ভ্রম

লেখক : নিউট্রন

তিনু উঠে বসে। জামাটা ঠিক করে পরে নেয়, আলুথালু হয়ে থাকা চুলে আঙুল বুলিয়ে ঠিক করার চেষ্টা করে। ওয়াশরুম হয়ে আসার পথে শিহাবের ঘুমন্ত শরীরে একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। বেশ পুরুষালি গঠন শিহাবের। লম্বা গড়ন, চওড়া কাঁধ, মাংসল পৃষ্ঠদেশ, লোমশ বুক, মেদহীন উদর; যে কোন নারীর দৃষ্টি আকর্ষণের যোগ্য। কিন্তু এই মুহূর্তে শিহাবের নগ্ন শরীরে দ্বিতীয়বার তাকাতে ইচ্ছা করছে না ওর। হালকা পায়ে হেঁটে বারান্দায় আসে। শরীর জুড়ে শিহাবের গন্ধ। গা ঘিনঘিন করে উঠে। একটু গোসল করে নিলে বেশ হত। এত রাতে গোসল করা ঠিক হবে কিনা ভাবতে ভাবতেই ফোন বেজে উঠে।বল।কী করিস?বারান্দায়।এত রাতে?ঘুম আসছে না।কেন?হি ডিড ইট এগেইন।টেলিফোনের ওপাশটা এবারে নিস্তব্ধ। দুজনেই কিছুটা সময় চুপ করে থাকে।“তোর খুব কষ্ট হয়, না রে?”উত্তরে কেবল ওপ্রান্ত থেকে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ভেসে আসে। কাল একবার আসবি?এসে কী হবে?আয় না। তোকে খুব দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে।দেখে কী করবি?কিচ্ছু না। শুধু দেখব।আচ্ছা।আচ্ছা শোন৷ এখন রাখছি রে। কাল দেখা হবে তবে। টাটা!নিঃশব্দ ফোনটা কতক্ষণ কানে চেপে ধরে রাখে তিনু। ওর ভালো লাগে। ভার্সিটির সিনিয়রদের অনেক ভাব থাকে এই ধারণাটা তিনুকে দেখে আরো বদ্ধমূল হয় এশার। তিনু এশার তিন ব্যাচ সিনিয়র। সুন্দরী৷ তবে চেহারায় কাঠিন্যের আড়ালে সেই সৌন্দর্যটা ঢাকা পড়ে যায় প্রায়ই৷ ডিবেটিং ক্লাবের সদস্য৷ জাতীয় আর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেশ কিছু অর্জনও আছে। ডিবেটিং ক্লাবের নবীন বরণের দিন দেখা অহংকারে মাটিতে পা না পড়া মেয়েটাই একদিন তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবে কে জানতো!ঘুম ভাঙতে একটু দেরিই হয়ে গেল আজকে। ক্লাসটা আর ধরতে পারবে না নিশ্চিত। তাই একটু আলসে ভঙ্গীতেই উঠে বসল। ডাইনিংরুম থেকে বাসনের আওয়াজ আসছে। বাবা উঠেছেন বোধহয়। তিনুর বাবা জনাব রফিকুল ইসলাম অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা। ছাত্র জীবন থেকে পেশা জীবন পেরিয়ে অবসর জীবনেও খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠার অভ্যেসটা চালু রেখেছেন। মেয়েটা তার অভ্যাস পায় নি৷ প্রায়ই দেরি করে উঠে। উনি ঘুম থেকে উঠে ঘন্টাখানেক হাঁটেন, নাস্তা করেন, বারান্দার গাছগুলোয় পানি দেন, মেয়ের জন্য নাস্তা বানান, এরপরে খবরের কাগজ নিয়ে বসেন। ততক্ষণে মেয়ে উঠে পড়ে৷ তাকে আর্লি টু বেড এন্ড আর্লি টু রাইজ শিরোনামে এক চোট ভাষণ শোনানো শেষে নাস্তা খাওয়ান। নাস্তা খাওয়ান বলতে, মেয়ে নাস্তা খায়। তিনি পাশে বসে থাকেন। এটা তার প্রাত্যহিক রুটিন।

ডিবেট রুমে আজকে খুব একটা ছেলেমেয়ে নেই৷ এশা এপ্লিকেশনটা হাতে নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত পায়ে রুমে প্রবেশ করল। তিনু আছে, সাথে আরো দুয়েকটা ছেলে মেয়ে আছে৷ গতদিন তার এপ্লিকেশনটা তিনু বাতিল করে বেশ একচোট বকাঝকা করেছিল। আজকে আবার লিখে নিয়ে এসেছে। তিনু এপ্লিকেশনটায় একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। ঝরঝরে হাতের লেখা। বানানেও ভুল নেই কোন। কিন্তু ফরম্যাটটায় একটু সমস্যা। মেয়েটাকে গতদিন এক দফা বকা দিয়েছে৷ আজ আবার কিছু বলা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছে না।“তুমি একটু বস। তোরা যা। আমি আসছি।”প্রথম কথাটা এশা এবং দ্বিতীয় কথাটা বন্ধুদের উদ্দেশ্যে বলা৷ তিনুর বন্ধুরা বের হয়ে যায়। এশা সামনের ফাঁকা চেয়ারটায় বসে পড়ে। “সাথে কাগজ আর কলম আছে?”এশা উত্তর না দিয়ে ব্যাগ থেকে কাগজ- কলম বের করে নেয়।“আমি যেভাবে বলছি সেভাবে লিখ। এখানে বসেই লিখ।”তিনু এশাকে এপ্লিকেশনের ফর্ম্যাটটা বুঝিয়ে দেয়। ফ্যানের বাতাসে তিনুর গা থেকে ভেসে আসা পারফিউম আর শরীরী গন্ধের মিশ্রণে মাদকতায় পরিপূর্ণ একটা গন্ধ এশার দরখাস্ত লেখায় ব্যাঘাত ঘটাতে থাকে বারবার। কাঁপাকাঁপা হাতে এপ্লিকেশনটা লিখে শেষ করে তিনুর হাতে দেয়। তিনু আবার চোখ বুলিয়ে নেয় সেটায়। এবারে পুরোপুরি নির্ভুল হয়েছে। প্রশংসাসূচক দৃষ্টিতে এশার দিকে তাকাতেই এশার ঘোরলাগা চোখের সাথে দৃষ্টি বিনিময় হয়ে যায়। লজ্জায় চোখ নামিয়ে এক ছুটে ঘর থেকে বের হয়ে যায় এশা।

বরাবরই বাসে তিনুর কাঁধে মাথা রেখে ঘুমানোর অভ্যেস এশার। বাসে ঝাঁকি লাগায় ঘুমটা একটু হালকা হয়ে যায় এশার। ঘুমের মাঝেই অনুভব করতে পারে তিনুর শরীরের স্পর্শ। একবার তাকাতেই মুচকি হাসিতে যেন আশ্বস্ত হয় সে। আবার ঘুমে ঢলে পড়ে।জনাব রফিকুল ইসলাম এখনও ঠিক ঠিক সকালে উঠেন। তবে আগের মতন আয়োজন করে দিনটা শুরু করতে পারেন না। বছর খানেক আগে ব্রেইন স্ট্রোকে শরীরের অর্ধাংশ প্যারালাইজড হয়ে গিয়েছে। বেশিরভাগ সময় শুয়েই দিন কাটাতে হয়। কাজের মেয়েটা আছে। মাঝেমধ্যে উঠে বসিয়ে দেয়। বানান করে করে খবরের কাগজ পড়ে শোনায়। তিনি মাঝেমধ্যেই ভুল শুধরে দেন। মা- মরা মেয়েটাকে বেশ ভালো ঘরে বিয়ে দিতে পেরেছেন। জীবনের কাছে তার আর বিশেষ কোন চাওয়া- পাওয়া নেই।বাস ব্রেক কষায় এবার ঘুমটা পুরোপুরি ভেঙে যায় এশার। ধাতস্থ হতে একটুখানি সময় লেগে যায়। পাশের সিটটা খালি। একটু আগে সেখানে কে বসে ছিল জানে না। কখন নেমে গেছে তাও জানে না। বুকের বাঁ পাশে একটা সূক্ষ্ম চিনচিনে ব্যথা নিয়ে বাস থেকে নেমে পড়ে ও। তীব্র রোদে চোখ ঝলসে যায়। কোঁচকানো কপালে রিকশা খুঁজতে থাকে। তিনুর নতুন বাসায় যাওয়ার রিকশা।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.