নিরন্তর

লেখকঃ-পৃত্থুজ আহমেদ

উৎসর্গঃআরমান সুশান

(আমি আরমান সুশান।নোয়াখালির একটা প্যারামেডিকেল কলেজে ৩য় বর্ষে পড়ছি।প্রত্যেকটা মানুষের একটা নিজস্ব গল্প থাকে।
তার অনুভূতি,জীবনের ঘটনাগুলো তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে।করে তোলে অনন্য।এই গল্পটা আমার।তেমনি একান্তই আমার নিজস্ব।)

আজ আমার ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার কথা।আসলে টাকা বলতে আমাদের কলেজের বেতন এবং যাবতীয় খরচ ব্যাংকে জমা দিতে হয়।আমাদের কলেজের পাশেই একটা ব্যাংক আছে।যেখানে শিক্ষার্থীরা কলেজের যাবতীয় খরচ জমা দিয়ে যায়।তো যথারীতি আমি ব্যাংকে এসে দেখি ৪ টা বেজে গেছে।ব্যাংকের ভেতরে গিয়ে দেখি ব্যাংকের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে।সবাই যে যার মত গুছিয়ে বাসার উদ্দেশ্য রওয়ানা হওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে।আমি যার কাছে টাকা জমা দেব তিনি মনে হয় এখানে নতুন এসেছে।কারণ আগেরবার অন্য একজনকে দেখেছিলাম।এই নতুন ব্যাংকার কে দেখে আমি রীতিমত ক্রাশিত।শুধু মনে মনে একটা কথাই বেজে উঠল এত সুন্দর কেউ হতে পারে?আমার মনে হয়েছিল যেন কোন গ্রিক দেবতা আমার সামনে বসে আছে।আমি তার কাছে গেলাম কথা বলতে।তিনি বললেন,
-ব্যাংক তো এখন বন্ধ হয়ে যাবে।এখন আর টাকা জমা নেওয়া হবেনা।
-তাহলে আঙ্কেল,আমি কী কাল সকালে আসব?কাল ব্যাংক খোলা থাকবে?
-হ্যাঁ অবশ্যই।আপনি ন’টার পর আসবেন।
-জ্বি আচ্ছা।
এই বলে আমি ঐদিনের মত চলে আসলাম।কিন্তু ঐ ব্যাংকারের প্রতি সূক্ষ্ম একটা ভাললাগার আবেশ রয়েই গেল।মনে হচ্ছে আমি তাঁহাতে নিমজ্জিত হয়ে যাচ্ছি।”লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট” বলে একটা কথা আছে।কথাটা কতটুকু সত্য আমি জানিনা।তবে আজ কেন জানি মনে হচ্ছে সত্যিই এমন হয়।প্রথম দেখায় প্রেম তো হতেই পারে।তবে কী আমি তাকে ভালবেসে ফেললাম?আরে,আমিত ঐ লোকের নামটাই জানিনা।ঠিকআছে,আগামিকাল জিজ্ঞেস করে নেওয়া যাবে।

*
পরেরদিন সকালে যখন ব্যাংকে গেলাম,তখন তিনিই প্রথম কথা বললেন।জিজ্ঞেস করলেন
-কেমন আছেন?
-আমি ভাল আছি।আপনি ভাল আছেন?
-জ্বি আমিও ভাল আছি।
এইভাবে কুশল বিনিময় করলাম পরস্পর।গল্পে গল্পে কথাবার্তা শুরু হয়।আমার যে কী পরিমাণ ভাল লাগছিল বলে বোঝানোর মত নয়।কিন্তু আমি খুব সহসা নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গেলে থতমত খাই সবসময়।কী বলব না বলব বুঝে উঠতে পারিনা।সাধারণত,ব্যাংকারদের স্যার বলে সম্বোধন করা হয়।কিন্তু আমি প্রথম দিন তাকে আঙ্কেল বলে সম্বোধন করে দিয়েছি।এই নিয়ে তার কলিগরা প্রচুর হাসাহাসি করেছিল তার উপর।

*
আমার এক বন্ধুর আসার কথা ছিল ব্যাংকে।আমি তাকে সেটা বলেছি যে আমার এক বন্ধুর টাকা জমা দেওয়ার কথা।সে আসবে।এই বাহানায় আমি আরও দুইদিন তার কাছে গেলাম।তাকে দেখার জন্য।একদিন হুট করে কথায় কথায় তাকে জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলাম,
-আচ্ছা আপনার কী ভাললাগে?
-আমার ছেলেদের ভাললাগে।তিনি বললেন।
এই কথা শুনে আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলেও মোটামুটি অবাক হওয়ার ভান করে বললাম,আপনার ছেলেদের ভাল লাগে?কী বলেন!আমিত তার কথার উপর হাসতে হাসতে শেষ যেন আমি এসব প্রথম শুনছি।এমন একটা ভান করলাম।এরপর,তাকে বললাম আপনার একটা অটোগ্রাফ দেবেন?তিনি মুচকি হাসলেন,আর বললেন
-আমিত সেলিব্রিটি নই যে আপনাকে অটোগ্রাফ দেব।তবে হ্যাঁ,আমার কলিগ আশরাফ ভাই(আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে দেখিয়ে দিলেন) সেলিব্রিটি।আপনি তার কাছ থেকে অটোগ্রাফ নিতে পারেন।
আমি বললাম,আমি আপনার কাছ থেকে অটোগ্রাফ চেয়েছি।আশরাফ ভাইয়ের কাছে নয়।তাই আপনিই আমাকে অটোগ্রাফ দেবেন।
-আচ্ছা ঠিকআছে।অন্য একসময় দেব।
কথায় কথায় জেনে নিলাম তার নাম আরাফাত।আরাফাত হোসেন।
*
আমরা দুজন কথা বলছিলাম।এক পর্যায়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন আমার বাড়িতে কে কে আছেন,আমার মা,বাবা কী করেন ইত্যাদি ইত্যাদি।আমাকে জিজ্ঞেস করলেন,আমি কোথায় থাকি?
-আমি ফেনীর দাগণভূঞাঁ থাকি।আপনি কোথায় থাকেন?
-আমি চট্টগ্রাম থাকি।এইত কয়েকমাস হল এখানে বদলি হয়ে এসেছি।
বেশ তো!
-তো একদিন চলুন আমাদের বাড়ি থেকে ঘুরে আসুন।আপনাকে আমার এলাকা ঘুরে দেখাব।ভাল লাগবে।
-তাই নাকি?অবশ্যই যাব।
-হ্যাঁ।আপনার দুষ্টুমিষ্টি কথাও শোনা যাবে তাহলে আরও কিছুক্ষণ।
-তাই নাকি?আর আপনার নাটক দেখবে কে?
-আরে,আমিত নাটক করিনা।তবে আবৃত্তি করি।প্রথমদিন,আমাকে দেখে তার এক সহকর্মীর আমাকে ডান্সার মনে হয়েছিল।যদিও এটা অনেকেই বলে।অবশ্য তাকে আমি বলে দিয়েছি আমি ডান্স করিনা।তবে একটু আধটু ডান্স পারি এই যা।তখন তিনি মানে আরাফাত বলছিলেন,
-তো মিস্টার,এখন আপনার কবিতা আবৃত্তি শোনান তো।
-হ্যাঁ আমি আপনাকে কবিতা আবৃত্তি শোনাই এখন আর আপনার ম্যানেজার এসে আমাকে পিটিয়ে বের করুক।
-আরাফাত হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল,তো,কখন শোনাবেন?
-আপনি যখন আমার বাড়িতে যাবেন তখন শোনাব নে।
এই নিয়ে কথা বলতে বলতে ব্যাংক বন্ধ হওয়ার সময় হয়ে এলো।আরাফাত বললেন,এখন তো ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাবে।আর সন্ধ্যা হয়ে এলো।আপনি বরং বাড়ি যান।অন্য কোনদিন আপনার কবিতা আবৃত্তি শুনব,আড্ডা দেব,গল্প করব।
-ঠিকআছে।আজ আসছি তাহলে।আল্লাহ হাফেজ।
-জ্বি আল্লাহ হাফেজ!
এরপর আর যাওয়া হয়নি।যেহেতু ব্যাংক এখানে প্রতিদিন এভাবে আসা যাওয়া ঠিক হবেনা।ব্যাংকে প্রবেশ করতে দেবে না।একদিন অবশ্য গিয়েছিলাম,কিন্তু দারোয়ান ঢুকতে দেয়নি।তাদের ম্যানেজার কে গিয়ে বলে দেয়ায়,তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন কোন দরকার আছে?আমি বললাম,আমার এক বন্ধুর আসার কথা ছিল।তাই এসেছি।
কোথায় আপনার বন্ধু? তিনি তো আসেননি।এবার ধারণা হয়েছে তিনি আপনার কেমন বন্ধু?
জ্বি স্যার।এই বলে আমি চলে আসলাম।আর যাওয়া হয়নি।আমি তার সাথে যোগাযোগ করার উপায় হিসেবে ফোন নম্বর কিংবা ফেসবুক আইডি চেয়েছিলাম।তিনি বলেছিলেন অন্য কোন সময় দেবেন।আমিও আর জোর করিনি।কেন যে নিলাম না!এখন নিজের উপরই রাগ হচ্ছে।
*
পরের মাসে আবার টাকা জমা দেওয়ার জন্য গিয়েছিলাম।তখন আরাফাতের ম্যানেজারও আমার সাথে কুশল বিনিময় করলেন।তার এক সহকর্মী আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,আরে আপনি আরাফাত ভাইয়ের ফ্যান না!আমি মুচকি হেসে বললাম,জ্বি আপনার আরাফাত ভাইয়ের ফ্যান।আরাফাত তখন প্রচুর ব্যস্ত ছিলেন।এই ব্যস্ততার মাঝেও এই কথা শুনে হেসে দিলেন।আমি আরাফাত কে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
-কেমন আছেন?
-ওয়ালাইকুমুস সালাম।আমি ভাল আছি।আপনি ভাল আছেন?
-জ্বি আমিও ভাল আছি।
-আচ্ছা আমাকে অটোগ্রাফ দেওয়ার কথা ছিলনা আপনার?
-আমি একটু ব্যস্ত আছি দেখছেন তো।পরে দেব।
আমি রাগ করেই বললাম,ঠিকআছে দিতে হবেনা অটোগ্রাফ।আপনি ভাল থাকুন দোয়া করি।আচ্ছা আমি কেন রাগ করছি?যদিও আমি জানি আমার রাগ,অভিমান তিনি কখনও বুঝবেন না।অবশ্য বোঝার কথাও না।আমি সেদিন রাগ করে চলে এসেছি।তাকে আমার ফেসবুক আইডি দিয়েছিলাম কিন্তু সে অ্যাড করেনি।এর মাঝে আমি তার কলিগদের থেকেও তার আইডি চেয়েছি,সবাই আইডি বলেছে যদিও কিন্তু আমি সার্চ করে পাইনি।
*
পরেরবার যখন গিয়েছি তখন আরাফাত আমাকে তার অটোগ্রাফ দিয়েছে।এমনকি তার ফেসবুক আইডিও খুঁজে দিয়েছে।আমি বাসায় এসে তাকে ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছি এবং একটা মেসেজও পাঠিয়ে দিয়েছি।কিন্তু,অনেকদিন হয়ে গেল সে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করেনি।মেসেজের রিপ্ল্যাই দেওয়া তো দূরের কথা।দ্বিতীয় দিন যখন তার কাছে গিয়েছিলাম,তখন তাকে আমি বলেছিলাম আপনার একটা ছবি আঁকব।আপনার কোন ছবি দেওয়া যাবে?তিনি বললেন,আপনি চোখ বন্ধ করে আমার কথা ভাবুন আর আমি ছবি আঁকুন।আমি শুনে হাসতে হাসতে বললাম,আমার কাছে পেন্সিল,রাবার কিছু নেই এখন।আমি কীভাবে আঁকব ছবি?তিনি বললেন,কলম দিয়ে আঁকুন।আমি মনে মনে বললাম,কেমন বেরসিকের পাল্লায় পড়লাম রে বাবা!
সেদিন আর ছবি আঁকা হয়নি।ফেসবুক আইডি পাওয়ার পর আমি ফেসবুক থেকে তার ছবি নিয়ে আঁকতে শুরু করেছি এখন।
*
আরাফাত আমায় ব্লক দিয়েছে।কেন দিয়েছে জানিনা।ব্যাংকে গেলেও কেমন এড়িয়ে চলে।সে এমন কেন করছে জানিনা।হয়ত বুঝতে পেরেছে।তাই আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছে।আচ্ছা,কেউ কাউকে ভালবাসলে তাকে কী এড়িয়ে যাওয়াটা খুব দরকার?এমন করা যায় না?তার সাথে একটু হাসিমুখে কথা বললেই তো হয়।আমি আরাফাতের কাছে সম্পর্ক চাইনি।এমনকি তার প্রতি নিজের দুর্বলতার কথা কখনও তার কাছে প্রকাশ করিনি।আমি শুধু চেয়েছি,আরাফাত আমার পাশে থাকুক।আমাকে তার ব্যস্ত দিবসের অগোচরে কয়েক মিনিট সময় দিক।এতেই আমি জীবন কাটিয়ে দিতে পারতাম।জীবনের শেষ বসন্তগুলো আমি তার রঙে রঙিন করে নিয়েছি।হ্যাঁ,আমি মৃত্যু পথযাত্রী।আমি ক্যান্সারের রোগী।কতদিন বাঁচব হিসেব নেই।তবে সময় যে ঘনিয়ে এসেছে তা বুঝতে পারি।আরাফাত পাশে থাকলে মৃত্যুটা হয়ত সুখকর হত।কিন্তু না,সে পাশে থাকবে না।তার হয়ত ভালবাসার ভার বহন করার সামর্থ্য নেই।তবে আমার আছে।আমি তাকে নিঃশ্বাসের শেষ প্রবাহ অবধি ভালবাসব।তার কয়েকটা ছবি যেগুলো আমি ডাউনলোড করে রেখেছি সেগুলো এখনও আমার কাছে আছে।আমি এখনও ব্যাংকে যাই।তার কাছেই আমাকে টাকা জমা দিতে হয়।কিন্তু আরাফাতের সাথে কথা বলিনা আমি।তার সামনে গেলেই আমার হৃদকম্পন বেড়ে যায়।শরীরের প্রত্যেকটা স্নায়ুর কম্পন জানান দেয় তার অবস্থান।তবুও আমি বাস্তবতা মেনে নিয়েছি।এগিয়ে চলি প্রতিটা দিন পিছিয়ে থেকেও।বাস্তব রোমাঞ্চকর নয়।বাস্তবতার পথগুলো কাঁটায় ভরা।প্রতিটা পদক্ষেপে ক্ষতবিক্ষত হতে হয়।তবুও মানুষ এগিয়ে চলে সুখি হওয়ার নিমিত্তে।এক চিলতে প্রেমের খোঁজে।প্রেম ভঙ্গুর।প্রেম মানুষকে ভেঙ্গেচুরে গুঁড়ো করে দিলেও মানুষ বারবার এই ভাঙ্গাগড়ার নিরন্তর খেলায় মেতে ওঠে।ছুটে চলে দিগ্বিদিক।

সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত গল্প

প্রথম প্রকাশ- সমপ্রেমের গল্প, ফেব্রুয়ারি ২১

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.