শোনো শুকপাখি

আফ্রাদ বললো, আচ্ছা বলতে পারো, কিভাবে বুঝবো আমি কাকে ভালোবাসি আর কাকে ভালোবাসি না?
রাফিন একটু চুপ থেকে বললো, যার কথা ভেবে ভেবে মন ও শরীর সারাক্ষণ উন্মন হয়ে থাকে তাকেই তুমি ভালোবাসো।
– আর?
– যার শুধুমাত্র শরীর তোমাকে টানে, তাকে তুমি ভালোবাসো না। তাকে তুমি শুধু কামনাই করো। শারীরিক ভাবে।
– আর যাকে শুধু মানসিক ভাবেই চাই?
– সে তোমার বন্ধু। প্রেমিক নয়।
আফ্রাদ একটু সিরিয়াসলি বলে,
– কিন্তু এই পার্থক্য তো ঠিক মতো বুঝি না।
– হুম… বোঝা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়।
– যেমন?
– যেমন কারো সাথে শুধু কথা বলতেই ভালো লাগে, পাবলিক প্লেসে তার সাথে হ্যাংগ আউট করতে ভালো লাগে- কিন্তু একলা ঘরে ঘষাঘষি করার কথা মনেই আসে না, রুচিতেও বাধে সে তোমার বন্ধু কেবল।
– আর,উল্টোটা… যার সাথে পাবলিক প্লেসে থাকতেই ইচ্ছে হয় না, শুধু মনে হয় কখন বিছানায় যাবো।
– সে তোমার বড় জোর সেক্স পার্টনার। প্রেমিক নয়। প্রেমিকের সাথে যে কোন জায়গায় যে কোন সময়ই দুর্দান্ত হয়।
– কিন্তু একটা কথা কি জানো?
– কি?
– সব কিছু ছাপিয়ে মানুষ নিজেকেই ভালোবাসে। কাজেই নিজেকে জানার জন্যও মানুষ কিন্তু সময় ও জায়গা চায়।
– মানে!
– মানে, মানুষের নিজেকেও ভালোবাসা দরকার। এই ভালোবাসাটা নিজেকে বোঝার জন্য।নিজেকে যে বুঝতে পারে না সে অন্যকে কিভাবে বুঝবে? কিভাবে ভালোবাসবে?
– আমাকে তাহলে স্পেস দাও। কখন থেকে অক্টোপাসের মতন জাপটে ধরে আছো!
বলে রাফিন আফ্রাদকে দূরে সরিয়ে দেয়ার কপট অভিনয় করে।

আফ্রাদ তখন রাফিনকে আরও কাছে টেনে নেয়। রাফিনের বুকে শিশুদের মতন মাথা গুঁজে মুখটা সেখানে ঘষাঘষি করে। তারপর মাথাটা উঁচু করে রাফিনের ঠোঁটে আলতো চুমু দিয়ে চোখে চোখ রেখে বলে, ভালো আছো?
রাফিন ঠিক তখনই বুঝতে পারে আফ্রাদকে সে বন্ধু না, যৌন সংগী না.. একজন প্রেমিকের মতনই ভালোবাসে।
কেউ যেন কখনো তাকে এমন ভাবে বলে নি, ভালো আছো?
এই অল্প একটু কেয়ারিং, রিএশিওরিং – শুধু একটু চোখে চোখ রেখে পূর্ণ দৃষ্টি মেলে বলা, ভালো আছো? কিন্তু কি বিপুল তার গুরুত্ব, একজন মানুষকে আপন করে নিতে। একজন প্রেমিক ছাড়া কে পারবে এমন ভালবেসে বলতে, ভালো আছো? কে পারবে এমন হৃদয় শরীর তোলপাড় করা দৃষ্টি মেলে দিতে- যে দৃষ্টির মধ্য দিয়ে প্রেমিকের হৃদয়ের ভেতরটা দেখে ফেলা যায়, পড়ে ফেলা যায়।
রাফিন বুঝতে পারে সে সত্যি সত্যিই যেন আফ্রাদকে ভালোবেসে ফেলেছে। আর তখনই তার ভয় হতে থাকে, আফ্রাদও কি তাকে এমনই ভাবে ভালোবাসে? নাকি বাসে না? ভয়টা আরও তাকে ছেয়ে ফেলে যখন সে ভেবে দেখে তাদের দুজনের সম্পর্কটা এমনই এর মাঝামাঝি কোন উত্তর হবে না, হয় না।
– কার কথা ভাবছো?
আফ্রা্দের গলায় কৌতুক।
– জর্জ ক্লুনির কথা।
– কে সে?
আফ্রা্দের স্বরে এবার কপট কৌতুহল।
– আমালের জামাই।
এবার আফ্রাদ রাফিনকে পুরোপুরি চিত করে শুইয়ে তার শরীরের নিচে এনে বলে,
সে কি রাফিনের জামাইয়ের চেয়েও হ্যান্ডসাম?
রাফিনের দুই হাত আফ্রা্দের হাতের তালুতে বাঁধা। আফ্রা্দের নীচের শরীরের অংশ রাফিনের শরীরের উপর। যেন সে রাফিনকে নীচে রেখে বুক ডন দেবে। রাফিন নীচে শুয়ে দেখতে পায় আফ্রা্দের পেশীবহুল বাহুর বাইসেপ ট্রাইসেপ কিভাবে ফুলে উঠেছে, তার লোমশ চওড়া বুকের পেশীগুলো কি টান টান হয়ে আছে আর চোখের ওই মারাত্মক চাহনি- চাপ দাড়ি আর মোচের মাঝে ঠোঁট টিপে নকল রাগের জিজ্ঞাসু ভনিতা – রাফিনের ভেতর বাহিরটা যেন পুরোপুরি কাঁপিয়ে তুলে। একটু আগের ‘ভালো আছো’ বলার অনুভবগুলি যদি শুধু তার হৃদয় জগতের অংশ হয়ে থাকে, তবে আফ্রা্দের এই ব্যাপারটি শারীরিক পরিপূরক।
রাফিন বলে, নাহ। তোমার মতন কেউ নয়।
আফ্রা্দ যেন একটু খুশি হয়। তার ঠোঁট রাফিনের ঠোঁটের উপর নেমে আসে। তার ঠোঁট ও জিহবা নানান কলায় রাফিনের ঠোঁট ও জিহবার সাথে কথা বলা শুরু করে- অনাদি অনন্তকালের চিরায়ত প্রেমের সাইন ল্যাংগুয়েজে। আফ্রাদ যেন এখন একজন চুমু থেরাপিস্ট। আর রাফিন তার সাবজেক্ট।
…..

আফ্রাদ বললো, জানো! ভার্সিটিতে আমাকে বন্ধুরা এমরান হাশমি বলতো।
রাফিন কটাক্ষ করে বললো, ওদের সবাই তোমার চুমু খেয়েছিলো নাকি?
– হাহা। নাহ। একদিন চুল কাটার সময় নাপিত বলতেছিলো। ওইটা আমার দুইটা দুষ্টু বন্ধু শুনে ফেলে। তারাই ছড়িয়ে দেয়।
– ভালোই তো। তা ভার্সিটিতে নিশ্চয়ই ছেলেদের লাইন পড়ে গেছিলো?
– ছেলে মেয়ে দু’দলেরই। খুশী?
– হুম খুশী। বিনা সাধনায় দেশী হাশমীর চুমু খাচ্ছি- খুশী হওয়ার মতোই ব্যাপার।
রাফিন আর আফ্রাদ তুচ্ছ আলাপ করছিলো। সোফায় শরীর এলিয়ে দিয়ে। টিভিতে আয়রন ম্যানের কোন একটা সিনেমা চলছে। আফ্রা্দের এইসব আধা সাইন্স ফিকশন, আধা ফ্যান্টাসি নির্ভর মারপিটের সিনেমা ভালো লাগে। তার আরও ভালো লাগে যন্ত্রপাতি, বিল্ডিং আর্কিটেকচার। গাড়ি তার প্যাশন। ইঞ্জিনিয়ারিং তার স্বপ্নের বিষয় অথচ তার পড়ালেখা মাইক্রোবায়োলজি নিয়ে। তার ডাক্তার আম্মুর খুব শখ তাই।
অন্যদিকে রাফিনের ভালো লাগে আর্ট ফিল্ম। মানবিক ড্রামা। থ্রিলার কিংবা কোর্ট ড্রামাও প্রিয়। কিন্তু এইসব উদ্ভট মারামারি খুব একটা প্রিয় না। আফ্রাদ অবশ্য নিজের পছন্দ অপছন্দের ব্যাপারে খুঁতখুঁতে নয়। খুব একটা কিছু বলেও না। তাই রাফিন আফ্রাদ অল্প কিছু যা পছন্দ করে তা করতে দেয়।
সিনেমার যখন বিজ্ঞাপনের ব্রেক আসে রাফিন আফ্রাদকে জিগ্যেস করে, আমরা কতদিন একসাথে আছি?
-দুই মাস না প্রায়?
– নাহ, তিন মাস হলো আজ।
-একটা জিনিস বলবে?
– কি?
– আমি তোমাকে তোমার ব্যাপারে আমার মন যা বলে তা খুলেই বলেছি।
– হুম
-শুধু হুম?
-তো?
-তো তোমার কিছু বলার নেই আমাদের ব্যাপারে?
– বলি নি আমি?
– কি বলেছো?
– দ্যাখো রাফিন আমি তোমার মতন নিজেকে বোঝাতে পারি না। প্রেমের পুতুপুতু সংলাপ বলা আমার কাজ না। আমার ব্রেইন খুব মেল ডমিনেটেড। তুমি জানোই গাড়ি যন্ত্রপাতি বেশি ভালো লাগে। নেভিগেশনে আমি খুব ভালো। কিন্তু আবেগ প্রকাশে বা আবেগ বুঝতে আমি অত দক্ষ না। তোমাকে কিছু ব্যাপার বুঝে নিতে হবে।
রাফিন হতাশ হয়ে তাকিয়ে থাকে।
বিড়বিড় করে বলে- আমার ভয় হয়।
– কিসের ভয়?
– তুমি আমাকে আমার মতন ভালোবাসো নাকি বাসো না?
– আমি তোমাকে তোমার মতন ভালোবাসি না। আমার মতন বাসি। এবং সেটা তোমার চেয়ে কম কিছু নয়।
তারপর আফ্রাদ একটু থেমে বলে,
আমি এখনো আমার ফ্যামিলির সাথে থাকি। আমার বাবা নেই। বড় ভাই ভাবী বাচ্চাদের নিয়ে বিদেশে আছেন। ছোট বোন পড়ালেখা শেষের দিকে। তার বিয়ে দিতে হবে। মায়ের বয়স হয়েছে। এজন্য তার এংজাইটিও বেড়েছে। প্রথমে বাবা মারা যাবার পর অল্প। আর তারপর ভাইয়া বিদেশে যাওয়ার পর সেটা এখন প্রকটই। আমাকে একটুও চোখের আড়াল করতে চায় না। দ্যাখো না তিনি একটু পর পর ফোন দ্যান।
রাফিন কি বলবে বুঝে পায় না। অথবা অনেক কিছু বলতে চায়, জড়তা কাটিয়ে উঠতে পারে না।
আফ্রাদ বলে, আমি যেমন তোমার জীবনের প্রথম পুরুষ নই, তুমিও নও। তবে সত্যি বলি, এরকম গভীর অনুভুতি কোন ছেলের প্রতি কখনো হয় নি।
মেয়ের প্রতি?
একটা দুটো প্রেম করেছি অনেক আগে। তবে এই অনুভূতি আগের চেয়ে অনেক আলাদা। অনেক অর্থবহ।
রাফিন প্রসংগ পাল্টে বলে, চলো কফি খাই।
আফ্রাদ বলে, এই এপ্রিলের গরমে?
তুমি চাইলে তবেই…
চলো গোসল করি আগে। তোমার বাথটাবে। ঠান্ডা বরফ ঢেলে দিও। বরফ জলে ডুবে থাকতে থাকতে গরম কফি খাওয়া যেতে পারে।
কথা মতন বাথটাবে পানি ভরা হয়। ঢালা হয় ঠান্ডা বরফ। পাশের টুলে গরম কফির পেয়ালা রাখা হয়।
বাথটাবে দু’জন মুখোমুখি বসে। একজন আরেকজনকে কফি খাইয়ে দেবে বলে।কিন্তু সেই কফি এক চুমুকের বেশি খাওয়ানো হয় না। রাফিন হঠাৎ শাওয়ার ছেড়ে দেয়। শাওয়ারের পানির ধারা বাথটাবের পানিতে শ্রাবন বৃষ্টির গুঞ্জন তুলে। শুরু হয় রোমান্স। আর তা যথারীতি শেষ হয় তাদের আদিম দুষ্টুমিতে।

ভেজা শরীর মুছে, পাউডার বুলিয়ে, ডিওডোরেন্ট মেখে শুকনো পোশাক পড়ে দু’জন যখন আবার কাউচে গড়াগড়ি দিচ্ছে, সুখের হরমোন তাদের শরীর জুড়ে যেন হিল্লোল তুলে যাচ্ছিলো। আর তারই আভা ছড়িয়ে ছিলো দুজনের চোখে মুখে।
দু’জনের চোখ মুখ যখন খুব কাছাকাছি – শ্বাসে শ্বাস মিলে যাচ্ছে… আফ্রাদ তার সেই সিগনেচার সংলাপটি থ্রো করে। বলে, ভালো আছো?
রাফিন বলে, আছি। তুমি?
আমিও। অনেক ভালো। কেমন এক শান্তি শান্তি ভাব।
তাই?
হুম। বোঝো না আমাকে দেখে?
বলে আফ্রাদ রাফিনকে ছোট্ট মিষ্টি চুমু দেয়। কানের কাছে মুখ রেখে ফিসফিস করে বলে, আই লাভ ইউ মাই লাভ।
রাফিন দুষ্টুমি করে হেসে বলে, এই না বললে তোমার খুব মেল ডমিনেটেড ব্রেইন? ভালোবাসার কথা বলতে পারো না?
ঠেলায় পড়লে মাঝে মাঝে বাঘকেও ঘাস খেতে হয়।
আফ্রাদও হাসতে হাসতে প্রত্যুত্তর দেয়।
তবে একটা জিনিস কি জানো আমারও ভয় হয়- আমি তোমাকে কষ্ট দেবোনা তো, কিংবা তোমার সময় নষ্ট করছি না তো? আসলে এমন ভাবে জড়াবো কখনো ভাবি নাই। ভাবতাম এদেশে এত কনজার্ভেটিভ সমাজে একটা ছেলের সাথে আরেকটা ছেলের সাথে সত্যিই কি এমন সম্পর্ক হয়? এমন ছেলের খোঁজই বা আমায় কে দেবে- যার সাথে মন ও শরীর ভাগাভাগি করে শান্তি, কথা বলে শান্তি, যার কাছে পৌঁছুলে মনে হয় সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে যে স্বপ্নের কাছে যেতে চায়- আমি যেন সেই স্বপ্নের কাছেই এসেছি।
রাফিন বলে, আমি ভাবতাম এরকম শুধু আমারই হয়।
-আমারও হয়। মনে আছে, প্রথম দেখার পর আমি তোমাকে লম্বা একটা টেক্সট করেছিলাম?! তোমার সাথে দেখা হওয়ার পর রাস্তায় একা একা পথ চলতে তোমার জন্য আমার মধ্যে যে অনুভূতিগুলি খেলা করছিলো – সে সব জানিয়ে। আমি চিন্তাও করতে পারি নি, আমার মত ছেলে এভাবে কারো জন্য ভাবতে পারে। আবার তা লিখে অন্যকে জানাতেও পারে।
বলতে বলতে আফ্রাদ যেন অল্প উদাস হয়ে যায়। রাফিন বলে,
হুম। তুমি বলেছিলে যদি হারিয়ে যাই, খুঁজে বের করে নিতে পারবে কি-না।
হ্যাঁ। আর তুমি উত্তরে বলেছিলে, তোমাকে হারাতেই দেবো না।
আমি তো ভয় পেয়েছিলাম। কেন প্রথমেই হারিয়ে ফেলার কথা আসছে?
-একটা কথা বলি রাফিন?
-বলো
যখন আমি তোমার সামনে থাকি, তখন যেমন আমি তোমার। যখন থাকি না তখনও আমি তোমার। বিশ্বাস রেখো।
এই কথাটি কেন এতদিন বলো নি?
ভয়। হারিয়ে ফেলার ভয়। কষ্ট দেয়ার ভয়। আমার পরিবারের কথা বলেছি। আমার দায়িত্বের কথা বলেছি। সমাজের কথা বলেছি। এরপরও কি ভয় হয় না।

হঠাৎ আফ্রাদ হাঁটু মুড়ে রাফিনের কোলে মাথা গুঁজে বলে বরং এখনো সময় আছে। ভেবে দ্যাখো। সম্পর্কে এখানেই ইতি টানি। তোমাকে আমি কষ্ট দিতে পারবো না।
রাফিন বলে, ভয় তো আমারও আছে। আমারও কি ফ্যামিলি নাই? আছে। আমার বাবা-মার বয়স হয়েছে। তারা মফস্বলে থাকেন। আমার বড় ভাইয়ের কাছে। বড় বোনের আগেই বিয়ে হয়ে গেছে। আমিই সবচেয়ে স্বচ্ছল বাড়ির মধ্যে। আমার বাবা-মাও কি চান না তারা আমার সাথেই ঢাকাতে থাকুন? আমার একটা বিয়ে হোক। আমার বড় ভাই ও ভাবি ঠারে ঠারে কি তা বলে না? কিন্তু আমি পরিবারে একটু বেশি ফিন্যান্সিয়াল কন্ট্রিবিউশন করে হোক, বুঝিয়ে নিজের অবস্থান জানিয়ে হোক, হোক কখনো নিজেকে ছোটো করে – ম্যানেজ করে চলতেছি না? কেন?
আফ্রাদ জিগ্যাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
রাফিন নিজেই উত্তর দেয়, কারন- প্রথমতঃ বাবা মা পরিবারহীন আমার কাছে ভালো থাকবেন না। দ্বিতীয়ত, আমার বিশ্বাস সবার মতন খোদাও আমাকে পৃথিবীতে জীবিত করে পাঠিয়েছে জীবিতের মতন বেঁচে থাকতে, মৃতের মতন বাঁচতে নয়। তাহলে মৃত করেই পাঠাতেন। আমি তাই জীবিতের মতনই একজন জীবন সংগীর সাথে জীবন কাটাতে চাই। আমার বাবা যেমন আমার মায়ের সাথে, আমার ভাই যেমন ভাবীর সাথে, আমার বোন যেমন দুলাভাইয়ের সাথে- আদম হাওয়া থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত যুগ যুগান্তরে প্রতিটি অপর সংগীর সাথে জীবন কাটিয়েছে আর কাটাবে তেমন ভাবে… বলো তাদের মতন আমারও নিজস্ব মানুষের সাথে জীবন কাটানোর অধিকার কি আমার নেই? বলো?
– আছে। আফ্রাদ জোর দিয়েই বলে।
রাফিন আবার বলতে থাকে, আমি সারাজীবন তেমন জীবন সংগীই খুঁজেছি আর দশজনের মতন। যার সাথে স্পিরিচুয়ালি, ফিজিক্যালি আর ইন্টেলেকচুয়ালি কম্প্যাটিবল হবে। স্ট্রেইট জগতেই এরকম খুঁজে বের করা অনেক কঠিন কাজ আর আমাদের জন্য তো সুপার কঠিন। কিন্তু আমার বিশ্বাস ছিল কেউ না কেউ তো থাকবেই। যদি না থাকতো আমার এই আকাংখা এমন তীব্র হতো না। নানা সম্পর্ক উপসম্পর্কের নানান উঁচু নীচু পথ পেরিয়ে তাকে এখনও খুঁজে পাওয়ার বিশ্বাস এত মজবুত থাকতো না। আমার বিশ্বাস ছিল শেষ নিঃশ্বাসটি ছাড়ার আগ মুহুর্ত হলেও আমি তার দেখা পাবো।
রাফিন যেন একটু দম নেয়।
আফ্রাদ তাকে জড়িয়ে ধরে কপালে একটা চুমু দেয়।
রাফিনও আফ্রাদের মুখকে দুই তালু দিয়ে তুলে ধরে ধীরে ধীরে তার কপালে চুমু দেয়।বলে, আমার শেষ কথাটুকু শোনো। তোমাকে স্পষ্ট ভাবে, আবারও বলছি- তোমাকে আমার সেই মানুষটিই মনে হয়েছে যার সাথে জীবন কাটানোর দৃঢ় ইচ্ছে ও সাহস দু’টোই আছে। কারন আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমার মনে হয়েছে তুমিও বাসো। এখন তুমি ভেবে দ্যাখো তোমারও সেই সাহস ও ইচ্ছে আছে কিনা। থাকলে আমাকে জানিও।
আফ্রাদ একটুও না ভেবে বলে, আছে।
রাফিন বলে, এখুনি বলতে হবে না। ভেবে বলো। সময় নাও। কিন্তু সঠিক উত্তরটি বলো।আমি অপেক্ষায় থাকবো।

এমন সময় আফ্রা্দের মোবাইলটা বেজে ওঠে আবার। আফ্রাদ হতাশ চোখে তাকায়।
রাফিন বলে, তোমার আম্মুর কল মনে হয়। অনেকক্ষণ হলো এসেছো। উদ্বিগ্ন হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। বাসায় যাও। আর উত্তরটা ভেবে দ্যাখো। এর মধ্যে আমাদের কথা, দেখা না হোক। সেটাই ভালো।

………………………

দু’দিন পর আফ্রা্দের ফোন আসে রাফিনের ফোনে।
রাফিনের এই দু’দিনেই চেহারা যেন অনেক বিধ্বস্ত হয়ে গেছে, চোখের কোণে অনিদ্রার কালি। উশকো খুশকো চুল, মুখে অযত্নের দাঁড়ি মোচ।
আফ্রাদ বলে, কেমন আছো?
সেই পুরনো স্বর আর আবেগ। শুনলেই সারা শরীরে শান্তি শান্তি ভাব ছড়িয়ে পড়ে।
রাফিন বলে,
ভালো। তুমি?
– তোমার মতন।
– আমি তো ভালো নেই। মিথ্যে বলেছি।
– জানি। সেজন্যই তো বললাম তোমার মতন। আজ যে আমি কোন মিথ্যে বলবো না।
– কি বলবে?
– আমার সাহস ও ইচ্ছে আছে। তোমার সাথে সারা জীবন কাটানোর।
– শুধু সাহস ও ইচ্ছে?
– না প্ল্যানও করেছি। ভাইয়া ছয়মাস পরেই আবার ঢাকায় চলে আসবে। পরশু ফোন করেছিলো। এবার আর বিদেশে যাওয়ার প্ল্যান নেই। ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার ব্যাঘাত হয়। তাছাড়া ভাইয়া আম্মুর খুব ন্যাওটা। মাকে ছেড়ে দূরে থেকে এবার নাকি তার যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে।
– আর?
– ভাইয়া বললো নীলির ভালো একটা বিয়ের প্রস্তাবও নাকি আসছে। বললো, তার ফাইনালের রেজাল্ট বের হওয়ার আগেই বিয়ে দিয়ে দেবে। একবার চাকুরীতে ঢুকে গেলে মেয়েদের বিয়ে দেয়া নাকি কঠিন।
– তারপর?
– তারপরেরটুকু তো শুধু ‘আমার’ পরিকল্পনা নয়। ‘আমাদের’ হবে। তোমার কি প্ল্যান?
– এত কিছুর পর কি আমার প্ল্যান বলে কিছু থাকে? তোমার প্ল্যানই আমার প্ল্যান।
রাফিন অনেকদিন পর খিল খিল করে হাসে।
আফ্রা্দের মনে হতে লাগলো ছেলেটার হাসির শব্দ শুনতেও অনেক আনন্দ, অনেক শান্তিময় সুখ!
এই সুখী আনন্দের নামই কি ভালোবাসা?

লেখকঃ বকুল আহমেদ

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.