বিকেলের গল্পগাথা ২

(১)
ইন্টার্ভিউ রুম থেকে বেরিয়েই এক বোতল পানি কিনে পান করে নিলো হিমু।উফ! শ্বাসরুদ্ধকর ইন্টার্ভিউ। এটাই হিমুর জীবনের প্রথম জব ইন্টার্ভিউ। মাস্টার্স কমপ্লিট করেই জব ইন্টার্ভিউ। নেই কোন চাকরির অভিজ্ঞতা।তাই চাকরিটা পাওয়া নিয়ে বেশ সন্দিহান হিমু।তবুও যতটা সম্ভব ভালোভাবে ইন্টার্ভিউ দেয়ার চেষ্টা করেছে সে। আগামীকাল ফোন করে উত্তর জানানো হবে বলে জানালো কর্তৃপক্ষ।অগত্যা একরাশ হতাশা নিয়ে বের হয়ে এলো হিমু।

রাত ৮ টা বাজে এখন।একটা ঝুপড়ি দোকানে ঢুকে তৃপ্তি করে চা খেয়ে নিলো হিমু।এবার বাড়ির পথে হাটা শুরু করেছে সে।হঠাৎ পেছন থেকে একটা ছোট্ট বাচ্চা মেয়ে হাতে ফুল নিয়ে ডাকছে।”স্যর ফুল নিবেন? বাচ্চাটির করুন আহ্বানে মন খারাপ হয়ে গেলো। ৫-৬ বছরের বাচ্চা,পেটের দায়ে ফুল বিক্রি করছে.।বাচ্চাটির হাতে ১০০ টাকার একটা নোট ধরিয়ে দিয়ে চলে আসতে চাইলো হিমু।কিন্তু একি!!বাচ্চাটি নাছোড়বান্দা। সে কিছুতেই ফুল না দিয়ে টাকা নেবে না।অগত্যা কয়েকটা গোলাপ নিতে হলো।

বাচ্চাটির থেকে ফুল নেয়ার সময় রাহিক এর কথা মনে পড়লো হিমুর।
বছর দুই আগে একটা বাচ্চা থেকে ফুল কিনতে গিয়ে ছোটকাটো ঝগড়া লাগে তাদের।হিমু কিনবে পরদিন তার বেস্ট ফ্রেন্ড এর বার্থডেতে গিফট করবে তাই। রাহিক কিনতে চাই তার বোনের জন্য।কারন পরদিন তার বোনেরও বার্থডে।সমস্যা হলো ফুলের তোড়া আছে মাত্র একটা।
অগত্যা’ না কিনেই ফিরে যায় রাহিক।কারন হিমু বেশি দাম দিয়ে ওটা কিনে নেয়।

পরদিন ফুলের তোড়া আর “হ্যাপি বার্থডে দোস্ত” লিখা চকলেট এর বক্স নিয়ে বেস্ট ফ্রেন্ড এর বাসায় চলে যায় হিমু।
নীলা তার বেস্ট ফ্রেন্ড। সে নিশ্চয় এমন সারপ্রাইজ এ খুশি হবে।শুধু খুশি কেনো রীতিমত অবাক হবে। ভাবতে ভাবতে কলিং বেল চাপল হিমু।দরজা খুলতেই “হ্যাপি বার্থডে ডে ডিয়ার নীলা” বলে ফুলের তোড়া এগিয়ে দিলো হিমু। কিন্তু একি!!
কাল রাতে যে ভদ্রলোকের সাথে ফুল নিয়ে ঝগড়া হলো সেই দরজা খুললো!!!
লজ্জা পাবে,নাকি রাগবে বুঝতেই পারছেনা হিমু।থ হয়ে দাড়িয়ে রইলো সে।
নীলার ডাকে সম্বিত ফিরে পেলো হিমু।
-এইই হিমু!! এমন হাত বাড়িয়ে মুর্তির মত দাড়িয়ে আছিস যে?
-ওহহ,,স্যরি।হ্যাপি বার্থডে দোস্ত।
-থ্যাংক ইউ দোস্ত।
-এই নে তুর ফেভরিট চকলেট।
-ওহহ মাই গড,,,তুই মনে রাখছিস!! আই লাভ চকলেট।
-আয় ভেতরে আয়।এই ভাইয়া তুই দাড়িয়ে রইলি কেনো? যা সর
-ওনি তুর ভাইয়া? আগে তো দেখিনি।
-হ্যা,,, ওনিই আমার ভাইয়া।রাহিক।তুকে কত্তবার ওর কথা বলেছি। সব ভুলে গেলি দেখছি।
-নাহহ ভুলিনি মনে আছে।
-ও দুবাই থাকে।ওখানে জব করে।
-ওহহ আচ্ছা
-আচ্ছা ভেতরে আয়।

হিমুকে জায়গা করে দিয়ে সরে গেলো রাহিক।হিমুর দিকে সে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেনো সে স্বপ্ন দেখছে। রাহিক হিমুকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে নাস্তা আনতে চলে গেলো নীলা। রাহিকের সাথে কীভাবে কথা বলবে বুঝতে পারছে না হিমু।কাল রাতে গায়ে পড়ে নিজেই তো ঝগড়াটা করলো।কি না কি ভাবছে সে কে জানে?

-এই যে,,চুপ করে আছো যে? কাল আমার সাথে ঝগড়ার ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছো?
-নাহহ আসলে তা না
-ওভাবে বলতে হবে না।আমি বুঝতে পারছি।ফুলের তোড়াটা তাইলে আমার বোনের জন্যই?
-হ্যা,,আসলে নীলা আমার বেস্ট ফ্রেন্ড তো তাই।কালকের ঝগড়ার জন্য আমি দুঃখিত।
-নাহহ,,ঠিক আছে।কিছু মনে করিনি আমি।আমিও ফুলটা নীলার জন্যই কিনতে চেয়েছিলাম।

টুকটাক কথা বলতে বলতে অনেকটা ফ্রি হয়ে গেলো দুজনে।যেনো খুব চেনা দুজন।

অইদিনের দেখা হওয়া, ঝগড়াগুলোই এক সময় কাল হয় হিমুর জীবনে।উল্টে যায় হিমুর স্বাভাবিক জীবনের প্রেক্ষাপট।
আসে প্রেম নামক বস্তু।আবার চলেও যায়।অজান্তেই দুফোটা অশ্রুজল ঝরে পড়লো গোলাপ গুলোর উপর।

(২)
ব্যাগ গোছাতে ব্যস্ত রাহিক।রাতের ফ্লাইটে বাংলাদেশ ফিরবে। প্রায় দেড় বছরের মত হলো দুবাইতে ব্যাক করেছে।সবাইকে খুব মিস করছিলো সে।মা,বাবা,নীলা আর হিমু।
সকাল নাগাদ বাংলাদেশ পৌঁছাবে রাহিক।
এয়ারর্পোর্ট থেকে রিসিভ করবে আদর আর প্রিয়াংক। আদর আর প্রিয়াংক সম্পর্কে সব জেনেছে সে।আদর নিজেই বলেছে যে সে প্রিয়াংককে ভালোবাসে।আদর ভেবেছিলো অন্য দশজনের মত খারাপ রিয়্যাক্ট করবে রাহিক।কিন্তু আদরকে চমকে দিয়ে কংগ্রাচুলেট করলো রাহিক।যেনো এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

মা বাবা নীলা কাউকেই জানায়নি সে ফিরছে।সারপ্রাইজ দিবে বলে।পারভেজ সন্ধ্যায় এসেছে রাহিকের কাছে।একেবারে এয়ার্পোর্ট ড্রপ করে দিয়ে তবেই ফিরবে।মাঝে মাঝে রাহিক ভাবে;পারভেজ এর মত এত্ত ভালো ছেলেকে কি করে সে শুধু বন্ধু ভাবলো?পারভেজ তার কত্ত যত্ন করে।বিপদে,সুখেদুঃখে পাশে থেকেছে এ ক’বছর।অথচ এ ছেলেকেই কিনা ফিরিয়ে দিলো সে!
অনেকদিন আগে পারভেজ রাহিককে তার ভালোলাগার কথা বলেছিলো।কিন্তু হিমুর কথা ভেবে সে না করে দেয়।কারন এখনো রাহিকের মনে হিমু থাকে।তবে সবসময় ভালো বন্ধু হয়ে থাকার কথা দেয়।
যার খেলাপ আজও করেনি পারভেজ।
আর বলেনি রাহিককে তার মনের কথা।

আজ চলে যাওয়ার সময় পারভেজ এর জন্য বুকের ভেতর ব্যথা অনুভব করছে রাহিক।
তার চোখে জল।কারন সে পারভেজ এর পবিত্র ভালোবাসা গ্রহণ করেনি।তাকে একা করে রাখার দায় শুধু তারই।যদি তার জীবনে হিমু না আসতো তাহলে হয়তো গল্পটা ভিন্ন হতো।
সেবার যখন আদর কিডন্যাপ হয়।তখন রাহিককে গাড়িতে অজ্ঞান অবস্থায় পায় পারভেজ।ওখান থেকে নিজের ঘরে এনে জ্ঞান ফেরা অবধি কত কিনা করেছে ছেলেটা। পরে সব জেনেছে রাহিক।

আজ হয়তো সে পারভেজকে বলতে পারতো সে চায় পারভেজ এর জীবনে ফিরতে।কিন্তু
সে অজানা অনিশ্চিত ভালোবাসার জন্য হিমুকে হারাতে পারবেনা।আজও রাহিক হিমুর আসায় আছে।হয়তো একদিন সে ফিরবে তার জীবনে। নতুন বসন্ত হয়ে।

(৩)

-উফফ,, আদর এত্ত দেরি করছো কেনো?সে কখন বললাম রেডি হতে।
-তুমাকেও আমি সে কখন থেকে বলে যাচ্ছি শার্ট টা পরিয়ে দাও।দিচ্ছই না
-আমি দিবো কেনো?তোমার হাত নেই?
-নাহ আমার হাত নেই।আমার হাত তুমি।
তুমি শার্ট পরিয়ে দিবা,চুল আঁচড়ে দিবা।নইলে এভাবে দেরি হতে থাকবে।রাহিক এসে বসে থাকবে।
– থাকলে থাকুক।আমার কি?ও তো আমার বন্ধু নয়।তোমার বন্ধু ।সো দেরি করো আর তাড়াতাড়ি করো। তোমার ইচ্ছে।আই ডোন্ট কেয়ার।
-প্রিয়,, দাওনা বাবু।তুমি না দিলে কে দিবে বলো?
-ঢং দেখো কত্ত!!কাজের সময় বাবু সোনা কত কি?কাজ শেষ পাশেও থাকেনা উনি।
-পাশে থাকিনা? ২৪ ঘন্টা তো তোমার সাথেই থাকি।এই সোনা,,দাও না প্লিজ!!
-আচ্ছা হয়েছে হয়েছে।আর ন্যাকামি করা লাগবে না।দাও শার্ট।

দুষ্টু মিষ্টি প্রেমের সম্পর্কে এভাবেই এগুচ্ছে আদর আর প্রিয়াংক এর।দুজনই এখন ঢাকা থাকে।প্রিয়াংক এর বাবার ঢাকার বিজনেস এখন প্রিয়াংক এর।আদরও এখানেই চাকরিতে জয়েন করে প্রিয়র সাথে আছে।

দুজনেই যাচ্ছে রাহিককে রিসিভ করতে।প্রিয়াংক অবশ্য যেতে চায়নি।অচেনা একজনকে রিসিভ করতে যাবে।যার সাথে বিন্দুমাত্র পরিচয় নেই।
আদরের জোরাজুরিতে শেষ অবধি রাজি হলো।

রেডি হয়ে দুজনই পৌঁছে গেলো এয়ারপোর্টে।
ওয়েট করছে রাহিকের জন্য।কিছুক্ষনের মধ্যে ফ্লাইট নামবে।

(৪)
আজকাল হিমুর মনটা ভারি হয়ে থাকে। কারো জন্যে যেনো মনটা কঁাদে।ইন্টার্ভিউতে ঠিকে গেছে সে।এক তারিখ থেকে চাকরিতে যোগ দিতে বলা হয়েছে। অথচ বিন্দুমাত্র উচ্ছ্বাস নেই মনে।
কাজের বাইরের সময়গুলো যেনো কাটতেই চায়না।
আজ হঠাৎ নীলা ফোন করেছিলো।রাহিকের সাথে সম্পর্ক শেষ হওয়ার পর কেমন যেনো একটা দূরত্ব এসে গেছে নীলার সাথে।আগের মত হাসি,মাস্তি,না বলে নীলার ঘরে যাওয়া এসব আর হয়নি।মাঝে মধ্যে নীলার সাথে ফোনে কথা হয়।এতটুকুই।

এখন হিমু এয়ার্পোর্ট যাচ্ছে। তার এক ফ্রেন্ড কাজ করে ঢাকা এয়ার্পোর্টে। সে ফোন করে দেখা করতে বললো এয়ারপোর্টেই।
অনেকদিন ধরে বন্ধুবান্ধব থেকে দূরে আছে হিমু।ইচ্ছে করেই নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে।বন্ধুর ফোন পেয়ে অনিচ্ছা সত্বেও বিমানবন্দর গেলো সে।

(৫)
বাংলাদেশ এ ল্যান্ড করলো দুবাইয়ের ফ্লাইটটি।দুবাইয়ের পাঠ চুকিয়ে দেয়ার চিন্তা নিয়েই দেশে ফিরেছে রাহিক।আদর বলেছিলো দুবাইয়ে ভালো না লাগলে দেশে এলে প্রিয়াংক আর তার অফিসে চাকরি দেবে রাহিককে।রাহিকের ফেরার খবর শুনে আদর নিজে থেকে চাকরি ঠিক করে রাখে রাহিকের জন্য।রাহিক মনে মনে এটা চিন্তা করে রেখেছে যে,আদরের অফিসে জয়েন করার পর যদি মা বাবা রাজি থাকে তাহলে আর দুবাই ফিরবে না সে।

রাহিক!! রাহিক!! ঐ তো বাইরে হাত নাড়িয়ে ডাকছে আদর।রাহিকও হাত নাড়ালো।

পাশের লোকটার মুখে রাহিক নাম শুনে থমকে দাড়ালো হিমু। রাহিককে ডাকছে এ লোক।এটা হিমুর রাহিক নয় তো!!
লোকটা যেদিকে হাত নাড়িয়ে রাহিক বলে ডাকছে সেদিকে তাকালো হিমু।
নাহহ তার চিন্তা ভুল নয়।এ রাহিক।এইই সেই রাহিক যাকে তাড়িয়ে দিয়েছিলো সে।যাকে বুকে পাথর চেপে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলো সে।সেই রাহিক আজ তার সামনে।
হিমু তাকিয়েই থাকলো রাহিকের দিকে।মুগ্ধ হয়ে। এ কবছরে অনেক পাল্টেছে সে।আগের থেকে অনেক সুন্দর হয়ে গেছে।রাহিক এগিয়ে আসছে।হিমুকে দেখেনি।
হিমু চায়না এভাবে দেখা হোক। সে হয়তো ভুলে গেছে তাকে।বিদেশে থাকে। হয়তো ওখানকার কাউকে পছন্দ করে সম্পর্ক গড়েছে।
রাহিক দেখার আগেই দ্রুত সরে গেলো হিমু।

(৬)
রাহিককে নিয়ে নিজের বাসায় ফিরলো আদর প্রিয়াংক।
ফেরার পথেই রাহিকের সাথে প্রিয়াংকের পরিচয় করিয়ে দিয়েছে আদর।প্রিয়াংক প্রথমদিকে কথা বলতে সংকোচ করলেও আদর কষ্ট পাবে ভেবে নিজেকে ইজি করে নিলো।
বাসায় ফিরেই ক্লান্তিতে শুয়ে পড়লো রাহিক।
চোখজুড়ে ঘুম এসেছে।

-শুনো আদর,,
-হ্যা বলো প্রিয়
-তুমি আপাতত ওনাকে বিরক্ত করোনা।দেখো বেচারা খুব ক্লান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে।ওনার ঘুম ভাঙলে তবেই কথা বলো।
-কেনো,?আমার বন্ধু এত্তদিন পর ফিরলো আমি তার সাথে কথা বলবো না?
-আহা! আমি কি কথা বলতে মানা করেছি?
বলছি ওনি খুব ক্লান্ত। ওনার রেস্ট দরকার। তুমি আপাতত তাকে ডিস্টার্ব করোনা।
ওনি ঘুমাচ্ছেন ঘুমাক।
-আচ্ছা ঠিকা আছে। ঠিক আছে।বিরক্ত করবো না।
-গুড। চলো ততক্ষনে বাজারে যাই আমরা।কিছু কাঁচাবাজার করতে হবে।
-ওকে চলো।
-তুমি রেডি হয়ে নাও।আমি লিস্ট করে নিই বাজারের।
-বুয়াকে বলে দিও রাহিকের খাবার তৈরি করে ওর ঘরে রেখে আসতে।
-আচ্ছা ঠিক আছে

(৭)
আজ হিমুর চাকরিতে প্রথমদিন। সে অফিস প্রধান মি. আদরের পার্সোনাল এসিস্ট্যান্ট হিসেবে যোগ দিয়েছে।তাকে সকল কাজ ভালোভাবে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে।
কেমনে ক্লাইন্টকে সন্তুষ্ট রাখতে হবে, কোনদিন আদরের মিটিং হবে তা ঠিক রাখা,কি কি ভুল হলে ক্লাইন্ট চলে যেতে পারে,অফিসের কার সাথে কতটুক কাজ করবে এসব।
সারাদিন অফিস করে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে বেশ ক্লান্ত হিমু।গা টা বিছানায় এলিয়ে দিতে যাবে এমন সময় ফোনটা বেজে উঠল।স্ক্রিনে নীলা নাম দেখাচ্ছে।

-হ্যালো,,,
-হ্যা রে হিমু,, কেমন আছিস তুই?
-এই তো ভালো আছি।তুর কি খবর?
-হ্যা,, আমি খুব ভালো আছি।
-খুব ভালো??
-হ্যা
– হঠাৎ খুব ভালো কেনো?
-আজকের দিনটা আমার লাইফের বেস্ট দিন ছিলো।আজকে দুইটা ঘটনা ঘটেছে।তুকে জানানোর জন্য ফোন করলাম।
-আমি জানি তুই কোন দুটি ঘটনার কথা বলবি!!
– দুস্ত,,তুই সত্যি জানিস?? দেখি বলতো
-প্রথমেরটা হলো,, আজ তুর ভাই রাহিক ফিরেছে।
তুদের বাসায় আজ ফিরলেও।সে দেশে আসে গতকাল।
-আর দ্বিতীয়টা?
-দ্বিতীয়টা হলো তুর জাস্ট ফ্রেন্ড রোহান আজ তুকে প্রপোজ করেছে!!
– ওহ মাই গড।তুই কেমনে জানলি এসব?
-আগে বল ঠিক বলেছি কিনা?
– হ্যা ঠিকি বলেছিস।আজ সত্যি বিশ্বাস করলাম হিমু হয়েছিস কেনো!!
-কেনো?
– জানিনা।এবার বল না রে কেমনে জানিস?অলৌকিক ক্ষমতা?
-আরেহ দূর বোকা।তুই সেই আগের মতই মাথামোটা রয়ে গেছিস।
শোন গতকাল আমি যখন আমার এক বন্ধুর সাথে দেখা করতে বিমানবন্দর যাই। তখন তুর ভাইকে ভেতর থেকে আসতে দেখি।যেহেতু তুদের কাউকে সেখানে দেখিনি। স্বাভাবিকভাবেই সে সারপ্রাইজ দেবে বলে জানায়নি কাউকে।
-আর রোহানের ব্যাপারটা?
– আজ সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফেরার পথে দেখি তুই আর রোহান রিক্সায় এবং তুর হাতে গোলাপ একটা।রোহান আমাকে কয়েকবার বলেছিলো সে তুকে পছন্দ করে।সো নরমালি ধরে নিছি যে সে তুকে প্রপোজ করেছে আজ।
-দূর!! মজাটাই মাটি করে দিলি।তুই সব জানিস দেখছি। আমি রাখছি এখন।বাই
-বাই

নীলার ফোন পেয়ে আবারো রাহিকের কথা মনে পড়ে গেলো।কতটা কষ্ট দিয়েছে সে রাহিককে। যে ছেলেটা কোন দোষ করেনি সে ছেলেকে শাস্তি দিয়েছে। বিচ্ছেদের শাস্তি।
আজ পুনরায় সেদিনের কথা মনে পড়তে লাগলো যেদিন আলাদা হয়ে গেলো হিমু আর রাহিকের রাস্তা।দুচোখ বন্ধ করলো হিমু। টপ টপ নোনতা জল গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে।

(৮)
ভোরে ফোনের শব্দে ঘুম ভাঙে হিমুর।এত্ত ভোরে ঘুম ভাঙায় বেশ বিরক্ত হিমু।একরাশ রাগ নিয়ে ফোনের স্ক্রিনে তাকালো। মুহুর্তেই সব রাগ বিরক্তি উবে গেলো!!! সাথে ঘুমের ঘোরটাও।এই যে তার স্বপ্নপুরুষ রাহিকের ফোন!
দ্রুত কাপা কাপা হাতে ফোনটা রিসিভ করলো হিমু।

-হ্যালো
-হিমু??
-হ্যা,,,রাহিক ভাই বলেন।
-দ্রুত একবার আমার বাসায় আসো।
-কেনো? কোন সমস্যা?
-হ্যা,, তাড়াতাড়ি আসো প্লিজ।
-কি হয়েছে বলুন আমায়।
-আগে আসো,,তারপর বলবো
-আচ্ছা,,,আমি আসছি।
দ্রুত বিছানা ছেড়ে রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লো হিমু।নিশ্চয় কোন সমস্যা হয়েছে রাহিকের।নয়তো এত্ত ভোরে কেনো ফোন করবে??
দ্রুত নীলার বাসায় পৌঁছে গেলো হিমু।দরজা খোলা! ভেতরে অন্ধকার। কারো সাড়াশব্দ নেই।”নীলা,,নীলা””রাহিক ভাই?? ” কয়েকবার ডাকলো হিমু।কেউ সাড়া দিচ্ছে না।ভেতরটা মুছরে উঠলো। কারো কোন ক্ষতি হয় নি তো!! ভয়ে ভয়ে ঘরের ভেতরে পা বাড়ালো হিমু। এক পা,, দু পা করে রাহিকের রুমের দিকে এগুতে থাকলো।
হঠাৎ পেছন থেকে কেউ তার চোখ ঢেকে ফেললো হাত দিয়ে।প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেলো হিমু।কিন্তু তার কন্ঠস্বর শুনে ভয় কাটলো।
-কে আমি,,বলোতো
-রাহিক ভাই!!
-চিনলে কেমনে?
-কন্ঠ শুনে।
-স্যরি,,,এত্ত ভোরে ডেকে আনলাম।তুমি ভেবেছো কোন বিপদ।
-ভাববো না,,, এত্ত ভোরে এমনভাবে ফোন করে আসতে বললেন।
-ভয় পেয়েছো?
-হ্যা,,,খুব।আমি ভাবলাম আপনাদের কোন বিপদ হয়েছে।এটা কেন করলেন রাহিক ভাই?
-ভাই??অনলি রাহিক।
-কেনো?রাহিক বলবো কেনো?
-কারন আছে।রাহিক বলবা এখন থেকে।আর একটু পর বুঝবা কেনো ডাকলাম।
-আচ্ছা আগে চোখটা ছাড়ুন।
-ছাড়ছি।তবে তুমি চোখ খুলবা না।যতক্ষণ না আমি বলবো।
-কেনো?
-সারপ্রাইজ আছে।
-ওকে।
-1…2….3 এবার খোলো।

চোখ খোলে তাকালো হিমু।অবাক হওয়ার চেয়ে বেশি কিছু থাকলে সেটাই হতো হিমুর সাথে। কারন রাহিককে এ অবস্থায় দেখবে সে স্বপ্নেও ভাবেনি।
হাতে রিং,মুখে ভয়ার্ত চাহনি,হাটু গেড়ে বসা।দেখেই তো থ হয়ে দাড়িয়ে ছিলো হিমু অনেক্ষণ।রাহিকের কথায় সম্বিত ফিরে পায়।
“আমি গে হিমু।আর আমি তোমায় ভালোবাসি। এত্তদিন নিজেকে আটকাতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারিনি।তোমার প্রতি টান আমাকে বাধ্য করেছে যে তোমাকে জানাতে।আমি তোমায় ভালোবাসি।
আমায় ভালোবাসবে হিমু?”।প্রতিউত্তর দিতে সময় নিলো হিমু।ভাববার জন্য নয়।কারন তার এসব স্বপ্নের মত লাগছে। নিজেকে বিশ্বাস করাতে সময় লাগছে।পুনরায় রাহিক বললো”কি?আমাকে ভালো লাগেনা তোমার?তাই গ্রহন করছো না আমায়,,তাইতো?”এবার কোন উত্তর দিলোনা হিমু।হাসিমুখেই হাত বাড়িয়ে দেয় রাহিকের দিকে। রাহিক রিং পড়িয়ে হাতে একটা চুমু দিল।ফিল্মি স্টাইলে।হিমু “এইচ” লেটারের নিজের গলার লকেটটা রাহিকের গলায় পড়িয়ে দেয়।তারপর রাহিক উঠে দাড়ালো।দুহাতে স্পর্শ করে হিমুর গাল।আবেশে চোখ বন্ধ করে হিমু।
রাহিক চোখ বন্ধ করে এগিয়ে আসতে লাগলো হিমুর দিকে।হিমু কাপছে।কাপছে তার সারা শরীর।আবেগে শিহরণে পুলকিত হচ্ছে। নিজেকে সামলাতে পারছে না হিমু।।রাহিক এগিয়ে দিলো নিজের ঠোটযুগল ।স্পর্শ করলো হিমুর কাপতে থাকা ঠোট।লম্বা একটা চুমু দিলো।সাথে দিলো ভালোবাসার উষ্ণতা।আবেশে নিজেকে সামলাতে না পেরে হিমু ঢলে পড়লো রাহিকের গায়।রাহিক সন্তর্পণে বাহুডোরে ধরলো হিমুকে।

তারপর সব হিমুর কাছে স্বপ্নের মতই ঘটতে লাগলো। নীলার পরিবার বাসায় ছিলোনা।
তাই রাহিক নিজে সকালের নাস্তা বানালো।নিজ হাতে হিমুকে খাইয়ে দিলো।তারপর হিমুকে সাথে নিয়ে বারান্দায় দাড়ালো।শক্ত করে চেপে ধরলো হিমুর হাত।
বারান্দায় দাড়িয়ে অনেক্ষণ কথা বললো দুজনে।কথা ফাকে ফাকে রাহিক হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরছে হিমুর কোমর। চুমু দিচ্ছে হিমুর গালে।
হিমু এতকিছুর পরেও নিজেকে ফ্রি করতে পারছেনা রাহিকের সাথে।আবার রাহিকের আচরনও খারাপ লাগছেনা।দুপুরে হিমুকে নিজে রান্না করে খাওয়ালো রাহিক।তাও নিজহাতে।বিকেলে চা করেও খাওয়ালো।সব শেষে সন্ধ্যায় হিমুকে ড্রপ করে দিয়ে গেলো।

আজ হিমুর জীবনের সবচেয়ে সেরা দিন ছিলো।সে যাকে পছন্দ করে, যে তার স্বপ্নে আসে।সে ছেলে কিনা আজ থাকে প্রপোজ করলো।এখনো সব স্বপ্নের মত হতে লাগলো হিমুর।
মাত্র ১৫-২০ দিনের আলাপেই রাহিক তাকে পছন্দ করে ফেললো!। এখনো মনে হচ্ছে সব স্বপ্নই একটু পর ভেঙে যাবে।বারবার মনে পড়ছে সে মুহুর্তগুলো।রাহিকের বলা কথা গুলো।

হিমু এখন চাইছে, সত্যি যদি অতিতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকতো তাহলে সে বারবার আজকের সকালে ফিরে যেতো।

(৯)

নীলার বাসায় হিমুর যাতায়াত বেড়ে গেলো।
নীলা তো বেশ খুশিই। বেস্ট ফ্রেন্ড তার বাসায় আসছে। কিন্তু সে জানেনা হিমু রাহিকের জন্যই আসে। একবার তো নীলার মাকে ভুল করে শ্বাশুড়ি ডেকে ফেললো হিমু।
সে কি অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়েছিলো সে।
সবাই ভেবেছে নীলাকে হয়তো সে পছন্দ করে তাই শ্বাশুড়ি ডেকেছে নীলার মাকে।
যদিও সেদিনের মত পরিস্থিতি সামাল দেয়া গেছে।কিন্তু হিমু আর রাহিক জানে কি ভেবে হিমু রাহিকের মা কে শ্বাশুড়ি বললো।

রাহিকও হিমুর বাসায় যাতায়াত করতে লাগলো। হিমুর মায়ের হাতের কষা মাংস আর চিংড়ি ভুনা রাহিকের প্রিয় হয়ে গেলো।
রাহিক এমনভাবে কথা বলে হিমুর ফ্যামিলির সাথে, যেনো সে বাইরের কেউ না বা আত্নীয় স্বজনও নয়।সে ঘরেরই সন্তান।
হিমুর ঘর ঘুছিয়ে দেয়,কাপর ধুইয়ে দেয়,হিমুর মাকে রান্নায় সাহায্য করে,বাজার করে এনে দেয়। হিমু জিজ্ঞেস করে “তুমি এসব কেনো করো? প্রতিবার হাসিমুখে রাহিক একটাই জবাব দেয়”তোমার জন্য আর আমার শ্বশুরালয় এর জন্য “।
আর কিছু বলতে পারেনা হিমু।

দিনের পর দিন গড়াচ্ছে। গভীর থেকে গভীর হচ্ছে হিমুর রাহিকের নিষিদ্ধ প্রেম।যে প্রেম শুধু নিষিদ্ধ। তবে এ নিষিদ্ধ প্রেমেই হিমু খুঁজে পেয়েছে তার অস্তিত্ব।

(১০)

-হিমু
-হ্যা বলো রাহিক
-তোমাকে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড রাহাতের কথা বলেছিলাম। মনে আছে?
-রাহাত??যার সাথে তোমার হাইস্কুল থেকে বন্ধুত্ব?
-হ্যা,,সেই রাহাত
-হ্যা তো,,কি হয়েছে ওর?
-ওর কিছু হয়নি।
-তাহলে ওর কথা বলছো যে?
-ও আমার সম্পর্কে জানে।
-হ্যা,,সেটা আমি জানি।তুমি বলছিলা।
তুমি গে সেটা রাহাত জানে।তারপরেও সে তোমার সাথে বন্ধুত্বে এতটুকু দূরত্ব আনেনি।
-হ্যা,,কিন্তু..
-কিন্তু কি?
-তাকে আমার আর তোমার ব্যাপারে বলেছি।
-কি??
-হ্যা,,তোমার সাথে আমার সম্পর্কের কথা বলেছি।
– তুমি আমাকে জিজ্ঞেস না করেই বলে দিলে?যদি সে কাউকে বলে দেয়,,তাহলে?
-সে কাউকে বলবেনা।সে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড না?সে তোমাকে দেখতে চেয়েছে।
-এরমধ্যে আমাকে দেখার ইচ্ছেটাও প্রকাশ করেছে।
-নাহ আমিই বলেছি দেখা করিয়ে দেবো।
-বাহহ,,মহান পুরুষ ওনি।নিজে থেকে বলেছেন। এরপর আর কাউকে জানিয়েছো না,তখন দেখবে তোমার কি হাল করি
-না না সোনা।এটাই প্রথম এবং শেষ
-আমি পারব না ওর সাথে দেখা করতে।
-প্লিজ,, না করোনা।অন্তত আমার জন্য।প্লিজ
-আচ্ছা ঠিক আছে।
-তোমাকেও সাথে থাকতে হবে।
-আচ্ছা,, থাকব

হিমুর সাথে রাহাতের দেখা হয়েছিলো। কিন্তু হিমু যেভাবে চেয়েছিলো সেভাবে হয়নি।হিমুর সাথে রাহিক ছিলোনা।কারন রাহিক জানেনা।হিমু রাহাতের সাথে দেখা করেছে একা। যেখানে হিমু আর রাহাত ছাড়া তৃতীয় ব্যাক্তি ছিলো না।

(১১)
রাত সাড়ে এগারোটা বাজে।হাতঘড়িতে সময় দেখলো হিমু।অনেক দেরি হয়ে গেছে।এবার বাড়ি ফিরতে হবে।রাহিককে মিথ্যা বলা হয়েছে।সে যদি জানত এত রাত অবধি বন্ধুর বাসায় সময় কাটাচ্ছে নিশ্চয় রেগে আগুন হয়ে যাবে।তাই হিমু বললো সে নিজ বাসায় আছে। দ্রুত বন্ধুর বাসার পাঠ চুকিয়ে নিজগৃহের উদ্দ্যেশে বেরিয়ে পড়লো হিমু।অনেক্ষণ অপেক্ষা করেও গন্তব্যের গাড়ি না পেয়ে হাটা ধরলো হিমু।।মধ্য রাত হতে চললো।রাস্তায় নিস্তব্ধতা বাড়ছে।বন্ধ হয়ে যাচ্ছে আশপাশের দোকানপাট। একা একা চুপচাপ হেটে যেতে বোরিং লাগছে।গান শুনলে মন্দ হয়না।প্যান্টের পকেট থেকে ইয়ারফোন বের করে কানে গুজে দিলো।তারপর ইয়ারফোন কানেক্ট করতে মোবাইলটা বের করলো।
স্ক্রিনে তাকিয়ে অবাক হলো হিমু। ২৩ টা মিসডকল!!! তাও আননৌন নাম্বার থেকে।কে করতে পারে এত্তবার কল?যেই করুক না কেন,,নিশ্চয় দরকারে করেছে।ফোন এতক্ষন সাইলেন্ট ছিলো বলে বুঝতে পারেনি হিমু।কালক্ষেপণ না করে দ্রুত কল ব্যাক করলো হিমু।প্রথমবার রিং হয়েই গেলো। কেউ রিসিভ করলোনা।
আবার কল দিলো হিমু।রিং হচ্ছে
-হ্যালো,,,হিমু?
-জ্বি,,আমি হিমু। আপনি কে?
-আমি রাহাত।রাহিকের বন্ধু।
-ওহহ আচ্ছা।এত্ত বার কল দিলেন।আসলে ফোন সাইলেন্ট ছিলো।
-ওহহ আচ্ছা।সমস্যা নাই
-ফোন করার কারনটা জানতে পারি?
-তুমি একবার রাহিকের বাসায় আসো?
-এত্ত রাতে কেনো?কোন সমস্যা?
-নাহহ। সমস্যা নাই।তবে জরুরি দরকার আছে।আমি রাহিকের বাসায় আছি।
-আপনি রাহিককে ফোনটা একবার দিন।
-রাহিক ঘুমাচ্ছে।
-তাইলে আমি সকালে আসব।
-এখন আসো।বাসার বাকিরা বেড়াতে গেছে।তাই রাহিক ফোন করে আমাকে এনেছে। ও একা বলে।আমি ওয়েট করছি।
– হ্যালো,,,হ্যা লো..

ফোন কেটে দিলো রাহাত। একবার যাওয়া দরকার।নিশ্চয় বিশেষ কোন দরকার।
উল্টো পথে আবার হাটা ধরলো হিমু। পনেরো মিনিটের মধ্যে পৌঁছে গেলো রাহিকের বাসায়।গেইটের সামনে রাহাত দাড়িয়ে আছে।হিমুকে দেখতেই এগিয়ে এসে হ্যান্ডশেক করলো।
বাসায় না ঢুকে হিমুর হাত ধরে সোজা ছাদে চলে আসলো রাহাত।তার চাহনি দেখে হিমু বুঝেছে। সে রেগে আছে হিমুর উপর।

-তুমি কি রাহাতকে ভালো হতে দেবেনা হিমু?
-ভালো হতে দেবো না মানে।সে তো ভালোই আছে।
– সে ভালো থাকার কথা বলছিনা।তার একটা মানসিক রোগ আগে যেটার জন্য তুমি দায়ী।
-ওর মানসিক রোগ আছে??
-হ্যা,,,ও সমকামী।
-সেটা আপনি আগে থেকে জানেন এবং তাকে সাপোর্ট দিয়ে আসছেন।
-রাহিক আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। তাই তাকে আমি সাপোর্ট দিচ্ছি যাতে সে সুস্থ হয়ে উঠে।
-আপনি কেনো বুঝতে চাইছেন না।সমকামিতা কোন মানসিক রোগ নয়।এটা ন্যাচারাল।চিকিৎসা দ্বারা এটা ভালো হয়না।
-অতকিছু না বুঝলেও চলবে আমার।আমি চাই রাহিক অন্য দশজনের মত স্বাভাবিক জীবনযাপন করুক।
-আপনি যা চান তা হতেই হবে এমন কোন কথা আছে কি? রাহিকের ইচ্ছের কোন দাম নেই?সে কেমন থাকতে চায়।
-রাত অনেক হলো। রাহিক জেগে গেলে সমস্যা।যা বলার স্পষ্ট করেই বলি।
-কি বলবেন?
-তুমাকে রাহিকের জীবন থেকে সরে যেতে হবে।
-সরে যাবো মানে??আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন রাহাত?
-পাগল কিনা জানিনা।তবে এটা জানি তুমি সরে যেতে বাধ্য হিমু।
-আপনার কথায় আমি সরে যেতে বাধ্য হব কেনো?
-এই দেখো,,আমার ফোনে।তোমাকে করা রাহিকের মেসেজের স্ক্রিনশট। আরো আছে,তোমাদের কিছু অন্তরঙ্গ ছবি।যা রাহিক ঘুমানোর পর ওর ফোন থেকে নিয়েছি।

নিজের আর রাহিকের অন্তরঙ্গ ছবি রাহাতের কাছে দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো হিমু।রাহাত ইতিমধ্যে হুমকি দিয়েছে যদি হিমু সরে না যায় তাইলে এই ছবি আর মেসেজের জন্য রাহিকের কোন ক্ষতি হলে তার জন্য হিমু দায়ী।
মুহুর্তে সব নিজের আয়ত্তের বাইরে চলে গেলো।হিমু অসহায়ের মত রাহাতের শর্তে রাজি হতে বাধ্য হলো।শুধুমাত্র রাহিকের ক্ষতির কথা ভেবে।

চোখের জল মুছে রাহিকের বাসা থেকে চলে গেলো হিমু।ঘুমন্ত রাহিক জানতেই পারল না আজ রাতেই তার প্রিয় বন্ধু তার সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছে।

(১২)
রাহিক ঘুমাচ্ছে।ভোরে আবারও ফিরে আসল হিমু।রাহাতকে অনুরোধ করলো রাহিককে শেষবার দেখে যাওয়ার সুযোগ দিতে।রাহাত সুযোগ দিলো।রাহিকের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো হিমু।ভেতরে শুধু ঘুমন্ত রাহিক আর হিমু।আস্তে আস্তে রাহিকের পাশে গিয়ে বসল। ঘুমন্ত শিশুর মত লাগছে রাহিককে।
“ঘুমালে একেবারে হুঁশ থাকেনা ছেলেটার” মনে মনে ভেবে হাসল হিমু,। পা একদিকে, হাত একদিকে মাথা একদিকে ছড়িয়ে ঘুমাচ্ছে। যত্ন করে ঠিক করে শুইয়ে দিলো হিমু।ইচ্ছে করছে কপালে একটা চুমু দিতে।
চুমু দিলো। একটা না কয়েকটা।
রাহিকের ঘুম ভেঙে গেলো।
হিমুকে দেখে জড়িয়ে শুইয়ে দিলো রাহিক।

-কখন এলে?ডাকলে না কেন?
-তুমি ঘুমাচ্ছিলে তাই।
-রাহাত কোথায়?
-ও পাশের রুমে আছে।তুমি ঘুম থেকে উঠলে কেনো?
-তুমি আসছো তাই
-ওহহ,,তাইলে আমি তোমার ঘুম ভাঙার জন্য দায়ী।ঠিকাচ্ছে।আমি চলে যাচ্ছি।
-আমি ওভাবে বলিনি বাবু।প্লিজ।রাগ করোনা।
-আচ্ছা।মাত্র ভোর হলো। তুমি ঘুমাও।আমি ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছি।:
-এভাবে যদি রোজ ঘুম পাড়িয়ে দিতে
-হয়েছে।এবার ঘুমাও।

মাথায় হাত বুলিয়ে রাহিককে ঘুম পাড়িয়ে দিলো হিমু।কিছুক্ষন রাহিকের দিকে তাকিয়ে তাকলো হিমু।এরপর পকেট থেকে চিঠিটা বের করল। রাহিকের হাতে গুজে দিয়ে বের হয়ে চলে গেলো হিমু।

“আমি পারলাম না তোমাকে দেয়া কথা রাখতে।পারলাম না তোমার সাথে সম্পর্ক ঠিকিয়ে রাখতে।পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও।ইতি হিমু”

হাতের মুঠোয় এমন চিঠি পেয়ে হতভম্ব হয়ে গেলো রাহিক।হিমু ফোন বন্ধ করে রেখেছে।যোগাযোগ করার অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো রাহিক।
এরপর থেকে বিদেশ চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত হিমুর সাথে অনেক যোগাযোগ করার চেষ্টা করলো রাহিক।নীলাকে দিয়েও হিমুর খোজ করালো।কিন্তু হিমুর হদিস পাওয়া গেলো না।
হিমুর বাড়ি গিয়েও দেখলো।পেলো না।হিমুরা বাড়িতে তালা দিয়ে গ্রামের বাড়ি চলে গেছে।কবে ফিরবে কাউকে বলেনি।
হিমুকে ছাড়া প্রতিটি মুহুর্ত অর্থহীন মনে হতে থাকলো রাহিকের কাছে।ভেতরটা হাহাকার করছে।কাউকে বলতে পারছেনা।
রাহাতকেও বলতে পারছেনা হিমুকে খুজে দিতে।কারন রাহাতের সাথে হিমুর পরিচয় করিয়ে দেয়নি সে।

হিমুর প্রতি অগাধ ভালোবাসা, রাগ নিয়ে বিদেশ চলে গেলো রাহিক।যাওয়ার আগে রাহাতকে বলে গেলো হিমুকে পেলে যোগাযোগ করিয়ে দিতে।রাহিক চলে যাওয়ার পর অনেকবার হিমুর সাথে রাহাতের দেখা হয়েছিলো। কিন্তু রাহাত যোগাযোগ করিয়ে দেয়নি।

(১৩)
“প্রিয় এখনো ঘুমাচ্ছো?তাড়াতাড়ি উঠো”
প্রিয়াংককে ঘুম থেকে একরকম জোর করেই টেনে তুললো আদর।ছেলেটা দিন দিন ঘুমকাতুরে হয়ে যাচ্ছে।ঘুম পেলে আর কোন কিছুর হুস থাকেনা।প্রিয়াংকের কাঁধে টাওয়েল জড়িয়ে ও মুখে ব্রাশ গুজে দিয়ে ঠেলে বাথরুমে ঢুকিয়ে দিলো আদর।প্রিয়াংক বেরুতে বেরুতে দ্রুত নাস্তা রেডি করলো আদর।প্রিয়াংক বের হলে তাকে খাইয়ে দিলো। এরপর নিজে খেলো।
খাওয়া শেষে প্রিয়াংককে রেডি করে দিলো তারপর নিজে রেডি হলো।

-আচ্ছা,, আদর তোমার বোর লাগেনা,?
-কেনো বোর লাগবে?
-এই যে রোজ আমাকে ঘুম থেকে টেনে তুলো,খাইয়ে দাও, বের হওয়ার জন্য রেডি করে দাও।
-দূর পাগল,,,বউ যখন অলস তখন বরকেই তো সব করতে হয়।
-আমি অলস,,,???
-নয় তো কি?,,,যদি কাজের কাজি হতে,,আমার সব কাজ করতে।এখন উল্টে আমাকেই করতে হচ্ছে।
-যাও,,যাও।আর করতে হবেনা,,ছাড়ো টাই।
আমি নিজেই পরে নিচ্ছি।
-হ্যা,,নিজের টাই নিজে পরো।পরে যেনো আমাকে না ডাকো।প্রতিবার জেদ দেখিয়ে তো নিজে পরতে যাও।পেরেছো?
-এবার পারব,,তুমি নিজের কাজ করো গিয়ে।

আজকেও প্রিয়াংক জেদ দেখিয়ে আদরকে টাই বাঁধতে দিলোনা ঠিকি।পরে আমতা আমতা করে আদরের কাছেই যেতে হলো ঠিক করতে।কারন প্রিয়াংক টাই পরতে পারেনা নিজে নিজে।

রেডি হয়ে বের হলো আদর প্রিয়াংক।আজ রাহিককে অফিসে আসতে বলেছে আদর।চাকরির জন্য নয়।নিজের অফিস দেখাতে।নিজের চেম্বারে বেশ সন্তুষ্ট সে।
নতুন পিএ বেশ কাজের।যে কাজ দেওয়া হোকনা কেনো।নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা দিবে তা করার। সব সময় আদর আসার আগেই আদরের চেম্বারে পৌঁছে যায় সে।আগের পি এ সপ্তাহে দু-তিনবার লেইট করবেই আর কাজের বেলায় অষ্টরম্ভা। তাই তাকে ছাঁটিয়ে নতুন পি এ হিসেবে হিমুকে নিয়োগ দিয়েছে আদর।এমন কাজের পিএ পেয়ে সন্তুষ্ট আদর।

-হিমু,,,
-জি স্যর
-কেমন আছো?
-জ্বি স্যর ভালো আছি।
-আমি কেমন আছি জিজ্ঞেস করবে না?
নাকি জিজ্ঞেস করতে ভয় লাগে?
-স্যরি স্যর
-ইটস ওকে।আমি মজা করছিলাম।আমাকে ভয় পাওয়ার কোন কারন নেই।কোন সমস্যা বা দরকার হলে বলবা।
-আচ্ছা স্যর।
-গতকাল ছুটি চেয়েছিলে না আজকের জন্য?
-হ্যা স্যর,
-কি জন্য,,?
-মা গ্রামের বাড়ি যেতে চেয়েছিলো।পৌঁছে দিয়ে আসার জন্য।
-এখন ছুটি দিলে খুব অসুবিধা হবে,,?
-না স্যর
-আচ্ছা,,তুমাকে আজকাল বেশ আপসেট দেখাচ্ছে।কারন কি?
-কিছুনা স্যর।এমনি।আমি ভালো আছি।
-আচ্ছা,,তুমাকে ৪ দিনের ছুটি দিচ্ছি।মায়ের সাথে গ্রামে গিয়ে মনটা ফ্রেশ করে এসো।
-থ্যাংক ইউ স্যর।
-ওয়েলকাম। তার আগে তোমাকে এখন একটা জায়গায় যেতে হবে।
-কোথায় স্যর
-সাথে ড্রাইভার যাবে।আমার এক বন্ধু আসবে আজ।তুমি তাকে নিয়ে আসবে।
-ঠিক আছে স্যর।
-তুমি গিয়ে গাড়িতে বসো।আমি ড্রাইভারকে বলে দিচ্ছি।
-ওকে স্যর
-শোনো,,তুমি আমার বন্ধুকে এখানে এনেই চলে যেতে পারো।সমস্যা নেই।
-আচ্ছা স্যর।
-ওকে যাও।

(১৪)
রেডি হয়ে ঘরে বসে রইলো রাহিক।সে নিজে চলে যেতে পারত আদরের অফিসে।কিন্তু আদর তা মানতে নারাজ।সে গাড়ি পাঠিয়েছে। সে গাড়িতে করেই আসতে হবে।সঙ্গে আদরের পিএ আসছে তাকে নিতে।আধঘণ্টা ধরে ওয়েট করছে রাহিক।
আর মনে মনে বিরক্তও হচ্ছে।

আদরের বন্ধুকে আনতে বেরিয়ে পড়ল হিমু।
বসের আচরনে মাঝে মাঝে ক্ষুব্ধ হয় সে।তার দায়িত্ব বসের অফিসিয়াল কাজ হ্যান্ডেল করা।অথচ বস আদর তাকে তা করতে দেয়না বললেই চলে।প্রায় বিভিন্ন জায়গায় পাঠিয়ে দেয় হিমুকে।আজ ওমুক ক্লায়েন্ট আসবে, কাল ওমুক বন্ধু আসবে। ব্যাস হিমুকে পাঠিয়ে দেয় নিয়ে আসতে। শুধু পাঠিয়েই কান্ত হয়না সে।বলে দেয় অফিসের বাইরে গিয়েও যেনো অফিসের নিয়ম মেনে চলে। ক্লায়েন্ট বন্ধুদের আনতে গেলে তাদের কে হাই হ্যালোর চেয়ে বেশি কিছু যেনো না বলে।আজকেও বলে দিয়েছে,,”যে আসছে সে আমার খুব কাছের বন্ধু,,তার সাথে গল্পগুজব করোনা।সে একদম এসব পছন্দ করেনা।সে যা জিজ্ঞেস করবে তার উত্তরই দিবে শুধু। “
হিমু শুধু হ্যা সূচক ঘাড় নাড়ালো।

গাড়ি এসে থামল রাহিকের বাসার সামনে।প্রথমে হিমু খেয়াল না করলেও পরে বুঝতে পারে সে রাহিকের বাসায় এসেছে।সে ভেবেছে ড্রাইভার ভুল করে এখানে নিয়ে এসেছে। কিন্তু পরে দেখল সে ঠিক জায়গায় এসেছে।
গাড়ির হর্ন শুনে বেরিয়ে আসছে রাহিক।তাকে আসতে দেখে বুঝতে পেরেছে হিমু।রাহিকই আদরের কাছের বন্ধু।হিমুর চোখে জল এসেছে রাহিককে দেখে।
ড্রাইভার আর রাহিক দেখে ফেলতে পারে।তাই দ্রুত চোখ মুছে নিজেকে সামলে নিলো সে এবং বসের কথামত রাহিককে ওয়েলকাম করতে গাড়ি থেকে নামল হিমু।
“স্লামালাইকুম,, স্যর,আমি হিমু।আদর স্যরের পারসোনাল এসিস্ট্যান্ট।স্যর আমাকেই পাঠিয়েছেন আপনাকে নিয়ে যেতে”রাহিকের দিকে হাত বাড়িয়ে বললো হিমু।
হিমুকে দেখে থমকে দাড়ালো রাহিক।সে কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে।চুপচাপ হিমুর দিকে হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করলো।
হিমুকে দেখে কথার ভাষা হারিয়ে ফেললো রাহিক।
“স্যর গাড়িতে বসুন”হিমু বললো।
রাহিক গাড়িতে এসে বসলো।হিমু ড্রাইভারের পাশে বসল।

রাহিককে অফিসের সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলো হিমু।ছুটি কাটাতে।

(১৫)
মধ্যরাত।আকাশে পূর্নিমার চাঁদ। বারান্দায় দাড়িয়ে আছে রাহিক।গায়ে নীল পাঞ্জাবি। আদরের অফিস থেকে ফেরার পর খুব পাঞ্জাবি পরতে ইচ্ছে হয়েছিলো।হিমু পছন্দ করতো পাঞ্জাবি।হিমুর সাথে যখন সে খুব সুন্দর দিন কাটাচ্ছিলো তখন প্রায় দুজনে পূর্নিমার রাতে পাঞ্জাবি পরে ছাদে শুয়ে থাকত।রাহিকের বুকে হিমু মাথা পেতে শুয়ে থাকত আর দুজনে চাঁদের আলো গায়ে মাখত।হিমু সারারাত বক বক করেই যেতো।রাহিক প্রথমের গুলা শুনলেও শেষের গুলা শুনতো না।কারন রাত শেষ হয়ে যেত আর রাহিকেরও চোখ জুড়ে ঘুম আসত।কিন্তু হিমুর বক বক করা থামত না।এক পর্যায়ে হিমুও ঘুমিয়ে পরত।
রাহিকের গায়ের নীল পাঞ্জাবিটা হিমুর দেয়া।হিমু যখন রাহিককে এ পাঞ্জাবি দেয় পরদিন রাহিক হিমুকে একটা হলুদ পাঞ্জাবি দিয়েছিলো আর বলেছিলো “হিমুদের হলুদ পাঞ্জাবিতেই মানায়”
ওটা দেয়ার পর হিমু খুশি দেখে কে।ছেলেটা যতক্ষণ তার সামনে থাকতে।সে তার দিকেই তাকিয়ে থাকত।
ভাবতে ভাবতে বাঁচোখের কোণ বেয়ে জল নামল। রাহিক মুছল না।ছোটবেলায় মায়ের মুখে শুনেছে বাঁচোখের জল নাকি সত্যি। কেউ যখন সত্যিকারে কারো জন্য কাঁদে তাহলে আগে বাঁচোখে জল আসে।

নীলার কাছ থেকে হিমুর নাম্বার নিয়েছে রাহিক।এখন মধ্যরাত।ফোন দেবে কি দেবেনা ভাবছে সে।যদি হিমু ঘুমিয়ে পড়ে তাহলে ফোনের জন্য তার ঘুম ভেঙে যাবে।
হিমুর কাঁচা ঘুম ভেঙে গেলে তার প্রচন্ড মাথাব্যথা শুরু হয়।এটা রাহিক ভালোভাবেই জানে।তাই ফোন দিলো না।
তারচেয়ে কাল হিমুর বাড়ি যাওয়াই ভালো।কাল হিমু ঘরে থাকবে হয়তো।আদর বলেছে সে তার পিএকে ৪দিনের ছুটি দিয়েছে। যদিও রাহিক যে হিমুকে চেনে তা আদরকে জানায়নি।
কাল ভোরেই হিমুর বাড়ি যাবে বলে ঠিক করলো রাহিক।সকাল হতে হতে যদি সে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে।

কাল হয়তো এতদিনের জমে থাকা প্রশ্নের উত্তর পাবে সে।

(১৬)
হিমুর মা ফজরের আজানের সাথে সাথেই ঘুম থেকে উঠেন। নামাজ পরেন,। নামাজ শেষে ঘন্টাখানেক কুরআন তিলাওয়াত করেন।তারপর সকালের নাস্তা তৈরি করেন।
নাস্তা নিয়ে হিমুর ঘরে যান আর হিমুকে ডেকে তুলেন ঘুম থেকে।এ তার প্রতিদিনকার নিয়ম।

আজও ফজরের নামাজ পরলেন।এরপর কুরআন তিলাওয়াত করতে বসবেন এমন সময় দরজায় করাঘাত।এত্ত ভোরে কে আসতে পারে? ভাবতে ভাবতে দরজা খুলে দিলেন।
-স্লামালাইকুম আন্টি।
-ওয়ালাইকুম। তোমাকে তো চিনলাম না
-আমাকে চিনতে পারছেন না?
-দিন দিন বয়স হচ্ছে। সব ভুলে যাচ্ছি তাই।
-আন্টি আমি রাহিক।হিমুর বন্ধু নীলা আছে না?তার ভাই
-ওহহ,,,চিনতে পেরেছি। তুমি নিলুর ভাই।
নীলাকে আমি নিলুই বলি।বড্ড ভাল মেয়ে।
তা বাবা বাইরে দাড়িয়ে আছো কেন ভেতরে এসো।
-…
-বিদেশ থেকে কবে ফিরলে বাবা?
-এই তো আন্টি,,,কিছুদিন হলো।
-তা,,হঠাৎ ভোরবেলা। কি মনে করে?
-বেশ কিছুদিন হিমুর সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না। তাই ভাবলাম ঘরে গেলে পাব।তাই ভোরেই এলাম।সকাল হতে হতে যদি বেরিয়ে যায় ও।
-ও আচ্ছা। বেশ বেশ। হিমু এখনো ঘুমুচ্ছে।তুমি বসো।আমি ডেকে দিচ্ছি ওকে।
-নাহ আন্টি ঠিক আছে।আমি ওর ঘরে গিয়ে ডাকছি।আপনি মনে হয় কুরআন পড়তে বসেছেন। আপনি পড়ুন।আমি যাচ্ছি।
-আচ্ছা,,বাবা।যাও তাহলে।

হিমুর ঘরে ঢুকলো রাহিক।ঢুকে দরজাটা নিঃশব্দে বন্ধ করলো।ভেতরে শুধু ঘুমন্ত হিমু আর রাহিক।আস্তে আস্তে হিমুর পাশে গিয়ে বসল রাহিক।হিমুর দিকে তাকালো।এ কবছরে অনেক পাল্টেছে ও।আগের থেকে রোগা হয়ে গেছে।নিশ্চয় নিজের খেয়াল রাখেনা হিমু।ওর দিকে চেয়ে ইচ্ছে করছে কপালে একটা চুমু দিতে।একটা না কয়েকটা।
কিন্তু দিল না।

(১৭)

-হ্যালো,,, কে?
– আমি রাহিক।চিনতে পারছিস?
– হ্যা,,কিন্তু এটা তো বাংলাদেশ এর নাম্বার। তার মানে তুই দেশে?
-হ্যা। আমি এখন দেশে “
-কবে আসলি?জানালি না কেন?
-এমনি। হঠাৎ করে চলে এলাম।
-ওহ আচ্ছা।
-তুই এখন কোথায়?
-আছি মেসে।
-আগেরটা নাকি নতুন?
-আগের জায়গায় আছি।
-তুই থাক। আমি আসছি।

এতক্ষন রাহাতের সাথে কথা বলছিলো রাহিক।হ্যা সেই রাহাত যাকে সে বেস্ট ফ্রেন্ড মনে করতো।যে বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে তার সবচেয়ে বড় ক্ষতিটাই করেছে।এখন রাহিক যাচ্ছে রাহাতের কাছে।শেষ না হওয়া অংক শেষ করতে।

রাহাতের মেসে পৌঁছালো রাহিক।কলিং বেল বাজাতেই রাহাত দরজা খুলে দিলো।তবে রাহাত বেশি চমকে গেছে।রাহিককে দেখে নয়।রাহিকের সাথে হিমুকে দেখে।এটা আশা করেনি সে।রাহাতের বুঝতে বাকি রইলোনা যে রাহিক সব জেনে গেছে।রাহিক আর হিমুকে আলাদা করার পেছনে তারই হাত ছিলো।

-তুই এটা কেন করেছিলি রাহাত?
-আমি কি করেছি?
-আমার সাথে হিমুকে দেখে বুঝতে পারছিস না?
-তুই এমন রেগে আছিস কেন?বস শান্ত হয়ে।
-তুকে আমি বেস্ট ফ্রেন্ড ভাবতাম।তাই আমার ইচ্ছে অনিচ্ছা অনুভুতি সব তুকে জানাতাম।আর তুই এটার সুবিধা নিলি?
-শোন।,, শোন রাহিক।তুই যা ভাবছিস তা না।
-হ্যা তাই।তুকে আমি বলেছি একবারো আমি স্বাভাবিক হতে চাই?আমি গে এটা মানসিক রোগ এটা তুকে কে বললো?
-এটা ঠিক না।তুকে স্বাভাবিক…..
-ব্যস।তুকে বলতে হবেনা।আমি যেভাবে সুখি থাকতে চাই সেভাবে দিস নি কেন?তুই হিমুকে ভয় দেখিয়ে আমার জীবন সরিয়ে দিয়েছিস।আর এত্তদিন আমার সামনে ভালো সেজে গেলি?
-আমি… আমি..
-হ্যা তুই। তুকে বিশ্বাস করাটা আমার ভুল।তারচেয়ে বড় ভুল তুকে আমার ভেতরের সত্তা সম্পর্কে জানানো।
-আমি তুকে সব বলছি।তুই বস আগে।
-যা জানার আমি আজ সকালেই হিমুর থেকে জেনে নিয়েছি।তুই আমার হিমুর অন্তরঙ্গ ছবি দেখিয়ে ভয় দেখিয়েছিলি তাকে?
যাহ,,,ফাঁস করে দে।সবাই জানুক। আমি সমকামী।আমি আমার সত্তা নিয়েই বাচতে চাই।আজ থেকে তুর সাথে আমার সব সম্পর্ক শেষ।
-…

হিমুকে নিয়ে চলে গেলো রাহিক।রাহাত চুপ করে রইলো।তার মুখে কথা নেই।একটু আগে সব স্বাভাবিক ছিলো।কয়েক মিনিটেই সব কেমন পাল্টে গেলো।হঠাৎ ঝড় এসে যেনো সব লন্ডভন্ড করে দিয়েছে।সে এখন বুঝতে পারছে সে কত বড় ভুল করেছে।সে তার বেস্ট ফ্রেন্ড কে হারিয়েছে।যে তাকে অন্ধের মত বিশ্বাস করত তাকে সে ঠকিয়েছে।এখন অনুশোচনা করে কোন লাভ নেই।

(১৮)
৩-৪ মাস পর।
হিমু রাহিক এখন একি অফিসে চাকরি করে।আদর-প্রিয়াংকের অফিসে।হিমুকে এ কদিন ধরে হাসিখুশি, কাজে স্বতঃস্ফূর্ত দেখে খুশিই হলো আদর।”মাঝে কদিন যে ছেলেটার কি হয়েছিলো,, সারাক্ষণ মন মরা হয়ে থাকত” মনে মনে ভাবে আদর।

আদর আজকাল একটা বিষয় নোটিস করছে।হিমু তার বন্ধু রাহিকের প্রতি আলাদা একটা আবেগ দেখায়। কাজ শেষ করেই রাহিকের রুমে গিয়ে বসে থাকে,লাঞ্চও একসাথে করে।তারচেয়ে বড় ব্যাপার হলো দুজনই একসাথে আসাযাওয়া করে।হিমুর এ আচরন পরিষ্কার না হলেও অনুমান করতে পারে আদর।

(সমাপ্ত)

লেখকঃ অপরাহ্নের কাব্য 

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.