অগস্ত্যপত্র

পৃত্থুজ আহমেদ

উৎসর্গঃশিধু আহমেদ

প্রিয়তমেষু *
শুরতেই অবাক হচ্ছিস তো?এটা ভেবেই যে সম্বোধন ছাড়া চিঠি লিখেছি কেন?কী করব বল,আমিত বরাবরই এমন।তোর ভাষায় অদ্ভুতুড়ে।ঠিক তেমনটা,যেমনটা তুই কল্পনা করিসনা আমাকে নিয়ে।আসলে সত্যি বলতে কী,তোকে ঠিক কী নামে,কোন নামে সম্বোধন করব সেটা বুঝে উঠতে পারিনা রে।তোর আর আমার সম্পর্কটাই তো চিরকাল দোদুল্যমান পরিস্থিতি গলাধঃকরণ করে এতদূর এসেছে।কখনও কোন স্থির অনুভূতির দোরগোড়ায় কড়া নাড়ার সুযোগ হয়ে ওঠেনি।এতগুলো বছরে এই একটা সম্পর্কের টানাপোড়ন আমার বোধগম্য হয়নি সত্যি।আচ্ছা,তুই কখনও বুঝেছিলি?আমাদের এই অনুভূতির ইন্দ্রজাল!

আচ্ছা এবার বলতো,কেমন আছিস তুই?নিশ্চয়ই ভালো আছিস বলবি।কারণ,তুই তো সবসময় নিজেকে ভালোর দলে দাবি করিস।এটা তো আমি জানি।আবার ফর্মালিটি করে ভালোর কথা জিজ্ঞেস করায় নিশ্চয়ই ক্ষেপে গেছিস?হা হা হা!তুই তো বরাবরই এমন।ফর্মালিটি তোর একদম পছন্দ না।তোর মতে,”ফর্মালিটি হয় পর মানুষদের মাঝে।আমাদের দুজনের মাঝে আবার কীসের ফর্মালিটি?আমরা তো একাত্মা।”
ফাহিম,সত্যিই কী আমরা একাত্মা ছিলাম? কিংবা এখনও আছি?

তোর হাতে কতটুকু সময় আছে?মানে কতটুকু সময় নিয়ে চিঠিটা পড়তে বসেছিস?আসলে আমার চিঠিটা কিন্তু বেশ বড়সড় মাপের।তোর ভাষ্যমতে,”বকরাক্ষস আকৃতির।”হা হা হা!আমরা মতই আমার চিঠিটাও বক রাক্ষস আকৃতির।আমার বকরাক্ষস নামটা কিন্তু তুই দিয়েছিলি।তোর মনে আছে?তোর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে একটু বেশি খেয়েছি বলে তুই আমাকে বকরাক্ষস উপাধিই দিয়ে দিলি!সত্যিই,তুই পারিস বটে।আসলে তোর হাতের রান্না বরাবরই একটু বেশি মুখরোচক আর লোভনীয় হয়।বেশি না খেয়ে পারা যায়?এখনও সেই স্বাদ মুখে লেগে আছে যেন।পুরানের সেই বকরাক্ষসও কিন্তু তোর রান্না খেয়ে তোর বশ্যতা স্বীকার করতে দু মিনিট ভাববেনা।

আজকাল খুব মুটিয়ে গিয়েছিস মনে হচ্ছে।সেদিন টেলিভিশনে দেখলাম তোকে।মনে হচ্ছে আগের মত শরীরের যত্ন নিচ্ছিস না।অথচ,একটা সময় কিন্তু তুই আমাকে নজরবন্দি রাখতি এসব খাদ্যাভ্যাসের ব্যাপারে।এটা খাবিনা,ওটা খাবিনা,এটা কর,ওটা কর বলে জীবন একেবারে ওষ্ঠাগত করে তুলতি।এটা খেলে ভুঁড়ি বাড়বে,ওটা খেলে ফিট থাকবে এই বলে বলে একসময় আমার মুখের রুচিই নষ্ট করে দিয়েছিলি।মনে আছে তোর?তুই নিজেও তো সবসময় নিজের তারুণ্য ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টায় অবিরত থাকতি।কিন্তু আজ,বয়সের ছাপ স্পষ্ট তোর শরীরে।এই,সামনের নভেম্বরেই তো তোর ষাট বছর পূর্ণ হবে,তাই না?বাহ্!আজকাল বয়সকেও প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে তাহলে!চুল,দাঁড়ি পাকাও শুরু করেছে দেখছি।এত বদলে গেলি কীভাবে ফাহিম?

জানিস ফাহিম,সেদিন তোর একটা লেখা পড়েছিলাম।কী যেন নাম ছিল!ও হ্যাঁ,”জন্মান্তরের প্রহেলিকা।”আচ্ছা তুই কবে থেকে জন্মান্তরে বিশ্বাস করা শুরু করলি বলতো?জন্মান্তর নিয়ে তোর অবিশ্বাস টা এতই দৃঢ় ছিল যে,এসব নিয়ে লেখালেখি করা তো দূর এসব তুই মুখেও নিতিনা।মনে আছে,জন্মান্তর নিয়ে আমরা দুজন কত ঝগড়া করতাম।আমি আমার বিশ্বাস তোর উপর চাপাতে চাইতাম,আর তুই তোর অবিশ্বাস আমার উপর চাপাতে চাইতি।বহু তর্ক,বিতর্ক হত এসব নিয়ে আমাদের মাঝে।এমনকি কয়েকবার তো কথা বলাই বন্ধ করে দিয়েছিলাম একে অপরের সাথে।মনে আছে তোর?আজ সেই তুই কীভাবে জন্মান্তর নিয়ে লিখছিস আমার বোধগম্য হচ্ছেনা।এটা কী আমি বিশ্বাস করতাম বলেই?নাকি আমার ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধার খাতিরেই!আজকাল তোর সবকিছুতে আমি নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই।তোর মাঝে আমি নিজেকে অনুভব করতে পারি কেন যেন।এটা তো হওয়ার ছিলনা।সত্যিই,বড্ড অদ্ভুত আমাদের এই জটপাকানো সম্পর্কটা।তোর কাছে তো সবসময় এই সম্পর্কটা বোঝার মত ছিল।জারজ সন্তান পেটে থাকা মহিলারা যেমন নিজেদের উদরপ্রসারণ লুকায় সবসময়।তুইও ঠিক তেমন আমাদের সম্পর্কটা তেমনই আড়াল করতি সবসময়।সমাজ,লোকলজ্জা এসবের খুব ভয় ছিল তোর।সমাজ নাকি সমকামিদের ভাল চোখে দেখেনা।ধর্ম বর্জিত সমকামিদের সমাজ মেনে নেবেনা কখনও।এমনটাই বলতে তুই সবসময়।তাই না?

আচ্ছা বলতো,ভালবাসায় এসব মেকি,গোঁড়া যুক্তি দিতে হয়?একবারও ভাবলি না,যারা ভালবাসে তাদের কাছে পুরো জগৎটা তুচ্ছ।প্রকৃত ভালবাসা কখনও ধর্ম,সমাজ এসবের স্বীকৃতির তোয়াক্কা করেনা।এটা তো তোর জানা কথা।তুই না লেখক!তুই তো প্রেম,ভালবাসার ভান্ডার নিয়ে থাকিস।একজন লেখকই তো মানুষকে শেখায় ভালবাসা,যুদ্ধ।সেই,তুই কীভাবে পারলি এমন গোঁড়া একটা যুক্তি দিয়ে নিজেকে আমার থেকে সরিয়ে নিতে!তুই না সবসময় বলতি,সমকামিতা প্রাকৃতিক!শুধু তুই কেন,পুরো বিশ্ব যাকে প্রাকৃতিক বলে দাবি করে।সেখানে সমাজ এবং ধর্মকে টেনে আনার কোন যুক্তি ছিল তোর কাছে?নাকি এখন আছে?আমি এখনও তোর গোঁড়া যুক্তিগুলো শোনার জন্য অপেক্ষা করছি।

আচ্ছা,তুই বলতে পারিস মানুষের মৃত্যু কেন হয়?মৃত্যুটা কী নতুন শুরু নাকি পুরনোর শেষ?মৃত্যুর শেষ ঠিক কোথায়?নাকি মৃত্যুই মানুষের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সূচনা! আমার আজকাল নিঃশ্বাস ভারি হয়ে আসে।খুব কাছ থেকে মৃত্যুকে উপলব্ধি করছি।মনে হচ্ছে মৃত্যু আমার অতি সন্নিকটে।জম দেবতার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাই যেন।এটা কেন হয় বলতে পারিস?যেদিন তুই আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলি সেদিনও এমনটা মনে হয়নি আমার।তবে এখন কেন? আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আমি খুব শীঘ্রই মারা যাব।মৃত্যুর শীতল ক্রোড়ে ঢলে পড়তে বেশি দেরি নেই মনে হয়।মৃত্যু যেন নিশির ডাকেরমত হাতছানি দিয়ে ডাকছে আমায়।আয় আয় আয়! তাই আমার এই শেষ প্রচেষ্টা তোর জন্য।এই শেষবার নিজের ভালবাসার স্বীকারোক্তি করে যাচ্ছি।তুই যখন আমার চিঠিটা পড়বি তখন আমি এই পৃথিবীতে থাকব না।অদূর দূরের কোন এক অজানায় হবে তখন আমার বসবাস।এটাই ভাবছিস তো,আমি কী করে জানি চিঠিটা তোর কাছে আমার মৃত্যুর পরেই যাবে!এটা নাহয় না জানলি তুই।তবে চিঠিটা যখন পড়বি,তখন আমি সত্যিই থাকব না এই ধরণীর নিঃশ্বাস গ্রহণ করা প্রাণীদের ভীড়ে।এটা আমার থেকে পাওয়া তোর জন্য শেষ চিঠি।পূর্বের কোন চিঠির উত্তর আমি পাইনি তোর কাছ থেকে।এই চিঠির উত্তর দিবি?দিবি আমার অগস্ত্যপত্রের শেষ উত্তর?আমি কিন্তু উত্তর চাই।কীভাবে পড়ব?তুই লিখে আকাশে উড়িয়ে দিস।কিংবা বেঁধে দিস কোন শুভ্র পায়রার পাখায়।ঠিক পৌঁছে যাবে আমার কবরের সীমানায়।এককোণে কিংবা ঠিক মাঝাখানে।আমার হৃদয় বরাবর।যেখানে একমাত্র ফাহিমের বসবাস। তুই আমার কবরের পাশে আসবি?অন্তত,একবার আসিস।সূচনালগ্নেই নাহয় অন্তিমবার আসিস।ঠিক আমার মাথার পাশের জায়গাটায় আসিস।কিয়ৎক্ষণের জন্যই সই।তবুও আসিস।তোর হাসিমুখটা ক্ষণিকের জন্য হলেও আমি উপলব্ধি করতে পারব।আচ্ছা তুই তখন হাসবি তো?হাসিস।তোকে হাসতে হবে।একদম কান্না করবি না।জানি,তুই তবুও কাঁদবি।কাঁদতে কাঁদতে শেষের দিকে হাসবি।তোর বরাবরের অভ্যেস।হয়ত তোর ঐ হাসিকান্নার নোনাজলে আমি সতেজ থাকব।আমার নিথর পচাগলা কলেবরের কবরটা নিরেট প্রস্তরময় হবেনা।দূর থেকে সবাই দেখে বলবে,দেখো কবরটা কত সজীব!নিশ্চয়ই বেঁচে থাকতে অনেক পূণ্যের কাজ করে গেছে লোকটা।কিন্তু আমিত জানি আমি চিরকাল তোর ভালবাসায় বেঁচে ছিলাম।মৃত্যুর পরেও সতেজ থাকব তোর ভালবাসার রস শুষে। অনেক বলেছি না রে?তোর কত সময় গেল হিসেব করেছিস!আর নয়,এই শেষ।শেষবারের মত বলছি তোকে,ভালবাসি ফাহিম।অনেক অনেক অনেক বেশি ভালবাসি তোকে।পরের জন্মগুলোতে আমাকে মনে করিস।যদি আমি ভুলে যাই,তবে তুই মনে করিয়ে দিস আমাকে এই জন্মের কথা।তোর নিজেকে মনে করিয়ে দিস আমায়।এই গুরুদায়িত্ব টা কিন্তু তোর উপরই ন্যস্ত করলাম আমি।তোর ডাক উপেক্ষা করার তো সামর্থ্য তো আমার কোন জন্মেই হবেনা।শুধু একবার ডাকিস,আমি জীবনানন্দের মত,আবার এবং আবার আসব ফিরে তোর কাছে।

প্রযত্নে বিবর্ণতায় রঞ্জিত আয়াদ

প্রথম প্রকাশ

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.