তুমি

তার সাথে এভাবে দেখা হবে কে ভেবেছিলো? আমি সেদিনও যথারীতি বিকালে বুয়েটের সামনের রাস্তা দিয়ে হাঁটাহাঁটি করছি। এমন সময় দেখি সে। বিস্ময়ের সাথে খেয়াল করলাম তার পেছনে অসম্ভব রূপবতী একটা মেয়ে। আমাকে সে তখনো দেখে নি। সে যেন দেখতেও না পায় সেজন্য আমি পেছন ঘুরে খুব ব্যস্ত একটা ভঙ্গি করার চেষ্টা করলাম। জানি, সে তবুও আমাকে চিনে ফেলবে। তারপরেও।

পকেট থেকে ফোনটা বের করে ইতস্তত নম্বর বের করতে লাগলাম। নিতান্তই, মুখ লুকানোর জন্য। রাস্তার কোলাহলের মধ্যেও স্পষ্ট শুনলাম তারা হাসছে আর কী সব গল্প করছে।
ও, লাল রঙের পাঞ্জাবি পরেছে। অথচ পাঞ্জাবি ও কখনই পছন্দ করতো না। আমি একবার পহেলা বৈশাখে ওকে পাঞ্জাবি গিফট করেছিলাম। প্যাকেট খুলে পাঞ্জাবি দেখে সে হোহো করে হেসে উঠেছিলো। “আমি তো পাঞ্জাবি পরি না। তুমি কখনও পাঞ্জাবি পরতে দেখেছো আমাকে?”, সে বলেছিল। বিয়ের পর হয়তো অভ্যাস বদলে ফেলেছে।

আমার কাছে এসে ও দাঁড়িয়ে পড়লো। মেয়েটা জিজ্ঞেস করলো, “দাঁড়িয়ে পড়লে যে?”
সে কিছু বললো না। আবার হাঁটতে শুরু করল। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সবটা শুনলাম। হঠাৎই কোনো এক তীব্র যন্ত্রণা টের পেলাম। বুয়েটের দেয়াল অস্পষ্ট লাগতে শুরু করলো।
তারা চলে যাচ্ছে। আমিও ওদের থেকে মুখ ঘুরিয়ে সামনে হাঁটতে লাগলাম। ওকে দেখার প্রচন্ড ইচ্ছা দমন করতে না পেরে পেছন ফিরে তাকালাম। দুজনেই হাত ধরাধরি করে হেঁটে যাচ্ছে। কত্তো সুন্দর মানিয়েছে তাদের।

অথচ মেয়েটার জায়গায় আমিও থাকতে পারতাম। একদিন ছিলামও। হিসাব না রাখা অনেকগুলো বিকাল আমি ওর হাত ধরে বেড়িয়েছি। কারো হাত ধরে যে এতটা প্রশান্তি পাওয়া যায় তা ওর হাত ধরে বুঝেছি।
কবি-সাহিত্যিকরা সারাক্ষণ মেয়েদের রূপ বর্ণনায় ব্যস্ত থাকেন। পটলচেরা চোখ, বাঁশির মতো নাক ইত্যাদি। কিন্তু, ছেলেদের চেহারার বর্ণনা তেমনভাবে আসেনি। আমি সাহিত্যিক টাইপ কেউ হলে অবশ্যই ছেলেদের সৌন্দর্যের প্রশংসা করতাম। আর তার শুরুটা করতাম ওর চেহারার বর্ণনা দিয়ে। মায়াকাড়া চোখ বলে একটা বিশেষণ মেয়েদের দেওয়া হয়। কিন্তু, যদি বলি ওর চোখের মতন চোখ আমি আর কারো দেখি নি, তাহলে এক ফোঁটা ভুল বলা হবে না।

তারা হাঁটছে। আর আমি তাদের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়েই আছি। মেয়েটা একবার হোচট খেয়ে পড়ে যেতে লাগলে ও হাত টেনে ধরলো। মেয়েটা সোজা হয়ে দাঁড়ালো। এরপর দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললো। ইশ! কী যে সুন্দর তার হাসি।
তারা এভাবে নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করতে করতে একসময় আমার দৃষ্টিসীমানা অতিক্রম করলো।
এইতো, গত পৌষ মাসের এক বিকালের কথা। আমি মেডিকেলের পাশের শহিদ মিনারের সামনের সিঁড়িতে বসে ছিলাম। শীত শীত করছিলো। ওর আসার কথা ছিলো। বাদাম ভেঙে ভেঙে জমিয়ে রাখছিলাম। ও আসলে একসাথে খাবো।

একসময় সে এলো। দূর থেকে তার হাসিমুখ দেখতে পাচ্ছিলাম। নিজেকে খুব ভাগ্যবান বলে মনে হচ্ছিলো। আমাকে দেখে ওই যে সে হাত নাড়ালো। এইবা কম কী?
অামার পাশে বসে বাদাম খেতে শুরু করলো। আমি সেদিনও তার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। ভ্রু জোড়া আরেকটু বেশি ঘন হলে ভালো লাগতো না। ওই তো বেশ আছে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “ইন্টারভিউ কেমন দিলে?”
ও বললো, “ভালো না। ইন্টারভিউ বোর্ডের সবাই কেমন যেন গম্ভীর। পাটখড়ি টাইপ একজন প্রশ্ন করতে ছিল। বলে কী, থিওরি অব রিলেটিভি সহজ ভাষায় বলো। ওইটা কী দুধভাত যে সহজ ভাষায় বোঝাবো বলো?”
তাহলে উত্তরে কিছুই বলো নি?
বলেছি তো। যদিও টেনশনে কিছুই মাথায় আসছিলো না। আচ্ছা, চলো এক জায়গায় যাই।
কোথায়?
ধানমন্ডি লেকের পাড়ে। প্লিজ প্লিজ প্লিজ। অনেক দিন যাই না। ধানমন্ডির রাস্তা দিয়ে হেঁটে বেড়ানোতেও আনন্দ আছে।
বাদামগুলা আগে শেষ করো।

ও হাসলো। পরম নির্ভরতায় আমি ও কাঁধে হাত রাখলাম।
অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে এরপর।
*
বুয়েটের সামনে থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে না। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। টিউশনির সময় হয়ে যাচ্ছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। মানুষের যেমন পানির তৃষ্ণা পায়, আমার হাত দুটোও তেমন আরেকজন মানুষের হাত ধরার জন্য তৃষ্ণার্ত। খুব শক্ত করে হাতটা ধরবো। হাতের প্রতিটা রেখা অনুভব করতে চাই আমি।
সেদিন আর টিউশনিতে যাওয়া হলো না। মাঝে মাঝে অসম্ভব রকম ক্লান্ত লাগে। কিসের জন্য, কার জন্য বেঁচে আছি? কেনইবা শহরে আছি? ওর জন্য? কী লাভ থেকে?
সে রাতেই ঠিক করলাম গ্রামে চলে যাবো। বাড়ি ফোন করলাম। একেবারে বাড়ি চলে যাবো শুনে মা খুশিতে কিশোরী গলায় হাসতে লাগলেন। তাঁর কথায় বহুদিন পর প্রাণের ছোঁয়া টের পেলাম। এতোদিন শুধু শুধু মা’কে কষ্ট দিয়ে বাইরে থেকেছি। আর না।
সপ্তাহখানেক পর সমস্ত ব্যাগপত্র গুছিয়ে, বইয়ের গাদা সমেত শহর ছাড়লাম। ঢাকা শহর। রঙের শহর। কারো স্বপ্ন তৈরির শহর, কারো কারো স্বপ্নভঙ্গের।

আসার সময় মনেপ্রাণে চাচ্ছিলাম রাস্তায় তার সাথে দেখা হোক। হয় নি। হবেই বা কী করে? সোমবার। সে ঐ চাকরিটা করছে এখনও। এতোদিনে নিশ্চয়ই প্রমোশন পেয়ে গেছে।
আমি ভেবেছিলাম ঢাকা শহরের জন্য আমার মায়া টায়া উঠে গেছে। কিন্তু, ট্রেনে ওঠার পরে ট্রেন ছাড়ার হুইসেল শুনে তৎক্ষণাৎ চোখ ভিজে গেলো। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলাম।
চাচ্ছিলাম তাকে যেন অন্তত স্টেশনে কাকতালীয়ভাবে হলেও একবার দেখি। শূণ্য সম্ভাবনা থাকলেও আশা করে ছিলাম। তবে, আশাভঙ্গ হতে বেশি সময় লাগলো না। একসময় প্লাটফরম সরে গিয়ে জানালার সামনে বিশাল ধানিজমি এলো। দৃশ্যপট অতি দ্রুত বদলাতে লাগলো।

পেছনে পড়ে থাকলো অসম্ভব সুন্দর কিছু সময়।

লেখকঃ ফাহিম হাসান

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.