সোনার হরিণ চাই

১.

তমাল আর নিতাইলাল বাল্যবন্ধু। একজন দেখতে সুন্দর, একজন মোটামুটি। একজন সমকামী, একজন বিসম!
তারা বেশীরভাগ সময়ই পদব্রজে রাজধানীর রাজপথের রাস্তা মাপে। তমাল সহজাতগুণে পুরুষ পথচারীদের বাকীসবও মাপার চেষ্টা করে তার মনোহরণকারী চক্ষুব্রজমিটার দিয়ে। নিতাই মাপতে গেলে তমালের নারীবাদী আগুন জ্বলে উঠে! নিতাই অবশ্য তমালের ব্যাপারটি জানে, ও নিয়ে তার মাথা ব্যাথা নেই। কিন্তু কথা হল, রথদেখা আর কলাবেচা ছাড়া দুজনের তেমন কোনো কাজ নেই। আভিধানিক অর্থে তারা বেকার।

তবে দীর্ঘদিন বেকার থাকার ফলে তারা এলাকায় চিহ্নিত বেকার। চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের যেমন এলাকাবাসী সমীহ করে চলে, তমাল আর নিতাইলালকেও মানুষ সমীহ করে নাক সিটকায়, ‘ধূর ধূর’ উচ্চারণে উলুধ্বনি দেয়, নানান রকম হিতোপদেশ শোনায়। “কতজন কত কিছু করে খাচ্ছে, আর তোমরা?” ‘অকালকুষ্মান্ড’, ‘গোবর গণেশ’, ‘আমড়া কাঠের ঢেঁকি’…।
লোকমুখে এসব শুনে তমাল মাঝে মাঝে বলে, “আরো কিছু বলুন তো, ইন্টারভিউয়ে আজকাল এগুলোও খুব ধরে।”

ইদানীং তমাল আর নিতাইলাল চাকরী খোঁজার নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে। দেশে সন্ত্রাসী আর দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় অনেক চাকুরীজীবি নিহত হচ্ছে। দু’বন্ধু তাই আজিমপুর কবরস্থান আর ঠাঁঠারিবাজার শ্মশানে পালা করে ঘোরাফেরা করে। লাশ এলেই তরিৎ গতিতে প্রশ্ন করে এটা কোনো চাকুরীজীবির লাশ কিনা, মৃত ব্যক্তি চাকুরীরত অবস্থায় মারা গেছেন কিনা। যদি চাকুরীরত অবস্থায় মারা যায় তাহলে তারা কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে এইভাবে, “শ্মশানঘাটে/গোরস্থানে গিয়া জানিতে পারিলাম আপনাদের অফিসে একটি পদ শূন্য হইয়াছে…।”

ফলপ্রসূ কোনো উত্তর না পেয়ে তারা হাসপাতালেও খোঁজ খবর চালায়, কোনো মুমূর্ষ রোগী চাকুরীরত অবস্থায় আছে কিনা জানতে। নিতাইলাল একদিন এক মুমূর্ষ রোগীর বেডের পাশে সারাদিন দাঁড়িয়ে ছিল। রোগীর আত্মীয় স্বজন ভাবে ছেলেটার কত বড় মন। এ যুগে এমন ছেলে দেখাই যায় না। সহজ সরল নিতাই যখন আসল কাহিনী বলে দিল, মুমূর্ষ রোগী নিজেই নাকি উঠে নিতাইকে তাড়া করেছিল।

তবে তমাল মাঝে মধ্যে কামাল করে দেয়। রাজধানীর কুখ্যাত মোবারক সন্ত্রাসী এক লোককে ধরে বেদম পেটাচ্ছিল একদিন। তমাল দূর থেকে অনেকক্ষণ ধরে দেখছিল। একসময় কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, “এক্সকিউজ মি, আপনারা কি খালি হাতেই মারবেন? নাকি চাকু ঢুকানোরও সম্ভাবনা রয়েছে? ঢুকানোর আগে দয়া করে একটু জিজ্ঞেস করবেন কি তিনি কোন অফিসে চাকরী করেন?”
তমালের প্রশ্ন শুনে মোবারক সন্ত্রাসী বোয়াল মাছের মত হা করে থাকে। উদ্দেশ্য কি জেনে মোবারক তমালকে বুকে টেনে নেয়।

তমালের দূরদর্শিতায় সে মুগ্ধ। তারও একটা ব্যাচেলর ডিগ্রী আছে। চাকরী না পেয়েই নাকি এ পথে। আফসোস, তমালের এ পথটা যদি জানা থাকতো! তবে এখন সে নিজেকে নিয়ে খুব গর্ব করে। রাজধানীর টপ টেররের পদ তার দখলে! তার নিজের তিন তিনটে টয়োটা গাড়ি, রেগুলার সায়েদাবাদ টু নারায়নগঞ্জ ট্রিপ মারে। আগে আকিজ বিড়ি টানতো, এখন বেনসন সুইচ ছাড়া চলে না।
মোবারক খুশি হয়ে তমালকে চাকরী দিতে চায়। “গুলিস্থান সন্ত্রাসী সংস্থা”র একাউন্ট্যান্টের পদ। “আচ্ছা” বলে তমাল ঢোক গিলে কোনোরকম পালাতে পেরেছিল সেদিন।

তমাল যেমন সুন্দর, তার স্বপ্নগুলোও বেশ সুন্দর সুন্দর। স্বপ্ন দেখে তমাল আর নিতাইলালের চাকরী হয়েছে। তাদের সামনে বিশাল বিশাল টেবিল। টেবিলের উপর শ’খানেক ফাইল। ফাইল ছুটাতে এসে কেউ কেউ টেবিলের নিচে ‘ভাইটামিন’ সাধে। তমাল পূর্ব পশ্চিম দাঁত কেলিয়ে, আঙুল কুচি করে নিতে নিতে বলে, “আরে এসবের কি দরকার ছিল…কি দরকার ছিল এসবের…হে হে হে!”

সেই টাকা তমাল ইচ্ছামত উড়ায়। বিজ্ঞাপনের প্রিয় মডেলটিকে নিয়ে রিজেন্সীতে খেতে যায়। তার আবদারগুলো রাখে হাজার হাজার টাকায়। রাতের বেলা বস্ত্র ত্যাগ দিয়ে তমালকে স্বর্গ ঘুরিয়ে আনে। ভাবতেই তমালের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সব ফুলে ফেঁপে উঠে!
২.

দুধওয়ালার দুধ বেচে রাজা হওয়ার স্বপ্নের মত তমাল আর নিতাইলালও স্বপ্নই দেখে যায়, চাকরী আর হয় না। স্বপ্ন দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে গেলে তমাল পার্কে গিয়ে বসে। গান শুনে, রেডিওতে। মোবাইল তার নেই। বেকার মানুষকে কে ফোন করবে? কার এত জরুরী প্রয়োজন? ডোনাল্ড ট্রাম্পের? “হ্যালো, তমাল সাহেব? শুনেছেন, এন্তোনিও গুতারেস তো রিটায়ার করছেন। জ্বী জ্বী। জাতিসংঘের মহাসচিবের পদটা খালিই আছে। কবে জয়েন করছেন বলুন তো! আরে মশাই, কেউ বাগড়া দিতে পারবে না। আমি আছি তো। আপনি প্লিজ না করবেন না।”

ট্রাম্পের সাথে কাল্পনিক ফোনালাপে ভেটো দিল এক মধ্যবয়সী পথচারী। সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় কেমন আড়চোখে তাকাচ্ছিলো। তখন নিতাইয়ের কথাটা মনে পড়ে তমালের। পার্কে নাকি আজে বাজে মানুষ ঘোরাফেরা করে। লোকটা আবার এদিকেই আসছে। তমাল সামান্য নার্ভাস হয়ে পড়লো। সত্যিই যদি ওরকম কেউ হয়।

“মাফ করবেন, আপনার হাতে ওটা কি? ওয়ারলেসের মত দেখতে? রেডিও নাকি?”
লোকটার বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। ঘড়ি, দামী জুতা আর জগিং স্যুটে একটা আভিজাত্য ভাব আছে। তমাল সিদ্ধান্তে পৌছালো লোকটা ‘ঐরকম’ কেউ না।

— হ্যা রেডিও।

— দেখি দেখি!
লোকটা প্রায় একফুটের কাছাকাছি চলে এসেছে।
“বাহ্! আজকালকার জেনারেশনও ট্রানজিস্টর ব্যবহার করে! সত্যিই, অবাক হলাম।”

লোকটি হাসিমুখে রেডিওটি ফিরিয়ে দিয়ে আবার জগিং করতে করতে চলে গেল।

কয়েকদিন পর আবার দেখা। দূর থেকেই জিজ্ঞেস করছে, “এই যে রেডিও ম্যান, কি খবর আপনার?” তমালও ভদ্রলোক ভেবে হাসিমুখে উত্তর দেয়। কথা বলে। জানতে পারে লোকটির নাম শাহাদাত রহমান। আস্তে আস্তে শাহাদাত রহমানের সাথে তমালের ভাল খাতির হয়ে যায়। দুজনে পার্কের বেঞ্চিতে বসে জমিয়ে আড্ডা দেয়। তমাল তার আর নিতাইয়ের বেকার জীবনের গল্প শোনায়। গল্প শুনে শাহাদাত রহমান অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। একদিন হাসতে হাসতে বলে, “আপনারা পলিটিক্সে জয়েন করছেন না কেন? আজকাল স্টুডেন্ট পলিটিক্স কিন্তু ‘নিউ প্রফিটেবল জব ইন দ্য মার্কেট’।”
তমাল তার উত্তরে বোঝায় এসবে তার কোনো আগ্রহ নাই। পলিটিক্স একটা লস প্রজেক্ট। টেম্পোরারি। ক্ষমতাবদল হলেই খেলা ডিসমিস! তার উপর বিরোধী দলের হুমকি ধামকি তো আছেই।

“তাই বলে শুধু চাকরীতেই ঝোঁক কেন? কালচারাল কোনো গুণ থাকলে তাতেও কিন্তু উন্নতি করা যায়।”
শাহাদাত রহমান প্রশ্ন শুনে তমাল বলে,
“অভিনয়ে ভীষণ আগ্রহ ছিল। স্কুল-কলেজের প্রোগ্রামে সবসময় অংশ নিতাম। ভালই করতাম।”
“কিন্তু?”
এখন কেন আগ্রহ নেই জানতে শাহাদাত রহমানের কৌতুহল হচ্ছে।

“আসলে গায়ের রঙ ভাল দেখে আয়োজকরা সবসময় বেছে বেছে মেয়ে রোলগুলো দিত আমাকে। আমার তাতে সমস্যা ছিল না। একবার আব্বা কি করে যেন জানতে পেরে সরাসরি মঞ্চে উঠে আমার কান ধরে বাড়ি নিয়ে আসে। সেই থেকে…।”

তমালের চোখে মুখে লজ্জা। শাহাদাত রহমান “আহারে” বলে আবার হাসতে থাকে।

তমালের খেয়াল হল এতদিন হয়ে গেছে শাহাদাত রহমান কি করে তা-ই জানা হল না। তমালের প্রশ্ন শুনে শাহাদাত রহমান রহস্য করে বলে, “আমি কি করি তা তো এখন বলা যাবে না। জানতে হলে আমার বাসায় চলেন একদিন। নাকি ভয় পাচ্ছেন?”

তমাল ঈষৎ রেগে গিয়ে বলে, “ভয় পাওয়ার কি আছে? বাচ্চা নাকি আমি? আসব কবে সেটা বলুন।”
৩.

সব শুনে নিতাই প্রচন্ড ক্ষেপে যায়।
“তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? তোকে না বললাম পার্কে অপরিচিত কারো সাথে কথা বলবি না। বাসায় যেতে বলল আর তুই ঢ্যাং ঢ্যাং করে রাজী হয়ে গেলি, গর্দভ কোথাকার।”

তমাল অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিতাইয়ের কথা শুনছে। ভাবছে শাহাদাত রহমান যদি নিতাইয়ের মতে আজে বাজে লোক হয়, কি করবে তখন। নাকের উপর দুটো ঘুষি মেরে পালিয়ে আসবে? তমাল খেয়াল করলো তার ভাবনায় সে ধরেই নিয়েছে কাল শাহাদাত রহমানের বাসায় তমাল যাচ্ছে।

পরদিন বিকেলবেলা জগিং শেষে শাহাদাত রহমান তমালকে সঙ্গে করে বাসায় ফিরল। পার্ক থেকে দশমিনিটের পথ। তমাল ভেতরে ভেতরে ভয় পাচ্ছে। কিন্তু বাইরে বোঝাচ্ছে না। শাহাদাত রহমানের এপার্টমেন্টটা বেশ বড়। দামী দামী আসবাবপত্র রাখা। কিছু এন্টিক ফার্নিচারও চোখে পড়লো তমালের।

— পরিবারের বাকীরা কোথায়?
— বাবা মা নেই। একটাই ছোট বোন, মেয়েকে নিয়ে নীচের ফ্লোরে থাকে। হাসব্যান্ড থাকে বিদেশে। আর আমি এখানে একাই। অবিবাহিত। তোমাকে বলা হয় নি আগে। চল আমার রুমে চল।

অবিবাহিত বলার পরই রুমে যেতে বলা! ব্যাপারটা তমালের ভীতিকর লাগছে। আশঙ্কা করছে লোকটা অন্যকিছু চায়। এখন আফসোস হচ্ছে তার, কেন যে নিতাইয়ের কথা শুনলো না।

ভেতরে ঢুকে অস্বস্থি কাটাতে তমাল প্রশ্ন করে,

“তো আপনার রান্না বান্না, বাসার বাকীসব কাজকর্ম কে করে?”
“ছগীর আছে তার জন্য। আমার বৃদ্ধ ব্যাচেলর জীবনের নোয়া’স বোট! হা হা।”
শাহাদাত রহমান রিস্টওয়াচটা খুলতে খুলতে বলে। তারপর কম্পিউটারে গান ছেড়ে দিয়ে গোসলে ঢুকে যায়। তমাল চুপচাপ বিছানায় বসে অপেক্ষা করছে শেষটা দেখার জন্য। কোনো কুপ্রস্তাব দিলে কি বলবে ভাবছে। ব্যাপারটা তো এমন না যে সমকামী বলে তাকে যার তার সাথে শুতে হবে। অস্থিরতা কাটাতে পায়চারী করতে করতে তমাল খেয়াল করলো দেয়ালে বেশ কিছু ছবি বাঁধানো ফ্রেমে। প্রত্যেকটাতে শাহাদাত হোসেন। তার বিভিন্ন বয়সে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ছবি। কোনোটাতে নাচ করছে। কোনোটাতে গান গাইছে। মঞ্চ নাটক করছে। মেডেল নিচ্ছে। তমাল যত দেখছে তত অবাক হচ্ছে। লোকটাকে নিয়ে ধাঁধায় পড়ে গেছে সে।

শাহাদাত রহমান বের হল। কাপড় বাথরুমেই পড়েছে। ছবিগুলোর সামনে তমালকে দেখে হাসলো।

“হ্যা ঠিকই ধরেছেন, আমি একসময় থিয়েটার করতাম। নাচ-গান সবই। বোনকে নিয়ে শিল্পকলায় যেতে যেতে আমিও কবে যেন জড়িয়ে গিয়েছিলাম।”

তখনই ছগীর এসে বলে, “স্যার, রবার্ট স্যার আসছেন।” শাহাদাত রহমান ভেতরে পাঠিয়ে দিতে বলে। এদিকে তমালের বুক দুরুদুরু করছে। এখন আবার কে এল!

বেশ সুদর্শন সুঠাম দেহের এক লোক ভেতরে ঢুকলো। জিমন্যাস্টদের মত শরীর আর ঝকঝকে দাঁত যে কারোরই চোখে পড়ার মত। বয়স তিরিশ/বত্রিশ হবে।

“রবার্ট, কি ছেলে পাঠিয়েছো? দু দিন পর পর ছুটি নেয়। তিনদিনের কথা বলে ছুটি নিয়ে আটদিন হয়ে গেল লাপাত্তা। এরকম করলে ব্যবসা চলে? নতুন কাউকে জোগাড় করে জলদি। এবার একটু ম্যাচিউর দেখে নিও।”

রবার্টের ভরাট গলায়ও খানিকটা বিরক্তি।
“বলবেন না স্যার আর। চরম বেয়াদব ছেলেটা। আগে জানলে পাঠাতাম না।”
রবার্ট তমালের দিকে চোখ পড়লে বলে,
“এনিওয়ে, স্যার উনাকে তো চিনলাম না।”

“মিট তমাল মাহমুদ। উনি আমাদের কালকের কাজটায় সাহায্য করবেন।”
শাহাদাত রহমানের কথা শুনে তমাল চমকে উঠে। কীসের কাজ? তাকে তো আগে কিছু জানানো হয় নি। একে তো গোলমেলে কথা বার্তা, তার উপর রহস্যময় আচরণ। আর কোন ছেলের কথাই বা বলছিল একটু আগে? তাকে দিয়ে কীসের ব্যবসা করায় তারা?

শাহাদাত রহমান সেলফোন টিপতে টিপতে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকেই বলে, “তমাল, পরিচয় হয়ে নিন রবার্ট পিটারসনের সাথে। আগামীকাল অনেকটা সময় ওর সাথে আপনার থাকতে হবে।”

তমাল এবার সাহস করে মুখ খুললো। জানতে চাইল উনি আসলে কি চাচ্ছে। তাকে দিয়ে কি করানো হবে। কেন এত রহস্য।

তমালের হালকা রেগে যাওয়া কন্ঠ শুনে শাহাদাত রহমান হেসে ফেলে। সেলফোন
টেবিলে রেখে তমাল আর রবার্ট, দুজনকেই বসতে বলে বিছানায়। তারপর তমালের দিকে তাকিয়ে বলে,

—- এত উদ্ভিগ্ন হবার কিছু নেই না। আপনার কনসেন্ট ছাড়া কিছুই হবে না। ভয় পাবেন না। আপনি আগে আমাদের কথাগুলো মনযোগ দিয়ে শুনুন। রবার্টকে অফিস থেকে বাসায় ডেকে আনার এটা অন্যতম কারণ।

তমালের আশঙ্কা কাটে নি তখনও। ভেতরে ভেতরে ভয়ে মুষড়ে পড়ছে। কেমন জানি দম বন্ধ লাগছে। ধৈর্য ধরে বসে আছে তাদের কথা শেষ হওয়ার অপেক্ষায়। এখান থেকে বের হতে পারলে বাঁচে!
৪.

বাসায় ফিরলো তমাল কয়েক মণ চিন্তা নিয়ে মাথায়। কিছুক্ষণ আগে তাদের কথাগুলো শুনে প্রচন্ড এক্সাইটমেন্ট কাজ করছে। সাথে হালকা ভয়। দ্বিধাগ্রস্ত মন স্থির করতে পারছে না কিছুতেই। “বেকার আছি এটাই ভাল, কি দরকার উটকো ঝামেলায় জড়ানো। অতিরিক্ত কৌতুহল না আবার বিপদ ডেকে আনে!”

মানুষের কৌতুহল আজব জিনিস। তমাল ঠিকই নির্দিষ্ট দিনে, নির্দিষ্ট ঠিকানায় , নির্দিষ্ট সময়ে পৌছালো। রোমাঞ্চিত মন টানতে টানতে নিয়েই এল অবশেষে। নিতাইকে এ ব্যাপারে কিছুই জানানো হয় নি। শাহাদাত রহমানের মতে বিষয়টি আপাতত বাইরে না যাওয়াই ভাল।

কলিং বেলে চাপ দেওয়ার আগে তমাল ঠিকানাটা আরেকবার মিলিয়ে নেয়। ‘৪৭/১, ঠিকই আছে।’
এক ভদ্রমহিলা দরজা খুললো। তমাল নিজের পরিচয় বলতেই ভেতরে ঢুকতে দিল হাসিমুখে।

ছিমছাম বাসা। নেহাৎ মধ্যবিত্তের বাসা যেমন হয় তেমনি। পুরানো সোফাসেট, সেন্টার টেবিল, তার নীচে পুরানো খবরের কাগজ, সাইড টেবিলে ফুলদানী, টেবিল ক্লথ, সোফার কভারে হাতের কাজ। সর্বত্র পরিপাটির ছাপ। দেওয়ালের একপাশে শিশু যীশুকে কোলে নিয়ে মা মেরীর বিশাল ছবি ঝুলছে, অন্যপাশে ভিন্চির “দ্য লাস্ট সাপার”।

মহিলা ট্রেতে করে চা আর নাস্তা নিয়ে ঢুকেছে। তমালের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, “একটু চা খান।”
তমাল সংকোচ করে, “এসবের দরকার ছিল না।”
মহিলা আবার বলে, “বিকেল বেলা, চায়ের সময়ই তো এখন। খান একটু।”
বলে নিজেও এক কাপ টেনে নেয়।

কলিংবেলটা আবার বেজে উঠে। তমালের ধারণাই ঠিক , রবার্ট এসেছে।
“আরে! একদম অন-টাইম! বাহ্।”
হাস্যজ্জ্বল মুখে তমালের পাশে বসতে বসতে বলল। আজ তার পরনে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবী। এ কদিনে শেভ না করে হালকা দাড়ি-গোঁফও রেখেছে ট্রিম করে। অথচ প্রথম দিন তাকে ক্লিন শেভে দেখেছে তমাল। আজ দেখতে অপূর্ব লাগছে।

“জেনি দি, উনাকে ভেতরে নিয়ে যান। রেডি করে ফেলুন। সময় ব্যয় করে লাভ নেই।”
রবার্ট ভদ্রমহিলাকে বলে।

মহিলা তমালকে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসায়। চিরুনী দিয়ে সিঁথি করতে করতে বলে, “আপনার চুল বেশ সিল্কি, লম্বাও তো আছে ভালই। পরচুলা লাগবে না। গুছি দিয়ে বেঁধে দিলেই চলবে।”

কিছু না বলে তমাল মাথা তুলে বসে। প্রচন্ড অস্বস্থি বোধ করছে।
উপলব্ধি করলো স্কুলের নাটকে মেয়ে সাজা আর এখানে মেয়ে সাজার মধ্যে আকাশ পাতাল তফাৎ।
চুল বাঁধা শেষ হলে মহিলা পেটিকোট হাত ধরিয়ে দিয়ে বলল প্যান্টটা খুলে এটা পড়তে। শার্ট আগেই খুলে রেখেছিল উনার কথায়। এরপর তিনি কোমরে, পেটে, গলায় মেক-আপ দিয়ে আঁটসাঁট অন্তর্বাস আর ব্লাউজ পরিয়ে দিল। নিপুণ হাতে ম্যাচকরা শাড়ি কুঁচি দিয়ে পরালো। শুরু হল মুখমন্ডলের কাজ। বেশ কিছুক্ষণ ধরেই চলল ফাউন্ডেশন, মাসকারা, আই ল্যাশ, আই শ্যাডো ইত্যাদির ব্যবহার। হাতে, গলায় পরানো হল ইমিটেশনের গহনা। সাথে একটি রিস্টওয়াচ। শেষ হল সিঁথিতে লম্বা সিঁদুর টেনে। তমাল অবাক হল যখন দেখে মহিলা বক্স থেকে একজোড়া ছয় নাম্বার জুতা বের করে দিল তাকে। জুতা পড়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তমালের মিশ্র প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। ভাবছে তাকে এ অবস্থায় কেউ দেখলে কী ভাববে। অবশ্য চিনতে পারার কথা না। কারণ চব্বিশ বছরের তমাল দেখতে এখন পঁচিশ/ছাব্বিশ বছরের সুন্দরী তমালিকা!

ড্রয়িংরুমে ফিরতেই রবার্ট তমালকে পা থেকে মাথা অব্দি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো। হাসতে হাসতে বলে “জেনি দি, এক্সিলেন্ট! নিখুঁত হয়েছে।”

বেরুবার আগে মহিলা তমালের হাতে একটা ভ্যানিটি ব্যাগ ধরিয়ে দিয়ে বলে, “একটা পার্স ছাড়া ভদ্রমহিলাদের মানায় না।”

সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথে দুজন বের হল। পাশাপাশি হাঁটছে। মোড় পর্যন্ত এসে রিকশা নেয়। উঠে বসার পর রবার্ট বলে, “দেখে মনে হচ্ছে না নতুন বিয়ে হয়েছে আমাদের?” বলে নিজেই হাসতে থাকে।

৫.

বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর রবার্ট যেন অন্যমানুষ। কথায় কথায় হাসছে। কাছে দূরে এটা ওটা দেখাচ্ছে। সঙ্গিনীর প্রতি বেশ আগ্রহ থাকলে যেমন হয়।

লেকের পাশে দুজন অনেকক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে পার্কের দিকে এগুতে থাকে। সূর্য ডুবে গেছে পুরোপুরি। রাস্তায় জ্বলতে শুরু করলো সোডিয়াম লাইট। পার্কে ল্যাম্পপোস্ট থাকলেও বেশীরভাগ জায়গাতেই অন্ধকার। মানুষ কম। কুপি বাতি নিয়ে বাদামওয়ালারা এদিক ওদিক খদ্দের ধরছে।

তমাল আর রবার্ট খানিকটা আলো আছে এমন জায়গায় ঘাসের উপর বসে। রবার্ট সিগারেট ধরায়। বসতে দেরী হল বাদামওয়ালার আসতে দেরী হয় নি। বারবার আসবে ভেবে রবার্ট বলে, “দে পাঁচ টাকার।”

বাদামের খোসা ছাড়াতে গিয়ে পাঞ্জাবীতে সিগারেটের ছাই পড়ে যাচ্ছিলো বারবার। তমাল ব্যাপারটা খেয়াল করে।
ঠোঙাটা নিজের হাতে নিয়ে খোসা ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে রবার্টের হাতে দিতে থাকে। রবার্ট দুষ্টুমির সুরে বলে, “এত ভালোবেসো না সোনা, মরেই যাব তাহলে!”
লজ্জা পেয়ে তমাল কিল মারতে গেলে রবার্ট হা হা করে হাসে।

পিছন থেকে আচমকা একটা কর্কশ আওয়াজ। “এই চা গরম! গরম চা।”
চাওয়ালা তমালের প্রায় ঘাড়ের কাছে মুখ এনে বলে, “ম্যাডাম, চা লাগবে?”

রবার্ট ধমকের স্বরে বলে, “এই যাও, চা লাগবে না।” চাওয়ালা সরে যেতেই রবার্ট জোরে জোরে বলে, “ভয় পেয়ো না, সুন্দরী মেয়েছেলে দেখলে অসভ্যগুলোর মাথা ঠিক থাকে না।”
সাথে সাথে আবার গলার স্বর নামিয়ে ফেলে। “এদের কেউ কেউ ছিনতাইকারীদের ইনফর্মার।”

চাওয়ালা যাওয়ার মিনিট পনেরো পার হয়েছে। ওরা দুজন গল্পে মশগুল। তমাল দুটো লোককে এদিকেই হেঁটে আসতে দেখলো। যাওয়ার সময় আড়চোখে তমালদের এক নজর দেখে নিয়েছে। পাশ কাটিয়ে একটু সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালো। তমালের কেমন ভয় লাগছে। রবার্ট যেন ব্যাপারটা আমলেই নিল না। যেমন গল্প করছিল তেমনিই করছে। তমাল হঠাৎ আরো দুজনকে উল্টা পাশ থেকে আসতে দেখে। হালকা আলোতে চেহারা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। পেছনের দুজনও হেঁটে আসছে খুব দ্রুত। কাছে এসেই চা পাতি আর চাকু বের করে বলল, “খবরদার চেঁচাবি না। ভালো মানুষের মত যা যা আছে দিয়ে দে।”

তমাল ভয়ে রবার্টের বাহু খাঁমচে ধরে। রবার্ট ভয়াতুর গলায় বলে, “প্লীজ, মারবেন না ভাই! সব দিয়ে দিচ্ছি।”

৬.

রবার্ট তাড়াতাড়ি করে হাতের ঘড়ি, মোবাইল আর মানিব্যাগ তাদের সামনে নীচে রেখে দেয়। একজন আগ বাড়ালো তমালের গা থেকে গহনা খুলতে। রবার্ট তড়িঘড়ি করে বলে, “প্লীজ আপনারা ওকে টাচ্ করবেন না, আমি খুলে দিচ্ছি।”

তখনই হ্যান্ডমাইকে আওয়াজ, “পুলিশ! কেউ নড়বে না। নড়লেই গুলি।”
বিশ/পঁচিশজন পুলিশ তাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলেছে। একজন দৌড় দিতে গেলে রবার্ট ল্যাং মেরে ফেলে দেয়। তখনই বিশাল বিশাল সার্চলাইটগুলো মুখে এসে পড়ে। ল্যাং খাওয়া লোকটার চেহারা দেখে তমাল অবাক! “আরে! একী! আপনি সন্ত্রাসী মোবারক না?”

মহিলার গলায় পুরুষ কন্ঠস্বর শুনে মোবারকসহ বাকীরা আৎকে উঠে। পুলিশ কাছাকাছি আসতেই মোবারক বলে, “স্যার দেখেন স্যার, দেখেন, ছিনতাইয়ের নতুন কৌশল। মাইয়া মানুষ সাইজা অন্ধকারে ঘাপটি মাইরা বইসা ছিল। হাঁইটা যাওয়ার সময় আমাগো উপ্রে চা পাতি লইয়া অ্যাটাক করছে। অ্যারেস্ট করেন স্যার দুইটারেই।”

বিশ/পঁচিশজনের ট্রুপ থেকে দুই হাতে চার সন্ত্রাসীরই কলার চেপে ধরলো পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের ডেপুটি কমিশনার শাহাদাত রহমান!
রবার্ট সামনে এগিয়ে মোবারকের মুখে ধরাম্ করে একটা চড় বসিয়ে দেয়, “ছয়টা মাস ঘুরিয়েছিস চান্দু। ঘুঘু পাখি সেজেছিলি? এবার ফাঁদ দেখেছিস? পি.টি.ইউ অফিসারকে বলিস ছিনতাইকরী?হারামজাদা!”
বলেই রবার্ট মোবারকের পেটে জোরসে ঘুষি মারতে থাকে।

চার সন্ত্রাসীকে নিয়ে তোলা হলো পুলিশের ভ্যানে। রবার্ট আর তমাল উঠলো শাহাদাত রহমানের জীপে। রবার্ট বসেছে ড্রাইভারের পাশে। শাহাদাত রহমান আর তমাল পেছনের সীটে। হাসাহাসির এক পর্যায়ে শাহাদাত রহমান তমালের দিকে তাকিয়ে বলে, “তারপর মিস্টার তমাল, বলেন কেমন বোধ করছেন। আমার সম্পর্কে আপনার মনে কি ধারণা জন্মেছিল সেটাও শুনতে চাই।”
“কি ভেবেছিলাম সে প্রসঙ্গটি থাক দয়া করে। সেদিন আপনার বাসায় আপনাদের আসল পরিচয় আর প্ল্যানটা জানতে পেরে লজ্জায় আমার মাথা কাটা যাচ্ছিল। সাথে অনেক শ্রদ্ধাও চলে এসেছে। আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ যে আপনাদের একটা অপারেশনে আমি ইনভলব্ হতে পেরেছি। নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি।”
তমালের চোখে মুখে আন্তরিকতা।

শাহাদাত রহমানও তমালকে ধন্যবাদ জানায় তাদের উপর বিশ্বাস রাখার জন্য।
“আর হ্যাঁ তমাল, আপনার সিভিটা জমা দিন তো আমার কাছে। ডিপার্টমেন্ট কিছুদিনের মধ্যেই সার্কুলার ছাড়বে। আমি রিকমেন্ড করে দিব। অবশ্য যদি আপনি এই ফিল্ডে কাজ করতে আগ্রহী,তো। কিন্তু হ্যাঁ, ঐ ফাইল চালাচালির স্বপ্ন ত্যাগ দিতে হবে। আমাদের অফিসে কিন্তু ওসব চলে না।” বলেই শাহাদাত রহমান আর রবার্ট হো হো করে হাসতে থাকে।
তমাল এদিকে কিংকর্তব্যবিমূঢ়! নিজের কানকে যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। তবে কি সোনার হরিণ শেষমেষ ধরা দিতে যাচ্ছে! তমাল আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লো। নিজেকে সামনে নিয়ে ধন্যবাদ জানায় শাহাদাত রহমানকে।

“স্যার, আমি আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবো। কিন্তু আমার আরো একটি আবদার আছে।”

শাহাদাত রহমানের চোখে কৌতুহল।

“সেদিন যে শুনলাম আপনার বোনের সুপার স্টোরের ম্যানেজার চাকরি ছেড়ে চলে গিয়েছে, ওখানে কি আমার বন্ধু নিতাইলালকে নেওয়া যায়?”
তমাল বলতে গিয়ে ভীষণ অস্বস্থি বোধ করছিলো। কেটে যায় শাহাদাত রহমানের কথায়।
“তাই তো! এটা কেন আমার মাথায় আসে নি আগে? ওকে কালই আমার বাসায় পাঠিয়ে দিবেন।”
দু’এক মিনিট পর শাহাদাত রহমানই নীরবতা ভেঙে বলে, “বাই দ্য ওয়ে রবার্ট, এমন একটা মিষ্টি মেয়ে পেলে,” তমালকে দেখিয়ে বলে, “ বিয়ের কথাটা আরেকবার ভাবতাম! আফসোস, বয়সটা নেই।”
রবার্ট স্বভাবসুলভ রসিকতা করে পেছনে তাকিয়ে বলে, “স্যার আপনার বয়স নেই, আমার তো আছে! আমিই ভাববো নাকি?” বলেই দুষ্টমির চোখে তমালের দিকে তাকায়। তমাল লজ্জায় কাঁচুমাচু হয়ে যায়। কিন্তু শাহাদাত রহমানদের হাসি যেন থামেই না।

রবার্ট তমালকে বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দেয়। তমালের গায়ে এখন স্বাভাবিক পোশাক। বিদায় নেওয়ার সময় রবার্ট বলে, “তমাল, আমার যে একটা বউই লাগবে তা কিন্তু না।”
একটা রহস্যময় হাসি ছুঁড়ে রবার্ট চলে যেতে থাকে। এদিকে তমাল ভাবছে এত আনন্দ নিয়ে আজ ঘুমাতে পারবে সে? কিংবা আজ না ঘুমালে হয় না? প্রাণের বন্ধুকে রূপকথার গল্পটি শুনিয়ে তার ঘুমটাও কেড়ে নিলে কেমন হয়?

লেখকঃ শাদ

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.