আগমনী পত্র

প্রিয় রণজয়,
আশা করি তুমি ভালো আছো? খুব অবাক হচ্ছো আমি মোবাইল ছেড়ে কাগজে কলম কেন ধরেছি… তাই তো? আজ বড় ইচ্ছে করছে তোমায় কিছু বলতে। কতবার বলেছি এবার ইন্টারনেট এর দুনিয়ায় নিজের আত্মপ্রকাশ ঘটাও, আমিও তবে তোমার চেহারাটা একটু দেখতে পাই। এতো দিনে নিশ্চয়ই মুখের ভাঁজে বয়সের ছাপ পড়েছে, শরীরে মেদ ঝুলতে শুরু করেছে। হয়তো বা এখনও সেই রকমই লৌহমানবই আছো। আজ বড় ইচ্ছে করছে তোমায় দেখতে, তোমায় কিছু বলতে যে কথা তোমার অতি ব্যস্ত সময়ে ফোনে বলা যায় না। তাই এই চিঠি ধরলাম। যা সময় নিয়ে লেখা যায়, সময় করে পড়া যায়।
জানো রণ, আজ অটো করে ফেরার সময় তোমাদের ওই পুরোনো কোয়াটারের রাস্তা দিয়ে আসছিলো অটোটা। ব্রিটিশ আমলের সেই লাল রঙের পুলিশ কোয়াটারগুলো আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু নেই মানুষগুলো, যাদের জীবনের সবটুকু ছিল ওখানে। তিন তলার উপরে তোমার ঘরের বন্ধ জানালাটার দিকে তাকিয়ে মনে হল তুমি আজও আমাকে ডাকছো ওর ভিতর থেকে। পরিত্যক্ত সেই বাড়িটা মনে হলো আজও আমাকে ডাকছে ঠিক যেমন আজ থেকে সাত বছর আগে ডাকতো।

বিষণ্ণতার ছায়ায় ডুবেছি আজ। তুমি জানো এখন আমি কোথায় বসে এই চিঠিখানি লিখছি? তুমি জানবেই বা কী করে? আমি এখন বসে আমাদের সেই হাই স্কুলের পিছনের বড় মাঠটার ধারে, যেখানে আমরা আসতাম ওই ভাঙ্গা পাঁচিলের ফোকর দিয়ে, বসতাম এই কৃষ্ণচূড়ার তলায়। আজ মনে হচ্ছে এই গাছটাও বুঝি আমাকে জিজ্ঞেস করছে, তুমি কোথায়?
সেদিন যদি আমি, তোমার ওই জিপ গাড়িটার সামনে এসে না পরতাম তবে হয়তো এই পৃথিবীতে একটা ভালোবাসার গল্প কমে যেত। আমাকে সামান্য কিছু অর্থ ধরিয়ে দিয়ে তুমি দায়মুক্ত হতে পারতে, পারতে সামান্য কিছু শুশ্রূষার দ্বায়িত্বমাত্র নিতে। কিন্তু সেদিন তার থেকেও বড় কোনও দ্বায়িত্ব তুমি নিয়েছিলে আমার প্রতি যেটা আমার বুঝতেই সময় বয়ে গেলো।

তুমি এসেছিলে আমাদের থানার বড়বাবু হয়ে মানে ওই ইন্সপেক্টর অফিসার হিসেবে। তোমার সময় ছিল সাময়ি কিন্তু আমার কাছে তুমি দিয়ে গেলে এক চিরন্তন স্মৃতি। আজ এই মাঠটা পুরো ফাঁকা; কেউ আসে না খেলতে। সবাই বড় হয়ে গেছে। শুধু আমি একা বসে বসে ভাবছি সেদিনের ছবিগুলো যখন সুযোগ পেলেই থানার কাজ সেরে পড়ন্ত বিকেলে গুম গুম আওয়াজ করে বাইকে এসে দাঁড়াতে ওই ভাঙা পাঁচিলের ধারে। আমি তখন একুশের ছোকরা কলেজ থেকে এসে বসতাম এই কৃষ্ণচূড়ার নিচে আর অপেক্ষা করতাম কখন তুমি আসবে। কী এক প্রাণবন্ত দৃশ্য ছিল যখন একরাশ উদ্দীপিত মুখর ভঙ্গীতে ছুটতে ছুটতে আমার কাছে এসে খুলে ফেলতে ওই খাকি উর্দিটা, আমার উপর ছুঁড়ে দিতে তোমার ওই দিনরাতের ঘামে ভেজা পুলিসের শার্ট আর স্যান্ড গেঞ্জিটা। তারপর তোমায় আর পায় কে? তিরিশের কোটার ওই বড়বাবু তখন নিজেকে অর্ধেকে নামিয়ে মাঠে নেমে পড়তো ফুটবলের নেশায়। মাঝেমাঝেই শুকনো মাটিতে পরে মাখতে ধুলো, মাখতে কাদা; আমার বারণ তুমি কখনই শুনতে না। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে ভাগ্যিস শুনতে না, না হলে সেই বিচিত্র দৃশ্যটা দেখার সৌভাগ্যও আমার হত না, যখন সন্ধ্যে নামার আগে পাখিরা ঘরে ফিরত, পশ্চিমা আকাশ যখন ঘন লাল থেকে অন্ধকারের পথে ধাবিত হত তুমি খেলার শেষে আমার দিকে আসতে; আমি চেয়ে চেয়ে দেখতাম এক কালচে বাদামী চামড়ার দীর্ঘাঙ্গদেহী পুরুষ শরীরময় ধুলার আবরণে আবৃত হয়ে এগিয়ে আসছে। মাথার ঝাঁকালে ঝরে পড়ত বিন্দু বিন্দু রাশি। ঠোঁটের কোণে থাকতো এক পরমানন্দের হাসি, যেন দিনের ওইটুকু সময়ই জীবন ফিরে পেতে। তুমি হয়তো জানো না, ওইটুকু দেখাই ছিল আমার কাছে পরম প্রাপ্তি।

তোমার মনে আছে কিনা জানি না, তোমার এক বদভ্যাস ছিল খেলার শেষে আমার কাছে এসে তুমি তোমার রুমালটা চাইতে। কিন্তু আমি আমার নিজের রুমালটা তোমায় দিতাম আর সেটা দিয়ে তুমি সারা শরীরের ঘাম মুছতে, এমনকি দুষ্টুমি করে নিজের প্যান্টের ভিতরও ওই রুমাল ঢুকিয়ে মুছতে। লোকে শুনলে যে কি প্রচন্ড ছিঃ ছিঃ করবে কে জানে? কিন্তু আজ সেই সত্যিটা বলছি, আসলে তোমার ঘামের গন্ধটা প্রাণ ভরে শোষণের এর চেয়ে ভালো উপায় আমার ছিল না। তুমি হয়তো জানো না, আমি রাত্রি পর্যন্ত ওটাকে নিয়েই পড়তে বসতাম কারণ ওটাই হয়ে গিয়েছিল আমার নেশা।
তোমার মনে পরে রণ, যেদিন তুমি খেলার মাঠ থেকে বাইকের পিছনে বসিয়ে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলে তোমার ওই পাঁচতলা কোয়াটারের ঘরে আমার সত্যিই একটু একটু ভয় লাগছিলো। কিন্তু তোমার ওই পরম স্নেহশীল ব্যবহার, আমার কাঁধে হাত রেখে অভয়দান বা কপালের মাঝে এক সত্যিকারের আদুরে চুম্বন আমাকে বুঝিয়েছিল এটা ভালোবাসা ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না। আমার অভ্যেস হয়েছিল সময়ে সুযোগে তোমার ঘরে চলে যাওয়া। বাইরের সেই রক্তচক্ষুর কঠিন হৃদয়ের পুলিশ অফিসারের চেনা চেহারার ভিতরে লুকিয়ে থাকা এক অন্য মানুষ যে কিনা অর্ধনগ্ন শরীরে কখনও শুধু জাঙ্গিয়া, কখনও বা হাফপ্যান্ট পরে কখনও ইলিশ তো কখনও রুই মাছের কালিয়া রাঁধতে ব্যস্ত এক আদ্যপ্রান্ত ভেতো বাঙালিকে দেখার সৌভাগ্য এই শহরে আমি ব্যতীত আর কারোর হয়েছে বলে তো মনে হয় না। আসলে, তুমি হয়তো জানো না, তোমার ওই বাথরুম থেকে কাঁপতে কাঁপতে ঘন লোমের ভেজা শরীরে বেড়িয়ে আশার অপরূপ দৃশ্যটা কিছুতেই হাতছাড়া করতে মন চাইত না। খুব ইচ্ছে করতো একদিন তোমার সাথে শাওয়ারের নিচে দাঁড়াই; কিন্তু সাহস হয়নি।
হয়তো তুমি জানো না, যখন তুমি আমাদের বড় রাস্তা দিয়ে যেতে বাজারের সব লোক আঙুল তুলে তোমার ওই জিপ গাড়িটার দিকে দেখাতো আর বলত “ওই যে আমাদের থানার বড়বাবু যাচ্ছে…” এটা আমি তোমায় কিছুতেই ভাষায় বোঝাতে পারবো না। আমার মধ্যে কী অদ্ভুদ রকমের আনন্দ হতো! মনে হত এ তো সবার জন্য বড়বাবু, আমার জন্য তো অন্য কেউ। আমার মধ্যে একটা সময়ের অপেক্ষার সৃষ্টি হত, ভাবতাম কখন আমার মানুষটা ঘরে ফিরবে, আবার কাছে পাবো।

তোমার প্রতি ভালোবাসা যে আমার মধ্যে তোমার প্রতি কামনার বিকাশ ঘটিয়েছিল সেটা অস্বীকার করার স্পর্ধা আমার নেই কারণ তার সাক্ষী তুমি নিজেই। তোমার প্রতি আমার দুর্বলতাই যে বাড়ে বাড়ে আমাকে টেনে নিয়ে যেত সেটা বোঝার বৌদ্ধিক ক্ষমতা তোমার মধ্যে বিদ্যমান। অথচ সব জেনেও আমি নিজেকে সামলে রাখতে পারিনি সেদিন; দুর্বলতার দোহাই দিয়ে চড়াও হয়েছিলাম তোমার উপর। মুক্ত করেছিলাম নিজের সবকিছু, উন্মুক্ত করে দিয়েছিলাম তোমাকেও। আমার দাঁত-নখের হিংস্রতা তোমার মত শক্ত সামর্থকেও রেহাই দেয়নি। তোমার লোহার চেয়ে শক্ত শরীর ছিল, হাতুড়ির থেকে কঠিন হাত ছিল, আমার ওপর বলপ্রয়োগের ক্ষমতা ছিল, আইন তোমার হাতে ছিল। ইচ্ছে থাকলেই তুমি আমাকে ইচ্ছেমত বিছানায় ব্যবহার করতে পারতে, কিন্তু তুমি সেটা করোনি। উপরন্তু আমি তোমাকে বাড়ে বাড়ে করেছি ব্যাবহার, খেলেছি তোমার শরীরটাকে নিয়ে আর তুমি বারবার আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছ শুধুমাত্র আমার কাঙ্ক্ষিত প্রতিদানটুকু। কারণ তোমার একটা হৃদয় ছিল, মনুষ্যত্ব বোধ ছিল, আর অন্তরে ছিল অকৃত্রিম ভালোবাসা। সেটা আমি জানতাম।

জানো রণ, আজ বড় লজ্জা লাগছে নিজের কর্মে, কোথায় যেন মন বলছে প্রেমের সুযোগে সঙ্গম ছিনিয়ে নেওয়াটা হয়তো একটু বেশিই অপরাধমূলক ছিল।
তুমি হয়তো জানো না, তুমি আমার জীবনের একমাত্র সেই যার সাথে আমরা দু’পক্ষই অন্তরের বিনিময় ঘটিয়েছি। তোমার প্রথম ছোঁয়া, প্রথম চুম্বন, প্রথম আত্মপ্রকাশ সবই আজও আমাকে শিহরিত করে। তুমি জড়িয়ে ধরে আমাকে বলেছিলে আমাকে ভালোবাসার কথা। তুমি আমাদের শহরে ছিলে মাত্র আড়াই বছর, সময়ের তুলনায় সেটা সামান্য হলেও আসলে তা আমার পুরোটাই জীবনটাই বদলে দিল। বদলে দিলো আমার চিন্তা, আমার আদর্শকে। প্রেম আর সঙ্গমকে যে আলাদা করেও রাখা যায় সেটার স্পষ্ট প্রমান তোমার সততা।
আজ দেখতে দেখতে দেখো সাতটা বছর কেটে গেলো। তোমার অসম্ভব ব্যস্ততা, অনবদ্য কৃতিত্ব, বিপুল দায়িত্ব সত্ত্বেও আজও মনে করে আমার খবর নাও। তুমি হয়তো জানো না, যখন তোমার বদলি হবার খবর এলো, আমার বুকের ভিতরটা এক নিমেষে ফাঁকা হয়ে গিয়েছিলো; কিছু মুহুর্তের জন্য ভেবেছিলাম আমি এবার অনাথের পথে, ভেবেছিলাম তুমি একটা সময় নিশ্চয় ভুলে যাবে আমাকে। কিন্তু আজও তোমার ওই একটা ফোন কল প্রমাণ করে আমি কতটা ভুল ছিলাম।

জানো রণ, আজ ভীষণ খারাপ লাগছে তোমার একাকীত্বটা দেখে। এই সাঁইত্রিশ বছরে এসেও তুমি নিজের জীবনটা একান্তই ব্যস্ত রাখো ওই তথাকথিত দুশমন দমনে। নিজের করে কিছুই হয়তো পেলে না। তোমার চলে যাওয়ার দিনটার শেষ মুহুর্তে ট্রেন ছাড়ার মাত্র মিনিট দশেক আগে আমি পৌছেছিলাম স্টেশনে। জানি না সেদিনের আমার ওই অবাঞ্ছিত আবদার রাখতেই তুমি এমনটা করলে কিনা? কিছু না ভেবেই বলে বসেছিলাম- “আমরা কি কখনই একসাথে থাকতে পারি না, ওই বিবাহিতদের মত?” তুমি উত্তর করেছিলে- “যেই দিনটায় তুমি সমাজকে ছেড়ে আসতে পারবে আমার কাছে সেই দিনটার জন্য আমি অপেক্ষায় থাকব…” আমি একবারও জানতে চাইনি তুমি চাও তবে তোমার ব্যবহারই তার উত্তর দিয়ে দিয়েছে। আজ মনে হচ্ছে সেই দিনটা আসন্ন। আজ ভালোবাসার মাস মানে ফেব্রুয়ারির দুই তারিখ। আজ থেকে সাত বছর আগে এই দিনটায় আমাদের দেখা হয়েছিলো ওই স্কুল মাঠের পাশে। এই সাতটা বছর পেরিয়ে এখন আমি বড় হয়ে গেছি। সমাজ নামক শিকলের দুর্ভেদ্যতা মাপতে শিখে গেছি। তাই মনে হয় এবার সময় হয়ে গেছে রণজয়; আমি আসছি তোমার অপেক্ষার অবসান ঘটাতে।

ইতি,
আমি।

লেখকঃ অরুন

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.