নব অধ্যায়

১.
নাহ এই মানুষটাকে নিয়ে আর পারা গেল না।আজ যে এভাবে দেরী করবে তা নতুন কিছু না।তবু একটা আশা তো থাকে।এক আধদিন এই আশাগুলো একটু পূরণ করা উচিত তার।আর অন্যদিন থেকে আজ একটু আলাদা দিন।কেকটা সাজাতে সাজাতে বার বার দড়জার দিকে তাকাচ্ছিল চিত্ত।নুর এখনও বাইরে।রাত বারটা বাজল বলে।ছেলেটা বড় অদ্ভুত হয়ে গেছে এই তিনবছরে।প্রথমদিকে অনেকটা গুমড়া মুখো হয়ে গেছিল।তবে এখন একটু স্বাভাবিক।কিন্তু কেমন যেন খাপছাড়া।তা নিয়ে চিত্তর চিন্তা নেই।কারন সে এর পিছনের ঘটনা জানে এবং সে নিজেও এর অংশ।

আর কতক্ষন কে জানে।যাক, নুর আসুক।এই ফাকে চিত্ত একবার হল রুমে রাখা অলির ছবিটার কাছে গিয়ে বসল।সোফার পাশে রাখা।হাতে নিল সে ছবিটা।বুকটা ফেটে যাচ্ছিল।সেই চেহাড়া আজও ভেসে উঠে।অলি আর চিত্ত আগে থেকেই বন্ধু ছিল।নিজেদের স্বত্তা সম্বন্ধেও তার অবগত ছিল।কারন এই দেশে এর জন্য জেল বা শাস্তি হয় না।তখনও জীবন স্বাভাবিক চলছিল।কিন্তু ঝড় সবসময় হঠাৎ আসে এবং হঠাৎ থেমে যায়।তবে থামার পর যা রেখে যা তা শুধু জঞ্জাল ছাড়া আর কিছুই নয়।

অলি নুর চিত্ত।তিনটা জীবন একটা সুতায় গাথা।আর সেই সুতার নানা টানে বিধি তাদের সাথে পুতুল খেলা খেললেন।এই পুতুল খেলার শুরু হয় আজ থেকে ছয় বছর আগে।যখন চিত্ত বুঝতে পারে যে সে নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধুর প্রেমিককে ভালাবেসে ফেলেছে।নুর আর অলির ভালাবাসা হয় ছয় বছর আগে।ঠিক তখনই অন্যদিকে চিত্ত তখন চোখে প্রেমের মরিচীকা দেখছিল।আর সেই মরিচীকা সত্যি জলের রূপ নেয় নুরের কাছে এসে।
অলির বাবার বড় কাছের মানুষ ছিল চিত্তর বাবা।তাই হঠাৎ এক্সিডেন্টে যখন চিত্ত অনাথ হয়ে যায় তখন তার ঠিকানা হয় অলির বাড়িতে।সবই ঠিক চলছিল।বৃটেনের কোনো এক শহরে বেড়ে চলছিল এই ত্রিকোণ ভালাবাসার গল্প।চিত্ত নিজেকে শত বাধা দিয়েও আটকে রাখতে পারেনি।সে জানত যে নুর অন্য কারোর।তবুও সে তাকে নিয়েই স্বপ্ন দেখত।অলি তাকে সবসময় জিজ্ঞাসা করত,”হ্যারে চিতু।তোর হাবভাব আমার কেমন যেন অন্য রকম লাগে।প্রেমটেম করছিস নাকি??”
-ধুর!তোর মাথায় ছিট পড়েছে??
-আমি সবই বুঝি চিতু।বলে দে তাকে।
-কাকে??
-যাকে তুই ভালবাসিস।
কথাটা বলে অলি একটা রহস্যের হাসি দিত।সে হাসি যে কত কথা বলত তা শুধু অলিই জানত।তবুও সব ঠিক চলছিল।চিত্ত কখনও কিছু বলেনি অলিকে।সে শুধু তার স্বপ্নেই প্রেম করে যেত।আর ভাবত যে স্বপ্নটা থেকে যাক অনন্তকাল।

অদিকে নুর এখানে জব করে।মা বাবা মারা গেছেন অনেক আগে।বড় ফাজিল ছেলে।সারাক্ষন অলির পিছনে লাগা তার অভ্যাস।কোনো কিছুতেই সে সিরিয়াস না।সব কথায় সে উড়িয়ে দেয়।আর দুরে থাকতে বললে অলিকে আরো বেশি করে কাছে টেনে জোর করে কিস করা ওর বদ অভ্যাস হয় গিয়েছিল।
সব মিলিয়ে জীবনের সাতরং তারা তিনজনই উপভোগ করছিল।কিন্তু জীবনটা তখন বদলাতে শুরু করল যখন অলির ক্যান্সার ধরা পড়ল।লাস্ট স্টেজ।ডাক্টার বললেন আর আশা নেই।মাত্র কয়েকদিন।একদিন হঠাৎ চিত্ত আর নুরকে ডেকে যখন অলি এই কথা জানাল তখন চিত্ত ঘাবড়ে গেল।কারন অলি কখনই এত বড় মজা করবে না।কিন্তু যে বিশ্বাস করল না সে হল নুর।

-তুমি কি আমাকে আর চিত্তকে বোকা পেয়েছো??
অলি তখনও চুপ।নুর বলেই যাচ্ছে।কিন্তু অলির চোখের নিচের কালো ছায়া চিত্তর ভাল লাগছিল না।হঠাৎ বলল,”অলি কোন স্টেজ?”
নুর হঠাৎ হাসি থামিয়ে চিত্তকে দেখল।তার চোখে পানি টলমল করছে।পলকহীন তাকিয়ে আছে অলির দিকে।এই চেয়ে থাকাতে রয়েছে ভয়।অলি তখনও মাথা নইয়ে আছে।মাথাটা ঘুরছে তার।নাকের কাছে একটু ভেজা ভেজা ঠেকছে।চিত্ত তাকে কি জিজ্ঞেস করেছে সে বুঝতে পারেনি।হঠাৎ আকাশটা একবার ঘুরে গেল।তার পর আর মনে নেই।যখন চোখ খুলে তখন জানল যে সে হসপিটালে আছে।আর তার নাক দিয়ে রক্ত পড়ছিল।চিত্ত আর নুর তাকে বেহুশ অবস্থায় হসপিটালে নিয়ে আসে।সেই শুরু।
এর পর অলি আর বাড়ি যেতে পারেনি।একদিন হঠাৎ চিত্তকে ডেকে বলল,”চিতু তুই নুরকে ভালবাসিস??”
চিত্ত কিছুক্ষনের জন্য যেন পাথর হয়ে গেল।তারপর হঠাৎ মাথা নেড়ে বলল,”এসব কি আজে বাজে বলছিস।তুই সুস্থ হয় বাড়ি আয় তোর একদিন কি আমার একদিন।আংকেলকে বলে পাগলা গারদে ভরব।
-আমায় ক্ষমা করিস চিত্ত।
-কেন??
-আমি তোর ডায়রী……

চিত্ত এবার আরেক দফা ধাক্কা খেল।কিন্তু সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছিল নুরের।যখন সবকিছু নুরকে অলি জানাল তখন চিত্ত এক নাগাড়ে কেদেই চলেছে।শেষে অলি নুরের হাতে চিত্তর হাতটা দিয়ে বলল,”নুর আমার শেষ ইচ্ছাটা রাখো।চিত্তকে তোমার কাছে রাখো।কথা দাও ওকে কষ্ট দিবে না।ও ভাল থাকলেই আমি ভাল থাকব।আমার চিতুলে তোমার কাছে রেখে গেলাম নুর।”
সেদিনই অলির শ্বাস উঠল।চিত্ত তখন পাগলের মত ছটফট করছিল।অলির হাত থেকে হাত সরিয়ে সে ছুটল ডাক্টারের কাছে।কিন্তু এসে যখন দেখল নুর পাথর হয়ে বসে আছে তখন তার বুকটা ধক করে উঠল।অলির সেই হাসি মাখা মুখটা আগের মতই আছে।শুধু হাসির শব্দটা বন্ধ হয়ে গেল।

একমাস পর অলির বাবা ও দুনিয়ার মায়া কাটিয়ে উঠলেন।চিত্ত তখন পাগল প্রায়।অলির মৃত্যুতে চিত্ত নুরকে সামলাতেই সময় গেল।নুর চারবার বেহুশ হয়ে গেল তার শরীর ঘেসে।কিন্তু যেদিন অলির বাবা মারা গেলেন সেদিন চিত্ত সত্যি অনাথ হয়ে গেল।সেদিন ও পাগলের মত চিৎকার করছিল।হাতে ছিল অলির এই ছবিটা।সে কার জন্য কাঁদছে তা বোঝা কিছুটা মুশকিল ছিল।তবে থাক।সে কাহিনী আর বাড়িয়ে লাভ নেই।শেষ কাজের পর নুর চিত্তকে নিয়ে অলির বাড়িতে চলে আসে।

২.
কলিংবেল বেজে উঠল।চিত্ত ভাবনা জগৎ থেকে ছিটকে পড়ল।চোখের পানি মুছে ছবিতে তাকিয়ে বলল,”দেখ অলি।কার হাতে দিয়ে গেলি।আমাকেই ওল্টো মহারাজের খেয়াল রাখতে হয়।”
বেলটা আবার বাজল।চিত্ত বলল,”দড়জা খোলা।লকটা ঘুরিয়ে নাও।”বলে চলে গেল কেক এর কাছে।ছবিটা মুছে কেক এর টেবিলে রাখল।
নুর ঘরে ঢোকল।কয়েকদিন ধরে মনটা কেমন যেন হচ্ছে।চিত্তর সামনে দাড়াতে কেমন যেন লাগে।কেন কে জানে??

দড়জাটা খুলে ঘরে ঢুকে নুর একটু হকচকিয়ে গেল।একি এটা কে।অলি?? না না, এটা কি করে হবে।অলি নেই আজ তিন বছর।একাকিত্ব অনুভুত হলেও মন এখন মানিয়ে নিয়েছে।কিন্তু সেই পাঞ্জাবী পড়া অলি এখানে আসল কি করে।
চিত্ত ফিরে দাড়াল।নুরকে দেখে হা করে তাকিয়ে আছে।চিত্ত লাজুল কখনই ছিল না।তাই লজ্জা সে কিছু কমই পায়।তাই নুরের তাকানো দেখে বলল,”হা করে আছ কেন।আমি কি ভুত নাকি?”
-তুমি অলির পাঞ্জাবী পেলে কোথায়।
-বন্ধু কার??
-তোমার।
-তাহলে তার জিনিস কার কাছে থাকবে।
-কিন্তু…
-আরে এই পাঞ্জাবী টা ও আমাকে দিয়ে গেছিল।কখন পড়া হয়নি।ওর খুব পছন্দের।আঙ্কেল ওকে দেয়।অসুস্থ থাকার সময় দিয়েছিল।
নুর কিছু বলল না।চুপ করে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকল চিত্তর দিকে।মনটা চাইছে জড়িয়ে ধরে।হ্যা ভুল নয়, আমি ঠিকই বলছি।এই সেই নুর যে ছিল অলি অন্ত প্রান।কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে ইদানীং তার এমন লাগে।মনে হয় এটা করি ওটা করি।হঠাৎ অলির কথা মনে হতেই আবার থেমে যায়।অলিকে কি সে ধোকা দিয়ে ফেলছে।এই কথাটা সে সবসময় ভাবে।
“এত দেরী হল যে বড়!!”চিত্তর কথায় নড়ে উঠল নুর।
-কেন??
-কেন কি? তুমি জান না কেন??
-না।
-তাহলে ফ্রেশ হয়ে নাও যাও।

নুর কিছু না বলে চলে এল।চিত্ত মনে হয় রাগ করেছে।ছেলেটা যে কেমন বুঝা মুশকিল।সত্যি অদ্ভুত একটা ছেলে।নুর জানে তাকে চিত্ত ভালবাসে।কিছুদিন ধরে তারও ইচ্ছা হয় চিত্তকে বুঝার।ফ্রেশ হয়ে বিছানাতে একটু শুয়ে পড়ল নুর।সারাদিন অফিস করে শরীরটা যেন ব্যাথা করছে।কিন্তু শুয়ে থাকার জো নেই।চিত্তর ডাক শোনা যাচ্ছে।আহা!! সারাদিন ইংরেজীর পিন্ডি চটকানোর পর ঘরে এসে নিজের ভাষা শুনতে সত্যি মধুর লাগে।
নাহ আর শুয়ে থাকা যাবে না।চিত্ত নিশ্চয় খাবার রেডি করেছে।ওর হাতের খাবার ছাড়া এখন আর অন্য কিছু মুখে রুচে না।অফিসের লাঞ্চ তো যাচ্ছে তাই।
-আসছি।

***

খাবার টেবিলে একটা প্লেট কেন?? চিত্ত তো নুরকে রেখে খায় না।আজ তিন বছর ধরে একসাথেই খেতে বসে তারা।আজ কি হল।তবে মনে হয় চিত্ত বেশি রাগ করেছে।
-প্লেট একটা কেন চিত্ত?
-তোমার জন্য।
-তুমি খাবে না??
-আমি খেয়ে নিয়েছি।
-আমাকে মিথ্যা বলছ??কেন রাগ করেছো চিত্ত??
-করিনি।
বলেই চিত্ত ওদিকে ফিরে চলে যেতে চাইছিল।নুর কিছু না ভেবে চিত্তর হাতটা চেপে ধরল।হাতে টন পড়ায় চিত্ত ঘুরে দাড়াল।নুর প্রথমে কি বলবে বুঝে উঠতে পারছিল না।কারন সে কখনও এভাবে চিত্তর হাত ধরেনি।আরো অবাক হয়ে গেছে চিত্তকে কাঁদতে দেখে।
-কি হল কাদছো কেন??
চিত্ত কিছু বলছে না।নুর খাওয়া ছেড়ে উঠে দাড়ালো।
-বল।
-তুমি আজকের দিন ও ভুলে গেলে।আজ অলির জন্মদিন।আর তুমি আজও দেরী করে আসলে??
-হুম দেরী তো হবেই।
চিত্ত মুখ তুলে তাকাল।কি বলছে এসব ও।কিন্তু হঠাৎ করে নুর ওকে টানতে টানতে তার ঘরে নিয়ে গেল।ব্যগটা খুলে দুটো টিকিট বার করল।সিনেমার টিকিট।
-এর জন্য দেরী হল।
-মানে?? তোমার মনে ছিল??
-কি করে ভুলব চিতু??
বলে চিত্তর দুই কাধে হাত রেখে একটু হাসল নুর।চিত্ত কি স্বপ্ন দেখছে।কারন নুরকে তো সে দেখেনি এমন করতে।”কি কিছু বল।যাবে না সিনেমা দেখতে??”

-কিন্তু নুর….তুমি এসব….
নুর দেখছে যে এই ছেলেটাই একটু আগে নাক লাল করে কাঁদছিল।আর এক ঝটকায় ভুলে গেল।চিত্ত এমন ভুলাই রয়ে গেল।আগেও এমন ছিল।ওর আর অলির সবই এক রকমের কাজ।শুধু অলি একটু লাজুক ছিল।আর চিত্ত এক কথায় নির্লজ্জ।খাওয়ার কথায় তো বলাই চলে।হেসে উঠল নুর।
-হ্যা আমি।জন্মদিন পালন যখন করছি তবে ভাল করি করি।ও খুশি হবে।মনে আছে কি বলেছিল??
-আমি খুশি থাকলেই ও খুশি।
-ঠিক তাই।এবার চল।কেক নিঃশ্চয় বানিয়েছো??খাওয়াবে না??
অমনি চিত্ত ছুটল।ওর মনেই নেই।ওভেনে ও চিকেন রেখে এসেছে।এবার না পুড়ে ছাই হয়।
নুর দেখছে।শুধুই দেখে চলেছে।তার কেন এসব ভাল লাগতে শুরু করেছে? কেনো অফিস থেকে আসতে দেরি হলে সে ফোন করে চিত্তকে জানায়।কেন জানতে চায় যে সে দুপুরে ঠিক করে খেল কি না।কে জানে।হয়তো চিত্ত ও তার খবর নেয় তাই।হয়তো বা অন্য কিছু।তবে কি সে চিত্তকে…না না।চিন্তায় বাদ সাধলো চিত্তর চিৎকার।”নুর খাবার ঠান্ডা হচ্ছে তারাতারি এসো।”

****
ওফফ!! আজ খুব খাওয়া হয়ে গেছে।এমনিতে এই খাবার গুলো চিত্ত পরের দিন কোনো বাচ্চাকে ডেকে খাইয়ে দিত।তবে আজ আর কিছুই আস্তো নেই।সব প্রায় শেষ করেছে নুর।চিত্ত খেল কম আর নুরকে দেখে অবাক হল বেশি।তা হোক।মাঝে মাঝে অবাক হওয়া ভাল।ছেলেটা এই তিন বছরে কিছুই আবদার করেনি।কিন্তু নুর এখনও বুঝতে পারছে না।সে কেন এত ভাবছে।তার তো কখনো চিত্তকে নিয়ে এত ভাবে নি।তাহলে কি সেকি চিত্তকে ভালবাসছে?? কিন্তু কেন?? কি হচ্ছে তার সাথে??

৩.
কালো।নিকষ কালো।তিনদিকে অন্ধকার হা করে আছে যেন।যেন বলছে এদিকে এসো।সামনের দিকে কিছু আলো দেখা যাচ্ছে।সেই আলো।মহাকালের সেই স্থব্ধ সময় এটা।একটু সামনে এগোতেই আলোটা গুচ্ছে পরিনত হল।সেই চেনা গুচ্ছ।সেই আলোক গুচ্ছের কাছে যত যাওয়া যায় তা আরো প্রকাশ হয়ে উঠে।তবুও বাকি তিনদিকের কালো অন্ধকার একটু সড়ে যায় না।তারা ঠাই দাড়িয়ে।তার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে নুর।আরেক পা এগোতেই তার গতি খুবই দ্রুত হয়ে গেল।নুর আগের মতই চোখ বন্ধ করে ফেলল।আবার সেই ডাক।”নুর!”
চোখ খুলল নুর।ও এসেছে।আবার এসেছে।”কি হয়েছে নুর??”
-অলি।আমার কি হয়েছে তুমিই বলো।আমার মাথা কাজ করে না।তোমার কথা আমার সারাদিনে মনে পরে না।সারাক্ষন অন্য কারোর কথা মনে পড়ে।কেন??
-চিতু?? তোমার মনে এখন ওরই স্থান বেশি।এটা মেনে নাও নুর।
-কিন্তু আমি তো তোমাকে ভালবেসেছি।
-আমার তোমার এক হওয়া বিধির লিখন ছিল না।তুমি চিতুর।
-এসব কি বলছ অলি।

-তুমি নিজেই একবার পরীক্ষা করে দেখো নুর।আমি নেই।তাই বলে তুমি মরে যাও নি।দুনিয়া চলছে।আমি আজ চলে গেলাম নুর।আর দেখা হবে না।মনে রেখো সামনে শুরু হতে চলেছে নতুন এক অধ্যায়।মনে রেখ সময় কথা বলে।
হঠাৎ সেই ধুয়া।চারদিক সাদা ধপধপে হয়ে গেল।সেই কালো ঘুচে গেল।তার মধ্যে নুর যেন অসহায়।”অলি অলি অলি….”

বিছানা থেকে হুরমুর করে উঠে বসল নুর।সে আজও স্বপ্ন দেখেছে।এই কয়েক মাসে সে খুব বেশি অলিকে স্বপ্নে দেখত।প্রতিবার একই ভাবে ঘটে সব।কিন্তু আজ কি হল।অলি আজ কি বলে গেল।আর আসবে না এই কথায় বা কেন বলল।কে জানে কি হল।তবে কি সে সত্যি চিত্তর প্রেমে পড়ছে।

******

খাবারটা টেবিলে রেখে বাথরুমে নক করল চিত্ত।
-নুর বের হও এবার।খাবার ঠান্ডা হয়ে যাবে।
-আসছি।
বলেই নুর বেরিয়ে এল।চিত্ত পুরো হা হয়ে গেল।টাওয়াল পড়া ভেজা গায়ে নুরের রূপ যেন উপছে পড়ছে।সুঠাম সেই শরীর আগে চিত্তকে এতটা অবাক করেনি।আসলে সুযোগ হয়ে উঠেনি।গেল দুবছর তো ওকে সামলে উঠতে শেষ।আজ বড় ভাল লাগছে চিত্তর এভাবে তাকিয়ে থাকতে।জানে এভাবে হ্যাংলার মত কারো শরীরের দিকে অন্তত তাকানো ঠিক না।কিন্তু ভালবাসার মানুষটাকে মাঝে মাঝে অন্যভাবে দেখে ভালো লাগে বটে।
-কি দেখছ??
-হ্যা?? না কিছু না।তুমি আজ অফিস যাবে না??
-না।
-কেন??
-আজ অফিস বন্ধ।মনে নেই।
সবে চিত্তির জ্ঞান হল।ঠিকই তো আজতো অফিস বন্ধ।
-আচ্ছা চল খেয়ে নিবে।
-আরে ও চিতু মশায়।খাবো মানে সিনেমা দেখতে যাবে না।চল আজ বাইরে খাব সারাদিন।
-প্রথমত চিতু আমাকে অলি ডাকত।চিতু ডাকবে তো পেট ফুটো করে দেব।আর দ্বিতীয়ত,আমরা দুপুরে বাইরে খাব।এত গুলো খাবার নষ্ট হবে।
-কিন্তু চিতু….
-আবার??
-চিতু।

বলেই হোহো করে হেসে উঠল নুর।চিত্ত দেখছে।ছেলেটা সত্যি পাল্টে যাচ্ছে।এভাবে হাসেনা অনেকদিন।আজ কি হল নুরের।
ওদিকে হাসি থামিয়ে নুর দেখল চিত্তর ডেপডেপ করে তাকিয়ে আছে।সেই আয়ত চোখ।সেই কাপা দুটো ঠোট যা কখনো চুপ থাকতে চায় না।এখনও ওর ঠোট দুটো নড়ে নড়ে উঠছে।নুর কি বলবে প্রথমে বুঝে উঠতে পারল না।পরক্ষনে আবার নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,”চলো,চিতু।”
হঠাৎ যেন চিতু ডাক শুনে হুশ হল চিত্তর।
-ধুর বাবা।তোমার কপালে আজ খাবার নেই।দেব না খেতে।
বলে হনহন করে বেরিয়ে এল চিত্ত।এসে বাইরে যাওয়ার জন্য দড়জা খুলে সবে বের হল অমনি একটা ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল।মনে হল যেন একটা ভীমে ধাক্কা খেল।ঠিক তখনই একটা হাত সামনে চলে এল।
“সরি, ক্ষমা করবেন আমি দেখিনি।আপনি ব্যাথা পাননি তো??”

৪.
মেঘ এখানেই বড় হয়েছে।বাবা এলেন হলেন খ্রিষ্টান এবং এই দেশেরই অধিবাসী।মা মহামায়া ছিলেন বাংলাদেশের মেয়ে।তাই তার ভাষাটা একটু অন্যরকম শুনায়।জন্ম এইদেশে হওয়ার ফলে ইংরেজি খুবই ভাল বলতে পারে।তবে বাংলাতে যত সমস্যা।মা গত হয়েছেন আজ পাঁচবছর।বাবার সাথে মিল তার কখনই ছিল না।বাড়ি ছেড়ে আলাদা হয়ে যাবে ভাবছে অনেক দিন ধরে।ভাল জায়গা পাচ্ছিল না।তাই এখানে এসেছে।”কিন্তু আমরা তো বাড়ি ভাড়া দেওয়ার কথা কিছু বলিনি।”বলতে বলতে কফিটা রাখল চিত্ত।”তাছাড়া আমরা দুজনেই মুসলিম তুমি আমাদের সাথে মানিয়ে। নিতে পারবে তো??”

-ইয়েস ইয়েস আই হেভ নো প্রভলেম।আর টা ছাড়া সমবয়সীদের সাথে থাকাটা আমার জন্য আনন্দের।নাও আপনি যদি অনুমুতি দেন।
চিত্ত একবার নুরের দিকে তাকাল।কারন তাদের টাকার কোনো প্রয়োজন ছিল না।অলির বাবার যে সুপার মার্কেট রয়েছে তাতে নুরের আলাদা চাকরি না করলেও তারা বসে বসে খাবে।নুর কিছুক্ষন ভেবে মাথা নাড়াল।”ওকে মেঘ তুমি থাকতে পারো।”
নুরের কথায় যেন একটু স্বস্তি পেল মেঘ।কিন্তু একটু পর মুখটা আবার শুকিয়ে উঠল।
-বাট স্যার আই হেভ এ প্রভলেম।
-(চিত্ত)কি হল।
-একচ্যুয়েলি আই এম গে।আর আমি চাই না এটা কারো কাছে হাইড করতে।
-(নুর)তাহলে তুমি ঠিক জায়গাতেই এসেছো।উই বুথ আর অলসো গে।এন্ড উই আর প্রাওড অফ ইট।
-এন্ড আপনাদের ভাড়া??
-(চিত্ত) তা লাগবে না।তুমি এমনিতেই থাকতে পারো।আর আমাদের স্যার না নাম ধরে বল।আপনি করে বললে ভাল লাগে না।
বলেই হেসে উঠল চিত্ত।

*******

এক মাস হয়ে গেল।নুর এখনও অলির সেই স্বপ্নের কথা ভুলতে পারছে না।কি এমন হবে কে জানে।এর মধ্যে সে অলিকে স্বপ্নেও দেখেনি।আর ওদিকে চিত্ত আর মেঘের মেলামেশা তার একদম ভাল লাগে না।প্রচুর হিংসা হয়।কোন কুক্ষণে যে মেঘ এসেছিল।কিন্তু তাতে তার কি।
পাশের ঘরে শুয়ে মেঘ ভাবছে চিত্তর কথা।চিত্ত খুবই মিশুক।একমাসে তার অতীত সব জানা হয়ে গেল মেঘের।ছেলেটাকে দেখলে তার ভেতর কি হয় কে জানে।এখন শীত পড়েছে।ফুরফুরে থাকার দিন নয়।তবে মনে যেন বসন্ত পড়েছে।কি যে হল তার।আগে দিন গুলো খুব মনমরা হয়ে যেত।তবে এখন দিন গুলো খুব রঙিন কাটছে চিত্তর সাথে।আচ্ছা চিত্ত কি তার কথা ভাবছে।কিন্তু কেনো ভাববে।সে তো নুর কে ভালবাসে।তবুও মেঘের ইচ্ছা হয় একবার যদি চিত্ত তার কথা ভাবত।
রাত একটা বেজে গেছে।চিত্ত তখনও বইয়ে মুখ গুজে।হঠাৎ দড়জায় শব্দ হল।
“কে??দড়জা খুলা আছে।”
নুর ঘরে এল।চিত্ত তো অবাক।নুর এত রাতে এখানে?? “নুর! তুমি এত রাতে?? শরীর ঠিক আছে।”
বইটা পাশের টেবিলে রেখে এগিয়ে এল চিত্ত।
-না না আমার কিছু হয় নি।আসলে তোমার ঘরে আলো জালানো তাই দেখতে এলাম।আচ্ছা আসি।
বলেই যেন কোনো রকম বের হয়ে এসে বাচল নুর।চিত্ত হা করে আছে।ঘোর কাটলে গিয়ে এক গ্লাস পানি খেল।একটু পর আবার শব্দ হল।
“কে??মেঘ??”
-হ্যা।এখনও ঘুমাওনি??
-না তুমি হঠাৎ??
-না তোমার ঘরে লাইট দেখে এলাম।আচ্ছা শুয়ে পরো।আমি যাই আমার কাল অফিস আছে।

চিত্তর মাথাটা এবার সত্যি ঘুড়ে গেল।মনে হয় এবার জগ এনে রাখতে হবে।সারারাত মনে হয় আর ঘুম হবে না।বিছনায় বসে অলির ছবিটা নিল হাতে।খুব মনে পড়ছে ওকে।এখন ও থাকলে হেসে খুন হত দুজনে।খুব মিস করছে তার প্রাণটাকে।ছবিটা বুকে চেপে ধরল চিত্ত।চোখ বন্ধ করে আপন মনে হেসে বলল,”কেমন আছিস অলি??দেখ তোর চিতুর খুব একা লাগছে।তুই থাকলে কত কিছুই আলাদা হত।”
হঠাৎ কিছু পরার শব্দ হল।চিত্ত ছুটে বাইরে গেল।একি তার দড়জার পাশের ফুলদানীটা পরে গেছে।কিন্তু এত শব্দ হল আর মেঘ নুর কেউ শুনল না?? আজব মানুষ।কিন্তু এই পাশটাতে তো নুরের ঘর।তবে…….

৫.
সকালে শীতের জন্য আরমোড়া ভেঙে উঠতে মন চায় না।খুব আলসেমি লাগে।তবে আজ দেরী হয়ে গেল।কাল রাতে কি যে হল।এত শীতেও সে অনেকটা পানি খেয়ে নিল।ওর এমনই হয়।চিন্তআ হলেই পানি খায়।কেন তা জানি না।নাহ আর বসে থাকা যায় না।নিচে নামতে হবে।নুর আর মেঘ নিঃশ্চয় আজ আগে উঠে গেছে।আজ অফিসে যেতে শেষে দেরী হবে।কম্বলটা সরিয়ে উয়হে ফ্রেশ হয়ে নিল চিত্ত।কিন্তু রুম থেকে বের হয়ে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল।একি নুর মেঘ কারোর কোনো পাত্তা নেই।দুই পাশের দুই দড়জা লাগিয়ে মহারাজেরা দিব্যি ঘুম।চিত্ত কিছুক্ষন হা করে থেকে এবার নুরের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।দড়জাটাতে ধাক্কা দিতেই খুলে গেল।নুর তো কখনও এভাবে দড়জা খুলে ঘুমায় না।ভেতরে ঢুকে আরেক দফা অবাক হল চিত্ত।নুর শুয়ে আছে বিছানার এক পাশে।একেবারে ছোট বাচ্চার মত দলা পাকিয়ে শুয়ে আছে।চিত্তর মনে খটকা লাগল।কাল সারারাত ফ্যানের শব্দ হল।কিন্তু কোন ঘরে তা ঠিক বুঝতে পারল না চিত্ত।চিন্তার একটা ভাজ পড়ল ওর কপালে।আর দাড়িয়ে না থেকে সোজা নুরের কাছে গেল।”নু…”
একি নুরের শরীর তো তাপে পুড়ে যাচ্ছে।নুর প্রচন্ড কাঁপছে।চিত্তর মাথা কাজ করেছে না।কি করবে সে।হঠাৎ নুরকে রেখে সে মেঘের ঘরের দিকে ছুটল।
“মেঘ মেঘ দড়জা খুলো।”

দড়জা খুলে মেঘ বেড়িয়ে এল।ঘুম চোখে চিত্তকে দেখে একটু ভয় পেল যেন।কিন্তু সকাল সকাল চিত্তকে দেখে মনটা ভাল হয়ে গেল।
-সুপ্রভাত চিত্ত।
-মেঘ একটু তারাতারি এসো।নুরের খুব জ্বর হয়েছে।
-হুয়াট।কখন।হাও।চল।
চিত্ত আর কথা না বাড়িয়ে চলে এল পিছনে এল মেঘ।নুর তখনও কাপছে।চিত্ত তারাতারি আলমারি থেকে একটা কম্বল এনে নুরের গায়ে দিয়ে পাশে বসল।
-তুমি ওয়েট করো।আমি ফ্রেশ হয়ে একটা ডক্টর নিয়ে আসছি।চিত্ত শুধু মাথা নাড়াল।তার এখন কথা বলার মত অবস্থা নেই।চোখ ফেটে পানি আসছে।নুরকে এমন অবস্থায় কখনো দেখেনি।খুব বেশি ভয় পেয়ে গেছে চিত্ত।

*****

ডাক্তারবাবু যা বলে গেলেন তা হলো যে খুব ভয়ানক কিছু না।সারারাত এভাবে ফ্যান চালিয়ে ব্লেঙ্কেট ছাড়া শুয়ে থাকাতে এমন হয়েছে।নুর খাটের হেলান দিয়ে বসে আছে।চিত্তর কাধে মাথা দিয়ে আছে।চিত্ত অন্য কথা ভাবছে।নুর কি সারারাত কেঁদেছিল?? হয়তো বা অলির জন্য খুব মন খারাপ করছিল।কারনের নুরের হাতে থেকে অলির ছবিটা সে একটু আগে টেবিলে রেখেছে।
আসলে চিত্ত যা ভাবছে তাই ঘটেছিল।এই পুরো তিন বছরে নুরের অলির জন্য টান অদেখা রয়ে গেল।নুর অলির কথা মনে করে।কিন্তু সবার অলক্ষে।যখন বড় একা লাগে তখন।কাল রাতে এই জন্যই সে ফ্যান চালু করে রাখেছিল।যেন তার কান্নার শব্দ কেউ না শুনে।
চিত্তর হঠাৎ মনে হল মেঘের কথা।ওর তো অফিস আছে।নুরকে দেখে এতটা ঘাবরে গেল যে মেঘের অফিসের কথা চিত্ত ভুলেই গেল।মেঘ এখনও বাধ্য বাচ্চার মত পাশে চেয়ারে বসে আছে।নুর শুতে চাইছে না তাই বসে।কিন্তু শরীরে শক্তি নেই এক ফোটা।তাই চিত্তর ঘাড়ে মাথা দিয়ে আছে।
-মেঘ তুমি আজ বাইরে খেয়ে নিও প্লিজ।দেখ তো নুর শুবেও না আমাকে ছাড়বেও না।আজ একটু কষ্ট করতে হবে।
-আরে না না। আমি আছি।আই এম হেয়ার।তুমি চিন্তা করো না।আমি আজ অফিস যাব না।
-না না তুমি অফিসে যাবে না কেন।তুমি যাও আমি ঠিক সামলে নিতে পারব।
-চিত্ত তুমি এখন আর অন্য কিছু ভেবো না।আমি ছুটি নিচ্ছি।আর ওর অফিস নাম্বারটা দাও আমি সেখান থেকেও ছুটি নিয়ে নিচ্ছি।
চিত্ত আর জোর করল না।আসলে নুরকে ছেড়ে সে নড়তে পারছে না।তাই একটু তো হেল্প চাই।
-মেঘ আজ তাহলে বাইরে থেকে খাবার আনিয়ে নিই।

-হ্যা আমিও তাই ভাবছিলাম।আমি যাচ্ছি তুমি থাকো।আর লাগলে আমাকে ফোন দিও।
মেঘ উঠে গেল।রুমে বসে নিজেকে কেমন যেন অসহায় লাগছিল।ভালবাসার মানুষ তার এই দুনিয়ায় কেউ নেই।মা চলে গেলেন।বাবার সাথে কখনই মিল ছিল না।দুনিয়াতে এখন তার জন্য শুধু শুন্যতা রয়েছে।কিন্তু সেই শুন্যতার শেষ সে যেন চিত্তকে দেখতে পায়।সেই মুখ।সেই আয়ত চোখ।সেই কাপা ঠোট।কিন্তু মেঘ যে বুঝেও অবুঝ।সে জানে চিত্ত তার নয়।তবু তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে ভাল লাগে মেঘের।থাক না সে অধরা।থাক না সে অপ্রাপ্তি হয়ে।
******
চিত্তর শরীরে যেন আরেকবার কম্পন হল।তাকিয়ে দেখে নুর আবার কাঁপছে।চিত্ত আর কিছু না ভেবে নুরকে জড়িয়ে ধরল।নুর দ্বিগুন জোড়ে ওকে জড়িয়ে ধরেছে।মুখে অস্পষ্ট কিছু বলে চলেছে।
-চিত্ত……..অলি বলেছে আমায়……..যাবে না।
-এইত আমি নুর।তুমি একটু শুয়ে পড়ো।একবার ঘুমাও সব শুনব।তুমি ঠিক হয় যাও।সব শুনবো।
নুর তা মানল না।সে চিত্তকে ছাড়ছেই না।কি আশ্চর্য্য দৃশ্য।যে ছেলেকে দুই মিনিট ঠিক করে বসানো যায় না এক জায়গায়।সেই চিত্ত আজ দু ঘন্টা ধরে নুরকে জড়িয়ে বসে আছে।সে যে এতটা দায়িত্ববান তা কি কেউ ভেবেছিল???
পরিস্থিতি সবই পাল্টাতে পারে।কে জানে সামনে আর কোন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে এই তিনজনকে!!!

৬.
তিন দিন পর নুর এখন অনেকটা সুস্থ।চিত্ত তাকে বলল তার অফিস থেকে নাকি সাতদিনের ছুটি নেওয়া হয়েছে।নুরেরও এখন অফিস যাওয়ার শক্তি নেই।কিন্তু জ্ঞান হওয়ার পর সে যখন নিজেকে চিত্তর বুকে আবিষ্কার করল তখন কিছুটা হকচকিয়ে গেল।দুদিন আর চিত্তর সাথে ঠিক করে কথা হল না।শুধু লক্ষ্য করল বেচারার চোখের নিচে কালো হয় গেছে।তিন রাত হয়ত একদম ঘুমায়নি।যাক আজ যখন আগের থেকে একটু সুস্থ লাগছে তবে একবার কথা বলা যেতেই পারে।
ওদিকে চিত্ত নিচে মেঘকে খাবার দিচ্ছিল।তিন রাত ধরে ঘুম নেই ওর চোখে।মাথাটা ঝিমঝিম করছিল।শরীরটা ও ভাল লাগছে না।একটু বিছানায় শরীরটা লাগাতে পারলে যেন প্রাণ বাঁচে।তবুও অনবরত কথা বলেই চলেছে।যখন সব কথা শেষ।আর কিছুই প্রশ্ন খুজে পাচ্ছে না মেঘকে করার জন্য তখন গান ধরল।বাংলা গান,সাবিনা ইয়াসমিনের গান।আঙ্কেল খুব শুনতেন গানটা।যখন বড় রেকডারে এই গানটা চালাতেন তখন অলি আর চিত্ত সব কাজ ফেলে ছুটে গিয়ে আরামকেদারার পায়ের কাছে বসে শুনত।আজ সেই গানটাই গাইছে সে।
তুমি চোখের আড়াল হও
কাছে কিবা দূরে রও
মনে রেখো আমিও ছিলাম
এই মন তোমাকে দিলাম।।

মুগ্ধ হয়ে শুনছিল মেঘ।বাংলা গান শুনা হয় না অনেকদিন।আগে মা গাইত।রবি ঠাকুরে “ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে” এই গানটা মায়ের খুব পছন্দ ছিল।চিত্ত অনেক কাজই মেঘকে তার মায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।বড্ড মায়া জমে যাচ্ছে ওর উপর।ভাবনায় ছেদ পড়ল গানটা থেমে যাওয়াতে।মেঘ তাকিয়ে দেখল চিত্ত মাথা ধরে দাড়িয়ে আছে।”কি হলো চিত্ত??”
মেঘ খাবার ছেড়ে উঠে এল।আবার জিজ্ঞাস করল,”কি হল চিত্ত?”
-কিছু না মাথাটা একটু ঘুরছে।
-হুম তা তো হবেই।তিন রাত ধরে ঘুমাওনি।যাও এখন শুয়ে পরো গিয়ে।আমি আজ যাব না।
-মেঘ ছাড়ো না এসব।তুমি এভাবে ছুটি নিতে থাকলে চাকরীটা না শেষে চলে যায়।
-নো নো।আই এম নট গোয়িং এনিওয়ার।জব গেল পাবো।বাট তোমার কিছু হয়ে গেলে আমার কি হবে।
চিত্ত অবাক হয়ে তাকাল মেঘের দিকে।কাথাটা মুখ ফসকে বলে মেঘ যে ভুল করেছে তা বোঝার সাথে সাথে মেঘ চিত্তর হাতে এক টানা দিয়ে নিয়ে চলল।কোনো কথা না বলে উপরে চিত্তর রুমে নিয়ে তাকে বিছানায় বসিয়ে দিল।একবার শুধু জিজ্ঞাসা করল ঔষধ কোথায় রাখা।তার পর মেডিসিন গুলো হাতে দিয়ে পানির গ্লাস ধরিয়ে কোনো রকমে বের হয়ে গেল মেঘ।চিত্ত অনেকদিন ধরেই মেঘকে দেখছে।একমাসে ধীরে ধীরে চিত্তর মনে হচ্ছে এ বাড়িতে হাওয়া কিছু আলাদা ভাবে বইছে।ওইদিন রাতেও নুর আবার এসছিল।তাই ফুলদানী পরেছিল তা সে বুঝে গেছে।তবে আজ মেঘের কথা গুলো কিছুটা অন্যরকম লাগল।সেই নীলাভ চোখ যেন অন্য কিছু বলছিল আজ।যে কথা সে নুরের চোখে খুজে তা যেন আজ মেঘের চোখে ঝিলিক দিচ্ছিল।ওফফ মাথাটা আবার ঘুরছে।এবার শুয়ে পরায় ভাল।

*******

চোখটা কখন লেগে গেল মনে নেই।উঠে দেখে অনেক বেলা হয়ে গেছে।নিচে গানের শব্দ হচ্ছে।চিত্ত হয়ত আবার উঠে গেছে।ছেলেটা একটিবার চুপ থাকে না।বড় চঞ্চল।ভেবে মনে মনেই হাসল মেঘ।কিন্তু দুঃখের খবর এই যে অফিসে বিরাট ঝামেলা হয়েছে।চাকরী মনে হয় এবার সত্যি চলে গেল।সে যাক।চাকরী নেওয়া কঠিন না।তবে চিন্তা হচ্ছে চিত্তকে নিয়ে।তখন মুখ ফসকে কথাটা বেড়িয়ে গেল।কি ভেবেছে কে জানে।নিচে গিয়ে সরি বলতে হবে।আগে ফ্রেশ হয়া যাক।
ফ্রেশ হতে হতে গানটা কখন থেমেছে মেঘের খেয়াল নেই।বাইরে এসে খেয়াল হল।আবার কিছু হল নাকি।মেঘ ছূটে নিচে নেমে এল।কিন্তু কেউ তো নেই।তাহলে নিঃশ্চয় ঘরে গেছে।ঘরে যেতেই গোসল করে বের হল চিত্ত।এত তারাতারি কিভাবে গোসল হয় কে জানে।চিত্তকে দেখে মেঘ থ মেরে গেল।বেশি চিকন নয়।তবে মোটা বলা যায় না।মাথার চুল গুলো থেকে পানি পড়ছে টপ টপ করে।সাদা বুক গোলাপী ঠোট লাল নাক।যেন দেবলোক থেকে এক আভা তার শরীরে পরছে।এমন রূপ দেখে মন টলে যাওয়াটা স্বাভাবিক।কিন্তু মেঘ স্বাভাবিক হয়ে বলল,”চিত্ত আজকের কথার জন্য কিছু মনে করো না।আসলে ওটা মুখ ফসকে বের হয়ে গেছে।
-আরে না না।তুমি এত ভেবো না।

*******

নুর সবে অফিস থেকে ফিরল।মেঘ এসেছে কিছুক্ষন হল।নুরকে দেখেই হেসে বলল,”হাই নুর।ফ্রেশ হয়ে এসো।তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।
-অপেক্ষা করতে গেলে কেন মেঘ।তুমি হয়তো কতক্ষন বসে রয়েছো।
-আরে না না আমিও এই মাত্রই এলাম।তুমি যাও।
নুর চলে এল।আজ একটা চিঠি লিখনে ভাবছে।ঠিক সেই ভাবে যেভাবে অলিকে লিখেছিল।সে অনেক ভাবল।কিন্তু প্রতিবার একটা নামই মনে আসে।চিত্ত!! তাই আর নয়।আজ সে মনের কথা বলেই দেবে।
বাইরের আকাশে তিনটি তারা।তিন কোনায় তিনটি তারাকে যদি রেখা দিয়ে যোগ করা যেত তবে একটা ত্রিভুজের মত দেখাত।আসলে তারা গুলো বিচ্ছিন্ন হওয়া সত্ত্বেও অবিচ্ছিন্ন।আর এদের থেকে দুরে একটি উজ্জ্বল তারা দেখা যায়।যেটা এদের থেকে আলাদা।কিন্তু সেই তারার দিকে তাকালে মনে হয় সে ভুল অবস্থানে নেই।ভুল অবস্থানে আছে তিনটি তারা।হয়ত এই একটা তারা ওই তিনটি তারার সাথে যোগ হলে ভাল দেখাত।হয়তো আলদা কোনো কোনের সৃষ্টি হত যা কিনা সম্পূর্ন।

৭.
সকালে ঘুম থেকে অনেকটা দেরি করে উঠল চিত্ত।কাল একটা ঘুমের ট্যাবলেট খেতে হয়েছে।ঘুম আসছিল না।আজ তাই অনেকটা দেরি করে উঠেও ফ্রেশ লাগছে।বিছানা ছেড়ে সোজা তার বেলকনিতে গেল সে।তার বেলকনি থেকে একটা গাছ দেখা যায়।কি গাছ সে জানে না।আঙ্কেল এই গাছটার দিকে প্রতিদিন তাকিয়ে থাকতেন।তখন অলি নেই।আঙ্কেল মারা যাওয়ার আগে একদিন বলেছিলেন,”জানিস চিত্ত এই বাড়িটাতে আমি যেদিন প্রথম অলিকে নিয়ে আসি সেদিন ওই গাছে একটা পাখি এসেছিল।অলি যেদিন চলে যায় সেদিনও একটা পাখি এসেছিল।আমি আজও সেই পাখির আশায় আছি।যেদিন অলি আমাকে দেখা দেবে।”
আঙ্কেল সে পাখিকে অলির প্রতিরূপই মানতেন।কেন তা জানা নেই।সে এক পিতার অনুভুতি।তাই তার কারন বের করা কঠিন।
চিত্ত অনেক্ষন তাকিয়ে থাকল।তারপর একবার ভাবল অলি কি কখনো আসবে?? এই পাখির বেশেই একবার আসুক না।চিত্ত নিজেও আশা করে যে ওই পাখিটা একদিন আসবে।সেদিন হবে কোনো এক বিশেষ দিন।গাছের পাতাগুলো ঝরে গেছে।কোনো ফুল নেই।বাইরে শীতের রোদ যেন গায়ে উম দেয়।আরো কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে চিত্ত ঘুরে দাড়ালো।এবার ফ্রেশ হতে হবে।

সকালের আলো লেগে ঘুম ভাঙল মেঘের।ইদানীং আলসে হয়ে যাচ্ছে।কাল চাকরীটা ছেড়ে দিয়েছে ও।যতদিন নতুন চাকরী না পাওয়া যায় ততদিন আরাম কিরে ঘুমানো যাবে তা ঠিক।তবে এই ঠান্ডাতে যদি পাশে কেউ থাকত তবে ঘুমাবার মজাটা দ্বিগুন হয়ে যেত।এটা ভাবতেই চিত্তর মুখটা ভেসে উঠে।কিছুক্ষন সেই মুখের দিকে কল্পনাতে চেয়ে থাকে মেঘ।তারপর একলাফে বিছানা ছেড়ে উঠে পরল।
বাইরে চোখ গেলে দেখা যায় এক টুকরো গলিত সোনা তার আলোর ঝিলিক দিচ্ছে যেন।একবার সেদিকে তাকিয়ে মাথায় একটা কথা খেলে গেল।আচ্ছা এমন হয়না কি?? যে সে গিয়ে চিত্তকে বলে দিল তার মনের কথা।মুখোমুখি দাড়িয়ে বলে দেবে।এমনিতেও নুর চিত্তর ভালবাসাকে দেখেও না দেখা করে আছে।যদি চিত্ত মেনে যায়।সত্যি কি এমন হতে পারে?? নাহ মেঘ মন ঠিক করেই ফেলল যে সে বলবেই।
নুর আজ খুব ভোরে উঠল।পাশে রাখা অলির ছবিটা নিয়ে একটা চুমু খেল।”সুপ্রভাত অলি।”বলেই একবার জোরে বুকে জড়িয়ে রেখে দিল ছবিটা।আজ খুব বেশি আনন্দ হচ্ছে ওর।আজ মনের সাথে অনেক লড়াইয়ের পর মনের কাছে সে হেরে গেল।তবে এতে তার জিত রয়েছে।সে সুখ যে কি তা শুধু আস্বাদন কারি জানে।যাক এবার চিঠিটা চিত্তর ঘরে রেখে এসে ফ্রেশ হয়ে নিতে হবে।

*******

চিত্ত ফ্রেশ হওয়ার সময় একটা শব্দ শুনলো মনে হল।একবার জিজ্ঞাসাও করেছিল কিন্তু কোনো উত্তর এল না।তোয়ালেতে মুখ মুছতে মুছতে একবার আয়নার দিকে তাকাল।তার খোচা দাড়ি গুলো বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে।অলি বলত নুরের এমন দাড়ি বড্ড ভাল লাগে।আচ্ছা নুর কি কখনো ওর হবে?? নাকি সে সারাজীবন একতরফা ভালবেসে যাবে নুরকে।কে জানে।
মুখ মুছে তোয়ালেটা চেয়ারের মাথায় রেখে সে খেতে চলে গেল।
খাবার টেবিলে বসে মেঘ আর চিত্ত একটু অবাক হল।নুর আজ খুব তারাতারি খাচ্ছে।যেন কোনো মতে নাকে মুখে গুজে বের হয়ে যেতে হবে।আর চিত্তও মেঘকে দেখে একটু অবাক হচ্ছে।খাবার না খেয়ে কিছুক্ষন মেঘ নুরকে দেখছে আবার কিছুক্ষন খাবার প্লেটে কি আকছে।নুরের অবস্থা দেখে অবাক হওয়ার কথা কিন্তু মেঘে কি হল।
এমনিতেও আজ চিত্তর কেন জানি শুধু ওই গাছটা আর ওই পাখির কথা মনে পড়ছে।বার বার মনে পড়ছে।খাবার শেষ নুর তরিঘরি করে বেরিয়ে গেল।যাওয়ার পথে একবার থেমে অলির ছবির কাছে গিয়ে হাতে নিয়ে একটা চুমু খেল।অবাক হওয়ার পর্ব শেষ হলে মেঘ একবার চিত্তর দিকে তাকালো।চিত্ত হা করে বড় বড় চোখ দিয়ে ডেপডেপ করে তাকিয়ে আছে ওদিকে।ঠিক যেন ছোট বাচ্চা।
-এই যে বাচ্চা মশাই।
-কি বললে??
রেগে এদিকে তাকালো চিত্ত।এক্ষুনি যেন খেয়ে ফেলবে।
-আরে কিছু না।শুনো তোমাকে একটা কথা বলব।
-হ্যা বলো।
-এখানে না।আজ একটু পড় সামনের কবরস্থানের রাস্থাটা আছেনা??ওইখানে এসো।আমি ও থাকবো।
চিত্ত একটু অবাক হল।কিন্তু মুখে ওকে বলে দিল।
খাবার শেষ রুমে গিয়ে চিত্ত তার টেবিলের দিকে তাকাতেই দেখে একটা খাম।”এটা কোথা থেকে এলো।টাওয়াল রাখার সময় লক্ষ্য করিনি তো।কে জানে হয়ত ভুলে দেখিনি।”

উপরে নিজের নাম লেখা দেখেই ছিড়ে ফেলল।কে কেন এত ভাবার ছেলে সে না।একি এটা তো একটা চিঠি।প্রথমে লেখা “প্রিয় চিত্ত,”।চিত্ত খুব মনযোগ দিয়ে পড়ল চিঠিটা।প্রায় আধা ঘন্ট পড়ার পর চিত্তর চোখ থেকে একফোঁটা পানি পড়ল কাগজে।শেষে ইতি নুর লেখাটা দেখে আজ যেন তার দুনিয়া বদলে গেল।”পেয়েছি হ্যা পেয়েছি।আজ আমি আমার নুরকে পেয়েছি।অলি তুই একবার দেখা দে।আমি তোকে জড়িয়ে ধরি।”
হঠাৎ একটা কিচিরমিচির আওয়াজ হল।খুবই ক্ষীন।পিছনে বেলকনির দিকে গেল চিত্ত।একি সেই গাছে একটা পাখি।অলি এসেছে।আজ সত্যি তার বিশেষ দিন।মেঘকে জানাতে হবে।

*******

চিত্তর ফোনে একটা মেসেজ আসল।আজ তোমার নীল লেন্সটা পড়ে এসো।নীল আমার প্রিয়।তোমার চোখে মানাবে।-মেঘ
সাথে সাথে মেঘের কাছে রিপ্লাই এলো,আজ আমিও তোমায় কিছু বলব মেঘ।আমি আসছি।

৮.
অনেক্ষন হল।চিত্ত এত দেরী করছে কেন।হয়ত প্রস্তুত হচ্ছে।সে বলেছে মেঘকে কিছু বলবে।আর মেঘ নিশ্চিত যে চিত্ত তার মনের কথা বলবে।চিত্তও তার প্রেমে পরে গেছে বলবে।তাকে জড়িয়ে ধরে বলবে আমি তোমাকে ভালবাসি মেঘ।মেঘও তাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলবে হ্যা আমিও তোমাকে ভালবাসি চিত্ত।আই লাভ ইউ।আই লাভ ইউ সো মাচ।আমাকে ছেড়ে যাবে না তো কখনো।চিত্ত মাথা নাড়াবে।তাকে জড়িয়ে থেকেই বলবে কখনো না।মনে মনে একবার হেসে উঠল মেঘ।সে আজ চিৎকার করে বলবে তার মনে কথা।মনে হাজার রঙের প্রজাপতি উড়ে যাচ্ছে।আর কিছুক্ষন পরই সেই রঙ গুলো ধরা দেবে।কিন্তু কোথায় চিত্ত।

নুরের আজ অফিসের কাজে মন বসছে না।বার বার মনে মনে বলছে,”অলি তুমি সত্যি আমাকে বাচতে শিখালে।নইলে আমি মরেই যেতাম এভাবে।লাভ ইউ অলি।”কিন্তু চিত্তর জন্য কি গিফট নিয়ে যাওয়া যায়।কি নিলে সে খুশি হবে।ফুল তো ওর এত ভাল লাগে না।না চকলেট ভাল লাগে।তবে?? হ্যা বই।রবীন্দ্রনাথের বই ওর ভাল লাগে।সেটাই নিয়ে যাবে।আজ কিছুতেই মন লাগাতে পারছে না সে।শুধুই ওর কথা মনে হচ্ছে।আচ্ছা ওকি চিঠিটা পেল?? আচ্ছা ও কি মানবে?? এই কি তবে নুরের জীবনের নতুন অধ্যায়??
********
চিত্ত আজ খুব খুশি।এই কয়েকদিনে মেঘের সাথে খুব ভাল বন্ধুত্ব হয়ে গেছে।আর এর মধ্যে আজ নুরের চিঠি তার জীবনে নতুন মোড় নিয়ে এসেছে।আজ আর মেঘকে না করতে পারল না।তাই চোখে নীল লেন্স পরে এসেছে।মেঘের খুব ভাল লাগে এইগুলো।আরেকটু এগোতেই দেখল মেঘ দাড়িয়ে।হাতে একটা ডায়রী।বেশ বড় আকারের কালো ডায়রী।চিত্ত এবার তারাতারি হেটে মেঘে কাছে গিয়ে দাড়াল।মেঘ একটু চমকে উঠল।তারপর কিছুক্ষন পলকহীন তাকিয়ে রইল চিত্তর দিকে।চিত্ত সত্যি তার কথা রেখেছে।নীল চোখ দুটো দেখে তার ইচ্ছা করছিল তাতে ডুবে যেতে।যেন একটা সচ্ছ সরোবর।যাতে পানি ছল ছল করে।”কি হল কি দেখছ মেঘ?”
হঠাৎ নড়ে উঠল মেঘ।
-না কিছু না।
-আচ্ছা চল হাটি।
-চল।
পাশা হাটছিল তারা।মেঘ মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে চিত্তর কাছে চলে যাচ্ছিল যাতে তার হাতটা একবার লাগে তার হাতে।চিত্ত বুঝল কিনা জানা নেই।তবে হঠাৎ সে মেঘের হাতটে টেনে নিজের হাতে নিয়ে নিল।মেঘ কিছুক্ষন অবাক হয়ে ছিল।তার পর ঘোর কাটল চিত্তর কথায়।
-মেঘ তুমি না বলেছিলে মি বলবে।
-হুম বলব তো।
-বল তাহলে।
-তুমিও তো কিছু বলবে বলেছিলে।তুমি আগে বল।
চিত্ত এই বিষয়ে আগে বলার সুযোগ ছাড়ে না।আর কথা বলার কোনো একটা সুযোগ পাওয়া হল আসল।
-আচ্ছা তাহলে আমিই বলি।
-ইয়েস স্যার।এটা শুনার অপেক্ষায় আছি।
-আজ আমি খুব খুশি মেঘ।আজ আমি সব পেয়ে গেছি।
বলেই হঠাৎ মেঘকে জড়িয়ে ধরল চিত্ত।মেঘ প্রথম ঝটকায় কিছু বুঝল না।পরে মনে হল চিত্ত আর কিছু না বলুক।তাকে এভাবে শুধু জড়িয়ে রাখুক।অনন্ত কাল ধরে।
মেঘের মনের প্রজাপতির দল ক্রমশ রঙ নিয়ে কাছে আসছে যেন।

-মেঘ
-হুম
-সে আমাকে ভালবাসে।
-কে??
-নুর।
হঠাৎ যেন পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল।কি শুনল মাত্রে সে।নুর চিত্তকে ভালবাসে।কি বলবে কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না সে।চোখের সামনের সব কেমন যেন অন্ধকার হয়ে উঠছিল।”মেঘ,মেঘ!””
চিত্তর ডাকে যেন জ্ঞান হল মেঘের।চিত্ত আরেকবার তাকে জড়িয়ে ধরে বলল,”তুমি না কি বলবে??”
-না তেমন কিছু না।বাড়ি চল পরে বলব।
-এখানে বল না মেঘ।
-নো চিত্ত।বাড়ি চল।জায়গাটা ভাল লাগছে না।চল।আর হ্যা বাড়ি গিয়ে তোমার একটা ছবি দিও আমাকে।প্লিজ।
বলে হাটতে লাগল দুজন।মেঘ চুপ করে হাটছে।
-আচ্ছা এই ডায়রী কার জন্য??
-ওহ এটা।আমি তো ভুলে গেছি।ওহ গড।এটা তোমার জন্য।আমি জানতাম তুমি আজ কেন খুশি।
-মেঘ তুমি সত্যি জানতে??
-ইয়েস।
চিত্ত আরেকবার জড়িয়ে ধরল মেঘকে।তারপর হাটতে হাটতে চিত্ত বহু কথা বলল।তা সে প্রতিদিনই বলে।মেঘের সেদিকে খেয়াল নেই।মেঘ ভাবছিল একবার কি সে চিৎকার করে কেঁদে উঠবে?? একবার কি বলবে যে চিত্ত এই ডায়রী আমি আমার চিত্তর জন্য এনেছিলাম।তোমাকে আকাশ বাতাস উজার করে চিৎকার করে বলতে চেয়েছিলাম আমি তোমাকে ভালবাসি।কিন্তু তা যে হল না।তুমি কি বুঝতে পারছো চিত্ত।শুনতে পারছো আমার বুকের পাজর ভাঙার শব্দ।
*******
নুর হাতে চোখের বালি উপন্যাস নিয়ে দাড়িয়ে।চিত্তর চোখে যেন সে সেই খুশি দেখতে পাচ্ছে।চিত্ত এবার ছুটে এসে নুরকে জড়িয়ে ধরল।”আই লাভ ইউ নুর।”
-আই লাভ ইউ টু।
হঠাৎ মেঘের রুমের দড়জা খুলা শব্দ হতেই দুজন স্বাভাবিক হয়ে গেল।মেঘ নিচে নেমে এলো।হাতে ব্যগ গোছানো।
-(নুর)একি কোথায় যাচ্ছ মেঘ?
-(মেঘ)বাড়ি যাচ্ছি নুর।
-(চিত্ত)কিন্তু কেন??
-(মেঘ)আসলে জবটা ছেড়ে দিয়েছি।এন্ড ওদিকে ডেডও ফোন করলেন বাড়ি যেতে।সো আর থাকা হল না।
-কিন্তু….
চিত্তর চোখ ফেটে জল এলো।জানে না কেন।খুব খারাপ লাগছে মেঘের জন্য।মেঘ একবার মনে করল ওকে কি বলা উচিত যে এই জল কেন চিত্ত।এ যে আমার অধিকার নয়।
-চিত্ত ছবিটা।
চিত্ত একটা ছবি মেঘের হাতে দিল।মেঘ একবার তাদের জড়িয়ে ধরে দুফোটা চোখের জল ফেলল।কান্নাটা খুব কষ্টে আটকে রেখেছে।বেড়িয়ে একবারও পিছনে ফিরে দেখল না।

***পরিশিষ্ট***

চিত্ত আর নুর হয়ত ভালই আছে।আগে কথা হত।এখন হয় না অনেক দিন।মেঘ ও তার ভাল থাকার পথ খুজে নিয়েছে।না সে আত্মঘাতী হয়নি।বাবাকে বলে দিয়েছে বাংলাদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে।সে চলে যাবে।যেখানে সে অধিকার পাবে না সেখানে অধিকার ফলানোর চিন্তাও আসবে না।

রাতের আকাশে তারা ঝিলমিল।সেই তিনটি তারা থেকে একটি একটু দুরে সরে গেল।আর সেই বিচ্ছিন্ন তারাটা মনের সুখে খসে পড়ল।তার অধ্যায় শেষ।এবার শুরু হবে নতুন সেই তারার নতুন অধ্যায়।

লেখকঃভুতু

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.