মনোহর

মানুষটার সাথে আমার দেখা হয়েছিল কয়েক বছর আগে৷ সুমি আপুর বিয়ের দিন৷ এত ভিড়, এত লোক তার মাঝখানে সে আমার নজর বন্দি হয়ে গেল৷ তার পর আরো একবার দেখা হয়েছিল।সেদিন সে রিকশা করে হয়ত কোথাও যাচ্ছিল। আমি ব্যস্ত ছিলাম বন্ধুদের সাথে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঝাল মুড়ি খাওয়া নিয়ে৷ তারপর আরো কয়েকবার। কিন্তু কখনো কথা হয়নি। দু তিনটা বছর এভাবেই চলে যাচ্ছিল। আমি ঢাবিতে পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। আর সেই মানুষটা স্মৃতি থেকে নির্ঘাত উধাও হয়ে গেল। মস্তিষ্ক হয়ত ধরেই নিয়েছিল, তাকে মনে রাখার কোন প্রয়োজন নেই। বড় অদ্ভুত আমাদের এই স্মৃতিঘর।

ক্লাস কিছুদিনের জন্য বন্ধ। ভাবলাম এই সুবাদে বাড়ি থেকে ঘুরে আসি। ঢাকা থেকে ব্রাহ্মনবাড়িয়ার বাসে যাওয়া আমার কাছে আত্মহত্যা তুল্য মনে হয়৷ যেতে হবে ট্রেনেই। কিন্তু ট্রেনের যা অবস্থা।ঘুরে ফিরে শেষ ভরসা ঐ বিকেলের তিতাস৷ অপরিচ্ছন্ন, নোংরা আর লোকে লোকারণ্য তিতাস ছাড়া আর গতি নেই৷

হাতের কাজ সারতে সারতে বিকেল পাঁচটা হয় হয়৷ দৌড়ে একটা রিকসায় চড়ে বসে প্লাটফর্মে ঢুকতেই দেখি সেই ভালবাসার তিতাস কেমন ছাড়িছাড়ি করছে। ধাক্কা ধাক্কি করে ট্রেনে চড়তেই মাথাটায় টং করে বাড়ি খেলাম।। ইস! ফেটে গেল নাকি? মাথাটায় এক হাত দিয়ে চেপে ধরে ভেতরে ঢুকতেই দেখলাম তিল ধারণের জায়গা নেই৷ আমি একটা সিটের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে পাশের ভদ্রলোক একটু সরে গিয়ে জায়গা করে দিয়ে বলল

-আহা! ব্যথা পেয়েছ নাকি?

আমি না তাকিয়েই বললাম,।

-হুম,কিসে যেন লাগল মাথাটা৷।

-বসো ত এখানে।

আমি না ভেবে চিন্তে বসতেই একটা মিষ্টি ঘ্রাণ এসে নাকে লাগল৷ মনে হল ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে আছেন৷ আমি ও তাকালাম। সাতাশ আটাশ বয়স হবে হয়ত৷ নীল রঙের টি শার্ট, চোখে চশমা৷ মুখ ভর্তি দাড়ি। বাহ!খুব সুদর্শন তো৷ আমি অবাক হলাম৷ মনে হচ্ছিল, আমি ভদ্রলোকে চিনি৷কথা বলল ওনি

-ছুটিতে যাচ্ছ?।

আমি ওনার চোখের দিকে তাকিয়েই উত্তর দিলাম

-হুম।ছুটিতে।

ওনি কিঞ্চিৎ লজ্জা পেয়ে বললেন-

-তোমাদের বাসা কি বাসুদেবপুর৷

-আমি মাথা নাড়লাম।

হ্যা এবার মনে পড়েছি। আমি ওনাকে চিনি।কয়েক বছর আগে দেখেছিলাম। ঐ যে সুমি আপুর বিয়ের দিন। তারপর, আর তার দেখা হয়নি৷ হয়ত কিছুটা পাল্টে গেছে৷ আগে দাঁড়ি ছিল না, এখন দাড়ি রেখেছে। চশমা পড়ত না, ইদানীং চশমা পড়ে। ভেতর থেকে পুরানো স্মৃতি জেগে উঠল৷ ওনাকে দেখার জন্য, কত বাহানায় আপুর বাড়ি গিয়েছি। কিন্তু দেখা হয়নি। নাম জানতাম না, তাই জিজ্ঞেস করতে পারিনি। ওনি আবার প্রশ্ন করল

-আকিবকে চিনো?

আমি মুচকি হেসে বললাম

-দেখুন তো, আমাকে চিনেন কিনা?

-তুমি কি, আবিরের কাজিন শুভ?

আমি মাথা নেড়ে উত্তর দিলাম

-জ্বি,আমি ই শুভ।

-আরে বাবা,এই কয়েক বছরে এত বড় হয়ে গেছ? খাও কি শুনি?

-এই ভিড়ের মধ্যে খাবারের লিস্ট দিতে হবে?

ওনি হেসে উঠল৷ অনেকটা আনন্দে হাসার মত হাসি।

তারপর দুজন ই চুপচাপ। আমার মনে নানান প্রশ্ন৷ বিয়ে করেছে কিনা,জব টব কী করছে,শুকিয়ে যাচ্ছে কেন, প্রেম করে কিনা,ঢাকা থাকে নাকি ভিন্ন কোথাও।

কোন প্রশ্ন ই করা যাচ্ছে না৷ জিভে অদ্ভুত আড়ষ্টতা।ওনার পাশে মাঝ বয়সী এক ভদ্রলোক৷ ওনি কে হবেন? আরে,ওনার নামটা ই তো জানি না। জিজ্ঞেস করব?

না,থাক৷ পরে হয়ত উল্টা পাল্টা কিছু ভেবে বসবে।

আমি পকেট থেকে মোবাইলটা খোলে ম্যাসেঞ্জারে ঢুকলাম।ওনি এবার ফিরে তাকালেন,

-তোমার ফেসবুকে এড কর তো।

বলেই মোবাইলটা হাত থেকে কেড়ে নিয়ে সার্চ বারে নামটা লিখল৷ আমি আড় চোখে তাকিয়ে দেখে নিলাম নামটা। Esr Hridoy.

বাহ! সুন্দর তো নামটা। হৃদয়।

আমি মুচকি হেসে বললাম

-তা,হৃদয় ভাই -বিয়ে করেছেন?

-আরে না, কী যে বল৷ সবে ত সাতাশ হল।

-সাতাশ কি বিয়ের বয়স নয়?

-তোমার কত শুনি?

-এইত,বাইশ হল বলে।

-তুমি করো না কেন? একুশ তো চলে গেছে।

-আমার তো পড়াশোনাটা শেষ করতে হবে৷বাই দ্যা ওয়ে, জব টব কিছু হয়েছে?

-জব করার ইচ্ছে নেই৷ আপাতত, বাবার ব্যবসায় হাত লাগিয়েছি।

-সেটাই ভাল৷ এত বড় ব্যবসা আপনাদের।

-তোমার কথা বল। কোথায় পড়ছ?

-আমাদের আর পড়া। ঢাবিতে ফিজিক্স পড়ছি। পড়ার জন্য পড়া বলতে পারেন।

– বাহ!বেশ তো। ঢাবিয়ান।

-আপনি ও তো ম্যাথে পড়তেন মে বি।

-আমাদের আর পড়া। বাদ দাও এসব৷ আসো না একদিন। ঘুরে যাও একদিন। কাছেই তো থাকি।

-সেটাই তো জানি না।

-জানবে কী করে শুনি। আগ্রহ ও তো ছিল না৷

-আপনি ও তো আর আসেন নি। তাছাড়া, আবির ভাইয়া বিদেশে যাওয়ার পর ঐ বাড়িতে আর যাওয়া ও হয়নি তেমন৷

-আমাদের বাড়ি উত্তর পাড়া। সোহেল কে বললেই নিয়ে যেত।

-সোহেল ভাইয়া তো আরেক বাটপার।

-বাটপার নাকি? জানতাম না ত। সে তো তোমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

-বলে নাকি আমার কথা?

-বলে মানে, খুব বলে।

-আপনি জিজ্ঞেস করলে বলে?

ওনি লজ্জা পেলেন। চোখ কেমন ছোট হয়ে গেল৷ আমি আর প্রশ্ন করিনি।লজ্জা পেল কেন বুঝলাম না।

ব্রাহ্মনবাড়িয়া ফিরতে রাত নয়টা। ট্রেনের ভেতরে তারপর তেমন কথা হয়নি। খেয়াল করছিলাম ওনি বারবার এ দিক ওদিক তাকাচ্ছেন৷ কখনো, আমার দিকে তাকিয়ে থাকে৷ আমি তাকাতেই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিত৷ আমি বিষয়টা উপভোগ করছিলাম।

ভদ্রলোকের গা ঘেঁষে বসে আছি৷ একটা উষ্ণ আদিম অনুভূতি ভেতরে তখন মাদল বাজাচ্ছে। ভিড়ের মধ্যে মাঝে মাঝে ইচ্ছে করেই শরীরের সাথে শরীর মিশিয়ে দিচ্ছিলাম। শরীর লাগতেই ওনি কেঁপে উঠতেন৷বিষয় টা ভাল লাগছিল৷ কখন যে ব্রাহ্মনবাড়িয়া এসে পৌঁছলাম খেয়াল ই করিনি।

ট্রেন থেকে নেমে দুজন দু দিকে হাটা শুরু করলাম। ভেতরে কেমন যেন আড়ষ্টতা ।ইস যদি আরেকটু বেশি সময় লাগাতো পৌঁছাতে। আরেকটু বেশি সময় জুড়ে তার সাথে থাকতে পারতাম।কিছু করার নেই৷ সময় তো সমাপ্ত হওয়ার ই ছিল। বিদায় নিয়ে দুজন দু দিকে হাঁটা শুরু করলাম।

বাড়ি পৌঁছে আর কিছুই ভাল লাগছিল না। বার বার ইচ্ছে করছিল, তাকে দেখতে। তার পাশে বসে গল্প করতে৷ এটা কি ক্রাশ ছিল নাকি কোন আবেদন? সেটা তখনো বোধগম্য ছিল না।

তারপর অনেকদিন, ভাইয়ার বিয়ে ঠিক হল। তা নিয়ে নানা ঝামেলা, এসব ঝামেলায় ভুলেই গিয়েছিলাম তার কথা ।হয়তো মাঝেমধ্যে মনে পড়তো কিন্তু ফেসবুকে একটু যে চ্যাট করবো একটু নক করব এমন মনোভাবটা জাগ্রত হয়নি ফলস্বরূপ দূরত্বটা আর কমেনি।

জানুয়ারি মাস , তার সাথে দেখা হয়েছিল অনেকটা দিন আগে। হয়তো চার পাঁচ মাস।হুট করে ঠান্ডা-সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত হলাম। হল থেকে ছুটি নিয়ে বাড়ি ফেরার জন্য কমলাপুর রেল স্টেশনের প্লাটফর্মে বসে ছিলাম।সাথে ছিল আমার বন্ধু গৌরব। ও কিশোরগঞ্জ নেমে যাবে। টিকেট কাটা ছিল তারপরেও ট্রেন ছাড়ার আগ পর্যন্ত প্লাটফর্মে বসেছিলাম। ট্রেনের ভিতরে বসার মতো কোনো রকম পরিস্থিতি ছিল না। ট্রেন ছেড়ে দিবে তার দু এক মিনিট আগে ট্রেনে চড়ে বসলাম। আমি বসে ছিলাম জানালার পাশের সিটে আর গৌরব অন্য একটি বগিতে।

মাথায় তখন প্রচন্ড ব্যথা। তারুপরে সর্দি টর্দি করে বিচ্ছিড়ি অবস্থা। ট্রেন ছেড়ে দিল। আমি চোখ বন্ধ করে হেলান দিয়েছিলাম। হঠাৎ স্মৃতি থেকে মুছি মুছি করা সেই পুরানো কন্ঠস্বর।

-অসুস্থ্য হয়ে গেলে?

আমি ফিরে তাকালাম।হায় ইশ্বর! হৃদয় ভাইয়া যে। নিমিষেই মনে হল এখন আমি সুস্থ্য। মাথায় কোম ব্যথা নেই৷ টিস্যুটা নাকে ঘষে জানালায় ফেলতে ফেলতে একটা পূর্ণতার হাসি দিয়ে বললাম

-কিছুটা। কখন বসলেন?এই মাত্র। ভিড়ে ঠেলে আসতে হয়েছ তো, তাই।

আমি মুগ্ধ হয়ে কিছুক্ষণ দেখে নিলাম৷ আহা! কি মিষ্টি একটা চেহারা।দেখলেই বুকের মাঝে কেমন ব্যথা হয়৷ ইসস! মানুষটা কেন আমার নয়, এই ভেবে আফসোস হয়৷আমি তার দিকে তাকিয়ে বেখায়ালি হয়ে গিয়েছিলাম৷ হুশ এল তার কথায়

-কী হল শুভ? বেশি খারাপ লাগছে না ত?

আমি অজান্তেই কয়েকবার মাথা নাড়ালাম যে, আমার খারাপ লাগছে না৷ আমার মাথা নাড়ানোতে কী ছিল কে জানে, সে হুট করেই আমার হাত ধরে ফেলল। আমি মুচকি হেসে হাত ছাড়িয়ে নিব সেই সময় সে বলে উঠল

-ঐ দিনের পরে তো আর যোগাযোগ ই করুনি৷ আজ আবার ট্রেনেই দেখা। আমাদের কি ট্রেনেই দেখা হবে?

আমি অবাক হয়ে গেলাম৷ আমার মনে হল, তার শরীরে ও জ্বর। আমি হাত ছাড়িয়ে তার কপালে হাত দিলাম। এই রে..এ দেখছি, তার ও জ্বর।

-আপনার যে জ্বর।

-হুম, একটু জ্বর তো বটেই৷ ও কিছু না। ঠিক হয়ে যাবে।

-একটু কী বলছেন? এ তো পুড়ে যাচ্ছে।

বুঝলাম, কথাগুলো জ্বরের প্রভাবে ও বলাতে পারে। নয়তো,এ টাইপের কথা কেন বলতে যাবে?

ট্রেন নরসিংদী আসার পূর্বেই সে জ্বরের প্রকোপে আবল তাবুল বকতে লাগল। ওর শরীরের এই অবস্থা দেখে আমার হাত পা কাঁপতে লাগল৷ মনে মনে ইশ্বরকে ডাকতে লাগলাম।ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌঁছানোর পর ওকে আর ছাড়িনি আমার সাথে সোজা বাড়ি নিয়ে আসি। তখন ও ওর প্রচুর জ্বর। ভাইয়া কে বলতেই ডাক্তার নিয়ে আসল৷

ওর জ্বরটা যখন ছাড়ল তখন রাত দুটো। সবাই যার যার রুমে চলে গেছে। আমি ওর পাশে বসে ছিলাম। ও ঘুমিয়ে ছিল। ঘুম ভাঙতে ই আমাকে পাশে বসে থাকতে দেখে খুব লাজুক ভঙ্গিতে বলল

-খুব, ঝামেলায় ফেলে দিয়েছি৷ তাই না?

ওর লাজুক ভঙ্গিমা দেখে আমার কী যে হল বুঝতে পারিনি।ভেতরে অদ্ভুত মায়া তৈরি হল।

আমি ঝোকে ওর কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে নিলাম। ঘটনার আকস্মিকতায় ও সামন্য বিব্রত না হয়ে চোখ বন্ধ করে নিল। আমি উঠে সোফায় শুতে যাব তখন ই আমার হাতটা ধরে বলল

-আমার পাশে শুয়ে থাক। যেয়ো না কোথায়।

ওর আবেদন, উপেক্ষা করতে পারিনি।

সারা রাত্রি ও আমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে ছিল৷ জ্বরের প্রকোপে কয়েকবার মা বলে বিড়বিড় করেছে৷ কখনো আমাকে শক্ত করে ধরে বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়েছে।

অসুস্থ্য ছিলাম আমি৷ অথচ, হিসাব উল্টে গেছে। সারা রাত না ঘুমিয়ে এটাই ভাবছিলাম৷ আমি কি তাকে ভালবাসি?

পরের দিন ও চলে গেল। বারবার কী যেন বলাতে চেয়েছিল। এত মানুষের ভিড়ে আলাদা করে কথা বলার সুযোগ হয়নি।পথে যেতে যেতে বারবার পিছনে ফিরে তাকাচ্ছিল আমিও তাকিয়ে ছিলাম। হয়তো কিছু বলতে চাচ্ছিল অথবা আমি কিছু বলতে চাচ্ছিলাম কিন্তু মুখে অদ্ভুত আরষ্টতা ।হারানোর ভয় নাকি না পাওয়ার যন্ত্রনা সেটাও বুঝতে পারছিলাম না।

সারা দিন কাটলো বিষণ্ণতায়। সন্ধ্যার দিকে শুয়ে ছিলাম হঠাৎ মোবাইলটা বেজে উঠল। একটা আননুন নাম্বার । ফোনটা ধরলাম।

-হ্যালো, কে বলছেন?

-আমি হৃদয়।

ওর ফোন পেয়ে আমার ভেতরটা আনন্দে নেচে উঠলো। আমি কিছু বলতে পারছিলাম না। সে হ্যালো হ্যালো করে যাচ্ছিল।

-হ্যালো শুভ কথা শুনতে পারছো না?

-হাঁ পারছি। কেমন আছো তুমি ,জ্বর কমেছে ?

-ওসব কথা ছাড় কাল একবার দেখা করো না প্লিজ।

-কোথায় আসতে হবে?

-কলেজ মাঠে আসো বেশিদূর আসতে বলব না।

আমার মনটা খুশিতে ভরে উঠল ওর সাথে একান্তে কিছু সময় কাটানো যাবে এই ভেবে। সারারাত ঘুম হয়নি ,কখন বিকেল হবে কখন বের হব এসব চিন্তা করে।

বিকেলের দিকে কলেজ মাঠে গেলাম৷ কলেজের যে পাশে শহীদ মিনার তার পাশে গাছের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। আমাকে আসতে দেখে এগিয়ে এল। আহা!কী সুন্দর ই না তাকে লাগছিল। আমি মিষ্টি হেসে প্রশ্ন করলাম

-তা জ্বর কমেছ তো, নাকি?

সে প্রতিউত্তরে মুচকি হেসে আমাকে জড়িয়ে ধরল৷ ওর উষ্ণ শরীরের ঘ্রাণে আমার ভেতরটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পড়েছিল। কী হচ্ছিল, আমি কিছু ই বুঝতে পারছিলাম না।

সেদিন দুজন প্রচুর ঘুরাঘুরি করেছি।কখন সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল খেয়াল ই করিনি।

এইভাবেই কেটে যাচ্ছিল দিন।বিকেল, সন্ধ্যা অথবা রাত। যখন সময় হয়েছে দুজন পাশাপাশি হেঁটেছি৷কিন্তু তাতে কখনো মন ভরেনি৷। ঢাকা আসার পরে ও সারাক্ষণ ওর কাছে মন পড়ে থাকত। কথা বলার জন্য ছটফট করতাম। সব কিছু বন্ধুত্বের মত ই চলছিল৷ কিন্তু, আমি হয়ত পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। ওরে আরেকটু নিজের করে পাওয়ার জন্য সারাক্ষণ ভাবতাম। কিন্তু, বারবার মনে হত হৃদয় হয়ত আমাকে ঐভাবে চায় না। বন্ধু বা ভাইয়ের মত ই সম্পর্কটা।আমি শুধু এই সম্পর্কের ভেতরে থাকতে চাচ্ছিলাম না৷

একদিন অনেক ভেবে চিন্তে এই সিদ্ধান্ত নিলাম যে, আর যায় হোক ওকে মনের কথাটা বলব ই বলব৷যেই ভাবা সেই কাজ৷ ওকে কিছু না বলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জন্য হল ছাড়লাম।বিকেলের দিকে ফ্রেশ হয়ে ওর বাড়ির উদ্দেশ্যে বের হওয়ার সময় বারবার ফোন করছিলাম কিন্তু ফোনটা অফ পাচ্ছিলাম৷ মনটা কু ডাক ডাকতে শুরু করেছিল৷ ভয় পাচ্ছিলাম। ও যদি আমাকে রিজেক্ট করে দেয়৷ আমি হোমোসেক্সুয়্যাল সেটা জানার পরে ও যদি আমার সাথে যোগাযোগ না করে৷ নানান চিন্তায় ওর বাড়ি গিয়ে পৌঁছলাম। এর আগে অনেক বার গিয়েছি৷ আজকে কেমন যেন লাগছিল।

বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই দেখি হৃদয় দাঁড়িয়ে সাথে দু একজন অচেনা লোক। আমাকে দেখে হৃদয় মুচকি হেসে ইশারায় বাড়ির ভেতরে যেতে বলল।আমি কিছু না বুঝতে পেরে বাড়ির ভেতরে ঢুকে দেখি দশ বারোজন বসে৷ আমি সালাম দিয়ে ভেতর রুমে ঢুকতেই আম্মু(হৃদয়ের মাকে আম্মু ডাকতাম) আমাকে দেখে বলল।

-এই গাধা,এতক্ষণে আসার সময় হল তুর?তুর বন্ধুর বিয়ে, তুই আগে বাগে থাকবি না?

-কার বিয়ে?

-আজকে তারিখ হবে। এখন যা, দেখতো কারো কিছু লাগবে কি না।

আমার পৃথিবী কেঁপে উঠল। পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছিল। আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রণে এনে ঐ বাড়ি থেকে বের হয়ে এলাম।

নিজেকে কেন জানি বারবার ধিক্কার দিতে লাগলাম। ভুল মানুষকে ভালবেসে নিজেকে নিজের কাছেই হাসির পাত্র মনে হচ্ছিল।

ফোনটা বন্ধ করে রুমে শোয়ে শোয়ে পুরানো কথাগুলো ভাবছিলাম। ওর প্রতিটি চুম্মন, জড়িয়ে ধরা,আমার খেয়াল রাখা,কথা না হলে অস্থিরতা সব ই নকল? চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ার মুহুর্তে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ৷ আমি দরজা খোলে দেখি ও দাঁড়িয়ে৷ নিজেকে সামলে নিয়ে দরজা থেকে সরে গিয়ে বিছানায় বসলাম৷ ও ঠিক আমার পাশে বসতে বসতে বলল,

-আম্মা খাবার পাঠিয়েছে খেয়ে নিও৷আর সামনের সপ্তাহের শুক্রবার বিয়ে৷ তোমাকে বুধবারে ই যেতে হবে৷

আমি কিছু বলিনি৷ ইচ্ছে করছিল ওকে বের করে দেয়। ও আমার হাতটা ধরে হাতের মধ্যে চুমু খেয়ে বের হয়ে গেল।

আমি মূর্তির মত বসে ছিলাম।

সারা রাত এক ফোটা ঘুম হয়নি৷ সকালে ভাবিকে দেখলাম কী নিয়ে জানি ব্যস্ত।নাস্তা করতে করতে জিজ্ঞেস করলাম ব্যস্ততার কারন। উত্তরে ওনি বলল

-বিয়েতে তো সবাইকে ই যেতে হবে৷ পিঠা চিড়ে ও বানানো দরকার। তাছাড়া যার বিয়ে তার জন্য স্বর্ণের দুল কেনা দরকার।

আমি অবাক হলাম।

-কার বিয়ে?

-কার আবার? হৃদয়ের বোন রিমার।

আমি কেঁপে উঠলাম। তারমানে হৃদয়ের বিয়ে নই? আমি দৌড়ে রুমে গিয়ে ফোন দিলাম।

-কোথায় তুমি?

-বাসায়৷

-আসবে একবার?

-আসব তো। কিন্তু কেন?

-আহা, আসো না।

ঘন্টা খানিক পরে ও এল। ও আসতেই ওকে জড়িয়ে ধরে কোন দ্বিধা না করে কানের কাছে মুখ নিয়ে বললাম

-আই লাভ ইউ হৃদয়

হৃদয় আমার কপালে চুমু খেয়ে বলল।

-এটা কি মুখে বলতে হয়? চোখ দেখে বুঝো না।?

আমি মাথা নাড়লাম যে-বুঝি না৷

ও আমাকে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে দিয়ে বলল

-দাঁড়াও,বুঝাচ্ছি৷

বলে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাগলের মত চুমু খেতে লাগল। আমি ওর প্রতিটি চুমুর আবেগে নিজেকে আবিষ্কার করছিলাম নতুন এক রূপে।

ওর উথাল করা মাতাল ভালবাসায় নিজেকে সম্পুর্ণ মনে হচ্ছিল। তারপর, একটা মধুর মিলনের মাধ্যমে শুরু হল, আমাদের মনোহর ভালবাসার গল্প।

লেখকঃ আরভান শান আরাফ

প্রথম প্রকাশঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.