আবার দেখা

এতবছর পর দেশে এসে মাসক্ষাণেক না থাকতেই যেন সব আগ্রহ ফুরিয়ে গেছে খামার বাড়ির এই জ্যামে পড়ে। টানা দু’ ঘণ্টা ঠাই বসে উসফিশ করছি গাড়িতে অথচ এক ইঞ্চি এগোনের নাম নেই।

গ্লাস খুলে দিলেও তেমন বিশেষ ফায়দা নেই। উল্টো অস্থিরতা আরো বাড়বে। একটুকু মুক্ত হাওয়ার খোঁজে, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে আমাদের মত প্রবাসীরা বারবার ফিরে আসে দেশের টানে।

না আর এভাবে থাকা যাচ্ছে না। প্রচন্ড গুমোট লাগছে। গ্লাস খুলতেই যে এত বড় সারপ্রাইজ পাব ভাবি নি। ফাহাদ আমার গাড়ি পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে।

তিরিং বিরিং চিংড়ির মত লাফিয়ে চলার স্বভাব ওর যাই নি। কে জানে সেই আগের মতই আছে কি না।

মানুষ তো প্রতিনিয়ত বদলায়। কারণে-অকারণে বদলায়, নিজের জন্য বদলায়, পরিস্থিতির বেগে বদলায়।

দীর্ঘ ছয় বছর পর ওকে দেখলাম। সত্যিই মীরাক্কেল। শেষবারও আমাদের এই খামার বাড়ির গোল চত্বরেই দেখা হয়েছিল।

আমি ওকে ওর ক্যাম্পাসের বাসে তুলে দিয়ে সোজা চিটাগাঙ আমার বাড়িতে চলে গিয়েছিলাম।

সেখান থেকে বিয়ের পিঁড়ি আর মাস না পেরোতেই বিদেশ পাড়ি জমায়। এক প্রকার পালিয়েই গিয়েছিলাম।

পালানোটা ভীষণ দরকার ছিল।
সুশীলরা হয়ত বলবে, পালিয়েই যদি যাই তবে বিয়ে কেন করলাম? যে মেয়েটাকে বিয়ে করলাম তার দোষটা কোথায়?

ওও তো কত স্বপ্ন নিয়ে স্বামীর ঘরে এসেছে। স্বামী সুখ পাওয়ার জন্য।

এর উত্তর আমার কাছে নেই। দু’ নৌকায় পা দিয়ে চলার মত যার জীবন, মস্ত বড় ধাঁধাঁর বাঁকে ঘুরে ঘুরে যার জীবন ঘুরপাক খাচ্ছে প্রতিনিয়ত তার কাছে কোনো উত্তর না থাকার ই কথা।

তবে একটা কথা না বললেই নয়। নিজে অসুখী হয়ে কি কখনও কাউকে সুখী করা যায়?

তবুও আমি সবাইকে সুখী করার চেষ্টা করেছি। পরিবারকে, নিজের বউকে, সুশীল সমাজকেও।

সমাজের কড়া শৃঙ্খলের নিয়ম মেনে আর মায়ের মুখের হাসি ফুটাতে নিজের ভেতরের সত্ত্বাকে অস্বীকার করে।

তবুও আমি স্বার্থপর, প্রতারক। কারণ, আমি বাইসেক্সুয়াল।

এক সত্ত্বায় আসক্ত যে সমকামীরা স্বীকার করে তার এই সম-সত্ত্বা ঈশ্বর প্রদত্ত আমিও কিন্তু সেই ঈশ্বরের ই সৃষ্টি।

অথচ তবুও আমি বেঈমান, অপরাধী। আমার অনুভূতি আর কষ্টগুলো সবকিছুই ভন্ডামি।
পালিয়ে গিয়েছিলাম নিজেকে বাঁচানোর জন্য, প্রতিনিয়ত গুমরে উঠার যন্ত্রণা থেকে একটু হাফ ছেড়ে বাঁচতে।

পালিয়ে গিয়ে নিজেকে বাঁচানোটা অপরাধ হলেও পাপ নয় বোধয়।

তারপর বছর দুই পর আবার ফিরে আসি। নিজের সাথে একপ্রকার যুদ্ধ করে তাও নিজের জন্য নয়। মায়ের করুণ আর্তনাদ আর স্ত্রীর প্রতি স্বামীপ্রীতি ফলাতে।

আবার চলে যাই। এভাবে আসা-যাওয়ার মাঝে চলছে জীবন। এভাবে ছয় বছর পেরিয়ে এ পর্যন্ত এসেছি।

ফাহাদকে দেখা মাত্রই একের পর এক সব স্মৃতিগুলো যেন আবার ভেতরটাকে দুমড়ে মোচড়ে দিচ্ছে।

একটুও দেরি না করে গাড়ি থেকে নেমে পরি। ড্রাইভারকে গাড়ি গ্যারেজ করে, বাসায় চলে যেতে বলি। আমার ফিরতে দেরি হবে, অনেক দেরি।
ফাহাদ ততক্ষণে অনেকটুকু এগিয়ে গেছে। ওর সাথে হেঁটে আমি কখনও পারব না।

প্রচন্ড অস্বস্তি হচ্ছে, ভয়ও হচ্ছে কি করে ডাক দিব। সাহস করে ক্ষীণ গলার ডাক দিলাম, ফাহাদ, কেমন আছ?

পেছন ফিরে ফাহাদ যে চমকে উঠে নি এটা আর বলতে হবে না। কিন্তু বলবে না। জেদি কি না।

– ওই, কি হলো? কেমন আছ?

~ ভালো।

– আমি কেমন আছি বললে না তো?

~ ভালো না থাকার তো কারণ দেখি না। নিজেকে ভালো রাখার কৌশল বেশ ভাল মত রপ্ত করেই পৃথিবীতে এসেছ। উভচর একটা।

– হা হা হা। আমি বাইসেক্সুয়াল বলে আমাকে উভচর খেতাব দেয়াটা তুমি তাহলে ভুলো নি।

ফাহাদ আর কিছু না বলেই আরো জোরে হাঁটা ধরলো। রাগ হচ্ছিলো, দৌঁড়ে গিয়ে হাতটা ধরলাম।

সেই আগের স্পর্শ, ভেতরটাকে আবার জাগিয়ে তুলছে, নাড়া দিচ্ছে আমি দুর্বল হয়ে পরছি।

>>>>>>>>>>>>>>>>>>>( সমাপ্ত)<<<<<<<<<<<<<<<<<<<<

লেখকঃ ডাকপিয়ন

প্রকাশেঃ সাতরঙা

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.