অন্তরালের ভালোবাসা

১.
কি সুন্দর বৃষ্টি হচ্ছে দেখেছেন? বৃষ্টি ভালো লাগে আপনার কাছে?”

পারিজাত স্যার সীমান্তর কথা শুনে আপন মনেই হাসে। ছেলেটা বৃষ্টি হলেই এমন রোমান্টিক হয়ে যায় কেন কে জানে! বৃষ্টি বিরক্তিকর মনে হয় তার কাছে,ভেজা পথ-ঘাট, রাস্তার জ্যাম সব মিলিয়ে খুবই অসহ্য একটা ব্যাপার। কিছুক্ষণ থেমে তাই কিছুটা রহস্য করে বলে সে- ‘বৃষ্টি না, তবে সীমান্তকে খুব ভালো লাগে আমার।’

– ‘ধ্যাৎ’

– ‘সমস্যা কি? অ্যাই লাভ সীমান্ত। হাসতে হাসতে বলে পারিজাত আর বুঝতে পারে সীমান্ত রেগে যাচ্ছে।

-‘না কিছু না। গাড়ী ঘুরান বাসায় যাব।’ সীমান্ত রাগত স্বরে বলে। পারিজাত আরো জোরে হাসতে থাকে।

সীমান্ত যে প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়ে পারিজাত স্যার সেখানকার এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। বেশ অল্প বয়সেই মেধা ও দক্ষতা দিয়ে ক্যারিয়ারে খুব ভালো পর্যায়ে পৌছে গিয়েছে। তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক সাফল্য ধরা দিয়েছে। এমনকি ভার্সিটির অনেক স্টুডেন্ট যেচে পড়ে এগিয়ে আসে খাতির জমাতে কাউন্সিলিং আওয়ারে পড়া বোঝার নাম করে। পারিজাত বেশ মজা পায়। এখন তার জীবনের চরম সময় চলছে। যা চায় তাই পায় সে।সীমান্ত ছেলেটা মাস চারেক হল এই ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। সহজ সরল আর বোকাসোকা ধরণের ছেলেটা। পারিজাতের খুব বেশিদিন লাগেনি এই ছেলেটাকে আয়ত্তে আনতে। সীমান্তর মত ছেলেরা রূপকথার জগতে বাস করে। কাউকে নিয়ে কল্পনা করতে বা ব্যক্তিগত জীবনে সিরিয়াস হতে হয়ত এদের কিছুটা সময় লাগে, কিন্তু ঠিক মত বাজিমাত করতে পারলেই পটিয়ে ফেলা যায়। যেমন পারিজাত পেরেছে। সীমান্ত মাত্র মাস খানেকের মধ্যেই ভয়ঙ্কর ভাবে তার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। কে জানে,হয়ত ওকে নিয়ে ভবিষ্যতের অনেক পরিকল্পনাও করে ফেলেছে!

পারিজাতের কাছ থেকে বিদায় না নিয়েই বাসার দিকে রওনা হয় সীমান্ত। একটু পরেই তার মুঠোফোনটি বেজে উঠে। পকেট হাতড়ে ফোন বের করে দেখে স্ক্রিনে একটা টেক্সট জ্বলজ্বল করছে। পারিজাত স্যারের ম্যাসেজ- ‘Sorry dear, Please Don’t angry with me. I will catch you tomorrow at 4pm.’ ম্যাসেজটা পড়ে সীমান্ত মৃদু হেসে উত্তর লেখে- ‘Okey sir’

পারিজাতের সাথে প্রথম পরিচয়েই সীমান্তের বেশ ভালো লেগেছিল। আর তার প্রতিও যেন পারিজাত স্যারের আগ্রহ ছিল সেই প্রথম থেকেই; তাই দুজনের ঘনিষ্ঠতা বাড়তে সময় লাগে নি। এরপর থেকে সময়টা কেমন যেন হু হু করে কেটে যাচ্ছে।কয়েক মাসে ওকে যতটুকু জেনেছে সে তাতে মনে হয়েছিল, একটা মানুষ একসাথে এত কিছু দারুণভাবে সামলে নেয় কীভাবে? ভার্সিটি, বাসা, জিম সহ এমন কিছুই নেই যাতে কিনা পারিজাতের যত্নের অভাব আছে। তবে প্রায়ই বলে এত ব্যস্ততার পরেও নাকি সে খুব নিঃসঙ্গ। নিজের জগতে ওর যত্ন নেয়ার কেউ নেই। ওর কাছ থেকেই জানতে পারে সীমান্ত যে ও কতটা অনন্য আর কতটা আপন হয়ে উঠেছে এই অল্প ক’দিনে। মানুষ আসলে মনে হয় অন্যের চোখে নিজের জন্যে মুগ্ধতা দেখে আনন্দ পায়। পারিজাতের সব কিছুতেই সীমান্ত মুগ্ধ হয়। পারিজাতও এই মুগ্ধতা দেখতে খুব পছন্দ করে। সীমান্তর মনে হয় যেন মানুষটা তাকে সম্মোহন করে ফেলেছে। আজকাল প্রতিটি দিন রঙিন লাগছে তার। খুব ছোটবেলায় যখন ও কল্পনা করত কোন এক রাজপুত্র বা তার জীবনের নায়ক এসে নিয়ে যাবে ওকে, সেই স্বপ্নই যেন বাস্তবে সত্যি হচ্ছে এখন। ভার্সিটি শেষে রোজ ওকে বাসায় পৌঁছে দেয়া, ওর সব পছন্দ আর অপছন্দ মুখস্থ রাখা, কিংবা গলার স্বর শুনেই বুঝে ফেলা যে ওর মন ভালো নেই, আরও কত কি! সীমান্ত তাই রোজ রোজ শুধু মুগ্ধ হচ্ছে। আর নিজেকে ভীষণ ভাগ্যবান মনে হচ্ছে ওর।

২.
সীমান্ত সেদিন ভাবতেই পারেনি যে তার সাথে এমন কিছু হবে! রিক্সা থেকে ভার্সিটির সামনে নামতেই তার নতুন ছাই রাঙা শার্টটা ছিড়ে গেলো। আজকে তার একটা প্রজেক্টের প্রেজেন্টেশন। দিনের শুরুতেই এমন ঘটনা ঠিক শুভ ঠেকলোনা ওর। দ্রুত রিক্সার ভাড়া মিটিয়ে কিছুটা বিব্রত হয়ে পা টেনে টেনে লাইব্রেরির দিকে এগুতে থাকে সীমান্ত।

আশে পাশের সহপাঠীদের বিস্মিত দৃষ্টি।সবাই ভাবে পারিজাত স্যারের সাথে কিসের এতো খাতির ওর! লাইব্রেরিতে এসে নিজের ল্যাপটপ ওপেন করলো সীমান্ত। পাশের ডেস্কে বরাবরের মতই এই পৃথিবীর সকল কিছুর উপর বিরক্ত হয়ে খিঁচ খেয়ে পড়াশোনা করছে প্রিয়ঙ্কর। গত চার মাসে এই ছেলেটা সীমান্তর সাথে পড়াশোনার ব্যাপার ছাড়া চারটি কথাও বলেন নি। অদ্ভুত এক রোবোটিক ও পড়ুয়া ছেলে ও। প্রতিদিন সবার আগে লাইব্রেরিতে আসবে, আর সবার শেষে সব পড়াশোনা,অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করে তারপর বাসায় যাবে। পড়াশোনা ছাড়া কোন কিছুতেই ওকে উৎসাহ দেখাতে দেখেনি সীমান্ত। এমনকি এই চার মাসে কখনো ওকে হাসতেও দেখে নি। অদ্ভুত এক মানুষ যেন। এই সব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে নীরস মুখে ছোট্ট একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে সীমান্ত। মনে পরে যায় চারটার মধ্যে সব কাজ শেষ করে পারিজাতের সাথে দেখা করতে হবে।

দুপুরের প্রেজেন্টেশটা বেশ সাফল্যের সাথে শেষ করে সে। তবে সমস্যা হয় প্রেজেন্টেশনের সময়। বেশ কিছু স্লাইড ওলট-পালট হয়ে গিয়েছিল। ভালো করে না দেখেই স্লাইডটা দেওয়ায় এই ঘটনা ঘটেছে। প্রেজেন্টেশনের মাঝখানে কয়েক মুহূর্তের জন্যে ও পুরোই ব্ল্যাক আউট হয়ে গেলো। সবার সামনে এতই ঘাবড়ে গেলো যে ওর মুখ থেকে কোন কথাই বের হলো না, সেই সময় সীমান্তকে এই অবস্থা থেকে বাঁচালো প্রিয়ঙ্কর। দ্রুত নিজের সিট থেকে উঠে স্লাইড গুলো খুবই দক্ষতার সাথে ঠিক করে দিলো। সে সৃষ্টিকর্তাকে অশেষ ধন্যবাদ জানিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। লাঞ্চের সময় প্রিয়ঙ্করকে দেখা গেলো ডাইনিং এর এক কোনায় বসে চুপচাপ খাবার খাচ্ছে।

সীমান্ত কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে তার সামনে গিয়ে ছোট্ট করে বলল- ‘ধন্যবাদ আজকের সাহায্যের জন্য।। আমি আসলে তখন খুবই অফ হয়ে গিয়েছিলাম ভুল স্লাইডের কারণে…’

ওকে কথা শেষ করতে না দিয়েই প্রিয়ঙ্কর শুকনো গলায় বললো- ‘ধন্যবাদের কিছু নেই, আমরা সহপাঠী, এটুকু সাহায্য করা আমার দায়ীত্ব।’ তারপর এমনভাবে খাবার খাওয়ায় মনোযোগ দিলেন যেন সীমান্তর কোন অস্তিত্বই নেই সেখানে। সীমান্ত দপ করে নিভে গেলো। ছেলেটার কথা শুনে মনে হল যেন গায়ে পরে কথা বলতে গিয়েছে সীমান্ত। নিজেকে কেমন যেন ছোট বা নীচ মনে হল। প্রায় ঝড়ের গতিতে ডাইনিং থেকে চলে আসলো সে। এরকম মানুষের কাছাকাছি থেকে আর বিব্রত হতে চায় না।

চারটার সময় দ্রুত পায়ে পার্কিং লটের দিকে এগুতে থাকে সীমান্ত। আকাশে মেঘ করেছে। মেঘলা আকাশের নিচে পারিজাত স্যার তার ধবধবে সাদা গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছে।

আজকের আবহাওয়াটা বেশ সুন্দর। আজ কাল হঠাৎ হঠাৎ না বলে কয়ে আকাশ জুড়ে মেঘ জমে যায়। তারপর শুরু হয় ঝুম বৃষ্টি। সীমান্ত গাড়ির কাঁচের ভেতর দিয়ে মুগ্ধ হয়ে বৃষ্টি দেখছে। পারিজাত গুনগুন করে রবীন্দ্রসংগীতের সুর গাইছে। আকাশে ঘন কালো মেঘের ঘনঘটা। থেকে থেকে বিজলি চমকাচ্ছে। কিছুক্ষণের মাঝেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি থেকে তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। সীমান্তর খুব বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে করছে। সে আড়চোখে পারিজাতের দিকে তাকাল।

– ‘আমার খুব বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছে করছে। আমি বৃষ্টিতে ভিজব।’

– ”অসুস্থ হয়ে যাবে সীমান্ত। অন্য কোন দিন…’

– ‘না। আজই ভিজব… এক্ষুনি… আর আমি একা ভিজব না। আপনাকেও ভিজতে হবে। জানেননা, কিছু কিছু বৃষ্টিতে একা ভিজতে নেই। আমার সাথে আমার বৃষ্টিসঙ্গি হবেন আপনি।’ একগুঁয়ে সুরে বলল সীমান্ত।

পারিজাত খানিকক্ষণ কী যেন ভাবল তারপর গাছ গাছালি ঘেরা বৃষ্টি মুখর একটা নির্জন রাস্তার পাশে গাড়ী থামিয়ে দিলো। সন্ধ্যা নেমে আসছে।

সীমান্ত জানালার কাঁচ নামিয়ে বৃষ্টি ছুঁয়ে দেখতে দেখতে প্রায় চেঁচিয়ে বলল- ‘বৃষ্টিতে ভিজবো’।

বলেই গাড়ী থেকে নেমে গেল। বৃষ্টির বেগ বেড়েছে,বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি পড়ছে। ল্যাম্প পোস্টের আলোতে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো কেমন কমলা রঙের লাগছে। এর মাঝে সীমান্ত আর পারিজাত হাত ধরে বৃষ্টিতে ভিজছে আর মাঝে মাঝে কথা বলছে। বৃষ্টির শব্দে কারো কথা ঠিক মত শোনা যাচ্ছে না। বাচ্চাদের মত চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কথা বলতে হচ্ছে। সীমান্ত কথা বলতে বলতেই হঠাৎ অসম্ভব আনন্দে চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার মনে হল চোখ খুললেই কোন স্বপ্নের মত বুঝি এই অনুভূতি বা মুহূর্তটা ভেঙে যাবে। সে আরও শক্ত করে পারিজাতের হাত চেপে ধরল। পারিজাত তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সীমান্তর দিয়ে তাকিয়ে আছে। সীমান্ত পুরোই এখন তার হাতের মুঠোয়। পারিজাতের মাথায় নানা ধরনের চিন্তা কাজ করতে থাকে। দুর্দান্ত গতিতে মস্তিষ্ক চলছে ওর। কী যেন ভাবে ও। তারপর আপন মনে মাথা নাড়ে।
সীমান্তর হাত ধরে আর একটু তার কাছে এসে খুব গভীর ভাবে সাবিনার দিকে তাকায় তারপর শব্দ করে হেসে বলে ওঠে-‘have you ever kissed anyone in the rain Shimanto? ‘

সীমান্ত ঝট করে চোখ খুলে ফেলে। পারিজাতের অসম্ভব গভীর দৃষ্টি আর বৃষ্টি ভেজা স্বর যেন ওকে এক নিমিষেই ভেঙে চুরমার করে দেয়। অদ্ভুত এক বিস্ময় আর ভালো লাগা নিয়ে অন্ধকারে ও পারিজাতের আবছা মুখটার দিকে তাকিয়ে থেকে মাথা নাড়ে। পারিজাত মুখে ঠিক আগের হাসির রেশ নিয়েই ওর আর একটু কাছে এগিয়ে আসে।

৩.
– ‘আপনার আজকাল হয়েছে কি স্যার? সব সময় এত ব্যস্ত থাকেন!’

– ‘কাজের চাপ বেড়েছে ডিয়ার। জানোই তো সামনে আই.ই.বি. এর লোকজন আমাদের ভার্সিটিতে আসবে। সব ডাটা আমাকে রেডি করতে হচ্ছে। ডোন্ট আস্ক… অ্যাই এম ডগ বিজি…’

– ‘আপনি আমাকে আগের মত মনে করেননা। গত প্রায় দু’ সপ্তাহ ধরেই আপনি আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছেন। হোয়াটস রং উইথ ইউ?’ গলার স্বরে একরাশ শূন্যতা নিয়ে বলে ওঠে সীমান্ত।

– ‘কে বলছে! এমন কিছুই নয় শুধু ব্যস্ততা। বোঝার চেষ্টা করো…’ পারিজাত গলায় যেন আবেগের সমুদ্র আনে। তারপরই খুব ব্যস্ততা দেখিয়ে বলে- ‘চেয়ারম্যান স্যার ফোন দিয়েছেন, তোমাকে আমি পরে ফোন দিচ্ছি…’

– ‘হুম…ঠিক আছে…’ বিষণ্ণ স্বরে উত্তর দেয় সীমান্ত।

পারিজাতের আজকাল সীমান্তকে আর ভাল লাগছে না। দিন কয়েক হলো নতুন ব্যাচে অনেকগুলো স্টুডেন্ট ভর্তি হয়েছে। এদের মাঝে বেশ কিছু সুদর্শন ছেলে আছে। একটা ছেলে তো খুবই আকর্ষনীয়, নাম প্রহর। ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি পারিজাত স্যার আজকাল প্রহরকে মুগ্ধ করতে ব্যস্ত। সীমান্তর পেছনে তো অনেক সময় নষ্ট করা হল। এত সাদামাটা আর পানসে ছেলে দিয়ে আসলে চলে না। প্রহরের মত কিউট ছেলের ব্যাপারই অন্যরকম। সেখানে সীমান্ত কিছুই না। পারিজাত প্রহরের কথা ভাবতে ভাবতে আঙ্গুলের ফাঁকে ধরা কলম খানা ঘোরাতে থাকে।

– ‘স্যার আজকে ক্লাশ শেষে ঘুরতে যাবেন? অনেকদিন হয়ে যাচ্ছে আপনার সাথে ক্লাসে ছাড়া দেখা করাই হচ্ছে না।’

– ‘সীমান্ত,আজকে তো পারব না। ক্লাসের পরে কাজ আছে কিছু আমার। এরমাঝে একদিন তোমাকে নিয়ে লাঞ্চ করব। জানোই তো কাজের কত ঝক্কি যাচ্ছে আজকাল। আর তোমার নিজেরও পড়াশোনা নিয়ে সিরিয়াস হওয়া উচিৎ। তোমার প্রথম সেমিস্টারের রেজাল্ট নিয়ে বেশ আশাহত হয়েছি আমি…’

সীমান্ত চুপ করে থাকে।ছাত্র হিসেবে খারাপ না সীমান্ত। পারিজাতের সাথে ঘুরাঘুরি দিনগুলোতেই সে পড়াশোনায় অবহেলা দেখিয়েছে। সে বুঝতে পারে না অনেক কিছুই। কিংবা হয়ত কারণগুলো চিন্তা করতে চায় না।

সপ্তাহের শেষ দিনে ক্লাস শেষ করে সীমান্ত পারিজাতের কেবিনে গিয়ে দেখে পারিজাত নেই। ফোন করতে থাকে বেশ ক’বার। পারিজাত প্রতিবারই ফোনের লাইন কেটে দিচ্ছে। কোথাও কিছু একটা সমস্যা হয়েছে,নিশ্চয়ই হয়েছে। পারিজাত স্যার হয়ত ওর ওপর রাগ করেছে কোন কারণে। সামনা সামনি কথা বললে সব ঠিক হবে । হঠাৎ এত বদলে গেছে কেন পারিজাত স্যার! মনের মধ্যে হাজারটা প্রশ্ন নিয়ে সীমান্ত কী করবে ভাবতে থাকে।

এমন সময় একজনের কাছ থেকে জানতে পারে পারিজাত স্যার মাত্রই নিচে চলে গেছে, সাথে নাকি একটা ছেলেও ছিল। সীমান্ত ওর মনে চেপে রাখা অজানা এক আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে। দ্রুত লিফট দিয়ে নিচে পার্কিং লটে গিয়ে পারিজাত স্যারের সাদা গাড়ীটা খুঁজতে থাকে। কিছুক্ষণের মাঝেই দেখে পারিজাত স্যার তার পাশে নতুন ব্যাচে ভর্তি হওয়া প্রহর নামের ছেলেটাকে নিয়ে গাড়ী ড্রাইভ করে বেরিয়ে যাচ্ছে। গাড়ীর কাঁচের ভেতর থেকে দেখে দুজনেই কথা বলতে বলতে হাসছে। সীমান্ত স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। গাড়ীটা নিমিষেই মিলিয়ে যায়। তার দু’ চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। মনে হয় চারপাশের পৃথিবী টলে উঠেছে। কোনক্রমে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করতে থাকে সে। কিন্তু পারে না। দু’চোখ দিয়ে তার টপটপ করে পানি ঝরছে। কিছুটা কষ্ট, কিছুটা ক্রোধ, কিছুটা গ্লানি সব মিলিয়ে তীব্র একটা মিশ্র অনুভূতি কাজ করছে মনে। হঠাৎ করেই তার মনে হয় সে খুব ক্লান্ত। শরীর ভেঙে পড়া ক্লান্তি আর জল ভরা চোখ নিয়ে তার চারপাশে উদ্ভ্রান্তের মত তাকাতে থাকে সে। গা ঘামছে তার, চোখের পানিতে গায়ের ওড়না ভিজে যাচ্ছে। আর সেই সাথে ঘামে গায়ের জামা শরীরের সাথে ডাকটিকিটের মত সেঁটে গেছে। সীমান্তর মনে হচ্ছে ও আর এক পা নড়তে পারবে না, হাঁটু ভেঙে পরে যাবে এখুনি। তারপর এভাবেই সে পরে থাকবে অনন্তকাল।

– ‘তুমি ঠিক আছো?’ হঠাৎ করেই অচেনা গলার স্বর শুনে সীমান্ত চমকে পেছনে তাকায়। প্রিয়ঙ্কর কখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়ালই করেনি সে। দ্রুত নিজের চোখ মুছে মাটির দিকে তাকিয়ে ভেজা গলায় বলে-‘জ্বি’

– ‘এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন?’ কিছুটা উদ্বিগ্ন গলায় বলে প্রিয়ঙ্কর।

-‘বাসায় যাব…’ গলার কাছে আটকে থাকা কান্না সামলে বলে সীমান্ত।

– ‘বাইরে তাকিয়ে দেখো অনেক বৃষ্টি হচ্ছে। যাবে কীভাবে? এই বৃষ্টির মাঝে তো কোন রিকশা বা সিএনজি কিছুই পাবেনা। লাইব্রেরিতে গিয়ে বসো নাহয়। বৃষ্টি কমলে যেও।’

প্রিয়ঙ্করের কথা শুনে সীমান্ত বিস্মিত হয়ে পার্কিং লটে বাইরে তাকায়। আকাশের রঙ গাঢ় ধূসর। তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে আর শোঁ শোঁ করে বাতাস বইছে। কখন এখন বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে কিছুই টের পায়নি সে। কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে ছিল ও?

– ‘আমি যেতে পারব প্রিয়ঙ্কর। বৃষ্টিটা একটু ধরে এলেই চলে যাব। এখানেই ঠিক আছি আমি।’ অন্যদিকে তাকিয়ে বলে ওঠে সীমান্ত।

– ‘কিছু মনে কোরোনা, তুমি মনে হয় কোন কারণে আপসেট। গত কদিন ধরেই তোমাকে বেশ বিষণ্ণ মনে হচ্ছে। কারণটা যাই হোক, তুমি নিজেকে সামলে নাও। এটুকুই বলব, মানুষের জীবন খুব বিচিত্র। জীবন প্রতিনিয়ত মানুষকে একেকটা অনুভূতি আর পরিস্থিতি দিয়ে পরখ করে। প্রকৃতি ছয় ঋতুর মত জীবনে একেক সময় একেক রকম পরিস্থিতি সামলাতে হয়। কখনো মানুষের জীবনে গ্রীষ্মের রোদ্দুরের মত কষ্টের তীব্রতা আসে, কখনো বা আসে আনন্দের বসন্ত, আবার কখনো আসে বেদনার বর্ষা। যেমন আজ তোমার কাছে এসেছে…’

সীমান্ত প্রিয়ঙ্করের কথা শুনে নিজেকে সামলে রাখতে পারে না। টপটপ করে তার চোখ দিয়ে পানি পড়তে থাকে। এবার সে কান্না লুকানোর চেষ্টাও করে না। আকাশের ঝরঝর বৃষ্টির সাথে সাথে তার দু’চোখেও যেন বৃষ্টির বান এসেছে।

প্রিয়ঙ্কর সীমান্তর কান্নাকে দেখেও না দেখার ভান করে আকাশের দিকে তাকিয়ে হালকা স্বরে বলে- ‘সীমান্ত জানো,খুব বিচিত্র একটি সিস্টেমের মধ্যে আমরা বেঁচে আছি। তুমি যদি একজন ফেয়ার মানুষ হও তবে তোমাকে এখানে একটি জেলি ফিসের মত বেঁচে থাকতে হবে। পৃথিবীতে ডাইনোসর নেই কিন্তু তেলাপোকারা ঠিকই টিকে আছে। একজন মানুষ বাঁচবে বড় জোর ১০০ বছর কিন্তু একটি সামান্য কচ্ছপের আয়ু ৫০০ বছর। কী অভুত তাই না?
কিছু মনে কোরোনা। আমার নিজের মনটাও আজ বেশি ভালো নেই। এই সেমিস্টারে আমি সিজিপিএ ফোর পেয়েছি, সুতরাং আমার আট ক্রেডিট ওয়েবার পাওয়ার কথা ছিলো । অথচ তা নাকি পাবোনা। কেন পাবোনা আমাকে তা জানানোও হবে না। খুব খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। কিছু টাকার খুব দরকার ছিল। এত পরিশ্রমের বিনিময়ে সে অনুযায়ী কিছুই পাচ্ছি না। হতাশা কাজ করছে, রাগের মাথায় এই সব উল্টা-পাল্টা বলছি। আসলে কি আমাদের মত জেলি ফিসদের তো আর রাগ দেখানোর মত তেমন জায়গা নেই। নিজের ভিতরেই রাগ পুষে রাখার চেষ্টা করি। তাও সব সময় পারি কই? আর কিছু বলার নাই। কিছু মনে কোরোনা প্লিজ…’ একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে হুট করেই কথা শেষ করে দেয় প্রিয়ঙ্কর।

প্রিয়ঙ্করের কথাগুলো শুনে সীমান্ত কিছু সময়ের জন্যে থমকে যায়। প্রতিটি মানুষের মাঝে তার নিজের একান্ত কিছু ব্যর্থতা আর কষ্ট বাস করে। কেউ তা প্রকাশ করে আর কেউ তা প্রকাশ করে না। প্রিয়ঙ্করের মত মানুষের মনেও আজ অদ্ভুত এক বেদনা কাজ করছে। কথা থামিয়ে দেবার কারণে দু’জনের মধ্যে ঝুপ করে নীরবতা নেমে আসে। অদ্ভুত এক নীরবতা। এই মুহূর্তে এই নীরবতাই সবচেয়ে বড় সত্য। বাইরে শুধু বৃষ্টির শব্দ। যেন পৃথিবীতে কোন কালে বৃষ্টির শব্দ বাদে কোন শব্দ যেন ছিল না। কেমন আচ্ছন্নতা কাজ করে সাবিনার। বাইরে বৃষ্টির সাথে অন্ধকার ক্রমশ জট পাকিয়ে উঠছে। একটা নিঃসঙ্গ বাতাস বইছে। সাথে ভেজা মাটির ঘ্রাণ। সীমান্তর এই বৃষ্টিতে, এই অন্ধকারে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে। প্রিয়ঙ্কর বাইরের অন্ধকারে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

সীমান্ত সন্তর্পণে প্রিয়ঙ্করের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলে- ‘ভালো থেকো প্রিয়ঙ্কর। আমি চলে যাচ্ছি। কেন জানি বৃষ্টি থামার জন্যে অপেক্ষা করতে ইচ্ছে করছে না।’

প্রিয়ঙ্কর আকাশের দিক থেকে চোখ নামিয়ে নেয়। বৃষ্টির ছাঁটে তার চশমার কাঁচ ঘোলাটে হয়ে এসেছে। চশমা খুলে নিয়ে আলতো করে মাথা নেড়ে সম্মতি দেয় সে। কিছুক্ষণের মাঝেই গাঢ় অন্ধকারাচ্ছন্ন বৃষ্টির মাঝে মিশে যায় সীমান্ত। পেছনে পরে থাকে কিছু অনুভূতি আর একলা দাঁড়িয়ে থাকা একজন বিষণ্ণ মানুষ…
৪.
প্রায় দুমাস হল ভার্সিটি থেকে টিসি নিয়েছে সীমান্ত।
নতুন কোন একটা ভার্সিটিতে ভর্তি না হওয়া পর্যন্ত তার অখণ্ড অবসর। সারাদিন তার কীভাবে কীভাবে যেন কেটে যায়। গভীর রাতে গাছের অসংখ্য পাতার ফাঁক দিয়ে চাঁদের উজ্জ্বল মনোরম আলো অন্ধকার ঘরের মাটিতে এসে মখমলের মত বিছিয়ে থাকে। সেই চাঁদের আলো, পাতার কাঁপন আর বাতাসের উদ্দামতা দেখতে দেখতে রাত

কেটে যায়। মাঝে মাঝেই তার প্রিয়ঙ্করের কথাগুলো মনে হয়- ‘খুব বিচিত্র একটি সিস্টেমের মধ্যে আমরা বেঁচে আছি। তুমি যদি একজন ফেয়ার মানুষ হও তবে তোমাকে এখানে একটি জেলিফিসের মত বেঁচে থাকতে হবে।’

সীমান্ত এখন আর কোন রাজপুত্রের স্বপ্ন দেখে না। শুধু অপেক্ষা করে বেদনার বর্ষাকাল শেষ হয়ে কবে তার জীবনে স্নিগ্ধ শরৎকাল আসবে। সে মানুষ নাকি জেলি ফিস তা সে জানে না। শুধু জানে খুব কম কথা বলা সাদামাটা অথচ সৎ একজন মানুষ তাকে একটি সন্ধ্যায় কিছু মুহূর্তের মাঝেই জীবনটাকে নতুন করে দেখতে শিখিয়েছে। জীবন নামক সিনেমার বাস্তব চরিত্রের প্রকৃত নায়কেরা পারিজাতের মাঝে নয় বরং প্রিয়ঙ্করের মত পরিশ্রমী আর পোড়া খাওয়া মানুষের মাঝেই লুকিয়ে আছে।

লেখকঃমৃন্ময় রয়

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.