তমা বাধা দিল,দিচ্ছে দিক না।ছোট ভাই তো।তুমি কোনদিন খাইয়ে দিয়েছো কাউকে?ক্যাবলাকান্ত কোথাকার।

সঞ্জু মুখের খাবার শেষ করে বলল,বাপ্পি,ছোটভাইকে যা খাওয়াবি পরে খাওয়াস ভাই।ও তো বলছে ওর পেট ভরে গেছে।

শেষের কথাগুলো অস্পষ্টভাবে বলল,তুই যে কি খাওয়াবি,কেউ না বুঝলেও,আমি বুঝেছি।

অহন বলল,বাপ্পি ভাইয়া,আর খাবো না,আমি যাই।

বাপ্পি বলল,যাবে?আচ্ছা যাও।আমিও আসছি শেষ করে।তুমি কই থাকবে?

অহন যেতে যেতে বাম হাতের মাঝের তিন আঙ্গুল হাতের তালুতে সমতল করে কানের কাছে নিয়ে বোঝল।মোবাইলে কল করে নিয়েন।

বাপ্পি একবার চোখ বুজে সায় দিল।

সাদেক সাহেব উদয়ের হাত ধরে হৃদয়ের কাছে এসে দাঁড়াল।হৃদয় ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল,ওহ আব্বু!খেয়েছেন তো?

সাদেক সাহেব বললেন,হ্যাঁ।শোন টুশির উপহারটা উপহার টেবিলে রেখে এসেছি।রেবেকাকে বলিস আব্বু এসেছিলো।

হৃদয় মাথা নাড়াল,আচ্ছা আমি বলে দিবো সইমাকে।আব্বু কোন টেবিলে বসেছিলেন?এতো লোক,আমি তো খেয়ালই করতে পারলাম না।ঠিক মতো খেয়েছেন তো?

সাহেক সাহেব বললেন,চিন্তা করিস না।এলাহি আয়োজন।খাওয়ার কি ত্রুটি হয়?

হৃদয় উদয়কে কাছে টেনে বলল,তুই খেয়েছিস ভাই?

উদয় মাথা নাড়াল,এত্তো।

হৃদয় হেসে দিল।সাদেক সাহেবকে বলল,সবার সাথে দেখা হয়েছে?

তিনি বললেন,হ্যাঁ।বাইরে যারা আছে।তাদের প্রায় সবার সাথে হয়েছে।শফিক তো ছাড়বে না।বলল আপনি আমাদের চেয়ারম্যান মানুষ।আমি নিজে গিয়ে বলে এলাম।আপনি বরযাত্রীর সঙ্গে খাবেন।কিন্তু আমার কি আর এতো সময় আছে।বিকালে কাউন্সিলে শালিস আছে একটা।

তারপর হৃদয়কে প্রশ্ন করল,তুই কখন যাবি?

হৃদয় একজনের হাতে চিকেন রোস্টের ডিশ দিয়ে বলল,ছয় নাম্বার টেবিলে।

তারপর বলল,আব্বু,আমার যেতে রাত হবে।দেখছো তো সকলে কি ব্যস্ত।চলে গেলে ভালো দেখায় বলো?

উদয় বলল,আব্বু,আমি ভাইয়ার কাছে থাকবো।

হৃদয় নিচু হয়ে বলল,না ভাই।আমি সারাক্ষণ কোথাই না কোথাই থাকি।তুই আব্বুর সাথে চলে যা।আমি রাতে গিয়ে টুনাটুনির গল্প বলবো।

উদয় মাথা নাড়িয়ে বোঝালো সে যাবে।

সাদেক সাহেব হৃদয়ের কাঁধে হাত রেখে বলল,তোর জ্বর সেরেছে?সারাদিন তো বোধহয় কিছু খাস নি।

হৃদয় সে কথার জবাব দিলো না।শুধু বলল,আব্বু,আপনি যান।

হৃদয় তড়িঘড়ি করে হেটে প্যান্ডেলের ভিতর চলে গেলো।অনুষ্ঠানে কয়েকজন দাওয়াতি মেম্বার ছিলো।তাদের একজন এসে বলল,সাদেক ভাই।সকলে বসে আছে।চলেন যাই।

সাহেক সাহেব ‘হুম’ বলে উদয়কে ধরে নিয়ে হাটা দিলো।

যে বাবা ছেলের প্রতি হওয়া হাজার অন্যায় দেখে মুখ খোলে না।সে আজ ছেলেকে সকলের মাঝে একলা পেয়ে তার শরীরের খোঁজ নিচ্ছে।খাওয়ার খোঁজ নিচ্ছে।হৃদয় সকলের আড়ালে চোখ মুছে,আবার কাজে মন দিল।মির্জাবাড়িতে সে অনেক কিছু পেয়েছে ছোট থেকে।তাদের ঋণ কখনো শোধানো যাবে না।তবুও সে চেষ্টা করে কৃতজ্ঞ থাকতে এদের প্রতি।দুপুর বারোটার পর থেকে জ্বর বেড়েছে।সেই শরীরে কাজ করছে।সকাল থেকে এখনো অবধি পেটে কিছু পড়ে নি।শরীরটা বেশ দুর্বল লাগছে তার।কাজগুলো শেষ হলে গিয়ে শুয়ে পড়তে পারতো কোন এক কোণে।যদিও জ্বর মুখ,তবুও এমনিতেই এতো খাবারের মাঝে থেকে কেন যেন খেতে ইচ্ছা করছে না তার।থেকে থেকে বুকের ভিতর চিনচিন করে উঠছে।কাল রাতের ঘটনার পর থেকে অহনের সামনে আর পড়ে নি।যে ঘৃণা করে।করুক না।তার তো স্বাধীনতা আছে ঘৃণার।সে সামনে গেলে যদি তার রাজপুত্র কষ্ট পায়।বিরক্ত হয়।তাহলে নিজেকে আড়াল করাই তো ভালো তার সামনে।টুটুল ভাইয়ার বন্ধুদের সঙ্গে কেমন হেসে খেলে বেড়াচ্ছে।বড় ভালো লাগছে দেখে হৃদয়ের।দূর থেকে তার রাজপুত্রকে দেখলে মাঝে মধ্যে চোখ ব্যথা করে ঝাপসা হয়ে আসছে।কারনে অকারণে মেয়েদের মতো চোখে জল আসার কোন মানে খুঁজে পায় না হৃদয়।বড় অস্বস্তি লাগে তার।মনে হয় কেউ যেন দেখছে তাকে।পোড়া কপাল।পোড়া চোখও বোধহয় জুটেছে হৃদয়ের ভাগ্যে।

অবশেষে খাওয়া দাওয়ার পালা সমাপ্ত হলো।

টুশিকে বিদায় জানোর আগমুহূর্তে শর্মি এসে উত্তর প্যান্ডেলে ঢুকলো।হৃদয়কে বলল,মেজো ভাবি তোকে ভিতরে ডাকছে।

হৃদয় বলল,কেন?ফুপি।কি হয়েছে?

শর্মি বলল,অহনা বায়না ধরেছে টুশির সঙ্গে যাবে।তাছাড়া টুশির সঙ্গে তো কাউকে না কাউকে পাঠাতে হবে।আম্মার শরীর খারাপ।অহন,টুটুল কেউ যাবে না।টুশির বান্ধবী প্রিয়াকে ওর সঙ্গে দেওয়া হচ্ছে প্রিয়ার মায়ের থেকে অনুমতি নিয়ে।কিন্তু প্রিয়া তো অহনাকে সামলাতে পারবে না।তুই যা না,বাপ।মেজো ভাবিও তাই বলছে।

সইমা বলেছে হৃদয়ের তো যাওয়া উচিত।কিন্তু তার পোশাকআশাক তো ভালো না।তার সইমার দেওয়া পাঞ্জেবীটা তো গায়ে দেওয়াও হলো না।একই রংয়ের একই ডিজাইনের পাঞ্জেবী তাদের দু’জনের শুনে অহন বিদ্রুপ করে বলল,একটা এতিম মিসকিনের সঙ্গে মিল রেখে এখন আমাকে কাপড়ও পরতে হবে?বাহ।তাকে যা ইচ্ছা বলুক।কিন্তু তাকে নিচু করতে গিয়ে সইমাকে সে অপমান করলো।হৃদয় ব্যাপারটা কিছুতেই ভুলতে পারছে না।সকালে ছোটকার কথায় সইমাকে ডাকতে যেয়ে বড় ভুল করেছে সে।শর্মি ফুপির হাত দিয়ে পাঠানো পাঞ্জেবী কাছারিঘরে,জয়নাল ভাইয়ের কাঁথা-বালিশের মাঝে চাপা পড়ে রয়েছে।সে চাপের ভার হৃদয়ের বুকে এসে ভর করেছে সকাল থেকে।

হৃদয় বলল,শর্মি ফুপি।আমি গেলে কি করে হবে?প্রিয়া আপুকে বুঝিয়ে দাও।সে বুঝবে।অহনাকে সামলাতে পারবে।আমি এখন গেলে ছোটকা একা পারবে না!

হৃদয় টেবিল পরিষ্কার করছিল,শর্মি হৃদয়ের হাত ধরে দাঁড় করিয়ে বলল,এড়িয়ে যাচ্ছিস।ওকে তোর সইমাকে গিয়ে বলছি।যা করার করুক।

শর্মি রেগে চলে গেল।

হৃদয় বাড়ি লোক পাতলা না হওয়া পর্যন্ত ভিতরবাড়ি যাবে না।যেতে পারলে সইমাকে বুঝিয়ে বলে আসতে পারতো ব্যাপারটা।তার সইমা নিশ্চয় বুঝতো তার অসুবিধাটা।

আট।

সন্ধ্যার পর মির্জাবাড়ি অনেকটা নিরিবিলি হয়ে গেছে।বকুলতলার প্যান্ডেল রেখে বাকি সাজসজ্জা খুলে ফেলা হয়েছে।বিশাল উঠান খাঁ খাঁ করছে।অধিকাংশ দাওয়াতি মেহমানেরা চলে গেছে।গ্রামের কুটুম্ব বাড়তি খানাপিনা নিয়ে সরে পড়েছে।শহর থেকে আসা কয়েক ঘর মেহমান।আর টুটুলের বন্ধুরা আছে।অহনের মামা-মামী শেষপর্যন্ত আসে নি।পিচ্চি অন্তুটার আসা হলো না।অহন আসার সময় কত বায়না করল।মামারা আসবে বলে অহনও ব্যাপারটা আমলে নিলো না।এখন তাকে ঢাকা ফিরতে হবে একা।তার আব্বুর জব তো যশোরে।উল্টো দিকে।ছোট কাকা কে বলবে দিয়ে আসতে।টুটুল ভাইয়াও তো তাকে নিতে পারবে না।সে কালই চলে যাবে বন্ধুদের সঙ্গে।

অহন বকুলতলার প্যান্ডেলে একটা চেয়ারে বসেছিল।বাপ্পি এসে পাশের চেয়ারে বসল,কাল তো চলে যাবো।তুমি একটু গ্রামটাও ঘুরে দেখালে না।চলো দু’জনে একটু হাওয়া খেয়ে আসি।

অহন বলল,এখন?আটটা বেজে গেছে।

বাপ্পি অহনের হাত ধরে টেনে উঠিয়ে বলল,সো হোয়াট।স্বচ্ছ জ্যোৎস্না।চারদিকে পরিষ্কার।বিয়ে বাড়ির এই আলোতে থেকে তুমি জ্যোৎস্নার কি বুঝবে?

অহন সম্মতি দিল,আচ্ছা চলেন।কৌশিক দাদা,সঞ্জু দাদা যাবে না?

বাপ্পি চলতে চলতে বলল,সঞ্জুর মাথা ধরেছে।সঞ্জু না গেলে কুশও যাবে না।তুমি ছাড়ো তো ওদের কথা!

অহনের হাত ধরে বাপ্পি কাছারিঘর পেরিয়ে পুকুরের সামনে দিয়ে বয়ে চলা কাঁচা মাটির রাস্তায় এলো।

অহনকে প্রশ্ন করল,কোন দিকে যাবে?

অহন ডানদিক দেখিয়ে বলল,এদিকে একটু গেলে দাউদকান্দি ছোট বাজার পড়বে।আমরা বরং ওদিকে যাই।

বাপ্পি অহনের হাত ধরে চলতে শুরু করল।

সামান্য হাটার পর দাউদকান্দির প্রাথমিক স্কুল পড়ে।বাপ্পি বলল,এখানে একটু বসি।পা ব্যথা করছে।

অহন খোঁচা মারল,এই না হলে বীরপুরুষ!এইটুকু পথ হেটে ক্লান্ত।শহুরে বাবু কি না?

গত বছর সরকারি অনুদানে ছোট করে শহীদ মিনার করা হয়েছে স্কুলটাই।যদিও যে টাকা এসেছিলো তা দিয়ে এরকম দশটা শহীদ মিনার করা যেত।গ্রামের স্কুল-কলেজে অনুদান এলে একেবারে উপর মহল থেকে ভাগ হতে হতে আসে।সে হিসাবে ঠিকই আছে বলা চলে।

বাপ্পি জুতা খুলে শহীদ মিনারের সমতল অংশে বসে পা ঝুলিয়ে দিলো।অহনের হাত ধরে টেনে বসাতে গেলো।অহন বলল,ওয়েট।জুতা খুলে নেয়।

জুতা খুলে সে বাপ্পির পাশে গিয়ে বসল।বাপ্পি অহনের একটা হাত নিয়ে নিজের কোলের উপর রাখল।

তারপর মিহি সুরে ডাকল,অহন?

অহন প্রত্যুত্তর করল,হুম।বলেন।

বাপ্পি বলল,আজ তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।

বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য অহন আজ পরেছে মিষ্টি রংয়ের শার্টের উপর হালকা খয়েরি কটি।জিন্স প্যান্ট।বাপ্পি ফর্মাল প্যান্টের সঙ্গে গাঢ় খয়েরী শার্ট ইন করেছে।সিল্কি চুল।ট্রিম করা দাড়ি।বিয়ের সাজপোশাক এখনো কারোর ছাড়া হয় নি।অহনের মুখে চাঁদের কোমল আলো এসে পড়েছে।সে চাঁদের দিকে তাকিয়ে বলল,আপনাকেও খুব সুন্দর লাগছে।

বাপ্পি অহনের হাতের অাঙ্গুল নিয়ে খেলা করতে করতে বলল,তোমার চোখে খুব নেশা।তাকানো যায় না।কেমন একটা লাগে।

অহন অবান্তর প্রশ্নসহ ভণিতা করল,তাই নাকি?জানতাম না তো।

বাপ্পি বলে গেল,আমি কাল যখন তোমাদের বাড়ি এসে তোমাকে দেখলাম।তখন কেমন একটা অন্যরকম ভালো লাগা কাজ করলো।তুমি জানো,সেটা কেমন ভালো লাগা?

অহন বলল,না তো।আমি কিভাবে জানবো!আপনি বললে না জানতে পারবো।কেমন?

বাপ্পি অহনের হাতে একটা চুমু দিয়ে বলল,ভালোবাসার মতো ভালোলাগা?

অহনের গা শিউরে উঠল।হাত ছাড়িয়ে নিয়ে দ্বিধা আর অবিশ্বাসে চোখ বন্ধ করে প্রশ্ন করল,ভালোবাসার মতো ভালোলাগে কি?

বাপ্পি আবার হাতটা এনে কোলে রাখল,তুমি তো ছোট?এতো সব জটিল কথা বুঝবে না!

অহন প্রতিবাদ করল,ইশ।ক্লাসে টেনে পড়ি।যথেষ্ট বুঝি।আপনি বোঝালে ঠিক বুঝবো।নিজে যে বোঝাতে পারছেন না,সে কথা স্বীকার করবেন না।

বাপ্পি ডান হাত দিয়ে অহনের মুখ টিপে বলল,পাকা বুড়ো।খুব বোঝো না?

অহন হাসল,হুম তো।বুঝালে বুঝি!

বাপ্পি হেয়ালি করল,কি বোঝো কে জানে!আচ্ছা একটা কথা বলো তো?

অহন প্রশ্নের আশায় প্রশ্ন করল,কি কথা বলেন?

বাপ্পি প্রশ্ন করল,তুমি কাউকে ভালোবাসো?আই মিন ভালোলাগে কাউকে?

অহন কিছুক্ষণ ভেবে বলল,হুম বাসি তো।আম্মু,আব্বু,শর্মি ফুপি,দাদি,ছোট কাকা।এদের।

বাপ্পি হাহাহা করে হেসে উঠল,আরে বোকা।এই ভালোবাসা সেই ভালোবাসা না।

বাপ্পির হাসি;স্কুলের খোলা মাঠে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এসে কানে বাজছিল।অহন বাপ্পির দিকে সরে এসে বলল,এমন হাসবেন না।ভয় লাগে।

বাপ্পি প্রশ্ন করল,ভূতে?

অহন মাথা নাড়াল।তারপর বলল,আচ্ছা তাহলে কোন ভালোবাসা?

বাপ্পি বিজ্ঞের মতো বলল,এই ধরো এমন কাউকে,যাকে দেখলে তোমার বুকের স্পন্দন বেড়ে যায়।কাছে পেতে ইচ্ছা করে।ছুঁয়ে দেখতে মন চায় কিংবা মনে হয় ও যদি আমার পাশে থাকতো।ঠিক আমার হয়ে।কতই না ভালো হতো।

অহন হেসে দিল,হুস।এমন তো হয় না।সবাই তো আমার পাশে থাকে।আব্বু,আম্মু……!

কথা শেষ করতে দিলো না।বাপ্পি অস্বস্তির সুর উঠালো মুখে,উফস,আবার আব্বু,আম্মু?

হাত জোড় করে বলল,মাফ চাই বাপ।

অহন খিলখিল শব্দে বাচ্চাদের মতো হাসল।

বাপ্পি অনেকক্ষণ কথা বললো না।তারপর নিজে একটু পিছন দিকে সরে বসে নিজের কোলের কাছে জায়গা করে অহনকে উঠিয়ে সামনে বসালো।পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে অহনের কাঁধে থুতনি রেখে প্রশ্ন করল,আমাকে ভালো লাগে না?

বাপ্পির শ্বাসপ্রশ্বাসের তাড়িত বায়ুর অদৃশ্য রেখা অহনের কাঁধে পড়ছিলো।এবার সত্যি তার বুকের স্পন্দন বেড়ে গেল।ঘুরে বাপ্পিকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করছে।শরীরের মাঝে কেমন শীতল ভালোলাগার স্রোত বয়ে যাচ্ছে।

অহন কোনরকমে উচ্চারণ করলো,জানি না।

বাপ্পি আরো গভীরভাবে জড়িয়ে ধরল,ভালোবাসতে ইচ্ছা করে না আমাকে?আদর করতে মন চাই না?

অহন ঘুরে বাপ্পিকে জড়িয়ে ধরল।বাপ্পি মুচকি হেসে অহনকে বুকের সঙ্গে লেপ্টে নিলো।

অহনের নবযৌবন।কিশোর বয়সের সীমানা পেরিয়ে যাওয়ার মাহেন্দ্রক্ষণ।শরীর উতলে পড়তে চাই।যেন বাঁধনহারা তার মন।

এটা ভালোবাসা?নাকি মোহ!কিংবা ভালোবাসা হলেও আদৌ বৈধ নয়!সেটা কি কেবল এখানের একপক্ষ জানছে?নাকি উভয়পক্ষই!সে হিসাব এখানে করলে বড্ড গড়মিল হয়ে যাবে।

চাঁদের আলোয় দু’টি যুবকের এমন জড়িয়ে থাকা,দূরে দাঁড়িয়ে একটা আবছায়া লক্ষ্য করছে।

তার বুকে ভাঙ্গনের খেলা।

বাপ্পি অহনকে ছেড়ে তার দু’গাল হাত দিয়ে ধরে বলল,ভালোবাসবে আমায়?

অহন সে প্রশ্নের উত্তর দিলো না।বাপ্পি অহনের ঠোঁটের কাছে ঠোঁট নিল,তোমার ঠোঁটের অমৃত সুধা চিরদিন যেন আমার থাকে।

অহনের ঠোঁট কেঁপে উঠল।ধীরে ধীরে দু’জনার ঠোঁট এক হয়ে মিশে গেলো।বাপ্পি অহনের মাথার পিছনে ধরে আস্তে করে শহীদ মিনারের সমতল অংশে শুয়ে দিলো।তখনও দু’জনের ঠোঁট এক ফ্রেমে বন্ধি।এভাবে মিনিট পাঁচেক চলে গেলো।বাপ্পি অহনের ঠোঁট ছেড়ে তার পাশে চিৎ হয়ে শুয়ে ভরা জ্যোৎস্নাময় আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো।অহনের দেহ নিথর পাথরের মতো।চোখ বড় বড় করে আছে।বাপ্পির সেদিকে বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই।দু’জনের শরীরে চাঁদের নির্জলা অথচ আর্দ্র।সূক্ষ্মময়।হিমাংশুর আলোকবর্তিকা।

মিনিটখানেক পর অহন দম নিলো।সঙ্গে প্রচুর শ্বাস টানের শব্দ।শহীদ মিনারের সমতল ভূমি হতে তার পিঠ ইঞ্চি দুয়েক উঁচু হয়ে যাচ্ছে।বাপ্পি প্রথমে ব্যাপারটা আমলে নিলো না।দ্বিতীয়বার শ্বাসের টান শুনে দ্রুত উঠে বসে অহনের শরীর নাড়া দিলো।অহনের জবাব নেই।সে অহনের পিঠের তলে হাত রেখে তার মাথা নিজের কোলে এনে অহনের গালে মৃদু আঘাত করতে লাগল,অহন,এই অহন!কি হয়েছে তোমার?অহন।

হৃদয় আড়াল থেকে ছুটে এলো।বাপ্পি কেঁপে উঠল।হৃদয় হাটু গেড়ে বসে অহনকে ধাক্কা দিতে লাগলো।অহন তৃতীয়বার শ্বাস নিলো।তারপর শ্বাস টানার শব্দ বাড়তেই লাগলো।

বাপ্পির দিকে তাকিয়ে হৃদয় প্রশ্ন করল,আপনি কি করেছেন ওর সঙ্গে?

বাপ্পি নির্বাক হয়ে গিয়েছিল।দ্রুত সামলে নিয়ে বলল,কই তেমন কিছু না তো।বিশ্বাস করো।

হৃদয় দ্রুত উঠে যেতে যেতে বলল,ওর শ্বাসকষ্ট উঠেছে।আপনি ওকে দেখুন আমি আসছি।

ভাগ্যিস তারা বেশি দূরে এসেছিলো না।হৃদয় দৌড় দিল।মির্জাবাড়ির বিশাল আঙিনা পেরিয়ে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি ভেঙ্গে হৃদয় বারান্দায় উঠলো।দিক ঠিক করে ভিতর বাড়ি যেয়ে চৌকোণা বাড়ির দক্ষিণে সিঁড়ি ধরে দ্বিতীয়তলায় উঠল।শর্মি পথ আটকে দাঁড়াল,ঐ হৃদয়,এতো তাড়াহুড়ো করে কই যাচ্ছিস?

হৃদয় হাত ছাড়িয়ে বলল,সময় নেই ফুপি।ছাড়ো।দোতলার টানা বারান্দা দৌড়ে দক্ষিণ-পশ্চিমের রুমে ঢুকল।অহনের ব্যাগ খুঁজতে লাগল।বিছানায় ব্যাগ পেয়ে দ্রুত সেটা খুলে ইনহেলার বের করল।তারপর আবার ছুটে বেরলো।

শর্মি সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিল।সে আবারও হৃদয়কে প্রশ্ন করল,এতো তাড়াহুড়ো করে কই যাস,বাপ।ও হৃদয়।

হৃদয় কোন কথায় কর্ণপাত না করে দ্রুতে নেমে এলো।রেবেকা দৌড়ে এসে বলল,শর্মি,কি হয়েছে ওর?

শর্মি বিরক্তি প্রকাশ করল,দেখো তো মেজো ভাবি!কিছু বলে গেলো না।কেন দৌড়াদৌড়ি করছে?কি হয়েছে?ধ্যাত।

রেবেকা বলল,জয়নালকে ডেকে ওর পিছনে পাঠাতো।জয়নাল গিয়ে দেখে আসুক।

শর্মি বলল,জয়নাল কাকা তো পূর্বপাড়া গেছে।ফিরবে সেই রাত দশাটায়।

রেবেকা অস্বস্তি সুরে বলল,কাজের সময় কাউকে পাওয়া যায় না।দাঁড়া,আমি আয়েশার বড় ছেলেকে পাঠাচ্ছি।ভিতরবাড়ি ঘুরঘুর করছে দেখেছি।

হৃদয় কাছারিঘর পিছনে রেখে কাঁচা রাস্তায় পড়ে আরো দ্রুত ছুটতে লাগলো।আসা যাওয়ায় মাত্র তিন মিনিটের একটু বেশি সময়ে হৃদয় পুনরায় বাপ্পির সামনে হাজির হলো।

দম বন্ধের যোগাড় যেন তার।হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,এই নিন ইনহেলার।অহনের মুখের ভিতর স্প্রে করেন।

বাপ্পি অহনকে কোলের সঙ্গে আধবসা করে মুখে স্প্রে করতে লাগলো।অহনের তখনও শ্বাস টান তীব্র।মিনিট পাঁচেক পর অহন স্বাভাবিক দম নিয়ে সোজা হয়ে বসল।

বাপ্পি জিজ্ঞাসা করল,এখন ঠিক আছো?

অহন মাথা নাড়াল,হুম।

মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে সঞ্জু দৌড়ে এলো।পিছনে কৌশিক।সঞ্জু রীতিমত ঘাবড়ে গেছে।প্রশ্ন করলো,বাপ্পি,কি’রে কি হয়েছে?ফোন করলি কেন?কিছুই তো বললি না ফোনে।শুধু বললি পাশের স্কুল মাঠে চলে আয় দ্রুত।

বাপ্পি জবাব দিল না।সঞ্জু বলল,আমরা এখানে চিনি কিছু?তারপর রাত।স্কুল খুঁজতে পাঁচমিনিট চলে গেলো।কি বললি আবার টুটুলকে আনা যাবে না।

হৃদয় বলল,আসলে ওনারা এখানে ঘুরতে এসেছিলো।

বাপ্পি ঢোঁক গিলল।ছেলেটা আবার বলে না দেয় যে অহনকে চুমু খেতে গিয়ে..!বাপ্পি আর ভাবতে পারছে না।কৌশিক জানলে ব্যাপারটা মোটেও ভালো হবে না।

হৃদয় বলে গেল,অহনের শ্বাসকষ্ট আছে।মাঝে মাঝে বেড়ে যায়।ঐ ভাইয়াটা তো জানে না।আমি বাড়ি যাচ্ছিলাম,ব্যাপারটা দেখে দৌড়ে বাড়ি গিয়ে ইনহেলার এনে দিয়েছি,এখন ঠিক আছে।আপনারা চিন্তা করবেন না।ঐ ভাইয়া বোধহয় ভয় পেয়েছে।তাই আপনাদের ডেকেছে।

সঞ্জু বলল,বাপ্পি,তুই ওকে একা নিয়ে এই রাতের বেলায় বেরিয়েছিস কেন?আমাদের বলতি,আমরাও সঙ্গে আসতাম।

বাপ্পি আমতাআমতা করল,আসলে গরম লাগছিলো তাই ভাবলাম ফ্রেশ বাতাসে একটু ঘুরে আসি।

কৌশিক ফোঁড়ন কাটল,গরম তো আমাদেরও লাগে।আমরা তো দিব্বি ইলেক্ট্রিসিটির বাতাসে মানিয়ে নিচ্ছি।

সঞ্জু বলল,থাক হয়েছে।এখন তোরা নাটক শুরু করিস না,প্লিজ।জানি তো,তোদের এই এক ঘ্যানরঘ্যানর ভাল লাগে না আর।

বাপ্পির দিকে তাকিয়ে বলল,অহনকে উঠা।বাড়িতে নিয়ে চল।আমরা এখানে বেড়াতে আসছি বন্ধুর বাড়ি।কিছু একটা অঘটন হলে কি হবে বুঝতে পারছিস?

বাপ্পির আসলেই নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে।একদমে এতোটা সময় ধরে চুমু খাওয়াটা বোধহয় ঠিক হয় নি।আসলে লিপকিসটাতে বাপ্পির একটু দুর্বলতা আছে।পছন্দের মানুষ হলে তো কথা নেই।সে যেন চিরকাল অমৃত সুধা পানে ঠোঁট লাগিয়ে থাকতে পারে অন্যের ঠোঁটে।কৌশিক তার এই স্বভাবে অভ্যস্ত।কিন্তু অহন।সে কোনদিন না পেয়েছে চুমুর স্বাদ।না এমন কামময় আবেগঘন মুহূর্ত।সেই ক্ষণে ঘটা প্রতিটি মুহূর্ত সেকেন্ড তার কাছে নতুন।বাপ্পিকে বাধা দিতে পারে নি,নিজেরও এতো ভালোলাগা কাজ করছিল যে দমের খেয়াল আসে নি।প্রেম সিক্ত হওয়ার মুহূর্তে শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে ভুলে যাওয়ায় তো প্রকৃত সাড়া দান।

অহন নিরিবিলি বসে ছিলো।মৃদু সুরে বলল,সঞ্জু দাদা,বাপ্পি ভাইয়ার কোন দোষ নেই।শ্বাসকষ্টটা হয় আমার মাঝে মাঝে।তার জন্য ওনার কি করার আছে?উনি তো আর জানেন না ব্যাপারটা।

সঞ্জু বলল,তাও ভাই।তোমার কিছু একটা হলে আমরা কি জবাব দিতাম বলো?

অহন উঠে দাঁড়িয়ে বলল,বাড়িতে ব্যাপারটা সবাই জানে।আমার ইনহেলার কোথায় থাকে সেটা অবধি তারা জানে।কারন শ্বাসকষ্ট হওয়ার নির্দিষ্ট সময় তো নেই।তাই ইনহেলার টা ব্যাগে রাখি,এজন্য ব্যাপারটা আমার স্কুলের বন্ধু এমনকি স্যারেরা পর্যন্ত জানে।কিন্তু এই সময় হবে তা তো জানা ছিলো না।ব্যাগটাও সঙ্গে নেই।সুতরাং ঘটনাটা সবাই বুঝবে এবং বুঝতো।সো রিলাক্স।আপনাদের কেউ কিছু বলবে না বাড়িতে।

সঞ্জু বলল,বড়জোর বেঁচে গেছো অহন।ভাগ্যিস,এই ভাইটা নির্দিষ্ট সময়ে ইনহেলার টা আনলো।ও কে হয় তোমাদের?

অহন চাঁদের আলোয় হৃদয়কে দেখলো।ছোট স্বরে বলল,উনি আমাদের বাড়িতে কাজ করেন!

বাপ্পি অহনের হাত ধরে বলল,এতো কথা বলতে হবে না।চলো এবার।

তারা হাটা দিল।

কৌশিক মুষ্টি পাকিয়ে পাশে উঁচু হয়ে থাকা শহীদ মিনারের প্রতীকে আঘাত করলো।

সঞ্জু কৌশিকের কাঁধে হাত রেখে বলল,কুল ইয়ার।ডোন্ট বি ইমোশনাল।আমি কি জানতাম?যে ওরা দুু’জনে এখানে একলা এসেছে।একটা রাত তো মাত্র।কাল আমরা চলে যাবো।

তারপর সঞ্জু হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,নাম কি তোমার ভাই?

হৃদয় ধরা গলায় বলল,হৃদয়।মোঃ হৃদয় তালুকদার।

সঞ্জু আর কৌশিক অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়ার পর হৃদয় ভাবল,আচ্ছা,একটা কাজের ছেলের কি এতো সুন্দর নাম হতে আছে?

তাদের নাম হবে মুতা,মফিজ,মদন কিংবা আবুল নামের মতো।

———————————————————————-

(পঞ্চম পর্ব)

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>> 

বিঃদ্রঃ তোমার একটিমাত্র জীবন যদি প্রেমহীন থেকে যায়,শর্তহীন দলিলে যদি কোন বিবাদীর নাম লেখা না থাকে,অনাবিষ্কৃত ভালোলাগা যদি তোমার ঠোঁটের আঙ্গিনায় বিরহ না জাগায়,একটিমাত্র জীবনে তুমি যদি কলঙ্ক এর সুখই না পেলে-তবে তুমি…!তবে তুমি আমার গল্প পড়ো না।

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>> 

নয়।

মির্জাবাড়ি থেকে ফিরতে রাত বারোটার মতো বেজে গেলো।

অহনকে সবাই মিলে নিয়ে যাওয়ার পর হৃদয় কিছুক্ষণ সেখানে ঠাঁই দাঁড়িয়ে ছিলো।তারপর বাড়ি আসার কথা মনে পড়তেই মির্জাবাড়ির কাছারিঘরের দিকে গেলো।পুকুরপাড়ের আড় বাঁধা বাঁশ থেকে ভোরে গোসল করে মেলা দেওয়া জিন্স প্যান্ট নিয়ে বদলে নিলো।তার নোংরা টিশার্ট আর জয়নালের একটা নরমাল প্যান্টে দিনটা কাটিয়ে দিয়েছিল।জয়নাল পূর্বপাড়া থেকে ফিরে ঘুমিয়ে পড়েছে।সারাদিন কত খাটাখাটনি।তারপর আবার ঘুমকাতুরে।হৃদয় আস্তে করে বালিশের তলা থেকে রেবেকার দেওয়া পাঞ্জেবী টা নিলো।জয়নাল নড়েচড়ে পাশ ফিরে আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো।হৃদয় দাওয়ায় নেমে সাইকেলের কাছে গেলো।তার বুকের ভিতর ছ্যাৎ করে উঠল।গতকাল সাইকেল এখানে তালা দিয়ে রাখার পর আর খেয়াল করা হয় নি।এখন সাইকেলটা সেখানে নেই।জয়নাল ভাইকে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ডেকেও কোন লাভ হলো না।সাইকেল পাওয়া গেলো না।জয়নাল বলল,আর পায়া যাবি না।যে নিছে সে কি ফেরত দেবে?

হৃদয়ও জানে ফেরত দিবে না।তবুও আরো কিছুক্ষণ চারপাশটা খু্ঁজল।

জয়নাল বলল,রাতটা থাকি যা।এতো রাইতে হেটে অত দূর যাবি নাকি!সেই পূবপাড়া।

হৃদয় শুধু বলতে পারলো,না জয়নাল ভাই,থাকবো না।এরপর হেটে এতটা দূর এসেছে।মাঝে অবশ্য দারোগাকান্দি ছোট বাজারে লাল চাঁন মিয়া চাচার চায়ের দোকানে বসেছিল।

লাল চাঁন মিয়া রসিক লোক।দোকানে চা খেতে আসা প্রতিটি মানুষের-তার বলা গল্প।একেবারে মুখস্থ।তিনি খরিদদারদের জন্য চা বানান আর নানান দেশের গল্প করেন।অথচ সেসব দেশে তিনি কোনদিন যান নি।ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত তার স্কুলের দৌড়।বাপের সঙ্গে গঞ্জের দোকানে আসতেন।বাপের অনুপস্থিততে খরিদদার সামলাতেন।দিনে দিনে হাতে যশ এলো।পাকা হাতে চা বানাতে শিখলেন।বাজারে আসা অধিকাংশ মানুষ তার চা বানানো খান।হৃদয়ের লাল চাঁন মিয়ার চা খেতে মন চায়।সে চা খায় না।তার একটা বড় কারন,তার পকেটে কখনো টাকা থাকে না।

খরিদদার কমলে তিনি হৃদয়কে বললেন,ও হৃদয় মিয়া,চা খাবা নি?

হৃদয় খুশি মনে উত্তর দেয়,না চাচা,আমি চা খাই না।কেমন জিভ পুড়ে যায়।পরে ভাত খেতে পারি না।

লাল চাঁন মিয়া পান খাওয়া লাল দাঁত বের করে হাসেন,কি কও মিয়া?চা আবার ঠান্ডা হয়নি?আরে খাও এক কাপ!দেহো কেমন লাগে।আমার হাতের চা তো সক্কলে খায়।পয়সা দিতে হইবো না।তুমি হও গিয়া আমাদের চেয়ারম্যানের পোলা।ফ্রিতে তো এক কাপ খাওয়াইতে পারি।আপদে বিপদে তোমার বাপকে তো আমরা স্মরণ করি।কি কও মিয়ারা!

কথা শেষ করে তিনি বাকি খরিদদারের দিকে তাকান তার কথার সত্যমিথ্যা যাচাইয়ের জন্য।কেউ কেউ আড়চোখে হৃদয়ের দিকে তাকায়।দু’একজন বলেন,তাতো ঠিক বলেছো,লাল চাঁন কাকা।বেশিরভাগ বলেন,চেয়ারম্যানের পোলা হলে কি হবে?পোশাকআশাক দেখছো নি?ফকিরেও অমন পোশাক পরে না।সৎমায়ে পোলাডারে শান্তিতে থাকাবার দেয় না।

অধিকাংশ সময় হৃদয় উঠে চলে আসে।তার বড় ইচ্ছা করে সাইকেল নিয়ে পদ্মার পাড়ে গিয়ে বসতে।রাত বাড়লে তার এই ইচ্ছা প্রখর হয়।শুধু কেবল-সে একা যেতে চায় না!বলে অপেক্ষা করে।অপেক্ষাটা কোন একটা হাতের।পদ্মার পাড়ে তার পাশে বসে থাকা একটা মানুষের।

সাইকেলটা ছিলো তার একমাত্র সঙ্গী।সারাদিনের ক্লান্তিতে ফেরার পথে হাটতে তার যতটা না খারাপ লাগছিলো,তার থেকে খারাপ লাগছিলো সাইকেলটার জন্য।সখিপুর।অত দূরের কলেজ।এখন তাকে রোজ হেটে যেতে হবে।ফিরতে হবে।

একমাত্র মেয়ে হওয়ায়,তার নানা-নানী সব সম্পত্তি তার মায়ের নামে লিখে দিয়েছিল।তারপর ছ’মাসের ব্যবধানে তারা দুনিয়া ছাড়লেন।সাদেক সাহেব চেয়ারম্যানি নির্বাচন করতে গিয়ে জামেলার সম্পত্তিটুকু শেষ করলেন।হৃদয়ের দাদা তার কানাকড়ি সম্পত্তি দিলেন না বেচতে।সাদেক সাহেব স্ত্রীকে বশ করে নির্বাচন করলেন।হারলেন।হৃদয়ের মায়ের অসুখে খরচ করলেন আজগর তালুকদার।হৃদয়ের দাদা।শেষ রক্ষা হলো না।আজ সাদেক সাহেব চেয়ারম্যান হয়েছেন।অঢেল সম্পত্তি জুটিয়েন।শুধু সংসারের বড় আর মৃত স্ত্রীর ছেলে আজ তাদের কাছে বোজা হয়ে গেছে।হৃদয় ভাবে,আজ মাতৃকুলে আপন কেউ থাকলে তার এমন লাথি-উষ্টা খেতে হতো না।চেয়ারম্যান বাড়ি তার কাছে যেন জাহান্নামের সমান।তবুও পড়ে থাকে এককোণায়।এতটুকু বয়সে সে কই যাবে?জীবন যে বড় নিষ্ঠুর।যন্ত্রণার।

আজ লাল চাঁন মিয়ার দোকানে ভিড় কম।হৃদয় এক মগ পানি নিয়ে চোখেমুখে ছিটালো।আরেক মগ তুলে ঢকঢক করে নিমিষে শেষ করলো।ড্রামে ভর্তি করে লাল চাঁন মিয়া খরিদদারদের জন্য পানি রাখেন।ড্রামের গায়ে ছিদ্র করে মগের হাতলে দড়ি বেধে রেখেছেন।তিনি বলেন,আর কইয়ো না মিয়া,বদ পোলাপান মগটা নিয়ে নেয় মাঝে মধ্যি।তাই এই ব্যবস্থা করা।হৃদয় পানি খাওয়া শেষে বসতেই লাল চাঁন মিয়া জিজ্ঞাসা করল,মিয়াকে কেমন দুর্বল ঠ্যাহে?তা কই থেকে আসলা মিয়া?

হৃদয় ক্লান্ত স্বরে জবাব দেয়,পশ্চিমপাড়া বিয়েতে গেছিলাম,চাচা।

তিনি পুনরায় প্রশ্ন করেন,মির্জাবাড়ি নি?

হৃদয়ের উত্তরের অপেক্ষা না করে আবার বলা শুরু করলেন,শুনলাম ম্যালা লোকের আয়োজন।আমার অবশ্য দাওয়াত আছিলো।যাই নি মিয়া।তোমার চাচির শরীরডা খারাপ।কিছু খাইতে পারছে না।

হৃদয় বলল,তাহলে না যেয়ে ভালো করেছেন!আপনি তো আবার কোথাও দাওয়াতে গেলে চাচির জন্য খাবার না এনে থাকতে পারেন না।

লাল চাঁন মিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন,আর কি করি কও মিয়া!ছেলেপিলে হলো না।বুড়োবুড়ির সংসার।সংসারে দু’টো মানুষকে দেখার জন্য মাত্র দু’টো মানুষই আছি।

হৃদয় বলল,তা তো ঠিক আছে,চাচা।চাচি কি বেশি অসুস্থ?

তিনি বললেন,না রে মিয়া।বেশি না।তয় কমও না।শরীরডা কেমন ভাঙ্গতে শুরু করিছে।

ষোলো বছর বয়সে বিয়ে করেছিলেন লাল চাঁন মিয়া।ভানু বিবির বয়স তখন বারো।তারপর পঞ্চাশ বছরের সংসার।দু’টো মানুষ।দু’টো মানুষকে কেবল আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছে।হৃদয়ের চোখে জল আসে।

লাল চাঁন মিয়া বললেন,শরীরডা যহন দুর্বল,এক কাপ চা খাইয়া চাঙ্গা হও মিয়া ।

হৃদয় বলল,চাচা,আমি বরং উঠি।চা খাবো না।বাড়ি ফিরতে হবে।রাত বাড়ছে।চাঁদের আলো থাকতে থাকতে যাই।

লাল চাঁন মিয়া বললেন,যাও মিয়া।আমিও যামু।খরিদদার কমছে।তোমার চাচির কাছে পুঁটিকে রাইখা আইছি।পাশের বাড়ির মেয়ে।বড় ঘুমকাতুরে।গিয়ে দেহুম তোমার চাচি অসুস্থ শরীল নিয়ে একলা জেগে আছে।সে ঘুমুচ্ছে।

তারপর হৃদয় ফের রাস্তায় নামলো।দারোগাকান্দির ছোট বাজার শেষ হলে বায়ে পড়ে কদমবাড়ির খাল।খালের পাড় ঘেষে সরু ইটের রাস্তা।আগে এটা অবশ্য কাঁচা মাটির রাস্তা ছিলো।হৃদয়ের বাবা চেয়ারম্যান হওয়ার পর,নিজের বাড়ি যাতাযাতের জন্য শ্যাওড়াকান্দি বিল পর্যন্ত ইটের ব্যবস্থা করেছিলেন।

বাড়ি ঢুকতে ঢুকতে আকাশ থেকে চাঁদ বিদায় নিল।

মধ্যরাত শুরু হলো।

বিছানায় গা এলিয়ে দিলো সে।ক্লান্ত ভাবটা জাঁকিয়ে বসেছে।সারাদিন বিয়ে বাড়িতে কিছু খাওয়া হয় নি তার।ক্ষুধা পেয়েছে প্রচন্ড।সইমা জানতে পারলে নিশ্চয় কষ্ট পাবে।মধ্যরাতে এ বাড়িতে খাবার নিয়ে কেউ তার জন্য বসে থাকবে না,ব্যাপারটা অস্বাভাবিক নয়।বরং কেউ বসে থাকলে ব্যাপারটা অস্বাভাবিক হতো।শরীরটাও ম্যাজম্যাজ করছে।জ্বর গায়ে কতশত দৌড়াদৌড়ি।জ্বর অবশ্য এখন কম।গোসল করতে পারলে ভালো হতো।হৃদয় উঠে লুঙ্গি খুঁজতে লাগলো।টেবিলে খাবার চাপা দেওয়া আছে।ঢাকনা তুলে যা বোঝা গেলো,গতরাতের ভাত।মর্জিনাটা এতো অলস।আর ভুলোমনের।শরীর নাড়িয়ে কাজ করতে চায় না।রোজ রাতে খাবার খাওয়ার পর হৃদয়কে ডেকে তাকে থালাবাসন দিতে হয়।একটা মানুষ দু’দিন বাড়িতে নেই।তার জন্য অভ্যাসবশত খাবার রেখে গেছে।পরে আর দেখার প্রয়োজনবোধ করে নি।ভালোই হলো।

হৃদয় গোসল করে এসে ভাতে পানি ঢেলে খেয়ে নিল।ভাত বেশি নষ্ট হয় নি।তরকারিটা গরমে একদম অখাদ্য হয়ে গেছে।পাশের ঘরে সখিনা বিবি আর মর্জিনা সাড়াশব্দহীন ভাবে ঘুমে অচেতন।রহিমের ছোঁয়া পেয়েছে এরা।অবশ্য দিনের বেলা যা খাটুনি।রাতে তো ঘুমে অচেতন হবে।

বিয়ের জন্য দু’টো দিন কলেজের কোচিং কামাই গেল।ছাত্র সে মোটামুটি ভালো।প্রাইভেট পড়তে পারলে আরো ভালো হতো।প্রাইভেটের টাকা কই পাবে সে!টেস্টের পর ফর্ম ফিলাপে দু’হাজার টাকা লেগেছে।সেটা সে অনেক কষ্টে যোগাড় করেছে।রঘুর থেকে।রঘুরা গৃহস্থ পরিবার।টাকার কমতি নেই।হৃদয় টাকার কথা বলাই রঘু কেবল একটা শর্ত দিল।পরীক্ষার হলে পাশাপাশি সিট যেহেতু।সুতরাং তাকে পাশ করানোর দায়িত্ব হৃদয়ের।হৃদয় রাজি হয়ে গেলো।উপায় যে আর মেলে না।তার সইমা কে বললে,সে নিশ্চয় দিতো।শুধু হৃদয়ের বড় আত্মসম্মানে লাগে টাকার ব্যাপারে।সইমা তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ দিচ্ছে।ভালোবাসা।তার কাছে টাকা চেয়ে মানুষটাকে অপমান করতে চায় না সে।যদিও তার সইমা বিনা বাক্যে টাকাটা দিতো।আর দরিদ্র হলে প্রিন্সিপালকে বলেকয়ে একটা ব্যবস্থা করা যেতো।সখিপুর থানার কয়েকটা চেয়ারম্যানের মাঝে তার বাবা আরশিনগরের চেয়ারম্যান।কলেজের সকল মানুষ তাকে চেনে।এ নিয়ে হৃদয়কে মাঝে মাঝে কথাও শুনতে হয়।টেস্টে উচ্চতর গনিতে তার নাম্বার কম আসাই প্রিন্সিপাল তো বলেই বসলো,চেয়ারম্যানের ছেলে বাপের ক্ষমতার জোরে বোধহয় পাশ করতে চায়।লেখাপড়ায় একেবারে মন নাই।উনার একটা কমন ডায়ালগ ছাত্রদের জন্য বরাদ্দ,লেখাপড়ায় একেবারে মন নাই।ফার্স্ট ইয়ারের সুখেন মাঝির ছেলে পরাণ উনার অগোচরে অভিনয় করে বলেন,লেখাপড়ায় একেবারে মন নাই।ধরা পড়ে কয়েকবার কান মলাও খেয়েছে বেচারা।হৃদয় কলেজ আঙিনায় ঢুকতেই প্রিন্সিপালের সঙ্গে দেখা।

তিনি চশমার উপর দিয়ে তাকিয়ে বললেন,তো হৃদয়হরণ বাবু,ভুল করে এদিকে আসলেন না তো?উনার নাম সুবাসচন্দ্র বসু।তবে ভারতবর্ষের নেতাজি নন।অাড়ালে তাকে ছাত্ররা ডাকে ‘সুচ স্যার’ বলে।কথার খোঁচা উনার চেয়ে আর কেউ ভালো দিতে পারেন না।অন্য স্যার ম্যামেরা তাই ওনাকে সমীহ করে চলেন-কথার কাঁটাছেড়া থেকে রক্ষা পেতে।হৃদয় উনার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।অথচ উনি ছাত্রদের শিক্ষা দেন মাথা উঁচু করে চলতে।কেবল তার সামনে গেলেই সকলের মাথা নিচু হয়ে যায়।

ক্লাসে ঢুকতেই রঘু এসে চেপে ধরল,তোর মতলব কি বলতো?

হৃদয় অবাক হয়ে বলল,মানে?কিসের মতলব?

রঘু ভাবুক হয়ে প্রশ্ন করল,টাকা মেরে দিবি না তো?তুই অাদৌ পরীক্ষাটা দিবি তো?

হৃদয় রঘুর মোটা ভুঁড়িতে খোঁচা মারল,তোর এই মোটা ভুঁড়ির মতো মাথাটাও মোটা আর ফাঁপা।পরীক্ষা না দিলে কার বেশি লস?তোর?না আমার?

রঘু মাথা চুলকালো,হুহু তোর মনে হয়।

হৃদয় রঘুর মাথায় হালকা চড় মেরে বলল,তাহলে বোঝ গাধা।

রঘু পুনরায় প্রশ্ন করল,তাহলে এ দু’দিন কলেজে এলি না কেন?

হৃদয় বলল,একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে গেছিলাম।

রঘু জিভ বের করে ঠোঁট চাটল,খুব খেলি না?

হৃদয় স্থির চোখে তাকিয়ে বলল,তোর খাওয়া ছাড়া আর কোন কথা নাই না?যেতাম নিয়ে।দু’পিচ গরুর গোশত খাইয়ে দিলে তোর ব্রাহ্মণজাত ঘুচতো।

রঘু হৃদয়ের থেকে দু’হাত সরে বসলো বেঞ্চে।ডান হাত দিয়ে পৈতা হাতিয়ে দেখে নিল।

তারপর বলল,যাহ।আমি কি জানতাম মিয়াদের বিয়ে!

হৃদয় ধাক্কা দিল,এ শালা মিয়া কি’রে।মুসলমান বলতে পারিস না।আমি যদি এখন তোকে মালাউন বলি।

কোচিং ছুটি হতে দুপুর দু’টো বেজে গেলো।

হৃদয় জোরে পা চালালেও পাক্কা এক ঘন্টা লাগবে।সাইকেলটা যে কেন অতো লোকের মাঝে রাখতে গেলো সে।টুটুল ভাইয়া নিশ্চয় আজ সকালে উনার বন্ধুদের নিয়ে চলে গেছেন।সইমা বলেছিল,অহন অবশ্য কয়েকটা দিন থাকবে।সকালে ও বাড়িতে না যেয়ে ভালো করেছে সে।গেলে সইমা,শর্মি ফুপি জোরাজোরি করতো টুশি আপুর শ্বশুরবাড়ি বউভাতে যাওয়ার জন্য।কতদূর।সেই ভেদরগঞ্জ থানা।হৃদয় বুঝতে শেখার পর সখিপুরের বাইরে যায় নি কখনো।একবার অবশ্য গিয়েছিলো জেলা সদরে।ক্লাস ফাইভে ছিলো তখন।হেডস্যারের সঙ্গে তারা কেবল কয়েকজন বাচাইকৃত ছাত্রছাত্রী।তর্কবিতর্ক প্রতিযোগিতায়।আর কোথাও যায় নি সে।বিকালে একবার মির্জাবাড়ি যেতে হবে তার।সাইকেলটা যদি পাওয়া যায়।কেউ যদি ভুল করে কিংবা দুষ্টু করে নিয়ে থাকে।ফেরতও তো দিতে পারে।মানুষের মনোতলের কি আর কূলকিনারা আছে?

ঘরে ঢুকে কলেজ ড্রেস খুলে লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে শুয়ে পড়ল।শরীরটা বেশ দুর্বল হয়ে গেছে এ দু’দিনে।আজ আর গোসল করে কাজ নেই তার।জ্বরটা যখন আসে নি।তখন গোসল না করাটা ভালো।

মর্জিনা খাবার নিয়ে ঘরে ঢুকল,আপনে পরশু রাতে আইবেন না,কইলেই পারতেন।খাবারগুলো নষ্ট হলো তো?

হৃদয় বলল,বেশি বকবক করিস না।তোর আম্মার মতো এখন ভাতের হিসাব করিস না।তার তো না হয় আমি সতীনের পুত।তোর আবার শত্রু হয়ে জন্ম নিলাম নাকি?

মর্জিনা টেবিলে খাবার রেখে বলল,বড় ভাইজান,এ্যামনে কইতে পারলেন?আমি কি আপনেরে তাই কইছি?

হৃদয় বলল,যা তো ঘ্যানরঘ্যানর করিস না।ক্ষুধা লাগছে খেতে দে।আর শোন,তুই যখনতখন আমার ঘরে ঢুকবি না।এখন বড় হয়েছিস।আসমা বেগম ভালো চোখে দেখবে না ব্যাপারটা।এরপর থেকে সখিনা ফুফু বা রহিমকে দিয়ে ভাত পাঠাবি আমার ঘরে।

মর্জিনা আজ শাড়ি পরেছে।চোখে কাজল।দু’পাশে বিনুনি করা চুল।সামনে এনে রেখেছে।কাজল চোখে জল টলমল করছে।পড়বার অপেক্ষায়।

হৃদয় প্রশ্ন করল,শাড়ি পেয়েছিস কোথায়?

মর্জিনা খুশি হলো,আমাকে কেমন লাগে বড় ভাইজান?ভালো লাগছে?আম্মায় দিছে,ওনার পুরান শাড়ি।

হৃদয় ভাতের প্লেটে হাত দিয়ে বলল,পুরান শাড়ি তা তো বুঝতে পারছি।আসমা বেগম যে কাউকে নতুন শাড়ি দিবে না,সেটা আমার থেকে ভালো কে জানে!হুম,ভালো লাগছে।

অভিমানে মর্জিনার চোখে আবার জল এসে গেল,শুধু ভালো লাগছে তাকে?হৃদয় ভাইজান কি তাকে কোনদিন ভালো করে দেখেছে?কি চায় সে!কেন ছুটে আসে বারবার।এ বাড়িতে সে ই তো একমাত্র হৃদয়ের খেয়াল রাখে।বড় নিষ্ঠুর পৃথিবীর পুরুষজাতিগুলো।

হৃদয় তাড়া দিল,বললাম না যেতে।খাওয়ার সময় ঘাড়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকলে,আমি খেতে পারি না।

মর্জিনা রেগে বলল,যাচ্ছি বাপু,যাচ্ছি।আর আসব নে আপনের ঘরে কোনদিন।হলো তো।

তড়িঘড়ি করে যেতে গিয়ে শাড়িতে পেঁচিয়ে পড়ার উপক্রম তার।হৃদয় খাওয়ার মনোযোগ নষ্ট না করে প্লেটের দিকে তাকিয়ে বলল,সামলাতে পারিস না তো পরিস কেন?সাবধানে হাট না।

দশ।

টুশির শ্বশুরবাড়ির বউভাত অনুষ্ঠান থেকে সকলে ফিরে এসেছে।

বিকালে হৃদয় মির্জাবাড়িতে গিয়ে দেখল টুটুল ভাইয়া তার বন্ধুদের নিয়ে এখনো যান নি।জয়নাল ভাইয়ের থেকে শুনল,সন্ধ্যার গাড়িতে যাবে।বউভাতে নিয়ে যাওয়া গাড়ি এখনো ছাড়ে নি।ইয়া বড় গাড়ি।মাইক্রো বাস না জানি কি ছাতা বলে!দশ-পনেরো জন অনায়াসে বসতে পারে কোন ঝামেলা ছাড়া।এসির বাতাস।আরামে ঘুম আসে।

হৃদয় পাঁচ-ছয় বছরের বাচ্চাদের মতো অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল,দশ-পনেরো জন?গাড়িটা এখন কই?

কথা না থামিয়ে আবার বলল,জয়নাল ভাই,আমি না কোনদিন এসিওয়ালা মাইক্রো বাস দেখিনি।ক্লাস ফাইভে থাকতে জেলা সদরে গিয়ে ছোট্ট একটা দুইটা প্রাইভেট কার দেখেছি।

জয়নাল বলল,ধুর,জানিস আমারও দেহনের শখ আছিলো।কিন্তু আকাশে মেঘ করেছে বলে কাঁচা রাস্তায় গাড়িটা ঢুকায় নি।দারোগাকান্দি ছোট বাজারে নাহি ড্রাইভারে গাড়িসহ থুয়ে আইছে।

হৃদয় আপ্লুত মনে বোঝাতে চেষ্টা করল,চলো না,তুমি আর আমি যেয়ে দেখে আসি।

জয়নাল প্রতিবাদ জানাল,আরে না।আমার ম্যালা কাম।গরুছাগল,হাঁস-মুরগি সব খোয়াড়ে তুলতে হবে নে।আয়েশা খালা বাইরের কাম করবো না।

হৃদয় হাত ধরে টেনে বলল,চলো না,জয়নাল ভাই।সন্ধ্যা হতে তো এখনো অনেক দেরি।

জয়নাল ভাই গরুর দড়িগুলো এক জায়গা করে বলল,ছাড় তো,আজান পড়লো বলে।জ্বালায় মারিস না।মাঠে যাতি হবে শীঘ্রই।

হৃদয়ের মন খারাপ হয়ে গেলো।

জিজ্ঞাসা করল,আমার সাইকেলের কোন খোঁজ পেলে?

জয়নাল ভাই যেতে যেতে বলল,না রে।আর পাবি না মনে কয়।

হৃদয় হালকা দৌড়ে জয়নালের কাছে এসে বলল,শোনো,জয়নাল ভাই,মেজকা কি চলে গেছে?

জয়নাল দাঁড়িয়ে পড়ল,খুব লাগিছে না?ব্যথা কুমিছে?

হৃদয় মাথা নাড়াল,ব্যথা নেই।মেজকা কি আর বেশি লাগবে তেমন মেরেছে।বলো?

জয়নাল মৃদু হেসে বলল,তুই বড় সরল মানুষ,হৃদয়।একটু বেশি ভালো।বেশি ভালো হয়া কিন্তু ভালো না।ভিতরবাড়ি যাবি তো?যাহ।বরকত কা বিহানে চলি গেছে।কয় ছুটি নাই।

হৃদয় বলল,আচ্ছা।

হৃদয় কাছারিঘরের দাওয়ায় বসে রইলো সন্ধ্যা ঘোর হওয়া অবধি।

সন্ধ্যার পর সদর দরজা মাড়িয়ে ভিতরবাড়ির ছোট উঠানে গিয়ে দাঁড়াল হৃদয়।

শর্মি এসে বলল,কি’রে কাল রাতে না বলে চলে গেলি কেন?মেজো ভাবি কতবার ভিতর বাহির করলো।আজ সারাদিনেও একবার এলি না।সবাই টুশির শ্বশুরবাড়ি গেলো।তুই ই একমাত্র গেলি না।

হৃদয় বলল,ফুপি,জানোই তো সামনে এক্সাম।পরপর দু’দিন কলেজের কোচিংয়ে যাওয়া হলো না।বিয়ের ঝামেলায়।আজ একটু গিয়েছিলাম।

শর্মি ধমক দিল,ফাজিল।আর একদিন কামাই হলে কি এমন হতো?

হৃদয় বলল,ছাড়ো তো।সইমা কই?

শর্মি হাতের কলস দেখিয়ে বলল,আমি পানি আনতে যাচ্ছি।তুই উপরে যা।টুটুল আর ওর বন্ধুরা চলে যাবে।মেজো ভাবিসহ সবাই আছে আম্মার ঘরে।বিদায় নিতে গেছে।তুই যা না।

শর্মি হাটা দিল।

ভিতরবাড়ির ছোট উঠানকোণে ডিপ টিউবওয়েলের ব্যবস্থায় পানি তোলা হয় এ বাড়িতে।হৃদয় সেদিকে একবার তাকিয়ে দক্ষিণের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।উঠে বামে দাদির ঘর।হৃদয় উঁকি দিয়ে দেখল।সকলে কথা বলছে।দাদির চোখে পড়ার আগে হৃদয় হাটা দিলো।

বাপ্পি ঘরে ঢুকে দরজা ভিজিয়ে দিল।তারপর দু’হাত বাড়িয়ে বলল,অহন,আমরা চলে যাচ্ছি।

অহনের মন গতকাল রাতে বাড়ি ফেরার পর থেকে খারাপ।কি এক মায়ায় জড়িয়ে বাপ্পি ফিরে যাবে।ভেদরগঞ্জ থেকে ফিরেই সে ঘরে ঢুকেছে।টুশিদের বাড়িতে গিয়েও তার কোনকিছুতে মন বসে নি।খাওয়াটাও হয় নি তেমন।অরুচিকর লাগছে সব।বাপ্পি ওই বাড়িতে ঘুরতে ফিরতে সুযোগ পেলেই অহনকে বারবার জিজ্ঞাসা করেছে,অহন কি হয়েছে তোমার?

অহনের কোন জবাবের ভাষা নাই।কেবল চোখ জলে ভরে আসছে।

টুশির শ্বশুরবাড়িটা দোতলা।উপরনিচ দিয়ে ছ’টা ঘর।রান্নাঘর কাঁচামাটির তৈরি।ছোট একখানা উঠান।অহনদের বসতে দিয়েছে উপরতলার বামে শেষ ঘরটায়।এ ঘরটা রাজুর।টুশির স্বামীর।আর মেয়েদের বিশ্রামের জন্য দিয়েছে নিচতলার মাঝের রুমে।টুটুল বসে উশখুশ করছিলো।

টুশি বলল,ভাইয়া।তমা আপুরা নিচতলায় বসেছে।তুমি গেলে যেতে পারো।

টুটুল একটা ফিকে হাসি দিল,আরে কি বলিস?আমি এমনি সব দেখছি।রাজু কোথায়?

টুশির ছোট ননদ চায়ের ট্রে হাতে নাস্তা নিয়ে এলো,ছোট ভাবি,কোথায় রাখবো?

টুশি সোফার সামনে রাখা ছোট্ট টেবিল দেখিয়ে বলল,ওখানে রাখো।

সে টেবিলে রেখে চলে গেলো।সঞ্জু একবার তাকাল।মন্দ নয়।মোটামুটি ভালো চেহারা।

কৌশিক আর সঞ্জু বসেছে সোফায়।বাপ্পি আর অহন পাশাপাশি টুশিদের নতুন বিছানায় বসেছে।টুটুল দাঁড়িয়ে এদিকওদিক দেখছিলো।তখন টুশি তমার কথাটা বলল।

পরবর্তীতে টুটুল চশমা ঠিক করে বলল,আচ্ছা,টুশি।তোর ভাসুর ননদ কয়’টা?

টুশি নতুন শাড়ির আঁচল ঠিক করল,বসে কথা বলো,ভাইয়া।এই যে দেখলে,এটা একমাত্র ননদ।আর বড় ভাসুর।বিয়ে করে নি।সামনে বিসিএস পরীক্ষা।পড়ুয়া পাগল।সকালে উঠেই ঢাকা চলে গেছে।বিয়ের জন্য কোনমতে এসেছিল।আর শ্বশুর-শাশুড়িকে তো নিচে দেখে এলে।

টুশি অহনের পাশে বসল,কি’রে কথা বলছিস না কেন?ভাইয়া তুমি বসো না।

টুটুল বসল।টুশি আবার উঠে সরবতের গ্লাস এগিয়ে দিল,সঞ্জু দাদা,নাও।কৌশিক দাদা,তুমিও নাও।

বাপ্পি আধশোয়া থেকে উঠে নিজেই নিলো।ফেসবুকিং করছিলো।আরেকটা গ্লাস অহনের দিকে বাড়িয়ে চোখ টিপলো।অহন হেসে গ্লাসটা নিলো।কৌশিক আড়চোখে তাকাল।

টুটুল সরবত শেষ করে বলল,আমি বরং একটু নিচে যাই।

টুশি বলল,চল,আমি নিয়ে যাচ্ছি।

টুটুল নামতে নামতে বলল,রাজু কোথায় বললি না তো।

টুশি জানাল,রাজু?সামনের বাড়ি প্যান্ডেল দেখলে না?বউভাতের জন্য করা।আমাদের উঠান তো দেখছই।ছোট।ওখানে গেছে বোধহয়।দাঁড়াও ডেকে পাঠাচ্ছি কাউকে দিয়ে।

টুটুল একটা হাসি দিল,বরের নাম ধরে ডাকিস নাকি?

টুশি পাল্টা হাসি দিল,ঐ আর কি!রাতে বলল যে…..!

টুশির কথা শেষ হওয়ার আগে তারা নিচে চলে এলো।

কৌশিক নিচু হয়ে সঞ্জুর কানে কানে বলল,সঞ্জু,ওয়াশরুমে যাওয়ার দরকার ছিলো।

সঞ্জু সরবতে শেষ চুমুক দিল,চল,এই ব্যালকনিতে বোধহয় দেখে এলাম ওয়াশরুম।

ওরা রুম থেকে বের হওয়ার পর বাপ্পি অহনের ধরে রাখা-না খাওয়া সরবতের গ্লাস নিয়ে ছোট্ট টেবিলে রাখল।অহনকে টেনে নিজের বাহুবন্ধ করল।

টুক করে তার তুলতুলে গালে একটা চুমু দিয়ে বলল,তোমার কি হয়েছে বলো তো?এমন মন ভার করে আছো কেন?

অহন নিজেকে ছাড়িয়ে নিল,ছাড়েন,বাপ্পি ভাইয়া।হঠাৎ কেউ এসে পড়বে।

বাপ্পি পিছন থেকে পাঁজাকোলা করে আবার জড়িয়ে ধরল।

অহনের ঘাড়ে ঠোঁট ছুয়ে বলল,দেখুক।আগে বলো তোমার কি হয়েছে?

অহন আবার নিজে ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করল।বলল,কিছু হয় নি তো।

বাপ্পি অহনের মুখ ঘুরিয়ে নিজের দিকে করল,আমরা চলে যাবো বলে মন খারাপ?আমার দুষ্টু মিষ্টি বাবুটার।

অহন অভিমান ভরা কন্ঠে বলল,জানি না তো।এমনিই ভালো লাগছে না।

বাপ্পি বলল,ওকে।শোনো,তুমি এমন গোমড়ামুখ করে থাকলে না আমি এ বাড়ির কিছু খাবো না।দেখো।

অহন বড়চোখ করে তাকাল,বাপ্পি ভাইয়া,বেশি হয়ে যাচ্ছে।আমি কই গোমড়ামুখে থাকলাম?

বাপ্পি হেসে বলল,তাহলে একটু হাসো।

বাপ্পি নিজের আধখাওয়া সরবতের গ্লাস এনে অহনের ঠোঁটের কাছে ধরল।

অহন আড়চোখে তাকাল,কি করবো?

বাপ্পি মুচকি হাসল,খাবে।আমি অর্ধেকটা খেয়েছি।বাকিটা তুমি খাবে।

অহন প্রতিবাদ করল,বেশি মিষ্টি হয়ে গেছে।আমি নিজেরটা তাই খেলাম না।আমি মিষ্টি খেতে পারি না।গা গুলোই।

বাপ্পি কটাক্ষ রাগ দেখাল,না খেয়েই বললে মিষ্টি হয়ে গেছে।ফাজিল।

অহন দুষ্টু হাসি দিল।বাপ্পি নিজের ঠোঁট গ্লাসের অপর পাশে এনে বলল,সরবত যদি মিষ্টি হয়ে থাকে খেয়ো না।আমার এই মিষ্টি তো খেতেই পারো।রাতে খেতে গিয়ে তো আমি বেচারা বিপদে ফেঁসে যাচ্ছিল।কি সাংঘাতিক।

অহন উঁচু হয়ে সরবতের গ্লাসটা নিয়ে ঢকঢক করে গ্লাসে থাক বাকি অর্ধেক সরবতটুকু শেষ করল,শান্তি হয়েছে?

বাপ্পি আবার মুচকি হাসি দিল,আহ।খুব শান্তি হয়েছে।

তারপর থেকে ঐ বাড়িতে দু’জনের সুযোগ খুব কম হয়েছে।কিছু মুহূর্ত হঠাৎ হাত ধরা।নজর পড়ার আগে ছেড়ে দেওয়া।এভাবে খুনসুটিতে চলে গেলো আজকের সারাদিন।

বাপ্পির বাড়িয়ে দেওয়া হাত দেখে অহন আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারলো না।দৌড়ে এসে বাপ্পির বুকে পড়ল।মুদু ধাক্কার তাল বাপ্পি দরজায় পিঠ বাধিয়ে সামলে নিল।

অনেকক্ষণ পর বাপ্পি অহনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,বোকা ছেলে!কাঁদছো কেন?আমি তো বললাম আমি রোজ ফোন করবো।

অহন আরো আষ্টেপৃষ্ঠে বাপ্পিকে জড়িয়ে ধরল।বাপ্পির বুকে মুখ গুঁজে আছে।

এই প্রথম কোন চাওয়া।পাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা।অহনের শরীর মনকে ঘিরে ফেলেছে।এটা হয়তো ভালোবাসা নয়।মোহ কিংবা আবেগ।কিন্তু বাপ্পির ক্ষেত্রে কি সেটা বলা চলে?সে তো প্রাপ্তবয়স্ক।চাওয়াপাওয়ার অর্থের সাথে জীবনের অন্ধকার কিংবা আলোর গলির পথ চেনে।তাহলে তাকে কোন মোহাস্ত্র ঘায়েল করলো।অহনকে ছেড়ে যেতে তার বুকে কেন এতো ব্যথা?সে তো এখানের গল্পটা নিতান্ত গল্পই ভেবেছে।যেটা রাজশাহী গিয়ে দুঃস্বপ্ন ভেবে ভুলে যাবে।মির্জাবাড়ি।মির্জাবাড়ির প্রতিটি মানুষ।অধিস্নেহে মানুষ হওয়া বাড়ির ছোট ছেলে অহনকেও।কিন্তু সে কি আদৌ পারবে?এখানে দু’দিনের তৈরি হওয়া জীবনের গল্পকে ভুলে যেতে!অহনের মাথার উপর টপাটপ দু’ফোঁটা গরম জল পড়লো।

বাপ্পি কাঁদছে।

অহন মাথা তুলে বলল,আপনিও যে কাঁদছেন!আপনি থেকে যান না?

বাপ্পির কাঁন্নার মাঝেও হাসি পেল।

ভেজা গলায় বলল,তাই হয় নাকি?এভাবে থাকা যায়।তাছাড়া আমার ক্লাস চলছে।তার মাঝে এসেছে ম্যানেজ করে।মন খারাপ করো না।আমি টুটুলের সঙ্গে আবার আসবো এ বাড়িতে।বড় মায়া পড়ে গেছে।

অহন আদুরে গলায় বলল,এরপর এলে এতোগুলো বন্ধু সঙ্গে আনবেন না?

বাপ্পি অহনের কপালে চুমু দিল,তাহলে বরং আমি ঢাকাতে যাবো!কেমন হবে?

অহনের ঠোঁটে প্রশস্ত হাসি ফুটল,দারুন হবে।

বাপ্পি সে হাসিকে যেন মলিনতায় ভরে দিল।বলল,মামা-মামীকে কি বলবে?আমি তোমার কে হয়?বন্ধু তো বলতে পারবে না।

অহন দ্বিধায় পড়ল,তাই তো।সেটা তো ভেবে দেখি নি।বন্ধু তো বলা যাবে না।

বাপ্পি সেটার প্রফুল্লিত সমাধান দিল,মন খারাপ করো না,অহন বাবু।আমার ডাক্তার হলে-আমি ঢাকায় কোন হাসপাতালে জয়েন্ট করবো।তারপর ছোট্ট একটা বাসা নিবো।তারপর শুধু তুমি আর আমি।হ্যাপি?

অহন আবার জড়িয়ে ধরল।বাপ্পি অহনকে ছাড়িয়ে নিচু হয়ে নিজের ঠোঁট দেখিয়ে বলল,আমারটা চাই।আমি দিতে গেলে তো আবার কি না কি হয়ে যায়।হাহাহা..!

অহন চোখ বন্ধ করল।ধীরে ধীরে ঠোঁট দু’টি এগিয়ে বাপ্পির কোমল ঠোঁটে রাখল।খুব হালকা।অথচ আবেদনময় একটা চুমু দিল।বাপ্পিও চোখ বন্ধ করল।তারপর দু’জনের নিঃশ্বাস ভারী হওয়ার আগেই বাপ্পি সোজা হয়ে দাঁড়াল।অহনের চোখ মুছিয়ে তুলতুল দু’গালে দু’টি চুমু দিল।

জড়িয়ে ধরে বলল,আসি তবে।ভালো থেকো।আর আমি ব্যস্ত থাকলেও তুমি অন্তত রোজ একটা মিস কল দিও।মনে থাকবে তো?

অহন মাথা নাড়াল।

বাপ্পি তাকে ছেড়ে দিয়ে বলল,সবাই বোধহয় এতক্ষণ নিচে চলে গেছে।তুমি নিচে যাবে না?

অহন বলল,আপনি যান।আমি এখানেই থাকি।নিচে গেলে সবাই বুঝে যাবে কিছু একটা হয়েছে।তাছাড়া আপনাকে যত দেখবো তত খারাপ লাগবে এখন।

বাপ্পি ‘আচ্ছা,তবে যাই’ বলে ভেজানো দরজা খুলল।বাপ্পি দরজার খোলার সেকেন্ড পাঁচেক আগে একটা মানুষ দরজার ওপাশ থেকে সরে দাঁড়াল।

নিচতলার ছোট উঠানে সবাই দাঁড়িয়ে আছে।

বাপ্পি আসতেই সঞ্জু ফিসফিস করে প্রশ্ন করল,কি’রে কই ছিলি?দেরি হয়ে যাচ্ছে তো।আকাশে মেঘ করেছে।

কৌশিকের দিকে একবার চেয়ে সঞ্জু আবার বলল,শুধু আকাশে নয়,ওদিকে দেখ।ফিরে চল,দেখবি কেমন লাগে।

বাপ্পি দাঁত চেপে বলল,আমার জিনিস আমি সামলাবো।ডোন্ট ওভার অ্যাক্ট।

টুটুল এগিয়ে এসে বলল,কি’রে কি ফিসফাস করছিস?চল এবার।সন্ধ্যা হয়ে গেলো।

‘হুম’ বলে বাপ্পি রেবেকাকে সালাম করল।সেটা দেখে তমা মাসুমাকে করতে এগিয়ে গেল।একে একে সবাই রেবেকা,মাসুমা,রফিককে সালাম করলো।

বাপ্পি শর্মিকে সালাম করতে গেলে শর্মি লাফিয়ে উঠল,এই আমাকে না।

টুটুল চশমা ঠিক করতে করতে বলল,আরে বাদ দে।শর্মি ফুপি আর আমি সমবয়সী।ওকে সালাম করা লাগবে না।

রফিক বলল,চলো বাপরা।তোমাদের দারোগাকান্দি ছোট বাজার গাড়ির কাছ পর্যন্ত দিয়ে আসি।

মির্জাবাড়ির সদর দরজা পেরিয়ে তারা কাছারিঘরের সামনের কাঁচা রাস্তায় পড়া মাত্রই ভিতর বাড়ির দোতলার বারান্দা থেকে হৃদয়ের মুদৃ চিৎকার ভেসে এলো।যে চিৎকারের শব্দ এদের কানে এলো না।

(ষষ্ঠ পর্ব)

>
বিঃদ্রঃ তোমার একটিমাত্র জীবন যদি প্রেমহীন থেকে যায়,শর্তহীন দলিলে যদি কোন বিবাদীর নাম লেখা না থাকে,অনাবিষ্কৃত ভালোলাগা যদি তোমার ঠোঁটের আঙ্গিনায় বিরহ না জাগায়,একটিমাত্র জীবনে তুমি যদি কলঙ্ক এর সুখই না পেলে-তবে তুমি…!তবে তুমি আমার গল্প পড়ো না।
>

এগারো।

হৃদয় দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে ডাকল,সইমা।অহন কেমন জানি করছে।শীঘ্রই আসো।

উঠান থেকে দৌড়ে সবাই উপরে উঠতে লাগল।বাড়িতে পুরুষ মানুষ বলতে আর কেউ নেই।জয়নাল ভিতরবাড়ি খুব কম আসে।না ডেকে পাঠালে আসা হয় না তার।হৃদয় দৌড়ে আবার অহনের রুমে গেল।অহন বিছানায় ছটফট করছে শ্বাস নেওয়ার জন্য।হৃদয় সারা রুম ইতিমধ্যে তছনছ করে ফেলেছে।ইনহেলার কোথাও নাই।ব্যাগে আবার খু্ঁজতে লাগলো।
রেবেকা তড়িঘড়ি করে রুমে ঢুকে বিছানা হতে অহনকে টেনে কোলে শোয়ালো,কষ্ট হচ্ছে বাপ?শর্মি দেখ না ওর ইনহেলারটা কই গেলো!
মাসুমা শর্মি দু’জনেই খু্ঁজতে লাগলো।
মাসুমা বলল,কি’রে হৃদয় পেলি বাপ?
হৃদয় হতাশ হয়ে বলল,না বড়মা।সারা রুম,ওর ব্যাগ সব দেখেছি কোথাও নাই।
শর্মি বলল,হৃদয়,তুই কাল রাতে অহনের ঘর থেকে কি নিয়েছিলি?
হৃদয়ের মনে পড়ল।কাল স্কুল মাঠে যখন অহনের শ্বাসকষ্ট উঠেছিলো তখন সে দৌড়ে ইনহেলার নিয়ে গেছিল।সেটা ওখানেই ফেলে এসেছে।কেউ মনে করে আনে নি।
হৃদয় নিজেও জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে বলল,ফুপি,সেটা তো বোধহয় কাল রাতে স্কুল মাঠে ফেলে এসেছে।কেউ মনে করে আনে নি।এখন কি হবে?আমি এক দৌড়ে যাবো?নিয়ে আসি।
শর্মি বলল,ওরে বাপ,ওটা কি ওখানে এখন পাবি?সারাদিন স্কুলের বাচ্চারা মাঠে খেলেছে।কে না কে নিয়ে গেছে।
হৃদয় হতাশ হয়ে গেল।
তার চোখে জল চলে এল,তাহলে এখন কি হবে ফুপি?
মাসুমা বলল,হৃদয়,ওকে পাঁজাকোলা করে ধর তুই।উপজেলা হাসপাতালে চল।শর্মি জয়নালকে ডেকে আন।
রেবেকা অহনের বুকের উপর পড়ে কাঁন্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে ইতিমধ্যে।এক মিনিটের ভিতর রেবেকা বেহুশ হয়ে গেল।শর্মি দ্রুত গিয়ে রেবেকাকে ধরে অহনের গায়ের উপর থেকে সরালো।অহনের শ্বাসের টান আরো বেড়ে গেছে।
শর্মি রেবেকাকে শুয়ে দিল।জয়নালকে দিয়ে ভ্যানগাড়ির ব্যবস্থা করতে হবে।শর্মি দ্রুত বেরিয়ে গেল।মাসুমা এসে অহনকে ধরলো।হৃদয়ের বুকের ভিতর ধড়ফড় ধড়ফড় করছে।হাসপাতালে নিতে নিতে অনেক দেরি হয়ে যাবে।অহনের কিছু একটা হয়ে গেলে তার সইমাকে বাঁচানো দায় হয়ে যাবে।
হৃদয় মাসুমার কাছে গিয়ে বলল,বড়মা।তুমি একটু বাইরে যাও,প্লিজ।আমি অহনকে দেখছি।
মাসুমা রেগে গেল,কি সব বলছিস আবোলতাবোল?দেখছিস না ছেলেটা দম নেওয়ার জন্য ছটফট করছে।
হৃদয় ফ্লোরে বসে পড়ল।
মাসুমার পায়ে ধরে বলল,প্লিজ,বড়মা।কয়েক মিনিটেরই তো ব্যাপার।তুমি থাকলে আমি কাজটা করতে পারবো না।আমার উপর একটু ভরসা রাখো।
হৃদয়ের বুক চিরে যাচ্ছে কথাগুলো বলতে।সে কোনদিন এ বাড়ির কারোর সঙ্গে এমন ব্যবহার করে নি।আজ তার বড়মাকে বের করে দিতে হচ্ছে রুম থেকে।মাসুমা থাকলে সে যে কাজ টা করতে পারবে না।
মাসুমা নিচু হয়ে হৃদয়ের হাত ছাড়ালো নিজের পা থেকে।হৃদয়ের মাথায় হাত রেখে বলল,তোর উপর আমার কেন;এ বাড়ির সবার ভরসা আছে।আমি যাচ্ছি,বাপ।

মাসুমা দরজার বাইরে এসে দাঁড়াল।

হৃদয় দরজা বন্ধ করে দিলো।বিছানায় এসে অহনের মাথাটা নিজের কোলে নিলো।বিছানার অন্যপাশে বেরেকা বেহুশ হয়ে পড়ে আছে।অহন একবার হৃদয়ের চোখের দিকে চোখ উল্টিয়ে তাকাল।তারপর আগের বেশি দ্বিগুন শব্দে শ্বাস টান দিলো।হৃদয় আর মুহূর্তকাল দেরি না করে অহনের তুলার মতো ঠোঁটে ঠোঁট বসিয়ে দিলো।নিজের দেহের রক্তরস থেকে ফুসফুসচক্রের মাধ্যমে ফিরে আসা কার্বন ডাই-অক্সাইড নাসিকাবদলি করে মুখে এনে সজোরে অহনের মুখে ফুঁ দিয়ে ছেড়ে দিলো।তারপর ঠোঁট থেকে ঠোঁট না উঠিয়ে জোরে অহনের শ্বাসনালী হতে ফিরে আসা বাতাস মুখে টেনে নিয়ে আবার ছেড়ে দিলো।মাথা চক্কর দিলো তার।সেটা আমলে না এনে কয়েকবার কাজটা করতেই অহন স্বাভাবিক শ্বাস নিতে শুরু করলো।অহন চোখ খুলে হৃদয়ের দিকে তাকাল।হৃদয়ের তখনও অহনের ঠোঁটের সঙ্গে লাগানো।হৃদয়ের শরীর এবার বৈদ্যুতিক শকের মতো ঝাড়া দিলো।
দ্রুত মুখ তুলে নিয়ে বলল,এখন ভালো লাগছে?
অহন মাথা নাড়াল।শব্দ করলো না।হৃদয় একটা বালিশ টেনে অহনের মাথা তাতে রেখে বলল,চুপটি করে শুয়ে থাকো।আমি আসছি।
দরজা খুলে বলল,বড়মা হাসপাতালে নেওয়া লাগবে না।অহন ঠিক আছে।তুমি ভিতরে যাও।আমি পানি নিয়ে আসি সইমার জ্ঞান ফেরাতে হবে।
মাসুমা কোন কথা বলার ভাষার খুঁজে পেল না।
সজল চোখে হৃদয়ের দু’গাল ধরে বলল,বাপ,তুই হাজার বছর বেঁচে থাক।
হৃদয় হঠাৎ মাসুমাকে জড়িয়ে ধরল,বড়মা,তুমি অহনের আয়ুষ্কাল কামনা করো।আমি চাই আমার রাজপুত্র হাজার বছর বেঁচে থাকুক।
শর্মি আর জয়নাল দৌড়ে এলো।
শর্মি বলল,বড় ভাবি,জয়নাল কাকা অহনকে নিচে নিয়ে যাক।আমি মেজো ভাবিকে দেখছি।
মাসুমা হৃদয়কে ছেড়ে দিয়ে চোখ মুছল,তার আর দরকার নেই।অহন ঠিক আছে।জয়নাল তুই বাইরে যা।
জয়নাল মাথা নাড়াল,আইচ্ছা,বড়মা।দরকার পড়িলে ডাইকবেন।
অহন তাড়াহুড়ো করে উঠে বসে রেবেকাকে ডাকতে লাগলো,আম্মু,আম্মু।কি হয়েছে তোমার?
হৃদয় পানি আনতে দৌড়ে গেল।শর্মি আর মাসুমা রুমের ভিতর ঢুকল।
শর্মি অহনকে ধরে বলল,তুই শুয়ে পড়,বাপ।আমরা দেখছি।
হৃদয় পানি এনে রেবেকার চোখে-মুখে ছিটালো।অহন তার একমাত্র ছেলে।বড় আদরের।বিয়ের পাঁচ বছর পর,ফকির-কবিরাজ দেখিয়ে,আল্লাহর কাছে কেঁদেকেটে তার এই নাড়িছেঁড়া ধন।তারপর আটবছর পর এলো অহনা।

মাইক্রোতে ড্রাইভারের পিছনের সিটে টুটুল আর তমা।বেশ আরামে বসেছে।ড্রাইভারের পাশের সিটে কেউ নেই।সঞ্জু একেবারে পিছনের সিটে কৌশিক আর বাপ্পির মাঝে বসেছে।কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে তার!
কৌশিককে বলল,তুই মাঝে বোস না।আমাকে সাইডে দে।
কৌশিক রাগী চোখে তাকাল।
সঞ্জু হালকা রাগ ঝাড়ল,আরে বাবা,তোদের মধ্যে কি হয়েছে তা নিয়ে আমাকে কেন মারছিস?
কৌশিক শান্তভাবে বলল,বেশি বকবক করলে আমি নেমে যাবো বললাম।
বাপ্পি বলল,সঞ্জু,থাক না ভাই।প্লিজ কুশকে ঘাটিস না।বেশি সময় লাগবে না।একটা ঘুম দে।
সঞ্জু ছোট ছোট করে কাটা কথায় বোঝাল,ঐ দেখ না।সামনের দু’টোকে।কপোত কপোতী।কি সুন্দর পাশাপাশি বসে যাচ্ছে।তোরা আয় মাঝে রেখে পিষছিস কেন রে?
বাপ্পি বলল,বাজে কথা বলিস না।যথেষ্ট জায়গা আছে,মাইক্রোটা নেহাৎ ছোট নয়।আর একটু আস্তে ইয়ার।টুটুল তমা বুঝলে কপালে শনি আছে।
সঞ্জু বিদ্রুপ করল,শুনবে না রে।ওদের এখন কান নেই বললেই চলে।
বাপ্পি প্রতিবাদ করল,তোকে বলেছে।টুটুলকে দেখিস না ক্যাবলাকান্ত!মোটেও সেটা না।তেমন হলে না তমার মতো মেয়েকে ও ধরতে পারতো না।কই তুই পেরেছিস তমা কে ধরতে!
সঞ্জু হঠাৎ ধাক্কা খেলো।বুকের ভিতর যেন হাতুড়ি পেটানোর শব্দ।কৌশিক তাকিয়ে একবার ফিক করে বাচ্চাদের মতো হাসল।তারপর কাঁচের ভিতর দিয়ে বাইরে তাকালো।দূরের কোন গ্রামে জোনাকি পোকার মতো শতসহস্র মুদু আলো জ্বলছে।নিভছে।সে ভাবছে,বাপ্পি কি আদৌ তাকে ভালোবাসে?নাকি এটা কেবল একটা অভ্যাস।বাপ্পির স্বভাবে পেয়ে বসেছে তার শরীরটা।কারন সে শারীরিক কিংবা মানসিকভাবে অসুস্থ থাকলেও কোনদিন বাপ্পিকে ফিরিয়ে দেয় নি।বাপ্পি যখন তার শরীরটা চেয়েছে তখন সে রাজি হয়েছে।নিজের কষ্ট হলেও।যেন কেবল বাপ্পি খুশি হয়।কষ্ট না পায়।ভালো থাকে।আর…?আর শুধু কৌশিককে একটু ভালোবাসে।

মেডিকেলে তৃতীয়ে বর্ষে এসে বাপ্পির সঙ্গে কৌশিকের আন্তরিকতা।তারপর দু’জন দু’জনকে অনুভব করা।অনুভূতির অস্তিত্ব বুঝতে চেষ্টা করা।একদিন বাপ্পি-তার মতো কালো একটা ছেলেকে ভালোবাসার প্রস্তাব দিয়েছিল।সেটা কি নিছক কামনাপরাগ ছিলো?যদিও কৌশিক কালো,তবুও তার চেহারায় একটা মায়া।একটা ভালোলাগা আছে।গত এক বছরে বাপ্পি কৌশিকের সহস্রাধিক ছবি তুলেছে।তাহলে মির্জাবাড়িতে যাওয়াটা কি তার বড় ভুল ছিলো?ফিরে গিয়ে সে বাপ্পির মুখোমুখি হবে!বাপ্পি না চাইলে তো সম্পর্কটাই থাকবে না।বন্ধুত্ব তো থাকতে পারে।আর ভালোবাসা….!সেটা হয়তো একান্তে।একান্ত।একপক্ষীয়ভাবে কৌশিকের কাছে রয়ে যাবে।

বাপ্পি ক্যামেরা স্ক্রিনে অহনের ছবিগুলো দেখছে।কোনটাই মিষ্টি হাসি।কোনটাই দুষ্টুমির চাউনি।না হলে কোনটাতে মন খারাপ।গভীর অনুরাগের ছোঁয়া।টুশির শ্বশুরবাড়িতে যে ছবিগুলো তোলা।তার অধিকাংশে অহনের মন খারাপের গল্পে ভরা।বাপ্পি ছবিগুলো পাল্টে বারবার দেখছিলো।
একটা ছবিতে চোখটা ভীষণভাবে আটকে গেল।বিয়ের দিন প্যান্ডেলে খাওয়াদাওয়ার পর অহনকে ফোন করে বাপ্পি যখন জানলো অহন কাছারিঘরের সামনে পুকুর পাড়ে,তখন সে একলা গিয়ে দেখলো-পুকুরের উত্তরপাড়ে অহন একটা নারিকেল গাছে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।বাপ্পি পিছনে গিয়ে কাশিতে শব্দ করলো।
অহন তাকিয়ে মিষ্টি হাসল,কতো মানুষে বাড়ি গিজগিজ করছে।তাই পুকুরপাড়ে এলাম।ভীষণ গরম পড়েছে না?
সত্যি বলতে কি বাপ্পিও ভীষণ ঘেমে গেছিল।শার্ট লেপ্টে গেছে গায়ের সঙ্গে।বলল,হুম।তোমাদের এদিকে একটু গরম বেশি।
অহন শার্টের উপরের কটি খুলে ফেলে বলল,বোধহয়।
পুকুরপাড়ে রফিক বাঁশের মাচা তৈরি করেছে।এখানে বসে সে মাছ ধরে বড়শিতে।অহন সেখানে বসল।বাপ্পি তার পাশে গা ঘেষে বসল।অহন ঘেমেছে।তবুও অহনের গা থেকে কেমন একটা মিষ্টি গন্ধ আসছে।বাপ্পি বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলো।মদিরতায় ভরা কেমন।সেও পারফিউম ব্যবহার করে।তবে নিজের গায়ের গন্ধের সঙ্গে পারফিউম মিশ্রণ কেমন তা সে জানে না।সেটা হয়তো একমাত্র কৌশিক জানে।কৌশিকের সঙ্গে বিছানা অন্তরঙ্গতায় জড়িয়েছে একশ রাত পেরিয়ে গেছে।সে হিসাবে তার গায়ের গন্ধ কৌশিকের মস্তিষ্কের ন্যাসাল মেমব্রেন দখল করে থাকার কথা।
বাপ্পি রুমাল বের করে ঘাম মুছল,অহন,তোমার তো অনেক সিঙ্গেল ছবি তুললাম।আমার সাথে একটা ছবি তুলবে?
অহন মুচকি হাসল,আমি তো মানা করি নি।আর মানা করলে কি আপনি শুনছেন?পিছন পিছন ঘুরে অন্তত আমার হাজারখানেক ছবি তুলে ফেলেছেন।
বাপ্পি একটা ছোট পেয়ারা গাছের ডালে ক্যামেরা স্থির করলো।টাইমার সেট করে অহনের কাছে এসে বসলো।পরে দেখা গেলো বাপ্পি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে।আর অহন বড় বড় মায়াবী চোখে বাপ্পির দিকে তাকিয়ে আছে।
বাপ্পির মুচকি মুচকি হাসি দেখে সঞ্জু ক্যামেরা স্ক্রিনে তাকাল,কি’রে কি দেখে হাসছিস?
বাপ্পি বা হাতের তর্জনী আঙ্গুল নিজের ঠোঁটে ছোঁয়ালো,চুপ।একটা কথাও না।
সঞ্জু চুপ হয়ে গেলো।বাপ্পি কৌশিকের দিকে তাকালো।আচ্ছা,কৌশিক কি সব বুঝতে পারছে?সে তো কৌশিককে ঠকাতে পারে না।সে অধিকার তার নেই।কৌশিক তাকে অনেক ভালোবাসে।সেটা যেমন সত্য।তেমন মাত্র বাহান্ন ঘন্টায় অহনের জন্য তার ভিতর যে অনুভূতি।তাও সত্য।সে বুঝতে পারছে কৌশিক অভিমান করে আছে তার উপর।অভিমান হওয়াটা স্বাভাবিক।তার যথেষ্ট কারনও আছে।কিন্তু অহনের সাথে যে বন্ধনটা গড়ল তার অচেতন মন।সেটা ভালোবাসা তো?নাকি কেবল মাত্র ভালোলাগা!মোহ কেটে গেলে কি এই ভালোবাসা সর্বোপরি ভালোলাগাই হোক সেটা আর থাকবে না?
বাপ্পির বুকের ভিতর চিনচিন ব্যথা অনুভব হলো।কৌশিক যে ভালো নেই সেটা বাপ্পি চর্মচক্ষুতে অবলোকন করতে পারছে।কিন্তু তার মনোচক্ষু কেন যেন বারবার বলছে অহন ভালো নেই।
বাপ্পি এবার অস্পষ্ট স্বরে বলল,সত্যি কি অহন ভালো নেই?
সঞ্জু বলল,বাপ্পি,এই।বিড়বিড় করে কি বলিস?
‘কিছু না রে’ বলে বাপ্পি সিট নিচু করে গা এলিয়ে দেয়।

আর কতদূর!এলোই বা কতদূরে তারা।

এক গ্লাস দুধ খেয়ে অহন ঘুমিয়ে পড়েছে।শর্মি,মাসুমা চলে গেছে।রেবেকা হৃদয়কে কাছে ডাকল।হৃদয় অহনের পায়ের কাছে বসে ছিলো।উঠে গিয়ে ফ্লোরে রেবেকার পায়ের কাছে বসলো।রেবেকা বলল,নিচে বসেছিস কেন?উঠে বোস।
হৃদয় বলল,না,সইমা।এখানেই ভালো লাগছে।
অহনের রুমে বক্সখাট।ফ্লোর থেকে হাতখানেক উচুঁ।হৃদয় মাথাটা রেবেকার কোলের উপর রাখল।রেবেকা হৃদয়ের চুলে বিলি কাটছিল।বলল,অনেক ভয় পেয়েছিস?রাজপুত্রকে খুব ভালোবাসিস না?
হৃদয় মাথা নাড়াল,কি যে বলো তুমি?ভালোবাসবো না।ভাই হয় তো।তুমি আমাদের তিন ভাইবোনের মা।জগতের সবচেয়ে ভালো মা।
রেবেকা আপসোস করল,তোর রাজপুত্রটা কেন যে তোকে দু’চোখে দেখতে পারে না!বড় অদ্ভুত লাগে।অথচ দেখ,তুই ওকে কত ভালোবাসিস।
হৃদয় আপত্তি করল,সইমা।ও ছোট মানুষ।বড় হোক একদিন ঠিক বুঝবে।
রেবেকা হাসল,তুই যেন কত বড়!তোরা মাত্র দুই বছরের ছোটোবড়ো!
হৃদয় শান্ত কন্ঠে বলল,আমি যে পরিস্থিতিতে পড়ে বয়সের তুলনায় অনেক বড় হয়ে গেছি,সইমা।
রেবেকা তাড়া দিল,হয়েছে।পাকা পাকা কথা বলতে হবে না।বাড়ি ফিরবি?
হৃদয় মাথা তুলে বলল,হ্যাঁ,সইমা।জানোই তো সামনে এক্সাম।অনেক পড়া বাকি।
রেবেকা বলল,অহন অসুস্থ হয়ে পড়াই রাত হয়ে গেল তোর।দু’টো খেয়ে যা।বিয়ের দিন কাজকর্মে কি খেয়েছিস,না খেয়েছিস!
হৃদয় তো বিয়ের দিন এ বাড়ির পানিও মুখে দেয় নি।সেটা যে সে বলতে পারবে না।
তড়িঘড়ি করে উঠে বলল,না,সইমা।আর খাবো না।অনেক রাত হলো।যেতে দেরি হয়ে যাবে।আকাশে মেঘও করেছে।বসন্তের প্রথম বৃষ্টি দিয়ে যাবে বোধহয়।
রেবেকা বলল,আজ রাতে তোর রাজপুত্রের কাছে থেকে যা।
হৃদয় উঠে দাঁড়াল,পাগল হয়েছো?মাঝরাতে আমাকে আধমরা করে ফেলবে।অহনাকে শর্মি ফুপির কাছে রেখে,তুমিই শুয়ে পড়ো তোমার আদরের ছেলের কাছে।

হৃদয় অহনের ঘুমন্ত মুখের দিকে একবার তাকিয়ে বেরিয়ে এলো।

বারো।

কলেজ থেকে ফেরার সময় আরশিনগর বড় বাজার পড়ে।হৃদয়ের আর হাটতে ইচ্ছা করছে না।গাড়িতে উঠার মতো টাকাও পকেটে নাই।কলেজে আসার সময় মর্জিনা একগাদা পান্তাভাত এনে মুখের কাছে রাখছে।তার মানে মর্জিনা আজ সুযোগ পায় নি গরম ভাত সরানোর।নাকি গতকাল বিকেলের প্রতিশোধ নিলো।মাঝে মাঝে মর্জিনা এমনই করে।রাগ বা অভিমান হলে হৃদয়কে সেদিন পান্তাভাত খেতে হয়।সকালে আসমা বেগমের চোখ এড়িয়ে আর গরম ভাত,তরকারী সরাই না।
রহিম মাঝে মাঝে আপসোস করে।মর্জিনাকে বলে,আমার জন্যিও তো পারস দু’টো গরম ভাত আনতে।রোজ বিহানে পান্তা খাইতে ভালো লাগে না রে।
মর্জিনা মুখে ভেঙচি কেটে বলে,আমার কি ঠ্যাকা পড়ছে নি।আমি তোর বউ লাগি?
রহিম ভাবে,হ মর্জিনা বউ হলে মন্দ হতো না।সখিনা খালা তাকে বড় আদর করে।ছেলের মতো।
রহিম হেসে বলে,আমার বউ হয়োনের ম্যালা শখ?মর্জিনা সেদিন পান্তাভাতে গুড় বা পেয়াজ মরিচ কিছুই দেয় না।
মুখ ভেঙচিয়ে বলে,আজ লবন দিয়ে খাইয়ে নিন।আম্মায় গুড় দিবো না।মরিচে নাকি ম্যালা দাম।রহিম সোজা।সরল মানুষ।বিশ্বাস করে।লবন দিয়ে পান্তাভাত খেয়ে উঠে।
পেটের ভিতর ইঁদুর দৌড়াচ্ছে হৃদয়ের।পান্তাভাত খেতে ভালো লাগছিল না,বলে খেলো না।এখন ভাবছে খেলে ভালো হতো।
হঠাৎ তার একখান হাতে টান পড়লো।বোরকা পরা একটা মেয়ে।অবশ্য মহিলাও হতে পারে।হৃদয়ের হাত ধরেছে।
হৃদয় ঢোঁক গিলল,কে আপনি?কি চান?
হাসির শব্দে বোঝা গেল একটা মেয়ে।বলল,তুই দেখি ভারী ভীতু।তাহলে সেদিন অমন জায়গায় কেমনে গিয়েছিলি?
কণ্ঠস্বর পরিচিত লাগছে।হৃদয় তবুও ধরতে পারছে না।এবার সত্যি ভীতু হয়ে বলল,মানে?আমি আবার কোথায় গেলাম।
মেয়েটি আবার খিলখিল শব্দে হাসল।হৃদয় মনে মনে ভাবে,বড় বেহায়া মেয়ে তো।
হাত ছাড়িয়ে বলল,আপনাকে আমি চিনছি না।পরিচিত নন আপনি।
এবার তিথি মুখের পর্দা সরালো।ভ্রু নাচিয়ে বলল,কি হৃদয়হরণ বাবু?তুমি আমাকে চেনো না?
হৃদয় হেসে দিল,তিথি বুবু?কই আসছো এখানে?
তিথি আবার মুখে ওড়না জড়িয়ে বলল,আরে ভাই।শখে পড়ে কি আসছি?দায়ে না পড়লে কি আমার মতো মেয়েরা রাস্তায় বের হয়!
হৃদয় বলল,কি যে সব বলো না তুমি!কেন আসছো সেটা বলো!
তিথি এদিকওদিক তাকাল।ভরদুপুর বাজারে মানুষ কম।
তারপর হৃদয়ের হাত ধরে বলল,ভাই তুই আমার একটা কাজ করে দিবি?
হৃদয় বলল,এমনভাবে বলছো কেন?তুমি বলো না কি করতে হবে!
তিথি চারদিক আরেকবার তাকিয়ে নিল,এই আরশিনগর বাজারে মির্জাবাড়ির চালের আড়ত আছে না?
হৃদয় জবাব দিল,হ্যাঁ,আছে তো।কেন?
তিথি বলল,মির্জাবাড়ির ছোট ছেলে রফিক মির্জা।তাতে তুই চিনিস?
হৃদয় অবাক হলো।তিথি বুবু ছোটকাকে কেন খুঁজছে?কিছু কি হয়েছে?
হৃদয় বলল,হ্যাঁ,চিনি তো বুবু।কি দরকার বলো?
তিথি একটা হাত উঠিয়ে নিচু জায়গা দেখালো,তুই তাকে গিয়ে বলবি যে আমি ঐখানটায় অপেক্ষা করছি,সে যেন আসে।আমার নাম বললেই চিনবে।
তিথি আবার হৃদয়ের হাত ধরল,ভাই,দয়া করে তুই আমার এই উপকারটা কর।
হৃদয় কিছু বুঝে উঠতে পারলো।তিথি বুবুর সাথে ছোটকার কি সম্পর্ক।না কি কোন ঝামেলা হলো!
হৃদয় বলল,আচ্ছা,বুবু।তুমি ঐখানটায় যাও।আমি ছোটকা কে…!
হৃদয় থেমে গেল কিছুক্ষণের জন্য।আবার বলল,মানে রফিক মির্জাকে গিয়ে বলছি।

তিথি তড়িঘড়ি করে সেদিকটা চলে গেল।

হৃদয় চালের আড়তে ঢুকে দেখল,ক্যাশিয়ার স্বপন ঘোষ মুখ হা করে ঘুমাচ্ছে।লোকটা এমনিতেই ঘুমায়।বাপ দাদার আদি মিষ্টির ব্যবসা ছেড়ে মুসলমানের চালের আড়তে ক্যাশিয়ারের চাকরি নিয়েছে।শেষ বয়সে।কষ্টে মানুষ করা ছেলেপিলে দু’বেলা মুঠো খেতে দেয় না।তারপর সংসারে চল্লিশ বছর বয়সী এক প্রতিবন্ধী ছেলে।ভাইয়েরা বিয়ে থা করে ভিন্ন হয়েছে।সে জীবনমুক্তির আশায় চেয়ে দিন কাটায়।মায়ের হাতে ভাত খায়।বাপের কষ্টের অন্ন যেন তার গলায় নামে না।চোখ দিয়ে অবিরাম জল গড়াই।দুপুরবেলা কাজের লোকগুলো নাই।বোধহয় খেতে গেছে।
হৃদয় হালকা ধাক্কা দিল,ও স্বপন কা,স্বপন কা।লোকটা ধড়ফড় করে যেন জাগলো,কে কে?
হৃদয় বলল,আমি হৃদয়।
স্বপনঘোষ ঘোর কাটা অবধি এদিকওদিক তাকালো।তারপর চশমা খুঁজে চোখে নিয়ে হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,ও তুমি।কি কইবা কও?
হৃদয় মাঝে মাঝে চালের আড়তে আসে।সকলে তাকে চেনে।বিশেষ করে স্বপন ঘোষ।হৃদয় এলে তিনি একটা গল্পের মানুষ পান।তার মুখে শুধু বিজয়ের গল্প।মুক্তিযুদ্ধের গল্প।দেশ স্বাধীনের গল্প।হৃদয় মুগ্ধ হয়ে শোনে।তারপর একটা শ্বাস ছেড়ে অস্পষ্ট স্বরে বলে,আমি যে কোনদিন স্বাধীন হবো।মুক্তি পেতে মন চাই।স্বপন ঘোষ কানে কম শোনে।বলে,কিছু কি কইলা মিয়া?হৃদয় এড়িয়ে যায়।
আজও গল্প পেতে বসতেন।বলল,বসো এইহানে।
হৃদয় মাথা নিচু করে দিল,না,স্বপনকা।আজ বসবো না।সামনে পরীক্ষা।মাত্র কয়েকদিন আছে।আশির্বাদ করো।
স্বপন ঘোষ হৃদয়ের মাথায় দু’হাত ঢলে আশির্বাদ করলো।
হৃদয় সোজা হয়ে দাড়াল,ছোটকা কই?
স্বপন ঘোষ বলল,ভিতরে আছে দ্যাহো।যাইবো আর কই!
হৃদয় ভিতরে গিয়ে দেখল রফিক দুপুরে খাওয়ার আয়োজন করছে।
হৃদয়কে দেখে বলল,বাপ,এসেছিস।আয় বোস।বিরিয়ানি আনছি।
হৃদয় বলল,ছোটকা,তুমি বাড়িতে যাও নি?
রফিক প্যাকেট থেকে বিরিয়ানি ঢালতে ঢালতে বলল,না রে বাপ।যেতে মন চাইলো না।একেবারে রাতে যাবো।
হৃদয় বসে বলল,ছোটকা।তিথি নামে একটা মেয়ে তোমাকে ডাকছে।এই বাজারের নিচে যে নিচু জায়গাটা আছে ওখানে।
রফিক মনমরা হয়ে গেল কেমন।বলল,আচ্ছা।এই নে তুই খা।আমি তাহলে কথা বলে আসি।
হৃদয় ছোট্ট খাটটাই কাঁধের ব্যাগ ফেলে বিরিয়ানির প্লেট হাতে নিল।রফিক বেরিয়ে গেল দ্রুত।

বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা ঘুরে গেল।পেটে খাবার পড়তেই ঘুম চলে আসছিলো।চালের আড়তের বিশ্রাম ঘরে ঘুমিয়ে পড়েছিলো।এমন তৃপ্তির ঘুম ঘুমায় নি সে অনেকদিন।তৃপ্তির খাবারও ছিলো।হৃদয় মনে করতে চেষ্টা করলো শেষ কবে বাড়িতে মাংস খেয়েছে।মনে পড়লো না।মাছ সে খায় না।তিনবেলা পছন্দ অপছন্দের সবজি দিয়ে বাঁচার জন্য খেতে হয়।তাও মর্জিনার চুরির অভ্যাস আছে তাই।না হলে হয়তো সেটাও জুটতো না।

ঘরে ঢুকতেই মর্জিনা বাইরে দাঁড়িয়ে ডাকল,বড় ভাইজান।
হৃদয় ভিতর থেকে বলল,কি বলবি বল?
হৃদয় জানে মর্জিনা আর কখনো ঘরে ঢুকবে না।বড় অভিমানী মেয়ে।ভালোই হলো অকারনে আসমা বেগমের কাছে কথা শুনতে হয় না তাহলে মেয়েটাকে।তাছাড়া গ্রামের কুটমহিলাদের এ বাড়িতে আনাগোনা বেশ।তারা আসমা বেগমের পর্যায়ে।কথা রটিয়ে বেড়াবে।মর্জিনা বড় হয়েছে।হৃদয় চাই না তার কারনে একটা গরীব মেয়ের কলঙ্ক হোক।
মর্জিনা অনেকক্ষণ পরে বলল,আপনেরে কেডা জানি খুঁজতে আইছিলো।
হৃদয় বলল,হুস,ইয়ার্কি মারার জায়গা পাস না!আমাকে কে খু্ঁজতে আসবে?তেমন কেউ তো নাই।
হৃদয় আরেকবার ভেবে দেখল,সত্যি তো।তাকে খুঁজতে এই চেয়ারম্যান বাড়িতে কে আসবে?কারোর আপসোস।উপহাস।কিংবা সমবেদনার দরকার পড়লে তো তারা রাস্তাঘাটে রোজ করে।আরেক আসার হলে।খোঁজার হলে।সইমা।কিন্তু তিনি তো কখনো মির্জাবাড়ির বাইরে বের হন নি।তাহলে কি কাউকে দিয়ে খবর পাঠালো।অহন গতকাল অমন অসুস্থ হলো।আমার অবশ্য যাওয়া উচিত ছিলো।কিন্তু সন্ধ্যা হয়ে গেল।দূরের পথ।সাইকেলটা থাকলে একবার যাওয়া যেত।আবার পড়তেও বসতে হবে।
মর্জিনা বলল,আপনে এমন ক্যান?আমি কি সব সময় মিথ্যা বলি নে?সত্যি একটা ছেলে আইছিলো।বিশ্বেস না হলি উদয়কে ডেকে শুনে ন্যান।
হৃদয় বাইরে এসে বলল,দেখতে কেমন?
মর্জিনা যেন নিখুঁত বর্ণনা দেওয়ার চেষ্টা করল,ফর্সা।বড় বড় সুন্দর চোখ।
হাত উঠিয়ে দেখালো,এই টুকুন উঁচু হবে!নাম যেন কি কইছিলো।মনে নাই।
হৃদয় বিরক্ত হলো,তোর মনে থাকে টা কি?পারিস খালি আসমা বেগমের অগোচরে তাকে গালমন্দ করতে।
মর্জিনার অভিমান হলো।সে আম্মাকে গালমন্দ করে।সে কি সাধে?সৎ ছেলে বলে তিনি হৃদয়কে কত অবহেলা।অবজ্ঞা।মানসিকতা অত্যাচার করেন।তার প্রতিবাদ সে আড়ালে।গোপনে।নিন্দায় করে।খুব বেশি কি অন্যায় সেটা!
হৃদয় বলল,নাম কি অহন বলেছিল?
মর্জিনা সময় নিলো না,হ,অহনই তো কইছিলো।আপনে কেমনে বুঝলেন?
হৃদয় হাসল,তুই ই তো চেহারার নিঁখুত বর্ণনা দিলি।
মর্জিনা যেন অবাক হয়।বলল,চেহারার বর্ণনা শুইনা কইয়া দিলেন কে!
হৃদয় মৃদু ধমক দিল,বেশি কথা কস।যা তো।
মর্জিনা বলল,দুপুরের খাওন খাইবেন?না হলি আইনা দেন নিয়ে যাই।
হৃদয় ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল,না,নিতে হবে না।রাতে খেয়ে নিবো ওটা।
মর্জিনা প্রতিবাদ করল,ঠান্ডা ভাত খাইবেন ক্যান?মাই ভাত রানতাছে তো।
হৃদয় বলল,তুই এখানে থেকে বকবক করিস না।আমার পড়তে হবে।শোন,একবার উদয়কে ডেকে দে তো।
মর্জিনা বলল,উদয়কে খালেক ভাই পড়াইতে আইছে।
হৃদয় আবার ধমক দিল,ঐ খালেক আবার তোর ভাই হলো কবে?কাকা বলতে পারিস না।দিন দিন মাথা মোটা হচ্ছিস।
যাওয়ার আগে মর্জিনা জিজ্ঞাসা করল,অহন আপনের কেউ হয়?পোলাডা কি উত্তরপাড়ার মির্জাবাড়ির পোলা।
হৃদয় টেবিলের সামনের চেয়ারটা টেনে বসল,হ্যাঁ,মির্জাবাড়ির ছেলে।
মর্জিনা আবার জিজ্ঞাসার পুনরাবৃত্তি করল,বললেন না তো পোলাডা আপনের কি হয়?বন্ধু?
হৃদয় অস্পষ্ট স্বরে বলল,বন্ধু?
সত্যিই তো অহন তার কে হয়?ভাই?নাহ।সেটা তো অহন মেনে নেয় না।তাহলে?নামহীন কোন সম্পর্ক!আমিও কি এসব ভাবি!রাজপুত্রের সাথে কোটালপুত্রের কি কোন সম্পর্ক হয়?নাকি আদৌ হয়েছে কখনো হয়েছে?হৃদয় তা জানে না।
হৃদয় আবারও ধমক দিল,তুই যাবি এখান থেকে?নাকি সখিনা ফুফুকে ডেকে কান মলা খাওয়াবো?ভাগ।

মর্জিনা নিঃশব্দে চলে গেল।

মেয়েটাকে এতো বকাবকি বোধহয় ঠিক হলো না হৃদয়ের।এ বাড়িতে তার খেয়াল কেবল সেই রাখে।কখন সে আসলো,কখন সে বের হলো।সখিনা ফুফুও তাকে ছেলের মতো জানে।মর্জিনা বোধহয় তাকে ভাইয়ের মতো ভালোবাসে।নাকি…..!সে আর ভাবতে চাই না।
আচ্ছা মর্জিনাকে সে যদি বলতোও যে অহন তার কি হয়!তাহলে কি কিশোরী মর্জিনা তা বুঝতো?হয়তো বুঝতো না।আবার হয়তো বুঝতো।কে জানে!সম্পর্কের ধরন তো পৃথিবীতে বোধহয় সবাই বোঝে।বোঝে না কেবল বুঝতে না চাওয়া অবুঝরা।

ঘুমাতে যাওয়ার আগে উদয় এলো।হৃদয় পড়ছিলো।এসে কোলের উপর বসল।হৃদয় বই বন্ধ করে উদয়ের গালে একটা চুমু দিল,কি হয়েছে আমার ভাইটার?
উদয় গাল ফুলিয়ে বলল,মিয়াভাই।আম্মু না একদম ভালো না।শুধু শুধু মারে।
হৃদয় উদয়কে জড়িয়ে ধরল,ছিঃ ভাই।আম্মুকে কখনো খারাপ বলতে হয় না।আল্লাহ পাপ দেয়।
উদয় কোল থেকে নেমে গিয়ে দাঁড়াল।বাম হাতের উপরে কনুই দেখিয়ে বলল,দেখো তুমি।একটা পড়া পারি নি বলে কিভাবে মারল।বললো তোর মিয়াভাই লেখাপড়া করে সব জমি দখল করবে।তুই গোমূর্খ হয়ে থাক।
হৃদয় হেসে আবার উদয়কে কোলে নিল,বাব্বাহ,ভাই।তোর তো দারুন ব্রেইন।সব কথা ধরে রেখেছিস।কিন্তু ভাই তোর আম্মু তো ঠিকই বলেছে।লেখাপড়া না শিখলে হবে?লেখাপড়া শিখে ইয়া বড় চাকরি করবে আমার ভাই।ঠিক তো?
উদয় মাথা নাড়াল,হুম।চাকরি করে তোমাকে আমাদের মতো একটা ঘর বানিয়ে দেবো।তুমি কত্ত ছোট ঘরে থাকো।
হৃদয় উদয়কে বুকের সাথে লেপ্টে ধরল।কত ছোট তার ভাই।তবুও তার ছোট্ট বুক ভরা কত ভালোবাসা তার প্রতি।
উদয় বলল,ছাড়ো মিয়াভাই।শোনো,শোনো।
হৃদয় ছেড়ে দিয়ে বলল,কি সোনা?
উদয় বিজ্ঞের মতো বলল,ঐ অহনা আছে না?তুমি আমাকে যে বাড়ি নিয়ে যাও?তার ভাই এসেছিলো।অহন ভাইয়া।আমাকে এত্তো চকলেট দিলো?আমি চকলেটগুলো মাকে দেখাতে গেলাম।অমনি আর আসতে দিলো না তোমার ঘরে।
হৃদয় বলল,তোকে কিছু বলেছে?কেন এসেছিলো।
উদয় ঠোঁট প্রশস্ত করল,কই না তো।মর্জিনা বুবু কিসব খেতে দিলো।কিচ্ছু খেলো না।বলল আমি একটু এখানে বসে থেকে চলে যাবো।
হৃদয় অনেকক্ষণ ভাবল।তারপর বলল,ভাই,তুই এখন যা।না হলে তোর আম্মু আবার পিটাবে।
উদয় যেমন দৌড়ে এসেছিলো তেমনি দৌড়ে চলে গেলো।

হৃদয়ের ভাবনা গভীর হলো।অহন কেন এসেছিলো?বাড়িতে কোন নালিশ করে যায় নি তো?নাহ তা বোধহয় করে নি।করলে এতক্ষণে চিল্লাচিল্লিতে তালুকদার বাড়ি আকাশে উঠে যেতো।তাহলে অহন কেন এসেছিলো।সইমা পাঠিয়েছিলো?তা বা হয় কিভাবে?সইমার কথায় রাজপুত্র কখনো আমাকে খু্ঁজতে এ বাড়িতে আসবে না।কি জানি!তার আর ভাবতে ইচ্ছা করছে না।কেমন ভ্যাপসা গরম পড়েছে।কারেন্টটাও চলে গেলো।বই পড়া আর হবে না।তার রুমে ফ্যান নেই।আসমা বেগম দিতে দেন নি বিল বেশি আসবে তাই।সে বই বন্ধ করে উঠানে এসে দাঁড়াল।

শুক্লপক্ষ চলছে।রাতের আকাশে দ্বাদশীর চাঁদ।চাঁদকে কেমন অদ্ভুত সুন্দর লাগছে।আচ্ছা এই সুন্দর জ্যোৎস্নায় কেউ কি তার মতো উঠানে এসে চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে?আছে হয়তো!তবে সে কে?বড্ড জানতে ইচ্ছা করে হৃদয়ের!

(সপ্তম পর্ব)

>
বিঃদ্রঃ তোমার একটিমাত্র জীবন যদি প্রেমহীন থেকে যায়,শর্তহীন দলিলে যদি কোন বিবাদীর নাম লেখা না থাকে,অনাবিষ্কৃত ভালোলাগা যদি তোমার ঠোঁটের আঙ্গিনায় বিরহ না জাগায়,একটিমাত্র জীবনে তুমি যদি কলঙ্ক এর সুখই না পেলে-তবে তুমি…!তবে তুমি আমার গল্প পড়ো না।
>

তেরো।

দারোগাকান্দি ছোট বাজার থেকে কদমবাড়ি খালের পাশ দিয়ে যে সরু ইটের রাস্তা-সেটা শ্যাওড়াকান্দি বিলের ভিতর দিয়ে চলে গেছে।বিলের অর্ধেকটা পর্যন্ত ইট।তারপর কাঁচা মাটির রাস্তায় পরিনত হয়েছে।চৈত্রের প্রখর রৌদ্রে-শুষ্ক আবহাওয়ায় রাস্তায় ধূলাবালি জমেছে।হালকা পূবালী বাতাসেও সূক্ষ্ম ধূলাবালি উড়াউড়ি করে।শ্যাওড়াকান্দি বিলের ভিতর দিয়ে এঁকেবেঁকে যাওয়া সরু রাস্তায় তারা হাটছিলো।রাস্তায় ছোট-বড় থেকে বিশাল আকারের সব গাছ।একটা বিশাল বট গাছের নিচে বাঁশের মাচা পাতানো।বিলে কাজ করতে আসা লোকেরা বিশ্রামের জন্য কিছু কিছু জায়গায়-গাছের নিচে এমন অনেক মাচা পাতিয়েছে।শেষ বিকেলের সোনালি রোদ তাদের চোখে-মুখে।
বাঁশের মাচায় বসতে বসতে হৃদয় বলল,এখানে বসো।
অহন পাশে বসল।
অনেকক্ষণ নীরবে কেটে গেলো।হৃদয় নিজে থেকে আগ বাড়িয়ে কিছু বলছে না।অহন কেন এসেছে কে জানে?তাও পরপর দু’দিন।হয়তো কোন দরকার।না হলে অহন তো কখনো তার কাছে আসবে না।যে ছেলে তাকে দু’চোখে দেখতে পারে না,তার কাছে অহনের কি কাজ?তাহলে কি রাজপুত্রের কোন কারনে মন খারাপ?কি হয়েছে তার?তার রাজপুত্র কম কথা বলে,তাই বলে এতোটা মন খারাপ তো কোনদিন দেখে নি।হৃদয়ের বুকের ভিতর ব্যথা করে উঠল।তাহলে কি বাপ্পির সঙ্গে অহনের কিছু হয়েছে!আচ্ছা,পরশু সন্ধ্যায় অহন কেন হঠাৎ অসুস্থ হলো তা কি মির্জাবাড়ির কেউ বুঝতে পেরেছে?বিশেষ করে তার সইমা।সে তো অহনের মা।মায়েরা নাকি সন্তানের সব কিছু বুঝতে পারে।অন্তত তার ব্যাপারে তো তার সইমা একদম সঠিক বলে!হৃদয় না খেলে কেমন করে যেন বুঝতে পারে!মন খারাপ থাকলে জানতে চায়।যদিও হৃদয়ের শেষ মন খারাপ কবে হয়েছিল!তার খবর সে নিজেও জানে না।
অহনই প্রথম কথা বলল,খুব মিষ্টি বাতাস না?
হৃদয় হালকাভাবে বলল,হুম,তবে মা বলতো বাতাসকে কখনো সুন্দর বা মিষ্টি বলতে নেই!
অহন প্রশ্ন করল,কেন?
হৃদয় উদাস মনে বলল,জানি না।মা বলতো।খুব ছোট ছিলাম তো,কারনটা কখনো জানতে চাই নি।হয়তো বললেও বুঝতাম না।
হয়তো হৃদয়ের মায়ের কথা মনে পড়ে গেল।মাঝে মাঝে এমন হয়।খুব ভালো লাগার মুহূর্তে তার খুব মায়ের কথা মনে পড়ে।তখন মন মলিন হয়ে যায়।অহন আর কিছু বলল না।
হৃদয় জিজ্ঞাসা করল,আচ্ছা,তোমার কি মন খারাপ?
অহন একবার তাকাল।
তারপর শ্যাওড়াকান্দি বিলের অদূরে তাকিয়ে বলল,কই না তো।কালকে ভীষণ মন খারাপ ছিলো।তাই আপনাকে খুঁজতে এসেছিলাম।
হৃদয় নড়েচড়ে বসল।
জিজ্ঞাসু মনে প্রশ্ন করল,কেন?কিছু কি হয়েছে?সইমা ভালো আছো?
অহন এবারও হৃদয়ের দিকে তাকাল।খুব অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন ছুড়ল,আপনি আপনার সইমাকে খুব ভালোবাসেন না?
হৃদয় খুব সহজভাবে বুঝালো,ভালো তো বাসি।সইমার মতো একজন নারীকে ভালো না বেসে থাকা যায়,বলো?তোমাদের মির্জাবাড়ি সইমাই আমার একমাত্র অবলম্বন।
অহন অবাক হলো,শর্মি ফুপি,বড়মা?
হৃদয় লজ্জা পেল,আরে তেমনভাবে বলি নি।তারাও আমাকে অাশাতীত ভালোবাসে,অস্বীকার করছি না তো।
অহন যেন আনমনা হলো।বলল,কি জানি।ভালোবাসাতেই তো জানি না।
বাঁশের মাচায় অহন দু’হাত ঠেস দিয়ে নিজের শরীর সোজা করে বসে ছিলো।হৃদয় অহনের হাতের উপর হাত দিতে গিয়েও সরিয়ে নিল।নিজে অহনের মতো করে বসে পা দোলাতে লাগল।
তারপর বলল,অহন,তোমার কি কিছু হয়েছে?কিছু বলতে চাও আমাকে?
অহন আবার শান্তভাবে তাকাল হৃদয়ের দিকে।কিছু বলল না।তার চোখ কথা বলছে যেন।হৃদয় বুঝতে পারছে সেটা-ধরতে পারছে না।
হৃদয় প্রত্যুত্তরের আশায় প্রশ্ন করল,কিছু তো বলো?আমার কিন্তু নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে এখন।আমার তরফ থেকে কি কোন অন্যায় হয়েছে?
অহন এড়িয়ে গেল।বলল,আপনার লেখাপড়ার খবর কি?পরীক্ষার তো মাত্র কিছুদিন আছে!
হৃদয় মাথা নাড়াল,হুম হচ্ছে কোনরকম।জানোই তো আমি অতোটা ভালো স্টুডেন্ট না।
অহন নিজের থেকেই হৃদয়ের হাতের উপর হাত রাখল।হৃদয় দু’জনের হাতের দিকে তাকাল।তারপর অহনের দিকে।আচ্ছা রাজপুত্রের কি শরীর ঠিক আছে?যা করছে নিজে থেকে করছে তো?ঘোরের মধ্যে নেই তো!
অহন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,আপনি ভালো স্টুডেন্ট না,এটা কেন বলছেন?আমি তো একটু হলেও কিছু জানি।
হৃদয় প্রসঙ্গ বদল করল,বাদ দাও তো এসব।চলো উঠা যাক।তোমার তো আবার ফিরতে হবে!
অহন হাত উঠিয়ে নিল।বলল,আমাকে একদিন পদ্মার পাড়ে নিয়ে যাবেন-আপনার সাইকেলে করে!
হৃদয় একই সঙ্গে পুলকিত এবং সংকুচিত হলো।তার রাজপুত্র আজ প্রথম নিজে থেকে তার সঙ্গে সাইকেলে করে পদ্মার পাড়ে যেতে চাইছে।কিন্তু তার সাইকেলটা যে চুরি হয়ে গেছে।কিভাবে সে অহনকে সাইকেলে করে ঘুরতে নিয়ে যাবে!
তবুও হৃদয় বলল,কবে যেতে চাচ্ছো!বলো?
অহন কিছুক্ষণ ভাবল।তারপর বলল,পূর্ণিমার দিন যাই?
হৃদয় বলল,আচ্ছা পরশুদিন।ঠিক আছে।
অহন বিস্ময়ে প্রশ্ন করল,আপনি পূর্ণিমার দিনক্ষণও জানেন?
হৃদয় স্মিত হাসল।বলল,কেন জানবো না?বাংলা,আরবী তারিখ আমি মনে রাখি।
অহন মনে রাখার বিশেষ কারন খুঁজে পেল না।তাই অগত্যা প্রশ্নও করল না।সে উঠতে চাইল।
হৃদয় বলল,একটা কথা বলবো?যদি অনুমতি দাও।
অহন উঠলো না।বলল,ঠিক আছে বলুন।
হৃদয়ের বুকের ভিতর কাঁপছিল।দম আটকে হঠাৎ বললেই ফেলল,বাপ্পি ভাইয়া ফোন করেছিল?
অহন অবাক হয়ে তাকাল হৃদয়ের দিকে।হৃদয় ঢোঁক গিলল।না জানি কি বলবে অহন।
অহন খুব স্থিরভাবে বলল,হ্যাঁ,গতকাল সকালে করেছিলো।কেন বলুন তো?
হৃদয় বলল,না এমনি।
পরক্ষণে বলল,তাহলে তুমি মন খারাপ করে আছো কেন?কি হয়েছে বলবে?

অহন বাঁশের মাচা থেকে নেমে দাঁড়াল।

তারপর বলল,কিছু তো হয় নি।এমনি ভালো লাগছে না।
হৃদয় নেমে অহনের পাশে দাঁড়াল,আমাকে না হয় নাই বা বললে।সইমাকে বলো বাড়িতে গিয়ে।মনের কথা চেপে রাখতে নেই।কষ্ট বাড়ে,কাউকে একটা বললে মন হালকা হয়।
অহন বলল,হুম।আচ্ছা।আমার যেতে হবে।সন্ধ্যা হয়ে আসছে।

মাধবপুর থেকে শ্যাওড়াকান্দি বিলের ভিতর রাস্তা দিয়ে লোকজন আরশিনগর বড় বাজার যাতায়াত করে।অধিকাংশের চলাচল ভ্যানগাড়িতে।তাও খুব পাতলা।হৃদয় একটা ভ্যানগাড়ি দাঁড় করালো।অহনকে বলল,উঠো।শোনো,পরশুদিন কি আমি যাবো তোমাদের বাড়িতে?পদ্মা নদীতে যাবে বললে।
ভ্যানগাড়ির সামনে দু’জন লোক ছিলো।অহন পিছনে বসলো।
হৃদয় জিজ্ঞাসা করল,পিছনে বসতে পারবে?
অহন মাথা নাড়াল,হুম।পারবো।আর শোনেন,আপনার যেতে হবে না।আমি পরশু বিকালে আসবো।
হৃদয় বলল,একটু সময় নিয়ে এসো।অনেকটা পথ।যেতে যেতে সন্ধ্যা হলে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যাবে।সইমা চিন্তা করবে।মাকে বলে আসবে কিন্তু।
হৃদয় একটু থেমে আবার অনুরোধ করল,শোনো,সইমাকে স্যরি বলো আজ গিয়ে।একটু জড়িয়ে ধরো।দেখবে তোমার এতদিনের সব অভিমান হাওয়া হয়ে যাবে।
অহন বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়াল,আচ্ছা।
হৃদয় পকেট হাতড়ে ত্রিশ টাকা পেল।
ভ্যানচালককে দিয়ে বলল,আপনি তো বোধহয় আরশিনগর বড় বাজারের দিকে যাবেন।দারোগাকান্দি ছোট বাজারে পৌঁছে,ও কে পশ্চিমপাড়ার একটা ভ্যানগাড়িতে তুলে দিয়েন।
ভ্যানচালক বলল,ভাইজান,ভাড়া হইতেছে গিয়া দুয়ে মিলে দশ টেহা।ত্রিশ টেহা দিতাছেন ক্যান?
হৃদয় কৃতজ্ঞতার চোখে তাকাল,আপনি রেখে দিন না!ও কে ঠিকঠাক একটা ভ্যানে তুলে দিয়েন।তাতেই হবে।
অহন বলল,আপনার টাকা দিতে হবে না।আমার কাছে আছে তো।আপনি রেখে দিন।আমি টাকা নিয়ে আসছি।
হৃদয় সজল চোখে বলল,অহন,প্লিজ।তোমাকে কোনদিন আমি এমনভাবে পাইনি।আজ অন্তত তুমি আমাকে এই সামান্য কারনে নিষেধ করো না।
অহনের মুখে কথা সরলো না।তার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।সে ভাবল,বাপ্পি ভাইয়া ঠিকই বলেছিলো।হৃদয় ভাইয়া বড্ড ভালো।
ভ্যানগাড়ি চলার আগমুহূর্ত অহন মিহি সুরে ডাকল,হৃদয় ভাইয়া।
হৃদয় যেন নির্বাক হয়ে গেল।সাড়া দানের কোন ফুসরত তার নেই।অহন আবার ডাকল,হৃদয় ভাইয়া।
হৃদয় এবার সাড়া দিল,হুম।কিছু বলবে?
ভ্যানগাড়ি চলতে লাগল।হৃদয় তার পিছনে হাটতে শুরু করল,অহন,বলো কি বলবে?
অহন একপলক তাকিয়ে থেকে বলল,পরীক্ষাটা ভালো করে দেন।আমি আপনাকে ঢাকা নিয়ে যাবো,ভার্সিটি ভর্তি কোচিংয়ের জন্য।

হৃদয় দাঁড়িয়ে গেল।

এখন তার পা যেন কিসে আটকে আছে।ভারী লাগে কেমন!ভ্যানগাড়ি অদৃশ্য হয়ে গেলে-হৃদয়ের দু’চোখ থেকে ঝরঝর করে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।এদিকওদিক তাকিয়ে চোখ মুছল।এতো বড় ছেলে কাঁদলে কেমন দেখায়!

হৃদয় বাড়ির উদ্দেশ্যে হাটা দিল।

তার রাজপুত্র কোনদিন তাকে ভাইয়া বলে ডাকে নি।আজ এই প্রথম।আনন্দে হৃদয়ের চোখ বারবার ঝাপসা হয়ে আসছে।মির্জাবাড়িতে সে এতো ভালোবাসা পেয়েছে তবুও কোনদিন সে তাদের জন্য সামান্য কিছু করতে পারে নি।গায়ে-গতরে যা খেটে দিয়েছে।আর ভালোবাসার বিনিময়ে ভালোবাসা।তার রাজপুত্র আজ ভ্যানগাড়ির সামান্য ভাড়াটাও তার থেকে নিতে নারাজ।কারন সে মিসকিন।এতিম না হয়েও এতিম।ত্রিশ টাকাটাও যে হৃদয়ের জন্য বড়।সেটা যেন তার রাজপুত্র বুঝল।আসমা বেগমের জন্য বাড়ির কাছে কোন টিউশনি সে পায় না।কলেজের কাছে দু’টো ছেলেকে পড়িয়ে মাসে ছয়শ টাকা পায়।তার অর্ধেক যায় উদয়ের পিছনে।বাকিটা সাইকেলের পিছনে যেত।অাধ পুরানো সাইকেল যে-এখন তো তাও নেই।তবে আজ তার রাজপুত্রের পিছনে প্রথম সামান্য ত্রিশ টাকা দিতে পেরে হৃদয়ের মনে একধরনের আনন্দবোধের শিহরণ জাগছিলো।তার খোঁজ কি রাজপুত্র জানে?হৃদয়ের মনের খোঁজ অহন কেমনে জানবে?হৃদয় একটা মুচকি হাসি দিয়ে চেয়ারবাড়ির আঙিনায় পা দিলো।

মর্জিনা আমচকা সামনে এসে দাঁড়াল।হাতে একটা মুরগি।বলল,বড় ভাইজান,আপনে কইলেন না হেই আপনের কি হয়?
হৃদয় প্রশ্ন করল,কে আমার কি হয়?
মর্জিনা বোকাভাবে বলল,ক্যান বিকেলে যেই পোলাডা আইলো হেই।
হৃদয় ধমক দিল,ঐ তুই সন্ধ্যাবেলায় মুরগি খোয়াড়ে না দিয়ে হাত নিয়ে আমার সামনে এসেছিস কেন?এসেই উল্টাপাল্টা প্রশ্ন।
মর্জিনা বলল,হেই ডিম তা দিতাছে,আম্মায় কইছে হেরে আলাদা রাখবো।
হৃদয় হাত উঠিয়ে বলল,তুই সর তো ওটা নিয়ে আমার সামনে থেকে।তোর আম্মায় যা বলছে সেটা কর।
মর্জিনা সরে দাঁড়িয়ে বলল,কইলে কি হইবো ঐ পোলাডা আপনের কে হয়?
হৃদয় যেতে যেতে বলল,সেদিন না বললাম কি হয়।আচ্ছা আমার ভাই হয়।তোর কোন সমস্যা?
মর্জিনা মাথায় হাত দিল।নিজে নিজে বলল,ভাই?উদয় কি তাইলে?চেয়ারমেন চাচায় তিন নাম্বার বিয়া কবে করচে?

হৃদয় ফ্রেশ হয়ে চেয়ার টেনে টেবিলের সামনে বসল।আজ তার মন ফুরফুরা।তার রাজপুত্র এই প্রথম তার সাথে সুন্দরভাবে কথা বললো।এত বছর পর তাকে ভাইয়া বলে ডেকেছে।যদিও হৃদয় এটা আশা করে নি।হয়তো প্রাপ্য নয়।তবুও একটা কিছু তো পেলো।পড়াতে তার মন বসছে না।সাইকেলটা যে নেই সেটা অহনকে বলা হলো না।এখন সাইকেল কই পাবে সে।আচ্ছা,খালেদ চাচাকে বলে তার সাইকেলটা কয়েকটা ঘন্টার জন্য নিলে কেমন হবে?তিনি কি দিতে চাইবেন?একটু পরে তো উদয়কে পড়াতে আসবে তখন দেখা যাবে।একবার বলে দেখবে সে।দিলেও দিতে পারে।

দু’দিন যেন দু’বছরের মতো মনে হলো হৃদয়ের কাছে।কোচিং ক্লাসে মন বসাতে পারছে না।মন শুধু উশখুশ করছে।সইমাকে যেন অনেকদিন দেখে না।মির্জাবাড়ি যেতে মন চায় তার।শুধু অহন বলে গেছে সে আসবে তাই হৃদয় পশ্চিমপাড়া গেল না।শেষে রাজপুত্র রাগ করে বসে।সেই ভয়।দারোগাকান্দি ছোট বাজার যেয়ে তার পা চলে না।কদমবাড়ির খাল পাড়ে বসে।শ্যাওড়াকান্দি বিলের সরু রাস্তায় হাটে।মন না চাইতেও পড়তে বসে।উদয়ের সাথে গল্প করে।মর্জিনাকে অকারনে ধমকায়।রহিমের কাজ দেখে।যেন বড় ভালো লাগে তার সবকিছু।
আচ্ছা,সইমা কি জানে তার রাজপুত্র তার কাছে এসেছিলো।জানলে খুব খুশি হবে।
মর্জিনা আসতে যেতে হৃদয়ের মুচকি মুচকি হাসি দেখে।দেখতে গিয়ে উষ্টা খেয়ে পড়ে।সখিনা ধমকায় মেয়েকে।আসমা বেগম সন্দেহের চোখে দেখে।

মির্জাবাড়িতে অহন মুখে মিষ্টি হাসি নিয়ে ঘোরে ফেরে।পুকুরপাড়।পিছনবাড়িতে সবেরি বিল।ভিতরবাড়ি।মনের রঙ তার জীবনের রঙের সঙ্গে মিশে রংমিলান্তির বাহারী আয়েস পেল।
শর্মি মাঝে মাঝে জিজ্ঞাসা করে,অহন,কি হয়েছে তোর,বাপ?একলা হাসিস কেন?শরীর খারাপ নাকি?
সে ভাতিজার কপালে হাত দিয়ে দেখে।জ্বর তো নেই।রেবেকাকে যেয়ে বলে,অহনের কি হয়েছে মেজো ভাবি?
রেবেকা নিজেও হাসে।সে ভাবে হয়তো হৃদয়ের সঙ্গে তার ছেলের সব দ্বন্দ্ব মিটে গেছে।মায়েরা যে পক্ষপাতী নয়,সেটা অহন বুঝেছে।সে শর্মিকে বলে,অহন হয়তো কোন ব্যাপারে খুশি।তাই মনে মনে হাসে।
শর্মির মৃত স্বামীর কথা-মনে পড়ে যায়।ধীর পায়ে উঠে গিয়ে ছাদের কোণে দাঁড়ায়।কাঁদে।

গোটা দিন তিনেক মির্জা বাড়িতে রফিকের দেখা মেলে না।শফিক সাহেব একা আরশিনগর বড় বাজারে চালের আড়ত সামলান।

হৃদয়ের খুশিরেখা কি কখনো অহনের রংরেখার সঙ্গে মিলবে?নাকি সর্বদা সমান্তরাল!

চৌদ্দ।

সখিপুরের পদ্মার পাড় পূর্ণিমার প্লাবনে ভেসে যাচ্ছে।বড় মায়াধরা পরিবেশ।
হৃদয় সাইকেল থামিয়ে বলল,এখনো সন্ধ্যা নামে নি।তুমি একা বসতে পারবে না?সামান্য সময়ের জন্য!
অহন পিছনের ক্যারিয়ারে বসে ছিল।সাইকেল থেকে নেমে দাঁড়াল,হুম,পারবো তো!
তারপর পুনরায় জিজ্ঞাসা করল,আচ্ছা এটা কি আপনার সাইকেল?
হৃদয় সে প্রশ্নের জবাব দিল না।বলল,তুমি একটু দাঁড়াও।আমি সাইকেলটা গ্যারেজে রেখে আসি।
একবার চাওয়াতে খালেক চাচা সাইকেলখানা দিয়েছে-ভরসা ছিলো বলে।নিজের সাইকেলটা চুরি হয়ে গেছে।এখন অন্যের টা চুরি হওয়ার ভয় তো তার থাকে।খুঁজে কোন গ্যারেজ পাওয়া গেল না আশেপাশে।হয়তো দূরে গেলে মিলবে।রাজপুত্র আবার একা থাকবে।একটা চায়ের দোকানে বলে হৃদয় সাইকেলটা রাখলো।তালা দিয়ে মিনিট পাঁচেকের মধ্যে ফিরে এলো।

অহনকে যেখানে দাঁড়িয়ে রেখে গেছিলো,সে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে।
হৃদয় পিছনে দাঁড়িয়ে প্রস্তাব দিল,চলো,কোথাও বসি।
অহন সম্মতি দিল,হুম।বসি-চলুন।
দূরের একটা চরের দিকে আঙ্গুল উঠিয়ে আলো দেখাল অহন।বলল,আচ্ছা,ঐখানটায় যাই?
হৃদয় বলল,যাওয়া যাই।বসতি বোধহয় ওদিকে।আলো জ্বলছে।

গোধূলি লগ্নের রাঙা রং আর চন্দ্র জ্যোৎস্নার হালকা আলো মিলে মোহনীয় মায়া সৃষ্টি করেছে এই সময়টাইতে।পদ্মার পাড় বেয়ে দু’জন হেটে চললো।
অহন কিছুদূর যেয়ে বলল,হৃদয় ভাইয়া,আমরা বরং সামনে বসি।আমার কিছু কথা ছিলো।
পদ্মার পাড়ে বিশাল এক বটগাছ।তার নিচে শান বাঁধানো ঘাট।দু’জনে হেটে গিয়ে সমতল অংশের উঁচু সিঁড়িতে বসল।
পদ্মায় ভাটা চলছে।কুলের পানি অনেক নিচে নেমে গেছে।
বিশাল পদ্মার বুকে ভাটার মতো-অহনের বুকেও যেন ভাটা।গলা শুকিয়ে গেছে তার।
হৃদয় অদ্ভুদ ভাবে তাকিয়ে আছে তার রাজপুত্রের দিকে।
অনেকক্ষণ কিছু বলছে না দেখে,হৃদয়ই কথা বলল,কি যেন বলবে বলেছিলে?
অহন একবার ঢোঁক গিলে নিল।তারপর অহন যেন একদমে বলার চেষ্টা করল,আমার সব সময় মনে হতো আম্মু আমার থেকে আপনাকে বেশি ভালোবাসে।বেশি আদর করে।তাই ছোটবেলা থেকে আপনাকে আমি দু’চোখে দেখতে পারতাম না।কিন্তু যখন বুঝলাম ভালোবাসার কোন প্রকার হয় না।আম্মু আমাকে আর অাপনাকে দু’জনকেই ভালোবাসে।
হৃদয় মুচকি হাসল,এটাই ছিলো তাহলে তোমার অভিমানের কারন?সইমাকে স্যরি বলেছো?
অহন ‘হুঁ’ বলে মাথা ঝাঁকাল।
অহন আবারও ঢোঁক গিলল।সে আগে কখনো কারোর কাছে এত কৈফিয়ত জারি করে নি।আজ করতে হচ্ছে।তার বিশেষ একটা কারন আছে।
হৃদয় বলল,সইমা,সবাইকেই ভালোবাসে।তুমি তার ছেলে,সইমা তোমাকে ভালোবাসে না।এটা কেন ভাবো!বলো তো।মিথ্যা অভিমান কেন করো।এটা তোমার ভারী অন্যায়!
অহন জোসনায় ভরা পদ্মার বুকে ছোট ছোট ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।কিছু বলল না।
হৃদয় বলল,তুমি কি এটা বলতে চেয়েছিলে?
অহন নিচু হয়ে রইল।তারপর হুট করেই বলল,বাপ্পি ভাইয়াকে আমি ভালোবাসি!
হৃদয়ের কোন ভাবান্তর হলো না।সে জানে অহন বাপ্পিকে ভালোবাসে।সেই রাতেই বুঝতে পেরেছিলো।যে রাতে খোলা স্কুল মাঠে-বাপ্পির দীর্ঘ চুমুতে অহন অসুস্থ হয়ে গিয়েছিল।তারপর বাপ্পি সেদিন সন্ধ্যায় চলে যাওয়ার পর অহনের অসুস্থতা।হয়তো অন্য কেউ বুঝতে পারে নি।কিন্তু হৃদয় বুঝতে পেরেছিলো।চোখে দেখা বলে নয়,এমনিতে যেন সে তার রাজপুত্রের মনের আনাগোনা টের পায়।
অহনের ভয় হতে লাগল।হৃদয় যদি এখন ছিঃ ছিঃ করে।তার আম্মুকে বলে দেয়।কি হবে তাহলে?কাউকে না কাউকে তো বলতে হতো একদিন।আজ না হোক।কাল।
হৃদয় কিছু বলছে না দেখে অহন ডাকল দিল,হৃদয় ভাইয়া।
হৃদয় এবার বিশাল পদ্মার দিকে তাকাল,তুমি বাপ্পি ভাইয়াকে ভালোবাস!সে কি তোমাকে ভালোবাসে?
অহন কথায় জোর দিল,অনেক ভালোবাসে!
হৃদয় পুনরায় প্রশ্ন করল,তুমি কিভাবে বুঝলে?
অহন অাত্মাবিশ্বাসী হয়ে উঠল মুহূর্তে।বলল,আমি বুঝতে পারি!
হৃদয় অবাক হল,তোমাকে কেউ ভালোবাসলে সত্যিই কি তুমি বুঝতে পারো?
অহন বুঝল হৃদয়ের কন্ঠে অবাক-বিস্ময়ের সঙ্গে সন্দেহ ভরা প্রশ্নধরন।
অহন কোন মনোদ্বন্দ্ব ছাড়াই বলল,হ্যাঁ,বুঝতে পারি।
হৃদয় বলল,হয়তো।

যদিও দু’জনের ব্যাপারগুলো হৃদয় দেখেছে।এটা অহনকে বলার দরকার পড়লো না।
অহন নিজে থেকেই বলল,আমি জানি আপনি ব্যাপারটা দেখেছেন।তাই আপনাকে বললাম।
হৃদয় জানতে চাইল,তুমি কি জানো?সইমা এটা জানলে কতটা কষ্ট পাবে?
অহনের চোখ টলমল করছে।বলল,আম্মুকে বলার মতো ব্যাপার হলে তো আমি আম্মুকেই বলতাম।এটা যে সমাজে অচল।অবৈধ।অনিয়মের বড় নিয়ম।সেটা আমিও জানি।কিন্তু কি করবো?আমি যে এমনই!
হৃদয় শান্তভাবে বলল,আমি কখনো বলবো না যে তুমি ভুল করেছো বা বাপ্পিকে ভালোবাসা তোমার উচিত হয় নি।কিন্তু অহন অন্তত যতদিন পারো সইমার থেকে ব্যাপারটা লুকিয়ে রেখো।আমি চাই না তুমি কিংবা সইমা কষ্ট পাও।
অহন কোন প্রত্যুত্তর করল না।খালি পায়ে উঠে গিয়ে ধীরে ধীরে শান বাঁধানো সিঁড়ি বেয়ে-ভাটায় জাগা শক্ত বালুময় সমতল স্থানে পা ফেলালো।বেশ ঠান্ডা অনুভব হলো।হৃদয় সেদিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।তারপর উঠে গিয়ে তিন সিঁড়ি নেমে বসে পড়ল।
অহনের দিকে তাকিয়ে জোরে বলল,বেশি নিচে যেও না।বালুর চর,যখন তখন সরে যাবে,শেষে পানিতে চুবনি খেয়ে ঠান্ডা লাগাবে।
অহন চিৎকার করে ডাকল,আপনিও আসেন না ভাইয়া!
হৃদয় মাথা নাড়াল,না না,আমার ভয় লাগে।তুমি উঠে এসো না।আমরা যাই।
অহন বলল,এখন না তো।আমি আরো অনেক সময় থাকবো।
হৃদয় প্রতি জবাব দিলো না।
মির্জাবাড়ির ছোট ছেলে রুপালি জ্যোৎস্না স্নানে পদ্মার বালুচরে খালি পায়ে হাটতে লাগল।হৃদয় তাকিয়ে রইল সেদিকে।সে চায় অহন ভালো থাকুক।যেখানে থাকুক।খুশি থাকুক।
অনেকক্ষণ হেটে এসে অহন হৃদয়ের পাশে সিঁড়িতে বসল।তারপর বলল,ছোট কাকা যে বাড়িতে নেই তুমি জানো?
হৃদয় বলল,কই না তো।সেদিন আড়তে দেখার পর আর দেখা হয় নি অবশ্য।
অহন জানালো,আজ চারদিন তার কোন খোঁজ নেই।আমার ঢাকা ফিরতেই হবে।এখন সম্পূর্ণ ক্লাসগুলো হচ্ছে।কে দিয়ে আসবে?বলুন।তাই তিন-চারদিন পর বাপ্পি ভাইয়া আসছে।
হৃদয় প্রশ্ন করল,তোমাদের বাড়িতে?
অহন বলল,আরে না।আরশিনগর বড় বাজারে থাকবে,ওখান দিয়ে জেলা সদর হয়ে ঢাকার যে বাস যায়,তার টিকিট কেটে রাখবে দু’টো।আমাকে ঢাকায় রেখে,ওনি আবার রাজশাহী ফিরে যাবে।টুটুল ভাইয়াকে না জানিয়েই আসবে,তাই আমাদের বাড়ি আসবে না।
তারপর একটু থেমে আবার বলল,ওহ,আপনার একটা কাজ আছে।
হৃদয় অহনের দিকে তাকিয়ে আবার প্রশ্ন করল,কি কাজ?
অহন বুঝাল,আম্মুকে আপনি বলবেন যে আরশিনগর থেকে আপনি আমাকে ঢাকার বাসে তুলে দিবেন।কোন সমস্যা হবে না।আপনার কথায় আম্মু ভরসা পাবে।না করবে না।না হলে আমাকে একা যেতে দিবে না।
হৃদয় সরলভাবে বলল,আমি সইমার কাছে অকারনে কোনদিন মিথ্যা বলি নি।তুমি নিশ্চয় ব্যাপারটা জানো।
অহন যুক্তি দিল,অকারনে কেন হবে?কারনটা তো বললামই।আমার জন্য না হয় সামান্য মিথ্যা বললেন।পারবেন না?
হৃদয় উত্তর দিল না।বলল,কয়টা বাজে দেখো তো?
অহন মোবাইলে সময় দেখে বলল,নয়’টা বেজে গেছে।
হৃদয় উঠে দাঁড়াল,আমাদের যেতে হবে।অনেকটা পথ।না হলে অনেক রাত হয়ে যাবে।তোমাকে পশ্চিমপাড়া রেখে আমারও ফিরতে হবে।
অহন বলল,আরেকটু থাকি না,প্লিজ।
হৃদয় হাটা দিল।বলল,না।সইমা চিন্তা করবে।তোমার তো সইমার প্রতি কোন কেয়ার নেই।
অহন অগত্যা উপায় না দেখে হৃদয়ের পিছু নিল।
সইমা চিন্তা করবে এটাই কি মুখ্য কারন?হৃদয়ের আর থাকতে ইচ্ছা করছে না পদ্মার পাড়ে।যে দেয়,সে কেড়েও নেয়।বিশাল পদ্মার বুকে এলে যেমন মনের প্রশস্ততা বাড়ে,তেমন হারানোর ভয়ও বাড়ে।দু’টি কারনই কি আজ হৃদয়ের বুকে আঘাত এনেছে?কি সেই কারন?

তার তিন-চারদিন পর সন্ধ্যাবেলা।হৃদয় সারা ঘরে তন্নতন্ন করে খুঁজেও তার এডমিট কার্ড,রেজিস্টেশন কার্ড পেলো না।অথচ দুপুরেই সে কলেজ থেকে এনে রেখেছে।এগুলো না পেলে যে তার পরীক্ষাটা দেয়া হবে না।মর্জিনার উপর চিল্লাচিল্লি করতে লাগলো।
রাগে যেন তার চোখ জ্বলছে।
প্রায় চিৎকার করেই বলল,তোকে কতদিন বলছি আমার ঘরে ঢুকে গোছগাছ করবি না।তুই কথাই শুনিস না।তোর কারনে আমি জায়গার জিনিস জায়গা মতো খুঁজে পাই না।
সখিনা সারা ঘর উলটপালট করে দেখছে।নানান কাগজ এনে হৃদয়কে দেখাচ্ছে।তার নিজের ভিতর জড়তা কাজ করছে।মর্জিনাকে কয়েক ঘা মেরেছে ইতিমধ্যে।
হৃদয় বিনয়ী হয়ে বলল,সখিনা ফুফু,তুমি যাও।তুমি পাবে না।মর্জিনাই আমাকে খুঁজে দেবে।
মর্জিনা টানা একঘন্টা ধরেও খুঁজে পায় নি।তার মনেই পড়ছে না যে,কোন কাগজে সে হাত দিয়েছে।দুপুরে হৃদয় কলেজ থেকে আসার পর সে হৃদয়ের ঘরেই ঢোকে নি।সকালে হৃদয় চলে যাওয়ার পর বিছানা গোছাতে এসেছিলো।তখন তো কোন কাগজ চোখে পড়ে নি-টেবিলে।
রহিম ঘরে ঢুকে বলল,ভাইজান,একটা কতা কইতাম।
হৃদয় বিরক্ত হল।বলল,যা বলবি,বলে কেটে পড়।আমার মন মেজাজ ভালো না।
রহিম মাথা নিচু করে বলল,দুপুরে গরু গোয়ালে রাখতে গিয়া দেহি আম্মা আপনের ঘরে ঢুহে কি একটা নিল।তারপর ঢেঁহিঘরে চুলাতে গিয়া পুড়াইলো।সখিনা খালা,মর্জিনা তহন তো ছিলো না।হেতিরা পুকুরে আছিলো।
হৃদয় নিস্তব্ধ হয়ে গেল।রহিম বলল,ভাইজান,তয় আমার কতা কহেন না।আমারে আম্মায় মাইরা হালাবো।আপনেরে ভালা পাই,তাই কইলাম আর কি!
হৃদয় মাথা নাড়াল।অস্পষ্ট স্বরে বলল,হুম,তুই যা।বলবো না।
সখিনা মর্জিনাও বেরিয়ে গেল।হৃদয় বিছানায় উবুড় হয়ে শুয়ে পড়ল।আজ তার হাসি-কাঁন্না যেন কোনটাই আসছে না।তিথি বুবুর কাছে যেতে বড্ড মন চাচ্ছে।নষ্ট গলিতে।
আচ্ছা নষ্ট গলিতে গেলে কি সকল দুঃখ ভোলা সম্ভব?

মির্জাবাড়িতে আজ যেন হৃদয়ের ঢুকতে মন চাইছে না।তবুও অবাধ্য মন নিয়ে ঢুকল।গতরাতে সে তার তিথি বুবুর কাছে গিয়ে তাকে পেল না।তিথি বুবু কোথায় গেল তাহলে?

হৃদয় ভিতরবাড়ি ঢুকে শর্মিকে সামনে পেল।জিজ্ঞাসা করল,শর্মি ফুপি,অহনের গোছগাছ হয়েছে?
শর্মি বলল,হ্যাঁ,সে তো রেডি।ওকে কে নিয়ে যাচ্ছে?আচ্ছা,তুই উপরে যা।সে গুছিয়ে বসে আছে!একদম রেডি।
হৃদয় উপরে যাওয়ার আগে শর্মি তার হাত ধরল,কি’রে কি হয়েছে তোর?চোখ-মুখ শুকনো কেন,বাপ?
হৃদয় হাত ছাড়িয়ে নিল,কি হবে ফুপি?কি সব বলো তুমি।সইমা কই বলো তো!
শর্মি ভালো করে দেখল হৃদয়কে।তারপর আবার প্রশ্ন করল,তোদের কি হয়েছে বল তো?অনেক বড় হয়ে গেছিস না তোরা?অহনকেও আজকাল বুঝতে পারছি না।অথচ দু’টোকেই সেই ছোটবেলা থেকে দেখছি।
হৃদয় হাটা দিল,তোমার যা কথা।আমি উপরে গেলাম।অহনের দেরি হয়ে যাবে।
শর্মি তাকিয়ে রইল হৃদয়ের চলে যাওয়ার দিকে।হৃদয়ের জন্য তার ভিতর মাতৃত্ববোধ ছিলো সব সময়।আজ যেন তা কেমন জেগে উঠল।হৃদয় দোতলা উঠার একটা করে সিঁড়ি ভাঙ্গছে,শর্মির মনে একটা করে নতুন প্রশ্নের উদয় হচ্ছে।সত্যি কি হৃদয় ভালো আছে?কি যেন একটা নেই আজ ছেলেটার মাঝে।হয়তো বলতে চাইছে না।
যুবতী বিধবা ভাবল,আসলে কি ছেলেটা বড় হয়ে গেছে?
অহনের রুমে রেবেকা ছিলো।হৃদয়কে দেখে বলল,কি জেদি ছেলে দেখলি?একা একা ঢাকা যাচ্ছে।
হৃদয় মনে মনে বলল,সইমা।তোমার ছেলে আর ছোট নেই।প্রেম করা শিখেছে।ভালোবাসতে বুঝেছে।তার প্রেমিক অপেক্ষায় আছে।তুমি চিন্তা করো না।রাজপুত্র খুব ভালো থাকবে বাপ্পি ভাইয়ার আয়ত্তে।
মুখে বলল,চিন্তা করো না,সইমা।আমি সব ব্যবস্থা করে দিবো।অহনের কোন সমস্যা হবে না।
রেবেকা বলল,কি জানি।তোরা যা ভালো বুঝিস কর।আমি চাই তোরা দু’ভাই ভালো থাক।
রেবেকা হৃদয়ের দিকে তাকাল,আমার খুব ভালো লেগেছে যে অহন তোকে ভাই বলে মেনে নিয়েছে।
হৃদয় একটু হাসল।অহন কথা বলল না।
তারপর হৃদয় অহনের ব্যাগ তুলে নিয়ে বলল,যাও।দাদি,বড়মাকে বলে এসো।শর্মি ফুপিকে নিচে দেখে আসলাম।যাওয়ার সময় বলে যেও।
তারপর রেবেকার দিকে তাকিয়ে আবার মুচকি হাসি দিল,তুমি দেখছোই তো আমরা ভালো আছি,সইমা।
অহন বেরিয়ে গেলে রেবেকা হৃদয়ের মাথায় হাত রাখল,আচ্ছা,সত্যিই তুই ভালো আছিস?কিছু কি হয়েছে তোর?
হৃদয় তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,তোমরা মায়েরা এমন কেন বলো তো?
রেবেকার প্রত্যুত্তর শোনার সময় যেন হৃদয়ের নেই।

ভ্যানগাড়িতে বসে অহন প্রশ্ন করল,হৃদয় ভাইয়া,আপনার কি কিছু হয়েছে?
হৃদয় হাসল,কি হবে?তোমরা সবাই কি সব বলছো!
অহন বলল,না।আপনাকে যে যত যাই বলুক,আগে কখনো এমন দেখি নি।কেমন যেন একটা অন্য রকম লাগছে।
হৃদয় অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,পরীক্ষা তো সামনে।তাই বোধহয়।
হৃদয়ের কথায় প্রাণ নেই আজ।কেমন নিথর কথার ধরন।বাচন।
অহন সাড়া দিল,হুম হবে হয়তো।

আরশিনগর বড় বাজার থেকে কিছুটা দূরে একটা ছোট রাস্তায় ভ্যানগাড়ি থামল।হৃদয় ব্যাগ তুলে বলল,চলে এসেছি।নামো।বাপ্পি ভাইয়া কোথায়?কল দাও।
বাপ্পিকে কল দেওয়া লাগলো না।সে এসে ভ্যানগাড়ির ভাড়া মিটিয়ে অহনের ব্যাগ নিলো হৃদয়ের থেকে।
হৃদয়ের কাঁধে হাত রেখে বলল,থ্যাংক ইউ ছোটভাই।অহনকে সাপোর্ট করার জন্য।ঠিকঠাক পরীক্ষা দাও।তারপর আমি দেখবো।তোমার জন্য নিশ্চয় আমরা কিছু করবো।
অহনের দিকে তাকিয়ে বলল,কি?আমি বলেছিলাম না!ভালো ছেলে কিন্তু।
অহন সামান্য হেসে মাথা নাড়াল,হুম।
বাপ্পি বলল,এখন হুম?আগে তো বুঝলে না।ছেলেটাকে কত কষ্ট দিলে।স্যরি বলেছো?
অহন জবাব দিল না সে কথার।সে তো দুঃখিত হয় নি।সে যে হৃদয়কে সময় দিয়ে নিজেকে হৃদয়ের কাছে সহজ করতে চেয়েছে।হৃদয়কে অপ্রস্তুত করতে তার ভালো লাগে নি।
বাপ্পি অহনের হাত ধরে বলল,চলো।গাড়ি এসে যাবে।
অহনকে নিয়ে হাটা দিয়ে আবার পিছন ফিরে তাকিয়ে বাপ্পি বলল,থ্যাংকস এগেইন হৃদয়।ভালো থেকো ভাই।
অহন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।কিছু বলল না।অথচ হৃদয় চেয়েছিল তার রাজপুত্র তাকে একটা কিছু বলে যাক।যেটা নিয়ে সে ভালো থাকতে-আপ্রাণ চেষ্টা করতে পারে।লড়াই করতে পারে।গত সন্ধ্যায় যে হৃদয়ের একমাত্র বেঁচে থাকার স্বপ্নটাও মাটি হলো।এখন হৃদয় নিঃস্ব।সর্বহারা।আজ অহন কেমন আপন হয়েও-পর হয়ে গেল।সে চেয়েছিল অহন অন্তত বলুক,আপনি ভালো থাকবেন হৃদয় ভাইয়া!তার রাজপুত্র হয়তো আর জানবেই না যে হৃদয়ের আর পরীক্ষা দেওয়া হবে না।অহন যে বলল-ঢাকায় কোচিং করাতে নিয়ে যাবে।সেটা যে আর সম্ভব নয় কখনো!

হৃদয় হাটু গেড়ে মাঝ রাস্তায় বসে পড়ল।

ভ্যানগাড়িওয়ালা জিজ্ঞাসা করল,আপনের কি হইছে ভাই?শরীল খারাপ?
হৃদয় হাত উঠিয়ে ‘না’ বলল।ভ্যানগাড়িওয়ালা চলে গেল।হৃদয় দু’হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরলো।চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করছে তার।অস্পষ্ট কাঁন্নার গুমোট শব্দ-তার নিজের কানে বাজছে।পেট থেকে যেন সকালের খাবার বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে।অথচ সকালে তার খাওয়া হয় নি।তবুও বমির বেগ সামলাতে সে উঠে-দৌড়ে রাস্তার পাশে নেমে গেল।অন্ননালী দিয়ে তিতা জল বেরল শুধু।

তারপর আর কোনদিন হৃদয় মির্জাবাড়ি যায় নি।আমাদের মির্জাবাড়ির গল্প কি তবে এখানেই শেষ?

(অষ্টম পর্ব)

>
বিঃদ্রঃ তোমার একটিমাত্র জীবন যদি প্রেমহীন থেকে যায়,শর্তহীন দলিলে যদি কোন বিবাদীর নাম লেখা না থাকে,অনাবিষ্কৃত ভালোলাগা যদি তোমার ঠোঁটের আঙ্গিনায় বিরহ না জাগায়,একটিমাত্র জীবনে তুমি যদি কলঙ্ক এর সুখই না পেলে-তবে তুমি…!তবে তুমি আমার গল্প পড়ো না।
>

পনেরো।

চার বছর পর।

সাহাপাড়া মোড়ের ‘মধু টি স্টল’ এ হৃদয়কে প্রায় দেখা যায়।এ ক’বছরে হৃদয় অনেকটা বদলে গেছে।আরশিনগরে অনেকে আজকাল তাকে ভয় পায়।সহজ সরল হৃদয় বখাটেপনা শিখেছে।সিগারেট ফুকা শিখেছে।গ্রাম্য রাজনীতিতে জড়িয়ে নিজের জায়গা করে নিয়েছে।দল থেকে মোটরবাইক পেয়েছে।তরুণ থেকে যেন যুবকে বদলেছে।শরীর বদলেছে।মন বদলছে।দুঃখের রং তার কাছে নিছক ছেলেমানুষি।যা কেবল ফ্যাকাসে নয়।মলিন হয়েছে।জীবনকে জটিল করে ফেলেছে।অসংখ্য ভালো-মন্দের সঙ্গ পেয়ে বিবেক ভোঁতা হয়ে গেছে।গ্রামের চায়ের দোকানে।পাড়ার মোড়ে।স্কুল-কলেজ মাঠ কিংবা হাট-বাজারে সে আড্ডায় মাতোয়ারা হয়।হৈ হুল্লোড় করে।সবখানে তার অবাধ বিচারণ।বাড়িতে সে কেবল শান্ত এবং নির্জীব থাকে।অবাধ্য হৃদয়ের মনে এখনো কোথাও ঘাপটি মেরে বসে আছে সরল শব্দটা।নরম।কোমল হৃদয় অনুভূতি হয়তো আজও আছে তার।

মাস খানেক ধরে সে সাহাপাড়া মোড়ের পথে হেটে যাওয়া দু’টি ভাইবোনকে লক্ষ্য করছে।সাহাপাড়া মোড় হয়ে তারা কলেজে যায়।শরীফ চেয়ারম্যানের ভাইবোন।আরশিনগরের বর্তমান চেয়ারম্যান শরীফ জোয়ারদার।দুই ভাইবোন আর স্ত্রী নিয়ে চারজনের ছোট্ট সংসার যুবক চেয়ারম্যানের।
তাদের কে দেখতেই সে রোজ সকাল-বিকাল সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে-বাইক দাঁড় করিয়ে মধু দাদার দোকানে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকে।বর্ণ আর অনু যখন কলেজে যায়,হৃদয় রোজ তাদের পিছু নেয়।বাইকের গতি মন্থর করে-তাল রাখে।অনু কখনো পিছু ফিরে দেখে না।কিন্তু বর্ণ বারবার পিছু ফেরে আর মুচকি হাসে।হৃদয় তা দেখে বর্ণকে চোখের ইশারা করে যেন অনু একবার তার দিকে পিছন ফেরে।তখন বর্ণ ছলনা করে বলে,আপু,হৃদয় ভাইয়া আজ পিছনে আসছে না!অবাক হয়ে অনু পিছু ফেরে।হৃদয় তখন বাইকের লুকিং গ্লাসে নিজের মাথার চুল ঠিক করতে ব্যস্ত থাকে।অনু ধোকা খেয়ে বর্ণের পিঠে মৃদু আঘাত করে বলে,শয়তান।আর একদিন এমন করলে না!আন্না কে বলে দিবো।

আজ বর্ণ একা ছিল।হৃদয় সরাসরি তার সামনে বাইক থামাল।বর্ণের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচাল,কি শালাবাবু,আজ একা যে!আমার বউটি আসে নি?সে কোথায়?
বর্ণ মুচকি হেসে বলল,নাহ দুলাভাই।আজ আপনার বউটি আসে নি।
হৃদয় চোখের সানগ্লাস খুলল,কেন আসে নি?আমার অত্যাচারে?
বর্ণ অদ্ভুদভাবে মুখ বিবৃতি করল,রুশা আপুর বিয়েতে গেছে।
হৃদয় বর্ণের মুখের ভাব দেখে বলল,বাহ,দু’ভাইবোনের বেশ তেজ।এমনই তো চাই।
তারপর হৃদয় জিজ্ঞাসা করল,বাই দ্যা ওয়ে,রুশাটা কে?
বর্ণ চটপট উত্তর দিল,অনু আপুর বান্ধবী।
হৃদয় হাসল,ও মেরা শালী।তো আমার শালাবাবু যায় নি কেন?
হৃদয়ের সাথে বর্ণের আলাদা একটা সম্পর্ক আছে যেন।নামহীন।তবুও সেটা সম্পর্ক।অনু হৃদয়কে যতটা অপছন্দ করে,বর্ণ যেন ঠিক ততটা পছন্দ করে।
বর্ণ মুচকি হেসে বলল,আপনার শালাবাবুর আজ একটা ক্লাস টেস্ট আছে।বিকালে যাবে।
হৃদয় বাইক দেখিয়ে বলল,তো উঠে এসো?
বর্ণ আপত্তি করল,কই নিয়ে যাবেন?
হৃদয় নিচু হয়ে বর্ণের কানের কাছে মুখ নেয়,ভয় নেই!অপহরণ করবো না।এতদূর হেটে যাবে কেন?মে হু না।আয়ো মেরা শালা।
বর্ণ দুষ্টুমি করল,এতো দিন কই ছিলো এত দরদ।
হৃদয় বলল,তোমার বোনকে দেখলে তো আমার নিজেরই ভয় করে।তাই আর তোমাদের ধারে কাছে যাই না।আমার বউটা খুব রাগী না?
বর্ণ আড়চোখে তাকাল,আপনার শালাটাও খুব রাগী।দেখবেন?
হৃদয় ভাণ করল,আরে না না।আমি তোমাকেও ভয় পায়।
দু’জনেই হেসে উঠে।
তারপর বর্ণ বলল,হৃদয় ভাইয়া,আমি যেতে পারবো।সামনেই তো কলেজ।
হৃদয় এবার টিপ্পনী কাটল,এই সেরেছে।দুলাভাই উবে গেল!হৃদয় ভাইয়া?
বর্ণ কেবল হাসল।কিছু বলল না।
হৃদয় হেসে বলল,যাই হোক যেতে যে পারবেন তা আমিও জানি,শালাবাবু।তবুও উঠুন।ছেড়ে আসি।আমার তো একটা দায়িত্ব আছে।নাকি!
বর্ণ বাইকের পিছনে উঠে বসল।হৃদয় বলল,ধরে বসুন।আপনার দুলাভাই ইয়ং জেনারেশনের,ধীরে মোটেও চালাবে না।
বর্ণ হৃদয়ের কাঁধে হাত রাখল।
হৃদয় পিছন দিকে হাত বাড়াল,শালাবাবু,ব্যাগটা আমার কাছে দিন!আমি আমার সামনে রেখে দেয়।
বর্ণ ব্যাগ এগিয়ে দিলে হৃদয় তার সামনে রাখে।তারপর বর্ণের হাত দু’টো নিয়ে নিজের পেটকে আবদ্ধ করিয়ে বলল,এভাবে ধরে বসে থাকেন।পড়ে গেলে কিন্তু আমার দোষ দিতে পারবেন না।
বর্ণ সেভাবেই জাপটে ধরে পড়ে থাকে।হৃদয়ের পিঠে নাক পড়তেই মিষ্টি একটা গন্ধ তার মস্তিষ্কে প্রবেশ করে।মিহি মাদকতার নেশা।সে ভাবে,এতো সুন্দর একটা ছেলেকে কেন যে অনু আপু পছন্দ করে না।সেটা তার অবুঝ মন বুঝতে চায় না।সে মেয়ে হলে কতই না ভালো হতো।কত আগে সে প্রেমে পড়ে যেত।কি মায়া হৃদয় ভাইয়ার চোখে-মুখে।

হৃদয়ের হাতের তুড়ি পড়াই বর্ণের ভাবনায় ছেদ পড়ল,শালাবাবু,এসে গেছি তোমার কলেজ।
বর্ণ নেমে ব্যাগটা নিয়ে হাটা দিল।হৃদয় পিছন থেকে বলল,মানুষ কি অকৃতজ্ঞ!দুলাভাইকে অন্তত একটা ধন্যবাদ তো দেওয়া যেত।
বর্ণ দাঁড়িয়ে পিছন ফিরল,নিজের লোকদের কখনো ধন্যবাদ দিতে নেই।
হৃদয় বাইকে হাত ঠেকিয়ে নিচু হলো,তাই নাকি?শালাবাবু দেখি অনেক বড় হয়ে গেছে।
বর্ণ আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে বলল,সে তো হয়েছি।সব কিছু বড় বড় হয়ে গেছে।
হৃদয় চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে বলল,দেখি কি কি বড় হয়েছে।
বর্ণ আরো দু’পা পিছিয়ে যায়,উঁহু,ওখানে দাঁড়ান।
হৃদয় বলল,আচ্ছা দাঁড়ালাম।
বর্ণ বলল,দ্যাট’স লাইক এ গুড বয়।
হৃদয় হাসল।বর্ণও হেসে হাটা দিল।
হৃদয় এবার কোমল কন্ঠে ডাকল,বর্ণ!
বর্ণ আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে সাড়া দিল,হুম।কহেন দুলাভাই!
হৃদয় জিজ্ঞাসা করল,ক্লাস টেস্টের পর একটু সময় দিতে পারবে?কিছু কথা ছিলো।আমি তোমার কলেজেই থাকছি।
বর্ণ মাথা নাড়িয়ে দ্রুত ক্লাসের দিকে পা বাড়াল।

হেমন্তের ফুরফুরে হাওয়া বইছিল।বেশ ভালো লাগছিল বর্ণের।এর আগে এখানে কখনো আসে নি সে।পদ্মা নদীর পাড়ে একটা বিশাল বট বৃক্ষের ছায়ায় শান বাঁধানো ঘাটে বসে আছে সে আর হৃদয়।হৃদয় এখানে আগেও একবার এসেছিলো।এটা দ্বিতীয়বার তার।ভরদুপুরে নদীর ঘাটে লোকের আনাগোনা কম।হৃদয় শার্টের বোতাম খুলে দিল।শার্টের নিচের সাদা স্যান্ডো গেঞ্জিতে ঢাকা-হৃদয়ের সুগঠন শরীর বর্ণের চোখে পড়ল।
হৃদয় হেসে বলল,ডোন্ট মাইন্ড শালাবাবু।গরম লাগছে খুব।তাই..আর কি!
বর্ণ যেন কিছু মনেই করল না।বলল,ইট’স ওকে।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে বর্ণ নিঃশ্বাস ফেলল,হৃদয় ভাইয়া,কি কথা ছিলো বললেন যে!
কি একটাতে ডুবে ছিল হৃদয়।বর্ণের কথাতে তার যেন ঘোর কাটল,ওহ,হ্যাঁ।তাই তো।আচ্ছা তোমার আন্না আমাকে পছন্দ করেন না কেন?
বর্ণ বুঝাল,আপনার বাবার সাথে রাজনৈতিক মনমালিন্য তো লেগেই থাকে।হয়তো তাই!
হৃদয় গলা পরিষ্কার করল,হুম।বুঝলাম।কিন্তু বর্ণ,অনু আমাকে কেন অপছন্দ করে?
বর্ণ ঢোঁক গিলল।সে ভেবেছিলো তার কথা কিছু বলবে।বলল,আপু ঠিক অপছন্দ করে-তা নয়।আন্নার ভয়ে হয়তো অমন করে।
হৃদয় দৃষ্টি স্থির রাখল,নাহ,আমি বুঝতে পারি।কেউ ভালোবাসলে তার চোখ দেখে বোঝা যায়,না ভালোবাসলেও বোঝা যায়।ওর চোখে আমার জন্য ঘৃণা দেখেছি।
বর্ণ হো হো শব্দে হেসে উঠল।বলল,আপনি একটু গুন্ডা টাইপের তো।তাই হয়তো।
হৃদয় শান্ত অথচ কেমন আর্দ্র স্বরে বলল,অনু কি অন্য কাউকে ভালোবাসে?
বর্ণ অবাক হল,আরে নাহ,হৃদয় ভাইয়া।
হৃদয় আপত্তি করল,না বলছো কেন?অনুর সবটা হয়তো তুমি জানো না।
বর্ণ আত্মবিশাস নিয়ে বলল,অসম্ভব!অনু আপু আমাকে সবটাই শেয়ার করে।
হৃদয় উদাস দৃষ্টিতে বটবৃক্ষের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,জানো তো,আমাকে কেউ ভালোবাসে না।
বর্ণ তার দিকে তাকাল,এভাবে বলছেন কেন?
হৃদয় আবেগভরা কন্ঠে বলল,ছোটবেলায় মা মরলো।বাবা আবার বিয়ে করল।অর্থ সম্পদের অভাব নাই,কিন্তু ভালোবাসা জুটলো না কপালে।সৎমা চোখে দেখতে পারে না,বাইরে থেকে থেকে আমি নষ্ট হয়ে গেছি।
বর্ণ হৃদয়ের হাটুতে হাত রেখে বলল,কেউ ভালো বাসুক আর নাই বাসুক,আমি আপনাকে অবশ্যই ভালোবাসি।
হৃদয় বাম হাত দিয়ে বর্ণের গাল ছুঁয়ে বলল,থ্যাংক ইউ,শালাবাবু।অন্তত পৃথিবীতে কেউ তো একজন আমাকে ভালোবাসে বললো।
অভিমানে তার চোখ ছলছল করছে।বলল,চলো উঠি,বর্ণ।
বর্ণ বলল,শুধু এটুকু বলার জন্য আমাকে এতদূর।নির্জন একটা জায়গায় আনলেন?
হৃদয় অবাক চোখে তাকাল,তো।আর কি?
বর্ণ বলল,না কিছু না।
তারপর বর্ণ উঠতে উঠতে সান্ত্বনা দিল,হৃদয় ভাইয়া,দেখবেন একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।
হৃদয় শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে বলল,কি জানি!আমার জীবনে কোনদিন কিছু ঠিক হবে না।
বর্ণ পা বাড়াল,জানি,অভিমানে এসব বলছেন।কিন্তু দেখবেন সত্যি একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে।

বর্ণকে জোয়ারদার বাড়ি নামিয়ে দিয়ে হৃদয় সোজা চেয়ারম্যান বাড়ি গেলো।হ্যাঁ,হৃদয়দের তালুকদার বাড়ি-এখনো,চেয়ারম্যান বাড়ি নামে পরিচিত।যদিও আরশিনগরে গত তিন বছর প্রতিনিধিত্ব করছে শরীফ জোয়ারদার।সাদেক চেয়ারম্যান নানান ফন্দিফিকির করে চলেছে আগামী নির্বাচনে জয় লাভের আশায়।

মাঝ উঠানে বাইক দাঁড় করিয়ে হৃদয় ঘরে ঢুকে গেলো।তার অগোছালো জীবনের মতো ঘরটা অগোছালো হয়ে গেছে।আগে মর্জিনা গুছিয়ে রাখতো সব।রহিমের সাথে বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর হৃদয়ের ঘরে অগোচরে ঢোকাও বন্ধ করে দিয়েছে সে।সাদেক চেয়ারম্যান লোকচক্ষুতে ভালো হওয়ার সুবাদে আসমা বেগমের অমত থাকা সত্ত্বেও রহিমকে পুকুর পাড়সংলগ্ন তিন কাটা জমি লিখে দিয়েছে।তাতে নতুন ঘর তুলেছে রহিম।কৃতজ্ঞে মাঝে মাঝে চোখ ব্যথা করে রহিমের।হাটে-বাজারে পরিচিত কিংবা অর্ধপরিচিত লোকেদেরকে বলে,চেয়ারম্যান চাচায় বড় ভালা মানুষ,আমারে থাকনের জায়গা দিছে।আগামী ইলেকশনে ভোট কিন্তু চেয়ারম্যান চাচাকে দেওন লাগে আপনাদের।মর্জিনা পোয়াতি হয়েছে।তাই চেয়ারম্যান বাড়ি কম আসে কাজে।নিজের কাজ শেষে অর্ধবৃদ্ধ শাশুড়ির কাজ কমিয়ে দেয় রহিম হাতে হাতে সাহায্য করে।সখিনা মনে মনে রহিমের জন্য দোয়া করে,মর্জিনার কোল পুরে য্যান ব্যাটা ছাওয়াল আহে।
হৃদয়ের সেই জরাজীর্ণ ঘর-পাশের রুমে আজও সখিনা থাকে।জামাই মেয়ের নতুন ঘরে তিনি যেতে চান নি।হৃদয় বুঝতে পারে না-এই স্বামী হারা মহিলা মুক্তির পথ পেয়েও কেন মুক্ত হতে চায় না।তার যে খুব মন চায়-মুক্ত হতে।রহিম নেই-চেয়ারম্যান বাড়ির কাছারিঘরটা শূন্য খাঁচার মতো দেখায়।আগের মতো শালিস-বিচার বসে না।শুভাকাঙ্ক্ষী কেউ এলে সাদেক সাহেব একেবারে ভিতরবাড়ি এনে খাতির যত্ন করেন।যেন পরমাত্মীয়।আসমা বেগমও তাড়াহুড়ো করেন।উদয় আজকাল বড় পরপর হয়ে গেছে।হৃদয় বাড়িতে তাকে তেমন পায় না বললেই চলে।প্রাথমিক স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কেমন লায়েক হয়ে গেছে।হৃদয় একটিবার মুচকি হাসে।
তারপর সখিনাকে ডাকে,সখিনা ফুফু,ভাত হয়েছে?
সখিনা পাশের ঘর থেকে উত্তর দেয়,তুমি বহো বাজান,আমি আইনা দিতাছি।
সখিনা খাবার দিয়ে গেলে হৃদয় খেয়ে শুয়ে পড়ে।একটা ঘুম দিয়ে সন্ধ্যায় গোসল করে নেবে।শরীরের যত্নও আজকাল তার নিতে মন চায় না।অনেকক্ষণ চোখ বুজেও ঘুম আসে না।উঠে বসে একটা সিগারেট ধরাই।কিছুটা টেনে ফেলে দেয়।তিতকুটে গন্ধ।অথচ গত চার বছর ধরে সে এটাই খেয়ে চলেছে।ঘরময় সিগারেট অবশেষ।মাঝেমধ্যে সখিনা একটু আধটু পরিষ্কার করে।হৃদয় আবার শুয়ে পড়ে।তার একটু ঘুমানো দরকার।রাতে প্রায় তার ঘুম হয় না।দিনে ঘুমিয়ে সেটা পোষানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে।

বর্ণের ডাকে আধখোলা চোখে তাকায় হৃদয়।প্রশ্ন করে,বর্ণ,কখন এলে তুমি?
বর্ণ মুচকি হেসে শিহরে বসল,অনেকক্ষণ।আপনাকে দেখছিলাম।
হৃদয় সম্পূর্ণ তাকিয়ে উঠে বসল।বলল,আরে আমাকে ডাকলে না কেন?
বর্ণ পা উঠিয়ে আসন পেতে বসে।হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,ডাকতে মন চাচ্ছিল না।বললাম না যে আপনাকে দেখছিলাম।
হৃদয় নিজের খালি গায়ের দিকে তাকিয়ে যেন লজ্জা পায়।বালিশের কাছ থেকে স্যান্ডো গেঞ্জি টেনে গায়ে চাপাতে চাপাতে বলল,শালাবাবু,তুমি তো দেখি ভারী বেহায়া।পরের জিনিসের দিকে নজর দাও।তোমার তো দেখি নজর ভালো না।
বর্ণ খিলখিল করে হাসল,পরের জিনিস কই,দুলাভাই?
হৃদয় বলল,আমি কি তোমার জিনিস?আমি তোমার বোনের জিনিস!
বর্ণ এবার উঠে হাটু গেড়ে বসে হৃদয়ের দিকে ঝুকে বলল,শালা দুলাভাইয়ে তো রসের সম্পর্ক থাকে।রসায়নটা জমানো উচিত না?
হৃদয় হাত দিয়ে বর্ণকে আবার আগের অবস্থানে বসিয়ে বলল,থাক হয়েছে,শালাবাবু।বেশি রস গলিয়ে লাভ নাই।পরে তোমার নিজের মানুষের জন্য রস কম পড়বে।মানুষটা বেরসিকের সঙ্গে ঘর সংসার করবে আর আমাকে গালমন্দ করবে।
বর্ণ কটাক্ষ করল,সে চিন্তা আপনার না করলেও চলবে।
হৃদয় খাট থেকে নামতে চাইল,কি খাবে বলো?আজ তুমি প্রথম আমাদের বাড়িতে এলে,মিষ্টি মুখ তো করাতেই হয়।
বর্ণ হৃদয়ের হাত চেপে ধরল।বড় বড় চোখে তাকিয়ে বলল,মিষ্টি মুখ না করে আমি যাচ্ছিও না।আপুর হবু হাজবেন্ড বলে কথা।বিয়ের আগে যত ফ্রী খেয়ে পারি।
হৃদয় বর্ণের সামনের চুল টেনে বলল,কিন্তু শালাবাবু,এমন মিষ্টি মিষ্টি কথা বললে।মিষ্টি হাত দিয়ে ধরে রাখলে।মিষ্টিটা আমি আনবো কিভাবে শুনি!
বর্ণ হৃদয়কে ধাক্কা মেরে বিছানায় ফেলে দিল,মিষ্টি আনতে বাইরে যাওয়ার কোন অনুমতি নেই,দুলাভাই।মিষ্টি খাওয়া নিয়ে কথা তো।সেটা আমি ঠিক খেয়ে নিবো।
হৃদয় বুকের উপর নিজের দু’হাত উঠিয়ে হেসে বলল,রেপ করবে নাকি?তোমার তো ভাবসাব ভালো না দেখি,শালাবাবু।আমি অবলা পুরুষ মানুষ।দোহাই লাগে ছেড়ে দাও।
‘অবলা পুরুষ মানুষ না!’ বলেই বর্ণ হৃদয়ের বুকের উপর চড়ে দু’হাত দিয়ে হৃদয়ের চোখ দু’টো বন্ধ করল।হৃদয়ের সিগারেট খাওয়া ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল।
কিছুক্ষণ পর ‘ওয়াক থু’ বলে ঠোঁট উঠালো,ঐ আপনি সিগারেট খান কেন?কি বিশ্রী দুর্গন্ধ!
হৃদয় একটা পাল্টা গোড়ে অবস্থান বদল করে বর্ণের বুকের উপর পড়ল।
ঠোঁটে দুষ্টুমির হাসি টেনে বলল,তাই না?ফাজিল।আমাকে পাগল করার ধান্দা।
বর্ণের দু’হাত দু’দিকে ছড়িয়ে তাতে নিজের আঙ্গুলগুলো দিয়ে মুষ্টিবন্ধ করে বর্ণের নরম ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল।

ধড়ফড় করে ঘুম থেকে উঠে বসল হৃদয়।কি সাংঘাতিক স্বপ্ন।কি সব লজ্জার দৃশ্য।নিচের দিকে তাকিয়ে জিহ্বা কাটল হৃদয়।লুঙ্গির অবস্থা দেখার মতো।

দ্রুত বিছানা থেকে নেমে-তোয়ালে কোমরে পেঁচিয়ে পুকুরের দিকে গেল সে।

ষোল।

রুশার বিয়ে থেকে ফিরতে রাত দশটা বেজে গেল।

রুমে ঢুকে বর্ণ সোফায় শুয়ে পড়ল।এতো রাতে কোন গাড়ি না পেয়ে হেটে আসতে হলো তাদের।ভাগ্যিস আন্না লোক পাঠিয়েছিলো।তা না হলে কি যে হতো।
সুমি বলল,কি’রে শুয়ে পড়লি কেন?হাত পা ধুয়ে ফ্রেশ হ।তারপর গিয়ে ঘুমিয়ে পড়।
বর্ণ হাত পা ছড়িয়ে পাঞ্জেবী খুলতে খুলতে বলল,ভাবী,আন্না কখন আসবে?
সুমি নিজের রুমে যাচ্ছিল।ফিরে এসে সোফায় বসল,ধুর,আর বলিস না।দেখলি তো আমাদের সঙ্গে বিয়েতেও গেলো না।কাউন্সেলিং অফিসে কি একটা সমস্যা হয়েছে তাই নিয়ে মেতে আছে।রাত-বেরাতেও তার হাজারটা কাজ।চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকে আমরা যেন পর হয়ে গেছি।
বর্ণ মুচকি হাসল,আরে তোমার জন্য তো আমি আছি।
সুমি চোখ বড় বড় করে তাকাল।পরক্ষণে হেসে দিল।
বর্ণ এবার সুমির দিকে তাকিয়ে বলল,বাহ,ভাবি।তোমাকে তো আজ সুন্দর লাগছে।
সুমি বর্ণের চুল টেনে বলল,মাইর খাস না কতকাল?
বর্ণ সুমির কোলে শুয়ে পড়ল,বহুকাল।তুমিই তো মারো না।নাও এবার মারো।
সুমি বর্ণের চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলল,এভাবে আদর পাওয়ার লোভে কোলের উপর শুয়ে পড়লে মারা যায়?
বর্ণ উপর দিকে চেয়ে বলল,কেন পারবে না?তারপর সুমির বাম হাতটা টেনে তার গালের উপর রাখল,নাও মারো।
সুমি হেসে বর্ণের নাক টেনে বলল,যা তো-হয়েছে।এবার উঠে গিয়ে দেখ আমার রাইবাঘিনী নন্দিনীর মেক আপ তোলা হলো নাকি?আমি দেখি লতিফের মা কি সব করে রেখেছে।
কোল থেকে বর্ণের মাথাটা নামিয়ে সোফাতে রেখে সুমি বলল,থাক তুই এখানে পড়ে।আমি গেলাম।
বর্ণ কটাক্ষ রাগ দেখালো,যাও যাও।আমাকে আদর করতে বললে তো তোমার সময় থাকে না।আন্না চাইলে না করতে না।
সুমি মুচকি হাসি দিল,ঐ ফাজিল।সে তো আমার স্বামী।তুই কি আমার স্বামী?
বর্ণ উঠে বসল,শোনো,স্বামীর চেয়ে দেবর বেশি আপন।তুমি কিচ্ছু জানো না!
সুমি বলল,হয়েছে।খুব পাকা না!থাম এবার।তুই আমার কি সেটা একমাত্র আমি জানি।তুই আর অনু তো আমার সন্তান।তোদের কখনো আমি দেবর-ননদ ভাবি নি।ভাববোও না।
তার চোখ ছলছলিয়ে উঠল।
বর্ণ বিরক্ত হল,উফ,আমি তো মজা করলাম।এই যে ইমোশনাল হয়ে গেলে।এখন কাঁন্নাকাটি শুরু করবে।আমি কি জানি না সেই ছোটবেলা থেকে তুমি আমাদের জন্য কি কি করছো!আমাদের মানুষ করার জন্য তুমি নিজের একটা সন্তান পর্যন্ত পৃথিবীতে আনো নি।ধুর তোমার জন্য আমিই এখন ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছি।তোমাকে না মজা করে আর কোনদিন কিছু বলবো না।
বর্ণ উঠে গিয়ে সুমির কাঁধে হাত দিয়ে মৃদু ধাক্কা দিল,তুমি যাও তো।নিজের কাজ করো।মেয়ে মানুষের এই এক বড় দোষ।কিছু একটু হলেই খালি প্যাঁচাল আর চোখে জল।
সুমি বর্ণের কান ধরল,ঐ শালা।খুব মেয়ে মানুষ চিনে গেছিস না?তা শুনি,কয়টার সাথে লটরপটর করছিস কলেজে?
বর্ণ বলল,ভাবী ভালো হচ্ছে না কিন্তু!ব্যথা লাগছে।ছাড়ো বলে দিলাম।শোনো,আমি তোমার ভদ্র দেবর।কলেজে কোন লটরপটর নাই।
সুমি কান ছেড়ে দিয়ে বলল,যা!আজ মাফ করে দিলাম।না হলে তো আবার তোর আন্না আসলে বিচার বসাবি।
বর্ণ সোফা হতে পাঞ্জেবী নিয়ে দৌড় দিল,বলবোই তো।দেখো তুমি আন্না আসলে তোমাকে আজ বকা খাওয়াবো।
সুমি জোরে জোরে বলল,যা বলিস।টাকার দরকার পড়লে চাইতে আসবি না?তখন দেখবো।ফাজিল।

জোয়ারদার বাড়ি।নতুন চেয়ারম্যান বাড়ি।চেয়ারম্যান বাড়ি হলেও আরশিনগরের কেউ এটাকে চেয়ারম্যান বাড়ি বলে না।সকলে বলে শরীফ জোয়ারদারের বাড়ি।শরীফের বাবা ছিলেন আরিফ জোয়ারদার।ব্যবসায়ী মানুষ।নানান জেলা ঘুরে ব্যবসা করতেন।নেত্রকোনার রসুলপুরে ব্যবসা করতে গিয়ে কাইসার চৌধুরীর একমাত্র মেয়ে রিনাকে বিয়ে করেন।তারপর ধীরে ধীরে সম্পত্তির বহর গড়েন।কিন্তু ভাগ্যের চক্রে দু’জনই এক্সিডেন্ট করে।হাসপাতালে নিয়েও শেষ রক্ষা হয় না।মারা গেল।তখন বর্ণ অনু একদম ছোট।শেষে আত্মীয়-স্বজনের পরামর্শে দায়ে-চাপে পড়ে অনার্স পড়ুয়া শরীফকে বিয়ে করতে হয়।কেবল ভাইবোনদের বড় করতে।স্বামী স্ত্রী মিলে বর্ণ আর অনুকে মানুষ করেছে।তারা আজ বড় হয়েছে।সুমির চোখে জল এসেই গেল।আঁচল দিয়ে চোখ মুছে সে ডাকে,লতিফের মা।শুয়ে পড়েছো নাকি?

অনু টেবিলে বসে পড়ছিল।অনেকক্ষণ হলো বর্ণ এসে তার বিছানায় শুয়ে শুয়ে পা দোলাচ্ছে।বর্ণের কিছু একটা বলবার বা চাইবার দরকার হলে সে এমনটা করে।
অনু এবার না থাকতে পেরে বলল,কি’রে তোর নিজের পড়া নেই?এখানে শুয়ে আছিস কেন?
বর্ণ সাহস পেয়ে উঠে বসল,শোন না,আপু।একটা কথা বলবো?
অনু বর্ণের দিকে না তাকিয়ে প্রশ্ন করল,তোর এইচএসসি টেস্ট পরীক্ষার আর কতদিন আছে রে?
বর্ণের মুখ শুকিয়ে গেল।বলল,বিশ দিন।
অনু বলল,রেজাল্ট ভালো না হলে আন্না একটা আছাড় মেরে তোর ব্যাঙ্গা গলিয়ে দিবে!
বর্ণ বিছানা থেকে নেমে এসে অনুর পিঠের কাছে দাঁড়াল,ব্যাঙ্গা কি?
অনু বিরক্ত হয়ে বলল,ঐ আমি জানি না।কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান না করে নিজের রুমে গিয়ে পড়তে বোস।
বর্ণ বলল,যা জানিস না।তা বলিস কেন?
অনু বই বন্ধ করে ঘুরে বসল,উফ,ঝামেলায় পড়লাম তো।বল কি বলবি!যতক্ষণ না শুনবো।কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করবি।যা বলবি বলে বিদায় হ তো।
বর্ণ বেশ উৎসাহ নিয়ে বলল,আজ দুলাভাইয়ের মোটরবাইকে উঠেছিলাম।
অনু রাগী চোখে তাকাল,বর্ণ।বেশি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু।ভাবীকে ডাক দিবো এবার।
বর্ণ বলল,আরে শোনো না।
অনু কপাল কুঁচকালো,ঐ তোকে কতদিন বলেছি যে ঐ ছেলেকে দুলাভাই ডাকবি না।ওর সাথে কি আমার বিয়ে হয়েছে?
বর্ণ সে কথার পাত্তা দিল না।বলল,হয় নি তো কি হয়েছে!আজ না হোক কাল তো হবে!
অনু বলল,তোকে বলেছে।আন্নাকে যদি বলি না।ওকে কেটে কুচিকুচি করবে।
বর্ণ এবার অনুর পড়ার টেবিলে ঠেলান দিয়ে দাঁড়াল,আমি জানি তুই জীবনেও এই কাজটা করবি না।আমার আপু না তুই!এমন কাজ করতে পারিস?
অনু ফিকে হাসি দিল,তাই না?আমাকে পটিয়ে না,কোন লাভ নেই।সর এখান থেকে।আর একদিনও টাকা চেয়ে পাবি না।তোর ঐ দুলাভাই-ঐ যে ললিপপ,চিপস কি সব কিনে দেয়।ওসব খাবি।আমার কাছে টাকা চাইতে আসবি না।
বর্ণ অনুকে জড়িয়ে ধরল,ঐ না আপু।আর দুলাভাই বলবো না।প্লিজ।প্লিজ।এমন করিস না।
অনু হেসে দিল,থাক হয়েছে।রুমে গিয়ে পড়তে বোস।
বর্ণ জড়িয়ে রেখেই বলল,বল,টাকা দিবি।
অনু বর্ণের হাত ছাড়িয়ে বলল,যা দেবো।আচ্ছা তোর কত টাকা লাগে রে?আন্নার থেকে নিস,ভাবীর থেকে নিস,শেষে আমার ক’টাও নিস।
বর্ণ হাত প্রশস্ত করে বলল,এতো লাগে।তোর একটা মাত্র ছোটভাই,দিবি না?
অনু বলল,ঐ যা।কানের কাছে আর বকিস না।পড়তে দে।
বর্ণ গিয়ে তার নিজের বিছানায় শুয়ে পড়ল।অনু বলল,তোকে না বললাম নিজের রুমে গিয়ে পড়তে বোস।
বর্ণ কোলবালিশ টেনে নিয়ে বলল,আজ আর পড়বো না।রুশা আপুর বিয়েতে বেশি খাওয়া হয়ে গেছে।
বর্ণ একা ঘুমাতে ভয় পায়।তাই অনুর রুমে দুটো আলাদা বিছানা করে দু’জনের শোয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।আগে অবশ্য একই বিছানায় শুতো তারা।বর্ণের এসএসসির আগে বর্ণ নিজেই এই ব্যবস্থা করেছে সুমিকে বলে।আলাদা রুম নিয়েছে নিজের পড়ার জন্য।কিন্তু একা শুতে পারে না বলে অনুর রুমেরই নিজের আলাদা পালঙ্কের ব্যবস্থা।তার নিজের কেমন লজ্জা লাগতো,বিশেষ করে যেদিন প্রথম ঘুমের মধ্যে স্বপ্নদোষ হলো।লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়েছিলো।অনুর দিকে তাকিয়ে দেখে সে এখনো ঘুম।দ্রুত উঠে ওয়াশরুমে ঢোকে।তারপর বিছানা আলাদা করেছে।সে নিজেও বুঝেছিলো অনুরও গোপনীয়তার বড় প্রয়োজন আছে।
অনু ফের পড়াই মনোযোগ দিল।বলল,আচ্ছা।ঘুমা।আজ ছেড়ে দিলাম।
বর্ণ ডাকল,আপু?
অনু বইয়ের দিকে তাকিয়েই বলল,হুম।কিছু বলবি?
বর্ণ বলল,তুই হৃদয় ভাইয়াকে কেন পছন্দ করিস না?
অনু আনমনা হয়ে বলল,জানি না রে।আন্না কে তো তুই চিনিসই।যেমন ভালো,তেমন মন্দ।
বর্ণ জিজ্ঞাসা করল,হৃদয় ভাইয়াকে অপছন্দ করার একমাত্র কারন কি আন্না?
অনু অস্পষ্ট শব্দ করল।তারপর বলল,হয়তো।
বর্ণ বলল,হৃদয় ভাইয়া কিন্তু খুব দুঃখী মানুষ।
অনু জানাল,শুনেছি রে।আমাদের ক্লাসে সোনালি আছে না?ওদের বাড়ি ওনাদের বাড়ির কাছে।ও সব বলেছে।সৎমায়ের জন্য নাকি ইন্টার পাসটাও করতে পারে নি।অনাদরে।অবহেলায় কেমন গুন্ডাটাইপের হয়ে গেছে।
বর্ণ টিপ্পনী কাটল,বাহ।বেশ তো খবর রাখিস।দুলাভাই হলে মন্দ হয় না!বল?
অনু রেগে গেল,আবার?
বর্ণ বলল,এমন করিস কেন?একটু দুলাভাই ই তো বলি।আর কিছু কি বলি?
অনু জোরে ডাকল দিল,ভাবি!
বর্ণ পাশ ফিরে কাঁথা মুড়ি দিল,প্লিজ আপু।আর বলছি না।ভাবিকে ডাকিস না।

অনু মুচকি হাসি দিল।

তার বেশ কয়েকদিন পর।

অনু আর বর্ণ কলেজে যাচ্ছিল।সাহাপাড়া মোড়ের সেই ‘মধু টি স্টল’র কাছে গেলে-হৃদয় বর্ণকে ডাকল দিল।
অনু বর্ণের হাত চেপে ধরল,যাবি না বলে দিলাম।
বর্ণ অনুর হাত ছাড়িয়ে বলল,ছাড়ো তো আপু।আমি যাবো আর আসবো।শুনে আসি কি বলছে।
অনু বলল,আমি কিন্তু আন্নাকে বলে দিবো।
বর্ণ রাস্তা পার হতে হতে বলল,যাও বলো।
অনু রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।ভাগ্যিস বোরকা পরা ছিলো।কেউ দেখলেও চিনবে না।আন্নাকে তার বড্ড ভয় করে।
বর্ণ এসে বলল,কি?বলুন দুলাভাই।
সেদিন অমন একটা স্বপ্ন দেখে-বর্ণের সামনে হৃদয় বেশ কয়েকদিন সহজ হতে পারে নি।কেমন একটা অস্বস্তিতে ছিলো!মনে পড়লে তার হাসিও পেত।
হৃদয় বলল,কি খাবে?বলো!
বর্ণ দোকানের দিকে তাকাল।তারপর ঠোঁট ভেংচিয়ে বলল,কিছুই তো খাওয়ার মতো দেখি না।কিছু খাবো না।যাই।
হৃদয় বর্ণের হাত ধরে টান দিল,আরে শালাবাবু।ওয়েট।তুমি যা খেতে ভালোবাসো সবই আছে।
দোকানদারকে লক্ষ্য করে বলল,মধু দাদা,ওকে দু’টো চিপস দাও।
তারপর আবার হৃদয়ের দিকে চেয়ে বলল,ললিপপ খাবে?
বর্ণ মৃদু হেসে বলল,হুঁ।খাওয়া যায়।ললিপপ তো….!
হৃদয় মুচকি হাসি দিল,ললিপপ কি?
বর্ণ কিছু বলল না।কেবল হাসল।
দোকানদারের থেকে ললিপপ,চিপস এনে বশির বলল,লন ওস্তাদ।
হৃদয় বলল,আমি খাবো?ওকে দে।
বশির বর্ণের হাতে একটা চিপসের প্যাকেট আর ললিপপ দিয়ে বলল,ওস্তাদ,এই প্যাকেটডা আমি ভাবিরে দিয়ে আহি?
হৃদয় ধমক দিল,ঐ বেশি বুঝিস।ওর কাছে দে।
বশিরের থেকে চিপসের বাকি প্যাকেটটা নিয়ে হৃদয় বর্ণ কে দিল,যাও।কলেজে দেরি হয়ে যাবে।
বর্ণ বলল,একটা কথা বলি,দুলাভাই?
হৃদয় বলল,হুম বলো?
বর্ণ বশিরসহ বাকিদের দিকে তাকাল,এই যে পাঁচ ছয়টা সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে ঘুরেন।আপনি কি গুন্ডা?
বশিরসহ বাকিরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।
বর্ণ বলল,মুখ চাওয়াচাওয়ি করে লাভ নেই আপনাদের।আমি ওনাকে বলছি,আপনাদের নয়।
হৃদয় হেসে বলল,আরে শালাবাবু,তুমি যা ভাবছো তা নয়।ওরা আমাকে ভালোবাসে তাই সঙ্গে থাকে।
বর্ণ বলল,আমি ছোট মানুষ।অতশত বুঝি না।এসবের কারনে হয়তো আপু আপনাকে পছন্দ করে না।
হৃদয় বশিরের দিকে তাকিয়ে বলল,তুই ওদের কাছে গিয়ে বোস।
তারপর বর্ণকে বলল,চলো,বাইকে করে তোমাদের কলেজে ছেড়ে আসি।
বর্ণ বলল,থ্যাংক ইউ,দুলাভাই।লাগবে না।আমরা নিজেরাই যেতে পারবো।আপু যে যাবে না,সেটা আপনি ভালো করেই জানেন।
হৃদয় বলল,তাহলে পিছন পিছন আসি?
বর্ণ হাটা দিল,না।আপু রেগে আছে।আজ আর আসতে হবে না।
হৃদয় নিচু হয়ে বলল,জো হুকুম শালাবাবু।

বর্ণ আসতেই অনু বলল,দেখিস,আজ যদি আন্নাকে না বলছি।কোনদিন তো মাইর খাস নি।আজ খাবি।
বর্ণ একটা ললিপপ মুখে দিয়ে বলল,যা বলিস।চিপস খেলে খা।না হলে আমি খেলাম।
অনু বলল,তুই খা।চল,দেরি হয়ে যাচ্ছে।ব্যাচে যেতে লেট হলে স্যার বকবে।ফারুক স্যার যে রাগী।
বর্ণ বলল,হুস,অনার্স পড়েও যদি বকা শুনতে হয়।দেখবি আমি তোর মতো পাতি কলেজে পড়ব না।ভার্সিটিতে পড়বো।
অনু চলতে চলতে বলল,পড়িস।আমি কি তোর মতো ছেলে?আন্না যে পড়াচ্ছে,তাতেই আমি খুশি।
বর্ণ বলল,আপু তোর সাইড ব্যাগে এই দু’টো চিপসের প্যাকেট রেখে দে না!
অনু চিপসের প্যাকেট দু’টো নিয়ে বর্ণের পিঠে থাকা ব্যাগের চেইন খুলে তাতে রাখল,তোর সম্পত্তি তুই রাখ।
বর্ণ বলল,তুই এতো হিংসুটে কেন?শোন আপু,সুন্দরী বোন থাকলে ছোট ভাইয়েরা এমন আদর আহ্লাদ পায়।বুঝলি?
অনু বলল,না বুঝি নি।আর আমি সুন্দরী তোকে কে বললো?
বর্ণ আরেকটা ললিপপ মুখে দিয়ে বলল,কে বলবে!আমি জানি তো আমার আপু খুব সুন্দরী।
অনু বলল,একটা কথা বল তো!
বর্ণ পিঠ থেকে ব্যাগ এনে বাকি ললিপপ ব্যাগে রেখে আবার পিঠে ব্যাগ ঝুলাল,কি?
অনু যুক্তি দিল,তোর হৃদয় ভাইয়া তো আমাকে কোনদিন দেখেছে বলে মনে পড়ে না।আমি ক্লাস নাইন থেকে বোরকা পরছি।আমার জন্য পাগল হওয়ার কোন যুক্তি তো পেলাম না!
বর্ণ ঠোঁট উল্টিয়ে বলল,আমি কি জানি!
অনু দ্রুত হেটে বলল,তোর জানতে হবে না।আমি ব্যাচে গেলাম।তুই সোজাসুজি ক্লাসে যাবি।আড্ডাবাজি করবি না।আর মুখের ললিপপ ফেলে দে।বাচ্চাদের মতো করে।ঐ দেখ সৃজন আসছে।ক্ষেপাবে।
বর্ণ ফিকে হাসি দিয়ে ললিপপ কড়মড় করে খেয়ে নিল।
সৃজন এসে বর্ণের কাঁধে হাত দিল,কি’রে দোস্ত?অনু দিদি কই গেলো?
বর্ণ বলল,ফারুক স্যারের ব্যাচে।চল ক্লাসে যাই।তুই কলেজ গেটে কেন?নীলা আসে নি?

সৃজন অস্পষ্ট বকবক করতে করতে বর্ণের কাঁধে হাত রেখে কলেজ চত্ত্বরে প্রবেশ করল।

(নবম পর্ব)

>
বিঃদ্রঃ তোমার একটিমাত্র জীবন যদি প্রেমহীন থেকে যায়,শর্তহীন দলিলে যদি কোন বিবাদীর নাম লেখা না থাকে,অনাবিষ্কৃত ভালোলাগা যদি তোমার ঠোঁটের আঙ্গিনায় বিরহ না জাগায়,একটিমাত্র জীবনে তুমি যদি কলঙ্ক এর সুখই না পেলে-তবে তুমি…!তবে তুমি আমার গল্প পড়ো না।
>

সতেরো।

আরশিনগর বড় বাজারে একদিন হৃদয়ের সাথে রফিকের দেখা হয়ে গেল।

হৃদয় বাইক থামিয়ে বলল,ছোটকা,কই ছিলে এতদিন তুমি?ভালো আছো তুমি?
রফিক অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।অনেকক্ষণ পর ক্ষীণে স্বরে বলল,হৃদয়?তোকে তো চেনা যাচ্ছে না,বাপ!কত বদলে গেছিস!
হৃদয় বাইক থেকে নেমে দাঁড়াল,আমার কথা ছাড়ো।তুমি এই তিন-চার বছর কই ছিলে ছোটকা?
রফিক যেন আক্ষেপ করল,ছিলাম রংপুরের দিকে।বড় ভাই গিয়ে নিয়ে আসলো গত পরশু।বড় ভাই গেলো-না আসলে খারাপ দেখাবে।
হৃদয় হেসে বলল,এসেছো ভালো করেছো।কার উপর অভিমান করে-রাগ দেখিয়ে তুমি বাড়ি ছাড়লে কে জানে!শুনেছিলাম তুমি নাকি বিয়ে করেছো?
রফিক হৃদয়ের দিকে তাকাল,হুঁ।
হৃদয় প্রশ্ন করল,কোথায় করলে?কিছু বললেও না।আগে কত কিছু শেয়ার করতে।এখন বুঝি পর করে দিয়েছ?
রফিক একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,তুই নিজে কি আগের মতো আছিস,বাপ?
হৃদয় একটু হাসল,কেন?আমি আবার কবে বদলে গেলাম?
রফিক কোমল গলায় বলল,এসে অবধি দু’তিন দিনে অনেক কথাই শুনলাম।মেজো ভাবি বলল-আমি যাওয়ার পর তুই নাকি আর কোনদিন আমাদের বাড়ি যাস নি!
হৃদয় অজুহাত দিল,জানোই তো তখন এক্সাম সামনে ছিলো,তারপর অনেক ব্যস্ত হয়ে গেলাম।আব্বু নির্বাচনে হেরে গেল।কত কি ঘটল।
হৃদয় এবার যেন উল্টে অভিযোগ করল,কোন কিছুর খোঁজই তো নিলে না।
রফিক প্রশ্ন করল-স্থির চোখে,সত্যি কি তাই?তুই এতোটা বিজি হয়ে গেলি যে তিন-চার বছরে একবার মির্জাবাড়িতে যেতে পারলি না।অন্তত তোর সইমার জন্য যাইতি।
হৃদয় এবার সত্যি এড়িয়ে গেল,তুমি বললে না তো কাকে বিয়ে করলে?
রফিক অবাক দৃষ্টিতে তাকাল,তুই সত্যি বড় হয়ে গেছিস,বাপ!শরীরের কি অবস্থা করেছিস।
হৃদয় মাসেল দেখাল,কি বলো।এই দেখো মাসেল।
রফিক শুকনো একটা হাসি দিল।তারপর বলল,একদিন বাজারের আড়তে আমাকে খুঁজতে একটা মেয়ে এসেছিল।মনে আছে?তুই আমাকে এসে বলেছিলি!
হৃদয় সাড়া দিল,হুঁ।
রফিক নির্বিঘ্নে জানাল,ঐ মেয়েটাকে।
হৃদয় অস্পষ্টে উচ্চারণ করল,তিথি বুবু!
রফিক জিজ্ঞাসা করল,তুই চিনিস নাকি?
হৃদয় বুঝল-সে তিথি বুবুকে চেনে শুনলে ছোটকা লজ্জা পাবে।আর নিজেও অপ্রস্তুত হবে।অতএব এড়িয়ে যাওয়া ভালো।বলল,না ছোটকা।কই যাচ্ছো?চলো বাইকে ছেড়ে আসি।
রফিক জানাল,ভেদরগঞ্জ যাচ্ছি।তুই অযথা কষ্ট করবি কেন?
হৃদয় বলল,তুমি এখনো আমাকে পর ভাবো!কষ্ট কিসের ছোটকা!তুমি উঠো তো।ছেড়ে আসি।
রফিক হৃদয়ের পিছনে উঠে বসল,যেতে যখন চাচ্ছিস।চল।
হৃদয় বাজারের বাইরের রাস্তায় এসে জিজ্ঞাসা করল,অহন কেমন আছে ছোটকা?কই পড়ছে এখন?
রফিক বিস্তারিত বলল,মেজো ভাবি তো বলল-ঢাকায় কি একটা বেসরকারি ভার্সিটিতে পড়ে।তেমন আসে না।ভাবি খুব অাফসোস করছিল তোদের নিয়ে।বলল-আমার দু’টো ছেলেই পর হয়ে গেলো।
হৃদয় অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।তারপর জানতে চাইল,আর টুটুল ভাইয়া?
রফিক জানাল,টুটুল?সে রাজশাহী মেডিকেলে ডাক্তারীতে জয়েন্ট করেছে।গেল বছর বিয়ে করেছে।তোর মনে আছে-টুশির বিয়েতে ওর বন্ধুদের সঙ্গে একটা মেয়ে এসেছিল।তমা।ওকে।বড় ভাবী বোধহয় সবচেয়ে সুখে আছে।অবশ্য আমার মন তাই বলে।
হৃদয় বলল,শর্মি ফুপি?দাদি?জয়নাল ভাই?
রফিক বলল,জয়নাল আছে তার কাজ নিয়ে।বেশ আছে।তোর দাদি,শর্মিও ভালো আছে।
হৃদয়ের খুব জানতে মন চেয়েছিল শর্মি ফুপির বিয়ে হলো কিনা!সত্যি কি সে ভালো আছে!তার কি ভালো থাকার কোন উপায় মির্জাবাড়ির লোক আদৌ করেছে।আবার যেন কিছু জানতেই ইচ্ছা করে না তার।কি দরকার-প্রিয় অপ্রিয় মানুষের দুঃখ সুখের খবর জেনে।
হৃদয় শুকনো স্বরে অনুরোধ করল,তুমি আর কোথাও যেও না ছোটকা।বড়কা একা এতো বড় বাড়ি।ব্যবসা।কিভাবে সামলাবে?বলো!
রফিক বলল,সমস্যা কি!তোর মেজকা রিটায়ার্ড নিয়েছে।বাড়িতেই আছে।শুনলাম বড় কি একটা ব্যবসা শুরু করবে।সংসারে আমার মতো উড়নচণ্ডী আর কেউ নাই।
হৃদয় মনে মনে বলল,তোর থেকেও উড়নচণ্ডী সংসারে আছে,ছোটকা।আমাকে দেখো না।
মুখে বলল,এসব বলো না।আর কোথাও যেও না তুমি।এবার ব্যবসার হাল ধরো বড়কার সাথে।
তারপর আর তেমন কথা হলো না দু’জনের মাঝে।
গন্তব্যে এসে রফিক নেমে দাঁড়াল,একদিন যাস মির্জাবাড়ি।তোর জন্য তোর সইমা বড় হাসপাস করে,বাপ।
হৃদয় তার কোন প্রত্যুত্তর করলো না।বলল,আমি যাই ছোটকা।তুমি সাবধানে ফিরো।
তারপর বাইক স্টার্ট দিল।মনে মনে আওড়ালো,স্যরি ছোটকা।আমি আর কোনদিন মির্জাবাড়ি যাবো না।আমাকে ভুল বুঝো না।

অতীতের কি এক অজানা।অচেনা।অক্ষত অভিমানে এত বছর পর চোখ ঝাপসা হয়ে এলো তার।

এমনি করে রোজ অপেক্ষা।কথায়।না কথায় কিংবা অকথায়।হৃদয়ের জীবন থেকে আরো কয়েকটা মাস চলে গেল।কেবল হৃদয়ের নয়।অনুর অনার্স প্রথম পর্বের পরীক্ষা শেষ হলো।বর্ণের এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল।সময়ের দৌড় সময় দৌড়াল।জীবনের দৌড়গুলো কি থেমে থাকে?সেও তার আপন গতিতে চলতে লাগলো।আর কেবল কিছু অজানা অনুভূতি।আবেগ।ভালোলাগা কয়েকটা হৃদয়ে খেলতে লাগল।হোক সেটা ভালোবাসা।অভিমান।অভিযোগ।নয়’তো বা অনুরাগ।ঘৃণা।

ভাপসা গরমে চারদিক নিস্তব্ধ।জোয়ারদার বাড়ির বারান্দায় রাতে খাওয়ার জন্য ফ্লোরে পাটি পাতানো হয়েছে।এ বাড়ির স্টাইল আধুনিক মডেলের।আরিফ জোয়ারদার ব্যবসার কারনে নানান জেলা ঘুরতেন।সেই সুবাদে বাড়ি করেছিলেন-মনের মাধুরী মিশিয়ে।একতলা বাড়ি।দু’পাশে এল সিস্টেমে মোট ছয় রুমের ঘর।প্রশস্ত কম অথচ লম্বা ছাদে নানান ফুলের সমারোহ।মূলত,সুমি করেছে ছাদের ছোট বাগানটা।এত বছর পরও বাড়িটা যেন বড্ড নতুন এবং আধুনিক দেখায়।শরীফ অবশ্য নতুন তিনটা ঘর তুলেছে।একটা কাছারিঘর।আরেকটা মেহমানদের।বাকিটা কাজের লোকেদের।
সুমি সবাইকে খাবার পরিবেশন করে বলল,লতিফের মা,মাছের ঝোলটা আনো।
তারপর শরীফের দিকে তাকিয়ে বলল,তোমাকে ডিম ভাজি দিবো?
শরীফ বলল,দাও।
তারপর বর্ণের দিকে তাকিয়ে বলল,ওকে দাও।
সুমি হেসে দিল,তোমার ভাইবোনকে না খাইয়ে রাখবো না’কি?
শরীফ বলল,আমি কি তাই বললাম!কি যে সব বলো তুমি!ঠিক ঠিকানা নেই।
লতিফের মা মাছের ঝোল নিয়ে ফিরে এলো,ন্যান ভাবি।
সুমী সেটা নিয়ে বলল,তুমি গিয়ে খেয়ে নাও।
লতিফের মা মাথা নাড়িয়ে চলে গেল।
শরীফ বর্ণের দিকে তাকাল,বর্ণ,তোর সাথে আমার কিছু কথা আছে।
বর্ণ নিচু হয়ে খাচ্ছিল।বলল,বলো।কি বলবে,আন্না।
শরীফ মুখের খাবার শেষ করল,তোর পরীক্ষা তো শেষ।আমি ভাবছি তোকে ঢাকায় কোচিং করতে পাঠাবো।
সুমি বলল,কেন?ও কি একা একা ঢাকা থাকতে পারবে?
শরীফ খেতে খেতে বলল,তুমি যা বোঝো না,তা নিয়ে কথা বলো না।প্লিজ।আর ও একা থাকতে যাবে কেন?
বর্ণ আর অনু মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।
তারপর বর্ণ বলল,আন্না,আমি এই কলেজেই পড়ি।আপু তো পড়ছে।
শরীফ বলল,বেশি বুঝিস না।স্বার্থের সাথে আমার কথা হয়েছে।তুই ওর ফ্ল্যাটে থাকবি।
বর্ণ আপত্তি করল,না না।আমি তোমার ঐ ক্ষেপাটে মামাতো ভাইয়ের কাছে থাকবো না।মেন্টাল একটা।শুধু ধমকায়।
শরীফ বর্ণের দিকে চেয়ে বলল,কি সব যা তা বলিস।স্বার্থ মেন্টাল হতে যাবে কেন?
বর্ণ মাথা নিচু করে ফেলল।
শরীফ বলল,হ্যাঁ।এটা ঠিক যে ও একটু রাগী।বদমেজাজি।তবে মনটা সুন্দর।আর তোর জন্য ও ই পারফেক্ট।তোর ভাবী আর বোনের আহ্লাদে যা হয়েছিস।রেজাল্ট কি হবে আল্লাহ জানে।
সুমি প্রতিবাদ করল,অমনি আমার দোষ?আর শোনো,ওর রেজাল্ট যথেষ্ট ভালো হবে।তুমি টেনশন নিও না।
শরীফ বলল,এই দেখো,একজনকে বললে আরেকজনের গায়ে ফোসকা পড়ে।আমার দেখি কথা বলার উপায় নেই।
সুমি কটাক্ষ রাগ দেখাল,তোমাকে কথা বলতে কেউ মানা করে নি!
অনু ফিসফিস করে বর্ণকে বলল,খুব তো বলিস,আমি ভার্সিটিতে পড়বো।পাতি কলেজে পড়বো না।এখন কি হলো?
বর্ণ সজল চোখে তাকাল,আমি তোদের ছেড়ে থাকতে পারবো না রে,আপু!
সুমি শরীফকে বুঝাল,ও যখন স্বার্থের সঙ্গে থাকতে চাচ্ছে না।তো আলাদা ব্যবস্থা করো ঢাকায়।আর তাছাড়া তুমি যখন বলেছো একবার যে-ওকে ঢাকা পড়তে হবে।সুতরাং আমরা জানি এটাই ফাইনাল।আমাদের কথা তো চিন্তা করবে না।
শরীফ প্রশ্ন করল,তোমাদের কথা কি চিন্তা করব?
তারপর তিক্ত গলায় বলল,দেবরকে আঁচলে বেঁধে রাখতে চাও।রাখো।ওর ভবিষ্যতের দরকার নাই।
সুমি সে কথার জবাব না দিয়ে দ্রুত উঠে রুমে চলে গেল,আমি কারোর ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে চাই না।
শরীফ অনুর দিকে তাকিয়ে বলল,এখন কাঁন্নাকাটি করবে নিশ্চয়।এরপর তুই শুরু করিস না।মাফ কর তোরা আমাকে।ভাইকে ঘরে বেঁধে রাখ।ওর আর পড়ালেখা করা লাগবে না।
শরীফ আধ খাওয়া থালাতে পানি ঢেলে-হাত ধুয়ে উঠে গেল।
অনু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।বর্ণের খাবারের প্লেটে তার চোখ থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়তে লাগল।

প্রায় রাত দশটায় উদয় এসে দুয়ারে দাঁড়িয়ে ডাকল,মিয়াভাই!আব্বু তোমাকে ডাকছে।
হৃদয় শুয়েছিল।উঠে বসল,আয় ভাই,ভিতরে আয়।
উদয় দুয়ারে দাঁড়িয়েই বলল,এখন যাবো না।আমার অনেক পড়া বাকি।
তারপর চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়ে আবার উদয় ফিরে আসল দুয়ারে।বলল,মিয়াভাই।কালকে আমার কিছু টাকার দরকার ছিলো।দিতে পারবে?
হৃদয় বিছানা থেকে উঠে এসে দুয়ারে উদয়ের মুখোমুখি দাঁড়াল,কত লাগবে?
উদয় জানাল,তিন হাজার।অবশ্য চার হলে ভালো হতো।তুমি তিনই দাও।
হৃদয় পুনরায় জিজ্ঞাসা করল,পড়িস তো মাত্র ক্লাস সেভেনে-এতো টাকা দিয়ে কি করবি তুই?
উদয় ভ্রু কুঁচকাল,অত কৈফিয়ত দিতে পারবো না।মন চাইলে দাও।না হলে দিতে হবে না।আমি ম্যানেজ করে নিবো।
হৃদয় অবাক হয়ে উদয়ের দিকে তাকাল,এভাবে কথা বলছিস কেন?আমি দিবো না-তা তো বলি নি।শুধু মাত্র একটা প্রশ্ন করেছি।
তারপর উদয়ের হাত ধরল,আচ্ছা দিচ্ছি।তুই ভিতরে আয়।
উদয় বিরক্ত হল।হাত ঝাড়া মেরে ফেলে বলল,উফ।বললাম তো আমার অনেক পড়া।
হৃদয় আর কথা না বাড়িয়ে চার হাজার টাকা এনে দিল,যাই করিস।আব্বুর সম্মানের কথা মাথায় রেখে করিস।রেজাল্ট যেন খারাপ না হয়।
উদয় টাকাটা নিয়ে আড়চোখে তাকাল।হৃদয় আবার উদয়ের কাঁধে হাত রাখল,ভাই,বিড়ি সিগারেট যেন ধরিস না।আব্বু জানতে পারলে কষ্ট পাবে।
উদয় নিজের কাঁধ থেকে হৃদয় হাতটা সরিয়ে বিদ্রুপ করল,খুব যে জ্ঞান দিচ্ছ-তুমি নিজে খাও কেন?
হৃদয় ছোট একটা দীর্ঘশ্বাস নিল,আমি খাই কেন?
হৃদয় কেবল থমকে গেল।উদয় আজ এসব কি বলছে।ভাইয়েরা ছোট থাকলেই বোধহয় ভালো হয়।
উদয় হাটা দিল,আব্বু ডাকছে।মন চাইলে এসো।

হৃদয় কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে।পার্টি ফান্ড থেকে যে টাকাটা পায়।তার কোনটাই সে অতি প্রয়োজন ছাড়া খরচ করে না।আসমা বেগম এসে একরকম কেড়ে নিয়ে যায়।বাবার কথা চিন্তা করে হৃদয় ঝামেলা করে না।সাদেক সাহেব এবার নির্বাচন করতে গিয়ে তার অধিকাংশ জমি বন্ধক পড়েছে।নির্বাচনে হেরেও গেলেন।ব্যবসা বাণিজ্য তেমন কিছু জানা নাই।পাঁচবছর চেয়ারম্যান পদে থেকে ব্যাংকে যা জমিয়েছে তাও গেছে।দ্বিতীয়পক্ষের গরীব শ্বশুর-শালাকে টানতে গিয়ে সাদেক সাহেব যেন আরো নিঃস্ব হয়েছেন।হৃদয় একেওকে পার্টির কাজ কিংবা কাগজপত্রের কাজ মিটিয়ে যে কমিশন পায়।তার পুরোটা উদয়ের পড়ার খরচের জন্য রেখে দেয়।আসমা বেগম নিজের ছেলের পড়ার খরচ চাইলে নিমিষে হৃদয়ের দেওয়া সংসার খরচ থেকে চালিয়ে নিতে পারে।তবুও ভাইয়ের প্রতি ভাইয়ের দুর্বলতা দেখে-সে নিজের ছেলের পড়ার টাকাটা উদয়কে দিয়েই হৃদয়ের থেকে চেয়ে নেয়।তার ফলাফল যে মারাত্মক ভয়ংকর হবে।হৃদয় বুঝতে পারছে।সে মনে মনে বলে-ভাইটা আমার বেপথে চলে না যায়।একদিন আসমা বেগম সব বুঝবে,তখন হয়তো সময় থাকবে না।নিয়তি-সময়ের সুযোগে বড় নিষ্ঠুর খেলা খেলবে।
হৃদয় উঠানে দাঁড়িয়ে ডাকল,আব্বু!ঘরে আছো?
সাদেক সাহেব ভিতর থেকে বললেন,হুঁ,ভিতরে আয়।
হৃদয় উশখুশ করল।গত পনেরো বছর।হৃদয় তালুকদার বাড়ির এ ঘরে ঢোকে না।তার দাদা যে বছর মারা যান,সে বছর দক্ষিণের কাঠের ঘরে শেষবার ঢুকেছিল।সেই যে ঘর।সে ঘরে হৃদয়ের মাও শেষ নিঃশ্বাস ছেড়ে ছিল।তালুকদার বাড়ির প্রথম ঘর।
সাদেক সাহেব আবার ভিতর থেকে বললেন,কি’রে আয়।
হৃদয় বারান্দা মাড়িয়ে ঘরে ঢুকল।সাদেক সাহেব বিছানায় বসা।আসমা বেগম তার পাশে বসে পান সাজাচ্ছেন।
সাদেক সাহেব বললেন,মাথা গুঁজে দাঁড়িয়ে না থেকে বোস।
পাশের রুম থেকে উদয়ের পড়া শোনা যাচ্ছে।সাদেক সাহেব জানতে চাইলেন,তোকে যে কাজটা করতে দিয়েছি তার কি কিছু হচ্ছে?
হৃদয় মাথা নিচু করে বসে ছিল।তেমনভাবেই বলল,জি আব্বু।চেষ্টা করছি।
আসমা বেগম মুখে পান পুরল।অভাবের সংসারেও শাড়ি গয়নার বহর তার।
হৃদয়ের দিকে চেয়ে বলল,শুধু চেষ্টা করলে হবে না।করতেই হবে।
হৃদয় সে দিকে তাকাল না,আমি তো বললাম চেষ্টা করছি।
সাদেক সাহেব বললেন,অতশত বুঝি না।পার্টি করো,রাজনীতি করো।যাই করো।আগামী নির্বাচনে আমি চেয়ারম্যান পদে জয় চাই।
আসমা বেগম বলল,শোনো,তোমাকে একটা শর্ত আমি দিয়েছি।নিশ্চয় মনে আছে।
হৃদয় মাথা নাড়াল,জি মনে আছে।
আসমা বেগম দাঁত দিয়ে আঙ্গুলের চুন কেটে বলল,তবুও আরেকবার মনে করিয়ে দেই-শরীফ চেয়ারম্যানের বোনকে বিয়ে করে আমার সংসারে এনে ফেলতে পারলেই তবে তুমি আমাকে মা বলে ডাকতে পারবে।
হৃদয় উঠতে উঠতে বলল,আপনাকে মা ডাকতে পারবো বলে নয়!বরং আব্বু চাইছে তাই করছি।না হলে কারোর বোনকে বিয়ে করে সংসারে এনে ফেলে-তার ভাইকে দুর্বল করার প্রলোভ আমার ছিলো না।
আসমা বেগম ক্ষেপে গেল,দেখলে তোমার ছেলে কি বলল আমাকে।
সাদেক সাহেব বললেন,তুমি আবার শুরু করো না।আমাদের কাজটা হলেই হলো।
আসমা বেগম গজগজ করতে লাগল।
হৃদয় বলল,আব্বু আমি আসি।
সাদেক সাহেব অনুমতি দিলেন।পনেরো বছর পর হৃদয় হয়তো প্রথম এবং শেষবার এ ঘরের বারান্দা মাড়িয়ে উঠানে নামাল।

আটারো।

পদ্মায় এখন জোয়ার।বিশাল বটবৃক্ষের নিচে সেই শান বাঁধানো ঘাটের দু’টো সিঁড়ি বাদে বাকি সিঁড়িগুলো জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে।বর্ণ হাটুর দু’ইঞ্চি নিচ অবধি পানিতে ডুবিয়ে পা দোলাচ্ছে।হৃদয় ঘাট থেকে কয়েক গজ দূরে পদ্মার পাড়ে বাইক দাঁড় করিয়ে বর্ণের থেকে এক সিঁড়ি উপরে এসে বসেছে।
বর্ণ প্রশ্ন করল,আচ্ছা,হৃদয় ভাইয়া।আমি চলে গেলে আপনার কি খুব কষ্ট হবে?
হৃদয় অদ্ভুতভাবে তাকাল।অনেকক্ষণ পর বিস্ময় প্রকাশ করল,মানে?
বর্ণ হাতে পানি উঠিয়ে আবার ফেলে দিল,মানে তো সিম্পিল।বলছি-আমি যদি কোথাও চলে যাই আপনার কষ্ট হবে না?
হৃদয় এবার জানতে চাইল,তুমি কি কোথাও যাচ্ছো?
বর্ণ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল,আমি তো যাচ্ছি না।আন্না পাঠাচ্ছে।
হৃদয়ের কৌতূহল বেড়ে গেল,কই পাঠাচ্ছে?
বর্ণ প্রায় বিস্তারিত বলল,ঢাকা।ভার্সিটি ভর্তি কোচিংয়ের জন্য।সেখানে আমার এক মামাতো ভাই থাকে।তার ফ্ল্যাটে থাকতে হবে।ভাল্লাগেনা।কয়েকদিন মাত্র হলো পরীক্ষা শেষ হয়েছে।একটু ঘুরতে ফিরতেও দিলো না।
হৃদয় কোন কথা বলল না।কেবল বর্ণের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
বর্ণ মুচকি হাসি দিল,কি হলো,দুলাভাই?
হৃদয় অনেকটা সময় নিল,কিছু না।
তারপর বর্ণকে উদ্দেশ্য করে বলল,তোমার সেই মামাতো ভাই কি করে ঢাকাতে?
বর্ণ পানি হতে পা তুলে উঠে এসে হৃদয়ের পাশে বসল।জানাল,স্বার্থ ভাইয়া?উনি তো ঢাবিতে পড়েন।
হৃদয় জিজ্ঞাসা করল,তোমার মামাতো ভাইয়ের নাম স্বার্থ নাকি?
বর্ণ মাথা নাড়াল,হুঁ।জানেন তো খুব রাগী।বদমেজাজি।এর জন্যই তো যেতে চাইছি না।আন্না তো শুনবে না।একবার যখন বলেছে।তখন পাঠাবেই।
হৃদয় জানতে চাইল,কবে যাচ্ছ তাহলে?
বর্ণ জানাল,পরশুদিন।আন্নাই রেখে আসবে।
হৃদয় চোখে আকুলতা নিয়ে প্রশ্ন করল,আমাকে মিস করবে না?
বর্ণ বলল,হুঁ,খুব মিস করবো,দুলাভাই।
এই কয়েকটা মাস হৃদয়কে বেশ সঙ্গ দিয়েছে বর্ণ।প্রায় তারা বাইকে করে পদ্মার পাড়ে এসে-এই ঘাটে বসে থেকেছে।নানান কথা বলেছে।গল্পগুজব করেছে।সুখ-দুঃখ শেয়ার করেছে।হাসি-তামাশা করেছে।বর্ণকে পাশে পেলে হৃদয়ের কেমন অসম্ভব রকমের একটা ভালোলাগা কাজ করে-বুকের গভীরে।যেসব কথা হৃদয় হাজার মানুষের মাঝে থেকেও কাউকে বলতে পারে না।সেটা অকপটে বর্ণকে বলে একধরনের হালকা অনুভূতি পায়।আজ বর্ণও চলে যাচ্ছে।
হৃদয় কোমলতা ভরা অনুভূতিতে বলল,হয়তো করবে।তারপর একদিন হয়তো সম্পূর্ণ ভুলে যাবে।হৃদয় নামে কাউকে তোমার মনে থাকবে না।
বর্ণ সে কথার গুরুত্ব দিল না।উৎফুল্ল হয়ে বলল,আচ্ছা।আপুর সাথে আপনার বিয়ে হলে আপনি তো সত্যি সত্যি আমার দুলাভাই হবেন।তাই না?
হৃদয় হাসল,বর্ণ,তুমি জানো।তুমি এখনো কেমন বাচ্চা বাচ্চা আছো।বেশ ছেলেমানুষি তোমার মাঝে।ভালোই লাগে।
বর্ণ বোকার মতো হাসল।বোকা বোকা হাসতে বর্ণকে বেশ মানায়।
হৃদয় আক্ষেপ প্রকাশ করল,আমার যদি অনেক টাকা থাকতো।তাহলে তোমাকে ঢাকায় আলাদা ফ্ল্যাট ভাড়া করে দিতাম।তোমার সেই রাগী ভাইটার সঙ্গে থাকতে হতো না।
বর্ণ বলল,কিছুই হতো না।আন্না যা জেদি।সে আমাকে পাগলটার কাছেই রাখতো।
হৃদয় পা ছড়িয়ে বসল,তোমার স্বার্থ ভাইয়া পাগল নাকি?
বর্ণ হেসে দিল,হুঁ।পাগলই তো।মেন্টাল।
হৃদয় অবাক হল,বলো কি?সত্যি নাকি?
বর্ণ হাসল,আপনি না অদ্ভুত।আরে পাগল হবে কেন?অনেকটা রাগী তাই বললাম।
বর্ণের বাঁ হাতখানা ধরে হৃদয় যেন কিছু একটা অনুভব করল।বলল,কলেজের ইউনিফর্মে তোমাকে খুব সুন্দর লাগতো।
বর্ণ আড়চোখে তাকাল,আজ কি খুব খারাপ দেখাচ্ছে?
হৃদয় মাথা ঝাঁকাল,আরে না।টিশার্টেও তোমাকে দারুন লাগে।তবে কলেজ ইউনিফর্মে বেশি সুন্দর লাগে।
বর্ণ হাত ছাড়িয়ে নিল,থাক হয়েছে।আমাকে পটিয়ে লাভ কি?আসল মানুষটাকেই তো পটাতে পারলেন না।
হৃদয় নড়েচড়ে বসল,ওহ বর্ণ।তুমি যাওয়ার আগে আমার একটা কাজ করে দিতে হবে।
বর্ণ জানতে চাইল,কি?
হৃদয় যেন আবদার করল,অনুর সাথে আমার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা ছিলো।যাওয়ার আগে একদিন আমাদের মিট করিয়ে দিতে পারবে?
বর্ণ মাথা নাড়াল,চেষ্টা করবো।
হৃদয় বলল,চেষ্টা নয়।আমি জানি তুমি পারবে।তুমি যেভাবে পারো অনুকে রাজি করিয়ে আনবে।আমি মধু দাদা দোকানে থাকবো।
বর্ণ হৃদয়ের দিয়ে তাকিয়ে হালকা চোখ বুজল,আচ্ছা,দুলাভাই।ট্রাই মাই বেস্ট।
হৃদয় বর্ণের দু’গাল ধরে নাড়াল,আমার কিউট শালাবাবু।
বর্ণ ঠোঁট প্রশস্ত করে হাসল।তারপর বলল,একটা কথা জিজ্ঞাসা করব?
হৃদয় অস্পষ্ট সুরে বলল,হুঁ।করো।
বর্ণ জানার আগ্রহ নিয়ে বলল,আমি যখন আমার সঙ্গে বের হই।তখন আপনার সাঙ্গপাঙ্গকে সঙ্গে আনেন না কেন?বা ওনারাও আসে না দেখি।
হৃদয় বলল,ও এই কথা।আসলে তুমি পছন্দ করো না তাই ওদের আনি না।তাছাড়া তোমার সাথে একলা সময় কাটাতে আমার ভালো লাগে।
বর্ণ আপত্তি করল,কে বললো আমি পছন্দ করি না।আপুই তো পছন্দ….!
হৃদয় বর্ণকে কথা শেষ করতে দিল না।বলল,অনু নয়।তুমিই আমার সাঙ্গপাঙ্গ পছন্দ করো না।
বর্ণ লজ্জা পেল,আপনাকে বলেছে আমি পছন্দ করি না।খুব না?
হৃদয় উঠতে উঠতে বলল,চলো ফেরা যাক।তোমাকে আবার বাড়িতে খোঁজাখুঁজি শুরু করবে।যা আদরের তুমি!
বর্ণ হাত বাড়িয়ে দিল,ধরে উঠান।
হৃদয় হাত বাড়িয়ে বর্ণের হাত ধরে উঠালো।তারপর ব্যাকুল কন্ঠে অনুরোধ করল,ঢাকায় গিয়ে আমাকে ভুলে যেও না।চলে যাচ্ছ,খুব খারাপ লাগবে।
বর্ণ বলল,আমারও।আচ্ছা একটা অনুরোধ করবো!রাখবেন?অনেকদিন ধরে বলি বলি করে বলা হয়ে উঠে না।
হৃদয় বর্ণের হাত ধরেই বাইক পর্যন্ত এসেছিল।হাত ছেড়ে দিয়ে বাইকে বসল।তারপর বলল,হুঁ,বলো কি অনুরোধ?
বর্ণ হৃদয়ের সামনে এসে তার একটা হাত নিজের মাথায় রাখল,আমাকে ছুঁয়ে বলেন আপনি আর কোনদিন সিগারেট খাবেন না।সিগারেট ছেড়ে দিবেন।
হৃদয় ভাঙ্গা হাসি হাসল,পাগলামি করো না।পিছনে উঠে বসো।
বর্ণ মুখ গোমড়া করে পিছনে গিয়ে বসল।
হৃদয় প্রস্তাব দিল,ধরে বসো।
বর্ণ কিছু বলল না।ধরলও না।
হৃদয় হেসে বলল,আচ্ছা ছেড়ে দিলাম।আর খাবো না।হলো তো?হ্যাপি?এবার তো ধরে বসো।
বর্ণ অদ্ভুত একটা হাসি দিয়ে হৃদয়কে জড়িয়ে ধরলো পিছন থেকে।হৃদয়ের বুকের ভিতর ঢিপঢিপ।ঢিপঢিপ।আওয়াজ শুরু হলো।

পরের দিন বিকেলে বর্ণ অনুকে নিয়ে ‘মধু টি স্টল’ এ গেলো।

অনুকে দূরে দাড়িয়ে রেখে বর্ণ দোকানের কাছে এসে বলল,হৃদয় ভাইয়া,অাপুকে অনেক কষ্টে রাজি করিয়েছি।বেশি সময় নেওয়া যাবে না।আর আপনার সাঙ্গপাঙ্গ সরাতে হবে।না হলে আপু কিছুতে আসবে না কিন্তু।
হৃদয় বশিরকে চোখে ইশারা করল।বশিরসহ চার-পাঁচজন উঠে গিয়ে অনেক দূরে রাস্তার ওপারে দাঁড়াল।
বর্ণ বলল,জাস্ট ফাইভ মিনিটস।আন্না কখন কোথা দিয়ে এ রাস্তায় এসে পড়ে।
হৃদয় বর্ণকে আশ্বস্ত করল,তুমি ওকে ডেকে আনো।পাঁচ মিনিটেই আমার কথা বলা হয়ে যাবে।মধু দাদা বর্ণ যা খেতে চায়।দিও।
হৃদয় দোকানের পিছনে চলে গেলো।বর্ণ গিয়ে অনুকে এনে দোকানের পিছনে হৃদয়ের কাছে দিয়ে দোকানের সামনে পাতানো মাচায় বসল।এখান থেকে হৃদয় আর অনুকে সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।
মধু দাদা বর্ণকে জিজ্ঞাসা করল,তুমি শরীফ জোয়ারদারের ছোডভাই না?
বর্ণ ভ্রু কুঁচকালো,জি।কেন বলুন তো?
মধু দাদা দোকান থেকে মুখ বের করে বলল,ঐ মাইয়াডা কেডা?তোমার বোইন?
বর্ণ বিরক্ত হলো,জ্বি।আমার আপু।
মধু দাদা এবার মুচকি হাসল,আমাগো হৃদয় ভাই কিন্তু বহুত ভালা মানুষ।দুলাভাই ডাহো দেহি।বোন দিবা নি?তয় দিলে কিন্তু মন্দ হয় না!
বর্ণের কপালে ভাঁজ পড়ল,আপনি বেশি কথা বলেন।
কথাটা শুনে মধু দাদার মুখ মলিন হয়ে গেল।সামলে নিয়ে বলল,তুমি কিছু খাইবানি?
বর্ণ হঠাৎ উঠে দাঁড়াল,না কিছু খাবো না।
তারপর সে বিড়বিড় করল,কি ব্যাপার!আপু হঠাৎ হৃদয় ভাইয়াকে চড় মারল কেন?কি এমন বলেছে,হৃদয় ভাইয়া।
অনু দ্রুত হেটে এসে বর্ণকে ধমকালো,হা করে দাঁড়িয়ে না থেকে টঙ থেকে নেমে আয়।আজ তোর খবর আছে!
বর্ণ হৃদয়ের দিকে তাকাতে তাকাতে অনুর সঙ্গে হাটা দিল।হৃদয় অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে রইল।নড়তে চড়তে যেন তার বড্ড কষ্ট হচ্ছে।

অনু এত দ্রুত হাটছে যে বর্ণ পিছন পিছন প্রায় দৌড়াচ্ছে।

বর্ণ হাঁপাতে হাঁপাতে প্রশ্ন করল,আপু কি হয়েছে?হৃদয় ভাইয়া তোর সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে?
অনু হাটার গতি আরো বাড়িয়ে দিল,একদম বেশি কথা বলবি না।আমি যেন আরো কোনদিন না দেখি তুই ঐ বখাটে ছেলের সঙ্গে মিশেছিস।এবার সত্যিই আন্না কে বলে তোকে রামধোলাই খাওয়াবো।
বর্ণ বলল,আচ্ছা,মিশবো না।কিন্তু কি হয়েছে বলবে তো?
অনু রাগে যেন জ্বলছিল,আর একটা কথাও বলবি না।কাল ঢাকা যা।তোকে আর শরীয়তপুর কে আনে আমি দেখছি।
বর্ণ আর কথা বলল না।তার চোখ টলমল করছে।এখন সব দোষ কি তার?হৃদয় ভাইয়াই তো চাইল কথা বলতে।কি যে হলো হঠাৎ।আপু কেনই বা হৃদয় ভাইয়াকে চড় মারতে গেল।আর তো সময় নেই যে হৃদয় ভাইয়ার কাছে শুনব কি এমন হলো।
কাল বিকালে সে ঢাকা চলে যাবে।কাল হয়তো আর বাড়ি থেকে বের হতে দিবে না-তাকে।

আরশিনগর বড় বাজারে ঢাকার বাস থামে।অনেকক্ষণ হয়ে গেল তারা বাসস্ট্যান্ডে এসেছে।গাড়ি আসে নি।বর্ণ দু’চোখে গভীর জিজ্ঞাসা নিয়ে দূরে তাকিয়ে আছে।যেখানে হৃদয় বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।তার খুব মন চাচ্ছে উঠে গিয়ে একবার জিজ্ঞাসা করতে গতকাল বিকালে সে আপুর সঙ্গে কি এমন ব্যবহার করেছে।কিন্তু তার আন্না পাশে বসা।ভয়ে তার হাতপা যেন অসাড় হয়ে আছে।
কিছুক্ষণ পর শরীফ বলল,বর্ণ,তুই একটু বোস ভাই।গাড়ি তো আসছে না।আমি পানি আর কিছু খাবার কিনে নিয়ে আসি।
বর্ণ বলল,আন্না,এতটুকু পথ যেতে খাবার লাগবে না।
শরীফ বলল,তোকে বলেছে এতটুকু পথ?জ্যামে পড়লে হয়তো যেতে যেতে সকাল হয়ে যাবে।শোন বমির ওষুধ আনবো?তুই জার্নিতে বমি করবি না তো আবার।
বর্ণ চোখ মুখ কুঁচকালো,আমার এখনই গা গুলাচ্ছে।আচ্ছা তুমি নিয়ে এসো।
শরীফ বলল,আচ্ছা বোস।আমি নিতাই দার ফার্মেসি থেকে নিয়ে নিচ্ছি।
শরীফ বর্ণের কাছ থেকে চলে গেলে-হৃদয় দ্রুত বশিরকে ডাকল।
বশিরের হাতে এক টুকরো কাগজ দিল সে,এটা বর্ণকে দিয়ে আয়।দেখিস শরীফ ভাই আসার আগে দিস।
বশির মাথা নাড়াল,ওকে ওস্তাদ।
বশির কাগজ টুকরো দিয়ে সরতেই শরীফ একটা লোককে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এলো।বর্ণ দ্রুত কাগজের টুকরোটি প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে নিলো।
শরীফ পানি আর খাবার এগিয়ে দিয়ে বলল,খাবারগুলো তোর ব্যাগে ভর।আর এই নে তোর ওষুধ।পানি দিয়ে এখনি একটা খা।
বর্ণ ওষুধ খেয়ে খাবার আর বাকি ওষুধ ব্যাগে রাখল।পানির বোতলটা ব্যাগের পার্শ্ব জালিতে ভরে দিল।
শরীফ সঙ্গে আনা লোকটির দিকে তাকিয়ে বলল,রফিক।এই যে আমার ছোট ভাই,বর্ণ।ওকে দিতেই ঢাকা যাচ্ছি।
রফিক বর্ণের দিকে তাকিয়ে বলল,বেশ বড় হয়ে গেছে।আমাদের টুশির বিয়ের সময় মির্জাবাড়িতে যখন তোদের সঙ্গে এসেছিল,তখন এই এতটুকু ছিলো।
বর্ণ লজ্জা পেল।তবুও বলল,ভাইয়া ভালো আছেন?
রফিক বলল,এই তো ভালো।শোনো ভাই,ঠিকঠাক লেখা করবে।চান্স পেতেই হবে।শরীফ কিন্তু তোমাদের দু’ভাইবোন কে খুব কষ্ট করে মানুষ করছে।
বর্ণ মাথা নাড়াল।
শরীফ রফিকের কাঁধে হাত রাখল,রফিক,বাস এসে গেছে।আমি ঢাকা থেকে ফিরে তোর সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা দেবো।কেমন!আমার তো জানতে হবে এই চার বছর কোথায় কি করলি!
রফিক বলল,তুই চেয়ারম্যান হয়েও এতটুকু বদলাস নি।সেই আগের মতো রয়ে গেছিস।

শরীফ মুচকি হেসে বর্ণের হাত ধরে বাসে উঠল।

বর্ণ জানালার কাছে একটা সিটে বসে পকেট থেকে চিরকুটটা বের করলো।
তাতে লেখা-“বর্ণ,আমাকে ভুল বুঝো না।অনুর সঙ্গে আমি কোন খারাপ ব্যবহার করি নি,বিশ্বাস কর।কেবল একটা সত্য কথা বলেছিলাম।ভালো থেকো।আর মন দিয়ে পড়াশোনা করো।”

বর্ণ বাইরে তাকাল।তার হৃদয় ভাইয়া তাকিয়ে আছে।বর্ণ হাত উঠিয়ে হাত নাড়াতে লাগল।
বাস অদৃশ্য না হওয়া পর্যন্ত হৃদয় হাত নাড়িয়ে গেল।
বশির বাইকের পিছনে বসল,ওস্তাদ চলো।
হৃদয় ‘হুঁ’ বলে বাইক স্টার্ট দিলো।তার চোখের সামনে কেমন ধোঁয়াশা।শীত গেল-সেই কবে!অবেলার বিকেলে কুয়াশার কেন এমন ঘনঘটা?

দারোগাকান্দি ছোট বাজার দিয়ে যাওয়ার সময় লাল চাঁন মিয়ার চায়ের দোকানটা চোখে পড়ল।গত বছর লাল চাঁন মিয়া মারা যাওয়ার পর হৃদয়ের তত্ত্বাবধানে দোকানটা কাশেম ব্যাপারী তার ছোট ছেলেকে ভাড়া নিয়ে দিয়েছে।কাসেশের ছেলেটা মনোযোগ দিয়ে ব্যবসা করে লাল চাঁন মিয়ার মতো।প্রতি মাসে হৃদয় লাল চাঁন মিয়ার স্ত্রী-ভানু বিবিকে ভাড়ার টাকাটা দিয়ে আসে।বৃদ্ধা কেমন নিস্তেজ হয়ে গেছেন।প্রতিবার হৃদয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া দেন।সুস্থ।সবল।লাল চাঁন মিয়া চলে গেলেন।অথচ তার অসুস্থ স্ত্রী-একমাত্র প্রিয়জন বিসর্জনে কেমন অর্ধমৃত।অসাড়।প্রাণহীন হয়ে আছেন।কি নিষ্ঠুর পরিনতি।

হৃদয় বহুকাল প্রিয়জনের জন্য কাঁদে না।কাঁদে না-প্রিয় কারোর চলে যাওয়ায়।তবে আজ কেমন বুকের মাঝে খালি খালি অনুভবটা বেড়ে গেছে তার।তবুও সে সামলে নিয়েছে নিজেকে।খুব কি বড় হয়ে গেল আমাদের হৃদয়?

দশম পর্ব)

>
বিঃদ্রঃ তোমার একটিমাত্র জীবন যদি প্রেমহীন থেকে যায়,শর্তহীন দলিলে যদি কোন বিবাদীর নাম লেখা না থাকে,অনাবিষ্কৃত ভালোলাগা যদি তোমার ঠোঁটের আঙ্গিনায় বিরহ না জাগায়,একটিমাত্র জীবনে তুমি যদি কলঙ্ক এর সুখই না পেলে-তবে তুমি…!তবে তুমি আমার গল্প পড়ো না।
>

উনিশ।


লেখকের কিছু কথাঃ তিন মাস আগে ‘হৃদয়ের নাম আরশিনগর’ গল্পটা ঠিক যেখানে শেষ করেছিলাম-আজকের ‘হৃদয়ের নাম আরশিনগর ২’ এর এই পর্বটা ঠিক সেখান থেকে শুরু করলাম।
নতুন পাঠকগণ চাইলে গল্পের কমেন্ট বক্সের লিঙ্ক হতে ‘হৃদয়ের নাম আরশিনগর’ এর সম্পূর্ণ পর্বটা শেষ করে এই পর্ব হতে শুরু করতে পারেন।

-ধন্যবাদ সবাইকে।

ছয়-সাত মাস পর (বর্তমান)।

বর্ণের কাঁধে কারোর হাতের আবেগী পরশে সে ফিরে তাকাল।চোখে বিস্ময়,হৃদয় ভাইয়া!আপনি এখানে?

বর্ণের হৃৎপিন্ড থেকে ধমনীতে হিমশীতল রক্ত বয়ে গেল।

অনু আপুর যে বিয়ে হয়ে গেছে!হৃদয় ভাইয়া কি তা জেনে এসেছে?এখানে কোন ঝামেলা করলে-স্বার্থ ভাইয়াকে কে সামলাবে?বর্ণের বুক ধড়ফড় শুরু হয়ে গেল।এই হয়েছে এক জ্বালা!স্বার্থ ভাইয়ার সান্নিধ্যে আসার পর-ভয় আর ভালোলাগায় বুকের কাঁপন আলাদা ধ্বনি-প্রতিধ্বনি করে যেন।এখন যেটা করছে-সেটা ভয়ের।
আচমকা হৃদয় বর্ণের হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল।

স্বার্থ ডিপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে বর্ণকে খুঁজতে লাগলো।চেনে না।জানে না।কোথায় চলে গেছে?একটু আদর পেতেই মাথায় উঠে নাচতে শুরু করেছে।একবার পায়-এমন ধমক খাবে।স্বার্থের চোখে-মুখে চিন্তার ছাপ পড়ল।
মৌন ডিপার্টমেন্টের দিকে আসছিল।
স্বার্থ এগিয়ে জিজ্ঞাসা করল,মৌন,তুই বর্ণকে কোথাও দেখতে পেলি?
মৌন এদিকওদিক তাকাল,কই?কোথাও তো দেখতে পাচ্ছি না।
স্বার্থ রেগে গেল,ঐ তোকে কি আমি এখানে খুঁজতে বলেছি?মৌন,আমার কিন্তু মেজাজ গরম।মারধোর খাবি।
মৌন হেসে দিল,কুল ইয়ার।বর্ণ এতটাও ছোট না।এরপর থেকে না-ও এই ভার্সিটিতে পড়বে।তুই কি ওকে রোজ পাহারা দিবি?
স্বার্থ শীতল চোখে মৌনের দিকে তাকাল,বেশি বুঝিস না।আজ ওর ওরিয়েন্টেশন ক্লাস।কার না কার হাতে র‍্যাগিংয়ে পড়বে।
মৌন হো হো শব্দে হেসে উঠল।
স্বার্থ রাগীভাবে তাকাল।তিক্ত গলায় বলল,বিশ্রীভাবে হাসবি না।অসহ্য লাগে।
মৌন হাসি থামাল,ওয়েট ইয়ার।বর্ণকে কেউ র‍্যাগিং করবে?আর তুই তাকে ছেড়ে দিবি?আমাকে এটাও বিশ্বাস করতে হবে!সো সুইট ইয়ার।
স্বার্থ বলল,বোকার মতো কথা বলিস না।বর্ণ আমার কাজিন,ভার্সিটিতে সবাই জেনে বসে আছে?তুইও না।একেবারে যা তা।সর আমার সামনে থেকে।
মৌন মন খারাপ করল,আরে ভাই তোর অ্যাটিটিউডটা আজো বুঝলাম না।কুল ডাউন।আমি সিরিয়াসলি কিছু বলি নি।ওয়েট আমি দেখছি কোথায় গেলো!
ত্রিশা রিকশা থেকে নেমে এসে দাঁড়াল।দু’জনের দিকে তাকিয়ে দ্বিধান্বিত হলো,কি ব্যাপার?দু’জনেরই মুড অফ।অ্যানিথিং রং।ডিপার্টমেন্টে যাবে তো-নাকি?
মৌন বলল,আরে তেমন কিছু না।ওর সাথে বর্ণ এসেছিলো ভার্সিটিতে।বর্ণকে দাঁড়িয়ে রেখে স্বার্থ উপরে গিয়েছিল।এসে দেখে নাই।এ জন্য ফেড আপ হয়ে আছে।আর ওকে তো তুমি চেনোই।কিছু একটু হলে কি সিচুয়েশন ক্রিয়েট করে।
স্বার্থ মৌনের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকালো,বেশি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু।
ত্রিশা বলল,ওকে।রিলাক্স।এতো চিন্তার কি আছে!
স্বার্থ ক্ষীণ দৃষ্টিতে ত্রিশার দিকে তাকাল,চিন্তার কি আছে মানে?হুম!তুমি জানো না বর্ণ কে শরীফ ভাইয়া আমার উপর ভরসা করে এখানে রেখে গেছে।ওর কিছু হলে আমি সবাইকে কি বলবো!
ত্রিশা রহস্যময় গলায় বলল,শুধু কি এই একটাই কারন?নাকি…!
মৌন বাধা দিল,ত্রিশা বেশি পেঁচিয়ে ব্যাপারটা ঘোলাটে করো না।বর্ণকে দেখে থাকলে বলো।
ত্রিশা কিছুক্ষণ ভাবল।তারপর জানাল,ওয়েট।বর্ণকে তো বোধ হয় বকুলতলার দিকে যেতে দেখলাম।একটা ছেলে ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল।
স্বার্থের চোখ রাগে জ্বলে উঠল,মানে?কি সব বলো তুমি?এখানে কোন ছেলে ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে যাবে?
তারপর কটু গলায় বলল,তুমি এতক্ষণে সেটা বলছ?তোমরা মেয়েরা না পারোও!আজাইরা!
ত্রিশা ঠোঁট বাঁকাল,অমনি মেয়েদের দোষ হয়ে গেল!আজিব।মেয়েদের প্রতি তোমার এতো রাগ কিসের বলো তো।আমি কি জানি!তোমরা বর্ণকে খুঁজছ।
মৌন স্বার্থের কাঁধে হাত রাখল,ইট’স সিম্পিল ইয়ার।হতেই তো পারে এখানে ওর পরিচিত কেউ আছে।
স্বার্থ নিজের কাঁধ থেকে মৌনের হাত সরিয়ে দিল,মৌন,এটা সাধারন কোন ব্যাপার না।ঢাকাতে আমি ছাড়া ওর কোন পরিচিত নেই।
মৌন বলল,আরে সৃজনও তো হতে পারে।আমাদের সাথে রসুলপুরে তীর্থের বিয়েতে যে ছেলেটা গিয়েছিল।
স্বার্থ বিরক্ত হল,বারবার বোকা বোকা কথা বলবি না।সৃজন হলে-ত্রিশা সৃজনকে চিনতো।
মৌন মাথা চুলকালো,তাও তো ঠিক।
ত্রিশা আরেকবার মনে করল,না।সৃজন নয়।অন্য কোন ছেলে হবে।
মৌন ত্রিশার হাত ধরে বলল,চলো তো।শালাবাবুর কপালে আজ শনি আছে।ওর জন্য আমাকে হ্যারাজমেন্ট হতে হলো।
ত্রিশা মৌনের হাত চেপে ধরল,স্বার্থ যাক।তুমি এসবে যেয়েও না।
স্বার্থ ব্যাগটা মৌনের কাছে একপ্রকার ছুড়ে দিল,তোদের যেতে হবে না।তোরা ডিপার্টমেন্টে যা।আমি দেখছি।
স্বার্থ দৌড় দিল।মৌন ব্যাগ সামলে বলল,আরে ভাই দেখে শুনে যা।
ত্রিশার দিকে তাকাল,কি পাগল দেখেছ?সবাই কিভাবে দেখছে ওকে।সে খেয়াল ওর আছে।
ত্রিশা বলল,ধুর,তুমি ছাড়ো তো।স্বার্থ অমনই।চলো উপরে যাই।
মৌন মুচকি হেসে ত্রিশার একটা হাত ধরল,হুঁ,চলো সুইটহার্ট।

চারুকলা অনুষদের বকুলতলা।ঢাবির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রাণকেন্দ্র।মনোরম পরিবেশ।সারাদিকে যুবক-যুবতী।কোথাও কপোত-কপোতী।হৃদয় বকুলতলায় এসে বর্ণের হাত ছেড়ে দিল।গরম নেই।হালকা ঠান্ডা পরিবেশ।তবুও বর্ণের গলা শুকিয়ে যেন কাঠ হয়ে গেল।
সে ভীতু গলায় জিজ্ঞাসা করল,হৃদয় ভাইয়া,আপনি এখানে কেন?
হৃদয় ভালো করে একবার বর্ণের দিকে তাকাল।বর্ণের মুখে আগের থেকে অনেক মোহনীয়তা।স্নিগ্ধতা।কোমলতা।বড় বড় চোখ দু’টায় বেশ মুগ্ধতা।শহরে এলে মানুষ এমন করে বদলে যায়?হয়তো বা।কেবল কি চেহারাটারই বদল হয়?নাকি আচার-আচারণ।চলাফেরা।কথাবার্তা।পোশাকআশাক।এমনকি রুচির বদলে স্বভাবটাও বদলায়।আচ্ছা,অভ্যাসগুলো কি বদলায়?
হৃদয় মুখে হাসির রেখা টেনে বলল,বর্ণ,তুমি আগের চেয়ে অনেক সুন্দর হয়ে গেছো।
বর্ণ ঢোঁক গিলল,হৃদয় ভাইয়া,আমি মজার মুডে নেই।আমি তো একটা প্রশ্ন করেছি!না?
হৃদয় বলল,আরে অধৈর্য হচ্ছো কেন?এসেছি যখন।সব বলবো তো।সময় দাও।
বর্ণের ভয় যেন বেড়ে গেল।যে কোন মুহূর্তে স্বার্থ ভাইয়া এখানে চলে আসবে।খু্ঁজতে খুঁজতে।তারপর কি করবে-আল্লাহ জানে।ঘামহীন পরিবেশেও সে কেবল ঘেমে যাচ্ছে।
বর্ণ প্রায় অনুরোধের সুরে বলল,হৃদয় ভাইয়া,যা বলার দ্রুত বলুন।আজ আমার ওরিয়েন্টেশন ক্লাস।মিস করবো।
হৃদয় অদ্ভুদ চোখে তাকাল বর্ণের দিকে,তুমি অনেক বদলে গেছো,বর্ণ।শরীয়তপুরের সেই বর্ণ।আর আজকের এই বর্ণ।সম্পূর্ণ আলাদা।
বর্ণ খানিকটা বিরক্ত হলো।একই সঙ্গে তার আবার মায়াও হলো।বিরক্তিটা স্বার্থের ভয়ে।মায়াটা হৃদয়ের ব্যাকুল চোখের দিকে তাকিয়ে।চারদিকে এত মানুষ।বর্ণের অস্বস্তিও হচ্ছিল।
বর্ণ বলল,ভাইয়া,প্লিজ।এটা ভার্সিটি।আপনি আমাকে একটা কথা বলুন তো।আমাকে কিভাবে খুঁজে বের করলেন?
হৃদয় নিচের দিকে তাকিয়ে পায়ের তলায় কিছু একটা ঘষতে ঘষতে বলল,অনু আমাকে ফোন করেছিল।
বর্ণ অবাক হয়ে গেল।আশ্চর্য ভঙ্গিতে প্রশ্ন করল,অনু আপু?আপনাকে ফোন করেছিলো?হাউ ক্যান ইট পসিবল!
হৃদয় বর্ণের একটা হাত ধরল,সব বলব তোমাকে।এখন কয়েকটা দিনের জন্য আমাকে একটু হেল্প করতে পারবে?
বর্ণ হৃদয়ের হাতের ভিতর নিজের হাত মুচড়াচ্ছিল।হৃদয় বুঝতে পেরে ছেড়ে দিল।
বর্ণ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,বলুন কি করতে হবে!
হৃদয় দূরে দু’টো ছেলেকে দেখিয়ে বলল,ওখানে নীল শার্ট পরা যে ছেলেটাকে দেখছ-ও খুব বিপদে পড়েছে।এই ঢাকাতেই একটা প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়ে।পাশে ব্লেজার পরা-সানগ্লাস চোখে যাকে দেখছো-লম্বা মতো।তাকে ও ভালোবাসে!
বর্ণ অবাক হয়ে হৃদয়ের দিকে তাকাল।
হৃদয় বর্ণকে সহজ করার জন্য আবার বলতে শুরু করল,আমি জানি,তুমি ভাবছো এটা আবার কেমন ভালোবাসা।কিন্তু ভালোবাসা তো ভালোবাসায় হয়।তাই না?
বর্ণ রোবটের মতো উত্তর দিল,হুঁ,তা তো ঠিক।
হৃদয় বলল,লম্বা ছেলেটার পরিবার পাশের ছেলেটাকে খুঁজছে।খুন করার জন্য।
ঘামাক্ত বর্ণের সারা গা শীতল হয়ে গেল এক নিমিষে।
ভয় কাটাতে হৃদয় বলল,আমি জানি তুমি যে এলাকায় থাকো-সেখানটা অনেক নিরাপদ।শুধু মাত্র দু’একটা দিনের জন্য ওদের রাখো।তারপর আমি দেখছি কি করা যায়।
বর্ণ বলল,হৃদয় ভাইয়া,সবই তো বুঝলাম।কিন্তু…….!
বর্ণ কথা শেষ করার আগে আচমকা স্বার্থ এসে বর্ণকে জড়িয়ে ধরল,কোথায় চলে এসেছ তুমি?আমি তো পাগল হয়ে যাবো।তুমি হারিয়ে গেলে।
বর্ণ যেন হতভম্ব হয়ে গেল।আজ পর্যন্ত কোনদিন সে তার স্বার্থ ভাইয়াকে এমন ছেলেমানুষি আচারণ করতে দেখে নি।এমন পাগলামি করতে দেখে নি।এত মানুষের মাঝে বর্ণ লজ্জায় যেন রাঙা হয়ে গেল।হৃদয়ের দিকে সে তাকিয়ে দেখল হৃদয় ভাইয়া ঘোর লাগার মতো তাকিয়ে আছে।পলক পড়ছে না তার।
বর্ণ স্বার্থের কানের কাছে মুখ নিল,কি হচ্ছে বলো তো।সবাই দেখছে।এটা তোমার বেডরুম নয়।
স্বার্থ যেমন আচমকা জড়িয়ে ধরেছিল তেমন আচমকা হুশ হলো।বর্ণকে ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
বর্ণ হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে একটা তৈরি করা হাসি দিল,উনি স্বার্থ ভাইয়া।ওনার সঙ্গেই আমি থাকি।
হৃদয় স্বার্থের দিকে তাকাল।তারপর বলল,এটাই তোমার সেই বদমেজাজি মামাতো ভাই?
বর্ণ হাতের ইশারায় হৃদয়কে চুপ করতে বলল।
স্বার্থ হৃদয়ের দিকে এবার তাকিয়ে বলল,হোয়াট ডু ইউ মিন বাই বদমেজাজি?
বর্ণ স্বার্থের দিকে তাকিয়ে বলল,স্বার্থ ভাইয়া।উনি তো মজা করেছেন।বাই দ্যা ওয়ে উনি হলো হৃদয় ভাইয়া।
স্বার্থের কপালে ভাঁজ পড়ল,কোন হৃদয়?
বর্ণ বলল,ঐ যে অনু আপুর কথা বলেছিলাম না!
স্বার্থ বুঝতে পারল।বলল,কিন্তু উনি এখানে কেন?
বর্ণ হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,হৃদয় ভাইয়া,আপনি একটু ওনাদের কাছে গিয়ে দাঁড়ান।আমি স্বার্থ ভাইয়ার সাথে একটু আলাদা কথা বলে নেয়।
হৃদয় ‘আচ্ছা’ বলে সেই দু’টো ছেলের দিকে চলে গেল।

মিনিট পাঁচেক পর বর্ণ স্বার্থকে নিয়ে হৃদয়ের কাছে এসে দাঁড়াল।বলল,হৃদয় ভাইয়া,আমি স্বার্থ ভাইয়াকে সব বলেছি।ওনারা দু’একদিন থাকতে পারেন আমাদের সঙ্গে।
হৃদয় কৃতজ্ঞতার চোখে তাকাল স্বার্থের দিকে,থ্যাংক ইউ,ভাই।তুমি আমাকে বিপদের হাত থেকে বাঁচালে।ও স্যরি।তোমাকে তুমি করে বলে ফেললাম।আসলে বয়সে আমার ছোট হবে তো তাই।মনে কিছু করো না।
স্বার্থ মৃদু হেসে বলল,ইট’স ওকে।আপনি তুমি করেই বলুন।
তারপর হৃদয় বাকি দু’জনের দিকে চেয়ে বর্ণকে দেখিয়ে পরিচয় করিয়ে দিল,ও হচ্ছে বর্ণ।আমাদের আরশিনগরের বর্তমান চেয়ারম্যান শরীফ ভাইয়ার ছোট ভাই।আর ও বর্ণের মামাতো ভাই।স্বার্থ।
তারপর বর্ণের দিকে তাকিয়ে পাশের ছেলেটাকে দেখালো,এ হচ্ছে মির্জাবাড়ির ছোট ছেলে-অহন।তোমার থেকে অবশ্য বড়।স্বার্থের সমবয়সী বা কয়েকদিনের ছোট বড় হতে পারে।একটা ভার্সিটিতে পড়ছে।তোমাকে তো বললামই।
বর্ণ কিছুক্ষণ ভেবে অহনকে জিজ্ঞাসা করল,আপনি কি রফিক ভাইয়ার ভাইপো?টুশি ফুফুর বিয়েতে আপনাকে দেখেছিলাম বোধ হয়।খুব বেশি মনে নেই।
হৃদয় প্রশ্ন করল,তুমি চেনো নাকি অহনকে?
অহন বলল,হ্যাঁ।আমি মির্জাবাড়ির ছেলে।ও মাই গড,তুমি শরীফ কাকার ছোটভাই?
বর্ণ স্মৃত হাসি দিল,হুঁ,তবে আমাকে আবার কাকা বলে বসবেন না।আমি কিন্তু বয়স্ক নয়।
অহন হেসে দিল,আরে না।
হৃদয় বলল,তাহলে তো হয়ে গেল।তারপর লম্বা ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলল,উনি হচ্ছেন বাপ্পি।প্রফেশনালি ডাক্তার।
বাপ্পি স্বার্থ আর বর্ণের দিকে তাকিয়ে সালাম দিল।মৌন দ্রুত হেটে এসে স্বার্থকে জিজ্ঞাসা করল,কি’রে কি হয়েছে?কল করে আসতে বললি যে!
স্বার্থ হৃদয়দের দিকে তাকিয়ে বলল,এনাদেরকে তুই একটু আমার ফ্ল্যাটে ছেড়ে আয়।বর্ণের আজ ওরিয়েন্টেশন ক্লাস।আমি ওকে একসঙ্গে নিয়েই ফিরবো।
হৃদয় আপত্তি করল,স্বার্থ,আমি যাবো না।তুমি বরং অহন আর বাপ্পি ভাইকে নিয়ে যেতে বলো।আমি একটা ব্যবস্থা ঠিক করে নিবো।তারপর দু’তিন দিন পর ওদের আমি নিয়ে যাবো।
স্বার্থ বলল,এটা হয় না হৃদয় ভাই।আপনিও যান।ফ্রেশ হন।আমি এসে সব শুনব।তারপর আমি যা বলব,তাই করতে হবে-কিন্তু।
বর্ণ সাহস পেল।বলল,হৃদয় ভাইয়া,আপনিও যান না।আমরা ফিরি-তারপর না হয় যেয়েন।
হৃদয় আর কিছু বলল না।
মৌন অহনদেরকে নিয়ে হাটা দিলে স্বার্থ বলল,শোন মৌন।খালাকে সব বুঝিয়ে দিয়ে আসিস।আর পকেটে টাকা আছে তো?

মৌন মাথা নাড়াল।

সবাই চলে যাওয়ার পর স্বার্থ বর্ণকে প্রশ্ন করল,হৃদয় কোন ঝামেলা করবে না তো?অনুর ব্যাপারে।
বর্ণ দ্বিধান্বিত হয়ে বলল,বুঝতে পারছি না।ভাইয়া তো বলল অনু আপু নাকি আমাদের খোঁজ দিয়েছে।
স্বার্থ বলল,মানে?অনু কিভাবে খোঁজ দিবে?
বর্ণ হাটল দিল,মানেটা আমি বুঝলে তো।আমি না বুঝে আপনাকে কি বুঝাবো।
স্বার্থ বর্ণের হাত ধরল,একা ফেলে যাচ্ছ কেন?চলো আমিও যাই।
বর্ণ মুচকি হাসি দিল,খুব সাহস বেড়েছে না!
স্বার্থ বর্ণের হাত না ছেড়ে বর্ণের হাটার সঙ্গী হলো।সেও মুচকি হেসে বলল,হুঁ,খুব।এবার চলো।

বিশ।

স্বার্থ আর বর্ণ ফিরতে ফিরতে দুপুর দু’টো বেজে গেল।

ফ্ল্যাটে ফিরে বর্ণকে ফ্রেশ হতে বলে স্বার্থ সরাসরি কিচেনে চলে গেল।রাখালের মা গোছগাছ করছিল।স্বার্থ কে দেখে বলল,এসেটো গিয়েইনচিস।বোস ক্যানে।মুই খেতেটো দিইনচি।
স্বার্থ গ্লাসে পানি ঢেলে খাওয়া শেষ করে বলল,খালা!তুমি এখনো ওনাদের দুপুরের খাবার খেতে দাও নি?
রাখালের মা জানাল,মু তো দিতেটো চেইনচি।উরা তো কইনচে খাবেক টো লাই।কইনচে,তুরা আইসলে খাবে ক্যানে।
স্বার্থ বলল,আচ্ছা,বুঝেছি।তুমি টেবিলে খাবার দাও।আমি দেখছি।আর শোনো,ফ্রিজে কি কি আছে?আমাকে বলো।তারপর বাজারে যাবো।
রাখালের মা ফ্রিজ খুলে বলল,ইটোতে কাঁচা সবজিটো আইনচে।ডিম,মাংসটো মু রেঁধেইনচি।
স্বার্থ ফ্রিজের কাছে গিয়ে বলল,তুমি সরো।আমি দেখছি।তারপর যা আনার আনবো।
স্বার্থ ফ্রিজ দেখে বলল,আমি খেয়েই বেরিয়ে যাচ্ছি।তুমি রাতের রাঁন্নাটা করে দিয়ে যেও।আমি না হয় এগিয়ে দিয়ে আসবো তোমাকে।
রাখালের মা হাসল,তুর যেতে হবেটো ক্যানে,মু একা যেতেটো পারবোক।
স্বার্থ বলল,আচ্ছা,সে দেখা যাবে।তুমি খাবার দাও টেবিলে।

বর্ণের রুমে ঢুকে দেখল হৃদয় সোফায় বসে আছে।বাপ্পি,অহন ঘুমিয়ে গেছে বর্ণের বিছানায়।
স্বার্থ গিয়ে সোফায় হৃদয়ের পাশে বসল,আপনারা খান নি কেন এখনো?প্রায় তিনটা বাজতে চললো।
হৃদয় হাতের ম্যাগাজিটা সোফা টেবিলে ফেলে বলল,অহনরা এসে ফ্রেশ হয়েই ঘুমিয়ে গেছে।তাই ডাকি নি।আর ভাবলাম তোমরাও এসো।একসঙ্গে খাবো যাবে।
স্বার্থ বলল,তাহলে ফ্রেশ হয়ে নিন।
হৃদয় বলল,হুঁ,যাবো।বর্ণ বের হোক।
বর্ণ ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে বলল,হৃদয় ভাইয়া,আমার হয়ে গেছে।আপনি যেতে পারেন।
হৃদয় উঠে গেলে বর্ণ এসে স্বার্থের পাশে বসল।তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছল।
স্বার্থ বর্ণের সামনের ভেজা চুল নাড়িয়ে বলল,শাওয়ার নিলে নাকি?
বর্ণ স্বার্থের কোলের উপর তোয়ালে ফেলে দিল,এক দিনে কতবার গোসল করবো?সকালে করেই তো বের হলাম।
স্বার্থ তোয়ালেটা পিছনে রেখে বর্ণের দিকে এগিয়ে বসল।বর্ণকে জড়িয়ে ধরল,চলো,আরেকবার দু’জন গোসলের আয়োজন করি।
বর্ণ স্বার্থের নাকে টান মেরে বলল,খুব শখ না!আশেপাশে মানুষ আছে।ছাড়ো তো।
স্বার্থ মুখটা গোমড়া করে বলল,কি নিষ্ঠুর।ধরতেও দেয় না।
তারপর বিছানার দিকে তাকিয়ে বর্ণকে উদ্দেশ্যে করে বলল,দেখো তো।অহন আর বাপ্পি ভাই কেমন সুন্দর শুয়ে-ঘুমাচ্ছে।পারফেক্ট কাপল।
বর্ণ উঠতে উঠতে বলল,হৃদয় ভাইয়া বের হলে আপনি ওনাদের নিয়ে খেতে আসুন।আমার প্রচন্ড ক্ষুধা পেয়েছে।ক্যাম্পাসে ফুচকা খেতে চাইলাম-তাও দিলেন না।
স্বার্থ বর্ণের হাতটা টেনে ধরল।
বর্ণ ফিরে দাঁড়াল,উফ,আবার কি হলো?
স্বার্থ বর্ণের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,তুমি আমাকে একবার আপনি বলছো,একবার তুমি করে বলছো।ব্যাপার কি?
বর্ণ একটা মিষ্টি হাসি দিল,আসলে অভ্যাস বদলানো সহজ না।তাছাড়া কেমন খালি খালি লাগছে আপনাকে তুমি করে বললে।মনে হচ্ছে কি যেন একটা বলছি না।
স্বার্থ বর্ণের হাতে চাপ দিল,ওকে আমার ‘আপনি-তুমি’ বেয়াইসাব।
হৃদয় ওয়াশরুম থেকে বের হলে তাকে দেখে স্বার্থ বর্ণের হাত ছেড়ে দিল।

বর্ণ দ্রুত বেরিয়ে গেল।

খাবার টেবিলে বর্ণ আর হৃদয়ের মাঝের চেয়ারে স্বার্থ বসেছে।অহন আর বাপ্পি তাদের সামনে।মুখোমুখি অবস্থান।
রাখালের মায়ের সব পরিবেশন করা হলে স্বার্থ বলল,খালা,এবার যান।আপনি খেয়ে নিন।
রাখালের মা মাথা নাড়িয়ে চলে গেল।ভাষাগত কারনে অপরিচিতদের সামনে রাখালের মা কম কথা বলতে চেষ্টা করে।বর্ণ যখন প্রথম এসেছিল তখনও একই কাজ করতো।একটু কিছু বললে বর্ণ হা করে থাকতো।স্বার্থের ধমক খেয়ে চুপসে যেত।
স্বার্থ সবাইকে খাবার দিয়ে বলল,আসলে ফ্রিজে তেমন কিছু নেই।আমিও ছিলাম না।তাই খালা জাস্ট ডিম আর চিকেনটা করেছে।
হৃদয় বলল,ঠিক আছে স্বার্থ।এতেই হবে।আমরা তো হঠাৎই আসলাম।
তারপর বর্ণের দিকে তাকিয়ে হৃদয় জানতে চাইল,বর্ণ,তুমি খাবে না?তখন তো খুব বলছিলে ক্ষুধা পেয়েছে।
স্বার্থ বর্ণের সামনে প্লেটও দেয় নি।
স্বার্থ নিজেই বলল,ও বোধহয় খেয়েছে।আপনারা খান।
হৃদয় মুখে এক লুকমা নিয়ে শেষ করে বলল,কখন খেলো?
স্বার্থ মিথ্যা বলল,মাত্রই।আমরা আসতে আসতে ওর খাওয়া হয়ে গেছে।আসলে ও ক্ষুধা একদম সহ্য করতে পারে না।
হৃদয় ‘ওহ’ বলে খাওয়ায় মন দিল।
বর্ণের রাগ হচ্ছিল।মনে মনে আওড়ালো,কি মিথ্যুক রে বাবা।ক্ষুধায় আমার পেট জ্বলে যাচ্ছে।মেন্টাল একটা।সবকিছুতেই পাগলামি।
স্বার্থ উঠে দাঁড়িয়ে জিন্সের পকেট থেকে মোবাইল বের করে বর্ণের হাতে দিয়ে বলল,তুমি বরং বসে বসে গেম খেলো।
বর্ণ আড়চোখে তাকিয়ে মোবাইল নিলো।
বাপ্পি আর অহন চুপচাপ খাচ্ছিল।
স্বার্থ খেতে খেতে জিজ্ঞাসা করল,অহন,তুমি কোন ভার্সিটিতে পড়ো?
অহন মাথা উঁচু করে বলল,আইইউবিএটিতে।
স্বার্থ বলল,ওহ।আর বাপ্পি ভাই আপনি কোন হাসপাতালে আছেন?
বাপ্পি জানাল,উত্তরা একটা ক্লিনিকে।অহন আর আমি একসঙ্গেই থাকি।ওর জন্যই মূলত সরকারী হসপিটালে জব নেয় নি।আসলে হৃদয় তোমাদের কতটুকু বলেছে।আমি জানি না।আমি আর অহন….!
স্বার্থ তার আগেই বলল,ইট’স ওকে,বাপ্পি ভাই।দিস ইজ ইওর পারসোনাল ম্যাটার।উই ক্যান’ট ইন্টারআপ অর ইগনোর।উই হ্যাভ নো রাইট দ্যাট।
বর্ণ আড়চোখে স্বার্থের দিকে তাকাল।
বিড়বিড় করে বলল,লেকচার!নিজের মধ্যে এটা আছে যে-এই জন্য কত ভাষণ।বাই দ্যা ওয়ে,মেন্টালটা তো কখনো এতো বকবক করে না লোকের সাথে।হলো কি?প্রেম করে ভালো হয়ে গেলো নাকি?
স্বার্থ বাম পাশ ফিরে বলল,বর্ণ,কিছু বললে?
বর্ণ মোবাইলের দিকে তাকিয়ে বলল,কই না তো।গেম খেলছি তো।
স্বার্থ অস্পষ্ট সুরে বলল,ফাজিল।
তারপর আবার বাপ্পির দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল,আপনারা কি করতে চান এখন?
হৃদয় বলল,আসলে বাপ্পি ভাইয়ার মা ব্যাপারটা মেনে নিয়েছে।কিন্তু ওনার বাবা সমাজে প্রতিষ্ঠিত লোক।তিনি এটা কিছুতেই মানতে নারাজ।তিনি অহনের পিছনে লোক লাগিয়েছে।
স্বার্থ হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,সেটাই তো স্বাভাবিক।আর অহনের বাড়িতে?
হৃদয় বলল,মির্জাবাড়িতে কেউ জানে না এই ব্যাপারটা।তারা জানে অহন একটা ফ্ল্যাটে একা থাকে।আশুলিয়ার দিকে।কিন্তু অহন তো থাকে উত্তরা।
স্বার্থ মাথা নাড়াল,সব বুঝলাম।কিন্তু আপনাদের প্ল্যান কি?
অহন খাবার টা পুরো শেষ না করে বেসিনে গিয়ে হাত ধুয়ে ফিরে এল।
বাপ্পি তার দিকে তাকিয়ে বলল,কি হলো আর খেলে না?
অহন জবাব না দিয়ে আবার চেয়ার টেনে বসল,আসলে আমার অনার্স ফাইনাল হতে কয়েকটা দিন আছে।অনার্সটা শেষ হলে আমরা দু’জন আমেরিকায় চলে যাবো।ওখানে বাপ্পির এক ফ্রেন্ড আছে।সে সব ব্যবস্থা করেছে।
বর্ণ মোবাইলের স্ক্রিন থেকে মুখ তুলে বলল,অহন আঙ্কেল আপনার ফ্যামিলিতে কি বলেছেন তাহলে?
অহন বর্ণের দিকে তাকিয়ে বলল,আম্মু,আব্বুকে বলেছি আমি স্কলারশিপ পেয়েছি কানাডাতে।
স্বার্থ বলল,তারা কাগজপত্র দেখতে চাইবেন না?
অহন জবাব দিল,আসলে আম্মু কোথাও বের হন না।আব্বু জব থেকে অবসর নেওয়ার পর নতুন ব্যবসাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।তাছাড়া আমাদের পরিবারে সবাই মোটামুটি ব্যস্ত।
বর্ণ সজল চোখে অহনকে প্রশ্ন করল,আঙ্কেল,আপনার কি মনে হচ্ছে না,আপনি ওনাদের ঠকাচ্ছেন।
অহন দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল,একটু তো খারাপ লাগছেই।
হৃদয় খাওয়া শেষ করে বলল,নিজের খুশির থেকে পৃথিবীতে অন্যকিছু বড় করে দেখলে কোনদিন ভাল থাকা যায় না,বর্ণ।
বর্ণ আর অহনের বুকের ভিতর ছ্যাৎ করে উঠল।
দু’জনই হৃদয়ের দিকে তাকাল।কারন তাদের থেকে ভালো আর কেই বা জানে হৃদয়ের জীবন গল্প!
স্বার্থ প্রস্তাব করল,বাপ্পি ভাই,আমাকে দু’টো দিন সময় দেন।আমার এক বান্ধবী আছে।ত্রিশা।ওর বাবা বেশ পাওয়ারফুল লোক।উত্তরায় ওদের একটা ফ্ল্যাট আছে।ত্রিশাকে কিছু একটা বুঝিয়ে,ওনাকে কোন একরকম কনভেনজ করবো।আপনারা যে ক’দিন দেশে থাকবেন।নিরাপদ থাকবেন।
হৃদয় বেসিন থেকে ফিরে এসে বসল,বাহ,তাহলে তো ভালোই হয়।আমাকে আর কষ্ট করতে হলো না।
অহন বলল,থ্যাংকস এ লট,স্বার্থ।
স্বার্থ বাপ্পির দিকে তাকিয়ে বলল,আপনি তো কিছুই খেলেন না।
বাপ্পি মাথা নাড়াল,আর খাবো না,স্বার্থ।আমার হয়ে গেছে।
স্বার্থ উঠতে উঠতে বলল,আপনারা তাহলে রুমে গিয়ে রেস্ট নিন।আমি একটু দেখে আসি খালা কি করছে।

কিছুক্ষণ পর সে ফিরে এসে সবাই চলে গেছে দেখে-বর্ণের দিকে তাকিয়ে বলল,এখনো গেম খেলছ?
বর্ণ জবাব দিলো না।
স্বার্থ প্লেটে ভাত তুলে বলল,কি দিয়ে খাবে?ডিম নাকি চিকেন?
বর্ণ এবারও কিছু বলল না।মোবাইল থেকে চোখও তুলল না।স্বার্থ আবার বলল,কি হলো?বলো।
বর্ণ গোমড়ামুখ করল,আমি খাবো না।
স্বার্থ প্লেটে চিকেন নিয়ে মাখাল।
তারপর পাশের চেয়ারে বসল,হা করো।
বর্ণ আড়চোখে তাকাল,বললাম না খাবো না।আপনি জানেন না!আমি তো খেয়েছি।
স্বার্থ হেসে দিল।তারপর বাম হাত দিয়ে নিজের বাঁ কান ধরল,আচ্ছা স্যরি।প্লিজ নাও।আমি কেন বলেছি তুমি জানো না?
বর্ণ বলল,আচ্ছা খাবো।আপনিও খান।
স্বার্থ বর্ণের মুখে খাবার দিয়ে বলল,আমি তো খেলাম।
বর্ণ মুখে খাবার নিয়ে বলল,কই খেলেন?ভদ্রতা করলেন।
স্বার্থ বলল,মোবাইল রাখো।আর গেম খেলতে হবে না।ঠিকঠাক খেয়ে নাও।আমিও খাচ্ছি।
বর্ণ মোবাইল রাখল।
স্বার্থ নিজের মুখে খাবার নিয়ে আবার বর্ণকে দিয়ে বলল,তুমি একটু জেনিথকে পড়িয়ে আসো।ফ্রিজে কিছু নেই।আমি একটু বাজার থেকে ঘুরে আসি।
বর্ণ চেয়ারে পা তুলে বসল,ফ্লোর বেশ ঠান্ডা।আচ্ছা খেয়ে যাচ্ছি।
স্বার্থ বলল,আচ্ছা কাল ডাইনিংয়ের ফ্লোর ম্যাট আনবো।মুখের ভিতর খাবার রেখে দাও কেন?দ্রুত খাও।
বর্ণ ঠোঁট-মুখ কুঁচকালো,উফ।খাচ্ছি তো।শুধু ধমকায়।
স্বার্থ মুচকি হেসে বলল,আমি শুধু ধমকায়?আদর করি না?
বর্ণ দুষ্টুমির হাসি দিয়ে মাথা নাড়াল।
বাচ্চাদের মতো করে বলল,হুঁ,খুব।
স্বার্থ বলল,আচ্ছা,খাওয়ার সময় বেশি কথা বলতে হবে না।বিষম উঠবে।
বর্ণ আর কথা বলল না।

বর্ণ রেডি হয়ে বের হচ্ছিল।হৃদয় ড্রয়িংরুমে বসে বসে টিভি দেখছে।
বর্ণকে বের হতে দেখে প্রশ্ন করল,কোথাও বের হচ্ছো?
বর্ণ বলল,হুঁ,ভাইয়া।ফার্স্ট ফ্লোরে একটা বাচ্চা মেয়েকে পড়াতে যাচ্ছি।অহন আর বাপ্পি ভাইয়া কই?
হৃদয় সোফায় একটু সরে বসল,একটু বসবে?কিছু কথা বলতাম।
তারপর আবার বলল,স্বার্থ বেরোনোর সময় ওদের ছাদে দিয়ে গেছে সম্ভবত।আমি ঠিক জানি না।
বর্ণ বসতে বসতে বলল,আচ্ছা।কি কথা?বলুন!
হৃদয় টিভি বন্ধ করে বলল,বিরক্ত হইয়ো না।তোমাকে আর হয়তো একা পাবো না।তাই ডেকে বসালাম।অনুর বিয়ে হয়ে গেছো বলে কি-দুলাভাই ডাকা ছেড়ে দিলে?
বর্ণ জবাব দিলো না।তার মানে হৃদয় ভাইয়া জানে অনু আপুর বিয়ে হয়ে গেছে।
হৃদয় বলল,হুম,তুমি ঠিকই ভাবছ!আমি জানি অনুর বিয়ে হয়ে গেছে।
বর্ণ তাকাল।প্রশ্ন করল,আন্না আপনাকে কবে লোক দিয়ে মেরেছে?
হৃদয় প্রত্যুত্তর বলল,অনুকে নেত্রকোনা রেখে গিয়ে।আসলে আমার কোন দোষ ছিলো না।
বর্ণ বিড়বিড় করল,আমি জানতাম আন্না ভুল করেছে।
হৃদয় জিজ্ঞাসা করল,কিছু বললে?
বর্ণ উল্টে প্রশ্ন করল,আচ্ছা,আপু আপনাকে ফোন করেছিল সত্যিই?
হৃদয় উত্তর দিল,হুম।প্রথম এবং শেষবার।বিয়ের দিন রাতে।
বর্ণ অবাক হল,আপনার নাম্বার পেল কোথায় আপু?
হৃদয় জানাল,তুমি ঢাকা আসার পর আরেকদিন আমার অনুর সাথে কথা হয়েছিল।সেদিন নাম্বার দিয়েছিলাম।আর সেদিনই তোমার আন্না আমাদের দেখে ফেলেছিল।তারপর অনুকে নেত্রকোনা রেখে গিয়ে আমাকে লোক দিয়ে মেরেছিল।
বর্ণ বলল,শুনেছিলাম আপনি নাকি এসিড নিয়ে ঘুরেছিলেন।আপুকে পাগলের মতো খুঁজছিলেন।
হৃদয় হাসল,কথাটা একদম ভুল।শরীফ ভাইয়াকে কেউ ফলস ইনফরমেশন দিয়েছিল।আরে বাবা,আমি তো জানতাম তোমার মামাবাড়ি নেত্রকোনার রসুলপুরে।তেমন ইনটেনশন থাকলে আমি কি অনুর বিয়ের দিন রসুলপুরে হাজির হতাম না।
বর্ণ নিরুৎসাহ নিয়ে বলল,সেসব জানি না।
তারপর কৌতূহল নিয়ে হৃদয়কে জানাল,আমার শুধু একটা কথা জানার আছে।আশা করি উত্তরটা পাবো।
হৃদয় বর্ণের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
কিছু বলল না।
বর্ণ জানতে চাইল,সেদিন সাহাপাড়া মোড়ের ‘মধু টি স্টল’ এর পিছনে আপু কেন আপনাকে চড় মেরেছিল?
হৃদয় সজল চোখে বলল,শুধু কৌতূহল থেকে জানতে চাইলে?নাকি অন্য কোন কারন আছে?
বর্ণ বলল,এতকিছু বুঝি না।তবে খুব জানতে ইচ্ছা করে।
হৃদয় আবেগভরা কন্ঠে বলল,কিছু কিছু কথা নাই বা জানলে।সেদিন কি হয়েছিল সেটা এখন জেনে কোন লাভ নেই।তোমার আপুর তো বিয়ে হয়ে গেছে।আর তোমার তো…..!
হৃদয় বাকিটুকু বলল না।বর্ণ প্রশ্ন করল,আমার কি?
হৃদয় মাথা নাড়াল,না কিছু না।মজা করলাম।
বর্ণ কথা বাড়াল না,আপনার বলতে ইচ্ছা না করলে জোর করবো না।আমি যাই,লেট হয়ে যাচ্ছে।

বর্ণ উঠে সদর দরজা পর্যন্ত গেলে হৃদয় মিহি সুরে ডাকল দিল,বর্ণ!
বর্ণ ‘হুঁ’ বলে ফিরে তাকাল।
হৃদয় ক্ষীণ গলায় বলল,আমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দিবে?উত্তরটা জানা আমার জন্য খুব জরুরি!
বর্ণ বলল,জি বলুন।উত্তরটা জানা থাকলে অবশ্যই দিবো।
হৃদয় তেমন ক্ষীণ গলায় জিজ্ঞাসা করল,তুমি কি স্বার্থকে ভালোবাসো?
বর্ণ তিক্ত গলায় উত্তর দিল,আমার প্রশ্নের উত্তরটাও জরুরি ছিলো।সেদিন যদি আমাকে আমার প্রশ্নের উত্তর দিতেন,তবে আজকের এই দিনটা হয়তো দেখতে হতো না।সুতরাং কোন কিছুর জন্য আমি দায়ী বা দোষী নই।

হৃদয় একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল,তুমি কি বুঝাতে চাইলে-আমি ঠিক বুঝলাম না।তবে তোমাকে করা আমার প্রশ্নের উত্তর-আমি পেয়ে গেছি।
বর্ণ হাসল।হাসিটা বিদ্রুপের নাকি অপরপক্ষের প্রতি করুণার।ঠিক বোঝা গেল না।

হৃদয় টিভি অন করল।হৃদয়ের হৃৎপিন্ডের চারটি প্রকোষ্ঠ।সকল প্রকোষ্ঠ কেবল কষ্টের গাঢ় নীল রংয়ে কালচে হয়ে গেছে।কে কবে তার কোন প্রকোষ্ঠের খবর রেখেছে?কেউ রাখে নি!কেউ জানে না-হৃদয়ের বুকের হৃদয় কিরুপ ভাঙা!জীবন যে তাকে বড় বেশি ফাঁকি দিল।নিয়মের বড় অনিয়ম-কি কেবল তার বেলাতেই ঘটে।

(একাদশ ও অন্তিম পর্ব)

>
বিঃদ্রঃ তোমার একটিমাত্র জীবন যদি প্রেমহীন থেকে যায়,শর্তহীন দলিলে যদি কোন বিবাদীর নাম লেখা না থাকে,অনাবিষ্কৃত ভালোলাগা যদি তোমার ঠোঁটের আঙ্গিনায় বিরহ না জাগায়,একটিমাত্র জীবনে তুমি যদি কলঙ্ক এর সুখই না পেলে-তবে তুমি…!তবে তুমি আমার গল্প পড়ো না।
>

একুশ।

রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর আড্ডা দিতে দিতে বেশ দেরি হয়ে গেল।

স্বার্থ উঠে দাঁড়াল,অহন আর বাপ্পি ভাই এখানে বর্ণের রুমে শুয়ে পড়ুন।আমার রুমে হৃদয় ভাইয়ের জন্য ব্যবস্থা করছি।
হৃদয় সোফায় বসে ছিল একা।স্বার্থসহ বাকি তিনজন বর্ণের বিছানায় বসে ছিল।
হৃদয় বিনয়ী গলায় প্রশ্ন করল,স্বার্থ,তোমরা কই থাকবে?
স্বার্থ বলল,আমি আর বর্ণ ড্রয়িংরুমে শুয়ে পড়বো।
অহন অনুনয়ের ভঙ্গিতে বলল,স্বার্থ তোমরাও এখানে থাকো।বেড তো বেশ বড়।হৃদয় ভাইয়া না হয় তোমার রুমে যাক।ড্রয়িংরুমে কেন শুবে?শেষ রাতে বেশ ঠান্ডা পড়ে-কিন্তু।
বাপ্পিও অহনের কথায় সুর মেলালো,হ্যাঁ,স্বার্থ।তাই করো।
স্বার্থ হাসি মুখে বলল,তা কি করে হবে অহন!তোমাদের তো প্রাইভেসি দরকার।
অহন লজ্জা পেল।বলল,দু’টো একটা রাতে কিছু হবে না।গল্প করতে পারবো-সবাই মিলে।
এবার হৃদয় উঠে দাঁড়াল।শান্ত গলায় বলল,কারোর কোথাও যেতে হবে না।
তারপর স্বার্থের দিকে তাকাল,স্বার্থ,আমাকে একটা কাঁথা কিংবা কম্বল দাও।আমি ড্রয়িংরুমে সোফায় শুয়ে পড়ি।তুমি আর বর্ণ তোমার রুমে যাও।
বর্ণ হৃদয়ের দিকে তাকাল,সেটা কি করে হয়?আপনি আমাদের মেহমান!
হৃদয় হয়তো নিছক দুষ্টুমি করল,মেহমান তো কি হয়েছে।আর তোমাদের কি প্রাইভেসির দরকার নাই?
স্বার্থ হতভম্ব গলায় জিজ্ঞাসা করল,মানে?কিসের প্রাইভেসি?
অহন আর বাপ্পি মুখ চাওয়াচাওয়ি করল।
হৃদয় কথাটা এড়িয়ে গেল।হাসি মুখ করে বলল,আরে বলছি যে,স্বার্থের রুমে এ্যাটাচ ওয়াশরুম আছে-কি নেই।ড্রয়িংরুমে তো একটা দেখলাম।ওয়াশরুমে যেতে হলে বারবার ড্রয়িংরুমে এসে তোমাদের ডিস্টার্ব করব?
স্বার্থ জানাল,আরে হৃদয় ভাই,ও রুমে এ্যাটাচ ওয়াশরুম আছে তো।কোন প্রব্লেম হবে না।
তবুও হৃদয় আপত্তি করল,আরে না।আমি ড্রয়িংরুমেই থাকি।অনেক রাত অবধি টিভি দেখা যাবে।

তারপর বর্ণের বিছানা থেকে একটা কম্বল নিয়ে হৃদয় বেরিয়ে গেল।

স্বার্থ ড্রয়ার টেনে আরেকটা কম্বল বেরিয়ে বর্ণের দিকে তাকিয়ে বলল,তুমি অহনদের বিছানা ঠিক করে দিয়ে-তারপর এসো।কেমন!

ড্রয়িংরুমের সোফায় কম্বল ফেলে-হৃদয় ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল।
মতিন চাচার ফার্মেসি দোকানে এখনো লাইট জ্বলছে।রাহমান রোজ নিয়ম করে দু’বেলা রোগী দেখে।তার বিদেশিনী সুন্দরী স্ত্রী-রাতে শাশুড়ির কাছে কুরআন পাঠ শিখছে।মতিন চাচা আগের মতো হাসিখুশি।প্রাণোচ্ছল।পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে মসজিদ যান।গলিপথে সকলকে আল্লাহর দাওয়াত দিতে দিতে যান।
আজকে রাতের শিফটে হোসেন ভাই ডিউটিতে।পঙ্গু ছেলেটা মারা যাওয়ার পর-সে প্রায় রাতের ডিউটিতে আসে।সন্তানহারা কিশোরী স্ত্রী সুর করে ভোর রাত অবধি কাঁদে।তার ঘুম হয় না।সে কেবল কিছুক্ষণ পর পর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।পুরুষের চোখে জল না মানালেও-একজন সন্তানহারা পিতার চোখে কি জল বেমানান?তবুও হোসেন ভাই কাঁদে না।

হোসেন ভাই রাতে ডিউটি করায় রশিদ চাচা বেশ খুশি।সন্ধ্যাবেলায় কাজ শেষে-যাওয়ার সময় রাখালের মা রশিদ চাচার সঙ্গে একতরফা ঝগড়া করে গেছে।আবার নাকি রশিদ চাচা ক্যানালে প্রসব করেছে।হৃদয় এদের কাউকে চেনে না।তবুও অনেক আগ্রহ নিয়ে মতিন চাচার ‘রাহমান ফার্মেসি’র দিকে তাকায়।টুলে বসে আধঘুমে থাকা হোসেনকে দেখে তার মায়া হলো।আহা!বেচারা ঠান্ডায় কেমন কুঁকড়ে আছে।

‘অগত্যা ম্যানশন’ এর তৃতীয় তলা থেকে যেন পুরো আকাশটা দেখা যায়।কৃষ্ণপক্ষ।অন্ধকার আকাশ জুড়ে কেবল ফুলকি তারার মেলা।হৃদয়ের অন্ধকার বুকের মত।যেখানে হাজারো ব্যথা-হাজারো তারার ফুলকির মতো-কখনো জ্বলছে।কখনো নিভছে।
হৃদয় ব্যালকনির রেলিং ধরে বাইরে মুখ বাড়াল।হালকা শীতল হাওয়া তার মুখ ছুঁয়ে গেল।ভেজা ভেজা গন্ধ তাতে।আজ খুব সইমার কথা মনে পড়ছে তার।মানুষটি কত ভালোবাসতো তাকে।বিধবা শর্মি ফুপির জন্য তার মন কেমন কেমন করে।গত চার-পাঁচটি বছরে সে একদিনও মির্জাবাড়ি যায় নি-এমনকি দারোগাকান্দির পশ্চিমপাড়া মাড়ায় নি।অথচ যে কারনে গেল না,সেই কারনটাই আবার এসে তার সামনে দাঁড়াল।তার কি এমন ক্ষমতা-আরশিনগরে।অহন কোন ভরসায়?কোন বিশ্বাসে?বাপ্পিকে নিয়ে সাহায্যের জন্য ছুটে গেল তার কাছে।কত আবদার করে বলল,হৃদয় ভাইয়া,আপনি আমার মায়ের পেটের ভাইয়ের থেকে কম না।আজ বাপ্পি আর আমার বিপদে এই সাহায্যটুকু আপনি করতেই পারেন।
হৃদয় আশ্বাস দিয়ে বলল,তুমি চিন্তা করো না।আমি জীবন দিয়ে হলেও তোমাদের কোন ক্ষতি হতে দিবো না।
কিন্তু বিগত পাঁচবছরে অহন একটিবার কি তার খোঁজ নিয়েছে?নেয় নি!হৃদয় কোথায় আছে!কেমন আছে!সেটা জানার আগ্রহ দেখানো-কি অহনের কাছে অনৈতিক ছিলো?নাকি প্রয়োজন মনে করে নি!
হৃদয় ভাবে,সাধারন অর্থে দেখতে গেলে অহনের পক্ষ থেকে তেমন অন্যায় বা দোষের কিছু ছিলো না।হয়তো খোঁজটা নিলেই বাড়াবাড়ি রকমের হতো।অযাচিত হতো।যাই হোক,অহনকে ভালো রাখার দায়িত্ব বাপ্পি ভাইয়ার।তার যতটুকু কর্তব্য ছিলো,সেটা সে পালন করছে।সমাধান তো হয়েই গেল।তাদের আগামী পথ চলার দিশারীতে-বাকি পথটুকু তাদের এগিয়ে দিবে স্বার্থ।বর্ণের স্বার্থ!হৃদয় মুচকি একটা হাসি দিয়ে ড্রয়িংরুমে চলে এলো।সে হাসিতে না ছিলো -প্রাণোচ্ছ্বাস।না ছিলো-জীবনের শ্বাসপ্রশ্বাস।

তার খুব ক্লান্ত লাগছে।শরীর কেমন শিরশির করছে।ছেড়ে দিয়েছে।টিভি সে খুব একটা দেখে না।স্বার্থকে শুধু তার বলার প্রয়োজনে বলা।অতএব ভুলেও সে টিভি অন করলো না।কম্বল মুড়ে সোফায় শুয়ে পড়ল।

সেদিন মির্জাবাড়ি থেকে রাজশাহী ফিরে কৌশিক বাপ্পির সঙ্গে সব খোলসা করে নিয়ে ছিল।বুকে পাথর বেঁধে বাপ্পিকে প্রশ্ন করেই বসেছিল,তুমি কি অহনকে ভালোবাসো?
বাপ্পি অবাক নয়নে তাকাল।তার ধারনাই ঠিক।কৌশিক কেবল ধরতে নয়-বুঝতেও পেরেছে ব্যাপারটা।
বাপ্পি লুকোচুরি করল না।এক বাক্যে উত্তর দিল,হুঁ।
কৌশিক দ্বিতীয় কোন প্রশ্ন করল না।
ঠোঁট কামড়ে ধরে বলল,ইট’স ওকে।আমার কোন অভিযোগ নেই।তুমি রেনডম বয় জেনেও আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম।সেটা হয়তো আমার ভুল ছিল।তবে আমার একটাই অনুরোধ-তুমি অহনকে কষ্ট দিও না।
বাপ্পি কৌশিকের দিকে অদ্ভুদ দৃষ্টিতে তাকাল,ভালোবেসেছিলে মানে?এখন ভালোবাসো না?
কৌশিক অন্য দিকে তাকাল।তার চোখ ছলছল করছে।বলল,হয়তো বা,হয়তো বা না।তোমার জেনে কি হবে বলো?
বাপ্পি যেন কৈফিয়ত দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল,আসলে কৌশিক-অহনের প্রতি ট্রুলি ফিলিংসটা এসে গেছে।কি করবো বলো?এজন্য অনেস্টলিই স্বীকার করলাম।তোমাকে মিথ্যা ভালোবাসায় বেঁধে রাখলে পরে কষ্টটা তুমিই পেতে।আমাকে ক্ষমা করে দিও,প্লিজ।
কৌশিক হাসি মুখে বলল,ধুর,কি সব বলো।শেষমেশ তুমি যে কাউকে সত্যিকারের ভালোবাসতে পেরেছ এটাতেই আমি অনেক খুশি হয়েছি।বিশ্বাস করো।
কৌশিক বাঁ হাতের বৃদ্ধ-তর্জনী আঙ্গুলদ্বয় দ্বারা হালকাভাবে গলা ধরল,আই ছয়ার।আমি সত্য বলছি।
বাপ্পি হেসে দিল,আই নো।ইউ ওয়ার দ্যা বেস্ট ফর মি।বাট কি যে হয়ে গেল..!
কৌশিক ক্ষীণ স্বরে বলল,ছাড়ো তো এসব।এখন থেকে আমরা বেস্টু হয়ে তো থাকতে পারব?আই মিন-বেস্ট ফ্রেন্ড?
বাপ্পি মাথা নাড়াল,শিওর।হোয়াই নট?
কৌশিক সজল চোখে আবদার করল,ক্যান আই হাগ ইউ ওয়ান টাইম?
বাপ্পি মধুর গলায় হেসে বলল,আই অ্যাম শিওর,নট লাস্ট ওয়ান!
কৌশিক ‘হুট’ টাইপের একটা শব্দ করল,নট শিওর!বাট উই আর বেস্ট ফ্রেন্ড নাউ।কি তোমার কোন সমস্যা নাই তো?নাকি অহনের ভয় পাচ্ছ?
বাপ্পি চোখ বন্ধ করে দু’দিকে মাথা নাড়াল।তারপর একবারের জন্য কৌশিককে জড়িয়ে ধরল।কৌশিক নিঃশব্দে ঠুকরে কেঁদে উঠল।গলার কাছে আসা শব্দ খুব কৌশলে আটকাল।যেটা কেবল সে ই একমাত্র ভালো জানে।ভালোবাসলেই যে তাকে পেতে হবে-এমন তো কোন লিখিত নিয়ম নেই।নেই রাষ্ট্রঘোষিত আইন।যাকে ভালোবাসলাম তার ভালোমন্দের দায়-তাকে ভালো রাখার দায় তো আমাদের উপরই বর্তায়।আমরা কেবল চাই-আমাদের ভালোবাসার সকল মানুষগুলো ভালো থাকুক।সেটা কাছে কিংবা দূরে থাকার দূরত্বের উপর নির্ভর নয়।তবে আমরা কেবল বুঝতে পারলাম-এখানে একটা সত্যিকারের ভালোবাসা হেরে গেল।

বাপ্পির দু’চোখ বেয়ে পানি পড়ছিল সেদিনের কথাগুলো মনে পড়াই।সেদিনের পর থেকে কৌশিক-বাপ্পির আর কোন রাতের গল্প হয় নি।তারপর থেকে সে সঞ্জুর সঙ্গে বেড শেয়ার করত।অহনের ভালোবাসাটা তখন মুখ্য ছিলো বলে বাপ্পিও কোনদিন আর অন্য কারোর সঙ্গে শরীর মেলায় নি।আজ কোথায়!কেমন আছে?কৌশিক।বাপ্পির শরীরের গন্ধ কি কৌশিকের মস্তিষ্কের ন্যাসাল মেমব্রেন মনে রেখেছে?চারটা বছর হয়ে গেল তার খোঁজ বাপ্পি জানে না।মেডিকেল কলেজ শেষ সময়টাইতে তাদের সেই যে শেষবার দেখা।

আজ বর্ণের রুমে ঘুমন্ত অহনের দিকে নতুন করে তাকাল বাপ্পি।সত্যিই এই ছেলেটাকে সে প্রচন্ড রকম ভালোবাসে।কোনদিন ছাড়তে মন চাইবে না।একজন বাইসেক্সুয়াল হয়েও বাপ্পি শুধুমাত্র বুঝেছে ভালোবাসার কোন গন্ডি হয় না।কোন প্রকার সেক্সুয়াল অ্যাটিটিউড মানে না।সে ঘুমন্ত অহনকে জড়িয়ে ধরল।
অহন নড়েচড়ে উঠল,কি হলো ডাক্তার বাবু,এখনো ঘুমাও নি?
রুমে ড্রিমলাইটের মতো কিছু একটার হালকা আলো আঁধারী।শুনশান।নিস্তব্ধ পরিবেশ।
বাপ্পি অহনকে আরো গভীরভাবে জড়িয়ে ধরে বলল,আমার জন্য তোমার উপর দিয়ে খুব স্ট্রেজ যাচ্ছে।না?
অহন ঘুম ঘুম চোখে বলল,উঁহু,রাত দুপুরে এসব কেন বলছ?ঘুমাও তো।
বাপ্পি প্রশ্বাসের গরম নিঃশ্বাস অহনের ঘাড়ে ফেলল,একটু আদর করি?
অহন আপত্তি করল,এই না।এখন না।এই ঠান্ডায় আমি গোসল করতে পারবো না।
বাপ্পি মেনে নিল,ওকে।কিন্তু জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে তো আপত্তি নেই?নাকি সেটাও চলবে না।
অহন পাশ ফিরে বাপ্পির মুখোমুখি হলো,বলেছি আপত্তি!এতগুলো রাত পার হলো।কোন রাতে আমাকে না জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়েছ-মনে পড়ে?
বাপ্পি কম্বলটা দু’জনের পা হতে মাথা অবধি টেনে নিল।
অহন ছটফট করল,আরে দম বন্ধ হয়ে যাবে।এখনো এত ঠান্ডা পড়ে নি।কম্বল ফেল তো।
বাপ্পি বলল,তোমার ডাক্তার বাবু সঙ্গে আছে তো।দম বন্ধ হলে আমি দম ফিরে দেবো।

ওয়াশরুম থেকে ফিরে স্বার্থ রুমের লাইট অফ করে দিল।বর্ণ শুয়ে কি একটা বই পড়ছিল।
লাফিয়ে উঠল,লাইট অফ করলেন কেন?ভয় লাগে তো।
স্বার্থ বিছানায় উঠে বর্ণকে জড়িয়ে ধরল,এই তো তোমার স্বার্থ ভাইয়া চলে এসেছে।কোয়ি ডার নেহি।
বর্ণ হাতড়ে বেড সুইচ অন করল।বলল,কোন স্বার্থ ভাইয়া টাইয়াই কাজ হবে না।আমি ঘুমালে অফ করবেন।
স্বার্থ কটাক্ষ রাগ দেখিয়ে বালিশ নিয়ে পালঙ্কের সাইডে রুমের দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসল,ওকে।আমাকে লাগে না তো?মনে থাকে যেন।
বর্ণ বই রেখে ধীরে ধীরে স্বার্থের কোলের ভিতর গিয়ে বসল।
স্বার্থ মুচকি হেসে বলল,জানো তো আমার একটা পোষা বিড়াল আছে।ওম নিতে সে এখন আমার কোলে এসে বসেছে।
বর্ণ আস্তে করে স্বার্থকে চিমটি দিল।
স্বার্থ ‘আউচ’ শব্দ করল,বিড়াল দেখি আঁচড়ও কাটে।
বর্ণ স্বার্থের হাত দু’টো টেনে এনে নিজের নাভির কাছে রাখল।
স্বার্থ বর্ণের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,কি করতে হবে রাজামশাই?
বর্ণ দু’দিকে মাথা নাড়াল,কিছু করতে হবে না।
স্বার্থ বর্ণের ডান কাঁধে থুতনি রাখল,আদর চাই?কতটুকু দেবো?
বর্ণ ‘উফ’ বলে কাঁধ ঝাড়াল,দাড়ি লাগে তো।
স্বার্থ সোজা হয়ে বসে বলল,ওকে।কাল থেকে রোজ ক্লিন শেভ হবো।হ্যাপি?
বর্ণ স্বার্থের কোলে শুয়ে পড়ল,এই না।মজা করছি তো।তোমাকে ট্রিম করা দাড়িতে সুন্দর লাগে।
স্বার্থ নিচু হয়ে বলল,এই যে ‘আপনি-তুমি’ ঘুম এসে গেল?
বর্ণ হ্যাঁসূচক মাথা ঝাঁকাল।
স্বার্থ অভিমানের সুরে বলল,আমাকে রেখেই।আর আমি কি বালিশ?
বর্ণ চোখ বুজে মুচকি হাসল।
মোবাইল বাজছিল।রসুলপুরের বড়বাড়ি থেকে কল এসেছে।
স্বার্থ বেড লাগোয়া টেবিল থেকে মোবাইল নিয়ে দেখে বলল,তীর্থ কল করেছে।কথা বলবে?
বর্ণ মাথা নাড়াল,না।তীর্থ ভাইয়ার সঙ্গে আমার আড়ি।
স্বার্থ বর্ণের গাল টানল,সে তোমার বর্তমান দুলাভাই।বুঝলে বেয়াইসাব।বেশি রাগ দেখালে তোমাকে আর তোমার বোনকে রাখবো না-আমরা দু’ভাই।
বর্ণ হেসে স্বার্থের কোলে গুটিসুটি হয়ে মুখে গুঁজে দিল।
স্বার্থ কল রিসিভ করে বলল,হ্যাঁ,তীর্থ।বল।
তীর্থ অভিযোগ করল,কি করিস দু’টোতে?কল রিসিভ করতে এতো সময় লাগে?
স্বার্থ বলল,আর বলিস না।তুই তো লক্ষ্মীমন্ত বউ পেয়েছিস।তোর শালাটা মানে আমারটা এতো লক্ষ্মীমন্ত না রে।বদের হাড্ডি।
বর্ণ স্বার্থের পায়ে চিমটি দিল।স্বার্থ আগের মতো শব্দ করল।তীর্থ জানতে চাইল,কি হলো রে।
স্বার্থ হাসি মুখে বলল,পিঁপড়ায় কামড়েছে।
তীর্থও হাসল,ছোট পিঁপড়া নাকি বড় পিঁপড়া?
স্বার্থ বর্ণের হাত দু’টো চেপে ধরে বলল,বুড়ো পিঁপড়া।
বর্ণ চিমটি দেওয়ার জন্য হাত ছুটাতে চাইল।স্বার্থ আরো জোরে চেপে ধরল।
তীর্থ বলল,দু’টোতে ফাজলামো পরে করিস।শোন,একটা ইম্পরট্যান্ট কথা আছে।
স্বার্থ বর্ণের হাত ধরে রেখেই বলল,কি ইম্পরট্যান্ট কথা।বল!
বর্ণ জোর খাটানো বন্ধ করে দিল।স্বার্থের মুখের দিকে তাকাল।
তীর্থ আতঙ্কিত গলায় বলল,শরীফ ভাইয়া ফোন করেছিল।বলল হৃদয়কে এলাকায় খুঁজে পাওয়া যাছে না।আব্বাজান খুব টেনশনে আছে।
স্বার্থ কান থেকে ফোন নামিয়ে বর্ণকে জানাল,তীর্থ বলছে-শরীফ ভাইয়া ফোন করেছিল।হৃদয় যে তোমাদের এলাকাতে নেই।সেটা নিয়ে সবাই টেনশনে।
বর্ণ উঠে সোজা হয়ে স্বার্থের বুকের সাথে মাথা ঠেকিয়ে ঠেলান দিয়ে বসল।তারপর স্বার্থের থেকে মোবাইল নিল।স্বার্থ পিছন থেকে বর্ণকে জড়িয়ে ধরে দু’হাত দিয়ে আবদ্ধ করল।
বর্ণ নিশ্চিন্ত গলায় বলল,তীর্থ ভাইয়া,হৃদয় ভাইয়াকে নিয়ে কোন টেনশন নেই।আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি।উনি কোনদিন কারোর ক্ষতি করবে না।তোমরা এটা নিয়ে চিন্তা করো না।আমি কথা দিলাম তো।
তীর্থ দ্বিধান্বিত হয়ে প্রশ্ন করল,তুই এত নিশ্চিন্ত কিভাবে?হৃদয় কই আছে-তুই জানিস?
বর্ণ আশ্বস্ত করল,হৃদয় ভাইয়া যেখানে থাকে-থাকুক।হৃদয় ভাইয়া যে কারোর কোন ক্ষতি করবে না,এটা আমার থেকে বরং তোমার বউ বেটার জানে।বিয়ের দিন রাতে হৃদয় ভাইয়াকে অনু আপু কেন ফোন করেছিল জেনে নিও।আপু কিছু একটা গোপন করেছে।যেটা হৃদয় ভাইয়া কিংবা আপু আমাকে কোনদিন বলে নি।আপু আপনার স্ত্রী।এখন নিশ্চয় আপনাকে বলবে-সবটা।
তীর্থ বিস্ময়াভিভূত হল।শীতল গলায় জানতে চাইল,তুই কি অনুর উপর কোন কারনে রেগে আছিস?
বর্ণ ‘নাহ’ বলে কলটা কেটে দেওয়ার আগে কোমল স্বরে বলল,হৃদয় ভাইয়া,কোনদিন পৃথিবীর কারোর এতটুকু ক্ষতির কারন হবে না।মিলিয়ে নিও।
বর্ণ কল কেটে দিলে স্বার্থ বলল,বাহ,তুমি তো দেখি তোমার হৃদয় ভাইয়ার উপর পিএইচডি করে ফেলেছো!
বর্ণ বেড লাগোয়া টেবিলে মোবাইল রাখল,বিদ্রুপ করলেন?
স্বার্থ বলল,আরে না।এমনি বললাম।আমার পাখিটা অন্যের ব্যাপারে এতো বেশি জানে।আমার একটু হিংসা হয়-এই আর কি।
স্বার্থ মুচকি হাসল।বর্ণ ঘুরে স্বার্থের গলা জড়িয়ে ধরে তার গলার কালো তিলটাতে একটা ছোট্ট চুমু দিয়ে বলল,ভয় নেই।হৃদয় ভাইয়া হয়তো আমাদের মতো না।যদি হতো আমাকে নিশ্চয় এতদিন কিছু একটা বলতো।
স্বার্থ রহস্যকন্ঠে প্রশ্ন করল,তুমি কিভাবে শিওর যে হৃদয় ভাই এমন না!
বর্ণ যুক্তি দিল,এমন হলে আপুকে ভালোবাসতো?আর অহনদের কথা বলছো?হৃদয় ভাইয়া অনেকগুলো বছর মির্জাবাড়িতে অনেক ভালোবাসা পেয়েছে।তাই হয়তো অহনকে ভাইয়ের মতো জেনেছে বলে অহনের ভালোবাসাকে অসম্মান করে নি!
স্বার্থ বর্ণকে বালিশে শুইয়ে দিয়ে বলল,কি জানি।হয়তো।তবে ছেলেটা অনেক ভালো।আমারও মনে হয় অনু বা আমাদের কোন ক্ষতি করবে না।
স্বার্থ নিজের বালিশটা নিয়ে বর্ণের পাশে শুইয়ে বলল,এবার লাইট অফ করি?
বর্ণ মুখোমুখি শুয়ে স্বার্থের নাকে নাক ঘষল।দুষ্টুমির হাসি দিল,আচ্ছা বেয়াইসাব।ওহ স্যরি,স্বার্থ ভাইয়া।
স্বার্থ বেডসুইচ অফ করে বর্ণকে জড়িয়ে ধরল,সারাজীবন ভাইয়া ভাইয়াই করে যেয়ে।ফাজিল।
বর্ণ টুক করে স্বার্থের ঠোঁটে চুমু খেলো,বলবোই তো।আমার এটা বলতেই ভালো লাগে।
স্বার্থ বর্ণের গাল দু’টো ধরে বর্ণের নাকে নাক ঘষে বলল,তুমি আমাকে ছেড়ে কোনদিন চলে গেলে আমি পাগল হয়ে যাবো।
বর্ণ বলল,আমাকে কোনদিন হারাতে দিও না।আজীবন তোমার বুকে ধরে রেখো।
স্বার্থ আবেগভরে বলল,ভার্সিটিতে ছেলে বন্ধু কম করবে।একটা কি দু’টো।আমি আর মৌন-যেমন।আমি কিন্তু আমার বর্ণকে কারোর সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারবো না।একদম মরে যাবো।
কথাটা বর্ণের যেন কলিজায় গিয়ে ঠেকল।
সে স্বার্থের ঠোঁট চেপে ধরল,উল্টাপাল্টা কিসব বলেন।আমি কিন্তু উঠে যাবো।
স্বার্থ চেপে ধরল,স্যরি তো।
বর্ণ বলল,সৃজনটা থাকলে ভালোই হতো।ওকে তো আর আমার পাশে হিংসা করতে পারতে না।কিন্তু ফাজিলটা নীলাকে নিয়ে কই উড়াল দিলো যে।
স্বার্থ বর্ণকে বুকের সাথে চেপে ধরে বলল,হয়েছে বর্ণবাবু।এখন ঘুমাও।বেশি বকবক করলে বুদ্ধি কমে যায়।
স্বার্থ ধীরে ধীরে বর্ণের নাভির কাছে হাত নিল।বর্ণ অস্পষ্ট ‘উফ’ শব্দ করল,কি ঠান্ডা হাত।
স্বার্থ বর্ণের ঠোঁটে চুমু খেয়ে বলল,নাভিতে আদর করি?
বর্ণ ঠোঁট বাঁকালো অন্ধকারে।বলল,নাভিতে আপনার মুখ পড়লে আমি দিশাহারা হয়ে যায়।কেমন শরীর খারাপ করে।
স্বার্থ হাত উঠিয়ে পাশ ফিরে শুইল,আচ্ছা,করলাম না আদর।ঘুমাও আমার ‘আপনি-তুমি’ বেয়াইসাব।
বর্ণ স্বার্থের প্রশস্ত পিঠ জড়িয়ে ধরল।তার আপন হাতের-নরম ছোঁয়ায়।

বাইশ।

সকালে সবার ঘুম ভাঙ্গার আগে হৃদয় উঠে সদর দরজা খুলে-নিচে এসে দাঁড়াল।

হোসেন ভাই নামাজের জন্য ওযু করছে।গড়গড় শব্দ করে কুলির পানি ফেলছে।
ওযু শেষে হৃদয়কে দেখে বলল,আপনি ক’তলায় আসছেন ভাই?
হৃদয় জবাব দিল,তৃতীয়তলা।
হোসেন ভাই গামছা দিয়ে মুখ মুছল,আমাদের স্বার্থ ভাইয়ের মেহমান আপনি?স্বার্থ ভাই কি হয় আপনার?
হৃদয় জবাব দিল না।বলল,গেটটা একটু খোলা যাবে?কিছুক্ষণ হেটে আসতাম।
হোসেন ভাই দ্রুত গেট খুলল।বলল,যান ভাই।আমি নামাজটা শেষ করি।
হৃদয় গেটের বাইরে এসে দাঁড়াল।একবার ‘অগত্যা ম্যানশন’এর তৃতীয় তলার দিকে তাকাল।
হোসেন ভাই প্রশ্ন করল,ভাইয়ের কি মন খারাপ?
হৃদয় একটা শুকনো হাসি দিল,না ভাই।
হোসেন ভাই জানতে চাইল,ভাই কি প্রথম শহরে এলেন?
হৃদয় ‘হুঁ’ বলে মাথা নাড়াল,প্রথমই ধরা যায়।তাই তো এদিকওদিক তাকিয়ে রঙের শহর দেখছি।
কথাটা একেবারে সত্য বা মিথ্যা নয়।পার্টির কাজে আগেও কয়েকবার হৃদয় ঢাকায় এসেছে।তবে নীলক্ষেতে এই প্রথম।
হোসেন ভাই গেট বন্ধ করে দিল।হৃদয় ‘রাহমান ফার্মেসি’ বায়ে ফেলে কয়েক মিনিট হেটে নীলক্ষেতের বড় রাস্তায় উঠল।হালকা কুয়াশা।ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো এখনো চলছে।এত ভোরবেলাতেও গাড়িঘোড়ার বহর কম না।মাঝে মধ্যে দু’একটা চা-বিড়ির খোলা দোকান চোখে পড়ছে।অনেকে খুলছে।ফুটপাতে ছন্নছাড়া মানুষগুলো শুয়ে আছে।নিশ্চিন্তে।যেন আত্মনিমগ্ন।হৃদয়ের আজ খুব সিগারেট খেতে মন চাচ্ছে।বর্ণকে কথা দেওয়ার পর সে আর কোনদিন নিকোটিনের ধোয়ায় কষ্টগুলো পোড়ায় নি।বুকের মাঝে কেমন একটা আশা-বাসা বেঁধেছিল।যেখানে ভিত্তি ছিলো ভালোবাসা।কিন্তু…!
শহরের কাকগুলো ভোরবেলা জেগে গেছে।বৈদ্যুতিক খুঁটিতে বসে দল বেধে মনের সুখে ডাকাডাকি করছে।হৃদয় সেদিকে একবার তাকাল।পরক্ষণে হাত দু’টো জিন্সপ্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে হাটায় জোর আনলো।

তার চোখের সামনে ভেসে উঠল-সেদিন বিকেলে ‘মধু টি স্টল’ এর পিছনের দাঁড়িয়ে অনুর সঙ্গে কিছু কথা।যে কথা আজও সবার আড়ালে পড়ে আছে।এমনি কি বর্ণও জানে না সে কথা।অথচ ছেলেটা কত কৌতূহল নিয়ে বসে ছিলো কথাটা জানার আশায়।হৃদয় কেন তাকে কথাটা কোনদিন বলতে পারলো না।

বোরখা পরে অনু এসে যখন দাঁড়াল।তখন হৃদয় মাথা নিচু করে নিল।অনু বলল,কি বলবেন বলুন।
হৃদয় অনেকক্ষণ সময় নিল।তারপর বলল,আপনাকে আমি কোনদিন দেখি নি।কোনদিন দেখবো-সে আশাও রাখি না।বর্ণের সঙ্গে যে মজাগুলো করি।সেটা নিতান্ত মজাই।
অনু বলল,বর্ণ ছোট।ও তো এগুলো সত্যি ভেবে নিয়েছে।আপনি এসব কেন করেন-আমি জানি না।তবে মানুষের ইমোশন নিয়ে খেলা ঠিক নয়।
হৃদয় বিস্তারিত বলল,আসলে আপনাকে বিয়ে করতে চাওয়ার একমাত্র কারন আমার বাবা।আব্বু অনেক টাকা খরচ করে নির্বাচনে শরীফ ভাইয়ার কাছে হেরে যাওয়ার পর-ওনার মাথার ঠিক নেই।তিনি চান আমি আপনাকে বিয়ে করে আমাদের পরিবারে আনি।যেন শরীফ ভাইয়াকে দুর্বল করে আব্বু আবার আরশিনগরের চেয়ারম্যান হতে পারেন।
অনু কঠিন গলায় প্রশ্ন করল,আপনিও কি তাই চান?
হৃদয় হতভম্ব হয়ে তাকাল।পরক্ষণে নিজেকে সামলে বলল,আমি যদি মন থেকে সেটা চাইতাম,তাহলে কি আপনাকে সবকিছু বলে দিতাম?
অনু বলল,আচ্ছা একটা কথা বলি?
হৃদয় নড়েচড়ে দাঁড়াল,হুঁ,বলুন।
অনু এদিকওদিক তাকাল,আপনি কি আমাকে ভালোবাসেন?
হৃদয় উল্টে প্রশ্ন করল,সত্য বলবো নাকি মিথ্যা বলবো?
অনু অবাক হল,মিথ্যা কেন বলবেন।অবশ্যই যেটা সত্য-সেটা বলবেন।
হৃদয় কোনপ্রকার জড়তা ছাড়া বলল,না।বাসি না।
অনু বিড়বিড় করে বলল,বাঁচা গেল।
হৃদয় জানতে চাইল,কিছু বললেন?
অনু চোখ বন্ধ করল,উঁহু,না।কিছু বলি নি।
হৃদয় বিনয়ী কন্ঠে বলল,আমি চাই নি আপনার কোন ক্ষতি হোক।সন্তান হয়ে আমি আমার বাবার অবশ্যই ভালো চাই।তবে সেটা সৎ পথে।এজন্য আপনাকে সবটা বলে দিলাম।আমি চাই না কাউকে ঠকাতে।কিংবা নিজে ঠকতে।অনু হিসাবে হয়তো আপনাকে আমি ভালোবাসি না।কিন্তু বর্ণের বোন হিসাবে অবশ্যই ভালোবাসি।বর্ণ খুব ভালো একটা ছেলে।
অনু বলল,বুঝলাম।আপনার কথা শেষ হলে আমি যাই?
অনু হাটা দিতে গেলে হৃদয় দম বন্ধ করে বলল,প্লিজ,আরেকটা কথা।আমার জন্য ব্যাপারটা খুব জরুরি।
অনু দাঁড়িয়ে গেল।বলল,জ্বি বলুন।
হৃদয় একদমে বলল,আমি বর্ণকে ভালোবাসি।
অনু বলল,হুঁ,সে তো বললেনই।
হৃদয় উশখুশ করছিল।বলল,আমি বর্ণকে প্রেমিকের মতো ভালোবাসি।
অনুর চোখ জ্বালা করে উঠল,মানে?কি বলতে চান।
হৃদয় সাহস করে তাকাল।বোরখা পরা মেয়েটার রাগী চোখ তাকে বিদ্ধ করছিল।সে বলল,বর্ণকে আমি আমার করে পেতে চাই।খুব ভালোবাসি ওকে,প্লিজ।
অনু আচমকা হৃদয়ের গালে চড় বসিয়ে দিল,বদমাইশ।আমার ভাই গে নাকি?আন্না জানলে তোকে মেরে ফেলবে।এখন বুঝেছি তোর মা কেন মরছে?সৎমা,পরিবার কেন তোকে ভালোবাসে না।ছিঃ।
হৃদয় অনেকটা সময় সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলো।’এখন বুঝেছি তোর মা কেন মরছে’ এই কথাটা তার বুকে প্রবল ধাক্কা দিয়েছে।বাকি কথাগুলো তার গায়ে লাগে নি।সত্যি কি একটা ছেলে হয়ে আরেকটা ছেলেকে ভালোবাসা এতোটাই ঘৃণার বিষয়?কই অহন যেদিন বাপ্পিকে ভালোবেসেছিল-সেদিন তো সে অহনকে ঘৃণা করতে পারে নি?অহন তার ভালোবাসা বুঝতে পারে নি।সে কোনদিন মুখ ফুটে বলতও পারি নি।ভয়ে।সইমার আত্মসম্মান-ভালোবাসাকে সে তুচ্ছ করতে পারে নি।অহনকেও বলতে পারে নি-অবৈধ ভালোবাসা তুমি বাপ্পিকে বেসো না।

একটা গাড়ির হর্ণে হৃদয় রাস্তা থেকে প্রায় ছিটকে পাশে দাঁড়াল।ড্রাইভার গালিগালাজ করতে করতে গেল,শালা মাতাল নাকি।কোথা থেকে সব মরতে আসে।

নীলক্ষেতের বইয়ের দোকানগুলো এখনো খোলে নি।বিভিন্ন প্রকাশনীর-বিভিন্ন ব্যানার সেখানে।একটা ব্যানারে লেখা-বর্ণ একাডেমী।হৃদয় একটু থামলো।তারপর মুচকি হেসে আবার হাটা দিল।শরীরটা কেমন খারাপ করছে তার।চিন্তা হলো এত সকালে শরীয়তপুরের বাস পাবে কি না।কে জানে!
আরশিনগর বড় বাজার অবধি যেতে পারলে হয়।ফিরে গিয়ে সে একবার মির্জাবাড়ি যাবে।সইমাকে প্রায় পাঁচটা বছর দেখে না।বড্ড ইচ্ছা করছে সইমার কোলে মাথা রেখে ঘুমাতে।তার তিথি বুবুকে না বলা একটা কথা বলতে-বুক যেন তৃষ্ণায় ফেটে যাচ্ছে।তিথি বুবু তো মির্জাবাড়িতে আছে।সে যে তিথি বুবুকে বলতে চেয়েছিল-আমার কোন মেয়ের প্রতি অনুভূতি-ভালোলাগা কাজ করে না।তুমি বলতে পারো বুবু?এটা কেমন অসুখ।যে অসুখে কোন সুখ নেই।স্বস্তি নেই।আমি যে মির্জাবাড়ির ছোট ছেলেকে ভালোবাসি।আমার রাজপুত্র-অহনকে ভালোবাসি।কিসব ভাবছে সে।অহন-না!সে তো অতীত।সময়ের ব্যবধানে।জীবনের ঘুরপাকে।অহনকে তো সে প্রায় ভুলে গেছিলো।সে কোনদিন ভাবতে পারি নি।অহন আবার তার সামনে দাঁড়াবে!তাও তার নিজের ভালোবাসা বাঁচাতে।অহন চিরকাল ভাই হয়ে থাকুক তার।তার রাজপুত্র ভাই।সইমার একমাত্র সন্তান।
কিন্তু-বর্ণ।সেও তো কোনদিন হৃদয়ের ভালোবাসাটা বুঝতে চেষ্টা করলো না।তুচ্ছ মজার আড়ালে এত বড় ভালোবাসার গল্প-কি সে একটা মুহূর্তের জন্য বুঝতে পারে নি?অবশ্য বর্ণের বা কি দোষ!সে তো কোনদিন মুখ ফুটে বলে নি।ভয়ংকর সত্যটা অনুকে বলে-তার ধাক্কা সামলাতে তার অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে।বর্ণ ঢাকায় আসার দিন শরীফের ভয়ে সে বর্ণের কাছে আসতে পারি নি।হয়তো সেদিন প্রথম এবং শেষবার বলে দিত-‘বর্ণ,আমি তোমাকে ভালোবাসি।খুব খুব ভালোবাসি।পারবে না,মা মরা এই ছেলেটাকে ভালোবাসতে?ভালোবেসে সকল না পাওয়াগুলো পাইয়ে দিতে।’বললে হয়তো বর্ণ তার জন্য অপেক্ষা করতো।কোনদিন কি আর বলা হয়ে উঠবে এই কথাগুলো।হয়তো কোনদিনও না।

হৃদয় ভাবল,একমাত্র মর্জিনাই হয়তো আমাকে গভীরভাবে ভালোবেসেছিল।আমার মতো একটা মিসকিনের জন্য-এতিম মর্জিনায় ঠিক ছিল।কিন্তু আমি যে সমাজে আর দশটা ছেলের মতো না।রহিমকে সে যে-পেল।বড় ভালো-পেল।রহিম চিরকাল মর্জিনাকে মাথায় করে রাখবে।
অনু পরে আরেকদিন যে স্যরি বলতে আসলো।সেদিন অনু বলেছিল,আপনি বর্ণকে ভালোবাসেন।আমি অসম্মান করছি না।সেদিনের ব্যবহারের জন্য আমি-দুঃখিত।কিন্তু আমার ঐ একটা মাত্র আদরের ভাই।আন্না,ভাবী খুব কষ্ট করে বড় করেছে।আন্না কোনদিন এটা মেনে নিবে না।
হৃদয় বলল,আপনার আন্না কোনদিন জানবে না,কথা দিলাম।
অনু বলল,আমাকে আরেকটা কথা দিতে হবে।
হৃদয় সরল মনে প্রশ্ন করল,কি?
অনু হাত জোড় করে বলল,আপনি বর্ণকে কোনদিনও বলবেন না যে-আপনি তাকে সমাজের আর দশটা ভালোবাসার মতো ভালোবাসেন না।আপনি নিজের মতো করে ভালোবাসেন।ও তো ছোট।আপনাকে ভাই কিংবা বন্ধু হিসাবে খুব ভালোবাসে।যদি জানে যে আপনার মনোভাব এমন।তবে ও হয়তো একদিন আপনার দিকে ঘুরে দাঁড়াবে।হয়তো তারপর একদিন আন্না জানবে।সেদিন আন্না ওকে বাঁচিয়ে রাখবে না।
হৃদয় নির্বাক হয়ে শুনলো।তারপর কথা বলা পুতুলের মতো যেন মুখস্ত বুলি ছুটল,ওকে বলবো না কোনদিন।কথা দিলাম।
অনুকে তার সাথে কথা বলতে দেখেই-একদিন তাকে শরীফ চেয়ারম্যান লোক দিয়ে মেরেছিল।আজও তার দাগ হৃদয়ের কলিজায় ঘা হয়ে যেন অবিরাম পঁচে যাচ্ছে।
অনু বিয়ের রাতে যখন ফোন করে জানাল,হৃদয় ভাইয়া,আমি যাকে ভালোবাসতাম।তাকে আমি আমার করে পেয়েছি।আমার-তীর্থ ভাইয়াকে।হয়তো আপনার জন্য।আপনি খুব ভালো একটা ছেলে।
হৃদয় বলল,আমার জন্য কেন হবে?কাউকে সত্যিকারের ভালোবাসলে সৃষ্টিকর্তা তাকে তার জন্য মিলিয়ে দেন।
অনু দ্বিধাভরে প্রশ্ন করল,সত্যি কি তাই?
হৃদয় এড়িয়ে গেল,একটা কথা বলবেন?
অনু বলল,জ্বি বলুন।
হৃদয় প্রায় অনুরোধ করে বলল,বর্ণ ঢাকার কই থাকে-একটু বলবেন।আমি শুধু একদিন একটা নজর ওকে দেখে আসবো।
অনু হয়তো ভরসা পেয়েছিল তার কথায়।বিশ্বাস করেছিল।অনুর ফোন রাখতে রাখতে বলেছিল,আমি মেসেজে পাঠিয়ে দেবো।

হৃদয়ের ফোনে মেসেজ এলো।

সে এবারও রাস্তার মাঝে চলে এসেছে।পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখল অফিসের মেসেজ।তারপর হঠাৎ তার মনে হলো বশিরকে একটা কল করলে কেমন হয়।
একবার রিং বাজতেই বশির কল রিসিভ করল,ওস্তাদ,তুমি কই?
হৃদয় বলল,কি’রে এতো সকালে জেগে গেছিস?
বশির সে কথার জবাব না দিয়ে বলল,তুমি বলো তুমি কই আছো।কাউকে কিছু না বলে চলে গেছো।আমরা সবাই টেনশনে।
হৃদয় ক্ষীণ কন্ঠে বলল,ঢাকাতে আছি।একটু এসে আমাকে নিয়ে যেতে পারবি?
বশির তড়িঘড়ি করে জানাল,আমি এখনি গাড়িতে উঠছি,ওস্তাদ।
হৃদয় হাসল,আরে পাগল।এমনি বললাম।আমি কাজে এসেছিলাম ঢাকাতে।এখন ফিরছি।
বশির বলল,আমি কিন্তু আসতে পারতাম।তোমার শরীর ঠিক আছে?
হৃদয় বলল,হুঁ,আচ্ছা বশির-আমার কিছু হয়ে গেলে তুই উদয় আর আব্বুকে দেখে রাখতে পারবি না?
বশির কাঁদোকাঁদো কন্ঠে অভিযোগ তুলল,এসব কি বলো,ওস্তাদ?তুমি না থাকলে আমার কি হবে?আমিও যে তোমার মতো এতিম।তুমি তো জানো-একমাত্র আশ্রয় আমার নানীও মারা গেল।তুমি আমার ভাই,আমার সব।
হৃদয় কোমল গলায় বলল,ধুর পাগল।এমনি বললাম।আমার কিচ্ছু হবে না।তবে আমি না ফেরা পর্যন্ত তুই উদয় আর আব্বুকে দেখে রাখবি।বুঝলি?
বশির চোখ মুছল,রাখবো।কিন্তু-তুমি না আসলে চলবে?তোমার মতো এতো ভালো ছেলে আমরা কোথায় পাবো,ওস্তাদ।তোমাকে বড় প্রয়োজন সবার।
হৃদয় ধরা গলায় বলল,কে বলেছে তোকে আমি ভালো!ঠিকানাবিহীন।আপনহারা।পরহীন একটা ছেলে কখনো ভালো হয়?নাকি হতে আছে?
বশির জানতে চাইল,তুমি এখন কই?গাড়িঘোড়ার আওয়াজ যে।
হৃদয় আবার রাস্তার মাঝে চলে এসেছে।এখন খেয়াল বড় কম তার।যেন নিজের রাজ্যে আত্মভোলা হয়ে হেটেছে চিরমুক্তির পথে।
বশিরকে জানাল,নীলক্ষেত।
বশির বলল,তুমি মোবাইল রেখে দেখেশুনে চলো,ওস্তাদ।
জীবনের দীর্ঘ একটা সময় পর আজ হৃদয়ের শুকনো দু’টি চোখে জল এলো।দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ার অপেক্ষায়।
বশিরকে জবাব দেওয়ার আগেই হৃদয়ের কান থেকে ফোন ছিটকে রাস্তায় পড়ল।গোটা কতক মানুষের শোরগোলের অস্পষ্ট আওয়াজ-হৃদয়ের কানে ভেসে এলো।অপেক্ষারত সেই দু’ফোঁটা অশ্রু পৃথিবীর সকল সৌন্দর্যকে মলিন করে হৃদয়ের চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল।

কিছু গল্পের কখনো শেষ হয় না।আমাদের এই নগরে কিছু প্রেমিক-তার বুকের বাঁপাশে কখনো হিসাবযন্ত্র বসায় না।তারা লাভ-লোকসানের পাল্লাই কখনো ভালোবাসাকে ওজন করে না।পরিমাপ করে না।তারা কেবল বুকের বাঁপাশটাতে ভালোবাসার আরশি ছড়িয়ে রাখে।যেখানে হাজার রকমের ভালোবাসার পূর্ণ অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন ঘটে।তাদের হৃদয়ের আরশিনগরে আমাদের মতো লাভ-লোকসান হিসাবকারী স্বার্থপর মানুষদের যাতায়াত কি বড় অন্যায় নয়?

একজন স্টাফ এসে বলল,হাসপাতালের মর্গে একটা বেওয়ারিশ লাশ এসেছে।কেমন অদ্ভুদ।সারা মুখে যেন বড্ড অভিমান।অভিযোগ।পৃথিবীর প্রতি।
কৌশিক ফিরে তাকাল,কি ব্যাপার,ফরিদ চাচা।আজকাল খুব ফিলসফি মনোভাব চলছে!হুম?
ফরিদ চাচা বলল,ফিলসফি না।তুমি একটিবার দেখে এসো,ডাক্তার বাবা।ঠিক বুঝবে!
কৌশিক প্রশ্ন করল,লাশ নাম্বার কত,ফরিদ চাচা?
ফরিদ চাচা জানাল,টুয়েন্টি ওয়ান।

কৌশিক মর্গে ঢুকে লাশের মুখের রক্তাক্ত সাদা কাপড় ফেলে ক্ষীণ গলায় বলল,হৃদয়!

তার চোখের কোণে পাঁচ-ছয় বছর আগে মির্জাবাড়িতে ছুটে চলা-এক দুরন্ত ছেলের মুখ ভেসে উঠল।


।।অসমাপ্ত।।

সমপ্রেমের গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.