অন্য মনের গল্প

১।
প্রতিদিন ভাবি ছুটির দিনে নাকে তেল দিয়ে ঘুম দিব। আদতে তা আর হয়ে উঠেনা।
ছুটির দিনের সকালগুলি যেন অন্য রূপে ধরা দেয়। আজও তার ব্যতিক্রম হলনা।
সকাল থেকেই আকাশটা মেঘে ভারী হয়ে আছে। এই মেঘলা দিনেও আমার ঘুম ভাঙ্গানোর জন্য প্রভাতের রবির কিরণ যেন মেঘেদের দল এড়িয়ে জানালার পর্দার ফাঁক গলে আমার চোখে এসে পড়ছে। সূর্যের আলো পড়তেই আমার চোখ দুটো পিটপিট করতে লাগলো।
ঘুম থেকে উঠার জন্য আড়মোড়া দিচ্ছি আর এমন সময় কানে আসলো যূথীর মিষ্টি কন্ঠের গানের সুর। বিয়ের পর থেকেই দেখে আসছি প্রতিদিন সকালেই যূথী নাশতা বানানোর সময় গলা ছেড়ে গান করে। সত্যি তার গানের গলা অসাধারণ।
যূথী মনের সুখে আমারো পরান যাহা চায় তুমি তাই- গানটি গাইছে। যূথীর গলায় রবীন্দ্র সংগীত শুনতে বেশ ভাল। মাঝে মাঝে মনে হয়, রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর বুঝি যূথীর কন্ঠ আগেই আন্দাজ করতে পেরেছিলেন বলে এমন সব অমর সৃষ্টি দিয়ে গেছেন।
ছুটির দিনে সকাল সকাল যূথীর কন্ঠে গান শুনে উঠাও এখন আমার এক ধরনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
আমি বিছানা ছেড়ে গুটি পায়ে রান্না ঘরের দিকে গেলাম। যূথীকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে ওর ঘাড়ে মুখ রাখলাম।
এই কি করছো এসব? বলেই ময়দা সমেত হাত দিয়ে যূথী আমার মুখ সরালো।
আমাকে দেখে যূথীর হাহা হাসি দেখেই বুঝে গেলাম যে যূথীর হাতে লেগে থাকা ময়দার কাই ততক্ষণে আমার মুখে লেগে গেছে।
আমি কপট অভিমান দেখিয়ে বললাম, কি হল এটা?
যূথী হাসি ধরে বলে, বেশ ভাল হয়েছে। সকালে কেউ বাসি মুখে এমন করে?
আমি তাই বলে যূথীর কাছে এগিয়ে যেতে লাগলাম।
আমি যূথীর কাছে যেতেই বললো, তিলাত, তালহা দেখলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।
সর্বনাশের কি আছে? তাদের বাবাই তো তার মা কে আদর করবে, তাই না?
তৌহিইইইদ। তুমি দিনে দিনে বেশ দুষ্ট হয়ে যাচ্ছ।
বাহ রে! বৌরে আদর করলে বুঝি দুষ্ট হয়ে যায়?
তিলাতের নুপুরের রুমুঝুম শব্দ কানে আসতেই যূথীর থেকে সরে এসে বললাম, বাহ! আমার মেয়েটা এখন সকাল সকাল নাচের প্র্যাকটিস করছে।
যূথী দুষ্টু হাসি দিয়ে বলে, ওর স্কুলে বৈশাখের অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের মেয়ে এই গানের সাথে নাচ পরিবেশন করবে। তাই হয়ত প্র্যাকটিস করছে।
তিলাতের স্কুলের অনুষ্ঠান কবে?
আগামীকাল বৈশাখের প্রথম প্রহরে।
কালকেই পহেলা বৈশাখ?
এ কেমন প্রশ্ন করলে?
অবাক হচ্ছো কেন? বাংলা মাসের হিসাব কি আর আমি রাখি। কাল বাদে পরশু দিনই ভুলে যাব বাংলা মাসের হিসাব। এখন তো মাঝে মধ্যে ইংরেজি মাসের দিন তারিখও ভুলে যাই।
বুঝেছি। বয়সের ভারে বুড়ো হয়ে যাচ্ছ।
হুম। ৪২ চলছে। জীবনের তিনভাগের দুইভাগই শেষ। বাকি আছে আর একভাগ মাত্র।
জীবনের ঐ একভাগও কি এমন রোবটের মত দিন পার করবে?
কি আর করার আছে বলো?
যূথী অনেকটা আক্ষেপ নিয়ে বললো, তাইতো। জানো, আমার খুব ইচ্ছে করে তোমাকে নিয়ে পাহাড়ে যেতে। সেখানে সূর্যাস্ত দেখবো, দেখবো সকালের মেঘ ভেদ করে সূর্যের আলোর জেগে উঠা। সে সময় আমি তোমার কাঁধে মাথা ঠেস দিয়ে সকালের মিষ্টি বাতাস উপভোগ করবো আর গলা ছেড়ে গাইবো, কতবার ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া, তোমার চরণে দিব হৃদয় খুলিয়া।
যূথীর বলে যাওয়া কথা আমি তন্ময় হয়ে শুনছি আর ভাবছি, এত সুন্দর করে ভালোবাসা মিশিয়ে কেউ কাউকে নিয়ে কি করে ভাবতে পারে? আমি কেন এমন করে ভাবতে পারিনা?

২।
যূথী, তিলাত আর তালহাকে নিয়ে বৈশাখের কিছু কেনাকাটা করতে বসুন্ধরা সিটিতে গেলাম।
কেনাকাটায় আমার তেমন ধৈর্য্য নেই। এক দোকানে কিছু পছন্দ হলে সেটা কিনে নেই, অন্য দোকান ঘুরে দেখে আর যাচাই করিনা। কিন্তু, যূথী ঠিক তার ব্যাতিক্রম। দশ দোকান ঘুরে দেখে তারপর বাছাই করে কিনবে। এত ধৈর্য্য যে সে কোথায় পায় তা বুঝে পাইনা।
যূথী দেশীদশের দেশালে গৃহস্থালি কিছু জিনিস দেখছে। তিলাত আর তালহা মিলে তাদের মা কে জিনিস পছন্দ করতে সাহায্য করছে। যূথীও যেন তাদের পছন্দকে সম্মান দেখাচ্ছে। মা বলেই অবলীলায় সে তিলাত আর তালহার পছন্দের গুরুত্ব দিচ্ছে। অথচ, আমি যদি সেই একই জিনিস পছন্দ করতাম তাহলে হয়ত যূথী সেটা দশবার ভাবতো।
যূথীর সময় লাগবে ভেবে আমি দেশীদশ থেকে বের হয়ে ফ্রিল্যান্ডে গেলাম। সেখানে ব্লু কালারের মধ্যে সূঁতার কাজ করা একটা পাঞ্জাবী পছন্দ হল।
সচরাচর আমি এখন এমন কালারফুল পাঞ্জাবী পড়িনা। কিন্তু পাঞ্জাবীটা দেখে মনে হল এটা রূপস কে বেশ মানাবে।
রূপস আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসাবে আমাদের অফিসে চাকরী করে। রূপস যেমন মেধাবী তেমন কর্মঠ। ওর কর্মদক্ষতার গুণেই যেন আমি বিক্রয় ও বিপণন বিভাগের প্রধান হিসাবে সফলতার সহিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। রূপস আমাদের অফিসে যেদিন থেকে কাজে যোগ দিয়েছে তার পর থেকেই যেন আমি অনেকটাই নির্ভার থাকতে পারছি।
পাঞ্জাবীটা কিনে দেশীদশের কাছে যেতেই দেখি তিলাত আর তালহাকে নিয়ে যূথী আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
আমার হাতে থাকা পাঞ্জাবীর প্যাকেট দেখে যূথী বলে কি ওটা?
ফ্রিল্যান্ড থেকে একটা পাঞ্জাবী কিনলাম।
যূথী আমার হাত থেকে পাঞ্জাবীর প্যাকেটটা নিয়ে পাঞ্জাবীটা দেখে বললো, তুমি তো এমন রঙিন পাঞ্জাবী পড়োনা।
আমি স্মিত হেসে বললাম, পাঞ্জাবীটা আমার জন্য না, রূপসের জন্য কিনেছি।
যূথী ভ্রূ দুটি কুঁচকে বললো, কোন রূপস?
তুমি রূপসকে চিনবেনা। ও আমার অফিসেই কাজ করে। ছেলেটা আসার পর থেকেই আমি এখন অনেক রিল্যাক্স মুডে কাজ করতে পারি। ছেলেটা এমনই পাগল যে ও অফিসে সকালে আমাকে নিজের হাতে কফি বানিয়ে দিবে, দুপুরে খাবারের সময় হলে আমাকে খাওয়ার জন্য তাড়া দিতে থাকবে। ও আমার একনিষ্ঠ ভক্ত বলে অফিসের আর সবাই আমাকে এক প্রকার হিংসাই করে। আমাদের অপারেশন ম্যানেজার জসিম সাহেব তো রূপসকে আমার অফিসিয়াল বউ বলে কটাক্ষ করে।
আমি কথাগুলো বলে যাচ্ছি আর যূথী আমার দিকে কেমন যেন ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে।
আমি যূথীর চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকা দেখে বললাম, এমন করে তাকিয়ে থেকে কি ভাবছো?
কিছুনা বলে যূথী আরো বলতে লাগলো, কাল তো পহেলা বৈশাখ। তোমার অফিসিয়াল বউকে তো পাঞ্জাবীটা আজকেই দেওয়া দরকার।
যূথী, তুমিও দেখছি জসিম সাহেবের মত বলতে শুরু করে দিয়েছো। ভাবছি রূপসের বাসার সামনে গিয়ে ফোন দিয়ে পাঞ্জাবীটা দিব। আমি নিশ্চিত ও আমাকে দেখলে ভূত দেখার মত চমকে যাবে।
আমার কথা শুনে যূথী একটা রহস্যের হাসি দিয়ে বললো, আচ্ছা। রূপস তোমার এত যত্ন করে কেন?
আমি ঝটপট উত্তরে বললাম, আমাকে পছন্দ করে বলে।
তোমাকে এত খেয়াল করে বলেই কি তুমি রূপসের জন্য এমন পাঞ্জাবী কিনবে বলে ঠিক করে রেখেছিলে?
কি যে বলোনা। আমি এমন কিছুই ভেবে পাঞ্জাবীটা কিনি নাই। পাঞ্জাবীটা চোখে পড়তেই মনে হল এটা রূপস পড়লে বেশ ভাল লাগবে। তাই কিনলাম আর কি।
যূথী আমার দিকে তাকিয়ে কেমন যেন একটা রহস্যজনক স্মিত হাসি দিল। যে হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে অনেক না বলা কথা।

৩।
ভেবেছিলাম যূথীদের বাসায় ড্রপ করে আমি রূপসকে পাঞ্জাবীটা দিতে যাব।
কিন্তু যূথীও আমার সাথে যাবে বায়না করায় ওকে সাথে নিয়ে মোহাম্মদপুর টাউন হলের দিকে রূপসের বাসার সামনে গেলাম।
আমার ফোন পেয়ে রূপস যেন বিদ্যুৎ বেগে ছুটে আসলো।
রূপস আমাকে সালাম দিয়ে বললো, স্যার আপনি এখানে!
আমি সালামের উত্তর নিয়ে বললাম, আমি একা আসিনাই, সাথে তোমার ভাবীও আছে।
যূথীকে রূপস সালাম দিয়ে ম্যাডাম বলে সম্বোধন করতেই যূথী বললো, ম্যাডাম না, ভাবী বলুন। আপনার কথা অনেক শুনেছি। আপনার স্যারের খুব যত্ন নিন আপনি।
রূপস কিছুটা লজ্জা পেয়ে বললো, ভাবী যে কি বলেন না। ওটাকে যত্ন নেওয়া বলে নাকি?
তাহলে কি বলে?
যূথীর করা প্রশ্নে রূপস চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো।
আমি গাড়ি থেকে রূপসের জন্য কেনা পাঞ্জাবীর প্যাকেটটা রূপসের হাতে দিলাম।
রূপস কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞাস করলো কি এটা?
যূথী উত্তরে বললো, আপনার বৈশাখের উপহার। আপনার স্যার আপনার কথা ভেবে পাঞ্জাবীটা কিনেছেন।
আমার থেকে উপহার পেয়ে যে রূপস অসম্ভব খুশী হয়েছে তা তার চোখ মুখে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।
নিজের বাঁধভাঙ্গা আনন্দকে নিয়ন্ত্রণ করে রূপস বললো, আপনারা কি বাইরেই থাকবেন। বাসায় আসুন।
আমি রূপসের কাঁধে হাত রেখে বললাম, আজ আর না। অন্য একদিন।
রূপস অনেক জোর করলেও আমরা চলে আসি।
আমি গাড়ি ড্রাইভ করছি আর আমার পাশে যূথী চুপ করে বসে আছে।
যূথী হঠাৎ নীরবতা ভেঙ্গে বললো, তোমার উপহার পেয়ে রূপসের চোখে খুশীতে প্রায় পানি চলে এসেছিল।
তুমি দেখছি রূপসের এ টু জেড খেয়াল করেছো।
হুম। জানো? পছন্দ থেকেই কিন্তু ভালোবাসার সূত্রপাত হয়।
আমি কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বললাম, কি সব আজেবাজে বলছো।
যূথী একবুক দীর্ঘশাস ফেলল। যূথীর এই দীর্ঘশ্বাসটা আমাকে জানান দিল যূথীর অন্য মনের আশঙ্কার যতসব না বলা কথা।

৪।
মেয়েরা যে কখনো তার স্বামী সন্তানের অধিকারে অন্য কারো ভাগ সহ্য করতে পারেনা তা আমার কাছ থেকে রূপসের কথা জানার পর থেকেই যূথীর কথা বার্তা, আচরণে তা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। এখন বেশ ভাল বুঝতে পারছি, সৃষ্টিকর্তা মনে হয় মেয়ে জাতিকে পুরুষ জাতি থেকে ভিন্ন মাটি দিয়েই গড়েছেন।
মাঝে মাঝে ভেবে আঁতকে উঠি রূপস যদি রূপস না হয়ে রূপসা হতো! তাহলে যূথী আর কি কি করতো তা উপর ওয়ালাই ভাল জানেন।
পহেলা বৈশাখে তিলাত যখন তার স্কুলের অনুষ্ঠানে পারফর্ম করছিলো তখন যূথী হঠাৎ করেই আমাকে বলে উঠলো, আমাকে একজোড়া নূপুর কিনে দিয়ে তো।
যূথীর এমন আবদার শুনে আমি রীতিমত ভড়কে গেলাম। অবাক বিস্ময়ে যূথীকে প্রশ্ন করলাম, নূপুর দিয়ে তুমি কি করবে?
যূথী লাজুক হেসে বলে, বাংলাদেশের মেয়েরে তুই গানের সাথে বুঝি আমাকে নাচতে দেখতে ইচ্ছে করেনা?
যূথীর কথা শুনে মনে মনে বললাম, এও কি সম্ভব?
যূথীর করা প্রশ্নের উত্তরে কি বলবো বুঝে পাচ্ছিলাম না। যূথীর দিকে তাকিয়ে শুধু মিটমিট করে হাসলাম।
আমার এই মিটমিট হাসিতেই দেখলাম যূথী তার ভরসা খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
আমার থেকে নিশ্চয়তা চাচ্ছে যেন তার আর তিলাত এবং তালহার মাঝে যেন কেউ না আসে।
যূথী খুব ভাল করেই জানে তিলাত আর তালহা আমার প্রাণ। ওরা দুজনেই এখন আমার পৃথিবী।
আমি নিজ চোখে কখনো এঞ্জেল দেখিনি ঠিকই, তবে যখনই তিলাত আর তালহার মুখপানে তাকাই মনে হয় দুটি এঞ্জেল আমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে।
পুরুষ মানুষের প্রকৃত পূর্ণতা আসে বাবা হওয়ার মাধ্যমে। তিলাত আর তালহার বাবা হওয়ার মাধ্যমে সেই পূর্ণতা আমি খুব ভাল করেই পেয়েছি।
তারপরও এর চেয়ে বড় নিশ্চয়তা যূথী আমার কাছে কি করে চায়?

৫।
যূথীর অমূলক সন্দেহের কারণেই আমি যথাসম্ভব রূপসকে এড়িয়ে চলা শুরু করেছি।
রূপসও হয়ত ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরেছে। তাই হয়ত গত দুইদিন যাবত সকালে অফিসে আসার পর থেকে সে আমার জন্য আর নিজ হাতে কফি বানিয়ে আনেনা। লাঞ্চের সময়েও আর খাবারের জন্য তাড়া করেনা। আমার আগেই সে লাঞ্চ করে নিচ্ছে।
সত্যি বলতে, এই বিষয়গুলা আমার কাছে অভ্যাসের মত হয়ে গিয়েছে। তাই সকালে যখন আমার জন্য পিয়নের হাতে কফিমগ দেখি, কিংবা দুপুরের খাবারের টেবিলে রূপসকে না দেখি তখন এক অস্ফুট যন্ত্রণা আমাকে গ্রাস করে।
আমার প্রতি রূপসের এত আগ্রহ শুধুই যে ভাল লাগার ছিলনা তা আমি এখন অফিসের কাজে রূপসকে নিয়ে সিলেটে এসে বেশ ভালই বুঝতে পেরেছি।
আমার ল্যাপটপ নষ্ট হওয়াতে আমি রূপসের ল্যাপটপ নিয়ে আমার রুমে কাজ করতে গিয়ে বিষয়টা জানতে পারি।
রূপসের ল্যাপটপে না বলা যত কথা নামে ফোল্ডার দেখে তা পড়ার এক আগ্রহ বোধ করতে লাগলাম। ফোল্ডারটি ছিল রূপসের ডিজিটাল ডায়েরী। তার জীবনের নানান ঘটনা সেখানে দিন তারিখ সন উল্লেখ করে লেখা। আমি স্ক্রল করে আমার সাথে রিলেটেড কয়েকটা পাতা পড়তে লাগলাম।

৩মে, ২০১৭।
আজ আইডিএলসি তে আমার প্রথম দিন। প্রথম দিন সকলের ভাল যায়। কিন্তু আমার মোটেও ভাল হয়নি। প্রপোজালের সামান্য ভুলের কারণে খারুস বসটা আমাকে ঝাড়লো। আল্লাহই জানে এই খারুসের কাছে কত বকা খাইতে হবে?

৭মে, ২০১৭।
আজকের দিনটা ছিল মিরাকলে ভরপুর। যেটা আমি ভাবিনি কখনো সেটাই হয়েছে। যাকে আমি খারুস ভাবতাম সেই কিটিকিটে বস কিনা দুটি কফিমগ হাতে আমার রুমে এসে কফি খেতে খেতে গল্প করলো আর কাজ শিখিয়ে দিল। সত্যি, খারুসটা শুধু বকতেই জানেনা, ভাল কাজ শেখাতেও জানেন। যতটা কিটকিটে স্বভাবের ভেবেছিলাম তা একেবারেই না। অত্যন্ত নরম মনের একজন। এমন নরম মনের মানুষকে তো আর খারুস বলা যায়না।

১০জুলাই, ২০১৭।
আইডিএলসিতে জয়েন করেছি দুইমাস পার হয়ে গেছে। এই দুইমাসে আমার মাঝে এক অদ্ভুত অভ্যাস হয়ে গেছে। অফিস কোন কারণে বন্ধ থাকলেই এখন কেমন যেন ছটফট লাগে। লাগবেনা কেন? অফিস বন্ধ থাকলেই তো আর আমি তাকে দেখতে পাইনা, তার কথা শুনতে পাইনা। সবচেয়ে মিস করি, সকালে যখন কফিমগ হাতে তার রুমে যাই তখন তার গম্ভীর মুখে ঠোঁটের কোণে যে মুচকি হাসিটা ফুটে উঠে সেইটা। তার জন্য আমি এক অদ্ভুত টান অনুভব করতে শুরু করেছি।

৮আগস্ট, ২০১৭।
আজকেই বস প্রথম বারের মত গাড়ি বাদ দিয়ে আমার মোটর বাইকে চড়ে পরিদর্শনে বেড়িয়েছে। বাইকের ক্লাচ চাপার ফলে সে প্রায়ই আমার উপর এসে পড়ছিল। যখনই তার বুক এসে আমার পীঠকে স্পর্শ করেছে তখনই কেমন যেন এক ভাল লাগার তরঙ্গ আমার শরীরে প্রবাহিত হতে শুরু করে দিল। সেই সাথে তার দেহ নিঃসৃত পারফিউমের সুঘ্রাণ আমাকে আরো বেশী মোহিত করছিল। ইচ্ছে করছিল তার বুকের ঘ্রাণ নিয়ে সেটাকে চিহ্নিত করে রাখি, যাতে চোখ বন্ধ করলেও তাকে আমার এতটুকু চিনতে কষ্ট না হয়।

৩১অক্টোবর, ২০১৭।
আজ তৌহিদের জন্মদিন। তার জন্মদিন মানে বিশেষ দিন। অফিসে কেক কেটে সবাই তাকে উইশ করেছে। আমিও করেছি। আজ আমার খুব করে তাকে বলতে ইচ্ছে করছিল, তুমি কি তোমার নামটা খেয়াল করেছো? তৌহিদ কে ইংরেজীতে বানান করার সময় সিলেবল করে পড়ে দেখ। টি ও মিলে টু, তারপরে ইউ, তারপরে এইচ আই ডি মিলে হিড। বুঝলেনা নিশ্চয়ই। কি করে বুঝবে? মাই লাভ হিড টু ইউ। তোমার নামের মাঝেই যে আমার ভালোবাসা লুকিয়ে আছে।

৭নভেম্বর, ২০১৭।
আজ আমার জন্মদিন। অফিসের আর সবার মত কাজের চাপে তুমিও আমাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে ভুলে গেছ। এর জন্য অনেক বেশী অভিমান হয়েছে ঠিকই কিন্তু রাগ করিনি। তোমার উপর আমি একেবারেই রাগ করতে পারিনা। এতসবের পরেও জন্মদিনের শুভেচ্ছা পেতে তোমার রুমে বারবার গিয়েছি। প্রতিবারই তোমার টাইয়ের নটের দিকে চোখ আটকে গেছে। আজ তুমি ঠিকমত টাইও বেঁধে আসতে পারোনি। ইচ্ছে করছিল তোমার টাইয়ের নটটা ঠিক করে দেই। ইস! যদি কোনদিন তোমার টাই টাও বেঁধে দিতে পারতাম।

১৩এপ্রিল, ২০১৮।
আজ আমার সবচেয়ে আনন্দের দিন। আজ বৈশাখ উপলক্ষ্যে তুমি আমাকে ফ্রিল্যান্ডের পাঞ্জাবী গিফট করেছো। জীবনে অনেক উপহার পেয়েছি। কিন্তু এই উপহারের মত আবেদন কোনটাই জাগাতে পারেনি। সবচেয়ে বেশী ভাল লাগছে এই ভেবে যে, তুমিও আনমনে আমার কথা ভাব দেখে। আচ্ছা, তুমিও কি আমাকে ভালোবাস? খুব বেশী জানতে ইচ্ছা করছে।

৬।
রূপসের না বলা কথার কয়েকটা পাতা পড়ে কেমন যেন আবেগাপ্লুত হয়ে গেলাম।
সেগুলি পড়ার পর থেকেই এক অদৃশ্য যন্ত্রণা আমাকে কাতর করে তুলতে লাগলো।
ভালোবাসার নাকি নিরেট পাথরেও ফুল ফোটানোর ক্ষমতা আছে। তেমনি, রূপসের নিটোল ভালোবাসা আমাকে ক্রমেই আবেগী করে দিতে লাগলো।
হৃদপিন্ডের রক্ত প্রবাহে যেন শীতলতা দেখা দিয়েছে। বুকের বাম পাশে কেমন যেন শিনশিন ভাব অনুভব করতে লাগলাম।
আমার শ্বাস প্রশ্বাসেও কেমন যেন দ্রুততার ছাপ স্পষ্ট দেখতে লাগলাম।
নিজের মনের সাথে যুদ্ধে নেমে গেলাম। রূপসের প্রতি দূর্বল হয়ে যাওয়া মনকে বুঝ দিতে শুরু করে দিলাম। নিজ মনে বলতে লাগলাম, আমি তো পরিপূর্ণ পুরুষ। একজন পুরুষ হয়ে আরেকজন পুরুষের ভালোবাসা গ্রহণ করা আমার মানায় না। এ অন্যায়।
পরক্ষণেই যেন আমার অন্য মন বলছে, রূপস তো তোকে ভালই বেসেছে। অন্যায় তো করেনি? এমন নিষ্কলুষ ভালোবাসা কি তুই পা মারিয়ে যেতে পারবি?
সাথে সাথেই চোখের সম্মুখে শুধু রূপসের অবয়ব ভাসতে শুরু করে দিল।
রূপসের চেহারায় আগে কখনো এমন মায়া দেখিনি। তাকে কখনো এত পবিত্রও মনে হয়নি।
আমার সমস্ত অনুভূতি বলছে রূপসের ভালোবাসার সাগরে হারিয়ে যেতে। এই ভালোবাসার সাগরের টান উপেক্ষা করা আমার জন্য অসম্ভব হয়ে গেছে।
যূথী, তিলাত আর তালহা আমার পৃথিবী, আর রূপস আমার জন্য অক্সিজেন স্বরূপ। বসবাসের জন্য যেমন বাসযোগ্য পৃথিবীর দরকার, তেমনি সেই পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে অক্সিজেনেরও দরকার।

৭।
ক্লায়েন্টের সাথে মিটিং এ যাওয়ার জন্য তৈরী হচ্ছি। টাই টা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি অনেকক্ষণ।
রুম থেকেই রূপস বলে ডাক দিলাম। রূপস আমার এক ডাকেই রুমে চলে আসলো। মনে হল যেন সে বাইরে থেকে আমার ডাকের অপেক্ষাতেই ছিল।
সে আসতেই আমি তাকে অবলীলায় তুমি সম্বোধন করে বললাম, রূপস। আমার টাই টা একটু বেঁধে দিবে।
সে আমার মুখে তুমি ডাক এবং টাই বাঁধার কথা শুনে অবাক হলেও আমার টাই বাঁধাতে অপারগতা দেখালো না।
রূপস এখন আমার সম্মুখে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে টাইয়ের নট বাঁধছে। টাই বাঁধার সময় কখনো সে ঝুকে আমার ঘাড়ে, আবার কখনো কাঁধে হাত রাখছে।
আমার খুব ইচ্ছে করছে তাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরি। আলতো করে কপালে চুমু এঁকে দেই। কানের কাছে গিয়ে আলতো করে বলি, মাই লাভ হিড টু ইউ।
*****

লেখকঃমাসুদ ইসলাম

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.