আঁখি পল্লব

বারো বছর পর দেশে ফিরে এলাম।আঠারো বছর বয়সে যেদিন দেশ ছেড়ে ছিলাম সেই দিনের কথা আজ মনে নেই। আজ মনে আছে কেবল এক জোড়া চোখ। আর সেই চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়া টলটলে পানি।
আমি প্রদীপ্ত চক্রবর্তী।আজ আমার ত্রিশ বছর বয়স।জীবনের এই দীর্ঘ সময়ে যা পেয়েছি সব কিছুই রয়ে গেছে। হারিয়েছি কেবল আমার সুখ। আজ বারো বছর ধরে যে জিনিসটার খোঁজে আমি ব্যস্ত তার নাম সুখ।
বাংলাদেশে পা দিতেই বুকটা কেঁপে উঠলো। যার জন্য পাগলের মত ছুটে আসা, যার জন্য এত প্রতীক্ষা, যার জন্য আমার বেঁচে থাকা সে কি আমাকে মনে রেখেছে? মনে রাখার মত মন কি তার আছে?যেদিন সব ছেড়ে গিয়েছিলাম সেদিন সে জড়িয়ে ধরেনি, ভাল থেকো বলে প্রমাণ ও করেনি যে আমার গুরুত্ব তার কাছে আছে। সে কেবল তাকিয়েছিল। তার শান্ত দুটি চোখ বেয়ে ঝরঝর করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল।আজো রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে সেই ষোলো বছর বয়সের তরুণের চোখ দুটি ভেসে উঠে।আমি সেই দিন লোকের ভিড়ে মিশে গিয়েছিলাম।সেই মিশে যাওয়ার পর নিজেকে আর আলাদা করতে পারিনি।

বাসায় ফিরতে সন্ধ্যা। ঢাকা বিমান বন্দর হতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অনেকটা দূরের পথ না হলে ও গাড়ির জ্যামে অনেকটা সময় লেগে যায়।গাড়িতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।বাসায় ফিরে কারো সাথে কোন কথা না বলেই গিয়ে শুয়ে পড়লাম।
ঘুম ভাঙলো রাত তিনটাই। ঘুম ভাঙতেই সেই চেহারাটা ভেসে উঠলো। আজ এই বাড়ি, ঘর, পথ শহর পালঠে গেছে। মানুষগুলো ও বদলে গেছে। বড় দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। দিদা মারা গেছে। দাদু ভাই অসুস্থ্য।সুদীপ্ত ভাইয়া বউ নিয়ে আলাদা বাসায়। ছোট ভাই নির্মল এইবার অনার্সে। এত টুকুন দেখেছিলাম তাকে। আজ কত বড় হয়ে গেছে। বাবা আমাকে আনতে যায়নি। ইতালি যাওয়ার পর কোন দিন তার সাথে আমার কথা হয়নি। আমি চাইনি। তার ও ইচ্ছে হয়নি।
ফেরার ইচ্ছে ছিল না আমার। ফিরলাম কেবল তার জন্য। যাকে ভালবেসে বেসে আমি বেঁচে আছি। কিন্তু সে কোথায় আছে? ভোর হোক, একবার যাব গ্রামের দিকে।
বাড়ির সামনেই মন্দির। মন্দিরের বা দিকে ফুল গাছ। সেখান থেকে ঘ্রাণ আসছে। ওর প্রিয় ছিল নীল অপরাজিতা। আমাদের বাসার গেইট বেয়ে বেড়ে উঠেছিল অপরাজিতা ফুল গাছ। নীল ফুলে ভরে উঠতো আমাদের গেইট। সে আসত, আড্ডা হত,আনন্দে নেচে উঠত আমার মন। যাওয়ার সময় হাত ভরে নিয়ে যেত নীল ফুল। আজ সেই গেইট নেই, ফুল নেই। সে আছে কিনা তা ও জানি না।

বাসার সামনে আগে রাস্তাটা ছিল না। আমবাগান ছিল।আজ আমগাছ একটা ও নেই। ভেতর বাড়ির পেছনে পুকুর ছিল। সেটা আছে তবে পুকুর পাড় যত্নের অভাবে ঝোপঝাড়ে পরিণত হয়েছে।আকাশ মেঘে ঢাকা। আমার মনে ঝড়। সেই ঝড়ে আশ্রয় দরকার। আর ঐ আশ্রয় যে আমাকে দিবে আমি তার খোঁজে বের হয়েছি। যদি পেয়ে যাই তবে সবটা দিয়ে ধরে রাখবো। আর যদি না পাই তবে আমি ও হারিয়ে যাব।আর যাই হোক তাকে ছাড়া বেঁচে থাকা আমার হবে না।
ভোরে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হলাম।সবাই তখন পূজায় ব্যস্ত। আমি বের হয়ে গেলাম।দু পা হাঁটতেই মনে হল, আমি তো কিছুই চিনি না। কীভাবে খোঁজবো তাকে? মনটা বিষাদে ভরে উঠলো। কিছুদূর যেতেই ছোট ভাই নির্মলকে দেখলাম হাত ভর্তি বাজারে নিয়ে বাসার দিকে আসছে। আমাকে দেখেই কোথায় যাচ্ছি তা জানতে চাইলো। আমি উত্তর না দিয়ে দ্রুত আসতে বললাম। সে বাজারের ব্যাগগুলো পাশের ছেলেটার কাছে দিয়ে আমার পাশে এসে দাঁড়ালো। দু পা হাটতেই আবার জিজ্ঞেস করলো
-দাদা কোথায় যাবা?
আমি তার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম
-আবিরদের বাসা চিনিস?
-কোন আবির?
-রহিম কাক্কুর ছেলে আবির।
-উ।আবির ভাইয়া?ওনারা তো এখানে থাকে না। চার পাঁচ বছর আগেই তো সিলেট চলে গেছে।

ওর কথা শুনেই ভূমি নড়ে উঠল। যার জন্য এত ব্যস্ততা। যে ছেলেটার জন্য আমার এত ভালবাসা, যার জন্য ছুটে আসা। সেই আবির আর এখানে নেই? সে কি আমাকে ভুলে গেছে? একটি বার ও কি আমার কথা তার মনে পড়ে না? তাহলে কেন সেদিন বুক ছোঁয়ে বলেছিল আমাকে কোন দিন ভুলে যাবে না। কষ্টে বুকটা ভরে উঠলো। বাসায় ফিরে এলাম।নাস্তার টেবিলে বসে মুখে আর খাবার দিতে পারেনি। মা নারিকেলের নাড়ু বানিয়েছে। আমি মুখে দেইনি। নাড়ু ছিল আবিরের প্রিয়। বাসায় ঢুকলেই কোথায় কি আছে তা খুটিয়ে খুটিয়ে খেত। আমি হেসে মরতাম।ওর সব কিছু আমার ভাল লাগতো। ওর হাসি, কথা বলা, হেঁটে চলা। ও যখন আমার বুকে মাথা রেখে শুয়ে শুয়ে গল্প করতো তখন সুখে আমার বুক ভরে উঠতো। মনে হত এইভাবে বেঁচে থাকলে মন্দ হত না।
আবিরের সাথে আমার পরিচয় কালীবাড়ির দূর্গা পূজায়। তখন আমি ইন্টারমিডিয়েট দিয়ে ভর্তি পরিক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।ও তখন ষোলো সতেরো বছরের কিশোর।শরতের আকাশ, আর দুর্গা দেবির আগমন। তখন ধর্মের প্রতি ছিল প্রবল ঘরছাড়া টান।দুর্গা দেবীর মন্ডপে ঘুরে ঘুরে বন্ধদের নিয়ে গেলাম কালীবাড়ি। দুর্গা পূজার জন্য এই মন্দির বিখ্যাত।

হঠাৎ করেই কোন একটা গণ্ডগোল লেগে গেল। ভিড় ঠেলে ভেতরে যেতেই দেখি পূজার পুরোহিত আর ষোল সতেরো বছরের এক ছেলের মধ্যে মন্ত্র নিয়ে তুলকালাম কান্ড। ছেলেটা বলছে পুরোহিত মন্ত্রের ভুল উচ্চারণ করছে কিন্তু ওনি মানতে রাজি নয়। এই নিয়ে ঝগড়া করতে করতে লগ্ন যখন যায় যায় তখন সবাই শান্ত হল। ছেলেটা কথা না বাড়িয়ে ভিড়ের মধ্যে হেটে গিয়ে মন্দিরের গেইটে দাঁড়িয়ে কার সাথে যেন হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলছিল। প্রথম দেখাই তাকে আমার ভাল লেগে গিয়েছিল। কাছে গিয়ে নমস্কার বলতেই সে চোখ ঘুরিয়ে তাকাল। আহা!কি সুন্দর চোখ।নদীর মত টলটলে পানি, ঘন কালো মোটা ভ্রু,খাড়া নাক, সদ্য গজিয়ে উঠা দাড়ি গোফ। বুকটা নড়ে উঠেছিল।
সেই দিনের পরিচয়ের সবটা আমার মনে আছে। আর মনে থাকবেই বা না কেন? আমার মনটা তো বেঁচে ই আছে তার জন্য।
চোখে পানি এসে গিয়েছিল। ভেতরটা কেঁদে উঠলো।খাবার টেবিলে যারা বসেছিল তারা সবাই খেয়াল করছিল আমি খাচ্ছি না। খাবার নেড়ে যাচ্ছি। মা কিছু বলতে যাচ্ছিল। আমি সেই সুযোগ না দিয়ে উঠে বের হয়ে এলাম।আমার একাকিত্ব দরকার।
দুপুরের দিকে মা ঘরে আসলো। এসেই খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইলো। আমি বালিশে হেলান দিয়ে শরৎ চন্দ্রের শ্রীকান্ত পড়ছিলাম।আমি পড়া রেখে মাকে প্রশ্ন করলাম
-মা, কিছু বলবে?
মা কিছুক্ষণ নিরব থেকে বলল
-তুই বিয়ে করবি না?
মায়ের প্রশ্ন শুনে আমি হাসতে হাসতে উত্তর দিলাম,
-হঠাৎ, বিয়ে কেন?
-ছেলে হয়েছিস, বিয়ে করবি না?
-ছেলে হলেই বুঝি বিয়ে করতে হয়?
-ও মা, করতে হয় না বুঝি?
-না, করতে হয় না। আর তুমি তো জানো ই আমি কী চাই। তারপরে ও যদি জোর কর তবে এইবার গেলে আর আসবো না।

মা মনে হয় কষ্ট পেয়েছেন। চুপ হয়ে গেল। তারপর যা বলল, তার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না।মা একটা কাগজ হাতে দিতে দিতে বলল
-এটা আবিরের বাসার ঠিকানা। তুই এসে চায়বি জানতাম।তাই আগে থেকে আনিয়ে রেখেছি। তুই যা, ওকে একবার নিয়ে আয়। অনেকদিন হল ওকে দেখি না।
বলেই মা চলে গেল। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। সত্য ই মায়ের তুলনা কেবল দেবী ই।মন ভাল হয়ে গেল।হাতের ঠিকানাটার দিকে তাকিয়ে রইলাম।আজকেই যেতে হবে।দেরি করলে চলবে না।
নিজেকে গুছিয়ে নিতে নিতে বিকেল তিনটা। বৈশাখ মাস। আকাশ কালো হয়ে মেঘ গর্জে উঠলো।আমি তখন সিলেটের উদ্দেশ্যে বাসে চড়ে বসলাম।হাতে হাতটা চেপে ধরে আবিরের কথা ভাবতে লাগলাম।কেমন দেখতে হয়েছে ও। ত্রিশ বছর হয়ে গেছে তার।যখন দেশ ছেড়ে ছিলাম তখন ওর অবয়বে যে স্নিগ্ধতা ছিল, আজো কি তা আছে? কতটুকু পালঠেছে? ও কি আমাকে মনে রেখেছে? আচ্ছা, আমাকে দেখলে কি ও চিনতে পারবে? সে সব ভুলে কি আবার নতুন করে আমাকে কাছে টেনে নিবে?
আমি চিন্তায় চোখ বন্ধ করলাম।সিলেটের রাস্তায় আসতে না আসতে ঘুমিয়ে গেলাম। ঘুম ভাঙলো কারো ডাকে
-এই যে, একটু সরে বসবেন?
আমি চোখ খোললাম।আটাশ ত্রিশ বছরের একজন তরুণ।চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, হাত ভর্তি বই।খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি আর বলিষ্ঠ দেহ। চোখ খোলে সম্পুর্ণ অবয়বটা এক ঝলক দেখে নিলাম।মুগ্ধতা ছাপিয়ে মনে হল, এই অবয়ব আমার সহস্র জীবনের চেনা। হয়তো বা মনের ভ্রান্তি। নিজেকে সামলে জানালার পাশের সিটে গিয়ে বসলাম।বসেই চোখ বন্ধ করে নিলাম।মাথাটা ভনভন করে উঠলো।ঘন্টা দেড় ঘন্টা ধরে বাস চলছে।বমি যে হবে নিশ্চিত ছিলাম।কিন্তু হলো না। আবিরের কথা মনে পড়তে লাগলো।

এক বর্ষায় আবির আমাকে জড়িয়ে ধরিয়ে চুমু খেয়েছিল।আমি জীবনের প্রথম ঠোটের ছোঁয়া পেয়ে কেঁপে উঠেছিলাম।ভালবাসার টানে সেই ঘোর বর্ষা আমাদের জীবনে বসন্ত হয়ে এল।বাহিরে প্রবল বর্ষণ আর আমাদের দেহে প্রবল উষ্ণতা।সেই ভালবাসা, সেই প্রেমে কেটে গিয়েছিল অনেকগুলো দিন। আমি তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজে ম্যাথ নিয়ে ভর্তি হয়ে পড়া শোনায় মনযোগ না দিতে পেরে মাথার চুল ছিড়ার উপক্রম।আর আবির নিজের মত করে এইচ এস সি এক্সামের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আর ঠিক সেই সময়টাই আমাদের জীবনে শুরু হল কাল বৈশাখী।

হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা। শুরুটা হয়েছিল কুমারী পূজা নিয়ে। সেইবার কুমারী পুজায় নতুন নিয়ম চালু করে দিল এলাকার অভিজাত ব্রাহ্মণ সম্প্রাদয়।আমরা যারা হিন্দু ছিলাম তারা মেনে নিয়েছিল, মেনে নেইনি এলাকার মুসলমানরা।সেই থেকেই তর্ক, বিতর্ক আর এক পর্যায়ে হাতাহাতি লড়াই।সেইবার প্রতিটি হিন্দু মুসলিমের বিরুদ্ধে আর প্রতিটি মুসলিম হিন্দুর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিল।আমি আর আবির তখন উভয় সংকটে। ধর্মের ফারাক যে মনের ফারাক সৃষ্টি করতে পারে সেটা প্রথম বুঝেছিলাম।সপ্তাহ খানেক চলা দাঙ্গায় আমি আর আবির ও জড়িয়ে পড়লাম।গ্রামে ব্রাহ্মণ সমাজের মিলিত সিদ্ধান্তানুযায়ী, আমাদের মুসলিমদের সাথে কোন প্রকার সম্পর্ক রাখা যাবে না। আমি তাদের আইনের বিরুদ্ধে গেলাম।আবিরের সাথে রোজ মিশতাম। তাদের বাসায় যেতাম।বিকালে নদীর তীরের নৌকায় বসে গলা ছেড়ে গান গাইতাম।সেই সময় টাই আমার আরেক যুদ্ধ শুরু হয়েছিল পরিবারের সাথে।
বাস এসে থামলো শ্রীমঙল শহরে। নামতেই আবার ঐ ভদ্রলোকের সাথে দেখা। আমার তখন খিদাই পেট চু চু করছিল।সকাল সন্ধ্যা নামের একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসে পড়লাম।আমার ঠিক পাশেই ঐ ভদ্রলোক বসলেন। বসেই মুচকি হেসে বললেন
-কোথায় যাবেন?
আমি পানির গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে বললাম
-সাতগাঁও
-তাই নাকি? আমি ঐখানেই থাকি।
আমি আরেকবার তাকালাম।ভদ্রলোক চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলল
-আপনাকে পরিচিত লাগছে কেন বলুন তো?
আমি গম্ভীর হয়ে বললাম
-বুঝতে পারছি না।

সারা রাস্তা তার সাথেই এলাম। সাতগাঁও এসে মানিব্যাগ থেকে ঠিকানাটা বের করলাম।আমাকে ঠিকানাটা বের করতে দেখে সে মুচকি হেসে কাগজটা ছিনিয়ে নিতে নিতে বলল
-দেখি আপনি কোথায় যাবেন।
আমি বিরক্তিতে চোখ কুঁচকিয়ে তাকাতেই খেয়াল করলাম তার চোখ মুখ গম্ভীর। কাগজটার দিকে এক পলকে তাকিয়ে বলল
-এই ঠিকানায় আপনি কার কাছে যাবেন?
আমি উত্তর না দিয়ে কাগজটা তার হাত থেকে নিয়ে সি এন জির দিকে পা বাড়ালাম।সে পিছনে স্থির দাঁড়িয়ে রইলো।
পাহাড়ি এলাকা।চা বাগান আর বাঁকাপথ।যেতে যেতে সন্ধ্যা। একতালা একটা বাড়ি। তার সামনে সুন্দর করে লেখা, সাতগাও টি রিসোর্ট।অন্ধকারে ডিমলাইটের আলোয় লেখাটা স্পষ্ট কিন্তু পথ নয়। অদূরে একজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম।ভেতরটা কেমন করে উঠলো। এ আবির নয় তো? ইশ্বর!এটা ই যেন আবির হয়। এতদিনের বিরহ যন্ত্রনা আর কষ্টের যেন সমাপ্তি হয়। আবির যেন আমাকে ক্ষমা করে কাছে টেনে নেই।
দুই মিটার পথ হাঁটতে হাঁটতে পিছনের স্মৃতি মনে পড়তে লাগলো।

আবিরের সাথে যখন আমার সম্পর্ক শত দাঙ্গার মধ্যে ও টিকে ছিল সেই সময় হিন্দুত্ববাদীদের প্রবল চাপে বাবা নিষেধ করলো আবিরের সাথে মিশতে। আমি তার বারণ শুনিনি। শেষের দিকে এক প্রকার জোর করেই পাঠিয়ে দিল মামার কাছে ইতালি।এক মাসের মধ্যে সব ঘটে গেল।আবির বা আমি তার কিছুই জানতাম না। কেবল যাওয়ার আগের দিন বাবা আমাকে বলল। আবির কে বলার সুযোগ হয়নি। খুব ভোরে যখন গাড়িতে মালপত্র তুলা হচ্ছিল তখন আবির এসে সামনে দাঁড়িয়েছিল।তার চোখ থেকে টপটপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল।আমার বুক ফেটে কান্না চলে আসলো।আমি সেই কান্না আর অশ্রুসিক্ত চোখ নিয়ে গাড়িতে চড়ে বসলাম।পিছনে এক কিশোর আমার বিরহে যন্ত্রনায় কাতর আর আমি ভেতরে, বুকে ঝড় নিয়ে ছুটে চলছিলাম।
আজ এত বছর পর আবার আবির আমার সামনে হবে।ভেতরে ভালবাসার ঝড় বয়তে লাগলো।
ছায়া মূর্তিটি কথা বলল,
-প্রদীপ্ত, দাঁড়াও।

আমি থমকে দাঁড়ালাম।সে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে লাগলো।কাছে আসতেই তার চেহারাটা স্পষ্ট হল।অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম’এ যে বাসে পরিচয় হওয়া সেই ভদ্রলোক! তারমানে এটাই আমার আবির। আমার আবির এত বড় হয়ে গেছে। এত সৌন্দর্য তার।এত মুগ্ধতা তার অবয়বে। আমি পাগলের মত তাকে জড়িয়ে ধরলাম। ধরেই কেঁদে দিলাম।কিন্তু, সে হাত বাড়িয়ে ধরলো না। ঠাই দাঁড়িয়ে রইল।আমি অবাক হয়ে খেয়াল করলাম তার চোখে পানি। কৈশরে সে যখন কাঁদতো তখন তার আঁখিপল্লব ভিজে উঠতো। বিন্দু বিন্দু অশ্রু গড়িয়ে পড়তো পল্লব থেকে।আজ ও তেমনটাই হল।
আমি ফুপিয়ে কাঁদিতে কাঁদতে বললাম
-দীর্ঘ এতগুলো বছর তোমাকে ছেড়ে আমি নরক যন্ত্রনা ভোগ করেছি। আমার সমগ্রতা তোমার জন্য এতটাকাল ছটফটিয়েছে। প্লিজ, তুমি আমাকে ক্ষমা কর। আমাকে কাছে টেনে নাও।আমি আর নিতে পারছি না তোমাকে ছেড়ে থাকার যন্ত্রনা।

আবির আমাকে টেনে তুলল। শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে বাচ্চাদের মত কেঁদে দিল।আর বলতে লাগলো
-আমি জানতাম তুমি ফিরবে। সবাই বলতো তুমি কোন দিন ফিরে আসবে না। কিন্তু আমি জানতাম তুমি ফিরবে। কারন আমি তোমাকে ভালবেসেছি। আর তুমি আমায়।
ভেতরটা আনন্দে ভরে উঠলো।আবিরের কপালে চুমু খেয়ে তার চোখ মুছতে মুছতে মনে হল, আমরা আর ত্রিশ বছরের নয়। আমরা ফিরে গেছি আমাদের কৈশরে। আমাদের স্বপ্নের যৌবনে।

লেখকঃআরভান শান আরাফ

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.