3RD GENDER-2 নাটকে লিংগ পরিচয়ের ভুল উপস্থাপনা

ফ্লিন রাইডার

নাটকে আমাদের রিপ্রেজেন্টেশনের একটি আলোচনা। থার্ড জেন্ডারের সিরিজের ২য় নাটক, ১মটি ব্যাপক হিট হওয়াতে ২য় নাটক বের করেছে স্টার ডিরেক্টর বান্নাহ। ১ দিনে যে পরিমাণ ভিউ এটাও হিট হবার পথে।ফারহান, শাওনের মত স্টার কাস্ট সহ আরো অনেক অভিনেতা, মারাত্তক অভিনয় করেছে, মারাত্তক ডায়ালগ, গল্প সুন্দর যেখানে অনেক সুন্দর করে সমস্যা গুলি দেখিয়েছে। দর্শক খুব ভাল্ভাবে গ্রহণ করছে , অভিনেতাদের প্রশংসা করছে। কমেন্টে অনেকে লিখছে আর কোন দিন হিজড়াদের সাথে খারাপ ব্যবহার করব না। সিনেমা নাটক শিক্ষার একটা বড় মাধ্যম। আমাদের দেশে জেন্ডার আর সেক্স এডুকেশন সেভাবে কেউ পায় না, কেউ আগ্রহ করে পড়ে না, চিন্তা করে, আলোচনাও করে না। এগুলি নিয়ে এত দিন আলচনা হত না, এখন অল্প মানুষ জানছে আস্তে ধীরে ইণ্টারনেটের মাধ্যমে, কিন্তু আপনি যদি কিছু দ্রুত ছড়াতে চান তাহলে মিডিয়ার কোন বিকল্প নেই।‍ কিন্তু আসলে মানুষ জানছে কি ?

প্রথমে আসি নাটকের নামে- থার্ড জেন্ডার বা তৃতীয় লিঙ্গ – নারী ও পুরুষ ব্যতিরেকে সকল লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষদের পৃথক একক শ্রেণিবিভাগ।তৃতীয় লিঙ্গ হল একটি আম্ব্রেলা টার্ম, যেখানে এমন ব্যক্তিদের শ্রেণীভুক্ত করা হয় যারা হয় নিজে অথবা সমাজের দ্বারা পুরুষ বা নারী কোনটাই হিসেবে স্বীকৃত নয়।এই আম্ব্রেলা টারমটা কয়েকটা অ-পশ্চিমা সংস্কৃতিতে ব্যাবহার করা হয় ,যেমন আমাদের বাংলাদেশ। ৩য় লিঙ্গের মত আম্ব্রেলা টার্ম আছে কুইয়ার , হিজড়া , কিন্তু এই আম্ব্রেলা টার্মগুলির লিংগ পরিচয় ও যৌনদৃষ্টি ভঙ্গির পরিধির ভিন্নতা রয়েছে।পশ্চিমাদের কুইয়ার আম্ব্রেলার মাঝে হেটেরো সেক্সুয়াল বা সিস জেন্ডার বাদে যারা আছে তারা সকলে কুইয়ার আম্ব্রেলাতে চলে যাচ্ছে।বিশ্বে বহু প্রচলিত টার্ম হচ্ছে কুইয়ার আম্ব্রেলা টার্ম।

তো এখন প্রথমে আসি নাটকের মুল চরিত্র গুলিতেফারহান সে মেয়েদের মত সাজতে ভালবাসে, চলাফেরা সব মেয়েলি। ফারহানের মানসিক লিঙ্গ মেয়ে-নারী।অন্যদিকে তার বাবা তাকে ছেলে বলে ডেকেছে, যা বুঝতে পারি বায়োলজিক্যালি তার দেহ, যৌনাঙ্গ সব পুরুষদের মত, তাই ছেলে বলেই অভিহিত করে।

ফারহান একবার নিজেকে হিজড়া হিসাবে নিজেকে অভিহিত করে। এখানেই আমার সমস্যা, যারা নাটকটি বানিয়েছে তারা আসলে ভাল করে এই লিংগ পরচিয়ের স্টাডি করেন নাই কখনো। ফারহান নিজেকে রূপান্তর কামী নারী বা ট্রান্সউইমেন বলতে পারত, নিজেকে কোতি (মেয়েলি পুরুষ) বলতে পারত। এতে মানুষ জানতে পারত, সচেতন হত। এর বদলে ফারহান নিজের পরিচয় দিল হিজড়া হিসাবে, কিন্তু কেন হিজড়া??? এই যে ভুল সেটার জন্য আমাদের কতটা পিছিয়ে যেতে হবে তাঁর কোন হিসাব নেই।

হিজড়া তো কোন স্পেসিফিক লিংগ পরিচয় না , তাহলে হিজড়া কি ?

হিজড়া হল সামাজিক পরিচয়(সোশাল আইডেন্টিটি) যাদের সমাজ ব্যবস্থা একটি সংস্কৃতি লালন করে। এবং তাদের সমাজ ব্যবস্থার প্রধান হলেন গুরুমা , যার শিষ্য থাকে। তারা জীবিকার জন্য টাকা তোলে ,সমাজ হতে বিতাড়িত বিভিন্ন লিঙ্গীয় পরিচয়ের মানুষদের নিজের সমাজ ব্যবস্থায় যুক্ত করেন এবং তাদের সমাজের নির্দিষ্ট নিয়ম আছে, সেগুলি তারা কঠোর ভাবে পালন করে। তাহলে এখানে কি লিংগ পরিচয়ের কোন যোগসুত্র নেই ?

জি আছে, হিজড়া একটি সোশাল আম্ব্রেলা টার্ম যার মাঝে মেয়েলি পুরুষ, রুপান্তকামী নারী, আন্তঃলিঙ্গীয় পরিচয়ের মানুষদের নিয়ে তারা এই হিজড়া সমাজ ব্যবস্থা গঠন করে।

এক্টূ দেখে নেই এই টার্ম গুলির মানে গুলি

  • আন্তঃলিঙ্গ – জন্মগতভাবে দৈহিক বা জিনগত পুরুষ ও নারীর মধ্যবর্তী কোন অবস্থানের ব্যক্তিবর্গ।
  • তৃতীয় লিঙ্গ – নারী ও পুরুষ ব্যতিরেকে সকল লিঙ্গের পৃথক একক শ্রেণিবিভাগ।
  • রূপান্তরিত লিঙ্গ – সেসকল ব্যক্তিবর্গ যাদের লিংগ পরিচয় তাদের বায়লজিক্যাল সেক্স হতে আলাদা।রূপান্তরকামী লিংগ পরিচয়ের ব্যক্তিগণ এমন একটি লিংগ পরিচয়ের অভিজ্ঞতা লাভ করেন যা সমাজ দ্বারা নির্মিত তাদের জন্য নির্ধারিত লিঙ্গের সাথে এক নয়, এবং নিজেদেরকে স্থায়ীভাবে সেই লিঙ্গে পরিবর্তন করতে চান।
  • খোজা – শুক্রাশয় অপসারণকৃত নপুংসক পুরুষ।

নাটকে একটি সিন আসে, যেখানে ফারহানের বিয়ে দিতে চায় তার বাবা, তাকে ছেলে বানাবে দেখে। তখন ফারহান বলে সে একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করতে পারবে না। তার বোন মা সেটা মেনে নেয় ।এবং তাকে সাহায্য করে বাড়ি হতে বের হয়ে যেতে। সে নিজে নারী অনুভব করে তাই সে অন্য নারীর সাথে জীবন কাটাতে চায় না।

পশ্চিমা টার্ম অনুযায়ী ফারহান একজন ট্রান্সজেন্ডার বা ট্রান্স উইমেন ।যার বাঙলা করলে দাঁড়ায়, রূপান্তরকামি নারী। যা পশ্চিমা টার্ম কুয়ের বা জেন্ডার আম্ব্রেলাতে অন্তর্ভুক্ত।

ফারহান এখানে হিজড়া নন, কারন তিনি হিজড়া সমাজ ব্যবস্থায় তখন ছিলেন না।

এবার আসি ২য় চরিত্রে, শাওনের ভাইকে ইভটিজিং করছে বলে উল্লেখ করে তার বাবা, কিন্তু একটা ছেলেকে ইভটিজিং করে কিভাবে,ইভ মানে প্রথম নারী ইভ বুঝায়, সেটা তো এডাম টিজিং হবে। শাওনের ব্যাপারটা আমি পরিষ্কার না, কারন সেকি মেয়েলি পুরুষ নাকি রূপান্তরকামি। মেয়েলি পুরুষ একজন হইতেই পারে, তার জন্য তাকে ৩য় লিঙ্গে বা হিজড়া গল্পে আনবার তো কোন মানে দেখি না। এখন শাওন তো শুধু মেয়েলি পুরুষ ,এখানে একটা সমস্যা চোখে পড়ল, হিজড়া টার্মের ব্যবহার। এখন শাওনের মত যারা রূপান্তরকামি না কিন্তু মেয়েলি পুরুষ তাদেরকেও মানুষ হিজড়া টার্মে ফেলে দেবার প্রবনতা দূর না করে তা স্থায়ী করার বিষয়টা। তাহলে মেয়েলি পুরুষরা কি সবাই হিজড়া হিসাবে গণ্য হবে এখন ?

এদিকে আবার নাটকের নামকরণ করা হয়েছে ৩য় লিংগ। এখানে কখন কিভাবে তারা নিজেদের ৩য় লিংগ হিসাবে আইডেন্টীফাই করলেন ??? এখানে রূপান্তরকামী নারী, কতি বা মেয়েলি পুরুষ এই টার্ম গুলির ব্যবহার তো নেই, সোজা আম্ব্রেলা টার্ম ব্যবহার করা হচ্ছে হিজড়া এবং ৩য় লিংগ যা যথেষ্ট সমস্যা জনক।

কারন হিজড়া সমাজের বাইরের যারা কোতি, রূপান্তরকামী নারী আছেন, তারা তো নিজেদের হিজড়া হিসাবে আইডেন্টীফাই করেন না, এবং এই যে পলিটিক্যালি ইনকারেক্ট হেটেরো মিডিয়া যেই ৩য় লিঙ্গের গনপ্রচার করছে তা দিয়ে আমাদের দেশের বলতে গেলে কেউই নিজেদের আইডেন্টীফাই করেন না।

এইযে আমাদের রুপান্তরকামী নারী, আন্তঃলিঙ্গীয় মানুষ, হিজড়াদের নিয়ে যে সকল ভুল উপস্থাপনা হয় তা আমাদের বন্ধ করতে হবে, সবাইকে সচেতন করতে হবে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.