আত্মজ্ঞান

গ্রামের নাম মহেশখালী, গাঁয়ের সম্মুখে একটা বিশাল ঝিল।গ্রামের অধিকাংশ মানুষ তাদের জীবিকা নির্বাহের জন্য এই ঝিল থেকে মাছ আহরণ করে। ঝিলের প্রান্ত ঘেঁষে গফুর সাহেবের বাড়ি।আধা পাকা রঙিন টিনের বাড়িটি দেখতে চোখে সূর্য কিরণের তিব্র আলোক রশ্মি প্রতিফলিত হয়।ঝিলের অধিকাংশ মানুষ গফুর সাহেবের কাচারি ঘরে বিশ্রামের জন্য আসে।গফুর সাহেব তাদের জন্য কাচারিতে পানির ব্যবস্থা করে রেখেছে। সবাই তাকে শ্রদ্ধা করে, সম্মান করে। গ্রামের আর আট দশ জনের মতো টাকা ওয়ালা সে, অনেকে তাকে মেম্বারের নির্বাচন করতে বলে। কিন্তু তিনি তাতে সায় দেন না।বলে ” মানুষের সেবা করনের ইচ্ছা থাকলে এমনিতেই করা যায় মেম্বার হওনের দরকার হয় না “।গফুর সাহেবের তিন মেয়ে এক ছেলে। বড় মেয়ে দুটির ভালো ঘরে বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট মেয়ে রুমা এবার অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়ে। অনেক জায়গা থেকে সম্বন্ধ আসলেও গফুর সাহেব ফিরিয়ে দেন। ঘটকে ঢেকে বলেন ” ঘটক সাহেব মাইয়াডা একটু পড়তো চাই, তাই বিয়ার লাইগা জোড়াযুরি করি না”।যহন ও কইবো বিয়ার কথা, তহন না হয় আপনারে কমুনে। ঘটক তার কথায় মাথা হেলিয়ে সায় দেয়। গফুর সাহেবের একটি মাত্র ছেলে রাদিফ।এবার ক্লাস সেভেনে পড়ে। ছাত্র হিসেবে খারাপ না, কিন্তু সারাদিন শুধু পাখি আর পাখি।রাদিফের যত সখ পাখিদের নিয়ে। তার জীবনে সে কত পাখি যে এনেছে তার হিসাব নেই।সারাদিন বনে বাদাড়ে ঘুরে ঘুরে পাখিন বাসার সন্ধান করে, আর বাসায় বাচ্চা পেলে সাথে করে বাড়িতে নিয়ে যায়।

একবার নিতাই কাকার বাড়িতে কাকের বাসা থেকে ছানা নিয়ে বাড়িতে যায় চুপিচুপি। ঘরে ঢুকতেই রুমা দেখে ফেলে।কিরে রাদিফ তোর হাতে কি? হতবাক হয়ে রাদিফ বলে” আপু মাকে বলিস না আমি একটি কাকের ছানা নিয়ে এসেছি “। তখনি রুমা জোরে জোরে মা কে ডাকতে শুরু করলো। মা ও মা, এদিকে এসো একবার দেখ তোমার গুণধর ছেলে কাকের ছানা পুষবে।একবার দেখে যাও।রুমার কথা শুনে মা লাঠি হাতে রাদিফকে তাড়া করলো।মায়ের হাতে লাঠি দেখে রাদিফ দিল এক দৌড়, কিছুটা দূরে গিয়ে আবার পিছন ফিরে তাকালো। মা দূর থেকে বলছে, যেখান থেকে এনেছিস সেখানে রেখে আয়।তা না হলে আজ ঘরে ঢুকতে দেব না।মায়ের কথা শুনে রাদিফ বিষন্ন মনে কাকের ছানাটা বাসায় রেখে আসলো।

★★★

কাকের ছানা বাসায় রেখে আসতি গিয়ে রাদিফের খুব খারাপ লাগলো।বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো, কিন্তু রাদিফ এখনো বাড়িতে যায় নি।কারণ মা তাকে মারবে সেই ভয়ে রাদিফ ঝিলের পাড়ে বসে রইলো। “রুমা দেখতো রাদিফ কোথায়? সেই দুপুরে বেড়িয়েছে এখনো বাড়ি ফেরার নাম নেই “। দেখ কোথায় আবার পাখি খুঁজছে? তোমার ছেলের তো পাখি পেলে আর বাড়ির কথা মনে থাকে না।রহিমা বেগম একটু রাগান্বিত কন্ঠে বললো, তোকে যেটা বলেছি সেটা কর। দেখ গিয়ে রাদিফ কোথায়? বেশি কথা বলতে হবে না। রুমা রাদিফকে খুজতে গিয়ে দেখে সে ঝিলের পাড়ে বসে আছে। দূর থেকে ডাকতে শুরু করলো, রাদিফ……. রাদিফ,,,,, রাদিফ পিছনে তাকিয়ে দেখলো রুমা তাকে ডাকছে। রুমার দিকে তাকাতেই রুমা রাদিফকে হাতের ইশারা দিল।কিন্তু রাদিফ সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করলো না। রুমা বিরক্তিকর মনোভাব নিয়ে রাদিফের কাছে এসে বললো, নবাবজাদা এখানে বসে কি নবাবি কাজ করছিস? মা তোকে ডাকছে।রাদিফ ভয়ের দৃষ্টিতে রুমার দিকে তাকিয়ে বললো” আপু মা আমাকে মারবে না তো”।রুমা রাদিফের হাত ধরে টেনে উঠিয়ে বললো” মা মারলেই কি মারতে দেব” আমার লক্ষী ভাইটার কি কেউ নেই? আমি আছি তো আমার লক্ষী ভাইটির পাশে।রুমার কথা শুনে রাদিফ তাকে জড়িয়ে ধরে। ভাই বোনে খুনসুটি করতে করতে বাড়িতে ফিরে।মায়ের ভয়ে রাদিফ বাড়িতে ঢুকে কোন কথা বলে না।রুমা খেতে আয়,তোর বাবা কখন আসে তার ঠিক নেই। তোরা দুজনে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়।রুমা আর রাদিফ খেতে বসে।কি নবাবজাদা খাস না কেন? মা আপুকে নিষেধ করো আমি কিন্তু,,, রহিমা বেগম রুমার দিকে তাকিয়ে বললো খাবার সময় অন্তত দুজনে একটু শান্তিতে থাক।মা ওমা আমাকে খাইয়ে দাও না, তুমিতো জানো নিজের হাতে খেতে আমার একদম ভালো লাগে না।দাও না ওমা মা,, মা,,

তোর জ্বালায় আমার একটু শান্তি নেই। নে ধর হা কর।রাদিফ হাসি মুখে মায়ের কোলে এসে বসে হা করে। এই তো আমান সোনা মা লক্ষী মা,,,,,, আমার মায়ের মতো কেউ নেই।এদিকে রুমা রাদিফকে বললো মা কি শুধু তোমার নাকি আমারো। মা আমাকেও খাইয়ে দাও। রহিমা বেগম বিরক্ত হয়ে বললো ” তোদেরকে নিয়ে আর পারি না ” আমার হয়েছে যত জ্বালা।সারাদিন সংসার সামলাও, আর প্রতিদিন রাতে তোদের দুজনের অত্যাচার আর সহ্য হয় না আমার। আমি পাগল হয়ে যাব তোদের কে নিয়ে। খাওয়া শেষ করে রাদিফ মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো। রাদিফের মাথায় হাত দিতে দিতে রহিমা বেগম বললো “বাবা তুই আমার কথা শুনিস না কেন”। রাদিফ একটু কৌতুহলবশত হয়ে বললো কোন কথা মা? এইযে সারাদিন রোদে রোদে পুড়ে পাখির বাসা খুঁজিস, পাখির ছানা নিয়ে আসিস।মা আমার পাখি পালতে ভালো লাগে।তোর ভালো লাগলেই হবে নাকি।জানিস পাখি কত কষ্ট করে বাচ্চা ফোঁটায়। আচ্ছা ধর আমার থেকে তোকে কেউ নিয়ে গেলে কি করবি? কেন আবার ফিরে আসবো।রাদিফের প্রতিউত্তরে রহিমা বেগম বলে যদি অনেক দূরে নিয়ে যায়, আসতে না দেয় তখন। আমি খুব কান্না করবো।তেমনি পাখিরো খুব কষ্ট হয় তার ছানার জন্য। ওহ্ তাই বুঝি।হ্যাঁ রে বাবা তাই।তাহলে আমি আর কখনো পাখির ছানা আনবো না, আর পাখিকে কষ্ট দেব না।

★★★

সেদিনের পর থেকে রাদিফ পাখির নেশা একরকম ছেড়েই দিলো।গ্রীষ্মের প্রখর রোদে ঝিলের পানি কমে গিয়ে আশেপাশের চাষ জমি জেগে উঠলে গ্রামের মানুষ সেখানে বিভিন্ন ফসল ও সবজি চাষ করে।রাদিফ প্রায় বিকেলে ঝিলেন পারে ঘুরতে যায়।বিলের দক্ষিণ পাশের জোড়া তালগাছ তার সব সুখের স্থান। যত বাড়ি থেকে রাগারাগি করে, মায়ের তাড়া খাওয়ার পর রাদিফ সোজা এই জোড়া তালগাছের নিচে বসে সব ভুলে যায়।সে ঝিলের পাড়ে আসলেই এখানে আসবে। কিন্তু আজ সে তালগাছের নিচে এসে একটু অবাক হলো। ইস্ একি অবস্থা! পাখির বাসাটা এভাবে পড়ে আছে। সে দেখলো বাসায় অনেক গুলো ডিম ছিল, কিন্তু পড়ে সব ভেঙ্গে গেছে। রাদিফের খুব মায়া লাগল।কিন্তু এখনো দুটো ডিম আস্ত ছিল,ভাঙ্গে নি। সে সযত্নে ডিম দুটো তুলে নিল। বাড়িতে সে কাউকে একথা জানালো না। কিন্তু সে এ ডিম দিয়ে কি করবে, তার ভাবনার শেষ হলো না।সবশেষে এ সিদ্ধান্ত হলো যে বাচ্চা ফোটানো মুরগির নিচে দিবে তা দেওয়ার জন্য। সে তাই করলো,ডিম দুটো মুরগির নিচে দিয়ে দিল।এবার সে ভাবতে লাগলো ডিম দুটো কিসের? কি পাখির? মা জানতে পারলে আবার আমাকে মারবে। ঠিক একুশ দিন পর মুরগির বাচ্চা ফুটলো।কিন্তু দেখা গেল সবগুলো সাদা মুরগির বাচ্চার সাথে একটা কালো বাচ্চা। রাদিফের মা এ দেখে রেগে রাদিফকে ডাকতে শুরু করলো। রাদিফ,,,,,,,, রাদিফ,,,,,,
রাদিফ ঘর থেকে বলে উঠলো” কি হয়েছে মা “? একবার বাইরে আয় তো। মায়ের কথায় রাদিফ বাইরে আসলো। কিরে রাদিফ তুই না বলে ছিলি আর পাখিদের কষ্ট দিবি না।হ্যাুঁ মা বলেছি।রহিমা বেগম কালো বাচ্চাটিকে দেখিয়ে বললো তাহলে এটা কি? রাদিফ বাচ্চাটা দেখে অনেক খুশি হলো। মা এটা তাহলে শোন বলে রাদিফ মাকে সব কিছু বললো।আরকটা ডিম নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু কেউ বলতে পারলো না এটা কি পাখির ছানা। কুৎসিত কালোর উপর হালকা হলুদ বর্ণ,চ্যাপ্টা ঠোঁট, প্রশস্ত পা। যাহোক ছানাটা তার মুরগি মায়ের সাথে সারাদিন ধরে ঘুরে বেড়ায় আর খায়।আস্তে আস্তে ছানাটা বড় হতে থাকে। এবার তার মুরগি ভাই বোনেরা তাকে হিংসা করতে থাকে, তারা সবাই দেখতে এক রকম কিন্ত সে দেখতে ভিন্ন। তাই তারা সুযোগ পেলেই তাকে মারতো।একদিন সকালে তার মুরগি ভাই বোনেরা তাকে মারার জন্য তাড়া করলো। সে কোন উপায় না দেখে দৌড়াতে শুরু করলো। দৌড়াতে দৌড়াতে সে এসে পুকুরে পড়লো।তার এক মুরগি ভাই এসে পুকুরে পড়ে মারা গেল।কিন্তু সে পুকুরে ডুবে যাচ্ছে না।সে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করলো।সে এবার বুঝতে পারলো যে সে তার ভাই বোনের থেকে আলাদা।সে দেখলো পুকুরের পানিতে আরো কিছু হাঁস ভাসছে, সে ঠিক তাদের মতো। এরপর থেকে তার ভাই বোনেরা তাকে মারতে গেলেই সে দৌড়ে পুকুরের পানিতে নেমে যায়। কিছু দিন পড় সে দেখলো পুকুরে তার মতো কিছু পরিযায়ী পাখি ভাসছে। তখন বুঝা গেল সে একটি পরিযায়ী পাখি। সে তার সহজাত ভাইদের চিনতে পারলো,তাদের কাছে নিজের পরিচয় দিলো।পর দিন সে তার চোখের দুফোঁটা শুকনো জল ফেলে তার মুরগি মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সহজাত ভাইদের সাথে উড়ে গেল।

★★★

তেমনি আমরা যারা সমপ্রেমী ও সমকামী আমাদের নিজের সম্পর্কে জানতে হবে। আমারা কি, কেমন,কেন? ইত্যাদি হাজারো বিষয় সম্পর্কে জানতে হবে। কারণ আমরা সমাজের চোখে চক্ষুশূল। সমাজ আমাদের ঘৃণা, অবহেলার চোখে দেখে। আমাদেরকে মনে করে আমরা অসুস্থ, ভারসাম্যহীন, অস্বাভাবিক ও বিচ্যুত। সমাজ সর্বদা আমাদের বিপক্ষে অবস্থান করবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ যে সমাজে মদ্য পান নিষিদ্ধ, সে সমাজে যেমন মদ্য পানকে অস্বাভাবিক ধরা হয়।তেমনি আমরা যারা সমপ্রেমী ও সমকামী আমাদের আচরণকে প্রচলিত সমাজ অস্বাভাবিক ধরে নেয়। তাই পরিযায়ী পাখির মতো আমাদেরকেও বাঁচার কৌশল জানতে হবে।সমাজের সাথে নিজেকে মানিয়ে চলতে হবে।কাউকে বিশ্বাস না হলে দরকার নেই তার কাছে মনের কথা বলা।মনের কথা মনে রাখলেই তো চলে।আমার মনে হয় সমপ্রেমী ও সমকামীদের মধ্যে প্রচুর ধৈর্য শক্তি বিদ্যমান।দেখা যায় একজন স্ট্রেইট মানুষ তার মনের কথা অন্যকে না বলতে পারলে মানসিক যন্ত্রণায় ভোগে যা তাকে দেখলেই বোঝা যায়। কিন্তু একজন সমপ্রেমী বা সমকামী তাদের মনের কথা কাউকে না বলে যে মানসিক যন্ত্রণায় ভোগে তা কিন্তু সহজে কারো চোখে ধরা পড়ে না।সমপ্রেমি বা সমকামীদের অবদমন ক্ষমতা অনেক।আমরা পারি নিজেদের মানসিক যন্ত্রণাকে অবদমন করতে। যার কারণে আমরা মুচড়ে যায় কিন্তু ভেঙ্গে যায় না।আমরা প্রেমে ব্যার্থ হলে কষ্ট পাই কিন্তু কখনো সহজে আত্মহত্যা করি না।কিন্তু একজন স্ট্রেইট প্রেমে ব্যার্থ হলে সহজে আত্মহত্যা পথ বেচে নেয়। সৃষ্টিকর্তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, যে তিনি অনুগ্রহ করে আমাদের মধ্যে অবদমনের এই বিশেষ গুণ দিয়েছে।যখন আমি জানতে পারবো আমি সমপ্রেমী,সমকামী। তখন অবশ্যই জানতে হবে এর প্রতি সমাজের দৃষ্টি কেমন অনুকূল না প্রতিকূল। অন্তত মনে করি শিক্ষা ছাড়া এটা জানা সম্ভব না। তাই জানতে হলে শিক্ষা অর্জন করতে হবে। নিজেকে যোগ্য করে গড়তে হবে। নিজেকে বাঁচানোর জন্য হাতিয়ারের ব্যাবহার জানতে হবে। সর্বপোরি নিজেকে জানতে হবে, নিজেকে গড়তে হবে। তারপর না হয় পরিযায়ী পাখির মতো সহজাত ভাইদের সাথে উড়ে গেলাম।যেখানে আমরা সুন্দর করে বাঁচতে পারবো,কারো অবহেলা, ঘৃণা আমাদের স্পর্শ করবে না। তাই নিজেকে সামলাতে আচরণের পরিবর্তন, ইচ্ছে গুলোর অবদমন, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
আমাদেরকে এটা বুঝতে হবে যে, সমাজ মনে করে আমরা অসুস্থ আমাদের চিকিৎসার দরকার।কিন্তু আমরা তো জানি আমরা কি…………….???

লেখক :শুভ্র মেঘ

প্রকাশেঃসাতরঙ্গা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.