বট বৃক্ষের আশে

মহল্লার কে না চিনে তাকে ?ঐ যে শহরের শেষ বাড়িটা আছে না তিন তলা ঐ বাড়ী টা ই কুদ্দুস সাহেবের ।আহা গ্রামের মাঝে এত সুন্দর বাড়ি বেশি একটা দেখা যায় না।কুদ্দুস সাহেব খুব মানি লোক ।থানার ওসিরাও ওনাকে সম্মান দিয়ে কথা বলে।কত টাকা তার তা নিয়ে অনেক গুজব ছড়ীয়ে আছে ।কেউ বলেন লাখ পতি কেউ বলেন কোটিপতি।শহরের একদম শেষে ওনার বাড়ি।ওনার বাড়িটা পৌরসভার ভেতর পরলেও তার পরের সব বাড়ি গ্রামের।
বাসুদেব পুর গ্রামটা কোথা থেকে শুরু তা নিয়ে দ্বন্দ আছে।কেউ বলেন কুদ্দুস সাহেবের বাড়ি হতে কেউ বলেন তারপরে।আজ এত অর্থ তার কিন্তু এক দিন তার কিছু ছিল না।দিন মুজুরি করত যখন বাইশ বছর।বিয়ে করল, কিন্তু অভাব তার কাটে নি।অল্প অল্প টাকা জমিয়ে আর ধার কর্জ করে একটা মুদির দোকান দিয়ে দিল।যেই ওনার ছেলে জাইদ জন্ম নিল সেই থেকেই দু হাতে অর্থ আসতে লাগল।কিন্তু ওনার স্ত্রী তা দেখে যেতে পারল না।দু দিনের কাল জ্বরে মারা গেল।
জাইদের তখন চার মাস।এক মাত্র ছেলেকে আর দোকান নিয়ে ওনি যখন সাগরে ভাসছেন তখন ওনার এক বোন চলে এল জাইদকে দেখাশোনা করতে।রেশমা বেগমের মায়া ধরে গেল জাইদের প্রতি।তাই আজ বাইশ বছর পর ও স্বামীর ঘরে যান নাই।স্বামী আজো মাঝে মাঝে আসেন।এত বড় বাড়ির নিচে বসে থাকেন অনেকক্ষন।রেশমা বেগমকে বলেন সংসারে ফিরে যেতে।ওনি তা শুনে মুখ কালো করে চোখে পানি এনে বলেন,জাইদকে ছেড়ে চলে গেলে ও থাকবে কেমনে।ঘুম হতে জেগে রাত পর্যন্ত ও আমাকে ছাড়া চলতে পারে না।বলতে বলতে এক পর্যায়ে মহিলা কেঁদে দিবেন।
জাইদ আট দশটা ছেলের মত না।সে শান্ত,ভদ্র,কালো ,সুদর্শন আর জ্ঞানী।শান্ত তার দুটি চোখ ।এমন দুটি চোখ যার আছে তার কিছু বলার দরকার হয় না।স্বচ্ছ চোখ দেখে মনের ভাষা বুঝে ফেলা যায়।তার কালো মত চেহারাটা দেখলে মনে হয় কালো চির রূপময়।জাইদ ছোট বেলা হতে হাসে কম,কথা বলে কম।স্কুল,কলেজ কোথায় বন্ধু নেই।বন্ধু হওয়াটা তার কাছে খুব কঠিন মনে হয় ।
ওপরের তলায় বড় বড় চারটা রুম।জাইদের দুটা আর তার বাবা ও রেশমা বেগমের বাকি দুটা।জাইদের একটা রুমে বিশাল বইয়ের ভান্ডার।বিকালে,রাতে, সকালে সারা দিন সে মুখের সামনে একটা বই ধরে রাখবে।ছাদে যাবে না,বাগানে দোল খেতে খেতে ,চায়ে চুমুক দিয়ে বই পড়বে না।সে আছে তার মত।বাড়িটার নিচ তলায় ড্রয়িং রুম।জাইদ কোন দিন নিচে বসবে না।সবার সাথে বসে খাবে ও না।মাঝের তলার রুম গুলো তালা বদ্ধ।বাড়ির পাশে ছোট ছোট কিছু ঘর আছে যা কাজের লোকদের।
জাইদের সকালটা শুরু হয় এক কাপ চা দিয়ে ।আজ ও তার ব্যতিক্রম ঘটল না।ঘুম থেকে উঠতেই রেশমা বেগম চা নিয়ে হাজির।একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে চায়ের কাপটা নিয়ে চায়ে চুমুক দিয়ে জানতে চাইলো বাবা কোথায়। রেশমা তার জবাব না দিয়ে চলে গেল।ওনার মনটা আজ বেশ ভাল নেই।ওনার ছেলে যাকে বাইশ বছর আগে ফেলে চলে এসেছিল সে একবার তার মাকে দেখতে চেয়েছে। আহা বেচারী ভাইপোর ভালবাসায় এত অন্ধ হল যে নিজের ছেলে কে ছেড়ে দিল।তখন ছেলের বয়স ছিল চার ।এখন না জানি কত বড় হয়েছে।স্বামীর বিশাল সংসারে লোকের ভিড়ে নিশ্চয় ওনার ছেলে অনেক যত্নে মানুষ হয়েছে।ওই দিন সব ছেড়ে আসার পর আর পিছনে তাকালেন না।না জানি দেখতে কেমন হয়েছে ওনার ছেলে।গতকাল ওনার স্বামী এসে একবার ছেলেকে দেখে আসতে বললেন।ছেলের জন্যে বৌ দেখছেন পছন্দ মত মেয়ে পেলেই বিয়ে দিয়ে দিবেন।তারপর থেকেই মনটা ব্যাকুল হয়ে ওঠেছে একবার ছেলেকে দেখার জন্যে।এখানে আসতে বললে কি সে আসবে ?বলবেই বা কে ?এখানে আসতে বলার মত মুখ তো আর ওনার নেই।যা ছেড়ে দিয়েছেন তা ফিরে দেখার মত সাহস যে ওনার নেই।
জাইদ সারা দিনে অনেকবার রেশমা বেগমকে খবর পাঠিয়েছিল কিন্তু ওনি আসেন নি।মাথা ব্যথার কথা বলে সারা দিন বিছানায় শুয়ে ছিল।সন্ধ্যার দিকে জাইদ একবার কী ভেবে যেন মার ঘরে গেল।রেশমা তখন শুয়ে ছিল।জাইদ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকবার গলা ঝেড়ে ভেতরে ঢুকল।জাইদকে দেখে ওনি বিছানা থেকে উঠে বসলেন।মলিন মুখে একটু হাসি এনে বললেন,
-বাবু তুমি ?তুমি তো সন্ধ্যায় বের হও না।
-বের হই না বলে তোমার ঘরে আসতে পারব না তা কিন্তু নয়।
-হয়েছে।এইবার বল মার কাছে কেন আসা হল?
-সারা দিন কোথায় ছিলে ?সকালের পর একবার ও গেলে না যে আমার ঘরে।
-ও তাই তো।শরীরটা ভাল নেই বাবু।
-তোমার চোখে পানি কেন মা ?কিছু হয়েছে ?আমায় বল। আজকাল তুমি কেমন যেন চুপচাপ থাক ।মন খারাপ কেন তোমার ?
-এমনি।
-জানি এমনি না।আমাকে বলবে না তো ?ঠিক আছে ? আমি দু দিন কিছু খাব না। জাইদের জিদের কাছে মার পরাজয় হল।ভাইপোর ভালবাসায় বাধ্য হয়ে সব বলল।নিজের মনের দুখের কথা । জাইদ সব শুনল কিন্তু কিছু বলল না।মনে মনে সে শপথ করল মার মুখে হাসি সে আনবেই।
রেশমা বেগমের ফেলে আসা ছেলের নাম অনিক। পড়াশোনা শেষ করে জব করছে ।বয়স ছাব্বিশ সাতাশ হবে।স্কুল কলেজ জীবনের বন্ধুদের মতে অনিক দুষ্ট,ফাজিল,অভদ্র আর ভাল।কেউ কেউ বেশী আবেগী হয়ে বলে তার মত ভাল মানুষ আর একটা ও জন্মায় নি। তারপরে ও ছোট সময় যে ছেলের মা তাকে ছেড়ে চলে যায় আর মানুষ হয় হোস্টেলে সে ছেলে আর কতটুকু ভাল হবে ?কিন্তু অনিকের দস্যিপনা ,দুরন্তপনা সব উবে গেল যখন যৌবনে পা দিল।কেমন যেন শান্ত হয়ে গেল। আজকাল তার মাকে দেখতে খুব ইচ্ছে হয় তার।রাত দিন এক করে অবশেষে সিদ্ধান্ত নিল,যাবে মাকে একবার দেখতে ।কেমন আছে তাকে ছেড়ে।তা জানার জন্যে।
সকাল দশটা হবে।জাইদ একটা বই পড়ছিল।রেশমা বেগম তখন বাহিরে ।বাড়িতে চার জন কাজের লোক ছাড়া আর কেউ নেই।হঠাৎ এই বাড়িতে অনিকের আগমন ।অনেক দূর থেকে এসেছে সে।তার মাকে নিয়ে যেতে।আজ যে সে তার মাকে নিয়েই ফিরবে।জাইদ কে খবর দিল একটা কাজের লোক ।বলল নিচে কেউ একজন এসেছে।জাইদ নিচে বসে না,তাই বলল উপরে আসতে।অনিক উপরে চলে গেল।তার লাইব্রেরীতে। জাইদ বয়ের দিকে তাকিয়ে ।অনিক তার দিকে।কি অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে আছে,মনে হচ্ছে শত জন্মের চেনা। জাইদকে দেখে অনিকের বুক এক অচেনা ভাল লাগায় ভরে উঠল।মনে হচ্ছিল এত সুখি সে কোন কালে ছিল না । এত প্রেম সে কোন জনমে অনুভব করেনি।
জাইদ চোখ তুলতেই অনিক চোখ ফিরিয়ে নিল।সে হাতের বইটা বন্ধ করে সেলফে রাখতে রাখতে বলল,
-আপনাকে কি আমি চিনি ?
-না।চিন না।পরিচয় দিলে চিনবে।
-তাহলে পরিচয়টা শুনি।
-আমি সেই ছেলে যার মাকে তুমি তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছ।
অনিকের কথা শুনে জাইদ ফিরে তাকাল।খুব ভাল করে একবার দেখে নিল।তারপর কোন কথা না বলে অনিককে জড়িয়ে ধরল।জাইদের বুকে যখন অনিকের বুক মিলল তখন তার মনে হল এত আনন্দে কেউ তাকে জড়িয়ে ধরেনি। অনিক কিছু বলতে যাচ্ছিল।কিন্তু জাইদ তা আটকে দিয়ে জড়িয়ে ধরে বলল
-ভাই,তুমি যাকে মা ডাক সে যে আমার দেবী।দেবীকে কেউ কি ছিনিয়ে নেয়?
-কিন্তু জাইদ আমার কি দোষ ছিল ?
-আমার কাছে কোন উত্তর নেই।আমি একটা জিনিস চাইব দিবে ভাই ?
-আমার মাকে দিয়ে দিতে যখন পেরেছি কোন কিছু চাইলেও দিতে পারব।
-মাকে তুমি এই বিষয়ে কোন প্রশ্ন করবে না প্লিজ।
-হা হা হা হা তুমি ও মা ডাক ?
-জন্মের পর তো তাকেই দেখে আসছি।বল জানতে চাইবে না।
-চাইব না।কিন্তু আমায় ছাড়।এই ভাবে জড়িয়ে ধরে রাখলে মরে যাব।
অনিকের কথায় জাইদের হুশ আসল যে সে আবেগে এতক্ষণ জড়িয়ে ধরেছিল তাকে।লজ্জায় পরে আর তাকাতে পারছিল না কিন্তু অনিক তার দিক হতে চোখ ও সরাচ্ছিল না।গভীর প্রেমের দৃষ্টিতে আটকে ছিল তার চোখ।
অনিক আসার পর জাইদ,রেশমা বেগম আর গোটা বাড়ি যেন বদলে গেল।সারাক্ষণ হৈ চৈ আর আনন্দে ভরে থাকে গোটা বাড়ি।কুদ্দুস সাহেবকেও আজকাল সকাল সকাল ফিরতে দেখা যায় ।দূর থেকে কেউ দেখলে মনে হবে এই বাড়িতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে।যে জাইদ কোন দিন ছাদে যেত না তাকে আজকাল দেখা যায় অনিকের সাথে ছাদে বসে গল্প করছে।কত গল্প।কখনো হাসিতে ভরে উঠে আবার কখনো আবেগে দু চোখে জলের খেলা। জাইদ যখন হাসে তখনো অনিক অবাক হয়ে তাকে দেখে আবার যখন কাঁদে তখনো দেখে।যেন এটা মঙলময় দর্শন।এই তো গতদিন অনেক গুলো ফুলের চারা এনে অনিক আর জাইদ মিলে বাগানে লাগাল,অপরাজিতার বীজ এনে বুনে দিল।নীল গন্ধহীন অতি সুন্দর অপরাজিতার গল্প করতে করতে যখন বাগানে দুজন কাজে ব্যস্ত বারান্দা হতে রেশমা তা দেখে চোখ পানিতে ভরে তুলে।হয়তো হারানো ছেলেকে দেখে অথবা দীর্ঘ বাইশ বছর পর জাইদকে খুশি দেখে।
ওইদিন বৃষ্টি নামল।জাইদ ,অনিক বৃষ্টিতে ভিজতেছিল। আচমকা অনিক জাইদকে প্রশ্ন করল,
-জাইদ কাউকে ভালবেসেছ?
-না তো ?তুমি বেসেছ?
-হ্যা।আজ অবধি অনেককে ভালবেসেছি।কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে তা মুলত ভালবাসা ছিল না।ছিল চাহীদা আর আবেগের ফল।
-ও।আমার কাছে ভালবাসা বলতে কোন কিছু নেই ।যা আছে তা হল বিশ্বাস,ভক্তি আর আস্থা।
-এটা আবার কী ?
-তুমি বুঝবা না অনিক।
-তাই বুঝি ?
-ভালবাসবে আমায় ?
-মানে ?
-কিছু না।
অনিক চলে এল।জাইদ বৃষ্টির মাঝে দাঁড়িয়ে অনিকের বলা কথার অর্থ খুঁজতে লাগল।আহা বেচারা এই কথাটার অর্থ খুঁজতে সারাদিন বৃষ্টিতে ভিজল।রাতে ও নামল বৃষ্টি সারা রাত ছাদে ভিজল বৃষ্টিতে।সকালে খুব ভোরে অনিকের রুমে গেল সেখানে সে ছিল না।সেল ফোন ,ব্যাগ সব ছিল।কিন্তু অনিক ছিল না।জাইদ মার ঘরে গেল।ওনি তখন সবে ঘুম থেকে উঠেছেন।জাইদ সোজা ওনার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল।রেশমা বেগম কারন জানতে চাইলে বলল,
-মা তোমার ছেলে কই ?
-চলে গেছে? জাইদ তা শুনেই লাফ দিয়ে উঠে বসে পড়ল।
-চলে গেছে ?কিন্তু কিছু ই তো নিয়ে যায়নি।
-আবার আসবে বলে গেছে।
অনিক চলে যাওয়ার চার পাঁচ দিন পরেও যখন ফিরে আসছিল না তখন জাইদের অশান্তি শুরু হল।ভাল যে সে ও অনিককে বাসে তা বুঝতে তার বাকি রইল না ।কিন্তু সেই ভালবাসা বলার জন্যে অনিক যে আর রইল না । অনিকের কমতি আর তার বিরহ যখন জাইদের হাড়মজ্জা জ্বালাতে শুরু করল তখন সে সীদ্ধান্ত নিল সে যাবে অনিকের কাছে।যাবে সে অনিককে বলতে যে সে তাকে ভালবাসে।
অনিক বাড়িতে ছিল না।চাকরির খাতিরে তাকে অনেক দূরে যেতে হয়েছিল।অফিস থেকে ঠিকানা নিয়ে সে ছুটল মুকুন্দপুর গ্রামের দিকে।প্রথমে ট্রেনে করে নামতে হয় ভাড্ডা স্টেশনে সেখান থেকে নৌকা অথবা লঞ্চে করে যেতে হয় চান্দিরা।চান্দিরা থেকে দু ঘন্টা পথ চলতে হয় নৌকায়।সে অনেক দুরের পথ।যে ছেলে কোন দিন ঘর থেকে বের হয়ে শিক্ষা সফরে যায় নাই সে ছেলে আজ শরীরে জ্বর নিয়ে ছুটল ভালবাসার মানুষের সন্ধানে।যে রাতে অনিক চলে এসেছিল,যে রাতে জাইদ সারা রাত বৃষ্টিতে ভিজেছিল সেই রাত ই তার জ্বর এসেছিল ।আজ এতদিন কিন্তু জ্বর তার পিছন ছাড়ছে না।ট্রেন হতে নেমে মনে হল জ্বর আরো বেড়েছে।লঞ্চে উঠতেই জ্বরটা হু হু করে বেড়ে গেল।জ্বরের প্রকোপে কয়েকবার হুশ হারিয়ে আবোল তাবোল বকছিল।
পাশে বসে থাকা একজন ভদ্র মহিলা আর তার স্বামী ছিল,আর ছিল সদ্য বিবাহীত দম্পতি।মহিলা দু জন বার বার মাথায় পানি ঢালছিল আর অন্য দুজন সারা লঞ্চ ছুটে বেড়াতে লাগল ডাক্তারের খোজে।কয়েকবার হুশ আসলে অনিক অনিক বলে জেগে উঠছে।একবার জিজ্ঞেস করা হল আপনি কোথায় যাবেন ?জাইদ হাতের ঠিকানাটা ধরিয়ে দিল ।মুকুন্দপুর । সাথে যে চারজন লোক ছিল তারা কেউ বাড়ি ফিরল না। জাইদকে পৌছে দিবে তার ঠিকানায় সে আশায় তারা নৌকাতে উঠে বসল।নৌকাতে উঠার আগে জাইদের ভাল হুশ ছিল।তখন রাত দশটা নৌকাতে উঠতেই তার শ্বাস কষ্ট হতে লাগল।ভদ্র মহিলা দোয়া পড়তে লাগল।অন্যমেয়েটা কাদছিল।তার কান্নার শব্দে আর নদীর টেউ এর শব্দ মিলিয়ে করুনতম পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছিল।জাইদ চোখ মেললেই বলতে লাগল।
-ভাই এখন কেমন লাগতাছে ?
-মু মুকন্দপুর কতদুর ? বলেই আবার চোখ বুঝে ফেলে।
এই পথ যেন আজ শেষ হচ্ছিল না।কত দূর আর বাকি জাইদের অনিকের কাছে যেতে ?কতটুকু পথ লাগবে তার ভালবাসি বলতে ?জাইদের জ্ঞান ছিল না।জ্ঞান ফিরলেই সে তার মাকে দেখছিল ।একটা গুর লেগে থাকে তার চোখে।সেই গুরে অনেক কিছু দেখে। বাস্তবতা আর কল্পনার মিল বন্ধন।চার মাস বয়সে তার যে মা মারা গিয়েছিল তাকে আজ দেখা দিল সেই কল্পনায়। সে যেন এখনো নববধু জাইদ ছোট শিশু।আবার দেখল অনিকের হাত তার হাতে।তারা হাটছে একটা পথ নিয়ে যা ছবির মত সুন্দর।ঝিরঝির বাতাস,চারপাশে শিমুলের তুলা উড়ছে।সেই তুলা এসে অনিকের মাথায় লাগছে। তাকে দেখাচ্ছে বরফের মত সুন্দর।
রাত তখন এগারটা।নৌকা এসে ভিড়ল মুকুন্দপুর গ্রামে।জাইদ তখন বেঁচে নেই।কিছুক্ষণ আগেই সে পৃথিবী ছেড়েছে। মারা যাওয়ার আগে পানি খেতে চাইল।মহিলাটি নদী হতে পানি খাওয়াল ।পানি খেয়ে খুব শান্ত ভাবে বলল ,তোমরা জান অনিক আমায় ভালবাসে।আমি ও ভালবাসি ।সে মুকুন্দপুর।আমি যাচ্ছি তার আশে।বলতে বলতে চোখ বুজল।তারপর বিড়বিড় করে কি যেন বলল।হয়তো বলল ,অনিক আমি তোমায় ভালবাসি।খুব ভাল……।।বাসি।
নৌকা ঘাটে ভিড়তে ভিড়তে বৃষ্টি শুরু হল।না এটা ঝড়। প্রকৃতির আক্রোশ।একটা ভালবাসা না মিলতে পারার আক্রোশ।জাইদের লাশ বৃষ্টিতে ভিজছে।ক্ষনিকের পরিচিত মহিলা দুজন কাঁদছে।ঘাটে কোন মানুষ নেই । মাঝি সহ বাকি দু জন অনিকের খোঁজে গেছে।জাইদের প্রাণ হীন দেহটা পরে আছে নৌকার ভেতর।তার কাল চেহারায় বিবর্ণ হাসি।যেই হাসিতে কষ্ট নেই ,দীর্ঘ দিনের যন্ত্রনা ভুলে বাঁচতে পারার হাসি সেটা।

লেখকঃ আরভান শান আরাফ

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.