প্রেম প্রাপ্তি

আরভান শান আরাফ

সেদিন নিরব এক অট্টহাসি হেসেছিল।সেই সত্যি অন্য রকম হাসি ছিল ।অনন্ত রিতিমত ভয় পেয়েগিয়েছিল তার অদ্ভুত রকম কান্ডজ্ঞানহীন অট্রহাসি দেখে ।আর ভয় তো পাবার ই কথা ,যখন তখন কারনে অকারনে যখন কেউ এমন হাস্য করবে তখন ভয় তো পাবেই।অনন্ত ছেলেটা খুব বোকা না হলে ও খুবি সহজ সরল ।আবার কেউ যেন সহজ সরল বলতে হ্যাংলা পাতলা রোগা সোগা বোকা প্রকৃতির কাউকে না বুঝে ।তাহলে আমি বলবো সে ভুল করবে ।

অনন্ত সহজ সরল বলে সে অসুন্দর নয় ,তার সরলতা তার মনের পবিত্রতায় ।তার সরলতা তার মনের সোন্দর্যতায় ।যে রূপে সে রূপবান সেই গুণেই সে গুনবান ।আনন্তের চরিত্রের মুল উপাদান সোন্দর্যতা ।তার দেহের ,মনের আর চিন্তার । নিরবের কথাটা নাই বলি ।কিছু কিছু লোক আছে না .যারা তাদের নামের কোন অর্থই ধরে রাখতে পারেনা ঠিক সেই রুপ নিরব ও পারে নি ।সে নিরব কিন্তু বাচাল ,সে সত্য কিন্তু মিথ্যুক ,সে সম্মানিত কিন্তু আতংকিত ।

তার সাথে অনন্তের পরিচয় ,সেই বাল্য কাল থেকেই । বাল্যকাল হচ্ছে ঐ কাল যখন একটা ছেলে বেড়ে ওঠার মূলমন্ত্র নিয়ে চারপাশটাকে আষ্টে পিষ্ঠে ধরে রাখতে চায় ।সে চাওয়ার মধ্য থেকে কবে যে নিরব আর অনন্ত এতো কাছাকাছি চলে এসেছে তার জ্ঞান তাদের ও আজ অবধি হয়নি ।আর তা না হওয়ারি কথা । তবে আজ যখন ধীরে ধীরে অনন্তের মনে এক ভালবাসার প্রিয়মূর্তি গড়ে ওঠছে তখন সে দেখলো যে এই মূর্তি তার যাকে সে তার বন্ধু ভাবে ।

তখনো হয়তো ভালবাসা ভালবাসাই ।তার আর কোন রূপ তার বা তাদের জানা ছিল না ।আর সেই ভালবাসা শুধু একজনের জন্যে ।নিরবের ক্ষেত্রে তা ক্লাসের সবচেয়ে শুস্রী মেয়েটা হলে ও অনন্তের কাছে সেটা হয়তো নিরব । তারা যে শহরে থাকে সেটা একটা মফস্বল এলাকা ।হাতের কাছে সব পেলে ও অনেক কিছুই পাওয়া যায় না ।শহরটাকে গ্রাম বললে ও ভুল হবে না ।গ্রাম না বলায় ভাল কারন কেউ আর গ্রাম্য নয় ।অনন্ত আর নিরব সেই শহরের কলেজে বিবিএ পড়ছে ।দুই পরিবারের মধ্যে পূর্ব থেকেই একটু বেশি ঘনিষ্টতা ।

সেই সুবাধে তার আরো কাছে আসা । অনন্ত জানে সে একটু অন্য রকম ।সে একটু আলাদা নিরব থেকে ।যেখানে নিরব প্রতিদিনে একেকটা মেয়ে পছন্দ করে প্রেমের জন্যে সেখানে অনন্ত জ্বলে ওঠে ।নিরব যখন কোন মেয়ের দিকে ইশারা করে মেয়ের সোন্দর্যতার তীব্রতর প্রশংসা করে তখন অনন্তের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ চলে ।টপ টপ করে ঝড়তে চায় চোখের পানি ।কিন্তু মুখে সচ্ছ দাঁতবের করে তার পছন্দের প্রশংসা করা ছাড়া তার আর কিছুই করার থাকে না ।

অথচ ভেতরে ভেতরে সে এক করুন কষ্টে ভোগে । একদিন বিকাল বেলা অনন্ত রেল লাইনের ধারের খালের পাড়ে বসে ছিল ।একমনে খালের জলে নুড়িকণা ঢিল ছুড়ে মারছিল ।বেখেয়ালি হয়ে ভাবছিল নিরবের কথা ।ভাবছিল ,সে সমকামী ।জীবনের প্রতিটা ক্ষণে তাকে বিসর্জন দিয়ে চলতে হচ্ছে তার চাহীদাগুলোকে ।আজ অযাচিত ভাবে যে ভুল পথে পা বাড়ালো তার জন্যে না হয় সর্বস্ব খোয়াতে হয় ।যদি তাই হয় তবে যে তাকে তার সম্পত্তি নিরবকে ও হারাতে হবে ।

যাকে সে তার সবটা দিয়ে আজে ভালবাসে । এমনি হাজার চিন্তা ঘিরে ধরলো তাকে । হঠাৎ ,পিছন থেকে নিরব এসে বসলো ।অনন্ত না তাকিয়েই বুঝতে পারলো এ তার ভালবাসা ,তার বন্ধু । ‘তুকে আমি খোঁজে মরছি ,আর তুই এখানে কার সাথে ডেটিং মারতে আসছিস , , ,,আমার কে আছে নিরব ,যার সাথে ডেট করা যাবে ? হা হা হা হা তুকে তো বলিই প্রেম কর ।তুই তো পছন্দ ই করিস না প্রেমটেম । এইভাবেই তারা কথা বলছিল ।

বাক বিতন্ডা আর অযুক্তিক কিছু তর্ক দ্বারা তাদের কথা শুরু ।এক পর্যায়ে ,অনন্ত নিরবকে ,জিজ্ঞেস করে আচ্ছা নিরব তুই আমাকে কি ভাবিস ?নিরব সাদাসিধে উত্তর দেয় ,কী আর ভাবব ?তবে তুই আমার জীবনের এমন কেউ যার সাথে কথা না বলে একদিন ও থাকতে পারব না । নিরবের উত্তরে অনন্ত সন্তুষ্ট হয়েছিল কি না তা জানা নেই তবে নিরব চেষ্টা করেছিল । সমপ্রেম এমন একটা আবেগ যা প্রিয় মানুষটার পাশে সারাক্ষণ থেকে ও তৃপ্ত হতে পারে না ।

অনন্তের ক্ষেত্রে ও ঠিক তাই ।নিরব আর সে সারাদিন ই এক সাথে তারপরে ও কোথায় যে কমতি ?কোথায় যে চাওয়া আর না পাওয়ার এক অন্ত কুলাহ । যখন রাত নামে ,পৃথিবী তখন এক গভীর ঘুম আচ্ছন্ন থাকে কিন্তু ,ভালবাসার দায়ে অনন্ত ঘুমাতে পারে না ।তার চোখে ভেসে ওঠে তার নিরবের চোখ ।তার বুকের কম্পন বেড়ে যায় ।তার চোখে ভেসে ওঠে নিরবের উদ্যাম খালি শরীর ,তার লোমশবুক ,গভীর নাভী ,লাল ঠোট আর সুঠাম বাহু ।অনন্তের ঘুম আকাশে উড়ে যায় ।রাত্রের আধারে মিশে যায় ।সে ঘুমাতে পারে না ।

বিছানা ছেড়ে ওঠে ঢক ঢক করে পানি খায় ।মাঝে মাঝে মাথায় তেল দেয় । তার ভালবাসা তাকে জাগিয়ে রাখে সারা রাত ভর । এভাবেই কাটছিল ,অনন্ত আর নিরবের দিনগুলো ।অনন্ত নিরবকে পাগলের মতো ভালবাসতে লাগলো আর নিরব অজ্ঞানের মতো রমনী সঙ্গ নিয়ে ছুটতে লাগলো ।অনন্ত পড়াশোনার ফাকে ফাকে একটা ছোট জব করতো ।যখন মাস শেষে মাইনে পেত তখন ,নিরবের পছন্দের কিছু তাকে গিফট করতো ।এটা তার শখ ।আর নিরব সেই গিফট সাদরে গ্রহণ করতো ।মাঝে মাঝে সেই গিপট যতনে সংরক্ষণ করতো ।

আর প্রেমিকাকে গিফট করতো ।অনন্তের কষ্ট লাগতো যখন দেখতো যে ,তার দেওয়া গিফট নিরব একটা মেয়েকে দিয়ে দিল ।তারপরে ও সহ্য করতো ।এক তরফা সমপ্রেমের এই একটাই জ্বালা ।আসলে আমরা যারা সমপ্রেমী তাদের শতকরা আশি জনের প্রেম ই এক তরফা ।তাই আমাদের বিসর্জন দিতে হয় আমাদের চাহীদা আর সুখ নামের বিলাসীকে । অনন্ত জানে ,যদি কোন দিন নিরব বুঝতে পারে যে অনন্ত গে তখন হয়তো তাদের বন্ধুত্বের এখানেই কুরবানী হবে ।তাই ভালবাসি শব্দটা না বলে অনন্ত বুকের মাঝেই চেপে রেখেছে ।হোক না প্রেম বিসর্জন ।

বন্ধু তো থাকবে ?আর তা নিয়েই অনাকাঙ্কিত প্রেমী অনন্ত তুষ্ট । একদিন ,অনন্ত জব থেকে ফিরে বইটা নিয়ে ছাদে বসেছিল ।হঠাৎ ,ছাদ থেকে দৃষ্টি ফিরতেই অনন্ত দেখে নিরব রিক্সা করে কোথায় যেন যাচ্ছে ,পাশে একটা মেয়ে ।হাতে তাদের আইসক্রীম ।অন্য হাত পরস্পর ধরা ।নিরবকে এই অবস্থায় দেখে অনন্তের বুকটা বারুদের মতো জ্বলে ওঠল ।এক তীব্র কষ্টে অন্তরের রক্ত জল হয়ে চোখ হতে গাল বেয়ে ঝড়তে লাগলো ।ছাদে দাঁড়িয়েই ছিল ।বুকের উপর একটা প্রচন্ডভারী পাথর চাপা পড়ে ছিল ।যাকে এতো ভালবাসে ,সে ভালবাসে অন্য কাউকে ।

ভাবতেই হৃদপিন্ড গলে যাচ্ছিল ।ছাদ থেকে রুমের ভেতরে গেল ।গিয়ে ঘুমের ট্যাপলেট খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লো । ঘুভ ভাঙল পরের দিন সকালে ,নিরবের ফোনে ।অনন্ত ,ফোনটা ধরতেই ঐ পাশ থেকে একটা মেয়ে কন্ঠ , অনন্ত ,তুমি দ্রুত সম্রিতা হাসপাতালে চলে এসো ।নিরব এখানে ভর্তি আছে ।অনন্ত ফোনটা কেটে কোন ভাবে ছুটল হাসপাতালে । প্রচুর রক্তক্ষরন হয়েছিল ।অনন্ত রক্ত দিল । নিরব সুস্হ্য হলো । নিরব আর তার লাভার রিক্সা করে ঘুরার সময় একটা পিকাপ ভ্যানের সাথে ধাক্কা লেগে এই দুর্ঘটনাটা ঘটে । অনন্ত নিরবকে ভালবাসতো নিজের সবটা দিয়ে ।

কিন্তু ,নিরব ভালবাসতো অন্য কাউকে ।এই সত্যি তাকে রিতিমত পীড়া দিত । তারপরে ও কিছু করার ছিল না ।কারন ,এটাই বাস্তবতা । একদিন ,অনন্ত ভাবলো এই ভাবে থাকা যাবে না ।এর নাম জীবন না ।যেখানে নিজের ভালবাসার কোন মুল্য নেই সেখান থেকে তাকে চলে যাওয়ায় ভাল ।তাই স্থির করল নিরবকে ভুলতে তাকে ছেড়ে চলে যাবে । এর পরের দিন ,অনেক কষ্টে বুকের সব জমানো কথা দিয়ে নিরবের কাছে একটা চিঠি লিখে অনন্ত চলে গেল , সারাদিন লাভারের সাথে ডেটিং শেষে বিকালে বাড়ি ফিরে টেবিলের উপর চিঠিটা দেখতে পেয়ে খুলল ।

চিঠিটা সে পড়তে লাগলো-
নিরব,
আমি চলে যাচ্ছি কিছু ব্যথ্যতা নিয়ে।আমি সেই বাল্যহতে তোমায় ভালবেসে এসেছি।কোন দিন মুখ খোলে বলতে ও পারিনি।আর আমি জানি বললে ও লাভ হবে না,কারন আমার সমপ্রেম তোমার মনের ঘৃণার বস্তু।কিন্তু কী করব বলতু ,ভালতোবাসি তোমায়।আমি জানি তোমাকে পাব না আমার মতো করে।তাই কষ্ট পেতে পেতে যখন ক্লান্ত তখন চলে যাচ্ছি।তুমি আমাকে ক্ষমা করো,সমকামী হয়ে ও তোমাকে ভালবাসার মতো সাহস দেখানোর জন্যে।
ইতি অনন্ত।

নিরব বুঝতে পারলো সে কী হারিয়েছে।পাগলের মতো ছুটল অনন্তের বাসায় কিন্তু সে সেখানে নেই।চলে গেছে সব ছেড়ে এক বুক কষ্ট নিয়ে।নিরবকে একা করে।অনন্ত চলে যাওয়ার পর নিরব বুঝতে পারলো সে ঠিক কতটুকু জায়গা জুড়ে ছিল তার হৃদয়ের।একাকিত্বের আগুনে পুড়তে লাগলো।সারাদিন পাগলের মতো অনন্তকে খোঁজতো,কিন্তু যে প্রেম হারিয়ে যায় তা কী আর পাওয়া যায়?

সমপ্রেমের গল্প ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.