অপ্রাপ্তি

লেখকঃ অরিত্র হোসেন

 ‘অবনী ঘুমাও’

“নাহ আমি ঘুমাব না। আমার একটা বাচ্চা চাই, চাই, চাই । এনে দাও!”

তন্ময়ের মন খুব খারাপ। প্রায় সব দম্পতিরাই আশা করে তাদের জীবন সন্তান দ্বারা পরিপূর্ণ হবে । বিয়ের তিন বছর কেটে গেলো কোন সুরাহা হল না। বাড়ির লোকজন বেশ হতাশ তবে সবচেয়ে বেশি হাপিত্যেশ করছেন অবনীর শাশুড়ি রোকসানা বেগম। তার বয়স ৬৩ বছর। ছেলে তাঁর একটাই তাই আশাও একজনের উপর। নাতনি-নাতির মুখ দেখার ধৈর্য ধরে বছরের পর বছর অপেক্ষাই করে যাচ্ছেন কিন্তু সু-খবর পান না। কিছুদিন আগে একবারে ভেঙ্গে পড়লেন যখন শুনলেন তাঁর পুত্রের সমস্যা আছে। বিলাপের সুরে বলছিলেন,

“আল্লাহ, তুমি আমার উপর এই ঠাডা কেন দিলা! ও আল্লাহ, আমার লগে কেন করলা?”

তন্ময় সান্ত্বনা দেবার ভাষা খুজে পেলো না কারণ তার নিজেরেই সান্ত্বনার দরকার। নিজেকে সামলে সে বলেছিন, “মা আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্য করেন। তুমি শান্ত হয়, ভালো খবর আসবে”।

রোকসানা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “আইবো না, আইবো না! ঘরে কুফা লাগসে, পাপি মানুষ ঘরে ঢুকসে। আল্লাহ্‌ রহম করবেন কি কইরা ক ?”

“মা, পাপি মানুষটা কে? কাকে বুঝাচ্ছ ?”

“কাকে বুঝামু, তোর বউ!”

“মা সমস্যাটা তো আমার, তোমার বউকে দোষ দিচ্ছ কেন?”

“তুই ইচ্ছা কইরা বউয়ের দোষ নিজের কাঁধে তুলসস! তোরে চিনি না!

“মা, এভাবে অবনীকে দোষারোপ করছ কেন? ওর অবস্থা দেখেছো? কিরকম হয়ে গেছে?”

“হ দেখসি, ডাকিনীর পাগলামি!”

“মা!”

“দেখ তনু, আরেকখান বিয়া কর। ঐ মাইয়া মানুষ আমাগো বংশ রক্ষ্যা করতে পারবো না সোনা”।

“মা, এটা আমার পক্ষে অসম্ভব! তুমি খামোখা আমার দোষ অবনীর উপর চাপিয়ে দিচ্ছ। এসব তোমাকে মানায় না”।  

“তনু তোর বাচ্চা আর হইব না! আমাগো বংশের কি হইব!”

তন্ময় কথা বাড়াল না। মায়ের সঙ্গে বাচ্চা নিয়ে বাকবিতণ্ডা প্রতিদিনের নির্ধারিত কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে। ওদিকে অবনীর অবস্থাও শোচনীয়। প্রায় আধাপাগল হয়ে গিয়েছে। খোটা শুনতে তার আর ভালো লাগে না। সারাদিন বাচ্চার জন্য কান্নাকাটি করে। কপালের লিখন তারা খণ্ডাতে পারছে না। তারা শিকলবন্দি।

“অবনী, ঘুমো এখন। রাত হয়েছে অনেক”

অবনী তন্ময়ের হাত ধরে বলল, “আচ্ছা তনু, আমরা কি বাচ্চা নিতে পারি না?”

“মানে?”

“মানে, হাসপাতাল থেকে সদ্য জন্ম নেওয়া বাচ্চা আমরা নিয়ে আসব। আমার বাচ্চাও জানাব না, কাউকেই জানাব না”।

তন্ময় অবনীকে বুকে টেনে নিয়ে বলল, হয়তো সম্ভব। তবে…

“তবে কি তন্ময়?”

“আমার ইচ্ছে নেই!”

“কেন নেই? তন্ময় বল কেন নেই!”

“অন্যের বাচ্চা ভাবতেই কেমন জানি পর পর লাগছে!”

অবনী রাগান্বিত কণ্ঠে বলল, তন্ময়! তোমার কাছ থেকে এই ধরণের কথা আশা করিনি!

“অনেক আশাই অপূরণ থেকে যাচ্ছে”

অবনী দরাজ গলায় বলল, হ্যাঁ না বললে আমি আত্মহত্যা করবো! হ্যাঁ বলতেই হবে!

তন্ময় আঁতকে উঠলো। অবনীর পক্ষে এক কাজ সম্ভব। সে কখনও কথার খেলাপ করে না। ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতি বিভাগের তুখড় স্টুডেন্ট ছিল অবনী। যেরকম তেজ, সেরকম রাগ! সবাই বলত তাকে ‘লম্বা মাস্তান’।

আসলেই মাস্তানদের মতো স্বভাব ছিল। একদিন রিকশা করে আসছিল সে, হঠাৎ এক গাড়ি দিয়ে জোরে পিছনে ধাক্কা দেয়। অবনী পড়ে গিয়ে খানিকটা চোট পায়। ব্যস! ড্রাইভারকে জুতা খুলে পিটালো! এই হল অবনী! কিন্তু সেই আগের অবনী আর নেই, একটা বাচ্চার জন্য উদাসি হয়ে গেছে। বাইরেও বের হয় না। সব ছেড়েছুরে বাসায় বসে থাকে। বেশীরভাগ সময় তার সময় কাটে নামাজ পড়ে বা ছাদে বসে থেকে।

“অবনী, ঠিক আছে নিবো বাচ্চা”।

তন্ময়ের বুকের ভিতর মুখ গুঁজে তৃপ্তির শ্বাস নিল অবনী।

অনেক খোঁজাখুঁজির পর এক হাসপাতালের নার্সের সঙ্গে পরিচয় হল তাদের। সে বলল, “আমি যে কলনিতে থাকি সেখানে একটা মেয়ে আছে। অনেক সুন্দরী। বেচারির বাচ্চা হবার ১ মাস আগেই মারা গেছে স্বামী। বাবার বাড়িতে চলে এসেছে। ভাইরা চাচ্ছে আবার বিয়ে দিতে কিন্তু বাচ্চা হয়নি তাই দিতে পারছে না। আর তারা বাচ্চা রাখতেও চাচ্ছে না। বড়ই অবাক হলাম বাচ্চার মাও চাচ্ছে না! আপনি কি আসলেই চান ঐ বাচ্চা?”

বাচ্চা নিতে তন্ময় প্রথম থেকেই ইচ্ছুক না, তাই নার্সের কথা শুনে তার যতটুকু আগ্রহ ছিল তা সুরসুর করে দ্রুত নেমে গেল। অবনী বলল, ‘জী, আমরা সেই বাচ্চা চাই! প্লিজ ব্যবস্থা করে দিন!”

“আচ্ছা দেখি কথা বলি, আবার যদি কিছু চায়!”

“চাওয়া চাইয়ি দেখা যাবে পরে, আপনি যোগাযোগ করিয়ে দিন”।

অনেক জোরাজোরি করার পর নার্সের সহযোগিতায় মেয়েটির সাথে যোগাযোগ করতে পেলো তারা।

মেয়ের নাম ফুলবানু। মায়াকারা চেহারা। দেখে মনে হচ্ছে না ১৫দিন আগে স্বামী মারা গেছে।

“আচ্ছা, বাচ্চা দিবেন সত্যি?”

ফুলবানু দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, না দিলে খবর দিতাম?

“তা ঠিক!”

“আচ্ছা কত টাকা দিবেন আমাকে আপনি?”

“আপনি কত টাকা চান?”

ফুলবানু হেসে বলল, ১ হাজার কোটি টাকা ! পারবেন ? হাহাহা!

“হাসছেন কেন! এতো টাকা দিতে পারবো না, আপনি সিরিয়াসলি বলেন”।

“হাহাহাহা – একটা বাচ্চার কি বিনিময় মূল্য আছে ? আমি খারাপ কিন্তু পিশাচ না। বাচ্চা দেয়ার জন্য টাকা নিবো না”।

অবনী ভুরু কুঁচকে বলল, তাহলে দিচ্ছেন কেন?

“দিচ্ছি, হয়তো আপনার কপালে লেখা ছিল”

“মানে?”

“মানে, কিছু না! এতো কথা বলতে পারবো না। শুনুন, ২৭ তারিখ ডেলিভারি হবে। বাচ্চা হবার সাথে সাথে দিতে পারবো না। ছয় মাস হোক তারপর!

অবনী অবাককণ্ঠে বলল, কি বলছেন!

“বাচ্চার ভালোর জন্য বলছি। ছয় মাস পর এসেন”।

অবনী ম্লান কণ্ঠে জিগ্যেস করল, স্বামীর প্রতি কি আপনার ভালবাসা এক ফোঁটাও ছিল না ?

“নাহ, ছিল না! কারন লোকটা অসম্ভব ভালো ছিল আর আমি খারাপ মেয়ে মানুষ। তাই ভালো মানুষকে ভালোবাসতে পারি নাই। কিন্তু আমার বাচ্চাটা অসম্ভব ভালো হবে”

অবনী কিছুই বলতে পারলো না। বুক ছটফট করছে খুব তার।

এক মাস পরের কথা।

বাচ্চা আজ হবে!

সবাই বলছে মেয়ে হবে। ফুলবানুর চেহারায় অন্যরকম এক সৌন্দর্য এসেছে। কথায় আছে মেয়ে হলে এমন সৌন্দর্য আসে। অবনী হাসপাতালে এসেছে। সঙ্গে আছে তন্ময়। ডাক্তার বলছে সব কিছু ঠিকঠাকই হবে। ধৈর্য ধরাই উত্তম কাজ হবে। অবনীর খুব অস্থির লাগছে। তার বাচ্চা কি ঠিক মতো হবে?

সকাল এগারটায় ভূমিষ্ঠ হল ফুটফুটে এক কন্যা শিশু।

ডাক্তার বেজারমুখে বেড়িয়ে এলেন। ফুলবানুর বাবা আর ভাইও হাসপাতালে আছেন। ফুলবানুর বাবা বললেন, মেয়ে আমার কেমন আছে ?

ডাক্তার বিমর্ষ কণ্ঠে বললেন, মেয়েকে বাঁচাতে পারি নি। সব আল্লাহর ইচ্ছা!

ফুলবানুর বাবা ফুঁপাতে ফুঁপাতে কাঁদতে লাগলেন। ফুলবানুর ভাই ঠাণ্ডা গলায় বললেন, বাচ্চাকে আমরা নিবো না। কে জানি নিতে চেয়েছিল তাকে দিয়ে দিন! আর তাড়াতাড়ি লাশ খালাস করুন। সময় কম।

ফুলবানুর বাবা বললেন, না! নাতনি আমি পালবো! এই আমার মেয়ের স্মৃতি।

“হেহ, খাওয়া জুটে না তিনবেলা আর আপনি নাতনি পালবেন ! ওকে বিক্রি করলে কিছু তো টাকা আসবে, লাভ আমাদেরই! আর পরোপকার হয়ে যাচ্ছে। একজন নিঃসন্তান দম্পতি সন্তান পাবার খায়েশ মিটাতে পারবে!”

“কিন্তু…”

“বাবা! কথা বাড়াইয়েন না। কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে”।

অবনীর কোলে ফুটফুটে কন্যা শিশু খেলছে। ফুলবানু ঠিকই বলেছিল। মেয়ে তার থেকেও হাজারো গুণ সুন্দরী হয়েছে। কি সুন্দর দুটি চোখ! আর হাসেও কি পবিত্রভাবে! বুকে জড়িয়ে রাখল কিছুক্ষণ। আজ সে সব পেয়ে গেছে! সব!

অবনীর কন্যা শিশুকে বাসার সবাই সানন্দে গ্রহণ করলো। শাশুড়ি বেশ খুশি নাতনি দেখে। সারাদিন তার কোলেই থাকে, রাতে অবনী সুযোগ পায়। জীবনের এই বিশাল অর্জনের কৃতজ্ঞতায় নাম রেখেছে ‘প্রাপ্তি’।

প্রাপ্তি সবার মন জয় করলেও তন্ময়ের ভালোবাসা থেকে সে বঞ্চিত। তন্ময় মেয়েকে ছুয়েও পর্যন্ত দেখে না। বরং সে বেশ বিরক্ত। মাঝে মাঝে অদ্ভুত সব আচরণ করে। একদিন প্রাপ্তিকে রেখে অবনী বাইরে গিয়েছিল, ফিরে এসে দেখে তার মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে কাপড় ভিজিয়ে ফেলেছে কিন্তু তন্ময়ের কোনো বিকার নেই। বাসায় কেও ছিল না শুধু তন্ময় ছাড়া। খবরের কাগজ থেকে মুখ সরিয়ে মেয়ে কোলে নিবে সে অভিলাষটুকুও নেই। প্রাপ্তিকে কোলে তুলে সময় নিয়ে তাকে আদর করল অবনী। আদরে আদরে ঘুমে ঢলে পড়লে শাশুড়ির ঘরে তাকে সযত্নে, নিরাপদে শুয়ে রেখে নিজের ঘরে এসে খুব ধীরে দরজা বন্ধ করলো। 

রাগান্বিত স্বরে অবনী তন্ময়কে জিগ্যেস করল, আচ্ছা, তুমি কি প্রাপ্তিকে মেনে নিতে পারনি ?

তন্ময় ঠাণ্ডা গলায় বলল, না পারিনি অবনী। সে আমার রক্তের না। আপন ভাবতে পারি না।

“মানে কি, সবাই মেনে নিয়েছে আর তুমি…”

“দেখ আমাকে জোর করবে না, অবনী!”

“তন্ময়, রক্তের সম্পর্ক কি আসল সম্পর্ক? ভালোবাসার জন্য, সন্তান হবার জন্য তার রক্ত নিজের রক্ত হতে হবে এমন কোনো নিয়ম আছে? না, নেই! ভালবাসতে কোনো শর্ত লাগে না, মনে ব্যাপার। আজব খেলা প্রকৃতি খেলে, কিন্তু প্রকৃতি নিষ্ঠুরতা করে না। পর বাচ্চাকে আপন বাচ্চা বানাতে নিজের রক্ত নয়, ভালোবাসার প্রয়োজন…”

তন্ময় অবনীর ঠোঁট আঙুল দিয়ে হালকা স্পর্শ করল। ঠোঁটে রাঙা লিপস্টিক খানিকটা ছড়িয়ে দিয়ে নিজের আঙুলে দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার কষ্ট হয় না অভিনয় করতে?

অবনী চোখ নিচু করে বলল, অভ্যাস হয়ে গিয়েছে।

তন্ময় বলল, আমরা এক মিথ্যার জগতে বাস করছি। আমি চাই না এক ফুটফুটে শিশুকে আমাদের মিথ্যার এই জগতে অংশ বানাতে। আমি মুক্তি চাই। আমি তোমার মুক্তি চাই।

অবনী ম্লানকণ্ঠে বলল, আমি তোমাকে ভালোবাসি।

তন্ময় বলল, ভালোবাসার প্রতিদান মানে এই নয় তুমি নিজের আসল আত্মাকে খুন করে নকল আত্মা নিয়ে জীবনযাপন করবে।

অবনী বলল, প্রাপ্তিকে আমি রাখতে পারবো না?

তন্ময় অবনীর কপালে হালকা চুমু খেয়ে বলল, আমি তোমাকে ভালোবাসি। হয়তো তোমার চেয়েও বেশী।

অবনী কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, আমার দম বন্ধ লাগে তন্ময়। আমি আর পারছি না।

তন্ময় শান্ত গলায় বলল, বাসায় কেউ নেই। কাপড় ছেঁড়ে নাও। অভিনয়ের প্রয়োজন নেই।

কাপড় ছেঁড়ে নিজেকে আয়নায় দেখল অবনী। তবে কাপড়ের নিচে সে অবনী নয়, সে হল আবির।

একসঙ্গে থাকার অভিলাষ পূরণ করতে গিয়েই আবির সত্ত্বাকে বিষাদময় মৃত্যু দিয়ে আজ সে অবনী। জানে না আর কতদিন পারবে সে। আর কতদিন পারবে!   

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.