ববির জন্য প্রার্থনা

কলোনির সবচেয়ে ধার্মিক আর প্রভাবশালী খ্রিষ্টান পরিবার হচ্ছে মেথিও এর পরিবার। ওনার স্ত্রী হেলেন খুব ধার্মিক আর গুণগ্রাহী। শহরের খ্রিষ্টান পরিবারের আদর্শই বলতে গেলে। মেথিও এর দু ছেলে। বড় ছেলে আলব্রেট আর ছোট ছেলে ববি। আলব্রেট উচ্চশিক্ষা গ্রহণে ব্যস্ত আর ববি এখনো ও স্কুলেই। দুই ভাইয়ের বয়সের মধ্যে ব্যাপক ব্যবধান থাকলে ও তাদের মধ্যে রয়েছে গভীর বন্ধুত্ব। আলব্রেট যেমনি হোক, পরিবার আর আত্মীয় সবার পছন্দের পাত্র একমাত্র ববিই। ববি শান্ত ,মেধাবী ,আর উৎসাহী। সে দেখতে সুন্দর, তার হাসি সুন্দর। তার মুখের কথা প্রাণোচ্ছালিত। তার ভদ্রতা সবার দৃষ্টি আকর্ষনীয়।

ববি সবার সাথে মিশতে পারলে ও একটা সময় নিজেকে একা করে দিতে লাগলো। সেই শান্ত শিষ্ট ছেলেটি নিজের মধ্যে অদ্ভুত কিছু খেয়াল করতো। সে খেয়াল করতো যে, সে আর বাকিদের মতো নয়। সে কিছুটা নয় বরং অনেকটাই আলাদা। শ্রেণীকক্ষের সহপাঠিরা যখন তাদের শিক্ষিকা মিস গাগাকে নিয়ে যৌনুক্তি করে তখন তার শুনতে কেমন রুচিতে আটকায় কিন্তু সুদর্শন শিক্ষক পলকে তার অনেক ভালো লাগে। ববি খুঁজতে থাকে এই নেশার কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু সে হতাশ হয়। ঈশ্বর তাকে কীভাবে গড়লেন তা সে নিজেও বুঝতে পারে না। কোথায় যেন অপূর্ণতা আর শূণ্যতা। জাতি আর ধর্মের জ্ঞান থাকা বেবি অবাক হয়ে খেয়াল করে তার যৌনতার উল্টো স্রোত। ববির ভালো লাগে সুদর্শন যুবক। তাদের অবয়ব ভাবনায় সুখ এনে দেয়। মোহিত চোখে সেই সুন্দর পুরুষগুলোকে সে কল্পনা করে, স্বপ্নে দ্যাখে।
ভালো লাগে তাদের সাথে গা ঘেঁষে কথা বলতে। ভালো লাগে তাদের মাংসল উরু আর পেশিবহুল বাহু। ববি বুঝতে পারে এই চাহিদাগুলো অসামাজিক। যেখানে সামাজিক শ্রীটুকুও বিন্দুমাত্র নেই। সে জানে সে ঈশ্বরের ঘৃনার পাত্র। তাই সে হতাশায় ডুবে থাকে সবসময়। কী করতে পারে সে ? যখন বারবার চেষ্টা করেও এ থেকে ফিরতে পারেনি। তখন হতাশা আর যন্ত্রনায় তার চোখে পানি চলে আসে। যখন তার মা জানবে যে, তার ছেলে অন্য ছেলে থেকে আলাদা, তার ছেলে স্বাভাবিক নয় তখন সে কী করবে? কী ভাবে গ্রহণ করবে তাকে তার আত্মীয়রা।

ববি কোনোভাবে বুঝতে পারেনা। মেলাতে পারে না প্রশ্নগুলোর উত্তর। তার মাথায় চাপ পড়ে। তার চোখ বেয়ে জল নামে। সে একজন সমকামী। সে বাইবেলে বর্ণিত পাপী। সে সমাজ আর ধর্মের চোখে নিকৃষ্ট তা ভাবতেই তার বুকটা কষ্টে ভরে যায়। ইচ্ছে করে চিৎকার করে কাঁদতে। কিন্তু সে কান্নাটাও তাকে চেপে রাখতে হয়। তার কষ্ট শুধু তারই। আর কারো নয়, কাউকে বলার মতো নয়। ববির মা হেলেন খুবই ধার্মিক প্রকৃতির হওয়াতে প্রতিদিন একবার করে তিনি ববিকে নিয়ে গির্জাতে যান। সেখানের গির্জার যাজক ফাদারের সাথে ওনার পরিচিতি খুব বেশি। ঐদিন ববি গীর্জায় যাওয়ার পর ফাদার তাকে বাইবেলে বর্ণিত সডোম জাতির গল্প বলল। যাদের সমকামের জন্যে ধ্বংস করে দিয়েছিল। ফাদার সাথে এও বলল, সমকামীরা ঈশ্বরের অভিশাপ। তারা ক্রুশ ধারন করলেও মুক্তি পাবে না। তারা চিরনরকী। ববি ফাদারের কথা শুনে ঘাবড়ে গেল। তার চোখ মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। কষ্টে তার বুকে পাথর জমে গেল। নিঃশ্বাস ঘন হয়ে এল। সে দ্রুত হেঁটে মাকে ফেলে একাই গীর্জা থেকে বের হয়ে পড়লো। রেলপথ দিয়ে ববি হেঁটে চলছে। এই পথটা অনেক দুর চলে গেছে। ববির চোখে পানি। তার ইচ্ছে করছে কোথাও চলে যেতে যেখানে বাইবেল নেই, গীর্জা নেই , নেই কোনো ফাদার। যেখানে থাকবে শুধু সে। সে ভাবে এই পথ কি তাকে নিয়ে যেতে পারবে সেখানে? যদি পারতো তবে সে চলে যেত। মাঝেমাঝে আবার ইচ্ছে করে ট্রেনের নিচে মাথাটা দিয়ে মরে যেতে।
.
সেদিন স্কুলে যাওয়ার পর সে একটা ছেলেকে দেখে। তার কাছে ছেলেটাকে ভীষণ ভাল লাগলো। ববি ভুলে গেল সব। ধর্মীয় বিধান, নিষেধ। ছেলেটাকে কাছে পাবার বাসনায় মরিয়া হয়ে গেল। সে যত বারই তাকে দেখেছে ততবারই প্রেমে পড়েছে। তার ছোঁয়া পেতে, তাকে জড়িয়ে ধরতে সে প্রবল ভাবে উৎসাহী। কিন্তু ববি জানতো না তার চাওয়া কোনোদিনও পাওয়ার নয়। একদিন ববি অনেক ভেবে স্থির করলো ঐ ছেলেটাকে সে বলবে তার মনের কথা। কিন্তু তা আর হলো না। সে বলার আগেই যা দেখলো তাতে ববির মন ভেঙে গেল। তার বুকে ব্যথা করতে লাগলো। কষ্টে তার দম আটকে যাচ্ছিল। সে দেখল যাকে সে ভালোবাসে সে তার বান্ধবীকে কিস করছে। নিজের প্রতি ববির ঘৃনা চলে আসলো।
একবুক কষ্ট নিয়ে বাড়ি ফিরল ববি। বাড়ি ফিরে কষ্টটা যেন আরো বাড়তে লাগলো। সে কতগুলো ঘুমের ট্যাবলেট খুলে নিল। খাওয়ার জন্যে মুখে দিতে গিয়ে ও দিল না মা আর বাবার কথা ভেবে।
বড় ভাই আলব্রেট বাসায় ফিরে ববিকে ডাকতে লাগলো। টিভি চলছে আর কলের পানি পরার শব্দ। বাথরুম খালি ছিল। অনেক গুলো রুম খুঁজেও যখন পেল না তখন সে রিডিং রুমে গেল। সেখানে গিয়ে দেখল ববি মরার মতো পড়ে আছে। তার আত্মাটা মোচড় দিয়ে ওঠল। কাছে গিয়ে ববিকে টেনে তুলে পানি ছিটে দিতেই ববি জেগে ওঠল। কী হয়েছে জানতে চাইলে ববি কিছু না বলে এড়িয়ে যায়।
কিন্তু আলব্রেট জেদ করে জানতেই চায়। ববি প্রচণ্ড রেগে যায়। রাগের মাথায় এক পর্যায়ে বলেই ফেলে যে, সে একজন গে আর এটাই তার কষ্ট। দুজনেই থ মেরে যায়। একজন সত্যটা বলে আরেকজন সত্যটা শুনে। পরক্ষণে ববি অনুরোধ করলো কাউকে যেন তা বলে। তাহলে সবাই তাকে ঘৃণা করবে। আলব্রেট ওয়াদা দেয় কাউকে বলবে না। ববিকে সে জড়িয়ে ধরে। হয়তো আলব্রেট ভাইয়ের কষ্টটা বুঝতে পেরেছিল ।
.
ঐদিন ববি স্কুলে ছিল। এদিকে কথা প্রসঙ্গে আলব্রেট তার বাবা মাকে বলে দেয় যে তার ছেলে ববি একজন গে। কথা শুনে মিঃ মেথিও এবং মিসেস মেথিও চমকে ওঠে। যে ছেলেকে ঘিরে তাদের এত স্বপ্ন, তাদের এতো আশা সেই ছেলে গে? যে ছেলেকে নিয়ে তাদের গর্বের সীমা নেই; সেই ছেলে গে, পাপী!
ভাবতেই তাদের কাছে বিষয়টা কেমন কুৎসিত মনে হচ্ছিল। আত্মীয়রা জানতে পারলে মুখ দেখাবে কি করে? এই চিন্তায় দুজনেই অস্থির। ঈশ্বর তাদের এ কোন পাপের শাস্তি দিলেন? এই কোন অভিশাপের ফলে এত বড় পাপী ছেলে তাদের সংসারে এলো? ববি যখন স্কুল থেকে বাসায় ফিরল তখন প্রতিদিনের মতো মা এসে জড়িয়ে ধরে চুমু খেল না। বাবা দিন কেমন কাটলো তা জানতে চাইল না। সবাই কেমন যেন চুপচাপ। ববির দিকে দু’জোড়া চোখ খুব অদ্ভুত ভাবে চেয়ে ছিল। আজ সকালে যে পরিবারটা তার ছিল অতি প্রশান্তির এই পরিবারটা এত দ্রুত যে পাল্টে যাবে তা কে জানতো? কেউ কথা বলেনি। ববিও বলেনি। সে তার রুমে গিয়ে এমনি শুয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর বাবা আর মা আসলো আলব্রেট এর বলা কথাটার সত্যতা যাচাই করতে। তারা জানতে চাইলো ববি আসলেই গে কিনা?

ববি বুঝতে পারলো সব পাল্টে গেছে। আর এই পাল্টানোর জন্যে দায়ী তার বড় ভাই। সে রক্তচোখে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেলল আর বলল, ‘তুমি কেন করলে এটা? কেন বলতে গেলে?’ সে জানতো সে সব হারাতে বসেছে তাই খুব রাগ হলো ভাইয়ের উপর। চেচিয়ে রাগ ঝাড়তে লাগলো দেখে বাবা থাপ্পর মেরে রুম ত্যাগ করল। ববিও কাঁদতে কাঁদতে বাসার বাহিরে চলে গেল। হেলেন সারা রাত ভাবলো ববিকে নিয়ে। পরের দিন খুব ভোরে তার বিশ্বস্ত যাজকের কাছে গেল। যাজক সব শুনে বলল যে ,এটা ইশ্বরের অভিশাপ। এই অভিশাপ কাটাতে হলে প্রচুর শ্রম দিতে হবে। অনেক কিছু ব্যবহার করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। ববির মা এই অভিশাপ কাটাতে বদ্ধপরিকর। সে তার শান্ত আর ভদ্র ছেলেকে অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে যাজকের কথা মেনে নিল। অন্যদিকে পরিবার সব জানার পর যেন সত্যিই ববি একটা অভিশপ্ত মানবে পরিণত হলো। ববি খুব একা হয়ে গেল। নিঃসম্পর্ক একা। সারাদিন বাসার পাশের রেলপথে বসে থাকতো। মাথাটা দু’পায়ের হাঁটুতে মিশিয়ে। মাঝে মাঝে একটা খাতায় খসখস করে কী যেন লিখত। তার চোখ থেকে পানি ঝড়তো। ভালো লাগতো না তার কোনো কিছু। স্কুলে যেত না ঠিকমতো। কারো সাথে কথা বলতো না। মেজাজ মন সব খিটখিটে হয়ে থাকত। রাত গুলো জেগে ভাবতো, সত্যিই কি গে হওয়া কোন অভিশাপ? ঈশ্বর কেন তাকে গে বানালো? সে তো চায়নি? কেন তার মস্তিষ্ক বিকৃত হলো? কেন তার জীনের ডিএনএতে সমকাম ঢুকে গেল? হায় ঈশ্বর! কেন সে সমকামী?
হেলেন ছেলের অভিশাপ মুক্তির জন্যে যাজকের দেওয়া পবিত্র পানি ছিটাতে লাগলো সারা বাড়িতে। বিভিন্ন তাবিস, কবজ এনে লটকিয়ে দিলো ববির রুমে। ববি যখন সন্ধ্যায় ফিরতো তখন এসব দেখে তার রাগ উঠত। মাঝেমাঝে টেনে ছিঁড়েও ফেলতো। প্রতিদিন সকালে মা এসে ববিকে বিভিন্ন পানি খেতে দিত আর বলতো এতে তার অভিশাপ কেটে যাবে। তার সমকাম দুর হয়ে যাবে। ববি খেত।

যদি মার কথা সত্যি হয়ে যায়। কিন্তু সত্য আর হয় না। দিনগুলো ,মানুষগুলো পাল্টাতে লাগল। ববির কাছে প্রতিটা সময় বিরক্তকর মনে হতে লাগল। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হতো ট্রেনের নিচে নিজেকে সঁপে দিতে। কিন্তু ঈশ্বর বলেন আত্মহত্যা পাপ। হায় ঈশ্বর! তাকে সমকামীও বানালে আবার আত্মহত্যা পাপও করলে। ববি না পারছে সমকাম থেকে বের হতে না পারছে, দুনিয়া থেকে বের হতে। কষ্টের আবেগ আর অনুভুতিত তাকে আটকে দিলে। এটা কোন অভিশাপ ঈশ্বর! এই বলে বলে ববি প্রায় কাঁদতো। ঐদিন গীর্জাতে গেল ববি। সাথে হেলেন আর তার স্বামী। সেখানে যাজক ববির উদ্দ্যশ্যে সমকামীরা যে ঈশ্বরের কত বড় অভিশপ্ত সেই আলোচনা করল।

ববি আজ কাঁদেনি, চলেও যায়নি। বসে থেকে শুনেছে। যাজকের প্রতিটা শব্দ, কথা যেন তার কাছে তীরের ফলার মতো মনে হতে লাগল। তার শরীর থেকে যেন চামড়া কেটে কেটে তুলা হচ্ছে। বাসায় ফেরার পর ববির মা খুব কাঁদলো। বাবা রাগ করে মান সম্মান হারানোর আগে গে ছেলেকে বাড়ি থেকে বের করতে বললো। কোনো এক আত্মীয়া সেখানে ছিল সে আরো কুরুচিপূর্ণ উক্তি করল। হেলেন কিছু বলল না, মেথিও না। আলব্রেডও হয়তো কাঁদছিল। ববি সব শুনছিল। আজ তার কাছে পৃথিবীটা খুব বিরক্তকর লাগছিল। খুব কষ্ট হচ্ছিল তার কাছে। তার জন্যে আজ এতো সুখি পরিবারটা ভেঙে গেল। সে রুম থেকে দৌড়ে বের হয়ে ছুটল রেল স্টেশনের দিকে। সোজা দাঁড়ালো রেলপথের সামনে। ববি জানে সে সমকামী। ঈশ্বর তাকে ঘৃণা করে। সে যদি আজীবন ঈশ্বরের পূজা করে তবুও সে নরকেই যাবে। আর যদি আত্মহত্যা করে তারপরও নরক। বেঁচে থেকে কষ্ট পেয়ে আর অন্যকে কষ্ট দিয়ে কি লাভ? ববি দাঁড়ালো ট্রেনের মুখমোখী। তার দু’চোখ বন্ধ। চোখ থেকে অশ্রু ঝড়ছে। ঈশ্বরের অভিশপ্ত কিশোর ববি কাঁদছে তাতে ঈশ্বরের কিছু আসে যায় না কারন ঈশ্বর মহান ধার্মিকদের জন্য। ববির মতো সমকামীদের জন্য না। ববির গাল থেকে জল ঝড়ছে আর ট্রেন ঝকঝক শব্দে এগিয়ে আসছে তাকে চাপা দিতে। ঝকঝক ঝকঝক ঝক…… শেষ।

ববিকে ট্রেনটা চাপা দিলো। ঝকঝক ঝকঝক শব্দ করে রক্তপিপাসুকের মতো চলে গেল। আর রেলপথে পড়ে রইল ববির ছিন্নবিন্ন মৃতদেহ। হায়রে ধর্ম আর সমাজ! বাঁচতে দিলো না একটা কিশোর ছেলেকে। তার একটাই দোষ আর তা হচ্ছে সে সমকামী। আজ তার জন্যে আমরা প্রার্থনা করবো না। প্রার্থনায় তার কিছু আসে যায় না। সে মরে গিয়ে বেঁচে গেছে আর আমরা যারা বেঁচে আছি তারা রোজ মরছি। অনেকের শরীরে পঁচনও ধরে গেছে। আজ তার জন্যে আমরা প্রার্থনাও করতে পারবো না। কারন সে গে। আজ যদি তার জন্যে প্রার্থনা করি তবে তা হবে নিষিদ্ধ। ববি মৃত্যুর পর যদিও তার পরিবার তাদের ভুল বোঝতে পারে কিন্তু সে তো আর ফিরেনি। যে খাতাটাই সে রেলপথে বসে লিখতো তার সমগ্রটা জুড়ে একটাই লেখা, হায় ঈশ্বর! আমি তোমাকে ঘৃনা করি। যেমন তুমি ঘৃনা করো আমাকে।

লেখকঃ আরভান

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.