অশনি সংকেত

১)

“কিরে সিয়াম উঠ। কত বেলা হইয়া গেলো। আর কত ঘুমাবি তুই। কে জানি তোরে বারবার ফোন দিতাছে।”
আম্মুর চিৎকার চেঁচামিচিতে অগত্যা বিছানা ছেড়ে উঠতেই হলো। ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখি ১০ টার বেশি মিসড কল। ইফাদ ফোন দিচ্ছে। ঘুমের ঘোরে বেমালুম ভুলেই গেছি আজ ওর আমার সাথে দেখা করার কথা। ওকে কল ব্যাক করতেই এক বস্থা গালির ঝুড়ি খুলে দিলো। আমি খালি স্যরি স্যরি বলে যাচ্ছি। অতঃপর ফোন রেখে ফ্রেশ হয়ে তাড়াহুড়ো করে বের হতে যাওয়ার সময় হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলাম। আম্মু জানতো আজ ইফাদের সাথে দেখা করার কথা। আম্মু বললোঃ
-যাওয়ার আগেই বাঁধা পেলি। একটু বসে যা বাবা। তা না হলে অমঙ্গল হবে।
-আম্মু এসব কুসংস্কার ছাড়ো তো। আমার লেট হচ্ছে। আসি।
বলেই বের হয়ে গেলাম। কিন্তু কানে আম্মুর সেই কথাটাই বাজছে। কেননা এর আগে যতবারই আম্মুর কথা অগ্রাহ্য করেছি ততবারই আমার কোন না কোন বিপদ হয়েছে। মনের মধ্যে একটা সংকোচনীয়তা কাজ করছে।
যাইহোক, এবার বলি ইফাদের কথা। ইফাদের সাথে পরিচয় ফেসবুকে। ও আমার ভালো বন্ধু। ওকে আমি আমার ভাইয়ের মত দেখি। ওয় নিজেও তাই দেখে। আর সবচাইতে চমকপ্রদ সত্যি হচ্ছে আমরা দুজনই সমপ্রেমী। আর তাই আমাদের মাঝে বন্ডিংটাও বেশ ভালো। ওর আমার সাথে খুব দেখা করার ইচ্ছা। তাই ওর ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিতেই আজ ওর সাথে দেখা করতে যাওয়া আমার। তাই সব ভয় সংকোচ দূরে রেখে ওর সাথে দেখা করতে যাচ্ছি আজ।

২)

ইফাদের সাথে ওর বয়ফ্রেন্ড আসবে। নাম রাফি। খুব মিস্টি একটা ছেলে। সদরের সবাই এক সাথে দেখা করে যাবো আমার এক ফ্রেন্ডের বাসায়। ফ্রেন্ড ঠিক না। বয়ফ্রেন্ড বলা যায়। তারপর আমরা চারজন মিলে সারারাত আড্ডা দিব, গল্পগুজব করবো। বেশ মজাই হতে চলেছে তবে। অনেক দিন পর ভালো কিছু সময় পার করতে যাচ্ছি।
গাড়ি থেকে নেমেই ইফাদকে ফোন দিলাম। দেখলাম রাফিকে নিয়ে একটা চায়ের দোকান থেকে বের হচ্ছে। দেখেই এসে জড়িয়ে ধরলো। কুশল বিনিময় শেষে আবার চায়ের দোকানে বসলাম। জাহিদ (আমার বয়ফ্রেন্ড) আসবে এখানেই। আপাতত ও কাজে ব্যস্ত আছে। ৩০ মিনিট অপেক্ষা করতে বললো মেসেজ দিয়ে। অপেক্ষা বিষয়টা খুবই বিরক্তের। অন্তত আমার তাইই মনে হয়।
অতঃপর জাহিদ আসলো। আমরা সবাইই পূর্বপরিচিত। তাই আর ওসবের দরকার হলোনা। এদিকে ইফাদের নাকি ক্ষিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। সবাই মিলে রেস্টুরেন্টে ঢুকে লাঞ্চ শেষ করলাম। তারপর সারা বিকেল সদরের ঘুরে বেড়ালাম। বেশ ভালোই লাগছে।

৩)

ইফাদের ইচ্ছে আমরা কোনো এক আবাসিক হোটেলে থাকবো। কিন্তু জাহিদের ইচ্ছে আমরা ওদের বাসায় থাকি। এটা আমারো ইচ্ছে। তাছাড়া আন্টি নাকি বেড়াতে গেছে। জাহিদের ছোট ভাইও বাসায় নেই। আংকেল ব্যবসার কাজে বাইরে।
“খুউউউউউউউউউউব মজা হবে। চলনা ইফাদ” আমি চিৎকার করে উঠলাম। অগত্যা রাজি হতেই হলো ইফাদ কে। রাফি আগে থেকেই রাজি।
অটোতে করে রওনা দিলাম। জাহিদদের বাসা সদর থেকে একটু ভিতরে। গ্রাম্য এলাকা। অদ্ভুত একটা গ্রাম। বলা যায় ভুতুড়ে। সন্ধ্যে হলেই সবাই বাড়িতে চলে আসে। আগেরবার গিয়ে এই ব্যাপার গুলো ভালো করর খেয়াল করেছি। আর জাহিদদের বাসাটাও কিরকম অদ্ভুত রহস্যময়। রাত হলেই একটা থমথমে ভাব হয়ে যায়। আমি কথা গুলা ইফাদকে বলিনি। তাহলে ওকে আর নেওয়াই যাবেনা।
আমাদের পৌছাতে প্রায় ৪.৩০ টা বেজে গেলো। গিয়ে ফ্রেশ হয়ে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়েই ঘুরতে বের হয়ে গেলাম। বের হয়েই শুরু হয়ে গেলো আমাদের দুরন্তপনা। নদীর ঘাটে গিয়ে দুস্টুমি করতে গিয়ে ইফাদকে একটু জন্য জলে ফেলে দিয়েছিলাম। ইফাদ পুরাই আলুর বস্তা। একবার পড়লে আর উঠতে পারবেনা। নৌকায় চড়তে গিয়ে ওকে আমি ভাসিয়েই দিয়েছিলাম। আর ওর সেকি কান্না। তারপর জাহিদ ওকে তীরে এনেছে।
গ্রামের হাইস্কুলের মাঠটা বেশ বড়। ওখানে গিয়ে বাচ্চাদের সাথে কিছুক্ষণ লাফঝাঁপ করলাম। গোল্লাছুট খেললাম। আর সন্ধ্যা নামতেই সবাই বিদায় নিয়ে চলে গেলো। আমরাও চলে এলাম।

৪)

বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে নাশতা করলাম। তারপর বসে কিছুক্ষণ গল্পগুজব করলাম। ইলেক্ট্রিসিটি নেই অনেকক্ষণ ধরে। হঠাত রাফির বায়না সে আবার নদীর ঘাটে যাবে। আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। কারণ এই এলাকার সবচেয়ে ভয়ানক জায়গা ওই নদীর ঘাট। দিনের বেলাতেই কিরকম গা ছমছম করে। আর এই রাতের বেলা…….বাপরে!!!
রাজি না থাকা সত্ত্বেও যেতে হলো। গিয়ে পারে উঠানো বড় একটা ভাঙা নৌকায় বসে আমরা আড্ডা দিচ্ছি। হঠাত জাহিদের একটা ফোন এলো। জাহিদ উঠে চলে গেলো।
দূরে একটা জোনাকিপোকা দেখে ওটা ধরতে আমিও চলে গেলাম। জোনাকিপোকাটার পিছনে পিছনে অনেক দুরেই চলে আসলাম। তবুও ধরতে পারলাম না। হঠাত করেই কোথায় উধাও হয়ে গেলো। আমি খুজছি। হঠাত করেই আমার মনে হলো আমার পিছনে কে জানি দাঁড়িয়ে আছে। পিছন ফিরতেই দেখি কেউ নাই। আবার কিছুক্ষণ পর মনে হলো আমার পাশ কাটিয়ে কে চলে গেলো।।এবার ভয় হতে লাগলো।
দূর থেকে ইফাদের ডাক শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু ভয়ে পা চলছেনা। টর্চ নিয়ে দেখলাম রাফি আসছে আমার দিকে। রাফি আসতেই জাপটে ধরলাম। রাফি জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে। আমি কিছু বললাম না।
গিয়ে দেখি জাহিদ দূরে দাঁড়িয়ে আছে মন খারাপ করে। ইফাদ বললো কি জানি হইছে ওর। আমি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে। সে আমাকে জড়িয়ে ধরেই বললো প্লিজ আমাকে ছেড়ে যেওনা। আমি কিছু না বলেই ওর ঠোট কামড়ে ধরলাম। তারপর পাগলের মত কিস করতে লাগলাম। দূরে দাঁড়িয়ে ইফাদ আর রাফি দেখছে আর হাসছে। লজ্জা পেয়ে জাহিদ দূরে সরে গেলো।

৫)

বাসায় ফিরলাম। ফিরেই সবাই গোসল করলাম। করে খাবার খেলাম। ১১ টা বাজে প্রায়। ইলেক্ট্রিসিটি আসার নাম নেই। পুরো এলাকা কিরকম ঝিম মেরে আছে। এই এলাকায় একটা ভাঙা বাড়ি আছে। সবাই বলে এটাতে ভূত আছে। তাই সহজে কেউ ওখানে যায়না। আমরা প্ল্যান করেছি কাল যাবো সকালে। ভূত খুঁজতে। ভূত খোজার কথা শুনেই ইফাদ কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লো। ভয় পেয়েছে।
শুতে শুতে বারোটা বেজে গেলো। খাটটা বেশ বড়সড়। চারজন খুব সহজেই শুয়ে পড়লাম। আমি আর রাফি রাফি আর ইফাদ দুজন খাটের দুই কিনারায়। আমি আর জাহিদ মাঝখানে।
ঘুম আসছেনা। সবাই চুপ। সব কিছু নিস্তব্ধ। এতটাই যে জাহিদ,রাফির শ্বাসপ্রশ্বাস এর শব্দ শোনা যাচ্ছে। হঠাত করেই জাহিদের শরীর তিনবার কেঁপে উঠলো। আর আমার মনে পড়ে গেলো গতবারের কথা।

জাহিদের শরীরে কিছু একটা এসেছিলো সেবার। ও রুম থেকে বের হয়ে গেছিলো সেবার। সোজা সেই ভাঙা বাড়ির দিকে। আমি আর আন্টি খুব কষ্ট করে আটকেছিলাম ওকে। এবার যদি এরকম কিছু হয়। ভয়ে আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে এলো। আবারো কেঁপে উঠলো জাহিদ। আমি রাফিকে ফিসফিস করে বললাম কথাটা। রাফি বললো চুপ করে দেখো কি হয়। কিন্তু বাগড়া দিলো ইফাদ। জাহিদের কম্পন সেও টের পেয়েছে এবং বারবার জাহিদকে ডেকে জিজ্ঞেস করছে কি হয়েছে ওর। কিছুতেই চুপ করানো যাচ্ছেনা ইফাদকে। আমি রাফি ওকে বারবার নিষেধ করছি। জাহিদও দুইবার অস্ফুটে না করেছে।
ঠিক নয়বারের মাথায় যখন জাহিদের কম্পনে ইফাদ ডেকে উঠলো তখন কে জানি বলে উঠলো তুই থামবি!!!! এটা জাহিদের গলা না। রাফিরও না। কথাটা বলেই জাহিদ ক্ষিপ্রগতিতে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো। ভাগ্য ভালো ছিলো বারান্দা তালা বন্ধ। তাই ও কিছুক্ষণ প্রায় পাগলের মত চিৎকার চেঁচামেচি করলো। আমি ভয়ে রাফিকে শক্ত করে জাপটে ধরেছি। আর আমাকে ইফাদ। কিছুক্ষণ সব ঠান্ডা। শুরু হলো প্রচণ্ড বৃষ্টি। আমি দিব্যি শুনতে পাচ্ছি পাশের রুমে কে কে জানি কাঁদছে। জাহিদ ওই রুমেই। তবে কান্নার আওয়াজ একজনেরটা আসার কথা। দুজন কে কে? ভয়ে আমার হাত পা অবশ হয়ে এলো। এই মুহুর্তে ইলেক্ট্রিসিটি আসলো। ফ্যান আর বৃষ্টির শব্দে কান্নার আওয়াজটা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছেনা। কান্নার সাথে কি কি যেনো বলছে জাহিদ।
আমি ইফাদ কে বললাম ফ্যান অফ করতে। তাহলে সব শুনতে পারবো। কিন্তু ইফাদ যাচ্ছেনা ভয়ে। আমি রাফিকেও ছাড়ছিনা। সমস্ত সূরা কেরাত যেনো মস্তিষ্ক থেকে মুছে গেছে। কিছুই মনে নাই। শুধু আল্লাহ আল্লাহ করছি।
ইলেক্ট্রিসিটি চলে গেলো। বৃষ্টিও থেমে গেছে। এবার কান্নার আওয়াজ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি।
“আম্মু! আম্ম গো!! আমাকে বাঁচাও। রাফিরে (জাহিদের ছোট ভাউয়ের নামও রাফি) আমারে নিয়া যা। আবার কে যেন হাসছে।
দুইবার রাফি বলে ডাক দিতেই ইফাদের বয়ফ্রেন্ড শব্দ করে উঠলো। আমি মুখ চেপে ধরে বললাম বাঁচতে চাইলে শব্দ করোনা ভাই আমার।
১০ মিনিট সব সাউন্ড অফ। তবে কি ওটা চলে গেছে? হঠাত করেই মনে হতে লাগলো আমার পায়ের কাছে বসে আছে। আমি আরো শক্ত করে রাফিকে ধরলাম। কিছুক্ষণ পরই বিকট শব্দে জানালা টা খুলে গেলো। আমি শব্দ করতে পারছিনা। আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে ভয়ে। তারপর ধপ করে মাটতে কি একটা পড়ে গেলো। আর এ মুহুর্তে ইলেক্ট্রিসিটিও চলে আসলো।

৬)

জাহিদ মাটিতে পড়ে আছে। ভয়ে কেউ যাচ্ছিনা। ওর হাত পা নাকে মুখে রক্ত লেগে আছে। আস্তে আস্তে উঠলাম সবাই। আমি দেখেই বলে উঠলাম চলে গেছে। রাফি আর আমি জাহিদকে ওয়াশরুমে নিয়ে গিয়ে গোসল করালাম। গোসল করানোর সময় ওর গায়ে কোথাও ক্ষতের চিহ্ন পেলাম না। তবে রক্ত কিসের? জাহিদকে গোসল করিয়ে শুইয়ে দিলাম। জ্ঞান ফিরেনি। যে রুম থেকে কান্না হাসির আওয়াজ আসছিলো সেখানে গেলাম। গিয়ে যা দেখলাম!!!!
জাহিদ কাঁচা মাছ খেয়েছে ফ্রিজ থেকে। পুরো ঘরে আঁশটে গন্ধ। ফ্লোরে রক্ত। সব পরিস্কার করতে করতে ৩ টার উপর বেজে গেলো। ক্লান্ত হয়ে শুতে গেলাম।
চোখটা একটু লেগে আসতেই হঠাত ঘুম ভেঙ্গে গেলো। টিনের চালে কেউ একজন হাটছে। তারপর কিছুক্ষণ সব চুপ। আবার বাসার পিছনে কে জানি ঝাড়ু দিয়ে পরিস্কার করছে……….অতঃপর বিকট এক হাসি। আর কিছু মনে নেই। রাফির কোলে শুয়ে আছি। ইফাদ হাসছে আর বলছে যখন জ্ঞান হারানোর কথা তখন হারাস নি। এই ভোর বেলায় কি দেখে হারালি….!!

লেখকঃ শাফিন রাজ

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.