হারানোর ভয়

লেখক: স্বধু

২০১৭ সাল আমার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর দীর্ঘ অবকাশ। বাড়িতে চলে আসছি পরিবারের সাথে সময় কাটানোর জন্য।পরিবারের সাথে সময়টা ভালো কাটছে।গ্রামে আমার কোন বন্ধু নেই।স্কুলের সহপাঠী যারা ছিল কাজের সুবাদে তারা গ্রামের বাইরে থাকেন।তবে সমবয়সী এক দুজনের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠেছে। মাঝেমধ্যে তাদের সাথেই আলাপ হয়।

একা থাকতে আমি কখনোই পছন্দ করতাম না।বন্ধুদের সাথে আড্ডা,ঘুরতে যাওয়া ও যেকোন ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার প্রবল ইচ্ছা আমার ছোটবেলা থেকেই ছিল।যদিও সমাজের মাত্র কয়েকজন মানুষের সাথেই আমার চলেফেরা হতো।তাই বাকীদের নিয়ে আমার কোন ভাবনা ছিলনা।

নদীর পারে আমার বাড়ি।বাড়ির কিছুটা দক্ষিণে পুরনো কিছু বাড়ির ভিটে।আগাছা আর জঙ্গলে ভরে গেছে।লোকজন সেখানে খুব একটা যায় না। নদীর পারে হওয়ায় জায়গাটা আমার বেশ পছন্দের। বিকেলে সূর্যটা পশ্চিমে গড়িয়ে পরলে হালকা ছায়া পড়ে আমার বসার জায়গায়।আর সন্ধ্যা হলেই চারিপাশে পোকাদের ঝিঁঝিঁ আওয়াজ আর যমুনা সেতুর বাতীগুলো জ্বলে ওঠে।নদীর পাড় ঘেঁষে সবুজ ঘাসে ঢাকা।পাড়ে কিছুটা খালের মতো। নতুন পানিতে ভরে গেছে।আর খালের ওপারে কাশবন। হালকা বাতাসে কাশবনে ঢেউ উঠে।এখানে সবচেয়ে চমৎকার সময় যখন আকাশে চাঁদের দেখা মেলে।হাজারো নক্ষত্রের ছিটিয়ে থাকা দৃশ্য। চাঁদের মিষ্টি আলোতে কাশবনের ঢেউ বেশ উপভোগ্য হয়।আমার সাড়াটা দিনের বিশেষ একটা অংশ এখানে কাটে।

আজ সকালে ফেসবুকে ফেক আইডিতে এক ভদ্রলোকের সাথে আলাপ হয়।তার নাম আরিফ। পড়াশোনা করেন ধানমন্ডিতে একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে।আরিফ আমাকে মেসেজ দিল-

– হাই!
– হাই! কেমন আছেন?
– ভাল আছি।আপনি কেমন আছেন?
–  ভাল আছি।কোথায় থাকেন আপনি?
– ধানমন্ডি। আপনি কোথায় থাকেন?
– টাঙ্গাইল।
–  আমিতো এখন টাঙ্গাইল আছি।আপনার নাম্বার দিন কথা বলি।

আমরা মোবাইলে একে অপরের প্রয়োজনীয় বিষয় জেনে নেই।আরিফ আসছে আমার সাথে দেখা করতে।তার আসতে আসতে দুপুর গড়িয়ে যাবে।আমি পরিপাটি হয়ে অপেক্ষা করছি নৌকা ঘাটে।

১ ঘন্টা অপেক্ষার পর আরিফ আসলো।নৌকার সামনে বসে আছে আরিফ। পাশে একটা শপিং ব্যাগ। ওকে চিনতে আমার অসুবিধা হয়নি।যদিও ও ফেসবুকে আমাকে অন্য কারো ছবি দিয়েছিলো। তবে ছবির ব্যক্তির চেয়ে ও বেশি আকর্ষনীয়। ওকে দেখে আমার বেশ আনন্দ হচ্ছে।আমি নিজের চারিপাশ ভুলে গেলাম ।নৌকা থেকে নেমে দু’জনে করমর্দন করে আমার পছন্দের জায়গায় নিয়ে গেলাম ।গাছের ছায়ায় ঘাসে বসে ও সিগারেট জ্বালিয়েছে।আমাকেও দিয়েছে একটা।আমি ওকে দেখছি অপলকে।আমার হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে। নিরবতা ভেঙ্গে ও আলাপ শুরু করলো।

– আই ওয়ানা কিস ইউ?
– নো!
– হুয়াই?
– দিস ইস পাব্লিক প্লেস!
– ওকে।

আমাদের আলাপ আর এগুলোনা।

মাত্র ৩০ মিনিট সময়ে সে তিনটি সিগারেট ফুকিয়েছে। সিগারেট শেষ হওয়ায় সে জিজ্ঞেস করলো, সিগারেট পাওয়া যাবে কোথায়। বললাম, আমার কাছে আছে।চলুন আমরা খালের ওপারে যাবো।সে সম্মতি জানলো।কিছুক্ষণ হেঁটে একটা নৌকা ধরে আমরা খালের ওপারে নেমেছি বালুতে।এখানে খুব বেশি লোকজন নেই। নতুন ফসল হয়েছে। কয়েকজন লোক ফসল কাটছেন।আমরা চরের দক্ষিনের কোনে এসেছি।এখান থেকে তাদের দেখা যায়না। আমি বালুতে আঁকছি।আরিফ পিছন থেকে আমাকে জড়িয়ে চুম্বন দিলো আমার ঘাড়ে, পিঠে আর কানে।আমি ভয় আর লজ্জিত বোধ করলাম।সংকোচ কাটাতে বললাম লোকজন দেখবে। সে চুপ হয়ে গেলো। একটুপর আরিফ জিজ্ঞেস করল –

–  এটা কি গাছ?
–  বাদাম।
–  এটা কি খাওয়ার উপযুক্ত হয়েছে?
–  হ্যা হয়েছে।আপনি খেতে পারেন। আমি তুলে দিচ্ছি।
–  এটা অন্যকারো। না বলে খাওয়া ঠিক হবেনা।
–  এটা আমাদের ক্ষেত।আর আমার বাবার চাষ করা।এই নিন খান।
–  ধন্যবাদ।

আরিফ বাদাম খাচ্ছে। আমি মন ভরে দেখছি নিজের স্বপ্ন পুরুষকে।আরিফের মতো কাউকেই সবসময় আমি চাইতাম আমার ভাবনায়।মুখ ভর্তি চাপ দাড়ি আর গোঁফের মধ্যে কামুক ঠোঁট আর পিপাসিত চাহনি আমাকে পাগল করে দেয়।আজ তাকে সামনে পেয়ে মনের মধ্যে আনন্দের ময়ুর নাচছে।হঠাৎ মনে হলো ওতো আজই চলে যাবে আমাকে ছেড়ে। এটা ভেবে কিছু না বলা কষ্টে মনটা ভারি হয়ে গেলো।

হঠাৎ আকাশে ঘোলাটে ভাব চোখে পরলো।পিছনে তাকিয়ে দেখি কালো মেঘে আকাশটা ছেয়ে গেছে। মুহুর্তেই আষাঢ়ে বৃষ্টি ভিজিয়ে গেলো আমাদের। নদীর জলে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ শুরু হলো। দু’জনে নেমে যাই যমুনার জলে।অল্প জলে নেমে আমরা স্নান করছি।সে আমাকে তার চোখে বন্দি করল। তার চোখে কামের তুফান দেখছি। পিপাসার্ত জানোয়ারের মতো ঠোঁট চুবিয়ে দিল আমার ঠোঁটে।।কাছে থেকে আরও কাছে টেনে নিচ্ছে ও আমায়।প্রকৃতির সাথে আমরা মিশে গেলাম প্রকৃতির আয়োজনে।

হঠাৎ উচ্চস্বরে ডাক শুনতে পেয়ে আমরা ভ্রমে আসি ।উচ্চস্বরে ডাক দেওয়া কন্ঠটি আমার বাবার।তাই কিছুটা ভয়ও পেয়েছি।কিছুক্ষন কেটে গেলো ডাকটি আর শোনা যায়নি।তাই আমরা আাবার স্নানে মগ্ন হই।

বৃষ্টি থেমে গেলো।চারিপাশ আবছা হয়ে গেছে। এখনি সন্ধ্যা নেমে আসবে।আমরা বাসায় ফিরবো। হঠাৎ সে বললো-

– নৌকা পাওয়া যাবে?
– না।
– বলো কি! আমারতো যেতেই হবে।
– কিন্তু যাওয়ার তেমন কোন ব্যবস্থা নাই।আর আজ নাহয় আমার কাছে থেকে যান। আমিতো খুশি হবো।
– ঠিক আছে থাকবো আজ।

আরিফকে নিয়ে বাসায় যাচ্ছি।পথে বাবার সাথে দেখা। বাবা-

– কোথায় গিয়েছিলে?
– বাবা আমার বন্ধু এসেছে শহর থেকে।ওর সাথে পরিচিত হোন। আরিফ উনি আমার বাবা।পরিচিত হও।
– আসসালামু আলাইকুম, আঙ্কেল।ভাল আছেন?
– হ্যা ভালো আছি।সোহাগ, উনাকে বাসায় নিয়ে যাও।আমি এসে আলাপ করব।

আমার ঘরে নিয়ে ওকে বসালাম।শুকনো কাপড় পরে দু’জনে প্রস্তুত হলাম নাস্তা করার জন্য।মায়ের সাথে আলাপ হলো ওর।আর নাস্তাও হয়ে গেলো। সন্ধ্যা হয়ে গেছে।বাহিরে অন্ধকার হচ্ছে।সিগারেট ফুকানোর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।সিগারেট নিয়ে হাঁটছি। রাস্তায় খুব বেশি লোকজন নেই। তাকে নিয়ে আমার আরেকটি পছন্দের জায়গায় গেলাম। এখানে নদীর পারে একটা নৌকা রাখা আছে। নৌকাটা অকেজো।তবে আমাদের বসার জন্য বেশ ভাল হয়েছে।আমি বসলাম নৌকার এক কোনে।সে আমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে।আমরা দুজনের বিষয়ে জানছি। আর আমি তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।

হঠাৎ সে আমায় তার বাহুডোরে আগলে নিলো।ঠোঁট গুঁজে দিলো আমার ঠোঁটে।আকাশে চাঁদ আর তারার মিছিল হচ্ছে। চারিপাশ আবছা আলোয় ভরে গেছে। মিষ্টি আলো, হালকা বাতাস আর বর্ষার গন্ধে প্রিয়কে আলিঙ্গন করার স্বাদ আমায় তৃপ্ত করছে।

আমরা এখন বাসায়।রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে আছি।জানালা দিয়ে চাঁদের আলো তার মুখে পড়ছে। আমি তাকে দেখছি। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিনা। চাঁদের আলোয় তাকে দেখতে অসম্ভব সুন্দর লাগছে।প্রান ভরে তাকে দেখছি।তার কপালে একটা চুমু এঁকে দিলাম।আর সেও আমাকে বন্ধি করলো তার পাঁজরে।মধুর আলিঙ্গনে আদিম খেলায় মিশে একাকার হয়ে গেলো চাঁদ, রাত আর আমাদের শরীর। 

সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি রোদের মিষ্টি আলো তার মুখে পড়ছে।তাকে দেখার স্বাদ মিটছেনা। তার ভাবনায় নিজেকে ডুবিয়ে ফেলি নিজের অজান্তেই।হঠাৎ মনের কোনে মোচড় দিয়ে উঠলো। ঘুম থেকে উঠেই সে আমায় হারিয়ে ফেলবে।চলে যাবে সে তার ঠিকানায়।তার ঠিকানাও আমার অজানা। চিরতরে তাকে হারানোর ভয় আমাকে পাগল করে দিলো।আমি আরিফকে দেখতে চাচ্ছিনা। ভয় হচ্ছে, তাকে হারানোর ভয় আমাকে বিষিয়ে তুললো। কষ্টের নীল আকাশে ভাবনায় ডুবে গেলাম।

হঠাৎ মায়ের ডাকে ভাবনার বিরতি হলো। তার ঠোঁটে শেষবারের মতো ঠোঁট ডুবিয়ে কষ্টের স্বাদ নিলাম।চোখের কোনে ভালবাসাগুলো নীল কষ্টের জল হয়ে টলমল করছে।নিজের ভাঙন ঠিক করতে চেষ্টা করলাম।

আরিফ আমার পরিবারের থেকে বিদায় নিয়ে রওনা হয়েছে।আমি ওকে এগিয়ে দিতে এসেছি।

আরিফকে হারাতে চলেছি আমি। হারানোর এই ঝড় সামাল দিতেই আমি ব্যস্ত।আরিফ গাড়িতে উঠেছে।বড় ইচ্ছে হচ্ছিল কপালে একটি চুম্বন এঁকে তাকে বিদায় দেওয়ার।কিন্তু সে ইচ্ছে আমার চোখের কোনে জল হয়ে ঝড়লো।আর কেটে গেলো তাকে হারানোর ভয়।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.