প্রেমশাস্ত্র

লেখকঃ অরিত্র হোসেন

-হ্যালো?

-হ্যালো। তুমি কি বের হয়েছ?

-হ্যাঁ। মাত্র বের হলাম।

-কিভাবে? বাইরে তো অনেক বৃষ্টি হচ্ছে।

-তাতে কি? ছাতা নিয়ে বের হয়েছি। তুমি কোথায়?

-আমি তো আটকা পড়ে আছি।

-মানে? তোমার অফিস থেকে বনানী মাত্র ৫মিনিটের পথ। একটা রিকশা নিয়ে…

– না না না। ভিজে যাবো তো! আর রিকশাও তো…

-আচ্ছা! আচ্ছা! বুঝতে পেরেছি। তুমি তাহলে বাসায় যাও। আজকে দেখা করার দরকার নেই।

-শিউর?

-হুম। শিউর।

-তুমি কি মাইন্ড করেছো?

আদিয়ান নিঃশ্বাস ফেলে বলল, নাহ তো।

ওপাশ থেকে জারিফ বলল, গ্রেট! তাহলে পরে কথা হবে। কেমন?

আদিয়ান কল কেটে দিল। প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে। খুব ইচ্ছে করছে মোবাইলটা ছুড়ে ফেলে দিতে। আদিয়ান দাঁড়িয়ে আছে হাতিরঝিলের ফুটপাথের উপর। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। সে এক হাতে ছাতা নিয়ে লেকের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। তার ছাতাটা ছড়ানো নয়। ছাতাটা একজনকে কোনোমতে বৃষ্টি থেকে রক্ষা করে। পিঠের নীচ দিকটা ভিজে যাচ্ছে সেটা অনুভব করা যাচ্ছে। আদিয়ান মুখ মলিন করে দাঁড়িয়ে আছে। কি করবে বুঝতে পারছে না। বাসায় যেতে ইচ্ছে করছে না। বাসায় গেলে মা’র ভারী ভারী কথা শুনতে হবে। তিনি বার বার বারণ করে বলেছেন, আজ বাইরে যাস না। বৃষ্টি আর ঠাণ্ডা। মায়ের কথা অমান্য করে চিৎকার চ্যাঁচামেচি করে বের হয়েছে। ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। শীতকালের বৃষ্টি মোটেও উপভোগ্য নয়। এক দিকে ঠাণ্ডা আরেকদিকে বৃষ্টি। পুরো আবহাওয়াই পরিবর্তন করে দিলো। আদিয়ান হাত রাখা মোবাইলের দিকে তাকাল। রাগে সারা গা জ্বলে যাচ্ছে। জারিফ কিভাবে মানা করে দিতে পারল? ওর কি একটুও ভালোলাগা নেই তার প্রতি? মোবাইলের লক খুলে ‘ওয়াটস অ্যাপ’ এ ঢুকল আদিয়ান। তারপর জারিফকে লিখে পাঠাল, ‘নিজেকে আজ তুমি প্রমাণ করেছ। আমার সাথে যোগাযোগ রাখবে না। বাই’। মেসেজ পাঠানোর পর ডাটা কানেকশন অফ করে ফ্লাইট মুডে দিয়ে দিলো। কিছুক্ষণের জন্য সে একা থাকতে চায়। মোবাইলটা পকেটে ঢুকিয়ে ধীর গতিতে হাঁটা শুরু করলো। বাতাসের বেগ বাড়ছে। আচ্ছা সে কি ছেলেমানুষি করছে? সে কি অহেতুক নাটক করছে? কার জন্যে? কাকে ভুলে থাকার জন্যে? নাসির কে? আদিয়ান নিঃশ্বাস ফেলল। আজ ২০জানুয়ারি। হুম। আজ থেকে ২বছর আগে তার সাথে দেখা হয়। ২বছর আগে পরিস্থিতি ছিল পুরোপুরি ভিন্ন। আদিয়ানের সেদিনের ঘটনা মনে করার চেষ্টা করলো। হুম, পুরো ঘটনা মনে আছে।

আকাশ ঝকঝকে পরিষ্কার। আশপাশ রৌদ্রে ঝলমল করছে। আদিয়ান ভীষণ বিরক্ত। বনানীর ১১নম্বর রাস্তার শুরু মুখে ১৫মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আজ ক্লাস ফাঁকি দিয়ে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়েছে। কারোর জন্যে অপেক্ষা করতে তার মোটেও ইচ্ছে হয় না। খুব বিরক্ত লাগে। আর উটকো ঝামেলার জন্যে তো কোন সময়ই নেই। গত ২মাস ধরে ‘নাসির’ নামে একটি উটকো ঝামেলা ঘাড়ে যে চেপে বসলো, আর নামার কোন খবরই নেই! আদিয়ান অনেকবার ছেলেটাকে স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, সে ছেলেদের পছন্দ করে। মনে করেছিল গে কথাটা শুনার পর ছেলেটা পিছু হটবে। নাহ! তা কি হয়! সে ছেলে ইনিয়েবিনিয়ে কতো কথা যে জিজ্ঞ্যেস করে! সন্দেহ হচ্ছে, এই ছেলেটা কি তার মতোই নাকি?

২০ মিনিট হতে চলল কিন্তু নাসিরের কোন খোঁজখবর নেই। কলেজে মোবাইল আনা নিষিদ্ধ, তাই আনতে পারেনি। লুকিয়ে লুকিয়ে অনেকেই আনে কিন্তু তার আনতে ভয় হয়। কোন দিন আবার ধরা খেয়ে যায়! ভুরূ কুঁচকে এদিক ওদিকে তাকাতে তাকাতে হঠাৎ তার চোখ পড়লো একটি রিকশার উপর। সেখানে কমলা রঙের একটা সোয়েটার পরিহিত এক যুবক মাথা নিচু করে মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করছে। আদিয়ান ভাবতে লাগলো, এই ছেলে সেই ছেলে নাকি? আরেকটু কাছে যেয়ে স্পষ্ট দেখতে পেলো ছেলেটাকে। হুম। এই ছেলেই হল নাসির। সে এখনও মাথা নিচু করে মানিব্যাগে টাকা খুঁজেই যাচ্ছে। আদিয়ান নকল কাশি দিয়ে বলল, খুচরা লাগবে? নাসির মাথা উচু করে আদিয়ানের দিকে তাকাল। তার চোখে-মুখে বিস্ময়ের ছাপ। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে। আদিয়ান ঠোঁট টিপে হাসি দিয়ে বলল, খুচরা লাগবে নাসির?

নাসির আমতা আমতা করে বলল, আসলে কি… আমমমম… আসলে

আদিয়ান বলল, রিকশা থেকে নামো। টাকা সম্ভব প্যান্টের পকেটে রেখেছ।

নাসির চট করে নেমে পড়লো। প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে মুচকি হাসল। পকেট থেকে ৫০টাকার নোট বের করে রিকশাওয়ালাকে দিলো। ভাড়া চুকিয়ে নাসির এখন খুব শান্তির হাসি দিচ্ছে। আদিয়ান হাত বারিয়ে বলল, আমি আদিয়ান। তুমি আজ আসতে অনেক লেট করেছো।

নাসির আমতা আমতা করে বলল, ভেবেছিলাম আমি তোমাকে সারপ্রাইজ দিবো।

-কিভাবে?

-তোমার আগে এসে, তোমাকে চমকে দিয়ে। কিন্তু সেটা সম্ভব হল না।

আদিয়ান হাসল। নতুন মানুষকে সে প্রথম দেখায় আপাদমস্তক একবার দেখে নেয়। আর দশটা সাধারণ ছেলের মতোই নাসির। কোন বিশেষত্ব নেই। আচ্ছা, সবার কি রূপের বিশেষত্ব থাকতে হবে? সে নিজেও আহামরি কোনকিছু না। আদিয়ান বিড়বিড় করে বলল, Don’t judge people. Don’t judge people.

নাসির পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করলো। প্যাকেট থেকে একটি সিগারেট বের করে আদিয়ানের দিকে দিয়ে বলল, খাও।

আদিয়ান শান্ত গলায় বলল, কলেজ ড্রেস পরে আছি। খাওয়া সম্ভব না।

নাসির সিগারেটটা প্যাকেটে ঢুকাতে ঢুকাতে বলল, কোথায় বসতে চাও?

-পাশেই বিএফসি। সেখানে বসে?

-আচ্ছা।

ধীর গতিতে দু’জন সমান তালে এগিয়ে চলছে ফুটপাথের উপর। দু’পক্ষ নীরব। কথা বলার কিছুই নেই। আদিয়ানের খুব বিরক্ত লাগছে। কে আপদ রে! আদিয়ান গলার স্বর নরম রেখে বলল, তুমি কিছু বলতে চাও?

নাসির আদিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল, কি বলতে চাই?

-বিশেষ কিছু?

নাসির ভুরূ কুচকাল। সম্ভবত কিছু ভাবছে সে। আদিয়ানের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। আর সম্ভব নয় এই অদ্ভুত মানুষের সাথে এক মিনিট থাকা। ঘড়ি দেখতে দেখতে বলল, আমার বাসায় যাওয়া দরকার। দেরি হয়ে গিয়েছে?

নাসির অবাকস্বরে বলল, মানে? এখনই বাসায় ফিরবে? আমাদের তো কথাই শুরু হল না ঠিকমতো।

আদিয়ান রিকশা ডাকল। নাসির তাজ্জব ভঙ্গিতে আদিয়ানের দিকে তাকিয়ে থাকল। রিকশা ঠিক করে উঠে পড়লো সে। নাসির বলল, আমার অনেক কিছু বলার আছে।

আদিয়ান কষ্ট করে বিরক্তভাব লুকিয়ে হেসে বলল, যথেষ্ট সময় দেওয়া হয়েছে। আমার মনে হয় কিছুই বলার নাই তোমার। থাক। তোমার সাথে পরিচিত হয়ে খুব ভালো লাগলো। পরে কথা হবে।

নাসির কিছু একটা বলতে গিয়েও বলতে পারল না। সে আদিয়ানের মুখের দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। আদিয়ান লক্ষ্য করলো নাসিরের চোখগুলো চোখের কোটরে ঢুকে গিয়েছে। সম্ভবত ছেলেটা রাতে ঘুমায়নি। চোখগুলো ছোট হলেও, সুন্দর। স্বচ্ছ ও সুন্দর।

আদিয়ানের ইশারায় রিকশা চলা শুরু করলো। সে পিছনে একবারও তাকাল না। সে আপদ ঘাড়ে নিতে চায় না। একে তো এই ছেলে নিজেকে ‘স্ট্রেইট’ দাবি করে, আবার যদি জিগ্যেস করা হয় কেন তার প্রতি এতো আগ্রহ তাহলে খুব দর্শন টাইপ উত্তর দেয়। আদিয়ান ঝামেলায় পড়তে চায় না। এইচএসসি পরীক্ষার আগে কোন ধরণের প্রেমভালবাসা-কাম সম্পর্কিত কোন বিষয়ে নিজেকে জড়াতে চায় না। একটা প্রেম করেই শিক্ষা হয়ে গিয়েছে। প্রথমে খুব সুন্দরভাবে পটানো হয়। তারপর? কর্ম শেষ, প্রেমও শেষ। আদিয়ান বিড়বিড় করে বলতে লাগলো, Think Positive. Think Positive.

বাসায় এসে মোবাইল ওপেন করতেই নাসিরের মেসেজ পায় আদিয়ান। মেসেজ পরতে শুরু করলে সে আর নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে পারে না। নাসির লিখেছে, ‘জানি না। জানি না কেন আমি এসব করছে। কিন্তু আমি তোমাকে খুব পছন্দ করি। তোমার নিষ্পাপ মুখের গড়ন আমার মনে এক গভীর ছাপ ফেলেছে। কোনমতেই মুছা যাচ্ছে না। আমি তোমাকে খুব পছন্দ করি। তুমি কি আমার হবে? প্লিজ? আচ্ছা, ঠিক আছে। তোমাকে এক সপ্তাহ সময় দিলাম আমি। এক সপ্তাহের মধ্যে আমাকে তোমার উত্তর জানিও’।

আদিয়ান কোন উত্তর দিলো না। কোন ঘটনা ঘটেনি এমন ভেবে ব্যাপারটা পুরোপুরি ভুলে গেলো। এক সপ্তাহ পূরণের ঠিক ২দিন আগে মেসেজ আসলো। আদিয়ানের টনক নড়ল। ও! নাসিরের ব্যাপারে সে তো ভুলেই গিয়েছে। নাসির মেসেজে লিখেছে, আমি তোমার উত্তর পেয়ে গিয়েছি। আমি আমার প্রপোজাল নিয়ে নিচ্ছি। ভালো থেকো। আদিয়ান দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল। মনে মনে ভাবল, যাইহোক ছেলেটা বুঝে গেলো। তাকে বেশ একটা কষ্ট করতে হল না।

দমকা বাতাস বইছে। আদিয়ান ব্রিজের উপর দাঁড়ালো। পাশ দিয়ে সাঁই সাঁই করে একেকটা গাড়ি চলে যাচ্ছে। কুয়াশা-বৃষ্টির মিশ্রণে পুরো পরিবেশটা অদ্ভুত লাগছে। প্যান্টের নিচের দিকটা ভিজে গিয়েছে। আদিয়ান জ্যাকেটের চেইন পুরোটা লাগিয়ে মাথা নিচু করে পানি দেখতে লাগলো। হাতে ধরে রাখা ছাতাটা মাঝেমাধ্যে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। ভীষণ ঠাণ্ডা লাগছে তার। সারা শরীর কাঁপছে। মনটাও কাঁপছে। পুরনো কথা মনে করে কি হবে? তাও সে মনের করার চেষ্টা করতে থাকলো।

পুরোপুরি একটা ঘটনাকে কি চাপা দেওয়া যায়? আদিয়ানের মতে না। নাসিরের সাথে যোগাযোগ বন্ধ প্রায় ৬মাস ধরে। যেমন হঠাৎ করে সে উদয় হয়েছিল আদিয়ানের জীবনে ঠিক সেভাবেই হঠাৎ করে হারিয়ে যায়। কিন্তু হারিয়ে যাওয়ার পর আবার উদয় হওয়া বিপদজনক।

৬মাস পর হঠাৎ নাসির ফোন করে আদিয়ানকে। কল দেখে অবাক না হয়ে থাকতে পারে না সে। হঠাৎ? কি চায় সে? কল রিসিভ করে আদিয়ান বলল, কি খবর?

ওপাশ থেকে নাসির কৌতূহলী গলায় বলল, ভালো আছো তো?

আদিয়ান হেসে বলল, হ্যাঁ। ভালো আছি। তো, এতো মাস পর আমার কথা মনে পড়লো? প্রেম মলিন হয়ে যাওয়ার পর?

নাসির বলল, হুম। মলিন হওয়াটা স্বাভাবিক নয়? যাইহোক একটা কাজে ফোন দিয়েছি।

-কি বোলো?

-আমি একটা শর্টফিল্ম বানাতে চাই। তোমাকে লাগবে।

-ওহ আচ্ছা। বেশ। কি সম্পর্কিত?

-সোলো শর্টফ্লিম। সামনাসামনি দেখা হলে বিস্তারিত বলবো। কেমন?

আদিয়ান বলল, ঠিক আছে। তাই হবে!

শর্টফিল্মের উসিলায় আদিয়ান আর নাসিরের বেশ খাতির হয়। তারা প্রায় বিকেলে আড্ডা দিতে বসে। স্ক্রিপটিং এর কাজে দু’জনকে বসতে হতো। ঢাকা শহরের বিভিন্ন লোকেশনে ঘুরাঘুরিও করতে হতো। আদিয়ানের প্রায় ভুলেই গিয়েছিল গত ৬মাস আগে খুব বিতর্কিতভাবে নাসিরকে সে প্রত্যাখ্যান করেছিল। কিন্তু, সে যে ভুল ছিল সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া শুরু করে। নাসিরের সঙ্গ তার খুব প্রিয় হয়ে উঠে। প্রথম সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়ার পর সে কোন নতুন সম্পর্কে জড়াবে না এই কসম কাটলেও প্রায় প্রতিটা রাত তার কাটে অস্থিরতায়। কাউকে পাওয়ার আশায় মনটা আঁকুপাঁকু করে। হয়তো বয়সের একটা তাড়না, হয়তো বয়সের একটা দাবি। সারা রাত কুটুর কুটুর করে গল্প করবে এমন ভাব আদিয়ানের মধ্যে না থাকলেও কারোর হাত ধরে বা বুকে মাথা রেখে ঘুমাবে সে আশা প্রবলভাবে তার মনে স্থায়ী হয়েগিয়েছিল।

যতদিন বাড়তে থাকে নাসিরের ছোট ছোট জিনিসগুলো খুব পছন্দের হতে থাকে। তার আপনসুলভ আচরণ দেখে আদিয়ানের মনে হাহাকার সৃষ্টি হয়। কেন সঠিকভাবে নাসিরকে সে মূল্যায়ন করে নি।

শর্টফিল্মের শুটের শেষ দিনে কাজ সারতে সারতে রাত হয়ে যায়। নাসির আদিয়ানকে মধ্যরাতে বাসায় যেতে দিবে না। আদিয়ান খুব ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নাসিরের সাথে থাকতে রাজি হয় না। তার অনুভূতিগুলো নতুন হলেও খুব শক্ত। আজ রাতটা যদি নাসিরের সাথে কাটায় তাহলে কিছু একটা নয়, সবকিছু হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা আছে।

আদিয়ান শেষমেশ নাসিরের কথা মেনে রাজি হয় তার বাসায় থাকতে। আদিয়ানের মনটা খুব খাঁখাঁ করা শুরু করলো। সে কি তার অনুভূতির কথা বলবে কি বলবে না সেটা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেলো। আদিয়ান সমীকরণ মিলানো শুরু করলো। যদি নাসির এখনও তাকে আগের মতো পছন্দ করে থাকে তাহলে আজই তারা এক হয়ে পারবে কিন্তু! যদি না হয়? যদি নাসির না বলে দেয়? আদিয়ান ভাবতে লাগলো, এ-কদিন নাসির যে ব্যবহার করেছে তার সাথে তা দেখে মনে হয় না সে মানা করবে। বারণ না করার সম্ভবনা নাই বললে চলে।

নাসির গোসল সেরে বের হয়ে ঘরে ঢুকল। আদিয়ান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নাসিরের শরীরের দিকে এক বার চোখ বুলিয়ে নিলো। কাপড়ে ঢেকে থাকা শরীর আর উলঙ্গ শরীর এ ঢের পার্থক্য। আকাশ-পাতাল পার্থক্য। উলঙ্গ শরীরের রেখা আবেদনময়ী। শরীর শিহরণ জাগানোর ক্ষমতা রাখে। নাসির অবশ্য পুরো নগ্ন নয়, কোমরে পাতলা গামছা জড়িয়ে রেখেছে। আদিয়ান চোখ নামিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। তার বুকের ধক ধক শব্দ বাড়ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে নাসির সব কাজ শেষ করে লাইট বন্ধ করে ডিম লাইট জ্বালিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। ঠিক আদিয়ানের পাশে। কিন্তু, এক হাত জায়গা রেখে। আদিয়ান চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে বলল, তুমি কি আগের মতো আমাকে পছন্দ করো নাসির?

নাসির কাশতে শুরু করলো। আদিয়ানের মেজাজ একটু খারাপ হল। সে কি প্রশ্নটা এড়ানোর জন্য কাশছে?

আদিয়ান আবার জিগ্যেস করল, তুমি কি আমাকে পছন্দ করো?

নাসির ম্লানকণ্ঠে বলল, হুম।

আদিয়ান বলল, স্পষ্ট করে জবাব দাও।

নাসির তার হাত দিয়ে আদিয়ানকে তার পাশে টেনে নিয়ে আসলো। আদিয়ান মুখ ঘুরিয়ে বলল, সত্যি পছন্দ করো?

নাসির বলল, হু।

ডিম লাইটের আলোয় নাসিরের চেহারা স্পষ্ট না দেখা গেলেও আবছা দেখা যাচ্ছে। আদিয়ান মুচকি হেসে নাসিরের গালে হালকা চুমু খেলো। নাসির ধীরে আদিয়ানের মুখটা নিজের মুখ থেকে দূরে সরিয়ে দিলো। আদিয়ান বেশ অবাক হল। কিছু বলবার আগেই নাসির বলল, তুমি কি আমাকে পছন্দ করা শুরু করেছো?

আদিয়ান চোখ বড় বড় করে নাসিরের কাঁধে হাত রেখে বলল, হ্যাঁ। ভয়ংকর ভাবে।

নাসির হো হো করে হেসে উঠলো। নাসিরকে হাসতে দেখে আদিয়ানও মিটিমিটি হাসতে লাগলো। নাসির হঠাৎ হাসি থামিয়ে বলল, এখন কি হবে?

আদিয়ান তার হাত নাসিরের গালের উপর রেখে বলল, আমি কি তোমাকে চুমু খেতে পারি?

নাসির ভুরূ কুঁচকে ফেলল। সে হাত সরিয়ে বলল, উহু। নাহ। সম্ভব না।

আদিয়ান অবাকস্বরে বলল, কেন?

নাসির শান্ত গলায় বলল, আমার বয়ফ্রেন্ড আছে।

আদিয়ান নাসিরের কাছ থেকে দূরে সরে গেলো। নাসির মুখ শক্ত করে আদিয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে। আদিয়ান ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলছে। নাসির মাথাটা বাঁকা করে বলল, কি আজব খেলা তাই না? যখন তোমার প্রেমে আমি ডূবে গিয়েছিলাম তখন কোন পাত্তাই দাওনি তুমি। আর এখন দেখো?

আদিয়ান মাথা ঘুরিয়ে শুয়ে পড়লো। তার খুব কান্না পাচ্ছে। আচ্ছা, মানুষের জীবন এমন জটিল কেন। নাসির আদিয়ানকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে আসলো। আদিয়ান নাসিরের দিকে ঘুরে তার বুকে কাঁদতে শুরু করলো। নাসির শক্তভাবে জড়িয়ে থাকলো তাকে। এই প্রথম বুকে ধরা এবং এই শেষ।

বৃষ্টির বেগ বাড়ছে। কিছুক্ষণ পর ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামতে পারে। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি অনেকক্ষণ ধরেই পড়ছে। এর কি শেষ নেই? আদিয়ান হাঁটা শুরু করলো। হাঁটার গতি ধীরে ধীরে বাড়ছে। নাসিরের কথা মনে করতেই তার দুচোখ ভিজে উঠেছে। সেই শেষ আলিঙ্গন তারপর তো আর দেখা হল না। নাসির ইচ্ছা করেই সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলেছে। বেশ করেছে। ভালো করেছে। তা না হলে… তা না হলে, নিজেকে সামলাতে পারতো না আদিয়ান। কি আজব লীলা! যে ছেলেকে খুব বাজেভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে আজ সেই ছেলেকে ভুলতে পারছে না। ভালোবাসার সমীকরণ এতোই জটিল হয়? না প্রেমশাস্ত্রের কোন সূত্রের অন্তর্ভুক্ত? কতো নম্বর সূত্র? আর কি কি সূত্র আছে?

জারিফকে আদিয়ান পছন্দ করে না কিন্তু জারিফ তাকে খুব পছন্দ করে সেটা সে বুঝেছে। আদিয়ান চেষ্টা করছে তার প্রতি পছন্দ তৈরি করতে। প্রেমশাস্ত্রের সূত্র অনুযায়ী এই ছেলেকে প্রত্যাখ্যান করে পরবর্তীতে প্রেমে পড়ে যায়? তখন কি হবে? আচ্ছা, প্রেমশাস্ত্রের একই সূত্র সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়? না আদিয়ান জোর করেই এটাকে সূত্র হিসেবে দাবি করছে। পরিস্থিতি ভিন্ন, পাত্র ভিন্ন। সে কি পরবর্তীতে জারিফের প্রেমে কি পড়বে? আদিয়ান হাসতে লাগলো। তার কাছে পুরো ব্যাপারটা বোকামি লাগছে। নিজের তৈরি করা নিজস্ব প্রেমশাস্ত্র, তার আবার সূত্র!

আদিয়ান থমকে দাঁড়ালো। জারিফকে রুক্ষভাবে কিছু না বললেই হতো। মনে মনে ঠিক করলো জারিফের সাথে সবকিছু ঠিকঠাক করে সম্পর্ক সুন্দর রাখবে। হাত থেকে যেতে যাওয়া যাবে না। যদি নাসিরের মতো ঘটনা ঘটে? আদিয়ান হাঁটা আরম্ভ করলো। পিছলা ফুটপাথের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে একটু কষ্ট হচ্ছে। হঠাৎ পিছলে পড়ে গেলো আদিয়ান। তার ছাতা ছিটকে লেকের দিকে গড়াতে গড়াতে পড়ে গেলো। বাতাসে উপর উঠছে আর নামছে। আদিয়ান ফিক করে হেসে দিলো। তার প্যান্ট ভিজে একাকার। বৃষ্টি পড়ছে ধীর বেগে। জোরে জোরে হাসতে লাগলো আদিয়ান। কি আজব তার জীবন!

হাসি থামিয়ে বিড়বিড় করে বলল, যাই বাসায় যাই!

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.