বিজয় ও একটি খন্ডচিত্র

লেখক- নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

সবুজে ঘেরা গ্রাম ‘পলাশডাঙ্গা’।শান্ত নিরব গ্রাম,কলকল শব্দে বয়েচলা নদী, সবমিলিয়ে যেন নকশিকাঁথার মাঠ।হলুদ ফুলে ভরা সর্ষের ক্ষেত তার মধ্যে বসে আছে দুই প্রাণবন্ত ছেলে । কমল ও কিশোর। দু জন এই গ্রামের ই ছেলে।রুপে গুনে কেউ কারো থেকে কম যায় না।কমল সবে নবম শ্রেণিতে পড়ে।আর কিশোর পড়ে কলেজে।কিশোরের দেহ যৌবনে টইটুম্বর।তবে কোমল যৌবন ছুই ছুই করছে।দুজনকে দেখলে বোঝার উপায় নেই যে ওরা জেলের সন্তান। ৩ভাইয়ের মাঝে কোমল ছোট।আর কিশোর একাই।তার কোন ভাইবোন নেই।কোমল ও কিশোর একে অপর কে ভালবাসে যেন দুই দেহ এক প্রাণ।দুইজন সর্ষে ফুলের আড়ালে বসে গল্প করছে।

কোমল-কোন খবর না দিয়েই চলে এলে! জটিল কিছু হয়েছে কি?

কিশোর-কলেজ বন্ধ দিয়েছে।দেশে রায়েট চলছে,যুদ্ধ হবে যুদ্ধ।তুই দেখছি কিছুরই খবর রাখিস না।

কোমল-কই রাখি না!এই তুমি এলে,ও পাড়ায় কাকুর মেয়ের বিয়ে হলো,জামিলা বুবুর ছাগল তিন টা বাচ্চা দিলো,আগামি কাল মাসি তোমার জন্য পূজা দিবে…সবই তো জানি।সব খবরই রাখি।

—শুধু ওই খবর রাখলেই হবে?
—তো আর কোন খবর রাখতে হবে!
—আমার শরীর কেমন করে?মন কি চায়?কাকে চায়?এসব তুই কিছুই জানিস না।শুধু মুখেই বলিস…সব বুঝি,সব জানি।
—তোমার শুধু ঐ এক কথা,আচ্ছা দাদা!রায়েট কি গো?
—রায়েট মানে যুদ্ধ।দেশ স্বাধীন হবে।আমরা আর পরাধীন থাকবো না।তোর আর আমার কথা সবার সামনে বলতে পারবো।তোকে আর লুকিয়ে লুকিয়ে জরিয়ে ধরব না।তোর আর আমার এক সংসার হবে।আমরা সবাই সমান অধিকার পাবো।লোকে কোন কটু কথা বলতে পারবে না।
—সত্যি বলছো!
—সত্যি সত্যি বলছিরে।

রাতে মাষ্টার কাকু উঠনে বলছেন…কাল নাকি গ্রামে মেলেটারি ঢুকবে।আজ বিকেলে নাকি পুরাতন স্কুলে ঘাটি পেতেছে।চারিদিকে পাহারা লাগিয়েছে যেন কেউ ঢুকতে না পারে।তাদের হাতে আবার অস্ত্রও অাছে

।কথাবার্তা শেষে সবাই যার যার ঘরে গেল।সকাল হতে না হতেই চারিদিকে গগন বিদীর্ণ চিৎকার ও শোরগোল

বাঁচাও!বাঁচাও!আগুন!আগুন!
কোমল বের হয়ে দেখলো সবাই দৌড়াদৌড়ি করছে। কেউ একজন বলল..গ্রামে মেলেটারি ঢুকেছে,ঘরে ঘরে আগুন দিচ্ছে, এলোপাথাড়ি গুলি করে মানুষ মারছে, কয়জন মেয়েকে তুলেও নিয়ে গেছে। কয়জন কে চোখ হাত বেধে গাড়িতে তুলেছে ।

আর এসব কাজে সাহায্য করছে গ্রামের মোড়ল কেরামত মিয়া। সন্ধায় মিটিং বসেছে..সিদ্ধান্ত নেয়া হলো মুক্তিযোদ্ধাদের দল তৈরি করে ট্রেনিং এর জন্য পাঠাবে আর মহিলা ও বাচ্চা ছেলেপুলেদের নদী পাড় করে নিরাপদ জায়গায় রেখে আসা হবে। কিশোর পড়লো মুক্তিযোদ্ধাদের দলে, কিন্তু কমল পড়লো না। কোমল বলল আমিও যাবো। মাষ্টার কাকু বাজখাই গলায় বলল…এটা বাচ্চাদের খেলা নয়। হয় মরণ না হয় বিজয়।

নৌকা রেডি সবাইকে এক এক করে নৌকাতে তোলা হচ্ছে। কমল অঝর ধারায় কাঁদছে। মাষ্টার বাবুর কথা তার বারবার মনে পড়ছে “হয় মরণ না হয় বিজয়” । তার খুব ভয় হচ্ছে সে যদি সে আর কিশোরকে ফিরে না পায়! যদি খারাপ কিছু ঘটে যায়!
তাহলে!
সে এসব ভাবছে আর কাঁদছে। সে কিভাবে বাঁচবে কিশোর কে ছাড়া? এত গোলমালে কি একবারও তার কথা মনে পড়ছে না কিশোরের। এত ভালবাসা কিভাবে উবে গেল? তখনই কিশোর হাত রাখলো কোমলের কাঁধে। বলল..সাবধানে থেকো। কমল জড়িয়ে ধরে কিশোরকে বলল আমাকেও নিয়ে যাও তোমার সাথে।তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না।

—একি পাগলামি করছো তুমি? আমি যে ফিরে আসবো।আসতে যে আমাকে হবেই।তোমায় নিয়ে যে ঘর বাধতে হবে।না আসলে চলবে?
—তবে মাষ্টার কাকুযে বললেন হয় মরণ না হয় বিজয়।
— তাইতো!উনি কি শুধু মরণের কথাই বলছেন নাকি।অত বাজে বকনা তো,যাও নৌকাতে উঠে বসো।এক প্রকার জোর করেই কোমল কে নৌকাতে তুলে দিয়ে নৌকা ধাক্কা দিয়ে দিলো। দুজনের চোখের জলে ভাসছে দুজন। হারিয়ে গেলো… অনেকটা চোখের অন্তরালে…।

কয়েক মাস পর….

আজ একটা বড় যুদ্ধে তারা অংশ নিবে তাই কিছু মুক্তিযোদ্ধাও আসছে তাদের দলে।নতুন যোদ্ধাদের দেখে তার মাথায় যেন বাজ পড়ল।তার প্রাণ ভ্রমরা কমল ও অাছে সেই দলে আছে কিছু মেয়েও তাদের চুল কাটা শার্ট প্যান্ট পড়া।কুশল বিনিময় শেষে এক কোণে গিয়ে বসলো তারা।
কিশোর বলল—কিভাবে আসলে এখানে?
—তোমরা আমাদের যেখানে রেখে এসেছিলে পাক-সেনারা সেখানে গিয়ে এলোপাথাড়ি গুলিকরে সবাইকে মেরে ফেলে।অনেকের ইজ্জত লুন্ঠন করে অনেকে তাদের ইজ্জত হারিয়ে প্রাণদেয়।আর বাকিরা পুরুষের বেশে যুদ্ধে নামে।আমিও তাদের সাথেই এসেছি।এভাবে তারা বহু এলাকা থেকে খান-সেনাদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করে।

তারও কয়েক মাস পরে….

আজ জামালপুরের মেলান্দরে একটা স্পেশাল অপারেশনে যাচ্ছে। তৈরি হয়ে ছুটলো তারা মাত্র ১৩ জন। তার মধ্যে কমল, কিশোর, তমাল, বুবলি, মালতি, দোলন ছাড়া আরো অনেকেই আছে।এবারের অপারেশনটা বরাবরের থেকে একটু কঠিন।তাদের জনবল তুলনামুলক কম।আর সামনাসামনি যুদ্ধ।সারা রাত তুমুল যুদ্ধের পর ভোরের দিকে ওরা পরাজয় বরণ করলো। বিজয় চরণ চুম্বন করলো মুক্তিযোদ্ধাদের। পাক-সেনারা সবাই মারা গেছে। সূর্য উকি দিচ্ছে। কিশোর হাসিমুখে বলল দেখো কমল সূর্য উঠছে,সমতার সূর্য,আমাদের সূর্য।
কিশোর বলতে লাগলো

-করাল তিমির রাত পেরিয়ে অাজকে এক অখন্ড মানচিত্রে বিজয় পেলাম। পরাধীনতার শিকল ভেঙে বেরিয়ে অাসা সদ্য মুক্তির ভোর! অাহ সে যেন এক নতুন প্রাণের সঞ্চার করে। জানি না অামাদের ভালোবাসা টা এ নতুন মানচিত্র গ্রহন করে কি না, তবে অামরা তারই সন্তান, সে অামাদের উপর রুষ্ট হবে না, কোন মা ই হয় না….. তার বিশাল সুশ্যামল অঙ্গের একটু জায়গায় হয়তো ঠাঁই দেবে এ দুটো মানবকে।

এই বলে কিশোর গভীরভাবে জড়িয়ে ধরলো কমল কে। ভালোবাসায় পরিপূর্ণ দুটো মনের অাজ অপেক্ষা শেষ হলো। শেষ হলো অারেকটি বিজয়ের অপেক্ষা। দূর হতে স্লোগান ভেসে অাসছে
“জয় বাংলা, বাংলার জয়…….”

প্রথম প্রকাশ -সাতরঙ

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.