অভিলাষ

লেখকঃ অরিত্র হোসেন

(এক)

উদাসীন চোখে বইগুলোর দিকে চেয়ে আছে শাফিন। চোখের সামনে গাদাগাদা বই থাকা সত্ত্বেও দৃষ্টি একটি বইয়ের দিকে। বইয়ের নাম ‘দৃষ্টিপ্রদীপ’। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস। শাফিন বিভূতির ভক্ত না। সেদিন তাঁর ‘দেবযান’ উপন্যাসটি পড়তে বসেছিল। এক পৃষ্ঠা পড়ার পর ঘুমে ঢুলতে শুরু করে। খুব চেষ্টা করেও চোখ খোলা রাখতে পারেনি। একজন ভালো লেখক হতে হলে অনেক পড়তে হয়। অনেক বলতে ঢের গুনন ইনফিনিটি বুঝায়। পড়ার অন্ত নেই। ভালো লেখক হবার অভিলাষ মনে লালন করে শাফিন বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলো  পড়ার চেষ্টায় নেমেছে। শরৎসমগ্র শেষ, মানিকসমগ্র শেষ। যদিও লেখাগুলো পড়ে ততটুকু আরাম পায়নি যতটুকু হুমায়ূন আহমেদের লেখা পড়ে পায়।

শাফিন দেখতে খুবই সাধারণ। ফর্সা-চিকন-চেহারা। লম্বায় বেশ বড়। স্বাস্থ্য চিকন কিন্তু রোগা নয়। বয়স ২১। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী বিভাগের ছাত্র। লেখাপড়ায় বেশ ভালো হওয়া সত্ত্বেও তার মনোযোগ তাতে নেই। লেখালেখি করা তার সবচে প্রিয় কাজ। পাঠ্যবই নয় সারাদিন গল্প-উপন্যাসের বই নিয়ে পড়ে থাকে। আশেপাশের পরিস্থিতি নিয়ে তার কোন মাথাব্যথা নেই। ছোটবেলা থেকেই শাফিন অন্যদের তুলনায় একটু হলেও ভিন্ন। চুপচাপ থাকতে পছন্দ করে, কারোর সাথে তর্ক-বিতর্কে যায় না। কিন্তু প্রচণ্ড রাগী। রাগলে তার মাথা ঠিক থাকে না। তখন খুব আজব ব্যবহার করে।

শাফিন গালে হাত দিয়ে চোখ বন্ধ করলো। খুব দুর্বল লাগছে। মনে হচ্ছে দেহের প্রত্যেকটা অঙ্গ ভারী হয়ে আছে। বাসায় এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। বাড়ি ফিরে তাকে এই ঘটনার শিকার হতে হবে সেটা কল্পনায় ছিল না। শাফিন চোখ খুলল। বইয়ের তাক থেকে ‘দৃষ্টি-প্রদীপ’ বইটি নিয়ে বিছানায় গেলো। বিছানায় বসার সাথে সাথেই ঘরে ঢুকলেন শাফিনের মা পারভীন রহমান। তিনি পড়ার টেবিলে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন। শাফিনের চোখ বইয়ের দিকে। এমন একটা ভাব নিয়ে বই পড়ছে যেন ঘরে কেউ নেই। পারভীন রহমান অতি স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন, কি করছিস তুই?

শাফিন বই থেকে মাথা না তুলে বলল, তুমি দেখতে পাচ্ছো কি করছি।   

পারভীন রহমান উশখুশ করে বললেন, তুই ব্লগে কি ধরণের লেখালেখি করিস?

শাফিন বই থেকে মাথা তুলে পারভীন রহমানের দিকে তাকাল। তার মা’র চোখেমুখে আতঙ্ক কাজ করছে। প্রশ্নের জবাব দিতে ইচ্ছা করছে না তার। তাই সে মাথা নিচু করে বই পড়ায় মনোযোগ দিলো।

-আমি কিছু জিগ্যেস করেছি।

শাফিন পাতা উল্টাতে উল্টাতে বলল, আমার কম্পিউটার সরানো হয়েছে কেন?

-তুমি ভয়ংকর কাজের সাথে জড়িয়ে আছো। তোমাকে এসব কাজ থেকে দূরে রাখার জন্য তোমার আব্বু কম্পিউটার সরিয়ে ড্রয়িং রুমে রেখেছেন।

-ও

পারভীন রহমান কড়াকণ্ঠে বললেন, বই থেকে মাথা তুলে আমার দিকে তাকাও।

শাফিন বইটা বন্ধ করে মা’র দিকে তাকাল। পারভীন রহমান বললেন, কি ধরণের লেখালেখি করো?

দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে শাফিন বলল, মা! অনেক আগে ব্লগে দু’একটা লেখা পাবলিশ করেছিলাম।

-কি ধরণের লেখা লিখতে?

-ফেমিনিজম। নারীর অধিকার সম্পর্কিত।

পারভীন রহমান বললেন, এসব লেখার তো কোন প্রয়োজন দেখি না।

শাফিন ঠাণ্ডাগলায় বলল, আমি প্রয়োজন দেখি।

পারভিন রহমান দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, তুমি কি এখনও লেখো?

-নাহ। গত ২বছর আগেই সব লেখা সরিয়ে নিয়েছি। আচ্ছা বলতো, হঠাৎ ব্লগ নিয়ে তোমাদের এতো মাতামাতি কেন?

পারভীন রহমান বললেন, গতরাতে তুমি তোমার এক সিনিয়র ভাইয়ের সাথে ব্লগ নিয়ে কথা বলছিলে। তুমি নিজে একটা ব্লগ চালু করার প্ল্যানিং করছ। তোমার বাবা…

পারভীন রহমানের কথা শেষ না হতেই শাফিন বলল, ওহ তারমানে গতকাল আব্বু আমার সব কথা শুনেছে?

-হুম। তুমি ভালোভাবে জানো আমাদের বাসায় দু’টো টিএনটি ফোন।

শাফিন মুখ শক্ত করে বলল, কাজটা আব্বু ঠিক করেননি।

-ঠিক করেছে। অবশ্যই ঠিক করেছে। এখন বোলো লেখালেখি ছাড়ছ কবে?

শাফিন অবাক হয়ে বলল, আমি লেখালেখি ছাড়তে পারবো না! অসম্ভব!

পারভীন রহমান শান্ত গলায় বললেন, তাহলে কম্পিউটার পাওয়ার আশা ছেড়ে দাও। তোমার আব্বু বলেছেন তুমি যদি লেখালেখি ছাড়ো আর তার কথামতো চলো তাহলে তিনি তোমার স্বাধীনতা কাড়বেন না।

শাফিন বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো। বারান্দার কাছে দাড়িয়ে বলল, আমি ব্লগিং অনেক আগে করতাম। এখন করি না তো।

-কিন্তু তুমি তো নতুন একটা শুরু করার কথা ভাবছ।

-ব্যাপারটা তেমন না। আমি শুধু জিগ্যেস করেছিলাম ব্লগ তৈরি করা যায় কিনা। কিন্তু আমাকে মানা করা হয়েছে।

-যাইহোক। সব বাবা-মা তাদের সন্তানদের কল্যাণ চায়।

শাফিন ক্রুদ্ধকণ্ঠে বলল, আমার স্বাধীনতা কেড়ে নিতে পারো না তোমরা।

পারভীন রহমান বললেন, গত পরশুও একজন ব্লগারকে বাসায় যেয়ে খুন করা হয়েছে। শাফিন! তোমার কি জানের ভয় নেই?

শাফিন ঠাণ্ডাগলায় বলল, আমি এক্সট্রিম পর্যায়ের ব্লগার না। আমি মূলত গল্পকার।

-এসব আমি বুঝি না। তোমার কাজ পড়াশুনা করা। ওসব লেখালেখি বড় মানুষের কাজ। তোমার দ্বারা সম্ভব না।

শাফিন কিছু একটা বলতে গিয়েও বলতে পারলো না। তর্ক করে লাভ নেই। সে কিছুই বুঝাতে সক্ষম হবে না। পারভীন রহমান ভাঁজ করা একটা কাগজ হাতের মুঠো থেকে বের করে শাফিনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, পড়ে নিও।

শাফিন বলল, এটা কি?

পারভীন রহমান বললেন, পড়ে বুঝবে। ওহ, তোমার ছোটখালা সেদিন ফোন করেছিল। সে বলল তুমি কিছুদিন আগে তোমার ফেসবুকের প্রোফাইল পিকচার রঙধনু করেছিলে। তুমি কি সেই রঙধনুর আসল অর্থ জানো?

শাফিন মাথা নাড়িয়ে বলল, জী জানি।

পারভীন রহমান মাথা নিচু করে বললেন, নাস্তিক হতে চলেছ তুমি? আগে তো ঠিকমতো নামাজ-কালাম করতে। এখন তো মসজিদেও যাও না। আবার এসব নিয়ে পড়ে আছো। কি যে হবে তোমাকে দিয়ে!

শাফিন বলল, মা তুমি যা ভাবছ সেটা সঠিক নয়।

-আমাকে তোমার কাছ থেকে শিখতে হবে না কোনটা সঠিক কোনটা বেঠিক। আমার কাজ আছে আমি চললাম।   

শাফিন কাগজের ভাঁজ খুলে পড়তে শুরু করল। পারভীন রহমান রুম থেকে চলে গিয়েছেন। কাগজে লেখাঃ

‘নির্দেশনাবলি’

১) রাত ১২টার পর মোবাইল বন্ধ করতে হবে।

২) লেখালেখি করা যাবে না।

৩) বয়সে বড় কোন বন্ধুর সাথে যোগাযোগ রাখা যাবে না।

৪) পড়াশুনা বাদে অন্য কোনরকম কার্যক্রমে অংশ নেওয়া যাবে না।

শাফিন ৪নম্বর পর্যন্ত পড়ে কাগজটা ভাঁজ করে টেবিলে রেখে দিলো। বাকি ৮টি শর্ত পড়ার কোন মানেই নেই।  মাথা ভার লাগছে। শাফিন বিছানায় বসলো। তার হাতের ডানদিকে জানালা। খুব ধীরে পর্দা সরাল। আকাশ পরিষ্কার। জানালায় মাথা রেখে অন্যমনস্ক হয়ে গেলো। হচ্ছেটা কি?  চারপাশের এমন পরিবর্তন হজম করতে পারছে না।

ব্লগিং করার জন্যে তার বাবা-মা যদি এতোটা সতর্ক হতে পারেন তাহলে যখন তারা শুনবেন তাদের ছেলে একজন সমপ্রেমী, সে ছেলেদের পছন্দ করে তখন কি হবে? বাসা থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিবে? তার সমমনা মানুষের সাথে মিশতে দিবে না? লেখালেখির সব ক্ষমতা খর্ব করবে? ভাবতেই  শাফিনের গা শিরশিরিয়ে উঠলো।

২০১৩ সালে শাফিন ব্লগে দু একটা লেখা লিখেছিল সেটা সত্য, কিন্তু যে বিষয়ের কথা মা’কে বলছে সেটা সত্য না। সে মূলত ‘সমপ্রেম’ নিয়ে ইতিবাচক নানা ধরণের কথা লিখেছিল। মোট ২টা লেখা ব্লগে প্রকাশিত হয়। লেখা দুটি বেশ বিতর্কিত হয়। ছদ্ম নামে লেখার কারণে তাকে তেমন কোন ঝামেলা পোহাতে হয়নি। ভয়ে কাহিল হয়ে শাফিন লেখাগুলো সরিয়ে ফেলে। তারপর ফেসবুকে তার নিজের ফেইক আইডি অর্থাৎ গোপন সমপ্রেমী আইডি’তে বিভিন্ন প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা লেখা শুরু করে। আজ ২বছর ধরে কোন প্রকার ঝামেলা ছাড়াই নিজের মন মতো লিখে আসছিল। কিন্তু, আজ স্বাধীনতায় বাগড়া ঘটলো। গতকাল রাতে আতিক ভাইয়ের সাথে শাফিন নতুন ব্লগ তৈরি করার ব্যাপারে আলোচনা করেছিল। তার ইচ্ছা সমপ্রেম সম্পর্কিত একটি বাংলা ব্লগ খোলা যেখানে বিশেষ করে সমপ্রেমিরা তাদের সৃষ্টিশীল কাজগুলো প্রকাশ করবে। বিরাট পরিকল্পনা। আতিক ভাই পরিকল্পনা শুনে সাধুবাদ জানালেও বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী এধরণের কার্যক্রম থেকে তাকে বিরত থাকার উপদেশ দেয়। শাফিনের বাবা রফিক সাহেব তাদের সম্পূর্ণ কথা শুনে ফেলেছেন নাকি শুধু ব্লগ সম্পর্কিত কথাগুলো শুনেছেন সেটা এখনও পরিষ্কার নয়  তার কাছে।

শাফিন বিছানা থেকে উঠল। টেবিল থেকে কাগজটা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরে দিকে গেল। পারভীন রহমান রান্না করছিলেন। শাফিন কাগজটা পারভিন রহমানের হাতে দিয়ে বলল, নির্দেশনাবলি মানা আমার পক্ষে সম্ভব না।

পারভীন রহমান কাগজটা ওভেনের উপর রেখে কাঁপা কণ্ঠে বললেন, তোমার কি আমাদের জন্য একটুও চিন্তা হয় না?

শাফিন রাগান্বিত স্বরে বলল, তোমরা খুব তুচ্ছ ব্যাপারকে বিরাট করে তুলছ। শুনে রাখো, আজকের রাতের মধ্যে সবকিছু ঠিকঠাক যদি না হয় তাহলে আজ রাতেই আমি বাড়ি ছাড়বো। বলে রাখছি।

পারভীন রহমান কিছু বলার আগেই শাফিন দ্রুত বেগে বেরিয়ে গেলো।

(দুই)

গুনগুণ আওয়াজ হচ্ছে। দূরে কোথাও যেন সুর করে কেউ সূরা পড়ছে। একটা শব্দও বুঝা যাচ্ছে না। শাফিন চোখ খুলল। ঘরের বাতি নিভানো। আড়মোড়া ভেঙ্গে বিছানায় উঠে বসলো। চারদিক অন্ধকার। রাত হয়ে গিয়েছে। ঘুম ঘুম লাগছে। ধীরে উঠে বাতি জ্বালাল। বাতি জ্বালানোর সাথে সাথেই চোখ দুটো কচ কচ করতে শুরু করলো। চোখ ডলতে ডলতে দরজা খুলে বের হল শাফিন। বসার ঘরে একজন হুজুর ধ্যানের ভঙ্গিতে মাটিতে বসে আছেন। শাফিন ভালোভাবে চোখ ডলে এগিয়ে গেলো ঘরের দিকে। দরজার কাছে দাড়িয়ে দেখল তার বাবা-মা দু’জনে সোফায় বসে আছেন। শাফিনের বাবার মাথায় টুপি, পরনে পাঞ্জাবী। আর তার মা পারভীন রহমান মাথায় কাপড় দিয়ে বসে আছেন। তার খটকা লাগলো। কি ব্যাপার? হচ্ছেটা কি?

শাফিনকে দেখে তার বাবা রফিক রহমান ম্লান কণ্ঠে বললেন, অজু করে আসো।

শাফিন গলা খাঁকড়ি দিয়ে বলল, কেন?

হুজুর দাঁড়িয়ে তজবি গুণতে গুণতে বললেন, অজু করে আসো।

শাফিন বলল, কেন?

রফিক রহমান বিরক্ত কণ্ঠে বললেন, বারবার জিগ্যেস করার কি আছে? মুরুব্বীরা যখন যেটা করতে বলে সেটা করতে হয়।

শাফিন গালে হাত দিয়ে বলল, কারণটা বোলো?

হুজুর দাঁড়ি হাতাতে হাতাতে বললেন, তওবা করানো হবে তোমাকে।

শাফিন স্তম্ভিত। তওবা করানো হবে মানে? সে কি কোন গুরুতর পাপ কাজ করেছে? হঠাৎ এ প্রসঙ্গ আসবেও বা কেন?

শাফিন ঠাণ্ডাগলায় বলল, কেন?

রফিকুল রহমান চোখের ইশারায় পারভীন রহমানকে চলে যেতে বললেন। তিনি কোন প্রকার শব্দ না করে স্থান ত্যাগ করলেন।

হুজুর সাহেব সোফায় বসতে বসতে বললেন, শুনলাম তুমি নাস্তিক হয়েছ?

শাফিন বলল, বাহ! নাস্তিক হয়েছি, কিন্তু আমি নিজেই টের পেলাম না! বাহ!

রফিকুল রহমান ধমক দিয়ে বললেন, বড়দের সন্মান করতে ভুলে গিয়েছ? যাও অজু করে আসো।

-আমি কোন পাপ কাজ করিনি যে তওবা করবো। তোমরা একটা ছোট ব্যাপারকে এতো বড় করে তুলছ কেন?

হুজুর ভারী গলায় বললেন, তোমার বাবার কাছে সব শুনেছি। ব্লগিং করো। নারীর সমান অধিকার নিয়ে কথা বল। বাহ।

শাফিন বলল, জী। বলি।

-ইসলামের নারীর অধিকারকে অসমর্থন করো তুমি?

শাফিন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হুজুরের দিকে। তিনি বললেন, বুঝেছি। নাস্তিকতা ঢুকেছে। শাখা-প্রশাখা বিস্তার করেনি।

শাফিন কড়াকন্ঠে বলল, আমি তওবা করবো না। আমি কোন পাপ করিনি।

হুজুর বললেন, করেছো।

-কি?

-শুনলাম তুমি বলে সমলিঙ্গ বিবাহ সমর্থন করো?

কথাটা শুনে শাফিনের হাত-পা কাঁপতে শুরু করলো। হুজুরের মুখে সমলিঙ্গ কথাটা বেশ বেমানান লাগছে। শাফিন কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল, আর কিছু বলার আছে?

হুজুর বললেন, অজু করে আসো।

শাফিন বলল, আরও কিছু বলার আছে?

হুজুর সাহেব দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, তুমি বেয়াদব। সাংঘাতিক বেয়াদব! আচ্ছা রফিকুল সাহেব আপনার ছেলেটা আবার ওসব নাতো? সমলিঙ্গ বিবাহ সমর্থন করে তার মানে সেও কি তাহলে…

রফিকুল রহমান মাথা নাড়িয়ে বললেন, কি যে বলেন হুজুর সাহেব! আমার ছেলের ওসবের ধারে কাছেও নেই। আরে বুঝলেন ইন্টারনেট দিয়ে ভুল করেছি। ফেসবুক নামে কি একটা জানি আছে সেটাই তার মাথা খেয়েছে। বয়সের বড় নানান ছেলেপুলের সাথে পরিচয় হয়েছে। এরাই ওর মাথাটা খাচ্ছে।

রফিকুল ইসলাম দাঁড়িয়ে শাফিনের হাত ধরে বললেন, হুজুর সাহেব তোকে কিছু জিগ্যেস করেছেন। উত্তর দে।

শাফিনের হা-পা শক্ত হয়ে আছে। অতি শোকে পাথর হয়ে তার বোধশক্তি সম্ভবত লোপ পেয়েছে। বুক ধকধক করছে। ঘাম ঝরছে। কিছু ঘামের ফোঁটা হাতের তালুতে জমা হচ্ছে। সে কি সঠিক উত্তরটা দিবে?

শাফিন আমতা আমতা করে বলল, আ-মি- আ-স-লে

রফিকুল ইসলাম বললেন, বল। জবাব দে!

শাফিন হাত ছাড়িয়ে গটগট করে নিজের ঘরের দিকে ছুটে গেলো।

তার পক্ষে অসম্ভব।

তওবা করা।

সত্যটা বলা।

শাফিন ঘরের দরজা সশব্দে লাগিয়ে বারান্দায় বসে হাঁপাচ্ছে। গায়ে হাত দিয়ে দেখল গরম হয়ে আছে। হাত ভেজা। সারা কপাল ভেজা। চোখের কোণায় এক’দুটো অশ্রুজল। মনটা খুব ভারী লাগছে। ইস! মনের এই দুঃখগাঁথাগুলো কাউকে যদি সে বলতে পারতো! তার কাছের বন্ধু বলতে কেউ নেই। আছে এক বান্ধবী। নাম আরোলি। সেও একজন ব্লগার। লেখালেখিতে বেশ ভালো দখল আছে। মূলত আরোলির লেখা পড়েই শাফিনের লেখালেখি করার সাহস জেগেছে। মেয়েটা মুখটা মায়াবী। দেখলে কেমন জানি দুঃখী, দুঃখী মনে হয়। কিন্তু সে দুঃখী নয়। তার সাহস অফুরন্ত। তার সাহসের পরিচয় পাওয়া যায় লেখাতে। তার কথাতে। শাফিনের অন্যমনস্ক মস্তিষ্ক চাচ্ছে আরোলির সাথে কথা বলতে। সে মোবাইলটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে কল করে ফেলল। তিনবার রিং হওয়ার পর আরোলি কল ধরে বলল, কি রে! খবর কি তোর?

শাফিন হন্তদন্ত করে বলল, আমি তোকে কিছু বলতে চাই।

আরোলি তার গলার স্বর শুনে আতঙ্কিত হয়ে বলল, কি হয়েছে তোর? সিরিয়াস কিছু?

শাফিন গলা কাঁপছে। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল, আমি তোকে আমার জীবনের সবচে বড় সত্য গোপন করেছি।

আরোলি স্বাভাবিককণ্ঠে বলল, কি?

শাফিন বলল, দোস্ত। আমি… আমি…

আরোলি বলল, আমি কি?

-আমি… আমি… কুইয়ার।

আরোলি কথাটা শুনে কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে জিজ্ঞেস করলো, কি বললি?

-আমি কুইয়ার।

আরোলি অবাককণ্ঠে বলল, তাতে কি হয়েছে? এটা আবার আলাদা করে বলার কিছু হল?

শাফিন অত্যন্ত অবাক হল আরোলির কথা শুনে। এতো সহজে সে কিভাবে ব্যাপারটাকে নিতে পারলো?

শাফিন বলল, তুই অবাক হস নি?

-অবশ্যই হই নি। কিন্তু মন খারাপ হয়েছে।

-কেন?

-আমাকে আগে জানালি না সেজন্যে!

শাফিন কাঁপাকণ্ঠে বলল, ভয়ে ছিলাম।

-তো আজ কিভাবে ভয় কাটল?

শাফিন কাঁদতে কাঁদতে বলল, আজ এক হুজুর এসেছিল আমাকে তওবা করাতে।

আরোলি অবাক কণ্ঠে বলল, কি?

আজকে যা ঘটেছে শাফিন তা সব খুলে বলল। আরোলি শুনে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, ভালো করেছিস কিছু বলিসনি।

-কেন?

আরোলি বলল, তুই কি চারপাশের অবস্থা সম্পর্কে অবগত আছিস?

-হুম।

-তোর কি মনে হয় এখন সঠিক সময়?

শাফিন বলল, সঠিক সময় তাহলে কবে আসবে বল? সব সময়ই হচ্ছে সঠিক।

-মোটেও না। নিজেকে গড়ে নে তারপর বলীয়ানকণ্ঠে নিজেকে প্রকাশ কর।

শাফিন বলল, কেন?

আরোলি দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, লেখালেখির খাতিরে। যা করতি তাও করতে পারবি না। আর বাংলাদেশের পরিস্থিতি তুই তো জানিসই।

শাফিন বলল, আর কতোদিন চুপ থাকবো?

আরোলি ম্লানকন্ঠে বলল, জানি না।

‘জানি না’ এই শব্দ দুটো শাফিনের কানে বাজতে লাগলো। মনে হচ্ছে শব্দ দুটো তার প্রত্যেকটা নিউরনে পৌঁছে গিয়েছে। তার সংবেদনশীল সব অঙ্গে শব্দ দুটো ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার মস্তিষ্ক এখন ‘জানি না’ শব্দ ছাড়া আর কিছুই মনে রাখতে পারছে না। নিজেকে যে লেখক হিসেবে দাবি করে, মুক্ত চিন্তার অধিকারী মনে করে সে আজ নিজের পরিচয় জানাতে ব্যর্থ হয়েছে। আজ ভয় বাধা হয়ে দাঁড়ালো। জীবনের ভয়, সমাজের ভয়।

আরোলি বলল, আমি ফোন রাখছি। ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা কর।

ফোনটা রেখে শাফিন বাইরে তাকিয়ে আছে। গলির মোড়ে দু-চারটা কুকুর কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে। একটা লোক ভয়ে ভয়ে তাদের পাশ কাটিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। লোকটার মুখ দেখতে খুব ইচ্ছা করলো শাফিনের। কিন্তু চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। বাড়িগুলোর ঘরের আলো রাস্তাকে তেমন আলোকিত করতে পারছে না। শাফিনের মনে হচ্ছে তার নিজের জীবনটাও এখন এমন অন্ধকারচ্ছন। বয়সের কাছে, পরিস্থিতির কাছে তাকে আজ হার মানতে হল। সমাজে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সে নিজেকে প্রকাশ করতে পারবে। তাও কি পারবে? আচ্ছা, তার নিজের ইচ্ছার কোন দামই নেই? সমাজের এতো ক্ষমতা কেন? কিভাবে পারে সমাজ তার ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে দমিয়ে রাখতে? হায়!

মোবাইল বেজে উঠলো। মেসেজ এসেছে। শাফিন গুঁতোগুঁতি করে মেসেজ খুলল। আরোলি লিখেছে, আমার একটা খুব অদ্ভুত ইচ্ছা ছিল। কি জানতে চাস? আমি সবসময় ভাবতাম আমার একটা কুইয়ার ফ্রেন্ড থাকলে খুব ভালো হত। আজ আমার ইচ্ছা পুরণ হল।

শাফিন বার্তাটা পড়ে মুচকি হাসল। হঠাৎ মন খানিকটা ভালো হয়ে গেলো। কিন্তু তাও এক প্রকার হতাশা কাজ করছে। আরোলির ইচ্ছা পূরণ হল আজ, কিন্তু তারটা কবে হবে? নিজেকে প্রকাশ করতে পারবে কি? সাহস নিয়ে মোকাবেলা করে সমাজে মাথা উচু করে দাঁড়াতে পারবে কি?

তার অভিলাষ কি আদৌ পূরণ হবে?

শাফিন দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.