শূণ্যস্থান

মাঝরাতে সুমনের ঘুম ভেঙ্গে গেল। ইদানিং প্রায় এমন হচ্ছে৷ অকারণেই ঘুম ভেঙ্গে যাচ্ছে। সুমন কিছুক্ষণ এ পাশ ওপাশ করলো কিন্তু ঘুমাতে পারলো না। ব্যর্থ হয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে সিগারেট ধরালো।তার স্ত্রী মিতু ওপাশ ফিরে ঘুমাচ্ছে। সুমন খেয়াল করলো মিতু ঘুমের মধ্যেই হাসছে। খিলখিল করে হাসি। তবে তার স্থায়িত্ব কম।মিতু কি জেগে আছে? সুমন কি তাকে ডেকে তুলবে?দুজন কিছুক্ষণ গল্প করলে,বারান্দায় হাটাঁহাঁটি করলে হয়তো ঘুম আসবে। না থাক,ও ঘুমাক।সারা দিন প্রচুর খাটাখাটি করতে হচ্ছে৷ কলেজে নাকি কী সব ঝামেলা যাচ্ছে। ছাত্রলীগদের গণ্ডগোলে কলেজ আতঙ্কিত৷ মিতুকে ও বেশ চিন্তিত মনে হল। ওকে সুমন অনেকবার বলেছিল চাকরি বাকরি ছেড়ে দিতে৷ কিন্তু কে শুনে কার কথা?বাচ্চা কাচ্চা নেই, সারাদিন একা একা থাকবে তাই চাকরি করা৷ সুমন ও সারাদিন অফিস, মিটিং নিয়ে থাকে৷ এত বড় বাড়িতে দুজন কাজের লোক,ড্রাইভার,ম্যানেজার কাকা আর তারা স্বামী স্ত্রী। বিয়ের পাঁচ বছর হয়ে গেছে অথচ সন্তান সন্তানি হয়নি। সুমনের বাবা মা দুজন ই গত দু বছর আগে দুই মাসের ব্যবধানে মারা গেল৷ এক বোন ছিল সে ও ততটা আসে না। অভিমান অথবা রাগ৷ সুমন ইদানিং এসব নিয়ে ভাবে না।যা ভেবে কোন অন্ত পাওয়া যাবে না, তা ভেবেই আর কি হবে?চলুক সব কিছু আপনি নিয়মে।
সুমন বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। বারান্দা থেকে রাস্তা দেখা যায়।রাস্তা ফাঁকা৷রাস্তার বামপাশে জামে মসজিদ। ঘন্টা খানেক সময় আছে ফজর হওয়ার। অথচ মুয়াজ্জিন সাহেব চলে এসেছেন। ওনার ও কি রাতে ঘুম হচ্ছে না? বৈদ্যুতিক থাম্ব ঘেঁষে দুটা কুকুর শোয়ে আছে। মাঝে মাঝে এক দুটা রিকশা যাচ্ছে। অকারণেই তারা বেল বাজাচ্ছে। সুমনের মনে হল সে খুব একা। অথচ তেমনটা মনে হওয়ার কোন কারন ই নেই।

রান্নাঘর থেকে চা গরম করে নিয়ে বসতে না বসতে ফজরের আজান দিয়ে দিল। সুমন আশ্বস্ত হল। এখন ভোরের আলো ফোটতে শুরু করবে৷রাত শেষ হবে৷ একা একা এত বড় একটা নির্ঘুম রাত পার করে দেওয়া সহজ ছিল না।
মিতুর ঘুম ভাঙতেই খেয়াল করলো সুমন বিছানায় নেই। মোবাইলের দিকে তাকাতেই দেখলো সাড়ে পাঁচটা। এত ভোরে জেগে গেল কেন সুমন? ওর কি শরীর খারাপ? মিতু, বিছানা ছেড়ে দাঁড়াতেই দেখলো সুমন জগিং করতে বের হচ্ছে৷ সে কিছু বলেনি৷ জগিং থেকে আসলে জিজ্ঞেস করা যাবে।
নাস্তার টেবিলে মিতু আর সুমন খেতে বসেছে। সুমন সকালে লাল আটার রুটি খায়৷ মিতু পাউরুটি আর ডিম ভাজি।মিতু রুটিতে কামড় দিয়ে সুমনের দিকে না তাকিয়েই প্রশ্ন করলো
-রাতে কি তোমার ঘুম হচ্ছে না?
সুমন চুপ করে রইল৷ মিতু আবার প্রশ্ন করলো
-খুব ভোরে জেগে যাচ্ছ ইদানিং। মন ঠিক আছে?
সুমন চেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে বলল
-হুম ঠিক আছে। আমি উঠলাম।
মিতু সুমনের খাবার প্ল্যাটের দিকে তাকিয়ে রইল। আজো সে একটার বেশি রুটি খায়নি। তাকে বেশ চিন্তিত মনে হল। সুমন কি কোন কারণে কষ্ট পাচ্ছে?

দুপুরে সুমন বাসায় আসে না। অফিসের ক্যান্টিনে খাবার খায়। সেখানকার খাবার খুব ভাল।ফজলু নামের একজন বাবুর্চি আছে। তার রান্নার হাত অসাধারণ।ফজলুকে আবিষ্কারের পিছনের গল্পটা সুমনের জীবনের সাথে এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, নিজেকে এক প্রকার কষ্ট দেওয়ার জন্যই দুপুরের খাবারটা ক্যান্টিনে খায়।

আজ থেকে অনেক দিন আগে, সাত আট বছর আগে। সুমন তখন,২৫ বছরের তরুণ। বাবা মায়ের আদরের রত্ন৷ বোনের সবচেয়ে ভাল বন্ধু। ইউনিভার্সিটির আদর্শবান তরুণ। চমৎকার সিজিপিএ নিয়ে অনার্স শেষ করে মাস্ট্রার্সের ফাইনালের জন্য যখন প্রস্তুতি নিচ্ছল তখন এক পড়ন্ত বিকেলে রিকসা করে বাড়ি ফেরার পথে রাস্তায় রিকসা উলটে রক্তারক্তি কান্ড। মাথা ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল। জ্ঞান হারাবার প্রাক্কালে সতেরো আঠারো বয়সের একটা ছেলেকে এগিয়ে আসতে দেখে আশ্বস্ত হয়ে চোখ বুঝলো। জনমানবহীন রাস্তায় মরে পড়ে থাকলে ও কারো খবর পাওয়ার কথা না।
যখন হুশ এল তখন নিজেকে নিজের বিছানায় আবিষ্কার করলো। আশেপাশে পরিচিত জনের চেহারা দেখে মন হালকা হল।কী ঘটেছিল,কীভাবেই সে বাসায় ফিরলো, ছেলেটাই বা কে? ড্রাইভারের কী হয়েছে এসব জানার চেয়ে তার কাছে মনে হল এখন পড়ায় না বসলে না ই হবে। কাল বাদে পড়শু পরিক্ষা।কবে সবাই বের হবে, কবে সে পড়ার টেবিলে বসবে এসব ভেবে যখন এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল তখন ই তার মনে হল, আজকে মিতুর জন্মদিন। ওর জন্মদিনে না গেলে না ই হবে। হাড় আস্ত রাখবে না।

মিতুর সাথে সুমনের বন্ধুত্ব কলেজ থেকে। তারপর এতগুলো দিন সেই বন্ধুত্ব টিকে থাকা চাট্টিখানি কথা নয়৷ কত বার রাগ হল,অভিমান হল,মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে গেল। তবো সেই বন্ধুত্ব টিকে রইল। এত গভীর বন্ধুত্ব ই কি তাদের এক সাথে সংসার করার কারন? না। সুমন কোনকালে সেইভাবে ভেবে ই দেখেনি৷ তাদের বিয়ে বাকি সাত আটটা বিয়ের মত ছিল না। সেই সময়টা সুমন ভুলে থাকতে চায়।আর না আসুক সেই সময়টা। ভেসে যাক সব,ডুবে যাক।

সুমন পিছনের দিনগুলো ভাবতে চায় না। জীবনের সব কিছু হারিয়ে, কোনভাবে সে বেঁচে আছে। বেঁচে থাকাটা সহজ নয় তার জন্য। তবো ও তাকে বেঁচে থাকতে হয়। মিথ্যা সুখের অভিনয়ে এইভাবে তার কেটে যাবে আরো অনেকগুলো দিন। অমৃত্যু তাকে টিকে থাকার জন্য অভিনয় করতে হবে।
আজ সুমন ক্যান্টিনে কিছু খায়নি। বিকেলের দিকে দুজন ক্লাইন্টের সাথে মিটিং শেষে যখন বাসায় ফিরলো তখন মিতু বাসায় ছিল না। সুমন নিজেই কিচেনে চলে গেল। অনেক দিন পর টুকটাক কিছু রান্না করল। একটা সময় ছিল যখন একজন মানুষ শুধু তার হাতের রান্না খাওয়ার জন্য দুপুরের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে তার বাসায় এসে বসে থাকতো।
ঐ যে, যেদিন সে রিকসা উলটে মাঝরাস্তায় পড়ে ছিল। সেদিন যে ছেলেটা দৌড়ে ছুটে এসছিল। তাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে উধাও হয়ে গিয়েছিল, সেই ছেলেটার সাথে ওর পরিচয় হয়েছিল আরো সপ্তাহখানেক পরে। সেটা এক বৃষ্টির দিন। সন্ধ্যায় মিতুদের বাসা থেকে ফেরার পথে মুষল ধারে বৃষ্টি নামলো। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার জন্য রাস্তার পাশে এক চা স্টলে গিয়ে বসলো। তখন ই তার মনে হল পাশের টেবিলে ছোট ছোট দাঁড়ি গোফের যে ছেলেটা অট্টহাস্যে চার পাঁচজনের আড্ডাটাকে মাতিয়ে তুলছে সে কেমন যেন চেনা চেনা।
একটু খেয়াল করে যখন মনে হল সেটা আর কেউ নয়, ঐদিনকার উপকারী মানুষটা। তখন টেবিল ছেড়ে আড্ডার মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াতেই ঐ ছেলেটা মুখ তুলে তাকিয়ে বলল
-আরে আপনি? সুস্থ্য হয়ে গেছেন?
সুমন মুচকি হেসে মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিল যে,সে সুস্থ্য হয়ে গেছে। ছেলেটা আবার বলল
-আসুন,বসুন। এই কালু, এখানে একটা চা দে তো।
সুমন বসলো না। না বসেই বলল, ঐদিনকার জন্য অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

বৃষ্টি ছেড়ে দিয়েছিল। সুমন না বসে বলল
-আমি আসি৷ একদিন বাসায় আসবেন।
বলেই চলে গেল।
তারপর আরো অনেকগুলো দিন। এখানে ওখানে দেখা হত৷ কখনো সুমন এড়িয়ে গেছে। কখনো ছেলেটা। কথা বলা, কুশল বিনিময় করা অথবা দু পা হাঁটা যেন আলাদা বিড়ম্বনা।সেই বিড়ম্বনা কাটাতে যখন দুজন ই তৎপর ঠিক সেই সময়টাই ইশ্বর ভিন্ন চিন্তা নিয়ে ব্যস্ত।
খাবার টেবিলে একদিন সুমনের মা কথা প্রসঙ্গক্রমে বলল
-নিবিড়কে একদিন বাসায় আসতে বলিস। ছেলেটা ঐদিন অনেক করেছে।
সুমন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল
-নিবিড় কে?
সুমন যতটা অবাক হল তার মা তার চেয়ে দ্বিগুন অবাক হয়ে বলল
-নিবিড় কে চিনিস না? অহনার সাথে পড়ে। ঐদিন যে ছেলেটা তুকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে গেল।
সুমন মুখে খাবার দিতে দিতে বলল
-ও তাহলে ছেলেটার নাম নিবিড়। তা আমাকে কেন বললে? অহনাকে ই তো বলতে পারো।
-অহনার বলায় আসবে না। অহনা কয়েকবার বলেছে। খুব ই ভাল ছেলে৷ নারে,সুমন?
সুমন কিছু বলেনি। খাবার টেবিল থেকে উঠে গেল কিছু না বলে।
এতগুলো বছর চলে গেল। কিন্তু সুমনের কাছে মনে হয় সেদিনকার ঘটনা। এই তো সেদিন কলেজের সামনে নিবিড়কে দেখতে পেয়ে ডেকে নিয়ে বাসায় একদিন আসতে বলে সুমন সারা রাত জেগে রইল। বারবার ইচ্ছে করছিল, একদিন দুজন বসে গল্প করলে,পাশাপাশি বসে, হাতে হাত রেখে কথা বললে মন্দ হত না।অথচ সেইদিন গুলো অনেক পুরানো হয়ে গেছে।কোন দিন আর ফিরবে না। মরে পঁচে যাওয়ার মত বিলিন হয়ে গেছে৷

মিতু বাসায় ফিরলো সন্ধ্যার দিকে। সুমন তখন ছাদে বসে ছিল। মিতু চুপচাপ এসে পাশে দাঁড়ালো।সুমন ফিরে মিতুর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল
-এত দেরি করলে কেন? কোন সমস্যা?
-অহনার বাসায় গিয়েছিলাম।রাস্তায় দেখতে পেয়ে টেনে নিয়ে গেলো।
-কেমন আছে ও?
-ভাল৷ তোমার কথা জিজ্ঞেস করেছিল।
-ও
সুমন আর অধিক কথা বলল না। নিজের রুমে চলে গেল।
নিবিড় আর অহনা ছিল হরিহর প্রাণ৷ অথচ, ঐদিনকার আগে সেটা ওর জানা ছিল না। সারাদিন, বই নিয়ে ব্যস্ত থাকা ছেলেটা কিছু ই জানতো না। সমাজ,পরিবার,বন্ধুত্ব,আড্ডা আর ভালবাসা তো শিখিয়েছিল নিবিড়।
একদিন সারাদিন রুমে বসে থেকে থেকে যখন বিরক্তি চরম সীমানায় তখন অহনাকে ব্যস্ত হয়ে নিচ তলায় যেতে দেখে জিজ্ঞেস করল
-কী হয়েছে রে?
অহনা মুখ বাঁকা করে বলল
-কিছু না।
সুমন আগ্রহবশত ঘর ছেড়ে বের হতেই দেখে নিচে নিবিড় আর দু একজন ছেলে মেয়ে আড্ডায় মজে আছে। সুমনের দৃষ্টি আটকে গেল নিবিড়ের দিকে৷ কি মুগ্ধকর ছেলেটা,তার হাসি,শরীরের ভাষা,চোখ আর মাথার কুকড়ানো চুলগুলো। সুমন মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল। নিবিড়ের চোখ উপরের দিকে যেতেই সুমন চোখ ফিরিয়ে নিল।সুমন নিজের রুমে গিয়ে বসতেই, নিবিড় এসে দরজার পাশে দাঁড়াল।
-আসব?
সুমন লজ্জায় লাল হয়ে বলল
-হুম আসো। বলতে হবে নাকি?
নিবিড় এসে একদম সুমনের শরীর ঘেঁষে বসলো। সুমনের ভেতরটা কেমন করে উঠলো। মনে হল, ওকে একটু ছোঁয়ে দেখতে, ইচ্ছে করছিল কোন এক আদমতায় ভেসে যেতে। ভেতরে ভেতরে সে কি ভাঙ্গন। বদ্ধ ঘরে মিনিট দশেক দুজনেই বসে ছিল চুপচাপ। কথা বলল নিবিড়
-একদম বের হন না, বাসা থেকে?
-হয় তো। তবে কম।
-যাবেন একদিন আমার সাথে?
সুমন নিবিড়ের দিকে তাকালো। তার চোখের দিকে চোখ রেখে বলল
-হুম।যাব। কোথায় নিয়ে যাবে?
-কাল সকালে আসবো।
বলে উঠে গেল নিবিড়। সুমন কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।

সারা রাত তার কেটেছিল ঘুমহীনভাবে। ভোরের দিকে চোখ লেগে গিয়েছিল। আর তখন ই ঘটল জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত ঘটনা৷ নিবিড়কে স্বপ্নে দেখে তার স্বপ্ন দোষ হল। লজ্জায় ঘুম ভেঙ্গে গেল তার।ফ্রেশ হয়ে নিচে যেতে দেখলো নিবিড় বসে আছে। সে আজ পাঞ্জাবি পড়েছে। পাঞ্জাবীতে তাকে অন্যদিনের চেয়ে সুন্দর লাগছে। সুমন কিছুক্ষণ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল।
সেদিনকার ঘটনাগুলো তার হৃদয়ে এমনভাবে গেঁথে আছে যে চাইলে ই ভুলা যাবে না। সুমন শতবার চেয়েছে ভুলে যেতে কিন্তু হৃদয় যেখানে বন্দি সেখানকার স্মৃতি ভুলাটা কি এতই সোজা?
ঐদিন নিবিড় সুমনকে নিয়ে গিয়েছিল পুরানো এক শশ্মান ঘাটে। বড় বড় বট গাছ, পাশে সরু নদী, যার পানি ছিল কাক চক্ষুর মত স্বচ্ছ।স্নিগ্ধ বাতাসে বটতলায় বসে সেদিন প্রাণ জুড়িয়ে গিয়েছিল সুমনের। সেদিন প্রথমবার নিবিড়ের কপালে সুমন চুমু খেয়ে বলেছিল তার মনের কথা৷ বলেছিল, তার হৃদয়ের আবেদন। সেই দিন শশ্মানে ঘাটে বসে এক যুবক আরেক যুবকের প্রেমে পড়ে ইশ্বরকে সাক্ষী রেখে প্রতিজ্ঞা করেছিল চিরকাল এক সাথে থাকার।
তারপরে বহুদিন বহুবার তাদের দেখা হত৷ একটা সময় দুজন দুজনের জন্য মত্ত থাকতো। মস্তিষ্কের প্রতিটি নিউরনে আশ্রয় হল পরস্পরের।
এতটা সময় পার হয়ে গেছে।সুমন এখন সাংসারিক।মিতু নামের একজনের স্বামী। যখন রাত হয় দুজন একি বিছানায় পাশাপাশি শোয়ে থাকে। আবেগে মিতু কখনো সুমনের শরীরে হাত রাখে৷ তার বুক পশমে আলতো করে বিলি কাটে। সুমন শুধু মিতুকে কষ্ট দিবে না বলে তার কপালে চুমু খায়। তার শরীর স্পর্শ করে। তাকে বুঝতে দেয় না যে, সে যখন তাকে স্পর্শ করে তখন ভেতর কাঁপিয়ে কান্না আসে। তার শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে নিবিড়ের স্পর্শ মিশে আছে। তার মনে পড়ে সেই দিনটার কথা, যেদিন প্রথম নিবিড় তার হাতটা শক্ত করে ধরে বলেছিল,চিরকালের তৃপ্তিদায়ক সেই কথা ‘ভালবাসি’।তার মনে পড়ে সেই রাতের কথা যেদিন নিবিড় সুমনের বুকে মাথা রেখে ঘুম ঘুম কন্ঠে বলেছিল ‘ছেড়ে যাবে না তো”
এক সন্ধ্যায় বাসায় সেদিন কেউ ছিল না। নিবিড় এসে হাজির আনন্দচিত্তে৷ সুমন নিবিড়কে দেখতে পেয়ে ভেতরকার উচ্ছ্বাস দমিয়ে পলকহীন চোখে জিজ্ঞেস করল
-এই সন্ধ্যায়?
নিবিড় সোফায় গাঁ এলিয়ে বসে বলল
-তোমার হাতের রান্না খেতে এসেছি। অহনা বলল তার ভাই নাকি ভাল রাধে।
সুমন মুচকি হেসে রান্না ঘরে ঢুকে গেল। সেদিনকার পরে, নিবিড় শতবার শতবাহানায় সুমনের হাতের রান্নার আবদার করে বসত।
সম্পর্কটা যখন নিজেদের মত করে বড় হচ্ছিল তখন ই ঘটে গেল অদ্ভুত কিছু ঘটনা৷
চিরকাল বন্ধু হয়ে থাকা মিতু বাসায় জানিয়ে দিল, বিয়ে করলে সে সুমনকে ই করবে।
সুমন খবরটা শোনার পর মিতুর সাথে দেখা সাক্ষাৎ বন্ধ করে দেয়। এতে কিন্তুর মিতুর মধ্যে কোন পরিবর্তন আসেনি। সে তারমত ই।সারাদিন চিকন ফ্রেমের চশমা পড়ে সে বই কুলে নিয়ে বসে থাকে। খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দেয়নি তবে একবেলা এক মুষ্টির বেশি তাকে কেউ খেতে ও দেখেনি। বাবা, মা বড় ভাই সবাই তার পক্ষে৷ কিন্তু যে মানুষটার জন্য তার এত কষ্ট সে ছিল বিপক্ষে।

অহনা তখন উভয় সংকটে। একদিন নিবিড়কে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিল, সুমনের সাথে এত আন্তরিকতার কারন কী? নিবিড় কিছু বলেনি। কিন্তু অহনা নিবিড়ের চোখ মুখ দেখে যে বিষয়টা বুঝেছিল সেটা ভেবে তার রাতে ঘুম হচ্ছিল না।
অহনা কি বুঝতে পেরেছিল যে,তার ভাই প্রচন্ডরকম ভালবাসে নিবিড়কে। নাকি সে ও অন্যদের মতই ছিল।
সুমনের প্রায় মনে পড়ে।। রাতের খাবার টেবিলে মিতু সুমনের প্ল্যাটে তরকারি দিতে দিতে বলল,
-অহনা বলছিল আমাদের দুজনকে একবার তার বাসায় যেতে। যাবে একদিন?
-না। তুমি যাও৷ আমার সময় হবে না।
সুমনের গম্ভীর উত্তর শুনে মিতু চুপ হয়ে গেল৷ পুনরায় কোন প্রকার প্রশ্ন না করে নিঃশব্দে খাবার খেয়ে উঠে চলে গেল।
ছাদে গিয়ে সে আর তার চোখের পানি আটকাতে পারেনি। ভেতর ফেটে কান্না আসছিল। নিজেকে কোনভাবে শান্ত করে চোখের পানি মুছে নিচের দিকে নেমে গেল। সুমন কিন্তু ঠিক ই বুঝেছে যে মিতু তার গৃহে ভাল নেই। আসলে কেউ ই ভাল নেই। সবাই একি যন্ত্রনা নিয়ে চলছে।
এই যন্ত্রনাটা শুরু হয়েছিল সেদিন,যেদিন মিতু হাতের রগ কেটে ফেলেছিল।নিবিড় আর অহনা তখন উভয় সংকটে। অহনা জানে তার ভাই অন্য আটদশটা ছেলের মত নয়। সে জানে তার ভাই নিবিড়কে ভালবাসে৷ সারা জীবন একি সাথে থাকার জন্য তারা ওয়াদাবদ্ধ৷ কিন্তু, তবো অহনার ভয় হত। সমাজ আর পরিবারের ভয়। তার বন্ধু নিবিড় আর সুমন কি সমাজ আর পরিবার এড়িয়ে বাঁচতে পারবে?সেদিন অহনা নিবিড়কে জিজ্ঞেস করেছিল, তার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি। নিবিড় মুচকি হেসে বলেছিল
-সারা জীবন তুদের সাথে থাকা।
অহনা চোখ দুটি উপরে তুলে বলল
-আমাদের সাথে মানে?
-তুই, সুমন।
অহনা আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি। চলুক। তারা ভাল থাকলেই সে খুশি। অথচ কিছুদিন যেতে না যেতেই বাড়ি থেকে সুমনকে বিয়ের জন্য চাপ দিতে শুরু করল৷ একদিকে মিতুর সুইসাইড করার চেষ্টা, অন্যদিকে সুমনের বাবা মায়ের প্রেসার সব মিলিয়ে সুমনের জীবন তখন ভয়াবহ নরকে পরিপূর্ণ হয়েছে।
ঘটনা সেখানে ও থেমে থাকেনি। সুমনের আম্মু নাওয়া খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। একজন সন্তান সব যন্ত্রনা আর পরিতাপ সহ্য করে নিতে পারে। কিন্তু মায়ের কষ্ট সহ্য করা তার পক্ষে সহজ না। সুমন ও পারেনি৷ সে রাজি হয়ে যায় মিতুকে বিয়ে করার জন্য। শুরুতে অহনা এই বিয়ের বিপক্ষে ছিল। সে মন থেকে মেনে নিতে পারেনি তার ভাইয়ের নরক ভোগ।
নিবিড় তখনো কিছু জানতো না। সে গ্রামে গিয়েছিল তার নানা ভাইয়ের অসুস্থ্যের কথা শুনে। অহনা,সুমন কেউ তাকে কিছুই বলেনি। নিবিড় সুমনের সাথে যোগাযোগের অনেক চেষ্টা করে বারবার ব্যর্থ হয়ে গ্রামে যাওয়ার চতুর্থ দিনের মাথায় অহনাকে কল করল।

সেইদিন সুমনের গাঁয়ে হলুদ। অহনা নিজের রুমে দরজা বন্ধ করে বসে আছে। বাড়ি ভরতি মানুষ। নিবিড়ের ফোন পেয়ে তার বুকটা কেঁপে উঠল। সে কী বলবে নিবিড়কে? সব কিছু শোনার পরে নিবিড় বেঁচে থাকতে পারবে তো? যে মানুষটাকে এতটা ভালবাসে, যে মানুষটাকে নিয়ে এত স্বপ্ন সাজালো, যে মানুষটা তাকে চিরকাল একসাথে থাকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, সে যখন তাকে ছেড়ে আইনত,সামাজিকভাবে আরেকজনের হয়ে যাবে সেটা কি মেনে নিতে পারবে নিবিড়। অহনার সাহস হয়নি ফোনটা ধরার।
ঐদিকে সুমনের বিয়ের দিন নিবিড় উন্মাদের মত ছুটে এল। বাড়িতে আলোক সজ্জা,গেইট আর লোকারণ্য দেখে তার বুকটা মুচড় দিয়ে উঠল। তিন চার মিনিট গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে রইল বরফের মত।এক সময় চোখের সামনে যখন গাড়িটা এসে থামল তখন তার দৃষ্টি গেল সেই গাড়িটার দিকে। তাকাতেই তার মনে হল পৃথিবীটা ধবংস হয়ে যাচ্ছে।মাথাটা ভনভন করতে লাগলো, গলা শুকিয়ে গেল, পা কাঁপতে লাগল। খানিকের জন্য তার মনে হল সব স্বপ্ন৷ মিথ্যা। গাড়িতে বউ নিয়ে যে বসে আছে সেটা সুমন না। অন্য কেউ৷
সুমন গাড়িতে মাথা নিচু করে বসে ছিল।সে তাকিয়ে ও দেখেনি যে, একটা ছেলে অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে। যার চোখের পানি গাল বেয়ে ঝড়ছে।
তারপর সুমন অনেকবার চেয়েছিল নিবিড়ের সাথে যোগাযোগ করতে৷ কিন্তু সে খোঁজে পায়নি৷ অহনা,সুমন অথবা নিবিড়ের বন্ধু বান্ধব কেউ ই তার খবর রাখেনি। একটা মানুষ বিলিন হয়ে গেল। কেউ তার খবর রাখেনি। এমন কি নিবিড়ের নানা বাড়িতে ও তার কোন খবর ছিল না৷ অহনা এর পরে আর কোন দিন সুমনের সাথে কথা বলেনি। প্রচন্ড অভিমানে সে বাড়ি ছেড়ে হোস্টেলে উঠে গেল। আর ফিরেনি।
এতগুলা বছর হয়ে গেল অথচ সুমন আর কোন দিন তার খবর পাইনি। হারিয়ে গেছে চিরতরে।
দেখতে দেখতে পাঁচটা বছর চলে গেল। সুমন অনেকটা মরে যাওয়ার মত বেঁচে আছে। মিতুর সাথে মিছে মিছে সংসার। লোক দেখানো মিছে সম্পর্ক। পাঁচ বছর আগে যে ছেলেটা তাকে ছেড়ে চলে গেছে, তার জন্য তার ভেতরটা সারাক্ষণ কাঁদে৷ইশ্বরের কাছে একটাই প্রার্থনা কোন একদিন পথ চলতে চলতে যেন তাদের দেখা হয় যায়।

গ্রামের নাম মুকুন্দপুর। চারদিকে মেঘনা। মাঝখানের চরে জেগে উঠেছে গ্রাম৷ আধুনিক সুবিধা বঞ্জিত এলাকা। বিদ্যুৎ নাই, বাজার নাই। বাজারের জন্য যেতে হয় নদীর ঐ পাড়ের গোসাইপুরে৷ সেখানে ও সব কিছু পাওয়া যায় না। বোর্ড অফিসের বাজারে যেতে হয়। সেখানে একটা হাসপাতাল আছে। পঁচিশটা বেড। দুইজন ডাক্তার৷ সাতজন সহকর্মী।স্কুল আছে। একটা প্রাইমারি আরেকটা হাই স্কুল।গ্রামের ছেলে মেয়ের এর চেয়ে বেশি পড়ার সুযোগ হয় না। এইবার বোর্ড পরিক্ষায় বসেছে মোটের উপর বারোজন। একজন মেয়ে। নাম কইতরী। তার বাড়ি মুকুন্দপুর। কইতরী মুকুন্দপুর গ্রাম প্রধানের মেয়ে।সৌন্দর্যে চোখে ধাধা লেগে যায়৷ মেধাবী।

কইতরীর খুব ইচ্ছা শহরে গিয়ে কলেজে পড়ার৷ কিন্তু তার বাপজানে রাজি হবে না। মাইয়া বড় হয়ছে। মাইয়ার বিয়া দেওয়া লাগব। মা মরা মাইয়া। সে প্রায় লজিং মাস্টার ও বোর্ড অফিসের হেডমাস্টার নিবিড়ের সাথে আলাপ করে। কী করবে মাইয়ারে নিয়া৷ নিবিড় এলাকায় আসছে দু বছর হল। এই দুইবছরে ই সে স্কুলের আর এলাকার চেহারা পাল্টে দিয়েছে। বোর্ড অফিস,গোসাইপুর,মুকুন্দপুরের মানুজন তাকে দেবতা তুল্য সম্মান করে৷ পঁচিশ ছাব্বিশ বছরের ছেলে, দেখতে রাজপুত্রের মত, স্কুলের হেডমাস্টার,তারুপরে চমৎকার স্বভাব চরিত্র। যে কেউ অবাক হয় দেখে। এলাকার সবাই তারে যুবা মাস্টর ডাকে। নিবিড় নিজে ও ভুলে গেছে যে তার একটা নাম ছিল। সে ও নিজেকে যুবা মাস্টর বলতেই সাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
নিবিড় মুকুন্দপুর গ্রামে থাকে। নদীর পাশে ছোট একটা ছন দিয়ে বাধা ঘর।ভেতরটা বেশ গোছানো। আধুনিক কালের কর্টেজগুলোর মত।ছোট একটা খাট।তাতে ফুলের নকশা করা।চরে গাছপালা তেমন নেই। কিছু নারিকেল গাছ আর তরমুজ। দু একটা দোকান আছে৷ সেখানে সারাদিন ট্যাপ বাজে।অদ্ভুত অদ্ভুত কিছু গান।

নিবিড়ের ছোট কুড়ে ঘরটার বা দিকে কাঠের তক্তা আর গাছের ডাল দিয়ে বুকসেলফের মত করে সাজানো। সেখানে অনেকগুলো বই রাখা।দুইটা ছোট ছোট টুল। একটাতে একটা ল্যাম্প আরেকটাতে পানি খাওয়ার জগ। সে খাবার খায় কইতরীদের বাসায়। কইতরীর আপন মা নেই৷ দুইজন সৎ মা।তারা কইতরীকে অনেক আদর করে। না করে ও উপায় নেই৷ কইতরীর বাবা মেয়ের অযত্ন একদম মেনে নিতে পারেন না।সেই ভয়ে কইতরীর দুই মা সারাক্ষণ কইতরী কইতরী করে মরে।
বাসায় ফিরতে ফিরতে নিবিড়ের সন্ধ্যা৷ সন্ধ্যা মানে এই চরাঞ্চলে রাত।সে গিয়েছিল গোসাইপুর। শহর থেকে কিছু বই আনিয়েছে৷ এই অঞ্চলে বই পাওয়া দুষ্কর।
বইগুলো চৌকিতে রেখে কাপড় ছাড়তে ছাড়তে হঠাৎ করেই তার দু চোখ ভিজে উঠল৷

ইদানিং প্রায় এমন হয়৷ অকারণেই বুক ফেটে কান্নার ঢেউ উঠে৷ কিছু কথা,কিছু ব্যথা হৃদয়টা এলোমেলো করে দেয়।নিবিড় বিছানায় ধপাস করে বসে পড়ল৷ তার মনে হল সে খুব একা।
মা বাবা মারা যাওয়ার পর মামার পরিবারের বড় হয়েছে সে।যত্নের বদলে তাচ্ছিল্য ই বেশি পেয়েছিল। একটু ভালবাসা, একটু যত্ন, আদর করা অথবা খেয়াল রাখার মত তেমন কেউ ছিল না। সতেরো আঠারো বছর বয়সে যখন সুমনের সাথে পরিচয় তখন তার মনে হয়েছিল যে, সে সুখি৷ এইবার সুখ ধরা দিয়েছে। কিন্তু সেই সুখ টিকেনি৷ টিকেনে বলেই আজ নিবিড় এতগুলা রক্তের সম্পর্কহীন মানুষের সাথে বেঁচে থাকার লড়ায়ে ব্যস্ত।
নিবিড় কাপড় ছেড়ে পায়জামাটা পড়ে বাহিরে বের হয়ে এল। জায়গাটা বেশ নিরব৷ একটু দূরেই নদী। সেখান থেকে ঢেউয়ের শব্দ আসছে। বাতাস সেই শব্দ মিশে অপুর্ব সংগীত সৃষ্টি করে৷ নিবিড় মুগ্ধ হয়ে শুনে সেই শব্দ৷ মাঝে মাঝে শেয়াল ডাকে। শেয়ালের কন্ঠে আর্তনাদ। নিবিড়ের ভেতরে ও তেমন একটা শব্দ তৈরি হয়। সেটা কষ্টের শব্দ। হৃদয়ের পাড় ভাঙ্গার শব্দ। নিবিড় বেঁচে থাকার জন্য সারাদিন শতভাবে ব্যস্ত থাকে৷ কিন্তু যখন ই রাত হয় তখন ই তার বুক ফেটে কষ্টের ফোয়ারা নামে।

অহনা গোসল সেরে বের হতেই দেখল জাবের গভীর ঘুমে। জাবেরের পোস্টিং হয়েছে এই অঞ্চলে।তার একা আসার ই কথা ছিল, কিন্তু অহনা ছাড়েনি। ওর শরীররা বেশি ভাল নেই। ডাক্তার মানুষ।ঠিকমত খাবার খাওয়া, রুটিন অনুযায়ী চলাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু জাবের তা করে না। ফলস্বরূপ অহনার আসতে হয়।
হাসপাতালটা ছোট। এলাকাটা বোর্ড অফিস নামে পরিচিত৷ চারজন নার্স,একজন ওয়ার্ড মাস্টার,একজন আয়া আর দু জন ডাক্তার ছিল এতিদিন৷ নানান কারন দেখিয়ে একজন চলে যাওয়ার কারনে জাবেরের পোস্টিং৷ আজ জাবের জয়েন করবে।অহনা সকাল থেকে তাকে টানা ডেকে যাচ্ছে৷ কিন্তু জাবের কুম্ভ কর্ণের মত ঘুমাচ্ছে তো ঘুমাচ্ছেই।

হাসপাতালে নতুন ডাক্তার আসবে শুনে নিবিড় কিছুটা স্থির হল। দুদিন যাবত চিন্তায় অস্থির হয়ে ছিল সে। এতগুলা রোগী একজন ডাক্তারের পক্ষে দেখা সম্ভব না।তারুপরে আবাহাওয়া পরিবর্তনের ফলে গ্রামের ছোট ছোট বাচ্চারা নানান সংক্রামক রোগে বিপর্যস্ত। নিবিড় ভেবেছিল দুপুরের দিকে একবার নতুন ডাক্তারকে দেখতে যাবে কিন্তু হঠাৎ করেই মুখন্দপুরের দুই ভাইয়ের মধ্যে জমি জমার জের ধরে ঝামেলা লেগে যাওয়াতে স্কুল থেকে সেখানে চলে যেতে হয়েছিল। ঝামেলা মিটতে মিটতে বেলা পড়ন্ত। গোসল দিয়ে খেতে বসার সময় শুনলো নতুন ডাক্তারের বিবরণ। স্ত্রীসহ এসেছেন তিনি। বাচ্চা কাচ্চা নেই।লম্বা চৌড়া ডাক্তার। মুখের ভাষা অতি মধুর৷ পুরানো ডাক্তারের মত না।নিবিড় আশ্বস্ত হল।
এলাকার মানুষগুলোর জন্য তার খুব মায়া হয়। সব কিছুতেই তারা পিছিয়ে। এইবার যদি কিছুটা সামনের দিকে আগাতে পারে।নিবিড় যতদিন আছে এলাকার উন্নতি নিয়েই ভাবছে৷

সুমন ঘুম থেকে জেগেই দেখে তার চোখ ভেজা। সে কি স্বপ্নে কেঁদেছিল? মনে পড়ছে না। তবে মনটা অস্থির হয়ে আছে।নিবিড়ের কথা মনে পড়ছে। সুমন তার বুকের বাম পাশে হাত রাখল। নিবিড় প্রায় তার বুকে হাত রেখে বলত
-এইখানে আমি থাকি?
সুমন নিবিড়ের কপালে চুমু খেয়ে বলত
-হুম,এইখানে আমার কলিজা থাকে।
নিবিড় আনন্দে জড়িয়ে ধরত।
সেই দিনগুলো, সেই নিবিড় হারিয়ে গেছে। সুমনের বুকে কেবল শূণ্যতা। ভয়ানক শূণ্যতায় ভরে গেছে সুমনের জীবন।
খাবার টেবিলে সুমন চুপচাপ ই ছিল। কথা বলল মিতু
-জাবেরের ট্রান্সফার হয়েছে, শুনেছো?
-না তো। কবে হল?
-দিন পাঁচেক।
-কোথায়?
-নাম জানি না। তবে গ্রামাঞ্চলে। অহনা সাথেই।
-ও গেল কেন?
-তা তো জানি না। তুমি কল দিও তো একবার মনে করে।
-দিব।
সুমন উঠে গেল।অহনা খাবার প্লেটে কিছুক্ষণ আঙ্গুলগুলি নাড়াচাড়া করে উঠে গেল।জীবনে সে সুখ চেয়েছিল কিন্তু আজ এই চাপা কষ্ট নিয়ে তাকে বেঁচে থাকতে হচ্ছে।

নিবিড় নদীর পাড়ের নৌকার গলুইয়ে বসে বসে বই পড়ছিল। হঠাৎ ঐ পাড় থেকে কারো আওয়াজ আসল।নিবিড় বই থেকে মাথা তুলে ঐপাড়ে তাকাতেই খেয়াল করল জনৈক ভদ্রলোক তাকে ডাকছে। হয়তো এইপাড়ে আসার জন্য, ঘাটে ভিন্ন কোন নৌকা ও নেই৷ খেয়া পারাপার বন্ধ। নিবিড় নৌকা ঐ পাড়ে নিয়ে গেল। ভাল করে খেয়াল করতেই বুঝল এটা নতুন ডাক্তার সাহেব৷
-স্লামুয়ালাইকুম ডাক্তার স্যার।
-আপনি যুবা মাস্টার?
নিবিড় মুচকি হেসে সম্মতি দিল।
-উঠেন।
জাবের নৌকাতে উঠে বসল।নিবিড় বৈঠা হাতে নৌকা বায়তে লাগল৷ নৌকায় দুজন ই নিরব ছিল। ঘাটে নামার আগে জাবের বলল
– এলাকার লোকজনের মুখে তো কেবল আপনার নাম ই শুনি
নিবিড় আবারো মুচকি হাসলো। নিবিড়ের হাসি দেখে জাবের বলল
-আপনার হাসি খুব সুন্দর। আমার স্ত্রী এমন হাসি খুব পছন্দ করে।
-হাসির রূপভেদ আছে নাকি?
-আছে বৈকি, অবশ্যই আছে। সেটা আমার স্ত্রী সবচেয়ে ভাল বুঝে।আসুন না একদিন।
-আসাটা অবশ্যই উচিত। আসব একদিন। তা এখন কোথায় যাচ্ছেন?
-মুখন্দপুর গ্রাম প্রধানের বাড়ি।
-কীসের জন্য?
-চলুন। গেলেই বুঝবেন।
নিবিড় অবাক হল। সে ডাক্তার জাবেরকে অনুসরণ করল৷ সে ভেবে পাচ্ছিল না, জাবের সাহেব পূর্ব এই অঞ্চলে এসেছিলেন কি না।

অহনা সকাল থেকে বিষণ্ণ।তার ঢাকা ফিরে যাওয়া উচিত। কিন্তু জাবের সেই বিষয়ে উদাসীন। কিছুক্ষণ আগে বের হয়ে গেছে৷ ফিরবে সন্ধ্যায়। অহনা একা একা থাকবে। যেটা ওর ভাল লাগে না একদম। নয়টার দিকে সুমনে কল করেছিল অনিচ্ছার পরে ও কথা বলেছে। ভাইয়ের বিষণ্ণ কন্ঠস্বর তাকে আরো বিষণ্ণ করে দিয়েছে। আচ্ছা, এমনটা হতে পারে না যে, নিবিড় আবার তাদের জীবনে ফিরে আসবে৷ আবার আনন্দে ভরে উঠবে তাদের জীবন। অহনার চোখ ভিজে উঠে৷

সন্ধ্যার দিকে নিবিড় নিজের ঘরে ফিরল। বাতি জ্বালিয়ে হাতে রাখা বইটা টেবিলের উপর রাখতে রাখতে চোখ মুছলো।তার ভেতরটায় এখন ভয়ানক ঝড় বয়ে চলছে। যাদের কাছ থেকে এতদিন সে পালিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছে আজ তারা তার সম্মোখে। বিকেলের দিকে যখন সে জাবেরের সাথে তার বাসায় গিয়েছিল তখন সে বিস্ময়ে হতভাগ হয়ে খেয়াল করল যে, জানালায় যে মেয়েটাকে দেখা যাচ্ছে সেটা অহনা। সুমনের বোন। সে আর ভেতরে যাইনি। পরিচিত হওয়ার আগেই সে দৌড়ে চলে এসেছে৷ যা ভেসে গেছে, বিলিন হয়ে গেছে তাতে আর সে মিশতে চায় না।

সুমনের সাথে পরিচয় হওয়ার আগে, অহনা নিবিড়ের কান পঁচিয়ে দিয়েছিল তার ভাইয়ের প্রসংশা করতে করতে। তার ভাই এমন, তার ভাই ওমন। তা শুনে শুনে নিবিড় মুগ্ধ হয়ে যেত। একটা সময় ভাগ্য ই তাদের মিলিয়ে দিয়েছিল। সেইদিনের রিক্সা উলটে যাওয়ার ফলে, জীবন এমন উলটে যাবে তা নিবিড় ভাবেনি। প্রেমে পড়েছিল সে সুমনের। যখন দেখা হত, মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত। সেইবার বিকেলে, যেদিন পুরানো শ্মাশান ঘাটের নদীর তীরে বসে সুমন নিবিড়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল
-তোমাকে ভাল লাগে।
নিবিড় লজ্জায় লাল হয়ে বলেছিল
-কেমন ভাল লাগে?
-তুমি বুঝো না?
-না,বুঝিয়ে দেন।
সুমন নিবিড়ের হাতটা টেনে তার বুকের উপরে রেখে বলেছিল
-তুমি বুঝে নাও।
নিবিড় বুঝে নিয়েছিল। সেই ভালবাসায় সে তার সর্বস্ব সঁপে দিয়েছিল সুমনের চরণে। ফলস্বরূপ,আজকে তার এই নরক ভোগ।
নিবিড় গ্লাস থেকে এক শ্বাসে পানি খেয়ে ঘর ছেড়ে বাহিরে চলে আসল৷ কোন একটা কাজে তাকে ব্যস্ত থাকতে হবে। তাতে হয়ত, সে ভুলে থাকবে সব। বাহিরে দুইটা শেয়াল দাঁড়িয়ে ছিল। নিবিড়কে দেখতে পেয়ে তারা দৌড়ে চলে গেল। নিবিড় শেয়ালগুলোর যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে রইল। আজকে, এত দিন পর, অনেক কষ্টে মানসিক সেই ভয়ানক যন্ত্রনা থেকে বের হওয়ার পর আজ তার একি রকম কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে সে আগের মত উন্মাদ হয়ে গেছে। নিবিড় দ্রুত ভুলতে চাচ্ছে সব।

সারারাত নিবিড় বাহিরে জেগে ছিল। শেষ রাতে অনেকগুলো শিয়াল যখন একসাথে ডাকছিল তখন নিবিড়ের বুক ফাটা আর্তনাদ চরের বালুভূমিতে প্রতিধবনিত হচ্ছিল। সেই কষ্ট, সেই যন্ত্রনা, যা ভুলার জন্য নিবিড়ের সব ছেড়ে দেওয়া তা আবার ফিরে আসছে।
নিবিড় ঘরের বাহিরের টুলে বসে ভোর দেখছিল। ঠিক সেই সময় কইতরী এসে পাশে দাঁড়াল। নিবিড় খেয়াল করেনি৷ হুশ এল কইতরীর প্রশ্নে
-স্যারের কিতা শইল হারাপ?
নিবিড় চট করে নিজেকে সামলে নিল। মুচকি হাসার চেষ্টা করে বলল
-না তো।
-আফনের চোক মুক লাল হয়া লইছে।রাইতে কিতা ঘুমান নাই?
-ঘুমিয়েছি। তুমি যাও, বই নিয়ে বসো।
কইতরী সাথে সাথে চলে যায়নি। দুই তিন মিনিট অপেক্ষা করে তারপর গেল।যুবা মাস্টরকে এমনভাবে সে আগে কখনো দেখেনি। মানুষটার জন্য তার বড্ড মায়া হয়।তার চোখে পানি এসে গেছে। সে পানি লুকাতে চলে গেল। নিবিড় আরো কিছুক্ষণ বসে নদীর দিকে গেল গোসলের জন্য।

মাঝরাতে সুমনের ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল। রাতে সে ফিরেও ছিল অনেক রাতে। মিতু তখন ঘুমে। সে ফ্রেশ হয়ে শব্দহীনভাবে মিতুর পাশে শোয়ে পড়ল। মাঝরাতে সে স্বপ্নে দেখেছিল নিবিড়কে৷ নিবিড় খুব একটা বড় বিপদে পড়েছে। সুমন তাকে সেই বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য গিয়ে নিজেই বিপদে জড়িয়ে গেছে। ঘুম ভাঙলো নিবিড়ের নাম ধরে চিৎকার করে জেগে উঠে।মিতু তখন ও ঘুমে। সুমন জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তার মনে পড়ল তাদের প্রথম সঙ্গমের কথা।
সেদিন ছিল বৃষ্টির সন্ধ্যা।সুমন আর নিবিড় আটকা পড়ে গিয়েছিল পুরানো এক পোড়া বাড়িতে৷চারদিকে সন্ধ্যা নামার পূর্বেই মেঘের অন্ধকার।পাশাপাশি দুই যুবক। নিবিড়ের তখন সতেরো আঠারো বয়স।আবেগে স্থান কাল বিচার করার বোধশক্তি কম।সে ঝুঁকে সুমনের গলায় চুমু খেল। নিবিড়ের ঠোটের ছোঁয়াতে সুমন কেঁপে উঠল। সে নিবিড়কে টেনে বুকে জড়িয়ে ধরল৷ নিবিড় আবারো তার গলায় চুমু খেল৷ সুমনে প্রকম্পিত হয়ে নিবিড়কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার ঠোটে চুমু খেল। নিবিড় চুম্মনে সাড়া দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। বাহিরে তখন প্রবল বর্ষণ। নিবিড় তার হাতদুটি স্থির রাখেনি। সুমনের সারা শরীর স্পর্শ করতে লাগলো৷ একটা সময় নিবিড় তার এক হাতে সুমনের প্যান্টের জিপার খোলে ফেলল। সুমন নিজের সর্বস্ব নিবিড়ের হাতে সঁপে দিয়ে পরম প্রশান্তিতে ডুবে গেল।সুমন নিবিড়ের দেহের সর্বত্র চুম্মনে ভরিয়ে দিতে লাগল।
বাহিরের এই বর্ষার দিনে একটা সময় উভয় নিজেদের খোঁজে পেল প্রবল এক আবেগে৷ ভালবাসা আর সুখে সেই ভাঙ্গা গৃহে একজন আরেকজনের দেহের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।প্রেমের প্রথম সঙ্গমে তারা দুজন ই ছিল মুগ্ধ।
আজ এতদিন পরে মাঝ রাতে সেই দিনের কথা মনে পড়তেই সুমনের দু চোখ ভরে উঠল কষ্টের জলে। সে বাহিরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থেকে মনে মনে কয়েকবার নিবিড়ের নাম ধরে ডাকল।

সুমন যখন রাত জেগে নিবিড়ের কথা ভাবছিল নিবিড় তখন পুরানো দিনের কথা ভুলার জন্য মধ্যরাতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে নিজেকে সান্তনা দিচ্ছিল।বেঁচে থাকার জন্য নিবিড় কত কিছুই না করছে অথচ দিন শেষে সেই ভালবাসাই তাকে জাগিয়ে রাখে৷ যে মানুষটাকে ভুলার জন্য এত কিছু করে অথচ সেই মানুষটাকেই ভুলা যায় না। ভালবাসা যেন গলায় ফণিমনসার কাঁটার মত বিধে আছে।
সুমন নিবিড়কে বলত, কোন কারনে যদি তারা আলাদা হয়ে যায় তবে যেন সে সুমনকে না ভুলে৷ মনে রেখে দেয়৷ নিবিড় কি সুমনকে দেওয়া সেই কথা রাখার জন্য ই মনে রাখছে তাকে? কী জানি৷ ইশ্বরের কোন খেলায় পুতুল তারা।

অহনা বিকেলের দিকে গিয়েছিল বোর্ড অফিসের বাজারে। সেখানে তার সাথে কইতরীর দেখা৷কইতরীর সাথে তার অনেক কথা হল। সহজ সরল গ্রাম্য মেয়ে। চেহারাটা খুব মিষ্টি।সেখানেই সে শুনল যুবা মাস্টারের কথা৷ তার চেহারার বর্ণনা,মানুষের প্রতি মমত্ববোধের কথা, তার শিক্ষা, ভাল মানুষি। বলা যেতে পারে দীর্ঘ বার্তালাপে কইতরী কেবল যুবা মাস্টারের কথা বলতেই আনন্দিত ছিল। অহনা মেয়েটার শিক্ষকের প্রতি দুর্বলতার কথা বুঝতে পেরে মুখ টিপে বারবার হাসছিল।অহনার ও খুব ইচ্ছে হচ্ছিল একবার তাদের যুবা মাস্টারকে দেখার। ঐদিন জাবের ও বলছিল যুবা মাস্টরের কথা। অহনা প্রসঙ্গ ক্রমেই বলল
-যুবা মাস্টিরের নাম কী?
কইতরী চোখ মুখ বড় করে বলল
-আমি তো তা জানি না৷ আইচ্ছা,জিগায়া দেহুম নে।
কথা শুনে অহনা হেসে গড়িয়ে পড়ার উপক্রম৷
অহনা খেয়াল করল, এই অঞ্চলের লোকেরা যাকে দেবতুল্য সম্মান করে তারা কেউ ই তার নাম জানে না। অহনার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে গিয়ে ঠেকল যুবা মাস্টার।
বাসায় ফিরে অহনা টিভি চালিয়ে এক মগ কফি নিয়ে বসতেই জাবের এল৷ জাবের এত সন্ধ্যায় দ্রুত আসে না। অহনা তাকে ফ্রেশ হওয়ার কথা বলে কফি বানাতে গেল। জাবের বাথরুম থেকে ডাকল-
-অহনা খবর শুনেছো?
-কী খবর?
-ভাইয়া ভাবি আসছে।
-সুমন ভাইয়া?
-হুম
-কেন?
-আমি বলেছি আসার জন্য।
-কী জন্য বলেছো?
-আসলেই দেখবে। তোমাদের অবাক করে দেওয়ার জন্য।
-ধেৎ, তোমার কথা বার্তা কিছুই বুঝি না।
-বুঝবে গো, বুঝবে। সময় হোক।
জাবের গুণগুণ করে গান গায়তে লাগল।অহনা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলল
-ভাইয়া কবে আসছে?
-আজকেই।
-রাত হয়ে যাচ্ছে যে।
-হোক।
অহনা কিছু বুঝতে না পেরে কফির মগটা টেবিলে রেখে বারান্দায় চলে গেল।

নিবিড় বাসায় ফিরে বিছানায় গা এলিয়ে শোতেই বাতাস বইতে লাগল৷ ঝড়ের পূর্বাভাস। এই চড়াঞ্চলে ঝড় মানে ভয়ানক কিছু। নিবিড় ঘর থেকে বের হয়ে এল বাতাসেরর গতি বুঝার জন্য। ঘর থেকে বের হওয়ার পরেই সে নৌকা ঘাট থেকে শব্দ শুনতে পেল। মনে হয় ঐ পাড়ে কেউ আটকা পড়েছে। নিবিড় দৌড়ে গেল। যা ভেবেছিল তাই। নদীর ওপাড়ে দুজন মানুষ। নিবিড় নৌকাটা খোলে ঐপাড়ে নিয়ে গেল।
জীবন কখনো কখনো আমাদের রহস্যে জড়িয়ে বিস্মিত করে দেয়। যার চক্রে না পরার জন্য প্রাণ পণে লড়ি তার চক্রে ই পড়তে হয়। নিবিড়ের নিঃশ্বাস আটকে গেল। এতগুলা বছর পরে সুমন তার সামনে দাঁড়িয়ে৷ এই ঝড় তুফানের রাত্রে। তার হাত পা কেঁপে উঠল, পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। সে নিজেকে অনেক কষ্টে সামলে গলায় পেচানো গামছাটায় মুখ ডেকে তাদের এই পাড়ে নিয়ে এল।
সুমন খেয়াল করেনি। যে মানুষটার জন্য তার এত ছটফটানি, এত কষ্ট সেই মানুষটা আজ তার চোখের সামনে। তার বুক কেঁপেছিল ঠিক। মনে হচ্ছিল এই মাঝি তার চিরকালের পরিচিত কেউ কিন্তু সে নিশ্চিত ছিল না। বরং অবাক হচ্ছিল। এমন কিছু মনে হওয়ার কারনে।
নৌকা ঘাটে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই নিবিড় নৌকা ছেড়ে চলে গেল। মিতু মাঝির এমন অচারণ দেখে অবাক হয়ে গেল। সে সুমনের হাতটা শক্ত করে ধরে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছিল কিন্তু সুমন তখন নিবিড়ের খেয়ালে মজে।

জানি না ইশ্বর কী রেখেছে তাদের ভাগ্যে। তাদের ভাগ্যটা অনেকটাই এমন যে,প্রথমে মিলন লেখাই ছিল কিন্তু পরে তা মুছে দিয়েছে।ফলস্বরূপ এতটা ভালবেসে ও তারা আলাদা। এই যে শূণ্যস্থান, এই যে একাকিত্ব, তার অবসান কি কোন কালেই হবে না?

গোসাইপুর গ্রামের মানুষগুলো বড্ড সহজ সরল। পূর্বে আরো বেশি ছিল৷ অশিক্ষা আর কুশিক্ষায় আচ্ছন্ন মানুষগুলোর জন্য নিবিড় দিন রাত খেটেছে। তাদের ভাগ্যের আজ যে উন্নতি তা নিবিড়ের জন্যই। এখন নিবিড়ের যাওয়ার সময় হয়েছে।হুট করে এই গ্রামে জাবেরের বাসায় সুমনের আগমন নিবিড়কে প্রায় নাড়িয়ে দিয়েছে৷ যাদের নিয়ে তার মিছে মিছে বেঁচে থাকা তাদের ছেড়ে যাওয়াটা সহজ নয় তার জন্য৷
নিবিড়ের মনে প্রশ্ন জাগে, সুমন কি এখানে অনেকদিন থাকবে? নাকি চলে যাবে? চলতে চলতে যদি পথে দেখা হয়ে যায়৷ ঐ খারাপ লোকটাকে কী বলবে সে? যে তার সাথে ভালবাসার মিছে অভিনয় করে গেছে এতটা কাল?তার চোখে চোখ তুলে তাকাতে পারবে সে? ভুলে যাওয়া সময়গুলো ভেবে তার চোখ দিয়ে জল পড়বে না তো? নিবিড় কি পারবে পাথরের মত হৃদয় নিয়ে তার সামনে দাঁড়াতে?

এই অঞ্চলে সুমন এসেছে গতকাল রাতে। এখন সকাল নয়টা৷ সুমন, জাবের,অহনা,মিতু খাবারের টেবিলে। অনেক দিন পর তারা সবাই খুশি৷ সুমনের মন বিক্ষিপ্ত। জাবের মিতুকে শুধু এতটুকু বলেছে, সে নিবিড়ের খবর দিবে। তা শুনেই মিতু নিবিড়কে নিয়ে চলে এসেছে।মিতু এখন মনে প্রাণে চায়, নিবিড় ফিরে আসুক। ভালবাসার মানুষটাকে দিনের পর দিন এমন কষ্টে দেখতে সে ও চাচ্ছে না। নিবিড় ফিরে আসুক প্রশান্তি হয়ে তাদের জীবনে সেটা অহনার ও প্রত্যাশা৷ কিন্তু যা গত হয়েছে, বদলে গেছে অথবা চলে গেছে তা ফিরে আসাটা যে ততটা সহজ নয় সেটা এই চারজনের মধ্যে কেবল অহনা ই জানে।
জাবের একটা কলায় কামড় দিয়ে সুমনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল
-ভাইয়া কি একদম ই হাসেন না?
সুমন কিছু বলল না, বলল মিতু
-ও হাসে। স্বপ্নে।
মিতু সত্য ই বলেছে।সুমন স্বপ্নে ই বেশি হাসে৷ সে যখন নিনিড়কে স্বপ্নে দেখে, সে যখন স্বপ্নে নিবিড়ের হাতে হাত রেখে পথ চলে তখন ই কেবল সে হাসে৷ বাকি সময়, বাস্তবে সে হাসে না। ভেতরটা থেকে কোন প্রকার হাসি আসে না। কেমন জলন্ত আগুনের ধোয়া বের হয়।

নিবিড় ঘর ছেড়ে বের হতেই সামনে জাবের। তার হাতে কালো ব্যাগ । গলায় স্ট্যাথোস্কোপ আর পড়েনে নীল রঙের পাঞ্জাবী৷ তার মুখ হাস্যজ্জোল।নিবিড়কে দেখতে পেয়েই সে চোখ মুখে রঙিন আনন্দের আভা এনে কাছে এসে বলল
-কোথাও যাচ্ছেন নাকি?
নিবিড়, ভেবেছিল উত্তর দিবে না৷ কিন্তু সে দিল। মুখে অভিনয়ে একটা কোমল হাসি এনে বলল
-রাধানগর যাব একটু।
-বিশেষ কাজে?
-তেমন কাজে নয়। ঐখানকার এক ভদ্রলোকে খবর পাঠিয়েছে।
-আচ্ছা,যান৷ তবে সন্ধ্যার দিকে অবসর তো নাকি?
-সন্ধ্যা হোক।
বলেই নিবিড় হনহন করে হেঁটে চলে গেল। কথার পিঠে কথা বলে আত্মীয়তা বাড়াতে সে আগ্রহী নয়৷ সে এড়িয়ে যেতে চায়৷
জাবের অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখল বিস্মিত এই ছেলেটাকে। কত বিস্ময় তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে৷ সবাইকে মুগ্ধ করার অদ্ভুত ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছে সে। আর সেই জন্য এতগুলা মানুষ তার অনুপস্থিতির কষ্ট পাচ্ছে।

নিবিড় বসে আছে দু তলা বাড়িটার সামনে। রাধানগর সহ আশেপাশের একাকার সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি মইন চৌধুরি। তার বাবার মৃত্যুর পরে সে তার প্রভাব আরো বেশি বিস্তার করেছে। নিবিড় এসেছে একটা অভিযোগ নিয়ে। মেঘনায় যে ইঞ্জিন চালিত নৌকা আছে তার সব কয়টা ইদানিং বাধা হচ্ছে গোসাইপুর এলাকার ধানী জমির পাশে। যার ফলে নৌকার তেলে সেখানকার পানি দূষিত হয়ে যাচ্ছে। এতে দশবারোজন চাষীর সদ্য লাগানো চারা নষ্ট হয়ে গেছে। নিবিড় চাইলে থানায় যেতে পারত। কিন্তু গ্রাম প্রধানের কথায় তার এখানেই আসতে হয়েছে।
নিবিড় আধা ঘন্টা ধরে বসে। পুকুর পাড়ে সুন্দর বেঞ্জি পেতে বসার আয়োজন৷ চা দিয়ে গেছে। তাতে দুধের সর ভাসছে৷ নিবিড় চায়ে মুখ না দিয়ে পুকুরের রাজহংসিগুলো দেখছিল। এই সময় দু তিনজন লোক সহ মইন চৌধুরি এসে গলা ঝাড়ি দিয়ে মুখ বরাবর বসল। মইন ফিরে তাকাতেই, মইন চৌধুরি মুগ্ধ হলেন। তিনি মনে মনে ভেবে নিলেন
-এই তাহলে গোসাইপুরের যুবা মাস্টার। নাম-পরিচয়হীন একটা ছেলে যে গ্রামের রূপ ই পালটে দিয়েছে।
মইন চৌধুরির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লাঠি হাতের জনৈক ভদ্রলোক ভারি গলায় বলল
-কী বলবেন, বলুন৷ জনাবের যায়তে হবে।
নিবিড় তার অভিযোগ জানাল। মইন মনোযোগ দিয়ে শোনার পর বলল
-কাল আমি নিজে গিয়ে দেখে আসব।
নিবিড় সম্মানে চোখ নুইয়ে বলল।
-আপনাকে ধন্যবাদ। বলে উঠতে যাবে ঠিক সেই সময় মইন বলল।
-খানিক বসুন৷ পরিচিত হয়।
নিবিড় না বসেই বলল।
-আমি পরিচিত হওয়ার মত কেউ নয়।
মইন তাকিয়ে রইল।
নিবিড় হেঁটে যাচ্ছে। মইন সে দিকে তাকিয়ে৷ তার সারাক্ষণ মনে হতে লাগল, ছেলেটাকে সে চিনে। দেখেছে৷ পূর্বে, বহূবার৷ হয়ত জাগরণে অথবা ঘুমে।

মইন চৌধুরির বয়স ত্রিশ পঁয়ত্রিশ হবে হয়ত। শক্ত সবল লোক। মাথায় ঘন কালো চুল। গাঁয়ের রঙ শ্যামলা। বড় বড় চোখ৷ পেশি বহুল শরীর।মুখে এক দু ইঞ্জি লম্বা ঘন দাঁড়ি৷চওড়া বুক আর ভারী কন্ঠস্বর।যত দিন তার বাবা ছিল ততদিন বিয়ের জন্য পীড়াপীড়ি করেছিল৷ এখন বাবা নেই, মা, আর দু বোন আছে। তারা ও কম পীড়াপীড়ি করে না৷ কিন্তু, এই ঝামেলা সেই ঝামেলা বলে আর বিয়ে করা হচ্ছে না। সময় চলে যাচ্ছে, আর মইন চৌধুরির একাকিত্বের সময়টা ও দীর্ঘতর হচ্ছে৷

এখন বিকেল৷ সুমন,মেঘনায় সূর্য ডোবে যাওয়া দেখছে। এই দিকটা নিরব৷লোকজনের তেমন যাতায়াত ও নেই।বিকেলের দিকে কইতরি যুবা মাস্টারের কাছে যাবে বলে বাড়ি থেকে বের হতেই দূরে কাউকে বসে থাকতে দেখে এগিয়ে এল৷
-এই যে, আপনি কে?
সুমন ফিরে তাকাল। তার চিকন চশমার ঐপাশে যে মেয়েটা তার বয়স চৌদ্দ পনেরো হবে হয়ত।দারুন মিষ্টি মেয়েটা দেখতে।গ্রামাঞ্চলের মেয়েরা সাধারণত এমন হয় না৷ সুমন মুচকি হেসে বলল
-তুমি আমাকে চিনবে না মেয়ে।
-নাম কইলেন তো চিনি।
-আমার নাম সুমন। চিনলে?
-জে না৷ চিনি নাই৷
-হা হা হা হা
কইতরীর বিস্ময়ের সীমা রইল না। এই লোকটা একদম যুবা মাস্টারের মত হাসে। কইতুরির খানিক সময়ের জন্য ভ্রম হল। মনে হল এই লোকটার দেহের যে প্রতিবিম্ব পড়েছে জলে তা যেন যুবা মাস্টার নিজেই। লোকটার চোখে মুখে অদ্ভুত বেদনা। কইতরি বিস্ময়ে প্রশ্ন করল
-আফনি কি যুবা মাস্টারের কিছু লাগেন?
-যুবা মাস্টার! কে সে?
-আফনি চিনবেন না। বলেই চলে গেল সে।
সুমন তাকিয়ে রইল। খানিকের জন্য তার ও মনে হচ্ছিল যে, মেয়েটা নিবিড়ের কথা বলছিল না তো? তার বুক ভারী হয়ে এল।চোখ বন্ধ করে সে কয়েকবার নিবিড়ের নাম নিল।তার চোখে মুখে ভেসে উঠল সেই আঠার উনিশ বয়সের নিবিড়ের চেহারাটা। তার সদ্য গজিয়ে উঠা দাড়ি সুমন যখন জিহবার লালায় চুমু খেয়ে ভিজিয়ে দিত তখন নিবিড় সুমনের নাকে কামড় দিয়ে বলত
-তুমি কি আমাকে বড় হতে ও দিবে না?
-না। তুমি সব সময় ছোট ই থাকবা। যেন আমার বুকের পাশে মিশে থাকতে পারো।
নিবিড় হাসত। নিবিড়ের হাসি সুমনকে আরো বেশি প্রেমিক করে তুলত৷ সেই দিন,সেই ভালবাসা,সেই হাসি আর মানুষটা হারিয়ে গেছে। সাথে হারিয়ে গেছে সুমনের সুখ।

সূর্য ডুবার পরে নিবিড় ঘরে ফিরে এল৷এলাকায় বিদ্যুৎ নেই।চারদিক অন্ধকার। কিছু দিন ধরে লোডশেডিং একটু বেশি ই হচ্ছে। নিবিড় ফেরার পথে হাতে করে একটা মশাল জ্বালিয়ে নিয়ে এসেছিল। সেটা এখন জ্বলে প্রায় শেষ। ঘরের পাশে আসতেই তার ভেতরটা মুচড় দিয়ে উঠল। তারমনে হল ওখানে,তার ঘরের সামনে কেউ দাঁড়িয়ে৷ নিবিড় গলা ঝাড়ি দিল। কোন শব্দ হল না। ছায়ামূর্তিটা তার দিকে এগিয়ে এল।কাছে আসতেই চেহারা স্পষ্ট হল। এটা মইন চৌধুরি। অথচ তিনি তো লোক ছাড়া একা বের হন না। নিবিড় ঘাবড়ে গিয়েছিল তাকে দেখে, গলা শুকিয়ে এসেছিল। নিজেকে সামলে সে প্রশ্ন করল
-আ আ আপনি?
মইন চৌধুরি আরেকটু এগিয়ে এসে আনন্দ চিত্তে উত্তর দিল
-হ্যা৷ আমি।
-কিন্তু, রাতে? আপনার লোকজন?
-হুম৷ এলোম। লোকজন নৌকায়। এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম।হঠাৎ মনে হল একবার দেখে যায় আপনাকে।
-আসুন না ঘরে আসুন।
-না৷ দেখা হয়ে গেছে। চলে যাব।
মইন চৌধুরি চলে যেতে পা বাড়াতে না বাড়াতে নিবিড় প্রশ্ন করল
-জমিগুলো দেখতে কবে আসবেন?
-যে কোন সময়।
মইন চৌধুরি হনহন করে হেঁটে চলে গেল। নিবিড় বিস্মিত হল। এই বিত্তবান লোকটিকে তার কাছে অকারণেই অদ্ভুত মনে হল।
নিবিড় নিজের ঘরে ঢুকে কাপড় ছাড়তে ছাড়তে নিজেকে দেখছিল৷ মশালের আলোয় তার বুকের পশমগুলো চিকচিক করছিল। অনেকগুলো বছর আগে যখন এই পশমগুলো গজাতে শুরু করেছিল তখন সুমন তার বুকে চুমু খেয়ে বলত,
-বুকে পশম রাখবে না।
নিবিড় প্রশ্ন করত
-কেন?
উত্তরে সে বলেছিল
-চুমু খাওয়ার সময় মুখে ঢুকে যাবে।
নিবিড় ধাক্কা দিয়ে সুমনকে চিৎ করে শুয়ে দিয়ে তার বুকে চড়ে তার বুক পশমে দাঁত দিয়ে কামড় দিয়ে বলত
-তাহলে, মিঃ এইগুলো? ফেলে দেই?
তারা হাসত৷ তাদের হাসিতে ইশ্বরের হিংসে হত। তাই তাদের ভাগ্য মুছে, পরস্পরকে আলাদা করে নতুন করে যে ভাগ্য লিখল তাতে কেউ ই কারো না।

রাতে মইনের ঘুম হয়নি। সকাল সাতটার দিকে জেগে পুকুর পাড়ে গিয়ে বসল। তার ভেতরটাই কেমন জানি উদাসীনতা।মনে হল এই একাকিত্বের, নিসঙ্গতার পরিবর্তন হওয়া দরকার।ইচ্ছে ছিল গোসাইপুর যাওয়ার কিন্তু কী মনে করে যেন গেলো না। হয়তো কারো প্রতি আসক্ত হওয়ার ভয়ে অথবা ভিন্ন কোন কারনে।

নিবিড় ক্লাস নিচ্ছিল। দপ্তরি কাকা এসে বলল তাকে কেউ ডাকছে৷ নিবিড় ক্লাস থেকে বের হয়ে এল।অফিস রুমে ঢুকার আগ পর্যন্ত তার মনে হয়নি যে, তার জন্য জীবনের আরো একটা বিস্ময় অপেক্ষা করছে। নীল রঙের শাড়ী পড়ে হাতে একটা ব্যাগ নিয়ে জৈনিক ভদ্র মহিলাকে দেখে সে ভেবেছিল, হবে হয়ত কোন শিক্ষার্থীর অভিবাবক। নিবিড় চেয়ারে বসতে বসতে বলল
-আসুন, বসুন।
ভদ্র মহিলা মুচকি হেসে চেয়ারে বসতে বসতে বলল
-কেমন আছেন?
-ভাল। কিন্তু আপনি?
-আমাকে চেনার কথা না।
-কেন?
-সেসব থাক।সকালে খেয়েছিলেন?
-জি। কী খাবেন বলুন৷
-কী খাওয়াতে পারবেন?
-গ্রাম্য এলাকা। সাধ্যের মধ্যে যা আছে। তবে পরিচয়টা জানা থাকলে সুবিধে হত।
-আমি মিতু। একটা কলেজে রসায়ন পড়াচ্ছি।আপনাকে দেখার অভিপ্রায় থেকে এখানে আসা।
-হঠাৎ,আমার মত গুণহীন কারো ব্যপারে আগ্রহের কারন টা ঠিক বোধগম্য হল না।
-কারন তো অনেকগুলা ই আছে। তবে সেই কারনগুলা তুলা থাক। আমি আজ উঠি।
-সে কি? আসার হেতু না বলেই উঠবেন।
-হ্যা,উঠব। আবার দেখা হচ্ছে৷ খুব দ্রুত৷
মিতু উঠে বাহিরের দিকে বের হয়ে গেল। নিবিড় তাকিয়ে রইল৷ এই অদ্ভুত মহিলাটিকে তার কাছে বিস্ময় মনে হচ্ছিল।

ক্লাস শেষে বাড়ি ফেরার পথে মেঘনা ফুসে উঠল। প্রবল বাতাস শুরু হল। বোর্ড অফিস হতে ঐ পাড়ে আসতে না আসতেই শুরু হল বর্ষণ। সাথে সাথে বাতাস। ভয়ানক ঝড়ে নৌকা প্রায় ডুবে যাওয়ার উপক্রম। চড়ে আসার পর বর্ষণ আরো প্রবলতর হল। সাথে বাতাসের ঝাপ্টা। গাছগুলো মড়মড় করে ভাঙতে লাগল। নিবিড় নৌকা থেকে নেমে নৌকাটা খুটিতে বেধে দ্রোত হাটতে লাগল। বিপরীত মুখি বাতাসের ধাক্কায় সামনের দিকে আগানোর সুযোগ নেই।তারুপরে চড়ের উড়ন্ত বালি। নিবিড়ে পড়নের পাঞ্জাবীটা খোলে মাথায় বেধে ফেলল। আর পকেট থেকে রুমালটা খোলে চোখ মুখ চেপে ধরল। কবরস্থানের দিক দিয়ে যাওয়ার সময় যখন গাছের ডাল এসে উড়ে মাথায় পড়ার উপক্রম ঠিক সেই সময় পিছন থেকে কেউ একজন ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। ডালটা মাটিতে পড়ার সাথে সাথে আকাশে বিজলি চমকালো। সেই আলোতে নিবিড় এমন একজনের চেহারা দেখল যাকে সে ভুলার জন্য এতটা সংগ্রাম করে আসছে।নিবিড় উঠে দাঁড়াল শক্ত হয়ে। সুমনের কন্ঠস্বর ভেসে আসল।
-ব্যথা পাননি তো?
নিবিড় উত্তর না দিয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।সুমন এগিয়ে এল। সুমন যখন নিবিড়ের ঠিক পাশে তখন আবার বিদ্যুৎ চমকালো। সেই বিদ্যুতের আলো সুমনের জীবন আলোকিত করার পথ দেখাল। আজ এত দিন পর যে মানুষটাকে একটিবার দেখার জন্য ছটফট করেছিল সে তার সামনে দাঁড়িয়ে।সুমন বাকরুদ্ধ। নিবিড়ের চোখে চোখ পড়তেই আনন্দে তার হৃদয়ে বিদ্যুৎ চমকাল। সে নিবিড়ের হাতটা টেনে ধরে বলল
-নি নি নিবিড়৷ আমি তোমায় অনেক খোঁজেছি। নিবিড়।
নিবিড় শব্দ করেনি। যে হাতটা সুমন তার দিকে বাড়িয়ে দিয়েছিল তা প্রত্যাখ্যান করে দৌড়ে চলে গেল। সুমন এই ঝড় বৃষ্টির রাতে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল। এত দিনের কষ্ট আজ তার লাগব হল।
সে ভিজে বাসায় গেল। অহনা আর মিতু গভীর চিন্তায় ছিল৷ তাকে দেখে চিন্তামুক্ত হল। আজ অনেক দিন পর সুমনের ঠোটের কোণায় হাসি দেখে মিতু প্রশান্তির নিশ্বাস নিল। মানুষটাকে হাসলে সত্য ই সুন্দর লাগে।

নিবিড় রুমে এসে কাঁপতে লাগল। ঝড় থেমে গেছে।কিন্তু নিবিড়ের বুকে যে ঝড় উঠেছে তা থামার নাম নেই। নিবিড়ে বাহিরে এসে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। নিরব এই চরে তার কান্না, যন্ত্রনা শুনার মত কেউ নেই৷ সে অসহায়৷ একা৷ সে নির্জন। নিরব।ইশ্বর কী চায়, কী তার খেলার ফলাফল তা কেবল ইশ্বর ই জানে।

লেখকঃ আরভান শান আরাফ

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.