আমার স্বীকারোক্তি

অ্যাডোনিস

আমি একজন সমকামী। বাংলাদেশে যেহেতু এটি অবৈধ, সেহেতু আমাকে লুকিয়ে ভালোবাসতে হয়। আমার মতো আরো হাজার হাজার মানুষ আছেন যারা ঠিক এমনই লুকিয়ে ভালোবাসে। আমরা এই ভালোবাসার কথা কাউকে জানাতে পারি না। কোনো পুরুষ কে পছন্দ হলে সরাসরি প্রেম নিবেদন করতে পারি না। নিজের পরিবার কেও জানানোর সাহস করি না। কেননা আমরা ভয় পাই। হারানোর ভয়। বাবা মা এর কাছে এই বিষয়ে জানানোর কোনো ইচ্ছে ই আমার ছিলো না। আমার বাবা মায়ের মাঝে আর সম্পর্ক নেই। আমি মায়ের সাথে নানুবাড়ি থাকতাম কিন্তু আমার মামা রা সেটা পছন্দ করতেন না। আমার ছোট মামা আমার নামে মিথ্যে অপবাদ দিলো যে আমি তার মেয়েকে রেপ করেছি। এ নিয়ে বাড়িতে অনেক অশান্তির সৃষ্টি হয়েছিলো। মার তো খেয়েছিলামই, সাথে কয়েকজন বাদে পুরো পরিবারই আমাকে আলাদা করে দিয়েছিলো। অনেক বড় সুযোগ ছিলো নিজের সমকামীতার কথা জানিয়ে দেয়ার কিন্তু আমার জানানোর ইচ্ছে না থাকায় সুযোগটা হাতছাড়া করেছিলাম। আমি তখনো নিজেকে চিনতে পারি নি ঠিক মতো। আমি বিভ্রান্তিতে ছিলাম, আমি আসলে সমকামী নাকি উভকামী। পরবর্তীতে চিন্তা করলাম, ভবিষ্যতে নিজ পায়ে দাঁড়াবো যখন, স্বাধীন হবো যখন, সেসময় বাড়িতে জানিয়ে দেবো। মাঝে একটা পারিবারিক সমস্যায় আমি মা কে ছেড়ে চলে আসি বাবার কাছে। এটা হয়তো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। আমার বাবা প্রবাসী। সে আমার কোনো প্রয়োজনের খেয়াল রাখে না। তার সাথে প্রায়ই আমার কথা কাটাকাটি হতো। আর সে রাগ করে কথা বলা বন্ধ করে দিতো। সে সর্বোচ্চ ৭ মাস আমার সাথে কথা না বলে থেকেছে। এই সময়টাতে সে আমাকে কোনো খরচও পাঠায় নি। এই সাত মাসে আমি মানসিক ভাবে অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছি। এবছর বাবা দেশে ফিরে এলো। তার সাথে সব ঝামেলা মিটেছে আমার। কিন্তু তার কথা বলার ধরন আমার পছন্দ হয় না। সে কেমন যেন, গোয়ার মত। সে দেশে এসে ব্যবসা শুরু করেছে। আর সারাদিন সে কাজেই ব্যস্ত। বাড়িতে যে তার ছেলে আছে, সে কি অবস্থায় আছে সেটা জিজ্ঞেস করারও সময় নেই। এ কয়দিনে আমি অনুভুতি, আবেগ, এসব শব্দ থেকে অনেক দূরে চলে এসেছি। আগে আমার মা একদিন ফোন না দিলেই আমার মন খারাপ হয়ে যেতো। কিন্তু এখন আর হয় না। আগে আমার মা আমাকে গালি গালাজ করলে আমি খুব কষ্ট পেতাম কিন্তু এখন আর কিছুই যায় আসে না। সেদিন রাতে হঠাৎ করেই মন খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছিলো খুব। কি থেকে কি ভাবলাম আর মায়ের কাছে মেসেজ লিখতে বসে গেলাম, বিশাল বড় একটা মেসেজে তাকে নিজের ব্যাপারে জানালাম। আমার যে মেয়েদের প্রতি অনুভুতি নেই সেটা বলে দিলাম মা কে। হাত কাঁপছিলো আমার থরথর করে। তাকে তার মতো করেই বুঝালাম।

সে অনলাইনে ছিলো না।

৩ দিন পার হয়ে গেলো সে অনলাইনে আসে না। আমিও তাকে ফোন দেই না। কারণ সব কথা ফোনে বলে বোঝানো যায় না। কিছু কথা লিখে প্রকাশ করাই শ্রেয়। সেদিন রাতে খেয়াল করলাম মা মেসেজ টা দেখেছে। পরদিন সকালে ফোন আসলো। আমি ফোন রিসিভ করলাম না। আমি অনেক চিন্তিত হয়ে গেছিলাম। আমি এমন কোনো কথা শুনতে চাইছিলাম না যেটা আমার শোনা উচিৎ না।

তৃতীয় কলটা রিসিভ করলাম,

– কি ব্যাপার তোমাকে ফোন দেই রিসিভ করো না কেন? কি করছো?

– আমি ঘুমাচ্ছিলাম

– বেলা বারোটা বাজতে চললো এখনো ঘুমাচ্ছো? আর তুমি আমাকে কি মেসেজ লিখেছো ওটা? মাথা ঠিকাছে?

– হ্যা, পড়েছো পুরোটা? 

– হ্যা, শোনো এসব চিন্তা বাদ দাও। তোমাকে নিষেধ করেছিলাম গে ফ্রেন্ড দের সাথে মিশতে। ওদের সাথে মিশে এই অবস্থা।

– আম্মু আমি ছোট থেকেই এমন। ওদের সাথে মিশতে পছন্দ করি কারণ ওরাও আমার মতো, আর এটা অস্বাভাবিক কিছু তো না।

– আমি কিছু জানি না, আমি ডাক্তার দেখাবো তোমাকে।

– আম্মু ডাক্তার কিভাবে ঠিক করবে? এটা কোনো রোগ না যে এটার চিকিৎসা করাবে তুমি।

– আমি জানি না। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো তোমাকে। এখন উঠো, উঠে ফ্রেশ হয়ে খাওয়াদাওয়া করো!

আম্মু কথাগুলো বলছিলো খুবই স্বাভাবিক স্বরে। আমার নিজেকে খুব হালকা লাগছিলো তখন। কারণ আম্মু যখন এরকম ভাবে কিছু বলে তখন সে সেই বিষয়টা পরবর্তীতে মেনে নেয়।

খুব বেশি খুশি লাগছিলো আমার।

মা মেনে নিক বা না নিক। এই দমবন্ধ করে ভালোবাসার চেয়ে আমি এখন প্রাণ খুলে ভালোবাসতে পারবো।

আমি সার্থক আজ।

mondroadmin Avatar

Posted by

Leave a comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.