রূপকথা

লেখকঃআনন্দ

উৎসর্গঃসকল নারী সমকামি বা লেসবিয়ানদের
[ভালবাসা এক অদ্ভুত মায়া।যে মায়ার উপর ভর করে টিকে আছে পৃথিবী।ভালবাসার কোনো সীমা নেই পাত্র নেই কাল নেই।এটা শুধুই অনুভুতি।যা কখনো কখনো না বলা থেকে যায় কিছু বাধার জন্য।]

…..…………………………………………………………
এক.
সাপের মত একেবেকে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া নদীটি জানে না তার গন্তব্য কোথায়।সেকি সাগরে মিশে যাবে নাকি আরো বড় কোনো নদীতে বিলিন হবে।সে জানে না।সে শুধু নিজের রাস্তা খুজে এগিয়ে চলে।রাতের অন্ধকারে তার বয়ে চলা পানি কলকল করে হেসে কথা বলে দুপাশের গাছপালার সাথে।ভোরে নতুন দিনের প্রথম কিরণ লেগে ভরে উঠে তার মন।নদীর নাম রূপবান।এ নদীর নাম এটা কেন তা জানি না।কেউই জানে না।
নদীর পাশে গড়ে উঠেছে ছোট্ট এক গ্রাম।গ্রামের নাম শিমুলতলী।এ গ্রামের পত্তন কবে হয়েছে সে ইতিহাস জানি না।গ্রামের নামের রহস্যও জানি না।গ্রামের দিকে নজর দিলে তেমন কিছু দেখার মতোও নেই।থাকার মধ্যে আছে গ্রামের শিশুদের অষ্টপ্রহর কান্নাকাটি হাসাহাসি।বউঝিদের কলহ কানাকানি।বেটাছেলেদের ক্ষেতে কাজ আর বেকার সময়ে আড্ডা।আর তাদের আড্ডা বলতে মনু মিয়ার দোকানে বিশ্রী শব্দদূষন।সর্বদা এরা নিজের চেয়ে অন্যের খবর নিয়ে মেতে থাকতে পছন্দ করে।তার উপর খবর যদি হয় কারো দোষ গুন নিয়ে তাহলে তো আর কথায় নেই।বউঝিদের দল ঘরমুখো তাই তাদের মধ্যে কানাঘুষা এত পরিমান বাড়ে যে সময়ে সময়ে কুন্তলযুদ্ধেও তারা লিপ্ত হয়।পুরুষেরা সময়ে সময়ে এমন খবর পেলে খাবার খাওয়ার কথাও ভুলে যায়।তবে তার মানে এই নয় যে তারা একে অন্যের সাহায্যে এগিয়ে আসে না।আসলে অন্যের বাড়ির তরকারি একটু বেশিই সুস্বাদু বটে।
সেই সুযোগে আবার মনু মিয়াও মধ্যে এক দুই বার ফোড়ঁন কেটে দেন।নতুন উদ্যমে তখন পুরুষেরা আসর জমজমাট করে।সেই ফাঁকেফাঁকে একের জায়গায় যদি দুই কি তিন কাপ চা বিক্রি হয় তবে তাতে মনু মিয়ার ফোড়ঁন কাটা সফল ও যুক্তি সম্মত বটে।
দুপুরের দিকে দোকানে মনু মিয়ার একমাত্র সঙ্গী বলতেও মাছি শত্রু বলতেও সেই মাছি।অলস দুপুরে মনু মিয়া দোকানে তাই একা বসে নিজের শরীর থেকে মাছি তাড়াবার বৃথা চেষ্টা করছিল বার বার।চোখটা যখন লেগে আসছিল তখনি একটা অতি পরিচিত কন্ঠে তার তন্দ্রা ছুটে গেল।কে এসেছে জানা সত্যেও চোখ মেলে তাকিয়ে সে বলল,”কেডা?” ঠিক তখন অপর পাশ থেকে জবাব এল,”বিস্কুট দে।খিদা লাগছে।”
মনু মিয়া সামনে দাঁড়ানো বুড়িকে দেখেছে।জন্ম থেকেই দেখে আসছে।লাটি হাতে দাড়ানো সে বৃদ্ধার বয়স বোঝা মুশকিল।সত্তর বললেও সে সাই দেয়।একশো বললেও সে সায় দেয়।মনু মিয়া কিছুটা এগিয়ে এসে বলল,”তোমাকে যেন কোথায় দেখেছি বুড়ি।বাড়ি কনে?কোন গিরামের তাহো।তোমারে ঠিক আমাগের বিথুই বুড়ির নাকান দেখতে।” মনু মিয়ার এই মজায় বুড়ি হঠাৎ ক্ষেপে গেল।”ওরে মুখপুড়া।আটকুড়োর বেটা।আমারে ছিনোস না?আমার সাথে রসিকতা করো?” বলে মাটি থেকে ছোট ছোট মাটির টুকরো তুলে ছুড়ে মারতে লাগল।মনু মিয়া এবার গামছা দিয়ে নিজের অর্ধটাক হয়ে যাওয়া মাথা ঘুড়ে দুই কান ধরে জিব কাটল।
-হাই হাই রে।ভুল হইছে আমার।মাফ কর।মাফ কর বুড়ি।এই ল বিস্কুট।
বলে কাচের বোতল থেকে একটা বড় শক্ত ধরনের বিস্কুট এগিয়ে দিলে বুড়ি তা খাবলে নিয়ে বিড় বিড় করতে করতে চলে এলো।পথে আসতে আসতে সে কি সকল শাপসামান্ত করল তার আগামাথা সে নিজেও জানে না।তার এই বিড়বিড় করে কথা বলা নিয়ে না মনু মিয়ার মাথা ব্যাথা আছে না গ্রামের অন্যদের।পুরো গ্রামে স্বাধীন বলতে এই বেথুই বুড়ি একমাত্র মহিলা।সারাদিন ঘুড়ে বেড়ায়।গাছ পালার সাথে কথা বলে নিজের মনেও কথা বলে।লোকে তাকে পাগল বলে না।তারা জানে বুড়ির সাথে ছায়া আছে।বুড়ির কথা বিফল হয় না।যদিও সে তেমন কারো সাথে কথা বলে না।যখন খিদে পায় যার বাড়িতেই যায় খেয়ে চলে আসে।কেউ কখনো মানা করে না।কখন কোথায় থাকবে তারও কোনো চিন্তা নেই।গ্রামের উত্তরে ফকির বাড়ির ভাঙা ঘরে সে থাকে।ফকিররা গ্রাম ছেড়েছে বহুদিন।সে এই গ্রামে কবে থেকে আছে জানি না।তবে বুড়ির পুরো দায়িত্ব যেন গ্রামের মানুষ কোনো কথা ছাড়াই নিয়েছে।মনু মিয়ার দোকান থেকে বের হয়ে বিস্কুট খেতে খেতে সে গ্রামের শুরুর দিকের তেঁতুল গাছের নিচে গিয়ে বসল।এখান থেকেই গ্রামের শুরু।প্রথম ঘর বলতে মনু মিয়ার দোকান।হাট বসে রুপবানের ওপারে।এ গ্রামের শেষ প্রান্ত বলতে শ্যামাদাসের বাড়ি।এরপর আর কোনো ঘর নেই।পিছনে শুধুই ধানি জমি।
শ্যামাদাস গ্রামের সংখ্যালঘু হিন্দুদের মধ্যেও গরিব।স্ত্রী কমলা তার দুই সন্তান পটলা,পুলি আর মা মরা ভাগ্নি পালকিকে নিয়ে তার সংসার।পালকি পাঁচ বছর বয়স থেকে এখানে।মা মরার পর বাপ এসে সেই যে মেয়ে ফেলে গেল আর এলো না।ছোটবেলা থেকে মামার অভাবের সংসারে মামির লাথিঝেটা খেয়ে বড় হয়েছে পালকি।আজ তার বয়স আঠারো।মার চেহাড়া তার মনে নেই।শুনেছে বাপ নাকি তাকে ফেলে রেখে গিয়ে বিয়ে করেছিল।এখন আর ওসব নিয়ে সে অত ভাবে না।মামির সাথে নিত্য কলহ তার খাদ্য হজমের একটা উপায়।তবে যতই কথা শোনাক আর বাড়ি ছাড়া করার ভয় দেখাক।মামির সাথে ভাব যে নেই তেমন নয়।পঠলা পুলির জন্মের আগে থেকে পালকি এখানে।তাই তার উপর রোশের পরিমান বেশি থাকলেও ভালবাসার ঘর একেবারে শুন্য নয়।তাই তো সে কয়েকদিন ধরে স্বামীকে ঘন ঘন বলছে।”তা হ্যা গো।আইবুড়ো মেয়ের আঠারো পেরোলো।এবার একটু খোজ করো।” উত্তরে শ্যামাদাস শুধুই “হু” বলে।বিয়ে হওয়ার পর থেকে এটাই সে করে আসছে।মাঝে মায়ের আর বোনের মৃত্যু সংবাদ শোনে চমকে উঠেছিল সেই যা।কমলা আর পারল না।এই ব্যাপারে স্ত্রীলোকের সহ্য ক্ষমতা প্রায় নেই বললেই চলে।তাই স্বামীর আশায় না থেকে সে নিজেই হরিবালাকে বলেছিল একটা ভাল ঘর আনতে।নমঃ নমঃ করে মুখপুড়ির বিয়েটা হলে কাটা নামল একটা।তাই তো আজ হরিবালা এসে বসে আছে।দুপুর করে আসার উদ্দেশ্য সে না খেয়ে যাবে না।খাওয়া শেষে একটা পানের আধা নিজের মুখে পুড়ে আধা হরিবালার হাতে গুঁজে চুন এগিয়ে কথাটা জিজ্ঞাস করল কমলা।হরিবালার বয়স প্রায় সত্তর ছুঁই ছুঁই।কোমড় বাকিয়ে হাটে।সে মাথা নেড়ে বলল,”যা মেয়ের কথা বলছিল লো পটলার মা।তার জন্য সম্বন্ধ আনা কি চাইরডা খানি কথা।”
-তা বুঝি গো খুড়ি।তাই তো তোমায় বলেছি।ওই হতভাগির একটা গতি হোক আমারো বিষ নামুক গা ঝেড়ে।
-তা যাক।তা শোন পাত্র এক খানা আছে।ওই গায়ের গোপাল মন্ডল।গেলবার কলেরায় শেষের বউডাও মইরা গেলো।তা বয়েস আর কত হইব।তা বছর পঞ্চাশ হইব।
কমলা পালকিকে সহ্য করতে পারে না ঠিকি।কিন্তু গোপাল মন্ডলের কথা শোনে সে নিজেও চমকে উঠল।
-সেকি গো খুড়ি।ও যে পালকির মামুর বড়।এত বয়স।তার উপরে প্রতিবার বউয়ের বেরাম হইয়া মইরা যায়।এই লইয়া দুইখানা বউ মইরা গেল।
-হ তা যা কইছস।বেচারার ভাইগ্যি খারাপ।তবে বউ দুইডার ভাগ্যি ভালা।সিন্দুর নিয়া মইরতেও ভাগ্যি লাগে লা।আমরা তো পাইরলেম না।
বলে হরিবালা কিছুক্ষন থামল।তার পর আবার বলা শুরু করল।
-বয়স বেশি তো কি হইছে।বেটা মাইনষের আবার বয়স কি।দুইখান ধানি জমি আছে।একটা টেকাও খরচা লাগব না শ্যামার।আর কইছে তোগো ঘরখানাও তুইলা দিব।
কমলা এতক্ষন নাক উচু করে রাখলেও ঘর ঠিক করার কথা শুনে একটু কাছে সরে এলো।হরিবাল তার চোখের চকচকে ভাব দেখে মনে মনে খুশি হল।
-হ গা খুড়ি।তুমি ওইহানে কথা পাড়ছিলা পরে কইল?
-নারে।গোপাইল্লা তো পালকিরে আগেই দেখছিল।ওইদিন আমি বলায় কইল সব।আর কয়েকদিন গেলে নাহি সেই ঘটক পাঠাইত।
কমলা লোভি নয়।তবে ঘরের কথা চিন্তা করে তার মনে জাগা আশা লোভ কি না তা বলা মুশকিল।ঘরের চালে জং ধরেছে।পালাগুলোও নড়বড়ে।স্বামী তার তেমন রোজগার করে না।দিন মুজুরি করে আর কতো কি করা যায়।নেহাত পালকির খাওয়া পড়া নিয়ে মাথা ব্যাথা নেই।সিকদার বাড়িতে ফরমাইশ কাটার সুবাদে তার খাওয়া পড়ার চিন্তা এখন আর করতে হয় না।

দুই.
ওফফ।কি অসহ্যকর পরিস্থিতি।সিকদার বাড়ির ঘোড়ার গাড়ি করে যেতে যেতে ভাবছিল ললিতা।না না,ঘোড়ার গাড়িতে বসে যেতে সমস্যা হচ্ছে না।সমস্যা হচ্ছে লোকের হা করে তাকিয়ে থাকা দেখে।কি আজব সব লোক।হা করে তখন থেকে লাইনে দাড়িয়ে তাকে এমনভাবে দেখছে যেন সে রানী ভিক্টোরিয়া।কিংবা অন্য গ্রহের কোনো প্রাণী।সে জানে কেন তারা তাকে এভাবে দেখছে।ঘাড় পর্যন্ত ছোট করে ছেটে দেওয়া চুল।চোখে কালো সানগ্লাস।কানে কালো টিপফুলের মত দুল।নাক খালি।হাতে ঘড়ি।পরনে ঘাগরা,যেটার রং এইখানকার লোকের চোখে কখনো ভাল লাগবে না।কারন সেটা দুর থেকে দেখলে কিছুটা তালি দেওয়া বোধ হতে পারে।ঢাকায় মেয়েরা তো এখন অহড়হ হাতাকাটা ব্লাইজ পড়ে ঘুড়ে বেরাচ্ছে।তাও তো সে এগুলো পড়ে এসেছে।যদিও কোনো ছেলে নেই এই দুপুরে।তবুও মেয়েরা যেভাবে হা করে গিলে খাচ্ছে তাতে নিজেকে অর্ধেক ওজনের মনে হচ্ছে।সাথে কেউ নেই তাই অস্বস্তি বেশি হচ্ছে।
গ্রামের লোকের হা করে তাকিয়ে থাকার কারন তো স্পষ্ট।সভ্যতার এই যুগে এসেও শিমুলতলীর রূপের পরিচয় কিছুক্ষন আগেই পাওয়া হয়ে গেছে।তাই এদের অবাক হতে দেখে হতবাক হওয়ার কিছুই নেই।পথ দিয়ে গজ গজ করতে করতে যাচ্ছিল হরিবালা।হঠাৎ ঘোড়ার গাড়ি দেখে হা করে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইল।তার পর পাশে দাড়ানো মজিদার মাকে বলল,”সিকদার বাড়ির মেয়ে নাকি রে।”
-হ গো চাচি।কি বাহার নি দেখছ।শইল্লে এক খানা ওড়না নাই।
-হ।বড় বাপের বিটি।আমাদের গেরামের মাইয়াগেরই তো লজ্জা শরম নাই।
-ক্যান গো চাচি।কার বাড়িত তে আইতাছো।
-শ্যামার বাড়ি গেছিলাম।ওই মুখ পুড়ি হাড্ডি ভাঙি দিলো লা।
বলেই বা হাতে ধরে কুঁকিয়ে উঠল হরিবাল।
-কি হইল গো চাচি।
হঠাৎ প্রশ্নটা শুনে হরিবালার সামনে সব ঘটনা ভেসে উঠতে লাগল।তখন কমলার সাথে কথা বলার সময় কোথা থেকে পালকি এসে হাজির হয়ে গেল।পালকি লজ্জার ধার ধারে না অত।কথায় কথায় যখন পাত্রের বয়স জিজ্ঞেস করে বসল তখন কমলা বলে দিল পঞ্চাশ।ওমনি সে মাথায় হাত।বলে,”ও তো বুইড়া খাটাশ।ওরে কে বিয়া কইরবো।ওই হরিবালা বুড়িরে কও নিকা বইত।আমি বুইড়ার ভাত খামু না।”
ছি ছি।কি লজ্জার কথা।একে তো বৃদ্ধা বিধবা হরিবালার নিকার কথা বলল।তার উপর নিজের বিয়ের কথাতে কথা বলে।হরিবালা বড়ই ক্ষুন্ন হলো।শেষে কোমড়ে ধরে দাড়িয়ে সে বলেই ফেলল,”তা তুই কোন চুলার বেটি লা।মা খাইলি বাপ লাত্থি মাইরলো।অত তেজ কিসের।কোন নবাবজাদা আইব তর নাকান অলক্ষ্মীরে বিয়া কইরতে।”এই কথা বলেছে না মাথায় বজ্রপাত হল মেয়ের।তারপর যা নয় তা গালাগাল শুরু করল।
-কি কইলি তুই।আমি অলক্ষ্মী?তুই আমার লাইগ্যা ওই অনামুখোর কথা পাড়তে আইছস।পুড়ার মুখী।ঘাটের মরা।দাড়া।
বলে রসুই থেকে একটা ছোট ছ্যালাকাঠ নিয়ে দাড়াতে হরিবালাও কোমড় বেধে নামল।
-হাছা কথা গায়ে লাগে?বয়েস হইল আঠারো।কাপড় পড়স হাটুর কাছে।রাক্ষুইসা ধারি মাইয়া কোনহানকার।
-তবে রে।বুইড়া নডি।চিনাইলা মাগি।তুই এইহানে আমারে দিয়া ওই বুইড়ার বিয়ার স্বাধ সাধনের লাইগ্যা আইছস।নিজের স্বামী তো খাইয়া বইছস।যা না যা।তুই গিয়া নিকা বো।
-শুনছিস কমলা?ওলোটনে মেয়ের কথা।
“তবে রে।খাড়া তুই।”বলে তেড়ে এসে ঠাস করে হরিবালার হাতে ছ্যালাকাঠ দিয়ে এক ঘা বসাল।কি কান্ড।গেল মেয়ের ভাল চাইতে মেয়ে কিনা এমন করল।নেহাত কমলা বাঁচিয়ে বাইরে এসে হাতে কিছু টাকা দিয়ে বলল,”খুড়ি তুমি খবর লাগাও।আমরা রাজি।আর ঘর তোলার কথা খানা মনে রাইখো।পালকিরে আমি বোঝামো।”হরিবালা হাত চেপে ধরে এসব বলতে বলতে আরেকবার মুখে শব্দ করে উঠল।একটু পর ঘোড়া গাড়ির পিছনে দৌড়াতে দেখা গেল বিথুই বুড়িকে।আকাশের দিকে এক হাত তুলে হো হো করে হাসতে হাসতে আসছে সে।চিৎকার করে বলছে,”আইছে আইছে।ঝড় আইব ঝড়।তুফান আইব।মইরব।কেউ মইরব।”
হরিবালা বিথুই বুড়ির কান্ড দেখে বলল,”হ্যা গো বুড়ি।তোমার আবার কি বিষ ছইড়লো।” বুড়ি এবার থামল।হাসি রেখা একান থেকে ওকানে টেনে বলল,”মরন হইব।আর তো পাঁচ মাস বটে।বিয়া হইব।মরন হইব।বসন্ত আইতাছে লা।” কথা শুনে মজিদার মা আর হরিবালা হেসেই খুন।হরিবালা বলল,”বুড়ি কি কও এইসব।রইদ্দোর চইড়া মাথা এইবার নষ্ট হইল নাহি গো তোমার।” কথাটা মনে হয় বিথুই বুড়ির ভাল লাগল না।”কি কইলি আঁটকুড়ীর বেটি।”বলে হাতের লাটিটা নিয়ে হরিবালার ব্যাথা পাওয়া হাতে ধুম ধুম আরো দুই ঘা বসিয়ে আবার চিৎকার করতে করতে চলে গেল।হরিবালা এবার “মা গো” বলে কেঁদে উঠল প্রায়।মজিদার ধরে বাড়ি নিয়ে গেল তাকে।
*****
বাড়ির সামনে গিয়ে দাদুকে দেখে গাড়ি থেকে লাফিয়ে নেমে এলো ললিতা।অনেক্ষন জড়িয়ে ধরে রেখে চশমাটা খুলে দাদুর চোখে দিল।
-ওয়াও দাদু।তোমাকে তো সালমান খান লাগছে।
-তা লাগবে বই কি।হাশেম সিকদার কি কম নাকি।শুধু চামড়া ঢিলে হয়ে গেছে।
ললিতা হেসে আরেকবার দাদুকে জড়িয়ে ধরল।চাকরদের জিনিস পত্র নামাতে বলে নাতনীকে নিয়ে হাশেম সিকদার মহানন্দে ভেতরে গেলেন।এত বছর তিনিই যেতেন ঢাকা।কিন্তু এবার তিনি জেদ ধরেছেন তাই ললিতাকে পাঠিয়েছে তার মা বাবা।
বিশাল বাড়ি।একাকালে জমিদার বাস করত।এখন জমিদার নেই,জমিদারিও নেই।তবে জশ আর দাপট সেই আগের মতই আছে।বিশাল এই বাড়ি মাত্র দুইবার দেখেছে ললিতা।এই নিয়ে তৃতীয়বার দেখছে।আগের কিছুই তার মনে নেই।অনেক ছোট থাকতেই আসা বন্ধ হয়ে গেল।পড়ার চাপ,ঢাকার অভ্যস্ততা।এসব কারনেই আসা হয়নি।মা বাবা আসলেও সে আসেনি।তাই গ্রামের কিছুই সে চিনে না।বিশাল বাড়িতে তার বাবাই একমাত্র উত্তরাধিকারী।দাদি মারা যাওয়ার পর দাদু যেন আরো একা হয়ে গেলেন।দেখা শোনার লোকের অভাব নেই।স্বপন দাদুর মত এত পুরোনো বিশ্বস্ত লোক অষ্টপ্রহর দাদুর দেখাশোনা করছে।তবুও বাবা বলেছিল দাদুকে নিয়ে যেতে।দাদু যেতে রাজি হননি।

তিন.
“দাদু আইসবো?”পালকির কথায় ঘুড়ে তাকাল ললিতা আর হাশেম সিকদার।ঘুড়ে দাড়িয়ে ললিতা যে মেয়েটাকে দেখল তাকে দেখে মুগ্ধ হওয়ার মত কিছুই নেই।গোল মুখে টানা টানা দুটো চোখ আর নাকে চকচকে ফুল।খুবই সাধারণ গ্রাম্য মেয়ের রূপ।কানে রং উঠে যাওয়া দুল।গলা খালি।গায়ের রং চাপা।দেখার মধ্যে হাজারে একটি সে নয়।তবুও ললিতার চোখে তাকে অপরূপা লাগছিল।কেনো?এর কারন কি? হ্যা কারন তো আছেই।যৌবনের প্রথম প্রহরে যখন সে বুঝতে পেরেছিল যে তার চাহিদা বদলে গেছে তখন থেকেই তার চোখে নারীরূপ বড়ই ভাল লাগে।পুরুষ তার স্বপ্নে কখনো আসেনি।তার স্বপ্নে এসেছে নারী।মুক্তকেশী এক অপ্সরা।যাকে দেখে সে মুগ্ধ হয়েছে।এই কি সেই অপ্সরা?এলোকেশী এই মেয়ের ডাগর ডাগর চোখে মোটা করে পড়া কাজলে গভীরতা তার মাপতে মন চাইছে।প্রথম দেখাতেই?হয়ত সে অন্যের চোখে তত রূপসী নয়।তবে ললিতার চোখে তাকে মেনকা সুন্দরীর চেয়ে কিছু কম মনে হচ্ছিল না।
“কে?ওহ পালকি?আয় বোন আয়।” হাশেম সিকদারের অনুমতি পেয়ে দড়জা পেরিয়ে পালকি এসে তার কাছে দাঁড়ালো।আসার সময় পায়ের নুপূর ঝুম ঝুম আওয়াজ করছিল।এমন আওয়াজ ললিতা কখনো শুনেনি।সত্যি শুনেনি।একে মুসলমান ঘরের মেয়ে বলে মায়ের শক্ত নিষেধ অলঙ্কারে যেন শব্দ না হয়।আর তাছাড়া সে কখনো এসব পড়তে পছন্দ করে না।তার বান্ধবীরা ও পড়ে না।পালকি হঠাৎ ধপ করে দাদুর পায়ের কাছে বসে গেল।হাশেম সিকদার পুরোনো গুড়গুড়ি থেকে কয়েকটা টান দিয়ে বলল,”কি হল পায়ের কাছে বসলি যে বড়।”
-হরিবালা বুড়ি গেছিল বাড়িতে।ছ্যালার বাড়ি মারছি।
-পাত্র কে?
-ও গায়ের গোপাইল্লা ঢেমনা।
-একেবারে ধুম করে দিয়েছিস?নাকি ছুড়ে মেরেছিস?
-ধুম কইরা মাইরছি।
-বেশ করেছিস।
বলে হাশেম সিকদার হো হো করে হেসে উঠল।ললিতা লক্ষ্য করল পালকি এতক্ষন মাটির দিকে চেয়ে মুখ গোমড়া করে বসে কথা বলছিল।কিন্তু দাদুর হাসির শব্দে দাদুর দিকে তাকিয়ে সেও হাসতে লাগল।ঢুলে ঢুলে হাসছিল সে।একটু পর দাদু বলল,”এই দেখ পালকি।এ হলো আমার নাতনী।ঢাকা থাকে।এখানে এসেছে বেড়াতে।” পালকি উঠে দাঁড়াল।ললিতা একটা প্রসন্নতার হাসি একেঁ হাত বাড়িয়ে বলল,”হাই।আমি ললিতা।”পালকি কিছুটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল।দাদুর দিকে তাকালে দাদু হেসে বলল,”মেলা হাত মেলা।সাহেবি কায়দা।হাতটা শক্ত করে ধরে সব জোরে একখানা ঝাকি দে তো দেখি।” পালকি ডান হাতটা কাপড়ে মুছে ললিতার দিকে বাড়িয়ে দাঁড়াল।এবার ললিতা নিজের হাত কিছুটা এগিয়ে পালকির হাত ধরে বলল,”এত লজ্জার কি আছে।আমি কি বাঘ নাকি বোকা মেয়ে।তোমার নাম কি?”
-জ্বে পালকি।
-বাহ ইউনিক নাম।সুইট নেম।
পালকি হা করে তাকিয়ে ললিতাকে দেখছিল।কি দুধের মত সাদা গায়ের রং।চুল গুলো অবশ্য অদ্ভুত।তবে ওই ঘাগরা পরে ললিতাকে পরীর মত মনে হচ্ছিল পালকির।পালকি নিজের কাজ জানার জন্য দ্বিতীয়বার দাদুর দিকে ফিরে তাকালো।
দাদু কেদারায় গা এলিয়ে চোখে বুজে গুড়গুড়িতে আরেকটা টান দিয়ে বলল,”মেম সাহেব কে গ্রাম ঘুড়িয়ে দেখাতে হবে।আগামী দুই মাস অন্তত এটাই তোর কাজ।অষ্টপ্রহর আমার নাতনীর খেয়াল রাখা।”
-অহ।আইচ্ছা।তা কহন যামু।
উত্তর দিল ললিতা,”কাল থেকে।” পালকি এমনিতে বড় চঞ্চল মেয়ে।তাই নতুন মানুষের সাথে মিশার যে জড়তা তা কাটিয়ে উঠতে তার বেশিক্ষন লাগেনি।”ঠিক আছে দিদিমণি।কাইল ভোরে আমি চইলা আমু নে।দাদু আমি নিচে যাই।”বলেই অপেক্ষা না করে নিচে চলে গেল সে।
ললিতা পাশের বিছানায় বসল।”দাদু।কে এই মেয়ে?”
-পালকি।শ্যামাদাসের ভাগ্নি।হতভাগির মা মারা গেল পাঁচ বছরে।বাপ এসে সেই যে ফেলে রেখে গেল আর এমুখো হলো না।অনেকদিন ধরেই আমাদের বাড়িতে আসা যাওয়া।স্বপনের পর ওই আমার একমাত্র সঙ্গী।
-বড় চঞ্চল স্বভাবের মনে হল।
-তা যা বলেছিস।শুনলি না।ঘটককে কেমন ছ্যালাকাঠ দিয়ে মেরে ভাগালো।বয়েস সবে আঠারো হলো।অভাবের সংসার।তাই শ্যামা হয়ত বিয়ের জন্য পাত্র খুঁজছে।
-তা তোমার এত কাছের।তুমি মানা করতে পারো না।এই বয়সেই কি কেউ বিয়ে দেয় নাকি।
-তাতে আমিই কি বলব বল।এলাকার মাথা হতে পারি।তবে ওটা ওদের ব্যাপার।তার উপর হিন্দু মেয়ে।বয়সে বিয়ে হলে তো আর রক্ষে নেই।এ তো আর ঢাকা নয়।
-আজব গ্রাম তো।
*****
রাতে খেতে বসে হঠাৎ এক বৃদ্ধাকে অবাদে খাবার ঘরে আসতে দেখল ললিতা।এখানের যা কাহিনী সে শুনেছে।এমন কান্ড হওয়াতে ললিতা হতবাক হলো কিছুটা।
-আব্বাজী ও আব্বাজী।
স্বপন কাছে দাড়িয়ে ছিল।হঠাৎ বুড়িকে দেখে ভড়কে গেল।”বুড়ি তোমারে না কইছি বাবু খাইতে বইলে আইবা না।ফের আইছো।”
-ছাড় আমারে।অভিশাপ লাগব স্বপইন্ন্যা।ছাড়।
বলে স্বপনের গায়ে থুথু ছিটিয়ে দিল বৃদ্ধা।দাদু মাথা না ঘুড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,”কে এসেছে?”
-বাবু বিথুই বুড়ি।
-তা আটকেছিস কেনো।ছাড় না।এসো মা এসো।ছাড় ওকে স্বপন।
স্বপন এবার বিথুই বুড়িকে ছেড়ে মুখ মুছতে লাগল।বিথুই বুড়ি সোজা গিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল।ললিতা অবাক হয়ে দেখছিল।দাদুর কোনো রূপান্তর নেই।তিনি নিজের মত খেয়ে যাচ্ছেন।একটু পর মাথা তোলে বলল,”কি মা।খিদে পেয়েছে?খেতে দেবো?”
-না আব্বাজী।আমি আইছি অন্য কারণে।
-আচ্ছা সে পরে হবে।এখন কিছু খেয়ে নাও দিকি।ওরে স্বপন বিথুইকে কিছু খেতে সে তো। স্বপন মাথা নেড়ে চলে গেল।বিথুই ললিতার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে হেসে উঠল।
-হাসলে যে বড়।
বিথুই হেসেই চলেছে।দাদু আর কিছুই জিজ্ঞাসা করল না।খাবার এলে গোগ্রাসে বুড়ি সেগুলো গিলে উঠে দাঁড়াল।এত তাড়াতাড়ি খেতে ললিতা কাউকে কখনো দেখেনি।দাদু বলল,”তা কি জন্য এলে বললে না।”
-শোন আব্বাজী।ঝড় আইতাছে।তুফান।বুঝলি।মেলা বড়।
-সেকি কথা।তা তুমি আটকালে না?
-মশকরা না রে আব্বাজী।
তারপর কি বলতে গিয়ে যেন বুড়ি থেমে গেল।হঠাৎ আবার হেসে উঠল সে।হাসতে হাসতে চলে গেল।
ললিতা এবার মুখ খুললো।”দাদু,মহিলা কে?আর তোমাকে তুই করে বলছিলেন যে।”
-ও বিথুই বুড়ি।আমার মায়ের আমলে তার কাছের ছিল বড়।কবে সে প্রথম এ গ্রামে আসে তা কেউ জানে না।তবে বড় জ্ঞানী বটে।যা বলে তাই ঘটে।বয়েস অনেক হলো।তাই এখন আর কেউ তার কথায় কান দেয় না।
-বাড়ি কোথায়।
-নেই তো।ওই উত্তরের ফকিরের ভিটায় থাকে।নাহলে যখন যেখানে খুশি ঘুমিয়ে পড়ে।খিদে পেলে যার কাছে খুশি চেয়ে নেয়।

চার.
রাতে ঘরে শুয়ে সিকদার বাড়ির দিদিমণির কথা ভাবছিল পালকি।শহুরে মেয়েরা বুঝি এমনই হয়।চুল গুলো কেমন ছোট ছোট।জামাকাপড় কেমন খাপছাড়া রঙের।গায়ে ওড়না নেই।কালো টিপের মত কি যেন কানে।তবুও যেন পরীর মত লাগে তার ললিতাকে।আচ্ছা কেনো তার এমন মনে হচ্ছে।সে যদি শহরে বড় হতো তাহলে কি সে ললিতাকে এত সুন্দর দেখত না।নাকি তখনও সুন্দর লাগত।তার চুল তো ললিতার চেয়ে অনেক লম্বা আর ঘন।তার হয়ত অমন খাড়া নাক নয়।কিন্তু খালি নাকে তো সে ঘুড়ে বেড়ায় না।টিপ কানের দুল তাও আবার কালো।সে কখনো দেখেনি।ওগুলো না নড়ছে না দোল খাচ্ছে।না ললিতার গলায় কিছু আছে।আর না ললিতার ঘাগরার রং ভাল।কিন্তু এগুলোর জন্য কি ললিতাকে সুন্দর দেখাচ্ছিল?নাকি শুধু ললিতাকে সুন্দর লাগছিল।কে জানে।পালকি অত মিলাতে পারে না।ছেলেদের শরীরের গন্ধ তার অপছন্দ।কখনো কোনো ছেলেকে তার ভাল লাগেনি।আঠারো বছর বয়স এক রঙিন সময়।তখন মনের কাননে ফুটে হাজার ফুল।শীত গ্রীষ্ম বসন্ত সকল ঋতুতেই সে কাননের ফুলের মেলা প্রজাপতির আনাগোনা চলে।তবে পালকির কাননে আজও কোনো প্রজাপতি আসেনি।তার বয়সি মেয়েরা ছেলেদের থেকে কিছুটা দুরেই থাকে।লজ্জায় অনেকে বাড়ির বাইরে যায় না পাছে বেগানা পুরুষেরা দেখে ফেলে।তবে তার কেনো এমন হয় না।তার উপর ছেলেদের সাথে সংসারী হয়ে তাদের ফায়-ফরমায়েশ কাটা।এ কথা শুনলেই তার সমস্ত গায়ে আগুন লেগে যায়।আজ দিদিমণির দিকে যেভাবে সে দেখছিল তা কি সবাই দেখে।বিয়ের কথা মনে হতেই হঠাৎ হরিবালা আর গোপাল মন্ডলের নাম মনে আসে তার।হরিবালার কথাগুলো মনে হলে গা জ্বালা করে তার।মামি তাকে ওই সময় বলল বিয়েটা হলে নাকি গোপাইল্লা ওদের ঘর তোলে দেবে।তবুও পালকি রাজি নয়।তার এসব বিয়েশাদি ভাল লাগে না।মামি সরল মানুষ।হরিবালা ডাইনি ওকে লোভ দেখাচ্ছে।অনেক অনেক চিন্তা ঘুরপাক খায় পালকির মাথায়।সে তার জীবনের অংকগুলো মিলাতে পারে না।উত্তর পায় না কেনো তার এমন হয়।কেনো তার বিয়ের নামে রাগ হয়।ছেলের নামে রাগ হয়।কেনো ললিতাকে তার এত উগ্র সাজে ভাল লাগল।সে জানে না।ভাবতে ভাবতে আবার হরিবালার মুখটা সামনে আসে তার।ছ্যালার ঘা খেয়ে শেয়ালের মত খেঁকিয়ে উঠে মুখের কি আকারই না করল।ভাবেই হাসি পায় পালকি।তবে রাগও হয়।সাথে সাথে হাসি মুখ ভোতা করে অস্পষ্টভাবে গাল পাড়ে সে।
“চিনাইল্ল্যা বুড়ি।আরেকবার আইলে মাথার চুল আর একটা ও রাখুম না।”বলে চোখে বুজে পাশ ফিরে সে।
*****
সকাল সকাল মামির গলা শুনে কিছুটা চমকে উঠল পালকি।এত নরম গলায় তো মামি তাকে ডাকে না।তাও আবার খাবারের জন্য।কিছুক্ষন কান পেতে শুনলো পালকি।তারপর হঠাৎ গোপালের কথা মাথায় এলো।তাহলে এই ব্যাপার।আবার নিশ্চিত মামি গোপালের কথা বলবে।তাই এত আদুরে ডাক কানে আসছে। “বলি ও পালকি।খেয়ে নে না রে মা।” পালকি গিয়ে চুপটি করে মামির পাশে রসুইয়ের মেঝেতে বসে গেল।মামি বাসন এগিয়ে দিলে পালকি অবাক।একি,এত মাছের লেজ।আজ ভাগ্য সত্যি সুপ্রসন্ন তার।এমন সু্যোগ বার বার আসে না।তাই কারন জিজ্ঞাসা করে হাত ছাড়া করার আগে গোগ্রাসে গপাগপ খেয়ে নিলো পালকি।খাওয়ার মধ্যে একবার মামির দিকে তাকিয়ে বলল,”তুমি খাইছো?”
-না অহন না।পরে খামু তুই খা।
-ভাত নাই?
-আছে লা আছে।ওই দ্যাখ।
বলে ইশারা করে পাতিলের মুখে রাখা একটা থালা দেখালো কমলা।পালকি আর কিছু বলল না।খেয়ে উঠে গিয়ে একবার পাতিলের কাছে দাড়াল।থালাটা আরেকটা থালা দিয়ে ঢাকা।উঠিয়ে দেখল সত্যি ভাত আছে।আবার ফিরে এসে উঠোনে দাড়াল।”মামি।কিছু কইবা?”
-ক্যান?
-না আইজ যে বড় নেজার ঝোল খাইলাম।গোপাইল্ল্যার কথা?
কমলা একটু চমকে উঠল।কিন্তু ভাবে তা প্রকাশ করল না।রসুই থেকে নেমে এসে বলল,”তা হ রে।লোক তো মন্দ না।তুই সুখে থাইকবি।”
-চাইনে আমার সুখ।
-ক্যান রে।বেটা মাইনষের আবার বয়েস কি।দ্যাখ না।তর মামুর ঘরটা এ তুইলা দিবো।একবারটি বোঝ মা।
-না মামি।ওই ঘাটের মরার নাম নিবা না।
কমলার মুখ এবার শক্ত হয়ে এলো।”তা শুইনবা ক্যাম।নবাবের বিটি।অইন্ন ধ্বংস করার লাইগ্যা ঘরে বইছ।মামুর ভালায় তোর কি।
-এই জইন্যে তুমি আমারে আদর কইরা খাওয়াইতে বসাইছিলা।
-দুর হ দুর হ হতভাগি।অলক্ষ্মী মাইয়া।
বলে রসুই থেকে ঝাটা নিয়ে তেড়ে আসতেই পালকি পালালো।
হাতের ঝাটা উঠোনে ফেলে কমলা আবার এসে রসুইয়ে বসল।এখান থেকে ঘরের চাল দেখা যায়।বড়ই খারাপ অবস্থা।কমলা কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকে সেদিকে।তারপর উঠে গিয়ে নিজের জন্য রাখা থালার ভাতগুলো হাড়িতে রেখে দেয়।রাখতে রাখতে তার মনে হয় গোপালের বয়সটা কি সত্যই বেশি নয়?কিন্তু নারীর মন কি না।আবার ফিরে তাকাতেই নিজের ঘরের ছবি দেখে তার মনে আশা জাগে।ভাল ঘরের আশা।
পথে যেতে যেতে পালকি হেসেই একাকার।মামি যেন কেমন বাচ্চাদের মত।ভাবল তাকে বলবে আর সে মেনে যাবে।মামির হাতের ঝাটার বাড়ি আর অলক্ষ্মী ডাক সে গায়ে লাগায় না।তবে মামার ঘরের কথা মনে আসছে তারও।কিন্তু না,তাই বলে সে নিজেকে বিক্রি করবে নাকি।পুরুষের বাদি হয়ে অন্তত সে থাকবে না।এভাবেই বিয়ে না করে থেকে যাবে।সারা গ্রামে ঘুড়ে ঘুড়ে বেড়াবে।ঠিক যেমন বিথুই বুড়ি করে।ভাবতে ভাবতে হেসে উঠে পালকি।কেনো হাসি পায় সে জানে না।হাসতে হাসতে সে সিকদার বাড়িরতে আসে।মাথার খোলা চুলগুলো বাতাসে উড়িয়ে হাসে সে।সে এক অদ্ভুত খুশি।যেন হঠাৎ করেই ভড় করেছে তার উপর আবার হঠাৎ মিলিয়ে যাবে।
বাগানের কাছে ললিতার ডাকে সেদিকে গেল পালকি।মনে হয় ওর জন্যই অপেক্ষা করছিল।পালকি গিয়ে সামনে দাড়িয়ে বলল,”চলেন দিদিমণি।”

পাঁচ.
নদীর ধার ধরে হাটছিল পালকি আর ললিতা।ললিতা মুগ্ধ হয়ে দেখছিও চারদিক।কি অপরূপ এই পথ।নদীর ধার,কলকল শব্দ একটু দুর গ্রামের মাথায় ওই তেঁতুল গাছ।শিল্পীর নিপুণ হাতে আঁকা ছবির মত লাগে দেখতে।”আচ্ছা এই নদীর নাম রূপবান তাই না?”হাটতে হাটতে জিজ্ঞেস করে ললিতা।
-জ্বে দিদিমণি।
-কেনো এই নাম হয়েছে জানো?
-না দিদিমণি।
ললিতা এবার থামল।”তুমি আমাকে তখন থেকে দিদিমণি ডাকছো কেনো।আমার তো নাম আছে।সেটা বলে ডাকো।”
-কি ডাইকবো তাইলে।আপনে তো আমার বড়।সিকদার বাড়ির মাইয়া।
-ধুর বোকা সিকদার বাড়ির মেয়ে বলেই ডাকতে হবে নাকি।আচ্ছা আমি তো তোমার বড়।তাহলে আমাকে ললিদি বলেই ডাকো।
-আচ্ছা দিদিমণি।
বলেই জ্বিব কাটল পালকি।ললিতা শব্দ করে হেসে উঠল।কি সরল মেয়েটা।পালকি ও এবার সাহস পেয়ে হেসে ফেলে।হাসতেই থাকে সে।ললিতা তাকিয়ে থাকে তার দিকে।হাসিটা বড়ই লোভনীয় মনে হয় তার কাছে।সে তো কখনো এভাবে হাসেনি।আচ্ছা এভাবে হাসলে কি তাকে ভাল লাগত।নাকি পালকি হাসছে বলেই ভাল দেখাচ্ছে।সে জানে না।
-আচ্ছা পালকি তোমার নামটা ছোট করে দেই?
-ওমা।নাম আবার ছোট হয় নাকি।
-হ্যা হয় তো।পালকি ডাকতে আমার ভাল লাগছে না।তোমাকে পলা বলে ডাকব।
-তাই।
-ভালো??
-হ বড় ভালা।নতুন নাম।
বলেই দুইহাত তুলে ললিতার দিকে মুখ করে পিছন দিয়ে হাটতে গিয়ে ধাক্কা লেগে পড়ে গেল পালকি।যে বুড়ির সাথে ধাক্কা খেয়ে পালকি পড়ে গেল তাকে ললিতা চেনে।কাল রাতে ইনিই এসেছিলেন।আর এনাকে গ্রামে ঢোকার পথে তেঁতুল গাছের নিচেও সেদিন দেখেছিল।নামটা মনে আসছে না।
-বিথুই।দেইখ্যা চলবি না বুড়ি।এক্ষুনি ব্যাথা পাইতি।
বলে নিজে উঠে বিথুই বুড়িকে টেনে তুলল পালকি।আগে তার শরীর ঝেড়ে দিল।তার পর নিজের শরীর ঝেড়ে নিল আঁচল দিয়ে।বিথুই বুড়ি হাসতে হাসতে বলল,”মনে রং ধইরেছে লা?লাগুক লাগুক।”তারপর হঠাৎ মুখ গোমড়া করে নিল।এগিয়ে এসে ললিতার কাছে দাড়াল।ললিতা একটা ফিকে হাসি দিয়ে বলল,”আমাকে চিনতে পারছেন?কালকে যে দেখেছিলেন।আমি ললিতা।আপনার আব্বাজীর নাতনী।” বুড়ি কি বুঝলো আর কি বুঝল না জানি না।কিছুক্ষন ললিতার মুখের দিকে পাথরের মত তাকিয়ে রইল।তার পর হঠাৎ মাথা চুলকাতে চুলকাতে হো হো করে হেসে উঠল।মুখে আওড়াতে লাগল,”রং লেইগেছে।আকাশের রং নীল।আর দুঃখের?” বুড়ি চিৎকার করে হাসতে হাসতে চলে গেল।ললিতা অবাক হয়ে তাকালো পালকির দিকে।পালকি কিছুক্ষন বুড়ির যাওয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,”ও অমনি।কথার কোন আগাগোড়া নাই।পুরা গেরামে আমার কথায় কিচ্ছু মনে করে না।আর বাকিরা তেমন কথাও কয় না।” ললিতা এগিয়ে হাটতে লাগল।”শুনেছি ওনি যা বলেন তাই হয়।”
-হ হয় তো।গেলবার রশিদ মাষ্টারের পোলা মইরা যাওয়ার আগে বুড়ি কইছিল।নতুন কইবর খুইড়তে।দেড়মাস পড় পোলা মইর্যা গেল।
-ধুর এমন হয় নাকি।এটা তো কাকতালীয়।তুমি কি করে বুঝলে ওনি আগে থেকেই বুঝেছেন।
-তাইলে কইলো কেমনে।
-তোমাকে খুব আদর করেন?
-হ।
-তাকে জিজ্ঞেস করো তার মৃত্যু কবে হবে।দেখো বলতে পারে নাকি।
-হ ললিদি।জিগাইছিলাম।কিছুই কইল না।
ললিতা হেসে ফেলল এবার।আজব এখানকার মানুষ।যে এত মানুষের ভবিতব্য বলে দেয় সে নিজের বেলায় চুপ।তবুও তার কথা সবাই বিশ্বাস করে।হাটতে হাটতে তারা তেঁতুলগাছের নিচে এসে দাড়ায়।গাছটার থেকে মানুষের চলার পথ অনেকটা দুরে।মনে হয়না এদিক দিয়ে কেউ যায়।ঝাঁকড়া তেঁতুলগাছ দেখলেই এর কারন বোঝা যাচ্ছে।নিশ্চয় ভুতের ভয়।”আচ্ছা পলা।রাস্তাটা এখান থেকে এত দুরে কেনো।গাছের নিচ দিয়ে কেউ যায় না নাকি।”
-না।কেউ যায় না।
-ভুতের ভয়।
পালকি চোখ বড় করে তাকালো ললিতার দিকে।মুখটা কাছে এনে বলল,”তুমি কি কইরা জানলা এইহানে তেনারা থাকে।” ললিতা আরেকটু কাছে সরে এসে বলল,”আমার কাছে জাদু আছে।”বলে হেসে দিল সে।”তা দিনের বেলাতেও কেউ আসেনা বুঝি?”
-নাহ।বেবাকে কয় এই গাছের নিচে অমাবইস্যার রাইতে যে আসে তার নাকি এইহানের মরণ হয়।অনেক কাহিনী কয় মাইনষে।দিনের বেলাতেও ভুলে কেউ এইদিকে আসে না।
-তাহলে তুমি আসলে যে।তোমার ভয় করে না?
-তুমিও তো আইছো।বিথুই ও তো আসে।
-ওনার কাছে তো শক্তি আছে।আর আমি তো এসব বিশ্বাস করিনা।
-তা আমি করি।তয় ডর লাগে না।কত আইয়া বইয়া থাহি।একটা কথা কমু?কাউরে কইও না যেনো।
ললিতা মাথা নাড়ল।পালকি এদিক ওদিক দেখে গলার স্বর নামিয়ে আনল।ফিস ফিস করে বলল,”গেল অমাবইস্যার রাইতে আমি এইহানে আইছিলাম।ঘন্টা দেড়েক বইসাছিলাম।কেউ জানে না।”
-সেকি।রাতে এদিকে কেনো?
-মামির ডরে।বাড়িতে থাকলে ঝাটার বারি খাইতাম।তাই পলাইয়া আছিলাম।পরে বিথুইয়ের কাছে গিয়া ঘুমাইছি।
-ওনি জানেন?
-হ।বিথুইরে আমি সব কই।দিল গাল মন্দ কইরা।কইল মরবি লা মরবি।
বলে হেসে উঠল পালকি।তারপর ললিতাকে পিছনে ফেলেই সে ছুটে গাছের কান্ডের কাছে গিয়ে থামল।তারপর বাদরের মত গাছের সবচেয়ে নিচু ডালে ঝুল খেয়ে উপরে উঠে গেল।সেখান থেকে হাসতে হাসতে বলল,”এইহানে গো ললিদি।এইহানে বইসাছিলাম।সেকি বাতাস সেদিন।” ললিতা তাকিয়ে দেখে পালকির চাঞ্চল্য।পালকি ডাল বসে চিৎকার করে বলল,”বিথুই কইল এইহানে কেন গেলাম।মইরম এহন।আমি কি কইছি জানো?”
-কি।
-কইছি মইরা গেলে এই গাছেই থাইকা যামু।এই ডালটায় বইসা হাওয়া খামু।আর গান গামু।দক্ষিণেরই হাওয়া বয়
আমার কথা কয়।।
বলে হাসতে থাকে পালকি।সে হাসিতে কোনো দুঃখ নেই কোনো বিষাদ নেই।নেই কোনো আশা আকাঙ্খা।শুধু আছে হাসির মনোমুগ্ধকরতা।যা ললিতার কাছে লোভনীয় লাগে।পালকি থামে না।তার হাসি আওয়াজ ধ্বনিত হয় রূপবানের ওপারেও।

ছয়.
এখানে এসে অনেকদিন হয়ে গেলো।পালকির সাথে ললিতার বন্ধুত্ব গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়ে উঠছে।পালকি বড়ই মিশুক মেয়ে তাই হয়ত এমন হচ্ছে।তবে ললিতার মন ইদানীং চিন্তিত হয়ে পড়ে।সময়ে সময়ে পালকির কথা তার মনে পড়ে।কারনে অকারনে তার মুখশ্রী ভেসে উঠে।দাদুর লাইব্রেরীর জানালা খুলে বসলে রূপবানের রেখা চোখে পড়ে।সেই জানালার কাছে বসলে দমকা হাওয়ায় তার চুল গুলো নড়ে না।এলোমেলো ও হয় না।শুধু সে চোখ বন্ধ করে ফেলে।আর সে পলকেই সেই হাসি মাখা মুখ ভেসে উঠে।ভেসে আসে সেই হাসির কলকল শব্দ।গাছের ডালে বসে পা দোলাতে থাকা সেই লক্ষ্মী প্রতিমার মত চেহাড়াটা ললিতার কাছে পরীর মত লাগে।আজও সে লাইব্রেরীর পিছনের দিকে জানালা খুলে সেদিকে তাকিয়ে আছে।হাতে রবি ঠাকুরের চোখের বালি।কিন্তু পড়ায় তার মন নেই।সে ভাবছে অন্য কথা।
আচ্ছা সে কি প্রেমে পড়ে গেছে পালকির।তাকে চোখে হারানো তাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকা।তার চাপা গায়ের রং দেখে তার চোখে অদ্ভুত সুন্দর লাগা।সবই কি শুধু সে গ্রামের মেয়ে দেখেনি বলে?নাহ।সে প্রেমে পড়েছে।হ্যা সে পালকির প্রেমে পড়েছে।আজ প্রায় একমাস মত হতে যাচ্ছে সে এখানে।বার বার একই প্রশ্নের সামনে এসে সে দাড়িয়ে গেছে।আজ তার উত্তর সে অনুধাবন করল কিছুটা হঠাৎ করেই।
-ললিদি।
চেনা কন্ঠস্বরটা শুনে ফিরে তাকাল ললিতা।পালকি সামনে দাড়িয়ে।চোখে মোটা কাজল তেল চকচকে চুলে ফিতা দিয়ে বেণনী।নাকে নাকফুলটা আগের মতই চকচক করছে।অসাধারণ কিছুই নেই,তবে সাধারণ ও নয় বটে।ললিতা একটা মৃদু হাসি দিয়ে বলল,”চলো আজ কোথায় যাবো?”
-বিথুইয়ের বাড়ি।ফকিরের ভিটায়।
-ওই ভবিষ্যৎ বলা বুড়ো মহিলার কাছে?ওনি আবার ছায়া টায়া ডেকে ভয় দেখাবেন না তো?যা অদ্ভুত।
-আরে না না।আমি আছি না।তুমি ডরাইও না।
পালকি ললিতার মজা করাটা কতই সরল মনে বিশ্বাস করে নিল।ললিতা এবার দম ফাটানো হাসি এলো।
-তুমি সত্যি বোকা পলা।
পালকি কিছুই বোঝে উঠতে পারল না।ফিকে হাসি দিয়ে দাড়িয়ে রইল।ললিতাকে দেখছিল সে।হাসলে বড়ই ভাল দেখায় তাকে।সে জানে না ললিতাকে তার কেনো এত ভাল লাগে।ললিতা এমনিরে খুবই চুপচাপ।কথা কম বলে।পালকির কম কথা বলা মানুষ দেখলে দম আটকা লাগে।কিন্তু ললিতাকে তার তেমন লাগে না।ওর সব কাজই পালকির কেনো পছন্দ হয়।এই কয়দিন তার মাথায় আবার এই প্রশ্নগুলো জট পাকাচ্ছে।আচ্ছা তার তো কাউকে ভালবাসতে ইচ্ছা করে।কিন্তু কাকে সে ভালবাসে তা সে কখনো বুঝে উঠতে পারে না কেনো।বিথুই বুড়ি সব জ্ঞান রাখে।তাই তাকেই আজ জিজ্ঞাসা করবে পালকি।পালকি ব্যস্ত হয়ে ললিতাকে বলল,”চলো ললিদি।রইদ্দোর চইড়লে আর রইক্ষে থাইকবো না।”
-চলো।
*****
গ্রামের উত্তর দিকে কিছুটা ঝোপজঙ্গল এর মত একটা জায়গা।বড় বড় গাছ কয়েকটা।তার তিন দিকে ছোট ছোট লতা গুল্ম ঘন হয়ে আছে।একদিকে মানুষ চলার ফলে নেই।সেইখানের ফকিরের ভিটে।বাড়ির অবস্থা দেখলে গায়ে কাটা দেয়।রাতে এখানে জীবজন্তু ছাড়া যদি মানুষ থাকে তাহলে হয় তার মাথায় সমস্যা নয় সে মানুষ নয়।
-পলা।এটাকে ফকিরের ভিটা বলে কেনো?
-এককালে এক ফকিরের বাড়ি ছিলো।বেবাকে কয়।তার দাদাও বাড়ি বাড়ি মাঙন কইরা খাইত বাপও মাঙন কইরা চইলতো।সে ও মাঙন কইরা খাইত।শেষ তার পোলার হঠাৎ কি হইল কে জানে।গেরাম ছাইড়া চইলা গেল।
-ভালই হলো।এখানে থাকা যায় নাকি।
-না গো ললিদি।এর অবস্থা আগে এমন আছিল না।আমি দেখছি।এখন কেউ নাই তাই অমন হইছে।
-ওই মহিলা এখানেই থাকেন?একা?
-হ।মাঝে মাঝে আমি থাইকতে আসি।মামির ঝেটা খাইয়া।
বলে মুখ চেপে হাসলো পালকি।তারা ঘরের দাওয়ায় গিয়ে দাড়ালো।জায়গায় জায়গায় মাটি ভেঙে গেছে।দাওয়ার চালটা অনেক নিচু।
-দাদুর এত বড় বাড়ি।ওনি ওখানেই থাকতে পারেন।দাদুকে আজই বলছি।
-কইয়া লাভ নাই।বুড়ি বড় ঠ্যাডা।বজ্জাতিরে কতবার কইলাম।দাদু ও কইল গেলো না।
বলে গলা বাড়িয়ে ঘরের ভিতর দেখে ডাকতে লাগল পালকি।”বিথুই ও বিথুই।বাড়ি আছিস নি।আমি আইছি।দেখ কেডা আইছে লগে।”
-আব্বাজীর নাতনী ললি বিবি নি?
বলতে বলতে ঘর থেকে হাসি মুখে বের হয়ে এলো বিথুই বুড়ি।এসে পালকিকে ডিঙিয়ে সে ললিতার কাছে গিয়ে দাড়াল।মুখের দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগল।ললিতা খানিক অবাক হলো।একমাসে এই প্রথম বৃদ্ধা তাকে দেখে হেসেছে।এই প্রথম তাকে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে ললিতার।”আইসো ঘরে আইসো বইন।”
-ও বুড়ি।তোর হইল কি।আমারে ফালাইয়া তুই ললিদিরে নিয়া পইড়লি যে বড়।
-পান খাইবি?ল খা।
বলে হাতের মুটোতে রাখা পানটা পালকির মুখে গোজে দিয়ে ললিতাকে টানতে টানতে ঘরে নিয়ে এলো বিথুই।ঘরে দেখার অবস্থা নেই আর।একধারে কুপির কালো দাগে মাটি কালো হয়ে গেছে।তার পাশে একটা খাটে ছেড়া বহুদিন না ধোয়া কাথা আর তেল চিটচিট করা বালিশ।তার ধারে পায়ের কাছে কিছু কাপড় আর পুটলি।
-আপনাকে তেল এনে দেয় কে?
-আব্বাজী দেয়।গায়ের যারে কই সেই দেয়।মনু ময়রা ও দেয়।
-আপনি দাদুর সাথে থাকতে যান না কেনো।দাদু আপনার খুব কদর করেন।আমি দাদুকে বলব আপনাকে নিয়ে যেতে।যাবেন।
বুড়ি চোখ বুজে বসে পড়ল খাটে।তারপর কি ভাবল বুঝা গেল না।চোখ খুলে পালকিকে কাছে ডাকল ইশারায়।পালকি এগিয়ে এসে বসল তার পাশে।
-তুই আমারে কিছু জিগাইবি?
পালকি উঠে দাড়ালো।”তুই জানলি কেমনে?”
-ললি বিবিও জিগাইবো।জিগা বিটিরা।
বলে গম্ভীর মুখ হা করে হেসে সে হাত তালি দিয়ে উঠল।ললিতা এবার কিছুটা অবাক হলো।সত্যি সে আজ বিথুই বুড়িকে জিজ্ঞেস করতে এসেছে সে কি সত্যি ভবিষ্যৎ বলতে জানে?তাহলে তাকে কি সে বলতে পারবে তার মনে যা চলছে তা সত্যি কি না।সে পালকি কে ভালবাসে কি না।
কিন্তু সে মুখে ভাব প্রকাশ করল না।বলল,”আচ্ছা আপনি কি বলতে পারবেন আমার মনে যা চলছে তা সত্যি কি না।আমি এখানে আসার আগে নিজের কাছে যে উত্তর পেলাম তা সত্যি কি না।”
-হাচা।সব হাচা।
-তাই নাকি।আপনি কি করে জানবেন আমি কি ভাবছিলাম।আমি তো কিছুই বলিনি।
-মনে রং লাগছে।পিরিতের হাওয়া বয়?
ললিতা দ্বিতীয় বারের মত অবাক হলো।সে আর কিছুই বলল না।সামনে দাড়িয়ে পালকি ওদের জ্ঞানবাক্য কিছু বুঝে উঠতে পারল না।কিছুক্ষন হা করে থেকে বিথুইয়ে গা গেসে আবার বসে গেলো।দুইহাতে তাকে ঝাপটে ধরে কাধে মাথাটা রেখে ঢুলতে লাগল।
-ছাড় মুখপুড়ি।তোর মনেও রং ধইরেছে।
-যাহ।তোর যত আজে বাজে কথা।
-কেন।তুই এই জন্যি আসছ নাই?শোন।চক্ষু বন্ধ কইরা মনের ভিতর দেইখলে যারে দেখা যাইব সেই তোর।এই তো জানতে আইছিলি?
পালকি হঠাৎ লজ্জায় পড়ে গেল।
বিথুইটা ললিতার সামনে এভাবে বলে দিল সব।ওকে ধাক্কা দিয়ে সে নিজে উঠে দাড়ালো।কিছুক্ষন তাকিয়ে ললিতাকে দেখল।তারপর বিথুইয়ের দিকে তাকালো।
-যাহ।চিনাইল্ল্যা বুড়ি।
বলে বের হয়ে এলো একাই।ললিতা এবার বিথুই বুড়ির হাতে দুটো ধরে বলল,”আপনি থাকবেন তো সিকদার বাড়িতে?তাহলে আমি আজি দাদুকে বলব আপনাকে নিয়ে যেতে।”
-পাঁচ মাস আছে হাত।যামু।যাইতে তো হইবই।পাঁচ মাস পর যামু।আব্বাজীরে কইও আমি পাঁচ মাস পর আমু।
-ঠিক আছে।
-ও লা কই গেলি।অলক্ষ্মী আমারে গাল দিয়া গেল।
বলে বেরিয়ে এলো বিথুই।ললিতার পিছন পিছন হাসি মুখে বেরিয়ে এলো।”চলো তো ললিদি।বুড়ির মাথা খারাপ।”বলে দাওয়ায় উঠে ললিতাকে টানতে টানতে নিয়ে গেল পালকি।তাদের যাওয়ার দিকে অপলক তাকিয়ে ছিল বিথুই।একটু পর তার চোখ ভিজে এলো।ভিজা চোখ মুছতে মুছতে সে ঘরে চলে গেল।একটু পর আবার হাসির আওয়াজ পাওয়া গেল ঘর থেকে।

সাত.
গ্রামের দক্ষিণ পুরোনো মন্দির আছে।ভাঙা মন্দির।অনেক আগে বানানো হয়েছিল।দেওয়াল গুলোতে বট হয়েছে।কোথাও ইট বেরিয়ে এসেছে।মন্দির প্রতিষ্ঠিত দেবতা শিব।এক কালে মহা ধুম ধাম করে শিবরাত্রিতে গ্রামের সব হিন্দু মেয়ে বউরা এখানে পুজো দিতে আসতো।সারা বছরই এখানে পুরোহিত ছিলো।এখনও পুজো হয়।তবে শুধু শিবরাত্রিতে।সারা বছর আর কোনো লোক এমুখো হয় না।পুরোহিত আর এই মন্দিরের সেবায় নেই।শিবরাত্রি এলে পুরোহিত আনা হয়।বাকি সময় এমন অবহেলায় পড়ে থাকে।মন্দিরটা বেশ বড় নয়।ছোট একটা ঘরের মত জায়গা যাতে দুইজন কি তিনজন অতিরিক্ত মানুষ নেয় না।এমনিতে এদিকটা জঙ্গল।সাপের ভয় তো রয়েছেই।তাই শিবপুজো করার সময় এটা পরিষ্কার করা হয়।পালকি অনেকবার এসেছে এই মন্দিরে।গায়ের বুড়িরা রসিকতা করে কম বয়সি মেয়েদের বলে শিব ঠাকুরের সামনে বসলে নাকি মনের মানুষের দেখা মিলে এখানে।চোখে নাকি তার মুখ ভেসে উঠে।
-তুমি কখনো করেছো এমন?
পালকির মুখ থেকে সব শুনে বলল ললিতা।
-না করি নাই।তয় ভাবতাছি একবার কইরা দেহি।
-বাব্বাহ।তাই নাকি।বিথুই বুড়ির কথা তাহলে তোমার মনে গেঁথে গেছে।
পালকি এবার লজ্জা পেয়ে গেলো।কিন্তু ফিক করে হেসে সে তা উড়িয়ে দিল।তারপর মন্দিরে উঠে গিয়ে শিবলিঙ্গটা হাত দিয়ে মুছে পাতা সরিয়ে দাড়ালো।কিছুক্ষন মাটির দিকে তাকিয়ে কি ভাবল।তারপর ফিরে এলো।ললিতা অবাক হলো না।কারন এই দিনে পালকিকে ও যতটা বুঝেছে এই মেয়ে কখন কি করে তার কোনো ঠিক নেই।আসলে বয়স কম।তাই সিদ্ধান্ত চলার গুণের চেয়ে কাজ করার প্রবণতা বেশি।তবুও সে জিজ্ঞাস করল,”কি হলো ফিরে এলে যে।পুজো করবে না?”
-না।আমি তো পুজো কইরতে জানি না।তুমি দেখতে চাইলা তাই লইয়া আইলাম।এই লও।
বলে কুঁচ থেকে একটা বিশাল পেয়ারা ললিতার হাতে গোজে দিল।ললিতা তখন থেকে লক্ষ্য করছিল ওর কুঁচে কিছু ছিল।
-কোথায় পেলে।
-কাইল বিন্তিগোর বাগানে গেছিলাম।নিয়া আইছি।
-বলে এনেছো?
-নাহ।
-সেকি।চুরি করলে?
-না তো।চুরি করুম কেন।ধার নিলাম।দাদুর বাগানে যহন হইব তহন বিন্তি নিয়া যাইব না কইয়া।
-সবার সামনে দিয়ে।
-না সন্ধ্যায়।আমি যেমনে আনছি সে ও তেমনে নিব।সুদবোদ।
ললিতা পালকির মনকষা হিসাবের আগাগোড়া বুঝে এটাই পেল যে সে নিজেও চুরি করেছে এবং বিন্তিকেও শিখিয়েছে।কিন্তু তাদের কারোর চোখেই তা চুরি নয়।ললিতার হাসি পেয়ে যায়।
*****
রাতে বিছানায় শুয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে আছে পালকি।অপেক্ষা করছে কখন রাতটা একটু গভীর হবে আর কখন সে ঘর ছেড়ে বের হবে।আরো কিছুক্ষন শুয়ে থেকে শেষে অতিষ্ঠ হয়ে বেরিয়ে পড়ল পালকি।উঠোনে দাড়িয়ে দেখল কমলার ঘরের বাতি বন্ধ।মানে নাক ডেকে ঘুম।এই সুযোগ আর আসবে না।
রাস্তায় যেতে যেতে আসে পাশে তাকাচ্ছে পালকি।ভুতের ভয় তার কখনো ছিল না।সে ভাবছে এদিকে মানুষ এই সময়ে না থাকলেও যদি ভুলে কারো সামনে পড়ে যায় তবে সব পণ্ডশ্রম।ওই সময় ললিতা থাকায় সে ঠাকুরের সামনে বসেনি।কেন জানি মন সায় দিল না।তাই সে রাতে এসেছে।বার বার মনে হচ্ছে তার চোখে ললিদির মুখ ভেসে উঠবে।কিন্তু কেনো তার উত্তর সে জানে না।
ভাবতে ভাবতে মনু মিয়ার দোকানের পিছন দিয়ে হেটে তেঁতুল তলা ধরে সে দক্ষিণ দিকে মোড় নেয়।তারপর কিছুটা ভিতরে গেলেই মন্দির।ভরা পুর্নিমা রাত।রাস্তাঘাট চক চক করছে আলোয়।বড় বড় গাছের মাথা থেকে চাঁদের আলো এসে মন্দিরের উপর পড়েছে।মায়াময় শোভা ছড়াচ্ছে সে আলো।পালকি মন্দিরের ধাপ বেয়ে উপরে উঠে গেল।পিনপতন নীরবতা,তার মধ্যে পালকির নুপুরের ঝুম ঝুম ভুতুরে লাগছিল।পালকির সমস্ত শরীর কাঁপছে।সে জানে না কেনো।হাত জোড় করে সে মনে সত্য প্রেম ভাবনা এনে তার চোখ বন্ধ করে দাড়ালো।সব কিছু অন্ধকার।সেই অন্ধকারে বার বার একটা চেহাড়া অতি পরিচিত চেহাড়া ভেসে উঠছিল।সেই প্রথমদিন দেখা,তারপর ঘুড়তে যাওয়া,তেঁতুল গাছের কাছে বসা।সব ছাড়িয়ে ছাপিয়ে উপরে উঠছিল শুধু ললিতার চেহাড়া।পালকি চোখ খুলল।তার চোখ থেকে কখন পানি পড়া শুরু হয়েছে সে তা জানে না।এবার সে ঢোকরে কেঁদে উঠল।মনে তার মিশ্র অনুভুতি হচ্ছে।সে মনের কোনো এক অন্ধকার কোনায় এই একটা আশা জাগিয়ে রেখেছিল যে ললিতার চেহাড়া সে দেখবে।সে চেয়েছিল সে দেখবে।তবে হঠাৎ কিসের ভয় তাকে পেয়ে বসল।সে মেয়ে হয়ে একটা মেয়েকে ভালবাসে কি করে।
না, আর এক মিনিট এখানে নয়।পালকি আর দাঁড়ালো না।ঝোপজঙ্গল দিয়ে দৌড়াতে সাবধানতা এখন তার মাথায় নেই।পায়ে কখন কাটা ফুটলো সেদিকে তার মন নেই।তার মাথায় শুধু ঘুড়ছে সে যদিও বা ভালাবেসে থাকে ললিদি কে।কিন্তু ললিতা কি তার ভালবাসা বুঝবে।এখানকার মানুষ কি বুঝবে?

আট
ললিতা সেই কখন থেকে ছটফট করছে।এত অস্থির তার কখনো লাগেনি।বিথুই বুড়ির কথাগুলো তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।বার বার ইচ্ছে করছে তেঁতুল তলায় গিয়ে দাড়ায়।কিন্তু এত রাতে।ভয় তার করছে না।কিন্তু তার তেঁতুল তলায় যাওয়ার থেকেও বেশি ইচ্ছা করছে সেখানে গিয়ে একবার পালকিকে দেখবার।সে কি যাবে পালকির কাছে।
বাইরে এসে দড়জা খুলে একবার দাদুর ঘরের কাছে গিয়ে দেখল সে।সবাই ঘুমিয়ে।এমন সুযোগ আর দুইটি নেই।ললিতা আবার নিজের ঘরে ফিরে এলো।কিছুক্ষন বিছানায় বসে কি যেন ভাবল।তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে দড়জা বন্ধ করে সে নিচে নেমে এলো।বিশাল জমিদার বাড়ি।ঝি চাকরের অভাব নেই।সেকেলে দুয়ারপাল নেই তবে একজন প্রহরী রয়েছে।ললিতা সিঁড়ি বেয়ে নিঃশব্দে নিচে নেমে এলো।একবার উঠোনে দাড়িয়ে চারদিকে তাকাল।পুরো বাড়ি থমথম করছে।অন্দর পেরিয়ে চার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে আবার চার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে হয়।বাইরের বিশাল উঠান পেরিয়ে মুল দুয়ার।সেখানে ছোট একটা ঘর।যেখানে প্রহরী থাকে।সে ও নাক ডাকছে।ললিতা সেদিকে একবার দেখল।খোলা দড়জা দিয়ে প্রহরীর হা করে শুয়ে থাকার ভঙ্গিমা দেখতে অদ্ভুত লাগে।
ললিতা দড়জার কাছে গিয়ে খুব সহজেই দড়জা খুলে ফেলল।কারন মুল দুয়ারে শুধু একটা কাঠ আড়াআড়ি দেওয়া।সিকদার বাড়িতে চুরি তো দুর ঢোকার জন্য এখনও মানুষ ভাবনায় পড়ে যায়।ললিতা বেরিয়ে দড়জা লাগিয়ে দিল।দুয়ার এত বড় নয় যে একজন মানুষ সামলাতে পারবে না।ললিতা এবার একটু তাড়াতাড়ি হাটতে লাগল।বার বার পালকির চেহাড়া সামনে আসছে।যতবার বিথুই বুড়ির কথা মাথায় আসছে ততবার পালকির চেহাড়া ভাসছে চোখে।তার মনে শুধু একটি কথায় আসছে।সে পালকিকে ভালবেসে ফেলেছে।
****
মনু মিয়ার দোকান সেই কখন পিছনে পড়ে গেল।সামনে তেঁতুল গাছ দেখা যাচ্ছে।ললিতা আরো কিছুক্ষন দ্রুত হেটে তেঁতুল তলায় এসে দাঁড়াল।মৃদু মন্দ বাতাস তার গায়ে ঠান্ডা ঠেকছিল।গাছের একটা মোটা শিকড়ে বসল ললিতা।সে কখনো কাঁদতে পছন্দ করে না।কিন্তু আজ তার চোখে অশ্রু বিন্দু স্পষ্ট।বাতাস বয়ে চলে কিন্তু তার চুল নড়ে না।সামনের চুল গুলো একটু কেঁপে উঠে।ললিতা পাথরের মত বসে ভাবে।
আজ কত বছর হয়ে গেল।সে জানতে পারল সে সমকামি।তখন তার বয়স উনিশ হবে।এখন সে পঁচিশ বছরে পা দিয়েছে।বাড়ি থেকে বিয়ের চাপ আসে।সে কিছুই বলে না।বার বার মানা করতেও এখন তার ভাল লাগে না।মা নিজের মত করে চিৎকার করে ক্ষান্ত হন।কিন্তু সে প্রতিবাদ করে না।তারপর একদিন হঠাৎ দাদু জেদ ধরল এখানে আসার জন্য।এখানে আসার পর পালকিকে দেখা।আর প্রথম দেখাতেই ভেতরে মোচড় দিয়ে উঠা।আজ দেড়মাস এই মেয়ের সাথে থেকে সে প্রতিবার তার প্রেমে পড়েছে।আচ্ছা পালকি কি বুঝবে তার কথা?নাকি তার কথা ছি বলে দুরে সরে যাবে।খুব ইচ্ছে করছে একবার পালকিকে দেখতে।আজ আর কোনো বাধা নয়।আজ সে বলেই দেবে তার কথা।
“কেডা?ললিদি??”হঠাৎ পিছনে পরিচিত গলা পেয়ে ফিরে তাকাল ললিতা।পালকি দাঁড়িয়ে আছে।জোরে জোরে শ্বাস ফেলছে।মনে হয় দৌড়ে এসেছে।
-একি পলা।তুমি এখানে?এত রাতে।আর এমন করছ কেনো।
পালকি কিছুক্ষন ললিতার দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর ধীরে ধীরে সে শান্ত হল।একটু এগিয়ে তেঁতুল গাছের কাছে গিয়ে ললিতার দিকে পিছন দিয়ে দাঁড়াল।
-মন্দিরে গেছিলাম।
-দক্ষিণে?শিবমন্দির?
-হ।বিথুই কইছিল না চোখ বন্ধ কইরা যারে দেখুন সেই আমার।মন্দিরে তো ভোলানাথ থাকেন।আমি মিছা দেখমু না।
-কি দেখলে??
পালকি চুপ করে দাড়িয়ে রইল।চোখ ঝাপসা ঠেকছিল।ললিতার দিকে ফিরল সে।ললিতা উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে।
-বলো পলা।
পালকি নিচে তাকাল।ললিতা এবার এগিয়ে এসে ওর হাতে ধরে নাড়া দিল।
-পলা বলো।
-তোমারে দেখছি।
বলে ফুঁফিয়ে কেঁদে উঠল পালকি।হাটু গেড়ে বসে গেল মাটিতে।ললিতা কিছুক্ষন চুপ ছিল।তারপর আস্তে আস্তে বলল,”ভালাবাসবে আমায়?”
পালকি উঠে ললিতাকে জড়িয়ে ধরে আবার কেঁদে উঠল।
নিশ্চুপ রাতে পালকির কান্নার শব্দ শুধু ললিতা শুনল।পাশে রূপবান বয়ে চলেছে।তার চড়ে কতই না গল্প সৃষ্টি হয়।এবার শুরু হল নতুন গল্প।দুটো মনের গল্প।একটি ভালবাসার গল্প।আর একটু রহস্য।

নয়.
সকালের আলো তখন ঠিক করে ছড়ায়নি।আবছা অন্ধকার রয়ে গেছে।মোল্লা বাড়ির মসজিদে নামায শেষ।লোকদের চলাচলে গ্রামে প্রাণ ফিরছে আবার।হাটবারে গ্রামের বেটাছেলেরা কেউ বাড়ি থাকে না।হাটের যাত্রীর মধ্যে বাজার করতে যতজন যায় তার দ্বিগুণ শুধু হাট দেখতেই যায়।কারন অকারনে সময় নষ্ট করা এ গ্রামের লোকদের বড়ই প্রিয় কাজ।হাটবারে গ্রামে ঢুকলে লোকের সন্দেহ হবে যে সত্যি এ গ্রামে পুরুষ আছে কি নাকি শুধুই বউঝিদের দল রয়েছে।তবে আজ তো হাটে যাবার ধুম পড়ারই কথা।গেল মঙলবারে ডাক এসেছিল।হাটে নাকি রঙিন টিভিতে ছবি দেখানো হবে।নায়িকা শাবনূরের ছবি বলে কথা।তাই রাত দশটার আগে অন্তত কোনো জোয়ান ছেলের দেখা পাওয়া যাবে না।
“পালকি নাইম্যা আয় কইতাছি।অত বড় ঢেংড়া মাইয়া গাছের ডাইলে বইয়্যা নি থাহে।নাম মুখপুড়ি।”সকাল দশটার দিকে শ্যামাদাসের বাড়ি থেকে কমলার চিৎকার শোনা গেল।হঠাৎ ধরা পড়ে যাওয়ায় দেওরির কাছে থাকা আতা গাছের ঘন পাতার একটা ডালে লুকিয়ে বসা পালকি কেঁপে উঠল।এ তার প্রতিবারের কাজ।আগের বার যখন ছবি এসেছিল হাটে তখনও সে এখানে বসেছিল।গ্রামের লোকের ঢল নামে হাটে যাওয়ার জন্য।অবশ্য বেশিক্ষন বসা যাবে না।কারন এদিকে তো মানুষ কম।তাই মামির ডাকে এত উঁচু ডাল থেকে লাফিয়ে নিচে সোজা মামির উপর পড়ল সে।মাটিতে পড়ে চেঁচিয়ে উঠল কমলা।
-হায় গো ভগবান।
-ও মামি গো।দেহি নাই দেহি নাই।উঠো উঠো।
বলে পালকি নিজে দাড়িয়ে কমলাকে টেনে তুলল।কমলা উঠে পালকির চুল টেনে বলল,”হতভাগি গাছে উঠছিলি কেন।নিজে তো পড়লি আমারেও মারবি।হায় ভগবান।”
-আহ মামি ছাড়ো দেহি।আমি যাই অহন গাঙুরের পাড়ে মানুষ জড় হইছে।
-হ যাও।ওই গাঙুরের জলে তলানি দিও।আর তোমার চাঁনমুক দেহাইও না।
পালকি সে কথার কোনো আমলই করল না।সে নিজের মত যাচ্ছিল।কমলা পিছন থেকে ডেকে উঠল।
-আ লা।চুল বাইন্ধা ল।কেশ উড়াইয়া গাঙুরের ধারে চইল্লেন মহারানী।
বলে কমলা রসুইয়ে চলে এলো।সে পালকিকে আটকায়নি।ঘরের কাজ কিছুই বাকি নেই।আর এমন ভীড় প্রতিদিন হয় না।এককালে তার বাপের বাড়ি থাকতে সে নিজেও এমন করত।আর ইদানীং পালকিকে একটু বেশি খুশি দেখাচ্ছে।খুশি হওয়ার কারন অবশ্য আছে।একমাস আগে সেই তেঁতুল তলায় নিজের মনের মানুষ খুজে পেয়েছিল সে।ললিতা।
এখন সে আগে রূপবানের পাড়ে যাবে।আজ নিশ্চয় বড় নাও আসবে।ছোট বেলা থেকে দেখে আসছে হাটে কোনো বড় অনুষ্ঠান হলে বড় নাও আসে।ছোট নাও ও আসে।নায়ে অনেক মানুষ থাকে।এগাও ওগাও সব মিলিয়ে অনেক লোক।সেদিন রূপবানে যেন নতুন জীবন আসে।সত্যি অদ্ভুত।এই মানুষ গুলোর দুঃখের কোনো আদি অন্ত নেই।জনম দুঃখী এই মানুষগুলো এত দুঃখের মধ্যেও নিজের সুখ খুঁজে নিতে জানে।এত ক্লেশ এত দীনতা সত্যেও এদের হাসি বড়ই দামি।যা শত কোটি টাকা দিয়েও বড়লোকের জন্য দুষ্প্রাপ্য।
পালকি তেঁতুল তলায় দাড়িয়ে দেখছে।খুব ইচ্ছা করছিল হাটে যেতে।কিন্তু মেয়ে মানুষকে নেবে কে।কথাটা মনে হলেই রাগে শরীরে আগুন লাগে।কিন্তু এখন তার নজর অন্যদিকে।আজ সে আসার কথা।না জানি কতটুকু বড় হয়েছে।কিছুক্ষন সে দিকে তাকিয়ে রইল পালকি।তারপর হঠাৎ কাধে কারোর হাত পড়তেই ফিরে তাকিয়ে দেখে ললিতা।
-কার জন্য দাড়িয়ে?
-ললিদি।তুমি এইহানে?
-হুম।কার জন্য অপেক্ষা করছো?
-খাড়াও আইলেই বুঝবা।
ললিতা আর পালকি আরো কথা বলছিল ঠিক তখনই একটা রিনরিনে গলা ভেসে আসল।”পালকি বুয়া গো।”পালকি ফিরে তাকাল।শেষে সে ও সেদিকে ছুটল।ললিতা দেখল পালকি যে ছেলেটাকে কোলে করে নিয়ে তার কাছে এলো তার বয়স চার কি পাঁচ হবে।একটা পা থেকে খানিক ছোট।তাই ছেলেটা আসার সময় খুঁড়িয়ে হাটছিল।পালকি তার গালে একটা চুমু দিয়ে বলল,”ছবি দেখতে যাস?”
-হ।
-কেডা লইয়া আইছে।
-মামা।
পালকি তার কোচ থেকে দুইটা পয়সা বের করে ওর হাতে দিয়ে বলল,”ল কিছু খাইস।”
লজ্জা বোধ করে ফিরিয়ে দেওয়ার মত বয়স বা জ্ঞান কোনোটাই তার নেই।সে হাত পেতে টাকা নিয়ে বলল,”আমি যাই?”
-যা।
বলে পালকি ওকে নামিয়ে আরেকটা চুমু দিল ওর গালে।সাথে ছেলেটা ও তাকে একটা চুমু দিয়ে গুটি গুটি পায়ে ছুটতে লাগল।
-ওরে আস্তে যা।পইড়া যাবি।
ছেলে সে কথায় কান দিল না।শুধু তার রিনরিনে গলায় দুর থেকে বলল,”তোমার লাইগ্যা ফিতা আনুম নে।”
পালকি হেসে উঠল।ললিতা এতক্ষন সব দেখছিল।এবার বলল,”কে বাচ্চাটা?”
-আমার এক সইয়ের ননদের ছাওয়াল।আমার লাগানই মামার ঘরে থাকে।একবার মামিরে কইয়া ওগোর বাড়ি গেলাম তহন দেখা হয়।
-ওর বয়সই তো পাঁচ বছর।
-হ দুই তিন বার দেখা হইছে।
-নাম কি ওর?
-রূপ।
*****
সন্ধ্যার দিকে পালকি আর ললিতা ললিতার ঘরে বসে ছিল।কারোরই মন ভাল না।আজ দুপুরেও মনটা কত ভাল ছিল।পালকি একদম চুপসে গেছে।ললিতার বাড়ি ফিরে যেতে হবে।ফিরতে ইচ্ছা করছে না পালকিকে ছেড়ে।কিন্তু এখানে তো আর একেবারে থাকা যাবে না।পালকি একবারও মানা করেনি।কিন্তু ওর মুখ দেখলে ললিতা বুঝতে পারছে সবই।
-পলা।কেনো মন খারাপ করছো?আমি তো হারিয়ে যাচ্ছি না।
-না আমার মন ভালা।
পালকির চিবুক ছুঁয়ে ললিতা তাকে নিজের দিকে ফিরালো।পালকি এবার কেঁদে জড়িয়ে ধরল ললিতাকে।পালকির এই শিশুসুলভ আচরণ ললিতাকে অবাক করেনি।কারন সে জানে পালকি এমন করবেই।পালকিকে জড়িয়ে ধরে সে বলল,”বোকা মেয়ে।আমি তো আসব আবার।”
-কহন আইবা?
-আবার সময় হলেই আসব।
-তুমি যাইও না।আমি মইরা যামু।
-পলা।কি যে বল না তুমি।আমাকে যেতেই হবে।বাবারও শরীর ভাল না।বড়ভাইয়া খবর পাঠিয়েছেন।ভাবিও বাড়ি নেই।একটু বুঝো লক্ষ্মীটি।
-না।আমি কিচ্ছু জানি না।তুমি যাইবা না।তাইলে ওরা আমারে গোপাইল্ল্যার লগে বিয়া দিয়া দিব।
-আরে বোকা দাদু তো আছেই।আমি না গেলে মা রাগারাগি করবে।
পালকি আর কথা বলল না।অনেক্ষন চুপ করে ললিতাকে জড়িয়ে বসে রইল।একটু পর কারো আসার শব্দ শোনে তারা ঠিক হয় বসল।দাদু ঘরে এলো।
-দাদুভাই কাল যাওয়ার ব্যবস্থা করেছি।
-ঠিক আছে দাদু।তুমি বসো এখানে।
হাশেম সিকদার বিছানায় বসলেন।তারপর আস্তে আস্তে কথাটা বললেন।তার নিজেরও মন খারাপ।
-তোর বাবাকে বলিস এবার গ্রামের বাড়িটা দেখা দরকার।আমি আর কতদিন?আমি মরলে এই বাড়ি ফাঁকা।
-আহ দাদু।আজাইরা কথা কইয়ো না।
পালকি ধমকে উঠল।

দশ.
পরদিন সকালে ললিতা চলে গেল।পালকি সারাদিন খেল না।কারোর সাথে কথা বললো না।কেউ তাকে খুব একটা দেখল না।সে সারাদিন দক্ষিণে শিবমন্দিরে বসে রইল।সন্ধ্যের দিকে বাড়ি না ফিরে সে উত্তরের পথ ধরল।হাজেরা বানু তাকে পথে একবার কি জিজ্ঞেস করছিল সে শুনে নি।কোনো জবাব ও দেয়নি।সোজা উত্তরের শেষে ফকির ভিটায় এসে থামল।বিথুই বাইরে বসে কি যেন আকঁছিল দাওয়াতে।এই সন্ধ্যের আবছাতে তার চোখে যে বিশেষ কিছুই ফুঁটে উঠছে না তা তার বার বার নিচে ঝুকে দেখার চেষ্টাতে স্পষ্ট।পালকিকে দেখে সে নড়ল না।কথাও বলল না।পালকি সোজা দাওয়া দিয়ে ঘরে চলে গেল।একটু পর বিথুই বুড়ি ঘরে গেল।পালকির পাশে বসল।পালকি কিছুক্ষন তার দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ ওকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল।বিথুই বুড়ি সেই কলের মত বসে।তার তাকানোতে যেন প্রান নেই।একটু পর আস্তে করে পালকির মাথায় হাত বুলিয়ে দিল সে।পালকি অনেক্ষন কাঁদল।তার মন মানছে না।সে এত কিছু দায়িত্ব বুঝে না।কখনো বুঝতে সু্যোগ বা ইচ্ছা কোনোটাই হয়নি।তার শুধু মনে হচ্ছে ললিতার মুখ সে আর দেখতে পাবে না।
বিথুই এতক্ষন চুপ থেকে এবার বলল,”খাইছস?পেডে দানা আছে??”
পালকি কোনো সাড়া দিল না।বুড়ির মুখ দেখে বুঝার উপায় নেই সে এখন কি অনুভব করছে।সে উঠে খাটের কোনায় রাখা একটা পুটলা থেকে একটা কাঁচের বয়াম বের করল।সেটা পালকির সামনে এনে ধরে বলল,”খাইয়া নে।”
পালকি সকাল থেকে কিছুই খায়নি।সে হাত বাড়িয়ে বয়ামটা নিল।একটা নাড়ু বের করে মুখে দিয়ে আবার ফেরত দিয়ে দিল।বিথুই সেটা বিছানায় পালকির পাশেই রেকে বাইরে গেল।ইতোমধ্যে অনেক্ষন হয়ে গেছে পালকি এখানে।চারদিক অন্ধকার হয়ে গেছে।একটু পর দাওয়া থেকে বিথুইয়ের কান্নার আওয়াজ পাওয়া গেল।পালকি শুনল কিন্তু অবাক হলো না।
-বিথুই আমি আইজ বাড়ি যামু না।
*****
ঘরে শ্যামাদাস তার তেলচিটে বালিশ পিঠের পিছনে দিয়ে বসে আছে।কমলা নিচে আসন পেতে ভাতের থালে রেখে বলল,”বইয়া পড়।আমি ছালুনডা লইয়া আসি।”
শ্যামাদাস নড়ল না।আগের মত বসে ঝিমুতে লাগল।ইদানীং শরীর ভাল না।জ্বরে ডাক ডাকছে কয়েকদিন ধরে।কমলা তরকারি আগেই রাখতে রাখতে আবার ডাকল,”আ গো ঠান্ডা হইয়া যাইব যে।আসো।”
শ্যামা এবার নিচে এসে বসল।কমলা পাশে বসল।উত্তরি বাতাস শীতের আগমনী বলছিল।হেমন্ত শেষ হবে আর বলে।তাই পাখার বাতাস এখন প্রয়োজন নেই।শ্যামা এবার গোগ্রাসে খেতে লাগল।কমলা কিছুক্ষন সে দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,”গাট লাইগব।”
শ্যামা সে কথায় কান দিল না।কমলা আবার বলল,”আ গো তোমার ভাগ্নি বাড়ি আসে নাই অহন ও।”শ্যামা এবার থামল।তার পর কিছুক্ষন থেমে পানি খেয়ে আবার আস্তে আস্তে খেতে লাগল।খেতে খেতে বলল,”নিশ্চয় বিথুই বুড়ির কাছে।আইজ আবার কিছু কইছ নাকি?”
-হ।আমি তো বইয়্যা তাহি তোমার মহারানীরে কিছু কইবার লাইগ্যা।কবে কার কথা শুনছে সে।মুখের চুপা যেন বাঁশের ফালি।
-আহ কমলা।খাইয়া গেছে?
-নাহ।
-তুমি খাইছো?
-হ।
বলে কমলা উঠে বাইরে চলে গেল।সে মিথ্যা বলেছে।সে খায়নি।সংসারে কেউ একজন না খেলে তার খাওয়া গলা দিয়ে নামে না।শ্যামা সে কথা বুঝে।তাই কমলা উঠে এসেছে।একটু পর আবার ঘরে গিয়ে দেখল শ্যামার খাওয়া শেষ।সে পুনরায় নিজের জায়গায় বসে চোখ বন্ধ করে আছে।সেভাবে থেকেই বলল,”খাইয়া লও কমলা।রাইতে না খাইলে পিত্তি পইরব।”
কমলা শুনল।কিছু বলল না।আসন তুলে রেখে।তরকারির খালি বাটি গেলাস থালতে রেখে থালা নিয়ে সে উঠে দাড়াল।
-রোসো রোসো।লাইজ্জের কাম ফালাইয়া মহারানী উধাও।আসুক কাইল বাড়িত।ওই অলক্ষিরে যদি ঝেটাইয়া বিদায় না করছি তবে আমার নামও কমলা না।
তারপর থালা বাটি ধুয়ে এনে রেখে সে স্বামীর পায়ের কাছে বসল।
-আ গো।শইলডানি গরম হইতাছে গো।
-না।এহনও জ্বর আসে নাই।
-ডায়া লাগে নি গো।কেতাডা টাইনা দেই?
-দাও দেহি।ডায়া তো আইয়াই পইড়ল।
কমলা আর কথা বলে না।কাথাটা শ্যামার গায়ে দিয়ে সে পা টিপে দেয়।সারাদিন মানুষটা ক্ষেতে কাজ করেছে।ব্যথা হওয়া স্বাভাবিক।তার উপর আবার জ্বর আসবে মনে হচ্ছে।ঋতু বদলের এই এক দোষ।
*****
তার পর আরো পনেরোদিন কেটে গেল।ষোলদিনে হঠাৎ হাশেম সিকদার ব্যস্ত হয়ে ঢাকা চলে গেল।পালকি জানতে পারল ললিতার বাবা খুবই অসুস্থ তাই দাদু ছেলেকে দেখতে গেছেন।পালকি এর পর থেকে আরো চুপ হয়ে গেল।সকালে আর তাকে ডেকে তুলতে হয় না।আর তাকে ঘরকন্নার কাজের জন্য ঝারি দিতে হয় না।কমলার গলা এখন আর শোনা যায় না রাস্তায়।হঠাৎ করে এই আঠারো বছরের পালকি কিভাবে এতটা গম্ভীর হয়ে গেল তা কমলা বুঝে উঠতে পারে না।পড়শিরা অনেকে বলে বড় হচ্ছে তাই মেয়ের মনে বোঝ এসেছে।কিন্তু কমলার মন মানে না।সেই পাঁচ বছর থেকে দেখে আসছে।কোলে পিঠে করে না হোক লাথি ঝাটা মেরেও সেই মানুষ করেছে একে।পালকির এমন ভাবোদয় তার ভাল লাগে না।

এগারো.
দেড়মাস হয়ে গেল হাশেম সিকদার গ্রামে নেই।পালকির ওই বাড়ি যাওয়া বন্ধই হয়ে গেছে।বাড়ি থেকেই বের হয় না।শুধু প্রতিদিন দুপুরে একবার তেতুঁল তলায় গিয়ে দাড়ায়।কিছুক্ষন পথের দিকে চেয়ে থাকে।তারপর আবার ফিরে আসে।এদিকে শ্যামাদাসের মাঝে সাতদিন জ্বর হয়ে গেল।গত দশদিন ধরে তাকে আবার জ্বরে ধরেছে।শীত এসে গেছে অনেক আগেই।একে শীত তার উপর জ্বরের প্রকোপ।
আজ অনেকদিন পর শ্যামাদাস একটু সুস্থবোধ করলে বাইরে এলো।গায়ের ময়লা চাদরটা ভাল করে জড়িয়ে বলল,”কমলা,আমি একটু বাইরে গেলাম।”কমলা পিছু ডাকল না।অসুস্থ রোগি শেষে পিছু ডাকলে না কিছু অমঙ্গল হয়।সে রসুই থেকে পালকিকে ডাকল।
-কও মামি।
পালকি এসে চুপচাপ রসুইয়ের পালায় ধরে দাঁড়াল।কমলা কিছুক্ষন ওর মুখের দিকে তাকাল।কি যে হল মেয়ের কে জানে।
-আ লা।খাইছস?
-ওহু।
-মুখ পুড়ি।খাস নাই কেন।শেষে না খাইয়া মইরবি আর গেরামে ঢিঢি পইড়ব মামি ভাত দেয় নাই।যা হাত ধুইয়া আয়।
পালকি দ্বিরুক্তি না করে হাত ধুতে গেল।কমলা উঠে নিজের ভাগের পাতিলের শেষের ভাত কয়টাও পালকির থালায় দিয়ে দিল।সে জানে পালকি সকালে একটু বেশি খায়।তার একবেলা না খেলে চলবে।মেয়েটা সেই যে চুপ হয়ে গেল।এখন খেয়েছে নাকি সে খেয়ালই নেই।
-আ লা নবাবের বিটি হইছে নি?খাইয়া উদ্ধার করো মা গো।
বলে সে আবার নিজের জায়গায় বসে কাঁথা সেলাইয়ে মন দিল।
সন্ধ্যার সময় শ্যামার কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসল।সাথে প্রলাপ তো আছেই।
-কমলা।গঙ্গা জলা কই।আমি যাই আইজ।
বলে চুপ করে আবার বলতে লাগল।
-আরে আরে এইহানে না রে সইত্য…ধারে কোপা…ধারে…।সইন্ধ্যা অইয়া পইড়ল মাজন।আইজ ক্ষান্তি দেন।
কমলা জ্বলপট্টি দিতে দিতে একবার বলে,”আ গো।একডাবার একটু ঘুমাও দেহি।আমি আছি তুমি ঘুমাও।”শ্যামাদাস প্রলাপ বকেই চলে।
*****
চারদিনে শ্যামার অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে উঠল।এদিকে সংসারের রোজগার করার মত কেউ নেই।শ্যামার অবস্থা ওষুধের অভাবে ক্রমশ খারাপ হচ্ছিল।কমলা দুচোখে অন্ধকার দেখছে।কোনো উপায়ন্ত খুঁজে পাচ্ছিল না।সকাল থেকে স্বামীর মাথার কাছে বসে।সিকাদার বাড়ির বড় বাবুও বাড়ি নেই যে ঋণ আনবে।হঠাৎ পালকি এসে দাড়াল।কমলা একবার ফিরে তাকাল।তারপর বলল,”যা তো মা চুলায় গরম জলডা লইয়া আয়।”
পালকি নড়ল না।কিছুক্ষন দাড়িয়ে থেকে বলল,”মামি তোমার সাথে কথা আছে।বাইরে আহো।”
কমলা খানিক বিস্মিতা হয়ে বাইরে এলো।
-মামি মামার ওষুধ এর জোগার তো হয় না।কি করবা এহন।
-কি আর করমু।ভগবান ভাল না কইরলে আমরা কি করমু।
-মামি একবার গোপাইল্ল্যার কাছে ধার লও।
-সে কেনে দিব না তা তুই জানিস নে?
পালকি কিছুক্ষন চুপ করে রইল।তারপর বলল,”মামি,তুমি জলডা নামাও আমি আইতাছি।”
-কই যাস?
-হরিবালার কাছে।
কমলা কিছুক্ষন ভাবল।হঠাৎ কিছু মনে আসায় তার চোখ বিস্ফোরিত হল।
*****
আন্দুলিয়া শিমুলতলী পাশাপাশি গ্রাম।উত্তরে ফকিরের ভিটা পাড় হয়ে কয়েক বিঘা জমি ছাড়ালেই আন্দুলিয়া গ্রাম।গ্রামে উঠে পশ্চিমে মোড় দিয়ে সবচেয়ে বড় বাড়িটা গোপাল মন্ডলের।মাথার গোমটাটা আরেকটু টেনে হরিবালা ডাক পাড়ল।”গোপাল মাজন বাড়িত নি গো।”
-কেডা।কেডা ডাকে।
ঘর থেকে যে ভুরিওয়ালা মোটা গোফ ওয়ালা লোকটা বেরিয়ে এলো সেই গোপাল মন্ডল।বাড়িতে আর কেউ নেই।সদস্য বলতে তার আগের স্ত্রীর দুই ছেলে এক মেয়ে।তারা এখন মামা বাড়িতে আছে।হরিবালা এগিয়ে এসে বলল,”পালকির মামুর অসুখ।ঘরে কানাকড়ি নাই।হাজার টাকা দিতে পারো দিতে পাইরবা নি মিয়া?”
-আমার লাভ?
গোপালের কথা শুনে হরিবালা এক গাল হেসে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
মাঝে এক সপ্তাহে শ্যামার শরীরের অবস্থার উন্নতি ছাড়া আর তেমন বিশেষ কিছু ঘটল না।সপ্তাহ শেষে শ্যামার বাড়িতে নতুন কাপর জামা ঢুকলো।রঙিন কাগজ লাগানো হলো সারা বাড়িতে।দক্ষিণের জঙ্গল থেকে কলার তেউর কেটে পোতা হলো।বাড়িতে মানুষের আগমন বেড়ে গেল।সারা গ্রামে খবর ছড়িয়ে পড়ল।পালকির বিয়ে কাল।আন্দোলিয়ার গোপাল মন্ডলের সাথে।শুনে সকলেই খুশি হলো তেমন নয়।কেউ কেউ আবার মাথা নেড়ে মুখ ভেংছে বলল,”যে মাইয়া নিতাছে।মাইয়ার পায়ে লক্ষ্মী।এক সংসারে টিকলে তয় খাতির।”
সব কথাই পালকির কানে যায়।তবে যার জন্য এত আয়োজন সে কেমন যেন চুপসে গেছে।না সে হাসছে না কাঁদছে।না সে পাথর হয়ে আছে না প্রানবন্ত।শত ব্যস্ততার মধ্যে কমলা বার বার পালকির কাছে আসে।মুখে কিছু বলে না।অন্য কাজের বাহানায় সে বার বার পালকির কাছে যায়।পালকির মুখের দিকে চেয়ে থাকে।পালকির মন সে বুঝে উঠতে পারে না।বুক ভেঙে কান্না আসে তার।
*****
“বুয়া তুই ও যাবি?আমাকে নিবি না?”ব্যাগ গোছাতে গোছাতে হঠাৎ এই কথায় ফিরে তাকাল ললিতা।তার ভাইয়ের ছেলে দাড়িয়ে।বয়স মাত্র ছয় বছর বয়স তার।ললিতার সবচেয়ে ভাল বন্ধু নিজের বাড়িতে।ললিতা হাত বাড়িয়ে ডাকল।সে সোজা এসে ফুফুর কোলে উঠে বসল।ললিতার তার গালে একটা চুমু খেয়ে বলল,”তুই আরেকটু বড় হয়ে যা।তারপর আমরা দুজন আবার যাবো।কেমন?”
-সত্যি?
-সত্যি।
সে ললিতাকে কিছুক্ষন জড়িয়ে ধরে রাখল।তারপর নেমে বলল,”আমি মাকে বলে আসি।”
ললিতা হাসল।মন তার ভাল নেই।ঢাকা এসেছে আজ সাড়ে তিন মাস।আর মন টিকছে না।বাবাও সুস্থ হয়ে গেছেন।তাই সে এখন দাদুর সাথে গ্রামে যেতে চাই।কিন্তু বড় ভাইজান আটকে দিচ্ছে।সে নিয়ে অনেক ঝামেলার পর সে ওদের একপ্রকার জোর করে রাজি করিয়েছে।পরশো তারা রওনা হবে শিমুলতলীর জন্য।

বারো.
সাজিয়ে রাখা চালের ঘড়ায় লাথি দিয়ে নব বধুরূপে বাড়িতে ঢুকলো পালকি।দুধ উৎলে উঠল।মাটিতে বিছিয়ে রাখা লালপাড় সাদা কাপড়ে পায়ের রাঙা ছাপ পড়ল।বাড়িতে আনন্দের জোয়ার বয়ে গেল।এবাড়ি ওবাড়ি থেকে বউঝিরা দলবেঁধে এলো গোপালের বউ দেখতে।তারা পালকির ঘোমটা তুলে নিখুঁত ভাবে দেখতে লাগল।যদি কেউ বলত যে একবার বউয়ের চামড়া টেনে দেখোতো আসলেই মানুষ কিনা।তবে হয়ত তাতেও পিছপা হওয়ার লোক এখানে কেউ নেই।পালকি কথা বলল না,নড়ল না,রাগ দেখাল না,ঠোট ভেংছে দাঁত দেখিয়ে তেড়ে আসল না।শুধুই পুতুলের মত বসে রইল।তার চার পাশে এত কোলাহল কিন্তু তার কানে কারো কথায় যাচ্ছে না।শুধু ভাবছে যা করেছে মামার জন্য মামির জন্য।এত বছর তো ওদের ঘাড়ে পা দিয়ে দিব্যি খেয়ে এসেছে।অন্তত সে ঋণ আসলে ফেরত দিলো।ললিতার মুখ তার মুখের সামনে ভাসছে।কি জবাব দেবে সে তাকে।আজ তো ওর কালরাত্রি।আর তো কিছুক্ষন।তার পর জবাব দেওয়া নেওয়া সব কিছুর অবসান ঘটবে।ভাবতে ভাবতে প্রাণ খুলে হাসতে ইচ্ছা করে পালকির।কিন্তু সে পারে না।
****
তেতুঁল তলায় দাড়িয়ে লম্বা একটা শ্বাস নিল পালকি।কনের সাজ পাল্টে একটা নতুন নীল তাঁতের কাপড় পড়েছে সে।শ্বাস নিয়ে চোখ খুলে তেঁতুল গাছের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষন।তারপর এগিয়ে গিয়ে সবচেয়ে নিচু ডালের ফাঁক থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করল।শ্বশুর বাড়ি থেকে সে পালিয়ে এসেছে এখানে।এই তেঁতুল গাছের নিচে।রাতের চাঁদ ক্রমশ হেলে চলেছে।রাত বেশি নেই।
নিস্তব্ধ রাত নিস্তব্ধ পথ নিস্তব্ধ রূপবান আর নিস্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে আছে পালকি।আচ্ছা পাপ কাকে বলে?পাপ কি কোনো অস্পৃশ্য বস্তু? যা শরীরে লেগে গেলে মানুষ পাপী নামে পরিচিত হয়।পাপ যদি নাই থাকত তাহলে পুণ্য পরিমাপ হত না।তাহলে কেনো পাপ লাগতে নেই।জানা নেই।আজ কোনো উত্তর জানা নেই পালকির।একবার তেতুঁলগাছের কান্ডটাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল পালকি।তার কান্নার কাঁপা স্বরের সাক্ষী হল এই পথ এই গাছ এই রাত এই হেলে পড়া চাঁদ আর রূপবান।
*****
আর তো কিছুদূর।যত এগিয়ে আসছে শিমুলতলী ততই ললিতার অস্বস্তি বাড়ছে।কখন পালকিকে দেখবে।চারদিন দেরী করে সে এসেছে।ভাইজানকে নিয়ে আর পাড়া যায় না।দাদুকে বেশ খুশি দেখাচ্ছিল।
শেষ বাঁক ঘুরতেই ঘোড়ার গাড়ি শিমুলতলীতে ঢুকল।
-আব্বাজী।ঝড় আইছিল রে।সব শ্যাষ।সব নষ্ট কইরা দিছে।
বলে চিৎকার করতে করতে গাড়ি কাছে এলো বিথুই।ততক্ষনে গাড়ি থামিয়েছে দাদু।বিথুই গাড়ির কাছে এসে হো করে হেসে উঠল।বলল,”তুই যাওয়ার পর বিয়াডা হইয়া গেল গা।কাইল রাইতের দিন পলাইয়া আইসা এই গাছের নিচে বিষ খাইয়া মইরা গেল।”
ললিতার ভিতরে কেমন করছে।মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব কিছু যেন দুরে সরে যাচ্ছে আবার ফিরে আসছে।বিথুই এবার কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে মাটিতে বসে ঢোকরে কেঁদে উঠল।চিৎকার করছে সে।
-আব্বাজী রে।পালকি মইরা গেছে।হতভাগি বিষ খাইয়া এই তেতুঁল তলায় মইরা গেছে।
“কে?দাদু…..”হঠাৎ অস্পষ্ট ভাবে এটুকু বলে ললিতা অজ্ঞান হয়ে গেল।
তারপর তেমন বিশেষ কিছুই ঘটল না।তবে চমকে দেবার মত কথা হলো বিথুই বুড়ির কথা এই প্রথমবার মিথ্যা হলো।পাঁচ মাসে কেউ মরল না।তার কথা মতে গণনা করলে পালকি সাড়ে তিন মাস পর মারা গেল।ললিতা আর ফিরেনি।এখানে এই অজপাড়া গ্রামে সে এমন কি পেয়েছে তা বাড়ির লোক কেউ বুঝল না।শ্যামাদাসের পরিবারে বিশেষ কোনো খবর জানা নেই।পাঁচ মাস পর বিথুই সিকদার বাড়ি চলে এলো।
সবই নিজের নিয়মে চলতে লাগল।বছর ঘুড়ে যায়।দক্ষিণের হাওয়া দিক বদলে উত্তরে বইতে শুরু করে।তখন সবাই বুঝতে পারে শীত এসেছে দোরগোড়ায়।রূপবানের জোয়ার ভাটার খেলা সেই আগের মতই রয়ে যায়।শুধু শেষ হয়ে গেল একটা গল্পের।রূপবান ঠিকানা বিহীন হয়ে বয়ে চলে।নতুন গল্পের খুঁজে।তেতুঁল গাছটা দাড়িয়ে থাকে নতুন গল্পের অপেক্ষায়।পাড়ে দাড়িয়ে সে রূপবানের দিকে চেয়ে বলে,”কেনো ছুটছিস রূপবান?”
রূপবান গাছের দিকে তাকিয়ে বলে,”তার গল্প আড়ম্ভ হবে যে।তার জন্য।”
গাছ জিজ্ঞেস করে,”কে সে?”
রূপবান কলকল করে হেসে বলে,”বলবো না।তুই বল কার জন্য দাড়িয়ে আছিস?”
এবার গাছ উত্তর করে,”সে আসবে বলে।”
রূপবান জিজ্ঞেস করে,”কে সে?”
গাছ হেসে ডাল পাতা ঝাঁকিয়ে বলে,”বলবো না।”বলেই যেন দুজনে হেসে উঠে।কেউ দেখে না কেউ শোনে না কেউ বুঝে না।শুধু জানে তারা।সে আসবে…….

(অসমাপ্ত)

[আমার লেখা প্রথম লেসবিয়ান গল্প রূপকথা।কখনো ভাবিনি লিখতে পারব।শেষ করতে পেরে খুবই ভাল লাগছে।যাক,আমার কথা আর বলছি না।কথা বলতে ভালবাসি কি না তাই বলার সুযোগ পেলেই হলো।

সমপ্রেমের গল্প ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.