ডিসেম্বরের শহর

ক্যামন করেই যেন তার সাথে পরিচয়। পরিচয়ের পেছনে ছিলো এক আকাশ ভালোলাগা। ফেসবুকের ভালোলাগা গড়াতে গড়াতে একদিন টুপ করে সে বললো
“চলোনা দেখা করি।”

তখন আমার মনের ঘাটে বাঁধনভাঙা খুশির রোল পড়েছে। প্রথম বার তার দেখা পাবো। শরৎকালের আকাশ। তবুও মেঘহীনই ছিলো বলা চলে। ৩ টা বাজে আমি বের হলাম। ট্রেনে উঠার আগেই একদফা বৃষ্টিতে ভেজা হয়ে গেলো।

এক্কেবারে বলদ হয়ে গেলাম বৃষ্টি দেখে! একেবারে কুকুর বেড়াল বৃষ্টি! নাই মেঘ তার উপর বৃষ্টি। কি আর করা। এসে পৌছালাম কমলাপুরে। প্ল্যাটফর্মে দাড়িয়ে আছি। দাঁড়িয়ে থেকে সময় নষ্ট হচ্ছিলো বলে মনে হলো! তাই প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে ওভারব্রীজের দিকে দৌড়াতে লাগলাম। পুরো কাকভেজা অবস্থা আমার। রুমাল দিয়ে শরীর শুকানোর বৃথা চেষ্টা চলছিলো আর কি। বাসে উঠেও ফ্যানের নীচে দাড়াতেই পারছিলাম না এতো ঠেলাঠেলি! তার মধ্যে উনাকে ফোন দিয়ে জানালাম মালিবাগ রেলগেইট ক্রস করবো।

টেনশন লাগছিলো খুব সত্যি বলতে। ড্রেসআপ বাজে তার উপর ভিজে অবস্থা বেহাল! ঢাকা আমার তখনো আনাগোনা কম! অনেক ভেবে চিন্তা করে বললাম তাকে মালিবাগ ব্রীজের নিচে আসতে। আমি দাঁড়িয়ে ভাবছি করবোটা কি আমি? কারণ, আমাদের কথাবার্তা অনেক গভীর ছিলো। তাই বলা যায় ফার্স্ট মিট আর ডেটও ছিলো ইহা। তাকে ফোন দিলাম! প্যারা দিয়েছি ভালো রকমের! ১৫ মিনিট ধরে তাকে রামপুরা ঘুরানো হয়েছে বলা যায়। লাস্ট যখন বললাম ‘আরো কি সময় লাগবে?’ বললো, ‘পিছনে ফিরে দেখেছো?’। তাকাতেই দেখলাম মুখে মিষ্টিমাখা এক হাসি দিয়ে সে আমার সামনে দাঁড়ানো। সাত-পাঁচ না ভেবে জড়িয়ে ধরলাম।

হাত দিতেই সে জিজ্ঞেস করলো ‘ভিজে আসছো দেখি?’ তারপর সব বললাম। আমার হাতে একটা ব্যাগ দিলো তাতে এক বক্স চকোলেট, ২ টা ছোট ক্যাটবেরী আর ২ টা কিটক্যাট ছিলো। আমার চকোলেট খুব প্রিয় হলেও সে খেতো না। তার সবথেকে অপ্রিয় খাদ্য ইহা!

আমরা আফতাবনগরের দিকে হাটছিলাম। কিছুটা ভালোলাগা, আঙুলে আঙুল ছোঁইয়ে আমরা তখন চেনা শহর থেকে দূর। রাস্তায় আমাদের কতো কথা! পৌছালাম আমরা আফতাবনগরে। সেখানে কাশফুল দেখছিলাম! তার ফোনে ছবি তুললাম। আমারো কয়েকটা ছবি তুলে দিলো। বাতাসে শারদ আগমনী।

আমরা এক পিলারের উপর বসে পুরোটা বিকেল উপভোগ করলাম। গান শুনছিলাম মিনারের। তার আর আমার মিনারের গান প্রিয় ছিলো। সন্ধ্যা গড়িয়ে এলো। উনার পরেরদিন প্রেজেন্টেশন ছিলো। আমরা হাটা শুরু করলাম রিক্সার জন্য! রিক্সায় উঠার পর হয়তো সে দ্বিধাবোধ করছিলো। মানুষ হিসেবে সে খুব নিরবপ্রকৃতির তা আবিস্কার করলাম। চোখে চোখ রেখে কথা বলতে সে পারে না সে। একপ্রকার জোর করেই বললাম চোখে চোখ রেখে কথা বলুন।

সে বললো, ‘শরম পাই’।

হাসলাম আমি। সন্ধ্যা নামার আগে সে বললো ‘আচ্ছা, একটা শব্দ বলি দেখো তো এর অর্থ পারো কি না?’। হেসে বললাম, ‘আমি ইংরেজি কম পারি’। উনি বললো, ‘টি-আমো এর অর্থ জানো?’। আমি বললাম, ‘ইহা কোন ভাষার শব্দ?’ উনি বললেন,’এটা স্পেনিশ শব্দ’। আমি বললাম, ‘বাঙালী ইংলিশ পারি না আবার স্পেনিশ’ বলেই হাসতেছি। সেও হাসলো আমার সাথে আর বললো, ‘এতো হাসাও কেমনে?’। আমি বললাম, ‘পারি আর কি’। সে বললো, ‘তুমি বলো টি-আমো’। বললাম ‘টি -আমো’। সে বললো, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’। চেয়ে রইলাম তার দিকে। আমিও বললাম, ‘ভালোবাসি গুলু আপনাকে’।

কথা কথাই রয়ে গেলো। আজ আমাদের দুজনের পথ দুইটি। তার সাথে আমার যোগাযোগ নেই প্রায় ৬ মাস হতে চললো। এর মধ্যে সে একটিবারের জন্যও যোগাযোগের চেষ্টা করে নি। ভালো থাকবেন গুলু যেমনই থাকুন। আমার অবস্থা আর নেই আগের মতো। কিসব করে বেড়াচ্ছি তা আর নাই বা বললাম।

জানেন গুলু,
এক বহুতল ভবনের বারান্দায় দাড়ানো। এখানে ডিসেম্বর। চারদিকে বিরহী হাওয়া ভাঙনের গীতে সুর তুলে। বিকেলে নিচে সব ছেলেমেয়ের আনন্দকলরব। যেন এপ্রিলের পাইনের সুভাসে এ শহর মাতোয়ারা। কিন্তু আমার মন নির্জীব এক ডিসেম্বরের দিনের মতো। এক ডিসেম্বরের শহরের জাগতিক বেদনা পুষছি ।পৃথিবী গোল। কালের পরিক্রমায় হয়তো আমাদের কখনো দেখা হবে। জানি না আমি আপনার সামনে দাড়াবো কি না বা আপনি আমার সাথে কথা বলবেন কি না? সেদিনও আমার মনে মিনারের ‘শপথ’ গানখানা বাজবে।

‘সবকিছু আছে আগেরইমতো,
শুধু হারিয়ে গেছে দুজনের দু’টো পথ।
জানি না ভুলে গেছো কি তুমি?
আমি ভুলিনি সেদিনের নেয়া শপথ।

লেখকঃ তানভীর নাদিম

প্রকাশেঃ সাতরঙ্গা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.