অন্তশূণ্য মিলন

রাফাদ স্কুল ব্যাগ টা কাধে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে বাসা থেকে বের হয়ে বাস স্ট্যান্ড এর দ্রুত হাটতে লাগলো!
গায়ে সাদা শার্ট ইন করা,,,কালো প্যান্ট এর সাথে,,, পায়ে কালো জুতা।তাড়াহুড়ো তে জুতার পিতা গুলিও ভাল করে বাধতে পারলো না! কখন যে বাস ছেড়ে দেয় সেই তাড়ায়।
হাটার সাথে সাথে মাথার এলোমেলো চুলগুলো নড়ছে।চুলগুলোও আছড়াতে ভুলে গেছে সে। তাও এত কিউট দেখাচ্ছে তার সুদর্শন চেহারাটা।একদম নিষ্পাপ দেখাচ্ছে যেন এর চেয়ে সরল ছোকড়া আর হয় না।
শার্টের হাতা টা কনুই পর্যন্ত ভাজ করে রেখেছে তার সাথে হাতে একটা কালো ঘড়ি।,কাধে স্কুল ব্যাগ টা। দেখাতে কিন্তু পিচ্ছি স্কুলের ছাত্র দেখাচ্ছে না,,দেখাবেই বা কেন ও তো আর পিচ্ছি না ক্লাস টেনের ছাত্র।
মুখে একটা তাড়না। কি যেন হারিয়ে ফেলছে! দ্রুত হাটছে। ঠোট গুলো যেন কিছু বলতে চায়। এমতাবস্থায় যে কেও তাকে দেখলে ভালো লেগে যাবে। কয়েকটা প্রাইমারী স্কুলের ছাত্রী তাকে দেখে হাসলো। তার ওদিকে খেয়াল নেই কোথাকার কোন পিচ্ছি মেয়েগুলা হাসছে। তাকে যে কি পরিমান ভালো দেখাচ্ছে সেই দিকে তার কোনো খেয়াল ই নেই। সে হয়তো নিজেও জানে না। থাক ওসব ও এগুলা কখনো ভাবেও না।
যাই হোক বাস স্ট্যান্ড এসে দেখে কোনো বাস নেই। ভাবতে লাগল কখন যে বাস আসে ঠিক নেই। এত দ্রুতই হাটলো যে কয়েক ফোটা ঘাম কপাল গড়িয়ে পরতে লাগলো। টিসু বের করে মুছতেই একটা বাস এসে হাজির। বাসে ওঠে সিট খুজতে থাকে। একটা ছেলে বয়স বিশ কি একুশ হবে হয়ত কোনো অফিসে চাকরি করে বলে মনে হয়। জামা দেখে তাই মনে হয়। কালো একটা শার্ট এর সাথে কালো প্যান্ট আর কালো জুতা,চুল গুলা সুন্দর স্টাইল করা। হ্যান্ডসাম ই দেখাচ্ছে। রাফাদের দিকে এমনভাবে এক নজরে তাকিয়ে রইল যেন রাফাদের চেহারায় লেখা আছে যে,,আমার দিকে তাকিয়ে থাকুন!
রাফাদ সিট খুজতে খুজতে ছেলেটার কাছে আসলো। ছেলেটার পাশের সিট টা খালি সে জানালার সাথের সিট টায় বসা।
রাফাদ : এই যে ভাইয়া, আমি জানালার পাশে বসবো,, একটু সাইট দেবেন?
ছেলেটা : হু! কি! (চমকে উঠে) ও হ্যা বসো।
রাফাদ বসে জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটা একবার ওর দিকে তাকিয়ে এবার নিচের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছে। ভাবছে হয়ত একটা মানুষ কিভাবে এত সুন্দর হতে পারে।
কিছু একটা বলবে মনে হচ্ছে। ভাবতে ভাবতে একটা গল্পও হয়ত রচনা করে ফেলেছে। একসময় বাস টা রাফাদের স্কুলের সামনে এসে থামলো। রাফাদ বাস থেকে নেমে চলে যাচ্ছে কিন্তু ছেলেটা কিছুই বলতে পারলো না।
একটা আফসুস রয়ে গেল আর কি কোনোদিন দেখা পাবে রাফাদের সে!
বাস একসময় একটি অফিসের সামনে এসে থামলো। ছেলেটি নেমে গিয়ে অফিসে ঢুকলো। ঢুকার সাথে সাথে একটা মেয়ে অর্কো বলে ডাক দিলো। ছেলে টার নাম সম্ভবত অর্কো। ছেলেটি মাথা তুলে মেয়েটির দিকে তাকালো।
এই শোন তোমার সাথে কথা ছিল,,অফিস থেকে রাঙামাটি যাবে,,তুমি যাবে?
নাহ আমার ভালো লাগছে না,, তোমরা যেও।
এই বলে অর্কো নিজের রুমের দিকে চলে গেল। এমনিতেই ওর মন ভাল নেই তার উপর এ বেড়ানোর কথা শুনতেও তার কাছে তেতো লাগতেছে।
অফিসে কোনো কাজেই মনোযোগ দিতে পারছে না।
মেয়েটি ছিল উপমা,, যে অর্কো কে খুব ভালবাসে,অর্কোর কেয়ার করে সে,, কিন্তু অর্কোকে কখনো বুঝতে দেইনি।
অর্কোর আজ রাঙামাটি না যাওয়ার কথা শুনে তার মন টাও ভার হয়ে রইল,,কত আশা করে রেখেছিল ওখানে গিয়ে সে অর্কোর সাথে টাইম পাস করবে,ঘুরবে,আর না হয় মনের কথা টা বলেই দেবে,,অর্কোকে,, তার ধারনা অর্কো তাকে রিজেক্ট করবে না।
কিন্তু এখন সব ভেজতে গেল।
এদিকে অর্কো অফিস থেকে ছুটি নিয়ে তাড়াহুড়ো করে বেড়িয়ে পড়েছে,, তার উদ্দেশ্য স্কুল ছুটির সময় ছেলেটি আবার বাসে চড়বে আবার দেখা হবে তার সাথে।
বাস চড়ে যেতে লাগল অর্কো। স্কুলের সামনে দিয়ে যাচ্ছে এমন সময় স্কুলের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলো স্কুল আরো আগেই ছুটি হয়ে গেছে। মন টা এবার ভারী খারাপপ
হলো।
দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বাড়ি ফিরতে হলো অর্কোকে।
পরদিন বাসে করে যাওয়ার সময় ঠিক ঐ যায়গাটা যেখানে রাফাদ বাসে উঠেছিল সেই রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে অর্কোর চোখ আটকে গেল,, ছেলে টা বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছে।
অর্ক বাস ড্রাইভারকে বাস থামাতে তাড়া ডিল,,এদিকে রাফাদ দৌড়ে এসে বাসে উঠে।
আজ রাফাদ অন্য একটা সিটে বসলো। তাই মনের মধ্যে কেমন ছটপট শুরু হয়ে গেল অর্কোর। বাসের জানালা দিয়ে আসা বাতাস তার কাছে বিরক্তিকর হয়ে গেছে। কিভাবে যে ছেলেটার সাথে পরিচিত হবে বুঝতে পারলো না।
বাতাসের ছোয়া রাফাদের চুল গুলোকে উড়াচ্ছে আর অর্কোর মনে ঝড় তুলে দিয়েছে।
একটু ইতস্ত করে রাফাদের সাথে গিয়ে বসলো।
রাফাদ আড় চোখে তাকিয়ে কিছু বল্লো না।
তোমার নাম কি?
আমাকে বলছেন?
হুম
রাফাদ
কোথায় যাচ্ছো?
কেন কাল দেখেন নি?
অর্কো ভাবতে লাগলো ছেলেটা তার কথা মনে রেখেছে। ভুলেনি তাহলে। একটু লজ্জা পেয়ে জিজ্ঞাস করলো
কিসে পড়ো?
ক্লাস টেন এ
জানালার বাইরে তাকিয়েই রাফাদ উত্তর গুলো দিলো। কিছু বললো ও না।
অর্কোর নিজেকে অসহায় মনে হচ্ছে। একটা স্কুলের ছাত্র থেকে কোনো পাত্তা পাচ্ছে না।
আ্যই,, স্কুলের সামনে দাড়াবেন।
বলে রাফাদ স্কুলে চলে গেল বাস থেকে নেমে আর সেই যাওয়াটা দেখছে অর্কো দু চোখ ভরে যেন কাওকে হাড়িয়ে ফেলছে।
যেমন টা হয় যখন একটা মানুশ এয়ারপোর্টে গিয়ে বিদায় নিয়ে প্রিয় জন ছেড়ে প্রবাশ জীবনের পথে পাড়ি জমায়।
চোখ ছল ছল করছে আজো তেমন কিছু জানা হলো না।
আর যাই হোক নাম টা তো জানা গেল। বার বার উচ্চারণ করে পড়ছে রাঅাঅাঅাঅাফাদ রাফাদ।
যেন এটা তার বাড়ির কাজ ছিল।
অফিসে রাঙামাটি ট্যুরের কথা আলোচনা হচ্ছে সেদিকে কান না দিয়ে নিজের কাজে মনযোগ দেওয়ার চেষ্টা করলো।
কিন্তু বেচারার মন তো এখন রাফাদের কাছে।
অফিস ছুটির পর আর নাগাল পেলোনা রাফাদের স্কুল অনেক আগেই ছুটি হয়ে গেছে।
বাস থেকে ফাকা স্কুল টার দিকে তাকিয়ে অর্কো রাফাদের শুন্য অঅস্তিত্ব খোজার চেষ্টায় মাতোয়ারা তখনি তার চোখে পড়লো ব্যানার।
রাঙামাটি শিক্ষা সফর।
তার মানে কি রাফাদদের স্কুল থেকে যাচ্ছে!
রাফাদ কি যাবে?!!
মনে কেমন টা অপ্রত্যাশিত আশা জাগলো।
তারিখ টা খেয়াল করে দেখে নিলো।
২০ জানুয়ারি রোজ বৃহস্পতিবার।
পরদিন বাসে উঠে রাফাদকে লক্ষ করলো। আজো সেই জানালার পাশে তাকিয়ে কি যেন ভাবছে। চুল গুলো যেন আহ্লাদে গদ গদ হয়ে নাচতেছে!
পাশে গিয়ে বসলো।
কেমন আছো?
কোনো?
কোনো উত্তর পেলোনা।
বেহায়ার মতো আবার জিজ্ঞাস করলো তোমাদের স্কুল থেকে নাকি রাঙামাটি শিক্ষা সফর যাচ্ছে?
হুম (জানালার দিকে তাকিয়ে)
তুমি যাচ্ছোনা?
হুম এইটাই তো স্কুলের শেষ শিক্ষা সফর।(তাও জানালার দিকে তাকিয়ে)
বন্ধু হবা?( বলেই ভয় পেয়ে গেল,একটা অচেনা মানুষকে কেন সে বন্ধু হতে বললো, কি ভাববে সে)
কেন? (এবার অবাক হয়ে অর্কোর দিকেই তাকালো)
তার দৃষ্টির ছোয়া পেয়ে অর্কো এক মুহুর্তের জন্য বোবা হয়ে গেল। কিছু বললো না।
এদিকে রাফাদের স্কুল এসে গেছে। নেমে গেল সে।
অর্কো বোবা হয়ে বসেই রইলো কিছুই বলতে পারলো না।
অফিস গিয়েই উপমাকে খুজতে লাগল।
উপমাকে পেয়েই জিজ্ঞাস করলো অফিস ট্যুর টা কি ফাইনাল হয়ে গেছে?
হুম ১৫ ই জানুয়ারি। তুমি কি যাবে না?
অবশ্যই যাবো।
অর্কোর আগ্রহ দেখে উপমা অবাক ই হলো।
কিন্তু ১৫ জানুয়ারি সমাস্যা হয়ে গেল।
আচ্ছা উপমা তারিখটা চেঞ্জ করা যায় না?
কেন বল তো তোমার কি প্রব্লেম?
হুম আমি ১৫ তারিখ যেতে পারবো না।
আচ্ছা ঠিক আছে আমি বস কে বলে তারিখ টা চেঞ্জ করতে বলব। কবে হলে তোমার সুবিধা হয়?
২০ তারিখটায়।
ওকে।
আচ্ছা আমি যাচ্ছি বলে অর্কোর নিজের কাজে মনযোগ দিলো। আজ যেন কোন অজানা আনন্দে ভেসে যাচ্ছে মন। কি যেন পাবে পাবে ভাবছে,,পুরষ্কার?? যেটা পাওয়ার জন্য ছোট বেলায় মন টা উতলা হয়ে থাকতো!
হুম সেরকম ই কিছু পেতে যাচ্ছে সে!
রাঙামাটির রাঙা আকাবাকা ঘাড়তেড়া রাস্তা দিয়ে অর্কোদের বাস টা চলছে। সবার মনেই ফুর্তি ফুর্তি ভাব ইনজয় করছে ভ্রমন টা শুধুই অর্কো ছাড়া।
রাফাদও আজ একটু খুশি খুশি মনোভাবে বাসে আনন্দের সাথেই পিকনিক তা ইনজয় করতেছে।
অর্কোদের বাসে গানের আসর জমানো। উপমা গান গাইলো কয়েকটা। যে গান গুলোর সার কথা অর্কো!!! যদিও উপরে নানা রঙের গান গাইলো সে কিন্তু হৃদয়ে শুধু একটাই গান বাজে অর্কো আর অর্কো। বড্ড নেশা হয়ে গেছে তার অর্কোতে।
অর্কোর সে গানে কোনো মনযোগ নেই সে শুধু জানে রাফাদ।
ঐ দিকে রাফাদ দের বাসেও গান টান কম হচ্ছে না কিন্তু রাফাদ সে গুলোর বাইরে। বড্ড ঠান্ডা ছেলে ও গান দূরে থাক কারো সাথে কথা বলতেও লাজুক হয়ে যায় যেন প্রয়োজনের থেকে একটু বেশি।
তাদের বাস দুটো খুব কাছাকাছি এলাকায় কিন্তু তারা কেও ই জানে না। দুটো বাস একমুখি যেমন টা ধরা যায় রাফাদ দের বাস টা দক্ষিন থেকে উত্তরে আর অর্কোদের টা উত্তর থেলে দক্ষিনে একই রাস্তায় যাচ্ছে মুখোমুখি পরবে কে জানে অর্কো সেটা খেয়াল করবে কিনা। রাফাদের খেয়াল করার কথা না কারন ও তো আর অর্কোকে খুজতেছেনা।
যাই হোক বাস দুটো আসছে। সামনে ৯০ ডিগ্রি কোনের একটা বিরাট মোড়।
সেখানেই হয়ত তাদের দেখা হবে। দেখি কি হয় দেখা হলে হয়ত অর্কো খুব খুশি হয়ে যাবে আহ্লাদে গদ গদ হয়ে বাস টা থামিয়ে রাফাদ দের বাসে উঠে যাবে। রাফাদ এর সাথে খুব করে কথা বলবে। মনের সেই না জানানো বেদনা গুলোতে তুলসি আর নীম পাতার ছোয়া দিতে বলবে তার হৃদয় দিয়ে। না তাদের ঠোট জোড়া এক হয়েই যাবে আজ। এগুলোই ভাবছে অর্কো বাসে বসে।
উপমা??
সে তো মগ্ন হয়ে আছে গানে তার প্রেম আজ পেরেম এ রূপ নেবে।
পেরেম টা হয়ত পাঠক বুঝতে পারছেন।
তাদের বাস দুটো সেই মোড়ের সম্মুখে। দুটো বাস এতটা স্পীডে আর হইচইয়ে মেতে ছিল যে মোড়ে এসে দুটো বাসের অপ্রত্যাশিত মিলন ঘটে!
দুজোড়া ঠোটের চুম্নের মতো করে বাস দুটো হারিয়ে গভীর সুখে। সেটা কি সুখ???
বাস দুটো মুখি মুখি সংঘর্ষে লুটিয়ে পড়ল পাহাড়ের পাদ দেশে। যাকে বলে এক্সিডেন্ট!!!!বাস দুটো চরম সুখে কাতড়াতে কাতড়াতে দুলতে দুলতে হেলতে হেলতে হারিয়ে গেল পাহাড়ের কোনো এক অজানায়।
পুলিশ এলো, মিডিয়া এল,র‍্যাব এল,সামরিক বাহিনী এল, বিজিবি আর কতকি!
এল এম্বুলেন্স আর লাশবাহী গাড়ি।
সবার লাশগুলো উদ্ধার করা না গেলেও উদ্ধার হলো সেই দুটো তরুনের লাশ। রক্ত মাখা শরীর গুলোতে আর লেখা নেই আমি অর্কো, আমি রাফাদ কিংবা আমি উপমা।
লাশবাহী গাড়ির অভাবে সেই দুটো তরুনের লাশ স্থান পেল একটা গাড়িতেই। খুব চাপাচাপি করেই রাখা হয়েছে লাশ দুটো।
দুজনের দুটো হাত লেগে আছে পাশাপাশি রক্ত মাখা হাত দূটো কেও কাওকে ধরতে পারছে না কিন্তু স্পর্শ তো আছে।
বেচে থাকলে কি এই টুকু বা হতো?
শুধু হাত নয় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ এখন পরস্পর মিলিত হয়ে আছে।
তাহলে এভাবেই মিলন লেখা ছিল তাদের ভাগ্যে। অবশেষে মিলন হলো তবে দুটো তরুনের প্রানহীন ভাবেই। প্রান থাকলেই বা কি হতো????????????
উপমা? তাকে নিয়ে কি লিখবো??

লেখকঃঅনুপম

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.