হারু

গ্রীষ্মের ছুটি,একটা অবসর সময় যাচ্ছে। তাই দিন দশেকের জন্য সিদ্ধান্ত হলো সিলেটে ফুপির বাড়ি বেড়াতে যাব।সেই বছর দশেক আগে একবার মায়ের সাথে যাওয়া হয়েছিল। বরাবরেই বেড়াতে যাওয়া আমার অনাগ্রহের শীর্ষে। তা যদি আবার আত্মীয় স্বজনের বাড়ি হয় তাহলে তো কথাই নেই । কিন্তু ভাইয়ার কথা ফেলতে না পারার একটা বদ অভ্যাস আছে । তাই আমার ভাগ্যের মা বোন এক করে রওনা হলাম । গাড়িতে উঠেই আমার ঘুমিয়ে পড়ার অভ্যাস নেই, কিন্তু আজ কিছুক্ষণ থেকে সেই একটা ঘুম দিলাম ।হঠাৎ ভাইয়ার ডাকে ঘুম ভাঙ্গল। প্রথম কথা

-“মহারাজ উঠেন আমরা এসে পড়েছি।”

আমি চোখ কচলাতে কচলাতে বললাম “এতো তাড়াতাড়ি!” ভাবী হেসে বলল তুমি ৪ ঘন্টা ঘুমিয়েছো। এবার সিয়াম নামো, আমাদের এখান থেকে এক কিলোমিটার হাঁটতে হবে।

এক কিলোমিটার!! আমার চোখ ব্রহ্মতালুতে পৌছে গেছে! নামতে নামতে নিজে নিজে গজগজ করছি
“এর জন্যই আমি আসতে চাইছিলাম না।একটা অজপাড়াগাঁ, একটা ভালো রাস্তা নেই, কোন দোকানপাট নেই,শুধু জঙ্গল আর জঙ্গল।”

ফুপির বাড়ি থেকে এক কিলোমিটার দূরে একটা গ্যারেজে আমাদের গাড়ি রাখার বন্দোবস্তো করা হলো।সরু মাটির রাস্তা আমরা হেটে চলছি, রাস্তাটা এত সরু যে সেখানে একসাথে তিনজন মানুষ পাশাপাশি হাঁটতেও পারবে না।আমি হাঁটছি আর আশে পাশে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি, একটা সময় আমি হোঁচট খেয়ে পড়ে যাই। ভাবি তা দেখে হাসতে থাকে। আর বলে
“এই সমান রাস্তায় পরে গেলে, বাসর রাতের আঁকা বাঁকা পথ পার হবে কেমনে?”

এই কথার পর ভাবি নিজেই আবার হাসাহাসি করতে লাগলো। ভাইয়া নির্বিকার। আমি প্যান্টের পিছনের ধুলা ঝাড়তে ঝাড়তে মনে মনে বললাম
“আল্লাহ মনে হয় ভাবীদের মুখে শরম বলতে কিছুই দেয়নাই” ।

অনেক কষ্ট করে শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলাম গন্তব্যে। আমাদের দেখে ফুপি খুব খুশি হলো । আর আমাকে দেখে তো চিনতেই পারে নাহ এমন অবস্থা । আর চিনবে কেমনে এসেছি সেই ১০ বছর আগে। স্বাগতম পর্ব শেষ হবার পর আমি দেকছি পেটে নাড়িভুঁড়ি হজম হয়ে যাচ্ছে খিদের ঠ্যালায়। ফুপি কে বললাম ” ফুপি আমায় খেতে দাও।আমার খুব ক্ষুধা পেয়েছে।” আমরা হাত মুখ ধুয়ে খেতে বসলাম।। খাওয়া শেষ করে আমরা বিশ্রাম নিলাম।ফুপির একটা ছেলে আছে নাম তার নয়ন। বয়স বছর দশেক হবে। বিকালে আমি আর নয়ন ঘুরতে বের হলাম। অনেক কিছু দেখলাম ভালো লাগলো। বাড়ি ফেরার পথে দেখা হলো একজনের সাথে। অনেক সুন্দর। বয়স ২২ কিংবা ২৫ হবে।অসম্ভব্য সুন্দর একজন পুরুষ, যে কেউ তার প্রেমে পড়বে এ কথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি।তার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম।কিন্তু সে আমার দিকেই আসছে। আমি চোখ নামিয়ে অন্য দিকে তাকালাম। হঠাৎ সে একেবারে আমার নিকটে এসে উপস্থিত হলো। আমার দিকে তাকিয়ে একটা সুন্দর হাসি দিলো।কি অপরুপ তার হাসি।এসেই বললো আমাকে টাকা দে নাহলে যাব না।নয়ন তাকে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলো। এই হারু এখান থেকে যা। ওনার কাছে টাকা নেই। আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না যে ছেলেটা মানসিক ভারসাম্যহীন। আমি পকেট থেকে টাকা বের করতেই সে এক থাবা দিয়ে দিলো দৌড়। নয়ন হা করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। তুমি এটা কি করলে ভাইয়া? কেন কি আবার করলাম।এই যে তুমি হারুকে টাকা দিলে, ও আবার আসবে।দেখো তোমাকে জ্বালিয়ে খাবে। খাক তোর কি? তোকে তো আর খাবে না আমাকে খাবে।আমার হিসেব আমি মিলাতে পারছিলাম না। যে এত সুন্দর একটা ছেলে সে কিনা পাগল। কি অপরুপ তার গঠন, কি সুন্দর তার মুখের হাসি, তার চোখ দুটো যেন মায়াবী। যে কেউ তার চোখে তাকিয়ে প্রেমে পড়ে যাবে। আমিও তার বিপরীত নয়।একজন সমপ্রেমী হিসেবে হারুর প্রতি কেমন একটা টান অনুভব করলাম। সাথে সমবেদনাও । তখন থেকে আমার মাথার মধ্যে শুধু হারু ঘুরপাক খাচ্ছিলো।সেদিন আর ঘুরতে পারলাম না।কি রে নয়ন আরো ঘুরবি। না ভাইয়া সন্ধ্যা হয়ে গেছে চলেন বাড়িতে যাই। সূর্য্যি ঠাকুর পাটে নামতে সামান্য বাকি ছিল। আমরা বাড়ি ফিরতে ফিরতে ঘোর অন্ধকার নেমে আসলো।

বাড়িতে ফিরে দেখি ফুপি পিঠার এক অশ্বমেধ যজ্ঞ শুরু করেছে ।আমার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল
-” কিরে সিয়াম এত সময় কোথায় ছিলি।”
এই বলে হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে কপাল মুছলো। হাতের কিছু আটা কপালে লেগে গেলো, বেশ সুন্দর দেখাচ্ছিলো ফুপি কে। আমি বললাম
-“এইতো পাশে একটু ঘুরতে গিয়েছিলাম।”
-“তো ঘুরতে যাস ভালো কথা, কিন্তু সাবধান পরিবেশ ভালো না।”

ফুপি অনেকক্ষণ ধরে বিলাপ করে যাচ্ছে। আমার সেদিকে কোন কর্ণপাত নেই, আমার চিন্তা শুধু হারু।ভাইয়া বসে ফোন চাপছিলো। আমি তাকে দেখে বললাম
-” ভাইয়া তুমি জানো আমার এখানে অনেক ভালো লাগছে, ইচ্ছে করছে সারা জীবন এখানে থেকে যাই।”
ভাইয়া আমার দিকে বিষ্ময়ের চোখে তাকিয়ে রইলো! ঘরঘরে গলায় বলল

-“কিরে সিয়াম এখানে কে তোকে যাদু মন্তর করলো। তুই কিনা এখানে আসতেই চাইছিলিনা, এখন আবার বলছিস সারাজীবন এখানে থেকে যেতে ইচ্ছে করছে?”
ভাবী বলল, “দেখো গিয়ে কোন লাইলীর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। কিরে আমার রসের দেবর কাকে পছন্দ হলো ?”
আমি হা করে আছি, জানি ভাবীর মুখ পাতলা, তাই বলে ভাইয়ার সামনে ও এইভাবে বলবে! আমি কিছু না বলে শরমে রুমে চলে গেলাম। যেতে যেতে ভাইয়ার কণ্ঠ শুনলাম ,”বেচারাকে শরম দেও কেন?”
ভাবীঃ “আমাদের দেবর ভাবীর ব্যাপারে নাক গলালে খুন করে ফেল্মু, আর তাছাড়া আম্মাজান বলেছে ,”সে আমার ছোট স্বামী”।
এই বলে ভাবী আর ফুপি খুব হাসাহাসি করতে লাগলো।

।সবাই মিলে খুব মজা করে রাতের খাবার খেলাম।রাতে আমার থাকার ব্যবস্থা হলো নয়নের সাথে। ভেবে নিলাম ভালোই হলো, নয়নের কাছ থেকে হরু সম্পর্কে সব জেনে নেব।তাই করলাম। হারুর আসল নাম হরনাথ চক্রবর্তী।আমি অবাক হলাম হারু আগে পাগল ছিল না। সে নাকি মাত্র বছর দুয়েক হলো পাগল হয়েছে।সেদিন আর কথা বাড়ালাম নাহ, আঁখি যুগল ঘুমে তলিয়ে আসলো।

পরদিন সিলেটে আমার নতুন সকাল শুরু , বিশাল সূর্যটা সবে মাত্র উদিত হলো।আর আমার সব চিন্তা ভাবনা গুলোকে আমি নতুন করে আবিষ্কার করলাম। আজ যে করেই হোক হারুর সাথে কথা বলতে হবে। ।আমি একা একা বাড়ির মধ্যে পায়চারি করতে থাকলাম।হঠাৎ করে ভাইয়ার ডাক, -“সিয়াম এদিকে আয়।”
-“আসি”
ভাইয়া বলল,” চল একটু দূরে একটা হিন্দু জমিদার বাড়ি আছে। গিয়ে দেখে আসি” ।আমি আর আপত্তি না করে সেখানে গেলাম। বাড়িটা অনেক পুরোনো, সম্ভবত ইংরেজ আমলের হবে। তবে কাজ গুলো অনেক সুন্দর, বেশ ভালো লাগছে দেখতে। কেমন পুরনো ঘ্রাণ! আমি ঘুরতে ঘুরতে বাড়ির ছাদে উঠলাম।বলতে গেলে বাড়িতে কোন জনমানবের বসবাস নেই। আমি ছাদে উঠে চারদিক দেখতে লাগলাম। হঠাৎ কারো হাসির শব্দে আমি ভীত হলাম। শব্দটা অনুসরণ করে আমি এগিয়ে গেলাম। ছাদের এক কোণে কেউ একজন বসে আছে। আমার খুব ভয় লাগছিল, তবুও সাহস করে এগিয়ে গেলাম। কাছে যেতেই দেখি হারু! আমাকে দেখে একটা মিষ্টি হাসি দিল।আর তারপর সে চলে যেতে উদ্যত হলো। আমার কথা শুনবে দাড়াও হারু আমার কথাটা শুনে যাও।কে শোনে কার কথা, হারু আমার দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে উন্মাদ হয়ে হাঁটতে লাগলো।আমি পেছন থেকে তার হাতটা টেনে ধরলাম। এবার সে শক্ত হয়ে দাড়িয়ে পড়লো।আমি পকেট থেকে কয়েকটা চকলেট বের করে হারুকে দিলাম।এবার তার রাগান্বিত চেহারা হাসি হাসি হলো।একটু হাসি দিয়ে চকলেট গুলো আমার হাত থেকে নিয়ে নিল।

আচ্ছা হারু আমারা কি একটু বসতে পারি? হারু মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।আমরা দুজনে পাশাপাশি বসলাম।আমি একটু গা ঘেঁষে বসতেই হারু দূরে সরে যায়। আচ্ছা হারু তুমিতো পাগল না, তাহলে পাগলের বেশ ধরো কেন।আমার কথা শুনে হারু যেন আকাশ থেকে পড়লো।আমি পাগল না তুই পাগল, তোর চৌদ্দগোষ্ঠী পাগল। আমাকে পাগল বলিস।আমি বুঝলাম যে হারু খুব রেগে আছে।
হারু আমি তোমাকে তা বলিনি, তুমি পাগল হবে কেন।এবার সে একটু শান্ত হলো।হারু তুমি কাউকে ভালোবাসো,কাউকে নিয়ে চিন্তা করো, কেউ তোমার চিন্তায় আসে। হারু আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। একটু পরে দেখি তার চোখ দুটো জলে ভিজে উঠলো।হারু কোনো কথা না বলে সোজা নিচে চলে গেলো। আমি শুধু বসে বসে তার চলে যাওয়াটা দেখলাম। তখন ছাদের পাশে একটা কাক ডেকে যাচ্ছে । কা কা কা ….

জমিদার বাড়ি থেকে আসার পর আমার খুব বোরিং লাগছিলো । খুব বাজে লাগছিলো নিজের কাছে। সন্ধ্যায় আমি বাড়ির পাশে একটু হাটাহাটি করছিলাম। হঠাৎ করে আমি দেখলাম কেউ একটা বাড়ির কোণে ঠাই দাঁড়িয়ে আছে। আমি সেদিকে তাকিয়ে দেখলাম হারু, আমাকে দেখে হাসছে।আমি হারুর কাছে যেতেই সে আমার দিকে এগিয়ে আসলো। কোন কথা না বলেই আমাকে জড়িয়ে ধরলো। বাচ্চা ছেলের মতো কাঁদতে শুরু করলো। এরকম পরিস্থিতিতে আমি কখনো পড়ি নাই। আস্তে করে বললাম ,”কি হয়েছে তোমার?”
সে আমার দিকে তাকালো। তার চোখে আছে এক আকাশ নির্বাক গল্প।
সে আস্তে আস্তে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, আমি পাগল না।
” সিয়াম কার সাথে কথা বলছিস? অন্ধকারে না কথা বলে আলোয় এসে কথা বল।” ফুপির কণ্ঠ।
হ্যাঁ ফুপি আসছি, আমি হারুর হাত ধরে বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেলাম। ফুপি হারুকে দেখে অবাক হলো!হারু তুই এখানে এখন! কি হয়েছে রে আমায় বল।কেউ কি মেরেছে নাকি বকেছে। না ফুপি তেমন কিছু হয় নি। আমি ওকে সাথে করে নিয়ে এসেছি, আমার সাথে কিছু কথা বলবে।

ফুপি আমাদের জন্য পিঠা নিয়ে এলো, আমি হারুকে পিঠা খাইয়ে দিলাম। হারু আমার দিকে তাকিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে দিল। কে জানে তার বুকে কত জন্মের কান্না জন্মে আছে! আমি তাকে বললাম
-” আচ্ছা হারু তুমিতো পাগল না, তাহলে কেন পাগলের বেশ ধরো। সবাই তোমাকে কত কিছু বলে।তোমার খারাপ লাগে নাহ?”

সে আমার দিকে তাকিয়ে বড় করে শ্বাস নিলো। তারপর বলতে শুরু করলো।
-” আমি যখন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাই। তখন সেখানেই সুবল নামে একটা ছেলের সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়।আমরা খুব ভালো বন্ধু ছিলাম, আমরা একে অপরকে না দেখে একটা দিনও থাকতে পারতাম না।সুবল আমাকে অনেক ভালোবাসত।আমিও তাকে অনেক ভালোবাসতাম।আমরা এক সাথে থাকতাম, কতবার একসাথে বৃষ্টিতে ভিজেছি।কত তার জন্য না খেয়ে থেকেছি, তার জন্য কত কষ্ট সহ্য করেছি।তার জন্য মিথ্যা বলে বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে তাকে দিয়েছি।তুমি জানোনা আরো কত্ত কি করেছি,ওর জন্য আমি নিয়মিত ক্লাস করতে পারিনি।জানো এই হারু নামটা ওর দেওয়া। আমি ওকে আমি সু বলে ডাকতাম।একদিন আমাদের কলেজের কলেজ ক্যাম্পাসে দেখা করার কথা। আমি ঠিক সময়ে সেখানে চলে যাই, কিন্তু সুবল সেখানে আসে নি। আমি খুব চিন্তিত ছিলাম, ওকে অনেক ফোন করলাম কিন্তু ধরলো না।কিছু সময় পর ওর ফোনটা বন্ধ পেলাম। আমি আরো উদ্বিগ্ন হয়ে গেলাম।সুবলের কিছু হয় নি তো এই ভেবে আমি, সারা ক্যাম্পাস খুজলাম।কিন্তু কোথাও পেলাম না,আমি সেখানে আর দেরি না করে বাসায় চলে আসলাম। এসে আমি সবচেয়ে বেশি হতবাক হলাম, কারণ সুবল বিছানায় পড়ে ঘুমাচ্ছে!

কি সুবল তোমার কি শরীর খারাপ? আমি এগিয়ে তার শরীরে হাত বুলাতে লাগলাম।আমি গায়ে হাত দিতেই সুবল আমার হাতটা ঝাড়া দিয়ে ফেলে দিল।আমি ভাবলাম হয়তো মন খারাপ তাই এমন করছে, আমি আর কিছু বললাম না।রাতে যখন শুতে যায় সুবল আমার সাথে আরো জঘন্য ব্যবহার করলো।

-“তুই যদি এখানে ঘুমাস আমি নিচে ঘুমাবো।”

আমি আর কিছু না বলে নিচে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। পরদিন সকালটা কেন যেন আমার সাথে নিষ্ঠুর হতে শুরু করলো।
আমি সরাসরি তার সামনে গেলাম। প্রায় চিৎকারের মতো বললাম
-“কি হলো তোমার ?”
সে দম নিয়ে বলল

দ্যাখ আমি আর নিতে পারছি নাহ। আমার এসব ভালোলাগে নাহ, কেন যেন ন্যাকা ন্যাকা লাগে। আচ্ছা কি হবে এই ভালোবাসায়? আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারবো নাহ। তুমিও নাহ। বাসা আছে , পরিবার আছে, সমাজ আছে, কি করে এসব ফাকি দিবো। এর থেকে এটাই ভালো হয় নাহ ! আমি এখানেই সব শেষ করে দেই। হারু আমি মুক্তি চাই। আমায় মুক্তি ভিক্ষা করি তুমার কাছে? কি ভালোবেসে আমায় মুক্তি দিতে পারবে নাহ ?

আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম । কিচ্ছু বলি নি, শুধু একটা কথাই বললাম
-“চোখের আরাল না করলাম, মনের আরাল হতে পারবে?
সে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো। তার চোখে ভাসাহীন শুন্যতা ।

আমি সে রাত্রেই বেরিয়ে পড়লাম। কেন জানি নিজেকে বেশ অচ্ছুৎ লাগছিলো। আমার মা বাবা কেউ ছিলো নাহ। এক কাকার বাসায় বড় হয়েছি। তারা আমায় দূর করে বেঁচে গেছে। নিজের জীবনের উপর মায়া হতে লাগলো। এখানে সেখানে বেড়াতে লাগলাম। এক অতল বিষণ্ণতায় দিন কাটাতে লাগলাম। এক অভিশপ্ত যাযাবর জীবন !

ঘটনা বলার পর অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর হারু আমায় বলল ” আমায় একটা কাজ খুঁজে দিবা ?”
আমি শুধু বললাম “দেখি”

পর দিন সকালে আমি ভাইয়ার সাথে এসব ব্যাপার নিয়ে কথা বললাম।

-ভাইয়া তোমাকে একটা কথা বলবো রাখবে?
-তোর কোন কথা রাখিনি ?
-না মানে…… মানে….
– কি মানে মানে করছিস,যা বলার বলে ফেল।
-মানে ভাইয়া একজনকে একটা কাজ দিতে পারবে।

আমার কথা শুনে ভাইয়া একটু অবাক হলো!

-সিয়াম এখানে এসে কাকে তোর ভালো লাগলো যে একে বারে তার জন্য কাজের ব্যবস্থা করে দিচ্ছিস।
– হারুকে কাজ দিতে হবে।

একথা শুনে ভাইয়া একটু বেশি হতবাক হলো!

-হারু, একটা পাগল নাকি কাজ করবে।সিয়াম তুই ঠিক আছিস তো, তোর মাথা ঠিক আছে তো।
-হ্যাঁ ভাইয়া সব ঠিক আছে, তুমি শুধু বলো কাজটা দিতে পারবে কি না।তা পারবো কিন্তু বাবার অনুমতি ছাড়া আমি কিছু করতে পারবো না। সেটা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না, বাবাকে রাজি করানোর দায়িত্ব আমার।

পরদিন সকালে আমরা সিলেট থেকে বিদায় নিলাম। ফুপি খুব আপত্তি করছিলো হারুকে না নিতে। কত কিছু বলতে লাগলো

” সিয়াম তুই কি হারুর সাথে পাগল হয়ে গেলি নাকি।কখন কি একটা করে বসবে তার জন্য কিন্ত সবাই তোকে দোষারোপ করবে।”

“ফুপি এ নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না, যা করার আর যা ভাবার সব আমি করবো।”

ফুপি আমার মাথায় হাত রেখে দোয়া করলেন।সাবধানে থাকিস, আর হারুকে দেখে রাখিস। বলা যায় না কখন কি করে বসে। গাড়িতে আমি হারুর পাশে বসলাম, হারু কেমন যেন মন মরা হয়ে গেছে।

-কি হারু তুমি কি কিছু ভাবছো,তুমি কি আমার সাথে যেতে ইচ্ছুক না।

-না সিয়াম তা নয়,তুমি না হয় সহজে আমাকে গ্রহণ করলে। কিন্তু তোমার পরিবার কি আমাকে মেনে নিবে।

– তুমি এত সব চিন্তা ভাবনা গুলো আমাকে দিয়ে দাও, এসব নিয়ে তোমাকে চিন্তা করতে হবে না। তুমি জানো না যে আমার মা অনেক ভালো, আমি মাকে বললে মা আমার কথা ফেলতে পারবে না।এবার একটু হাসোতো, গোমরা মুখে তোমাকে একদম বাংলার পাঁচের মতো লাগে।হাসো না হারু একবার,এর পর আমরা হাসাহাসি করতে করতে সারা রাস্তা পার করে দিলাম।

নিন সাহেব বাড়িতে চলে এসেছি, এবার সব কিছু সামলান।

-হ্যাঁ ভাইয়া দায়িত্ব যখন নিয়েছি তখন আমাকেই তো সব সামলাতে হবে।মা ও মা…

বাইরে থেকেই মাকে ডাকতে শুরু করলাম।আমার ডাক শুরুর মা তড়িঘড়ি করে বাইরে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। সিয়াম তুই এত শুকিয়ে গেছিস কেন? ঠিক করে খাওয়া হয় নি, ঠিক মতো ঘুমাস নি তাই তো।না মা আমি ঠিক আছি, আর দেখ সাথে করে কাকে নিয়ে এসেছি। হারুকে দেখে মা বললো, এ কে সিয়াম? মা ওর নাম হারু। হারু আমার মা।হারু মায়ের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলো। মা সব কি এখানই হবে নাকি এবার ঘরে যেতে দিবে।আমার কিন্তু খুব বেশি ক্ষুধা লেগেছে, আগে খেতে দাও পরে তোমাকে সব বলছি।হ্যাঁ চল, তোরা ফ্রেশ হয়ে নে আমি খাবার বাড়ছি।খাওয়া শেষ করে আমি মাকে সব বললাম। মা এখন থেকে হারু আমাদের সবার সাথে থাকবে।থাকবে ঠিক আছে কিন্তু তোর বাবা।মা তুমি বাবাকে রাজি করাবে প্লিজ প্লিজ প্লিজ!! বাবা তো তোমার কথা ফেলতে পারবে না। আচ্ছা ঠিক আছে আমি দেখছি তোর বাবার সাথে কথা বলে।মায়ের কথা শুনে আমি অনেক খুশিতে মায়ের গালে একটা চুমু দিলাম।

রাতে মা বাবাকে সব কিছু বললো,এদিকে আমার ডাক পড়লো বাবার ঘরে। আমি সেখানে যেতেই দেখি বাবা আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। কি শুনলাম এসব, তো ছেলেটা কি সুবিধার হবে নাকি পালিয়ে যাবে। না মানে বাবা হারু খুব ভালো ছেলে,তাছাড়া পড়াশোনা অনেক ভালো। এখন তুমি যদি একটা কাজ দিতে তাহলেই তো বোঝা যেত।হ্যাঁ কিন্তু তাকে কি কাজ দেওয়া যার। বাবা দোকান দেখাশোনার কাজ দাও ভালো হবে।আমার কথায় বাবা রাজি হলো।সিয়াম তুই তো অনেক বড় হয়ে গেছিস, সব কিছু কেমন চিন্তা ভাবনা করে করছিস।তো বাবা হারু থাকবে কোথায়? চিলেকোঠাটা তো খালি পড়ে আছে, সেখানেই না হয় থাকার ব্যবস্থা করো।
পরদিন সকালটা আমার আর হারুর জীবনের নতুন একটা অধ্যায় যুক্ত হলো।

সিয়াম তুমি আমার জন্য এতো কিছু করছো।
আমি হেসে বললাম , ” এ কিছু নাহ। আর শোনো সারাক্ষণ মনমরা হয়ে বসে থাকবে না।আর পিছনে ফেলে আসা দিন গুলো একটু ভুলতে চেষ্টা করো।”

তিন মাসের মধ্যে হারু অনেক পরিবর্তন হলো। এখন সবাই তাকে আপন কবিতার নিয়েছে।রমজান মাস দোকানে কেনা-বেচা অনেক, হারু এখন ব্যস্ত সময় পার করছে।সারাদিন একবারো বাড়িতে আসার সময় পাই না।তাই প্রায় সময় করে রাতে দোকানে যেতাম হারুকে দেখতে।

সিয়াম তুই দোকানে! আমাকে দেখে ভাইয়া এক রকম আশ্চার্য হয়ে গেলো।আগে তো কখনো ভুলেও কোনদিন দোকানে আসতি না, তো কি মনে করে এসেছেন। দেখতে এলাম হারু সব কিছু বুঝতে পারছে কি না।হারুকে আর বোঝাতে হবে না আপনার যদি কিছু বোঝার থাকে তবে হারুর কাছ থেকে বুঝতে পারেন। ভাইয় তুমি সব সময় আমার সাথে লাগবে না। আমার নাজেহাল অবস্থা দেখে দোকানের সবাই হেসে উঠলো।

ঈদের আর কয়েক দিন বাকি, কেনাকাটা শেষ করলাম।এবার ঈদের আমার সব কিছু হারুর পছন্দ মতো কিনেছি, শুধু পাঞ্জাবি কিনলাম আমার পছন্দ মতো। নীল রঙের দুটি পাঞ্জাবি কিনলাম আমার আর হারুর জন্য। ঈদের দিন সকালে আমি ভাইয়ার সাথে ঈদের নামাজ পড়তে গেলাম । নামাজ শেষ করে বাড়িতে এলাম, হারুকে সাথে করে মায়ের হাতে বানানো পায়েস খেলাম।সন্ধ্যার পর আমি আর হারু রিকশা করে শহরের বাইরে ঘুরতে গেলাম এবং অনেক মজা করলাম। পরদিন বিকেলে বাড়িটা বেশ ফাকা ছিল কারণ সবাই ঘুরতে গেল, আমি মা আর হারু বাড়িতে ছিলাম।বিকেলে আকাশ দেখার উদ্দেশ্যে ছাঁদে গেলাম, অনেক সময় ছাঁদের রিলিংয়ে হেলান দিয়ে বসে রইলাম। সন্ধ্যার আভাস নেমে আসলো, আমি নিচে যাব এমন সময়ে ইচ্ছে হলো একবার হারুর সাথে দেখা করে যায়।গিয়ে দেখি হারু ঘুমাচ্ছে।

আমি হারুর কাছে গেলাম। কি মনে করে তার ঠোঁট এ একটা ছোট্ট করে চুমু দিলাম। সে আমাকে টান দিয়ে বুকে জড়িয়ে নিলো। আমি তার চোখের দিকে তাকালাম। কামনা ছিলো, আরো কিছু ছিলো! তারপর আর জানি নাহ, শরীরে শরীর মিশলও । সে খেলায় আমরা চলে গেলাম বহুদূর।

হঠাত করে দরজা খুলে গেলো! দেখি আমার ভাই সেখানে! আমি আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে রইলাম! ভাই ভাষাহীন । শুধু একটা কথাই বলল , ” আমার রুমে আয় দুজনেই।

ভাইয়া চলে যাবার পর আমি তার মুখের দিকে তাকালাম। তার মুখে কোন রা নেই। দুজনেই চললাম ভাইএর রুমে।
ভাইয়ার রুমে যেতেই বলল
-“দরজা বন্ধ করে দে।”

আমি দরজা বন্ধ করে দিলাম । আমরা ৩ জন রুমে। ভাই বলল
-“হারু , তুমি কাওকে কিছু না বলে আজ রাতেই চলে যাবে। আর সিয়াম তুই কোন কথা বলবি নাহ। আমি এই ঘটনা কাউকে জানাবো নাহ । এটা আমার তোর প্রতি দয়া। আর দুজনেই আমার চোখের সামনে থেকে যাও। ভাবতে পারি নাহ একদল সমকামী নিয়ে ঘরে বাস করি ! হুহ!

ভাইয়ের কথায় সেদিন খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। সেদিনের পর থেকেই আমি কেমন যেন মনমরা হয়ে গেছি , রুমে থাকি। কথা বলি নাহ , দরকার ছাড়া। হারু সেদিনেই চলে গিয়েছিলো। মাঝে মাঝে মাঝরাতে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। আমি তখন চুপি চুপি চিলেকোঠায় যাই। গিয়ে বসে থাকি। আর হারুর সেই চোখের কথা মনে পরে। সে কি আমায় বলতে চেয়েছিলো ,”ভালোবাসি?”
সে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে নাহ , কখনো !
সে গানটার কথা মনে পরে,
“আহারে জীবন, আহা জীবন,
জলে ভাসা পদ্ম যেমন ।”

লেখকঃ শুভ্র মেঘ

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.