যেতে নাহি দিবো

পুরো বাড়িতে আলো নিভানো ।নিকষ কালো অন্ধকার। একটি ঘরে হলুদ আলো টিম টিম করে জ্বলছে। একটি শর্টস আর টিশার্ট পরে বিছানায় শুয়ে আছে রাইদ। বার বার ফোন দিচ্ছে। কিন্তু মোবাইল ফোন অফ। প্রচণ্ড বিরক্তি আর রাগ উঠছে রাইদের। ইচ্ছে করছে হাতের কাছে যা কিছু আছে ভেঙ্গে চুরমার করে দিতে। সেই সাথে বুকে তীব্র কষ্ট অনুভব করছে সে। এই গালিব কেই কি সে ভালবেসেছে। এই নতুন গালিব কে তো সে চিনে না।
ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজছে পাশের গির্জায়। ১ টা বাজে। দেখতে দেখতে ১.৩০ টা বাজলো। নাহ এইবার উঠতে হবে। গালিব কে টেনে নিয়ে আসবে সে।
কিন্তু তার আগেই কলিং-বেল বাজলো ।কে কে?
কেউ সারা দিলো না। দরজা খুললও কেউ নাই। হটাত করে হালুম বলে গালিব চমকে দিলো রাইদ কে।
অন্য সময় হলে রাইদ প্রচণ্ড মজা পেতো। কিন্তু আজ পেলো না। বরং মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেলো।গালিব বুঝলো দেরি করে আসার কারণে রাইদ রাগ করেছে।
-সরি দেরি হয়ে গেলো । আজ তো জানোই কমিউনিটির সবচেয়ে বড় পার্টি।তোমাকে তো ইনভাইট করা হয়েছে। তুমি গেলে না কেন?
-তুমি জানো আমি এই সব প্রোগ্রামে যাই না।আমার ইচ্ছা হয় না।আর ছেলে রা মেয়ে সেজে ধেই ধেই করে নাচে সেটা আমার অসহ্য লাগে। যেটা তুমি রেগুলার করছও। আগে ছোট প্রাইভেট পার্টি তে করতা। এখন ওপেন পার্টি তে পর্যন্ত। এখন আমার ফ্রেন্ডরা বলবে তোর বিএফ তো কতি সমাজের শিরোমণি। আর বার গুলোতেও নাচার চেষ্টা করতে পারো। গুড ফর ইউ । টাকা কিছু ইনকাম করতে পারবা।
-ছিঃ। তোমাকে আমি মুক্ত মনা ভেবেছিলাম। আর তুমি আমাকে বার ড্যান্সর বললে?ক্রস ড্রেসিং করা একটা ফান। সবাই এটাকে ইজি ভাবে নেয়। শুধু তুমি পারো না সহ্য করতে।
-কিন্তু তুমি আমার জন্য সেক্রিফাইস করতে পারো না? প্লিজ এসব ছেড়ে দাও। আমার প্রচণ্ড কষ্ট হয় তোমাকে নিয়ে যখন মানুষ গসিপ করে আর হাসে।
-তুমি তো জেনে শুনেই রিলেশন করেছো। এখন এই কথা কেন ?
-আমি ভেবেছিলাম তুমি আমার সাথে রিলেশনের পর এগুলা ছেড়ে দিবে। কিন্তু এখন তো দেখছি উল্টা আরও বেশি করে করছো।প্রাইভেট পার্টি তে করো সেটা আলাদা কথা। ফ্রেন্ড দের মাঝখানে করা যায়। কিন্তু ওপেন পার্টি তে তো সবাই দেখে। কেন বোঝো না।
-আমার পক্ষে নাচ ছাড়া সম্ভব নয়।এটা আমার ধ্যান জ্ঞান প্যাশন। আর ওপেন পার্টিতে আলাদা মজা। ফ্রেন্ড রা সবাই মিলে নাচি সে এক আলাদা অনুভূতি। তুমি বুঝবে না।
-তার মানে তুমি আমার কথা শুনবে না?
-না। আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। এখানে তোমার প্রবেশের অনুমতি নেই।
-ওকে ফাইন তুমিও দেখ আমি কি করতে পারি।

আজকাল অনেক রাত করে ফিরে রাইদ। মুখে এলকোহলের গন্ধ।গালিব ভয় পায় ওর দৃষ্টি দেখে।লাল চোখ।কিন্তু কি করবে বুঝতে পারছে না। কিছু বললেই রাইদ বলে
-তোমার জীবন তোমার কাছে। আমারটা আমার কাছে।আমি তোমার লাইফে ইন্টার-ফেয়ার করবো না। তুমিও আমার লাইফে ইন্টার-ফেয়ার করবা না
আজকাল ড্রিঙ্কের সাথে সাথে রাইদের টাকা দিয়ে কার্ড খেলতে যাওয়ার অভ্যাস হয়েছে। আর কোথায় কোথায় যায় কে জানে?
এসব দেখে গালিবের অনেক জিদ হল । তাকে শিক্ষা দেয়ার জন্য রাইদ এমন করছে।
মনে মনে বললো আমিও ছাড়বো না।

এখন সব পার্টি তেই গালিব । ওর নাচ ছাড়া প্রোগ্রাম শুরুই হয় না।কখনো শাড়ি , কখনো লেহেঙ্গা আবার কখনো কখনো স্কারট।
একজন ফরেনার একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম করবে বাংলাদেশের সমকামী দের উপর। সেখানে নাচের দৃশ্য থাকবে।সে গালিব কে নিতে চায়।
গালিব তো প্রচণ্ড উৎসাহী হয়ে পড়লো । কিন্তু রাইদ কে না বলে?রাইদ কে বললে সে কক্ষনো করতে দিবে না। তাছাড়া রাইদের সাথে এই সম্পর্ক মনে হয় টিকবে না। এই সুযোগ আর পাওয়া যাবে না। সে সাইন করে দিয়ে আসলো কন্ট্রাক্ট পেপারে।

আজ কার্ড খেলায় জিতে অনেক টাকা পেলো রাইদ। ভাবলও আর খেলবো না। অনেক তো হল। কিন্তু গালিবের কথা মনে পরার পর ভাবলও এইবার সম্পর্ক ঠিক করতে হবে। অনেক হল। গালিব সব কিছু বুঝিয়ে বলবে। এইবার নিশ্চয় গালিব বুঝবে। একটু কম্প্রোমাইজ করবে।

বাড়ি গিয়ে দেখলও গালিব গম্ভীর মুখে বসে আছে।
কি হল?
কিছু না।
তোমার জন্য একটা গিফট এনেছি?
গিফটটা খুললও অসম্ভব সুন্দর জাহাজের মডেল ।
গালিবের মুখ হাসি তে ভরে উঠলো।
ওরে আমার জান পাখি। এই কথা বলে কিস করলো রাইদ কে
আজকে তো দেখি ড্রিঙ্ক কর নাই
শুনো আমি ড্রিঙ্ক করা ছেড়ে দিব। আর কার্ড খেলাউ।চল আজকে বাইরে কোথাও খেয়ে আসি। ক্যান্ডল লাইট ডিনার।
এসব শুনে গালিবের মুখ অন্ধকার হয়ে গেলো।রাইদ তার জন্য সব ছেড়ে দিচ্ছে। অথচ সে ডকুমেন্টারি তে নাম লিখিয়ে এসেছে। এত সুন্দর একটি মুহূর্তে এই কথা সে কিভাবে বলবে ভাবছে গালিব।এই কথা বললে পুরো পরিবেশটাই নষ্ট হয়ে যাবে।
কিন্তু বলতেই হবে
বললো । শুনে রাইদ তেমন রিয়াকশন দেখালো না। শুধু বলল তাহলে আমিও ড্রিংক ছাড়তে পারবো না।তারপর ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লো।
গালিব সারা রাত ব্যাল্কনিতে বসে থাকলো। কি করবে সে বুঝতে পারছে না। কান্না আসছে। নাচ ছাড়া তার জন্য অসম্ভব। আর রাইদ কে ছাড়াও অসম্ভব। কিন্তু রাইদের মত ভালবাসা কেউ তাকে দিবে না।এরপর কাঁদল অনেকক্ষণ। সুইসাইড করতে মন চায় কিন্তু সেটা তো মহা পাপ।
শেষ রাতের দিকে বিছানায় এসে শুইলও। পাশে শুয়ে আছে রাইদ।
হটাত রাইদ গালিব কে জড়িয়ে ধরলও । মুখে চুমো দিতে লাগলো। আর বলছে আমাকে ছেড়ে চলে যাসনে।গালিবও উত্তেজনায় রাইদকে জড়িয়ে ধরল। এরপর………।ভোর হওয়া পর্যন্ত তাদের ভালবাসা চললো
সকালে উঠে তারা আবার আগের মতই । রাতের ঘটনার কথা যেন মনেই করতে পারছে না।ছুটির দিন দুইজনই বাড়িতে।
-রাইদ শুনো তোমার সাথে কথা আছে।
-আমারও আছে। মনে হয় আমরা ২ জন এক ই কথা বলতে চাইছি
-তুমি বল
-আমাদের সম্পর্ক মনে হয় আর কাজ করছে না বেটার আমরা আলাদা হয়ে যাই।
-ওকে
-এখন তো মাস মাত্র শুরু হল। বাসা ছাড়া যাবে না। আগামী মাস থেকে আলাদা হয়ে যাবো ।


সেইদিন রাতের বেলায় ২জনই একই সময় বাড়ি ফিরলো। কিন্তু কেউই চাবি নিয়ে আসে নাই।ভুলে গিয়েছে।অফিসে রেখে এসেছে। দরজা লক করা। এত রাতে চাবিওয়ালা পাওয়া যাবে না। তাদের বাসাটা এমন যায়গায় যে আশপাশে তেমন বাড়ি নাই। আর আত্মীয়, বন্ধু বান্ধব এদিকে কেউ থাকে না।কি করবে। সারা রাত রাস্তা তে কাটাতে হবে। কেউই কারো দিকে তাকাচ্ছে না। ২ জনই হাঁটছে রাস্তা ধরে কিন্তু অনেক দূরত্ব রেখে।একটু আগেই বৃষ্টি হয়েছে। ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা হাওয়া
রাস্তার ধারে একটি ভাতের হোটেল খোলা। ২ জনের খিদে পেয়েছে। রাইদ ঢুকলও হোটেল । বাইরে বেশ কিছু দূরে দাড়িয়ে আছে গালিব। ভিতর থেকে রাইদ চিৎকার করে ডাক দিলো গালিব কে। গালিব হোটেলে ঢুকে রাইদের সামনের টেবিলে বসলো। রাইদ আগেই খাবারের অর্ডার দিয়ে রেখেছিল। গরম গরম খিচুরি আর ডিম ভুনা আসলো। গালিবের প্রিয় খাবার। বৃষ্টি হলেই খেতে চায়। কিন্তু রাইদ একদম পছন্দ করে না। কত যে খুনসুটি হয়েছে এটা নিয়ে। গালিব অবাক চোখে তাকিয়ে ভাবছে কি হল ব্যাপারটা । রাইদ বললো
এরপর তো তোমাকে খিচুরি খাওয়াতে পারবো না। তাই আজকে শেষ বারের মত খাইয়ে দিলাম। ইচ্ছে করছে হাত দিয়ে খাইয়ে দিতে। কিন্তু তা তো সম্ভব নয়।
গালিব কিছুই বলল না। কি বা বলার আছে?
খেয়ে বের হতেই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলও । গালিব দৌড়ে বাস স্টপেজের সামনে একটা ছাউনি আছে। সেখানে দাঁড়ালো।
রাইদ বৃষ্টি তে ভিজছে।বৃষ্টি রাইদের অনেক প্রিয়।যখন বৃষ্টি পড়ে বৃষ্টিস্নান করার জন্য সে আকুল হয়ে যায়।বাড়ির ছাদ টা গালিব আর রাইদের খুব প্রিয়। রাতে কেউ যায় না ছাদে। যখন গরম পড়ে তখন দুই জনে ছাদের বিছানা করে শুয়ে আকাশ দেখে।তারা গুনে। মাঝে মাঝে গিটার নিয়ে গান ধরে রাইদ। আর গালিব অপলক দৃষ্টিতে গান শুনে।
রাইদের বৃষ্টি তে ভিজতে দেখে গালিবের পুরনো স্মৃতি মনে পরে গেলো। গালিবের বৃষ্টির প্রতি এত আকুলতা নাই। আবার ভিজতে খারাপও লাগে না। রাইদ এসে সবসময় হাত ধরে টেনে নিয়ে যেত বৃষ্টি স্নান করার জন্য’
গালিবের খুব ইচ্ছা করছে বৃষ্টি তে ভেজার জন্য। কিন্তু ইগো তে লাগছে। ঈশ আজ যদি রাইদ তার হাত ধরে নিয়ে যেত। কিন্তু কেনইবা নিবে? তাদের সম্পর্ক তো শেষ
হটাত রাইদ একসময় এসে গালিবের দিকে হাত বাড়িয়ে বললও
-শেষ বারের মত বৃষ্টি স্নান হবে নাকি? এর পর আমি কই চলে যাবো ।আমাকে আর খুঁজে পাবে না।
গালিব এর চোখে পানি। মুখ টা অন্য দিকে ঘুরিয়ে চোখ মুছলও। উঠে আসলো হাত ধরাধরি করে নির্জন রাস্তার মাঝখানে । দুটি ছেলে পরম মমতায় হাত ধরে বৃষ্টিতে ভিজছে। কোন স্ট্রেট ব্যক্তিও বলবে যে এটা কোন সিনেমার দৃশ্য । এত ভাল লাগছে কেন?
বৃষ্টি থামলও । ভিজা কাপড় এ ঠাণ্ডায় কাঁপছে ২ জনই
রাইদ বললো
-চা খেতে পারলে ভাল হত।
-কই পাবে এখন চা।এত রাতে।
-চল একটু খুঁজে দেখি।
খুঁজতে খুঁজতে দেখলও একটি বন্ধ চায়ের দোকান। পাশে বসে এক জন বয়স্ক মানুষ দোতারায় গান গাইছেন।
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি ক্যামনে আসে যায়
মুগ্ধ হয়ে গান শুনলও তারা। গান শেষ বয়স্ক মানুষটি তাকালেন তার দিকে।
বাবা রা কিছু বলবা ?
চাচা এদিকে চা কোথায় পাওয়া যাবে।
আরে এটা তো আমার চায়ের দোকান পাশের দোকান টি দেখিয়ে বললও।
চাচার দোকানে চা পান করতে করতে তে গালিব ভাবছে চাচার গাওয়া গানটির কথা। মানুষের জীবন কত ছোট । এর মাঝেই আমরা কতো ঝগড়া বিবাদ করি।
চা শেষে রাইদ একটু দূরে দাড়িয়ে সিগারেট ধরালো। গালিব দেখতে পেলো দূর থেকেই। দেখেই তার মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। কতবার না করেছি সিগারেট খেতে।ইচ্ছে করছে দৌড়ে যেয়ে সিগারেট টা মুখ থেকে ফেলে দেই। আগে এমন করেছেও। কিন্তু পরক্ষণে মনে হল এখন তো সম্পর্কই নেই। সিগারেট খাওয়া তো ওর ব্যক্তিগত ব্যাপার।আমি কেন ভাবছি…
এদিকে রাইদ দেখলও গালিব দেখতে পেরেছে যে সে সিগারেট খাচ্ছে। সে সিগারেট টা ফেলে দিল। কিন্তু তারপর পর মনে হল ফেললাম কেন। এখন তো গালিব তাকে কিছু বলবে না। কারন তারা এখন আলাদা হয়ে গিয়েছে। আসলে এগুলো অভ্যাস। ভালবাসা থেকেই অভ্যাস গুলো তৈরি হয়েছে।
এরপর আবার তারা উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরতে লাগলো। ভোর হতে অনেক দেরি। জায়গা তা ঢাকা শহর থেকে ১০ মাইল দূরে। তাই পুকুর আছে। গাছ আছে। জঙ্গল আছে। সবুজের ছড়াছড়ি।গালিব পুকুর ঘাটে যেয়ে বসলো । পাশে এসে বসলো রাইদ। কিভাবে জানি ২ জন খুব কাছাকাছি চলে এলো । সাধারণত মাঝে মাঝেই গালিব রাইদের কাঁধে মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে পরে। আজকেও তা হলও। রাইদ উঠিয়ে দিলো না । তার খুব কষ্ট হয়েছে কয়েক দিন পর এই ছেলেটার সাথে আর কোন সম্পর্ক থাকবে না। আর কখনো ঘাড়ে মাথা দিয়ে ঘুমবে না। ঝগড়া করবে না। বৃষ্টি তে ভিজবে না। গলায় কান্না দলা বেধে আসছে।
১০ মিনিট পরেই গালিবের ঘুম ভেঙ্গে গেলও । এইভাবে তো বেশিক্ষণ ঘুমানো যায় না।ঘুম ভেঙ্গে উঠার পর গালিবের লজ্জা আর রাগে ২ টাই লাগছে। নিজের উপর রাগ।রাইদ কে বলল
সরি ঘুমিয়ে পরেছিলাম…
কথাটা শুনে রাইদ এর কষ্ট হলও । এখুনি তাদের মাঝে ফরমালিটিস চলে আসছে। এখনো সকাল হতে অনেক দেড়ি ।ঘাট থেকে উঠে তারা রাস্তা ধরে হাঁটছে । হটাত একটি পাথরের সাথে ধাক্কা খেয়ে রাইদ পড়ে গেলো রাস্তার উপর। গালিব দৌড়ে আসলো । হাল্কা ব্যথা পেয়েছে রাইদ। এদিকে গালিব রাইদের পায়ের ক্ষত না দেখে ছাড়বে বড় কোন ক্ষত হলও নাকি।
-তুমি দেখে চলতে পারো না? কত বড় একটা ক্ষত হয়েছে দেখ?
-আরে কি মুশকিল কোথায় বড় ক্ষত হলও । সামান্য রক্ত বের হয়েছে।
-তোমার এটি-এস দেয়া লাগবে। কিন্তু এতো রাতে ওষুধের দোকান কোথায় পাই?
-আরে গত মাসে এটি-এস আমি দিয়েছি। আর তুমি এত ব্যস্ত হইয়ো না। আর দু দিন পর তো তুমি আমার সাথেই থাকবা না।
কথাটা শুনে গালিবের খুব খারাপ লাগছে। সত্যি তো দেখা হবে না। এটাই কি সে চেয়েছিল?নাচের চেয়ে কি রাইদের ভালবাসা ছোট ? কিন্তু তা কি করে হয়?মন টা ভার হয়ে আছে।
ভোর হয়ে আসছে। পূর্ব আকাশে লাল আভা দেখা যাচ্ছে । আজানের সুমধুর ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। চারিপাশে ভরের টাটকা বাতাস। পাখিদের কলতান। সব কিছু পবিত্র লাগছে। কত দিন এমন ভোর দেখে নাই তারা।এত সুন্দর দৃশ্য আসলে একা দেখতেও ভাল লাগে না। কিন্তু আজকের পর তো তাদের কে একাই দেখতে হবে।
১০ টার আগে কোন চাবিওালা পাওয়া যাবে না। এত সময় তারা কি করবে?
গালিব লজ্জা লজ্জা কণ্ঠে একটি প্রস্তাব দিলো।
-চল রিকশায় ঘুরি
ঘণ্টা ধরে একটি রিকশা ভাড়া করলো গালিব। গান শুরু করলো রাইদ
আমারও পরানও যাহা চায় ………..
……………………………………
তুমি সুখ যদি না পাও.
যাও সুখেরও সন্ধানে যাও……
গানটি শুনে গালিবের কষ্ট লাগছে খুব। সত্যি কি আমি সুখের সন্ধানে পেয়েছি। আজ যাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি তার মর্ম কি সত্যি বুঝতে পারছি?
রিকশায় ঘুরা শেষ একটি রেস্টুরেন্টে বসলো । রাইদের হাত টা টেবিলের উপর। গালিব তার হাত ২ টা রাইদের হাতে রাখলও ।
চমকে উঠলো রাইদ।
-আমরা কি আমাদের রিলেশন নিয়ে আবার চিন্তা করতে পারি না?
-কি চিন্তা করবো ?
-আসো একটা সমঝোতায় ।আমি শুধু প্রাইভেট পার্টি তে নাচবো।আস্তে আস্তে নাচো বন্ধ করবো কিন্তু সময় লাগবে। আর তুমি ড্রিঙ্ক করা বাদ আর দিনে ৫ টার বেশি সিগারেট খেতে পারবা না।
এই কথা টা শুনে রাইদের মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেলো ।
-আমি রাজি । কিন্তু হটাত ?
-কালকের সারা রাত টা আমার সবচেয়ে স্মরণীয় রাত। আমি বুঝেছি তুমি আমাকে কত ভালোবাসো। আমি তোমাকে হারাতে পারবো না।তোমার ভালবাসা অমূল্য । তা আমি হারাতে পারবও না।
-কিন্তু কাল রাতে আমি কি করলাম?
-খিচুরি খাওয়ালে । বৃষ্টি স্নান করলাম এক সাথে, তারপর চাচার গান। এই গানের কথা গুলো আমার অন্তরে গেঁথে গিয়েছে। আসলেই জীবনটা তো ছোট । এতো ছোট জীবনে আমরা কেন ঝগড়া বিবাদ করবো। মানুষের জীবনের এর থেকে কত কত বড় বড় ঘটনা ঘটে।তাতেও সম্পর্ক টিকে থাকে। আর আমরা কত তুচ্ছ কারণে একসাথে থাকতে পারি না। তারপর তোমার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমানো। তুমি যে ভালবাসায় আমাকে ঘুম থেকে তুলে দাও নাই। এটা আমি কোথায় পাবো ?আর সবার শেষে তোমার গান। অন্তর থেকে গাইছিলে তুমি। তোমার চোখে পানি দেখেছি। আমি জানি তুমি আমাকে উদ্দেশ্য করে গান টা গাইছিলে। তুমি এত শক্ত একজন মানুষ । সেই মানুষ টি কাঁদছে । আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। তুমি দেখো নাই। আমিও কেঁদেছি। তুমি আমার জন্য কেঁদেছ আমি কিভাবে তোমাকে ছেড়ে যাই বল? আমি জনম জনম তোমার সাথে থাকতে চাই।
রাইদের চোখে আবার পানি টলমল করছে
তুমি আবার আমাকে ছেড়ে চলে যাবে না তো ?আমি আমার কষ্ট কমানোর জন্য বৃষ্টি তে ভিজেছি। গান করেছি। কিন্তু কমে নাই।
আর এখন?
বুকের উপর যে পাথর ছিল তা সরে গিয়েছে।
চল চাবিওালা খুঁজে নিয়ে আসি
দরকার নাই
কেন?
আজ বাসায় যাব না। ট্রেনে করে অজানা গন্তব্যে যাব। কোন গ্রামে । প্রকৃতি দেখবো , নদীতে নৌকা চালাবো ।কোন গৃহস্থ বাড়িতে খাবো আবার ফিরে আসব পরবর্তী ট্রেনে।চল না।
চল হারিয়ে যাই অজানা গন্তব্যে।
একটু সমঝোতা , একটু সেক্রিফাইস,একটু দায়িত্ব এভাবেই না একটা সম্পর্ক গড়ে উঠে।

লেখকঃ অরণ্য রাত্রি

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.