তৃতীয় পুরুষ

বৃষ্টি শুরু হয়েছে। মার্চ মাসের শুরুর দিকে সাধারণত বৃষ্টি হয় না।
অপু মাঠের দিকে দৌড় দিলো। গরুগুলা এখনই না তুললে ভিজে জবজবে হয়ে যাবে। আশ্চর্য! এরই মধ্যে আকাশ ঘন কালো মেঘে ছেয়ে গেছে। গরুটাও ডাকতে শুরু করেছে। খুঁটি থেকে গরুটাকে ছাড়িয়ে অপু বাড়ির দিকে আসতে লাগলো। তার পা কাদায় মাখামাখি হয়ে গেছে। মাথার চুল ভিজে গেছে।
কাঁচা রাস্তায় উঠে সে একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখলো। শফিক ভাই আসছে। বড় একটা মানকচু গাছের পাতা ছিঁড়ে- সেটাকে ছাতার মতো করে শফিক ভাই ধরে রেখেছে। তারপরেও বেচারা এরই মধ্যে ভিজে গেছে।
অপুকে দেখে শফিকের নজর এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলো। অপু মনে মনে বলতে থাকলো, “ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি”
কিন্তু বাইরে বললো, “আরে! শফিক ভাই! হঠাৎ কোত্থেকে?”
শফিক হেসে বললো, “বাড়ির কথা খুব মনে পড়ছিলো রে। আর মা চিঠি পাঠয়েছে। মায়ের নাকি শরীর খারাপ।”
অপু মনে মনে বললো, “এসেছ ভালোই করেছ। তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছিলো।”
আর বাইরে বললো, “হ্যাঁ। চাচী সেদিন নাকি কলতলায় পা পিছলে পড়ে গিয়েছিলো। সেদিন তো দেখে আসলাম। বাম পায়ে কালসিটে পড়ে গেছে।”
শফিক বললো, “যাই রে। তুই-ও বাড়ি যা। বৃষ্টিতে ভিজছিস কী জন্য? গাধা ছেলে!”
গরু নিয়ে অপু বাড়ির দিকে যেতে লাগলো। তার মুখ হাসি হাসি। এতো খুশি কেন লাগছে কে বলবে?
বাড়ি ফিরে অপু গোয়ালঘরে গরুটা বেঁধে রাখলো। রান্নাঘরে মা রান্না করছে। বাড়ির পুরো উঠান বৃষ্টিতে ভিজে ভয়ানক পিচ্ছিল হয়ে গেছে। অপু পা টিপে টিপে রান্নাঘরে গেল। অপুর মা জাহেদা তরকারি চুলায় দিয়েছেন। ভাত রান্না হয়ে গেছে। আজকের আয়োজন সামান্য। আলু চিকণ করে কেটে ভাজি করা, সরিষা বাঁটা দিয়ে নতুন সজনেডাঁটার তরকারি। অপুকে দেখে জাহেদা বললেন, “কীরে গোসল করেছিস? যা পুকুর থেকে গা ধুয়ে আয়। বাঁদর ছেলে।”
অপু আবার বাড়ি থেকে বের হয়েছে। তার ইচ্ছা করছে শফিক ভাইয়ের বাড়িতে যেতে। মানুষটার দিকে শুধু তাকিয়ে থাকতেই ইচ্ছা করে। বৃষ্টির বেগ আরো বাড়ছে। আজ বৃষ্টিতে ভিজতেও ভালো লাগছে। অপু পুকুরের দিকে এগুলো। বাঁধানো সিঁড়ি ডিঙিয়ে পানিতে নামলো। বৃষ্টির মধ্যে পুকুরে গোসল করার আনন্দটা বেশিরভাগ মানুষই জানে না। অসময়ের কিছু শাপলা ফুটে আছে পুকুরে। অপু সাঁতরে গিয়ে একটা শাপলা টান দিয়ে তুলে ফেললো।

*
সেদিন রাতে পুরনো বটগাছের নিচে গানের আসর বসলো। জাহেদার হাঁটুর ব্যাথা বাড়ছে। অথচ অপু কিছুতেই বাড়িতে থাকবে না। ছেলেটাকে তিনি বারবার যেতে বারণ করলেন। অপু নাছোড়বান্দা।
বটগাছের নিচে হ্যাজাক লাইট জ্বালানো হয়েছে। মুন্সি আবদুল বয়াতিকে ডেকে আনা হয়েছে। দলবল নিয়ে তারা গান করছে। অপু খেয়াল করলো ভীড়ের মধ্যে শফিক ভাইও আছে। শফিক ভাইয়ের সঙ্গে আছে রাশেদ ভাই আর সুমন দা। তারা তিনজনেই একসঙ্গে দাঁড়িয়ে গান শুনছে। আর নিজেদের মধ্যে কী যেন বলছে। অপুর ইচ্ছা করছে শফিক ভাইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে। শফিক ভাই কী যেন বলছে আর হাসছে। অপু মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। মানুষটার হাসি দেখতে এতো ভালো লাগছে কেন?
অপু মনে মনে বলতে লাগলো, “শফিক ভাই, আমার দিকে একবার তাকাও। আমার দিকে একবার তাকাও।”
বেশ কিছুক্ষণ পর সত্যি সত্যি শফিক অপুর দিকে তাকালো। অপু দ্রুত চোখ সরিয়ে সামনের দিকে তাকালো। গানবাজনা কিছুই তার কানে এখন ঢুকছে না। অপু আবার চোখের কোণ দিয়ে শফিকের দিকে তাকালো। আশ্চর্য!? মানুষটা এখনও তার দিকেই তাকিয়ে আছে! অপু মুখ টিপে হাসতে লাগলো। যতটা সম্ভব চেষ্টা করলো খুশি খুশি ভাবটা কমাতে। কিন্তু সে পারছে না৷ তার মুখে এখন মুচকি হাসি। গভীর আনন্দ নিয়ে সে গান শুনতে লাগলো।
খোলা মাঠের মধ্যে বটগাছ। শেষ ফাল্গুনের শীতল অথচ মিষ্টি বাতাস আসতে শুরু করেছে। শীত করছে, অথচ খুব বেশি শীত নেই। এই অলৌকিক পরিবেশের সঙ্গে মুন্সি আবদুল বয়াতির গান চমৎকার মিলে গেছে৷ সে গাচ্ছে-
“ও কী ও বন্ধু কাজল ভ্রমরা রে,
কোনদিন আসিবেন বন্ধু,
কয়া যাও, কয়া যাও রে।”
*
পরদিন বিকালে অপুদের বাড়িতে হঠাৎ করেই শফিক এলো। অপু হতভম্ব। তার ভয় ভয় করতে লাগলো। শফিক ভাই আবার বাড়িতে কিছু বলে দেবে না তো? বাস্তবে অবশ্যি সেরকম কিছু ঘটলো না। শফিককে দেখেই অপুর মা জাহেদা খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলেন। শফিককে তিনি কী খেতে দিবেন, কোথায় বসতে দেবেন কিছুই বুঝতে পারলেন না। ঢাকায় ছেলেটা কী খায় না খায় তার তো ঠিক নেই।
শফিককে পিড়ায় বসতে দিয়ে তিনি ঘরের মধ্যে দ্রুত পায়চারি করতে লাগলেন। বাড়িতে এক টিন মুড়ি ছিলো৷ মুড়ি তো থাকার কথা৷ পাটালি গুড় আছে৷ গুড়ের চা বানালে ছেলেটা নিশ্চয়ই আগ্রহের সঙ্গে খাবে। ইশ! মোয়া ফুরিয়ে গেছে। মোয়া থাকলে ভালো হতো। বরইয়ের আচার আছে৷ এটা দেয়া যায়। যদিও শফিক বারবার বলছে ব্যস্ত না হতে। কিন্তু, জাহেদা ব্যস্ত না হয়ে পারছেন না।

অপু গিয়ে শফিকের পাশে বসলো। মনে মনে বললো, “কাল তুমি ওরকম ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে ছিলে কেন আমার দিকে?”
বাইরে বললো, “আকাশের চাঁদ দেখছি আজ মাটিতে নেমে এসেছে। মা কিন্তু আপনার কথা মাঝেমাঝেই বলে৷ এসেছেন ভালোই করেছেন।”
শফিক বললো, “হ্যাঁ। আচ্ছা শোন্, নৌকায় করে নদী বেড়াবি? খুব নদীর দিকটায় যেতে ইচ্ছা করছে।”
অপু মনে মনে বললো, “হঠাৎ আমাকে একলা নিয়ে যেতে চাচ্ছ কেন? বদ মতলব নেই তো?”
আর বাইরে বললো, “যাওয়া যায়। আপনি একটু বসুন। মা সম্ভবত আপনাকে কিছু না খেতে দিয়ে বাড়ি থেকে বের হতে দিবে না।”
নদীর পাড়ে এসে অপুর অসম্ভব রকম আনন্দ লাগছে। আসার সময়ও একটা মজার ঘটনা ঘটলো। অপু পা পিছলে পড়ে যাবে যাবে এমন সময় শফিক অপুর হাতের কব্জি শক্ত করে ধরে ফেলল। ওই মুহূর্তে মানুষটার মুখে ছিলো স্পষ্ট শঙ্কা।
অপুর খুশিতে লাফালাফি করতে ইচ্ছা করছে। খুব জোরে একটা চিৎকার দিতে ইচ্ছা করছে৷ নদীর পাড়ে চিৎকার করে কিছু বললে মজার একটা ব্যাপার ঘটে। কথা প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে। সে যদি এখন জোরে বলে ওঠে “ভালোবাসি”, তাহলে এই কথাটাও প্রতিধ্বনিত হয়ে বার বার ফিরে আসবে।
কিন্তু, কথাটা বলা যাচ্ছে না। কারণ, শফিক তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে৷ শফিক বললো, ” কীরে তোর মুখ এরকম হাসি হাসি কেনো?”
অপু বললো, “আমার হাসতে ভালো লাগে তো এইজন্যে।”
নৌকায় চড়া হলো না। চৈত্রের শুরুতে নদীতে পায়ের পাতা ভেজার মতো পানি থাকে। এতো কম পানিতে নৌকা ভাসানোর কথা চিন্তাই করা যায়। অপু সেই পানির ভেতরে হাঁটছে। পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত পানিতে ডুবে গেছে। এতো ভালো লাগছে! শফিক ভাইয়ের গল্পগুলা শুনতেও ভালো লাগছে। মানুষটার গল্পের বেশিরভাগ অংশজুড়ে আছে দেশের বর্তমান অবস্থা। শফিক অপুকে জিজ্ঞেস করলো, “হ্যাঁরে, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ কিছু শুনেছিস? নাকি সারাদিন এভাবে লাফিয়ে বেড়াস?”
অপু রেডিওতে ভাষণ শুনেছে। কিন্তু মানুষটাকে রাগানোর জন্য বললো, “না তো! কেন ভাই?”
আশ্চর্যের ব্যাপার, মানুষটা রাগলো না। বরং হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে সব বুঝিয়ে বলতে শুরু করলো। অপু মানুষটার দিকে তাকিয়ে আছে৷ এতো সুন্দর গলার স্বর কীভাবে হয়? তার ইচ্ছা করছে মানুষটাকে জাপটে ধরতে। মানুষটার কোনো কথাই সে মনোযোগ দিয়ে শুনছে না৷ এই ফাঁকে মানুষটার হাত ধরে ফেলতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু, সে জানে কাজটা করা তার পক্ষে সম্ভব না। তারপরেও ইচ্ছা করছে।
শেষ বিকালের রোদ এসে তাদের গায়ে পড়ছে। যে রোদ- চাঁদের আলোর মতো উত্তাপ হীন। কিছুটা রোদ শফিকের চোখের ওপর সরাসরি এসে পড়েছে। চোখের মণি সোনালী রঙের লাগছে৷ অপু মুগ্ধ হয়ে মানুষটার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে।

*
আটদিন পরে শফিক ঢাকায় যাওয়ার জন্য বের হলো। তারিখটা হলো ২৫শে মার্চ, ১৯৭১। অপুর মন সামান্য মন খারাপ লাগছে। আশার কথা হচ্ছে মানুষটা বলেছে যে সামনেরবার তাকেও ঢাকায় নিয়ে যাবে। শহীদ মিনার, ভার্সিটি এলাকাগুলো ঘুরাবে। পুরান ঢাকা বলে নাকি একটা জায়গা আছে। পুরান ঢাকার খাবার খুব বিখ্যাত। সেখানেও নিয়ে যাবে।
শফিক হেঁটে হেঁটে বড় রাস্তা পর্যন্ত গেলো। আর অপু একদৃষ্টে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকলো৷ মনে মনে বলতে থাকলো, “খুব তাড়াতাড়ি চলে আসবে। খুব তাড়াতাড়ি। ভালো থাকবে৷ সাবধানে থাকবে।”
শফিক কমলাপুর স্টেশনে নামলো। ইকবাল হল পর্যন্ত যেতে তার অনেকটা সময় লেগে গেলো। সে যখন তার রুমে ঢুকলো তখন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার মতো বেজে গেছে৷ সে খুব দ্রুত হাতমুখ ধুয়ে নিলো। তার রুমমেট একমনে বই পড়ছে। শফিক বাড়ি থেকে আনা খাবার বের করে খেতে লাগলো। হাঁসের মাংস, সঙ্গে মাষকালাইয়ের ডাল।
খাওয়ার পর কিছুক্ষণ বিছানায় শুয়ে ছটফট করে একসময় সে বই নিয়ে বসলো। সামনেই পরীক্ষা। সে যখন ঘুমাতে গেলো তখন রাত সাড়ে এগারোটা বাজে।
ঘুমানোর কিছুক্ষণের মধ্যে প্রচন্ড শব্দে তার ঘুম ভেঙে গেলো৷ সে স্পষ্ট শুনতে পেলো খুব কাছেই যেন কেউ সশব্দে বোমা ফাটাচ্ছে। আর প্রতিবারেই রুমের কাঁচের জানালা ঝনঝন করে কেঁপে উঠছে৷ আকাশে কি কেউ ফানুসের মতো কিছু ওড়াচ্ছে? এতো আলোকিত লাগছে কেন আকাশ? পাকিস্তানি মিলিটারি কি তাহলে রাস্তায় নেমে গেছে? খুব ঘনঘন গুলি ফোটার শব্দ হচ্ছে। শফিক তার রুমমেটকে ডাকলো, “সাইফুল ভাই! কী হচ্ছে বলুন তো?”
সাইফুল কিছু বলার আগেই তারা শুনতে পেলো অনেকগুলা বুটজুতার একসঙ্গে তালে তালে “ঘট ঘট ঘট” শব্দ হচ্ছে। যেনো বুটজুতা পরে একদল মানুষ মার্চ করছে৷ শব্দটা হলের দিকেই এগিয়ে আসছে। শফিক রুম থেকে বের হয়ে বাইরে কী হচ্ছে দেখতে চাইলো। সাইফুল বাঁধা দিলো৷
সত্যি সত্যি মিলিটারিরা শফিকের ইকবাল হলের সামনে এসে গেছে৷ মেইন গেটের তালা ভেঙে তারা হলের ভেতরে ঢুকে পড়লো৷ একই সঙ্গে হিন্দুদের জগন্নাথ হল, মেয়েদের রোকেয়া হল আর শামসুন্নাহার হলে মিলিটারি ঢুকে পড়লো। মিলিটারিদের উপরে নির্দেশ আছে এসব হলের প্রতিটা ছাত্রকে মেরে ফেলতে হবে।
শফিককে মেরে ফেলা হলো তার রুমে। দরজা ভেঙে পাকিস্তানিরা ভেতরে ঢুকে শফিক আর তার রুমমেটকে মেশিনগান চালিয়ে ঝাঁঝড়া করে ফেললো৷ অথচ, মিলিটারিরা বুঝতেও চেষ্টা করলো না যে, এই ছাত্রগুলোই কোনো না কেনো মায়ের আদরের ধন, ভালোবাসার মানুষ!
এতো সহজে কারো সমস্ত স্বপ্ন মেরে ফেলা যায় সেদিন শহরবাসী এই কথা প্রথম বুঝতে পারলো। মৃত্যুর আগে শফিক প্রায় নিঃশব্দে বলছিল, “মা তুমি কোথায়? পানি খাবো মা। গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। পানি, পানি, পানি।”
তাঁকে পানি দেয়ার মতো হলে জীবিত কেউ নেই। তাঁর মৃতদেহ খুব অযত্নের সঙ্গে মেঝেতে পড়ে রইল।
সেই একই রাতে মিলিটারিরা নগরীর সাধারণ মানুষদেরও আক্রমণ করলো; যাদের বেশিরভাগেরই কোনো রকম প্রস্তুতিই ছিলো না। খুবই সাধারণভাবে মিলিটারিরা মেশিনগান চালাতে লাগলো। সেই রাতে সকলেই ছিলো ঠিক মৃত্যুকূপের উপরে। ভাগ্য নির্ধারণ করে দেবে কে মৃত্যুকূপে পড়বেআর কে পড়বে না। মানুষ মেরে ফেলা এতোটা সহজ? এতোটাই মূল্যহীন মানুষের জীবন? বহু মানুষের মৃতদেহ অবহেলায় অযত্নে পড়ে রইলো। মিলিটারিরা আগুন জ্বালিয়ে দিলো অনেক জায়গায়। পত্রিকার অফিসগুলো জ্বলতে থাকলো।

কারফিউ শুরু হলো পরদিন থেকে। আর এদিকে, মানুষের লাশ পঁচতে শুরু করলো। কয়েকটা রাত নগরবাসী নির্ঘুম কাটালো। প্রতিরাতেই কেউ না কেউ মারা যাচ্ছে। তরুণীদের ওপর মিলিটারির নৃশংসতা ছিলো সবচেয়ে জঘন্য৷ কয়েকদিন পর ডোম যখন লাশ তুলছিল তখন তারা দেখলো, বেশিরভাগ মেয়েদেরই নগ্ন দেহ স্তুপাকারে পড়ে আছে। মেয়েদের প্রায় সবারই স্তন ছিঁড়ে তুলে ফেলা হয়েছে। তাদের অনেকেরই যোনিপথে ধারালো ছুরি ঢুকিয়ে কেটে এসিড দিয়ে ঝলসে দেওয়া হয়েছে। তাদের মুখে ভয়াবহ রকমের আতঙ্ক বিরাজ করছে তখনও। এই দৃশ্য দেখে ডোমরা বারবার চোখ মুছতে লাগলো।
মানুষের পঁচা গলা লাশ নর্দমা, বাড়ির আনাচে কানাচে পড়ে রইলো।
শফিকের লাশ দীর্ঘ তিনদিন ওভাবেই থাকলো। এরই মধ্যে তাঁর গায়ের মাংস পঁচতে শুরু করেছে। সমস্ত শরীর ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তার মুখে বসে আছে স্বাস্থ্যবান অনেকগুলো মাছি৷ পুরো হলে মাংস পঁচা গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে৷ অথচ, লাশগুলো তুলে জানাজা করার মতো কেউ নেই। কিংবা, লাশের নিজ বাড়ির ঠিকানায় পাঠানোর মতোও কেউ নেই। তিনদিন পর ডোম এসে লাশগুলো ট্রাকে তুলে নিয়ে গেলো। আর সব লাশের মতোই শফিকের লাশের স্থান হলে ধলপুরের ময়লা ডিপোতে।
*
শফিকের মৃত্যুর খবর কয়েকদিন পর গ্রামে এসে পৌঁছুলো। সেই খবরও ভাসাভাসা। যারা খবর এনেছে তারা কেউই নিশ্চিতভাবে বলতে পারছে না শফিক আদৌ মারা গেছে নাকি। তবে, হলের সব ছাত্রকে যখন মেরে ফেলা হয়েছে তখন নিশ্চয়ই তাদের মধ্যে শফিকও আছে।
শফিকের মৃত্যু সংবাদ অপুর বিশ্বাস হলো না। অসম্ভব একটা ব্যাপার! এতো জীবন্ত একটা মানুষ একদিনের ভেতরে কীভাবে মারা যেতে পারে? ঢাকায় নাকি অনেক মানুষকে মেরে ফেলা হয়েছে। একরাতের মধ্যে ঘটা ধ্বংসযজ্ঞ অপুর বিশ্বাস হয় না। সে মনে মনে বলতে থাকলো, “বাড়ি এসো শফিক ভাই। তোমাকে এক নজর না দেখলে আমি মরে যাবো। বাড়ি এসো, বাড়ি এসো, বাড়ি এসো।” সেদিন বিকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অপু নদীর পাড়ে বসে রইলো। আকাশে মরা জোছনা। জোছনার আলো নদীর পানিতে পড়ে চিকচিক করছে৷ তবে প্রকৃতির এই সৌন্দর্য অপুকে স্পর্শ করছে না। একসময় সে জোরে চিৎকার করে বলে উঠলো, “ভালোবাসি।”
তার কথাটা প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে ফিরে আসতে লাগলো। সঙ্গে সঙ্গে অপুর চোখে পানি চলে এলো।
এই ঘটনার কয়েকমাস পর পাকিস্তানি মিলিটারিরা অপুদের গ্রামে ক্যাম্প করে। এক গভীর রাতে মিলিটারিদের তাবুর আশেপাশে অপুকে দেখা গেলো। শেষরাতে মিলিটারিদের ক্যাম্পে হঠাৎ করেই আগুন জ্বলে উঠলো। অপু তখন ক্যাম্প থেকে অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে আগুনের জ্বলে ওঠা দেখছে। আগুনের লেলিহান শিখা আকাশ ছুঁয়ে ফেলেছে। অপুর কেন জানি না মনে হচ্ছে খুব কাছেই কোথাও শফিক ভাই দাঁড়িয়ে আছে। গাঢ় ভালোবাসাময় চোখে সে অপুর দিকেই তাকিয়ে আছে।

লেখকঃ ফাহিম হাসান

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.