১২ বছরের এই কারাগারে

লোন সারভাইভার

মানুষের জীবনটা খুব অদ্ভুত। এই মুহুর্তের নিশ্চিত বিশ্বাস পরমুহূর্তেই অনিশ্চয়তার আঁধারে ঢেকে যায়। মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের নানা গুনাবলী দিয়ে তৈরি করেছেন। পৃথিবীতে আমাদের আসাও হয়তবা মহৎ কোন উদ্দেশ্য নিয়ে। তারপরও মানুষের মধ্যে রিপু জিনিসটা ভীষণভাবে কাজ করে। একেকটা বয়সে এসে একেকটা রিপু হৃদয়ের গভীরে হয় অসীম শান্তি অথবা সীমাহীন বেদনার জন্ম দেয়।
একটা নির্দিষ্ট বয়সে আসার পর হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের, ভালোবাসা আর আবেগের এবং কখনো কখনো জৈবিক চাহিদাগুলো অন্তর্নিহিত শান্তির জন্য আবশ্যক হয়ে পড়ে। জীবনে আমরা যে সামাজিক অবস্থানেই থাকি না কেন এটাকে অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই। ধনী-দরিদ্র, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, পুরুষ-নারী, ধার্মিক-অধার্মিক সবাই একান্তই আমার আমিতে এটা হয়ত প্রচন্ড রকম অনুভব করি।
কেউ কেউ খুব কষ্টে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কেউ কেউ খুব আপন কাউকে খুঁজে পেয়ে অসীম মায়ায় আর অপরিসীম ভালোবাসায় সিক্ত হয়, কেউ কেউ আশাহত হয়ে দুয়ারে দুয়ারে নিজেকে বিলিয়ে দেয়। আর একটা শ্রেণী আছে যারা খুব ভালোবাসার পরও প্রত্যাখ্যাত বা আহত হয়ে শুধু স্মৃতি আকড়ে ধরে বাঁচতে চায় কিংবা একজন মানুষের ভালোবাসার খোঁজে জীবনটা কাটিয়ে দেয়।
এই মানুষ গুলোই সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায়। কাছে যেতে চাই কিন্তু পারি না এরচেয়ে বড় কষ্টের আর কি হতে পারে।
কিন্তু জৈবিক অনুভুতিগুলো বিধাতা সবাইকে একভাবে দেননি। এজন্যই হয়ত প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের ব্যতিক্রম হিসেবে একটা তৃতীয় জৈবিক অনুভুতি আর প্রচন্ড মানসিক আবেগ দিয়ে কিছু সংখ্যক মানুষ পৃথিবীতে একবুক কষ্ট নিয়ে জীবনটা কাটিয়ে দেয়। মনে নেয়া আর মেনে নেয়া তো কখনও এক হতে পারে না। তারপরও জীবন থেমে থাকে না। চলে যায়, চালিয়ে নিতে হয়।

খুব বড় একটা ভূমিকা দিয়ে ফেললাম। এবার মূল ঘটনায় আসা যাক। জীবন থেকে নেয়া। একান্তই ব্যক্তিগত আর বুকের গভীরে সযত্নে আগলে রাখা চিনচিনে ব্যাথার চাদরে ঢেকে রাখা অনুভূতির গল্প।

ছোটবেলা থেকেই আমি খুব সংস্কৃতিবান, মূল্যবোধ আর তথাকথিত সুশীল সমাজ এ মানুষ। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে একটা বিষয় বুঝতে পারলাম যে আমার ভিতরে একটা অস্বাভাবিকতা আছে। এ বিষয়ে প্রচুর পড়াশুনা করলাম। প্রায় ডজন খানেক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, সেক্স বিশেষজ্ঞ, হরমোন বিশেষজ্ঞ দেখালাম। খুব ভয়ে ভয়ে একা একা যেতাম। নাম পরিচয় গোপন রাখতাম। যদি কেউ জেনে যায় তখন আমি সমাজে মুখ দেখাব কিভাবে। পরিবারের সদস্যদের অবস্থা কী হবে। ইত্যাদি ইত্যাদি ভাবনা আমাকে সারাক্ষন তাড়িয়ে বেড়ায়, এখনও বেড়ায়। কত রাতের পর রাত জায়নামাজ এ বসে কেঁদেছি। কত রাতের পর রাত ছাদের দরজা বন্ধ করে খোলা আকাশের নীচে জলন্ত সিগারেট হাতে নিয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ এর চেষ্টা করেছি, এখনও করি। উপায় মেলে না। হয়ত বিধাতা আমার একটা কঠিন পরীক্ষা নিচ্ছেন। শুধু আমার বললে ভুল হবে, আমাদের।
আমি ভীতু মানুষ নাই কিন্তু আমার আত্নসম্মান বোধ প্রচন্ড। তাই স্রোতের বিপরীতে নিজেকে শক্ত ভাবে দাঁড় করাতে পারি না। পারব ও না।
তারপরও মানুষের মন তো, একটা আশ্রয় খোঁজে।
যে মানুষটা আমার সব সীমাবদ্ধতা জেনেও খুব যত্ন করে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে বলবে, “তুমি ভয় পেয়ো না, তোমার এই নিঃসঙ্গ যাত্রায় আমি আমৃত্যু তোমার হাতটা ধরে রাখব”।
একটা মানুষ আমার জীবনে এসেছিল। ভালোবাসা হয়ে কিন্তু আমি তার কাছে শুধু বন্ধূই ছিলাম।
অনেক অলিগলি ঘুরে এবার মূল ঘটনায় আসি।
আমরা একসাথে খেলতাম, খেতাম, ঘুরতাম। উথাল পাতাল বন্ধুত্ব। আমি ওকে পাগলের মত ভালোবাসতাম।
ও আমাকে খুব ভালোবাসো, শুধুই বন্ধু হিসেবে।
আমি নানান ভাবে ওকে বোঝাতে চাইতাম যে আমি ওকে খুব ভালোবাসি। ও বুঝতে কি না কে জানে কিন্তু চেষ্টা করত এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতে যাতে আমার সাথে কখনো থাকতে না হয়। প্রয়োজন শেষ হলেই চলে যেত।
যাই হোক, একটা সময়ে গিয়ে আমি ওকে সত্যি ঘটনা খুলে বললাম। তখন থেকে আমি আর ও দুজন দুই পথের যাত্রী। ও আমাকে প্রচন্ড ঘৃনা করে, সমকামী বলে। ও বলে আমি ওর সাথে প্রচন্ড অন্যায় করেছি বিষয়টি প্রথমে না বলে, আমি পাপী, সমাজবিরোধী।
অথচ সবাই বলত, আমাদের মত বন্ধুত্ব বিরল।
সব খুলে বলার পর থেকে কখনও ওর গায়ে একটু হাত রাখতে চাইলে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে।
আমি ওর কোন দোষ দেই না। আমার এ ধরনের অনুভূতি ও মেনে ও বা নেবে কেন ?
অথচ পরে একদিন জানলাম, ও তার প্রেমিকার সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে। পরিবার বিয়ে মেনে নিতে চাচ্ছে না। এ নিয়ে টানাপড়েন চলছে।
আমার প্রশ্ন হল, এটা কি অপরাধ না ? হয়ত অপরাধ কিন্তু সমকামিতা র মত ঘৃণিত ও অপমানিত নয়।
কেননা এটা সমাজস্বীকৃত যৌন আচরণ।

আমি তো ইচ্ছা করে সমকামী হই নি। একেবারে ছোট বেলা থেকে, যখন থেকে বুঝতে শিখেছি, আমি ছেলেদের প্রতি প্রচন্ড আগ্রহ বোধ করতাম। পরে বুঝতে পারলাম যে আমি সমকামী।
ধর্ম আমাদের গ্ৰহণ করে না, কোন ধর্ম ই না। অথচ এই সমস্যার মূলে কিন্তু যৌন বিকৃতি বা মানসিক সমস্যা নয়।
এটা একান্তই জীণগত একটা অনুভুতি যেটা প্রাকৃতিক।
প্রকৃতিতে প্রায় ১৩০০ প্রজাতির মধ্যে সমকামিতা দেখা যায়।
আমি খুব চেষ্টা করি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে। পারি না।
শরীর না হয় বেঁধে রাখি শাসনে কিন্তু মনকে শান্ত করতে পারি না।
রূমের দরজা বন্ধ করে রাতের পর রাত চোখের জল আর নির্ঘুম চোখে বিধাতার কাছে জানতে চাই, কেন এমন করে বানালে ?
প্রায় ২৭ বছরের জীবনে ১২ বছরের মত সময় এই কারাগারে আটক আমি।
তিনি কোন উত্তর দেন না।
অসহায় আমি সবার কাছে ভালো থাকার অভিনয় করে যাই। প্রতিদিন মরছি, একটু একটু করে।
হয়ত একদিন আসলেই মরে যাব। তখন ও কি বিধাতা নিশ্চুপ থাকবেন ?

পেয়েছি এক ভাঙ্গা তরী
জনম গেল সেচতে পানি।
আর কি যে এ পাপীর ভাগ্যে দয়াল চাঁদের দয়া হবে,
আমার দিন কি এভাবেই যাবে বেয়ে এ পাপের তরণী ?
আমি বা কার, কে বা আমার ?
প্রাপ্ত বস্তু ঠিক নাই আমার
বৈদিক মেঘে ঘোর অন্ধকার উদয় হয় না দিনমনি।

সমপ্রেমের গল্প ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.