পরিহাস

লেখক- আরভান শান আরাফ

জীবন আমাদের সব দেয়নি। কিছু তার নিজের কাছে রেখে দিয়েছে। যা ছিনিয়ে আনতে হয়। এই আনা নেওয়ার মাঝে অনেক কিছু আবার হারিয়ে ও যায়। যেমনটা সীমান্ত হারিয়েছিল গত দু বছর আগে।
হুট করেই ফেচবুকে পরিচয় নীল নামের ছেলেটার সাথে। তার কথা বলার ধরন, আবেগ আর জ্ঞানময় কথায় যে কেউ মুগ্ধ হয়ে যায়। সেই হিসেবে সীমান্ত ও মুগ্ধ হয়ে গেল। মুগ্ধতা একটা নিউক্লিয় বিক্রিয়ার মত যা আটকে না থেকে চেইন আকারে চলতেই থাকে আর যার সমাপ্তি হয় এক ভয়াল ধ্বংসের মাধ্যমে।

সেই ধ্বংস যে কত ভয়ানক সেই জ্ঞান সীমান্তের ছিল না। তার মনে হয়েছিল যে কোন কিছুর বিনিময়ে নীলকে তার চায়। সে বুঝতে ও পারেনি নীল তাকে চেয়েছিল কিনা।
নীল বিষমকামী ছেলে। মেয়েদের প্রতি যার আগ্রহ প্রবল। প্লে বয়ের মত যার প্রতি মাসে প্রেমিকা রদ বদল হয়, যে ছেলে সেক্স সেক্স সেক্স ছাড়া আর কিছুই বুঝে না, তাকে ভালবাসা সহজ ছিল না। সেই ভালবাসা কেবল যে কঠিন তা কিন্তু নয় তা ছিল নির্মম আর যন্ত্রনার। সেই যন্ত্রনা সীমান্তের দুইটা বছর কেড়ে নিয়েছিল সুখ থেকে। আজ হয়তো সে সুখি। কিন্তু সেই ভুল কি সে অতীতে গিয়ে শোধরাতে পারবে? না পারবে না। যা ঘটে যায় তা পালঠে ফেলার ক্ষমতা কারো থাকে না। সীমান্তের ও ছিল না।
২০১৫ সালের শুরুর দিকে নীলের সাথে সীমান্তের পরিচয়।একদিন হুট করেই দেখা হয়ে গেল। ফেচবুকের ফ্রেন্ডদের সাথে ছেলেরা কম ই দেখা করে বিশেষ করে ছেলেদের সাথে তো নয় ই। মেয়ে হলে ভিন্ন কথা। কিন্তু সীমান্তের সাথে নীল ঠিক ই দেখা করলো।

দীঘির পাড়ে যে বিশাল বটগাছ তার গুড়িতে বসে দুজন অনেক কথা বলেছিল। কথায় কথায় সীমান্তের বুঝতে বাকি রইলো না যে, নীল চূড়ান্ট রকম দেহকামী ও নারী লোভী একটা ছেলে। তার আশা ভঙ্গ হল। কিন্তু ভালবাসা যেখানে প্রবল ভগ্ন আশা সেখানে জাগ্রত হতে বাধ্য। হলো ও ঠিক তাই। দু দিন যেতে না যেতে সীমান্ত আমার নীলকে ভালবাসতে শুরু করলো। তার ভালবাসা ছিল তীব্র যার কোন চিন্তাশীলতা ছিল। ভবিষ্যৎ পরিণাম না জেনে না বুঝে নীলের জন্য সীমান্তের মন সর্বদা অস্থির থাকতো। একটা মেসেজের রিপ্লে আসতে অনেক সময় নিত। কারন নীল তখন অন্য মেয়েদের সাথে চ্যাটে ব্যস্ত থাকতো। সীমান্ত অস্থির হয়ে থাকত রিপ্লের জন্য। অনেক সময় রিপ্লে ও আসতো না। সীমান্ত একের পর এক মেসেজ করে যেত। নীল যত কঠিন হত সীমান্ত তত তরল। বিষয়টা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, সীমান্ত নীলের অবহেলা,অবজ্ঞা,কাঠিন্য সব ভালবাসতে শুরু করলো। ভালবাসা যখন মহামারির রূপ নিল সীমান্ত তখন সিদ্ধান্ত নিল নীলকে সব বলে দেওয়ার। কিন্তু বলে দেওয়াটা খুব সহজ ছিল না। একে তো নীল স্ট্রেইট তার উপরে চরমভাবে সমকাম বিদ্বেষী। তার জন্য সীমান্তের ভালবাসা গ্রহণ করা কঠিন ছিল। নীল যখন বুঝতে পারবে একট গে ছেলে দিনের পর দিন তারে ভালবেসেছে, তাকে একটু ছোঁয়ে দেখার জন্য,তার দিকে তাকিয়ে থাকার জন্য, তাকে ভালবাসার জন্য তার সাথে চলেছে তখন কি সে আদৌ মেনে নিবে? পারবে মেনে নিতেতাকে?সেটা ভয়ানক হয়ে ধরা দিবে সীমান্তের জীবনে।

রাতে এক ফোঁটা ও ঘুম হল না তার।নীলের সাথে দেখা করার জন্য ছটফট করতে লাগলো। বেলা দ্বিপ্রহর,সীমান্ত অস্থির হয়ে নীলকে কল করে দেখা করার কথা বলল। নীল, অবসর ছিল। সে বলল দেখা করতে অসুবিধা নেই। নীল বাসে করে চলে আসলো দিঘির পাড়। সেখানে বড় বটগাছটার নিচে বসে রইলো অনেক্ষণ কিন্তু সীমান্ত আসতে আজ অনেক সময় নিচ্ছে।
বেলা দুইটা বেজে বারো মিনিট। সীমান্ত এসে পৌঁছলো। তার সারা শরীর ঘামে ভেজা। চোখ লাল হয়ে আছে। তাকে দেখেই বুঝা যাচ্ছিল সেই অস্থির। নীল কাছে গিয়ে হাত ধরে বসাতে বসাতে বলল,

-এই অবস্থা কেন তোমার?
সীমান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
-আমি কিছু কথা বলতে চাচ্ছি। তোমাকে শুনতে হবে।
-বল শুনছি।
সীমান্ত বলা শুরু করলো
-নীল আমি তোমাকে ভালবাসি। কারন আমি গে।
নীল চোখ বড়বড় করে তাকালো। কিছু বলল না। সীমান্ত নীলের দিকে না তাকিয়ে বলে চলল
-আমি গে এটা যেমন সত্য আমি তোমাকে ভালবাসি এটা ও সত্য।আমি জানি তুমি মানবা না।হয়তো কথা বলা ও অফ করে দিবা। কিন্তু, আমি ও না বলে পারতেছিলাম না। তাই আজ বলে দিলাম। তোমার যা খুশি কর।
নীল সীমান্তের কথা শুনলো।আর অট্টহেসে বলল
-তোমার কি ধারনা আমি এসব বুঝতে পারিনি? তুমি গে বলেই তোমার সাথে মিশেছি। কারন আমি ও গে। জাস্ট, স্ট্রেইট সাজার চেষ্টায় আছি যেন, লোকের কাছে ধরা না খায়।

সীমান্ত নীলের চোখের দিকে তাকালো, তারপর বলল
-সত্য করে বলছো?
-হুম, সত্য। আর এ ও সত্য যে, আমি তোমাকে ভালবাসি।ভালবাসি বলেই বারবার ছুটে আসি।
নীল আর সীমান্ত উভয়ের চোখে ই আগুন। সেই আগুনে সেইদিন পুড়ে গেল একটা বিশ্রী সামাজিকতা।
এর পরের দিন নীলের বাসায় সীমান্ত আর নীলের মিলন হল। চরম মিলনের সময়, সীমান্ত নীলের কপালে চুমু খেয়ে বলল,
-আমরা পাপ করছি না তো।?
নীল চুমুর প্রতিউত্তর দিয়ে বলল
-না। ভালবাসা আর মিলনে পাপ নেই। পাপ হয় ধর্ষণে।
সেই বিশ্বাস নিয়ে চলার দু ই মাসের মাথায় যখন নীলে বিয়ে করে বউ আনলো তখন সীমান্ত গিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে বলেছিল,
-তুমি না গে? তাহলে বিয়ে করলে কেন?
নীল সীমান্তের গালে থাপ্পর মেরে বলল
-শালা,তুই গে বলে ভাবিস সবাই গে?আমি তো শুধু একটা ছেলের সাথে সেক্স করলে কেমন অভিজ্ঞতা হয় তা বুঝার জন্য তুকে ব্যবহার করেছি। এ ছাড়া আর কিছুই না। তুর জন্য আমার মনে একটুকু ও ভালবাসা নেই।

সীমান্ত কিছু বলেনি। সে জানে, তাদের যতবার মিলন হয়েছে ততবার ই পাপ করেছে। পাপটা সীমান্ত নয় নীল করেছে। কারন তাদের ভালবাসা ছিল না। আর ভালবাসা ছাড়া সব মিলন ই হয় ধর্ষন না হয় বেশ্যা বৃত্তি।
সীমান্তের সারা শরীর কেঁপে উঠলো। সে বাসায় গেল। গোসল দিয়ে পবিত্র হওয়ার চেষ্টা করলো। সাদা একটা পাঞ্জাবি পড়ল, পাজামা পড়ে নিল। মাথা আচড়ালো। একটু সেন্ট মেখে নিল। খাটের নিচে রাখা রশিটা বের করে বাহিরে বের হয়ে এল।আকাশে চাঁদ উঠেছিল। ভরা পূর্ণিমার রাতে সীমান্ত পাপ কাটানোর জন্য বাড়ির পাশের বকুল গাছে ফাঁস দিল। তার দেহটা ঝুলে ছিল। চাঁদের আলো কেঁদে কেঁদে বিদায় জানাচ্ছিল। আর পৃথিবী পরিকল্পনা করছিল তাকে বাঁচানোর।

দুই বছর প্যারালাইজড থাকার পর গতকাল তার মস্তিষ্ক স্বাভাবিক হল। আমরা তার দীর্ঘায়ু কামনা করি। কারন সামাজিকতার পরিহাস উপেক্ষা করে বাঁচতে হবে যুগ যুগ।

প্রথম প্রকাশ – সাতরঙ

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.