একলা আকাশ

এক
ঝুম বৃষ্টি পরছে।আমি আর রাতুল ভাইয়া বসে আছি বাড়ির উঠানে। আমাদের বাড়িটা পুরাতন ঢাকায়।খান বাড়ি। বিশাল বাড়ি আমাদের।অনেক পুরনো কিন্তু সুন্দর। দুই তলা বাড়ি। এক তলায় থাকি আমরা আর দোতালায় বড় চাচা। বাড়ির মাঝখানে বিশাল উঠান। আর এই উঠানে কিছুক্ষণ আগে বৃষ্টি তে ভিজেছি আমরা। রাতুল ভাইয়া আমার কাজিন। বড় চাচার একমাত্র ছেলে। আমি আর রাতুল ভাইয়া ২জন ২জন কে ভালবাসি। এটা অবশ্য কেউ জানে না। জানতে পারলে বাবা আর বড় চাচা একদম খুন করে ফেলবে। মা এসে বকা দিচ্ছে
– এমনে বৃষ্টিতে ভিজে কেউ? আমি আর পারি না তোদের নিয়ে।
রাতুল ভাইয়া বলছে
– চাচি আষাঢ়ের প্রথম বৃষ্টি। আর ভিজবো না। তা কি করে হয়?
– তোর বাবা আর তোর চাচা দেখলে মহা ঝামেলা হবে। নে মাথা মুছে নে তোয়ালে দিয়ে।
মা তোয়ালে এগিয়ে দিল। আমরা মাথা মুছে নিলাম। আমরা ২ জনেই ম্যচিউরড। কিন্তু বৃষ্টিতে ভেজার লোভ সামলাতে পারি না। তাও আবার বর্ষার প্রথম বৃষ্টি ।আমি অর্ণব । এইবার এইচ এস সি দিলাম। আর রাতুল ভাইয়া গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করলো।রাতুল ভাইয়ার ব্যচের সবাই বিদেশে উচ্চ শিক্ষার চেষ্টা করছে। কিন্তু রাতুল ভাইয়া দেশেই চাকুরী খুঁজছে ।তার কারণ হল আমি। আমাকে একা রেখে রাতুল ভাইয়া বাইরে যাবে না। আমাদের দুজনের প্ল্যান আমার গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট হলে একসাথে দেশের বাইরে যাবো ।সেখানে একসাথে থাকবো।কোনদিন বিয়ে করবো না।
রাতুল ভাইয়া বলল
– চল ঘরে যাই। দশটা বাজে। এরপর আব্বা বকা দিবে।
– আরেকটু থাকো ।
– নারে আব্বা কে তো চিনিস ।দেরি করলে চিল্লাচিল্লি শুরু করবে।
আমার খুব থাকতে ইচ্ছা হচ্ছিলো। এমন রোমান্টিক পরিবেশ। বফ কি ছাড়তে মন চায়? কিন্তু বড় চাচা বেশ রাগী । এই বয়সেও রাতুল ভাইয়া কে চড় থাপ্পর মারে। আমি পারতপক্ষে বড় চাচার মুখোমুখি হই না। প্রায়ই দোতালা থেকে বড় চাচার চিৎকার শোনা যায়। চায়ে চিনি কম হলে কিংবা পেপার খুজে না পাওয়ার মত তুচ্ছ ব্যাপারেও বাঘের মত হুঙ্কার দেন।রাতুল ভাইয়া তো ভয় পায়ই বড় চাচা কে। চাচিও ভয়ে জুজু হয়ে থাকেন।
আমাদের বাড়ি আর কিছু সম্পত্তি নিয়ে বড় চাচার সাথে বাবার ঝামেলা চলছে।বেশ ভাল রকম ঝামেলাই। কিন্তু তাতে আমাদের সম্পর্কের কোন প্রভাব পড়ছে না। এতেই আমি খুশি।
বৃষ্টি থেমে টিপ টিপ করে পরছে এখন। রাতুল ভাইয়া উঠে চলে গিয়েছে। আমি একা উঠানে বসে বৃষ্টি দেখছি। মাত্র এইচ এস সি পরীক্ষা শেষ হয়েছে। ভর্তি পরীক্ষার জন্যউ পড়া শুরু করি নাই। সারাদিন অবসর। রাতুল ভাইয়ার ও কোন কাজ নেই এখন। আমাদের প্ল্যান আগামী সপ্তাহে ঢাকার বাইরে ১ সপ্তাহের জন্য হাওয়া হয়ে যাওয়া । বাবা মা আপত্তি করবে না। ভয় হল বড় চাচা কে নিয়ে। তিনি রাজি হবেন কিনা সন্দেহ।
মা ডাকছে ডিনারের জন্য। আগে ২ পরিবার এক সাথেই খেতাম। তখন দাদিয়া বেঁচে ছিলেন। আহা কি সুখের সময় ছিল তখন। বড় চাচা বেশি চিল্লাচিল্লি করলে দাদিয়ার ধমকে চুপ হয়ে যেতো। আমরা ২ কাজিনের এক সাথেই বড় হয়েছি। ছোট বেলা থেকেই আমাদের মাঝে ভাব। একজন আরেকজন কে ছাড়া থাকতে পারতাম না।তারপর সময়ের সাথে সাথে তা ভালবাসায় পরিণত হয়েছে।
মা বৃষ্টি দেখে ডিনারে খিচুরি রান্না করেছেন।ডিম ভাজা দিয়ে খিচুরি খেলাম। আহা অমৃত।ডিনার করে ঘরে গেলাম। রাতে ঘুমানোর আগে রাতুল ভাইয়া একবার ফোন দিবে। রাতুল ভাইয়ার মুখে গুড নাইট না শুনলে ঘুম আসে না। ফোনে রিং বাজছে। রাতুল ভাইয়া ফোন দিয়েছে। আমি আমার বিছানায় শুয়ে রাতুল ভাইয়ার সাথে কথা বলছি। রাতুল ভাইয়ার মুড আজকে খুব ভাল। বর্ষার গান শুনাচ্ছে আমাকে।
আজি ঝড় ঝড় মুখোর বাদল দিনে…।
রাতুল ভাইয়া খুব ভাল গান গাইতে পারে। তবে এই গান শোনার সৌভাগ্য সব সময় হয় না। হটাত হটাত শোনা যায়। আজকে যেমন শুনছি। বাইরে ঝুম বৃষ্টি ।জীবন কত সুন্দর!

দুই
আমরা বেড়াতে এসেছি। বড় চাচা মহা ঝামেলা করেছিল। কিন্তু সেগুলো রাতুল ভাইয়া খুব সুক্ষ ভাবে এড়িয়ে আমাকে নিয়ে মৌলভীবাজার বেড়াতে এসেছে।এর আগে একবার কক্সেসবাজার বেড়াতে গিয়েছিলেম আমরা ২ জন। কিন্তু সেবার কক্সবাজারে পৌঁছাতে না পৌঁছাতে আমি জ্বরে পরলাম। তারপর ২ দিনের মাঝে ঘরে ফিরে গেলাম। কোন মজাই করতে পারি নাই। গড নোস এই বার কি হবে! এইবার এসে উঠেছি দুসাই রিসোর্টে ।দেখার মত জায়গা।রিসেপশনের জায়গাটা এত সুন্দর। চারিদিকে পানি আর মাঝখানে একটা খোলা চালা ঘরের মত।সেখানেই রিসেপশন। রিসেপশনের কাজ শেষ করে আমরা মূল হোটেল রুমে এসে ঢুকলাম। ভাইয়া এসে ওয়াইফাই চালু করে ফেসবুকে ঢুকেছে। রাতুল ভাইয়া কে যে কি সুইট লাগছে দেখতে। নীল শার্ট আর ধবধবে সাদা একটা প্যান্ট পরা। ৬ ফিট লম্বা। পেটে সামান্য ভুঁড়ি হয়েছে আজ কাল। মাথা ভর্তি ঘন কালো চুল। শ্যামলা গায়ের রঙ। আমি আবার উল্টা। মায়ের ফরশা রংটা পেয়েছি। আমি ৫-৮। একদম স্লিম। আর লালচে বাদামী চুল।
আমি যেয়ে ঢুকলাম ওয়াশ রুমে।শাওয়ার নিয়ে বের হয়ে দেখি রাতুল ভাইয়া বিছানায় শুয়ে সটান ঘুম দিয়েছে। আহা ঘুমাক। সারা রাস্তা ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গল আমি ঘুমিয়েছি রাতুল ভাইয়ার ঘাড়ে মাথা রেখে। আর বেচারা জেগে ছিল। এখন তাকে ডেকে তোলাটা অত্যাচার করা হবে। আমি যেয়ে ব্যাল্কনি তে বসলাম। কি সুন্দর ভিউ। চারিদিক সবুজ।আসলেই সুন্দর রিসোর্টটা। ব্রশিয়ার হাতে নিয়ে দেখতে লাগলাম কি কি করা যাবে এখানে। অনেক কিছুই করার আছে।
– সাইকেল চালানো
– ইনডোর গেমস
– ব্যাডমিন্টন , টেনিস
– পুল, স্পা
– সিনেমা
– বোটিং
রাতুল ভাইয়া পুরো বিকেল নাক ডেকে ঘুমালো । আমিও এক পর্যায় ভাইয়ার পাশে শুয়ে পরলাম। ৩ দিন আছি। সময় পাওয়া যাবে ঘুরে দেখার। এত তাড়াহুড়োর কিছু নেই। আমি পাশে শুতেই রাতুল ভাইয়ার গায়ের পরিচিত গন্ধ টা পেলাম।এই গন্ধ আমাকে মাদকের মত কাছে টানে। রাতুল ভাইয়া হটাত আমাকে জড়িয়ে ধরলো। বুঝলাম ঘুম ভেঙেছে তার। এখন রোমান্স করতে চাইছে। সন্ধ্যা বেলা টা রোমান্স করেই কাটলো আমাদের। রাতে ডিনার করলাম স্প্যাগেটি, চিকেন ফ্রাই আর থাই স্যুপ দিয়ে। তারপর গেলাম সিনেমা দেখতে। দুসাই রিসোর্টে নিজস্ব সিনেমা হল রয়েছে। গোলমাল রিটারন্স হচ্ছে। খুব যে ভাল লেগেছে তা না। কিন্তু ২ জন একসাথে কিছু করাটাই অনেক আনন্দের। কেউ বকা দেয়ার নেই। যা খুশি তাই করতে পারছি। বাসায় সবসময় ২ জন কাছাকাছি থাকলেও কেমন যেন পর পর হয়ে থাকতে হয়। রাতে ঘুমালাম অনেক রাতে। সিনেমা হল থেকেই ফিরে দেখি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সিলেটের বিখ্যাত বৃষ্টি। মুগ্ধ হয়ে বৃষ্টি দেখলাম ২ জন মিলে। বৃষ্টি যখন টিপটিপ করে পরছে তখন ২ জন মিলে বের হলাম পুরো এলাকাটা ঘুরে দেখার জন্য। রাতের বেলা অবশ্য তেমন কিছুই দেখা যাবে না। তার উপর আকাশ মেঘে ঢাকা। তারাও দেখা যাচ্ছে না।তারপরেও বের হলাম। চারিদিক নীরব , নির্জন। শুধু ঝি ঝি পোকার ডাক শোনা যায়। আর ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ।এমন পরিবেশে ইচ্ছা করছে রাতুল ভাইয়া কে জড়িয়ে ধরি।বহুদিন ধরে আমি এমন রাতের অপেক্ষায় ছিলাম। আমার আর কিছু করতে হল না।
এর মাঝে রাতুল ভাইয়াই হটাত করে টুক করে আমার ঠোঁটে একটা চুমু দিয়ে দিল। ভাগ্য ভাল আশে পাশে কেউ ছিল না।
ঘুম থেকে উঠলাম বেশ বেলা করে। ব্রেকফাস্টের সময় চলে যাচ্ছে। ২ জন মিলে দৌড় দিলাম ব্রেকফাস্ট করতে। ব্রেকফাস্ট করে গেলাম পুল সাইডে। যে গরম। দুপুর পর্যন্ত পুলেই কাটাবো ঠিক করলাম।পুলে দাপাদাপি করলাম অনেক্ষন।বিকেলে সাইকেল চালিয়ে ঘুরলাম সারা রিসোর্ট। আর সন্ধ্যায় ব্যডমিন্টন খেল্লাম। আমি ই জিতলাম।আর রাতে বিছানায় ঝড় উঠলো।চলল সীমাহীন রোমান্স। এইভাবে কিভাবে জানি ৩ টা দিন স্বপ্নের মত পার হয়ে গেলো ।
এদিকে বাসায় কি ঘটছে তা তো জানি না। যখন বাসায় ফিরলাম তখন আমাদের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরলো।

তিন
শ্রীমঙ্গল থেকে বাড়ি ফিরছি। মন খারাপ। স্বপ্নের মত দিন গুলো পার হয়ে গেলো। ভাল সময় এত দ্রুত চলে যায় কেন?
বাড়ি তে ফিরে দেখলাম সারা বাড়ি কবরের মত শুনশান নীরব । ঝড় আসার আগে যেমন চারিদিক শান্ত হয়ে যায় তেমন লাগছে। কেমন ভয় ভয় লাগছে আমাদের ২ জনের। কি হল আবার! ঘরে ঢুকেই দেখি বাবা মুখ অন্ধকার করে বসে আছেন। এই সময় বাবা সাধারণত টিভি দেখে্ন। আর বাবা খুব হাসিখুশি মানুষ। ৩ দিন পর আসলাম। আমাকে দেখলেই বাবার জিজ্ঞেস করার কথা এই ৩ দিন কি করেছি। আমি রসমালাই কিনেছি রাস্তায়। বাবা রসমালাই খুব পছন্দ করেন। রসমালাই খাবার টেবিলের উপর রাখলাম। কিন্তু বাবা দেখি কিছুই বলছে না। আমি শেষ পর্যন্ত বললাম
– বাবা রসমালাই এনেছি তোমার জন্য ।
– রাখ পরে খাবো ।
বাবার গলার স্বর কেমন গম্ভীর শোনাচ্ছে ।আমি মা কে খুঁজতে লাগলাম। মা কে জিজ্ঞেস করতে হবে কি হয়েছে। মা তার শোবার ঘরে বসে পান চিবুচ্ছে। আমাকে দেখে হাসলো
– কি রে ফিরলি?
থ্যাঙ্কস গড । মা অন্তত স্বাভাবিক ভাবে কথা বলছে।আমি বললাম
– মা রসমালাই এনেছি। বাবা কে বললাম। কিন্তু বাবা খেতে চাইলো না। মুখ অন্ধকার করে বসে আছে।
– আর বলিস না। এই কয়দিন বাসায় যা হচ্ছে আমারই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে ইচ্ছে করছে।
– কি হয়েছে মা?
– তোর বড় চাচা জমিজমা সংক্রান্ত ব্যাপার নিয়ে মামলা করেছেন তোর বাবার বিরুদ্ধে।
– কি বলছো এসব?
আমি ভাবতাম বড় চাচা বাবা কে পছন্দ করে না। কিন্তু তাই বলে মামলা করে দিবে? আমি ভাবতেই পারছি না।এই জন্যই তো বাবার মুখ এরকম অন্ধকার । মা বলল
– তোর বড় চাচা খুব হম্বিতম্বি করছে। বলছে দেখে নিবে আমাদের। এই বাড়ি ছাড়া করবে আমাদের।এমন কি তোর বড় চাচি পর্যন্ত আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে।
বড় চাচি আর মায়ের মাঝে অনেক বন্ধুত্ব ছিল। বড় চাচা আমাদের পছন্দ না করলেও চাচি আর মায়ের সম্পর্ক স্বাভাবিক ছিল। আমাদের বাসায় ভাল কিছু রান্না হলে ও বাসায় যেত আবার ওই বাসায় ভাল কিছু রান্না হলে আমাদের বাসায় আসতো। মা যেমন রাতুলের প্রিয় খাবার কি জানেন তেমনি চাচিও আমার প্রিয় খাবার কি জানেন। সেই বড় চাচি এখন মায়ের সাথে কথা বলছে না ।ভাবাই যায় না। হটাত উপরে চিৎকার শুনতে পারলাম ।বড় চাচা চিল্লাছেন। সাথে রাতুল ভাইয়ার গলার স্বর শুনতে পারছি। কোন ব্যাপার নিয়ে ২ জনের মাঝে তর্ক হচ্ছে। কিন্তু কথা গুলো স্পষ্ট নয়। আমার কেমন ভয় ভয় লাগছে। বুঝতে পারছি খুব বড় একটা ঝড় আসছে।
সারাদিন রাতুল ভাইয়ার কোন দেখা নেই। আমার খুব চিন্তা হচ্ছে। এমন তো কক্ষনো রাতুল ভাইয়া করে না। বিকেলে দিকে ফোন দিলাম। ফোন অফ। আমার দুশ্চিন্তা আরও বেড়ে গেল। ভাবলাম উপরে যেয়ে দেখে আসি। আমি বের হতে যাবো। বাবা ডাকলেন
– কই যাস?
– উপরে
– শোন এখন থেকে উপরে যাওয়া একদম বন্ধ।
– মানে?
– তোর মা কেও ডাক। এসব কথা তারও শোনা দরকার।
আমি মা কে ডেকে নিয়ে আসলাম। বাবা মা কে বসতে বললেন। আমিও বাবার পাশে যেয়ে বসলাম । বাবা বললেন
– তোমাদের ২ জন কেই বলছি।বড় ভাই আমার সাথে যা করলেন তা ঠিক করেন নাই। এসব বাড়ি , জমি বিষয় সম্পত্তি আলোচনা করেই ঠিক করা যেত ।তা না করে তিনি মামলা করলেন। শুধু তাই না হুমকি ধামকি দিচ্ছেন। ভাবি আর রাতুল কে পর্যন্ত আমাদের সাথে মিশতে না করে দিয়েছেন। এর পর যদি আমাদের আত্মসম্মান বলে কিছু থাকে তাহলে আমি এবং তোমরা আর উপরে যাবো না। রাতুল আর ভাবির সাথেও আজকে থেকে সব ধরণের মেলামেশা আর কথা বলা বন্ধ।
মা আপত্তি জানিয়ে বলল
– বাচ্চাদের এর মাঝে না টানলেই না? রাতুল কি দোষ করেছে?
– আমি তো টানতে চাই নাই। বড় ভাই টেনেছেন। আর ওরা মোটেও বাচ্চা নাই। বড় হয়েছে। এসব বিষয় তাদেরও বুঝতে হবে।
আমার মাথা ঘুরছে। এসব কি বলছে বাবা। রাতুল ভাইয়ার সাথে আর কথা বলতে পারবো না। মিশতে পারবো না। সেটা কিভাবে সম্ভব। কিন্তু বাবা সাধারণত কোন বিষয় নিষেধ করেন না। তবে একবার কিছু বললে তা সিরিয়াসলি নিতে হবে।না মানে না। বাবার মুখের উপর কথা কক্ষনো বলি নাই। এখন কিভাবে বলবো। আমি দেখলাম বাবার চোখ থেকে পানি পরছে।বাবা বলছেন
– বড় ভাই আমার সাথে এমন করবেন কক্ষনো ভাবি নাই। বড় ভাইয়ের মাথা গরম তা জানি। তাই বলে মামলা করবেন? বাড়ি ছাড়া করার হুমকি দিবেন? এই বাড়িতে তার যতখানি অধিকার আমার ততখানি। আমিও দেখবো মামলা কার পক্ষে যায়! আমিও মামলা লড়বো । ছেড়ে দেয়ার পাত্র আমিও নই।
বাবা কে এমন ইমোশনাল হতে খুব কম দেখেছি। আমার খুব খারাপ লাগছে। বড় চাচার উপর কেমন জানি খুব রাগ লাগছে। ইচ্ছে করছে ২ কথা শুনিয়ে দিয়ে আসি। কিন্তু তা সম্ভব নয়। কারণ তিনি রাতুল ভাইয়ার বাবা। আমি নিজের ঘরে গিয়ে শুইলাম। মাথা কাজ করছে না। কি করবো! গতকালও আমাদের মাঝে কথা বলাতে কোন বাঁধা ছিল না। আর আজকে! আমি রাতুল ভাইয়ার মোবাইলে ফোন দিলাম। ফোন এখনো অফ। কেন মোবাইল অফ। আমার রাগও হচ্ছে আবার চিন্তাউ হচ্ছে।
সন্ধ্যায় রাতুল ভাইয়ার ফোন আসলো। আমি শুয়ে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পরেছিলেম। ফোনের শব্দে ঘুম ভাঙলো।ফোন ধরলাম। ওই পাশ থেকে রাতুল ভাইয়া বলছে
– হ্যালো
– হ্যালো । তোমার মোবাইল অফ ছিল কেন?
– সে অনেক কথা। বাড়ির অবস্থার কথা তো জানিস? আব্বা তোদের সাথে মিশতে না করেছে। সেটা নিয়ে তর্ক করতে গিয়ে আব্বা আমাকে চড় মারলো। তারপর রাগে মোবাইল অফ করে রেখেছিলাম।
– হম।বড় চাচা মামলা করেছেন।
– মামলা করা টা ঠিক হয় নাই। কিন্তু চাচাও কিন্তু অনেক গোঁয়ারতুমি করছেন। আব্বার মাথা গরম। চাচা জানেন। তারপরও কেন তর্ক করে বাবা কে রাগায় দিলেন?একটু শান্ত ভাবে হ্যান্ডেল করতে পারলেন না চাচা?
– তাহলে তুমি বলতে চাও আমার বাবাই দোষী ? বড় চাচা ধোঁয়া তুলসী পাতা। তিনি কিছুই করেন নাই?
– আমি কখন তা বললাম?
– মামলা করা খুব খারাপ হয়েছে। বাবা খুব কষ্ট পেয়েছেন। বাবা তোমার সাথে কথা বলতে আমাকে নিষেধ করে দিয়েছেন।শুধু আমাকে নয় মা কেও নিষেধ করে দিয়েছেন।
– সে কি! আব্বার না হয় মাথা গরম। তাই সে নিষেধ করেছেন আমাকে তোর সাথে কথা বলতে? কিন্তু চাচা তো জানতাম ঠান্ডা স্বভাবের মানুষ। তিনি কিভাবে বললেন?
– তোমার বাবা সব কিছু তে রাগ দেখাবেন? আর আমার বাবা কিছু বললেই দোষ ?
– আমি কি তাই বলেছি? শোন এখন ঝগড়া করার সময় নয়। সব কিছু ঠান্ডা মাথায় ভাবতে হবে।
– তুমি ভাবো ।
– দেখ আমি তোদের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে আব্বার হাতে চড় খেয়েছি। তারপর অন্তত আমার উপর রাগ করিস না। আমি জানি মামলা করাটা ঠিক হয় নাই।
– আচ্ছা বল। রাগ করি নাই।
– শোন এখন তো আর বাসায় কথা বলা যাবে না। আমাদের ফোনে কথা বলতে হবে। আর দেখা করতে হবে বাইরে। কোন ভাবেই যাতে ধরা না পরি।
– কোথায় দেখা করবা?
– কালকে বিকেলে ধান্মন্ডি লেকে । ডিঙি রেস্টুরেন্টে ।
আর বেশিক্ষণ কথা হল না। ফোন রেখে দিলাম। আমার কেমন জানি উত্তেজিত লাগছে। মনে হচ্ছে আমরা এইবার আসল প্রেম করতে যাচ্ছি। সবার অলক্ষে গোপনে কথা বলবো ।প্রেমিক প্রেমিকারা যেমন লুকিয়ে প্রেম করে। এদিকে বড় চাচার চিৎকার আবার শোনা যাচ্ছে। জানি না কি হয়েছে আবার। এখন আবার ভয় লাগা শুরু হল। কখনো ধরা পরলে খুব খারাপ হবে। কিছুক্ষণ পর চিৎকার থেমে গেলো। চারিদিকে শুনশান নীরবতা। পুরো বাড়ি ঘুমিয়ে পরেছে। আমি উঠানে এসে দাঁড়ালাম । আমি আকাশের দিকে তাকালাম।আকাশে অসংখ্য নক্ষত্ররাশি। আচ্ছা কখনো এমন হবে না তো রাতুল ভাইয়া আমার থেকে আলাদা হয়ে যাবে। তাহলে আমি মরে যাবো। নিজের অজান্তেই ২ ফোঁটা চোখের জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পরলো।

চার
সকালে ঘুম ভাঙলো বাবার চিৎকারে। কে জানি রাতে আমাদের টেলিফোন লাইন কেটে দিয়েছে। আমার ধারণা এটা বড় চাচার কাজ। আমার শুধু নয়। বাবা আর মায়েরও একই সন্দেহ। এদিকে বড় চাচা স্বীকার করলো না। বরং অনেক হম্বিতম্বি করলো। বাবা আর বড় চাচার মাঝে বিশাল ঝগড়া বেঁধে গেলে। এক পর্যায় রাতুল ভাইয়া এসে বড় চাচা কে জোর করে ধরে উপরে নিয়ে গেলো । আমার কেমন যেন ঘেন্না ঘেন্না লাগছে বড় চাচার প্রতি।এটা কেমন কথা !টেলিফোনের লাইন কেটে দিবে। আর তিনি ছাড়া কার এত মাথা ব্যথা হয়েছে টেলিফোনের লাইন কাটার জন্য।তিনি তো বলেছেন আমাদের বাড়ি ছাড়া করবেন। এদিকে বড় চাচা নাকি চিৎকার করে অসুস্থ হয়ে পরেছেন। আমি ভাবছি আরেকটা কথা আজকে কি রাতুল ভাইয়া পারবে আমার সাথে দেখা করতে। কোন মতে কিছু খেয়ে আমার নিজের ঘরে চলে গেলাম।
সকাল ১১টার দিকে রাতুল ভাইয়া ফোন দিল।১ বার রিং বাজতেই আমি ফোন ধরলাম।ওপাশ থেকে রাতুল ভাইয়া বলছে
– শোন ৫ টার মাঝে ডিঙ্গি রেস্টুরেন্টে থাকবি।
– আচ্ছা।
– এখন রাখি। ৫টায় দেখা হবে।
সময় আর কাটে না। কখন ৫টা বাজবে। রাতুল ভাইয়ার সাথে দেখা হবে। তিনটার দিকে ঝুম বৃষ্টি শুরু হল। এমন বৃষ্টিতে বের হব কিভাবে। যাওয়াটাই ক্যান্সেল হয়ে যায় নাকি ভাবছি। ৫ টা নাগাদ বৃষ্টি ধরে এলো। এখন টুপটাপ করে পরছে। বৃষ্টি হলেই রাস্তায় পানি জমবে। বিশেষ করে পুরান ঢাকার অবস্থা একদম কেরোসিন হয়ে যায়। বাসার সামনে এক হাঁটু পানি জমেছে। ভাগ্য ভাল একটা রিকশা পেলাম। দরদাম না করেই উঠে পরলাম। চললাম নতুন ঢাকায়। ধান্মন্ডি তে।
বৃষ্টি ভাল লাগে। কিন্তু বৃষ্টির পরবর্তী অবস্থা ভাল লাগে না।রাস্তা কাদা কাদা হয়ে যায়। পানি জমে।ঢাকার এই জলাবদ্ধতা কবে দূর হবে? দেখলাম কিছু গাড়ি আর বাস রাস্তায় থেমে রয়েছে। মনে হয় ইঞ্জিনে পানি ঢুকেছে। তাই আর চলছে না। যে রাস্তা আধা ঘণ্টায় যাই সে রাস্তা পৌঁছাতে ১ ঘন্টা লেগে গেলো । ঠিক কাটায় কাটায় সারে ৫ টায় রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম। দেখলাম ভাইয়া বসে আছে । সামনে ধূমায়িত কফি মগ। মুখ চোখে স্পষ্ট বিরক্তি। বুঝলাম আমার উপর ক্ষেপে আছে। আমি যেয়ে ভাইয়ার সামনের চেয়ারটা টেনে বসলাম। ভাইয়া বিরক্তির স্বরে বলল ।
– এই তোর আসার সময় হল?কখন আসতে বলেছি?
– সরি বৃষ্টির জন্য লেট হয়ে গেলো।
– হুম।বাসার অবস্থা তো দেখলি?
– বড় চাচার আজকের কাজটা বাড়াবাড়ি হয়েছে।
– কোন কাজটা?
– এই যে টেলিফোন লাইন কেটে দেয়া।
– কে বলল যে আব্বা টেলিফোন লাইন কেটে দিয়েছে।
– তাহলে কে কেটেছে
– দেখ কোন কিছু কনফার্ম না হয়ে বলা ঠিক না।
বুঝলাম বড় চাচার বিরুদ্ধে এইভাবে কথা বলা ঠিক হচ্ছে না। হাজার হোক তার বাবা তো।আমি চুপ হয়ে গেলাম।ভাইয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল
– আব্বা যে কি করে । আর ভাল লাগে না।
আমি রাতুল ভাইয়ার হাতে হাত রেখে বললাম।
– মন খারাপ কর না তো সব ঠিক হয়ে যাবে।
– কিন্তু এইভাবে কত দিন? বাসায় তোর সাথে কথা বলতে পারবো না। বাইরে এসে কথা বলতে হবে।
– জানি না। কিন্তু এছাড়া আর কি বা করার আছে।
– ইচ্ছা করে তোকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাই।
আমি হাসলাম। বললাম
– চল চলে যাই। প্রশান্ত মহাসাগরের কোন নির্জন দ্বীপে। যেখানে শুধু আমি আর তুমি থাকবো । আর কেউ নয়।
– তার আগে চল রিকশা করে কিছুক্ষণ ঘুরি।
– ইয়ে চল।
রাতুল ভাইয়া আর আমার একসাথে রিকশা ভ্রমন আমাদের ২ জনেরই খুব প্রিয় একটা কাজ। টুপটাপ বৃষ্টি পরছে আর আমরা রিকশার হুড তুলে রিকশা ভ্রমন করছি। ধানমণ্ডি থেকে চানখারপুল পর্যন্ত রিকশা করে যাবো ২ জন। তারপর ২ জন আলাদা আলাদা বাড়ি যাবো। বাসায় কোন ভাবেই যেন জানতে না পারে আমরা দেখা করেছি।
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। আকাশ কালো হয়ে আছে। মেঘের কারণে শুকতারা দেখা যাচ্ছে না। রাস্তার সোডিয়াম বাতি গুলো জ্বলে উঠেছে। রাস্তার জমে থাকা পানি তে প্রতিবিম্ব পরেছে। দুরের কোন মসজিদ থেকে আজানের সুমধুর ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। এক অদ্ভুত মায়াময় পরিবেশ। এই পরিবেশে প্রিয়জনের হাত ধরতে পারাটা পরম সৌভাগ্যের।
চানখারপুলে এসে আমাদের এই স্বপ্ন যাত্রা শেষ হল। ইচ্ছে করছে রাতুল ভাইয়া নাহ কথায় কথায় ভাইয়া বলতে আর ভাল লাগছে না। এখন থেকে শুধু রাতুল। ইচ্ছে করছে রাতুলের ফোলা ফোলা কমলার কোয়ার মত ঠোঁটে একটা চুমু দেই। রাতুল আমার রিকশা ঠিক করে দিল। তারপর আমি রিকশায় উঠতেই রাতুল একটা সিগারেট ধরালো। এটা আমার কাছে খুব অপছন্দনীয় একটা কাজ। কিন্তু আমার কথা রাতুল থোড়াই কেয়ার করে। মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। এত সুন্দর একটা সময়ের শেষ এইভাবে হল?এখন রিকশায় উঠে না পরলে সিগারেট টা মুখ থেকে নিয়ে ছুড়ে ফেলতাম।যতই রাগ করুক না কেন।
বাসায় যখন পৌঁছলাম তখন রাত ৮ টা বাজে। আজকে নিশ্চিত মায়ের বকা খেতে হবে। এতক্ষণ কই ছিলাম তারও কৈফিয়ত দিতে হবে। কি বলবো মাথায় সাজিয়ে নিয়ে ঘরে ঢুকলাম। ঘরে ঢুকতেই মা চিৎকার শুরু করলো ।
– পরীক্ষা শেষ হয়েছে বলে কি যা খুশি তাই করে বেরাতে হবে? বলি কয়টা বাজে? সামনে তো ভর্তি পরীক্ষা ।বই গুলো তো ছুঁয়ে দেখো না। কোথাও চ্যান্স না পেলে আমি কিন্তু প্রাইভেটে পড়ার টাকা দিবো না।
– মা আমি তো বাবুদের ওখানে গিয়েছিলেম। ওরা কোন কোচিঙে ভর্তি হবে তাই নিয়ে আলোচনা হচ্ছিলো । তাই তো দেরি হয়ে গেলো।
এইবার মা একটু শান্ত হল। আমার ঘরে যেয়ে ঢুকলাম। ঘরে ঢুকেই ইউ টিউবে প্রিয় একটা রবীন্দ্র সঙ্গীত ছাড়লাম। আমার আগে ভাল লাগতো না রবীন্দ্র সঙ্গীত। স্লো মনে হত। কিন্তু রাতুলের কথায় শুনতে শুনতে এখন ভাল লাগে। আসলে প্রিয় মানুষের সব কিছুই এক সময় প্রিয় হয়ে যায়। যেমন রাতুলের পোষা প্রাণী খুব প্রিয়। আমার অসহ্য লাগতো । রাস্তা ঘাটে কুকুর বেড়াল দেখলেই মেজাজ খারাপ হয়ে যেতো। কিন্তু আজকাল আর খারাপ লাগে না। কুকুর বেড়াল দেখলেই রাতুলের কথা মনে পড়ে। সে থাকলে আদর করতে চাইতো কুকুর বা বেড়াল গুলো কে।আবার কুকুর বেড়াল গুলোউ রাতুল কে দেখলে আহ্লাদে আঁটখানা হয়ে উঠে। কিন্তু বড় চাচির জন্য বাসায় কোন পোষা প্রাণী বাসায় আনা যায় না। বড় চাচি একদম পছন্দ করেন না এসব।
পাঁচ
সকাল বেলা উঠে আজকেও ঘরে চিৎকার চেঁচামেচি। আজকে বড় চাচা ঘুম থেকে উঠে চিৎকার শুরু করেছে। আজকে নাকি আমরা তার ফোন লাইন কেটে দিয়েছি। আসলে নিজে কেটে আমাদের নামে দোষ দিচ্ছে। একটা সাইকো পুরা। বাবা চিৎকার শুনে ঘর থেকে বের হয়েছে। আমিও ছুটে বের হলাম কি হয় দেখার জন্য। কথার এক পর্যায়ে বড় চাচা বাবার গায়ে হাত তুল্লেন। বাবা কিছু বলার আগে রাগের মাথায় আমি বলে ফেললাম
– চাচা অনেক হয়েছে এইবার থামেন। আপনাদের লাইন আমরা কেউ কাটি নাই।
– ছোট মুখে এত বড় কথা। বড় দের মাঝখানে কথা বলে। বেয়াদব কোথাকার।
এই বলে আমার গালে একটা চড় মারলেন বড় চাচা। আমার মাথা পুরো খারাপ হয়ে গেলো যেন। আমাকে বাসায় কেউ কক্ষনো হাত তুলে না। সেখানে বড় চাচা আমার গায়ে হাত তুলল । আমি চিৎকার করে বললাম
– সাইকো একটা।
এদিকে রাতুল চিৎকার চেঁচামেচি শুনে নিচে নেমে এসেছে। পুরো ঘটনা সে কিছুই দেখে নাই। কিন্তু আমার মুখে সাইকো শুনে সে কেমন জানি ভ্যাবাচেকা খেয়ে গিয়েছে। আমি এমন বেয়াদবি করবো সে মনে হয় ভাবতেই পারে না। রাতুল এসে বড় চাচা কে টেনে তুলে নিয়ে গেলো। আমি বাবা কে নিয়ে ঘরে ঢুকলাম । বাবা বললেন
– তুই কাজ টা ঠিক করলি না। হাজার হোক তোর মুরুব্বি। তোর গুরুজন। তাঁকে তোর সাইকো বলাটা ঠিক হয় নাই।
– তোমার গায়ে হাত তুলেছে তারপর তুমি এই কথা বলছো
– তোর মাফ চাওয়া উচিৎ তোর বড় চাচার কাছে।
– আমি পারবো না।
এদিকে মা এসে বললেন
– থাক ওকে আর উপরে পাঠিও না মাফ চাবার জন্য। তোমার ভাইয়ের তো মাথা খারাপ। আবার চড় থাপ্পর মারবে।
আমি সোজা আমার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম। এরকম অপমানিত আমি হই নাই কখনো। চোখ ফেটে কান্না আসছে। আবার এখন নতুন একটা চিন্তা মাথায় এসেছে। রাতুল কি মনে করবে। তার বাবা কে সাইকো বলেছি সেটা কি সে মেনে নিতে পারবে। আমি ফোন দিলাম রাতুল কে। রিং বাজছে । কিন্তু ফোন ধরলো না রাতুল। সারাদিন অনেকবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কোনবার ফোন ধরলো না রাতুল।

ছয়
সকালে উঠে ভাবলাম বড় চাচার কাছে মাফ চাইতে যাবো। এত ইগো নিয়ে বসে থাকলে হবে না। দোষ বড় চাচার। কিন্তু আমারও অমন বলা উচিৎ হয় নাই একদম। তিনি গুরুজন।আর রাতুলও সেই কারণে রাগ করে বসে আছে নিশ্চয়। যা ভাবা তাই কাজ। বাসার কাউকে না বলে উপরে উঠে গেলাম। আর একদম রাতুলের মুখোমুখি পরে গেলাম। রাতুল খুব রাগান্বিত হয়ে বলল
– কেন এসেছিস? আরও খারাপ কিছু শুনাতে?
– আমি মাফ চাইতে এসেছি
– মাফ চাওয়ার কথা এখন মনে পড়লো ? গতকাল সারাদিন কি করেছিস?যা নিচে যা।
– দেখো বড় চাচাও কিন্তু প্রতিদিন হম্বি তম্বি কম করে না। গতকাল শুধু আমার গায়ে না বাবার গায়েও হাত তুলেছিল।
– তাই বলে তুই আব্বা কে সাইকো বলবি?
– এই জন্য তো মাফ চাইতে এসেছি
– তুই ঘরে যা।
– তুমি ফোন ধর না কেন?
– এরপর তোর সাথে সম্পর্ক রাখার আর কথা বলার আমার কোন ইচ্ছে নাই।
– এসব কি বলছো তুমি?
– ঠিক বলছি। যে আমার আব্বা কে অপমান করে তার সাথে আমার কোন সম্পর্ক থাকতে পারে না।
– আচ্ছা ভাল।
আমি আর দাঁড়ালাম না। আমার চোখে পানি এসে যাচ্ছে। এটা রাতুল কে দেখানো যাবে না। তার আগেই ঘরে যেতে হবে। নিজের ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে দিলাম। কাউকে চোখের পানি দেখানো যাবে না। এর আগেও রাতুলের সাথে ঝগড়া হয়েছে। কিন্তু এইবার মনে হচ্ছে অনেক সিরিয়াস হয়ে গিয়েছে। কি করবো !আমি আবার ফোন দিলাম রাতুল কে। কিন্তু লাইন কেটে দিল সে। সারা দিন কথা বলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু সে ফোন ধরে না বা লাইন কেটে দেয়। শেষ পর্যন্ত আমার নাম্বার ব্লক করে দিল রাতুল। আমি মুষড়ে পরলাম খুব। আগেও ঝগড়া হয়েছে। কথা বন্ধ ছিল । কিন্তু কেউ কারো নাম্বার ব্লক করে নাই। আমি ফেস বুকে ঢুকলাম। ঢুকে মন আরও খারাপ হয়ে গেলো । রাতুল আমাকে ফেসবুকেও ব্লক করে দিয়েছে। বুঝলাম এই বার সত্যি সত্যি রিলেশন আর থাকবে না। আমারও এখন ক্ষোভ হচ্ছে। আমি তো মাফ চাইতেই গিয়েছিলেম। আর বড় চাচা যা করছেন তা কি ঠিক করছেন? বাবা বলে কি তার সব দোষ মাফ হয়ে যাবে। এরকম এক চোখা নীতি রাতুলের। দরকার নেই আমার তার সাথে আর রিলেশনের। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। কান্না গলার কাছে দলা পাকিয়ে এসেছে। কিন্তু কাউকে বলতে পারছি না। আমার অপরাধ কি এত বেশি যে রিলেশন নষ্ট করে দিল রাতুল। সারা রাত ঘুম হল না। শেষে উঠানে যেয়ে বসে রইলাম।
সাত
১ মাস পার হয়ে গিয়েছে। বর্ষা শেষ হয়ে শরৎ এসেছে। সেই যে রাতুল আমার সাথে কথা বন্ধ করেছে আর কথা হয় নাই। এত দীর্ঘ সময় কথা না বলে থাকার ইতিহাস আমাদের নাই। আমি ধরে নিলাম আমাদের রিলেশন শেষ । মাঝে মাঝে রাতুল কে দেখি গেট বের হওার সময় উঠানে। বা কখনো বিকেলে ছাদে উঠলে দেখি রাতুল গোপনে সিগারেট টানছে। আগে সিগারেট টানলে আমি সিগারেট ছুড়ে ফেলে দিতাম। এখন আর তা করা হয় না। বরং আমি ছাদ থেকে নিচে নেমে যাই। আমাদের মাঝে কোন কথা হয় না। বড় চাচার সাথেও বাবার সম্পর্ক ভাল না হয়ে বরং আরও খারাপ হয়েছে।
এমনই ক্রান্তিকালে আমার রেজাল্ট দিল। আমি গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছি। অনেক দিন পর একটা ভাল খবর। বাবা তো সেই খুশি। কয়েক কেজি মিষ্টি চলে আসলো বাসায়। প্রতিবেশী দের বাসায় মিষ্টি দেয়া হল। বড় চাচার বাসায় মিষ্টি পাঠানো হল। কিন্তু সেই মিষ্টি ফেরত পাঠানো হল। সেদিন রাতেই হটাত রাতুল আমাকে ফোন দিল। আমি ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে রাতুল বলল
– হ্যালো ।
– হ্যালো ।
– কংগ্রাচুলেশন ।
– থ্যাঙ্কস।
এরপর অনেকক্ষণ চুপচাপ । কেউ কথা বলছি না।আমি নীরবতা ভাঙলাম।
– আর কিছু বলবে?
– হ্যাঁ। তোর সাথে আমার কিছু কথা ছিল।
– বল
– এখানে না। দেখা করে বলতে চাই।
– কবে দেখা করতে চাও?
– কাল দিয়াবাড়ি।
– ওকে
– তাহলে কাল দেখা হচ্ছে।
আমি সারা রাত ঘুমাতে পারলাম না। কি এমন কথা যে দেখা করে বলতে হবে? তাহলে কি আমাদের সম্পর্ক কি আবার ঠিক হয়ে যাবে? সব কিছু আগের মত হয়ে যাবে। খুব বেশি এক্সপেক্টেশন ভাল না। নিজেকে বুঝাচ্ছি। আবার বার বার মনে হচ্ছে রিলেশন ঠিক হয়ে যাবে।
আট
সকাল থেকেই উত্তেজিত আমি। কখন ৩ টা বাজবে আর আমি বাসা থেকে বের হব। ৪ টা সময় দিয়াবাড়িতে আমাদের দেখা করার কথা। কি কথা বলবে সেটা শোনার জন্য আমি উন্মুখ হয়ে আছি। অনেক দিন পর একটু মাঞ্জা মারলাম। বহুদিন পর রাতুলের সাথে কথা হবে সেই আনন্দে মাঞ্জা মারলাম। বাসে উঠে পরলাম ৩ টায় । পুরো ১ ঘন্টা লাগলো দিয়াবাড়ি পোঁছতে। এর আগেও রাতুলের সাথে দিয়া বাড়ি এসেছি। এটা আমাদের খুব প্রিয় জায়গা। শরত কালে সাদা কাশফুলে ঢেকে যায় পুরো এলাকা। সেই কাশ বনের ফাঁকে ফাকে রেস্টুরেন্ট , চা খাওয়ার দোকান আছে। আমাদের প্রিয় একটা চায়ের টং আছে। ওখানে অপেক্ষা করতে বলেছে রাতুল। আমি পৌঁছানোর ১৫ মিনিটের মাথায় রাতুল চলে এলো। আমার বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না।
রাতুল এসে আমার পাশে বসলো । কতদিন এইভাবে রাতুলের পাশে বসা হয় না। রাতুলের গা থেকে সেই পরিচিত পারফিউমের গন্ধ পাচ্ছি। আমার মন বলছে সব কিছু আগের মত হয়ে যাচ্ছে।রাতুলই প্রথম কথা বলল ।
– কিরে কেমন আছিস? আবারও কংগ্রাচুলেশন এত ভাল রেজাল্টের জন্য।তুই তো ডাক্তার হতে চাশ। ভাল কোন মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হবার চেষ্টা কর। কোচিঙে ভর্তি হ। বেশি সময় তো নেই হাতে।
আমার বিরক্ত লাগছে। এইসব কথা বলার জন্যই কি রাতুল আমাকে ডেকে এনেছে। কিন্তু আসলে এগুলো ছিল ভূমিকা। এবার গলা খাঁকারি দিয়ে রাতুল বলল
– তো যেই জন্য তোকে ডেকে এনেছি সেটা এখন বলি। দেখ তোর সাথে আমার অনেক ভাল সময় কাটিয়েছি। আমি সেগুলো কোন দিন ভুলবো না। আসলে ভুলতে পারবো না। তোর মত কেউ হয়তো আমার জীবনে আর আসবেও না। কিন্তু আমাদের তো সামনে আগাতে হবে। তোর আর আমার পরিবার কেউ কাউকে সহ্য করতে পারে না। এই অবস্থায় আমাদের মাঝে মেলামেশা করা কি সম্ভব? তাছাড়া প্রায় এক মাস আমরা কেউ কারো সাথে কথা বলি না। আ্মাদের মাঝে আসলে রিলেশন টা আর নেই। এটা আর জোড়া লাগানো সম্ভব না। ভাঙ্গা কাঁচ জোড়া লাগালাও ফাটা দাগ থেকে যায়।
আমি বাঁধা দিয়ে বললাম
– এসব আমি জানি। তুমি কি বলতে চাও সরাসরি বল
– এই এক মাস আমি অনেক চিন্তা করেছি। আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সেটা জানানোর জন্যই তোকে ডেকে এনেছি।
– কি সিদ্ধান্ত।
– আমি আর এই দেশে থাকছি না।
– মানে
– আমি আমেরিকায় পি এইচ ডি করার জন্য ফান্ড পেয়েছি। ভিসাউ হয়ে গিয়েছে। সব ঠিক থাকলে আমি আগামী মঙ্গল বার আমেরিকার উদ্দেশ্যে ফ্লাই করবো
আমি হতবিহবল হয়ে পরলাম। কি বলবো বুঝতে পারছি না। রাতুল ভাইয়া বলল
– এই কথা গুলো বলার জন্য আমি তোকে ডেকেছি। আমার মনে হয়েছে তোকে এই কথা গুলো সরাসরি বলা দরকার। তাই বললাম।
– ধন্যবাদ
– আমি উঠি। আর আমাদের একসাথে যাওয়া ঠিক হবে না। ভাল থাকিস।
এই বলে রাতুল উঠে চলে গেলো আমাকে একা রেখে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। পশ্চিম আকাশ লাল হয়ে গিয়েছে।কাশবনের মাঝে আমি বসে আছি। সে এক অপূর্ব দৃশ্য । কিন্তু সে দৃশ্য দেখার মত মন আমার নেই। আমার শুধু মনে পড়ছে রাতুল বলেছিল আমরা একসাথে বিদেশে যাবো। এক সাথে থাকবো। তাহলে সব মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ছিল। আমার বুকের উপর মনে হচ্ছে কেউ একটা ভারী বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। আমি অবাক হয়ে খেয়াল করলাম আমারর কান্না আসছে না। তাহলে কি আমি আগের থেকে শক্ত হয়েছি?আমি উঠে দাঁড়ালাম। বাড়ি যেতে হবে। অনেক দূরের রাস্তা। বাসে উঠে প্রথম আমার চোখ থেকে দু ফোঁটা পানি পরল। কিন্তু না আমার শক্ত হতে হবে। এই পুরনো রিলেশনের কথা ভেবে চোখের পানি ফেললে হবে না। আমার জীবন প্রতিষ্ঠা লাভ করতে হবে। বাবা মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে হবে। আমাকে ডাক্তার হতে হবে। ভাল একটা মেডিক্যাল কলেজে চ্যান্স পেতে হবে। পুরনো অতীত কে ফেলে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

নয়
মঙ্গলবার যেন চোখের পলকে চলে এলো। এই কতদিন আমি কেমন যেন ঘোরের মাঝে ছিলাম। আমার কেবলই মনে হচ্ছিলো রাতুল যা বলেছে তা হয়তো মিথ্যা। কিংবা সে হয়তো সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবে। ফোন করে হয়তো বলবে
– শোন আমি যাচ্ছি না। আমরা ২ জন একসাথেই যাবো তোর গ্রাজুয়েশনের পর।
কিন্তু তা হল না। এই কয়দিন রাতুল অনেক শপিং করলো। আমি উঠানে বসে দেখি সে বড় বড় ব্যাগ নিয়ে উপরে উঠছে। আগে আমাকে ছাড়া কোন শপিং করতো না সে। আমার পছন্দ করে দিতে হত। এখন একাই করছে। ভালই হয়েছে। আমি তো প্রায়ই বলতাম
– আমি না থাকলে শপিং করে দিবে কে?তুমি তো কিছুই পছন্দ করতে পার না।
এখন সে নিজের শপিং নিজেই করতে পারে। আমাকে আর প্রয়োজন নেই। শুধু শপিং কেন কোন কিছুতেই আমাকে আর প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমি তো তাকে ছাড়া এক মুহূর্ত ভাবতে পারি না। আমি মুখ হাসি হাসি করে রাখি। ওকে বুঝতে দিব না। কিন্তু আমার বুকে তো রক্তক্ষরণ হচ্ছে। প্রতি রাতে বালিশটা চোখের জলে ভিজে ভিজে যায়। রাত টা তো শুধু আমার একার। তখন কেঁদে হাল্কা করি নিজেকে। জীবন তো কারো জন্য থেমে যায় না। আমার জীবনও থেমে নেই। কোচিং এ ভর্তি হয়ে গিয়েছি। ভাল কোন মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হতে হবে।
মঙ্গল বার আজকে। আজকে চলে যাবে রাতুল। হয়তো আর কোন দিন দেখা হবে না। চলে যাবার আগে রাতুল এলো আমাদের বাসায় বিদায় নিতে। বহু দিন পর রাতুল আমাদের বাসায় পা দিল। বড় চাচা মামলা করার পর থেকে তো আমরা কেউ কারো বাসায় যাই না। বাবা বলল
– ভাল থাকিস। পড়াশোনা করে দেশে ফিরে আসিস। তোর বাবা মা একা হয়ে যাবে নাহলে।
মা একটু কাঁদলও । বলল
– তোর বাবা চাচার ঝগড়ার কারণে যাবার আগে তোকে ভাল মন্দ কিছু খাওয়াতে পারলাম না।
– চাচি আমি কি মারা যাচ্ছি। দেশে ফিরে তোমার হাতের রান্না খাবো আবার।
রাতুল আমার দিকে তাকালও। বলল
– ভাল মত পড়াশোনা করিস। আবার দেশে এসে দেখি যেন তুই আধা ডাক্তার হয়ে গিয়েছিস।
আমি বললাম
– তুমি ভাল থেকো ।
রাতুল বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছে। আমি উঠানে দাঁড়িয়ে আছি। বড় বড় ২ টা লাগেজ নিয়েছে এখলাস চাচা আর শিপন। আমাদের বাসার কেয়ারটেকার আর কাজের লোক। আমাদের গলিতে গাড়ি পার্ক করা যায় না।গলির বাইরে মাইক্রোবাস এনে রাখা হয়েছে। ভাড়া করা হয়েছে। বড় চাচা আর চাচি যাবে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত। গেট দিয়ে বের হবার সময় রাতুল একবার আমার দিকে তাকালও। কি আশ্চর্য তার চোখ পানি তে টলটল করছে। তাহলে কি এখনো আমাকে সে ভালবাসে? নাহ তা কেন? ভালবাসলে কি আমাকে একা রেখে যেতো।
দশ
রাতুল চলে যাবার পর থেকে আমি কেমন বদলে গেলাম। আগে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে ভাল লাগতো। এখন রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনলে কেবল রাতুলের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠে। কত রবীন্দ্রসঙ্গীত রাতুল আমাকে গেয়ে শুনিয়েছে। সে আমাকে রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনা শিখিয়েছে। বৃষ্টি আসলে আর ভিজতে ইচ্ছা করে না। বরং জানালা বন্ধ করে বসে থাকি। কোন রোম্যান্টিক সিনেমা দেখতে ইচ্ছা করে না। “কল মি বাই ইয়োর নেম” সিনেমাটা আমি কতবার দেখেছি। কিন্তু এখন আর দেখি না। কারণ এই সিনেমা দেখলেই রাতুলের কথা মনে পড়ে যায়। কিন্তু তারপরেও কি রাতুল কে ভুলতে পারি?সারা বাড়িতে রাতুলের স্মৃতি ছড়ানো । ছাদ থেকে শুরু করে বাড়ির গেট পর্যন্ত সব জায়গায় রাতুলের স্মৃতি। আগে যখন একদিনও রাতুলে কে না দেখে থাকতাম না সেখানে মাস চলে যাচ্ছে রাতুল কে দেখি না। রাতুল আমেরিকা যাবার পর একদিনও আমাকে ফোন করে নাই। আমি রাতুলের নাম্বার পর্যন্ত জানি না। আমি জানি রাতুল আমাকে ফোন করবে না। তারপরও আশা করে থাকি। ফোনে রিং বাজলেই মনে হয় রাতুল ফোন করছে।আমি কি দিন দিন পাগল হয়ে যাচ্ছি?
কোচিঙে যাই আসি। কিন্তু পড়াশোনা কিছুই হচ্ছে না। আমি মনে হয় কোথাও চ্যান্স পাবো না। পড়ার টেবিলে বই খুলে বসে থাকি। কিন্তু কিছুই পড়া হয় না। বন্ধুরা যেখানে পড়াশোনায় ব্যস্ত আমি তখন রাতুলের চিন্তায় মগ্ন। অথচ ভর্তি পরীক্ষা এসে যাচ্ছে। আমি খুব ভাল ছাত্র। সবাই ধরে নিয়েছে আমি ঢাকা মেডিক্যালে চ্যান্স পাবো কিন্তু আমার অবস্থা কি তাতো আমি জানি। মাঝে মাঝে দিয়াবাড়ি একা একা চলে যাই। সেই চায়ের টং এ বসে চা খাই। চায়ের দোকানের মামা জিজ্ঞেস করেন
– আপনার ভাই আর আসে না কেন?
আমি জবাব দিতে পারি না। আমি গোপনে চোখের পানি মুছি। সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত বসে থাকি।যখন পশ্চিম আকাশ লাল হয়ে যায় তখন আবার ফিরে আসি আমাদের এই ব্যস্ত শহরে। ভাবি এখন রাতুল কি করছে? আমাদের থেকে তো ১২ ঘণ্টার পার্থক্য। নিশ্চয় ঘুম থেকে উঠেছে। আগে ঘুম থেকে উঠেই আমাকে ফোন দিত। এখন কি অন্য কাউকে দেয়। কারো কারো জন্য কারো জীবন থমকে যায়। আমারও তেমন থমকে গিয়েছে।
১১
থমকে যাওয়া জীবনে গতি ফিরে তখন যখন মানুষ ধাক্কা খায়। আমিও একটা বড় ধাক্কা খেলাম। মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় আমার স্থান অনেক পিছনে। কোন সরকারি মেডিক্যাল কলেজে চ্যান্স পেলাম না। ঢাকা ভার্সিটির পরীক্ষাতেও অনেক পিছনে। বাসা থেকে শুরু করে সব জায়গায় শুধু অবহেলা ।আমার থেকেও অনেক খারাপ ছাত্র মেডিক্যালে চান্স পেয়ে গেলো । আমি বুঝতে পারলাম কি ভুল করলাম। রাতুলের অবসেশন অনেকখানি দূর হল ঠিকই । কিন্তু এত দিন পর। ওর কথা ভেবে নিজের জীবনের এত বড় ক্ষতি করলাম। ও তো ঠিকই পি এইচ ডি করে নিজের জীবন ঠিকই গুছিয়ে নিচ্ছে। আমার কথা কি ভাবছে? আমি বাস্তবতায় ফিরলাম।নিজের ব্যর্থতার কথা ভেবে চোখের পানি ফেলা ছাড়া এখন অবশ্য কিছু করার নাই।
বাবা মা বাসায় ভাল করে এখন আর কথা বলে না। আমি কোথাও চ্যান্স পাবো না এটা তাদের ভাবনার অতীত ছিল। তারা এখন আত্মীয়স্বজন দের সামনে নাকি মুখ দেখাতে পারছে না। বাবার অফিসের পিয়নের ছেলেও নাকি কোন মেডিক্যাল এ চ্যান্স পেয়েছে। আর আমি!
মামা রা খালা রা এসে সান্ত্বনা দেয়ার ছলে ফোঁড়ন কেটে যায়। পাড়া প্রতিবেশীরাও কেমন করুণার দৃষ্টিতে তাকায় আমার দিকে। এটা যে কত বড় কষ্ট যারা এর সম্মুখীন হয়েছে তারাই বুঝে।
আমার আজকাল খুব মৃত্যু চিন্তা বাড়ছে । এমন যদি হত দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছি। কিংবা কোন বড় অসুখ হয়েছে তাহলেই মনে হয় ভাল হত। সুইসাইড করা মহাপাপ। আর সুইসাইড করার সাহস পাই না। আমি কাপুরুষ। কিন্তু বাবা মা সারাদিন মুখ গোমড়া করে বসে আছে সেটা দেখতেও ভাল লাগে না। দু চোখ যেদিকে চায় সেদিকে চলে যেতে পারলেও হত।

আচ্ছা রাতুল নিশ্চয় সব জেনেছে বড় চাচার কাছ থেকে। তারপরও একবারও আমাকে ফোন করে সমবেদনা জানালো না। অথচ তার জন্যই আজ আমার এই অবস্থা। না তার জন্য হবে কেন সে তো বলেই দিয়েছে তার সাথে আমার কোন রিলেশন নেই। আমার দোষেই আজ আমার এই অবস্থা। আর রাতুলের মত ছেলে দের কে ভুলে যাওয়াই উচিত। এই উপলব্ধি টা আরও ৩ মাস আগে আসতো তাহলে আজকে এই দিন দেখতে হত না।
একদিন বাবার সাথে তুমুল ঝগড়া লেগে গেলো। তার ইচ্ছা আমি কোন প্রাইভেট মেডিক্যালে ভর্তি হই তাদের সারা জীবনের সেভিংস খরচ করে। কিন্তু আমি তা চাই না। তার কথা আমি তাহলে কি করতে চাই।
।আমি বললাম
– আমি আবার মেডিক্যাল এডমিশন দিবো। এক বছর কোন ব্য্যাপার না।
– তুই যদি এইবার চ্যান্স না পাস।
– এইবার অবশ্যই পাবো। আমি এমন হার্ডওয়ার্ক করবো যে চ্যান্স অবশ্যই পাবো।
বাবা মা দুজনেই চুপ করে আছে। আমি চিৎকার করে বললাম
– আমাকে আরেকবার চেষ্টা করতে দাও প্লিজ।এর পর তোমরা যা বলবে তাই করবো। আমি জানি তোমাদের মাথা আমি সমাজে নিচু করে দিয়েছি। কিন্তু আরেকবার চেষ্টা করতে দাও। আমি ঢাকা মেডিক্যালে চ্যান্স পেয়ে দেখাবো ।
বাবা এইবার চুপ করে থাকলেন না। বললেন
– এই তো আমার ছেলের মত কথা।
অনেকদিন পর বাবার মুখে এমন কথা শুনে আমার চোখে পানি এসে গেলো। বাবা আমাকে এসে জড়িয়ে ধরলেন। অনেক দিন পর মনে হল আমার বুক টা একটু হাল্কা লাগছে। সেদিনের পর থেকে বাবা মা আবার স্বাভাবিক হয়ে গেলেন। আবার আগের মত আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করলো তারা। এইবার আমার তাদের স্বপ্ন পূরণ করতেই হবে। নিজের জীবনে কে নতুন করে সাজানোর জন্য পরিকল্পনা শুরু করলাম আমি।

১২
আমার বেস্ট ফ্রেন্ড সৃজন। আমরা সেই ছোটবেলা থেকে বন্ধু। আমরা ২ জনেই সমকামী এবং একজন আরেকজনের এই ব্যাপারটা জানি। তার মানে এই না যে আমাদের মাঝে কোন শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে। সে আমরা শুধুই বন্ধু।সে রাতুল আর আমার ব্যাপারটা জানতো। কিন্তু তার বাবার বদলির চাকুরীর জন্য সে এসএসসি এর পর খুলনা চলে গিয়েছিল। তারপর দীর্ঘ দিন আমার কোন যোগাযোগ ছিল না। সেও এইবার মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে টিকে নাই। আমার মত আবার এডমিশন টেস্ট দিবে। এইবার ঢাকায় থেকে কোচিং করে পরীক্ষা দিবে। অনেকদিন পর সে আমার বাসায় আসলো। আমি হটাত তাকে পেয়ে সেই খুশি। তার উপর সে এইবার টিকে নাই। আমার মত আবার পরীক্ষা দিবে। এই কথা জেনে আমি তো আরও খুশি। আমরা ২ জন রিডিং পার্টনার হয়ে পড়তে পারবো । বাবা মাও সৃজন কে বেশ পছন্দ করে। মা তো সৃজন কে আসতে দেখেই রান্না ঘরে ঢুকে গিয়েছেন কি রান্না করে খাওয়াবে। সৃজনের আব্বা আবার বাবার বন্ধু। বাবা সৃজন কে দেখেই তার বন্ধুর খোঁজ খবর নিলেন। তারপর সৃজন কে আমার ঘরে নিয়ে গল্পের ঝুড়ি খুলে বসলাম।সে প্রথমেই রাতুলের কথা জিজ্ঞেস করলো। সব খুলে বললাম। সব শুনে সৃজন বেশ কষ্ট পেলো। আমি এইবার তার কথা জিজ্ঞেস করলাম।
– কিরে তোর কোন প্রেম ট্রেম হল?
– আমি এইসবে নেই।
– কেন?
– সিঙ্গেল থাকাই তো ভাল। যা খুশি তাই করা যায়। এক পুরুষ নিয়ে যে তুই ক্যামনে ছিলি?
– কি বলিস! প্রতি দিন নতুন নতুন পুরুষ পাবো কই?
– আরে কতির ঘরের কতির ঢং দেখ। কিছুই জানে না! এহ!
– আরে সত্যি জানি না।
– কেন ফেসবুক নেই?
– আছে তো !
– তোর ফেক আইডি নেই?
– না
– আমর জ্বালা। কতির ঘরের কতি। এখন নিশ্চয় বলবি গ্রাইন্ডার কি তাও জানিস না।
– না জানি না তো
– গ্রাইন্ডার হল একটা মোবাইল এপ। এই এপে ঢুকলে তোর আশে পাশে যারা গে তাদের সবার প্রোফাইল দেখতে পাবি। মানে যারা গ্রাইন্ডারে প্রোফাইল খুলেছে।
– কই দেখি
সৃজন গ্রাইন্ডার এপ টা দেখালও। স্মার্ট ফোন থাকলেই ডাউনলোড করে নেয়া যায়। আমার বাড়ির আশে পাশে যারা প্রোফাইল খুলেছে তাদের প্রোফাইল দেখা যাচ্ছে। কারো ছবি দেয়া আছে। কারো নাই। আমার কাছে এক নতুন জগত খুলে গেলো যেন। আমার এত আগ্রহ দেখে সৃজন বলল
– কিরে আইডি খুলবি নাকি?
– না। এই সব বাল সাল ইউজ করবো না।
– মুখে তো বলতেছিস বাল সাল। কিন্তু নাগরের লোভে তো জিভ দিয়ে পানি পরতে দেখছি।
– বাজে কথা বলবি না তো !তুই দিন দিন মেয়েলী হয়ে যাচ্ছিস।
– আমর জ্বালা এক কতি আবার আরেক কতি রে কয় মেয়েলী।
– ওই মাইর খাবি। আমি কবে কতি হলাম।
– তাহলে কি রাতুল ভাইয়া কতি ছিল?
– ওই আমরা কেউ কতি ছিলাম না। আর রাতুলের নাম আমার সামনে আর তুলবি না। আমি ওকে সারা জীবনের জন্য ভুলে যেতে চাই।
– ভুলার কথা যে বলছিস বড়। সত্যি কি ভুলতে পারবি?
ওর এই কথা আমার হৃদয়ের গভীরে যেয়ে আঘাত করল। আসলেই কি ভুলতে পারবো ! কিন্তু আমার ভুলতে হবেই যে!
বিকেলে সৃজন চলে গেলো। সেদিন সৃজন আমাকে নতুন ভাবে ভাবার রাস্তা খুলে দিল। আচ্ছা রাতুল কে ভুলতে যদি নতুন কারো সাথে রিলেশন করা লাগে তবে তাই করবো। পরক্ষণে ভাবলাম রিলেশনের দরকার কি? রিলেশন একটা ঝামেলা। নতুন করে কারো প্রেমে পড়তে চাই না। এখন যেমন আছি তেমনি থাকবো । কিন্তু ডেট করে বেড়াবো। হম সেটাই ভাল। নতুন কারো সাথে রিলেশন করে জীবনে নতুন সর্বনাশ ডেকে আনবো না। এক রাতুলের সাথে ব্রেকাপের পর যে কষ্ট পেয়েছি।এখন আমার প্রাইমারি এটেনশন পড়াশোনা হতে হবে। প্রেম নয়।
সেদিন রাতেই ভাবলাম গ্রাইন্ডার এপ টা ডাউনলোড করে দেখি কেমন লাগে।যা ভাবা তাই কাজ। ডাউনলোড করলাম এপ টা। আমার প্রফাইলের নাম দিলাম “কালো ভ্রমর”।যেন ভ্রমরের মতই ফুলে ফুলে মধু খাবার জন্যই তো এই আইডি খোলা। নতুন আইডি তে বেশ কয়জন নক করলো। প্রথমেই সবাই জিজ্ঞেস করে এজ , সেক্স , রোল। তারপর চায় পিক। মানে ছবি। কিন্তু ছবি দিতে ভয় লাগে। তাই কাউকেই ছবি দিলাম না।
এপ টা তে দিন দিন এডিক্টেড পরতে লাগলাম। একদিন সৃজন বাসায় আসার পর সৃজন কে বললাম কথা টা। বললাম
– আমি গ্রাইন্ডারে দিন দিন এডিক্টেড হয়ে পড়ছি। সারা দিনের মাঝে অবসর সময়েই সারা দিন গ্রাইন্ডারে পরে থাকি।
– আমর জ্বালা। তাতে কি হয়েছে?
– আগে কত বই পড়তাম , সিনেমা দেখতাম। সব বাদ দিয়ে গ্রাইন্ডারে পরে থাকি।
– তাও তো ছবি দিস নাই কাউকে।
– ছবি দিতে ভয় লাগে।
– কতির ঘরের কতি। এত ভয় লাগলে মধু খাবি কেমন করে? আইডি তো রেখেছিস কালো ভ্রমর। ছবি না দিলে কেউ মধু খেতে দিবে না।
– তাহলে বলছিস ছবি দিবো ?
– সে আমি কি জানি। কিন্তু ছবি ছাড়া এখানে কেউ পাত্তা দিবে না এও বলে রাখলুম।
সেই দিন সৃজন চলে যাবার পর অনেকক্ষণ ভাবলাম। আমি আসলে কি চাই! আমি রাতুল কে ভুলতে চাই। আর তার জন্য দরকার নতুন কাউকে। প্রেম না জাস্ট ডেট। কিন্তু এইভাবে কি ভোলা যাবে। চেষ্টা করে দেখি না। সেদিন প্রথম একজন কে আমার ছবি দিলাম। আমি জানি আমি সুন্দর। কিন্তু ছেলেটা আমার ছবি দেখে এমন ভাবে প্রশংসা করলো যে আমি নিজেই অবাক হলাম। আমি কি আসলেই এত সুন্দর। ছেলেটার নাম সবুজ। আমরা ডেট করবো ঠিক করলাম। আমরা প্রথমে দেখা করবো বসুন্ধরা সিটি তে। আগামী রবিবার। সেদিন ছেলেটার নাম্বার নিয়ে অনেকক্ষণ কথা বললাম। কিছুক্ষণ এটা সেটা বলেই আমরা সরাসরি চলে গেলাম যৌনতার কথায়। আমি বহুদিনের ক্ষুধার্ত। রাতুল চলে যাবার পর এই প্রথম যৌনতার স্বাদ কিছুটা ফোনে পাচ্ছি। ফোন রেখে ভাবলাম আমি কি খারাপ হয়ে যাচ্ছি? এক সময় চ্যাট সেক্স, ফোন সেক্সের কথা শুনলে আমার কাছে খুব জঘন্য মনে হত। আর এখন আমি এসব করে বেড়াচ্ছি। আসলে ছেলেরা মনে হয় এমনই। যৌনতার কাছে ছেলেরা পরাজিত হয়ে যায় সব সময়।
রবি বার কেন আসে না। আমি ধৈর্য হারা হয়ে যাচ্ছি। সারা দিন সবুজের কথা মনে হয়। এই সব কথা মনে করে মাস্টারবেট করি। আর রাতে তো ফোন সেক্স আছেই।সবুজও আমার প্রতি যথেষ্ট আগ্রহী।অবশেষে সেই প্রতীক্ষিত রবিবার এলো।
বসুন্ধরা সিটি তে ফুড কোর্টে দেখা করলাম সবুজের সাথে। সবুজ আমাকে দেখেই কেমন গদ গদ হয়ে গেলো। ওখানেই আমার হাত ধরতে চায়। কিন্তু সবুজ কে আমার তেমন ভাল লাগলো না। ছবি তে যা দেখেছিলেম অত টা সুন্দর সে নয়। কিন্তু তারপরও তার সাথে ফোন সেক্স করেছি। সে জানে কিভাবে পার্টনার কে আনন্দ দিতে হয়। তাই তার সাথে সেক্স করার ইচ্ছে মরে যায় নি। সেদিন সবুজ আমাকে তার ফ্ল্যাটে আমন্ত্রণ জানালো। সে তার ফ্ল্যাটে একা থাকে। তার বাবা মা দেশের বাইরে থাকে। ফ্ল্যাট টা তার নিজের ফ্ল্যাট। আমি বাসায় বললাম সৃজনের বাসায় থেকে পড়াশোনা করবো। সেই রাতে ধানমন্ডি তে আসলাম সবুজের ফ্ল্যাটে।
ডিনার করলাম তার সাথেই। তারপর গিয়ে ঢুকলাম সবুজের শোবার ঘরে। সবুজ আমাকে তার বাহুডোরে নিয়ে আমার ঠোঁটে চুমু দিল। আমিও রেস্পন্স করলাম। বহুদিন পর আমার শুকনো ঠোঁট গুলো আদ্র হয়ে উঠলো । আমি আর সবুজ কাপড় খুলে এক অপরের সামনে নগ্ন হলাম। তারপর সবুজের বিছানায় ঝড় উঠলো। আসলেই সবুজ জানে কিভাবে পার্টনার কে সুখ দিতে হয়। যৌনতায় এত আনন্দ অনেক দিন পাই নাই।
সকালে বাড়ি যখন ফিরলাম তখন কেমন জানি একটা গিলটি ফিলিংস কাজ করতে লাগলো। শেষ পর্যন্ত আমিও। যে আমি ভালবাসা হীন যৌনতা কে ঘৃণা করতাম সে আমি গত রাত্রে এক স্বল্প পরিচিত একজনের সাথে সেক্স করে আসলাম। সেখানে ছিল না কোন ভালবাসা। সারা দিন বিষয়টা আমাকে ভাবালও। আমার কি অধঃপতন হচ্ছে। আবার এটাও ঠিক ভালবাসা না থাকলেও আমি গত রাতের সেক্সের প্রতিটা ক্ষণ উপভোগ করেছি। এরপর ?
আমি ঠিক করলাম সবুজের সাথে আর নয়। কারণ একজনের সাথে বার বার ইনভল্ভ হলে আমি তার প্রেমে পরে যেতে পারি। আর সবুজ তো ইতোমধ্যে আমার প্রেমে পড়েই গিয়েছে।প্রপোজ করেছে। কিন্তু আমি বেশ বিনয়ের সাথে তাকে না করে দিয়েছি। তারপরও সে বিরক্ত করলে নাম্বার ব্লক করে দিবো ভেবেছি। তারপর আবার শুরু হল গ্রাইন্ডারে পুরুষ শিকার।

১৩
জীবনটা কেমন বদলে গেলো। জানি না ভালর দিকে যাচ্ছে নাকি খারাপের দিকে যাচ্ছে। গ্রাইন্ডার ছাড়াও ফেসবুকে এখন আমার ফেক আইডি রয়েছে। কিন্তু আমার ফেভারিট গ্রাইন্ডার। এখন পর্যন্ত আমি দশের অধিক মানুষের সাথে যৌনতায় লিপ্ত হয়েছি। এর মাঝে ফরেনার ও আছে। আগে ভয় লাগতো ছবি দিতে এখন প্রোফাইলেই ছবি রয়েছে। আমি কেমন সেক্সফ্রিক হয়ে যাচ্ছি। রাতুল কে ভুলতে যৌনতা কেই অস্ত্র হিসেবে নিলাম। কিন্তু আমি কি আসলেই সুখে আছি? আজকাল খুব ক্লান্ত লাগে। মনে হয় আবার আগের জীবনে ফিরে যাবো কিনা। কেমন যেন প্রেম করতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু সেরকম কাউকে পাই না। পড়া শোনা চলছে এর মাঝেই। আমি প্রতিটা মক টেস্টে ভাল করছি। আমার রিডিং পার্টনার সৃজনও ভাল করছে।
একদিন রাকিব নামে একজন নক করলো গ্রাইন্ডারে। বেশ ম্যাচিউরড। ৩০ এর উপরে বয়স। ছবি দেখে আমার ভাল লাগলো। কথা চলতে লাগলো। আমি প্রথমে জিজ্ঞেস করলাম
– এজ রোল লোকেশন ?
– রোল না বললে কি চ্যাট করবেন না?
মনে মনে গালি দিলাম গ্রাইন্ডারে এসে সুশীল সাজছে।আমি উত্তর দিলাম
– রোল বলতে অসুবিধা?
– হম। একদিনের পরিচয়ে রোল বলাটাকে কেমন চিপ মনে হয়।
– গ্রাইন্ডারে এসে চিপ চুদাচ্ছেন?
– কেন গ্রাইন্ডারে কি ভাল চ্যাট করা যায় না?
– ভালর কথা চ্যাটের বাল।
– আপনি দেখতে এত সুন্দর । কিন্তু আপানার কথা গুলো এমন রাফ কেন?
হটাত থমকে গেলাম আমি। এই প্রথম কেউ আমাকে চিপ বলল । রাফ বলল। আচ্ছা আমি তো আসলেই তাই হয়ে গিয়েছি।মেসেজ আসার সাউন্ড শুনতে পেলাম।রাকিব লিখেছে
– আপনি কি মাইন্ড করলেন?
– না। আমি যা তাই তো বলেছেন।
– আমি আসলে ওভাবে বলতে চাই নাই।
– ইটয ওকে।কি জানতে চান বলুন।
– আপনি কি করেন?
– আমি স্টুডেন্ট। এইবার মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা দিবো। আপনি?
– বাহ ভাল। আমি ডাক্তার। আপনি তো তাহলে আমার প্রফেশনেই আসছেন।
– হম। চ্যান্স পাইলে।
– আচ্ছা আপনার হবি কি?
– বই পড়া , মুভি, গান আর ট্রাভেলিং। আপনার?
– আমার মোস্টলি ট্রাভেলিং। গান ও শোনা হয় প্রচুর।
– কি গান শুনতে ভালবাসেন ?
– রবীন্দ্রসঙ্গীত ।এছাড়া আধুনিক বাংলা গান শোনা হয়।
আমি থমকে গেলাম । রাতুলের কথা মনে পরে যাচ্ছে্‌।রবীন্দ্র সংগীত তো রাতুলেরও খুব প্রিয় ছিল।এদিকে আবার মেসেজ আসার শব্দ শুনতে পেলাম
– আপনার কি গান শুনতে ভাল লাগে?
– বাদ দেন
– কেন?
– এমনি ভাল লাগছে না এই ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে।
– আচ্ছা পেট পছন্দ করেন?
– না।আমার খুবই অপছন্দ।
– কেন! আমার তো খুবই পছন্দ। কিন্তু মা পছন্দ করেন না। তাই পেট রাখতে পারি না।বৃষ্টিতে ভিজতে কেমন লাগে?
– ভাল না। বৃষ্টি আসলে আমি জানালা বন্ধ করে দেই।
– কেন? আমার সাথে থাকলে তো বৃষ্টি তে ভিজতেই হবে। দেখবেন কত মজা।
এ যেন রাতুলের প্রতিচ্ছবি। সব পছন্দ রাতুলের সাথে মিলে যাচ্ছে। আরও অনেকক্ষণ চ্যাট হল। আমার কেন জানি রাকিব কে খুব ভাল লেগে গেলো।

১৪
এখন প্রতি দিন রাকিবের সাথে চ্যাট হয়। কিন্তু এখনো দেখা হয় নাই আমাদের। আমাদের ২ জনের মাঝে খুব ভাল বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। কিন্তু আমাদের মাঝে যৌনতা নিয়ে কোন কথা হয় না। আমরা ২ জনের ফেসবুক আইডি এক্সচেঞ্জ করেছি। এখন ফেসবুকেই চ্যাট হয়। আমার আর এখন তেমন গ্রাইন্ডারে ঢুকা হয় না। রাকিবের সাথে চ্যাট করেই সময় পার হয়ে যায়। আর কারো সাথে চ্যাট করতে ইচ্ছা হয় না। আমাদের মাঝে দেখা করার প্রসঙ্গ প্রায় উঠে। কিন্তু দেখা করা হয়েই উঠছে না। দেখা করার প্লেস নিয়েও আমাদের মাঝে নানা আলোচনা হয়েছে। অবশেষে ঠিক হল ঢাকা ভার্সিটির চারুকলার সামনে আমরা দেখা করবো আগামী শুক্রবার।
শুক্রবার বিকেল ৪ টা। আমি ঠিক সময়ে এসে উপস্থিত হলাম। আকাশ কেমন মেঘলা হয়ে আছে। পাগলা হাওয়া বইছে। বছরের প্রথম বৃষ্টি বুঝি আজই হবে।১৫ মিনিটের মাঝে রাকিব এসে উপস্থিত হল। অনেক ছবি দেখেছি। তাই চিনতে কোন সমস্যাই হল না। রাকিব ফরশা, এভারেজ বডি ফিগার, ৫-১০, মাথা ভর্তি কালো চুল।চোখে রিমলেস চশমা।
আমরা ঢাকা ভার্সিটির রাস্তা ধরে হাঁটছি আর গল্প করছি। এই কথা থেকে সেই কথা। কথা আর শেষ হয় না। এক পর্যায় আমি জিজ্ঞেস করলাম
– আপনার বাসায় বিয়ের জন্য কিছু বলে না? বিয়ের বয়স তো চলে যাচ্ছে । কবে বিয়ে করবেন?
– আরে না বিয়ে করবো কেন? আমার মা তো সব জানে। এবং মেনেও নিয়েছে।তাই বিয়ের জন্য প্রেশার দেয় না ।একদিন আপনাকে নিয়ে যাবো বাসায়। মায়ের সাথে দেখা করিয়ে দিবো।
– তাহলে তো আপনি খুব লাকি।এমন মা পাওয়া আসলেই ভাগ্যের ব্যাপার.
– হম। হয়তো ।
– আপনার মনের মানুষ কে তো তাহলে আপনার মা মেনে নিবেন।
– মনের মানুষকে যদি আমার মনের কথা জানাতে পারি তাহলেই না এই প্রসঙ্গ আসবে।
– তার মানে আপনার মনের মানুষ আছে?
– আছে কিন্তু সে যে বুঝেও বুঝে না।
– মানে?
– কিছু না। চলেন হাওয়াই মিঠাই খাই।
হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করছিলো একটা বাচ্চা মেয়ে। তার কাছ থেকে ২ টা হাওয়াই মিঠাই নিলাম। টিএসসি তে এসে বসলাম। ভেলপুরি খাওয়া হল। আইসক্রিম খাওয়া হল। তার সাথে চলল আড্ডা।একজন আরেকজনের পরিবার সম্পর্কে জানলাম। রাকিবের আরেকটা ছোট ভাই আছে। বাবা মা ২ জনেই রাকিবের ব্যাপারটা জানে। আড্ডা দিতে দিতে আমরা একদম খেয়াল করি নাই যে আকাশ কালো হয়ে গিয়েছে। ঝড় ঝড় করে বৃষ্টি নামলো। আমরা ২ জন যেয়ে একটা ছাউনির নিচে আশ্রয় নিলাম। হটাত দেখি রাকিব আমার দিকে তাকিয়ে হাসলও । আমি অবাক হয়ে বললাম
– কি হল?
– চলুন বৃষ্টিতে ভিজি। বছরের প্রথম বৃষ্টি।
বৃষ্টিতে ভেজার কথা শুনে কেমন যেন আনমনা হয়ে গেলাম। শেষ ভিজেছিলাম রাতুলের সাথে।
যখন বৃষ্টি টুপ্টাপ করে পরতে লাগলো আমরা ২ জন একটা রিকশা ভাড়া করে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আধাঘণ্টা ঘুরলাম।রিকশাওয়ালা তো অবাক। সে তো আর জানে না আমরা বৃষ্টি বিলাস করছি।
রাতুল চলে যাওয়ার পর প্রায় ৮ মাস পর বৃষ্টিতে ভিজলাম। বৃষ্টি দেখলে যে আমি জানলা বন্ধ করে দিতাম। সেই আমি আবার বৃষ্টি তে ভিজলাম। আমাকে রাকিব বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিল রিকশা করেই। সবকিছু হটাত করে খুব রঙিন লাগছে। সব কিছুই ভাল লাগছে। এরকম ফিলিংস অনেকদিন পর হল। প্রেমে পড়লে নাকি এমন লাগে।তাহলে কি আমি রাকিবের প্রেমে পরে গিয়েছি। সেদিন সারা রাত ভাবলাম। রাকিব খুব ভাল ছেলে। মোটেও সেক্স ফ্রিক নয়। তার ভাল লাগা গুলো আমার ভাল লাগার সাথে মিলে যায়। সবচেয়ে বড় কথা রাকিব আমাকে পছন্দ করে সেই ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। তাহলে ওর সাথে রিলেশনে যেতে অসুবিধা কোথায় ? আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি। রাকিব আমাকে একটা রবীন্দ্রসঙ্গীতের ডিভিডি দিয়েছে। তার প্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীত এর কালেকশন। বহুদিন পর রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনলাম। মোট ১০ টা গান রয়েছে।
– সখি ভাবনা কাহারে বলে।
– ভালবাসি ভালবাসি।
– আমার পরান যাহা চায়।
– ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে।
– গহন কুসুম কুঞ্জ মাঝে।
– আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে।
– আমার মন কেমন করে।
– তুমি কোন কাননের ফুল।
– তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা।
সেই রাতেই রাকিবের সাথে চ্যাট হল। রাকিব লিখলো
– আজকে আপনি মনের মানুষের কথা জিজ্ঞেস করলেন না?
– হ্যা।
– যদি বলি আপনি আমার মনের মানুষ ।
আমি লিখাটার দিকে তাকিয়ে আছি অনেকক্ষণ। কি বলবো ? আমি আমার সব কিছু বলেছি তাকে। রাতুলের কথাও বলেছি।আমার এই অভিশপ্ত বহুগামি জীবন সম্পর্কেও সে জানে।কিছুই গোপন করি নাই। আমার সব কিছু জেনেই সে আমাকে মেনে নিয়েছে। আর আমি তো আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি রাকিব প্রপোজ করলে আমি রাজি হয়ে যাবো। আমার এই অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্তি চাই। বহুগামী জীবন কক্ষনো সুখের হতে পারে না। তা আমি এই কয়দিনে খুব বুঝতে পেরেছি। প্রথম প্রথম ভাল লাগলেও এখন আমি ক্লান্ত এই জীবন নিয়ে। আমি জবাব দিলাম
-মনের মানুষ কে মনের কথা বলতে এত কুন্ঠা কেন?
– আমি ভয় পাই আপনি যদি রিজেক্ট করে দেন।
– সে ভয় তো আমারও ছিল। যাই হোক এখন থেকে আর আপনি নয়। শুধু তুমি।
– ওকে। আমি তোমাকে ভালবাসি অর্ণব।
– কিছু কিছু কথা মুখে বলার প্রয়োজন নেই। হৃদয় দিয়েই অনুভব করা যায়। আমি তোমাকে অনুভব করতে পারি।
– আমি সারা জীবন এই দিনটার কথা মনে রাখবো।
-আমিও।
আমার জিবনের নতুন অধ্যায় শুরু হল রাকিব কে নিয়ে।

১৫
রাকিবের সাথে সম্পর্কের পর থেকে আমার জীবন যেন এক নতুন মোড় নিল। সারা সপ্তাহ আমি পড়াশোনা করি আর শুক্র এবং শনিবার যেন শুধু আমাদের ২ জনের। রাকিবের ছোট একটা লাল টুকটুকে গাড়ি আছে। কোন কোন সপ্তাহে এই গাড়ি করে চলে যাই অনেক দূরে। লং ড্রাইভে। কোন সপ্তাহে সিনেমা দেখি। আবার কোন সপ্তাহে ধানমন্ডি লেকে আড্ডা। কখনো কখনো টিএসসি , ঢাকা ভার্সিটি এলাকায় কেটে যায় সারা বেলা। পুরাতন ঢাকার রেস্টুরেন্ট গুলো তে হানা দেই কোন কোন সপ্তাহে। এভাবে কেটে যাচ্ছে আমাদের দিন গুলো হাসি, আনন্দে।
রাকিব শুধু তার বাসায় তার মায়ের সাথে দেখা করতে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু আমার অস্বস্তি লাগে। তাই আর যাওয়া হয়ে উঠে না। কিন্তু এইবার রাকিব আমাকে আগামী শুক্রবার তার বাসায় নিয়ে যাবার জন্য গোঁ ধরে বসে রইলো । আমাকে যেতেই হবে। সেদিন নাকি তার মা বাবার এনিভারসারি। তার মা নাকি আমাকে দেখতে চেয়েছেন। আনটি নাকি খুব খুঁতখুতে । আমার তো ভয় লাগছে আমাকে দেখে পছন্দ করবে কিনা।কিন্তু রাকিব আমাকে অভয় দিচ্ছে আমাকে অপছন্দ করবার নাকি কোন কারণ থাকতে পারে না। কিন্তু তারপরও গে আইডেন্টিটি নিয়ে কারো বাবা মা এর সামনে দাঁড়ানো। কিছুটা অস্বস্তি তো লাগবেই। শুক্রবার এসে গেলো । কি পরে যাবো তা অনেকক্ষণ ভাবলাম। পরে মনে হল ফরমাল ড্রেসে যাই। এ ড্রেস সবচেয়ে বেশি ডিসেন্ট হবে। আর ফরমাল ড্রেসে আমাকে মানায় ভাল। রাকিব তার গাড়ি নিয়ে আমাদের বাড়ির সামনের মোড় টা তে এসে বসে আছে। আমি তাড়াহুড়ো করে বের হলাম। গিয়ে দেখি রাকিব বিরক্ত হয়ে বসে আছে। আমার দেরি দেখেই মনে হয় বিরক্ত হয়ে গিয়েছে। ঠিক রাতুলের মত। উফ আবার সেই রাতুলের চিন্তা মাথা। নাহ রাতুলের কথা ভাবা যাবে না,।আমি রাকিবের পাশে সিটে বসলাম। বসে বললাম
– সরি লেট হয়ে গেলো।
– ইটজ ওকে ।
– আচ্ছা আজকে তো আনটি আর আঙ্কেলের মেরেজ এনিভারসারি।আমার তো কিছু নিয়ে যাওয়া উচিৎ।
– আরে লাগবে না।
– আরে অন্তত ফুল নেই।
শাহবাগে এসে ফুল নিলাম। তারপর সোজা ধানমন্ডি। ধানমন্ডিতেই রাকিবের বাসা।বাসার নাম তিস্তা। তিস্তার তিন তলায় থাকে রাকিব রা। ঘরে বেল বাজাতেই একজন ফরশা সৌম্য দর্শন মহিলা দরজা খুলে দিল। পরনে সালওয়ার কামিজ।তিনি গোল্ডেন ফ্রেমের চশমা পরে আছেন।বুঝলাম ইনি রাকিবের মা। আমি সালাম দিলাম। মহিলা হেসে বললেন
– তুমি নিশ্চয় অর্ণব।
– জী
– এসো ঘরে এসো।
আমি ফুলগুলো মহিলার হাতে দিলাম।তিনি হেসে বললেন
– এগুলো আনার কি দরকার ছিল?
বসার ঘরটা খুব সুন্দর করে সাজানো। দেশ বিদেশের নানা সুভ্যেনির রয়েছে।রয়েছে বিশাল ওয়ালক্লক। সিলিং থেকে একটা ঝাড়বাতি ঝুলানো। মেঝে তে তুরকিশ কার্পেট । আমি সোফায় বসলাম। মহিলা হেসে নানা কথা জিজ্ঞেস করছেন। কিন্তু হাসি টা কেমন জানি কৃত্রিম মনে হচ্ছে। নাকি আমারই বোঝার ভুল জানি না।কেন জানি মনে হচ্ছে তিনি আমাকে পছন্দ করছেন না। কিন্তু এমন হবার কি কোন কারণ রয়েছে।কিছুক্ষণ কথা বলার পর মহিলা মানে আনটি বললেন
– রাকিব তোর ঘরে অর্ণব কে নিয়ে যা। বসে গল্প কর। আমি বরং দেখি রান্না কত দূর হয়েছে।
রাকিব আমাকে তার ঘরে নিয়ে গেলো। একজন ব্যাচেলরের ঘর যে এত সুন্দর গোছান থাকতে পারে তা আমার ধারণা ছিল না। ঘরে একটা বিছানা। বিছানায় টারকিশ ব্লু এর চাদর বিছানো। পাশেই একটা ম্যাট।জানালার পর্দা গুলো টার্কিশ ব্লু।এক পাশের দেয়াল জুড়ে বুকশেলফ। আরেক পাশের দেয়ালে ওয়াল কেবিনেট। আমি যেয়ে বিছানার উপর বসলাম। রাকিব এসে আমার পাশে বসলো
– মা কে কেমন লাগলো
আমার কাছে আন্টির হাসি টা কৃত্রিম মনে হয়েছে। মনে হয়েছে তিনি আমাকে পছন্দ করেন নাই। কিন্তু তা আর রাকিব কে বললাম না। বরং বললাম
– আন্টি তো খুব ভাল মানুষ। আমার খুব ভাল লেগেছে
– হ্যাঁ মা তো খুব মিশুক। দেখলে কেমন আপন করে নিল তোমাকে
– হম।
আমি প্রসংগ বদলানোর জন্য বললাম
– তোমার ঘর টা তো খুব সুন্দর গোছান।
– হ্যাঁ মা গুছিয়ে রাখে। মা না থাকলে ঘর টা এমন গুছানো রাখা সম্ভব হত না।
– হম।
আমি যেয়ে রাকিবের বই কাল্কেশন দেখছি। বললাম
– বাহ তুমি তো অনেক বই পড়।
– আরে আমি আর কি বই পড়ি। মায়ের ঘরে আরও অনেক বই আছে। মায়ের কাছ থেকেই তো গল্পের বই পড়ার অভ্যাস এসেছে।
মর জ্বালা । যা বলি তাতেই আন্টির প্রসঙ্গ চলে আসে। আরও কিছুক্ষণ গল্প করলাম। এরপর আন্টি এসে ডাকলেন খেতে। অনেক কিছু রান্না করেছেন। রান্না তে কোন কার্পণ্য করেন নাই। কিন্তু বেড়ে দেয়ার বেলায় তিনি কেমন জানি আড়ষ্ট হয়ে রইলেন। অথবা আমার মনের ভুল। আমি খাওয়া দাওয়ার পরই চলে যেতে চাইলাম। আমার নিজের কাছে কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে। নিজেকে মনে মনে বুঝাচ্ছি যা ভাবছি তা ঠিক নয়। আনটি নিশ্চয় আমাকে পছন্দই করেছেন। হয়তো তার প্রকাশ ভঙ্গী এমন। সবাই তো আর এক রকম হয় না। রাকিব সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকার জন্য জোরাজুরি করছে। সন্ধ্যায় আঙ্কল আসলে কেক কাটা হবে। আমি আসলে এমন পরিবেশে কক্ষনো থাকি নাই। আমাদের বাসায় জন্মদিন ই ঠিক মত পালন করা হয় না। সেখানে ম্যারেজ অ্যানিভারসারি পালন তো দূরের কথা। আর আঙ্কল কেমন ব্যবহার করবেন গড নোস। আমি এইবার বেশ কড়া ভাবেই বললাম
– না রাকিব আজকে চলে যাই। বাসায় আজকে তাড়াতাড়ি ফিরতে বলেছে। কি জানি কাজ আছে।আরেকদিন আঙ্কল এর সাথে দেখা করবো।
রাকিব কি বুঝলো কে জানে! আর জোরাজুরি করলো না। আমাকে নামিয়ে দিয়ে আসতে চাইলো। আমি বললাম
– আমি বাসেই যেতে পারবো।
যাবার সময় আর আন্টির সাথে দেখা হল না। আন্টি এই সময় ঘুমান। তাই আন্টি কে না বলেই চলে এলাম।

১৬
বাসায় এসে দেখি বাসায় কেউ নাই। উপর তলা মানে বড় চাচার বাসা থেকে হৈচৈ শোনা যাচ্ছে। নতুন করে গণ্ডগোল হল নাকি। আমি দৌড়ে উপরে উঠলাম। উঠে দেখি বড় চাচি কান্নাকাটি করছে। বাবা হন্য হয়ে মোবাইলে কার সাথে কথা বলছে। বড় চাচা কে দেখছি না।আমার ভয় লাগছে। কি হল। মা বড় চাচার ঘরে ছিলেন। সেখান থেকে বের হয়ে আমাকে দেখে বলল
– তুই এসেছিস? ভাল হয়েছে। এখুনি একটা এ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা কর।
– কেন কি হয়েছে?
– তোর বড় চাচা মনে হয় স্ট্রোক করেছেন। বাথরুমে যাবার সময় পরে গেলেন। তারপর থেকে জ্ঞান নেই।
– কি বলছো।
– যা বলছি কর । এখুনি হাসপাতাল নিতে হবে।
আমি রাকিব কে ফোন দিলাম। সে ঢাকা মেডিক্যালে আছে। আমাকে বলল
– আমি একটা এ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়ে দিচ্ছি। তুমি এখুনি ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে আসো। ইমারজেন্সি তে। আমি ওখানে আছি।
আমি বাবা কে বললাম
– বাবা আমার একটা সিনিওর ভাইয়া ঢাকা মেডিক্যালের ডাক্তার। তিনি বলেছেন সেখানে ইমারজেন্সি তে নিতে। তিনি একটা এ্যাম্বুলেন্স পাঠাচ্ছেন ।
– তাহলে তো খুব ভাল হল। আমি তো নানা জায়গায় ফোন করেও এ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করতে পারছিলাম না।
কিছুক্ষণের মাঝেই এ্যাম্বুলেন্স চলে এলো। এখলাস আর শিপন মিলে চাচা কে পাঁজা কোলা করে এ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত নিল। সেখান থেকে ঢাকা মেডিক্যালের ইমারজেন্সি তে। আমি একটা ব্যাপার লক্ষ করলাম। বিপদের সময় পরম শত্রুও আপনজন হয়ে উঠতে পারে। বড় চাচা বাবার সাথে এত কিছু করার পরও বিপদে বড় চাচা কে বাবা ছেড়ে যেতে পারেন নাই। নিজে তাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন।
ইমারজেন্সি তে যেয়ে দেখি রাকিব দাঁড়িয়ে আছে।উৎকণ্ঠিত চেহারা। রাকিব সাথে থাকায় বড় চাচা কে সাথে সাথে মেডিসিন ওয়ার্ডে এডমিট করা হল।সেখানের কর্তব্যরত চিকিতসক রা বললেন আইসিইউ তে নিলে ভাল হয়। চাচার অবস্থা নাকি ভাল না। কিন্তু ঢাকা মেডিক্যালের আইসিইউ তে কোন বেড খালি নেই। রাকিবের সাথে পরামর্শ করে চাচা কে আবার এ্যাম্বুলেন্সে করে স্কয়ার হাসপাতালে নিলাম। চাচা কে স্কয়ার হাস্পাতালের আইসিইউ তে ভর্তি করা হল।
রাত বাজে বারোটা। রাকিব আমার পাশেই বসে আছে।স্কয়ার হাসপাতালে রাকিবের কিছু বন্ধু আছে। তারা চাচা কে দেখছেন। বাবা উত্তেজিত। পায়চারী করছেন। এক জায়গায় বসে থাকতে পারছেন না। মা , চাচি কে সামলাচ্ছেন। চাচি এখন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। রাতুল কে ফোনে জানানো হয়েছে সব কিছু। সে বাংলাদেশে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তারপরও বাবা বলেছেন তাকে এখুনি না আসতে। হয়তো চাচা ভাল হয়ে যাবেন দ্রুত।
স্কয়ার হাসপাতাল ফাইভ স্টার হোটেলের মত। সুন্দর করে সাজানো।দেয়ালে সুন্দর সুন্দর ছবি। মেঝে আয়ানার মত চকচকে। কোন ময়লা নেই। ১২.৩০ এর দিকে রাকিব আমাকে বলল
– চল ক্যাফেটেরিয়া থেকে চা খেয়ে আসি
আমি বললাম
– তুমি চলে যাও। আন্টি চিন্তা করবে।অনেক রাত হয়েছে।
– না না আমি থাকি। রাত টা থাকি। জেনে যাই কি অবস্থা
– তুমি আমার জন্য এত কষ্ট করছো
– এটা কি বল!তোমার জন্য করবো না তো কার জন্য করবো
আমি মৃদু হাসলাম।বললাম
– চল ক্যাফেটারিয়া তে যাই।
ক্যাফেটারিয়া থেকে চা খেয়ে ফিরতেই খারাপ খবর টা শুনলাম। বড় চাচা আর নেই। রাত ১ টায় আমাদের সকল কে ছেড়ে না ফেরার দেশে পারি জমিয়েছেন তিনি।

১৭
সারা বাড়ি জুড়ে আগর বাতির গন্ধ। এক পাশে কিছু বাচ্চা এতিম ছেলে কুরআন তিলাওয়াত করছে। চাচি এখনো উদ্ভ্রান্তের মত কাঁদছেন। তিনি যেন বিশ্বাস করতেই পারছেন না বড় চাচা আর নেই। বাবা মা দুই জনের চোখেই পানি দেখছি। বড় চাচা যাই করে থাকুক ভাই তো। এত দিনের সঙ্গী। আমরা একসাথে ছিলাম। আমার মনটা কেমন বেদনার্ত হয়ে আছে। বুঝতে পারছি না কেন? বড় চাচার প্রতি কোন ভালবাসাই আমার ছিল না কখনো। বরং তাকে সব সময় আমার কাছে ব্বিরক্তিকর মনে হত। সারাক্ষণ চিৎকার চেঁচামেচি করে সারা বাসা অস্থির করে রাখতেন। তার জন্য খারাপ লাগছে। আশ্চর্যই বটে। দূর দূরান্ত থেকে আত্মীয় স্বজন রা আসছেন দেখা করার জন্য। অনেক আত্মীয়স্বজন কে আমি কক্ষনো দেখেছি বলেও মনে করতে পারছি না। কিভাবে তারা খবর পেয়েছেন তাও চিন্তার বিষয়। মৃত্যুর সংবাদ বাতাসের আগে ছড়ায় ।এসকল আত্মীয়স্বজন সান্ত্বনা দিচ্ছে। আবার নিজেদের মধ্যে নানা গল্প জুড়ে বসেছে। বাড়ি পুরো গম গম করছে মানুষের কলরবে। কেউ কেউ নিজে নিজেই বসে গিয়েছে কুরআন তিলাওাত করতে এবং তসবিহ গুনতে।মৃত বাড়িতে চুলা জ্বালানো হয় না। পাশের পাড়া প্রতিবেশীরা খাবার দিয়ে যাচ্ছে। খিচুরি রান্না করে পাঠিয়েছে।আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম শোকের থেকে কেমন জানি একটা উৎসবের আমেজ চলে আসছে।বড় চাচার লাশ রাখা হয়েছে হিমাগারে। রাতুল আসলে দাফন হবে। আজকে বিকেলেই রাতুল এসে পৌঁছবে। তাকে নিয়ে আসার দায়িত্ব পরেছে আমার। আমি যে কাজটা সবচেয়ে উপেক্ষা করতে চেয়েছিলেম সেই কাজ টার ভার আমার উপর পরেছে। রাকিব বলেছে আমার সাথে যাবে এয়ারপোর্টে রাকিব কে রিসিভ করতে। কারণ তার গাড়ি আছে । এখন গাড়ি ভাড়া করা একটা ঝামেলা । এমনি মরা বাড়ি। তাই রাকিব কে নিয়ে যাবো। রাতুল কি মনে করবে তার কেয়ার করি না। তারপরও হাজার হোক তার বাবা মারা গিয়েছে। আমি যতদূর সম্ভব ভাল ব্যবহার করবো ভেবে রেখেছি।

১৮
আমি বসে আছি রাকিবের গাড়িতে। যাচ্ছি এয়ারপোর্ট।রাতুল কে রিসিভ করতে। মন ভাল নেই একদম।তারপর রাতুলের কি অবস্থা দেখবো তাও বুঝতে পারছি না।তার বাবা মারা গেছে। মনের অবস্থা কেমন থাকবে। কান্নাকাটি করবে কিনা! রাকিব কে দেখে রাতুলের মনে কোন প্রশ্নের উদ্ভব হবে কিনা তাও বুঝতে পারছি না। সব মিলিয়ে মনে কেমন জানি অস্বস্তি লাগছে। তাও রাকিব আছে সাথে। একা গেলে আরও বিব্রত লাগতো। আচ্ছা এত দিন পর রাতুল কে দেখবো। এক সময় তো তাকে ভালবাসতাম। একদিন দেখা না হলে অস্থির হয়ে যেতাম। সেই আমি রাতুলের সাথে দেখা করতে বিব্রত বোধ করছি। মানুষ আসলেই বদলায়। কারণে অকারণে বদলায়। আমিও বদলে গিয়েছি। এখন দেখার বিষয় রাতুল কতখানি বদলেছে। যাত্রা পথে রাকিব একদম চুপচাপ। সে তো জানে আমার আর রাতুলের সম্পর্কের কথা। কিন্তু সে একবারও আমাকে উলটাপালটা কিছু জিজ্ঞেস করছে না। সে বুঝতে পারছে আমার মনের অবস্থা। এ জন্য কৃতজ্ঞ আমি। শুধু কৃতজ্ঞ না ধন্য এমন জীবন সঙ্গী পেয়ে।
রাতুলের ফ্লাইট ৫ টায়। আমরা ৪.৩০ এর মাঝে এয়ারপোর্টে পৌঁছে গেলাম। বসে আছি কনকরস হলে।ঠিক ৫ টা সময় কাতার এয়ারঅয়েজ ল্যান্ড করেছে।রাতুল কাতার এয়ারে এসেছে। কিছুক্ষণের মাঝেই হয়তো রাতুল চলে আসবে। অপেক্ষা আসলেই বেশিক্ষণ করতে হল না। রাতুল একটা কালো সানগ্লাস পরে আছে। হাতে একটা ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে আসছে। আমি তাকে দেখে হাত নাড়লাম। সেও হাত নাড়লো। মুখে শুকনো হাসি। বুঝলাম জোর করে হেসেছে। আসলে এই পরিস্থিতিতে হাসি আসার কথাও না। রাতুল তেমন বদলায় নাই। আগের মতই আছে। বরং কিছুটা শুকিয়েছে মনে হল।বাইরে এসে আমার দিকে তাকিয়ে বলল
– কেমন আছিস রে?
– ভাল না।বাসায় এমন পরিস্থিতি।
আমি আর কি জিজ্ঞেস করবো ভেবে পাচ্ছি না। যার বাবা মারা গিয়েছে তাকে নিশ্চয় জিজ্ঞেস করা যায় না তুমি কেমন আছ। আমার হটাত মনে হল রাকিবের সাথে তো পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় নাই। আমি রাতুলের কাছে রাকিব কে ইন্ট্রুডিউজ করে দিলাম।
– রাতুল ভাইয়া ইনি রাকিব । আমার সিনিওর ফ্রেন্ড।উনি ডাক্তার। বড় চাচার চিকিৎসার সময় অনেক হেল্প করেছেন। তার গাড়িতেই তোমাকে নিতে এসেছি।
রাতুল হ্যান্ড শেকের জন্য হাত বাড়িয়ে বলল
– নাইস টু মিট ইউ এন্ড থ্যাঙ্ক ইউ।
– সেম হেয়ার
এরপর আর তেমন কথা হল না। আমরা গাড়িতে যেয়ে বসলাম। আমি রাকিবের পাশে বসলাম । রাতুল পিছনে। রাতুলের মুখের এক্সপ্রেশন কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কারন এখনো সে সান গ্লাস খুলেই নাই।
বাড়ি তে নেমে রাতুল কেমন ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো। এত মানুষ সে আশা করে নাই মনে হয়। দৌড়ে উপরে উঠলো । চাচির সাথে দেখা করবে। চাচি তো রাতুল কে দেখে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করলো। এই প্রথম রাতুল সান গ্লাস খুলল। তার চোখ লাল, ফোলা ফোলা । বুঝাই যায় অনেক কান্নাকাটি করেছে। এটা আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখার জন্যই সানগ্লাস পরে ছিল। আমার কাছে সে তার দুর্বলতা দেখাবে না। আমার কেন জানি খুব খারাপ লাগছে। রাতুল কে কক্ষনো বড় হয়ে কাঁদতে দেখি নাই। এই প্রথম দেখলাম।এদিকে আমার হটাত মনে হল রাকিব তো দাঁড়িয়ে আছে। তাকে বিদায় জানানো হয় নাই। আমি নিচে নামলাম।রাকিব নেই। মানে চলে গিয়েছে আমাকে কিছু না বলে,। হয়তো আমাদের ফ্যামিলি গেট টুগেদার এ দাঁড়িয়ে থাকতে অসস্তি বোধ করছিল।
সেই দিন ই বাদ মাগরিব বড় চাচা কে দাফন করা হল আজিমপুর কবরস্থানে।

১৯
২ সপ্তাহ পার হয়ে গেলো বড় চাচার মৃত্যুর। কিন্তু রাতুলের ইউএসএ যাবার কোন নাম নেই। বরং সে সকল মামলা তুলে নিল। বাবার সাথে বসে সম্পত্তির ঝামেলা গুলো মিটিয়ে ফেললো। আমি বেশির ভাগ সময় রাতুলের আড়ালে থাকার চেষ্টা করি। কেমন জানি অস্বস্তি লাগে। এর মাঝে রাতুল যে আমার সাথে কথা বলার খুব চেষ্টা করেছে তাও না। আমার মাঝে মাঝে কেমন জানি অপরাধ বোধ কাজ করে । মনে হয় রাকিবের সাথে রিলেশন যাওয়ার কথা শুনলে যদি রাতুল কষ্ট পায়। তারপরে আবার পরক্ষনে মনে হয় রিলেশন আমি ভাংগি নাই। ভেঙ্গেছে রাতুল। সে কোন যোগাযোগ রাখে নাই। তার জন্য আমার জীবনের অনেক কিছু ওলট পালট হয়ে গিয়েছে। এখন সে যদি কষ্ট পায় তাহলে সেটাই তার প্রাপ্য। আমার কিছুই করার নাই। আবার মনে হয় আদৌ রাতুল কোন কষ্ট পাবে? তার হয়তো কোন রিলেশন আছে ইউএসএ তে। এই কথা ভাবলে কেন জানি আবার খারাপ লাগে। মনে হয় রাতুল আরেক জনের হবে কেন! মানুষের মন কত বিচিত্র।
সন্ধ্যায় নিজের ঘরে বসে পড়ার চেষ্টা করছি। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। পড়ায় মন বসছে না। ইচ্ছে করছে রাকিবের সাথে বৃষ্টি তে ভিজতে। রাকিব কে একটু আগে ফোন দিলাম। ধরলো না। মনে হয় হাসপাতালে ব্যস্ত। একটা রবীন্দ্র সঙ্গীত ছাড়লাম
মন মোর মেঘেরও সঙ্গী
ঠিক এই সময় আবার ফোন আসলো ।রাকিবের ফোন নিশ্চয়। কিন্তু না। আমি হতবাক। রাতুল ফোন দিয়েছে। কতদিন পর রাতুল আমার মোবাইলে ফোন দিয়েছে। আমি কাঁপা কাঁপা হাতে ফোন রিসিভ করলাম। অপর প্রান্ত থেকে রাতুল বলে উঠলো
– হ্যালো
– হ্যালো
– কি করিস?
– পড়ছি। কিছু বলবে?
– হ্যাঁ কিছু কথা ছিল।
– বল
– এখন নয়
– মানে?
– দিয়াবাড়িতে আসতে পারবি কাল বিকেলে
– কেন?
– ওখানেই কথা গুলো বলতাম।
– এমন কি কথা যে দিয়া বাড়িতে বলতে হবে
– আচ্ছা আসতে হবে না তোর
ফোন রেখে দিল রাতুল। রাতুল অভিমান করেছে। কিন্তু অভিমান করা তাকেই সাজে যে ভালবাসে। রাতুল কি তাহলে এখনো আমাকে ভালবাসে। কেন রাজি হলাম না দেখা করতে। কি বলতো আমার জানা দরকার। না আমি ভুল করেছি। রাতুল কে আমার এখুনি ফোন দিতে হবে। আমি দেখা করতে চাই।ফোন দিলাম রাতুল কে
– হ্যালো
– হ্যালো । কি বলবি?
– আমি দেখা করবো কাল।
– ফাইন। তাহলে কাল বিকেল ৫ টায় দিয়া বাড়িতে
– ওকে
রাতুল ফোন রেখে দিল। ফোন রাখার পর আমার মাথায় নানা চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগলো। রাতুল বলতেই আমি রাজি হয়ে গেলাম। রাতুলের কথায় কি জানি ছিল। নাকি আমি রাতুল কে আসলে ভুলতে পারি নাই।আমি ভেবেছিলেম আমি বদলে গিয়েছি। আসলে কিছুই বদলায় নাই আমার। তাই রাতুল ডাকতেই চলে যাচ্ছি। না না এটা ঠিক হচ্ছে না। রাকিবের সাথে আমি কমিটেড। তাকে কষ্ট দেয়ার রাইট আমার নেই। আমি কি করবো তাহলে?আমি যেয়ে উঠানে বসলাম।মনে টানাপড়েন চলছে। আমার সিদ্ধান্ত আমি নিয়ে নিয়েছি। কঠিন সিদ্ধান্ত।

২০
সকালে ঘুম ভাঙতেই মনে পড়লো আজকে দিয়াবাড়ি যেতে হবে বিকেলে। রাতুলের সাথে দেখা হবে। কি এমন কথা বলবে রাতুল আজকে। গতবারের কথা মনে পড়ছে । সেদিন সে আমাকে তার আমেরিকা যাবার সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল। আর আজকে নতুন করে কি জানাবে? আবার রিলেশন করতে চাইবে? কে জানে। আকাশ মেঘলা। আজকে আবার বৃষ্টি পরবে না তো। তাহলেই যাওয়া হয়েছে। প্রায় এক বছর হয়ে গিয়েছে রাতুলের সাথে দিয়াবাড়িতে দেখা করার।এখন নিশ্চয় দিয়াবাড়ি আবার সাদা কাশ ফুলে ঢেকে গিয়েছে। ভাগ্য ভাল আকাশের মেঘ কেটে গিয়েছে। সূর্য মেঘের কোলে উঁকি মেরেছে।আমি ৪ টার মাঝে বের হয়ে গেলাম বাসা থেকে। ১ ঘণ্টা তো লাগবেই পৌঁছোতে। শারদীয় দুর্গা পূজা সামনে। তার প্রস্তুতি দেখলাম রাস্তায়।মনে পরে প্রতি পূজায় আমি রাতুল বের হতাম পূজা দেখতে। আরও কত স্মৃতি মনের এ্যালবামে উঁকি দিচ্ছে। সেই ছোটবেলা থেকে শুরু করে রাতুলের আমেরিকা যাবার আগ পর্যন্ত। নস্টালজিক হচ্ছি আমি প্রতি নিয়ত।
দিয়া বাড়ি পৌঁছে সেই পরিচিত চায়ের টং টা তে গেলাম। দেখি রাতুল আগেই পৌঁছে গিয়েছে। চা খাচ্ছে।আজকের পরিবেশ টা খুব সুন্দর। তেমন রোদ নেই। আবার বৃষ্টিও নেই। সাদা কাশফুলে ছেয়ে আছে চারিদিক। দূরে বড় বড় বিল্ডিং তৈরি হচ্ছে। নতুন শহর হবে এদিকে।কিছু দিন পর হয়তো এখানেও বাড়ি ঘর তৈরি হবে। কাশফুলের এই বন টা আর হয়তো থাকবে না।বিলীন হয়ে যাবে আমার আর রাতুলের সম্পর্কের মত। আমাকে দেখে রাতুল হাসলও। সেই পরিচিত হাসি। রিলেশন থাকতে যে হাসি টা দিয়ে আমাকে ভুলাত ঠিক সেই হাসি। কিন্তু আমার মনের ভিতর এখন ঝড়। রাতুল আর আমার মাঝখানে এখন আরেকজন আছে। রাকিব। আমি চাইলেই তাকে অতিক্রম করতে পারবো না। আমি যেয়ে বসলাম রাতুলের পাশে। কতদিন পর তার গায়ের পরিচিত গন্ধ টা পাচ্ছি।
আমাকে দেখে রাতুল বলল
– কিরে কেমন আছিস?>
– ভাল। তুমি?
– ভাল ।পড়াশোনা কেমন চলছে
– চলছে
– এইবার কিন্তু চ্যান্স পেতেই হবে
– ইনশাল্লাহ পাবো
এরপর নীরবতা। ২ জনের কেউই কথা বলছি না। আমার আশ্চর্য লাগছে। এমন কক্ষনো হয় নাই আমি রাতুলের পাশে বসে আছি অথচ কোন কথা হচ্ছে না। আমি চুপ করে আছি কারণ আমি অপেক্ষা করছি রাতুল কি বলার জন্য আমাকে ডেকে এনেছে তা শোনার জন্য। কিন্তু সে কি কোন কথা খুঁজে পাচ্ছে না বলার মত? আর যে কথা টা বলার জন্য ডেকে এনেছে তা বললেই তো হয়। রাতুলই নীরবতা ভাঙলো
– কিরে চুপ কেন?
– তুমিও তো চুপ। তাছাড়া তোমারি তো বলার কথা আজকে । তাই না?
– হম। তাই বলে তোকে এমন চুপ থাকতে দেখে অভ্যাস নেই তো
– আমারও অনেক কিছুর অভ্যাস ছিল না। কিন্তু করে নিতে হয়েছে।
– তুই তো আমার উপর অনেক অভিমান করে আছিস
– নাহ। অভিমান ছিল। অভিমানে আদ্র হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তা কবেই শুকিয়ে গিয়েছে। এখন আর কোন অভিমান নেই।
– এই কথা গুলোউ কিন্তু অভিমান করার মতই শুনাচ্ছে।
– তোমার বুঝার ভুল।
– আচ্ছা তুই আমাকে ক্ষমা করে দে।
– এটা বলার জন্যই ডেকে এনেছো ?
– না মানে
– ক্ষমা করার মত তো কিছু হয় নাই। আমাদের দুই পরিবারের মতের মিল হচ্ছিলো না। তাই তুমি আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছ। নিজের ক্যারিয়ার গুছিয়েছ।
– দেখ আমি আমেরিকা গিয়েছি ঠিক। কিন্তু একদিনও তোকে ভুলতে পারি নাই।
– মিথ্যা । আমার জীবনে এত বড় দুর্ঘটনা ঘটলো। আমি মেডিক্যাল এডমিশনে চ্যান্স পেলাম না। আর তুমি একদিনও খবর নিলে না। আর তুমি বলছো তুমি একদিনও আমাকে ভুলো নাই। ডাহা মিথ্যা কথা
– তাহলে এখন কেন তোকে ডেকে আনলাম।
– সেটা শোনার জন্যই তো বসে আছি।
– দেখ আমি তোকে এখনো আগের মতই ভালবাসি।আমরা চল আবার আগের মত হয়ে যাই।
আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। এই কথা টা শোনার জন্য কত রাত অপেক্ষা করেছি। কিন্তু যখন আর শোনার দরকার নেই তখনই এই কথা টা শুনতে হল। আমার চোখ থেকে অজান্তে পানি চলে আসলো। আমি চোখের পানি লুকানোর জন্য অন্য দিকে তাকালাম। কালকে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছি যে রাতুল রিলেশন আবার পুনর্জীবিত করতে চাইলেও আমি রাজি হব না। কারণ তাতে রাকিবের প্রতি অন্যায় করা হবে। আমি জানি রাতুল কে আমি ভালবাসি। কিন্তু এখন কোন উপায় নেই। আচ্ছা এক সাথে কি দুজন কে ভালবাসা যায়? তাহলে রাকিবের প্রতি আমার অনুভূতি কি। আমি কি রাকিব কে ভালবাসি । আমি রাকিবের উপর ভরসা করি। শ্রদ্ধা করি। বিশ্বাস করি। শ্রদ্ধা , বিশ্বাস এবং ভরসার অপর নাম কি ভালবাসা নয়? জানি না। মানুষের মনোজগৎ অনেক বিচিত্র। এর রহস্য মনোবিজ্ঞানীরাউ খুঁজে পায় নাই। আর আমি তো নগণ্য এক তরুণ। আমি চোখ মুছে রাতুলের দিকে তাকিয়ে বললাম
– এখন আর সম্ভব নয়। আমি এনগেজড।
– মানে?কার সাথে? কবে?
– রাকিবের সাথে। ৬ মাস হবে।
রাতুল কিছু বলছে না। মাথা নিচু করে চুপ করে আছে। আমি কি বলবো ভেবে পাচ্ছি না।রাতুল ই নীরবতা ভাঙলো। বলল
– কংগ্রাচুলেশন। অবশ্য এত তাড়াতাড়ি আমাকে ভুলে যাবি ভাবতে পারি নাই। যাই হোক তোরা ভাল থাক।
আমি চুপ করে রইলাম। কি উত্তর দিব। রাতুল ব্যাগ থেকে একটা ডায়রি বের করলো। রাতুল বলল
– তুই আমাকে মিথ্যাবাদী বলেছিস না? আমি যে তোকে ভুলি নাই তার প্রমাণ এটা।
– এখানে কি আছে?
– এই ডায়রি তে খুব কাঁচা হাতের কিছু কবিতা আর চিঠি আছে। বিদেশে একাকি রাত হলেই তোর কথা খুব মনে পড়তো। অনেক যন্ত্রনা হত। ইচ্ছা হত তোকে ফোন করি। কিন্তু আব্বা বেঁচে থাকতে তোর সাথে আমার রিলেশন সম্ভব ছিল না। তাই তোকে ফোন দেই নাই। ফোন দিলে তোকে মিথ্যা আশা দেয়া হত। আমি বরং চেয়েছিলাম তুই আমাকে ভুলে যা। আর আমি আমার যন্ত্রণা লাঘব করার জন্য এই ডায়রি তে তোকে নিয়ে চিঠি আর কবিতা লিখতাম। কাউকে তো আমার যন্ত্রণার কথা বলতে পারতাম না। তাই ডাইরিতেই লিখতাম।
আমি ডাইরিটা হাতে নিলাম। আসলেই ডাইরির পাতা জুড়ে অনেক কবিতা আর চিঠি। রাতুল বলল
– আমি তাহলে যাই । তুই ভাল থাকিস’
আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল আমি রাতুল কে থামাই। বলি চল আগের মত হয়ে যাই। কিন্তু তা কি সম্ভব!
রাতুল আমাকে একা রেখে চলে গেলো। আজকেও সেদিনের মত আকাশ লাল হয়ে আসলো। সেদিনের মত একা কাশ বনে বসে রইলাম সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত। হাতে রাতুলের ডায়রি। আমার কান্না আসছে না। কিন্তু মনে হচ্ছে কাঁদতে পারলে ভাল হত। বাসে উঠে প্রথম আমার চোখ থেকে পানি পড়লো।

২১
বসে আছি টিএসসি তে। রাকিব আসতে বলেছে। খুব জরুরি দরকার নাকি। রাকিবের গলার স্বর কেমন অন্যরকম শোনাচ্ছিল। মনে হচ্ছে কোন কারণে আপসেট। আমিও আপসেট। আমি কাল সারা রাত ভেবেছি। আমার মনে হয়েছে আমি আসলে রাতুল কেই ভালবাসি । রাকিব কে নয়। কাউকে না ভালবেসে রিলেশনে থাকা টা তো তার সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করা। আজকে আমি রাকিব কে সব বলে দিবো। বলে দিবো যে আমি রাতুল কে ভালবাসি। তারপর রাতুলের কাছে ফিরে যাবো। কালকে সারা রাত রাতুলের ডাইরিটা পড়েছি। একেকটা পাতা পড়েছি আর চোখ থেকে পানি পরেছে।
প্রায় আধা ঘণ্টা হয়ে গিয়েছে রাকিব আসছে না। ফোন দিলাম।রাকিব ফোন ধরলো
– এইতো এসে পরেছি। আর ৫ মিনিট।
– ওকে
ঠিক পাঁচ মিনিট পর রাকিব কে দেখলাম হন্তদন্ত হয়ে আসছে। আমার খুব গিলটি ফিলিংস হচ্ছে। কিভাবে রাকিব কে না করবো। তার প্রতি অনেক বড় অন্যায় করলাম। রাকিব কি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে কোন দিন?রাকিব এসে আমার পাশে বসলো। বলল
– অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখেছি না?
– না ঠিক আছে।
– তোমাকে একটা কথা বলার জন্য ডেকেছি।
– আমারও তোমাকে কিছু বলার আছে।
– কি কথা?
– আগে তুমি বল।
– শোন খুব খারাপ খবর। মায়ের তো কয়েকদিন যাবত শরীর টা খুব খারাপ যাচ্ছিলো। আমার এক স্যার কে দেখালাম। তিনি কিছু টেস্ট করতে দিয়েছিলেন। আজকে রিপোর্ট গুলো হাতে পেলাম।
– কি পেয়েছো রিপোর্টে ?
– মায়ের ক্যান্সার ধরা পরেছে
রাকিবের চোখ থেকে পানি পরছে।আমি সান্ত্বনার হাত রাখলাম রাকিবের ঘাড়ে।রাকিব বলছে
– আমার খুব খারাপ লাগছে অর্ণব। মা আমাকে ছেড়ে সারা জীবনের মত চলে যাবে ভাবতেই কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। অর্ণব তুমি কিন্তু আমাকে ছেড়ে যেও না প্লিজ।
আমি কি বলবো । আমার আর আমার কথা বলা হল না। রাকিবের এই অবস্থায় আমি তাকে ছেড়ে যেতে পারি না। এটা অনেক বড় অন্যায় হবে।

২২
রাতুল আজকে আমেরিকা চলে যাবে।বড় চাচিও সাথে যাচ্ছেন। চিরদিনের জন্যই চলে যাচ্ছে রাতুল। আর মনে হয় না ফিরবে। বাড়ি টা ছাড়া তার ভাগের জমিজমা সব বিক্রি করে দিয়েছে রাতুল।এই কয়দিন আমার মনে ঝড় বয়ে গিয়েছে। কতবার মনে হয়েছে রাতুল কে বলি আমি তোমাকে ভালবাসি আমি তোমার সাথে থাকতে চাই। কিন্তু ততবার বিবেক আমাকে বাঁধা দিয়েছে। আনটির ক্যান্সার ধরা পরার পর রাকিব একদম ভেঙ্গে পরেছে। তাকে এই অবস্থায় আমি ছেড়ে যেতে পারি না। সৃষ্টিকর্তা আমার সাথে এ কি খেলা খেলছেন।
রাতুল আর বড় চাচি আসলেন আমাদের কাছে বিদায় নিতে। আমি না করে দেয়ার পর রাতুল আমেরিকা চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিল। কার জন্য সে দেশে থাকবে। বড় চাচি মা কে জড়িয়ে ধরে খুব কান্নাকাটি করলেন। কম দিন তো না। ৩০ বছরের সংসার।আর এই ৩০ বছরের সঙ্গী আমার মা। তাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আবার কবে দেখা হবে। হয়তো আর দেখাই হবে না।
রাতুলের চোখেও পানি। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আর হয়তো কোন দিন রাতুল কে দেখতে পাবো না। হয়তো আমেরিকায় যেয়ে সে নতুন সঙ্গী খুঁজে নিবে। আমাকে ভুলেই যাবে। আমার চোখেও পানি চলে আসলো। বড় চাচি আমাকে জড়িয়ে ধরেও কাঁদলেন কিছুক্ষণ। যাবার আগে রাতুল একবার আমাকে হাগ করলো। শেষবারের মত স্পর্শ পেলাম রাতুলের। তারপর রাতুল গেট দিয়ে বের হয়ে গেলো। আমি ছাদে উঠলাম । একা একা ছাদে সময় কাটাবো। হাতে রাতুলের ডাইরি। অনেকবার পড়েছি এই ডাইরি। যতবার পড়েছি কেঁদেছি। আজকে আবারো পড়বো।

২৩
আন্টি মানে রাকিবের মা কে দেখতে যাচ্ছি। আন্টি নাকি আমাকে দেখতে চেয়েছে। একজন মৃত্যু পথযাত্রি মানুষ কে দেখতে যাচ্ছি। ভাবতেই কেমন লাগছে।আমরা সবাই একদিন মারা যাবো এই কথা গুলো মনে পড়ে যাচ্ছে। রাকিবের গাড়ি তে করে যাচ্ছি। তিস্তায় এসে গাড়ি থামালও রাকিব।দ্বিতীয় বারের মত এসেছি রাকিবের বাসায়। আজকে রাকিব আমাকে সরাসরি আন্টির শোবার ঘরে নিয়ে গেলো। আন্টি বিছানার উপর শুয়ে আছেন। বিছানার চাদর সাদা ধবধবে। পাশেই চেয়ার রাখা।দেয়ালে একটা এলইডি টিভি।আন্টি টিভি দেখছিলেন শুয়ে শুয়ে।আন্টি কে সেদিনের থেকে আজকে অনেক রোগা লাগছে। চোখের নিচেও কালি পরেছে। আমাকে দেখে শুকনো হাসি হাসলেন আন্টি।আমি সালাম দিলাম।আন্টি আমাকে বললেন
– অর্ণব বস আমার পাশে।
আমি বসলাম।রাকিব দাঁড়িয়ে আছে। আন্টি রাকিব কে বললেন
– রাকিব নিচের কনফেকশনারি থেকে কিছু নাস্তা নিয়ে আয়। আমার শরীর এত খারাপ হয়ে গিয়েছে যে কিছু নাস্তা বানাবো অর্ণবের জন্য সে শক্তিও নেই।
আমি বললাম
– আনটি নাস্তা আনা লাগবে। আমি তো আপনাকে দেখতে এসেছি
– না বাবা কিছু আনুক। তুমি না খেয়ে গেলে আমার খারাপ লাগবে। তাছাড়া ওষুধ ও শেষ। ওর ওষুধ আনতে নিচে ফারমাসি তে যেতেই হবে।
রাকিব চলে গেল। ঘরে আমি আর আন্টি।আনটি আমাকে বললেন
– বাবা শুনেছও তো আমার রোগের কথা।
– জি
– আমি হয়তো আর বড় জোর কয়েক মাস বাঁচবো।
– কি বলেন আন্টি। চিকিৎসা করলে আপনি পুরো সুস্থ হয়ে যাবেন ইনশাল্লাহ।
– না বাবা। আমি বুঝে গিয়েছি আমি বেশি দিন নেই। ডাক্তাররা যে খুব আশা দিচ্ছে তা তো নয়। আমি বুঝে গিয়েছি আমি আর নেই।
আমি কি বলবো । চুপ করে রইলাম। আন্টির চোখ থেকে পানি পরছে।তিনি চোখ মুছে বললেন
– বাবা কত শখ ছিল আমার। কোন কিছু পূরণ হল না। তাতে আফসোস নেই। কিন্তু আমি মারা গেলে এই পরিবার টা ধ্বংস হয়ে যাবে। রাকিবের ভাই মাত্র ক্লাস সেভেনে পরে। রাকিবের আব্বা হার্টের রোগী।নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। এদের কে দেখে রাখবে বল।আমি রাকিবের সমস্যার কথা জানি। তাই কখনো বিয়ের জন্য প্রেসার দেই নাই। কিন্তু এখন কোন উপায় নাই। আমি মারা যাবার আগে পরিবার টা গুছিয়ে রেখে যেতে চাই। এখন একটাই উপায় তা হল রাকিব কে বিয়ে দেয়া। তার বউ এসে সব গুছিয়ে নিবে।
আমি হতবিহবল হয়ে পরলাম। এসব কি বলছে আন্টি। আমাকে এসব বলার জন্যি ডেকে এনেছে।আমাকে চুপ থাকতে দেখে আন্টি বললেন
– তুমি কষ্ট পেয়েছ জানি।কিন্তু আমার কোন উপায় নেই বলতেই হবে। তুমি থাকলে রাকিব কক্ষনোই বিয়ে করতে রাজি হবে না। আমি তো তোমার মায়ের মত। মনে কর মা ই। তুমি রাকিব কে ছেড়ে দাও বাবা। তোমার কাছে হাত জোর করছি।
আমার কাছে পুরো সিনেমাটিক মনে হচ্ছে আন্টির কথা গুলো। আসলেই কোন বাবা মা বোধ হয় মন থেকে সমকামিতা মানতে পারে না। যতই সামনাসামনি বলুক না কেন। সব বাবা মায়ের স্বপ্ন থাকে তার ছেলে বিয়ে করবে। আমার আর আন্টির প্রতি কোন শ্রদ্ধা রইলো না। ভেবেছিলেম তিনি অন্যরকম। কিন্তু আসলে তিনি আর সকল সাধারণ মা দের মত। আমাকে চুপ থাকতে দেখে বেশ কর্কশ স্বরে তিনি বললেন
– তুমি আমার কথা না শুনো কিন্তু এই কথা গুলো যে তোমাকে বলেছি তা রাকিব কে বল না।
বাহ তিনি এখনো রাকিবের সামনে ভাল সাজতে চাইছে। আমি বললাম
– আমি কিছুই বলবো না।
এরপর আন্টি আমার সাথে আর একটা কথাও বললেন না। রাকিব আসলো কিছুক্ষণের মাঝেই। এক গাদা নাস্তা নিয়ে এসেছে। কিন্তু আমার কোন কিছুই খেতে ইচ্ছে করছে না। তারপরও একটা কেক খেলাম। এরপর আমি রাকিব কে বললাম
– আমি উঠবো
রাকিব বলল
– আমি নামায় দিয়ে আসি।
আমি বললাম
– না আমি একাই যাবো।
রাকিব আর জোরাজুরি করলো না।
২৩
রাতে রাকিব ফোন দিল। খুব আপসেট।সে ফোন দিয়ে বলল
– মা খুব জোরাজুরি করছে বিয়ে করার জন্য।এমনকি বাবাউ বলছে একই কথা।
– আমি জানি
– তুমি কিভাবে জানো ?
– না অনুমান করলাম আর কি।তো বিয়ে করবে?
– মাথা খারাপ। বেশি প্রেসার দিলে বাসায় যাওয়া ছেড়ে দিব। নতুন বাসা নিবো । একা থাকবো।
– আন্টির এই অবস্থায় তাকে ছেড়ে থাকতে পারবা।
– তাহলে কি করবো ?
– আমি বলি কি তুমি বিয়ে করে ফেলো ।
– মানে?
– বিয়ে কর। তোমার পরিবার কে দেখে রাখার জন্য তো একটা বউ দরকার।
– তোমার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে।
রাগ করে ফোন রেখে দিল রাকিব। আমি সারা দিন ভেবেছি। আসলেই কি রাকিব এর মা না চাইলে আমি কি রিলেশন রাখতে পারবো। আমি আর কোন দিন রাকিবের বাসায় যাওয়া তো দুরের কথা তার মায়ের সামনে দাঁড়াতে পারবো না। আর সত্যি কথাই তো ওদের পরিবারে একটা বউ দরকার। আমার জন্য একটা পরিবার ধ্বংস হয়ে যাবে এই দায় ভার আমি নিতে পারবো না। আমার রাকিবের থেকে দূরে সরে যেতে হবে অনেক দূরে।

২৪
আজকে রাকিবের বিয়ে। আমি রাকিব কে বলেছি আমার আর রাতুলের মাঝে সম্পর্ক ঠিক হয়ে গিয়েছে। আমার পক্ষে আর তার সঙ্গে রিলেশন রাখা সম্ভব নয়। পুরো মিথ্যা কথা। কিন্তু এই কথা গুলো না বললে রাকিব বিয়ে করতে রাজি হত না। আমি জানি রাকিব এখন কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু আমি থাকলে কক্ষনোই সে সুখি হতে পারতো না। রাকিবের বাবা মা আমাকে মেনে নিতে পারে নাই।তাদের কে ছেড়ে রাকিব আলাদা বাসা নিয়ে থাকবে শুধু আমার জন্য এটা আমি কিভাবে মেনে নেই। দুই জন অসুস্থ মানুষ আর একটা নাবালক ভাই। তাদের কে ছেড়ে রাকিব আলাদা থাকবে তা আমার বিবেকে বাধা দেয়। তাই আমি সরে এসেছি রাকিবের কাছ থেকে।
আমি রাকিবের বাসার সামনে দাড়িয়ে আছি। পুরো বাড়ি আলোক সজ্জা করা হয়েছে। দূর থেকে রাকিবের বাসার আলোকসজ্জা দেখি। আজকে রাকিব আরেকজনের হয়ে যাবে। তার একটা পরিবার হবে। বেবি হবে। এক সময় আমার কথা পুরোপুরি ভুলে যাবে। আজকে ফেসবুকে রাতুল তার বফ এর ছবি পাঠিয়েছে আমাকে। সেও আমাকে ভুলে যাবে একদিন। আসলে আমাদের দেশে আমাদের মত সমকামি দের জীবন এমনি। এই কারো হলাম। আবার কয়েকদিন পর আবার একা। শত শত বছর ধরে এভাবেই চলে আসছে। হয়তো আরও শত বছর এইভাবেই যাবে। হটাত একটা ফোন আসলো। আননোন নাম্বার।
– হ্যালো
– হ্যালো
– কে বলছেন
– আমার নাম তুষার। আপনি আমাকে চিনবেন না।
– কি বলতে চান?
– আপনার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাই……………………
আমি ফোন রেখে দিলাম। জীবন আমার সাথে আর কত খেলা খেলবে ।

লেখকঃঅরণ্য রাত্রি

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.