ব্লগার

সত্য ঘটনার আদলে রচিত গল্প
লেখকঃ-ফাহিম হাসান


৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭।
ইরফান হোসেন ফেসবুকে একটা ফেইক আইডি খুললেন। আইডির নাম দিলেন “অনুসন্ধিৎসু পথিক”। ফেইক আইডি খোলার এই আইডিয়া তিনি পেয়েছেন তাঁর বন্ধু আবিরের থেকে। আবির নাকি একটা সময় এরকম ফেইক আইডি চালাতো।
আবির তাঁকে বলেছে, “ওদের সম্পর্কে ভালো মতন জানার জন্য ফেইক আইডির চেয়ে ভালো কোনো উপায় হতেই পারে না। কারণ, ওদের বেশিরভাগই একসঙ্গে দুইটা আইডি চালায়। একটা নিজের ছবি-টবি সহ রিয়েল আইডি, আর অন্যটা নিজেকে সবার থেকে লুকিয়ে ফেইক আইডি। রিয়েল আইডিতে ওরা যা বলতে পারে না, ফেইক আইডিতে সেগুলা অবলীলায় বলে ফেলে। যেমন ধর, কারো কোনো ছেলেকে ভালো লাগলো। নিজে ছেলে হয়ে রিয়েল আইডিতে এসব ওরা বলতে পারে না, আমিও বলতে পারতাম না। এই সময় কাজে আসে ফেইক আইডি।”
যাহোক এরপর গুগল থেকে তিনি পুরুষ মডেলদের ছবি বাছাই করতে লাগলেন। অনেক বাছাই করে দেখতে অসম্ভব সুন্দর অথচ আউলা ঝাউলা টাইপ একজনের ছবি তিনি ডাউনলোড করলেন। সেই ছবি আইডিতে প্রোফাইল পিকচার হিসেবে দিলেন।
এই মুহূর্তে তিনি বসে আছেন বইমেলায়। এবারের বইমেলায় তাঁর লেখা তৃতীয় বই “বিজ্ঞান এবং ধর্মের আলোয় সমকামিতা” বের হয়েছে। প্রকাশকরা তাঁকে জানিয়েছেন বই ভালো বিক্রি হচ্ছে। তবে, অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে তাঁর বই নাকি অনেক বেশি ভীড়ের মধ্যে বিক্রি হয় না। মেলায় মানুষ যখন কম থাকে যেমন, দুপুরের দিকটায় তখন ক্রেতা আসে।
*
সেদিন বইমেলা থেকে তাঁর ধানমণ্ডির বাসায় আসতে আসতে রাত সাড়ে এগারোটা বেজে গেলো। তিনি যখন তাঁর ফেইক আইডিতে লগ ইন করলেন তখন রাত বাজে প্রায় দেড়টা। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, তাঁর আইডিতে এরই মধ্যে ১৩৬ টা ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট চলে এসেছে। তিনি সবগুলো ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট দেখতে লাগলেন। এসব কেমন নাম? বটম চাই, ললিপপ খাবো, বয়স্কদের ভালোবাসা চাই, ঢাকার টপ, আমি টাঙ্গাইলে তুমি কোথায়, বন্ধু হবে, কিউট পোলা, পোলা খোর রবিন ইত্যাদি। তাদের সিংহভাগেরই প্রোফাইল পিকচারে অর্ধনগ্ন ছেলেদের ছবি দেয়া।
তাদের ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট কি তিনি একসেপ্ট করবেন? তিনি বাছাই করতে লাগলেন। কয়েকজনের ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট একসেপ্ট করতে না করতেই “বটম চাই” তাঁকে মেসেজ দিলো, “From
Age
Roll”
তিনি ভেবে পেলেন না তাঁর রোল নম্বর নিয়ে ছেলেটা করবেটা কী। তিনি লিখলেন, “আমার বাসা ধানমণ্ডিতে। বয়স ২৮।”
বটম চাই রিপ্লাই দিল, “Roll?”
তিনি লিখলেন, “ভার্সিটির রোল নাকি স্কুলের? “
তাঁর রিপ্লাই পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গে ‘বটম চাই’ তাকে ব্লক করে দিলো৷ তিনি সামান্য অবাক হলেন। তিনি আরো কয়েকজনকে মেসেজে নক করলেন। কেউ রিপ্লাই দিলো না।
ততক্ষণে রাত আড়াইটা বেজে গেছে। তিনি লগ আউট করলেন।
*
১১/০২/২০১৭
দিনটা তাঁর অসম্ভব ব্যস্ত কেটেছে। সকালে অফিসে যাওয়ার আগে দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিক এসে হাজির। তাঁর নতুন বই নিয়ে তারা নাকি পত্রিকায় লেখালেখি করবে। তাঁকে ইন্টারভিউ দিতে হলো।
অফিস শেষে তিনি সোজা চলে গেলেন বইমেলায়। মানুষে গমগম করছে চারদিক। নিজের অজান্তেই তাঁর আনন্দ লাগতে শুরু করলো।
বাসায় ফিরে তিনি ফেইক আইডিতে লগ ইন করলেন। সেই মুহূর্তে তাঁর ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট এর সংখ্যা ৩৪৬। ‘বয়স্কদের ভালোবাসা চাই’ আইডি থেকে মেসেজ আসলো, “Hi”
তিনি রিপ্লাই দিলেন, “হ্যালো!”
বয়স্কদের ভালোবাসা চাই রিপ্লাই দিলো, “kmn acn?”
বাংলা ভাষার এই দুর্দশা দেখে তাঁর মনটা খারাপ হয়ে গেল। তবুও তিনি লিখলেন, “ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?”
রিপ্লাই এলো, “vlo. Acca apnr size kto?”
তিনি লিখলেন, “সরি, কিসের সাইজ?”
উত্তর এলো, “kicu bujho na? Dudu khau?”
তিনি লিখলেন, “আসলে আমি আপনাদের নিয়ে আমার ব্লগে একটা লেখা লিখব। এই জন্যেই আইডিটা খুলেছি।”
বয়স্কদের ভালোবাসা চাই লিখলো, “sonen, majh rate vojor vojor korben na. Apnar kace kono top er numbr thakle dan ar na hoy foten.”
তিনি হতভম্ব। এরা এমন কেন? স্বাভাবিক কথাবার্তাও কি করতে পারে না?
তিনি আর উত্তর দিলেন না। “হুজুর টপ” নামের একটা আইডি থেকে তাঁকে একজন মেসেজ দিলো, “হ্যালো!”
তিনি লিখলেন, “কেমন আছেন?”
উত্তর এলো, “ভালো। তুমি কেমন আছ সোনা?”
অপরিচিত কাউকে ‘তুমি’ বলাটা যে অভদ্রতা, মানুষ কি এটাও ভুলে গেছে? সোনা-ই বা বলছে কেন?
ইরফান লিখলেন, “ভালো আছি। আচ্ছা, আপনি কি হুজুর? মানে মসজিদে নামাজ পড়ান?”
হুজুর টপ রিপ্লাই দিলো, “হ্যাঁ। কোনো সমস্যা?”
ইরফান লিখলেন, “আমাদের ধর্ম তো দুইজন ছেলের মধ্যকার এ ধরণের সম্পর্ক স্পষ্টভাবে সমর্থন করে না। তারপরেও আপনি এগুলো করছেন? তার উপরে আপনি মসজিদের ইমাম।”
হুজুর টপ লিখলো, “হ্যাঁ সোনা। ছেলেদের পছন্দ হলে কী করবো?”
এরপরই হুজুর টপ নিজের ছবি পাঠাতে লাগলো। খালি গায়ে দাঁড়ি অলা বিশেষত্বহীন চেহারা লোকটার। ছবি পাঠিয়েই হুজুর টপ মেসেজ দিলো, “আমাকে পছন্দ হয় সোনা? দেখা করবে আমার সাথে?”
ইরফানের বিরক্ত লাগতে শুরু করলো। তিনি লগ আউট করলেন।
*
পরদিন, বইমেলা থেকে ইরফান রিকশায় চড়ে রওনা দিয়েছেন। এমন সময় তাঁর ফোনে একটা কল এলো। নম্বরটা অপরিচিত। তিনি কল রিসিভ করে বললেন, “হ্যালো।”
ওপাশ থেকে হ্যালো জাতীয় ভদ্রতার মধ্যে না গিয়ে খড়খড়ে গলায় একজন বলতে লাগলো, “কী রে, ইরফান নাস্তিক! তোর কি পাখা বেশি বড়ো হয়ে গেছে? এসব কী বই বের করছিস তুই? শালা তুই বাংলাদেশে বসে সমকামী অধিকার নিয়ে কথা বলিস? হিজড়া শালা। তুই তো বেজন্মা রে..”
ইরফান বললেন, “দ্যাখেন, আপনি যেই হন না কেন আপনার সঙ্গে এসব কথা বলার আমার কোনো…”
তাঁকে থামিয়ে দিয়ে ওপাশ থেকে বললো, “শোন, তুই সাবধানে থাকবি। তোকে না আমার ছেলেরা আজকেও মেলায় চোখে চোখে রাখছিল। ইচ্ছা করলে তোর গলাটা আজকেই কেটে ফেলে রাখতে পারতাম। কিন্তু, করলাম না। জান বাঁচাইতে চাইলে বইটা বিক্রি করা বন্ধ কর বুঝলি?”
বলেই কল কেটে দিলো। কিছুটা সময় ইরফান স্তব্ধ হয়ে বসে থাকলেন। থানায় কি একটা সাধারণ জিডি করে রাখবেন? তিনি রিকশাচালককে রিকশা ধানমণ্ডি থানার দিকে ঘুরাতে বললেন।
*
চারদিন পরে ইরফান আবার ফেইক আইডিতে লগ ইন করলেন। আজকে শপথ করলেন- সুস্থ মস্তিষ্কের কারো সাথে অবশ্যই কথা বলবেন৷ ইতোমধ্যে ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট সংখ্যা ৪৭৮ হয়ে গেছে। অনেক খুঁজে তিনি ‘নীলাম্বর গগণ’ নামের একটা আইডিতে মেসেজ পাঠালেন, “হ্যালো!”
বেশ খানিকক্ষণ পর উত্তর এলো, “কেমন আছেন বলুন।”
তিনি লিখলেন, “ভালো। আপনি কেমন আছেন?”
উত্তর এলো, “ভালো।”
এরপর ইরফান নিজের আসল পরিচয় দিলেন। নীলাম্বর গগণ রিপ্লাই দিলো, “আপনি আসলেই ইরফান হোসেন তো? নাকি মশকরা করছেন?”
ইরফান তখন লিখলেন, “হ্যাঁ”।
তখন নীলাম্বর গগণ লিখলো, ” স্যার, আপনার ইন্টারভিউ সেদিনও পত্রিকায় পড়লাম। অসাধারণ বলেছেন। আপনার বইটা পড়ারও ইচ্ছা আছে।”
ইরফান লিখলেন, “ধন্যবাদ। আচ্ছা, আপনাকে একটা প্রশ্ন করি?
নীলাম্বর গগণ লিখল, “জ্বী, করে ফেলুন স্যার। তবে, আমাকে তুমি বললে বেশি খুশি হতাম।”
ইরফান লিখলেন, “ঠিক আছে। আচ্ছা, তুমি কি কখনও কোনো ছেলের সঙ্গে রিলেশনে গিয়েছ?”
নীলাম্বর গগণ লিখল, “জ্বী স্যার গিয়েছি।”
ইরফান লিখলেন, “আচ্ছা, তোমাদের কি রিলেশনে যাওয়ার ব্যাপারটা কমন?”
নীলাম্বর গগণ উত্তর দিলো, “হ্যাঁ, অনেকটাই কমন। আর আমরা যারা ঢাকায় থাকি, তাদের ক্ষেত্রে তো আরোও বেশি কমন।”
ইরফান প্রশ্ন করলেন, “তাহলে ঢাকার রাস্তায় বা রেস্টুরেন্টগুলায় তোমাদের দেখা যায় না কেন? আমি ঢাকায় কখনও দুইজন পূর্ণবয়স্ক ছেলেকে গভীর আবেগে হাত ধরে থাকতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না।”
নীলাম্বর গগণ লিখলো, “স্যার, আসলে আমরা যারা রিলেশনে থাকি- রিয়েল লাইফে তারা একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো আচরণ করি। আর তাছাড়াও, পাবলিক প্লেসে আমাদের প্রকাশ্যে হাত ধরাধরি করে চলাফেরায় অলিখিত নিষেধাজ্ঞা আছে। হয়তো এজন্যই দেখেন নি। এদেশে আসলে গোপন জীবনে সমকামী এমন মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি।”
ইরফান লিখলেন, “হয়তো ঠিকই বলেছ। আচ্ছা, তোমার আসল নামটা কী?
উত্তর এলো, “শুভ্র”
*
এই ঘটনার ৯ দিন পর ২৫/০২/২০১৭ তারিখে ইরফান রাতে বাসায় এসেই তাঁর ব্লগে একটা দীর্ঘ লেখা লিখতে শুরু করলেন। ব্লগের শিরোনাম দিলেন “ছাইচাপা জগৎ”। তাঁর লেখা নিচে হুবহু তুলে দেওয়া হলোঃ
“আমার লেখা নতুন বইটা নিয়ে অনেকে অনেক রকম কথা বলছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলো খুশি। তারা বলছেন অনেকদিন পর এদেশে LGBTQ দের নিয়ে কেউ কিছু লিখছে। যা সত্যিই আশাব্যঞ্জক। সেদিন তো ছয় পৃষ্ঠার একটা মেইল পেয়েছি। মেইলটা পাঠিয়েছে পলাশ নামের একটা ছেলে। ছেলেটা সমকামী। পুরো ছয় পৃষ্ঠা জুড়ে সে নিজের অভিজ্ঞতার কথা লিখেছে।
যখন ক্লাস নাইনে ছেলেটা পড়তো তখন ও তার এক ক্লাসমেটকে পছন্দ করে ফেলে। বলা বাহুল্য, ক্লাসমেটটা ছিলো ছেলে। ক্লাসমেট ছেলের নাম মুহিন। ওই সময়কার কথা বলতে গিয়ে পলাশ লিখেছে, “স্যার, আমি তখনও বুঝতাম না কেন মুহিনকে এতোটা ভালো লাগতো। আপনি হয়তো বিশ্বাস করবেন না আমি ক্লাসে প্রতি দশ মিনিট পর পর মুহিন যেই সিটে বসতো ওই দিকে তাকাতাম। ওর হাসিমুখ দেখতাম। কেন যে এতো ভালো লাগতো জানি না। মুহিন আমাকে দেখে হাসতো। কিন্তু, তবুও আমার লজ্জা লাগতো না। আমি ফের তাকাতাম। বাসায় পর্যন্ত গিয়ে ওর কথা-ই ভাবতাম। আমার খাতা বই সব তখন M+P লেখা দিয়ে ছেয়ে গিয়েছিল। শুধুমাত্র ওকে দেখার জন্যই আমি তখন প্রতিটা দিন স্কুলে যেতাম। মুহিনের হাসি, কথা বলার ধরণ, হাঁটার ধরণ কিংবা ওর পরনের জামা কাপড়ের রঙ পর্যন্ত আমি মিলিয়ে চলতাম। এরকম খাপছাড়া ঘটনাগুলা আমার সাথে তখন প্রথম ঘটতে ছিল। কয়েকমাস পর বুঝতে পারলাম, হয়তো এটাই ভালোবাসা। স্যার জানেন, আনন্দে আমার চোখে পানি এসে যেতো তখন। সমস্ত পৃথিবীর সবকিছু আমার ভালো লাগতে শুরু করেছিলো।”
পাঠক! আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এতো সুন্দর একটা ভালোবাসার গল্প কখনও সম্পূর্ণ হয় নি। পলাশ কখনই মুহিনকে তার মনের কথা বলতে পারে নি। বিনিময়ে সে লুকিয়ে লুকিয়ে কেঁদেছে। আর মুহিনও কিছুই বলে নি।
যাহোক, আমার বইটা নিয়ে সবাই যে শুধু প্রশংসাই করবে এমনটা আমি কখনই আশা করি নি। হয়েছেও তাই। নিন্দা এসেছে প্রচুর। বাংলাদেশের ইসলামি দলগুলো আমাকে ‘মুরতাদ’ ঘোষণা করেছে।
অনেকে হাদিসের রেফারেন্স আনছেন। পবিত্র কুরআনের রেফারেন্স টেনে আনছেন। কিন্তু, কিছু মানুষের জন্য যে এসব রেফারেন্স বিষফোঁড়ার মতো তা কি আমরা কখনও ভাবি? আমরা তো হাদিস-কুরআনের রেফারেন্স দিয়েই নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। অথচ, যারা সমকামী, দিনশেষে তাদেরই নিজেদের দীর্ঘশ্বাসের বোঝা বয়ে বেড়াতে হয়। অন্য কাউকে তারা নিজেদের কষ্ট বুঝতে দেয় না। আর অন্যরা বুঝতেও চায় না। তারপরেও একটা বিষয় কী জানেন, অনেকেই আছেন যাদের কিনা ধর্মের উপর অটল বিশ্বাস, বিশ্বাস আল্লাহর উপর।
সমকামীদের সমস্যাগুলা আসলে স্ট্রেইটরা কখনই বুঝবে না। স্ট্রেইটরা কঠিন কঠিন কথা বলবে ওদের বিরুদ্ধে। যদি কোনোভাবে, স্ট্রেইট ছেলে-মেয়েদের এক ঘন্টার জন্য সমকামী বানিয়ে দেয়া যেত তাহলে খুব ভালো হতো। ওরা বুঝতে পারতো গে লাইফ কেমন!
এছাড়াও, সাধারণ মানুষ আমার বইয়ের নাম দেখে নাক সিঁটকানো শুরু করেছেন। সেদিন পাশের বাসার ভদ্রলোক আমাকে দেখেই বলে উঠলেন, “কী ব্যাপার ইরফান সাহেব! হিজড়াদের নিয়ে নাকি বই লিখেছেন? তা মশাই আপনার গা গুলালো না?”
অথচ লোকটা কিনা ঢাকা ভার্সিটিতে ফিজিক্সে পড়াশোনা করেছেন। এর বাইরেও আছে। সেদিন রাতে তো একটা ফোনাকল এসেছিল। আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে ওরা। মৃত্যুর ভয় আমার কখনই ছিলো না।
বেশ কয়েকদিন আগে ফেসবুকে আমি একটা ফেইক আইডি খুলেছিলাম। আইডি খোলার উদ্দেশ্য ছিল ওদের ভেতরে ঢুকে গিয়ে ওদের সব কথা জানা। উদ্দেশ্যটা বিফল হয় নি।
ফেসবুকে আইডিগুলোর একটা বিশাল অংশ যে ওদের ফেইক আইডি দখল করে রেখেছে তা কি আমরা জানি? জানি না, বুঝিও না। কখনও কি ভেবেছি, একটা মানুষ কখন ফেইক আইডি খুলে নিজেকে সবার সামনে প্রকাশ করে? ভাবিই নি।
নিজেদের একটা সত্তাকে ওরা ফেসবুকে এসে প্রকাশ করে। নিষিদ্ধ সত্তা। বাইরের পৃথিবীর কাছে যার কোনো মূল্যই নেই। বরং আছে অনেক অপমান।
ফেইক আইডিতে মোটামুটি দশ দিন পার করেই আমার অনেক অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে৷ বিশ জনের মতো ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছে। বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, ওদের সিংহভাগই হতাশায় ডুবে আছে।
খুব ছোট বয়সেই তাদের অনেকের শারিরীক নির্যাতনের অভিজ্ঞতা হয়ে যায়। আর এসব অভিজ্ঞতার বেশিরভাগই হয় পাশের বাসার বড় চাচা, দাদা বা কাজিনদের থেকে।
কিন্তু, তারপরেও ওদের রিলেশনে যাওয়া বিষয়টা অনেক কমন, একে অন্যকে ভালোবাসাটা কমন। ভ্রু কুঁচকচ্ছেন? হ্যাঁ, ওরা রিলেশনে যায়। আর সেই দুইজনের মধ্যে বোঝাপড়ার ব্যাপারটা স্ট্রেইটদের চেয়ে কম না।
সেখানে, রুদ্র নামের একটা ছেলের সাথে আমার পরিচয় হয়। ছেলেটা ঢাকায় থাকে। যখন ওর বারো-তের বছর বয়স তখন ও বুঝতে শুরু করে যে ছেলেদের জন্য ওর অন্যরকম আকর্ষণ কাজ করে। ভার্সিটিতে ওঠার পর সে রিলশনে যায় আরেকটা ছেলের সাথে। সে সময় নাকি ওরা ঢাকা শহর চষে বেড়িয়েছে। প্রায় রাতেই নাকি ওরা স্ট্রিট ল্যাম্পের আলোয় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতো। স্পষ্টই বোঝা যায়, অসম্ভব মিষ্টি ছিলো ওদের সম্পর্ক।
এরকম একটা পোস্ট সেখানে দেখেছি- যেখানে একটা ছেলে লিখেছে যে “বাসা থেকে বিয়ের কথা বলছে৷ বাসার লোকজন এটাও বলছে পছন্দের কোনো মেয়ে থাকলে বলতে। অথচ আমি আরেকটা ছেলেকে পছন্দ করি৷ কী করবো কিছুই বুঝতে পারছি না।”
অনেকে হয়তো হাসছেন পড়তে পড়তে। কিন্তু, গভীরভাবে ভাবুন। কেমন মানসিক অবস্থায় পড়লে একজন মানুষ এরকম পোস্ট করে?
এমনকি, বিবাহিত পুরুষদের ফেইক আইডির সংখ্যাও নেহাত কম নয়।
কোন পেশার মানুষ সেখানে নেই বলুন? মুদি দোকানদার থেকে শুরু করে এমবিবিএস ডাক্তারদের পর্যন্ত আইডি আছে। এবং অবশ্যই সেগুলো ফেইক আইডি।
ওরা বাসায়ও বলতে পারবে না এসব। সবসময় তাদের একটা ভয়ের মধ্যে থাকতে হয়- এই বুঝি কেউ জেনে গেল! বন্ধুদেরও বলা যায় না।
ফেইক আইডির খাতিরে পরিচয় হওয়া আরো কয়েকজনের কথা বলি এখানে।
সিয়ামঃ ছেলেটা যখন ক্লাস এইটে পড়তো তখন সে খেয়াল করে ওদের পাড়ার এক বড় ভাই ওর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। বিষয়টা এতো ঘনঘন ঘটতো যে সিয়ামের ধারণা হয়েছিল ছেলেটা তাকে পছন্দ করে। অথচ, তাদের কেউই একে অন্যকে কিছুই জানাতে পারে নি। অন্য অনেক গল্পের মতো এই গল্পও শেষ হয় নি।
রায়হানঃ এই মানুষটা পেশায় শিক্ষক। একটা সরকারি কলেজে তিনি কমার্সের সাবজেক্ট পড়ান। তিনি সম্পর্কে যান তার এক স্টুডেন্টের সাথে। বলা বাহুল্য স্টুডেন্ট ছেলে। যাহোক, তাদের রিলেশনের কয়েক মাসের মধ্যেই রায়হানের বিয়ে ঠিক হয়ে যায়৷ এবং, ব্রেকআপ করে তিনি বিয়ে করে ফেলেন। এটাও একটা অসমাপ্ত গল্প।
শোয়েবঃ ইনি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। মাদ্রাসার সবাই তাকে ‘ছোট হুজুর’ নামে চেনে। এই মানুষটা পছন্দ করেন তার পাশের বাসার এক ছেলেকে। কিন্তু, তিনিও কখনই কিছু বলতে পারেন নি। যতদূর শুনলাম একটা মেয়ের সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে৷ মেয়ের বাবা একজন আলেম।
আজহার আলীঃ আজহারের বয়স এখন ৫৭। তার তিন ছেলে। ছেলেদের একজন আর্মিতে পর্যন্ত চাকরি করছে। ছোট ছেলেটা বৃত্তির টাকায় পড়াশোনা করছে। এরকম সুখের সংসার ছাড়ার কথাও কেউ কল্পনা করবে না। অথচ স্ত্রীর সঙ্গে এখন তার বনিবনা হচ্ছে না। আজহারের নাকি প্রতিটা দিন দমবন্ধ লাগত। বর্তমানে তিনি স্ত্রী পুত্র ছাড়াই একা সংসার করছেন। আশ্চর্যের কথা হচ্ছে তিনি এই একা একা বেশ ভালোই আছেন।
লিস্টি করতে গেলে আরো অনেকের নাম চলে আসতো। ওদের ভালোবাসার কিন্তু কোনো সামাজিক মর্যাদা নেই। ধর্মও ওদের অনুকূলে নেই। কিন্তু, তারপরেও ওদের ভালোবাসার অন্ত নেই। এতো বাঁধার পরেও যে তারা হাসিমুখে থাকছে এবং এখনও যে ভালোবেসে যাচ্ছে দেখে সত্যি অবাক হতে হয়।
এরকম যন্ত্রণা নিয়ে ওরা যে সুইসাইড না করে বেঁচে আছে তাই তো আশ্চর্যের!
অবশেষে মনে হচ্ছে আমার বই লেখাটা হয়তো সার্থক হলো। জানি সমাজ বদলাতে আরো কয়েক যুগ লাগবে, তবুও চাই বদলটা আসুক। ওদের যেন এই ভয়ে না বাঁচতে হয় যে কেউ ওদের আসল পরিচয় জেনে যাবে।
ভালো থাকুক ওদের সব্বাই। “
*
তার এই ব্লগের উত্তরে অনেকে অনেক কিছু লিখলো। রুপা নামের একটা মেয়ে লিখলো, “সমকামী শব্দটা উচ্চারণ করতেই গা ঘিনঘিন করছে। আর আপনি ওদের নিয়ে লিখলেন কোন রুচিতে?”
ইরফান উত্তরে লিখলেন, “মেয়েদের এরকম মানসিকতার জন্যই সমকামী ছেলেরা প্রকাশ্যে আসতে আরো ভয় পায়। বয়ফ্রেন্ডের সাথে আরেকটা মেয়ের সম্পর্ক থাকার কথা একটা মেয়ে যথেষ্ট সহজে গ্রহণ করতে পারে। অথচ, তার বয়ফ্রেন্ডের আরেকটা ছেলের সাথে সম্পর্ক থাকার কথাটা শুনলে মেয়েটা নির্ঘাৎ ব্রেকআপ করে ফেলবে।”
মাহমুদুল নামে একজন লিখলো, “সমকামিতা এক ধরণের মানসিক রোগ। চিকিৎসা করলে এই রোগ সম্পূর্ণ সেরে যায়।”
মাহমুদুলের উত্তরে তিনি লিখলেন, “বিষয়টা আসলে অতটা সহজ না।”
আল-আমিন নামের একজন লিখলো, “আপনার মাথা ঠিক আছে তো? সমকামীতাকে ইসলাম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশে কয়দিন আগে যে ভূমিকম্পটা হলো, ওইটা ওদের জন্যেই হয়েছে।”
উত্তরে ইরফান লিখলেন, “কাউকে ভালোবাসাটা পাপ বলে আমার মনে হয় না।”
দীনেশ নামে একজন লিখলো, “এটা সম্পূর্ণ মানসিক বিকৃতির লক্ষণ এবং আমেরিকা থেকে এসমস্ত আমদানি করেছে বাংলাদেশের অসভ্য কিছু লোক। যেখানে পশুপাখি পর্যন্ত এই জঘন্য কাজ করে না, সেখানে ওরা এসব করে বেড়ায়। ওরা তো পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট।”
ইরফান উত্তরে লিখলেন, “পশুদের মধ্যে সমকামীতা নেই কে বললো? এখনই গুগল করেন।”
তৌহিদ নামে একজন লিখলো, “ভালো বলেছেন। এসব কথা যে প্রকাশ্যে এসে বলার সাহস দেখিয়েছেন তাই-ই তো অবাক করা বিষয়। আপনার কাছে থেকে আরো অনেক লেখা পাওয়ার অপেক্ষায় থাকলাম।”
*
সেই রাতে ইরফান তাঁর মেইল চেক করতে ভুলে গেলেন। মেইল চেক করলে দেখতে পেতেন Jihad for Peace নামের একাউন্ট থেকে তাঁর কাছে একটা মেইল এসেছে। মেইলটা খুব সংক্ষিপ্তঃ
“সাবধান! জান কবজের সময় হয়ে গেছে। আল্লাহ, আল্লাহ্ কর নাস্তিকের বাচ্চা নাস্তিক।”
*
২৭ শে ফেব্রুয়ারী, ২০১৭
সেদিনও অফিস শেষে রোজকার মতো তিনি বইমেলায় গেলেন। সেখানে, অনেক ভীড়ের মধ্যে তাকে দেখে দুইজন ছেলে দাঁড়িয়ে পড়লো। ছেলে দুজন লেখক এবং ব্লগার ইরফানকে চিনতে পেরেছে। দুজনের একজন তাকে দেখেই কেঁদে ফেললো। তিনি বিস্ময়ে হতবাক। তিনি তাদের দিকে এগিয়ে গেলেন। যে ছেলে কাঁদছিলো তার কাঁধে হাত রেখে সহজ গলায় বললেন, “আরে বাবা কাঁদছো কেন? আমি তো আছিই তোমাদের পাশে। আমার যতটুকু সাধ্য, আমি ততটুকুই করবো।”
ছেলেটা পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখ মুছলো। বললো, “স্যার, কতগুলা রাত যে না ঘুমিয়ে কাটিয়েছি কেউ জানবে না। সবসময় মনে হতো আমি কেন এরকম। এতো খারাপ লাগে স্যার!”
তিনি বললেন, “শোনো, মন খারাপ কোরো না। তোমাদের আসলে সৃষ্টিকর্তা অসম্ভব মানসিক শক্তি দিয়ে পাঠিয়েছেন। সেই শক্তিকে ব্যবহার করো। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করো। আর একটা কথা শোনো। নিজেকে কখনই ছোট মনে করবে না। কক্ষনো না। নিজের মেধাকে পরিপূর্ণ রূপে কাজে লাগাবে। বুঝলে?”
ছেলেটা হাসিমুখে বললো, “জ্বী স্যার। আচ্ছা, আমি কি আপনার কাঁধে হাত রেখে একটা ছবি উঠতে পারি?”
ইরফান উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন, “আরে হ্যাঁ হ্যাঁ, অবশ্যই পারো।”
রাত সাড়ে নয়টায় তিনি বইমেলা থেকে রিকশায় চড়ে বাসার দিকে রওনা দিলেন। বইমেলা ছাড়িয়ে রিকশা হাইওয়েতে উঠেছে। চারদিকে দোকান। আলো ঝলমল করছে। এমন সময় হঠাৎই কয়েকজন যুবক মুখে কালো কাপড় বেঁধে তাঁর রিকশার সামনে এসে দাঁড়ালো। রিকশাচালক জোরে ব্রেক কষে রিকশা থামালো৷ ওই ছেলেগুলার একজন রিকশাচালককে ঘাড় ধরে রিকশা থেকে নামিয়ে ফেলল। আরেকজন ইরফানের হাত ধরে টেনে তাঁকে নিচে নামালো।
কী হচ্ছে বোঝার আগেই তিনি টের পেলেন তাঁর মাথায় অসম্ভব জোরে কেউ আঘাত করেছে। তাঁর সামনের একটা ছেলের হাতে কুরবানির পশু জবাই করার ছুরি। ছেলেটা সেই ছুরি তাঁর বুকের ওপর ক্ষিপ্র গতিতে চালাতে লাগলো। আরেকটা ছেলে হাতের রামদা নিয়ে ইরফানের পুরো হাতেপায়ে এলোপাথাড়ি কোপাতে শুরু করেছে। হাত দিয়ে বাধা দিতে গেলে একটা কোপ এসে পড়লো তার ডান হাতের চারটা আঙ্গুলের উপরে। তিনটা আঙ্গুল সঙ্গে সঙ্গে খসে পড়লো।
তার মাথা ঝিম ধরে গেলো। চারিদিক রক্তে ভেসে যাচ্ছে। রাস্তার অপর পাশেই পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। তাদের কেউ এগিয়ে আসছে না। ফুটপাত ভর্তি মানুষ। তারাও নির্বাক হয়ে হত্যাদৃশ্য দেখছে। কিছু রিকশাওয়ালা রিকশা পেছনদিকে ফিরিয়ে উল্টো দিকে চলতে শুরু করেছে।
সেদিন রাত এগারোটায় টিভিতে ব্রেকিং নিউজ এলো “দুর্বৃত্তদের হামলায় লেখক এবং ব্লগার ইরফান খুন।”

সমপ্রেমের গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.