করি তোমারই আরাধনা

-হ্যালো, সৈকত?
-হ্যাঁ। কী হয়েছে রে?
ফোনের ওপাশে থাকা হাসান কথার এই পর্যায়ে আমতা আমতা করতে লাগল।
অামি আবার জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে? বলবি তো!
হাসান এবার বলল, শ্রাবণের বাসা থেকে ফোন এসেছিল। ও নাকি অ্যাক্সিডেন্ট করে মারা গেছে।

অামি হঠাৎ করেই বোধশক্তিহীন হয়ে পড়লাম। ওপাশ থেকে হাসান হ্যালো হ্যালো বলা শুরু করেছে। আমি স্বাভাবিক গলায় বললাম, “বল, শুনছি।”
হাসান বলল, “আমরা সব ফ্রেন্ড সার্কেলরা ঠিক করেছি যে সাড়ে আটটার বাস ধরবো। ময়মনসিংহ পৌঁছাতে পৌঁছাতে মাঝরাত হয়ে যাওয়ার কথা। তুই যাচ্ছিস তো?”
অামি বললাম, “হু, যাবো তো।”
-তাহলে, এখনই বের হ। সাড়ে আটটা বাজতে বেশি দেরি নেই।
অামি ফোন কেটে দিলাম।

শ্রাবণ! যে শ্রাবণ একদিন শুধুই আমার ছিল, সেই শ্রাবণ মারা গেছে? কীভাবে সম্ভব? বিশ্বাস হচ্ছে না এখনও।
বাড়ি থেকে যখন বের হলাম তখন অাটটা পনের বাজে হয়তো। এখনও ওদের কেউ আসে নি। আমি একটা বেঞ্চিতে গিয়ে বসলাম। শীত করছে ভালোই।
৫ মিনিটের মাথায় ওরা সবাই দল বেঁধে আসলো। তবে, পুরনো দিনের সেই হৈ হুল্লোড় আর নেই। কতই না পাগলামি ছিল আমাদের! অার এখন? সবাই যার যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত। শ্রাবণও সংসার পেতেছিল। সে সাত বছর আগের কথা। তবে, শ্রাবণ হয়তো জানত না, ওর জন্য কেউ একজন অপেক্ষা করে। যদিও সেই অপেক্ষা পুরোপুরি অর্থহীন, তারপরেও সে অপেক্ষা করে।

টিকিট কাটা হলে আমরা বাসে উঠে বসলাম। শফিক কিছুক্ষণ কাঁদতে লাগল। তারপরই তার স্ত্রীর জ্বর নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেল; জ্বর বেড়ে গেলে কী হবে, বাসায় সে একা আছে ইত্যাদি।
আমি জানালার পাশের একটা সিটে বসেছি। কাচের জানালায় কুয়াশা বাষ্প জমেছে। এজন্য, জানালা দিয়ে তাকালে বাইরের দিকটা অদ্ভুত লাগছে দেখতে।
যাত্রী তেমন নেই বলে অল্প সময়ের মধ্যেই বাস ছেড়ে দিল।
*
তখন আমি সবে ঢাকা ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি। ভর্তি পরীক্ষা ছাড়া আগে কখনও ঢাকায় আসি নি বলে, ঢাকার কিছুই চিনতাম না তখন। শুধু চিনতাম ভার্সিটিতে যাওয়ার পথটা। একই পথ দিয়ে যেতাম, আসতাম। প্রত্যেকটা ক্লাস করতাম। এই ছিল আমার রোজকার রুটিন।
সেই বছর প্রচণ্ড বৃষ্টি হয়েছিল। বৃষ্টি আমার বরাবরই প্রিয়। ইচ্ছে করেই বৃষ্টির মধ্যে ঘুরতাম, ছাতা মাথায় ফুটপাত দিয়ে হেঁটে বেড়াতাম।

সকাল থেকেই বৃষ্টি হচ্ছিল এমন একটা দিনের কথা। ভার্সিটিতে যেতে ইচ্ছা করছিল না। এজন্য দেরি করে ঘুম থেকে উঠেছিলাম সেদিন। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল তবুও বৃষ্টি ছাড়ার নামগন্ধ অবধি নেই। ঘরের মধ্যে বসে থাকতে থাকতে দমবন্ধ লাগছিল। তাই, অনেকটা শখ করেই বাইরে বের হলাম, ছাতা মাথায় দিয়ে।

ঢাকা শহর একেবারেই গ্রামের মতো না। বৃষ্টির মধ্যে এখানে ঘোরাঘুরি করার শখ সেদিন খুব দ্রুতই মিটে গিয়েছিল। চা খেতে ইচ্ছা হচ্ছিল বলে একটা চায়ের টঙে গিয়ে বসলাম। কাদামাটিতে একাকার অবস্থা দোকানটার। চা খেয়ে যখনই বের হবো তখনই শুনলাম কেউ একজন আমাকে ডাকল, এই যে শোনো!
অামি পেছন ফিরে তাকালাম। চিনতে পারলাম না সে কে। আমি অপ্রস্তুত স্বরে বললাম, জ্বী বলুন।
“অাসলে আমি আমার ছাতাটা মেসে ফেলে এসেছি। কাইন্ডলি আমাকে আমার মেস পর্যন্ত পৌঁছে দিলে খুবই ভালো হতো। বৃষ্টির মধ্যে এখানে আটকে পড়েছি,” সে বলল।
অামার তখন কিছুটা শঙ্কা হতে লাগল; ছিনতাই টিনতাই করে না তো আবার! অবশ্যি দেখে তেমন মনে হচ্ছে না। তারপরেও আমার কেমন জানি অস্বস্তি লাগছিল। সরাসরি না বলাটা তখনও রপ্ত করতে পারি নি। তাই, বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলাম।
অামাকে ইতস্তত করতে দেখে সে বলল, কী হয়েছে? অামার ওপর সন্দেহ হচ্ছে?

অামি আমতা আমতা করতে লাগলাম, না মানে ইয়ে…
সে হো হো করে হেসে উঠল। “সন্দেহ করার দরকার নেই। আমরা একই ভার্সিটির একই ডিপার্টমেন্টে পড়ি। তুমি তো কারো দিকে ভালোমত তাকাও না, তাই হয়তো আমাকে খেয়াল করো নি। আমরা একই সাথে ক্লাস করি”
তখন আমি সামান্য লজ্জা পেয়ে বললাম, ও আচ্ছা। আসুন আমার সাথে।
সে ছাতার নিচে আসলো। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে। কথায় কথায় বলল, তোমার নামটাই তো জানা হলো না। কি যেন নাম তোমার…?

অামি বললাম, সৈকত। আপনার?
-শ্রাবণ।
এরপর সে তার মেস দেখিয়ে বলল, ওইখানটায় আমার মেস। দোতলায় আমি থাকি। যদি কখনও দরকার পড়ে তাহলে অবশ্যই জানাবে।
অামি বললাম, জ্বী, জানাবো।
তখন সে বলল, আমাকে তুমি করে ডাকলে খুশি হতাম। আর তাছাড়াও আমরা একই ব্যাচের স্টুডেন্ট।
অামি মৃদু হাসলাম।

এর বেশ কয়েকদিন পরের কথা। শ্রাবণের ব্যাপারটা মাথা থেকে হারিয়ে গেছে। এখন মূল টেনশন টেস্টগুলা নিয়ে। কীভাবে ভালো করা যায়।
এমনি এক দিন ক্লাস শেষ করে আসছিলাম, তখন পেছন দিকে শ্রাবণের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম, এ্যাই, সৈকত!
পেছন ফিরে তাকালাম। এই প্রথম শ্রাবণকে ভালো করে দেখলাম। নীলচে শার্টটায় দেখতে তো ভালোই লাগছে! কালো ফ্রেমের চশমা পরেছে বলে চেহারায় অন্য রকম একটা সৌন্দর্য এসেছে।
“কী ব্যাপার? তোমার তো কোনো খোঁজই নেই। ভুলে টুলে গেলে নাকি?” শ্রাবণ বলল।
অামি বললাম, কি যে বলেন না। কেমন আছেন বলুন?
-আবার আপনি করে বলছ? সেদিন না বলেছিলাম তুমি করে বলতে?
-আচ্ছা ঠিক আছে। তুমি করেই বলব। কেমন আছো বলো?
শ্রাবণ মৃদু হেসে বলল, এই তো ভালোই আছি। তা পড়াশোনা কেমন হচ্ছে, হ্যাঁ?
-এই তো হচ্ছে ভালোই।

শ্রাবণ সম্ভবত আরো কিছু বলতে চাইছিল কিন্তু আমার হঠাৎ করেই অস্বস্তি লাগতে শুরু করল। তাই একটা অজুহাত দেখিয়ে সেদিনের মতো মেসে চলে আসলাম।
তবে, সত্যি বলতে কী আমি টের পেতাম যে শ্রাবণের মধ্যে কিছু একটা চলছে। যেমন, ক্লাস হচ্ছে এর মধ্যে মাঝেমাঝেই মনে হতো যে সে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। কিংবা, লেকচারার স্যার আসতে কিছুটা দেরি করছে এর মধ্যেই সে সবার সামনে গান ধরতো, “নিশিদিন মনের ভেতর করি তোমারই আরাধনা”। গানের গলা ভালোই ছিল তার। তার আরেকটা গুণ ছিল। ভালো ছবি আঁকতে পারতো সে। কোনো কোনো দিন তাকে একমনে ভার্সিটি ক্যাম্পাসে বসে তার ড্রয়িং বইটায় ছবি আঁকতে দেখতাম। তাকে ডেকে কিছু বলতে সাহস পেতাম না। কিন্তু, দূর থেকে তাকে দেখতে ভালোই লাগত। হঠাৎ হঠাৎ তার সাথে চোখাচোখি হয়ে যেত। আমি দ্রুত চোখ সরিয়ে ফেলতাম তখন।
হয়তো দুর্বল হয়ে পড়ছিলাম ওর প্রতি। ব্যাপারটা সেও টের পেয়ে গিয়েছিল হয়তো।

ধীরে ধীরে আমি ওর সাথে কিছুটা ফ্রী হতে শুরু করেছিলাম। ক্লাস শেষ করার পর নতুন একটা রুটিন পেয়ে গিয়েছিলাম তখন। আর সেটা হচ্ছে শ্রাবণের সাথে কমপক্ষে আধা ঘণ্টা গল্প করা। ওর সাথে কথা বলার পুরোটা সময় আমি যেন পৃথিবী থেকে হারিয়ে যেতাম। কেমন যেন একটা মনোবল পেতাম তার সাথে কথা বলে। মনে মনে তার একটা নামও ঠিক করে ফেলেছিলাম; অক্সিজেন!
ভাদ্র মাস পড়েছে তখন এমন এক সন্ধ্যার কথা। আমি মেসে মাত্রই পড়তে বসলাম। এমন সময় মেসের একটা কর্মচারী আমার রুমে এসে বলল, এখানে সৈকত কে?
অামি বললাম, জ্বী, আমি।
“অাপনারে শ্রাবণ নামের একজন ডাকে। নিচ তলায় দাঁড়ায় আছে। আপনি আসেন।” লোকটা বলল।
অামি কিছুটা অবাক হলাম। শ্রাবণের সাথে তো সকালেই কথা হয়েছে। এর মধ্যে কী হল! তবুও, খুশিমনেই রুম থেকে বের হলাম।

নিচ তলায় এসে দেখি মশাই দাঁড়িয়ে আছে। আশ্চর্য! পাঞ্জাবী পরেছে কেন? অাবার ডান হাত পিছনে রেখে কিছু একটা লুকিয়ে রেখেছে বলে মনে হচ্ছে। আমি হাসতে হাসতে বললাম, শ্রাবণ, তুমি আমার মেসে? হঠাৎ?
প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ও মিটমিট করে হাসতে লাগল।
নিচ তলায় মেসের বেশ কিছু ছেলেরা দাঁড়িয়ে ছিল। শ্রাবণ বলল, চলো, একটু বাইরে যাই।
অামি অবাক হয়ে বললাম, কেন?
“অারে আসো তো।”
অামি মেসের বাইরে চলে এলাম। তখনও শ্রাবণ তার হাতটা পিছন দিকেই রেখে দিয়েছে।
মেসের বাইরে নিরিবিলি একটা জায়গায় আসার পর শ্রাবণ হুট করে তার ডান হাতটা সামনে নিয়ে এলো। আর হাতটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো। তার হাতে একটা কাগজের ব্যাগ।
অামি বললাম, কী এটা?
সে বলল, নিজেই দেখে নাও!
অামি তার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে ব্যাগটার ভেতরে হাত দিলাম। একটা বাদামী রঙের হাতঘড়ি ছিল ভেতরে।
জিজ্ঞেস করলাম, এটা কার?
সে বলল, মশাই, এটা আপনার! অারেকটা জিনিস অাছে।
বলে সে তার পাঞ্জাবীর পকেটে হাত দিয়ে একটা কাগজ বের করল। আর বলল, কাগজটা রুমে গিয়ে খুলবে।
অামি জিজ্ঞেস করলাম, এসব কী করছো শ্রাবণ? অামি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, এই ক’দিনে তুমি আমার জন্য খুবই প্রয়োজনের হয়ে পড়েছ। সারাদিন যখনই কোনো কাজ করতে যাই সবসময় তোমার মুখটাই চোখে ভাসে। ভালোও লাগে কল্পনায় তোমায় দেখে। তোমার কথা বলা, হাসির শব্দ সবসময় কানে বাজে। আমি বুঝতে পারছি না কেন এমনটা হচ্ছে। হতে পারে আমি তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি।
কথাটা শুনে আমার হৃদপিণ্ড ছ্যাৎ করে উঠল।
ও বলতে থাকলো, “তোমাকে এখনই কিছু বলতে হবে না। তবে ঠিক ছাব্বিশ তারিখেই আমি তোমার মতামত শুনতে চাই।”
অামি বললাম, “ছাব্বিশ তারিখ আসতে এখনও বিশ দিন বাকি। তুমি চাইলে এখনই আমার উত্তর শুনে নিতে পারো।”
“উঁহু! যদিও আমি বুঝতে পারছি তুমি কী বলবে, তবুও আমি আমার নিজেকে ২০টা দিন অপেক্ষা করাতে চাই। অপেক্ষা করাতেও আনন্দ আছে!” শ্রাবণ বলল।

অামি হাসতে হাসতে বললাম, “আচ্ছা ঠিক আছে জনাব।”
এরপর ওর সাথে বেশ অনেকক্ষণ হাঁটলাম। জোছনা রাত ছিল হয়তো। তবে, ঢাকা শহরে জোছনা বোঝার কোনো উপায় নেই। স্ট্রিট ল্যাম্পের আলোয় চারদিক সয়লব। তবুও, হাঁটতে ভালো লাগছিল। হয়তো জীবনের শ্রেষ্ঠ কিছু সময় ছিল ওটা।
রুমে ফিরতে ফিরতে রাত দশটার মতো বেজে গেল সেদিন। তড়িঘড়ি করে শ্রাবণের দেওয়া কাগজটা বের করলাম। পেন্সিলে আঁকানো একটা স্কেচ ছিল সেটা। শহুরে রাস্তায় একটা ছেলে পেছন ঘুরে দাঁড়িয়ে আছে। তার মাথায় ছাতা। বৃষ্টি হচ্ছে। ভালো করলে দেখলে ছেলেটার দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে কারো জন্য অপেক্ষা করার একটা ব্যাপার দেখা যায়। এটাই হলো ছবির বিষয়। ছবির নিচটায় লেখা, “পড়ুয়া ছেলে”!।
খুশি মনে সেদিন ঘুমাতে গেলাম।

ঠিক ২০ দিন পর চিঠি লিখে ভার্সিটির দিকে রওনা দিলাম। ইচ্ছে করেই লাল পাঞ্জাবীটা পরেছিলাম সেদিন। ক্যাম্পাসে ঢুকতে না ঢুকতেই দেখি সে আমার আগে এসে বসে আছে। আমি তার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়লাম।
সে প্রচ্চণ্ড উৎসাহের সাথে প্রায় দৌড়ে আমার কাছে চলে এলো। এসেই বলল, তোমার মতামতটা দাও। তোমাকে ২০ দিন অপেক্ষা করাতে গিয়ে আমার নিজের অবস্থাই কাহিল। তাড়াতাড়ি বলে ফেলো!
অামি আমার ব্যাগ থেকে চিঠিটা বের করলাম আর শুকনো মুখে তার দিকে চিঠি বাড়িয়ে দিলাম। সে চিঠিটা নিতে নিতে বলল, কী ব্যাপার? মুখ ওমন করে আছো কেন?
অামি বললাম, কিছু না। তুমি পড়ো।
সে বলল, এভাবে মুখ করে অাছো, আমার কিন্তু আমার টেনশন হচ্ছে।
অামি আবার বললাম, পড়ো তো চিঠিটা।
সে পড়তে শুরু করলো।
চিঠিটা এরকম ছিল,

“শ্রাবণ!
অাজ থেকে ২০ দিন আগের এক রাতে তুমি আমাকে বেশ চমকিয়ে দিয়ে নিজের মনের কথা বলেছিলে। সেই মুহূর্তে আমি পৃথিবীর সবথেকে সুখি মানুষ ছিলাম হয়তো। কিন্তু, রুমে আসার পর তোমার সাথে আমার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা মনে হওয়ার পর আমি আমার ভয় হচ্ছে। আমি আর সামনের দিকে এগোতে চাচ্ছি না। হয়তো তুমি বুঝতে পারছ আমি কী বোঝাতে চাচ্ছি। একারণে তোমার প্রোপোজাল আমি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করছি।
সৈকত।”

চিঠিটা পড়ে আমার মতো শ্রাবণের মুখও শুকিয়ে গেল। হয়তো চোখের কোণে সামান্য পানিও চলে এসেছিল। আমার দিকে করুণচোখে তাকিয়ে বলল, তুমি কি সিরিয়াস?
অামি বললাম, হু।

সে তখন কোনো কথা না বলে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইলো। আমি তখন আকাশ ফাটিয়ে হেসে উঠেছিলাম। “আরে পাগল! তোমার কি মনে হয় আমি তোমার প্রোপোজাল ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখি? দাঁড়াও, আসল চিঠিটা দেই।” বলে আমি ব্যাগে রাখা আরেকটা চিঠি বের করলাম। তারদিকে বাড়িয়ে দিলাম। সে আমার দিকে ঘুষি মারার একটা ভঙ্গি করল। আমি খিলখিল করে হাসতে লাগলাম। চিঠিটা ও পড়া শুরু করলো,

“শ্রাবণ!
মন খারাপ করো না। আমি আসলেই তোমার প্রপোজাল ফিরিয়ে দিচ্ছি।
সৈকত”

চিঠি পড়া হলে ও আবার আমার দিকে তাকালো। আমি আগের চেয়ে কয়েকগুণ জোরে হাসতে শুরু করলাম। রাগ করে সে দ্রুত হাঁটতে শুরু করল। আমি হাসতে হাসতে দৌড়ে গিয়ে তার শুষ্ক হাতটা ধরলাম। “আমি আসলেও তোমাকে অনেক অনেক বেশি ভালোবাসি। হয়তো তুমি যতটুকু বাসো তার থেকেও বেশি। তোমার মতো আমারও একই অবস্থা। সারাদিন শুধু তুমিই শুধু মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাও। তাহলে বুঝে নাও,” বললাম আমি।
ততক্ষণে মশাই একটু করে হাসতে শুরু করলো। বলল, সকালে কিছু খেয়েছ?

অামি বললাম, হু অনেক আগেই খেয়েছি।
সে বলল, তা তো খাবেই। রাক্ষশ হচ্ছো যে দিনদিন।
কথাটা শুনে অামি আস্তে করে ওর পিঠের ওপর একটা কিল দিলাম। বললাম, কেন তুমি খাও নি?
সে বলল, নাহ। টেনশনে খাওয়া দাওয়া বন্ধ আমার কাল রাত থেকে।
অামি বললাম, চলো। ওই দিকটায় একটা ভালো খাবারের দোকান আছে। কিছু খেয়ে আসি। আমারও ক্ষিধে পেয়েছে।
“রাক্ষস” ও বলল।
অামি হাসতে লাগলাম। সেও হাসছিল। আহা! কতো সুন্দর হাসিই যে তার ছিল।

ক্লাসের বাইরে আমরা মাঝে মাঝে একটা বটগাছের নিচে গিয়ে বসতাম। ঢাকা শহরে বটগাছ আছে এটা আসলেই আশ্চর্যের। অবশ্য জায়গাটা শ্রাবণই খুঁজে বের করেছিল। আমি বটতলাটার নাম দিয়েছিলাম “প্রেমবট”! বটতলায় ভালো বাতাস করতো। গ্রীষ্মের কতো বিকেল যে বটগাছটার নিচে বসে কাটিয়েছি তার হিসেব নেই। কিছুটা গল্প, সামান্য রাগারাগি আর প্রচুর ভালোবাসায় ভালোই চলছিল সবকিছু।
দেখতে দেখতে অনেকগুলো বছর কেটে গিয়েছিল। ভার্সিটির পাট চুকানো হয়ে গেছে ততোদিনে। শ্রাবণ বিসিএস এর জন্য চেষ্টা করতে লাগল। আর আমি শুরু করলাম টিউশনি। দুজনেই তখন ঢাকায়। শ্রাবণও টিউশনি শুরু করেছিল। তবে, বিসিএস নিয়েই হয়তো সে বেশি সিরিয়াস ছিল। কিন্তু, বিসিএস এর ওপর আমার ভরসা ছিল না। ঠিক করেছিলাম কোনো একটা মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষকতার জন্য চেষ্টা করবো। এ সময়টায় যদিও আমাদের যোগাযোগ অনেকটাই কমে গিয়েছিল তবুও মনে হয় না সম্পর্কে ঘাটতি ছিল। তবে, শ্রাবণকে কোনো কোনো দিন চিন্তুিত বলে মনে হতো। কিছু জিজ্ঞেস করলে এড়িয়ে যেত। তবে, এটা নিয়ে তেমন কিছু ভাবতাম না। অবশ্য আমারও ভয় করতো। ভার্সিটি পাশ করে চাকরি বাকরি করা ছেলেদের বিয়ের জন্য আদর্শ পাত্র হিসেবে ভাবা হয়। যার কারণে দুজনেরই পরিবার থেকে মেয়ে দেখার পর্ব শুরু হয়েছিল। আমি যদিও বাসায় সাফ করে না বলে দিয়েছিলাম। কিন্তু, শ্রাবণ হয়তো কিছুই বলেছিল না বাসায়। আমি শ্রাবণকে মাঝে মধ্যে বলতাম, “শ্রাবণ! অামি কিন্তু বিয়ে করছি না এটা বাসায় সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছি। তুমি জানাচ্ছ কবে?”

ও কিছুটা এড়িয়ে যেত বিষয়টাকে, “আরে বলব বলব। চিন্তা করো না।”
অামি তখন করুণ মুখে বলতাম, “তোমাকে ছাড়া সত্যিই কিছুই নেই আমার।”
ও বলত, “জানি, জানি।”
বিসিএস পরীক্ষা হয়ে গেল। ভাইভা, রিটেন সবকিছু শেষ হওয়ার পর দেখা গেল শ্রাবণের নাম এনলিস্টেড হয়েছে, শিক্ষক বিসিএস ক্যাডার হয়ে গেছে সে। বিসিএস এর রেজাল্টের পর ও কিছুদিনের জন্য তার গ্রামের বাড়িতে চলে গিয়েছিল। আমি তখন নিতান্তই একা ঢাকায়। কয়েকটা স্কুলের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষাও দিয়েছিলাম সে সময়।
এগারোদিনের মাথায় শ্রাবণের গ্রামের বাড়ির ঠিকানা থেকে আমার নামে একটা চিঠি এলো। চিঠি খুলে দেখি ভেতরে একটা বিয়ের কার্ড। শংকিত আমি দ্রুত বিয়ের কার্ডটা খুললাম। “আগামী ২৬শে মে মোঃ শ্রাবণ হোসেন এবং মোছাঃ রুকসানা আক্তার এর শুভ বিবাহ সম্পন্ন হতে যাচ্ছে। আপনাকে সপরিবারে নিমন্ত্রণ” এরপর বিয়ের অনুষ্ঠানসূচি, অমুক দিনে গায়ে হলুদ, ওই দিন বউভাত ইত্যাদি ইত্যাদি লেখা।
অামার হাত কাঁপতে লাগল। হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম তখন আমি। পরের কয়েকটা ঘণ্টা যে কীভাবে চলে গিয়েছিল তা বুঝতেই পারছিলাম না। অনেকক্ষণ পর সংবিত ফিরেছিল সেদিন। বাদামী ঘড়িটা, শ্রাবণের দেওয়া চিঠিটা, ওর করা পোট্রেটগুলা সব এখনও আমার কাছেই সযত্নে আছে।
পরদিন খুব ভোরের ট্রেন ধরে রাজশাহী আমার নিজের বাসায় চলে আসলাম। আর হতচ্ছাড়া চোখ কোনো বাঁধ না মেনে অঝরে পানি ঝরাচ্ছিল।

*
পঁচিশ তারিখ ভোরবেলার কথা। হালকা কুয়াশা পড়েছিল সেদিন। আমি রোজকার মতো আনমনে বাড়ির সামনের পুকুর পাড়টায় বসে ছিলাম। একসময় দেখি রাস্তা দিয়ে কে যেন হেঁটে আসছে। দূর থেকে খুব চেনা চেনা লাগছিল। রোদ উঠেছে ততক্ষণে। কিছুক্ষণ পর বুঝতে আর বাকি থাকলো না যে শ্রাবণ-ই আসছে। আমার বাড়ি ওর কাছে অচেনা থাকার কথা ছিল না। কারণ, আম-কাঁঠালের সময় ওকে বাড়িতে এনেছিলাম দু’বার।
ওকে দেখেই আমার এমনিতেই চোখ ভিজে এলো। দু’হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেললাম। প্রচণ্ড কান্না পাচ্ছিল তখন।
অামি টের পেলাম শ্রাবণ আমার পাশে এসে দাঁড়াল। আবার তার ভারি স্যান্ডেলের শব্দ দূরে মিলিয়ে গেল।
বাড়িতে এসে দেখি ও বাবা আর আম্মার সাথে গল্প করছে। আমাকে বাড়িতে ঢুকতে দেখে আম্মা বলল, কিরে সৈকত, কোথায় ছিলি এতক্ষণ। দ্যাখ শ্রাবণ এসেছে।

অামি ওর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসার চেষ্টা করলাম।
বেলা এগারটার দিকে আমি বাজার করে বাড়ি ফিরলাম সেদিন। যদিও শ্রাবণের দুপুর পর্যন্তও থাকার কথা না। কারণ, পঁচিশ তারিখ মানে সেদিন ওর গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান।
বাড়ি এসে আম্মাকে বাজার দিয়ে আমি আমার রুমে গেলাম। চেয়ারে শ্রাবণ বসে আছে। আর জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। আমি ওকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম, দ্রুতপদে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইলাম। কিন্তু, সেই পুরনো ডাক “এ্যাই সৈকত!” শুনে পিছে তাকানো ছাড়া আর উপায় ছিল না আমার। চোখ আবার ভিজে আসছিল। দেখলাম শ্রাবণও চোখ মুছল। “আসলে তোমাকে কীভাবে বুঝাবো বুঝতে পারছি না। বাড়ি যাওয়ার পর সব কেমনভাবে যেন ওলট পালট হয়ে গেল। বাসা থেকে অনেক আগে থেকেই মেয়ে দেখা হচ্ছিল। বিসিএস এর রেজাল্টের পর তাই বাসা থেকে দেরি করতে চায় নি” বলে শ্রাবণ আরেকবার চোখ মুছল।

অামার আর কিছুই শুনতে ইচ্ছা হচ্ছিল না। শ্রাবণের ওপর খুব অভিমান হচ্ছিল। আমি কোনো কথা না বলে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। শ্রাবণ অসহায় ভঙ্গিতে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে।
সাড়ে এগারটার দিকে শ্রাবণ বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। বাবা আর আম্মাকে তার বিয়ের দাওয়াত দিয়ে গিয়েছিল। মাথা নিচু করে ও চলে যাচ্ছিল হেঁটে হেঁটে। ওকে ওভাবে যেতে দেখে সেই সময় আমার ভেতর যে কী হচ্ছিল সেটা আমি আর সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কেউই জানে না।

বাড়িতে বাবা আর আম্মাকে বিয়ে বাড়িতে যেতে সম্পূর্ণভাবে বারণ করে দিয়েছিলাম। তারা দুজন যে অবাক হয়েছিল সেটা স্পষ্টই বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু, কিছু করার ছিল না।
কয়েক সপ্তাহ পর আবার ঢাকায় ফেরত আসলাম। একটা জায়গায় নিবন্ধন পরীক্ষায় টিকে গিয়েছিলাম। সেখানে আবার ভাইভা আর রিটেন এক্সাম হলো। শেষ পর্যন্ত আমিই টিকে গেলাম। মাধ্যমিক স্কুল ছিল সেটা। তবে, স্কুলটার প্রিন্সিপাল কেন জানি না দুচোখে আমাকে দেখতে পারত না। তার প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল ক্রমাগত আমার খুঁত ধরা। সেখানে ছয়টা মাস অনেক কষ্টে ছিলাম। আস্তে আস্তে হয়তো প্রিন্সিপাল স্যারও আমার আন্তরিকতা বুঝতে পারছিল। একদিন সকালে তিনি আমাকে ডেকে বললেন, “বাবারে, তোমাকে আমি এতদিন কথা আর কাজের মাধ্যমে কষ্ট দিয়েছি বারবার। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও!”

ওই স্কুলটায় এখনও আছি। শ্রাবণের কথা যে মনে হতো না তা তো না। প্রতি শুক্রবার “প্রেমবট” গাছটার পাশ দিয়ে হেঁটে আসতাম। তবে কখনও গাছটার তলায় বসতাম না। মাঝে মাঝে ওর পোট্রেট আর চিঠিগুলায় হাত বুলাতাম। এভাবেই চলে যাচ্ছিল।

শ্রাবণের বিয়ের পর একদিন মাত্র ওর সাথে দেখা হয়েছিল। হাসানের বিয়ের দিন। তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই এসেছিল সেবার। তবে, কেউই কোনো কথা বলেছিলাম না ওই দিন। অামিও চাচ্ছিলাম না আমার জন্য ও অস্বস্তিতে পড়ুক।

*
বাসের ঝাঁকুনিতে আমার তণ্দ্রা কেটে গেলো। শফিক ঘুমাচ্ছে। আর হাসান ফেসবুকিং করছে। জানালায় তখনও কুয়াশা জমে ছিল। হাসানকে জিজ্ঞেস করলাম, ময়মনসিংহ কী পৌঁছে গেছি?
হাসান জবাব দিল, এইতো আর দশ মিনিট।
অামি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।

*
শ্রাবণের বাড়ি মানুষে পরিপূর্ণ। কেউ একজন উচ্চস্বরে কাঁদছে তা শোনা যাচ্ছে। হিফজখানার ছেলেরা এসে কুরআন শরীফ পড়ছে হয়তো। তিলাওয়াতের মৃদু আওয়াজ আসছে। বাড়ির একপাশটায় কবরের জন্য দরকারি বাঁশ কাটা হচ্ছে। চাটাই কেনার কথাবার্তাও হচ্ছে হয়তো। পাড়ার মুরুব্বিরা কাজটা করছে দেখলাম।

বাড়িতে ঢুকেই শফিক কেঁদে উঠলো। হাসানও কাঁদতে শুরু করলো। আমি খাটিয়ার দিকে এগিয়ে গেলাম। শ্রাবণের ডান হাতটায় কম্পাউন্ড ফ্র্যাকচার হয়েছিল কে যেন বলল। গোসল করানো হয়ে গিয়েছিল ততক্ষণে। দূর থেকে সাদা কাফনে মোড়ানো তার দেহটা নজরে আসছিল। বুক ভারি হয়ে গেল হঠাৎ করেই। মুখটা তখনও যেন জীবন্ত! সেই পুরনো শ্রাবণের মতো।
নাকে তুলা গোঁজা তার। আগরবাতি জ্বলছে। সামান্য মিষ্টি গন্ধ আসছে ওখান থেকে। আমি একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলাম তার মুখের দিকে। কিছুক্ষণ পর শ্রাবণের চাচী হবে হয়তো উনি এসে আমাদের হাতমুখ ধুয়ে নিতে বললেন।

*
রাত তখন দেড়টা বাজে। গ্রামের মানুষজন অনেক আগেই চলে গেছে। আমরা ক’জন, শ্রাবণের বাবা আর তার ছোট ভাই বসে আছি। শ্রাবণের শ্বশুরমশাইও ছিলেন। কিন্তু, বয়স হওয়ার দরুণ তিনি এই শীতে বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারলেন না। শ্রাবণের পিচ্চি ছেলেটাও বসে ছিল অনেকক্ষণ। বারবার বলতে ছিল, “বাবা উঠছে না কেন?”

রাত বাড়তে ছিল। শফিকরা শুয়ে পড়লো। শ্রাবণের ছোট ভাইয়েরও হয়তো ঘুম পেয়েছিল। সে বারবার হাই তুলছিল। আমি ওকে বললাম, তুমি ঘরে গিয়ে ঘুমাও। আমি আছি এখানটায়।”
ও উঠে গেল। শ্রাবণের বাবা তখন স্থির চোখে বসে ছিলেন। আমি গিয়ে ওযু করে আসলাম। শ্রাবণের চাচীর থেকে একটা কুরআন শরীফ নিলাম। শ্রাবণের পাশে বসে সূরা ইয়াসিন পড়তে শুরু করলাম। শ্রাবণের পাড়ার কোনো একটা বন্ধু বারবার আসছিল আর কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছিল।

আমি জেগে রইলাম। আগরবাতি জ্বালানোর সামান্য কাজগুলো করতে থাকলাম। রাত সাড়ে তিনটার দিকে আমি কুরআন পড়া বন্ধ করলাম। একবার তাকালাম ওর দিকে। কতোটাই যে পবিত্র লাগছে ওকে দেখতে! দেখে যেন মনে হচ্ছিল তার ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি হাসি ভাবও আছে। তাকিয়েই থাকলাম তার দিকে।
সকাল সাড়ে নয়টায় শ্রাবণের জানাজা নামায হয়ে গেল।
জানাজা পড়ে শ্রাবণের বাসায় এসে ওর মা-বাবার রুমটায় আমি শুয়ে পড়লাম। প্রচন্ড ক্লান্ত লাগছিল। শোয়া মাত্রই ঘুমিয়ে পড়লাম।

ঘুম ভাঙল কেউ একজনের ডাক শুনে। “কাকু, আর কতক্ষণ ঘুমাবে?”
অামি চোখ খুললাম। তাকিয়ে দেখি শ্রাবণের পিচ্চিটা বসে আছে। সেই ডাকছে আমাকে এবং বলছে “আর কতক্ষণ ঘুমাবে?”
অামি বললাম, “এই তো বাবা। আর ঘুমাবো না। খুশি?”
ছেলেটা মাথা নাড়লো। তার চোখদুটো পুরোপুরি শ্রাবণের চোখের মতো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমার নামটা যেন কী?
ও বলল, ধ্রুব।
অামি বললাম, আরে বাহ! এত ভারী নাম? নামটা কার পছন্দ বলো তো?
ধ্রুব এক কথায় বলল, বাবার!
অামি আবার জিজ্ঞেস করলাম, ধ্রুব তুমি কি স্কুলে ভর্তি হয়েছ?
সে গর্বের সাথে বলল, “হু, হয়েছি তো। আমি তো কুচিং করছি।”
অামি হেসে বললাম, কুচিং করছো?
সে বলল, হ্যাঁ তো!

“তোমার স্কুলে নতুন বন্ধু হয়েছে?” অামি জিজ্ঞেস করলাম।
ও বলল, “হ্যাঁ, অনেক বন্ধু আছে আমার ক্লাসে।”
অামি জিজ্ঞেস করলাম, কয়েকজনের নাম বলো তো শুনি।
ধ্রুব মহান্দনে তার বন্ধুদের নাম বলতে শুরু করলো।
শ্রাবণের বাসা থেকে বলে দিয়েছিল যে কুলখানির পর যেন আমরা ঢাকায় যাই। কুলখানির আগে কোনো ক্রমেই যেন আমরা বের না হই। তাই আমি ফোন করে আমাদের প্রিন্সিপ্যাল স্যারকে বলে দিলাম যে তিনদিন আমার স্কুলে যাওয়া হবে না।

*
পরদিন বিকেলে আমরা শ্রাবণদের বাসার সামনে বসেছিলাম। এমন সময় ধ্রুব কোত্থেকে চলে আসল। “কাকু, কাকু আমার সাথে একটু আসো না। আমাকে একটা হাতির ছবি আঁকিয়ে দাও না,” সে বলতে লাগল।
অামি বললাম, আচ্ছা বাবা চলো।

শ্রাবণের রুমে ওই প্রথম ঢুকলাম। শ্রাবণের গায়ে সেই পরিচিত গন্ধ তখনও ছিল। আমি সোফার ওপর বসলাম। ধ্রুব ওর অাঁকার খাতা নিয়ে আসলো। আর আনল একটা পেন্সিল। খাতা খুলে আমি সাদা একটা পৃষ্ঠা বের করে একটা হাতির ছবি এঁকে দিলাম। আমার আঁকানো ছবি হয়তো ধ্রুবের পছন্দ হয়েছিল। ও আমাকে বলল, আমার আব্বুও তোমার মতো ভালো ছবি আঁকে জানো?
অামি উৎসাহের সাথে বললাম, কই তোমার আব্বুর আঁকা ছবি দেখি।
ধ্রুব তার ড্রয়িং খাতার পৃষ্ঠা উল্টাতে লাগলো। একটা সময় সে থেমে গেলো আর আমার দিকে খাতাটা ধরে বলল, এই দেখো আমার আব্বুর আঁকা ছবি।

অামি তাকালাম। আর হতভম্ব হয়ে গেলাম। খুব পরিচিত একটা ছবি আঁকা ছিল ওখানে। শহুরে রাস্তায় একটা ছেলে বৃষ্টির মধ্যে ছাতা মাথায় দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ছবির নিচের লেখা ছিল, “পড়ুয়া ছেলে”। সেই হাতের লেখা!
অামার হাত কাঁপতে লাগলো। চোখ ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল। আমি দ্রুত ধ্রুবকে বললাম, “ধ্রুব বাবা, আমাকে এক গ্লাস পানি খাওয়াতে পারবে?”
ধ্রুব বলল, তুমি বসো, আমি আনছি।
ধ্রুব রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরও আমি পাথরের মতো বসে রইলাম। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল।
পানি নিয়ে এসে ধ্রুব দাঁড়িয়ে পড়লো। বলল, তুমি কাঁদছো কেন কাকু?

“কোথাও কাঁদছি? চোখে কী যেন একটা পড়লো”

ধ্রুব এসে তার ছোট্ট হাতটা দিয়ে চোখ মুছে দিল। আর বলল, হাসো হাসো।
অামি ওকে কোলে তুলে নিলাম। আর ওর দিকে তাকিয়ে একটু হেসে দিলাম। ধ্রুবও মিষ্টি করে হাসল।
চোখ তবুও ঝাপসা হয়ে আসছিল বারবার।

ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে গেছে।

লেখকঃ ফাহিম হাসান

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.