কফি শপ

লেখক- অরণ্য রাত্রি


অচিন-পুর শহর। শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে প্রমত্ত সাঙ্গু নদী। শহরটা ছোট হলেও এখানে একটি বড় মেডিক্যাল কলেজ রয়েছে। কলেজ শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত। আমি এই শহরে বড় হয়েছি। কিন্তু এখন থাকি ঢাকায়। পড়াশোনার জন্য পারি জমাতে হয়েছে ঢাকায়। আজ দীর্ঘ ৬ মাস পর অচিন-পুর এলাম। এখন এই শহরে আমার পরিবারের কেউ থাকে না। তাই বাধ্য হয়ে উঠতে হল বন্ধুর বাসায়। দীর্ঘ ১ মাস থাকার উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছি। আমার বন্ধুটার নাম কিশোর। তার খুব সুন্দর, ছিমছাম , ছোট একটা কফি শপ আছে । কফি-শপ টা শহরের কেন্দ্রস্থলে কলেজের ঠিক পাশেই অবস্থিত। কলেজের পাশে অবস্থিত হওয়ায় প্রচুর ছাত্র,ছাত্রী রা আসে কফি-শপে।
কিশোর আমার ছেলেবেলার বন্ধু। আমরা সব কিছুই শেয়ার করি। যেমন আমি যে সমকামী তা কিশোর জানতো। আবার সে যে সমকামী তাও আমি জানতাম। অবশ্য আমরা শুধুই বন্ধু। বেসটি। কিংবা ভাইও বলা যায়।আমি অচিন-পুরে এসে সন্ধ্যা বেলাটা কিশোরের সাথেই তার কফি-শপে কাটাবো। কফি-শপে কত ধরনের মানুষ আসে। আমার শখ নানা ধরনের মানুষ দেখা।কিশোর কে বলতেই সে রাজি হয়ে গেলো। কিশোরের কফি-শপের নামে “কফি ও গল্প”। ইন্টেরিওর খুব সুন্দর। কিশোরের রুচির প্রশংসা করতে হয়। এত ছোট শহরেও এত সুন্দর ছিমছাম কফি শপ। আমার গানের গলা ভাল আর আমি গিটার বাজাতে পারি। কিশোরের ইচ্ছা সামনের থারটি ফাস্ট নাইটে একটা মিউজিকাল নাইট করবে আমাকে দিয়ে। আমিও খুব এক্সাইটেড।
প্রথম দিন কফি শপে এসেই আমি অবাক। এত মানুষ। বসার জায়গা দেয়া যাচ্ছে না। আর কিশোর আর দুই জন সহকারী খাবার সারভ করতে করতে হয়রান হয়ে যাচ্ছে। আমিও সাহায্য করতে গেলাম। সে মুখ ঝামটা দিয়ে বলল
– তুই বসে বসে মানুষ দেখ। তুই পারবি না এসব কাজ।আর একদমই যদি কিছু করতে চাস তাহলে কাউন্টারে বস।
আমি এক মগ কফি নিয়ে কাউন্টারে বসলাম। কফি অসাধারণ হয়েছে। এই জন্যই তো মানুষ এত আসে। কফি শপে কফি ছারাও কিছু খাবার পাওয়া যায়। সেগুলোর চাহিদাও কম না। রাত দশটার দিকে মানুষের রাশ কমে গেলো একদম। কফি-শপ বন্ধ করা হয় এগারোটায়। ঠিক দশটায় একজন ছেলে দরজা খুলে ঢুকল। আমি তাকালাম। এত সুন্দর হয় মানুষ!


কিশোর এখন আমার সাথে কাউন্টারে এসে বসেছে।এদিকে ছেলেটার চেহারা দেখে আমি মোহিত হয়ে গিয়েছি। ফিসফিস করে কিশোর কে জিজ্ঞেস করলাম
– ছেলেটা কে রে?
– ছেলেটার নাম অয়ন। মেডিক্যাল কলেজে পড়ে। প্রতিদিন ১০টা সময় আমার দোকানে আসে কফি খেতে।
– ছেলেটা দেখতে জোস। আমি তো প্রেমে পরে গিয়েছি
– হা হা। আরেকটা কথা। তুই শুনলে খুশি হবি। ছেলেটা সমপ্রেমী । আমাদের মতই। ফেসবুকে তার ফেক আইডি আছে।
– জোস। আমার এর সাথে প্রেম করতেই হবে। নাহলে আমার এই জীবনই বৃথা।
আমার ভাগ্য প্রসন্ন ছিল। ভাগ্যদেবতা মনে হয় আমার আকুতি শুনেছেন। অয়ন বিল দিয়ে চলে গেলো। কিন্তু একটা বই ফেলে রেখে গেলো। বইটা ফেরত দেয়ার নাম করে অয়নের সাথে দেখা করার একটা ছুতা পেলাম। ঠিক করলাম কাল সকালে মেডিক্যাল কলেজে যাবো অয়নের বইটা ফেরত দিতে।আর এভাবেই বন্ধুত্ব করতে হবে।


২টার দিকে ক্লাস শেষ হয়। আর তখন সবাই কলেজ থেকে হস্টেলে ফিরে। আমি ১.৩০ টা থেকে কলেজের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আমড়া , চটপটি আর ফুচকা খাওয়া হল কিন্তু অয়নের দেখা নেই। অবশেষে দেখা পেলাম। সাদা এপ্রন পরে অয়ন গেটের দিকে আসছে। সাদা এপ্রনে তাকে অসম্ভব কিউট লাগছে। আমি কি এগিয়ে যাবো নাকি গেটের সামনে দারিয়ে থাকবো তা বুঝতে পারছি না। কিন্তু আমার এত বুঝবার দরকার হল না। অয়ন ই আমার সামনে এসে দাঁড়ালো ।
– আপনি এখানে?
– ইয়ে মানে হ্যাঁ
– কার কাছে এসেছেন?
– আপনি আমাকে চিনেন?
– হ্যাঁ কাল তো কফি শপে দেখলাম। কিশোরদার সাথে কাউন্টারে বসে ছিলেন
তার মানে ছেলেটা আমাকে কাল লক্ষ্য করেছে। আমি তো একদমই বুঝতে পারি নাই। গলা খাঁকারি দিয়ে বললাম
– ইয়ে মানে আপনার কাছেই এসেছি
– কেন?
– এই যে এই বইটা ফেলে রেখে এসেছেন। তাই ফেরত দিতে এসেছি
এবার অয়ন হেসে দিল। বলল
– আমি প্রতি রাত ১০টা সময় ক্যাফে তে যাই। কিশোর দা জানেন। আপনি কষ্ট করে আসতে গেলেন কেন?তখন ফেরত দিলেই হত
– না ভাবলাম দরকার লাগে যদি
– এসব ফালতু কথা। আসলে আপনি আমার সাথে দেখা করতে এসেছেন।
আমি ঢোক গিললাম। অয়ন সব বুঝে ফেলেছে।
– কিন্তু আমার পিছনে ঘুরে তো লাভ নেই। আমার বফ আছে।
কেউ যেন আমার বুকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করলো । কি বলবো বুঝতে পারছি না।অয়নের কথা গুলো আমাকে প্রচণ্ড ভাবে আহত করেছে।
– কে বলল আপনাকে আমি আপনার পিছনে ঘুরতে এসেছি। আমি চেয়েছিলেম শুধু বন্ধুত্ব। আপনি চান না ভাল কথা। বিদায়।
আমি চলে যাচ্ছি। পিছন থেকে অয়ন ডাক দিল।
– শুনেন।
– জি বলুন
– আই এম সরি। আপনাকে হার্ট করে থাকলে
– ইটজ অকে।
– আপনার সাথে বন্ধুত্ব করতে আমার কোন অসুবিধা নাই। ইনফাক্ট আমার বন্ধু সংখ্যা খুব কম। আর সমপ্রেমী বন্ধু তো নেই ই।
– ধন্যবাদ।

আমার কেমন মন খারাপ লাগছে। বন্ধুত্ব হল কিন্তু এর চেয়ে বেশি তো কিছু হবে না। আর তারপর থেকে আমরা প্রায় প্রতিদিন দেখা করতে লাগলাম। জানতে পারলাম অয়ন সম্পর্কে অনেক কিছু। তার পরিবার, বাবা, মা , ভাই , বোন। তার ভাল লাগার আর পছন্দের সব কিছু। সবচেয়ে বেশি জানলাম তার বফ সম্পর্কে। সে সারাক্ষণ তার বফ কে নিয়ে বক বক করতেই থাকে।আমার খারাপ লাগে শুনতে। কিন্তু অয়ন জেনেও না বুঝার ভান করে। এই কয় দিনে অয়নের বফ সম্পর্কেও সব জেনে গেলাম আমি।অয়ন যে তার বফ কে অসম্ভব ভালবাসে তা তার কথা শুনলেই বুঝা যায়। অয়নের বফ বয়সে আমাদের ২ জনের চেয়ে বড়।নাম পলাশ। ব্যবসা করে।বিয়ে করে নাই। কখনো নাকি করবেও না। অয়নের ইচ্ছে বফ আর সে একসাথে ১০ তলার উপরে একটা ছোট ছিমছাম ফ্ল্যাট কিনবে। ওখান থেকে পুরা ঢাকা শহর দেখা যাবে। আমার প্রচণ্ড লোভ লাগে। হিংসা হয়। এ ধরনের স্বপ্ন আমিও দেখেছি।


এভাবেই চলে যাচ্ছিল দিন গুলো। আমরা প্রায়ই এখানে সেখানে ঘুরতে যাই। কখনো ঝরনার জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকি। কখনো আবার নীল পাহাড়ের চূড়ায় উঠে শহর টা কে দেখি। সাঙ্গু নদী তে বিকেলে নৌকা ভ্রমণ আমার খুব প্রিয়। নৌকা মাঝ নদিতে নিয়ে সেখানে বসে সূর্যাস্ত দেখি। কিন্তু তারপরও জীবনটা কে অপূর্ণ মনে হয়। কারণ অয়ন তো আমার জীবনে থেকেও নেই। এদিকে অয়নের বফ পলাশের জন্মদিন চলে আসছে। এটা নিয়ে আমার কোন মাথা ব্যথা নেই। কিন্তু অয়নের আছে। এটা তার জীবনে পলাশের সাথে প্রথম জন্মদিন পালন।আমাকে অয়ন জিজ্ঞেস করছে
– আচ্ছা তোমার বফ থাকলে তোমার বফ এর প্রথম জন্মদিনে কি দিতে?
আমি অনেকক্ষণ চিন্তা করে বললাম
– একটা লাল গোলাপ
– শুধু একটা গোলাপ?
– হ্যাঁ। আমি খুব সাধারণ মানুষ। তাই আমার উপহারও সাধারণ । কিন্তু এতে আমার জীবনের সমস্ত ভালবাসা নিহিত রয়েছে
– ধ্যাত তোমার সব দার্শনিক কথা। ভাবছি পারফিউম দিবো। কিন্তু এই মরার শহরে তো ভাল পারফিউমও পাওয়া যায় না। কি যে করি!
আমি হাসলাম। অয়ন বলল
– এই আমার সাথে চিটাগাং যাবে? উপহার কিনবো। এখান থেকে চিটাগাং যেতে মাত্র ২ ঘণ্টা লাগে। চল না।
– তুমি বলেছ আর আমি যাবো না? তা কি করে হয়?


পরের দিন খুব ভোরে চিটাগাং এর বাসে উঠবো।হিম হিম ঠাণ্ডা। এখনো গরম পরে নাই। আর ভোর বেলা তো। প্রচণ্ড শীত। জিনসের একটা জ্যাকেট পরেছি আমি।বাস কাউন্টারে অপেক্ষা করছি অয়নের জন্য। কিন্তু অয়ন লেট করছে। ১০ মিনিট হয়ে গিয়েছে। বিরক্ত লাগছে। দেখলাম অয়ন দৌড়ে আসছে। কাঁধে ব্যাগ।
– সরি লেট করে ফেললাম।
মনে মনে বিরক্ত হলেও মুখে বললাম
– ইটজ ওকে
বাসে উঠলাম। ২ জনই পাশাপাশি সিটে বসেছি। কেমন উত্তেজনা কাজ করছে ভিতরে ভিতরে। একটা সম্পূর্ণ দিন অয়নের সাথে কাটাবো ভাবতেই দারুণ লাগছে। বাসের জানালা খোলা। বাতাস এসে অয়নের লম্বা চুল গুলো কে এলো মেলো করে দিচ্ছে। অয়ন কেমন লজ্জা লজ্জা মুখে তাকিয়ে থেকে বলল
– কি দেখছও বল তো এইভাবে?
– তোমাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে।
– উফ এসব কথা আর কত! তুমি নিজে কত সুন্দর খেয়াল আছে? যে কেউ তোমার সাথে রিলেশন করতে চাইবে।আমিও হয়তো করতে চাইতাম পলাশের সাথে রিলেশন না থাকলে।
মনটা কেমন খুশি হয়ে গেল। ভাবছি ঈশ পলাশের সাথে অয়নের রিলেশনটা যদি ভেঙ্গে যেত। কিন্তু তা তো হবার নয়। পলাশ অয়ন কে অনেক ভালবাসে।
১০ টার দিকে পৌঁছে গেলাম চিটাগাং। নেমেই ছুটলাম সানমার অশেন সিটি। পারফিউম কিনবো। অনেক খুঁজে পেতে একটা পারফিউম পছন্দ করলো অয়ন। আমার খুব হিংসা লাগছিল। আমার জন্য কেউ কখনো উপহার এইভাবে কিনে নাই। উপহার কিনা শেষ হলে লাঞ্চ খেলাম । এরপর আমি প্রস্তাব দিলাম অয়ন কে
– চল সমুদ্র দেখে আসি। চিটাগাং এসেছি আর সি বিচে যাবো না?
– দেরি হয়ে যাবে না?
– একদিন একটু দেরি হোক না। আমরা তো আর প্রতিদিন দেরি করবো না।
অয়ন কি জানি ভেবে বলল
– আচ্ছা চল।

সমুদ্র আমার বরাবর প্রিয়। পাহাড়ের থেকে সমুদ্র ভাল লাগে বেশি। পতেঙ্গা এসে নামলাম দুজন। শীতকাল। বিকেল দ্রুত হয়। সমুদ্রের বিশালতার সামনে দাঁড়ালে অন্য এক অনুভূতি কাজ করে। পৃথিবীর বিশালতা অনুভব করা যায়। আমরা যে কত ক্ষুদ্র সেটা বুঝা যায়। সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব অনুভব করি।
পাথরের বাঁধ পার হয়ে নামলাম সৈকতে। নামার সময় অয়ন কে হাত ধরে নামালাম। এই প্রথম তার হাত ধরা। ওর কাছে হয়তো কোন ব্যাপার না। কিন্তু আমার কাছে অনেক বড় একটা ঘটনা। হাঁটছি সোনালী বালির সৈকতে। আস্তে আস্তে ঢেউ এসে পা ভিজিয়ে দিল।অনেকক্ষণ জলকেলি করলাম। সমুদ্রের বালিতে নাম লিখলাম দুইজনের। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। একটা পাথরের উপরের বসে সূর্যাস্ত দেখবো। সেই সাথে গল্প করছি। আমাদের জীবনের সব না বলা কথা। এত সুন্দর সময় আমার জীবনে কম এসেছে। হটাত অয়ন আমার কানে কানে কি জানি বলতে চায়। শুনলাম কথা টা । শুনে আমি কষ্ট পাবো না খুশি হব বুঝতে পারছি না। অয়ন বলেছে
– আমার জীবনে তেমন কোন বন্ধু ছিল না। আজ মনে হচ্ছে আমি আমার সেরা বন্ধু পেয়ে গিয়েছি। তুমি আমার সেরা বন্ধু
কিন্তু আমি মনে মনে ভাবছি আমি কি সেরা বন্ধু হতে চেয়েছি?সূর্য পশ্চিম আকাশ লাল করে ডুবে যাচ্ছে। অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য। কিন্তু আমার মনটা ভার হয়ে আছে। কিছুই ভাল লাগছে না। সূর্য অস্ত গেলো। চারিদিক অন্ধকার হয় আসলো। এখন চলে যাওয়া দরকার।অয়ন বলল
– আমার কিছু শামুকের জিনিস পছন্দ হয়েছিল। কিনবো
– আচ্ছা তুমি কিনে নিয়ে এসো। আমি এখানেই বসছি। ভিড়ের মধ্যে ঢুকতে ইচ্ছা করছে না।
– আচ্ছা।

চারিদিক অন্ধকার। দূরে সমুদ্রে জাহাজের আলো দেখা যাচ্ছে। আমি উপরের আকাশের দিকে তাকালাম। আকাশ পরিষ্কার।তারা গুনা যায়। বেশ অনেকক্ষণ হল অয়ন আসছে না। চিন্তা লাগছে। রাস্তা হারিয়ে ফেললো না তো ? ভাবলাম ফোন দিবো।তক্ষুনি দেখলাম অয়ন আসছে হন্তদন্ত হয়ে। মুখটা ফ্যাকাসে। আমার পাশে এসে বসলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম
– কি হল এত দেরি?
অয়ন কেমন যেমন চুপ হয়ে গিয়েছে। কিছুই বলছে না ।আমি একটা ধাক্কা দিয়ে বললাম
– কি হয়েছে বল তো ?
অয়ন কেমন যেন তোতলাতে তোতলাতে বলছে
– আমি এই মাত্র পলাশ কে দেখলাম একটা মেয়ে আর একটা ছোট বাচ্চার সাথে ।
– বল কি?
– ও তো সকালে বলেছিল সে ঢাকায় । চিটাগাং আসবে এমন তো সে বলে নাই।
– তুমি কথা বলেছ?
– না দূর থেকে দেখে বলেছি।
– যাও কথা বল । জানতে চাও কি ব্যাপার।ভুল বুঝাবুঝি হতে পারে।
– ঠিক বলেছ। তুমি বস। আমি আসছি।
– আমি আসবো ?
– না। তুমি থাকো
অয়ন ৫ মিনিটের মাঝেই চলে আসলো। অন্ধকারে ঠিক বুঝা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে অয়নের চোখ ভেজা। এমই জিজ্ঞেস করলাম।
– কি হয়েছে?
– আমাকে এখন কিছু জিজ্ঞেস কর না প্লিজ।
গলার স্বর শুনে বুঝতে পারলাম আসলেই কিছু হয়েছে।আমি আর চাপাচাপি করলাম না। রাত হয়ে গিয়েছে। বাড়ি যাওয়ার কথা।বাস স্ট্যান্ডে আসলাম। বাস আসতে আরও আধা ঘণ্টা। কাউন্টারে বসলাম। অয়ন তখন থেকে যে চুপ হয়েছে আর কোন কথাই বলছে না।আমি বেশ ঠাণ্ডা গলায় বললাম
– আমাকে কি বলবা কি হয়েছে?
– কিছু না। পলাশ বিবাহিত। তার স্ত্রী এবং সন্তান রয়েছে। আর আমাকে সে চিনে না।
আমি অবাক হলাম না। ফেসবুকে পরিচয় হয়ে প্রেম করতে গেলে এমন ঘটনা অনেকের সাথেই ঘটেছে। কিন্তু পলাশ! আমি আসলে অয়ন পলাশের সম্পর্কে এত ভাল কথা বলেছে যে আমার মাথাতেই আসে নাই এমন হতে পারে। সারা বাসে অয়ন চোখ বন্ধ করে থাকলো। বুঝলাম শকড। ওকে এখন একা থাকতে দেয়াই উচিৎ। একটু সামলে উঠুক তারপর নাহয় সান্ত্বনা দেয়া যাবে । বুঝানো যাবে।


খুব সকালে ফোন আসলো অয়নের।
– হ্যালো
– হ্যালো
– তুমি একটু আসবা ? আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। তুমি আসবা একটু ? তুমি ছাড়া তো আর কেউ নেই কথা বলার।
– আমি আসছি।
নদীর ধারে যেয়ে বসলাম ২ জন। একদিনই অয়নের চোখ গর্তে ঢুকে গিয়েছে। দেখেই বুঝা যাচ্ছে কিছু খায় নাই। ওখানেই একটা ছোট রেস্টুরেন্ট রয়েছে। জোর করে খাওয়ালাম। তারপর আবার নদীর ধারে একটা সেতুর মত রয়েছে তার ধারে যেয়ে বসলাম। ওর কাছ থেকে যা শুনলাম। পলাশ আসলে বিবাহিত। স্ত্রী এবং পুত্র রয়েছে। চিটাগং বেড়াতে এসেছে ফ্যামিলি নিয়ে। কিন্তু এমনই কপাল যে অয়নের হাতে নাতে ধরা পড়বে সে ভাবেই নাই। পলাশের স্ত্রী যাতে কিছু না বুঝতে পারে সে জন্য অয়ন কে না চেনার ভান করেছিল পলাশ। গতকাল গভীর রাতে নাকি ফোন দিয়েছিল পলাশ অয়ন কে। মাফ চেয়েছে। কিন্তু অয়ন সম্পর্ক রাখবে না ঠিক করেছে। এত বড় সত্য যে গোপন করে তার সাথে কিসের সম্পর্ক। অয়ন এত শক্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে তা ভাবি নাই আমি। অয়ন কে বাইরে থেকে অনেক নরম মনে হলেও ভিতর টা অনেক শক্ত।
এরপর বেশ কয়েকদিন কেতে গেল। প্রতিদিন ২ জন এক সাথে বের হয়েছি। শহরের ধারে কাছে কোথাও না কোথাও যাচ্ছি। অয়ন ক্লাস মিস দিচ্ছে। আসলে ওর এখন একটু একটু করে মন টা কে ঠিক করতে হবে। তাই কয়েকদিন ক্লাস করছে না। কিন্তু জ্বালা হয়েছে আমার। আমি আরও বেশি করে প্রেমে পরে যাচ্ছি অয়নের।এক দিন করলাম একটু দূরে যাবো ১ দিনের জন্য। গেলাম বান্দরবানের নীলগিরি। রাতে থাকবো। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে অয়ন আমার প্রতি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। তাহলে কি আমার ওকে প্রপোজ করা উচিৎ ? চান্দের গাড়ি করে নীলগিরি এসে পৌঁছে গেলাম। মাঝখানে ছিল শৈলপ্রপাত। সেটাও দেখলাম। যখন নীলগিরি তে পৌঁছে গেলাম তখন বিকেল। যায়গা টা যে এত সুন্দর আমার ধারনাই ছিল না। সেদিন রাতে ঘটলো একটা ঘটনা। আমরা গল্প করতে করতে রাত তিনটা বেজে গেলো। ২ জন একটা ঘরে। আর কেউ নেই। বাইরে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। একটা লেপ দিয়েছে। তার নিচেই শুয়েছি ২ জন। আমার এত দিনের ধৈর্যের বাঁধ মনে হয় ভেঙ্গে গেল। আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম। ওর দিক থেকে কোন বাঁধা আসলো না। সেই রাত্রে আরও অনেক কিছু হল তা নয়। কিন্তু আমরা একজন আরেকজন কে চুমো দিয়েছিলাম। একদম ভোরে ঘুম থেকে উঠলাম। কারন তখন নীলগিরির সবচেয়ে সুন্দর থাকে। চারিদিকে মেঘ আর মেঘ । মনে হয় যেন মেঘের সমুদ্র। আমি দৌড়ে বের হলাম কটেজ থেকে। বের হয়ে তো আমি মুগ্ধ। এত সুন্দর দৃশ্য একা দেখা যায় না। অয়ন কে ডাকতে গেলাম। দেখলাম সে মুখ কালো করে বসে আছে। আমি বললাম

– কি ব্যাপার? বাইরে চল দেখ কত সুন্দর দৃশ্য।
– তোমার সাথে কথা আছে।
– এখুনি বলতে হবে?
– হ্যাঁ
– বল
– কালকে রাত্রে এটা কি হল! অবশ্য তোমাকে একা দোষ দিচ্ছি না। আমারও ইনভল্ভমেন্ট ছিল।
– আমি তোমাকে ভালবাসি। আর তুমিও আমাকে ভালবাসও তাই এমন হয়েছে।
– আমি তোমাকে ভালবাসি না। খুব ভাল বন্ধু মনে করি। আর ভালবাসার ভুল করবো না।
– তুমি ভুল মানুষ কে ভালবেসেছিলে।
– এত কিছু বুঝি না। আমাদের আলাদা হয়ে যেতে হবে। এক ভুল আমি দ্বিতীয় বার করবো না।প্লিজ তুমি আমাকে ভুল বুঝো না। আজকের পর থেকে আমি আর তোমার সাথে দেখা করবো না।
– কি বলছও এসব ? তোমার মাথা ঠিক আছে?
– খুব ঠান্ডা মাথায় এই কথা গুলো বলছি।
আমি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে একটা কথাই বললাম
– কালকে থারটি ফাস্ট নাইট ।কফিশপে আমি সারা সন্ধ্যা গান গাইবো। তুমি যদি আমাকে ভালবাসও তাহলে অবশ্যই তুমি লাল গোলাপ নিয়ে সেখানে আসবে আমার জন্য।
অয়ন জল ভরা চোখ নিয়ে তাকিয়ে আমার দিকে। কিছুই বলছে না। এরপর নাস্তা না করেই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অচিনপুরের উদেশ্যে রওনা দিলাম আমরা। আমাদের মাঝে আর একটা কথাও হল না। অচিনপুর নেমে যে যার পথে চলে গেলাম।


আজকে ডিসেম্বরের ৩১ তারিখ। সন্ধ্যা থেকেই কফি শপে বসে আছি গিটার নিয়ে গান করছি। এত মানুষ আসছে যাচ্ছে। আমার বেশির ভাগ গান গুলো রোমান্টিক। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে অয়ন আসবে। তাই বার বার নজর চলে যাচ্ছে গেটের দিকে। আমি যেমন অয়ন কে ভালবাসি তেমনি আমার মনে হয়েছে এতদিনে অয়নও আমাকে ভালবেসে ফেলেছে। আর সেদিনের লেপের নিচে যে আমাদের ২ জনের মধ্যে যা হল তার সবটুকুই কি জৈবিক চাহিদা? ভালবাসা বলতে কিছু ছিল না? আমি গাইছি
তুমি আকাশের বুকে বিশালতার উপমা
তুমি আমার চোখেতে সরলতার প্রতিমা
আমি তোমাকে গড়ি ভেঙ্গে চুড়ে শতবার………………
গানটা গাইছি,। আর চোখের সামনে অয়নের ছবি ভাসছে।এত দেরি করছে কেন অয়ন?

“অয়নের ডায়রি থেকে…”

হলের পুকুরের পাশে বসে একটার পর একটা পাথর ফেলছি। কি করবে বুঝতে পারছি না।ভাবছি এত অল্প সময়ের ব্যবধানে , তার উপর যাকে বন্ধু মনে করতাম তার সাথে রিলেশনে যাওয়া কি ঠিক হবে। একটা ভুল তো করেছি আর নয়। হ্যাঁ ওর প্রতি আমি দুর্বল হয়ে পড়ছি। তাই তো তার থেকে দূরে সরে যেতে হবে। আজকে থার্টি ফাস্ট নাইট। চারিদিকে আনন্দ উৎসব। সবাই কফি শপে যাচ্ছে গান শুনতে।আমারও খুব শুনতে ইচ্ছা করছে। খুব খুব।খুব কষ্ট হচ্ছে।ছোট বেলায় কষ্ট পেলেই বাবা মায়ের কাছে ছুতে যেতাম। মনে করতাম আমার সব কষ্ট তারা দূর করে দিবে।আজকে কি করবো । এত ছোট তো আমি আর নেই। আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি।

পরিশিষ্ট…
৩১ ডিসেম্বর রাত্রে অচিনপুর থেকে ঢাকাগামী একটি বাস খাঁদে পরে যায়। বাসের ড্রাইভার সহ সকল যাত্রী মারা যায় সেই দুর্ঘটনায়। সেখানে অয়ন নামে একটি ছেলে ছিল। সে অচিনপুর মেডিক্যাল কলেজের থার্ড ইয়ারের ছাত্র ছিল। সে ঢাকায় বাড়ি যাচ্ছিলো বাবা মায়ের কাছে।
যাকে ভালবাসি তার সাথে ব্রেকাপ কষ্ট দেয়। কিন্তু তার মৃত্যু যে কষ্ট দেয় তার তুলনা নেই …………………।

প্রথম প্রকাশ- সাতরঙ

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.