ভালোবাসার বর্ণিল ক্যানভাস

এক
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা একেবারে রক্তিম বর্ণ ধারণ করে আকাশের গায়ে মিশে গেছে। কখন যে রাধামাধবের মন্দিরে যাব! তারপর সেখান থেকে যাব গঙ্গা ঘাটে। প্রদীপ ভাসাতে। এটা আমার রোজকারের অভ্যাস কিংবা ঈশ্বরসেবা। যা আমাকে পালন করতেই হবে। হঠাৎ ঠাকুমা আমাকে ডাকতে ডাকতে বের হলো।
-কিরে অরু আজ তুই কি মন্দিরে যাবি না?
-যাবো তো ঠাকুমা। দেখো না মা যে এই অবেলায় কোথায় গেল। মা না আসলে কি করে যাই!
-তুই যা। বউমা আসলে আমি বলে দিব ক্ষণ।
-আচ্ছা আমি গেলাম।
ঠাকুমাকে বলে রাধামাধব এর জন্য গাঁথা শিউলি ফুলের মালা আর প্রদীপশিখা নিয়ে বেরিয়ে গেলাম। মন্দিরটা বেশি দূরে নয়। শুনেছি এলাকার জমিদারেরা মন্দিরটা গড়ে দিয়েছিল ব্রিটিশ আমলে। পুরেনো বলেই মন্দিরের প্রতি মানুষের গভীর ভক্তি, মান্নত। আমিও আজকাল এই মন্দিরে রোজ পুজো দেই। তারপর গঙ্গাঘাটে প্রদীপ ভাসিয়ে বাসায় ফিরি। আর তা শুধু একজন মানুষের জন্যই করি। কিন্তু হায়! যার জন্য আমার এত শুদ্ধ আয়োজন সে হয়তো জানেই না আমি তাকে পাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে ঈশ্বরের সাহায্যে নিজেকে সঁপে দিয়েছি। আমার ঈশ্বরতুল্য, প্রাণাধিক প্রিয় শিমুল’দার জন্য আমার এইসব ব্রত, উপবাস। সেই শিমুল’দা আমাকে যদি একটু বুঝতো; নাকি বুঝেও না বুঝার ভান করে থাকে! সারাক্ষণ দুষ্টুমি করে। মাঝে মাঝে খুব রাগ হয় আমার। ইচ্ছে করে তার মাথায় একটা বারি মেরে বলি, ‘আমি তোমায় ভালোবাসি গো শিমুল’দা। তোমার জন্যই যে আমার এত সাধনা। এত আয়োজন।’ কবে যে আমাকে বুঝবে মানুষটা!

দুই
মন্দিরে গিয়ে নিজ হাতে গাঁথা শিউলি ফুলের মালাটা রাধামাধবের চরণে দিয়ে পুজো সারলাম।
গঙ্গার ঘাটে গিয়ে প্রদীপটাও ভাসিয়ে দিলাম। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছি প্রদীপটাকে। প্রদীপের স্নিগ্ধ আলোয় কিছুটা জায়গা আলোকিত হয়ে আছে। শিমুল’দার জীবনটাও যেনো সবসময় এরকম আলোকিত থাকে- রাধামাধবের কাছে সেই প্রার্থনা করি। আর তাইতো আমার প্রদীপ ভাসানোর এই তপস্যায় হাজির হই প্রতিদিন।
ঘাট থেকে উঠতেই দেখি শিমুল’দা দাঁড়িয়ে আছে। আমার দিকে চেয়ে মিটিমিটি হাসছে। কাছে যেতেই বলল,
-কিরে অরু রোজ এমন প্রদীপ ভাসাস, পুজো করিস। কার জন্য রে, কাউকে ভালোবাসিস নাকি?
-কী যে বলো না তুমি শিমুল’দা!
-বুঝি বুঝি। বল নাইলে মাসিকে উল্টাপাল্টা বলে দিব…
-আরে এমনি বললাম তো।
আমি ঘাট থেকে উঠতে না উঠতেই শিমুল’দা মাকে বলার জন্য ছুটলো। আমিও তাঁর পেছনে দৌড়াতে লাগলাম। তার কাছে গিয়ে পিছন থেকে জাপটে ধরে বললাম, ‘বলো না প্লিজ…আমি তোমাকে একদিন সব বলব।’ শিমুল’দা আমার দিকে কেমন লোভাতুর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার চোখকে ইশারায় এড়িয়ে বললাম, ‘আচ্ছা এখন বাসায় যাই। অন্ধকার হয়ে গেছে।’ বলেই কোনোরকম পালিয়ে আসলাম। শিমুল’দার সামনে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে কখনোই পারি না আমি। খুব ছুঁতে ইচ্ছে করে। খুব ভালোবেসে ভেসে যেতে ইচ্ছে করে দূরের কোনো দ্বীপে। দুনিয়ার কোনো সমপ্রেমী মন এই শ্যামবর্ণ সুঠাম দেহের সুদর্শন পুরুষকে এড়িয়ে যেতে পারবে না। যেমনটা আমি পারি না। তাইতো তার অপরূপ সৌন্দর্যে ডুবে যাই বারবার। তাকে নীরবে ভালোবাসতে বাসতে বলি, ‘তুমিই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দর মানুষ শিমুল’দা। যার জন্য আমার এতদুঃখ,এই প্রতীক্ষারত অহর্নিশ যাপন।

তিন
কদিন ধরে খুব ঠাণ্ডা পড়েছে। হাত পা শীতল হবার মতো ঠাণ্ডা। রাতের খাবার শেষে উমজড়ানো কাঁথার নিচে শুয়ে আছি। হঠাৎ শিমুল’দার গলা শুনলাম। বুকের ভিতর কেমন ধুকপুক ধুকপুক করতে লাগল। যদি সে ঘরে আসে। আমি খালি গায়ে শুয়ে আছি। খুব লজ্জায় পড়ে যাবো।
হায় ভগবান! কথায় বলে, যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যে হয়। এমনটা ভাবা মাত্রই শিমুল’দা ঘরে চলে আসলো। এসেই আমাকে টেনে হিঁচড়ে তুললো। আমি লজ্জায় লাল হয়ে গেলাম। ইতস্তত বোধ হচ্ছিল ভেতরে। ততক্ষণে মা’ও চলে এসেছে। মা আসতেই শিমুল’দা বলল, ‘মাসি আমি অরুকে নিয়ে আগামীকাল এক জায়গায় যাব। তোমার কোনো আপত্তি নেইতো?’ মা মাথা নাড়ালো। তেমন কিছু না বললেও শুধু বলল, ‘তোর সাথেই রাখিস।’
আমার মাথায় একটা গাট্টা মেরে শিমুল’দা চলে গেলো। আমার মনে যেন আর খুশি ধরে না। একরকম নাচতে শুরু করে দিলাম। মা দেখে হাসতে হাসতে শেষ।
প্রবল উত্তেজনায় সারারাত ঘুম হলো না। স্বপ্নের মানুষটা আমাকে নিয়ে কোথাও যাবে। এর থেকে আনন্দের আর কী হতে পারে! কিন্তু কোথায় যাবে, কেন বা আমাকে নিয়ে যেতে চাচ্ছে? কৌতুহল আর আনন্দ আমাকে ঘুমোতে দেয় না। কেবল তার চোখদুটো ভাবতে থাকি চোখ বুজে।

চার
সারাদিনের সব কাজ আগেই সেরে রেখেছি আজ। বিকেলের দিকে শিমুল’দা একটা নীল শার্ট আর জিন্সের প্যান্ট পড়ে আমাদের বাড়িতে এলো। তাকে দেখে মনে হলো সে যেন স্বর্গপুরুষ। যাকে আমি প্রতিদিন পুজো করি। আমার পুজোয় সন্তুষ্ট হয়ে সে মর্তে নেমে এসেছে আমার ইচ্ছে পূরণ করতে। একটা মানুষ এতটা সুদর্শন কী করে হতে পারে তা ভগবানই জানেন! আমি অবাক চোখে দেখেই যাচ্ছি।
আমার কাছে এসে বলল, ‘নে অরু রেডি হয়ে নে।’ আমি বললাম, ‘পুজো দিব না, প্রদীপ ভাসাবো না?’ শিমুল’দা বলল, ‘আজ দুজন একসাথে সব করব।’ কথাটা শুনে খুশিতে আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে। এটা কি স্বপ্ন না সত্যি?
প্রথমবার শিমুল’দা আর আমি একসাথে শিউলি ফুলের মালা গাঁথলাম। তারপর মন্দিরে গিয়ে পুজো দিলাম, একসাথে প্রদীপ ভাসালাম।
তারপর দুজনে চললাম। আমার ডান হাত ধরে সে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমি জানি না।
খুব জানতে ইচ্ছে হলো। বললাম,
-আচ্ছা শিমুল’দা আমরা কোথায় যাচ্ছি?
-বলা যাবে না।
-বলো না। একটু বলো।
-সিনেমা দেখতে।
কথাটা বলে আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছিল। আমি খুশিতে শিমুল’দাকে জড়িয়ে ধরে একেবারে গালে চুমুই দিয়ে দিয়ে দিলাম। শিমুল’দা হাসতে হাসতে একেবারে মাটিয়ে পড়ে যাচ্ছিল। আর আমি? লজ্জায় বোবা হয়ে গেলাম।
সিনেমা শেষ হলো। আমি পুরোটা সময় জুড়ে শিমুল’দার হাতটা ধরে রেখেছি। একবারের জন্যও ছাড়িনি। রোমান্টিক দৃশ্য গুলার সময়ে শক্ত করে শিমুল’দার হাত চেপে ধরেছি। আর আবেগী মুহুর্তগুলো দেখে কেঁদেছি তাকে ভেবে।
সিনেমা শেষে দুজনে বাড়ি ফিরছি। আমি এখনো শিমুল’দার হাত ধরে আছি। শিমুল’দা একবারের জন্যও ছাড়াতে চায়নি।
আকাশে সুন্দর একটা চাঁদ উঠেছে। মেঘভাঙা জ্যোৎস্না টুপটাপ করে ঝরে পড়ছে চারদিকে। আমি গুনগুনিয়ে ‘চাঁদনি পশর রাইতে আমায় স্মরণ করে’ গানটা গাইছি। ঠিক এমন সময় সামন দিয়ে একটা হুতুম পেঁচা উড়ে গেলো। আমি ভয় পেয়ে ও মাগো বলে শিমুল’দাকে জড়িয়ে ধরলাম। শিমুল’দা কিছু না বলে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো আমাকে। শিমুল’দার শরীর থেকে চন্দনের একটা মিষ্টি গন্ধ আসছিল তখন। মাতাল করা সেই গন্ধ। আর পারছিলাম না আমি। নিজেকে ছাড়িয়ে শিমুল’দার কাছে গিয়ে চোখ বন্ধ করে বুকে একটা চুমু দিয়ে কানের কাছের বললাম ‘ভালোবাসি তোমায় শিমুল’দা। আমি তোমায় খুব ভালোবাসি।’ বলেই দৌড় দিলাম। শুনতে পেলাম শিমুল’দা আমাকে ডাকছে। ‘অরু শুনে যা, যাসনে প্লিজ। শুনে যা অরু।’ আমি এক দৌড়ে বাড়িতে ঢুকে গেলাম।

পাঁচ
বাসায় আসার পর না খেয়েই শুয়ে পড়লাম। একটা চিন্তা কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না। শিমুল’দাকে যে মনের কথা গুলো বলে দিলাম, এখন যদি শিমুল’দা আমাকে ভুল বুঝে, যদি আমার সাথে আর কথা না বলে, আমাকে খারাপ বলে তার জীবন থেকে সরিয়ে দেয়! আমার খুব কষ্ট হবে তখন। ভালোবাসার মানুষটা ভালো না বাসুক, বন্ধু হিসেবে কথা বললেও যে একধরনের সুখ পাওয়া যায়। সেই সুখটাই আমার কাছে পরমপ্রিয়, তৃপ্তির খোড়াক। মনের আকাশে দ্বিধার মেঘ। চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। একটা ঘোর অশান্তি আমাকে শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। কিন্তু এটাও তো হতে পারে, তাকে আমি দাদা হিসেবে ভালোবাসার কথাটা বলেছি। সে অম্তত এটা ভাবুক। নয়তো আমাকে শিমুল’দার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
.
পরেরদিন সারাদিন শিমুল’দার খোঁজ নেই। গোধূলিলগ্নে পুজো শেষ করে, প্রদীপ ভাসাতে গিয়েও শিমুল’দাকে দেখলাম না। অথচ প্রতিদিন গঙ্গার ঘাটেই দাঁড়িয়ে থাকে। প্রদীপ ভাসিয়ে ছুট লাগালাম শিমুল’দার কাছে। তাদের বাসায় কেউ নেই।
পুরো বাড়ি ফাঁকা। শিমুল’দার ঘরে উঁকি মারতেই দেখি শিমুল’দা লেপ জড়িয়ে শুয়ে আছে। আমি পা টিপে টিপে শিমুল’দার ঘরে গেলাম। গিয়েই ডাক দিলাম,
-শিমুল দা…
সে ভারী গলায় জবাব দিলো,
-কিরে অরু তুই, এই সময়ে?
-না মানে শিমুল’দা…আসলে কাল রাতে…
কথাটা শেষ না হতেই শিমুল’দা আমার হাত ধরে এক হ্যাচকা টানে তার বুকে আঁচড়ে ফেলল। শিমুল’দার লোমহীন বুকে পড়ে, শরীরের উষ্ণ ছোঁয়া পেতেই আমার শরীরটা কাঁটা দিয়ে উঠলো। একটা রোমাঞ্চকর মোহ যেন আমাকে গিলে খেতে চাচ্ছে। আমি একেবারে চুপ মেরে গেলাম। শিমুল’দা আমাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। আমি বললাম, ‘শিমুল’দা ছাড়ো। কী করছো? বাসার মানুষজন দেখলে কী ভাববে!’ আমার কথাকে আঙুল দেখিয়ে সে বলল, ‘দেখার কেউ নেই। সবাই বেড়াতে গেছে।’ আমি হা করে তাকিয়ে রইলাম শিমুল’দার দিকে। শিমুল’দা চোখদুটোতে মায়া নিয়ে বললো, ‘পাগল ছেলে, আমি জানি তুই আমাকেই ভালোবাসিস…আর তোর এত পুজো, আর্চা সব আমার জন্যই।’

এবার আমি বিস্ময়বোধক হয়ে গেলাম। লজ্জায় শিমুল’দার বুকে মুখ লুকাতে চাইলাম। শিমুল’দার উষ্ণ ঠোঁটের পরশ আমার ঠোঁটে এসে লাগল। আমার সারা গায়ে কেমন শিহরণ খেলে গেলো। আমি শিমুল’দাকে বাঁধা দিলাম না। এত দিনের জমানো ভালোবাসা সব উশুল করে নিব আজ এই ভেবে। শিমুল’দা এক টানে আমার গায়ের জামাটা খুলে ফেলল। চরম উত্তেজনায় আমি ছটফট করছি। কিছুক্ষণের জন্য দুজন হারিয়ে গেলাম দুজনাতে। ভালোবাসার শোধ মেটাতে। চুমোয়, শিৎকারে, আলিঙ্গনে। কিছুক্ষণ পর শিমুল’দা ঘর্মাক্ত নগ্ন দেহ নিয়ে পাশেই হেলে পড়ল। আমি শিমুল’দার বুকে।এই প্রথম রচিত হলো শিমুল’দা আর আমার এক নিষিদ্ধ প্রেমের কাব্য।

ছয়
সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আমাদের সম্পর্কটাও এগিয়ে চলছে। দিন, মাসের হিসেবে ছাপিয়ে কবে যে ছয়মাস হয়ে গেল টেরই পেলাম না। ঝগড়া, খুনসুটি, ভালোবাসা, আদরে বেশ ভালোই আছি আমরা দুজন। শিমুল’দা মাঝে মাঝে ইচ্ছে করেই ঝগড়া করে। তারপর আমি যখন কান্না করি, সারাদিন না খেয়ে থাকি তখন আমাকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে মন্দিরের পিছনে বসিয়ে খাবার এনে নিজের হাতে খাইয়ে দেয়। আর এখন আমরা দুজন একসাথেই পুজো করি, একসাথেই প্রদীপ ভাসাই। তবে যাইহোক না কেন আমি শিমুল’দাকে ছাড়া একদম অচল। শিমুল’দাকে ছাড়া নিজেকে কল্পনা করাও আমার পক্ষে অসম্ভব।
.
আজ কত বেলা হয়ে গেল একবারও শিমুল’দা দেখা করতে আসেনি। অভিমানে গাল ফুলিয়ে বসে আছি। কয়েকবার বাড়িতে গেলাম। কেউ নাই বাড়িতে। হঠাৎ দেখি শিশির’দা দৌড়াতে দৌড়াতে আসছে। শিশির’দা শিমুল’দার কাকাতো ভাই। ওর চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। চোখ ভেজা। কাছে আসতে জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে শিশির’দা? শিশির’দা যেটা বলল তার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। শিমুল’দা এক্সিডেন্ট করেছে। চারদিকটা অন্ধকার দেখতে লাগলাম। মাথাটা ঘুরছে। তারপর আর কিছু মনে নেই। যখন আমার জ্ঞান ফিরল আমি দেখলাম- মা, ঠাকুমা, মাসি আমার শিয়রের পাশে বসে আছে। লোকলজ্জাকে দূরে রেখে বাচ্চাদের মত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলাম। ছেলেরা খুব কষ্ট না পেলে কাঁদে না। আজ আমার জীবনের প্রদীপের অগ্নিশিখা শিমুল’দাকে হারাতে বসেছি। সবাই ভাবছে দাদা লাগে তাই কাঁদছি। কিন্তু আমি তো জানি শিমুল’দাই আমার বেঁচে থাকার মূলমন্ত্র, একমাত্র আশা। তবে একা করে কেনই বা চলে যাচ্ছে আজ। আমি কি অপরাধ করলাম!

আমার কান্নাকাটি দেখে শিশির’দা আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু মা কেন জানি বাধা দিচ্ছে। আজ মা’র কোনো কথাকেই প্রাধান্য না দিয়েই শিশির’দার সাথে চলে গেলাম। সাথে রাধামাধব এর চরণ থেকে একটা ফুল নিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখি আমার শিমুল’দা হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছে। কোনো জ্ঞান নেই। মুখে অক্সিজেন মাক্স লাগানো। নার্সকে বলতেই নার্স ভিতরে যেতে নিষেধ করে দিলো। আমি নার্সের মুখের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে কেঁদেই ফেললাম। অস্পষ্ট স্বরে বললাম, ‘শুধু ফুলটা ছুঁইয়েই চলে আসবো। একটু যেতে দেন।’ নার্স আর না করতে পারল না। আমি ফুলটা শিমুল’দার কপালে ছুঁইয়ে একটা চুমু খেয়ে হাতটা ছুঁলাম। নার্স ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। তারপর বাইরে এসে গ্লাসের মধ্যে দিয়ে দেখতে লাগলাম। মাসির কাছে গিয়ে মাসির মাথায় হাত দিয়ে ‘কিচ্ছু হবে না শিমুল’দার। কিচ্ছুনা। কিচ্ছুনা।’ বলেই মাসিকে জড়িয়ে ধরলাম। কান্না আর থামাতেই পারছি না। মাসি বলল, ‘বোকা ছেলে আর কাঁদিস না। তোর শিমুল’দা ভালো হয়ে যাবে। ভগবানের উপর ভরসা রাখ।’মাসিও ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাদঁছে।

সাত
হাসপাতালে কিছুদিন থাকার পর শিমুল’দাকে বাড়ীতে নিয়ে আসা হয়েছে। ভগবানের ক্রিপায় শিমুল’দা এখন অনেকটাই সুস্থ। বাড়ীতে আনার পর শিমুল’দার সেবা যত্নের দায়িত্বটা আমিই নিয়েছি। মাসিও কিছু বলেনি। শুধু বলেছে তোর শিমুল’দাকে কিন্তু তোকেই সুস্থ করে তুলতে হবে। তোর হাতেই ছেড়ে দিলাম। শিমুলটাও তাই চাইছিল।
দিনরাত এক করে শিমুল’দাকে সুস্থ করে তোলার প্রয়াস চালাতে লাগলাম। একটু একটু করে মানুষটা সুস্থ হতে লাগল। আলোর পৃথিবীতে আমার শিমুল’দা আবারও ছুটাছুটি করবে, হুইলচেয়ারে বসে আর মন খারাপ করে বাইরে তাকিয়ে থাকতে হবে না, স্ট্রেচারে ভর করে আর দাঁড়াতে হবে না।
শিমুল’দাকে সেবা করার দায়িত্ব পেয়েছি বলে অনেকেই খুশি হলেও খুশি হয়নি শিমুল’দার মামাতো বোন তৃধা দিদি। কারণ সেও চাইছিল শিমুল’দার সেবা যত্ন করার জন্য। শুনেছি তৃধা দিদির সাথে শিমুলদার বিয়ে হওয়ার কথা। মাসিও রাজি। তবে মাসি তৃধা দিদিকে দায়িত্ব না দিয়ে আমাকে কেন দিলো সেটাই চিন্তার বিষয়। দিনে দিনে শিমুল’দা সুস্থ হয়ে উঠছে।
.
শিমুল’দা এখন পুরোপরি সুস্থ। দুষ্টুমি শুরু করে দিয়েছে। যখন তখন জড়িয়ে ধরে, চুমু খেতে যায়। বাঁধা দিলেই কী যে অভিমান! আজ ঠিক করেছি শিমুল’দাকে নিয়ে বের হব। মাসি’কে বলে রেখেছি। প্রথমে রাধামাধব এর মন্দিরে যাব তারপর সেখান থেকে একটু নদীর ধার থেকে ঘুরে আসবো।
বের হবার সময় মাসিকে প্রণাম করেই বের হলাম। মাসি আশীর্বাদ করলেন দুজনকেই। আমার বুকের ভিতর মৃদু কম্পন অনুভূত হলো। বেরিয়ে পড়লাম দুজনে।

আট
মন্দিরে কিছুক্ষণ বসে থেকে আমরা গঙ্গার ঘাটের দিকে হাঁটছি। আমি একেবারে চুপচাপ। শিমুল’দা বকবক করেই যাচ্ছে। দুজনের মাঝে খানিকটা দূরত্ব। হঠাৎ শিমুল’দা আমার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। দুহাতে আমার গালে ধরে চোখের দিকে তাকিয়ে বললো,
-কিরে অরু তোর কি হয়েছে?
-কই কিছু নাতো।
-বলবি? আমি সব বুঝতে পারছি।
-মাসি যদি তোমার থেকে আমাকে আলাদা করে দিয়ে তৃধা দিদির সাথে তোমার বিয়ে দিয়ে দেয়। আমার কি হবে! আমি তো মরেই যাব…
কথাটা শেষ হতেই শিমুলদা আমাকে জড়িয়ে ধরলো। আমিও শিমুলদার বাহুডোরে লুকিয়ে গেলাম। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছি আর বলছি তোমাকে আমার কাছ থেকে আলাদা করে দিলে আমি মরেই যাবো। শিমুল’দা এবার শব্দ করে হেসেই দিল। একটু দূরে গিয়ে ভেংচি কাটতে লাগলো। আর ছিঁচকাঁদুনী বলে ক্ষ্যাপাতে লাগলো। আমি ধরতে যেতেই হোঁচট খেয়ে শিমুল’দার উপর পড়ে গেলাম। শিমুল’দাকে আলতো করে গলায় টিপ দিয়ে ধরলাম। শিমুল’দা কে জড়িয়ে ধরে চুপটি করে কানে বললাম, ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি।
শিমুল’ দা আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠল,’ তুই শুধু আমার রে অরু, শুধুই আমার।’ শিমুল’দার উষ্ণ ঠোঁট জোড়া মিশে গেল আমার ঠোঁটে। দুজন হারিয়ে গেলাম এক অজানা নিষিদ্ধ প্রেমের সাগরে।

লেখকঃ শাফিন রাজ

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.