এলো নতুনের আবাহন

প্রিয় দিদিভাই,

আরেকটি বৈশাখ এসে গেছে তাই না?আসলে পঞ্জিকার খবর রাখিনা বহুদিন। রাখিনা ঠিক তা নয়। রাখা হয়ে উঠে না। চাইলেও পারিনা। কি অবলীলায় সবাই পুরাতন জরা জীর্ণতাকে পেছনে ফেলে নতুন বছর বরণে মেতেছে। আমি যে মেতে উঠতে চাইনা তা তো নয়, কিন্তু চাইলেই কি আর সব পারা যায়? মুখের চাওয়া আর বাস্তবতার ফারাক তো কবিগুরু এভাবেই বলেছিলেন “যত বলি নাই রাতি/মলিন হয়েছে বাতি”

তবে বৈশাখের এই দিনগুলোতে জীবনের চরম সত্যের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনাগুলো এখনো বেশ মনে পড়ে। জানিস দিভাই, এখনো সেই অতীত মনে পড়লে আমি যে কী ভীষণ বিষণ্নতায় ভুগি তা কেবল আমিই জানি।আমি চাইলেই কি আমার অতীত বিসর্জন দিতে পারবো?চেষ্টা তো কিছু কম করিনি। কতটুকুই বা পেরেছি!আমার দ্বিতীয় স্বত্ত্বার কথা যেদিন সবাই জেনে গেল তারপর থেকে কত দিন কত রাত নিজের সাথে যুদ্ধ করেছি তা আর কেউ না জানুক তুই তো জানতি।আজ পুরাতন কথাগুলো বলতে বড্ড বেশিই ইচ্ছে করছে। এই দূর প্রবাসে কথাগুলো বলবার মতো কাউকেই পাইনি বলেই হয়তো বারবার তোকেই এসব বলি। কাউকে নিজের করে পেলে হয়তো তোকে এভাবে জ্বালাতাম কি না কে জানে!তবে এই চিঠির শেষে তোর জন্য একটা চমক অপেক্ষা করছে।

আচ্ছা দিভাই,তোর সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে?আমি সবে কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি। অভির সাথে তখন আমার সম্পর্ক দুবছর ছুই ছুই। সময়ের হিসাবে কম হলেও তা কখনো মনেই হতোনা!একদিন অনেক সাহস করে তোকে বলেই ফেললাম আমি অভিকে কে ভালোবাসি। শুনে তুই যেন আকাশ থেকে পড়েছিলি!আমার সাথে দুদিন মুখ দেখাদেখি পর্যন্ত করলি না।অবশ্য পরে আমায় ডেকে বললি মানুষ হিসেবে একজন মানুষকে ভালো আমি বাসতেই পারি। কিন্তু সমাজ কি বলবে?আমাদের সমাজ,আমাদের ধর্ম এটা কোনোভাবেই তো মেনে নিবেনা। কিন্তু আমি আমার স্বত্তাটাকে কিভাবে এড়িয়ে যাবো সেটা নিয়েও তোর প্রশ্ন ছিল।তোকে শুধু আশ্বস্ত করেছিলাম তুই পাশে থাক,বাকিটা আমি সামলে নিবো।সেদিন থেকে আজ অব্দি তুই আমার পাশে ছিলি, আছিস। আমি বিশ্বাস করি আগামীতেও থাকবি।

সেবার অভিকে বাসায় নিয়ে এসেছিলাম। বাবা কিভাবে কিভাবে যেন সব বুঝে গিয়েছিলেন। মা চলে যাওয়ার পর যে বাবা কোলে পিঠে মানুষ করলেন সেই বাবাই হঠাৎ কেমন যেন বদলে গেলেন।হয়তো তার স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গিয়েছিল বলে,হয়তো আর সবার মত তিনইও বংশ রক্ষার কথা ভেবেছিলেন বলে। ভেবে দেখ কোনোদিন যদি বাবার কথামত কাউকে বিয়ে করতাম তবে কি কখনো সেই মেয়েকে আমি সুখে রাখতে পারতাম বা নিজে সুখী হতাম?দুটি জীবন দুটি পরিবার কিছু স্বপ্ন সব নষ্ট হয়ে যেত না?তুই বাবার সাথে জেদ করে একরকম জোর করেই আমাকে মন্ট্রিলে পাঠিয়ে দিলি। ভালোই যাচ্ছিল নতুন জীবন। অভি তখনও দেশে।দিন দিন ওর পরিবর্তন হচ্ছিলো। ভেবেছিলাম সব ঠিক হয়ে যাবে। আদৌ কিছু তো ঠিক হলই না বরং সব ঘেটে ঘ করে দিয়ে সে অন্যজনের হাত ধরে চলে গেল! সেই প্রথম নিজেকে খুব বড় অভিশপ্ত মনে হয়েছিল।

জীবনে অভিশাপের আরেকটা দিন কবে ছিল জানিস?যেদিন বাবার মৃত্যু হলো অথচ আমি যেতে পারলাম না তাকে শেষ বিদায় দিতে।লোকমুখে শুনেছি তিনি যাবার আগে বলে গিয়েছিলেন আমি যেন তার শেষকৃত্যে না যাই। যদিও তুই ব্যাপারটা লুকিয়ে গেছিস শুধু আমি কষ্ট পাবো ভেবে।

দুঃখ বিলাস তো অনেক হলো,এবার একটু নতুন কথায় আসি।আমার ফেসবুকের প্রোফাইল পিকচারে আমার পাশের যে ছেলেকে দেখছিস ও হলো শিশির। বাংলাদেশ থেকে এখানে এসে সেও বছর চারেক আগে। মনের মিল বলে কোনো জিনিস যদি থেকে থাকা তবে এই ছেলের সাথে আমার ঠিক তাই হয়েছে। আরও মজার ব্যপার কি জানিস ও আমার মতই রাঁধতে ভীষন ভালোবাসে। আমার মতই জীবনে কষ্টের সাগরে ভেলা ভাসিয়েছে। তবে আন্টি মানে ওর মা এখন ওর সবটা মেনে নিয়েছেন। ও আর আমি খুব ভালো বন্ধু।

কিছুদিন আগে যখন এখানে খুবই তুষারপাত হচ্ছিল সেই সময় খুব সকালে সে একগুচ্ছ শ্বেতশুভ্র ফুল তোড়ার ভেতরে আমার ফ্লাটের সামনে একটা চিঠি রেখে যায়। চিঠিটির সারকথা এই যে মনের মিল যেহেতু এতই বেশি মনের মানুষ হতে বাধা কোথায়!কিন্তু জানিসই তো ঘরপোড়া গরুর মত আমিও সিদুরে মেঘেই আজকাল বড্ড ভয় পাই। তাই অকে অনেকটা এড়িয়ে চলা শুরু করেছিলাম। কিন্তু কি জানিস তো যে কদিন ও কে এড়িয়ে গেছি সে কদিনই মনে হয়েছে যেন নিজেকে এড়িয়ে চলছি। তাই বাধ্য হয়েই বল আর প্রেমে পড়েই বল ওকে আমার জীবনে ঠাই দিয়েই দিলাম। ওর পরশ,ওর নিষ্পাপ আলিঙ্গন আমাকে এতটাই আশ্বস্ত করেছে তাতে আমি বুঝে গেছি এই মানুষটাই সেই মানুষ যাকে আমি খুঁজে ফিরেছি জীবনভর।এই মানুষটাই সেই মানুষ যার স্বপ্নে বিভোর হয়ে কাটিয়ে দিয়েছি এতগুলো বসন্ত!যার জন্য গেয়েছি “মোরা আর জনমে হংস মিথুন ছিলাম নদীর চরে!”

ঠিক করেছি দুজন মিলে বাঙ্গালী খাবারের একটা রেস্টুরেন্ট দিব। নামও ঠিক করে ফেলেছি। “কিংশুকে শিশির রান্নাঘর”! আর সবচেয়ে খুশির খবর আগামী মাসে ওড় গ্রাজুয়েশন শেষ হচ্ছে। তারপর আমরা বিয়ে করবো ঠিক করেছি। তোর সেই স্বপ্নের মতই তোর ভাই এবার শেরওয়ানি,নাগড়া,পাগড়ি পড়ে বিয়ে করবে। আর সাথে যে থাকবে তারও গায়ে থাকবে শেরওয়ানি,পায়ে নাগড়া্,মাথায় পাগড়ি আর হ্যাঁ কপালে লম্বা করে লাল তিলক। ভেবেছি বিয়েটা বাঙ্গালী রীতিতে করবো তাই তোকে জিজুসহ কিন্তু আসতেই হবে,এবার আর কোনও অজুহাত দিস না। ১৪২৫ এ এর চেয়ে ভালো উপহার হয়তো আর কিছুই হবে না!

শুরু করেছিলাম কবিগুরূর মলিন বাতির সলতে জ্বালাতে জ্বালাতে। তবে শেষে এসে সেই তাঁর গানের আশ্রয় নিয়েই বলি “মুছে যাক গ্লানি,ঘুচে যাক জরা”। অতীতের জীর্নতা কাটাতে এই নতুন জীবনেও পাশে থাকিস দিদিভাই। আর ওর হাতের রান্না খাওয়ার জন্য হলেও এবার এসে ঘুরে যা।

ইতি
তোরই কিংশুক

লেখকঃ ধূসর পান্ডুলিপি
প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.