মনের অসুখ

এক

আমি রবি । খুব ভীতু প্রকৃতির ছেলে। রক্ত দেখলে ভয় পাই। মাকরশা দেখলে ভয়ে কুঁকড়ে যাই। হরর ফিল্ম দেখতে পারি না। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ভয় পাই পাগল মানুষ। ছোট বেলায় এক পাগল মানুষ দৌড়ে এসে আমার হাত কামড়ে দিয়েছিল। তখন থেকেই এই ভয়ের সূচনা।ভয় কে জয় করার মন্ত্র আমার জানা নেই। বন্ধুরা সব সময় আমার এই বিষয় নিয়ে আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। আমার কাজিন দিঠি শুধু মাত্র আমাকে সাহস যোগানোর চেষ্টা করে। জোর করে আমাকে নিয়ে হরর ফিল্ম দেখে। এত ভয়ের পরও আমি কিন্তু একটা সাহসের কাজ করে ফেলেছি। আমি যে সমকামী তা দিঠি কে বলে দিয়েছি। আমি ভয় পেয়েছিলেম দিঠি আবার আম্মু কে বলে দিবে না তো । কিন্তু সে ভয় ছিল অমূলক। কিন্তু সে খুব স্বাভাবিক ভাবে নিয়েছে। এরপর থেকে আমাদের বন্ধুত্বের গভীরতা বেড়েছে। আমার বেস্ট ফ্রেন্ড এখন দিঠি।
আমি ছোটবেলায় নাচ শিখেছি। আমি খুব ভাল নাচতে পারি। কিন্তু নাচ শেখার প্রতি আমার তেমন আগ্রহ ছিল না। আমার ভাল লাগতো ছবি আঁকতে। কিন্তু আব্বু আম্মু আমার আগ্রহের কোন দাম দেয় নাই। তারা চেয়েছে আমি নাচ শিখি। কিন্তু এত বড় হয়ে আমার আর নাচতে ভাল লাগে না। বরং রঙ তুলি নিয়ে ছবি আঁকতেই ভাল লাগে। জানি আমার আঁকা ভাল হয় না। তারপরও আঁকি।আমার ভাল লাগে সব ধরণের চিত্র প্রদর্শনী গুলো তে যেতে। আমি সব সময় পেপারে খেয়াল করি কখন কার চিত্র প্রদর্শনী হয়। আমার যেতেই হবে। আমার খুব ইচ্ছা আমার বাড়ির দেয়াল ভর্তি নানারকম ছবি থাকবে। কিন্তু এসব ছবির যে দাম! আমার সাধ্যের বাইরে।
আমার প্রিয় বর্ষাকাল। বাংলাদেশের বৃষ্টি আমার মতে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য গুলোর একটি। এক মাত্র বৃষ্টি হলেই আমি নাচি। বৃষ্টির গানের সাথে। কখনো “ মন মোর মেঘেরও সঙ্গী” আবার কখনো বা “ পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে” ।বৃষ্টিতে ভিজতেও আমার ভাল লাগে।ছাদে উঠে শিল কুঁড়াতে আরও বেশি মজা। এমনই একটি বৃষ্টির দিনে তার সাথে পরিচয়।
সে চিত্রশিল্পী। শিল্পী অবশ্যই। কিন্তু অখ্যাত। তার নাম আমি জানতামই না। হটাত একদিন পেপারে দেখলাম দৃক গ্যালারি তে রাশেদ জামানের চিত্র প্রদর্শনী হবে। এ আবার কে রে বাবা ! কোন দিন তো নামই শুনি নাই। যাবো না যাবো না করেও এক বৃষ্টি স্নাত সন্ধ্যায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ভাবলাম দেখে আসি নতুন শিল্পী। নতুন দের কেও তো উৎসাহ দিতে হবে তাই না?
গাড়ি নেই। আব্বু গাড়ি নিয়ে কই জানি গিয়েছে। এই বৃষ্টির মাঝেই রিকশা করে বৃষ্টি তে ভিজতে ভিজতে দৃক গ্যালারিতে এসে উপস্থিত হলাম। তেমন দর্শনার্থী নেই। একজন খুব সুদর্শন যুবক বসে আছেন। ৫-১০ উচ্চতা, ফরশা, স্লিম। বুঝলাম ইনি রাশেদ জামান । শিল্পী। আমাকে দেখে হাসি মুখে এগিয়ে আসলেন। কথা হল তার সাথে। তিনি শখের চিত্র শিল্পী। এমনিতে এমবিএ করেছেন। বাবার ব্যবসায় যোগ দিয়েছেন। কিছুক্ষণ কথা বলার পর আমি বললাম
– আমি এখন ছবি দেখবো। কিন্তু একা। আপনি আমার সাথে আসবেন না প্লিজ। আমি একা ছবি দেখতেই পছন্দ করি। এক মনে ছবি দেখি। ছবির ভিতরে প্রবেশ করি। তখন কেউ থাকলে আমি মনোযোগ দিতে পারি না।
– অবশ্যই । আপনি একা দেখুন। আমি আসবো না।
এক মনে আমি ছবি দেখছি। ছবির বিষয় বৃষ্টি। সব কয়টা ছবি বৃষ্টি নিয়ে। আমার প্রিয় বিষয়। ছবি গুলো খুব সুন্দর। দেখে মনেই হয় না কোন অখ্যাত এঁকেছেন ।একটা ছবির সামনে এসে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। ছবিটিতে একটি ছেলে ছাদে শিল কুড়চ্ছে ।আমার কাছে মনে হচ্ছে এটা যেন আমারই ছবি। আমি অনেকক্ষন ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। মনে হচ্ছিল আমি যদি এত সুন্দর ছবি আঁকতে পারতাম। ছবি দেখা শেষ করে রাশেদ কে ধন্যবাদ জানিয়ে যখন বের হলাম তখন মনে হল এতক্ষণ একটা স্বপ্নের রাজ্যে ছিলাম।আমার স্বপ্নের রাজ্য। আমি ছবি দেখতে এতই বিভোর ছিলাম যে কয়টা বাজে তাও খেয়াল করি নাই। আমার জীবনের দেখা শ্রেষ্ঠ ছবি প্রদর্শনী মনে হয় এটাই।
বাসায় গিয়ে রঙ তুলি নিয়ে বসলাম। ছবি আঁকবো বৃষ্টির ছবি। আঁকা শুরু করলাম। কিন্তু মন মত হচ্ছে না।। এক সময় ছবি আঁকায় ইস্তফা দিলাম। আমাকে দিয়ে অমন সুন্দর ছবি আঁকা হবে না।
পরের দিন কেমন যেন ছবি দেখতে ইচ্ছে করছে। আজকেই প্রদর্শনীর শেষ দিন। মনে হল যাই। কিন্তু রাশেদ সাহেব কি মনে করবেন? বার বার তার ছবি দেখতে যাই! আচ্ছা যাই না! কি আর হবে!শেষ পর্যন্ত সব দ্বিধা দূর করে প্রদর্শনী তে গেলাম। আজকেও মানুষের আনাগোনা কম। আমাকে দেখে রাশেদ হেসে এগিয়ে আসলেন।
– আপনি আজকেও এলেন?
– আসলে আপনার আঁকা ছবি গুলো এত সুন্দর যে আবার দেখতে ইচ্ছা করছিল।
– ধন্যবাদ
– না না ধন্যবাদ তো আপনার প্রাপ্য। আপনি ছবি না আঁকলে তো আমার জীবনের এত সুন্দর কিছু সময় পেতাম না।
আমি আবার ছবি দেখছি। একেকটা ছবি দেখছি আর মন্ত্র মুগ্ধের মত তাকিয়ে আছি। আমার প্রিয় ছবিটার সামনে এসে দাঁড়ালাম। ইশ ছবি টা আমার ঘরের দেয়ালে ঝুলাতে পারতাম। কিন্তু নিশ্চয় ছবিটার অনেক দাম হবে।
ছবি দেখা শেষ হল। রাশেদ আমাকে দেখে হেসে বললেন
– কেমন লাগলো ?
– আজকে কালকের থেকেও বেশি ভাল লেগেছে। আমার দেখা শ্রেষ্ঠ প্রদর্শনী এটাই।
– কি যে বলেন। মানুষ ই তো আসে না আমার আঁকা ছবি দেখতে। সেখানে আপনি এত প্রশংসা করছেন।
– মানুষ কেন আসে না জানি না। কিন্তু আমি শুধু শুধু প্রশংসা করি না।
– আচ্ছা আমরা একটা কফিশপে বসে কথা বলতে পারি?
– অবশ্যই কিন্তু আপনার প্রদর্শনী আপনি না থাকলে?
– কিছু হবে না। আমার একজন স্টাফ আছে । সে থাকবে।
আমার ভাল লাগছে। যে এত সুন্দর ছবি আঁকে তার মন টাও নিশ্চয় অনেক সুন্দর হবে। তার সাথে বসে গল্প করতে নিশ্চয় ভাল লাগবে। আমি রাজি হলাম। পাশেই ক্যাফে ম্যাংগো । সেখানে বসলাম। অনেক কথা হল। সবচেয়ে বড় যে ব্যাপারটা হল আমরা বন্ধু হয়ে গেলাম। ফেসবুক, মোবাইল নম্বর আদান প্রদান হল। অন্য রকম একটা আনন্দ নিয়ে বাসায় ফিরলাম। একজন চিত্রশিল্পী এখন আমার বন্ধু। হোক সে অখ্যাত। কিন্তু তার ছবি গুলো তো অসম্ভব সুন্দর।

দুই

রাশেদের সাথে প্রায় প্রতিদিন কথা হয় এখন। ফেসবুকে চ্যাট হয়। খুব গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে আমাদের মাঝে। রাশেদের বাসায় রাশেদ ছাড়া শুধু তার মা আছেন। বাবা মারা গিয়েছেন। আনটির সাথেও আমার সম্পর্ক অনেক ভাল। আমি ছাড়া রাশেদের আর নাকি তেমন বন্ধু নেই।
একদিন রাশেদের বাসায় থাকবো। সারা রাত সিনেমা দেখবো এই পরিকল্পনা। আমি রাশেদের আমন্ত্রণে এক কথায় রাজি হলাম। এমই কেন এক কথায় রাজি হলাম? আমার তো কারো বাসায় থাকতে ইচ্ছা করে না। অনেক অনুরধের পরও অনেক বন্ধুর বাসায় আমি রাতে থাকি নাই। আর রাশেদ একবার বলতেই রাজি হয়ে গেলাম। আমি কি রাশেদের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছি? কিন্তু সেটা কি উচিৎ?রাশেদের ওরিয়েন্টেশন তো আমি জানি না। কিন্তু মাঝে মাঝে তাকে সমকামী বলে সন্দেহ হয় আমাকে। কারণ তার সাথে কথা বলতে গেলে কখনো মেয়েদের কথা উঠে না। আর তার বেশির ভাগ ছবিতেই কোন পুরুষ মানুষ থাকে। কিন্তু তাকে কখনো সরাসরি জিজ্ঞেস করার সাহস পাই নি। কিন্তু এইবার ভাবছি আমি আমার ওরিয়েন্টেশন বলেই দিবো। এত বড় মিথ্যা গোপন করবো না। সে যদি সত্যিকার বন্ধু হয় আমার তাহলে সে এইভাবেই এক্সেপ্ট করবে আমাকে।
আসলো সেই আকাঙ্ক্ষিত রাত। ডিনার করে রাশেদের ঘরে চলে গেলাম। রাশেদের ঘর টা খুব সুন্দর । পরিপাটি করে সাজানো। প্রথমে দেখলাম হিচককের রেবেকা। তারপর কিছুক্ষণ ব্রেক।নানা বিষয় নিয়ে কথা বলছি আমরা। একপর্যায় আমি ভাবলাম এখন বলে দেই আমার ওরিয়েন্টেশনের কথা। আমি বললাম
– রাশেদ তোমার সাথে কিছু কথা ছিল।
– আমারও কিছু কথা ছিল
– তাহলে কি তুমি আগে বলবে?
– না না তুমি আগে বল
– না তুমি বল
– আচ্ছা । শোন আমি এই কথা গুলো বলার পর হয়তো তুমি আর আমার সাথে কথাই বলবে না। তারপরও আমাকে বলতে হবে। আমি এই ভার আর নিতে পারছি না।
– কি এমন কথা
– বলছি। শোন রবি আমি স্বাভাবিক না। আমি মেল হোমসেক্সুয়াল। আর আমি তোমাকে ভালবাসি ।
আমি কেমন তব্ধা মেরে গেলাম। একে তো হোমসেক্সুয়াল তার উপর আমাকে ভালবাসে। আচ্ছা আমি কি রাশেদ কে ভালবাসি। এই কথা গুলো শোনার পর আমার কেমন জানি খুব ভাল লাগছে। তাহলে আমি নিশ্চয় রাশেদ কে ভালবাসি। আমি কিছু বলার আগেই রাশেদ বলল
– আমি জানতাম তুমি কথা গুলো শুনলে শকড হবে। কিন্তু আমার না বলে কোন উপায় ছিল না। তুমি যে আমার সাথে আর বন্ধুত্ব রাখবে না তাও বুঝতে পারছি।
– খুব বুঝেছও। বুঝে আমাকে উদ্ধার করেছো। আমিও তোমাকে ভালবাসি গাধা।
এরপর আর সিনেমা দেখা হল না। সারা রাত আমরা ভালবাসলাম একজন আরেকজন কে। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছিলো।

তিন

সেইদিন জানলাম আরেক সত্যি। ভোর রাতের দিকে হটাত করে রাশেদ বলল
– রবি শোন আমার একটা কথা তোমাকে বলা হয় নাই। আমার মনে হয় এই কথা টা শোনার পর তুমি আমাকে আর ভালবাসবে না।
– কি এমন কথা?
– আমি মানসিক রোগী। বাইপোলার মুড ডিসঅরডারের রোগী
মানসিক রোগী মানে কি পাগল? আরে কি ভাবছি ! ওর মাঝে তো পাগলামির কোন লক্ষণই নাই।
– কি রোগ এটা?
– আমি কখনো খুব বিষণ্ণ থাকতাম। কখনো খুব রেগে যেতাম।এই রেগে যাওয়া টা কে ম্যানিক ফেস বলে। কিন্তু এখন ওষুধ খাবার পর স্বাভাবিক আছি।
– তাহলে সমস্যা কি?
– কথা হচ্ছে আমার সারা জীবন ওষুধ খেতে হবে।
– তাহলে ভাল থাকবা তো ?
– হ্যাঁ। কিন্তু তুমি বুঝতে পারছো না। আমার ম্যানিক ফেস টা খুব ভয়াবহ।
– আরে বাদ দাও তো ! তোমার মত শান্ত ছেলে আর কত ভয়াবহ হবে।
আমি পাত্তা দিলাম না। কারন তাকে এতদিনে কোন দিনই মানসিক রোগী মনে হয় নাই। আর সে হবে ভয়াবহ ? ওর মত শান্ত , নম্র , ভদ্র ছেলে আমি এই পর্যন্ত দেখি নাই।

চার

আমরা হানিমুনে এসেছি। কক্সেসবাজার। পাঁচ দিন থাকার পরিকল্পনা। প্রথমদিন কক্সেসবাজার পৌঁছে আমরা সায়মন হোটেলে উঠলাম। বিচ সাইড রুম নিয়েছি। রুম থেকেই সমুদ্র দেখা যায়। প্রথমদিন সন্ধায় কক্সেসবাজার পৌঁছেছি। তাই আর বিচে গেলাম না। রুমেই কাটালাম। সারাটা সন্ধ্যা একজন আরেকজন কে ভালবাসলাম। সন্ধ্যার দিকে বের হলাম ডিনার করতে। কাছেই একটা ভাল রেস্টুরেন্ট আছে। ডিনার করে যখন বের হব তখন রাশেদ বলল
– রবি একটা ভুল হয়ে গিয়েছে
– কি?
– আমি তো ওষুধ গুলো আনতে ভুলে গিয়েছি
– কি বল!
– প্রেসক্রিপশন ছাড়া এই ওষুধ গুলো কোন ফার্মেসি বিক্রি করবে না।
– তাহলে?
– থাক! এত চিন্তা কর না। মাত্র তো ৪-৫ দিনের ব্যাপার। এ কয়দিন ওষুধ না খেলেও হবে। আর এখন তো তুমি আমার ওষুধ।
আমার কাছেও মনে হল ও তো স্বাভাবিক আছে। ৪-৫ দিন ওষুধ না খেলে কি হবে? আর এইসব মানসিক রোগ আমার বিশ্বাস হয় না। সাইক্রিয়াটিস্ট রা এসব ওষুধ খাইয়ে মানুষ কে আরও পাগল বানিয়ে ছাড়ে। আমার কথাই সত্য প্রমাণিত হল। সারা রাত আমরা ভালবাসলাম। গল্প করলাম। ও কথা দিল আমার পোট্রেট করে দিবে। ভোরের দিকে আমরা ঘুমালাম।
ঘুম থেকে উঠতে দেরি হল আমার। আমি ঘুম থেকে উঠেই দেখি রাশেদ গোসল করে রেডি হয়ে বসে আছে। নাস্তা করে আমাকে নিয়ে বিচে যাবে।
– কি ব্যাপার? কখন উঠলে ? আমাকে ডাকো নাই কেন?
– আরে তোমার ঘুম ভাঙাতে চাই নাই। তোমার কষ্ট হবে। আমার কেন জানি ঘুমই হল না। নতুন জায়গায় অবশ্য আমার ঘুমাতে একটু সমস্যা হয়।
– না ঘুমিয়ে এখন বিচে যাবে? আর এরপর থেকে আমার কষ্টের কথা ভাববে না। তোমার ঘুম ভাঙলে আমাকেও ডেকে তুলবে ।
– আমার একটুও ক্লান্ত লাগছে না। আমি একদম ঠিকঠাক। বিচে যেতে পারবো । আর তোমাকে এরপর থেকে ঘুম থেকে টেনে তুলবো ।
আমরা নাস্তা করে বিচে গেলাম। সারাদিন বিচে কাটালাম। সূর্যাস্ত দেখলাম। আমার প্রথম তাকে কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হল। ও সাধারণের তুলনায় অনেক বেশি কথা বলছে। ওর ক্লান্ত লাগার কথা। অথচ ওর গায়ে অনেক প্রাণ শক্তি ভর করেছে যেন। তাও আমার কাছে কোন সন্দেহ লাগলো না। কিন্তু ও যখন আমাকে মাঝ রাতে ঘুম থেকে ডেকে তুলে বলল যে তার ঘুম আসছে না। বিচে যেতে ইচ্ছা করছে তখন বুঝলাম ওষুধ না আনা তে তার সমস্যা হচ্ছে। এবং এর পরের কয়েকটা দিন আমার জীবনের বিভীষিকাময় দিন। প্রথমে অতটা বুঝি নাই। তাহলে তখুনি ওকে নিয়ে ঢাকা ফিরে যেতাম। ধীরে ধীরে ও কেমন জানি অদ্ভুত আচরণ শুরু করলো। অস্বাভাবিক রকম কথা বলা শুরু করলো। এত কথা মনে হয় এই ২ মাসেও বলে নাই সে। রাতে ঘুমাতে চায় না। একটু ঘুমাতেই ঘুম ভেঙ্গে যায়। তারপর সারা রাত পায়চারী করে। তারপর শুরু হলে উত্তেজিত হয়ে যাওয়া। আমার সামান্য দেরি , সামান্য ভুলে সে উত্তেজিত হয়ে যায়। বিশ্রী রকম ঝগড়া হতে লাগলো তার সাথে। আমি প্রথমে বুঝি নাই যে এগুলো ওষুধ না খাবার জন্য হচ্ছে। আমার মনে হতে লাগলো সে বুঝি এমনি। এতদিনে তার আসল চেহারা আমি দেখতে পাচ্ছি। এক সাথে থাকতে গেলেই মানুষ কে চেনা যায়। কিন্তু আমার ভুল ভাঙলো শেষ রাতের দিন। সামান্য কথা কাটাকাটি তে সে এত উত্তেজিত হয়ে গেল যে টেবিলের উপর গ্লাস ছুঁড়ে মেরে ভেঙ্গে ফেললো। আমাকে প্রায় মারতে যায় এমন অবস্থা। আর বিশ্রী ভাষায় গালিগালাজ।তুই তোকারিও করছে। আমি ভয় পেয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলাম।আমি তখন প্রথম অনুধাবন করলাম সে অসুস্থ। আমি ফোন দিলাম আন্টি কে।আন্টি বলল
– আমি এই ভয় করছিলাম। আমি এখুনি রওনা দিচ্ছি। কাল সকাল নাগাদ পৌঁছে যাবো। ততক্ষণ যাবত প্লিজ তুমি হোটেল ছেড়ে চলে যেও না।
আমি কি করবো বুঝতে পারছি না। কিন্তু তারপরও কথা দিলাম থাকবো।সারা রাত কাটালাম লবি তে।প্রচণ্ড ভয় লাগছে। ভাগ্য ভাল যে সে রুম থেকে নিচে লবিতে নেমে আসলো না। আমি আমার মোবাইল অফ করে দিলাম। যাতে সে ফোন না করতে পারে। সকাল ৮ টার মাঝে আন্টি এসে হোটেলে পৌঁছে গেলো।তারপর ইতিহাস। আমি লাগেজ ছাড়াই জাস্ট টিকেট কেটে ঢাকা চলে আসলাম। তাকে ফেস করার সাহস আমার নেই। সবচেয়ে বড় কথা এত বড় পাগলের সাথে আমার পক্ষে থাকা সম্ভব না।

পাঁচ

আমার প্রথম প্রেম টাই ব্যর্থ হল। বাড়ি ফিরে আমার প্রচণ্ড কষ্ট হতে লাগলো। শুধু মনে হচ্ছে রাশেদ আমাকে ঠকিয়েছে। কিন্তু সে তো তার মানসিক রোগের কথা আগেই বলেছিল। আবার এমন মানসিক রোগীর সাথে থাকাও সম্ভব না। আমার এক মাত্র বন্ধু দিঠি কে সব কথা খুলে বললাম। দিঠি সাইকোলজির ছাত্রী। সে বলল
– আমার এক টিচার এর সাথে কথা বলবি? সে এই রোগ টা সম্পর্কে তোকে ভাল বলতে পারবে।আমার মনে হয় তুই রাশেদের সাথে অন্যায় করছিস।
– মানে? তুই বলতে চাস ওই পাগল টার সাথে আমাকে থাকতে?
– কোন মানসিক রোগীকে পাগল বলা উচিৎ না। শরীরের যেমন অসুখ হয়। মনেরও তেমন অসুখ হয়। তারা পাগল নয় তারা অসুস্থ।
আমার কথা টা মনের ভিতরে যেয়ে বিঁধলো । আসলেই তো ওষুধ খেলে যখন ভাল হয়ে যায় তখন নিশ্চয় এটা অসুখ। আমার মনে হল কথা বলেই দেখি না। কি বলে দিঠির টিচার।
যা শুনলাম তার সার সংক্ষেপ অনেকটা এই রকম। বাইপোলার ম্যানিক ডিপ্রেসিভ ডিসঅরডার। এই রোগে কেউ কখনো কখনো খুব বিষণ্ণ হয়ে যায়। আবার কখনো কখনো কেউ খুব উত্তেজিত হয়ে পরে। বিষণ্ণ হয়ে গেলে সেটাকে বলে ডিপ্রেসিভ ফেস। আর উত্তেজিত হয়ে গেলে ম্যানিক ফেস। ম্যানিক ফেস টাই রাশেদের হয়েছিল কক্সেসবাজারে ওষুধ না খাবার জন্য। ও আসলে এমন নয়। উনি আরও বললেন এই রোগ কক্ষনো পুরোপুরি ভাল হয়ে যায় না। কিন্তু নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। অনেকটা ডায়বেটিসের মত। নিয়মিত ওষুধ খেলে এই রোগের মানুষ পুরোপুরি স্বাভাবিক থাকে। আর তাদের দরকার ভালবাসা , যত্ন। কক্ষনো নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে গেলে ডাক্তার তো রয়েছেই। কিন্তু ভয় পেয়ে তাদের দূরে ঠেলে দেয়া যাবে না।
বাসায় যেয়ে আমি অনেক ভাবলাম। আসলেই তো আমার ভালবাসার মানুষ কে দূরে ঠেলে দিয়েছি শুধুমাত্র তার অসুস্থতার কারণে। আমি কি একটু ধৈর্য ধরে তাকে সামলাতে পারতাম না? ভালবাসার মানুষের অসুস্থতা ভালবাসা দিয়েই জয় করতে হবে।

ছয়

বাইরে ঝুম বৃষ্টি । আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি আমি আবার রাশেদের কাছে ফিরে যাবো। একটা সিএনজি নিয়ে রাশেদের বাসার সামনে এসে নামলাম । রাশেদের নিজেদের দোতালা বাসা। বাসার কেয়ারটেকার আমাকে চিনেন।আমাদের ২ জনের ভালবাসার কথাও তিনি জানেন। তিনি ছোটবেলা থেকে রাশেদের বাবা মারা যাবার পর কোলে পিঠে করে মানুষ করেছেন। আমাকে দেখে তিনি কেমন যেন মুখটা নিচে নামিয়ে ফেললেন। আগের মত হাসলেন না। ব্যাপার টা কি?
– কি খবর সবুজ ভাই
– ভাল থাকা যায়?
– মানে?
– আপনি কি কিছুই জানেন না?
– কি জানবো ?
– রাশেদ ভাইজান আর নেই।
– মানে?
– তিনি আত্মহত্যা করেছেন কক্সেসবাজার থেকে ফেরার পর ই।
সবুজ ভাই কাঁদছেন ।
আমার বুকটা কেমন খালি লাগছে। রাশেদ নেই মানে? আমি কত কিছু কল্পনা করে এসেছি। রাশেদের কাছে ক্ষমা চাইবো। তারপর আবার আগের মত জীবন শুরু হবে আমাদের। আমি তার অসুস্থতা ভালবাসা দিয়ে জয় করে তাকে সারা জীবন আগলে রাখবো। এখন আমি কি করবো ?আমি রাস্তার উপরই বসে পরলাম।
– ভাইজান
– বলেন
– খালাম্মা এই বাড়ি ছেড়ে তার বোনের বাসায় চলে গেছেন । পুরো বাড়ি ফাঁকা । আপনাকে একটা জিনিস দেখাতে চাই। এই জিনিস খালাম্মা কাউকে দেখাতে না করেছেন।নষ্ট করে দিতে বলেছেন। কিন্তু আপনাকে আমি দেখাবো।আপনার জন্যই আমি অপেক্ষা করছিলাম।
– কি জিনিস?
– বাড়ির ভিতর যেতে হবে আপনার।
– চলেন।
আমার ভাবনা থেমে গিয়েছে। আমার কানে সবুজ ভাইয়ের কথা শুধু ঢুকছে। কিন্তু মাথায় যাচ্ছে না। আমি বসেই আছি।
– চলেন
এই বার উঠলাম আমি। হাঁটার শক্তি যেন হারিয়ে ফেলেছি। অনেক সবুজ ভাই ই ধরে ধরে আমাকে উপরে তুলল। আমাকে নিয়ে গেলো রাশেদের ঘরে। ঘর জুড়ে পাঁচ টা পোট্রেট। পাঁচ টা পোট্রেট ই আমার। পাঁচ টা নীল পদ্ম। রাশেদ মারা যাবার আগেই তার ভালবাসার পাঁচ টা নীল পদ্মই আমাকে দিয়ে গিয়েছে।
– সবুজ ভাই আমাকে ছবি গুলো দিবেন
– না।
– কেন?
– খালাম্মা চান না তার ছেলের নামে কোন কলঙ্ক ছড়াক
– আমি কলঙ্ক ছড়াবো ?
– আপনাকে বিশ্বাস কি? একবার তো ছেড়ে চলে এসেছেন
তাই তো আমাকে তো আসলেই বিশ্বাস করা যায় না। সবুজ ভাই বলেই যাচ্ছে কথা
– জানেন খালাম্মা ভাইয়া সুইসাইডের নোট পুড়িয়ে দিয়েছেন। ওখানে আপনার আর রাশেদ ভাইজানের ভালবাসার কথা লেখা ছিল। আপনার জন্যই আমার রাশেদ ভাই সুইসাইড করেছেন। আর কোন দিন আসবেন না এখানে আপনি। আমি ছবি গুলো পুড়িয়ে দিবো আজকে। ভাল যদি বাসতেই পারবেন না তখন বলেছিলেন কেন ভালবাসার কথা। অসুস্থ মানুষ কে বুঝি ভালবাসা যায় না?
সবুজ ভাই যা বলছেন তা একদম সত্য কথা। মানসিক ভাবে অসুস্থ মানুষ কে কি আসলেই ভালবাসা যায় না। আমার জন্যই রাশেদ আজ এই পৃথিবী তে নেই। আমি বৃষ্টির মাঝেই দৌড়ে বের হয়ে গেলাম বাড়ি থেকে। বৃষ্টির মাঝে হাঁটছি। এক সময় আর পারলাম না। ফুটপাথে বসে বৃষ্টি তে ভিজতে ভিজতে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলাম আমি।আমার রাশেদ আর নেই। এটা কিভাবে মেনে নিবো ? আমার কান্না দেখে লোক ঝরো হওয়া শুরু করলো। আমি উঠে একটা রিকশা নিলাম।চললাম বাড়ি।

সাত

আমারও মনের অসুখ হয়েছে। হয়তো রাশেদের মত নয়। কিন্তু তাও তো মনের অসুখ। আমার কিছু ভাল লাগে না। সারা দিন শুধু রাশেদের কথা ভাবি। আমি কত বড় অন্যায় করেছি এটা নিয়ে ভাবি। জীবন কে নতুন ভাবে উপলব্ধি করছি। মৃত্যুই যখন হবে তখন আর এত ভালবাসা ভালবাসি করেই বা কি হবে।পৃথিবীর এত রঙ এত আনন্দ কিছুই আমাকে আর স্পর্শ করে না। সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে নিয়ে গেলেন আব্বু আম্মু। সাইক্রিয়টিস্ট বললেন আমার মানসিক রোগ হয়েছে। তীব্র বিষণ্ণতায় আক্রান্ত আমি। আমাকে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করে দিতে বললেন। তা না হলে নাকি আমি যে কোন সময় সুইসাইড করতে পারি। আমি মনে মনে হাসি। সাইক্রিয়াটিস্ট কত বোকা। আমি তো সুইসাইড করবো না। তারপরও আমি সাইক্রিয়াটিস্টের ভুল ভাঙলাম না। মানসিক হাসপাতাল কে বেছে নিলাম আমার বাড়ি হিসেবে। কারণ আমি প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই। আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত।

সমাপ্ত।

লেখকঃ অরণ্য রাত্রি

প্রকাশেঃ সাতরঙা গল্প

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.