পথে এক নির্ঘুম রাত ও কিছু এলোমেলো ভাবনারা

রাত ১০.০০:
শ্যামলী বাস কাউন্টারে এসে পৌঁছালাম। অফিস থেকে ফোন এসেছে, তাই হঠাৎ করেই ঢাকা ছাড়তে হচ্ছে। বাসার সবার খুব মন খারাপ, এমনভাবে যেতে হওয়ায় নিজেরও খুব খারাপ লাগছে। ভারী ব্যাকপ্যাকটা কাঁধে নিয়ে কাউন্টারের বাইরে দাঁড়ালাম। গত বারের যাত্রার কথা মনে পড়ছে, কত পার্থক্য! মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করতে লাগলাম।

রাত ১০.৫০:
ভীষণ মেজাজ খারাপ হচ্ছে নিজের উপর। বাস মিস করেছি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি সব যে ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছিল মাথায়, কখন আমার বাস চলে গেছে টের পাই নি। কাউন্টারে যেয়ে বললাম। আমার অসহায় অবস্থা থেকে ওদের বোধ হয় দয়া হল, আরেকটা বাসে উঠিয়ে দিল। কিন্তু নামতে হবে অন্যখানে, আরো দু’বার গাড়ি পাল্টিয়ে তবেই গন্তব্য! সিট একদম পেছনের সারিতে। কি যে হয়েছে আমার ইদানিং, মন নেই যেন কিছুতেই। নিজেকে ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে পড়লাম গাড়িতে।

রাত ০১.৫০:
বাস জার্নিতে আমার এমনিতেও ঘুম আসে না, মাঝে মাঝে তন্দ্রা মতন হয় শুধু। আজ তাও হচ্ছে না। একে পেছনের সিট বলে ভীষণ ঝাঁকুনি, যেন সমুদ্রের ঢেউয়ে নৌকায় ভাসছি! তার উপর ড্রাইভিং হচ্ছে খুব রাফ। কয়েকবার খুব অল্পের জন্য বেঁচে গেছি, ওভারটেকিং করতে গিয়ে দু’বার একদম মুখোমুখি অবস্থা ছিল। আমি শক্ত হয়ে বসে আছি। আমার উচ্চতা এবং গতি ভীতি প্রবল, আর আমি কিনা ছোটবেলায় পাইলট হবার স্বপ্ন দেখতাম! কী অদ্ভুত, তাই না?

রাত ০২.২০:
প্রচন্ড ঝাঁকুনিতে তন্দ্রা ভেংগে গেল। গাড়ি অর্ধেক কাত হয়ে রাস্তার পাশের খাদের দিকে ঝুলে রয়েছে। সবার সম্মিলিত আর্তচিৎকারের মধ্যেই ড্রাইভার কোন মতে গাড়িটা সোজা করতে পারল। একটা ব্রীজের রেলিং এর সাথে সংঘর্ষ! এবার ড্রাইভারের কিছু হুঁশ ফিরল। কিছু চেঁচামেচি করে সবাই আবার ঘুম, জেগে রইলাম আমি!

রাত ৩.১০:
মাঝবিরতি। ওয়াশরুমে গিয়ে হালকা হয়ে আসলাম। বাইরে এসে খোলা বাতাসে নিজেকে একটু রিচার্জ করার চেষ্টা করলাম, তা সেটা বেশ ভালই হল বৈকি! আমার মত আরো একজন সেখানে ঘুরছিল, মিষ্টি মুখের সাথে মায়াবী হাসি, আড়চোখে কয়েকবার দৃষ্টি বিনিময় হল। কেন যেন মনে হচ্ছিল সে কথা বলতে চাচ্ছে, কিন্তু দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারলাম না। ওর বাস ছেড়ে দিল, জানলা দিয়ে মাথা বের করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, শেষ মুহূর্তটা বন্দী রইল একটা মিষ্টি হাসির ফ্রেমে!

রাত ০৪.০৫:
সবাই গভীর ঘুমে। আকাশে কোন চাঁদ দেখছি না, তারার আলোও নেই। চারপাশে ফসলের ক্ষেত, কাঁচা সবুজের ঘ্রাণ বেশ বুঝতে পারছি। নিকষ কালো অন্ধকার দেখতে হলে এমন জায়গাতেই আসতে হয়। আচ্ছা, কবরে কি এর চাইতেও অন্ধকার? কেমন করে থাকে ওখানে সবাই? বেশি ভাবতে পারলাম না, দম বন্ধ হয়ে আসছিল। নিজেকে নিয়ে ভাবতে বসলাম। যতবার ভাবি, নতুন নতুন আমি’কে যেন আবিষ্কার করি! নিজেই নিজের কূল পেলাম না এখনো, অন্যরা আর কি বুঝবে! এমন মুহূর্তগুলোয় নিজেকে বড় তুচ্ছ মনে হয়, একলা মনে হয়, নিজের অস্তিত্ব যেন কোন ধোঁয়াশা হয়ে প্রহেলিকা তৈরি করে! সেখানে আলোর নাচন থাকে, আমাবস্যার অন্ধকার থাকে, না বোঝা না বলা কথা থাকে; শুধু ধরতে গেলেই সব কেমন মিলিয়ে যায়! জীবনের চাওয়াপাওয়া গুলো তখন আর মুখ্য হয়ে ওঠে না, লেনাদেনা আর কোন অর্থ বহন করে না, শুধু নিজের পাপের ভার নিজেকে সেই মুহূর্তে যেন আরো অবনত করে, প্রার্থনা তখন শুধু একমুঠো শান্তির!

ভোর ৪.৫৫:
পূর্ব আকাশ একটু একটু করে আলোকিত হচ্ছে। শুকতারাটা এখনো জ্বলজ্বল করছে। লোকজন ফজরের নামাজ শেষে বাড়ি ফিরছে। কী অদ্ভুত প্রশান্তি তাদের চোখে-মুখে! হিংসে হল ওদের। বাতাসে কেমন একটা শীতলতা, পুরো পরিবেশে স্নিগ্ধ এক পবিত্রতা। আমার ঘুম পেতে লাগল। পাপী ইন্দ্রিয়ের সৌভাগ্য হয় না এমনকি পবিত্রতার কিছু স্বাদ নেবারও, মাথা পেছনে এলিয়ে দিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করলাম আমি।

লেখকঃমেঘদূতের বর্ণমালা

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.