নীলকান্তমণি

লেখকঃ অরিত্র হোসেন

১)

‘তাহলে তুমি বিয়ে করছো?’

খুব আগ্রহ সহকারে কৌশিক তাকালো আবিরের দিকে। বিয়ের শেরওয়ানীটা তার হাতে। সেটার দিকে চোখ বড় বড় করে চেয়ে আছে। চোখের পাতা নড়ছে না। চেয়ে থাকার মতো শেরাওয়ানী নয়। বুকের দিকে অতি কুৎসিত নকশা আঁকা। আলপনার নকশা বিয়ের শেরওয়ানীতে মানায় নাকি? কৌশিক ঠাণ্ডা স্বরে বলল, কি পছন্দ হচ্ছে না?

আবির হড়বড় করে বলল, পছন্দ হবে না কেন? নিজেই তো পছন্দ করে কিনে আনলাম। তুমি তো আবার এসব ব্যাপারে খুব অনভিজ্ঞ। একটা দোকানে নিয়ে গেলে কোনটা কিনবে না কিনবে, দিশেহারা হয়ে যাও। তারপর মাথা চুলকাতে চুলকাতে সবচে বাজেটা কিনে নিয়ে এসে মন খারাপ করে বল, যাহ! কিনে ঠকলাম। হাহাহাহা…

আবির গা দুলিয়ে হেসে যাচ্ছে। কৌশিক আজ লক্ষ্য করল ওর হাসিতে একটু দুঃখ দুঃখ ভাব আছে। সেটা কি পরিস্থিতির জন্যে প্রকাশ পাচ্ছে না আগেও ছিল? আগে তো চোখে পড়েনি তার! আজই কেন ধরতে পারলো বিষয়টা সে? রহস্যজনক!

-রয়্যাল ব্লু কালারটা তোমাকে খুব মানায়। তাই এই কালারের শেরওয়ানী কিনে আনলাম। পরে দেখো তো ঠিক হয় কিনা!

-পরতে পারবো না। তুমি শেরওয়ানীটা রেখে আমার কাছে এসো। কথা বলবো।

-কেন? এখান থেকে তো কথা বলা যাচ্ছে। তোমার কাছে যেতে হবে কেন? বিয়ের আগে আগে অভ্যাস করতে হবে কিভাবে তোমার সাথে কম কথা বলে থাকা যায়। নাহলে পরবর্তীতে আমার কপালে শনি আছে। হাহাহাহা!

-আবির! এদিকে আসো, কথাটা শান্ত স্বরে বলল কৌশিক।

শেরওয়ানীটি খুব যত্ন করে প্যাকেটে রাখলো আবির। তারপর ঘরের দরজার কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়ালো। ঠিক ১ মিনিট চুপ করে দাড়িয়ে থাকার পর সে ছুটতে ছুটতে বারান্দায় গেলো। শব্দ করে একটা চেয়ার টেনে বসে ম্লান গলায় বলল, কি হয়েছে? কি কথা বলতে চাও?

হঠাৎ আনন্দিত হয়ে যাওয়া আবার হঠাৎ চুপসে যাওয়া, এ কয়েকদিনের মধ্যে আবিরের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তার মনের অবস্থা সে নিজে ছাড়া আর কেউই পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করতে পারবে না। কৌশিক আবিরের মুখের দিকে তাকালো। দুটো চোখ রক্তাক্ত লাল। চোখের কোণায় অশ্রুজল নেই। ছেলেটার মুখে একটা দাগও নেই। কৈশোরে সবারই গোটা কয়েক ব্রণ উঠে। দাগ রেখে যায়। শ্যামলা মসৃণ চেহারা। কানগুলো বড্ড ছোট মাথার তুলনায়। গড়ন মাঝারী। কৌশিকের চেয়ে আবির উচ্চতায় লম্বা। মাঝেমধ্যে সে অবাক হয় তার মতো ছোটখাটো, অতি সাধারণ চেহারার ছেলের সঙ্গে আবির প্রেম করছে কেন? সে নিজেই তো নিজেকে পছন্দ করে না। খোদা তৈরি করতে গিয়ে তাকে চেহারাও দেয়নি, আবার লম্বাও বানায়নি। তবে কৌশিক যা ভাবে তা সত্য নয়। অনেকের মধ্যে নিজের চেহারা আর গড়ন নিয়ে অনেক অভিযোগ থাকে। কৌশিক এর ব্যতিক্রম নয়।  

আবির আবারও প্রশ্ন করলো, কি বলতে চাও তুমি?

কৌশিক বলল, গতকাল রাত ঘুমাওনি?

আবির চোখ কচলাতে কচলাতে বলল, আরে গতকাল রাতে বিয়ের কার্ডে নাম লিখেছি। লিখতে লিখতে রাত শেষ। পরে আর ঘুম আসেনি। এপাশ ওপাশ করে উঠে গিয়েছি।

-তারপর কি করেছো?

-আচ্ছা তুমি এতো প্রশ্ন কেন করো বলতো? আমাকে নিয়ে তোমার এতই কিসের ভাবনা? বাদ দাও।

কৌশিক বলল, কেন বাদ দিবো? এমন কি হয়েছে যে তোমাকে নিয়ে চিন্তা করা বাদ দিতে হবে?

আবির মুখ ঘুরিয়ে নিলো। কৌশিক খাটে বসেছিল। সে ধীরেসুস্থে খাট থেকে নেমে বারান্দায় গেলো। টুল টেনে আবিরের পাশে বসে তার হাতটা ধরে বলল, আমার দিকে তাকাও আবির। আবির তাকালো না। কৌশিক হাত শক্ত করে ধরে বললাম, আবির তাকাও!

আবির কাঁদতে শুরু করলো। ফুঁপিয়ে নয় ধীরে ধীরে কাঁদছে। চোখের পানির ছিটেফোঁটা কৌশিকের হাতে পড়ছে। বাইরে বিন্দুবিন্দু বৃষ্টি পড়ছে। চারদিকে অন্ধকার। স্ট্রীট লাইটের আলোতে কাজ হচ্ছে না। কৌশিক আলতোভাবে আরেক হাত নিজের হাতে রাখল। আবির বলল, কেন আমাদের জীবনে এতো সমস্যা। কেন?

কৌশিক বলল, সমস্যা সমাধানের তো রাস্তা আছে। এখনও আমি বিয়েটা ভাঙ্গতে পারি। শুধু তুমি একবার…

আবির বলল, না কৌশিক। খবরদার এই কাজ করবে না। অ্যান্টির অবস্থা দেখেছো? যদি একবার বলো তুমি বিয়েটা করবে না তখন ব্যপারটা কি দাঁড়াবে?

-ব্যাপারটা আর কি দাঁড়াবে! আমার মা হয়তো …

-থাক ওসব বলো না। ওসব কিছুই হবে না। আমরা দু’জনই জানি ব্যাপারটা কেন হচ্ছে।  আমাদের সম্পর্কে কোন আঁচ আসবে না এই আমার বিশ্বাস!

-কিন্তু তুমি যে প্রতি মুহূর্ত কষ্ট পাচ্ছ সেটার কি হবে? এভাবে তো আমি তোমাকে দেখতে পারবো না। আমি নিজেই দুর্বল হয়ে যাবো।

-আর কাঁদবো না এই বলে রাখলাম। কথা বলার সময় অনেক পাবো। যাই অ্যান্টিকে সাহায্য করতে হবে। অনেক কাজ বাকি আছে।

কৌশিক বলল, চোখ মুছো আগে।

আবির একটু ভুরূ কুঁচকে বলল, হাতটা ছাড়লে তো মুছতে পারবো।

সঙ্গে সঙ্গে তারা দুজনেই জোরে হাসতে লাগল। কৌশিক হাত দিয়ে চোখের পানি ভালো করে মুছে দিল।

-এবার উঠি। পরে কথা হচ্ছে।

-আবির, আমি এখনও জিজ্ঞেস করছি বিয়েটা কি করবো?

আবির বারান্দা থেকে বেড়িয়ে গেলো। কৌশিক পিছন ফিরে বলল, বিয়েটা কি করবো?

আবির হাসিমুখে বলল, হ্যাঁ। করবে তুমি। অবশ্যই করবে।

কৌশিক মাথাটা ঘুরিয়ে সামনে তাকাল। আবিরের হাসিমুখে জবাব তার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। কিভাবে হাসিমুখে ও কথাটা বলতে পারলো? সে নিজে কখনও পারত না। তাকে ওমন প্রশ্ন করা হলে দৌড়ে গিয়ে আবিরকে জড়িয়ে ধরে বলত, তোমাকে করবো। কি রাজি? কল্পনার জগত থেকে বেরিয়ে আসা উত্তম। যা ঘটবে না তা নিয়ে চিন্তা করাটা বোকামিতে শামিল। শুধু তার মাকে যদি খোলাখুলি করে বলতে পারত তাহলে এতোবড় সমস্যার সম্মুখীন হতে হত না। কিন্তু কৌশিক কি করে মাকে কথাগুলো বলবে? দু, দু’বার স্টোক করেছেন। একবার বাবার মৃত্যুর পর, আরেকবার তার বোনের পালিয়ে বিয়ে করার পর। তার কথা শুনে হয়তো আবার স্টোক করতে পারেন। কৌশিক কিভাবে পারবে কথাগুলো বলে তার মাকে মৃত্যুপথে ঠেলে দিতে? মাঝে মাঝে মার ব্যাপারটা মাথায় থাকে না তখন বিয়ে না করার তীব্র ইচ্ছা জন্মে। কিন্তু ঘুরেফিরে একই টেনশন। তার মা। কতো কষ্ট করে বড় করিয়েছেন। বাবা চলে যাওয়ার পর যে আর্থিক সংকটে সে জীবন অতিবাহিত করেছি তা বর্ণনীয়যোগ্য নয়। যখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে না তখন সর্বোত্তম পথকেই গ্রহণ করা শ্রেয়। হয়তো কৌশিক আর আবিরের ১২ বছরের সম্পর্কে বিরাট পরিবর্তন আসবে কিন্তু তারা আলাদা তো হবো না। আবিরের কথা ভাবলেই কৌশিকের মন ভারী ভারী লাগে। শেষমেশ একটা মেয়েকেই বিয়ে করতে হচ্ছে? কতো জল্পনাকল্পনা ছিল তাদের। সব ধূলিসাৎ করে সবচে অপছন্দের কাজটা করতে যেতে হচ্ছে। অবশ্য একটা বিষয়ে একটু শান্তি পাচ্ছে কৌশিক। যাকে বিয়ে করবে সে হল তার সবচে প্রিয় বান্ধুবী সানিয়া। তার সাথে হয়তো থাকতে কৌশিকের সমস্যা হবে না তবে সে তাকে ধোঁকা দিবে প্রতিটা মুহূর্ত। সাহসে কুলায়নি তাই তাকে সব সত্যি বলতে পারেনি কৌশিক । ‘যদি সে না করে দেয়? তাহলে কি হবে?’ এইসব ভয়ের কারণে বলতে গিয়েও মুখে আটকে রেখেছিল। কৌশিক বিড়বিড় করে বলল, আসলে একটা কাপুরুষ। অনেক বড় কাপুরুষ।

চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল কৌশিক। বিড়বিড় করে আবার বলল, কি হবে এতো ভেবে? তার নিজেকে খুব নোংরা লাগছে। মনটা বিষাক্ত লাগছে। কি করতে যাচ্ছি সে? কি?    

২…

আবির নিজের ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে আছে। বাতি নিভানো। কম্পিউটার চলছে। মনিটরের আলো হালকা ছড়িয়ে গেছে সারা ঘরে। আবিরের প্রচণ্ড মন খারাপ। মন খারাপ হলে তার খুব ঘুম পায়। বিছানায় শরীর পড়তেই অতল ঘুমে হারিয়ে যায়। তবে আজ তার ঘুম আসছে না। হয়তো তার মন খারাপের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। আবির হাতের পাঁচ আঙ্গুল একবার মুষ্টিবদ্ধ করছে আবার খুলছে। খেলার ছলে করেই যাচ্ছে। হঠাৎ দরজায় ধাক্কা পড়লো। আবিরের উঠে গিয়ে দরজা খুলতে ইচ্ছা করলো না। ধাক্কার পরিমাণ সময়ের সাথে সাথে বেড়েই যাচ্ছে। ধাক্কার বেগ ও শব্দ যখন তুঙ্গে তখন আবির বিরক্ত হয়ে বিছানা থেকে নেমে খুব ক্লান্তভঙ্গিতে দরজা খুলতে গেলো। দরজা খুলে দেখে তার মা শাহানা দাড়িয়ে আছেন। দেখে বুঝা যাচ্ছে তিনি রেগে আছেন।

-তোর কি আমার একটুও চিন্তা হয় না? এতক্ষণ ধরে ধাক্কিয়ে যাচ্ছি!  

আবির বলল, ভিতরে আসো মা।

শাহান বেগমের হাতে কিছু কাগজপত্র দেখতে পাচ্ছে আবির। শাহানা ভিতরে ঢুকলেন। বাতি জ্বালিয়ে বিছানায় বসলেন। আবির তার মার সামনে একটা চেয়ার টেনে বসলো। শাহানা বললেন, তোর পাসপোর্ট ও টিকেট এসেছে।

আবির বলল, দাও তো দেখি।

শাহানার খামটা আবিরের হাতে দিলেন। খাম বের করে টিকেট, পাসপোর্ট খুব মনোযোগ সহকারে দেখতে লাগলো আবির।

শাহানা বললেন, তুই কৌশিকের বিয়ের দিন ফ্রান্স যাচ্ছিস কেন?

আবির বলল, কাজের জন্য যাচ্ছি। কাজ অনুযায়ী ভিসা হয়েছে আর সুবিধামত টিকেট কাটা হয়েছে। এখন বিয়ের দিনে পরে গেছে তো করবো কি?  

শাহানা বললেন, তুই ইচ্ছা করেই সেদিন যাচ্ছিস। অ্যাম আই রাইট আবির?

আবির কাগজপত্র দেখা বন্ধ করে তার মায়ের দিকে তাকাল। তার মা সব জানে। এই একমাত্র ব্যক্তি যার কাছে আবির তার রাজ্যের সব কথা বলতে পারে। তাই যাওয়ার ব্যাপারে তার কি উদ্দেশ্য জড়িত তা বলার প্রয়োজনবোধ করছে না।

শাহানা বললেন, কতদিন নিজেকে লুকিয়ে রাখবি? আর কতদিন অনুভূতিহীন হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার ব্যর্থ চেষ্টা চালাবি?

আবির বলল, মা আমার পক্ষে কৌশিকের বিয়েতে যাওয়া সম্ভব না। আর যদি আমি এখানে থাকি তাহলে কৌশিকের জোরাজোরিতে, আমার অনিচ্ছার সত্ত্বেও আমাকে যেতে হবে। সেটা আমি কখনই চাই না। আমার পক্ষে কৌশিকের বিয়ে দেখা… বিয়ে দেখা অসম্ভব।

শাহানা তার ছেলের হাত ধরে বললেন, তুই যা ভালো বুঝিস সেটা কর বাবা। আমার কোন আপত্তি নেই। তবে… আমার ছেলেকে আমি এমন উদাস দেখতে পারবো না। অন্তত আমার জন্যে হলেও মনখারাপ করে থাকিস না আবির।

আবির শাহানাকে জড়িয়ে ধরল। শাহানা খানিকটা স্বস্তি পেলেন। আর যাইহোক না কেন ছেলে তার কখনই হতাশ করে না তাকে।

শাহানা বললেন, দেরি হয়ে যাচ্ছে তোর। মনে নেই আজ কৌশিকের হলুদ? বিয়েতে যাওয়া হবে না কিন্তু হলুদে যাওয়া তোর উচিত।

আবির কড়া গলায় বলল, আমি যাবো না মা।

শাহানা ঠাণ্ডা গলায় বললেন, আমার ছেলে দুর্বল নয়।

-আমাকে একটা শক্ত যুক্তি দাও কেন আমি ওর হলুদে যাবো?

-সে যদি তোকে সত্যি ভালোবাসতো তাহলে বিয়ে করতো না। সে তোর অনুভূতিকে পাত্তা দেয় না।

আবির শান্ত গলায় বলল, পরিস্থিতি মা কাউকেই পাত্তা দেয় না।

শাহানাও শান্ত গলায় বললেন, করে নিতে হয়।

আবির চেয়ার থেকে উঠে বলল, পাঞ্জাবী বের করো মা। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি। তুমি রেডি হয়ে যাও।

শাহানা বেশ আনন্দিত হলেন। ছেলে ধীরে ধীরে দুঃখ কাটিয়ে বেরিয়ে আসবে। ভালো লক্ষণ। আবিরের পাঞ্জাবী বের করে তিনি নিজে তৈরি হবার উদ্দেশ্যে তার ঘরে চলে গেলেন।

পাঞ্জাবীর দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে আবির। তার মা কেন এই পাঞ্জাবিটাই বের করলো? আলমারিতে পাঞ্জাবীর সংখ্যা তো কম নয় তাও! হয়তো খেয়াল করেননি। হয়তো রঙ পছন্দ হয়েছে। সবকিছুর মধ্যে রহস্য থাকে না। মাঝেমধ্যে কাকতালীয়ভাবে মিলে যায়। মাঝেমধ্যে অনেক কাজ না করতে চাইলেও করতে হয়। অনেক জিনিস না করতে চাইলেও হজম করতে হয়। আর অনেক অনুভূতি না চাপিয়ে রাখতে চাইলেও ধামাচাপা দিতে হয়।

১২ বছরের সম্পর্কের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি তো দূরের কথা চিৎকার করে একে অন্যের সঙ্গে কথাও বলা হয়নি। ইয়াহু চ্যাটে পরিচয় তারপর প্রণয়। প্রথমে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে বসে বসে আড্ডা দেওয়া, বেলা নেমে আসলে আলতো ভাবে হাত ছুঁয়ে ফুটপাথে হাঁটা, একদিন হঠাৎ করে ঝাপটে ধরে একে অন্যকে আজীবনের সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করা সব কেমন ধোঁয়াটে লাগছে আবিরের কাছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিগুলোতে মরিচা ধরতে শুরু হয়। আবিরের খুব ইচ্ছা করছে কৌশিককে নিয়ে দূরে কোথাও পালিয়ে যেতে। চরমের দুঃখের মধ্যে আবির ফিক করে হেসে ফেলল।

৩…

আমার কাছে বিয়ের অনুষ্ঠানগুলো সবসময় খুব ভালো লাগে। চকচকে হয়ে বিয়ে বাড়িতে যাওয়া যায়। আশেপাশের মানুষজনকে তাক লাগিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু এখন কেন জানি খুব বিরক্তিকর লাগছে সবকিছু। বড়সড় এক পার্টি সেন্টারে চলছে হলুদ উৎসব। আমি স্টেজে বসে আছি। পাশে আমার হবু স্ত্রী বসা। সে আজ খুব ক্যাটক্যাটে হলুদ রঙের শাড়ি পরেছে। খুবই কমন। কোন নতুনত্ব নেই। আজ সে খুব খুশি। কেনই বা হবে না? আজ তার গায়ে হলুদ। পরশু বিয়ে। সমাজে প্রচলিত আছে, সব মেয়ের কাঙ্ক্ষিত দিন হল বিয়ের দিন। ব্যাপারটার মধ্যে বেশ রোমান্টিকতা আছে বলে আগে ধারণা করতাম। এখন আমার কাছে ন্যাকামি ছাড়া কিছুই মনে হয় না। অবশ্য আমার ব্যাপারটা বেশ আলাদা। আমি তো আর দশবারোটা ছেলের মতো মেয়ে পিপাসী না। চোখমুখ শক্ত করে বসে আছি। ফটোগ্রাফার সাহেব সেকেন্ডে সেকেন্ডে ছবি তুলেই যাচ্ছে। ফ্ল্যাশে চোখ জ্বলে যাচ্ছে। কিন্তু আমার হবু স্ত্রী নানা ভঙ্গিমায় ছবি তুলছে। একটা ছবিতেও নিজেকে সাধারণ দেখাতে সে রাজি না। আচ্ছা আবির কোথায়? এখনও আসছে না কেন ছেলেটা? তার সাথে কিছু জরুরী কথা ছিল। ফাঁকফোকর পাচ্ছি না যে একটু আশপাশ দেখে আসবো। সব মেয়েছেলেরা ঘিরে আছে। এদিকওদিক করতে করতে হঠাৎ চোখ পড়লো আবিরের উপর। বাহবা! ছেলেকে আজ যা লাগছে না! আমার দেওয়া বেগুনী পাঞ্জাবীটা তাকে বড্ড মানিয়েছে। এ পাঞ্জাবী আমাদের সম্পর্কের ৫ বছর হওয়া উপলক্ষে দিয়েছিলাম। আজ পর্যন্ত গায়ে চড়ায়নি। বলেছিল খুব স্পেশাল দিনে পরবে। আজ মোটেও তার জন্য স্পেশাল দিন না। আমি উঠে দাঁড়ালাম আর সঙ্গে সঙ্গেই মেয়ের মা অর্থাৎ আমার হবু শাশুড়ি বললেন, বাবা কি হয়েছে? কোন সমস্যা?

আমি গম্ভীর হয়ে বললাম, খুব বড় সমস্যা হয়েছে।

আমার হবু শাশুড়ির চোখমুখ অন্ধকার হয়ে গেলো। তিনি খুব ভীতভাবে বললেন, কি হয়েছে বাবা?

আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, টয়লেটে যাবো। খুব বাজে অবস্থা।

শাশুড়ি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলেন। মাথা নাড়াতে নাড়াতে তিনি তড়িঘড়ি করে বললেন, যাও বাবা। কেউ আটকাবে না। আমি সবাইকে বলে দিচ্ছি।

-সবাইকে বলে দেবার মতো ঘটনা নয় শাশুড়ি আম্মা। আমি আসছি।

মঞ্চ থেকে নামলাম। মঞ্চের সামনের জায়গাটা বেশ বড়। এক কোনায় আবিরকে দেখতে পেলাম। আমি দ্রুত হেঁটে তার কাছে গেলাম। আমাকে দেখতেই চিৎকার করে বলল, কি হল তোর? নিচে কেন? উপরে যা।

-চুপ কর। আমার সাথে ওইদিকটায় চল।

-কোথায় যাবো মানে?

-বেশি কথা বলিস না চল আমার সাথে।

আমি হন্তদন্ত করে সামনে চলতে লাগলাম। আবির আসছে নাকি সেটা দেখার জন্যে পিছনে তাকালাম। হ্যাঁ সে আসছে। আমি আশেপাশে তাকাচ্ছি কেউ আসছে কিনা। সতর্কভাবে লক্ষ্য করছি। পিছন থেকে আবির বলল, চোরের মতো এদিক ওদিক তাকাচ্ছিস কেন? সোজা হাঁট!

পার্টি হল থেকে বেরিয়ে একটা খালি রুমের সামনে এসে দাঁড়ালাম। সম্ভবত গ্রিন রুম। পার্টি হলে গ্রিন রুম থাকবে কেন? আমি আবার এই প্রশ্নই বা করছি কেন? রুমের দরজা খোলা ছিল। আমি আবিরকে টেনে নিয়ে রুমের ভিতর নিয়ে আসলাম। রুম লক করে দিলাম।

আবির খুব অস্বস্তিতে বলল, এসব কি করছিস কৌশিক? তোর খেয়াল আছে এটা গ্রিন রুম? যারা হলুদে পারফর্ম করছে তাদের চেঞ্জরুম। কেউ যদি এসে পড়ে?

আমি আবিরের কোমর ধরে কাছে টানলাম। আবিরের মুখের সামনে আমার মুখ। আবির নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো। সে বিড়বিড় করে বলল, খোদার দোহাই লাগে। দয়া করে ছাড়ো। এ জায়গাটা মোটেও নিরাপদ নয়।

-আমি কিছু জানি না। চুমু খেতে ইচ্ছে করছে।

-পাগলামি ছাড়ো কৌশিক। ছাড়ো আমাকে।

-না।

-আবির জেদ করো না।

-দেখো কৌশিক কেউ এসে পড়লে মানসম্মান সব শেষ।

-তাহলে আমাকে ওয়াদা করো আগামীকাল সারাদিন তুমি আমার সাথে কাটাবে।

আবির অবাককণ্ঠে বলল, মাথা খারাপ? পরশু তোমার বিয়ে!

-তাতে কি? আমি কাল…

-ওসব জেদ করবে না।

-কেন করবো না। কালই তো…

-তারমানে বুঝাতে চাচ্ছ কাল জন্মের মতো তোমার শখ মিটিয়ে নিবে? বিয়ের পর শখ উড়াল দিবে?

-আবির তেমনটা না।

-হ্যাঁ তেমনটাই। তুমি আমাকে ছাড়ো নাহলে…

-নাহলে কি?

-কৌশিক!

-আমাকে আগে বোলো তুমি আগামীকাল আমার সাথে…

হঠাৎ দরজায় কে যেন টোকা দিলো…

অতি উত্তেজিত অবস্থায় আমার হুঁশ থাকে না। দরজায় ধাক্কা পড়েছে সে শব্দ পেয়েছি, কিন্তু আবিরকে ছাড়তে কিছুতেই আমার মন চাইছে না। আরও শক্ত করে জাপটে ধরলাম আবিরকে। আবির আবার বেশ লাজুক স্বভাবের সে সাথে অতি ক্ষুদ্র বিষয়ে অত্যধিক বিচলিত হয়ে যায়। ‘কি জানি হয়ে গেলো, বড় বিপদ হয়ে গেলো’ এমন ভাবসাব সব সময়!

দরজায় নক অনবরত হচ্ছে। আমি চিৎকার করে বললাম, কি চাই?

ওপাশ থেকে কিচিরমিচির শব্দ। নিশ্চয় মেয়েপক্ষের মেয়েদের দল। হলুদে তারা নৃত্য পরিবেশন করছে। নৃত্য দেখে মনে হচ্ছে বিটিভির নতুনকুঁড়ি অনুষ্ঠানে অডিশন দিতে এসেছে।

খুব বেশি দরকার কি তোমাদের?

এবার হাসাহাসির শব্দ পেলাম। নিজেদের মধ্যে তারা কিচকিচ করে হাসতে যে আনন্দ পায় তা আমার জানা নেই। বয়সে সবগুলোই আমার হাঁটুর সমান কিন্তু বাড়তি বয়সে তাদের পাকামি আমার ঘাড় সমান।

তীক্ষ্ণ চিকন কণ্ঠে এক মেয়ে বলে উঠলো, দুলাভাই। আমি কিন্তু আপনাকে চিনতে পেরেছি। এখন বলেন ভিতরে কি হচ্ছে, হুম?

আবার শুরু হল বিখ্যাত হাসা। আবির নিজেকে আমার কাছ থেকে মুক্ত করে ফেলল। ইশারায় জিজ্ঞেস করল, কি করবো এখন আমি।

আমি মোবাইলটা বের করলাম। ফোন দিলাম হবু শাশুড়ির নাম্বারে। রিং হচ্ছে ধরছে না। সম্ভবত ফোন হাতের কাছে নেই। মাথায় কিছু আসছে না। কি করা যায়? দরজা খুললে আমারকে আর আবিরকে দেখে মেয়েগুলো নিশ্চয় কিছু বদ ধারণা তৈরি করবে। পরে বিশাল আকারে ঝামেলা সৃষ্টি হবে। আমি মাথা চুলকাতে লাগলাম। ওদিকে আবির দাঁত দিয়ে নখ কাটছে। টেনশনের চরম সীমায় পৌঁছালে সে এক কাজটা অতি আনন্দের সাথে করে। আর আমার সামনে করলে প্রত্যেকবার ধমক খায়। এখন ধমক দিতেও পারছি না। কি জ্বালা!

দুলাভাই, ও দুলাভাই! দরজাটা খুলেন ভাই! কি করছেন?, সেই তীক্ষ্ণ চিকন কন্ঠের মেয়েটি হাসতে হাসতে বলল।

আমি আশা ছেড়ে দিলাম। কিছু করার নেই এখন। একটা পথ খোলা, দরজা খুলে দিতে হবে। আর দস্যিগুলো আমাকে আবিরের সাথে দেখবে এবং রীতিমতো কথা তৈরি করবে। আমি আবিরের দিকে তাকালাম। সে গভীর মনোযোগে ফোন টিপাটিপি করছে। আমি দাঁত চিবরে খুব আস্তে বললাম, এই সময়টা সামাজিকতা না করলে হয় না? যখনই সুযোগ পায় তখনি মোবাইলে গুঁতাগুঁতি। আরে ব্যাটা পরবর্তীতে কি ঘটবে সেটা নিয়ে চিন্তা কর।

আমার কথার তোয়াক্কা করলো না আবির। একবার শীতল দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল তারপর আবার টিপাটিপি শুরু করলো। আবির মনে হয় এটাই চায়, সবকিছু জানাজানি হয়ে যাক। তার মনের ক্ষোভ থেকে এরকম ধারণা জন্মানো অস্বাভাবিকের কিছুই না। আমি হন্তদন্ত করে দরজা খুলতে গেলাম ঠিক ওইসময় আমার পাঞ্জাবীর পিছন অংশটা জোরে টান দিয়ে আবির বলল, খবর্দার! এ কাজ ভুলেও করতে যেও না। ব্যবস্থা হচ্ছে, একটু সময় লাগবে। আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই আবার দরজায় ধাক্কা পড়লো। এবার আবির চেঁচিয়ে বলল, হিমেল নাকি বাইরে? ওপাশ থেকে খুব ফিসফিসিয়ে জবাব আসলো, হ্যাঁ। আমি। তাড়াতাড়ি দরজা খুলে বের হও দু’জন।

আমার মেজাজটা চরম পর্যায়ে বিগড়ে গেলো। এই পতঙ্গ অর্থাৎ হিমেলকে আমি দুচোখে দেখতে পারিনা। বডী বিল্ডার ও দেখতে সুন্দর হওয়ায় তার পা মাটিতেই পড়ে না। কথায় কথায় ইংলিশ ঝাড়ে, আগে তো বাংলায় কারোর সাথে কথাই বলতে পারতো না। খুব ইনিয়ে বিনিয়ে কারণটা বলতো বাইরে থাকার কারণে তার এই পরিবর্তন। হোক পরিবর্তন, কিন্তু এত রঙ-ঢং? আবিরের সাথে সখ্যতা আছে বেশ। দুজনের গলায় গলায় খাতির। বিশেষ গোপন সংবাদদাতার কাছে শুনেছি হিমেল চিকনচাকন ছেলে বেশ পছন্দ করে। আবির চিকন ও লম্বা, তাই সম্ভবত ওর প্রতি হিমেলের এতো দরদ। যতই বন্ধুত্বের দোহাই দেক না কেন, ইশারা একবার পেলেই হিমেল লুফে নিবে। আমার খুব সন্দেহ হয় হিমেলকে। মাঝে মধ্যে আমার আর আবিরের ঝগড়া লাগলে গাধা আবির হিমেলের কাছে যে দুঃখনামা পেশ করে। আর সেই সুযোগে সান্ত্বনা ও আমার বিরুদ্ধে কুমন্ত্রণার কাজও খুব চালাকি করে সেরে ফেলে। গর্দভটাকে কতবার বলেছি দূরে থাক, দূরে থাক। আরে না! আমার কথা সে শুনবে? আবির আবার জিম করা মানুষজন বেশ পছন্দ করে। আমাকে তিন তিন বার ঠেলেও জিমে পাঠাতে পারে নাই। শেষবারের বার তো বলেই ফেলল, দেখো শরীর ঠিক করো। ওই ভুঁড়ি আমার মোটেও পছন্দ না।

আমি খুব কর্কশ স্বরে বলেছিলাম, তুমি আমাকে ভালোবাসো না শরীরটাকে? আর নিজেকে দেখেছো? শুকনা–পটকা! তাও কি তেজ রে বাপরে।!

কিন্তু খুব স্বাভাবিক লাগে, মানুষের দেহের গড়ন পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপারে ভূমিকা রাখে। শারীরিকভাবে আকর্ষিত না হলে অবশ্য পিরীতি সম্পূর্ণ হয়তো হয় না।

আবির দরজা খুলতেই হিমেল তড়িঘড়ি করে ভিতরে ঢুকে পড়লো। সে আমাদের জন্য অনেক চিন্তা করে এমন একটা ভাবখানা দেখাচ্ছে। রীতিমতো আমার মেজাজ আরও বেড়েই যাচ্ছে। হিমেল চট করে আবিরের হাত ধরে বলল, দেরি করছ কেন? বের হই।

আমি দাঁত কড়মড়িয়ে বললাম, সেটা হাত ধরে বলতে হবে কেন? এমনে বলা যায় না?

আবির বলল, হ্যাঁ বের হওয়া উত্তম। শুনো কৌশিক অনুষ্ঠান চলাকালীন সময় যেন তোমাকে আমার আশেপাশে না দেখি। এলাহি কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছ, এবার ক্ষান্ত দাও।

-তোমার সাথে আমার কিছু জরুরী কথা আছে। প্লিজ, সেটা শেষ হউক।

-কৌশিক, খামখা ঝামেলা বাধিয়ো না তো। হয়েছে তো।

হিমেল মাতব্বরি করে বলল, যখন আবির চাইছে না তখন

আমি ধমক দিয়ে বললাম, তোমাকে কথা বলতে কে বলেছে?

আবির বলল, আহা, চুপ করো তো সব। হিমেল একটু বাইরে দাঁড়াও, আমি ১ মিনিটের মাথায় কথা শেষ করে বের হয়ে আসবো। জাস্ট ওয়ান মিনিট।

হিমেল আবিরের আদেশ মাথা নিচু করে মান্য করে দ্রুত বেড়িয়ে গেলো। হায়রে! একবার খালি আবির তার মুঠোই যাক, তাহলে তার আসল রঙ দেখানো শুরু করবে। অসহ্য!

আমি বললাম, ওই বডীবিল্ডারের সাথে এতো কিসের ভালোবাসা। জানো না, বান্দরকে লাই দিলে মাথায় উঠে?

আবির বলল, শুনো এতো স্বামী স্বামী ভাব দেখাবো না। যেই কিনা একটু দরদ দেখায় তাকেই বলে দাও বান্দর। ভালো মানুষ আছে তো দুনিয়ায়, নাকি?

-ওতসব আমাকে বুঝাবে না। ৩ মাসের ছোট তুমি আমার।

-সেটাই, তর্কে যখন কেউ পারে না তখন বয়সের জোরে জিততে চায়।

-দেখো আবির…

-ওসব বাদ দাও। কি বলবে, তাড়াতাড়ি বল।

আমি আবিরের কাছে গেলাম। হাতটা ধরে বললাম, আচ্ছা কালকের দিনটা তাহলে একসাথে কাটাচ্ছি আমরা। ঠিক আছে?

আবির বলল, দেখা যাক। সিউর হয়ে বলতে পারছি না।

আমি আবিরের নাকটা টিপে বললাম, ওরে ব্যস্ত পাবলিক।

আবির খানিকটা লজ্জা পেলো। তার লজ্জা আমাকে জবাব দিলো, সে নিশ্চয় আগামীকাল আমার সাথে কাটাবে। অবশ্যই!

আবির বলল, হাতটা ছাড়ো। হয়েছে তো এবার চলো।

আমি হাত ছেড়ে দিলাম। আবির দৌড়াতে দৌড়াতে বের হয়ে গেলো। তার এমন হাঁসফাঁস আমাকে ভাবিয়ে তুলল। আচ্ছা আবিরের কি আমার প্রতি আকর্ষণ, ভালোবাসা সব ফিকে হয়ে যাচ্ছে। আমার বিয়ে কি আসলেই আমাদের মধ্যে বিরাট দূরত্ব সৃষ্টি করবে? আচ্ছা, ওই পতঙ্গ হিমেল কি আমার জায়গা নিয়ে নিবে? আমার আবির কি আমার আর থাকবে না?

আমি বের হলাম রুম থেকে। খুব দূরে হিমেল আর আবির হেঁটে যাচ্ছে। আবির ক্রমাগত হেসে যাচ্ছে, আর হিমেল হাত নেড়ে নেড়ে কি জানি বলছে।

যা নিয়ে আজীবন ভয়ে থাকতাম সেটা কি সত্যি হতে যাচ্ছে?

৪…

সানিয়ার মুখোমুখি বসে আছে আবির। আগামীকাল কৌশিকের বিয়ে। বিয়ে চলাকালীন সময়ে বর ও কনে পক্ষের ব্যস্ততা তুঙ্গে থাকে। অনেকে বলে শুধু দু’জনের মধ্যে বিয়েটা হয় না বরং দু’টি পরিবারের মধ্যে বিয়ের মাধ্যমে আত্মীয়তার শক্ত বন্ধন সৃষ্টি হয়। বিরাট ঝামেলার মধ্যে সানিয়ে কিভাবে সময় করে বাইরে এলো তা কে জানে! বিয়ের দিনে মেয়েরা সাংঘাতিক চিন্তায় থাকে। খাবারও গিলতে পারে না। কিন্তু সানিয়ার চিন্তামুক্ত ব্যবহার দেখে আবিরের অবাক হচ্ছে। সানিয়ে পরনে এক সাধারণ সুতি শাড়ি। রঙ কালচে নীল। আজকাল মেয়েরা তো শাড়িই পরে না। আর এদিকে সানিয়া যে কিনা নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে ফার্মেসি বিভাগে পড়েছে, সবসময় জিন্স ও টপস এ দেখা গিয়েছে সে কিনা আজ শাড়ি পরে একজনের সাথে দেখা করতে এসেছে। অবশ্য নর্থ সাউথে পড়লেই মেয়েরা ‘ওয়েস্টার্ন’ টাইপের জামাকাপড় পরবে তা কিন্তু নয় তবে আবিরের এমন ‘সঙ্কীর্ণ’ চিন্তা তাকে ভাবিয়ে তুলল। তার মোটেও ভাবা উচিত হয়নি।

সানিয়া চুল ঠিক করতে করতে বলল, তোমাকে এই ভরদুপুরে কফি শপে ডেকেছি তাতে তুমি বিরক্ত হও নি?

আবির হাসতে হাসতে বলল, আমি অতো সহজে বিরক্ত হই না। তো সানিয়া হঠাৎ কি মনে করে আমাকে ডাকলে?

সানিয়া সামনে কফির মগ। ধোঁয়া উড়ছে। কালো কুচকুচে কফি মানুষ খেতে পারে কি করে? স্বাদ নেই, যেন প্রাণও নেই। সে কফির মগে সামান্য জিভ ভিজিয়ে বলল, খুব তিতে। আমার অর্ডার করাই উচিত হয়নি।

আবির বলল, আসল কথাটা বোলো সানিয়া।

সানিয়া আবার সেই তিতে কফিতে চুমুক দিলো। মুখ সামান্য বাঁকালো তারপর আবার এক চুমুক খেলো। আয়োজন করে কফির মগটা টেবিলে রেখে বলল, আমি তুমি আর কৌশিক স্কুল-কলেজ একসাথে পড়েছি তাই না? কিন্তু কোনদিন দেখলাম না যে আমার প্রতি তোমার কোন আগ্রহ আছে।

আবির ভ্রূ কুচকে বলল, আগ্রহ থাকাটা কি একদম জরুরী?

সানিয়া মুচকে হেসে বলল, স্কুল লাইফ থেকে আমি পাগলের মতো ভালোবাসি কৌশিককে। ক্লাস টেনে বলে দিয়েছিলাম কিন্তু…। কৌশিকের স্পষ্ট ‘না’ আমাকে আঘাত করেছিল। মনে হছিল যেন কেউ বুক চিরে ছুরি বসিয়ে দিয়েছে। হঠাৎ করে তার বদলে যাওয়া, আমার প্রতি তার ভালোবাসা জন্মে উঠা আমাকে সন্দেহ করেতে বাধ্য করছে।

আবির অবাক সুরে বলল, তোমাকে কৌশিক ভালোবাসে?

সানিয়া বলল, তা জানি না। সে নিজে কখনও বলেনি। কিন্তু আমি কথাবার্তার মধ্যে সেটা আন্দাজ করতে পেরেছি। মনে হচ্ছে তার আমার প্রতি আগ্রহ এবং পছন্দের মাত্রা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আবির মনে মনে হাসল। হায়রে মানুষ! কল্পনা করতে কতো ভালোবাসে! সানিয়া আসল সত্যটা না জেনে কি আকাশ পাতাল কল্পনা তৈরি করছে। ইন্টারেস্টিং!

সানিয়া বলল, আজকে তোমাকে এখানে ডাকার মূল উদ্দেশ্য একটাই – আমার নিজের টেনশন দূর করা। আচ্ছা আবির, কৌশিক কেন বিয়েটা করছে?

আবির গোটা কয়েক সেকেন্ড সানিয়ার দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। কি জবাব দিবে সে?

-চুপ করে রইলে যে?

-আমি কৌশিকের বেস্ট ফ্রেন্ড হওয়া সত্ত্বেও অনেক ব্যাপার আছে যা সে আমার সাথে শেয়ার করে না। আমার মনে হয় কি সানিয়া সম্ভবত তার সুপ্ত ভালো লাগা এতদিনে জেগে উঠেছে। আর যেহেতু বাসা থেকে…

সানিয়া বলল, ওহ আচ্ছা। বুঝলাম। আচ্ছা তোমার হাতের যে আংটিটা আছে সেটা নীলা পাথরের না?

হঠাৎ করে এক কথা থেকে অন্য কথায় চলে যাওয়ায় আবিরের বুঝতে একটু সমস্যা দেখা দিলো। সানিয়ে বড়ই চঞ্চল স্বভাবের মেয়ে। যে প্রসঙ্গে কথা হচ্ছিল সেটা না শেষ করেই আংটির প্রসঙ্গে লাফ দিল?

আবির বলল, হ্যাঁ নীলা। আমি অবশ্য নীলা বলি না, বলি নীলকান্তমণি। রঙ দেখেছো? কেমন গাঢ়!

সানিয়া বলল, আংটিটা দেখে একটু মেয়েলি লাগছে! আচ্ছা তুমি কি কোথা থেকে কিনেছ?

আবির প্রচণ্ড বিরক্ত হল। এই আংটি নিয়ে তার এতো মাথা ব্যথা কেন? আংটিটা কৌশিকের দেওয়া। এই আংটি দিয়ে কৌশিক প্রপোজ করেছিল তাকে। আবিরের পছন্দের পাথর নীলা। আজ প্রায় ৭বছর হয়ে গেলো তার হাতে আংটিটা আছে। মাঝে মাঝে মনে হয় তার দেহের একটা অংশ, এই নীলকান্তমণি।

আবির বলল, হুম। আম্মুর আংটি। পছন্দের তো, তাই…

সানিয়া খুব অস্থিরভাবে বলল, আচ্ছা শুনো। দেরি হচ্ছে আমার। আজ খামোখাই তোমার সময় নষ্ট করলাম। যাইহোক তাও একটু ,অন হালকা। বিয়ে বাড়িতে থাকতে অসহ্য লাগছিল তাই একটু বাইরে বেড়ালাম।  

আবির বলল, হুম। তবে এখন তাড়াতাড়ি বাড়ি যাওয়াই উত্তম।

সানিয়া উঠে পড়লো। সে হাতটা বাড়িয়ে বলল, ধন্যবাদ সময় দেওয়ার জন্য আবির। আগামীকাল দেখা হচ্ছে এক অন্য রূপে!

হান্ডশেক করে আবির মুচকি হাসি দিলো। সানিয়ার সাথে তার কিছুক্ষণ কথা বলেই তার মাথা ধরে গেছে। কৌশিক কিভাবে সারাজীবন থাকবে?

সানিয়া  তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে গেলো। হঠাৎ করেই অস্থিরতা ও অন্যধরণের এক অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করতে লাগলো। আবির চেয়ারে বসে আছে। আরেকটা কফি অর্ডার দিয়েছে। মাথা ঝিমঝিম করছে। কি যেন ভাবতে ভাবতে মোবাইলটা বের করে দেখল, ১৭টা মিস কলস! সানিয়ার সাথে কথা বলার সময় আবির মোবাইল সাইলেন্ট করে রেখেছিল। ১৭টা মিসকল কৌশিকের! একটা মেসেজও এসেছে দেখল। মেসেজ এ লেখা,

‘আমাকে এভাবে প্রত্যাখ্যান না করলেও পারতে। যাইহোক কাজটা ঠিক করলে না’।

আবিরের তাৎক্ষনিক মনে পড়লো আজ সারাদিন কৌশিকের সাথে কাটানোর কথা। সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারিনি সে। দুপুর ১২টায় সানিয়ার ফোন তাকে জেগে তুলেছে। ফোন করে তাকে দ্রুত বনানী ১১ তে আসতে বলে। আবিরের খেয়ালও ছিল না যে…। আবির মাথায় হাত দিয়ে বসে রইল। বুক ধক ধক করছে। এখন সে কৌশিককে ফোন করে কি জবাব দিবে? সে তো ইচ্ছে করে কাজটা করেনি। আবির কাঁপা কাঁপা হাতে কৌশিককে ফোন দিলো। দুবার রিং হতেই ফোন ধরল কৌশিক। আবির আস্তে বলল, কৌশিক শুনো…

কৌশিক খুব কড়াকণ্ঠে বলল, আবির বিরক্ত করিস না এখন। ব্যস্ত আছি খুব।

-মানে? তুমি না বললে আজ সারাদিন একসাথে থাকবো আমরা?

কৌশিক শীতল গলায় বলল, সেটা তো সম্ভব হচ্ছে না আজ। কারণ তোমার ইচ্ছে নেই তারচে বড় কথা …

অবাক সুরে আবির বলল, ওয়েট আ মিনিট। আমি তোমাকে তেমন কিছুই বলিনি।

-বলা লাগে কি? আমি তো আর শিশু না। বুঝি সবই। যাইহোক হিমেলের সাথে ভালো সময় কাটুক সেটাই কামনা করি।

আবির কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলো না। কৌশিক ফোন কেটে দিয়েছে। আবির ৫বার কল করলো। কৌশিক ফোন ধরল না।

কিছুক্ষণ পর কৌশিক একটা টেক্সট পাঠাল। তাতে লেখা,

আগামীকাল আমার জীবনের সবচে বাজে দিন। আবার বলা যায় শ্রেষ্ঠ দিনও। যাইহোক, আগামীকাল যেন তোমার মুখ আমার না দেখতে হয়। বিয়েতে না আসলে যদি কেউ খুশি হয় তাহলে সেটা আমি। ভালো থেকো। খুশি থাকো।

আবির টেক্সটটা পড়ে কান্না ধরে রাখতে পারলো না। টপটপ করে অশ্রুবর্ষণ করতে লাগলো, কফিশপের ভিতরে। আশেপাশের মানুষ অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো আবিরের দিকে। একজন মেয়ে মানুষ কাঁদলে হয়তো মানুষের অদ্ভুত লাগতো না কিন্তু পুরুষ মানুষ বলে এতোগুলো বিস্ময় মুখ আবিরের দিকে তাকিয়ে থাকলো।

চোখ মুছতে মুছতে কাঁপা কাঁপা হাতে মা’কে ফোন দিয়ে বলল, মা! আমি আগামীকাল ফ্রান্স যাচ্ছি। গোছগাছ শুরু করে দাও, আমি আসছি।

৫…

গত দুইদিন ধরে কৌশিক খুব অসংলগ্ন আচরণ করছে। বিয়ের দিন কবুল বলার সময় হঠাৎ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো। সে কান্না আর থামে কি? আশেপাশের মুরুব্বীরাও তাকে থামাতে পারে না। অবশেষে যখন কৌশিকের মা গগনবিদারী কান্না শুরু করলেন এবং বিলাপ করতে লাগলেন, ‘আমার ছেলেটা পাগল হয়ে গেছে, হে আল্লাহ্‌! কি করলেন এটা?’ তখনই কৌশিকের হুঁশ ভালোভাবে আসলো। সে নিজেকে ক্রন্দনরত অবস্থায় দেখে খুব লজ্জা পেলো। কৌশিকের বড় চাচা শরিফুল ইসলাম উপস্থিত সবার কাছে হাত জোড় করে বললেন, মাফ করবেন। আসলে হঠাৎ করে কৌশিকের পিতার কথা স্মরণে এসেছিল, তাই পরিস্থিতি না বুঝেই…

কৌশিকের হবু শ্বশুর লিয়াকত হোসেন ভ্রূ কুঁচকে বললেন, আদৌ সত্য কথা বলছেন না ছেলের মাথায় ছিট আছে?

শরিফুল ইসলাম রেগে গিয়ে বললেন, এসব কি বলেন! ছিট থাকবে কেন? যা বলছি তা বিশ্বাস হয় না?

লিয়াকত আলী কিছু বলবার আগেই কৌশিকের হবু শাশুড়ি মোমেনা বেগম বললেন, ওসব বাদ  দেন তো। কৌশিক, বাবা কবুল বোলো!

কৌশিক কিছুক্ষণ তার চাচার দিকে চেয়ে থেকে খুব আস্তে কবুল বলল। শরিফুল ইসলাম রেগে গিয়ে বললেন, মেয়ে মানুষ হইছ নাকি? কবুল জোরে বল। গলায় জোর নাই?

কৌশিক গম্ভীরভাবে জোরে কবুল বলল। চারদিকের স্তব্ধতা কোলাহলে রূপ নিলো। বিয়ে কার্যক্রম সম্পূর্ণ ঘোষণা করে কাজি সাহেব বললেন, এমন কেস অনেক দেখেছি। মানে শুধু কন্যা যে ঘাবড়াবে তা কিন্তু নয় বিয়ে তো বিরাট এক গুরুদায়িত্ব, তাই ভয় পাওয়া, সংকুচিত হওয়া দোষের কিছু না। কই মিষ্টি কই?

মিষ্টি বিতরণ চলছে। কৌশিক এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রেজিস্ট্রি খাতার দিকে। সানিয়ার সাথে তার বিয়েটা হয়েই গেলো। কতো পরিকল্পনা ছিল, আবির আর সে বিয়ে করবে। রেজিস্ট্রি বিয়ে, যে  বিয়েকে কেউ ইলিগ্যাল বলতে পারবে না। বৈধতা …। কৌশিকের কবুল বলার সময় কাঁদাকাদি করার দুটো কারণ আছে, প্রথম কারণ- আবিরের কথা মনে পড়ে যাওয়া আর দ্বিতীয় কারণ – আবিরকে দেওয়া টেক্সটের কথাগুলো মাথায় ঘুরপাক খাওয়া। দুটোর সংমিশ্রনের তার বুকে এক অসহনীয় হাহাকার সৃষ্টি করলো।

আজ বৌভাত। কৌশিক ঘাড় সামান্য ডান দিকে কাত করে এক দৃষ্টিতে সামনে থাকা টেবিলগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। এই দৃষ্টি এবং বিয়ের দিনে রেজিস্ট্রি খাতায় তাকানোর দৃষ্টির সাথে ব্যাপক মিল আছে। তার চোখের সামনে আবির নয়তো রেজিস্ট্রি খাতা সামনে ভাসছে। কৌশিককে যে কেউ দেখলে বলবে, ছেলে নেশা করে আছে। কৌশিকের মা জাহানারা বেগম ছেলের হাতটা শক্ত করে ধরে বললেন, ঠিক করে উঠে বস। বসতে গিয়ে তো প্রায়ই শুয়ে পড়েছিস।

কৌশিক ঘোর থেকে বেরিয়ে নড়েচড়ে বসলো চেয়ারে। এখন সে স্টেজে। পাশে সানিয়ে বসে আছে, ছবি তুলেই যাচ্ছে। কৌশিককে একবারও বলছে না ছবি তোলার কথা, যেন সে সিলেবাসের বাইরের বিষয়। সানিয়া খুব আনন্দের সাথে বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি করে ছবি তুলছে। জাহানারা বেগম বললেন,

তোর কি কোন অসুখ হয়েছে?

কৌশিক বলল, না মা। কিছুই হয়নি। আসলে এতো ঝামেলা চলছে তো…

-বুঝলাম। নিজেকে সামলা। বিয়াশাদী হয়েছে, এখন দায়িত্ববান হতে হবে।

কৌশিক কোমল গলায় বলল, মা। আবির কি এসেছে?

জাহানারা বেগম বললেন, না আসেনি। বিয়েতেও দেখলাম না। আচ্ছা আবিরের সাথে ঝগড়াঝাঁটি করেছিস নাকি? অবাক হলাম অনেক! আবির আসলো না তোর বিয়েতে! আবার আজ বৌভাতেও দেখছি না। অবশ্য আজ আবিরের মা এসেছেন। উনাকে দেখলাম, কথা বলতে যাবো দেখি তোর শাশুড়ি আমাকে তার মামাতো বোনের সাথে পরিচয় করবার দেওয়ার জন্য টেনে অন্যদিকে নিয়ে গেলেন।

কৌশিক খুব আস্তে বলল, ওহ।

জাহানারা বেগম বললেন, থাক তুই। পরে কথা হবে। শুন, আর যেন তোকে না দেখি উলটপালট হয়ে বসে আছিস। মোটেও দৃষ্টি নন্দিনীয় না। বুঝলি?

কৌশিক মাথা ঝাঁকিয়ে মায়ের সাথে একমত পোষণ করলো।

জাহানারা বেগম চলে গেলেন। তার যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু কিশোরী ছেলেমেয়ে এসে ভিড় জমাল কৌশিকের সামনে। এক মেয়ে খিলখিলিয়ে বলল, কি দুলাভাই! চিনতে পারলেন?

কৌশিক খুব অবাক সুরে বলল, না তো। পারলাম না।

মেয়েটা খিলখিলিয়ে হেসেই যাচ্ছে। কৌশিকের খুব চেনা লাগছে এই হাসির শব্দ। হলি কাউ বলে আর্তনাদ করে উঠলো কৌশিক। এ সেই মেয়ে! এই মেয়ে হলুদের দিন রুমের বাইরে দাড়িয়ে ছিল। কৌশিক হড়বড় করে বলল, কি চাও তুমি?

মেয়েটার হাসি মুখ সাথে সাথে গোমড়া হয়ে গেলো। কৌশিক কি কোন অবান্তর প্রশ্ন করেছে নাকি? কিছু বলার আগেই ভিড় ঠেলে একজন সুশ্রী মহিলা এসে দাঁড়ালো সানিয়ার সামনে। সানিয়া খুশিতে ফেটে বলল, অ্যান্টি কেমন আছেন! বিয়েতে আসেননি কেন। কৌশিক ভালোভাবে লক্ষ্য করলো মহিলাটিকে, চেনা চেনা লাগছে। মহিলাটি এবার কৌশিকের দিকে তাকাল। আরে! মহিলাটি হল আবিরের মা। নিজের উপর ঘৃণা হচ্ছে কৌশিকের। তার সবচে পছন্দের মানুষের সবচে পছন্দের মানুষটিকে চিনতে এতো কষ্ট হচ্ছিল? ধিক্কার! কৌশিক উঠে দাড়িয়ে পা ছুঁয়ে সালাম করতে গেলো, শাহানা মুখ শক্ত করে বলল, করতে হবে না কৌশিক। তুমি বসো।

সানিয়া উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, অ্যান্টি আপনাকে যা লাগছে না আজকে। মনে হয় ১০বছর বয়স কমে গেছে।

শাহানা মলিন কণ্ঠে বলল, সে আর কি।

সানিয়া বলল, আচ্ছা আবির আসেনি? তাকে বিয়েতেও দেখলাম না। কোথায় ও?

শাহানা কৌশিকের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় বলল, অনুমতি পায়নি। তাই আসেনি। মর্জির দাস তো সে, তাই উপেক্ষা করতে পারিনি।

সানিয়া বলল, বুঝলাম না ঠিক অ্যান্টি।

শাহানা বললেন, একটা প্রজেক্টের কাজে ফ্রান্স যেতে হয়েছে তাকে। বিয়ের দিনই চলে গিয়েছে। আগে থেকে ফাইনাল ছিল, কিন্তু উসখুস করছিল বিয়ের দিন যাবে কি যাবে না। আমি ঠেলে পাঠিয়ে দিলাম আর কি।

কৌশিক আবিরের ফ্রান্স যাওয়া খবর শুনে সেখানে ফিট হয়ে যাওয়া উপক্রম। তার মস্তিষ্ক কোনোভাবে ব্যাপারটা গ্রহণ করতে পারছে না। না, আবির তাকে ছেড়ে যেতে পারে না।

কৌশিক ঢোঁক গিলে আমতা আমতা করে বলল, কতদিনের জন্য?

শাহানা ঠাণ্ডা গলায় বললেন, ঠিক নেই। সে বলেছে বছর খানেক লাগতে পারে আবার ওখানে থেকে যাওয়ারও চিন্তাভাবনা আছে।

কৌশিক শাহানার কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলো। কিছু শুনতে পারছে না, কিছু দেখতে পারছে। তার সামনে রেজিস্ট্রি খাতা সেই পৃষ্ঠা আর আবিরের মুখমণ্ডল ভেসে উঠছে। শাহানা হাত ইশারায় কৌশিককে বলল, এদিকটায় আসবে? কৌশিক মাথা নিচু করে স্টেজের যে অংশে শাহানা ইশারা করে দেখালেন আসার জন্য সেখানে এসে দাঁড়ালো। শাহানা নির্লিপ্ত ভাবে বললেন,

শুনো কৌশিক, আমি তোমাকে নিজ পুত্রের মতো স্নেহ করতাম। কখনও তোমার আর আবিরের মধ্যে ভেদাভেদ করিনি। কিন্তু যা তুমি করেছো সেটা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।

কৌশিক বলল, অ্যান্টি শুনেন…

হাত দিয়ে থামিয়ে শাহানা বললেন, আমি কিছু শুনতে চাই না। আমি যা বলছি মনোযোগ দিয়ে শুনো, আমি ইচ্ছে করেই আবিরকে ফ্রান্সে পাঠিয়ে দিয়েছি। একমাত্র কারণ যাতে সে তোমার স্মৃতিতে জীবনটা অতিবাহিত না করে। তার ক্যারিয়ারে মনোযোগ দিতে পারে। বিয়ে পরবর্তী অবস্থা আবির মোটেও মানতে পারতো না, তাকে কষ্ট দিতো। সে এসবকিছু থেকে বাইরে থাকবে, এতে আস্তে আস্তে মনোযোগ সরতে থাকবে এবং এক পর্যায়ে সে স্থিত হবে। একজন মা হিসেবে আমার কর্তব্য আমি পালন করেছি। সে ভালোবাসার মানুষটির সঙ্গে থাকতে চেয়েছিল আমি তা কোন প্রকার দ্বিধা ছাড়া গ্রহণ করেছি, কিন্তু সে সুযোগ হয়নি। আমি তার জীবনকে হেলায় ফেলায় চলতে দেখতে পারিনা। বুঝেছ?

কৌশিক চুপ করে মাথা নিচু করে রইল। শাহানা তার কাঁধে হাত রেখে বলল,

সুখী হও কৌশিক। তোমার উপর আমার কোনো রাগ নেই।

শাহানার চোখ ছলছল করে উঠলো। এ কান্না কৌশিককে দেখানো যাবে না। তিনি দ্রুত নেমে এলেন স্টেজ থেকে। তিনি সবসময়ে চাইতেন আবির আর কৌশিক একসাথে থাকুক। কিন্তু যা নিয়তি ঠিক করে রেখেছে সেটা বদলাবার শক্তি তো একজনের হাতেই।

শাহানা খুব চিন্তিত। আজ ২দিন হয়ে গেলো আবিরে গিয়েছে কিন্তু কোন প্রকার যোগাযোগ করেনি সে। একমাত্র ছেলেকে নিয়ে চিন্তিত থাকাটা স্বাভাবিক। ছেলেটার কি কোন কিছু হল না তো?

কৌশিক চুপচাপ বসে রইল সানিয়ার পাশে। একজন একজন করে হাস্যজ্জ্বল মুখে ছবি তুলছে বর-কনের সাথে। সানিয়া কৌশিকের দিকে তাকিয়ে বলল,

হাসছ না যে? কি হল?

কৌশিক বলল, আবিরের কথা মনে পড়ছে।

সানিয়া মুখ নরম করে বলল, আমারও পড়ছে। বিয়ের আগের দিন দেখা হয়েছিলো, তারপর যে দেখা হবে না কে জানতো!

কৌশিক আগ্রহী সুরে বলল, বিয়ের আগের দিন আবির তোমার সাথে ছিল?

-হুম, কফি শপে একসাথে ছিলাম আমরা। আমি খুব টেনশনে ছিলাম তো,তাই আবিরকে আসতে বলি। প্রায় ৩ ঘণ্টার মতো ছিলাম।

বরাবরের মতো এবারো কৌশিক ভুল প্রমাণিত হল। আবিরকে কিছু না বলার সুযোগ দিয়ে বড় একটা অন্যায় করে ফেলেছে। ‘তার উচিত এখন আবিরের পা ধরে মাফ চাওয়া, তা আবিরের কাছে যাওয়া প্রয়োজন’ কথাগুলো কৌশিক বিড়বিড় করে বলছে।

হাতে একটা আংটির বাক্স নিয়ে শাহানা এগিয়ে এলেন সানিয়ার সামনে। শাহানা কৌশিকের সাথে কোন বাক্যবিনিময় না করে সানিয়াকে বললেন,

তোমার জন্য উপহার। আবির দিয়েছে।

সানিয়া বাক্স খুলে একটি আংটি বের করলো। গোল নীল পাথরের বিরাট আংটি। কৌশিক ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলো। সে অবাক চোখে শাহানার দিকে তাকিয়ে বলল, এটা?

শাহানা কৌশিকের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বললেন, আমাকে আবির বলেছিল আংটিটা তোমার বেশ পছন্দ হয়েছে। তাই না দিয়ে সে থাকতে পারলো না।

কৌশিক পুরোপুরি বিধ্বস্ত। তার ভালোবাসার প্রথম ও সবচে মূল্যবান নিদর্শন এই নীলকান্তমণির আংটিটি। আবির সবসময় বলতো, আর কিছু আলাদা হোক না হোক এই আংটি কখনও আমার কাছ থেকে আলাদা করব না। যেদিন এই আংটিটি আমার কাছ থেকে দূরে চলে যাবে সেদিন বুঝবো আমাদের সম্পর্ক শেষ। তারমানে, তাদের সম্পর্কের যাত্রা শেষ? 

৬…

কৌশিকের বাড়িতে আজ এক বিরাট ঘটনা ঘটে গেছে। পাঁচ বছর আগে যে বোন প্রেমিকের সাথে পালিয়ে অজানা গন্তব্যে চলে গিয়েছিলো সে বোন ফিরে এসেছে। একা ফিরেনি, সাথে স্বামী ও ৩বছরের ফুটফুটে মেয়েকে নিয়ে ফিরেছে। জাহানারা বেগম মেয়ে লায়লার চেহারা না দেখার কসম কাটলেও মেয়েকে দেখে হুহু করে কেঁদে উঠলেন। জামাই’এর সাথে কোন বাক্যবিনিময় না করে নাতনিকে কোলে নিয়ে সারা বাড়ি ঘুরতে লাগলেন। সানিয়া মহাআনন্দে তাদের খেদমত করতে লাগলো। কৌশিককে অতি চিন্তিত মুখে এদিকওদিক ঘুরাঘুরি করতে দেখা গেলো। লায়লা দু’দুবার ডাকার সত্ত্বেও কৌশিক সাড়া দেয়নি। লায়লা তার স্বামী আদিলের দিকে তাকিয়ে কাঁদোসুরে বলল, আচ্ছা, কৌশিক আমার সাথে কথা কইছে না কেন?

আদিল কৌশিকের বন্ধু রাসেলর চাচাতো ভাই। কৌশিক ও রাসেল দু’জনের সহযোগিতায় তারা পালাতে পেরেছিল। তখন কৌশিকের বয়স ২৩বছর। তাগড়া জোয়ান পুরুষ, দিলে অশেষ সাহস সারাক্ষণ মারমুখো ভাবসাব। বোনের পালিয়ে যাওয়ার পর জাহানারা বেগম স্ট্রোক করেন। সাথে সাথে তার অশেষ সাহস রূপান্তরিত হয় – ভয়ে! কোনোদিন বোনের সাথে কথা বলবে না এমন পণ করে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছিল। আজ পাঁচ বছর পর প্রিয় বোন ফিরে এসেছে। বাড়ির প্রাণ ফিরে এসেছে। কৌশিক এদিকওদিক ঘুরছে আর পণের কথাটা ভাবছে। তার এমন অস্থিরতা দেখে সানিয়া বলল, হাঁসফাঁশ করছ কেন? কি হল?

কৌশিক বলল, কই হাঁসফাঁশ করছি? খালি উলটাপালটা কথাবার্তা তোমার।

-সেটাই। যাও বোনের সাথে দেখা করে এসো। আর কতক্ষণ বেচারিকে অপেক্ষা করাবে। ভাইয়ের সাথে দুটো কথা বলার জন্যে…

কৌশিক হাত দিয়ে থামিয়ে বলল, আহা থামো তো। মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি। আমি কথা কই আর না কই তাতে তোমার কি?

সানিয়া মুখ কুঁচকে বলল, দেখো অ্যাতো দাপটের সাথে কথা কইবে না। বিরক্ত লাগে।

কৌশিক দাড়িয়ে ছিল ডাইনিং টেবিলের সামনে। সানিয়ার সাথে কথা কাটাকাটি করে গটগট করে চলে এলো তার নিজের রুমে। বিয়ের পর থেকে স্ত্রী তার অধিকার অনুযায়ী বেশ দাপট দেখাচ্ছে। সানিয়াও কৌশিকের পিছে পিছে চলে এলো। তার হাতে কিছু শুকনো কাপড়। ছাদ থেকে উঠিয়ে নিয়ে এসেছে, কাপড়গুলো বিছানায় ফেলে একে কে গোছানো শুরু করলো। কৌশিক ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল। সানিয়া কাপড় গোছাতে গোছাতে বলল, কথা না কইয়ে কেন চলে এলে? জামাই বাহিরে বসে আছে, তার সঙ্গেও তো কথা বলতে পারতে।

কৌশিক কড়াকণ্ঠে বলল, আমি কথা বলব না। হয়েছে? এবার চুপ করো!

সানিয়া বলল, সেটাই জানো খালি।

কৌশিক বলল, আচ্ছা তুমি কি লেখাপড়া ছেড়ে দিয়েছ নাকি? বিয়ে হয়েছে ১৫দিন হল, ছুটি কাটানো শেষ হয়নি?

সানিয়া মলিনকণ্ঠে বলল, যেতে ইচ্ছে করে না ভার্সিটি।

-অ! বুঝেছি। ধরেছে গৃহিণী রোগ। সারাটা জীবন কাপড় গোছাতে গোছাতে পার করে দিবে নাকি? অমন চিন্তা ভুলেও করো না, কাল থেকে ক্লাসে যাবে। বাসায় থাকতে থাকতে গৃহিণী ভাব চলে এসেছে।

সানিয়া বলল, ক্লাস করতে ভালো লাগে না।

কৌশিক রাগান্বিতকণ্ঠে বলল, তাহলে এক পয়সা হাত খরচা পাবে না। পড়ালেখা করবে, তবেই পাবে। বুঝলে?

সানিয়া হাসিমুখে বলল, হাতখরচা দিয়ে করবো কি? বাসায় থাকলে…

কৌশিক ইজি চেয়ার থেকে উঠে বারান্দায় চলে আসলো। সানিয়ার সাথে এমন তর্কাতর্কি মোটেও ভালো লাগছে না। ১৬দিন হতে যায়, আবিরের কোন খোঁজ পাইনি সে। সেদিন গিয়েছিল আবিরের বাসায়, কাউকে পায়নি। ফোন করেছে অনেকবার শাহানাকে, তাকেও পায়নি। এভাবে যোগাযোগ না করে থাকবে কতদিন? এমন চলতে থাকলে একদিন উন্মাদ হয়ে রাস্তায় তাকে ঘুরতে হবে। কৌশিকের বারান্দা বেশি বড় না। মাঝারী সাইজের বারান্দা অনেক টবে ভর্তি। একটা ছোট চারিতে পদ্মও আছে। পদ্ম পাতা ছেড়েছে সবেমাত্র, ফুল আসতে ধের দেরি। সানিয়া হঠাৎ এসে কৌশিকের সামনে চায়ের কাপটা দিয়ে বলল, চা খাও।

কৌশিক ভুরূ কুঁচকে বলল, তিরিশ মিনিটও হবে না চা খেলাম, আবার কেন খাবো?

সানিয়া বলল, খাবে কারণ তোমার মেজাজ তুঙ্গে। চা খাও, মেজাজ ঠাণ্ডা করো।

কৌশিক গম্ভীরভাবে বলল, আমার মেজাজ ঠিকই আছে।

-সেটা ভালোভাবেই টের পাচ্ছি।

কৌশিক বারান্দা থেকে বেরিয়ে এলো। শান্তিমত কোথাও বসতে পারছে না। সানিয়া তার পিছনে লেগেই আছে। হায়রে!

গটগট করে বেরিয়ে ডাইনিং রুম পেরুতেই সদর দরজার সামনে লায়লাকে দেখল। লায়লা কড়মড় করে বলল, অ্যাতো বড় হয়ে গেছিস যে বোনের সাথে ভাব নিস?

কৌশিক কপাল কুঁচকে বলল, জী। হয়েছি বড়।

লায়লা বলল, চল ড্রয়িংরুমে বসি। কিছু কথা বলব।                

কৌশিক কোন জবাব না দিয়ে লক্ষ্মী ছেলের মতো ড্রয়িং রুমে গিয়ে সোফায় পা তুলে বসলো। লায়লা তার পাশে বসতে বসতে বলল, তো আবিরের কি খবর রে?

কৌশিক বলল, জানি না। বিয়ের দিন ফ্রান্স চলে গিয়েছে। এরপর থেকে লাপাত্তা।

লায়লা অবাক হয়ে বলল, বাড়িতে খোঁজ নিয়েছিস?

-বাড়িতে কাউকে পাইনি। দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করলাম, কি ছাতারমাথার উত্তর দিল বুঝলামই না।

-তো এখন কি করবি?

কৌশিক বলল, কি করবো এখন। বিয়ে তো হয়ে গিয়েছে, আমার যা সর্বনাশ তাতো হয়েছেই।

লায়লা বলল, মা’কে বলার সাহস পেলি না?

কৌশিক হাসতে হাসতে বলল, সে আর পথ রেখেছ নাকি! স্ট্রোক তো করলো সবে মাত্র ২বার, ৩য়বার যে করলে ভগবান আর মাকে পৃথিবীতে থাকার অনুমতি দিবে না সেটা তুমিও জানো ভালো করে আমিও জানি।

লায়লা খানিকটা লজ্জা পেয়ে যায়। কৌশিকের সম্পর্কে তার পরিবারে লায়লা ছাড়া আর কেউ জানে না। যখন কৌশিক ক্লাস ১০এ পড়তো তখন সে তার বোনকে ছেলেদের প্রতি তার মোহের কথা বলছে। লায়লা এ নিয়ে কখনও বিরূপ কথা তো দুরের কথা, আশাহীন বাণী শুনায়নি।

কৌশিক লায়লাকে বলল, দুলাভাই কই?

লায়লা মুচকি হেসে বলল, বাজার করতে গিয়েছে। জামাই এসেছে প্রথম শ্বশুরবাড়িতে, বাজার তো করতেই হয়।

-উফ, তোমাদের রেনেসাঁ যুগের নিয়মকানুন। ভাল্লাগেনা আর।

সানিয়া ট্রেতে কিছু খাবার নিয়ে ঘরে ঢুকল। কৌশিক নাকমুখ কুঁচকে রাগীকণ্ঠে বলল, তোমার গৃহিণী স্বভাব মোটেও পছন্দ হচ্ছে না। সে সক্কাল থেকে এইটা ওইটা করছ। চুপ করে কোথাও বসতে পারো না?

সানিয়া স্বাভাবিকভাবে বলল, বিয়ে হয়েছে। অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। আমি শুধু তোমার বউ না, এ বাড়ির বউ। দায়িত্বকর্তব্য আছে, সেগুলো পালন করতে হবে।

লায়লা বলল, ভাগ্যের কি পরিহাস তাই না? যে কৌশিক সানিয়াকে পাত্তাই দিতো না আজ ভালোবেসে তাকে বউ করে ঘরে এনেছে। হাউ রোম্যান্টিক!

লায়লার কথাটা শুনে কৌশিকের পিত্তি জ্বলে গেলো। লায়লা সবকিছু জানে তা সত্ত্বেও কেন এই ধরণের কথা কইছে?

সানিয়া ট্রে হাতে নিয়ে দাড়িয়ে আছে। মনোযোগ ও দৃষ্টি অন্যদিকে। স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে কিছু একটা নিয়ে সে গভীর চিন্তায় আছে। কৌশিক বলল, ট্রেটা টেবিলে রাখো। আর কাজ করতে হবে না, সোফায় বসো।

সানিয়া অবান্তর কিছু একটা শুনে ফেলেছে এমন ভাব করে আঁতকে উঠে ট্রেটা টেবিলে রেখে হড়বড়িয়ে বলল, জরুরী কথা আছে। রুমে আসো।

কৌশিক সানিয়ার অস্থিরতাটের পাচ্ছে। কি হল? এমন করে ঘামছে কেন? সে বলল, আচ্ছা চলো।

কৌশিক উঠে দাড়িয়ে লায়লাকে বলল, আপু আসছি। তুমি মা কাছে যেয়ে বসো।

সানিয়া আর কৌশিক রুমে। সানিয়া দরজার ছিটকানি লাগিয়ে দিয়েছে। গোপন কথা বলার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। কৌশিকের বিরক্ত লাগছে। মেয়ে মানুষের অধিক রহস্যতা তার কাছে অপছন্দীয়।

কৌশিক বলল, কি বলবে দ্রুত বোলো।

সানিয়া বলল, ইজি চেয়ারে বসো আরাম করে।

কৌশিক ইজি চেয়ারে বসলো। সানিয়া প্রত্যেকটা পর্দা বন্ধ করে দিয়েছে। ঘরে উজ্জ্বল লাইটের আলো জ্বলছে। সানিয়া খাটে বসে মাথা নিচু করে বলল,

তুমি এক সপ্তাহ ধরে অফিসে যাচ্ছ না কেন?

কৌশিক বলল, শরীর ভালো যাচ্ছে না। আর অফিস করতে ইচ্ছাও করে না আজকাল।

-তাহলে প্রতিদিন বিকেলে কোথায় যাও?

কৌশিক ঠাণ্ডাকণ্ঠে বলল, সেটা তোমার জানার দরকার?

সানিয়া হাসল। মেয়েটার হাসি সুন্দর, ঠোঁট টিপে হাসে। আজকে গোলাপি রঙের হালকা লিপস্টিকও লাগিয়েছে।

সানিয়া বলল, গ্রিন রোডের ফ্ল্যাটে কি করো তুমি?

কৌশিক অবাক হল। হওয়াটা স্বাভাবিক। গ্রিণ রোডের ফ্ল্যাটের কথা কেউ জানে না। গত ৩বছর আগে কৌশিক আর আবির দু’জন যৌথভাবে ফ্ল্যাট ভাড়া নেয়। একটাই উদ্দেশ্য নিজেরা যেন একান্তে সময় কাটাতে পারে। এমনও হয়েছে ঢাকার বাইরে যাবার কথা বলে তারা ফ্ল্যাটে থেকেছে, সময় কাটিয়েছে। তাদের অস্বীকৃত ছোটো সংসার সেইকাল থেকে ফ্ল্যাটেই শুরু হয়। কৌশিক আর আবির দুজনই ব্যাপারটা তাদের পরিবারের কাছে গোপন রেখেছে। কিন্তু সানিয়া কিভাবে জানলো এই ব্যাপারটা? কৌশিকের বুক মচর দিয়ে উঠলো। সানিয়া সবকিছু জেনে ফেললো নাকি?

কৌশিক আমতা আমতা করে বলল, আসলে ব্যাপারটা হল কি বাসায় আমার মন টিকে না। আর এমন একটা ফ্ল্যাট নেওয়ার উদ্দেশ্য একটাই একান্তে কিছু সময় কাটানোর।

সানিয়া মুখ শক্ত করে বলল, কোন মেয়ে মানুষের সাথে একান্তে সময় কাটাতে?

কৌশিক হাসার ভান করে বলল, আরে না না। কি যে বোলো। আবির মাঝে মাঝে আসতো। আর্টিস্ট মানুষ, ছবি আঁকত নিজের মনে।

-কেন তার নিজের বাসায় আঁকতে পারতো না?

কৌশিক বলল, আহা। বড্ড প্রশ্ন করো। কি হয়েছে তা বোলো তো।

সানিয়া উঠে কৌশিকের কাছে এসে দাঁড়ালো। হাতলে কৌশিকের হাত রাখা, সেটার উপর হাত রেখে মাথা নিচু করে বলল, আবিরের ডেড বডী আজ সকালে ওই ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। বাড়িওয়ালা তোমার ফোনে কল দিয়েছিল একটু আগে।

কৌশিক চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। প্রচণ্ড রাগান্বিত স্বরে চিৎকার করে বলল, কি যা তা বলছ! আর ইউ ম্যাড?

সানিয়া কৌশিকের হাত ধরে বলল, প্লিজ বসো। সব বলছি।

কৌশিক হাত ছেড়ে আলমারি থেকে শার্ট বের করে গায়ে দিলো। সানিয়া বলল, প্লিজ সেখানে যেও না তুমি। সুইসাইড কেইস, তোমাকে পুলিশ ধরবে।

কৌশিক চিৎকার করে বলল, আই ডোন্ট কেয়ার!

-আমার কথাটা শুনো কৌশিক, এমন ছেলেমানুষী করো না।

কৌশিকের চোখ লাল হয়ে গেছে। প্রেসার বাড়লে তার এমন হয়। সানিয়ার বাজে কথাগুলো কানে বাজছে। আবির মোটেও সুইসাইড করার ছেলে না।

সানিয়া বলল, আবিরের সাথে হিমেল নামে এক ছেলে থাকতো। তাকে পুলিশ ধরেছে। তুমি প্লিজ দয়া করে এখন যেয়েও না। তোমারও অবস্থা সুবিধার না।

কৌশিক শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে এক পর্যায়ে বিছানায় পড়ে গেলো। বিছানার বালিশ মুখে গুঁজে কাঁদতে লাগলো। কান্না বাইরে যেতে না পেরে সেজন্য এই পদ্ধতি। তার মাথা কাজ করছে না। আবির কেন সুইসাইড করবে? আর হিমেল? ও কেন আবিরের সাথে থাকবে? সাধ্য উদ্ধার করতে না পেরে খুন করলো নাকি হিমেল, আর চালিয়ে দিলো সুইসাইড হিসেবে?

সানিয়া কৌষিকের পাশে এসে বসল। বুকে হাত বুলাতে বুলাতে বলল, কান্না করো না কৌশিক। উঠে বসো।

কৌশিক বুক থেকে সানিয়ার হাতটা ছিটকে সরিয়ে দিলো। দরজায় কে জানি জোরে জোরে ধাক্কা দিচ্ছে। সানিয়া দৌরে দরজা খুলল। লায়লা দাড়িয়ে আছে।

লায়লা ভীতমুখে বলল, পুলিশ এসেছে…

৭…

আপনি কিছু খাবেন?

বেঁটে, রোগা লোকটি বিনয়ের সাথে প্রশ্ন করলো। আমি বসে আছি একটা রুমে। রুমে ঘুটঘুটে অন্ধকার। অবশ্য রুমের দরজা খোলা। খোলা দরজার বাইরে থেকে আলো কিছুদূর আসলেও মূলত ঘরটাকে আলোকিত করতে পারছে না। আমি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছি, চোখ বন্ধ। দ্রুত শ্বাসপ্রশ্বাস চলছে, ঘুটঘুটে অন্ধকার আমাকে অস্থির করে তুলে। আমি লোকটির প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বললাম, আপনার স্যারকে তাড়াতাড়ি আসতে বলেন।

লোকটা চলে যাওয়ার পা বাড়ালেও হঠাৎ থেমে বলল, স্যার কিছু খাবেন না?

আমি বললাম, বাতি জ্বালাও।

লোকটা আমতাআমতা করে বলল, নিষেধ আছে। শফিক স্যারের অনুমতি ছাড়া জ্বালানো যাবে না।

আমি একটু হাসলাম। চেয়ারের হাতলে হাত ঘষতে ঘষতে বললাম, রিমান্ডের ঘর এটা?

লোকটা বলল, জী।

-ও। তোমার নাম জানা হল না।

লোকটা শুকনো মুখে বলল, আমার নাম কাদের। থানার পিয়ন হিসেবে আছি।

-ও।

-আপনি কি সত্যিই কিছু খাবেন না?

আমি কড়া গলায় বললাম, না।

কাদের নামে লোকটি চলে গেলো। আমি উঠে দাঁড়ালাম। অন্ধকার ঘরে শ্বাস কষ্ট হচ্ছে। যত বেশি সময় ধরে থাকবো তত বাড়তে থাকবে। মাথায় অনেক চিন্তা খেলা করছে। আবিরের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া পর থেকে অনেক কাহানী হয়ে গেলো। ফ্ল্যাটে যেয়ে আবিরকে দেখবো সে পরিস্থিতি নেই, ডেড বডি পাওয়ার পরপরই আমার সন্ধানে বাসায় চলে এলো পুলিশ । সেখান থেকে সোজা থানায়। থানার এই ঘরে আমাকে ২ঘন্টা ধরে বসিয়ে রেখেছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে আমাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এই ব্যাপারটা যতই বুঝানো চেষ্টা করলাম ততই মা ঘাবড়ে যেতে লাগলো। ভাগ্যিস সানিয়া আর লায়লা মাকে সামলিয়ে নিয়েছিল নাহলে আরেক অঘটন ঘটতে সময় লাগতো না। আবির সুইসাইড করেছে না তার মার্ডার হয়েছে ব্যাপারটা মাথায় চক্কর দিচ্ছে। আচ্ছা, আমার এতো অধঃপতন হল কিভাবে? আমার সবচে প্রিয় মানুষটি, ভালোবাসার মানুষটি দুনিয়াতে নেই আর আমি ভাবছি ওর মৃত্যু কিভাবে হল? ছি! ছি!

আমি রুমের মধ্যে চারদিকে চক্কর দিচ্ছিলাম। এমন সময় ভারিক্কি দেহের অধিকারী একজন লোক গম্ভীর গলায় বললেন, কৌশিক সাহেব। চেয়ারে বসুন।

গলার আওয়াজ শুনে আমি থমকে গেলাম। খুব মোটা কণ্ঠ আমার ভয় লাগে। কেমন জানি শয়তান শয়তান ভাব পাওয়া যায়।

আমি চেয়ারে যেয়ে কাচুমাচু হয়ে বসলাম। লোকটা বাতি জ্বালাল। আমার সামনে ১০০ওয়াটের বাল্ব জ্বলছে। বাতির আলো চোখে পীড়া দিচ্ছে। অনেকক্ষণ অন্ধকারে থাকার ফল। লোকটি সশব্দে হেঁটে এসে আমার সামনের চেয়ারে এসে বসলো। হাতটা এগিয়ে দিয়ে বলল, মিস্টার কৌশিক, আমি শফিক।

আমি হ্যান্ডশেক করলাম। লোকটার চেহারায় পুলিশ পুলিশ ভাব নেই, খুব সাধারণ চেহারা। এমন চেহারা দেখলে মনে হয় কোথায় যেন দেখেছি। কিন্তু আসলে দেখিনি।

শফিক বলল, তো কি খবর আপনার?

আমি বললাম, ভালো না। ২ ঘণ্টা ধরে আমাকে এখানে বন্দি করে রেখেছেন, কিভাবে ভালো থাকতে পারি? আবিরের লাশটাও দেখতে পারলাম না।

শফিক হাসতে হাসতে বললেন, লাশ দেখার মতো জিনিস হল? যে চলে গিয়েছে, সে গেছেই। লাশ দেখলে আপনার আবিরের মৃত চেহারা আজীবন মনে থাকবে। যখনি তার কথা মনে করতে যাবেন তখন মৃত চেহারা আপনার সামনে ভেসে উঠবে, তা মোটেও সুখকর নয়।

-পুলিশে কাজ না করে আপনার প্রোফেসর হওয়া উচিত ছিল।

শফিক চেয়ারটা সামান্য আমার দিকে টেনে নিয়ে আসলো। মোটেও সুবিধাজনক লাগছে না ব্যাপারটা। রিমান্ডে নাকি অনেক কিছুই হয়। আমি তো অবশ্য আসামি না, কিন্তু তারা যদি অপ্রীতিকর কিছু করে? তাহলে কি হবে?

-অনেক সময় নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করতে হয়। দুনিয়াটা তো ইচ্ছার উপর চলে না।

-আবির কোথায়?

শফিক হাত হাতলে রেখে বললেন, হাসপাতালে। ময়নাতদন্ত হবে, রিপোর্ট আসবে তারপর খুনি খুঁজা হবে।

আমি বললাম, আবিরের খুন হয়েছে?

শফিক বলল, সেটাই আমরা প্রেডিক্ট করছি। বাসায় হিটার পাওয়া গেছে। যা দেখলাম তাতে মনে হয়ে হিটারের চুলায় হাত লেগে কারেন্ট সাপ্লাই হয়েছে। স্যান্ডেল ছিল না পায়ে, স্পট ডেড।

আমি কৌতূহলী হয়ে জিগ্যেস করলাম, আজকালকার যুগে হিটার কে ব্যবহার করে। আর যে বাসায় চুলা আছে সে বাসায় হিটারের প্রয়োজনীয়তা কি?

শফিক মুচকে হেসে বলল, সেটা আপনি ভালো বলতে পারবেন মিস্টার কৌশিক। আপনার বাসাও সেটা।

আমি শফিকের দিকে তাকালাম। তার চেহারায় রহস্যের হাসি। তিনি কি আজ সত্য উদঘাটন করতে বসেছেন?

শফিক বলল, কৌশিক সাহেব। আপনার সাথে আবিরের কি ধরণের সম্পর্ক ছিল?

আমি বললাম, হি ওয়াজ মাই বেস্ট ফ্রেন্ড।

-এর চেয়ে বেশি কিছু না?

-নাহ।

-ভালো করে ভেবে উত্তর দিন। মিথ্যা বললে ফাঁসবেন আপনি।

আমি বললাম, আমি মিথ্যা বলছি না।

কথাটা বলার পর নিজের মধ্যে এক অপরাধ বোধ কাজ করতে লাগলো। আমার এতো সাহসের অভাব ছিল।

-আপনারা মেয়ে নিয়ে আসতেন ফ্ল্যাটে?

আমি অবাক হয়ে বললাম, কি বলেন আপনি?

শফিক নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল, ভুল কিছুই বলিনি। খাটের পাশ থেকে বেশকিছু কনডমের প্যাকেট পাওয়া গেছে। ডাস্টবিনে দুটো ইউজড কনডম পেয়েছি।

-ও

-খালি ও? আশেপাশের মানুষদের কাছ থেকে খবর পেলাম, আপনার বাসায় মেয়েদের যাতায়াত ছিল না।

আমি বললাম, আপনি কি বুঝাতে চাচ্ছেন?

-নিজের গায়ে ব্যাপারটা কেন লাগলো আমি জানি না। আবিরের সাথে হিমেলও থাকতো!

আমি কড়া কণ্ঠে বললাম, হিমেল আর আবিরের মধ্যে কিছু হয়নি।

রুম কাঁপিয়ে শফিক হাসছে। আমি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মেঝেতে। আবির আর হিমেল, তাহলে কি … ?  

৮… 

আবিরের বাসার পরিস্থিতি থমথমে। আবিরের মা শাহানা অচেতন। পুত্রের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার পর জ্ঞান হারান, তারপর আর জ্ঞান ফিরেনি । ডাক্তার অবশ্য আশ্বাস দিয়েছে সিরিয়াস কিছুই হয়নি। আবিরের বডি ময়নাতদন্তে পাঠাননি তার বাবা। কিন্তু আশেপাশে অফিসার বন্ধুরা তাকে জোর করে, কারণ একটাই – বিগ্রেডিয়ারের ছেলের খুনি কে বের করতেই হবে। আবিরের মৃত্যুতে আশেপাশের পরিচিত মহলে কিছু কথা উড়া উড়ি করছে। আবিরের মৃত্যু সংক্রান্ত নিম্নের কথাগুলো ছড়িয়েছে:

১)আবির হিমেল নামে এক ছেলের কাছে ধর্ষিত হয়েছে, পরে তাকে খুন করা হয়।

২)আবির আত্মহত্যা করেছে।

৩)কৌশিক আবিরকে খুন করেছে।

৩টার মধ্যে সবচে অধিকতর প্রাধান্য পেয়েছে ১নম্বরটা। ধর্ষণ কথাটা কোন বাক্যের সাথে যুক্ত করে দিলে মানুষের আগ্রহ আকাশচুম্বী খ্যাতি লাভ করে। ‘তাও আবার এক ছেলে, আরেক ছেলে’ এমনটা ভাবতেই পুরো গোটা সমাজ শিহরিত, তাদের কাছে মানুষ গুরুত্বপূর্ণ না, মানসন্মান ও নিজের বানানোর নিয়মকানুন প্রাধান্য পায়। 

আবিরের লাশ পাওয়া যায় সকাল ৮টায়। পেপার ওয়ালা পেপার দিতে এসে লক্ষ্য করে দরজা হাট করে খোলা। সে কৌতূহল বশত ভিতরে উঁকি মারলে দেখতে পারে কেউ নেই আশেপাশে। সে ভিতরে ঢুকে এদিকওদিক দেখতে গিয়ে রান্নাঘরে আবিরকে দেখে। সে মাটিতে পড়ে আছে, হাতটা হিটারের পাশে  পড়ে আছে। পা’এ স্যান্ডেল নেই, হিটার জ্বলছে। সে তড়িঘড়ি করে হিটার বন্ধ করে চারপাশে চিৎকার করে সবাইকে ফ্ল্যাটে আনায়। বাসায় যে ছুটা ছেলে কাজ করতো তাকে খুঁজে পেলো না। সে পালিয়েছে জিনিসপত্র নিয়ে। আবিরের মাকে ফোন দেয় বাড়ীওয়ালা, তিনি তখনই অচেতন হয়ে যায়। আবিরের বাবা পুলিশসহ ফ্ল্যাটে আসে। ছেলের মৃতদেহ দেখে অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। একজন আর্মি অফিসার এতো বলীয়ান থাকে যে তার কান্না খুব কানে বাঁধে। অবাক চোখে সবাই তাকিয়ে থাকে আবিরের বাবার দিকে।

পুলিশ তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে হিমেলকে গ্রেফতার করে। হিমেলকে খুঁজতে পুলিশদের বেশি কষ্ট করতে হয়নি। হিমেল এখনও মুখ খুলেনি। আবার এমনও বলেনি যে সে খুন করে নি।

আসলে খুনটা কে করলো, হিমেল? না অন্য কেউ?

৯…

সানিয়া আবিরের রুমের সামনে দাড়িয়ে আছে। দরজা লক। চাবি আনতে বাসার বুয়া শাহানার কাছে গিয়েছে। গ্রিন রোডের ফ্ল্যাটে যাওয়ার অনুমতি পায়নি সে। পুলিশের আন্ডারে ফ্ল্যাট, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষেধ। সানিয়া আবিরের রুম দেখতে চায়। কেন দেখতে চায় তা প্রশ্ন হতে পারে। উত্তরটা সানিয়ার নিজের কাছে অজানা। তার ইচ্ছে করছে, তাই দেখতে চাচ্ছে। সানিয়া দশ মিনিট হল দাড়িয়ে আছে। কৌশিক এসেছে সাথে, সে এখন আবিরের বাবার সাথে কথা বলতে ব্যস্ত। তাদের মধ্যে কঠিন কথাবার্তা চলছে, বন্ধ দরজায় কান লাগিয়ে সানিয়া কিছু শুনার চেষ্টা করেছিল। ভাসাভাসা কথা শুনেছে। কিছু শব্দ যেমন ইডিয়ট, শয়তান, হেল এগুলো বারবার শুনতে পেরেছে। বেশিক্ষণ কান লাগিয়ে রাখতে পারিনি, আবিরের বাসার বুয়া এসে তাকে ভড়কে দিয়েছিল। তারপর সে আমতাআমতা করে আবিরের রুম দেখতে চায় বলে ইচ্ছা পোষণ করে। বুয়া তাকে আবিরের রুমের সামনে দাড়িয়ে থাকতে বলে রুমের চাবি আনতে চলে যায়।পনেরো মিনিট পর বাসার বুয়া সানিয়ার কাছে এসে বলল,

আপা চাবি দিতে মানা করেছেন। বলেছেন আপনার রুম দেখার কোন দরকার নাই।

সানিয়া কি বলবে খুঁজে পেলো না। সে মাথা নিচু করে বলল, আমি বাসায় যাচ্ছি। খবরটা কৌশিক বের হলে দিও।

বুয়া মুখ শুকনো করে বলল, আইচ্ছা।

আবিরের বাবা তামিম রহমান মুখ শক্ত করে ইজি চেয়ারে বসে আছে। হাতে পানির গ্লাস। একটু পর পর গ্লাসে চুমুক দিচ্ছেন। পানি যে আয়োজন করে খাওয়া যায় সেটা কৌশিক প্রথম উপলব্ধি করলো। প্রথমে সে মনে করেছিল তামিম সাহেব মদ খাচ্ছেন। এমন আয়োজন করে চুমুক হুইস্কির গ্লাসে দেওয়া মানানসই।

কৌশিক তামিম সাহেবের সামনে দাড়িয়ে আছে। তার আর্মি ভীতি আছে। আর তামিম সাহেবকে সে পরিচিত হওয়ার পর থেকে প্রচণ্ড ভয় পায়। এ ভয় এখনো কেটে উঠেনি।

তামিম রহমান গ্লাসে চুমুক দিয়ে বললেন, কি দরকারে এসেছ?

কৌশিক মাথা নিচু করে আছে। খুব আস্তে বলল, খোঁজখবর নিতে এসেছি।

তামিম সাহেব মুখ ভেটকিয়ে বললেন, ন্যাকামি কম করবে। আবিরের কাছে কোন টাকা পেতে? স্পষ্ট করে বোলো।

কৌশিক বলল, আবিরের তো কখনও টাকার কমতি হতো না। সে কেন ধার নিবে?

তামিম সাহেব বললেন, নিতেও পারে। অদ্ভুত স্বভাবের এক ছেলে। যখন ক্লাস নাইন এ পড়তো তাকে প্রতি মাসে ১ হাজার টাকা হাত খরচ দিতাম। যা চাইত তাই দিতাম। কিন্তু একদিন আমার মানিব্যাগের সব টাকা-পয়সা নিয়ে গুম হয়ে যায় ১ সপ্তাহের জন্য। কঠিন জেরার পর সে বলল ঘুরতে গিয়েছিল কক্সবাজার। আমি চড় দিয়ে বললাম, মানিব্যাগে ছিল মাত্র ৩হাজার টাকা আর এই টাকায় তুই কক্সবাজার গিয়েছিস? কার সাথে গিয়েছিস? কিছুতেই মুখ খুলেনি। আজও এই রহস্য অজানা। তামিম সাহেব হঠাৎ থেমে চেয়ার থেকে উঠে বললেন, তোমার সাথে যায়নি তো?

কৌশিকের হাতপা কাঁপছে। ঘটনা আধা সত্য। আবিরের সাথে কৌশিক ১সপ্তাহের জন্য কৌশিকের দেশের বাড়িতে গিয়েছিল। কক্সবাজারের কথা কেন আবির বলেছিল সেটা বুঝতে পারছে না। আজ এতদিন পর রহস্য উন্মোচন হবে না তো?

তামিম সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, জোয়ান পুরুষের পা কাঁপছে কেন? এ বয়সে এমন ভয় পেলে চলবে নাকি? সহজ হও আর বোলো কি দরকারে এসেছ।

কৌশিক বলল, আমি কি বসতে পারি?

তামিম সাহেব তার চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। পানির গ্লাস টেবিলে রাখলেন। টেবিলে সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করলেন। তারপর আবার এসে ইজি চেয়ারে বসলেন। সিগারেট মুখে দিয়ে আশপাশ তাকাতে লাগলেন। এতো আয়েশ করে উঠে সিগারেট নিলেন কিন্তু ম্যাচ আনতে ভুলে গেলেন। কৌশিক পকেট থেকে তার লাইটারটা বের করে এগিয়ে গিয়ে তার সামনে লাইটারটা দিয়ে বলল, স্যার নিন।

তামিম সাহেব ভুরূ কুঁচকে লাইটার নিয়ে সিগারেট জ্বালালেন। একবার ফুঁকে বললেন, আমি তোমার স্যার কবে থেকে হলাম?

কৌশিক ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল, মুখ ফসকে বলে ফেলেছি।

-ওহ আচ্ছা। চাকরি কেমন চলে?

-ভালো।

তামিম সাহেব মুচকি হেসে বললেন, একটা জিনিস সবসময় মাথায় রাখবে আর্মি ব্যক্তিদের সাথে মিথ্যা বলবে না।

কৌশিক তামিম সাহেবের কাছ থেকে কিছুদূরে চলে গেলো। ভয়ংকর মানুষদের কাছ থেকে যতদূর থাকা যায় তত ভালো।

তামিম সাহেব বললেন, গত ২০দিন ধরে অফিসে যাও না। চাকরি চলে গেছে। কি করবে বোলো এখন?

কৌশিক নিচু গলায় বলল, আপনি যদি একটু…

তামিম সাহেব ঘর কাঁপিয়ে হাসচ্ছেন। হঠাৎ করে তাকে নিজের কাছে খুব শক্তিশালী লাগছে। এমন ভাব সচরাচর হয় না।

তামিম সাহেব বললেন, আবিরের কেইসের ব্যাপারে যথেষ্ট মাথা খাটিয়েছ। চাকরি তো যাবেই। কাজের কাজ তো কিছুই হয়নি বরঞ্চ পানি দিন দিন ঘোলা হচ্ছে।

-কিন্তু রহস্য তো বের করতে হবে।

-তুমি কি মিসির আলি যে রহস্য সমাধান করবে? ওসব সবার পক্ষে সম্ভব হয় না।

-আপনি কি চাচ্ছেন তাহলে?

তামিম সাহেব কৌশিকের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেন। আসল কথা এখন শুরু করা যায়।

-তোমার চাকরিটা আবার পাবে। আজ মাসের ১৯তারিখ। সামনের মাসে ১তারিখ থেকে অফিসে যাবে। সবকিছু ঠিকঠাক করার দায়িত্ব আমার। কিন্তু একটা শর্ত আছে।

কৌশিক কৌতূহলী স্বরে বলল, কি শর্ত?

-তুমি ১০দিনের জন্য ঢাকার বাইরে যাবে। ঢাকার বাইরে মানে গাজীপুর, টাঙ্গাইল না। বান্দরবান, কক্সবাজারের দিকে যাবে। স্ত্রীকে নিয়ে হানিমুনও সেরে যাবে। এতোসব ঝামেলার মধ্যে এমন ছুটি অনেক কাজের।

কৌশিক মলিন মুখে বলল, এর কারণটা জানতে পারি?

তামিম সাহেব সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে বললেন, অবশ্যই। আবির আর তুমি গ্রিন রোডের বাসায় থাকতে তা জানাজানি হয়েছে। এখন এ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করলে কেঁচো খুড়তে সাপ বের হবে। আমি চাই না – নোংরা ব্যাপারটা জানাজানি হোক।

কৌশিক হতভম্ব হয়ে বলল, কিসের নোংরা ব্যাপার?

তামিম সাহেব কঠিন মুখে বললেন, আমার ছেলে তোমাকে পছন্দ করতো সেটা আমি জানি। মনে করো না আমি ঘাস খেয়ে জীবন পার করি।

-স্যার…

তামিম সাহেব ধমক দিয়ে বলল, আবার স্যার? কতবার বলেছি স্যার ডাকবে না।

-সরি।

-সরি মাই ফুট। তোমার সাথে থেকে থেকে আমার ছেলের আজ এই দশা। খুনের রহস্য বের করতে গিয়ে এখন যদি বের হয়ে যায় তোমরা উভয় দুজনকে পছন্দ করো তাহলে আমার মানসম্মান কই যেয়ে ঠেকবে? আর নিজের মা’র কথা ভেবেছ কি?

কৌশিক গম্ভীর গলায় বলল, ভালোবাসা হল ভালোবাসা। কোন নির্দিষ্ট শ্রেণীর মানুষকে ভালবাসতে হবে এমন তো নিয়ম নেই।

তামিম সাহেব বললেন, কিন্তু মনে রাখবে তুমি একটা সমাজে বাস করো। সমাজের কাছে তোমার জবাবদিহিতা করতে হবে।

কৌশিক হেসে বলল, হাস্যকর সমাজ ব্যবস্থা মানুষই তৈরি করেছে। মনগড়া নিয়ম আজ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

তামিম সাহেব উঁচু গলায় বললেন, স্টপ। এ বিষয়ে আমি তোমার সাথে কোনও আর্গুমেন্টে যেতে চাই না।

কৌশিক দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে বলল, আচ্ছা ঠিক আছে।

তামিম সাহেবের সিগারেট খাওয়া শেষ হয়েছে। চেয়ার থেকে উঠে অ্যাস্ট্রেতে সিগারেট ফেলে কৌশিকের দিকে এসে বললেন, চলো আবিরের রুমে যাই।

পরিষ্কার ঝকঝক করছে রুমটা। মনে হয় প্রতিদিন অতি যত্নে পরিষ্কার করা হয়। কৌশিকের চোখে পানি চলে এলো। আবিরের কথা খুব মনে পড়ছে তার। ছোটবেলা থেকে এ বাসায় যাতায়াত তার। প্রেমের প্রত্যেকটি স্মরণীয় ঘটনার সাক্ষী এ ঘরটি। তাদের প্রথম দৈহিক মিলনের কাহানী চট করে মনে পড়ে যায় তার, ফিক করে হেসে ফেলে। তামিম সাহেব কৌতূহলী গলায় বললেন, কি পুরনো স্মৃতি মনে পড়ে গিয়েছে নাকি?

কৌশিক লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে। তার কেন জানি মনে হচ্ছে আবির বাইরে কোথাও গিয়েছে, কিছুদিনের মধ্যে ফিরে আসবে। সবাই তাদের সম্পর্ক মেনে নিয়েছে, আবির ফিরলেই ধুমধাম অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের সম্পর্কে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। কৌশিক নিজের কল্পনার প্রতি বিদ্বেষ তৈরি হল, যা সম্ভব হবে না তা নিয়ে কিসের ভাবনা।

তামিম সাহেব বললেন, বিছানায় বসো।

কৌশিক বিছানায় বসলো। তামিম সাহেব দাড়িয়ে আছে বারান্দার সামনে। তার দৃষ্টি নিচের দিকে। তাকে খুব বিষণ্ণ মনে হচ্ছে। পুত্র শোক কাটিয়ে উঠতে পারিনি, না পারাটা স্বাভাবিক।

তামিম সাহেব বললেন, কেইস ক্লোজড করতে হবে। এই কেইস চলা সম্ভব না।

কৌশিক বলল, এতো তাড়াতাড়ি আশাহত হলে কিভাবে চলবে আংকেল?

তামিম সাহেব উঁচু গলায় বললেন, আশা ঠিকই আছে। কিন্তু যদি তোমার আর আবিরের ব্যাপারটা না থাকতো তাহলে খুনির চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করে ছাড়তাম।

-কবে যাবো আমি?

তামিম সাহেব হেসে বললেন, এতো সহজে মেনে নিলে? নট ব্যাড! আগামীকাল রাতে রওনা দিও।

কৌশিক হাত কচলাতে কচলাতে বলল, আমি আবিরের স্বার্থে এবং দুই পরিবারের স্বার্থে কাজটা করছি।

তামিম সাহেব বললেন, ইন্টারেস্টিং কিছু শুনতে চাও?

-কি বিষয়ক?

-কেইস রিলেটেড।

কৌশিক আগ্রহ সহকারে বলল, অবশ্যই!

তামিম সাহেব কৌশিকের সামনে এসে বললেন, ইনভেস্টিগেশনে দুটি ইন্টারেস্টিং তথ্য পাওয়া গেছে। ১- সানিয়া আর হিমেলের সম্পর্ক ছিল। রিলেশন ব্রেকাপের রিজন হিমেল ছেলেদের পছন্দ করতো। ২-তোমার আর আবিরের সম্পর্কে সানিয়া সবকিছু জানে।

কৌশিক নিষ্পলক দৃষ্টিতে তামিম সাহেবের দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখেমুখে ভয়ংকর ভয়ের ছাপ। হতচকিত হয়ে বলল, তারমানে কি…?

তামিম সাহেব বললেন, আবির একটা গাধা। বাবার সাথে তার এতো দ্বন্দ্ব কেন ছিল কে জানে। আমাকে এসে যদি বলতো, বাবা আমি কৌশিককে পছন্দ করি। হয়তো তার গালে ঠাসঠাস করে দুটা থাপ্পড় দিতাম। অনেক বকতাম। কিন্তু সাথে সাথে রাগ পড়ে যেতো। জড়িয়ে বলতাম বাবা তোর যা ইচ্ছা তাই হবে। ছেলে তো আমার একটাই। সন্তানই তো বাবা-মা’র সব।

তামিম সাহেব কথাগুলো বলতে গিয়ে তার গলার স্বরে খানিকটা কাঠিন্য এলো। তিনি কড়া কণ্ঠে বললেন, কৌশিক উঠে দাড়াও।

কৌশিক তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ালো। তামিম সাহেব বললেন, আসো কোলাকুলি করি।

কৌশিক তামিম সাহেবকে জড়িয়ে ধরলেন। তার বাবার কথা মনে পড়ে গেলো। তামিম সাহেবের মধ্যে নিজের বাবার অস্তিত্ব খুঁজতে চাইছে নাকি কৌশিক?

আবেগ জর্জরিত গলায় তামিম সাহেব বললেন, অল দ্যা বেস্ট মাই ডিয়ার। ট্রিপ সাকসেসফুল হবে ইন শা আল্লাহ্‌!

কৌশিকের চোখ অশ্রুতে ভরে উঠলো। সে তার অশ্রু লুকানোর চেষ্টা করতে লাগলো, তামিম সাহেবকে অশ্রু দেখাতে চায় না।

১০…

প্রায় ১৮ঘন্টা জার্নি করে কক্সবাজার অবশেষে পৌঁছেছি। আমার জীবনের সবচে জঘন্য বাস জার্নি ছিল। জ্যাম, বাসের কেরামতি সব মিলে আমার মেজাজ এখন তুঙ্গে। যার সাথে কথা বলছি তার সাথে দুর্ব্যবহার করছি। সানিয়া আমার কাছে মোট ৪বার ধমক খেয়েছে। বিগত ১ ঘণ্টা সে আমার সাথে কোন বাক্যবিনিময় করেনি। ইশারা-ইঙ্গিতে কথা বলার চেষ্টা করেছিল পাত্তা দিইনি। পাত্তা যত পাবে, ততই মাথায় উঠবে। আর পাত্তা দেওয়ার প্রশ্নই উঠে না, এখন পেট থেকে কথা বের করার পালা।

বাসে বসে বসে অনেকক্ষণ অনেক কিছু নিয়ে ভেবেছি। সব ভাবনা আবিরের খুন ও সানিয়া সম্পর্কিত। একটা ভুল হয়ে গেছে, এতো তাড়াতাড়ি ট্রিপে চলে আসাটা ঠিক হয়নি। সানিয়ার ব্যাপারে বিস্তর পড়াশুনা করা প্রয়োজন ছিল। এখন আফসোস করে লাভ নেই, মিশনে নেমে পড়েছি।

আমরা এখন হোটেল রুমে। সানিয়া দীর্ঘ জার্নিতে খুব ক্লান্ত তাই তিনি শান্তির স্নানে ব্যস্ত। আমি বসে আছি বারান্দায়। মার্চ মাস কক্সবাজার আসার উপযুক্ত সময় কিনা জানি কিন্তু ভালো লাগছে। নরম বাতাস, মুহূর্তেই চোখ বুজে যায় আরামে। সামনে সাগর দেখতে পারছি। বিশাল বিশাল ঢেউ ধমধম করে পড়ছে। কতো জায়গা ঘুরেছি কিন্তু আবিরের সাথে কক্সবাজার একবারও আসা হয়নি। আসবো আসবো করে, বান্দরবান-খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটি কতো জায়গায় ঘুরলাম, এক জায়গা ২বার করেও গিয়েছি কিন্তু কক্সবাজার আসা হয়নি। আবিরের মুখখানা ভেসে উঠলো চোখের সামনে। চোখ ভারি হয়ে আসছে, চোখের পাতা বন্ধ করতেই স্বপ্নে ডুবে গেলাম।

সাগরের সামনে, আমি আর আবির পাশাপাশি দুটি বেঞ্চেতে বসে আছি। মাথার উপর ছাতা। বেঞ্চ দুটির দূরত্ব বেশি না। আমি আরাম করে শুয়ে সাগরের জলখেলা দেখছি। আবির মাথানিচু করে বই পড়ছে। আমি বিরক্ত স্বরে বললাম, যদি বিয়ে করতেই হতো বইকে করতে। আমাকে করেছো কেন? আবির বই থেকে চোখ সরাল না। আমি রেগে গেলাম। উঠে গিয়ে বইটা ছুড়ে ফেলে দিলাম। আবির ক্ষেপে দিয়ে বলল, বই হল বিদ্যা। বিদ্যাকে অসন্মান করতে হয় না।

আমি বললাম, সবসময় বিদ্যাকে সন্মান করতে হয় না। সন্মান করার কিছু নির্দিষ্ট সময় আছে।

আবির তীক্ষ্ণ গলায় বলল, যাও বইটি তুলে নিয়ে আসো।

-যাবো না।

-তাহলে কথাও বলবে না আমার সাথে।

আবির গটগট করে সাগরের দিকে পা ফেলতে লাগলো। আমি আনন্দে আটখানা হয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে বইটি তুলে বেঞ্চের কাছে এসে দেখলাম, যে বেঞ্চে আবিরে বসে ছিল সেখানে হিমেল আর আবির জড়াজড়ি করে শুয়ে আছে। আবিরের হাত হিমেলের বুকে আর হিমেলের হাত আবির ঠোঁটে। আমি গর্জন করে উঠলাম। উঁচু গলায় বললাম, তোমরা উঠো!

আবির কিশোর ছেলেদের মতো করে বলল, উঁহু না। আমার হিমেল খুব ভালো লাগে।

হিমেল আবিরকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে ফেলে। দু’জনের মুখ অনেক কাছাকাছি, তাদের ঠোঁট অনেক কাছাকাছি চলে আসার পর…

চোখমুখে পানির ছাট পড়ছে। আমি তড়িঘড়ি করে উঠে পড়লাম। বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি আমাকে পুরো ভিজিয়ে দিয়েছে। পিছনে তাকিয়ে দেখলাম সানিয়া মিটমিট করে হাসছে বিছানায় শুয়ে শুয়ে। কতক্ষণ ঘুমিয়েছি তা বলতে পারবো না। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। চারদিকে আলো জ্বলে উঠেছে, লাল-নীল-সবুজ হরেক রকম আলো। সাগর তার আপন মনে গর্জন করেই যাচ্ছে।

আমাকে রুমে ধুকতে দেখে সানিয়া উঠে পড়লো। তার পরনে ম্যাক্সি টাইপের খুব উগ্র পোশাক। বুকের দিকটা খোলামেলা বেশ, মনে হয় খুব কষ্টে রেখেঢেকে রেখেছে। আমি বললাম, এইগুলো কি হচ্ছে সানিয়া?

সানিয়া আহ্লাদী স্বরে বলল, হানিমুনে মানুষজন এরকমই করে।

আমি বিরক্ত স্বরে বললাম, সিনেমা-সিরিয়াল দেখে মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোমার। যা দেখায় তা বাস্তব জীবনেও প্রয়োগ করো। গাধার গাধা!

সানিয়া মুখ গোমড়া করে বিছানায় পা তুলে বসলো। ১০বছরের খুকী খুকী ভাব। আমি নিজেকে সামলিয়ে নিলাম। অতি ক্ষুদ্র ব্যাপারে উত্তেজিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। বিড়বিড় করে বললাম, কথা আজ বের করবই।

সানিয়ার কাছে যেয়ে শান্ত কণ্ঠে বললাম, যাও পোশাক চেঞ্জ করে আসো। আমি এসব পোশাক দেখতে অভ্যস্ত নই। সুন্দর একটা শাড়ি পরবে, মাথায় বিরাট একটা টিপ দিবে। নো মেকআপ। হাত ভর্তি চুড়ি পরবে।

সানিয়া লাফ দিয়ে উঠে পড়লো। সুটকেস খুলে শাড়ি বের করা শুরু করলো, একপর্যায়ে আমার দিকে তাকিয়ে কাঁদো সুরে বলল, টিপ নেই।

-চুড়ি?

-না, চুড়িও আনিনি।

-তাহলে কি এনেছ?

সানিয়া সুটকেসে সামনে মন খারাপ করে বসে থাকলো। আমি বিছানায় যেয়ে আরাম করে শুয়ে বললাম, আমাকে এক গ্লাস পানি দাও তো।

সানিয়া উঠে দাড়িয়ে টেবিলের কাছে গেলো। টেবিলের উপর রাখা গ্লাস হাতে নিলো। আমার কাছে নিয়ে আসতে আসতে বলল, পানি না খেয়ে এটা খাও।

আমি ভুরূ কুচকে বললাম, এটা কি?

-এনার্জি ড্রিংক।

-কে নিয়ে এসেছে?

-আমি।

-কোথায় পেলে?

সানিয়া বলল, এতো প্রশ্ন করো না তো।

আমি কড়া কণ্ঠে বললাম, আমি মদ খাই না।

-এটা মোটেও মদ না।

-সত্যি করে বোলো কোথায় পেয়েছ?

সানিয়া আমার পাশে বসে মুখ শক্ত করে বলল, হানিমুনে এসেছ। শিক্ষা সফরে না। সারাক্ষণ মুখ গোমড়া করে বকাবাজ্জি করবে না। আর জানো না এটা হানিমুন স্যুট, নানা আয়োজন থাকে এদের।

আমি মনে মনে বললাম, তামিম সাহেব আপনি কিভাবে আপনার ছেলের জামাইয়ের সাথে এমনটা করতে পারলেন। হানিমুন তো করবো না তাও কেন এতো বাহারি হোটেলের বাহারি আয়োজন করেছেন।

সানিয়া গ্লাস এগিয়ে দিলো আমার দিকে। আমি দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে গেলাম। খাবো কি খাবো না। অ্যালকোহল যে খাই না সেটা অবশ্য সত্য না। খেয়ে ফেলি, মেজাজ তাহলে একটু হলেও শান্ত হবে।

বড় এক গ্লাসে অর্ধেকটা এনার্জি ড্রিংকে পূর্ণ। আমি সানিয়ার হাত থেকে গ্লাস নিলাম, উঠে বসে ঢকঢক করে খেয়ে ফেললাম। প্রচণ্ড তিতা প্রকৃতির ছিল। আমি কাশতে কাশতে বললাম, কি খাওয়ালে তুমি আমাকে?

সানিয়া মুচকি মুচকি হাসল। তার হাবভাব মোটেও সুবিধার মনে হচ্ছে না। আমি দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়লাম। আমার দুটো জিনিস খুব অপছন্দের। এক – মুচকি মুচকি হাসা, দুই – প্যানপ্যানে কান্না। সানিয়ার অপছন্দের কাজটা অবলীলায় করেই যাচ্ছে। সে ভালো ট্রিকস খেলেছে আমার সাথে। সম্ভবত ড্রিংকের সাথে কিছু মিশিয়েছে। একবার আবিরও একই কাজ করেছিল। প্রকৃতি পুনরাবৃত্তি করতে পছন্দ করে। আজ সে ৪বছর আগের ঘটনা পুনরাবৃত্তি করছে। আগে আবির ছিল, এখন সে নেই। এখন আছে খলনায়িকা সানিয়া। আমার মাথার চিন্তাভাবনা এলোমেলো হতে শুরু করেছে। উল্টাপাল্টা লাগছে সবকিছু। স্বপ্নের বাকি অংশ চোখে ভাসছে। আবিরকে হিমেল বিশ্রীভাবে চুমু খাচ্ছে, ঠোঁট কেটে ফেলবে এমনভাবে। আবির প্রাণপণে চেষ্টা করছে হিমেলকে দূর করতে। যতবার ধাক্কা দিচ্ছে ততই হিমেল কাছে চলে আসছে। শার্টের বোতামগুলো খুলছে। আবিরের সাদা বুকের মধ্যে মাথা ঘষছে, এক পর্যায়ে কামড়ে ধরল। রক্ত পড়তে শুরু করলো, সে রক্তে সারা শরীর ভেজে গেলো। আমি আবিরের কাছে যাবো তখনই আবিষ্কার করলাম আমার বুকে সানিয়া হিমেলের মতো মুখ ঘষছে এবং এক পর্যায়ে কামড়ে ধরল। আমি সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার দিলাম। স্বপ্ন ভেঙ্গে গেলো। চোখ খুলতেই দেখলাম সানিয়া আমার ডানপাশে বসে আছে। খুব কাছে, নিঃশ্বাস পাচ্ছি। ডান গালে একটু ব্যথা পাচ্ছি। গালে হাত দিলাম, খাঁজকাটার মতো অনুভব করলাম। কঠিন গলায় বললাম, আমার গালে কামড়ালে কেন?

সানিয়া লজ্জা পেয়ে বলল, খুব ইচ্ছা করছিলো।

আমার পুরো জগত এখন দোদুল্যমান। চারপাশের প্রত্যেকটা জিনিস নড়ছে। স্থির নেই কিছুই। আমি চোখ বড় বড় করে বললাম, সানিয়া তুমি কি আমাকে ভালোবাসা?

সানিয়া মাথা নেড়ে বলল, আমার জীবনের চেয়ে বেশি।

আমি ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বললাম, আবিরকে তুমি খুন করেছো?

সানিয়া নির্বিকার গলায় বলল, হ্যাঁ। আমি করেছি।

-পুলিশের কাছে সব স্বীকার করবে?

সানিয়া কঠিন স্বরে বলল, না।

আমি সানিয়ার হাত শক্ত করে ধরলাম। তার মুখ আর মুখ সামনাসামনি। সে চোখ নামিয়ে রেখেছে। আমার মাথা ঘুরছে। ঠিকমতো ধরতেও পারছি না তাকে। সানিয়া বলল, হাত ছাড়ো।

-তোমার সাথে হিমেলের সম্পর্ক ছিল?

সানিয়া বলল, আমি জবাব দিতে আগ্রহী না।

আমি হাতটা আরও শক্ত করে ধরতে গেলাম তখনই বুঝলাম আমার চেতনা সব ঘোলা হতে শুরু করেছে। আমি মাথা চেপে বসে আছি। সানিয়া আমাকে শুইয়ে দিলো ঠিক করে। সে উঠে দাড়িয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলল, কেন খুন করেছি জানতে চাবে না?

আমি অস্পষ্ট স্বরে বললাম, কেন?

-আমি তোমাকে ভালবাসি, আমি চাই না আমারদের মধ্যে কেউ থাকুক।

আমি বললাম, স্বার্থ পূরণ হয়েছে?

সানিয়া হাসল। আমি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম।

১১…

চোখ চিড়চিড় করছে। কঠিন আলো চোখে পড়ছে। আলো চোখের পাতায় ধাক্কা দিচ্ছে। বলছে, সকাল হয়েছে! চোখ খুলো! আমি চোখ খুললাম। বারান্দার দরজা হাট করে খোলা। বাইরে প্রচণ্ড রোদ উঠেছে। আমি উঠে বসতে গেলাম। মাথা ভার হয়ে আছে। আমার পাশের সাইড টেবিল থেকে মোবাইলটা নিতে চেষ্টা করলাম। পারলাম না, হাতপা বেশ দুর্বল। গা ঝেড়ে উঠলাম। একটা খাম পড়লো মেঝেতে। আমি খামটা মেঝে থেকে উঠিয়ে নিলাম। বন্ধ খাম, ভিতরে কিছু আছে। খামের উপর লেখা, কৌশিক লাভস সানিয়া। আমি চোখ কচলাতে কচলাতে বারান্দার চেয়ারে এসে বসলাম। খামটা খুললাম। সানিয়ার চিঠি। সে লিখেছে,

প্রিয় কৌশিক,

মানুষ মানুষকে কতটুকু ভালোবাসে সেটা আন্দাজ করার শক্তি মানুষেরই নেই। আমি তোমাকে অনেক বেশি ভালোবাসি। কিন্তু আমি কাপুরুষ অপছন্দ করি। তুমি একটা কাপুরুষ। তুমি তোমার ভালোবাসাকে কখনও অর্জন করতে পারোনি। তুমি সমাজের যুদ্ধে পরাজিত।

হ্যাঁ, আমি আবিরকে খুন করেছি। কিভাবে করেছি শুনবে? প্রথমে ঘুমের ওষুধ খাইয়েছি তারপর হিটারে তার হাত ঢুকিয়েছি। কিন্তু আমি হিটার আনিনি, এনেছে হিমেল। সে কেন হিটার এনেছিল তা আমি জানি না। আবির ফ্রান্সে বিয়ের দিন যায়নি। হিমেল তাকে যেতে দেয়নি। বিয়ের দিন থেকে হিমেল আর আবির একসাথে বাস করা শুরু করে। হিমেল আমার দূরসম্পর্ক এক ভাই। মনে নেই আমাদের হলুদে এসেছিল? মাথাটা খাটালে উত্তর পেতে পারতে। হিমেল আর আমার সম্পর্ক ভাই-বোনের, প্রেমিক-প্রেমিকার নয়। যে বলেছে সে মিথ্যা বলেছে। আবিরের খুনে হিমেলের কোন হাত নেই। সে আমাকে বিভিন্ন সময় তথ্য আদানপ্রদান করতো। গ্রিণ রোডের বাসার কাহানী, তোমাদের প্রেম কাহানী সবই তার কাছ থেকে শুনা। একটা মাত্র স্বার্থ ছিল – আবিরকে উপভোগ করা। সেটা করেছে কিনা একটু মাথা খাটিয়ে উত্তর বের করো, অবশ্যই পাবে।

আর কিছু জানতে চাও? ও আচ্ছা, পুলিশের কাছে আমি ফোন করে বলেছি আবিরের মৃত্যুর জন্য আমি দায়ী। পুলিশ কথায় বিশ্বাস করেনি, আমি বলেছি আমার আলমারিতে প্রুফ আছে। কি প্রুফ আছে জানতে চাও? জানতে চাইলে আমি দুঃখিত, সবকিছু আমি তোমাকে জানাতে আগ্রহী না।

স্ত্রী হিসেবে তোমার কাছ থেকে আমি কিছুই পাইনি, অধিকার তো দূরের কথা। তুমি একজন ব্যর্থ প্রেমিক, ব্যর্থ স্বামী।

কাপুরুষতা আমি পছন্দ করি না, কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবাসি, আজীবন বাসবো।

চললাম আমি। খুব দূরে যাচ্ছি চলে যেখানে কেউ আমাকে পাবে না।

বিদায়!

ইতি তোমার অভাগা স্ত্রী

সানিয়া।

আমি চিঠিটা ভাঁজ করলাম। খামে না ভরে উঠে পড়লাম। মোবাইল নিয়ে দ্রুত গতিতে রুম থেকে বেরিয়ে আসলাম। রিসেপশনে এসে জটলা দেখলাম। অনেক মানুষ। তাদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে। রিসেপশনে একটা মেয়ে বসে আছে। আমি তাকে জিগ্যেস করলাম, কি হয়েছে?

মেয়েটা বলল, এক মহিলা আত্মহত্যা করেছে। সুইমিংপুলে নামার জন্য অনেক চেঁচামেচি করেছেন, তারপর নামলেন কিন্তু আর বেঁচে উঠলেন না। কর্তৃপক্ষ খুব বিরক্ত।

আমি দৌড়ে সুইমিংপুলে গেলাম। কিছু মানুষ লাশের চারদিকে দাড়িয়ে আছে। আমি এগিয়ে গিয়ে দেখলাম লাশটা সানিয়ার। খুব সুন্দর নীল শাড়ি পড়া, মাথায় টিপ এবং হাত ভর্তি চুড়ি। আমি হাঁটু গেঁড়ে বসলাম সানিয়ার পাশে। জটলা কমে গেলো। সুইমিংপুল দেখাশুনার দায়িত্বে যে লোকটা আছে সে আমাকে বলল, আপনার স্ত্রী?

আমি নিচু স্বরে বললাম, জী।

-আমি মানা করেছিলাম স্যার তাকে। তিনি শুনলেনই না। যখন ডুবতে শুরু করলেন তখনই খোঁজখবর দিয়ে মানুষজন জোগাড় করে ফেললাম। তিনি নিজ ইচ্ছায় আমাদের হাতে ধরা দিলেন না। আমরা তাকে…

আমি হাত দিয়ে থামিয়ে দিয়ে বললাম, একটা কাজ করতে পারবেন?

-কি স্যার?

-সানিয়ার হাত থেকে আংটিটা খুলে আমার হাতে দিন তো।

লোকটা সানিয়ার হাত থেকে নীলকান্তমণির আংটিটা খুলে আমার হাতে দিলো। আমি আংটিটা মুষ্টিবদ্ধ করে উঠে দাঁড়ালাম।

-স্যার কি করবেন?

আমি বললাম, চুপ করে দাড়াও।

আমি মোবাইলটা বের করে তামিম সাহেবকে ফোন দিলাম। দুবার রিং হতেই তিনি ধরে বললেন, পুলিশ এসেছে?

আমি শান্ত গলায় বললাম, না আসেনি। ঘটনা খুব সিরিয়াস, আপনি কি এখানে আসতে পারবেন? সানিয়া সুইসাইড করেছে। আমার মাথায় কিছু খেলছে না।

তামিম সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, চিন্তা করো না কৌশিক। অ্যাই এম কামিং।

আমি লোকটাকে বললাম, পুলিশ আসবে। তাদেরকে লাশ নিয়ে যেতে দিবে না।

লোকটা হতচকিত হয়ে বলল, আপনি কোথায় যাচ্ছেন?

আমি মুচকি হেসে বললাম, আসছি।

সমুদ্রের পাড়ে দাড়িয়ে আছি। একেকটা ঢেউ পা ভিজিয়ে যাচ্ছে। আশপাশে বেশি মানুষ নেই। আমি আমার মুষ্টিবদ্ধ হাত খুললাম। নীলকান্তমণির আংটিটা দুআঙুলের সাহায্যে ধরলাম। বিশাল পাথরের আংটিটি আজ সৌন্দর্যে ঝলমল করছে। রোদ পড়ে ঝিলিক দিচ্ছে। আমার চেহারা দেখা যাচ্ছে অস্পষ্ট। আমি কিঞ্চিৎ হাসলাম। আংটিটা ছুঁড়ে দিলাম সাগরের দিকে। বেশ দূরে পড়লো। অতল সাগরে হারিয়ে যাবে আংটিটি।

আমি চিৎকার করে বললাম, বিদায় নীলকান্তমণি। বিদায়!

পা’য়ের কাছ দিয়ে তিনটা কাঁকড়া হেঁটে যাচ্ছে। একজন আরেকজনকে একটু পরপর আঘাত করছে। পিলপিল পায়ে সাগরের দিকে ছুটে গিয়ে হঠাৎ গুম হয়ে গেলো।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.