আমি আকাশ হলাম,একা মেঘের সাথে

১।
বেলকনিতে দাড়িয়ে হিমুর গায়ে-হলুদ অনুষ্ঠান দেখছি আমি।পরিষ্কার দেখতে পারছি।চশমা ছেড়ে চোখে লেন্স লাগিয়েছি।এ বাড়ির বিশাল জায়গা জুড়ে বাগান,ফ্রন্ট ইয়ার্ড,সুইমিং পুল।ফ্রন্ট ইয়ার্ড সবুজ ঘাসে পরিপূর্ণ।সবুজ ঘাসের দেহের উপর পিঁড়িতে দাড়িয়ে আছে হিমু।গলায় সোনার চেইন সোনালী রোদে চিকচিক করছে।সারা গায়ে-মুখে কাঁচা হলুদ মাখা,গায়ে ধবধবে সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি,পিছন থেকে সুগঠিত শরীরের প্রশস্ত বুকে নতুন গামছা এসে পড়েছে।চুলগুলো হালকা হাওয়ায় উড়ছে।মনে হলো পৃথিবীর সকল সৌন্দর্য্য সৃষ্টিকর্তা আজ তাকে দিয়েছে।কি অদ্ভুত মায়া দুটি চোখে।
আজ পহেলা ফাল্গুন।বসন্তের প্রথম দিন।
আজ হিমুর গায়ে হলুদ।
কাল দোসরা ফাল্গুন।বিশ্ব ভালোবাসা দিবস।
কাল হিমুর বিয়ে।
ভালোবাসা দিবসে যখন পৃথিবীর সকল যুগল এক হবে,আমরা তখন ছেড়াদ্বীপের মত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবো।এ কেমন নিয়ম বিধাতার।হিমু আড়চোখে আমার দিকে তাকালো।আমি চোখ নামিয়ে নিলাম।বিয়েতে হিমুর রাজী হওয়ার একমাত্র শর্ত আমি একফোঁটা চোখের পানি ফেলতে পারবো না।এখন যদি সে দেখে আমি উপরে দাড়িয়ে তাকে দেখে কাঁদছি,তবে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।আমি কাঁদছি আমার হিমুর রুপ দেখে।আজ ওকে এত সুন্দর লাগছে কেন?
সারা বাড়ি মানুষের আনাগোনা।নিচ থেকে মামনি ডাক দিল।আমি ধীর পায়ে হেটে যেতে লাগলাম।রুপা আপু আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে হিমুর সামনে দাড় করালো।
-দেখো মুন!আমার ভাইটাকে কি মিষ্টি লাগছে!
আমি হিমুর চোখে চোখ স্থির রেখে বললাম,”আপু!তোমার ভাইটা তো এমনিতেই খুব সুন্দর।”
মামনি আমার কাধে হাত রেখে বলল,”তুই আমার ছেলেটাকে হলুদ মাখবি না?”
আমি শুকনো একটা হাসি দিয়ে বললাম,”কেন মাখবো না মামনি?অবশ্যই মাখবো।”
রুপা আপুর হাত থেকে একটু হলুদ নিয়ে আমি আমার ভালোবাসার মানুষটির গালে ছোঁয়ালাম।হিমুর চোখ টলমল করছে।আমারও নিজেকে সামলাতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে।কিন্তু ওর সামনে থেকে কেন জানি যেতে ইচ্ছা করছে না।চোখটা আলতো করে বন্ধ করলাম।হিমু তার হলুদ মাখা গাল থেকে হলুদ এনে আমার গালে লাগিয়ে দিল।আমার শরীর শিহরিত হলো।একজন অপরিচিতা মহিলা বলল,”বন্ধু যদি হলুদ ছোঁয়াতে এত সময় নেয়!আমরা কখন ছোঁয়াবো।”
হিমুর কান্ডে আমার লজ্জা করতে লাগলো।যদিও এত মানুষের মাঝে কেউ কিছু মনে করে নি।কারন তারা তো আর জানে না হিমুর সাথে গত সাত বছর আমার কি সম্পর্ক ছিলো।
রুপা আপু হেসে বলল,”থাক হয়েছে।বন্ধুর গালে আর মাখিস না হিমু।শেষে আরেকটা মেয়ে কই পাবো।”
কথাটা বিদ্রুপের সুরে আমার কানে বাজল।রুপা আপু জেনেশুনে আমার সামনেই এসব কথা বলছে।মামনি এগিয়ে এসে বলল,”মুন!তুই রুমে যা বাবা আমি আসছি।কিছু কথা আছে।”
“আচ্ছা!”বলে আমি রুমের দিকে পা বাড়ালাম।
নিজেকে আয়নায় দেখতে লাগলাম।আমার বাম গালে হলুদ মাখা।চোখ বুজে অনুভব করতে লাগলাম।যেন মনে হলো হিমুর নরম রাঙা ঠোঁট আমার বাম গাল ছুঁয়ে গেল।
“কি’রে আয়নার সামনে দাড়িয়ে কি দেখিস?”বলতে বলতে মামনি বিছানায় বসল।আমি টিস্যু দিয়ে গালটা মুছে বিছানার অন্য পাশে বসলাম।
হিমুর বিয়ের জন্য ওকে নিয়ে এত তাড়াতাড়ি লন্ডন থেকে দেশে ফেরা।এক মাসের ছুটিতে অলরেডি পনেরদিন পার হয়ে গেছে।অফিসের কত কাজ বাকি পড়ে।বেডসাইড টেবিল থেকে ল্যাপটপ নিয়ে কোলের উপর ওপেন করলাম।মামনি খুব মনোযোগ দিয়ে আমাকে দেখছে।
মামনি ভেজা গলায় ডাকল,”মুন!”
আমি “হুমম” বলে তাকালাম!চোখ নামিয়ে আবার ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললাম,”ওভাবে তাকিয়ে কি দেখো মামনি?কিছু কি বলবে?”
-নিজের সংসার আর বংশরক্ষার দোহাই দিয়ে তোকে খুব কষ্ট দিচ্ছি,তাই না?
আমি ল্যাপটপ বিছানার একপাশে রেখে এগিয়ে এসে মেঝেতে বসে মামনির একটা হাত নিজের দু’হাতের মাঝে নিয়ে বললাম,
-মামনি!তুমি না সব সময় বলো আমি তোমার আরেকটা ছেলে।একজন মা কি কখনো ছেলেকে কষ্ট দিতে পারে?
মামনি অপর হাতটা আমার ডান গালে আলতো করে ছোঁয়ালো।আমি তার হাতটা কাধ আর গাল দ্বারা হালকা চেপে ধরলাম।যাতে এই মহিষী নারীর আদরের পরিমানটা অনুভব করতে পারি।কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রাখলাম।কষ্ট খুব বেশি হলে আমি চোখ বন্ধ করে চোখের সামনে এক আকাশ সমান অন্ধকার অনুভব করি।কিন্তু সেই অন্ধকারের মাঝে আমি যেন সাতরঙা আকাশ দেখতাম।কিন্তু আজ দেখলাম বাস্তবিক অাঁধার কালো আকাশ।
মামনি বলল,”বিশ্বাস কর বাবা!আমি কখনো চাই নি আমার হিমুনের অস্তিত্ব নষ্ট করতে!”
চোখ খুলে মামনির হাটুতে মাথা রেখে বললাম,”পাপ-পূণ্য,সমাজ,ধর্ম বিবেচনা না করে তুমি গত সাতটা বছর তোমার ছেলের সাথে আমাকে সংসার করতে দিয়েছো!সেটা ক’জন মা পারে?”
-বাবা!তুই দেশে থাক না?আমি না হয় তোর সাথে থাকবো!
-না মামনি তা হয় না!আমি নিজের স্বার্থে তোমাকে তোমার পরিবার থেকে আলাদা করতে পারবো না।
-কিন্তু সেই দূরপ্রবাসে তুই আপনজন ছাড়া থাকবি কিভাবে?
আমি মামনির হাটু থেকে মুখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে বললাম,”তুমি তো আছো!মাঝে মাঝে এই বুড়ো ছেলেটাকে দেখতে যেতে পারবে না?”
-ধুর পাগল!পারবো না কেন?ভার্সিটির চাকরিটা ছেড়ে দিছি।ছেলের বিয়ে দিচ্ছি,মেয়ে জামাই সুখে আছে।এখন তো আমি স্বাধীন।হাতে অফুরন্ত সময়।বাকি জীবন তো শুয়ে বসে কাটাতে হবে!তার থেকে কিছুটা সময় কি আমি তোকে দিতে পারবো না?
“মামনি!”আমি খুব কোমল কন্ঠে ডাক দিলাম তাকে।
তিনি এবার তার দু’হাতে আমার দু’গাল ধরে বললো,”কিছু বলবি বাবা?”
-জানো তো মামনি!আমার আগের চেহারাটা আমার খুব দেখতে ইচ্ছা করে।বাবা সব সময় বলতো তুই তোর মায়ের মত হয়েছিস।মাঝে মাঝে মা কে খুব দেখতে ইচ্ছা করে।
-যদিও তোর সাথে আমার নাড়ির সম্পর্ক নেই,তবুও শুধু একজন মা হিসাবে আমি তোকে কি কম ভালোবাসা দিয়েছি ?
-আমি তা বলি নি মামনি।তুমি ছিলে বলেই তো আমি বেঁচে আছি।
তারপর কিছুক্ষণ থেমে বললাম,”আমি ভুলে গেছি চেহারাটা।তোমার ছেলে তো সেই চেহারায় পাগল হয়ে আমাকে ভালোবেসেছিল!বলো?তোমার ছেলে কি বলতো জানো তো মামনি!”
-কি বলতো?
-বলতো,মুন,তোমার চোখ দুটো এত সুন্দর কেন?কেমন সুন্দর কৃষ্ণবর্ণ মনি।ঠিক ভ্রমর কালো।
মামনি আমার থুতনিতে হাত দিয়ে বলল,”তোর চোখ দুটো এখনো ভ্রমর কালো আছে।
আমি আনমনা হয়ে বললাম,
-সেই দুষ্টু মিষ্টি দিনগুলোতে যখন ভার্সিটিতে তোমার ছেলের সাথে ফ্লার্ট করতাম।কত রঙিন ছিলো দিনগুলো।আজ এত বছর পরে কত মিস করছি দিনগুলো।
-খুব কষ্ট হচ্ছে বাবা?
আমি আবার মামনির হাটু দুটোতে মাথাটা ঠেকিয়ে একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বললাম,”মামনি!সেদিন তুমি আমাকে কেন বাঁচালে বলো তো?”
পোড়াচোখ থেকে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
মামনি আমার চুলে তার নরম কোমল মাতৃসুলভ হাত বুলিয়ে বলল,”তোর আঙ্কেল আমাকে ডিভোর্স দেয় দিক!তুই হিমুকে নিয়ে আবার লন্ডন চলে যা!”
আমি মুখ তুলে মামনির ঠোঁট চেপে ধরলাম ডান হাত দিয়ে।
-কখনোই না।পৃথিবীতে আমার রক্তের কোন আপনজন নেই।আপন বলো পর বলো তুমিই সব।আমি কখনো চায় না আমার মামনি অসুখী হোক।
-আমার হিমুটাও যে বড্ড কষ্ট পাচ্ছে রে মুন।সমকামী বলে আমি কখনোই আমার সন্তানকে কুসন্তান ভাবিনি।আজ তার দম ফাটা কষ্টেও আমি কিছু করতে পারছি না।
মামনির চোখের কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়গড় করে গড়িয়ে পড়ল।বলল,
-তোরা দুটোই সমান জেদি।কষ্টে বুক ফেটে মারা যাবি অথচ মামনিকে কষ্ট পেতে দিবো না।
মেঝেতে হাটু গেড়ে আমি বসাইছিলাম।আমি হেসে মামনির পা জড়িয়ে ধরে বলল,”ক্ষমা করো জননী।কাল তোমার ছেলের বিয়ে!কোনকালে শুনেছো যে ছেলের বিয়েতে তার মা কাঁদে?”
মামনি আমার কান ধরে বলল,”খুব পাকামো হচ্ছে না!”
“আহ!ছাড়ো।লাগছে তো।”
-লাগুক।
মামনির হাতটা কান থেকে সরিয়ে আমার মাথায় দিয়ে বললাম,”তুমি দোয়া করো তো মামনি!তোমার এই পরছেলেটা যেন জীবনে সুখী হয়।শুনেছি মায়ের দোয়া বৃথা যায় না।”
মামনি আমাকে হালকা থাপ্পড় দিয়ে বলল,”ফাজিল!পরছেলে কি’রে!তাহলে আমি কি তোর পর’মা?”
আমি বললাম,”বালাই ষাট!কখনোই না!তুমি তো আমার সেরা মামনি!ওয়ানলি ওয়ান মাদার অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড।”
“কিন্তু মামনি!তুমি যদি এমন কাঁন্নাকাটি করো,তাহলে হিমুটা কি করবে বলো তো।”
মামনি চোখ মুছতে মুছতে বলল,”ওকে আর কাঁন্না নয়!তুই আমাকে কথা দে যে তুই আর মন খারাপ করে থাকবি না।”
মামনির হাতে হাত দিয়ে বললাম,”কথা দিলাম।হ্যাপি?”
মামনি আমার চুল মৃদু টান দিয়ে বলল,”আমি দোয়া করি আমার মুন যেন সকল কষ্টকে আপন করে বাঁচতে শেখে।”
আমি মামনির শুভ্র কোমল হাতে চুমু এঁকে দিলাম পরম মমতার ভরে।

২।
রাস্তা পারাপারে আমি বরাবরই অক্ষম।পৃথিবীতে এই একটা কাজই আমার দ্বারা অসম্ভব।মা ছিলো না বলে ছোটবেলা বাবা সাহায্য করত,তারপর বন্ধু-বান্ধব,অতঃপর বিশেষ কেউ একজন।
অনেকক্ষণ ধরে শাপলাচত্বরে দাড়িয়ে আছি।অচেনা মুখগুলোর মাঝে চেনা একটা মুখ খুঁজে ফিরছি।কিন্তু পরিচিত মুখটা অধরায় রয়ে যাচ্ছে।আমার রাস্তার ওপারে যাওয়াটা খুব দরকার।মনে হচ্ছে ওপারে আমার মুক্তি মিলবে।আকাশের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে রাস্তায় পা বাড়ালাম।সেকেন্ড কয়েকপরে আমাকে কেউ ধাক্কা দিয়ে আদি অবস্থানে পাঠিয়ে দিলো।ধাক্কা সামলে চোখ খুলে দেখলাম রক্তাক্ত অবস্থায় হিমু রাস্তায় পড়ে আছে।যমের গাড়িটা ততক্ষণে বহুদূর চলে গেছে।মুক্তি কার মিললো ঠিক বুঝলাম না!আমার নাকি হিমুর?ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললাম।
চোখ খুলে দেখলাম এই হালকা বসন্তের শীতেও আমি দরদর করে ঘামতে শুরু করেছি।সামনে একরাশ অন্ধকার।হঠাৎ কানে দরজায় কারোর আঘাতের শব্দ এলো।আমি লাইট করে বেড সাইড টেবিল হতে এক গ্লাস পানি নিমিষে শেষ করে ফেললাম।দরজায় আবার কারোর টোকার শব্দ হলো।উঠতে ইচ্ছা করছে না,তবুও উঠে দরজার কাছে গেলাম।এমনিতেই ঘুম আসছিল না।দু’মিনিট চোখটা লাগতেই দুঃস্বপ্ন এসে হাজির।
দরজা খুলতেই হিমু হুড়মুড়িয়ে ঢুকে দরজা ভিজিয়ে দিল।ঘুরেই আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল,”আমি আর পারছি না।”
লন্ডন থেকে আসার পর এখানে আমার আর হিমুর রুম আলাদা হয়ে গেছে।পনেরো দিনে রাগে,অভিমানে হিমু এ ঘর মুখো হয়নি।বাস্তবের কষাঘাতে আমরা আজ যোজন যোজন দূরে।সাতটা বছর এক বিছানায় একে অপরকে আশ্রয় করে শুয়েছি।অভ্যাস বলেও তো একটা কথা আছে।আমি হিমুকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম,”কি ব্যাপার এত রাতে এখানে কেন তুমি?”
আমাকে আবার জড়িয়ে ধরে হিমু বলল,”তুই বুঝিস না কেন মুন?”
অতি আবেগে বা রাগে হিমু সব সময় আমাকে তুই তুকারি করে।এটা সব সময়ের অভ্যাস।মন্দ লাগে না।
আমি হিমুর মাথার পিছনে হাত দিয়ে চুলে বিলি কেটে বললাম,”তুমি আমার রুমে এটা কেউ বুঝে গেলে লজ্জার শেষ থাকবে না।হিমু!
-বুঝুক।
-ছেলেমানুষি করো না হিমু!বি প্র্যাকটিক্যাল।তোমার বাবা জানতে পারলে মহাকান্ড হবে!
“হোক।তুই চুপ থাক।”বলে হিমু আমাকে ঠেলে বিছানায় ফেললো।
আমার বুকের উপর চড়ে তার দু’হাত দিয়ে আমার দু’হাত শিকলবদ্ধ করলো বিছানায়।আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,”এত বছর আমার সাথে সংসার করলি!অথচ আমি কিসে ভালো থাকবো তুইও বুঝলি না!”
আমি চোখ বন্ধ করে বললাম,”ঝুমু খুব ভালো মেয়ে।তোমাকে সুখে রাখবে।”
হিমু বিদ্রুপের হাসি হেসে বলল,”তুই ই বুঝলি না।আর সে!ভালোই বললি।”
হিমু মন খারাপ নিয়ে আমার গলায় কিস করতে লাগলো।আমি বাম হাত ছাড়িয়ে গলায় হাত দিয়ে তাকে বাধা দিলাম।সে মুখ তুলে বলল,”ওহ!এখন তোকে ভালোবাসার অধিকারও উঠে গেছে?বাহ!”
-হিমু বুঝতে চেষ্টা করো!সকাল হলে তোমার বিয়ে।এটা ঠিক না।
-হোয়াট ডু ইউ মিন ‘ঠিক না’?এতো বছর যা করেছি সেটা কি ঠিক ছিলো?
-তখনকার কথা আলাদা ছিলো হিমু!
হিমু আমাকে বিছানায় আরো জোরে চেপে ধরে বলল,”ফাক ইট।আলাদা ছিলো মানে কি?”
-চিৎকার করো না।তুমি আমি ছাড়াও এ বাড়িতে লোক আছে।
-তো?আই ডোন্ট কেয়ার।
-বাট আই কেয়ার।হুমম..আই কেয়ার।
হিমু আমার পিঠের নিচে হাত দিয়ে বিছানায় আমাকে উবুড় করে ফেললো।এক হাত বুকের তল বরাবর রেখে হালকা উঠিয়ে গলা চেপে ধরলো।
-গো টু হেল।
-হিমু ছাড়ো!আমার লাগছে।
সে আরো জোরে চেপে ধরে আমার নিচের পোষাক খুলে ফেললো।এক অপরিচিত হিমুর সাথে পরিচয় হলো সে রাতে।একটা সময় উরুস্তম্ভে প্রচুর ব্যথা অনুভব করলাম।এত বছরে খুব যত্নে আদর পাওয়ার অভ্যাস হয়ে গেছে।আজ বুনো,উন্মাদ স্পর্শে আমার ভিতরটা গুলিয়ে এলো।দু’একবার অন্ননালীতে রাতের সামান্য খাবার এসে আটকে ফিরে গেল।লজ্জায় চিৎকারও দিতে পারছি না।জোরে বেডসিট খামছে ধরলাম।হিমুর তলপেটে ঘাম জমেছে যা আমার পিঠের ঘামের সাথে বিশ্রী শব্দ করছে।কত মিনিট জানি না,মাথাটা কেমন করছে,চোখ জোড়া বন্ধ হয়ে এলো।যখন হালকা সেন্স ফিরলো মনে হলো তলপেটে গরম কিছু পড়ল।হিমু পিঠের উপর থেকে নেমে আমার পাশে চিৎ হয়ে শুলো।আমি বিছানা থেকে নেমে পালঙ্কের ডানপাশে মেঝেতে বসে পড়লাম।বিছানা থেকে কম্বলটা টেনে গায়ে জড়ালাম।কম্বলের গায়ে বড় বড় গোলাপ অঙ্কিত নীল ফুল।বড্ড বেমানান লাগছে।নগ্ন গায়ে আজ নিজেকে যেমন বেমানান মনে হচ্ছে।হিমু নেমে মেঝেতে বাম পাশে পালঙ্কের সাথে হেলান দিয়ে বসল।দু’জনের চোখ রুমের দু’দেয়ালে আটকে গেল।আমি মেঝেতে শুয়ে পড়লাম।হিমুও শুয়ে পড়লো মেঝেতে।গরজিয়াস পালঙ্কের নিচ দিয়ে দু’পাশে দু’জনকে দেখা যাচ্ছে।আমি উপরের দিকে তাকালাম।মাথা ঘুরিয়ে পালঙ্কের নিচ দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম হিমু মেঝেতে শুয়ে আছে,চোখ দু’টো শীতে অব্যবহৃত বৈদ্যুতিক পাখায় আটকে আছে।দু’চোখ দিয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় জল পড়ছে।সেখানে চোখ স্থির রেখে বলল,”সরি মুন!”
-আই রেয়্যালি সরি।
আমি কিছু বললাম না দেখে হিমু আবার বলতে শুরু করলো,”তুমি কেন এমনটা করলে মুন?”
“যদি নিজের ভালোবাসাকে এভাবে মুক্তি দিবে তাহলে কেন ভালোবেসেছিলে?”
আমি ধরা গলায় বললাম,”কেন করেছি সেটা সময় বলে দিবে!”
-জানো তো মুন।তুমি খুব জেদি।নিষ্ঠুর বটেও।
একটু থেমে হিমু আবার বলল,”তুমি চাইলে পারতে সাত বছরের সম্পর্ককে ভালো রাখতে।”
-চাইলেই সব হয় না হিমু।আমাকে ভালোবাসাই তোমার একমাত্র দায়িত্ব নয়।আরো কাছের কারোর উপর তোমার দায়িত্ব,কর্তব্য আছে।তাদেরও তোমাকে কাছে পাওয়ার অধিকার আছে।ভালোবাসা সব মেটাতে পারে না হিমু।
-কিন্তু দু’টো মানুষ তো ভালোবেসে ভালো থাকতে পারে।
-ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড হিমু।দু’টো মানুষের ভালো থাকা ইট’স নট এক্সপেক্টেড টু ইউ।তুমি তো এমন স্বার্থপর ছিলে না।
-সেই তো।আমি এখন স্বার্থপর হয়ে গেলাম।
-আমি ওভাবে কথাটা বলি নি।তুমি ভুল বুঝছো আমায়।
“আমি পুরানো হয়ে গেছি।ভালোবাসতে পারবে না বলে পর করে দিচ্ছো।”
-তুমি এভাবে বলছো কেন?তুমি চাও না মামনি,তোমার বাবা ভালো থাকুক।
-কিন্তু মুন!সাত বছর আগে মামনি আর রুপা আপুই তো আমাদের ভালো রাখতে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছি।এখন তারা কেন এটা চাইবে?
-তুমি সবটা জানো না হিমু।
নিঃশ্বাসটা আমার ঘন হয়ে আসছিলো।একটু থেমে নিঃশ্বাস নিয়ে বললাম,
“তারা ভালো চেয়েছিল বলেই তো আমরা সাত সাতটা বছর খুব ভালো ছিলাম।এখন কি আমাদের উচিত নয় তাদের ঋণ পরিশোধ করা?তাছাড়া তোমার বাবার চাওয়াটাও দেখতে হবে।তুমি তাকে খুব ভালো করেই জানো যে তিনি যা চান তা করে ছাড়েন।তুমি না চাইলেও তোমাকে বিয়েটা করতে হতো।”
-আমি ওতো কিছু বুঝি না।তুই কি চাস সেটা বল।
আমি চোখ বন্ধ করে বললাম,”আমি চাই তুমি বিয়েটা করে আঙ্কেলের ব্যবসায় বসো।সবাইকে নিয়ে ভালো থেকো।”
“আর তুই কি করবি?”
“আমার কথা তোমার ভাবতে হবে না!এত বড় পৃথিবীতে আমার থাকার জায়গার অভাব হবে না।লন্ডনে একটা সামান্য জবও আছে।সেখানে চলে যাবো।”
-তুই যা চাস তাই করবো।কিন্তু আমারও একটা কথা তোকে রাখতে হবে?
“কি?”বলে আমি উৎসাহ চোখে হিমুর দিকে তাকালাম।
-তুই আমার বিয়ের পরও কিছুটা দিন এ বাড়িতে থাক না!প্লিজ!
-সেটা দু’জনের পক্ষে কষ্টের হবে হিমু।তবুও চেষ্টা করবো।
হিমু মেঝেতে উবুড় হয়ে শুয়ে দু’হাতের মাঝে মলিন মুখটা রেখে দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,”আমাদের আর হিমুন হয়ে থাকা হলো না!তাই না মুন?
আমার মনে হলো আমি শূণ্যতায় ভাসছি।হিমু উঠে এসে মেঝেতে আমার পাশে শুলো।
বাম হাতটা আমার গালে ছুঁইয়ে বলল,”খুব কষ্ট হয়েছে আজ?ব্যথা দিলাম খুব।না?মেঝে থেকে উঠো ঠান্ডা লেগে যাবে।ভোর হয়ে এলো।”
আমি একটা শুকনো ঢোক গিললাম।হিমু বাম হাতের তর্জনী আঙ্গুল আমার চুল থেকে ধীরে ধীরে টেনে নাসিকা বরাবর ঠোঁটে আঙ্গুল ছোঁয়ালো।তারপর গলা পেরিয়ে বুকের কাছে নামলো।আমি আমার বুকেই হিমুর হাতটা চেপে ধরলাম।
আমার গা গুলিয়ে এল।উঠে দৌড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা এটে দিলাম।

৩।
কনে ফারিয়া জাহান ঝুমু।আঙ্কেলের বন্ধুর মেয়ে।কাজল টানা বড় বড় চোখ,উত্তলিত নাসিকার গোড়ায় যুগল ভ্রু,পাতলা ঠোঁট।আজকালকার মেয়েদের মত চুলের কালারফুল স্টাইল।রুপা আপুর তো এক দেখাতেই পছন্দ হয়ে গিয়েছিল।অবশ্য আমি লন্ডন থেকে ফিরবার পথে গাড়িতেই রুপার আপুর মুখে সেটা শুনেছিলাম।আমরা যখন প্রথমবার ঝুমুকে দেখতে যায়।হিমু একবার মাত্র ঝুমুর দিকে তাকিয়েছিল।সোফাতে আমি ওর গা ঘেষেই বসেছিলাম।কনেপক্ষ জানে আমি ওর বেস্ট ফ্রেন্ড।লন্ডনে দুই বন্ধু জব করেছি সাত বছর।অন্তরঙ্গ বন্ধু গা ঘেষে বসলে তো দোষ নেই।আমি চাপা স্বরে হিমুর কানে কানে বললাম,”মেয়ে তো বেশ সুন্দরী।পছন্দ হলো?”
হিমু রাগে দাঁত চেপে বললো,”আমি কি চাই তুমি সেটা ভালো করেই জানো!তোমার এত শখ আমাকে বিয়ে দেওয়ার,তুমিই ভালো করে দেখো না!সতীন নিয়ে সংসার করার যখন এত ইচ্ছা!”
“ইশ!সতীন নিয়ে সংসার করতে আমার বয়ে গেছে।”
ডান হাত হাওয়ায় ভাসিয়ে বললাম,”ফুসস..!তোমাকে বিয়ে দিয়েই আমি হাওয়ায় ভেসে ভেসে লন্ডন।”
“তুই বললেই হবে নাকি!এখানে থেকে আমার আর আমার বউয়ের পিরিত দেখে জ্বলবি আর পুড়বি।”
আমি বাম হাতের বৃদ্ধা আর তর্জনী আঙ্গুল দিয়ে হিমুর উরুতে চিমটি কাটলাম।
হিমু “আউছ” শব্দ করে উঠল।মামনি বলল,”কি’রে তোরা দুটোতে কি গুজুরগুজুর ফুসুরফাসুর করিস?”
আমি মৃদু হাসি দিয়ে বললাম,”কিছু না মামনি।”
রুপা আপু বলল,”হিমু!ঝুমুকে আলাদাভাবে কিছু জিজ্ঞাসা করার থাকলে কর না।”
“না মানে আমি একা!”
“ওমা তুই একা মানে কি?তোর সাথে আমরা সবাই যাবো নাকি!”
হিমু আমার দিকে তাকাল।জানি ওর ইচ্ছা নাই।তবুও আমি জোর করে ওদের পাশের রুমে দিয়ে এলাম।বুকের ভিতরটা জানি কেমন করছিল।রুপা আপুর বছর তিনেকের ছেলে সাদ।এই দিন চারেকে তার সাথে বেশ সখ্যতা হয়েছে।আমি ওকে কোলে নিয়ে ঝুমুদের বেলকনিতে গেলাম।সাদ কে বুকের সাথে লেপটে নিলাম।তবুও বুকের ভিতর ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল।উপরের আকাশটা কেমন চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে এলো।
“আচ্ছা তোমাকে কে বলেছে আমাকে বর সাজাতে?”
“ঠিকঠাক হয়ে দাড়াও না!প্লিজ।”
দেশে ফিরে হিমুর অনেক পুরানো বন্ধু-বান্ধবদের সাথে যোগাযোগ হয়েছে।আজ তারা সবাই এসেছে বিয়েতে।কেউ আর একাকি নেই।যুগলে,সন্তানে।শুধুমাত্র হিমুই বাকি।ওর বন্ধুমহল সবাই জানে আমি ওর ছোট ভাইয়ের মত।শুধু জোহান ভাইয়া ছাড়া।সারা বাড়িময় লোকে লোকারণ্য।মামনি জেনেশুনে আমাকেই কেন যে হিমুকে বর সাজানোর দায়িত্ব দিল কে জানে।ইয়াশ ভাইয়া এখনো ভার্সিটি লাইফের মত রাগী আছে।আমাকে উদ্দেশ্যে করে বলল,
-সাইমুন!পরাতে যখন পারবে না।পরাতে আসছো কেন?
-ভাইয়া আপনার বন্ধুটা দেখেন না কি করছে?একটু স্থির হয়ে দাড়ালে তো পারে!
“নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা!”সোফা থেকে উঠে গিয়ে বলল,”ছাড়ো তো।দেখো আমি রেডি করে দিচ্ছি।”
আমি সরে গিয়ে সোফায় বসলাম।পাশে জোহান ভাইয়া।তিনি গলা খাকিয়ে বললেন,
“তোর মনে আছে হিমু?ইয়াশের ধমকে সাইমুন ভার্সিটি লাইফের প্রথম দিনই তোকে প্রপোজ করেছিল!”
ইয়াশ ভাইয়া বলল,”তুই আছিস ফাও চিন্তা নিয়ে।”
-কিন্তু ব্যাপারটা রোমান্টিক ছিলো তো।বল?
“ছাই ছিলো!”বলে ইয়াশ ভাইয়া নিজের কাছে মন দিল।
জোহান ভাইয়া আমার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বলল,”ভালোবাসার মানুষটাকে এভাবে ছেড়ে দিলে!সাইমুন।”
আমি নিঃশ্বাস নিয়ে বললাম,”আপনি তো সব জানেন।আমার আর উপায় ছিলো না।”
-কিন্তু জীবন যুদ্ধে যে হেরে গেলে ভাই।
-ভাইয়া।এত কিছুর পরে এটা খুব ভালো করে বুঝে গেছি যে আমরা শুধু জেতার জন্য বাঁচি না।হেরে যাওয়ার জন্যও বাঁচি না।আমরা বাঁচি শুধু বাঁচার জন্যে।
-ভাই তোমার তত্ত্ব কথা আমি বুঝি না।
তিথি আপু রুমে ঢুকতে ঢুকতে বলল,”তোদের বর সাজানো হলো?কনে সাজানোর সময়ও তো এর চেয়ে কম লাগে।আঙ্কেল তাড়া দিচ্ছে।হিমু!”
জোহান ভাইয়া বলল,”ছেলেদের সাজঘরে মহিলা নট অ্যালাউ!”
তিথি আপু তার মাথায় হালকা আঘাত করে বলল,”তাই না?”
আপু আবার বলল,”জোহান,ইয়াশ!আমাদের তো এই শালার বিয়েতে আসা উচিত হয় নি।শালা আমাদের কারোর বিয়েতে লন্ডনী রেখে আসলো না।”
“তা ঠিক।”বলে ইয়াশ ভাইয়া আবার বলল,”কিন্তু খাওয়া ছাড় দেয় কিভাবে?বল।”
সবাই হেসে উঠল।হিমু সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল,”তোরা সবাই একটু যাবি?মুনের সাথে আমার একটু কথা আছে।”
ওরা যাওয়ার সময় হিমু জোহান ভাইয়াকে ডেকে বলল,”জোহান,দরজাটা লক করে যাস।”জোহান ভাইয়া চোখ ইশারায় সম্মতি দিল।
হিমু সোফা থেকে তুলে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।আমি ওকে ছাড়িয়ে বিদেশ থেকে সাথে আনা ব্যাগটা খুললাম।তারপর ওর গলা থেকে সোনার চেইনটা খুলে তাতে লাভ লকেট দিয়ে ওর গলায় আবার পরিয়ে দিতে দিতে বললাম,”আংটিও এনেছিলাম।কিন্তু তোমার হাতে তো অ্যাংগেইজমেন্টের আংটি।আমার তো আর ওটা দেওয়া উচিত হবে না।মামনির কাছে তোমার বউয়ের জন্য আনা নেকলেস আছে।নিয়ে নিও।”
হিমু ছলছল চোখে লাভ লকেটের দিকে তাকাল।লাভ লকেটের দুটো পার্ট।হিমু খুলে তার দু’পাশে ওর আর ঝুমুর ছবি দেখে বলল,”বেইমান!তুই সব জানতি।জেনেশুনে আমাকে লন্ডন থেকে নিয়ে আসলি?”
আমি বললাম,”হিমু!এসব কথা এখন থাক।”
হিমু তার দু’হাত দিয়ে আমার কাধের নিচে দু’হাতের গোড়ায় জোরে চেপে ধরে সোফায় বসালো।তারপর অর্ধদাড়িয়ে আমার মাথার দু’পাশে সোফায় দু’হাত ঠেকিয়ে ঠোঁটের কাছে ঠোঁট নিয়ে বলল,”কিন্তু তুই কিভাবে থাকবি আমাকে ছাড়া।”
আমার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।হিমু রাগে ফোঁপাতে ফোঁপাতে ডান হাত দিয়ে আমার দু’গাল চেপে ধরে বলল,”হুমম বাবু।তুমি কাঁদতে তো পারবে না একদম।জান!তুমি আমাকে কথা দিয়েছো তো যে কাঁদবে না।”
“হিমু ছাড়ো।আমার লাগছে।”
“লাগুক” বলেই হিমু আমার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিলো।কিছুক্ষণ পর নিচের ঠোঁটে তীব্র জ্বালা অনুভব করলাম।আমি এক ঝটকা মেরে হিমুকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলাম।নিচের ঠোঁট কেটে রক্ত পড়ছে।
জোহান ভাইয়া দরজা খুলে বলল,”এটা কি করলি তুই?ওর ঠোঁট কেটে তো রক্ত পড়ছে।”
হিমু উঠে জোহান ভাইয়াকে হালকা ধাক্কা দিয়ে যেতে যেতে বলল,”গো টু হেল।আই ডোন্ট কেয়ার এনিথিং।”
“জোহান!তুমি বাইরে যাও।গিয়ে গাড়িতে বসাও হিমুকে।আমরা বেরোবো একটুপর।আমার কিছু কথা আছে মুনের সাথে।”
আঙ্কেলকে দেখে আমি ঠোঁটে বাম হাত চেপে ধরলাম।
জোহান ভাইয়া বাধ্য ছেলের মত মাথা নাড়াল,”জি।আঙ্কেল।”
জোহান ভাইয়া চলে যাওয়ার পর আঙ্কেল দরজা বন্ধ করে এসে বলল,”কি নাটক হচ্ছে এ বাড়িতে?”
“জি বাবা!মানে?”
আঙ্কেল রেগে বলল,”রাসকেল।কে তোমার বাবা।ডোন্ট কল মি বাবা।রাবিশ।”
“সরি আঙ্কেল।”
“আমি তোমার টিকিট কনফার্ম করে রেখেছি।বরযাত্রী বেরোনোর আগে তুমি এ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবে।আমি চাই না বিয়ের পরও আমার ছেলে তোমার মত একটা নোংরা ছেলের সাথে যোগাযোগ রাখুক।সাত বছর শুধু ওর মায়ের কারনে তোমরা ছাড় পেয়েছো।”
-কিন্তু আঙ্কেল….!
-কোন কিন্তু নেই।এ বাড়িতে তুমি শুধু ওর মায়ের কারনে আশ্রয় পেয়েছো কিছুদিনের।
-ওকে।থ্যাংকস।বাট টিকিট লাগবে না,আঙ্কেল!আমি চলে যাচ্ছি।
মামনিকে আর দেখা হলো না।তার হিমুন আজ অস্তিত্ব সংকটে।একজন বাঁধা পড়বে নতুন সম্পর্কে,অন্যজন পুরানো সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছে।ব্যাগটা কাধে নিয়ে গেট ক্রস করার সময় দেখলাম বরযাত্রীর গাড়িতে হিমু বসে আছে।বারবার রুমাল দিয়ে চোখ মুখ মুচছে।ভিউ গ্লাসে আমাকে দেখে ফিরে তাকাল।হয়তো ওর মন চাইছে আমাকে আটকাতে।এত মানুষের ভিড়ে ওর আর আমার যোজন যোজন দূরত্ব বেড়ে গেছে।আজ চাইলেও আমার কাছে আসতে পারবে না সে।ওর চোখ টলমল করছে।অজান্তে দু’ফোঁটা চোখের পানি পড়লো আমার।পকেট থেকে টিস্যু পেপার বেরোলাম।যে টিস্যুতে হিমুর গায়ে হলুদের হলুদ মেখে আছে,যে হলুদের ছোঁয়া আমার মুখে আজ অদৃশ্যে শিহরণ জাগছে।আমার চোখের অশ্রু মিশে গেল সে হলুদ রঙা টিস্যুতে।
বিশাল বড় অথচ ঐ একাকি আকাশের মত হয়ে গেলাম আমি।সবার ধরা ছোঁয়ার বাইরে।যে আকাশে থাকল না কোন চাঁদ,তারা,উল্কা,নীহারিকা বা ধুমকেতু।যার বুক জুড়ে আছে শুধু বিষাদের কালো মেঘের ঘনঘটা।
কোন একদিন হয়তো এই মেঘগুলো বৃষ্টি হয়ে ঝরবে নতুন কারোর বুকের জমিনে।

লেখকঃ মেঘ রাজ সাইমুন

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.