একটি অ-সম কাহিনী

কুমার

মানুষের নিজেই নিজেকে জানতে অনেক সময় লেগে যায়।ঘুমের ঘোর লেগে থাকা লোককে যেমন ঝটকা দিয়ে জাগিয়ে তুলতে হয় , সেরকমি মাঝেমাঝে উদ্দীপকের প্রয়োজন হয় নিজেকে সজাগ করে তুলতে….. মৃদুল এর জীবনেও ইতিবৃত্তটাও কিছুটা তাই
সাধারন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে মৃদুল।ছোটোবেলাতেই বাবা মা কে হারিয়েছে। মামার বাড়িতে থেকে অনেক কষ্টে মানুষ….ভাগ্য একটু সদয় হয়েছিল, তাই কোনোমতে কলসেন্টারের কাজটা পেয়ে যায়…..দেখতে শুনতে ভালো, চাকরিও করে,তাই টুকটাক বিয়ের সম্বন্ধও আসছিল। কিন্তু মৃদুলের কাউকেই পছন্দ হয় না। কি করে অন্যদের বুঝাবে, যখন সে নিজেই বুঝতে পারেনা যে,কেন তার কোনো মেয়েদের প্রতিই আগ্রহ হয় না।ছাত্রজীবন একরকম নিরামিষই কেটেছে……”কোনকিছু” হওয়া তো দুরে থাক, আজ পর্যন্ত কোন মেয়ের সাথে তার নামটুকুও জড়ায়নি।তবে ছেলেদের প্রতি একটা আকর্ষণ,চোরাস্রোতের মতো মনের গভীরে বয়ে যেতো,যেটা সে নিজেই নিজের কাছে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করতো।

কিন্তু সেটা আর সম্ভব হল না,যেদিন অবিনাশ লাহা তাদের কলসেন্টারে জয়েন করল।অবিনাশের টলডার্ক হ্যান্ডসাম চেহারা,সুন্দর ব্যক্তিত্ব, অসাধারন বাগ্মিতা সব মিলিয়ে যেন চুম্বকের মতো।যেখানেই যায় সেখানেই আকর্ষনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। প্রথমদিন অফিসের সবার সাথে পরিচয় করার সময় যখন মৃদুলের দিকে হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়ায়,তখন মৃদুল কিছুটা মন্ত্রমুগ্ধর মতো দুই হাত দিয়ে অনেকক্ষণ জড়িয়ে থাকে অবিনাশের হাতদুটো …….কে এ?….. এ কি সেই, যার অপেক্ষায় এতোদিন ছিলাম……কিছুক্ষন পর ঘোর ভাঙ্গলে লজ্জিত হয়ে, হাত ছেড়ে দিয়ে আলাপ পরিচয় শুরু করে।এই ক্ষনিকের লজ্জাটুকু অবিনাশের চোখে পড়লেও ,সে কিছু বলে না।

এরপর থেকে মৃদুলের দিনগুলো কেমন পাল্টে যেতে থাকে।যখন ঘরে থাকে তখন নানারকম কাজের মাঝেও অবিনাশের কথা ভাবতে থাকে…..আর অফিসে থাকলে বেশিভাগ সময় নজর চলে যায় অবিনাশের কেবিনের দিকে।মৃদুলের একটা কেবিনের পরেই……মাঝে শুধু ফাইবার গ্লাসের স্বচ্ছ পার্টিশন।একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অনেক সময় নিজের মনের সাথেই অজান্তে কথা বলতে থাকে……বলো না অবিনাশ, আসবে আমার কাছে? ধরবে আমার হাতদুটো দু হাত দিয়ে?…চলবে আমার সাথে চির জীবনের সাথি হয়ে?…… আবার চোখাচোখি হয়ে গেলে,একটু ভদ্রতার হাসি হেসে চোখ সরিয়ে নেয়।

মৃদুলদের অফিস চারতলায়।একদিন লিফ্টে উঠতে যাবে এমনসময় অবিনাশও এসে পড়ে। দুজনেই একটা লিফ্টে উঠে পড়ে।বেশ ভীড় ছিল লিফ্টে…..দুজনে প্রায় গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাড়িয়ে পড়ে।অবিনাশ কিছুটা কাজ নিয়ে মোবাইলে মগ্ন ছিল তাই লক্ষ করেনি, মৃদুল প্রায় মোহগ্রস্তের মতো বুকের কাছে ওরদিকে তাকিয়ে।আর কোমরের কাছটা আলতো করে এক হাতে জড়িয়ে আছে।অবিনাশের হালকা উষ্ণ নিশ্বাস ঘাড়ে এসে পড়ছে।এর আগে এতো কাছে অবিনাশকে কখনো পায়নি……অবিনাশের শরীরের পুরুষালি গন্ধ,হালকা গোলাপি পাপড়ির মতো ঠোট,স্বপ্নিল মায়াবী চোখ,টিকালো নাক এইসব দেখতে দেখতে মৃদুলের খুব ইচ্ছে করছিল,ওকে বুকের মাঝে নিবিড় আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরতে আর চুমোয় চুমোয় ভরে দিতে, আর এভাবেই অনন্তকাল লিফ্ট চলতে থাকুক তাদের নিয়ে। অনেক কষ্টে মৃদুল নিজেকে সামলে রাখে। কিন্তু যন্ত্র বোঝেনা অযান্ত্রিকের মনোবাসনা,তাই চারতলায় এসে লিফট থামতে, সবাই যে যার গন্তব্যর দিকে বেরিয়ে যায়, মৃদুলও নেশাগ্রস্তর মতো কেবিনের দিকে এগিয়ে যায়।

কথায় কথায় মৃদুল একদিন অবিনাশকে জিজ্ঞাসা করে–
ফিউচার প্ল্যান কি ভেবেছো? বিয়ে টিয়ে কবে করছ?
অবিনাশ একটু সলজ্জ হেসে বলে– না এখনো তেমন কিছু ঠিক করিনি,আর একটু সেটল হয়ে নিই তারপর দেখা যাবে
— তা কাউকে কি ঠিক করা আছে? মানে ‘বিশেষ কেউ’…..গার্লফ্রেন্ড?…
— না না সেরকম কেউ নেই।
জবাবটা শুনে মৃদুলের একটা স্বস্তির নিশ্বাস বেরিয়ে আসে।এটা অবিনাশ লক্ষ করল এবং একি প্রশ্ন মৃদুলকে করলে, মৃদুল হেসে বলল…. তোমার মতোই….সেম কেস,ওসবের ভাবনাচিন্তা কিছু করিনি।….কিন্তু হাসিটা প্রানখোলা নয়,হাসির নীচে যেন অনেককিছু চাপা ছিল।
এভাবেই টুকটাক দেখা হয়,কথাবার্তা হয় কিন্তু মনের কথা মনেই থেকে যায়, মুখে আর ফোটে না…..একটা ছেলে হয়ে একটা মেয়েকে ভালোবাসার কথা বলা যতোটা সহজ, ততোটাই কঠিন একটা ছেলে হয়ে ছেলেকে সেটা বলা।শাস্ত্রে কোথাও সমকামিতার বিরুদ্ধে একলাইনও লেখা নাই অথচ শাস্ত্রজ্ঞ পন্ডিতরা যুগযুগ ধরে ধর্মের দোহাই দিয়ে একে নিষিদ্ধ করে রেখেছে।সাধারন মানুষের এমন মগজধোলাই হয়েছে যে তারা ‘ব্যতিক্রম’ হওয়া দুরে থাক… ভাবতেও পারেনা। কিন্ত ‘মন’ নামের এই পদার্থটা কবেই বা শাস্ত্রযুক্তি মেনে চলে। মৃদুল ভেবে পায় না কিভাবে সে মনের কথা অবিনাশকে জানাবে।দৈব বোধহয় সহায় ছিল তাই একদিন সুযোগ এসেও গেল–

দিওয়ালী উপলক্ষে একটা অফিসপার্টি ছিল।কাছেই একটা হোটেলে। লেট নাইট পার্টি। মৃদুল ঘরে বলেই গেছিল ফিরতে দেরি হবে।
পার্টি ছিল বেশ জমকালো। সবাই তখন ফুরফুরে রঙিন মেজাজে।নাচ,গান,আড্ডা,খানাপিনা,ড্রিংক সবই চলছে ।কিন্তু মৃদুলের নজর ছিল অবিনাশের দিকে।অবিনাশকে লাইট ব্লু শার্টে অপূর্ব লাগছিল।মৃদুল অবিনাশের কাছে গিয়ে বসল একি টেবিলে, আর হাসিঠাট্টার ছলে একটু জোর করেই ওকে বেশী বেশী করে ড্রিংক করাতে লাগলো।এমনসময় চারপাশ একটু নির্জন জায়গা দেখে নিয়ে অবিনাশকে কাছে টেনে নিয়ে দুহাতে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল, আর গভীর আশ্লেষে নিজের ঠোট দিয়ে ওর পাঁপড়ির মতো ঠোট দুটো চেপে ধরলো…. বহুদিনের তপ্ত মুরুভুমি প্রচন্ড পিপাসায় অমৃতের বারিধারা পান করে চললো…যেন অন্তহীন তৃষ্ণা।অবিনাশ তখন ঠিক প্রকৃতিস্থ ছিল না তাই নেশাগ্রস্তর মতো মৃদুলের কথাই শুনে যাচ্ছিল……
অবিনাশ…. অবিনাশ… তোমাকে খুব ভালোবাসি অবিনাশ খু..উ..ব..।জানিনা তুমি আমাকে ভালোবাসো কিনা।কিন্তু প্লিজ, শুধু ছেলেকে ভালোবাসি বলে আমাকে ঘৃনা করো না।শুদ্ধ ভালোবাসায় কোনো পাপ নেই,উচু নীচু নেই, কুল মান জাতির বিচার নেই, কোনো লিঙ্গভেদও নেই।ভালো যদি নাও বাসো, অন্তত ঘৃনা করো না।সেটা আমার সহ্য হবে না। এইটুকু দয়া করো….. প্লিজ।… বলতে বলতে মৃদুলের চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসে…. অবিনাশের গাল ভিজিয়ে দিতে থাকে। অবিনাশ বুঝতে পারে আর শুধু চুপ করে থেকে মৃদুলের প্রবল হৃদস্পন্দন অনুভব করতে থাকে।আর একবার গাঢ় আলিঙ্গনে অবিনাশকে জড়িয়ে ধরে,ছেড়ে দিয়ে মৃদুল ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
ওইদিনের ঘটনার পর দুজনেরই একটা অস্বস্তিকর পরিবেশের মধ্যে দিন কাটতে থাকে।দুজনের মধ্যে যেন একটা চাপা লুকোচুরি চলতে থাকে।সামনাসামনি হয়ে গেলে কোনো ছলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা।একজনের বাস্তবের সম্মুখীন হওয়ার ভয়, আরেকজনের বাস্তবকে স্বীকার করার লজ্জা। যদিও অবিনাশ সেদিন নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সবকিছু ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারেনি তবুও সেই আবেগঘন মুহূর্তে মৃদুলের বলা হৃদয়স্পর্শী কথাগুলো বারবার কানে এসে বাজছিল। কিন্তু এ কি করে সম্ভব……ছেলেয় ছেলেয় আবার ভালোবাসা হয় নাকি?….. তবে এটাও মনে হচ্ছিল না, মৃদুলের উচ্চারিত কথাগুলো একবর্ণও মিথ্যা হতে পারে। অবিনাশ ভেবে পাচ্ছিলনা এই পবিত্র প্রেমকে গ্রহন করার সামর্থ্যই বা তার কোথায় আবার প্রত্যাখান করার মতো নির্দয়তাই বা কোথায়।
কিন্ত মৃদুলের পক্ষে এইভাবে থাকা আর সহ্য হচ্ছিল না।তাই একদিন অফিস ছুটি হওয়ার পর অবিনাশ যখন কাজ শেষ করে কেবিন থেকে বেরোতে যাবে, এমনসময় মৃদুল এসে ঘরে ঢোকে…

— অবিনাশ একটু দাড়াও, কিছু কথা ছিল। সেদিন পার্টিতে যা হয়েছিল তারজন্য আমি মাফ চাইছি।
হয়ত সেটা তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে করেছিলাম।কিন্তু বিশ্বাস করো সেটা আমি আবেগের বশে, নেশার ঘোরে করিনি।অনেক আগেই বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সাহস হয়নি।এখনো তোমার উত্তরের আশায় আছি অবিনাশ…….কোন জবরদস্তি নেই। তোমার যেটা সিদ্ধান্ত হবে তাই মেনে নেব। কিন্তু প্লিজ…..চুপ করে থেকে এড়িয়ে যেয়ো না।এটা আমার পক্ষে আরও কষ্টকর।

অবিনাশ এতক্ষন মাথা নীচু করে,টেবিলের দিকে তাকিয়ে শুনে যাচ্ছিল।মৃদুল হঠাৎ এভাবে সামনে চলে আসবে ভাবতে পারেনি।সেদিকে তাকিয়েই আসতে আসতে বলল…… মৃদুল, আসলে এই ব্যাপারটা আমার কাছে এতোটাই আনএক্সপেক্টেড ছিল,যে এখনো আমি নিজেই ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি।প্লিজ কিছু মনে করোনা, আমাকে একটু সময় দাও।
মৃদুল একটু কঠিন হয়েই বলল…ওকে,টেক ইয়োর টাইম।গুডবাই…বলে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
এভাবেই দিন কাটছিল।মৃদুলের কাছে এটা ক্রমশ অসহ্য হয়ে উঠছিল।সারাদিনের ক্লান্তির পর রাতে যখন ঘুমাতে যেত,তখন বিধাতার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ বুকফাটা আর্তনাদ হয়ে বেরিয়ে আসত….”কেন…কেন আমার সাথে এরকম হল?সমকামী হয়ে কি অপরাধ করেছি?..কোথায় যাব আমি? কি করব..আমার মরন হয় না কেন”…… নির্জন রাতের অন্ধকার শুধুই চুপ করে শুনেছে….কোনো প্রত্যুত্তর দেয়নি।

মৃদুল অবশেষে ঠিক করে,এই চাকরী থেকে রিজাইন দেবে….যে করেই হোক অবিনাশের কাছ থেকে দুরে যেতে হবে, না হলে তার মুক্তি নাই এ অসহ্য জ্বালা থেকে। এ ব্যাপারে অফিসের মানিকবাবুর সাথে কথাও বলে রাখে, তিন চারদিন সময় লাগবে।এরই মাঝে একদিন অফিস ছুটি হয়ে সবাই বেরিয়ে গেছে,মৃদুলও কাজ সেরে কেবিন থেকে বেরোতে যাবে এমন সময় অবিনাশ এসে ঢুকল-
– শুনলাম তুমি নাকি চাকরী ছেড়ে দেবে? কারনটা কি আমি?
মৃদুল চুপ করে মাথা নিচু করে রইল।অবিনাশ বলতে থাকল…. জান মৃদুল, মিথ্যা বলব না এইকদিন তোমার কথাই বেশি ভেবেছি।যেদিন শুনলাম তুমি চাকরি ছেড়ে দিচ্ছ, সেদিন মনে হল, কিছু একটা যেনো ভুল হয়ে যাচ্ছে, হারিয়ে ফেলতে চলেছি ভীষন দামি কিছু….কিন্তু কি?…. কি সেটা?… সে যেনো এক পাগলা ভুত মাথায় চেপে বসেছিল…..রাতের ঘুম গেলো উড়ে….ভোরবেলার ঠান্ডায় একটু তন্দ্রাভাব এলে, বিছানায় কুঁকড়ে শুয়েও অভাববোধ হচ্ছিল যেনো কিছুর…..তখন বুঝলাম সেটা ছিলো তোমার সেই দুই হাতের মাঝে জড়িয়ে থাকার নিশ্চিন্ত আরামটুকু সমাজ,লোকনিন্দা,আইনকানুন সবকিছু আমার বুদ্ধিকে চারদিক দিয়ে ঘিরে ধরেছিল,কিন্তু মনের কাছে সব হেরে গেছে মৃদুল। তাই হয়তো একটু দেরী হয়ে গেলো বুঝতে যে, কখন তুমি সমস্ত মন জুড়ে বসে গিয়েছ.. …
আই লাভ ইউ……বলে মৃদুলকে জড়িয়ে ধরল পরম আবেশে, আর ঠোঁট দিয়ে গভীর চুম্বন এঁকে দিল।দুজনের চোখেই তখন জল,তবে সেটা মিলনের… আনন্দের….
মৃদুলের আর রিজাইন দেওয়া হল না।…..(সমাপ্ত)

সমপ্রেমের গল্প ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.